ভ্রমণ

শীতের সাতকাহন

শীতে শালবনে, বান্দরবানে

মীর ওয়ালীউজ্জামান | 5 Apr , 2011  

সপ্তম কাহন: শীতে শালবনে, বান্দরবানে

k-7-5.jpg
ভাওয়াল গড়ের মেজবানগণের সাথে বসে আছেন লেখকের দুই ভ্রমণসঙ্গী

ভাওয়াল গড়ে

বিষ্যুৎবার বিকেল। অফিস ডিউটি শেষে নিচে নেমে গাড়ি বের করে অপেক্ষা করছি। ওপর থেকে নামবে আমার সহকারী রাকিব। ওর বউ রিপা আসছে ওদের লালমাটিয়ার বাসা থেকে। যাব সবাই মিলে শালবনে, ভাওয়াল গড়ের এক গ্রামে। ওরা খেজুরের রস খাবে, শীত উপভোগ করবে। শহরে এই পৌঁষ মাসের শেষেও নাকি তেমন শীত অনুভূত হচ্ছে না। রুবি সকালে অফিসে আসার সময় আমার ওভারনাইট ব্যাগ সঙ্গে দিয়ে দিয়েছে। রিপা রিকশায় এসে নামল। রাকিবও দেখছি সিঁড়ি বেয়ে নামছে। টেলিপ্যাথি নাকি গো? দেবাদেবী একসঙ্গে যে? আমার রসিকতায় রিপা হেসে বলে, না, টেলিফোন—সেলুলার। বোঝা গেল। পেছনের ডিকি খুলে ওদের ব্যাগ তুললাম। যাত্রা শুরু হল। উওরায় আলিবাবা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে বাচ্চাদের জন্য মিষ্টি নেয়া হল। চা খেয়ে একটানা চলে সন্ধের মুখে ভাওয়াল গড়ে ঢুকে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে শীতও যেন ঝামড়ে এল, ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। কাঁচ তুলে দেয়া হল। রিপা পেছনে বসেছিল। এবারে শুয়ে পড়ে বলল, আমি সব দরজা লক্ করে ঘুমোলাম। যথাসময়ে উঠব।

এমসি বাজার থেকে শিশুপল্লীর সাইন দেখে ডানদিকে ছোট রাস্তায় পড়লাম। একটু এগিয়েই শিশুপল্লীর নানা স্থাপনা অনেকখানি জায়গা জুড়ে। টিমটিম্ করে হলুদ আলো জ্বলছে প্রকল্প এলাকায়। ওদের কম্পাউন্ড নিচু দেয়ালে ঘেরা। সন্ধে না হতেই এই জনবিরল অরণ্য অঞ্চলে আঁধার নামে। গাড়ির বাতি আমাদের সাহস ও মানসিক সমর্থন যোগাচ্ছে। গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাকিব আর আমি শীতবস্ত্র গায়ে চড়িয়ে নিলাম। আরাম লাগল। রাকিব ফিসফিস করে শুধোয়, আর কতদূর? কতদূর আর, কতদূর, বলো মা … গান গাইতে গাইতে আমি সরু পিচের রাস্তায় চোখ আর মন রাখলাম। একটা গুঁইসাপ রাস্তা পেরোল। জঙ্গল এখানে দু’দিক থেকে চেপে এসে আমাদের আটকে দিতে চাইছে যেন। জনমনিষ্যির চিহ্ন নেই। নেই বাড়ি-ঘর। আমরা যাচ্ছি কোথায়? রিপার আচমকা প্রশ্নে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। হেসে বললাম, এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি … মনে পড়ছে? হ্যাঁ, পথের পাঁচালি, রাকিবের ঝটিতি উত্তর। বিশ্বাস হচ্ছে না একটুও, ওয়ালী ভাই। রিপার কন্ঠে শীত, ভয়, রোমাঞ্চের মেলামেশা। সেজন্যই আপনাদের আনা এখানে, অন্যরকম জীবনের স্বাদ নিতে … বলে আমি সামনে আলো দেখাই, ওই যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সীমানা। এসে গেছি। গাড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেখে ব্যাগ কাঁধে আমরা ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় পথ দেখে এগোই। ফজলু দোকানি জিজ্ঞেস করে, ওয়ালী বাই না? কই উটবাইন? দেখি, আফাজদের বাড়ি যাই আগে।

