যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার

অদিতি ফাল্গুনী | ২৬ মার্চ ২০১১ ১:৩০ অপরাহ্ন

a-freedom-fighter-taking-mid-day-nap.jpg
দুপুরে বিশ্রামাগারে ঘুমাচ্ছেন এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা

২০০০ সালে ঢাকার কলেজ গেইট এলাকায় অবস্থিত ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ পরিচালিত ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রোগ মুক্তি বিশ্রামাগার’-এ কিছু আহত মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে গেলে সেখানে মুক্তিযোদ্ধা মোদাচ্ছার হোসেন মধু বীরপ্রতীক একটি সাদা খাতায় লেখা তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্মৃতিচারণার কিছু পৃষ্ঠা তুলে দেন। খাতাটা আমি ফটোকপি করে তাঁকে ফিরিয়ে দেই। ভুল বানান ও কাঁচা অক্ষরে লেখা হলেও ঐ স্মৃতিচারণায় স্কুল-কলেজের হিসেবে স্বল্পশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা মধু আমাদের জাতীয় ইতিহাসের কিছু অদেখা ও অজানা তথ্য তুলে ধরেছেন। লেখাটা কোথায় ছাপানো যায় সে নিয়ে বিস্তর ভাবনা সত্ত্বেও দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততায় এ কাজে আর অগ্রসর হতে পারি নি। ২০০৯ সালে কলেজে গেটের ঐ বিশ্রামাগারে আবার গেলে জানতে পারি যে মধু আর বেঁচে নেই। অপরাধবোধ থেকেই মধুর সতীর্থ অন্যান্য প্রায় বিশ/বাইশ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। এই লেখায় সেই বিশ/বাইশ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার পত্রস্থ করা হলো। লেখাটির দ্বিতীয় অংশে থাকছে মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক মোদাচ্ছার হোসেন মধুর দিনপঞ্জি।

১) মোঃ নূরুল মিঞা,
পিতা: সুরুজ মিঞা,
গ্রাম: জিলাদপুর (মতিগঞ্জ বাজার),
পো: সাতগাঁও,
থানা: শ্রীমঙ্গল,
জেলা: মৌলভিবাজার।

‘আজ দশ/বারো বছর হয় পুরা হুইল চেয়ারে বসা আমি। যুদ্ধ করছি তিন নম্বর সেক্টরে। যুদ্ধের এক বছর আগে আমি দুই বছর আনসার ট্রেনিংয়ে ছিলাম। আমি বর্ডারের কাছে বাল্লা বিওপিতে ই,পি,আর, …এখন যেটা বি,ডি,আর, .. সেইখানে আনসার ব্যাটালিয়নে চাকরি করতাম। যুদ্ধ বাধলে বর্ডারের ওপার গিয়া দুই সপ্তাহ ট্রেনিং নিলাম। তয় তারিখ এবং সময় ঠিকমতো কইতাম পারি না। সব কথা স্মরণ নাই। ইতিহাস একেবারে আটাইয়া ঘুরাইয়া কইতাম পারি না। আমরা যুদ্ধ করছি খোয়াই নদী, বাল্লা বিওপি, রেমা গার্ডেনের কাছে। ভাদ্রের ১০/১৫ তারিখে সিলেটের একডালা বসন্তপুর প্রাইমারি স্কুলে রাত্রি দশটা/এগারোটার দিকে এ্যাটাক করি। স্কুলটায় পাঞ্জাবিরা ছিল। আমি এল,এম,জি, নিয়া এ্যাটাক করি। ঐ যুদ্ধেই আমার শিরদাঁড়ার পাশে গুলি লাগে। আমার জ্ঞান ছিল না। আমার সাথে যারা ছিল তারা আমাকে বর্ডারের ওপারে নিয়া যায়। ইন্ডিয়ার খোয়াই-আগরতলা-শিলচর-গৌহাটি-লখনৌ-রামগড় নানা হাসপাতালে আমার চিকিৎসা হয়। ভাদ্রের তিন/চার মাস পর দেশ স্বাধীন হয়। ঢাকায় সি,এম,এইচ, হাসপাতালেও কিছুদিন ছিলাম। যুদ্ধের সময় আমার মা জীবিত ছিল। দেশ স্বাধীনের পর আমি আনসার ব্যাটালিয়নে তিনশ’ টাকা বেতনে আবার যোগ দিই। তখনো আমার হুইল চেয়ার লাগতো না। হাঁটা-চলা করতে পারতাম। বিয়া করি। চারটা ছেলে আমার। চারজনই নাইন পাশ। ছোট ছেলে কুয়েতে থাকে। ধীরে ধীরে আমি পুরা পঙ্গু হইতে থাকি। আজ বারো বছর হয় সম্পূর্ণ হুইল চেয়ারে বসা। দেশ স্বাধীনের পর আহত হিসাবে শুরুতে পাইতাম ৭৫ টাকা। এখন হুইল চেয়ারে বসি বইলা মাসে ১৪,৫০০ টাকা পাই। দেশের বাড়িতে হুইল চেয়ার রোগীরে কে দেখবে? তাই এখানেই থাকি।’

bisihramagar-1.jpg
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের রোগ মুক্তি বিশ্রামাগার, কলেজগেট, ঢাকা

২) মোহাম্মদ আবু সিদ্দিক
বয়স: ৫৭,
গ্রাম: চান্দপুর,
থানা: মোহনগঞ্জ,
জেলা: নেত্রকোণা।

“আমার বয়স ৫৭-এর একটু বেশি। আমার দেশের বাড়ি হইলে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থানার চান্দপুর গ্রাম। যুদ্ধ করছি ৫ নং সেক্টরে, সিলেট জেলার বুলাগঞ্জে। আমাদের পরিবারে আমরা ভাই-বোন ছিলাম আটজন। আমি ছিলাম তিন জনের ছোট। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। ভারতের শিলংয়ের মোহনগঞ্জে ২১ দিন ট্রেনিং নিছি। একটা ইওথ ক্যাম্পে এই ট্রেনিং নিছিলাম। আমাদের বাঙালী কমান্ডারের নাম ছিল আব্দুল হামিদ। ইল্ডিয়ান ইনস্ট্রাক্টর আমাদের রাইফেল, এস.এল.আর., গ্রেনেড ও এল.এম.জি. চালানো শিখাইছিলো। আগস্ট মাসে আমরা বর্ডারের চেলাই পার হয়ে দেশের ভিতরে আইসা যুদ্ধ করতে থাকি। আগস্ট মাসে টানা ১০/১৫ দিন যুদ্ধ করছি। এর দুই মাস পর অক্টোবর মাসের ছয় তারিখের এক যুদ্ধে আমি কাবু হই। সেই দিন ছিল মঙ্গলবার। ছাতকের এক ফ্যাক্টরির পাশে রাতে আমরা বিশ জন মুক্তিযোদ্ধা… ফ্যাক্টরির সামনে একটা মরা নদী… নদীর একপাশে আমরা পজিশন নিছি আর একপাশে পাঞ্জাবিরা। তিন জন ঐ যুদ্ধে আহত হইছিলাম। আমি, আলতাফ ও আর একজনের নাম মনে নাই। আমি জ্ঞান হারাইলাম। জ্ঞান ফেরে তিন/চার দিন পর। আমার সাথী যারা ছিল, তারা আমাকে শিলংয়ের হাসপাতালে প্রথম নিয়া গেছিল। জানুয়ারি মাসে শিলং থেকে বিহারের লামকুমের হাসপাতালে আমাকে নেওয়া হয়। দেশে ফিরবার পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আমাকে গুলিস্তান সিনেমা হলের কেন্টিনে সেলসম্যানের চাকরি দেয়। তার আগেই ১৯৭৫-এ আমি বিয়া করছি। যুদ্ধের পর পর আমার সেক্টর থেকে আমাকে ১,০০০/ টাকা সেইসময়ের টাকার হিসাবে ভাতা দেওয়া হইছিল। এখন আমি অবসরে। গত বছরের জুলাইয়ে আমার এল.পি.আর. শেষ হইছে।”

৩) মান্নান আলী (বয়স: ৫৭)
গ্রাম: রইসপুর,
থানা: দোয়ারাবাজার,
জেলা: সুনামগঞ্জ,
বিভাগ: সিলেট।

“যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমার বয়স ছিল আঠারো বৎসর। আমি কৃষিকাজ করতাম। তা’ যুদ্ধ যখন শুরু হইলো, আমি কোন ভয়-ডর করলাম না। দেখলাম যে নির্যাতন যেভাবে চলতেছে, মানুষ যেভাবে মরতেছে… মরণ তো লাগবেই একদিন… সবাইরে মারতেছে তো আমার বাঁইচা থাইকা কী লাভ? আমার খালাতো ভাই ছিল মিরাজ আলী। সেই বললো বর্ডারের ওপারে জোয়ান ছেলেদের অস্ত্রের ট্রেনিং দিতেছে। তা’ এপ্রিলের শেষদিকে তার সাথে বর্ডার পার হইলাম। মেঘালয়ে ২১দিন ট্রেনিং করলাম। দৌড়াদৌড়ি, প্যারেড আর পি,টি, কইরা শরীরটা শক্ত করা, রাইফেল, এস.এল.আর. আর গ্রেনেড চালানো ইত্যাদি শিক্ষা হইলো। মে মাসে ছাতকে প্রথম অপারেশন করি। সেই অপারেশনে কিছু রাজাকার আমাদের হাতে ধরা পড়ছিলো। কোম্পানী কমান্ডার আসকির সাহেবের কাছে যখন প্রথম রাজাকারগুলারে নিয়া যাই, তিনি বাহবা দিলেন কিন্তু এইটাও বললেন, ‘যত রাউন্ড গুলি করছো, তত রাউন্ড গুলির হিসাব কিন্তু দিতে হবে।’ আমার নিজের গ্রামের বাড়ি গিয়াও অপারেশন চালাইছি। একবার তো দোলেরগাঁওয়ের ঐখানে রাজাকাররা আমাদের ভয়ে পুষ্করণীতে অস্ত্র ফেইলা পালাচ্ছিল। আমরা কয়েকজন রাজাকারকে ধইরা সোজা গুলি চালাইলাম। মেজর নূরুন্নবী ছিলেন আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডার। ৭ই ডিসেম্বর সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে ছাতক বাজারে বিকাল চার ঘটিকায় সম্মুখ যুদ্ধে মাইন বিস্ফোরণে আমি আহত হই। এন্টি-পার্সোনেল মাইন ছিল সেইটা। আমি তখন গাঙ পারাইয়া ছাতক বাজারে উইঠা গেছি। ‘জয় বাংলা’ ডাক দিয়া আমরাই কিনা পাঞ্জাবিদের উল্টা ধাওয়ায় আনতেছিলাম। তখনি পাঞ্জাবিদের পুঁইতা রাখা একটা মাইনে আমার পা পইড়া পা উইড়া যায়। বিকাল চারটায় আমি আহত হই। আমার সাথীরা পাঞ্জাবিদের এ্যাটাকের ভিতর যুদ্ধ করতে করতেই আমারে আস্তে আস্তে সরায় নিয়া যাচ্ছিল। পরদিন ভোর ছয়টায় সীমান্তের ওপারে ভারতের ভোলাগঞ্জ হেডকোয়ার্টারে এ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে আমারে ভর্তি করা হয়। সেইহানোত একমাস থাকার পর মহারাষ্ট্রে পুনায় আর্মি হেডকোয়ার্টার হাসপাতালে আমি আরো ৫/৬ মাস থাকি। আমার অস্ত্রোপচারে ৬০,০০০/ টাকা লাগছিলো। এইটা তখনকার দিনের টাকার হিসাবে বলা। স্বাধীনের পর দেশে ফেরত আসিয়া পর আমি ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে’র ‘ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার’-এ ট্রেনিং নেই। ১৯৭৪ সালে একটা সাবান প্যাকিং ফ্যাক্টরিতে ১৫৫ টাকা বেসিক ওয়েজে চাকরি শুরু করি। বিয়েও করি। দুই ছেলে দুই মেয়ে আছে আমার। বর্তমানে আমি অঙ্গহীন অবহেলিত। তবু, আল্লাহর প্রতি আমি নারাজ না।’

৪) কমান্ডার এস,এম, নূর ইসলাম
বয়স: ৫৮,
গ্রাম: চিকনহাটি,
জেলা: নীলফামারি।

“আমার দেশ হলো বৃহত্তর রংপুরের নীলফামারি জেলার… তখন নীলফামারি থানা ছিল… সেই নীলফামারির চিকনমাটি গ্রামে। যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। আমি তখন মাত্র মেট্রিক পরীক্ষা দিয়া উঠলাম। আমি যুদ্ধ করছি ৬ নম্বর সেক্টরে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় বর্ডারে। কর্নেল শাহরিয়ার ছিলেন আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডার। মে মাসের প্রথম দিকে আমাদের গ্রাম হতে আমরা প্রায় ৮০-৮৫ জন ছেলে একসাথে বর্ডার ক্রস করি। সেসময় আমাদের ওদিকে ভাসানী-ন্যাপ পলিটিক্সের প্রভাব ছিল। তাই, রাজনৈতিক ভাবে আমরা মোটামুটি সচেতন ছিলাম। এছাড়াও গ্রামে যুদ্ধ শুরুর পরপরই এক রাজাকার চাকুর ভয় দেখিয়ে ছয়/সাত বছরের একটা মেয়েকে রেপ করার পর আমরা অনেকেই খুব কষ্ট পাই ও প্রতিকারের কথা ভাবতে থাকি। যাহোক, দার্জিলিং শিলিগুড়ির পাশে বাগডোগরার কাছে ডাঙ্গার হাট নামে একটা জায়গায় আমরা ২৯ দিন ট্রেনিং নিলাম। রাইফেল, এস.এল.আর., এস.এম.জি., এল.এম.জি., মর্টার, মাইন বা আরো নানা এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার আমরা তখন শিখলাম। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও আমাকে ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে নেওয়া হলো। বিল্ডিং ওড়ানো, মাইন ওঠানো, ব্রিজ বা টাওয়ার ধবংস করা প্রভৃতি আমি শিখেছিলাম। এমন বেশ কিছু অপারেশন আমি সফলভাবে সম্পন্ন করি। আমাদের নানা অপারেশনের ভেতর উল্লেখযোগ্য একটি অপারেশন হলো পঞ্চগড়ের বোদা থানার বোয়ালমারীর যুদ্ধ। আমরা মোট ১১০ জন বাঙালী এফ,এফ, বা ফ্রিডম ফাইটার এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। এদের ভেতর আমরা দশ জন আবার ছিলাম ইন্টেলিজেন্সের লোক। তিস্তা নদীর পশ্চিম পাড়ে প্রায় ৩ মাইল এলাকা জুড়ে আমরা মাইন পুঁতে রেখেছিলাম। আমরা পজিশন নিয়েছিলাম নদীর পশ্চিম পাড়ে। আর, খান সেনারা ছিল পূর্ব পাড়ে। প্রায় ৭০ জন খান সেনা এই যুদ্ধে মারা যায়। রাশিয়ান মাইন, শর্ট গান ও স্টেনগান আমরা এই যুদ্ধে ব্যবহার করেছিলাম। আমাদের সোর্স আগের দিনই নদীর পূর্ব পাড়ে খান সেনাদের ঘাঁটি গাড়ার কথা জানালে আমরা ওদের প্রস্তুতি নিয়ে ওঠার আগেই উল্টা দিকে পজিশন নিয়ে যুদ্ধ শুরু করি। বললে বিশ্বাস হবে না, যুদ্ধের পর রক্তে কয়েক মাইল জায়গা মনে হয় চোখের সামনেই লাল হয়ে গেল। আমরা ওদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র-শস্ত্রে প্রায় ৭টা মহিষের গাড়ি বোঝাই করলাম।