আফাজের বাবা জানালেন, ম্যাহমান লইয়া আইছুইন। হারুনের বাড়িতে উডুইন যে। বলেন, আমি লগে লই। শামসুদের বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে উনি আমাদের মনজিলে পৌঁছে দিলেন। রাকিব-রিপা বিস্মিত, আনন্দিত। ছোট্ট একতলা বাড়ি। বড় ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা হল। গরম জল এল বাথরুমে, যদি কারো হাতমুখ ধুতে ইচ্ছে করে। সামনে ঢালু সবুজ ঘাসে ছাওয়া প্রান্তর গড়িয়ে গেছে। ঐ দূরে মালভূমির ওপর আরেক বাড়ি। টিমটিম্ আলো জ্বলছে। বিজলি বাতি আছে ঠিকই, তবে ভোল্টেজ কম। বারান্দায় বসে শীতে কুঁকড়ে না গেলে দৃশ্যটি পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে চালানো যেত। পুরো পাড়া জুড়েই আফাজদের পরিবারের বসবাস। আমাদের আগমনী বার্তা চাউর হতে ঘরে ঘরে প্রস্ততি চলছে—কে কিভাবে রাকিব-রিপাকে আপ্যায়ন করবে। ওদের সেকথা জানাই। ওরা যার পর নাই আমোদিত হয়। আপাতত: ঠান্ডায় ঘোরাঘুরি না করে হারুনের ঘরেই আড্ডা জমালাম। ক’টি মেয়ে এসে রিপাকে নিয়ে গেল পাড়া বেড়াতে। ডোউন্ট ফগ্গেট ইওর ফ্ল্যাশলাইট, রিপা। হ্যাঁ, বাইরে তো কেষ্টর পক্ষ চলছে। রসিকা রিপা ডান্ডাবাত্তি (বিহারের গাঁয়ে দেহাতিদের মুখে শোনা) হাতে বেরোয়।

k-7-6.jpg
ভাওয়ালে লেখকের জমির গাছ

আফাজ এসে বসল কাছে। কি লাগবো, বাইয়ে? কন আমারে। ওর কথায় মনে পড়ল, আমার ব্যাগে চানাচুর রয়েছে। ওকে বাটিতে কাঁচা লঙ্কা-পেঁয়াজকুচি আর দু’ফোঁটা সর্ষের তেল আনতে বল্লাম। আফাজ ছুটল। রাকিব গ্লাসে গরম পানি আর ফায়ার ওয়াটার মিশিয়ে চুমুক দিয়ে মুখ খুলল, পুরো গ্রামই মনে হল আপনাকে ‘ওয়ালী বাই’ বলে জানে—ছেলে-বুড়ো-নারী নির্বিশেষে। এর তাৎপর্য্য যদি একটু বয়ান করেন। বলছি, পেটের ভেতরে ঝাল চানাচুর আর ফায়ার ওয়াটার একটু ক্রিয়াশীল হোক। বছর কুড়ি আগে এখানে এসে আমি এক ডাক্তার বন্ধুর সহায়তায় হাসপাতাল, স্কুল, কৃষিকাজ শুরু করেছিলাম। স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের কাজ দিয়ে, শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়ে এক সামাজিক আন্দোলনের পত্তন করেছিলাম। এই আফাজদের গোষ্ঠীর সবাই আমাকে পুরো সমর্থন যুগিয়েছে তখন। আফাজ একসময়ে আমাদের প্রকল্পের কৃষি বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্তি পায়। আমরা একসময় এখান থেকে চলে গিয়েছিলাম অন্যতর কাজের দায়িত্ব পালন করতে। আফাজরা ওদের কনিষ্ঠদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রকল্পের কাজ চালু রেখেছে। আজ ওদের ছেলেমেয়েরাই এখানকার নেতৃত্বে। আমি মাঝে-মাঝে আসি, রুবিও আসে। আমাদের মেয়েটি তার জীবনের প্রথম বছর এই গ্রামেই কাটিয়ে গিয়েছে। সে-ও আসে নাড়ির টানে। এরা সকলেই আমাদের আত্মীয়ের বাড়া।

খুব আরামে বসে আড্ডা হচ্ছিল। রাতের খাবারের ডাক এল। আফাজের বড়চাচার বাড়িতে এবেলা খেতে হবে। জ্যাকেট-টুপি-মাফলার চাপাতে হল। দরজা খুলতে প্রচন্ড ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপ্টা লাগল মুখে। চোখের কোণ ভিজে ভিজে লাগছে। ভেজা শীতের আবহে এরকম হয় জানি। আফাজ, ইরানে কি এর চেয়ে বেশি শীত? আমার প্রশ্ন শুনে আফাজ হাসে। কি যে কন বাইয়ে, তেহরানে তো শীতকালে আমার খালি কান্দন আইতো। বাইরের কামে যাইতে কইলেই ভয়ে আতপাও ফ্যাডের বিত্রে হান্দাইত য্যান্। কি আর করা, রুজি-রুজগারের ব্যাফার তো, সাইরা আইছি। আল্লায় সারাইছে। আমার তো সবসময় মাতাব্যাতা থাকতো। আফনে ঔষদ না ফাডাইলে মল্লাম অইলে আমি। রাকিবের ঔৎসুক্য মেটাতে বলি, ও পিলখানার গোলাপবাগানে প্রশিক্ষণ নিয়ে তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে মালির চাকরি নিয়ে গিয়েছিল।

সব বন্দোবস্ত বাইয়েই করছিলেন, আফাজ শূন্যস্থান পূরণ করে। শামসু হারিকেন হাতে এগিয়ে নিতে এসেছিল। ওদের বাড়ি পৌঁছে বিছানায় উঠে দস্তরখানে বসা হল। চিলমচিতে হাত ধোয়ার পর খাওয়ার আয়োজন দেখে চক্ষু স্থির! রিপা তার ফ্যানদের সঙ্গে নিয়ে বসেছে। আফাজদের দুই বোন ফ্যাশন ডিজাইনার রিপার চলন-বলন-কার্যকরণে মুগ্ধ।

দু’দশক আগের তুলনায় এদের ঘরবাড়ির শ্রী ফিরেছে। মানুষজনের স্বাস্থ্য ভাল। সব বাড়িতেই সবজি বাগান, ছোট পুকুরে ঘরে খাবার মাছ পর্যাপ্ত। সব দেখেশুনে আমার মন ভরে যাচ্ছিল। রাকিব-রিপাও মুগ্ধ ওদের আতিথেয়তায়, আপন করে নেয়ার গুণে। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে জানালাম, আমি শামসুদের বাড়িতেই রাতে কাত হব। রাকিব-রিপাদের রাত ১১টায় খেজুরের তাজা রস নামিয়ে খাওয়ানো হবে। গ্র্যান্ড। মন্তব্য করে আমি শুভরাত্রি জানিয়ে লেপের নিচে ঢুকে গেলাম। ভোরে উঠে যথারীতি প্রাত:কৃত্য সেরে হাঁটতে হাঁটতে উত্তরের বনে চলে গেলাম। বনের মধ্যে মান্দাইদের বাড়িতে পৌঁছে সুরেন্দ্র রাজবংশীর খোঁজ করলাম। সুরেনের চুলে পাক ধরেছে। ওর মাসি মোড়া পেতে বসতে দিলেন। নিয়ে এলেন গৃহে তৈরি ধান্যামৃতের হাঁড়ি আর লবণ-মরিচ ছড়ানো মুরগির ডিমসেদ্ধ। আতিথ্য অবহেলা করার প্রশ্নই ওঠে না। মাসি পাশে বসে পরিবারের সকলের কুশল শুধান। আফাজ আমার পেছনে পেছনে চলে এসেই পড়েছে। মাসি ওর মাথার টুপি দেখে বললেন, ইরান ফেরত আফাজ মৌলানা অইছে। একটা ডিমসেদ্ধ খাও তুমি। আমরা বিদায় নিলাম। আম্মা ফিডা বানাইছে সারারাইত, আমারে কয়, ওয়ালি ব্যাডারে ডাইক্ক্যা নিয়ায়। এই বাড়িত্ নাস্তা খাইবো। আফাজের বার্তা শুনে দ্রুত পা চালাই।