commander-sm-nur-islam-lost-his-one-leg-in-71-when-he-was-just-17-years-old.jpg………
মুক্তিযোদ্ধা এস,এম, নূর ইসলাম
……….
এছাড়া, পঞ্চগড়ের শিপটিহারিতেও আর একটা সাকসেসফুল অপারেশন করি আমরা। পঞ্চগড়ে পাকিস্তানিদের প্রায় তিন তলা উঁচু বাঙ্কার ছিল। বালুর বস্তা, কলাগাছ এই সব দিয়ে বাঙ্কারটা তারা তৈরি করেছিলো। আগস্টের শেষের দিকে বাঙ্কারের সামনে গিয়ে আমরা হামলা চালাই। এই যুদ্ধে একজন কর্নেল সহ ২জন পাকিস্তানি সৈন্য ও স্থানীয় পিস কমিটির হাফেজ সহ আরো বেশ কিছু রাজাকার আমাদের হাতে ধরা পড়ে। বাকি পাকিস্তানিরা অনেকেই অবশ্য পালিয়ে যায়। ১৭টা বাঙালী মেয়েকে এই বাঙ্কার হতে আমরা উদ্ধার করি। তবে, আমি নিজে যে যুদ্ধে আহত হলাম, সেটা হলো ডিসেম্বর মাসের ১৩ তারিখের যুদ্ধ। দিনাজপুর জেলার খানসামা হাটের কাছে নদীর ধারে ভোর পাঁচটায় সম্মুখযুদ্ধ শুরু হলো। সকাল চারটা থেকেই আমরা অবশ্য সৈয়দপুরের দিকে এ্যাডভান্স করা শুরু করি। নদী পার হওয়ার সময় পাকিস্তানিদের সাথে আমরা মুখামুখি হই। ওরা পালাচ্ছিল। আমারা ইন্দো-বাংলা মিত্রশক্তি সংখ্যায় বেশ ভারিই ছিলাম। দুইটা ভারতীয় ব্রিগেডের প্রায় ১০,০০০ সৈন্য ছাড়াও আমরা বাঙালী ফ্রিডম ফাইটারই সংখ্যায় ছিলাম ১২০০ জন। ১৯ গুর্খা রেজিমেন্ট ও পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটা ব্রিগেড আমাদের সাথে ছিল। ৭০/৮০ টা ট্যাঙ্কও ছিল আমাদের সাথে। আমরা যখন নদী ক্রস করছিলাম… প্রায় হাজার খানেক গজ পথ ক্রস করার পর… হঠাৎই একটা মাইন বিস্ফোরিত হয়ে আমি আহত হই। আমাকে ভারতীয় সৈন্যরা এ্যাম্বুলেন্সে তুলে পরে সোজা হেলিকপ্টারে করে ঠাকুরগাঁ আকাশপথের বর্ডার পার হয়ে বাগডোগরা হসপিটালে ভর্তি করে। সেখান হতে পুনার কির্কি ও কোলকাতা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৯৭২-এর জানুয়ারি মাসে আমি কোলকাতা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য শয্যাবন্দি। আমার আব্বা খবর পেয়ে আমাকে সেখানে দেখতে গেলেন। সুস্থ হবার পর দেশে ফিরলে প্রথমে কিছুদিন যশোর ক্যান্টনমেন্ট ও পরে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে আমাকে রাখা হয়। ১৯৭৭-এ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাভুক্ত ‘যাত্রিক পাবলিকেশন্স্’-এর ছাপাখানায় কম্পোজিটরের চাকরি পাই। ১৯৭৭-৮০ সাল অবধি সেখানেই কাজ করি। পরে নিজেই ছোটখাট ব্যবসা বা কারবারের চেষ্টা করি। ১৯৭৭ সালেই আমার ফুপাতো বোনকে আমি বিয়ে করি। তিন ছেলে ও এক মেয়ে আছে আমার।”

৫) কেয়ামুদ্দিন মোল্লা
বয়স: ৫৫ বৎসর।
গ্রাম: দীঘিগোয়েলবাড়ি,
ইউনিয়ন: চরতারাপুর।
জেলা: পাবনা।

“১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় আমার বয়েস ছেলো ১৯ বছর। আমরা ছেলাম ছয় ভাই এক বোন। কৃষিকাজ করতাম। একটু-আধটু ক্ষেতের কাজ আর বাদ বাকি সুমায়ে বাপের হোটেলে খাতাম। আমাদের গিরাম কিন্তু চর এলাকার মদ্যি। পদ্মা নদী চারদিকি ঘের দেয়া। এপারে কুষ্টিয়া, ওপারে পাবনা। মধ্যে রাজবাড়ি, পাংশা এই সব জাগা। যুদ্ধ বাঁধলি পরা আমি কুষ্টিয়ার জলঙ্গি বর্ডার পার হইয়ি চুয়াডাঙ্গা থেন মালদা গেলাম। সিখানে গৌড়বাগান ক্যাম্পে রিক্রুট হলাম। দিন চোদ্দ আমাদের পিটি-প্যারেড করিয়ে, শরীরটা একটু ফিট করার পর পাঠালো জলপাইগুড়ির পানিহাটা। সিখানে আরো আঠাশ দিন অস্ত্র ট্রেনিং করার পর জলঙ্গি আসি। সব মিলায়ে প্রায় আট/দশটা অপারেশনে অংশ নিই। পাবনা মেন্টাল হাসপাতালের সামনেও অপারেশন করিচি। আমি আবার যুদ্ধ করিচি ৭ নম্বর সেক্টরে। কর্নেল নূরুজ্জামান ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আর ব্রিগেডিয়ার গিয়াসুল করিম ছিলেন সাব-সেক্টর কমান্ডার। দিনাজপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট আর ইদিকে পাবনার ফুলগাঁ পর্যন্ত এই ৭ নম্বর সেক্টরের মদ্যি ছেলো। এইখানে এট্টা কতা কই: আমার খালাতো ভাই কিন্তু রাজাকার ছেলো। সে থাকতো বুবলিয়া রাজাকার ক্যাম্পে। ইউনিয়ন বোর্ড অপিসে তারা ক্যাম্প করিছিলো। তা’ ঐ ইউনিয়ন বোর্ড অপিসের আট/দশ মাইলের ভেতর কারেন্ট ছেলো না। একবার সন্ধ্যাকালে রাজাকাররা তাদের ক্যাম্পে হ্যাজাক জ্বালিলো আর আমরা বোর্ড অফিসের সামনে গিয়া ফায়ারিং শুরু করলাম। আমারি গুলি পিঠির পর লাগি এক রাজাকার দেখলাম দোতলায় পড়ি গেলো। আমার পাশে ছিলো মঞ্জু। আমার সাথীরা তো রাজাকারদের সাথে আন্ধা-গোন্ধা (এলোপাতাড়ি) গুলি চালাতিছে। একটা গুলি আমরা পায়ের গোড়ালির উপর লাগলো। সাথীরা আমার সাথে সাথে হাতের ব্লেড দিয়ি গুলিটা টাইনে ফাঁড়লো। ভাগ্যি গুলি খুব ভিতরে ঢোকে নাই। উপর দিয়া গিছিলো। আমরা ছিলাম ৩২ জন আর অরা ছিল ৫০ জন। ওরা বিল্ডিংয়ের উপর থেন (থেকে) গুলি চালাইছে আর আমরা নিচ থিকি এল,এম,জি, চার্জ করিছি। এক পর্যায়ে আমরা দু’পক্ষই যুদ্ধ থামাই। কিন্তু, পরের দিন… সে ধরো তোমার জষ্টি-আষাঢ়-শাওন-ভাদর মাসের দিন… দীঘিগোয়েলবাড়ি চরের সামনি দুইটা নৌকায় বিশ জনা করি আমরা চল্লিশ জনা মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হাতে উঠিচি। গাঁয়ের লোক আবার আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভাল জানতো। মনে করেন একজনের বাড়ি দুইজন খাতাম কি আর একজনের বাড়ি গিয়া পাঁচজন খাতাম এমন আর কি। তা’ আমার সেই রাজাকার খালাতো ভাই মাজে মইদ্যেই আমার বাড়ি গিয়া মা’কে বলছে, ‘খালাম্মা, ওদের সারেন্ডার করতি বলেন। ওদের যুদ্ধ থামাতি বলেন!’ তা’ যে দিনির কতা কচ্চি… সিদিন নদীর ভিতরে ভিতরে চরে তুষের ক্ষেত আর পাটের ক্ষেত… এইসময় দুইটা নৌকায় তো আমরা বিশ জনা করি চল্লিশ জনা মুক্তিযোদ্ধা… কেউ পানিতে আবার কেউ নৌকায় অস্ত্র হাতে… তখনি রাজাকারদের নৌকা আমাদের মুখামুখি। একটা এল,এম,জি,তে কিন্তু ২৮-৩২টা গুলি ভরা যায়। পাঁচ/ছয়টা ম্যাগাজিন থাকে। একজনের কাজ গুলি ভরা, একজনের ম্যাগাজিন টানা আর একজনের ফায়ার করার কাজ করতি হয়। আমাদের সাথে একটা ভাল ব্রিটিশ এল,এম,জি, ছেলো। তা’ আমরা ফায়ার করা শুরু করলাম। দুই জন রাজাকার মারা গেলো। যাগো একজনা আমার খালাতো ভাই। এ ঘটনার পর আজ পর্যন্ত আমার খালার সাথে আমার মা’র কথা হয় নি। আমি এই যুদ্ধে আহত হলাম। ঈশ্বরদী ব্যাক করি বাবুলছড়া ক্যাম্পে আমারে রাকা হলো। এখানে আরো ২৫০ মু্ক্তিযোদ্ধা ছেলো। কিছুদিন বিশ্রাম নেবার পর আবার যুদ্ধের শ্যাষের দিকি আমি অপারেশন শুরু করি। তকন সালিন্দির চরে মেন্টাল হাসপাতালের সামনিই ফাইট চলছে। চারপাশে মিলেশিয়া আর রাজাকার। পূর্ব-উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ… এই চার দিকে প্রায় ২৫০ মু্ক্তি… মানে বাবুলছড়া ক্যাম্পের সবাই পজিশন নিছে। এইটা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কতা। তারিক একদম ঠিক ঠিক কতি পারবো না। তা’ সেই রাত একটার দিকে ফায়ার শুরু হলো। যারা গ্রেনেড চালায় তারা শত্রুর পঞ্চাশ গজ ও শুদু বন্দুকঅলারা শত্রুর একশ’ গজের ভিতর থাকি যুদ্ধ শুরু করলো। সকাল পর্যন্ত দুই পক্ষেই গুলি চললো। সকালের দিকি মরতে লাগলো। উভয় পক্ষেই। আমি ২টা শার্টের উপর একটা জাম্পার পরা ছিলাম। একে শীত তাতে গুলিগালার কাজ তাই। সকালবেলায় দেখি কি পানি পিপাসায় আর এক পা নড়তে পারি না। আমার সাথীরা আমারে ডাক্তারবাড়ি নিয়া গিয়া সেলাই দিলো। আমারে কোলকাতায়ও পাঠানো হলো। সেখানে দুই মাস থাকি। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর দেশে আসি। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালেও ম্যালাদিন থাকলাম। এসময় বিদেশী ডাক্তার ড. গার্স্ট এসে আমাদের জন্য কাজ শুরু করলেন। আমি দেশে ফেরলাম বঙ্গবন্ধু দেশে আসার এক সপ্তার মদ্যি। ঢাকা মেডিকেলে দুই মাস থাকলাম। ১৯৭৩-এ বিশ্রামাগারে উঠলাম। ১৯৭৭ সালে মুন সিনেমা হলে সেলসম্যানের চাকরি পালাম। প্রায় বারো বছর মানে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চাকরি করলাম। এরপর তো শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্টে নিজিদির মদ্যি কোন্দল। ব্রিগেডিয়ার আমিন চৌধুরী কল্যাণ ট্রাস্টের দায়িত্ব নিলেন। ওনার মেজাজ একটু গরম ছিল আর ঘাড়টাও ছিল ত্যারা। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাকে এক লাখ টাকা দিইচে। আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলে যানবাহন মন্ত্রণালয়ে চাকরি করে। বড় মেয়ে ডিগ্রি পড়ে আর ছোটটা স্কুলে।”

৬) মোহাম্মদ বদিউল আলম
বয়স: ৬৬ বৎসর,
জন্মস্থান: ফটিকছড়ি থানা
জেলা: চট্টগ্রাম।

bullets-pierced-hand-of-ffmohammad-badiul-alam.jpg………
মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম
………
“আমার জন্ম ১৭ই জুলাই ১৯৪২। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আমি মুজাহিদি প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম। যুদ্ধের সময় চন্দ্রঘোনা পেপার মিলস-এ আমি মেকানিক্যাল ফিটারের কাজ করতাম। এমনিতে স্কুলে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করছি। ১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় আমি শ্রমিক লীগ করতাম। এই সময় আমাদের ফ্যাক্টরিতে লেবার লিডার নির্বাচনে আমি জিতছি। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ শেখ সাবরে পাঞ্জাবিরা ধইরা নিয়া গেল। আমাদের ফ্যাক্টরির মালিক ছিল দাউদ কর্পোরেশন। ওরা পশ্চিমা। বোম্বাইয়া। উর্দু ভাষায় কথা কয়। ফ্যাক্টরির এক বোম্বাইয়া অফিসার ছিল। তার নাম ছিল আবু সোলেমান বাপ্পু। ২৭ তারিখ দিবাগত রাতে এই বাপ্পু সাহেবের কাছে চা নিয়া গেছে আমাদের ফ্যাক্টরির এক বাঙালী বাবুর্চি। তার নাম ছিল নূর হোসেন। বরিশাল বাড়ি ছিল তার। তো নূর হোসেন যখন তার কাছে চা নিয়া গেল, তখন বাপ্পু সাহেব ঠাট্টা করে তাকে বললো, ‘তুমহারা বাপকো তো এ্যারেস্ট করনে বাদ হাম লোগ পাকিস্তান লে যাউঙ্গি। আভি তুমলোগ কিসকো বাপ বুলায়েগা?’ নূর হোসেন চা দিয়া আইসা এই কথা জানাইলে আমাদের মাথায় আগুন চাপলো। ভোর সকালে যখন আজান হইছে, আমরা বাপ্পুরে গিয়া কইলাম যে ‘আপনি একা বিহারী আর আমরা ১৮০ জন বাঙালী। আমাদের খেপাইয়েন না!’ বাপ্পু কী বুঝলো কে জানে… সে গামবুট পইরা, কাঁধে সিঙ্গল ব্যারেল বন্দুক নিয়া একা একাই একটা স্পিডবোটে উইঠা জাম্বুছড়া খাল বাইয়া ওরাছড়ি রিজার্ভ ফরেস্ট পর্যন্ত চললো। এদিকে আমরা বাঙালী লেবারের একটা দল যে পাহাড়ি রাস্তায় ওরাছড়ি পর্যন্ত হাঁইটা যাচ্ছি তারে লক্ষ্য কইরাই, সে কিন্তু তা বোঝে নাই। ওরাছড়ি পৌঁছাইয়া সে হাতে বন্দুক নিয়া হাঁটতেছে, তখন আমরা তারে ঘেরাও করলাম। তারে পাহাড় ডিঙ্গায় ঢালুতে নিয়া গিয়া বললাম, ‘কলমা পড়ো। তুমিও মুসলমান। আমিও মুসলমান। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম।’ ড্রাইভার নূর মহম্মদ তারে গুলি করলো। পরের দিন আমরা চট্টগ্রাম শহরের দিকে গেলাম। ৩০শে মার্চ কাপ্তাই জেটি ঘাটে গিয়া ক্যাপ্টেন হারুনের সাথে দেখা করলাম। ৩১শে মার্চ কালুর ঘাট ব্রিজে গেলে কর্নেল অলির সাথে দেখা হইলো। এপ্রিলের ৪ আর ৫ তারিখে পাকিস্তানি জাহাজ ‘বাবর’ চট্টগ্রাম পোর্টে শেলিং করায় শহরে ঢোকা সম্ভব হইলো না। তখন পিছন দিকের রাস্তা ধইরা বান্দরবান, রুমা পার হইয়া ‘দুমদুইম্যা’ ই,পি,আর, ক্যাম্পে পৌঁছালাম। ১৫ তারিখ ভারতের জারাইছড়ি ক্যাম্পে পৌঁছালাম। বিএসএফ-এর মেজর বাজুবল সিং আমাদের শরণার্থী ক্যাম্পে যেতে বললো। আমরা মোট ২৩ জন শ্রমিক ছিলাম। এদের ভেতর নয় জন ক্যাম্পে গেল। কিন্তু, আমরা আমাদের সাথের পোঁটলার চাদর দিয়া তাঁবু টাঙ্গাইয়া বললাম, ‘আমরা যুদ্ধ করতে চাই। আমাদের ট্রেনিং দাও।’ পরদিন আমাদের আসাম-ভারত দেমাকাগিরি বর্ডারের কাছে পাঠাইলো। সেখানে ছিলেন মেজর তারা সিং। আমরা দেমাকাগিরি টাউনের কলেজ মাঠেও তাঁবু খাড়া করলাম। ২৪ শে এপ্রিল মেজর তারা সিংয়ের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সেসময় আরো ছিলেন ই.পি.আর.সুবেদার আব্দুর রশিদ, হাবিলদার আব্দুল খালেক, হাবিলদার বদিউল ও আরো এগারো জন গুর্খা সিপাহী। মেজর তারা সিং বললেন, ‘তোমরা কি সত্যি সত্যি তোমাদের দেশ রক্ষা করতে পারবে বলে মনে করো?’ বললাম, ‘পারবো। আমাদের ট্রেনিং দেন।’ ২৮শে এপ্রিল থেকে আমাদের ট্রেনিং দেওয়া শুরু হইলো। ২৩ শে জুলাই পর্যন্ত চললো। ২৪ শে জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির উপর ঠেকারমুখ নামক জায়গায় প্রথম অপারেশন করি। মেজর তারা সিং আমাদের সাথে ছিলেন। তিন জন পাকিস্তানি গুলিবিদ্ধ হয়। আমরা ১৪ জন শ্রমিক, ইপিআরের ৬ জন সিপাহী, কমান্ডার আব্দুর রশিদ ও মেজর তারা সিং ও আরো ৬জন ইন্ডিয়ান সোলজার ছিল। সবাই মিলা আমরা ছিলাম প্রায় আটাইশ জন। আজো পরিষ্কার মনে আছে ১১:৪০-এ প্রথম আমরা ফায়ারিং শুরু করি। তিন জন পাকিস্তানি সৈন্য মারা গেছিল এই অপারেশনে আর ছয় জন সারেন্ডার করে। ঠেকারমুখের কাছে দুইটা রোড ব্লক কইরা আমরা অপারেশনটা শুরু করছিলাম। এই সময় কিছু চাকমা ছেলে আমাদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। সঞ্জীব কুমার চাকমা নামে এক ছেলে পরের এক যুদ্ধে আমাদের পক্ষে ফাইট দিতে গিয়া মারা যায়।

…কত কথা মনে আসে। কত আর বলব? মোট পাঁচটা অপারেশনে অংশ নিছি। এই যুদ্ধের সময় ভারত মিত্রপক্ষ হইলেও একবার কিন্তু ইন্ডিয়ানদের সাথে আমাদের কিছু কথা কাটাকাটি হয়। আমাদের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আব্দুর রশিদকে মেজর তারা সিং ৩রা আগস্ট বলে কাপ্তাই বাঁধ খুলে দিতে, যাতে চট্টগ্রামে পাকিস্তানিদের পালানোর কোনো পথ না থাকে। কিন্তু, আব্দুর রশিদ বললেন চট্টগ্রামে তো বাঙালীরাও থাকে। কাপ্তাই বাঁধের মুখ খুলে দিলে তারা তো মারা পড়বে। কথা কাটাকাটির পর আব্দুর রশিদকে আসাম-ভারত দেমাকাগিরি হতে এক কিমি দূরে এক ক্যাম্পে ১৭ ঘণ্টা আটক করা হয়। ১৭ ঘণ্টা পর আর তাকে ছাড়া হয়। যাই হউক, ৬ই আগস্ট আমরা আবার অপারেশনে নামি। বান্দরবানের রুমায় ৬ই আগস্ট দিবাগত রাতে রুমা থানায় ৬জন পাঞ্জাবি সহ মোট ১৩/১৪ জন পুলিশ স্টাফকে হারিয়ে থানা দখল করি। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লড়াই হইছিল। ৮ই আগস্ট বান্দরবান থানা দখল করি। ১৫০ জন পাঞ্জাবি সৈন্যের পাল্টা আমরা ছিলাম মোট ১১৬ জন। আমাদের সাথে ছিল ৬ জন পুলিশ। মুজিব বাহিনীর সদস্যরা গ্রেনেড ক্যারি করছিল। আমাদের ১৪ জন শ্রমিকের কাছে ছিল এস,এল,আর,। আড়াই ঘণ্টা ফাইটিং দিয়ে যুদ্ধে জিতি। আট তারিখ রাত তিনটায় ফায়ারিং শুরু করি আর যুদ্ধ শেষ হয় সকাল সাড়ে পাঁচটায়। এবার ৭ই ডিসেম্বরের যুদ্ধের কথা বলি। এই যুদ্ধের কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না। কাপ্তাই বাঁধের ওপারে… ইন্ডিয়ান বর্ডারে থাকতেই খবর আসলো যে পাঞ্জাবি সৈন্য কাপ্তাই বাঁধ হতে চিটাগাং পোর্টের জেটি পর্যন্ত কন্ট্রোল করছে। আমরা তখন বর্ডার ক্রস শুরু করলাম। ইন্ডিয়ান বর্ডারের যে রুট হতে আমরা ঢুকতাম, সেই রুটে প্রায় দুই দিন দুই রাত হেঁটে তবে পৌঁছানো যাইত। সাথে ক্ষুধা মিটানোর ট্যাবলেট থাকতো। তবে, এইবার আমরা এক পাহাড়ি পরিবারে খাবার চাইলাম। তারা বাঁশ কেটে হাড়ি-পাতিল বানিয়ে আমাদের ডাল, আলু ভর্তা আর ভাত খেতে দিলো। পাঁচ তারিখ দিবাগত রাতে পাঞ্জাবি সৈন্যদের মুখোমুখি পজিশন নিয়ে আমরা ফায়ারিং শুরু করি। কাপ্তাই প্রজেক্টের ২০০ গজ দূর হতে ফায়ারিংয় শুরু হয়। পাঁচ তারিখ সকাল ১১:৩০ টার দিকে ডিউটিতে থাকা ১৯জন পাঞ্জাবি সৈন্য ধরা পড়ে। তাদের কাপ্তাই হাসপাতালে রাখা হয়। পাঁচ হতে সাত তারিখ আমরা কাপ্তাই বাজারের একটা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করছি। সাত তারিখ আর্মি ক্যান্টনমেন্ট হতে পাঞ্জাবিরা গুলি শুরু করলো। সকাল ৮:৩০ হতে ১২:৪৫ পর্যন্ত যুদ্ধ চললো। ঐ যুদ্ধেই সঞ্জীব কুমার চাকমা ও নূর হোসেন মারা যায়। আমার হাতে-পায়ে গুলি লাগে। আমাকে সাথে সাথে কাপ্তাই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান হতে ১৯শে ডিসেম্বর আমাকে চিটাগাং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ১৯৭২-এর ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিলাম। চিটাগাং কলেজের মাঠে সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকের কাছে হাতিয়ার জমা দিলাম। ১৯ শে জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমাকে শতকরা ৪৫ ভাগ আহত হিসেবে ঘোষণা করা হলো। সরকার আমাকে এসময় রাশিয়া পাঠায়। সেখানে মস্কোতে তিন মাস ২২ দিন থাকি। ১৯৭৫-এ দ্বিতীয় বারের মতো আমাকে রাশিয়া পাঠানো হয়। কম্যুনিস্ট দেশ। সাইবেরিয়ায় ১৪ দিন, লেনিনগ্রাদে ৬ দিন থাকি। ’৭৫-এর ১৯ শে মে আমার পায়ে বোন গ্রাফটিং অপারেশন হয়। দেশে ফিরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে যাই। ১৯৮৪ সালে অনেক বয়সে আমি বিয়া করি। আমার ছয় ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়া হইছে। বাকি সবাই লেখা-পড়া করছে। দুই ভাই এক বোনের সাথে তিন একর জমি আমি ভাগে পাইছি। খাওয়া-খরচ চইলা যায়। ১৯৯০-এ আমি একটা দোকান দিই। সেই দোকানের আয়েও আমার কষ্ট কিছু কমে।”

৭) মোহাম্মদ আব্দুল রকিব
বয়স: ৮০,
গ্রাম: সোনাখিরা,
উপজেলা: বিয়ানীবাজার,
জেলা: সিলেট।

“আমার বয়স বর্তমানে হইলো আশি বছর। আমার দুই ছেলে দুই মেয়ে। যুদ্ধের সময় আমি ছিলাম কৃষক। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমার গ্রাম সোনাখিরায় রাজাকারের খুব উৎপাত। যন্ত্রণায় টিঁকতাম পারি না। আমি আওয়ামি লীগ করতাম। যুদ্ধ শুরু হইলে পরা… আমি চিরকালই দ্বিনের মানুষ… লম্বা দাড়ি ছিল… তা’ পাতাইরখণ্ডি মাদ্রাসার মাওলানাকে গিয়া জিজ্ঞাসা করলাম ফ্রন্টে কাজ করার জন্য দাড়ি শেভ করলে গুনাহ্ হয় কিনা। তিনি কইলেন ‘দাড়ি নিয়াই যুদ্ধ করো।’ তিন দিন পর বর্ডারের ওপারে রিক্রুটের লাইনে খাড়া হইলাম। এইটা ভারতের ‘লোহার বল’ ট্রেনিং সেন্টার। তো আমারে লাল কার্ড মানে যুদ্ধে অংশগ্রহণের কার্ড দিছে। কিত্ত, ইন্ডয়ান ব্রিগেডিয়ার আমারে কোন ট্রেনিং দিচ্ছে না। আমার বয়স তখনি চল্লিশের উপর। আবার লম্বা দাড়ি। উনি ভাবছেন আমার অনেক বয়স। তো বাঙালী সুবেদারকে বলছে কি, ‘এ তো মুরব্বি আদমি। একে বেশি কষ্ট দিও না।’ আমি কইলাম, ‘না, আমারে ট্রেনিং দিতে হবে।’ তিন মাস ট্রেনিং নিলাম। রাইফল, এল.এম.জি., স্টেনগান… সব কিছু চালানো শিখলাম। তিনমাস পর আমারে কইলো ফ্রন্টে যাইতে। পয়লা কইলো যে আপনি লাতু যান গিয়া। কইলাম লাতু আমি যাইমু না। তখন কয় আপনি যান গিয়া বালিয়া ক্যান্টনমেন্ট, ৪ নং সেক্টর। গেলাম। সেইখান থেকে আমারে ইস্যু করছে দত্ত বাবু আর কর্নেল ওসমানী। আমারে কয়, ‘সামনে খোরমা টি গার্ডেনে এক ব্যাটালিয়ন পাঞ্জাবি সৈন্য আছে। তুমি অপারশনে যাবার আগে রেকি করো।’ আমি তাদের কাছে চারদিন সময় নিলাম আর কইলাম, ‘আমি অপারেশনে আর্মি, ইন্ডিয়ান আর্মি কি বি.এস.এফ., নিতাম না। দশ/বারোজন মুক্তিযোদ্ধা শুধু সাথে নিমু।’ তো সেইমতো রেকি করার পর খোরমা টি গার্ডেনের চারপাশ ঘেরিয়া ব্রাশ ফায়ার করার পর রিপোর্ট দিলাম। তারপর ইন্ডিয়ান আর্মি কিতা করছে আমি কইতাম পারি না। খোরমা টি গার্ডেনের পর চাম্পারণ টি গার্ডেন আর কাঁঠালবাড়ি টি গার্ডেনেও অপারেশন করি। কাঁঠালবাড়িয়া অপারেশনের সময় লাড়িতে (নিতম্বে) আর পায়ে গুলি লাগে। যুদ্ধের পর কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পত্তি কোকাকোলায় কয়েক বছর কাজ করি। এখন কেরাণীগঞ্জে থাকি। বর্তমানে ঘরে আমার দুই ছেলে দুই মেয়ে আছে।”