গাজিরচালা থেকে দেখতে পাই, রিপা পাড়ার সব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ফসল কেটে তোলা ন্যাড়া মাঠে গোল্লাছুট খেলছে। রাকিব বোধহয় এখনো ঘুমোচ্ছে। ছেলেটা একটু ঘুমকাতুরে আছে। ওর নাকি পেট ভরে ঘুমোনোর সুযোগ হয় না। সারাদিন অফিসে ব্যস্ত, রাত কাটে ইন্টারনেট ব্রাউজিং-এ নাকি। আফাজ দৌড়ে আগে চলে যায়, ওকে ঘুম থেকে তুলে আনবে। আমি রিপাকে হাত তুলে ডাকি, চেঁচিয়ে বলি, পিঠে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, আসুন জলদি। আমার সাড়ে এগারো কাঠার প্লটে সামছু আর আফাজ গাছ লাগিয়েছে সীমানা জুড়ে। বড় বড় চারা কিনে এনে পুঁতে দিয়েছে, নিয়মিত জলসিঞ্চন হচ্ছে। রিপা পিঠে খেতে বসে আফাজের বাবার কাছে আবদারের সুরে পেশ করে, খালু, আমাদের জন্য এক টুকরো জমি কিনে দিতে হবে—ওয়ালী ভাইয়ের ওই গাছে ঘেরা জমিটার মতো। রিপা তখন কি ঘুণাক্ষরেও জানত যে, ওই জমিটাই বছর ঘুরতে ওর আঁচলেই বাঁধা পড়বে! সে আর এক গপ্পো। শুকনো চিতই, রসে ভেজানো চিতই, দুধপুলি, ভাপা—সবই একটু করে খেতে হল। আফাজের মা বিলাপ করে চললেন, আহারে, রুবি বেডি আর ছেরিডারে আনলে কী দোষ অইতো, দুইডা ফিডা খাইতো, গুরতো-গারতো দুইদিন…। পিঠে খেয়ে আরো বেশি-বেশি শীত লাগতে লাগল আমার। চা খেয়ে, বাথরুম সেরে ওদের তাড়া দিলাম। এবার ফিরতে হবে। ভাওয়ালের গ্রামে শীত উপভোগ করা হল বেশ!