৮) আতাউর রহমান খান
মুক্তিযোদ্ধা থানা কমান্ডার
বিয়ানীবাজার, সিলেট।

“যুদ্ধের সময় আমি ছিলাম খুলনা বি,এল, কলেজের সাধারণ সম্পাদক এবং ছাত্রলীগের খুলনা শাখার সম্পাদক। ২৫ শে মার্চ রাত একটায় জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক সালাহউদ্দিন ইউসুফ আমাকে বললেন, ‘ঢাকাতে হামলা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন যার যার এলাকা মুক্ত রাখতে।’ তখন খুলনার মহিলা এম,পি, মুন্নুজান সুফিয়ানের স্বামী আবু সুফিয়ানের সাথে খুলনা ইপিআর হেডকোয়ার্টারে গেলে ৩২ জন ইপিআর সদস্য আমাদের সাথে আসে। ২৬ শে মার্চ সকালে আমরা খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে গাছ কেটে ব্লক দিই। সেনাবাহিনী এসে দুই ট্রাক গাছ সরানো শুরু করলে ইপিআর সদস্যরা পাল্টা আমাদের পক্ষে লড়াই করলো। এদিকে সার্জেন্ট জহুর হত্যার পর ইতোমধ্যেই ‘জয় বাংলা বাহিনী’ ও ‘স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী’ তৈরি হয়ে গেছে। ২৭ শে মার্চ পিপলস জুট মিল, ক্রিসেন্ট জুট মিল ও নিউজ প্রিন্ট মিলের শ্রমিকদের সাথে কথা হলো। এসময় প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক ছিল এই এলাকায়। মার্চ গেল। এপ্রিলের ৭ তারিখের পর যশোর ক্যান্টনমেন্ট হতে শতাধিক পশ্চিম পাকিস্তানি আর্মি খুলনার পথে কামান দেখাতে দেখাতে চলে গেল। এরই ভেতর খবর পেলাম যে ফরিদপুরে ওবায়দুর রহমান মুক্তাঞ্চল করেছে। আমরা বিশ জনের মতো যুবক ছেলে তখন কাশিয়ানী রাস্তা দিয়ে ১৭ দিন পায়ে হেঁটে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌঁছলাম। রামদিয়া কলেজের ভিপি সহ বিশ জন ছাত্র ও দু’জন শিক্ষক আমাদের সাথে ছিল। তা সেই ভেড়ামারাতেও দেখি বর্ডারে যাবার রাস্তা বন্ধ। তখন যশোর বেনাপোল রুটে ভারতে নদীয়া শান্তিপুরের কৃষ্ণমোহন কলেজে আশ্রয় নিলাম। যে সময়ের কথা বলছি, তখন আমার চুল ও দাড়ি অনেক লম্বা ছিল। আমি ছাত্রলীগ করলেও বামপন্থী তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের কথাবার্তা আমাকে মুগ্ধ করতো। মনে মনে আমি তাঁকে খুব সম্মান করতাম।

…তা যেকথা বলছিলাম। ভারতে যাবার পর নদীয়া থেকে ট্রেনে কৃষ্ণমোহন কলেজে গেলে কলেজের ছেলেরা আমাদের তালা খুলে থাকতে দিয়েছে। এর ভেতর পথে আমরা কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। মুসলিম বাড়ি ইচ্ছা করেই অ্যাভয়েড করতাম। মুসলিমদের ব্যপারে বলা তো যায় না যে তারা চীনপন্থী না পাকিস্তানপন্থী, জামাত না আওয়ামী লীগ। নদীয়া পৌঁছবার পর আমাদের এই বিশ জনের দলের হিন্দু ছেলেরা তাদের আত্মীয়দের বাড়ি খুঁজে-টুজে চলে গেল। আমাদের দলের আমি, রেজাউল (কুষ্টিয়া বাড়ি) ও আনোয়ার হোসেন কোলকাতার বাংলাদেশ মিশন অফিসে গেলাম। সেখানে হাইকমিশনার ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানীর সাথেও দেখা হলো। কোলকাতা থেকে সিলেট-আসাম বর্ডারের করিমগঞ্জ গেলাম। ওসমানী বললেন, ‘তুমি তো অরিজিন্যালি সিলেটের ছেলে। পড়াশোনার জন্য খুলনার বি,এল, কলেজে পড়ছো। কিন্তু, তুমি তো খুলনা-কুষ্টিয়া বর্ডার এলাকার ভাষা ভাল জানো না, রাস্তা ভাল চেনো না। বরং সিলেট যাও। সেখানে যুদ্ধের কাজ বেটার করতে পারবে।’ সিলেটে গিয়ে দেখা হলো আব্দুস সামাদ আজাদ ও এমপি আব্দুর রহিম, আখতার ভাই ও ড. চঞ্চলের সাথে। আমাকে মুজিব বাহিনীতে নেওয়া হলো। এরপর আগরতলা বর্ডারে কাজ করছি। তবে, আমি সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে প্রচার ও জনসংযোগেই বেশি ছিলাম। এসময় শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, মোস্তাক আহমেদ, আ.স.ম. আব্দুর রব সহ অনেকের সাথেই দেখা হয়েছিল।”

comrades-passing-life-2.jpg
বিশ্রামাগারে মুক্তিযোদ্ধারা

৯) অনিল কুমার রায়
জন্মস্থান: ফুলবাড়ি থানা,
বয়স: ৫৬ বৎসর।

“আমি যুদ্ধ করছি ৭ নম্বর সেক্টরে। দিনাজপুরের অর্ধেক, বগুড়া, বৃহত্তর পাবনা ও বৃহত্তর রাজশাহী ছিল এই ৭ নম্বর সেক্টরের আওতায়। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ১৭। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষা দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ফুলবাড়ি থানার পাঁচ মাইল দক্ষিণে বাড়াইহাট গ্রাম আর দুই মাইল উত্তরে দইমারি গ্রাম। আমরা এই দুই গ্রামের মাঝামাঝি থাকতাম। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের প্রধান টার্গেট ছিলো হিন্দু জনগোষ্ঠি, সেহেতু এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই আমরা বর্ডার পার হয়ে ওপার বাংলার পশ্চিম দিনাজপুরের কুমারগঞ্জ থানার খলসামায় একটা টিনের ছাউনি ঘরে গোটা পরিবারসুদ্ধ উঠলাম। আমার বাবা ছিলেন কৃষক। পাঁচ ভাইয়ের ভেতর আমি ছিলাম চতুর্থ। আমাদের কোন বোন ছিল না। আমার ভেতর যুদ্ধে যাবার একটা ইচ্ছা ছিলই। আরো যখন গোটা ফ্যামিলি একটা নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে, আমার কোন পিছুটান রইলো না।

জুলাইয়ের শেষে ডাঙ্গারহাট নামক স্থানে একটা ট্রানজিট ক্যাম্পে আমি সহ মোট আটটি ছেলে ভর্তি হলাম। ১৪ই আগস্ট আমরা উচ্চতর একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পানিঘাটাতে গেলাম। পানিঘাটাতে এক মাস ট্রেনিং পেলাম। দুই ইঞ্চি মর্টার, এলএমজ, এসএলআর, থ্রিনটথ্রি, হাই অ্যান্ড লো দু’ধরনের এক্সপ্লোসিভস্ হ্যান্ডেল বা অপারেট করা শিখলাম। এছাড়াও, মাইন বিশেষতঃ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ও অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন বা ব্যুবি ট্র্যাপ প্রস্তুত করা কি বসানো এসব কিছুই শিখেছি। অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইল ১০ থেকে ২০ পাউন্ড ওজনের ভেতর হলেই অনায়াসে বার্স্ট হয়। এটা আবার বেস টাইপ ও জাম্পিং টাইপ… দু’ ধরনেরই আছে। অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন সাধারণতঃ ১৫০ পাউন্ডের মতো ওজন হয়। ট্রেনিং ক্যাম্পে এক্সপ্লোসিভসের ব্যবহার আমি বিশেষ ভাবে শিখলাম। ধরা যাক, এক পাউন্ড এক্সপ্লোসিভসে আমি এক ইঞ্চি কাঠ বা স্টিল কাটবো কি বার্স্ট করবো। দুই ইঞ্চি কাঠ বা স্টিল কাটবো তিন পাউন্ড এক্সপ্লোসিভসে ইত্যাদি। কত কী করেছি! পাকিস্তানি কম্যুনিকেশনস ধবংস করতে গিয়ে রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া, কৃষক ও রাখাল সেজে ক্যামোফ্লেজ করা…

আমার প্রধান স্মরণীয় কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধ অপারেশন হলো ফুলবাড়ি থানার মাচুয়াপাড়া (এটাই প্রথম যুদ্ধ যেখানে বিপক্ষের দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছিল), রাঙামাটি (সবাই পালিয়ে গেছিল, দু’জন রাজাকারকে ধরা হয়), পার্বতীপুর থানার চৌহাটির যুদ্ধ (যে যুদ্ধে আমরা দু’জন বিহারীকে মারি), খোলাহাটি রেল লাইনের উপর যুদ্ধ, রংপুরের বদরগঞ্জ যুদ্ধ ও দিনাজপুরের মহারাজা স্কুলের যুদ্ধ যেখানে আমি আহত হই ও একটি পা হারাই। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি আমরা বড়পুকুরিয়া রেল লাইনের অপারেশন করি। বড়পুকুরিয়া রেললাইনে চার/পাঁচজন রাজাকার রেকির মাধ্যমে পাহারা দিত। সেই পাহারা এড়িয়ে রেল লাইনের সামনে ব্রিজের কাছে রাত এগারোটার দিকে বারুদ, কর্টেস, সেফটি ফিউজ, জিসি প্রাইমা, ডেটোনেটর জড়ো করে ফায়ারিং দিলাম। কোথাও কোন সাড়াশব্দ পেলাম না। রাজাকাররা হয়তো পাহারায় একটু ঢিলা দিয়েছিল। আশপাশে চেক করে, কাউকে না পেয়ে ব্রিজ উড়ানোর সরঞ্জামাদি ব্রিজে ফিট করলাম। প্রয়োজনমতো জিসি প্রাইমার, কর্টেস, সেফটি ফিউজ সংযোগ করে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যার যার পজিশনে থাকলাম। ব্রিজ ওড়ানোর পর সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন সুবেদার নায়েব আলীর কাছে রিপোর্ট করলাম। দু’দিন পরে ক্যাপ্টেন বললেন ‘মাচুয়াপাড়ায় পাকিস্তানি ক্যাম্প আছে। ক্যাম্প উড়াতে হবে। ইউ আর সিলেক্টেড। ঠিক সন্ধ্যার সময় খলসামা সীমান্ত গ্রাম অতিক্রম করে দেড় মাইল ভেতরে পাক সেনাদের ক্যাম্পের কাছে যাবে। ঐ ক্যাম্পে প্রায় ১০০ জন পাকিস্তানি সৈন্য আছে।’ সন্ধ্যায় খেয়ে ১৯/২০শে সেপ্টেম্বর রওনা দিলাম। রাত আটটার দিকে বর্ডার ক্রস করে হাঁটা শুরু করলাম। ধানক্ষেতে হাঁটুর উপর পানি। না যায় হাঁটা, না যায় সাঁতার কাটা। মূল টার্গেটের শ’ খানেক গজের ভেতর এসে পজিশন নিলাম। পাঁচ মাইল পেছন হতে মিত্র বাহিনী আর্টিলারি কাভারেজ দিচ্ছে। আমরা তো পজিশন নিয়েছি। আর্টিলারি কাভারেজ শুরু হয়েছে। একশো রাউন্ড শেলিং ফায়ারের ভেতর আমরা মুক্তিযোদ্ধারা অ্যাডভান্স করছি। পাকিস্তানিদের ভেতর ২০/২৫ জনের লাশ পড়লো। আমাদের দু’জন মুক্তিযোদ্ধা ‘অন দ্য স্পট’ মারা গেল।

আমি নিজে আমার পা হারাই ৬ই জানুয়ারি দিনাজপুর মহারাজা স্কুলের এক যুদ্ধে। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় নিয়াজিরা আত্মসমর্পণ করলেও দেশের ভেতরে নানা জায়গায় তখনো পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ চলছিল। ৬ই জানুয়ারি আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বর্ডার ক্রস করে দিনাজপুর শহরের মহারাজা স্কুলে এসে ক্যাম্প বানালাম। কিন্তু, আশপাশে পাকবাহিনী মাইন পুঁতে রেখেছিল। হঠাৎ এক মাইন বিস্ফোরণে তৎকালীন মহারাজা স্কুলসহ আশপাশের পাঁচশ’ গজের ভেতর সব ঘরবাড়ি ধূলিস্যাৎ হয়। প্রায় ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়ে কোনোমতে বেঁচে যান। আমার পা আমি ঐ বিস্ফোরণেই হারাই। এরপর দিনাজপুর সদর, রংপুর সদর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও মগবাজার সুশ্রী হাইশে আমি চিকিৎসা নেই। সোহরাওয়ার্দ্দি হাসপাতাল থেকে ১৯৭৪ সালে আমি প্রথম পা পাই। এটা ব্যবহার করেছি ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। কোনো কোনো কৃত্রিম পা ‘লাইফ’ পায় মানে অনেকদিন চলে। দ্বিতীয় পা ভারতের পুনা থেকে পেয়েছি। এটা সেই ১৯৮৪ সাল হতে আজ অবধি ব্যবহার করছি। স্বাধীনতার পরে সরকারের প্রশাসনে আমি একটা ছোট-খাট চাকরি পাই। সেটাই আজো করছি। আমার এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে লালমাটিয়া কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ছে। ছেলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। কষ্টের ভেতর শিরদাঁড়া, উরু ও সুস্থ পা’টাতে মাঝে মাঝে খুব ব্যথা হয়।”

১০) মোহাম্মদ মানিক আলী
বয়স: ৫৫
জন্মস্থান: বিয়ানিবাজার, সিলেট।
বর্তমান পেশা: টেলিফোন প্রকৌশলী।
বৈবাহিক অবস্থান: বিবাহিত।

“মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৭ বৎসর। বাবা কৃষক ছিলেন। মেট্রিক পরীক্ষা দেবার পরের বছরই যুদ্ধ শুরু হয়। আমি এপ্রিল মাসে ৪ নং সেক্টরে মেজর সি,আর, দত্তের অধীনে যুদ্ধ করেছি। সিলেট হতে করিমগঞ্জ হয়ে লাতু ট্রানজিট ক্যাম্পে যাই। স্টেনগান ও রাইফেল চালানো, মাইন প্রস্তুত করা… প্রায় ৪৪ ধরনের মাইন প্রস্তুত করার কাজ আমি আড়াই থেকে তিন মাসে শিখে উঠি। পাক বাহিনীর সাথে একটা অপারেশনের কথা খুব মনে পড়ে। আমরা জিতেছিলাম সেই অপারেশনে। জকিগঞ্জ ক্যাম্পে ঈদের আগের দিন আমরা ঘেরাও করি। ওরা কিন্তু সংখ্যায় প্রায় ২০০/৩০০ জন ছিল। ভোররাত চারটার দিকে আমরা অ্যাটাক করি। পাক বাহিনীর ওয়্যারলেস তার ও টেলিফোন সংযোগ আমরা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলাম। রাস্তা কেটে যানবাহন চলাচলের পথও বন্ধ করে দিই। পরদিন সকাল ১১টা পর্যন্ত গোলাগুলি চলে। মিত্র বাহিনী পাকিস্তানি এক ক্যাপ্টেনকে বন্দি করে। সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা, মুজিব বাহিনী, পুলিশ ও ইপিআর সবাই মিলে আমরা কাজ করেছি।