বান্দরবানে

w-280.jpg
স্ত্রী-কন্যাসহ লেখকের পেছনে পাকা কটেজের সামনের ফুল

বান্দরবান শহর ছাড়িয়ে মিলনছড়ির রিজর্টে পৌঁছলাম ডিসেম্বেরের শেষে এক দুপুরে। মেটে সিঁড়ি বেয়ে রিগ্রিখিয়ং রেস্তোরাঁয় উঠে গেলাম সোজা। আমরা পাঁচজন—আমি, রুবি, রুবাই আর মামাতো ভাই ব্রাসেল ও তার স্ত্রী রুপাহলি। খাবারের কথা বলে, টেরাসে দাঁড়িয়ে দেখলাম এক অপূর্ব নৈসর্গিক সম্ভারের মেলা। কুয়াশার নীল, আকাশের নীল, অনেক নিচে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদীর সর্পিল নীল জলধারা, আর সবুজে সবুজ টিলাশ্রেণি—তার খাঁজে খাঁজে জংলি কলাবন, অজানা ঝোপঝাড় ও হ্রস্ব-উঁচু অটবি অজস্র। শীত বাতাসে শরীর কি কেঁপে উঠল একটু? বুড়ো হচ্ছি তো, নিজেকে বলি আমি। এখন থেকে শীতে ঠাণ্ডা একটু না হয় বেশিই লাগল! নিচে বাঁ দিকে কারপার্কে অপেক্ষমান আমাদের ভ্যানের চালক আলমগিরকে ইশারায় ওপরে ডাকলাম। হালকা লাঞ্চ খেতে খেতে রিজর্টের পরিচালক খোকন সাহেবকে জানালাম, আমরা এক্ষুণি চিম্বুকে যাব। শীত পড়েছে কেমন? খু-উ-ব, সন্ধে হলেই টের পাবেন, ওয়ালি ভাই। তাড়াতাড়ি ঘুরে আসুন। এবারে আপনাকে পাকা ঘর দেব, কটেজ নয়। একেবারে মেইডেন গেস্ট হবেন আপনারা। বেশতো, খোকনদা , তাই হবে। উঠে পড়ি।

চিম্বুকের চেনা রাস্তা অচেনা মনে হচ্ছে। প্রায় আড়াই দশক আগে ফৌজি জীবনে দেখেছিলাম, রাস্তা এবড়ো-খেবড়ো, ক্রলিং করে এগোনোর উপযোগী। এখন নিচু নিচু স্টাইলিশ গাড়ি মসৃণ পিচঢালা পথে চলেছে। ভালই লাগে। যাবতীয় উন্নয়নের সুফল কি গুটিকয়েক গ্র্যাবারদের জন্য? যারা কেড়ে খেতে পারছে না, তাদের দিন কি ফিরবে আদৌ? পথের একপাশে পাহাড়, অন্য দিকে খাদ। সেখানে নীল কুয়াশা, ঢালে দু’চারটি কুঁড়ে আর ঝোপঝাড়। আশ্চর্য সুন্দর সব পাহাড়ি বনজ কুসুমের মেলা। রঙের বিস্ফোরণ দেখছি মাঝে মাঝে—লাল, হলুদ, অপরাজিতা নীল। বুনো কলাগাছের জঙ্গল। চিম্বুক চূড়ার অব্যবহিত নিচে গাড়ি থেমে গেল। বাস স্টপ। সীমান্ত রক্ষীদের চায়ের দোকান। পরিচয় জেনে ওরা আমাদের গাড়িকে ওপরে উঠে যাবার ছাড়পত্র দিয়ে দিল। ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা হেঁটেই উঠলাম। অত্যন্ত খাড়াই। কাফ মাসল পাকিয়ে যেতে লাগল। রুবাই বয়সে সবার ছোট। ও সবার আগে চূড়োয় উঠে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, আব্বু, আম্মু, চাচা, চাচি, তাড়াতাড়ি এসো। এখানে কি বাতাস আর কী সুন্দর জায়গাটা! চিম্বুকে উঠে সকলেই যার-যার জ্ঞানগম্যি কাজে লাগিয়ে কেওক্রাডং, রাঙামাটি, কাপ্তাই ইত্যাদি যত পরিচিত পাহাড়ি ল্যান্ডমার্ক—সেগুলির লোকেশন নির্দেশ করতে ব্যস্ত হল। আমি হেলিপ্যাডের একধারে বসে ধূম্রশলাকা জ্বালালাম।

k-7-4.jpg
চিম্বুক চূড়ায় লেখকের দুই ভ্রমণসঙ্গী

নেমে বিডিআর-এর দোকানে বসে কফি আর গরম সিঙাড়া খেলাম। ফেরত নামার বেলায় একটি ছোটখাটো প্রপাতের ধারে থামা হল। ক’টি পাহাড়ি মেয়ে হস্তশিল্পের নমুনা দেখাল, মেয়েরা কিছু কিনল। মিলনছড়িতে ফিরতে সন্ধে ঘনাল। রেস্তোরাঁয় উঠে খোকনদার সঙ্গে আমি আড্ডায় বসে গেলাম। ওরা নিচে আমাদের ঘর-টর দেখে আসতে চলল। এখানে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে, তাই না? আমার প্রশ্ন শুনে দাদা হাসলেন, হ্যাঁ, তবে আপনাদের ঘরে ফায়ারপ্লেস রয়েছে। আমাদের জানালেই রুমবয় গিয়ে কাঠকুটো জড়ো করে আগুন করে দেবে রাতে। গুড, নতুন অভিজ্ঞতা হবে ওদের, আমি খুশি মনে বলি। গোয়েন্দাগিরির সুরে দাদা এরপর বললেন, আপনার সঙ্গে তো নিশ্চয় হাইল্যান্ডের জিনিষপত্র রয়েছে। তবুও যদি লাগে, আমার স্টকে বর্মি আগুনের ফেরেশতা রয়েছে, বলবেন শুধু। অবশ্যই, ধন্যবাদ। নিশ্চিন্ত বোধ করি। রুমে যাবেন নাকি, ওয়ালি ভাই? নাহ্, এখানেই ভাল লাগছে। নিচের দিকে অন্ধকারে তাকালেই মন উধাও হয়ে যায়। মনে মনে কার্সিয়ং-এর মোটেলে ম্যয়খানার টেরাসে বসে আঁধারে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে চোখ বিস্ফার করে বৃথাই কলাকেষ্ট বনে বসি আমি। কেবল, রামনামের পানীয়ের পাত্রটি অনুপস্থিত। আমি একটু হাসি, খুকখুক কাশি। গলা ভিজবে এক্ষুণি, ব্যবস্থা করছি। বলে করিৎকর্মা ছোটখাটো মানুষটি ত্বরিতপদে অপসৃত হলেন।

হাতে-মুখে ঠাণ্ডা বাতাস আদর বুলিয়ে দিতে শুরু করেছে। পকেট থেকে হাতমোজা বের করে পরি। প্ল্যাস্টিকের টেবিল-চেয়ার টেনে একটু পেছনে রেস্তোরাঁর কাঁচের দেয়ালের সঙ্গে বসিয়ে দিই। এখানটায় ওপরে রঙিন ক্যানভাসের চাঁদোয়া খাটানো। সরাসরি হিম ল্যান্ড করবে না শরীরে, তবে শৈত্যবিন্দুরাশি মৃদু বাতাসে ভর করে আসছে। কেউ একজন ভেতর থেকে বড় কাঁচের দরজার একটি পাল্লা টেনে দিল। খোকন এলেন। তার পেছনে পরিচালক। ট্রে-তে দু’টো লম্বা, সুদৃশ্য কাটগ্লাসের পানপাত্র কোন স্বচ্ছ পানীয়ে পরিপূর্ণ। চুমুক দিয়ে দেখেন, ভয় পাবেন না। ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা কুল-কুল প্লেইন ওয়াটার নয়, কচি ডাবের জলটা এখনো ঘোলাটে মেরে যায়নি, তাই। কথা একেবারে ঠিক, বলে আমি তারিয়ে তারিয়ে খোকনদার দাক্ষিণ্য উপভোগ করি। রুবাইরা এল। সকলেই মোটামুটি গা-মাথা ঢেকেঢুকে এসেছে। সাবধানের মার নেই। বান্দরবানের মশাদের কুখ্যাতি সেই ফৌজি জীবন থেকে শুনে আসছি। মশাদের প্রিয় জায়গা মানুষের হাত আর মুখ—আঢাকা পেলে আর কথা নেই, হুল ফুটিয়ে বসে থাকবে, জান কবুল করেও। কারণ, ওই অবস্থায় ওদের মধ্যে অন্যমনস্ক, দার্শনিক ধাঁচের মশা তো কামড়াতে গিয়েই মার খায় মানুষের হাতে। আহারে, দার্শনিকতা তাহলে সবাইকে অসহায় করে তোলে! এত কথা বলছি, কারণ, রুবাই, সে সন্ধেয় একটি মশার কামড় খেয়েছিল ঐ টেরাসে বসে, ফুলহাতা জামা পরে না থাকার কারণে। ঐ একটি কামড়ের ফলে আরো দিন ১০/১২ পরে ঢাকায় ফিরে ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শমরিতায় দিন দশেক কাটিয়ে রোগমুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিল।