তবে, আমি আমার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি ও ডান হাতের পাতা হারাই ৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১। আমাকে অথরিটি নির্দেশ দিয়েছিল যেন এয়ারপোর্ট হতে সিলেট শহরের দিকে ঢোকার পথে মাইন বসিয়ে রাখি। কিন্তু, আমার কাছে ফিউজ কাটার কিছু ছিল না। মুচড়ে ছিঁড়তে গিয়ে গান পাউডার বা বারুদ হাতের ভেতর বার্স্ট করে ও দুই চোখও আহত হয়। ভোর পাঁচটায় আমাকে আসামের করিমগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দশ/পনেরো দিন সেখানে চিকিৎসার পর আমাকে নিয়ে আসা হয় সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেক্টর কমান্ডার কর্নেল ওসমানী আমাকে রেকমেন্ডেশন লেটার দিলে সেই চিঠির ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু আমাকে হাঙ্গেরিতে টেলিফোন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর একটি তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে পড়তে পাঠান। ’৭৪-এর আগস্ট হতে ’৭৭ পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনার পর দেশে ফিরে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে চাকরি পাই। টেলিফোন সুপারিনটেনডেন্টের চাকরি। বর্তমানে ঢাকার ৩০, পুরানা পল্টনের একটা বাড়িতে আছি। আমার তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে উকিল। ছোট ছেলে সুজন ইউডাতে বিবিএ অনার্স পড়ছে। ওই আমাকে নিয়ে মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে যাওয়া, কল্যাণ ট্রাস্টে বা বিশ্রামাগারে আসা এসব কাজে সাহায্য করে।

অল্প বয়সে দু’চোখ হারিয়েছি বলে দুঃখ হয় কিনা? তা তো হয়ই! তবে, অন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধার তুলনায় আমি বরং স্বাচ্ছন্দ্যে আছি। অনেকে অনেক কষ্টে আছেন। তাদের কথা ভেবে বড় দুঃখ হয়।”

১১) আব্দুস সামাদ

“যুদ্ধে আমার হাত ভাঙ্গছে, চোখ একটা নষ্ট হইছে আর কানের পর্দা ফাটছে। তবু, আল্লাহর রহমত যে আমার মাত্র কুড়ি পার্সেন্ট ইনজুরি হইছে। আমি পুরা পঙ্গু হই নাই। দেশ আমার কুমিল্লার বিবাড়িয়ার নবীনগর। বর্তমানে থাকি রংপুর। শেখ সাব আমারে ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে একটা এনিমি সম্পত্তি দিয়া গেছে। অল্প এক/দুই বিঘা জমি। তা সেই জমির পাশে এক বিহারী এখন দালান উঠাচ্ছে। জীবনে কোনো শান্তি পাইলাম না। আটটা ছেলে-মেয়ে। আমার এক কড়া সম্পত্তি নাই। জায়গা-জমি নাই। চিকিৎসা পাচ্ছি না, ভাতা পাচ্ছি না। হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর একবার বঙ্গভবনে দেখা করতে গেছিলাম। ওনার সময় নাই।”

১২) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম বীর প্রতীক

ff-golam-mostafa-bir-bikram-bir-pratik-golam-mostafa-with-his-grandson.jpg……..
নাতি কোলে মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম বীর প্রতীক
……..
“আমার দেশ ছিল কুমিল্লার বিবি বাজারে। আমি তিন নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করছি। ‘জেড’ ফোর্স, ‘কে’ ফোর্স ও ‘এস’ ফোর্সের ভেতর আমি যুদ্ধ করেছি ‘এস’ ফোর্সের আওতায়। আমি ছিলাম সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানীর সদস্য। ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা-দোহার এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে আমি আহত হয়ে চিরতরে হুইল চেয়ারের আশ্রয় গ্রহণ করি। ডিসেম্বরের এক তারিখ মাধবপুর (হবিগঞ্জ) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার মাঝখানে চান্দুয়া ডাকবাংলো যাবার পথে খবর এলো যে সরাইল থানার শাহবাজপুর ব্রিজের কাছে পাঞ্জাবিরা আছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু শাহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রম ছিলেন আমাদের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার। একটা ব্যাটালিয়ন সাধারণতঃ চারটা কোম্পানীর সমন্বয়ে গঠিত হয়। চান্দুয়া বা ভোপালপুর ব্রিজের কাছে এসে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু শাহ মোহাম্মদ বীর বিক্রম ও ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন ‘জয় বাংলা’ বলে পাক বাহিনীর গাড়ির সামনে গিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করলেন। নায়েক মূর্তজা অ্যাকশন নিয়ে ব্রিজের একপাশে ও নায়েক আবুল কালাম আজাদ অপর পাশে গিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করেন। কোম্পানী কমান্ডার টোয়াইসি সিপাহী আদম আলীও যুদ্ধে ছিলেন। হাবিলদার রফিক, সিপাহী মজিবর সহ অনেকেই এই যুদ্ধে ছিলেন আমার সাথী। ১৮/১৯ জন পাকিস্তানি সৈন্য আমাদের কাছে হেরে গেল। আমি এই যুদ্ধেই গুরুতর আহত হই। আহত হবার পর আমাকে গৌহাটি, পুনা, লাখনৌয়ের কমান্ডো হাসপাতাল সহ নানা হাসপাতালে নেওয়া হয়। আমাকে স্বাধীনতার পর সরকার হতে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ১৯৭৫-এর নভেম্বর মাসে পাঠানো হয়। আমি দেশে ফিরি আর ১৯৭৭ এর অক্টোবরে। আমার চার ছেলে। এক ছেলে সামনে লেবার হিসেবে বিদেশে যাবে। এক ছেলে বিয়ে করেছে। দুই ছেলে ড্রাইভিং ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করে। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধে আমার সাহসিকতার অবদান হিসেবে বীর প্রতীক উপাধি ছাড়াও আমাকে সেনাবাহিনীতে অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যুদ্ধের পর থেকে আমি পূর্ণ পঙ্গু।”

১৩) মোহাম্মদ শুকুর আলী

“আমি ৪ নম্বর সেক্টরে লালমনিরহাটে যুদ্ধ করছি। ইপিআরে ছিলাম। যুদ্ধের সময় আমার বয়স ধরেন ৩০/৩২ হবে। যুদ্ধে আমার হাতে ও পায়ে গুলি লাগছে। আমার ছয় মেয়ে, দুই ছেলে। তিন মেয়ের বিয়া দিছি। এক ছেলে আইএ পড়ছে। বড় ছেলে ড্রাইভারি করে।”

১৪) গোলাম মোস্তফা চৌধুরী

“আমার বাড়ি নোয়াখালি। তবে, যুদ্ধ করছি শেরপুরে। বাবা শেরপুরে পাটের ব্যবসা করতেন। আমরা ছিলাম চার ভাই তিন বোন। আমি যুদ্ধের ট্রেনিং নেই মেঘালয়ের তুরায়। এপ্রিলের ১৪ তারিখ এই ট্রেনিং শুরু হয়। মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জে বিএসএফ ক্যাপ্টেন নেগি আমাদের তাঁবু দিল। প্রায় একশোর মতো ছেলে আমরা জড়ো হইছিলাম। প্রাথমিক ট্রেনিংয়ের পর কারো পোড়াখাসিয়া, কারো মাহেন্দ্রগঞ্জ আবার কারো বাহাদুরাবাদ ঘাটে দায়িত্ব পড়ে। আমাকে দেওয়া হলো পোড়াখাসিয়া ক্যাম্পে। রাজারবাগ পুলিশের আলম সাহেব ঐ ক্যাম্পে সেকেন্ড ইন কমান্ড বা টু-আই-সি’র দায়িত্বে ছিল। কর্নেল তাহের ছিলেন আমাদের সেক্টর কমান্ডার।

’৭১-এর মাঝামাঝি পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে আমাদের প্রথম মুখামুখি সংঘর্ষ হয়। তখন জুন মাস। তেনাছড়া ব্রিজ উড়াইতে আমরা প্রায় দেড়শ ছেলে রাত তিনটা কি সাড়ে তিনটায় সুরমা নদীর ব্রিজের উপর উঠে দেখি গাড়ির আলো। পাঞ্জাবিদের গাড়ির আলো। আমি ডিনামাইটে আগুন দিলাম। পাঞ্জাবিদের তিনটা গাড়ি নষ্ট হইলো। অনেক বিহারী আহত হইলো। বর্ডারের এক পাশে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আর এক পাশে বদর বাহিনী ও বিহারীদের ক্যাম্প। আমাদের সাথে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এসএলআর, স্টেনগান ও লাইট মেশিন গান। সেই প্রথম দিনের অপারেশনে খুব ভয় পাইছিলাম। পরে ধীরে ধীরে ভয় কাটে আমার। শ্রীবর্দি, বক্সিগঞ্জ, কামালপুর, শেরপুর, ভায়াডাঙা, নক্সি এইসব জায়গায় অনেক অপারেশন করছি আমি। আমরা শ্রীবর্দী থানার বিহারী ক্যাম্প ও বক্সিগঞ্জ, ঝিনাইগাতি আর কামালপুরের বিহারী ক্যাম্পও উড়ায় দিছি। তাহের ছিলেন মাহেন্দ্রগঞ্জে। কাগিলাখুরার যুদ্ধে কয়েকজন বিহারী আমার পিঠে ও পেটের ডানদিকে বেয়োনেট চার্জ করে। তখন কর্ণজোড়া পাহাড়ের দীনেশ চৌধুরী তার বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে আমাকে এক মাস সেবা শুশ্রুষা করে। নভেম্বরের ২৮ তারিখ আমরা বিহারীদের কাছে ‘সারেন্ডার লেটার’ পাঠানোর নোটিশ দিই। শেষ যুদ্ধ হয়েছিল ময়মনসিংহের শেরপুরে। এখন তো শেরপুর নিজেই আলাদা জেলা। আমি এক মাস বিশ্রামের পর এই শেষ যুদ্ধে অংশ নিই। যুদ্ধ শেষে ১১ নম্বর সেক্টরের সবাই আমরা জমায়েত হয়ে অস্ত্র জমা দিই। ১৯৭৫ পর্যন্ত আমি রক্ষীবাহিনীর রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে কাজ করি। পরের ত্রিশ বছর আমি তেল ফেরি করে বেড়িয়েছি। ২০০২ ও ২০০৩-এ ব্রেইন স্ট্রোক হয়ে আমার শরীরের শতকরা ৪১ ভাগ পঙ্গু হয়ে পড়ে। ১৯৭৬ সালে আমি বিয়ে করেছি। আমার চার ছেলে আর এক মেয়ে। বড় ছেলে একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে। মাসে ছয় হাজার টাকা বেতন। মেজ ছেলে এমএ পাস করে চাকরি করছে। বড় মেয়ে বিএ পাস করে বিয়ে হয়েছে। সেজ ছেলে ম্যাট্রিক পাশ করেছে। আজ ৩৪ বছর হয় ভাড়াবাড়িতে আছি। নিজের বাড়ি হয় নাই।”

১৫) আব্দুল লতিফ ভুঁইয়া

“আমি যুদ্ধ করছি ২ নম্বর সেক্টরে। ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলে কসবা-কুমিল্লা হতে নোয়াখালি এলাকায় আমাদের ফিল্ড ছিল। যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল মাত্র বাইশ বছর। আমি যুদ্ধের শুরুতে ঢাকার পূর্ব কাফরুলে ছিলাম। এপ্রিলের পনেরো তারিখ আমি প্রথম ক্যাম্পে গিয়া নাম লেখাই। রাজারবাগ পুলিশ স্টেশনের হাবিলদার আব্দুল মালিক আমাদের বারো আনি ট্রেনিং দেন। ভারতের বালাটোলা (কোলকাতা)-য় ২৮ দিন ছিলাম। মে মাসের দিকে কসবায় আমার প্রথম দায়িত্ব পড়ে। আমি আট/দশটা অপারেশনে অংশ নিই। ঢাকা আর নোয়াখালির নানা জায়গায় আমি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। মনে আছে কসবার ওপার থেকে কাঁধে এলএমজি করে রেঞ্জের ভেতর এনে টার্গেট করে গুলি করেছি। মে মাস। কসবা রেল স্টেশনে শত শত আর্মি আর রাজাকার ঘাঁটি গেড়েছে। রাতের দিকে আমরা ভৈরবের উদ্দেশ্যে মার্চ করলাম। ব্রিজ ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলাম। পরের দিন আমরা নদীর ওপারে পজিশন নিয়ে মিলিটারির সাথে ঠিক সাড়ে চার ঘণ্টা যুদ্ধ হলো। এছাড়াও মুন্সিগঞ্জের দিকে ছোট ছোট যুদ্ধ হয়েছে। ভাদ্র মাসে বেলোনিয়া বর্ডার পার হয়ে একটা বড় পাট ক্ষেতে লুকাইছি। পাক বাহিনী নৌকাযোগে মার্চ করে যাচ্ছিল। আমরা সেই যুদ্ধে তাদের হারাই। কিন্তু আহত হই ৬ই ডিসেম্বর নোয়াখালির মিরগঞ্জ থানার যুদ্ধে। ভোর ৫টা থেকে পাঞ্জাবি ও রাজাকারের লগে সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়। আনুমানিক ১:০০ টার দিকে ডান পা নষ্ট হয়ে যায়। পায়ে গুলি লাগার পর এমনি হুঁশ হারাই যে আর ১১ দিন পর জ্ঞান ফেরে। ডান পায়ে তখন ব্যান্ডেজ। পুরো ডান পাটাই এভাবে নষ্ট হয়ে যায়। লক্ষীপুর সদর হাসপাতালে প্রথম দিন দশেক থাকার পর আমাকে ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। ১৯৭৫-এর জুলাইয়ে আমি বিয়ে করছি। চার ছেলে আমার। বড় ছেলে মেট্রিক পাস করে ছোট-খাট কাজ করে। মাঝারো ছেলে বিয়ে করে আলাদা। ছোট ছেলে আইএ ফেল। আমি সূতার ব্যবসা করি। আজ পনেরো-কুড়ি বচ্ছর ধরে এই সূতার ব্যবসাই করছি।”

১৬) সোলেমান সর্দার (বয়স: ৮০)

“যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ৪০ বছর। নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার জয়পুর গ্রামে আমার দেশের বাড়ি। আমি ছিলেম সাইকেলের মেকানিক। ’৭১-এর ২৮ শে মার্চ আমরা যশোর ক্যান্টনমেন্টের দিকে রওনা হলেম। সাথে আমাদের ঢাল, সড়কি, দাও ছিল। এর ভেতরেই খবর পেয়িছি যে ক্যান্টনমেন্টের রেল লাইনের বাম দিকে আনসার, পুলিশ আর সেনাবাহিনীর বাঙালীরা নাকি সব জড়ো হয়িছে। তা দুপুর বারোটার দিকে যাত্রা শুরু করে তিন ঘণ্টা পর পৌঁছে দেখি বিডিআর ইপিআর কি একটা পিঁপড়ে কিছু নেই। আমরা চলি আলাম নড়াইলের দিকি। ইটনায় লোহাগড়া হাইস্কুল ও কলেজে আমরা ট্রেনিং নেওয়া শুরু কল্লাম। এপ্রিল মাসে রাজাকাররা আমাকে অ্যারেস্ট করে থানায় দিলে। তা লোহাগড়া থানার ওসি হাতে মোল্লা আমার পরিচিত পুলিশ। সে আমাকে ছেড়ে দিলে। থানা হতি ছাড়া পেয়িই মোতালেব মিঞা ধানের মিলের সামনে নবগঙ্গা নদী সাঁতরে পার হইয়ি বাড়ি গিয়ি মাকে বলিচি, ‘মা, আমাকে লুঙ্গি ও শার্ট দাও।’ মা আমাকে লুঙ্গি আর শার্ট দেবার পর সাঁতরায় দাদাবাড়ির দিকি রওনা দিলাম। রাত্রি বারোটায় আমার চাচা আমার সাথে দেখা কল্লে। ওখান থেকে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মামাবাড়ি চলে গেলাম। পরের দিন সকালবেলা ভাত খাতিছি। এসময় কিছু নক্সাল এসে মামারে কোপাতি চাচ্ছিলো। ওরা মামাবাড়িতে মজুদ টিন আর পাট নিতি আসছিল। আমি দৌড়ে দু/তিন ঘর পর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ হতে রাইফেল এনে ’বিলাঙ্ক ফায়ার (ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার)’ দিলাম। নয় জন নক্সালকেই আমরা আটক করলাম। মে মাসের দিকে ভারত চলে গেলাম। বাগদায়। বাগদার টালিখোলা ক্যাম্প হতে বেগুনদিয়া ক্যাম্প গেলাম। ভিজে-পুড়ে এমন দু/তিনটা টেন্ট বদলালাম। দেখি বেগুনদিয়া ক্যাম্পে ট্রেনিং নিতে প্রায় ২০০-২৫০ ছেলে জড়ো হয়েছে। ছেলেদের টেস্ট হলো যে তাদের প্রশিক্ষণ আছে কিনা। ২০-২৩ দিন ছিলাম সেখানে। তারপরই সরাসরি অপারেশনে। ভাটিয়াপাড়া, বোয়ালমারি, আলফাডাঙ্গা, শিরিরাম, লাহুড়িয়া, লোহাগড়া আর কালারবাজারে বেশির ভাগ যুদ্ধ করিছি। সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হলো আলফাডাঙ্গায়। নভেম্বর মাসে। আলফাডাঙ্গার ক্যাম্পে আমরা মোট ছিলেম দেড়শ জনা। শেষ রাত্তিরির দিকি মানে তিনটার দিকি সংবাদ পাই যে দেড়শ রাজাকার আর জনা পঞ্চাশ পাঞ্জাবি বোয়ালমারির পানে আসতিচে। ওরা পজিশন নিল বোয়ালমারী বাজারের হাবিব ব্যাঙ্ক… দেশ স্বাধীনির পর যারে কই সোনালী ব্যাঙ্ক… সেই সোনালী ব্যাঙ্কের শাখার অফিসিরি সামনে। বিকেল পাঁটচা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। বিপক্ষের ১২টা লাশ, দেড় কেজি সোনা আর দশ হাজার টাকা আমাদের হাতে আসে। সন্ধ্যায় বোয়ালমারী হতি নৌকো করি যাতিচি। আটজন ছিলাম একটা নৌকায়। ছয়জন ভারত যাবে। আর দু’জন আহত। এমন সময় রাজাকাররা আবার নদীর পার হতি গুলি করিছে। আমার ডান হাতের কনুইয়ে লাগলো। আট নম্বর সেক্টরের বয়রা ক্যাম্পে গিয়ি সোনা ও টাকা জমা দিলাম। আরো প্রায় এক মাস যুদ্ধ করলাম। ডিসেম্বর মাসে পা দেবার দু’দিন আগে কাশিমপুর যুদ্ধে বাঁ পায়ের উরু ও নিতম্বে গুলি লাগে। যুদ্ধে ত’ ব্যথা পাবার ভয় করলে চলে না। কথা কবার সময় নাই। ক্যাম্পেই সেবা চললো।”

১৭) মোহাম্মদ অলিলুর রহমান,
গ্রাম: সাশুনিয়া, থানা: মোকসেদপুর
জেলা: গোপালগঞ্জ।

“যুদ্ধের সময় আমি খুলনার খালিশপুরে ফুলতলায় ইস্টার্ন জুট মিলে চাকরি করতাম। বয়স তখন চব্বিশ। আমরা ছিলাম দুই ভাই দুই বোন। বাবা কৃষক ছিলো। তা যুদ্ধ শুরু হবার আগেই বাবার মৃত্যু হয়। আমি মেট্রিক পাশ করতে পারি নাই। ইস্টার্ন জুট মিলের ফিনিশিং সেকশনে হেড সর্দার হিসেবে কাজ করছি। ২৮ শে মার্চ দিবাগত রাত্রে আমি আমার কমান্ডার ও আর্মির সুবেদার শামসুল হক মোল্লার নেতৃত্বে ইস্টার্ন জুট মিলের ক্যাম্প লুট করি। সাতটা রাইফেল আমাদের হাতে চলে আসে। ২৯ শে মার্চ আমরা কাশিয়ানী থানায় আসি। রাতে হাইস্কুলে ক্যাম্প করি। রাজাকারদের তাড়ায় টাড়ায় আরো কিছু অস্ত্র উদ্ধার করি। মোকসেদপুর থানার কানপর্দি গ্রামে আর্মির মেজর (অব:) আজিজ মোল্লা ছেলেদের ট্রেনিং দিচ্ছিলেন। যোগ দিলাম। আর্মি, বিডিআর (তখন ইপিআর), রিটায়ার্ড আর্মি-পুলিশ-বিডিআর সবাই ছিল এই ক্যাম্পে। ইপিআরের জাফর আহমেদ মল্লিক, আব্দুল মজিদ তালুকদার এরা সবাই আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ৯ই আগস্ট মোকসেদপুর থানায় হামলা করলাম। এটা ছিল সোমবার দিনগত রাত ১১:০০ টার মতো। পাক বাহিনীর সাত জন আর্মি, পিস কমিটির চেয়ারম্যান ওহাব মিয়া, আমাদের পক্ষে ১১জন পুলিশ সহ প্রায় আঠারো-কুড়ি জন জখম। আমরা ছিলাম প্রায় ২০০ জন। রাত দুইটার দিকে আমাদের গুলি শেষ হয়। উল্লাপাড়ার কর্নেল আলতাফ লোক পাঠায়ে গুলি পাঠানোর খবর দিচ্ছেন। এই সময় চাঁদহাটের পথ হয়ে আজিজ এলো দুই প্যাকেট গুলি নিয়ি। সে এসেই থানার বাইরের বাগানে বসে আমাদের ভেতর সব গুলি ভাগ করে দিল। এদিকে সারা রাত ধরিই কিন্তু গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতিছিল। কিছুক্ষণ বিরতির পর ভোর চারটায় আবার যুদ্ধ শুরু হলো। আমরা ত থানার বাইরের বাগানে পজিশন নিছি। আর রাজাকার ও পাঞ্জাবিরা থানায় পজিশন নিছে। থানার ছাদের উপর চারজন রাজাকার ছিল টহলে। তাদের দিকি গুলি ছুঁড়লি তারা অন্য দিক দিয়ি লাফায়ি পড়লো। আমাদের ভেতর তিনজনা মাথায় বালির বস্তা বান্ধি থানার দক্ষিণ কোণা দিয়ি ঢুকি গ্রেনেড চার্জ করলো। এদের ভেতর একজন ছেলেন লুৎফর রহমান, একজন ইপিআর সুবেদার মেজর আব্দুল জলিল ও অপরজনা আমি। গ্রেনেডের গোলায় থানার ভিতরি আগুন লাগলো। তখন বটগাছের মগডালে বসি আমাদের দলের জাফর মল্লিক থানার পানে বিলাঙ্ক ফায়ার শুরু করলো। এলোপাথাড়ি গুলি শুরু হলো। শত্রুপক্ষের ওরা কেউ বাঁচলো না। থানায় ঢুকি পর গ্রামের মানুষকে চাল-ডাল-কাপড় দিলাম। অস্ত্র ও গোলাবারুদ… মনে করো সে প্রায় ১৫/২০টা রাইফেল নিলাম। এরপরপরই ভারত চলি গেলাম। কারণ আওয়ামী লীগ ঘোষণা করলো যে ভারত থেকে ট্রেনিং না নিয়ি যুদ্ধ করলি রাজাকার ঘোষণা করবে। কাজেই ভারত গেলাম। ট্রেনিং নিয়ি ফেরার পর আবার যুদ্ধ করিছি তোমার মোকসেদপুরের বামনডাঙ্গা, জলিরপাড়ের শিন্দাঘাট, ফরিদপুর শহর, কাশিয়ানীর ফুতরা গ্রাম, ভাইটেপাড়া (ভাটিয়াপাড়া)। ভাইটেপাড়ায় নভেম্বরের সতেরো তারিখের যুদ্ধটা ছিল জমজমাট। খুলনা থেকে আর্মি আসছে ভাইটেপাড়ায়। ফুকরা বাজারে পজিশন নিছি দুপুর বারোটায়। হাজার দেড় দুই অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, পুলিশ সব অবস্থান নিছে ফুকরা বাজার আর ফুকরা চরে। মধুমতী নদীর সামনে থেকে দুইটা লঞ্চ বোঝাই পাঞ্জাবি সৈন্য যাবে। ভাইটেমারার ওদিকে আমাদের সেন্ট্রি ছিল। পাঞ্জাবিরা দুইটা ঘানি নৌকায় সাইলেন্সার ফিট করছে। আমাদের সেন্ট্রিরা বুঝতে পারে। ফুকরার চরে এসে আর্মি ও রাজাকার গুলি শুরু করে। আমরা বাজার ছেড়ে চরে চলে আসি। গোলাগুলি শুরু হয়। দুটো নৌকা ডুবিয়ে দেই। দুপক্ষেই প্রচুর মানুষ নিহত হয়। বেলা তিনটার দিকে আমার চোখের নিচে, পাছা আর উরুতে গুলি লাগে। বাম দিকে ধানক্ষেতের উপর পড়ে গেলাম। ভারতের বনগ্রাম সাব-ডিভিশনের একটা হাসপাতালে ১২-১৫ দিন কাটালাম। ১৮ ডিসেম্বর ভাইটেপাড়ায় আরো একটা যুদ্ধ হলো। এই যুদ্ধে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোরের অনেক যোদ্ধা অংশ নিয়েছে। এবার যুদ্ধ শুরু হলো রাত ১২টার পর। পাঞ্জাবিদের বাঙ্কার ছিল পাশেই। খুলনার গোয়ালপাড়া পাওয়ার হাউস থেকে গরম পানি ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িতে করে এনে ফায়ার সার্ভিসের ফিতা ও বয়া দিয়ে গরম পানি ভাইটেপাড়ায় মাটির নিচে খানেদের বাঙ্কারে আমরা ছুঁড়ে মারি। তখন বেলা বারোটা বাজে। বেলুচ আর পাঞ্জাবি মিলিয়ে ২৫ জন আর ১০০ জন রাজাকার এতে মারা যায়। এই যুদ্ধে মেজর মঞ্জুর, মেজর জলিল ও মেজর জয়নাল আবেদীন সবাই একসাথে ছিলেন। একটা কথা। পাঞ্জাবিদের বাঙ্কারে কিন্তু আমরা গুলি করতে পারি নি। বরং ওরা দূরবীণ দিয়ে দেখে দেখে আমাদের তিন জনকে গুলি করে। ক্যাপ্টেন বাবুলের দাড়ির ভেতর দিয়ে গুলি লেগে মাথার বাইরে দিয়ে বের হয়। ইপিআরের জাফর আহমেদের বাঁ পায়ে গুলি লেগে বাঁ পায়ের নিম্নাংশ ভেঙে যায়। কাজি আনোয়ার হোসেনের তলপেটে গুলি লাগে। বাঙ্কারের ভেতর গরম পানি পাইপ দিয়ে ফেললে ওরা সব আধা ঘণ্টার ভেতর সারেন্ডার করে বের হলে কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাঙ্কারে পাওয়া গুলি আমরা দখল করি। আর বাঙ্কারে পাওয়া চাল, ডাল, লবণ, মরিচ এলাকার লোকদের দিয়ে দিই। আঠারোটা বাঙালী মেয়েকেও আমরা বাঙ্কার থেকে উদ্ধার করি। তাদের মুখ ও বুকের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। অত্যাচারে ক্ষত-বিক্ষত। সেই কথা ভাবলে এখনো চোখে পানি চলে আসে।

মিলে গিয়ে পাঁচ/ছয় দিন চাকরি করার পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে এলাম। কেন জানি কারখানায় কাজে নতুন করে মন বসাতে পারলাম না। দেশে ফিরে কৃষিকাজ করা শুরু করলাম। বিয়ে করলাম স্বাধীনের ছয়/সাত বছর পর। আমার এখন দুইটা মেয়ে। বড় মেয়ে ঘরেই থাকে। ছোট মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে। নানা অসুখে ভুগছি। হার্টের সমস্যা, পিত্তথলিতে পাথর, ব্রেনে সমস্যা আর ডায়াবেটিস। সাম্প্রতিক সময়ে আমার ৩০% ডিজএ্যাবিলিটি কমায় ৫% করে ভাতা দেওয়ায় মাসিক ছয়শো টাকা করে ভাতা পাই।’

১৮) শামসুল হক

আমার বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার রঘুনাথপুর গ্রাম। বর্তমানে আমার বয়স ৫৮ বৎসর। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২২/২৩-এর মতো। ১৯৬৯-এর শেষের দিকে আমি সিপাহী (কনস্টেবল) হিসেবে পুলিশে যোগ দিই। পড়াশোনা করেছি ক্লাস এইট পর্যন্ত। ’৭১-এর জুনে আমি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাথে যুদ্ধে যোগ দিই। বিরামপুর-হিলি-নওয়াবগঞ্জ বর্ডারে যুদ্ধ করেছি। ডাক্তার মহব্বত জান ও কর্নেল রেজা (বর্তমানে মেজর জেনারেল) আমাদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