w-330.jpg
জলপ্রপাতে জেগে থাকা পাথরের উপরে বসে আছেন লেখকের মেয়ে রুবাই

জমিয়ে আড্ডা হল। ভেতরে গিয়ে বসেছিলাম আমরা একটু বাদেই। বাইরের দিকের দরজা একেবারে বন্ধ করে দিতে হল। শীতের মার। বাতাস তখন আরো জোরদার হয়েছে। গাইড ট্যুরের টিলার চারপাশে বহুদূর পর্যন্ত জনমনিষ্যির চিহ্নমাত্র নেই। কেবল অরণ্যানী আর টিলাশ্রেণী। বহুদূরে নিচে শঙ্খ নদী সরু রুপোর ধারার মতো দেখায়। সত্যিকারের জনবিরল। কেবল প্রকৃতি আর প্রাণীকূল ঘিরে রয়েছে আমাদের। ডিনার খেয়ে ঘরে ঢুকে মনটা আরো খুশ্ হল। ফায়ারপ্লেসে লগ জ্বলছে। ব্রাসেলদের ঘরে ঢুকে দেখে এলাম, ঠিকই আছে। ওরা শুভরাত্রি বলতে চাইছে। ফিরে এসে আগুনের পাশে আরাম চেয়ারে বসে প্রিয় ঔপন্যাসিকের সাম্প্রতিক রচনায় মন দিলাম। ছুটি কাটানোর উপযুক্ত ঋতু, আবহ ও পরিবেশই বটে! ওরা মা-মেয়ে বড় বেডে শুয়ে পড়ল। উষ্ণতার মাঝে ঘুমিয়ে যাবে, এই ইচ্ছে। আগুনের শিখা ধিকিধিকি জ্বলছে, নিভে যাচ্ছে মনে হচ্ছে, আবার চেটে-চেটে ফিরে আসছে নীলচে আভায়। হাই উঠতে আমিও দাঁত ব্রাশ করে বড় আলো নিবিয়ে কম্বলের ওপর লেপ টেনে নিলাম গায়ে। বালিশে মাথা রেখে শুয়ে আধবোঁজা চোখে ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমে তলিয়ে গেছি!

পড়ুন: (প্রথম কাহন) (দ্বিতীয় কাহন) (তৃতীয় কাহন)(চতুর্থ কাহন)
(পঞ্চম কাহন)(ষষ্ঠ কাহন)

m.waliuzzaman@gmail.com
আর্টস প্রোফাইল: মীর ওয়ালীউজ্জামান


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


2 Responses

  1. আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ভ্রমণে আদিবাসী কোথায়? এই অনুপস্থিতি লেখাটিকে সাধারণের মাত্রায় নামিয়ে এনেছে। ধন্যবাদ।

  2. Sabuj Ahmed says:

    ভাল লাগল বর্ণনা পড়ে। মন ছুটে যেতে চায়, কিন্তু নগর জীবনের ব্যস্ততা……….আসলে হয় না!!!
    আরও ভাল লাগত যদি আরও বেশি ছবি থাকত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.