আমার ছিল দুই বোন। মা বাবাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেছিলেন। মা’র অন্যত্র বিয়ে হয়। আমি সারদা ট্রেনিং ক্যাম্পে (রোল ৬৭২, ডিআইজি খালেদ সাহেবের নেতৃত্বে, দিনাজপুর ৬৫) মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ ছাত্র-কৃষক ট্রেনিং নেই। উল্লেখযোগ্য অপারেশনের ভেতর বিরামপুর আর ডাঙ্গাপাড়ায় অংশ নিয়েছি।

বিরামপুরের চুরকুইয়ে সোলেমান বিহারীর ক্যাম্প ছিল। বড় রাইস মিলের ভেতর ১২ জন বিহারী রাজাকার ছিল। আমাদের দলে আমি, জিন্নাহ, মুসলিম, ফজলু আর ইন্ডিয়ান ফোর্সের ১২/১৩ জন ছিল। সকাল দশটার দিকে… তারিখ ভাল মনে নেই… আমরা কয়েকজন রাইফেল, গ্রেনেড, এলএমজি আর এসএলআর নিয়ে প্রস্তুত। আমার হাতে ছিল থ্রি নট থ্রি। রাজাকারদের দোতলা ক্যাম্প ঘেরাও দিয়ে ফায়ারিং করি। এক ঘণ্টা ফায়ারিং চলে। আমরা এক ঘণ্টা ধরে ফায়ারিং করি। এই যুদ্ধে আমাদের কেউ আহত হয়নি। বরং আমরাই প্রতিপক্ষের লাশ নিছি।

আজো মনে পড়ে ডাঙ্গাপাড়ার যুদ্ধ। ভারত থেকে পার্টি আসছে আমাদের সাহায্য করতে। পাকসেনারা জানত যে ভারত থেকে সৈন্যরা আসছে। তাই পাকিস্তানিরা এমন বম্বিং শুরু করলো যে ইন্ডিয়া থেকে যারা সাহায্য করতে আসছে, তারা সবাই মারা গেল। আমরা তখন যুদ্ধের কৌশল হিসাবে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়লাম। রামভদ্রপুর আর নয়াপাড়া অঞ্চলেও আমরা কিছু রাজাকার মেরেছি। বিরামপুরের সোলেমান বিহারীর ক্যাম্পের কথায় আবার ফিরে আসি। ঐ যুদ্ধে জিতবার পর আমরা ক্যাপ্টেন শাহরিয়ারের কাছে হাতিয়ার জমা দিতে গেলাম। তখন হিলি বর্ডারে ভারতীয়দের কাছ থেকে তিন ট্রাক মাইন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আর একটা দল দিনাজপুর ফিরছিল। সন্ধ্যাবেলায় সেই মাইন আমরা মাটিতে পুঁতছিলাম। এসময় একটা মাইন বিস্ফোরিত হয়ে আমি জ্ঞান হারাই। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম রংপুর হাসপাতালে। মনে হলো আমার গোর আজাব হচ্ছে। এক মাস চিকিৎসা চললো। ইঞ্জেকশন আর ইঞ্জেকশন। শুরুতে কথা বলতে পারতাম না। ২/৩ মাস পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডান উরু থেকে মাইন বের করা হয়। মাইন অর্থ মাইনের স্প্লিন্টার। সরকার থেকে এরপর আমাকে জার্মানি পাঠানো হয়। এক বছর চিকিৎসা করা হলো। ১৯৭২-এর শেষে দেশে ফিরলাম বিদেশ থেকে। মাসে ৭৫ টাকা করে ভাতা। বঙ্গবন্ধু আমাকে সাড়ে চার বিঘা জমি দিয়েছেন যা বন বিভাগের লোকরা বর্তমানে জোরদখল করেছে। আমার জমির দাগ নম্বর হলো দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানায় হরিপুর বিট জমি (২৬০০/২৯ দাগ)। খাজনা দিচ্ছি নিয়মিত। আমার কাছে জমির রেকর্ডও আছে। কিন্তু, বনবিভাগ গত ৬/৭ বছর ধরে একটু একটু করে দখল করছে। হেলিকপ্টার (ইউক্যালিপটাস) আর আকাশমণি গাছ লাগিয়ে বনবিভাগ এই জমিগুলো দখল করছে। বর্তমানে আমার দখলে আছে আড়াই বিঘা জমি। এই আড়াই বিঘা জমিতেই যা ফসল হয়, তার উপর আমার সম্বৎসর খোরাকি নির্ভর করে। রঘুনাথপুরে আমার পৈতৃক ভিটাও আছে। মা মারা গেছে। বিয়ে করেছি ১৯৭৭/৭৮-এর দিকে। দুই ছেলে দুই মেয়ে আমার। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ছেলে দুটো মেট্রিক পাশ করেছে। আমার ৫০% ডিসএ্যাবিলিটি আছে। আগে ৫৬২৫ টাকা পেতাম। সম্প্রতি ভাতা আরো ১১০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ৬৭০০ টাকা করে পাচ্ছি। মাঝখানে কিছুদিন শরীর খুব খারাপ গেল। প্রস্রাব হতে কষ্ট হতো। খাওয়ার খরচ, ওষুধের খরচ সব মিলিয়ে মাসে প্রায় দশ হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়।

১৯) সামছুর আলী মণ্ডল
সার্শা, যশোর

সামছুর আলীর স্ত্রীর ভাষ্য: ” উনি খেলাধূলা করতেন। যুদ্ধের শুরুর দিকে একবার উনি দক্ষিণ বর্ডারে খেলতি গেছেন। খেলা থেকে ফিরে এইসি বাঘাছড়া এলাকায় দ্যাখেন লাশের পর লাশ। ঐ রাত্তিরিই উনি আরো দু’জনাকে সাথে করে নিয়ে ভারতের হাতিপুর চইলে গেলেন। তিনমাস পর এক রাত্তিরি দেখা করতি আসছিলেন। আমার শাশুড়ি তাকে পিঠাসিটা বানায়ে খাইয়েছিল। তারপর আবার উনি বর্ডারে চইলে গেলেন যুদ্ধে। ওনার গুলি লাগছে ৭ই নভেম্বর। বাম সাইডে শেল। কামানের গুলি লাগছে।”

সামছুর আলীর নিজের ভাষ্যে: “আমি ছিলাম লাইন পজিশেনে। ক্রলিং করে যাচ্ছিলাম। এক গুর্খা সৈন্য আর এক বাঙালী মারা পড়লো। আমার বাম সাইডে শেলের গুলি লাগবার পর আমাকে বশিরহাট হয়ে বারাকপুর মেডিকেলে নিয়ে গেছিলো আমার সাথীরা। এই আহত হবার আগে আমি রেসলিং খেলতাম, পাঁচ সের চালের ভাত খাতাম। মনে আছে, যুদ্ধে যাবার আগে ট্রেনিং শেষ করে হাতিয়ার নিয়ে বাড়ি আসলাম। মা তিনরকম পিঠা বানালেন। ছিটা রুটি পিঠা। ঐ পিঠাই খালাম এক ধামা। তারপর বানালেন খোলা মুচি পিঠা। সেই পিঠা খায়ে যুদ্ধে গেলাম। যুদ্ধে কডা শত্রু মারিচি? ও অগোনা। যুদ্ধের শেষের দিকে ত’ আহত হলাম। আজ বারো বছর ধরে সম্পূর্ণ প্যারালাইজড। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কোকা কোলায় প্যারালাইজড হবার আগে চাকরি করেছি। বছর কয়েক হয় ডান সাইডে স্ট্রোক হয়ে শরীরটা আমার একটু বেশিই খারাপ হয়ে গেছে। সিএমএইচে আমার একটা কিডনি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন ছেলি চাকরি করে।”

২০) মোহাম্মদ শামসুদ্দিন (বয়স: ৬৫)
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর

“১৯৬৪ সাল অবধি আমি ছিলাম ছাত্র। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছি। ১৯৬৪-’৭১ সাল অবধি আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। একটা ব্যপার, যুদ্ধের সময় আমার মা বেঁচে ছিল না। তবে, বাবা বেঁচে ছিল। আমরা ছিলাম সাত ভাই এক বোন। আমি ছিলাম ৪র্থ নম্বর।

’৭১-এর এপ্রিলের নয় তারিখে আমরা ভারতের পার্বত্য ত্রিপুরার আগরতলার জিরো পয়েন্ট বা বিষ্ণুপুরে পৌঁছে যাই। আমরা মোট আঠারো জন ছিলাম দলে। আমিই অধিনায়ক ছিলাম। ইন্ডিয়ান ইঞ্জিনিয়ানিং কলেজে তিন দিন ছিলাম। ঐ তিন দিনেই আরো আশি জন আমাদের সাথে যোগ দিল। আমি তাদের দায়িত্বে ছিলাম। আমি ট্রেনিং নিয়েছি ভারতের শিমলাতে। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট ইব্রাহিম (তখন মেজর ছিলেন) আমাদের দলের নেতৃত্বে দিয়েছেন। শিমলায় সাত দিন পিটি প্যারেড করার পর আমাদের আসামের ইন্দ্রনগর পাঠানো হয়। সেখানে এক মাস এক সপ্তাহ ট্রেনিং চলে। কর্নেল বাগচি ছিলেন সেই ট্রেনিং সেন্টারের ইন-চার্জ।

প্রথম পাঁচ মাস আমরা যুদ্ধ করেছি ৪নম্বর সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর সি. আর. দত্ত। তিন নম্বর সেক্টরে ছিলেন মেজর শফিউল্লা। মেজর এ. এন. এম. নূরুজ্জামানও ছিলেন। ’৭১-এর ৩রা জুলাই আমরা কানাইঘাট থানা রেইড করি। কানাইঘাট থানার সড়কের বাজারে আমরা একটা ব্রিজ ভাঙি। আর শরিফগঞ্জ বাজারে একটা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙি। ফলে তিনটা থানা বন্যা প্লাবিত হওয়ায় পাকবাহিনী ঐ তিন থানার কোন বাঙ্কারে আর থাকতে পারে নি। এই অপারেশনের জন্য আমরা ত্রিশ জন সন্ধ্যাবেলা জালালপুর ক্যাম্প থেকে রওনা শুরু করি। তিন রাতে ২৪ মাইল হাঁটি। তিন দিন আমরা উপাস। চলার পথে গাছের ডাব, নারকেল কি কাঁচকলা পেড়ে খাচ্ছি। ঐ একমাত্র খাওয়া। রাত তিনটার দিকে পাকিস্তানি ক্যাম্পেও হামলা চালাই। আমাদের এক সহযোদ্ধা রেবতী মোহন দাশ ঐ যুদ্ধে আহত হলেন।

সেপ্টেম্বর মাসে আমরা আমলাছিট ইপিআর ক্যাম্প মুক্ত এলাকা হিসেবে প্রথম জয় করি। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ আমাকে ৩ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। এই সেক্টরের আওতায় আমি প্রথম যে অপারেশনে অংশ নিই, তাতে আটগ্রাম নামে একটি গ্রামে আমাকে যুদ্ধে অংশ নিতে হয়। এই যুদ্ধে আমরা ছিলাম ১৫০ জন। গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন মাহবুবুর রহমান সাদি চৌধুরী।

আমরা জানতাম যে পাঞ্জাবিদের ক্যাম্পে আমাদের আক্রমণ করতে হবে। দুপুরের দিকেই রওনা হই। সূর্য ডোবার সাথে সাথে স্পটে পৌঁছানোর পরপরই আমরা পাক আর্মির তিন জনকে ক্যাপচার করি। পাক আর্মির সংখ্যা ছিল ৭০-এর উপর। আমরা দেড়শো জন তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে আক্রমণ চালালাম। আমাদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র ছিল এসএলআর, ব্রিটিশ এলএমজি, এসএমজি, থ্রি নট থ্রি, দুই ইঞ্চি মর্টার। তা তিন গ্রুপে তিনজন কমান্ডার। মাহবুবুর রব সাদি, মণি আর আশরাফুল হক বীরপ্রতীক। তিন ঘণ্টা ধরে গুলি বিনিময় হলো। তিন জন পাক আর্মিকে হ্যান্ডস-আপ করিয়ে আমাদের কমান্ডাররা তাদের পাঠিয়ে দিলেন আসামের নাসিমপুর ক্যাম্পে।

’৭১-এর ১৪ই আগস্টের একটা অপারেশনের কথাও মনে পড়ে। দিবাগত রাতে আমরা এ্যাটাকে যাই। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ থানার আশপাশের এলাকায় এই অপারেশনটি করা হয়েছিল। শত্রুপক্ষ ছিল ২৫০ গজ তফাতে। সুরমা নদীর ওপার থেকে গুলি করলাম আমরা।… কোনটা রেখে কোনটার কথা যে বলি? ১লা ডিসেম্বরের অপারেশনের কথাই ধরেন। রাত দশটার দিকে আখাউরার অন্তর্গত আজমপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশে বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকে পড়ি। ঢুকবার পরপরই আমাদের এই অপারেশনের কমান্ডার মতিন সাহেব বললেন যার যার বাঙ্কার নিজেরা খুঁড়ে নিতে। আমি ১লা থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর অবধি যুদ্ধ করি। এক হাজার গজ দূরে পাকিস্তানিরা ২০ ইঞ্চি পুরু দেয়াল তৈরি করেছিল। হাতের বামদিকে মিত্রবাহিনী। ডানে ইলেভেন্থ বেঙ্গল। তিন প্লাটুন (৩x৩৭=১১১) বাঙালী সৈন্য। মিত্রবাহিনীর প্রচুর সৈন্য ছিল। ভারি কামান, রকেট লঞ্চার সবই ছিল আমাদের। এই যুদ্ধে আহত হয়ে আমি আগরতলা হাসপাতালে ভর্তি হই। এক সপ্তাহ ছিলাম সেখানে। পরে আখাউরা শহীদ স্মৃতি হাসপাতালেও থাকি কিছুদিন। আমার কী হয়েছিল? পুরো বাঙ্কার একপাশে বিধ্বস্ত হয়ে আমার পিঠের উপর পড়ে ও আমার মেরুদণ্ডের সন্ধিতন্তু ছিঁড়ে যায়। দেশ স্বাধীন হবার পর ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে’র প্রধান কল্যাণ কর্মকর্তা কাজি আনওয়ারুল করিম চিঠি দিয়ে আমাকে সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালে উন্নততর চিকিৎসার জন্য পাঠালো। সোহরাওয়ার্দিতে আবার ড. ক্যাপ্টেন চৌধুরী আমাকে বিশ্রামাগারে রেফার করলেন। ১৯৭৮ সালের মে মাসে আমাকে হাঙ্গেরি পাঠানো হয়। তিন মাস আমি হাঙ্গেরি থাকি। সেখানেই আমাকে হুইল চেয়ার দেয়া হয়। এরশাদ তখন সেনাপ্রধান। হাঙ্গেরি থেকে ফিরে এসে অবধি হুইল চেয়ারেই চলাফেরা করছি এতগুলো বছর। আমার তিন মেয়ে। বিহারিদের পরিত্যক্ত এই বাড়িটির একটি অংশ হোটেল হিসেবে ভাড়া দিয়ে মাসে ১৩,০০০ টাকা পাই, আর একটি অংশ ডিসপেন্সারি হিসেবে ভাড়া দিয়ে ১৮,০০০ টাকা পাই। আহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা হিসেবেও মাসে কিছু টাকা পাই। এভাবেই চলছে।”

২১) মোসলেম উদ্দিন (বয়স: ৭৭),
গ্রাম: কমলাপুর, ডাকঘর: কমলাপুর
উপজেলা: কুষ্টিয়া সদর
জেলা: কুষ্টিয়া।

“যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ৩৯ বৎসর। তখনি ৪/৫টা সন্তান আমার। আমি ছিলাম স্থানীয় আনসারের থানা কমান্ডার। গোডাউনে চাকরি করতাম। ’৭১-এর ২৮শে মার্চ অস্ত্র নিয়ে পালাই। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম ও ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ডিআইজি দেলোয়ার হোসেন ছিলেন আমার একই গ্রামের মানুষ। ওনরাই আমার সাথে মুক্তিযুদ্ধ কী, মুক্তিযুদ্ধে কেন বাঙালী হিসেবে যোগদান করা আমাদের কর্তব্য… এসব বিষয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। ওনরা ত’ ছিলেনই। সেইসাথে কুমারখালির কিবরিয়া সাহেব আর চুয়াডাঙ্গা ক্যান্টনমেন্টের মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, হাবিলদার আব্দুল হালিম… আমরা সবাই দলবদ্ধ হলাম। ৩১শে মার্চ রাত বারোটায় কুষ্টিয়া শহরে মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আমরা সবাই ফায়ারিং শুরু করি। শহরের জিলা স্কুলে প্রায় দুইশোর মত পাকিস্তানি সৈন্য ছিল। আমরা সেখানে আক্রমণ চালালাম। ওরাও পাল্টা উত্তর দিতে শুরু করলো। আমার সহকারী আব্দুল হামিদ এই ফায়ারিং-পাল্টা ফায়ারিংয়ে মারা গেল। পাঞ্জাবিরা হারলো। ভোর ছয়টা পর্যন্ত এমন ফায়ারিং চললো। পাঁচ/ছয়টা লাশ পড়েছিল। জিলা স্কুল ক্যাম্পে রাত ভোর হলে দুটো মেয়ের লাশ পাওয়া গেছিল। পাকিস্তানিরা বাবলাতলায় এসে ক্যাম্প তৈরি করে আমাদের সাথে যুদ্ধ করলো। পাকিস্তানিরা ওখানে নয় দিন ছিল। এই যুদ্ধেও আমরা জয়ী হলাম। এরপর হলো বংশীতলার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আমাদের ৮০/৮৫ জন মারা গেছিলো। বংশীতলা যুদ্ধের পর পাইকারি হারে গ্রাম পোড়ানো শুরু হলো। বংশীতলা, শালঘরমধুয়া… আশ-পাশের সব গ্রাম পুড়তে লাগলো। ১৭ জন আনসার সহ পালায়ে আলাম। টাউন থেকে দুই কিলোমিটার ভিতরে। সেবার গুলি পায়ে লাগে বার হয়েছিল! এমন কত যুদ্ধ! কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলবো? দেশ স্বাধীনের পর চাকরি করতি করতি তাও ছাড়ে দিলাম। এখন প্রায়ই জ্বর আর বুকি ব্যথা থাকে।

অক্টোবরে করিমপুর গেলাম। বালিয়াপাড়া থেকে খবর পেয়ে আসিচিল। পিরায় ১০০ পাকিস্তানি সৈন্য ছিল। আমরা ছিলাম ৫০ জন। দুই জন মারা পড়লো। বেনাপোল বর্ডার হয়ে ইন্ডিয়ান সোলজাররা আসেছিল। যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিলাম কুষ্টিয়ার পুলিশ লাইনে। ১৯৭২-এর ১৫ই জানুয়ারি রক্ষী বাহিনীতে যোগ দিই। যুদ্ধের পর আমার আরো তিনটি সন্তান হয়েছে। পানিতে ডুবে এক মেয়ে মারা গেছে। ঢাকার পিলখানায় আমি ১৯৭২-’৭৫ সাল অবধি রক্ষীবাহিনীতে কাজ করেছি। আমি ছিলাম বাহিনীর ‘সি’ কম্পানিতে। যুদ্ধের সময় আমার প্রায় ৮-৯ বিঘা জমি ছিল। বর্তমানে মাত্র ৪-৫ বিঘা আছে। আমার এক ছেলে বর্তমানে মাছের ব্যবসা করে, এক ছেলে অপসোনিন কোম্পানির ড্রাইভার, এক ছেলে মিস্ত্রী। আমি মাসে ১৩৫০ টাকা ভাতা পাই।”

২২) মোহাম্মদ সবুর আলী সর্দার (বয়স: ৫৫)

“যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৭ বছর। আমার দেশ হলো সাতক্ষীরার দেবহাটা থানার চিনিডাঙ্গা গ্রাম। পাকিস্তান আমলে অল্পবয়সী ছেলেরা মুজাহিদ ট্রেনিং নিতো। তিন মাসে দেড়শো টাকা করে পেতাম। পড়াশুনা মোটেই জানতাম না। যুদ্ধের পরে নাম সই করতি শিখিচি। কিন্তু, যুদ্ধ শুরু হলে ওদের সাথে না যেইয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলাম। মে মাসের মাঝামাঝি পাক আর্মি সাতক্ষীরায় এলো। য্যাকন যুদ্ধ শুরু হলো, তখন আমাকে ডেকেছিল। দেবহাটায় ইপিআর ক্যাম্পে বিহারী ছিল। আমরা পঁচিশ জন মুজাহিদ ট্রেনিং পাওয়া ছেলে বিহারী ইপিআরদের ধরে ভারতে চালান দিলাম। বাঙালী ইপিআর যশোর ক্যান্টনমেন্টে আসে। আমরা ক্যাম্প চৌকি দিতাম। খাদ্য সপ্তাহে খাইতাম। বেলাক (স্মাগলিং) করে পাবলিক যা পয়সা পাতো, আমাদের দেতো। মাছ, কচ্ছপ, দুধ, সব্জি আমাদের দেতো। খাতি খাতি ভারত থেকে আমাদের অস্তর দিল। তখন বেভেন্ন জায়গায় আমরা যুদ্ধ করতি চলে গেলাম। মে মাসের পর আমরা প্রায়ই তকিপুর, চব্বিশ পরগণা… বর্ডার ক্রস করতাম। দুই মাইল পারোতাম (পার হতাম)। নৌকায় পালায়ি থাকতাম। খাল দিয়া ব্রিজের এপারে যুদ্ধ করতি করতি আমরা এপাশে চলে আলাম। রাত ১০:০০ টার পর চলে আলাম। ক্যাম্পে আসলাম। ভোরে রেডিওতে বললো যে পাকিস্তানিরা চইলে গেছে। একটা গরু মাইন বিস্ফোরনে মারা গেছে। সাব-সেক্টর কমান্ডার শাহজাহান মাস্টার বললো, ‘মাইন অপসারণ করতে হবে। নয় অনেকেই মারা যাবে।’

চার জন (আমি–সবুর আলী, আব্দুল সোবহান–মাগ্রি গ্রাম, মনসুর–খেজুরবাড়িয়া, আব্দুল ওয়াহাব–দেবহাটা) মাইন তোলা শুরু করলাম। আমি চেক করি, আব্দুল সোবহান বেয়নেট দিয়ে খুঁচায় তোলে, ওয়াহাব ইপিআর ক্যাম্পে রেখে আসে, মনসুর রেডি করে। ২০টা মাইন তোলা হয়ে গেছে। ২১ নম্বর মাইনটা তিন হাত দূরে। কোথাও সূতা, কোথাও তিনটা তারের মাথায় লাল ইঁটের খোওয়া আছে। সেই খোওয়া তুললি মাইনের মাথায় পড়লি আমি সবুর আলী আর আমার সাথি আব্দুল সোবহান সেন্সলেস হয়ে যাই। ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। মনসুর আলী আমাদের ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ভারতে সন্ধ্যার দিকে জ্ঞান ফেরে। খবর পেয়ে শুনি ওহাব মারা গেছে। ত’ আহত হবার পর ডান হাত আর একত্র মুঠো করতে পারি না। বারাকপুর হাসপাতালে ভর্তি হইছিলাম। ডান হাতে, বাম ঘাড়ে ও গর্দানে শেলিংয়ের টুকরো ও বাম পাশে শেলিং লাগে। ভারতে রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতাম। পালায় আসলাম। ওখান থেকে এইসে দেখি কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভাই ও সাব-সেক্টর কমান্ডার মিলে কালিগঞ্জ বরাবর একটা বড় যুদ্ধে অংশ নিতে যাচ্ছে। আমি সাব-সেক্টর কমান্ডারকে বললাম, ‘আমি যাব।’

উনি বললেন, ‘তোমার হাত খারাপ।’

‘একটা এসএমজি দেন।’

কিছু খাওয়া দাওয়া করে, রেস্ট নিয়ে যুদ্ধে রওনা হলাম। যেই আমরা নৌকায় ওটপো, সেই ‘জয় বাংলা’ বলতি বলটি একটা খান সেনার লাশ নিয়ি লেফটেন্যান্ট বেগ কালিগঞ্জ থেকে ইন্ডিয়া চলে আসলো। আমাদের আর যুদ্ধে যেতে হলো না। ক্যাম্পে এইসে নিজের মা’র সাথে দেখা করলাম। আবার একটা যুদ্ধে যাই। মেজর এম, এ, জলিল নবম সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘পারুলিয়া ব্রিজের দু’পাশে খান সেনা। উড়ানো যায় কিনা? ঐ ব্রিজটা কি ভাঙ্গা যাবে?’

আমি বললাম, ‘যাবে।’

‘কীভাবে ভাঙ্গবা?’

বুঝায় বললাম। আমি আসলে ব্রিজ ওড়ানো, বাড়ি ওড়ানোর মত কাজই যুদ্ধে বেশি করেছি। আমরা ২৫ জনই ব্রিজ ওড়ানোর জন্য মাল-পত্তর, বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে রওনা হলাম। রওনা হলি কালিগঞ্জ থেকে লেফটেন্যান্ট বেগ আমাদের ক্যাম্পে এসে বললো, ‘ওরা কোথায় যাচ্ছে?’

‘পারুলিয়ায় ব্রিজ ওড়াতে যাচ্ছি।’

‘আমরাও যাব।’

এবার ওনাদের নিয়ি আমরা পারুলিয়ায় ব্রিজ ওড়াতে আসি। জুনির শেষ হবে খুব সম্ভাব। কি জুলাই মাসের পরতম ভাগ। ব্রিজির দুই পাশে খান সেনা বাঙ্কার করিয়া, এলএমজি ও মেশিন গান পাতিয়া বসি আছে। ২০ জনের মতো খান সেনা ও ২০ জনের মতো রাজাকার। এবার আমি ও লেফটেন্যান্ট বেগ আরো সাতজন ছেলেকে নিইয়ি খেজুরবাগে নদীতি মাঝখানে নামলাম। নদীতে নেমে সাঁতার দিইয়ি, মাঝখানের খুঁটি (পিলার) দিয়ি ব্রিজি উঠি এক্সপ্লোসিভস্ ফিট করি। লেফটেন্যান্ট বেগ নিজের হাতে ফিট করে। আমি দেখায় দিই। যখন চলি আসলাম আমাদের খেজুরবাগ গ্রামের নিকটে, তখন পুবদিকির ব্রিজির গার্ডার গেল। গেলি আমরা রাজাকার পিরায় কুড়ি জন ছিল ব্রিজির পর… মারা যায়। লেফটেন্যান্ট বেগের এলএমজির একটি গুলি ভরা মাগাজিন রেখে আসে। খুঁজি আর পাওয়া যায় নাই। আমি গাইডার (গাইড) হিসাবে চললাম। খুলনার শিরামণিতে শেষ যুদ্ধ। ডিসেম্বর মাসের কথা। নৌকায় করে পুঁটিমারী থেকে ব্যাংদা আসি (সাতক্ষীরা থানা)। ওখানে রাজাকারদের সাথে কিছু যুদ্ধ হলো। রাজাকার কিছু পলায় যায়। ওরা ছিল ৩০০/৩৫০ মতো। আমরা ছিলাম দুইশো/ সওয়া দুইশো মতো। একশোর মতো রাজাকার যাচ্ছে। আমরা ৩০/৪০ জন হাতিয়ার হাতে জঙ্গলে কি নদীতে রাজাকার আর খান সেনাদের ঘিরে ধরতাম। ও মাথায় দশজন ঘেরি ধরবে, এ মাথায় আরো দশজন… এই ভাবে।

তা’ ডিসেম্বর মাসে ঈদির দিন। গল্লাবাড়িতে পাক সেনা ও ভারতীয় সেনার বিশাল যুদ্ধ হয়। তিন দিন যুদ্ধ হয়। মাংসের গন্ধে, মানুষ মরার গন্ধে চারপাশ একাকার। পেলেন থেকে বোমা পড়তিচে। সুন্দরবন কলেজ যেন ভূতের বাড়ি। সেখানে রাত কাটাতাম। সাতক্ষীরায় মিলিশিয়া ক্যাম্পে ওসমানীর সার্টিফিকেট নিয়ি বাড়ি ফিরলাম। মিথ্যি কথা বলতি কি? দুই ছেইলি আর চার মেইয়ে নিয়ে এই শরীরে আমি ত’ কাম করে খাওয়াতে পারি নাই। আমার বউ পরের বাড়ি কাজ করেছে। নাইট গার্ডের চাকরির চেষ্টা করিচি। ডান হাতির জন্য হয় নাই। দুই বিঘা জমি বিক্রি করে ষোলশ’ টাকা পেলাম। খুব কম-সম খেইয়ি চলে। বড় ছেলে জাল টানে। ছোট ছেলে ফাইভে পড়ছে। মেয়ে তিনটা বিয়ে হইয়েছে। স্বামীরা নেয় না। তিন মেয়ে বাড়িতে আছে। বর্তমানে আমার কুড়ি পার্সেন্ট ডিসএ্যাবিলিটি। আগে ৩০% ছিল। মাসে ৫,০০০ টাকা ভাতা পাই।”

an-old-and-injured-soldier-in-the-court-yard-of-the-rest-house.jpg
বিশ্রামাগারের আঙিনায় বৃদ্ধ এক মুক্তিযোদ্ধা

ছবি. তুলেছেন অদিতি ফাল্গুনী

a_falgun@yahoo.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্ম্যাক হাসান — এপ্রিল ৫, ২০১১ @ ৬:২৮ অপরাহ্ন

      “অদিতি ফাল্গুনী” অনেক বড় দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে এসেছেন। আমরা আর আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের মানুষগুলো চলার পথে এই কথাগুলো জেনে এ দেশের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,আমাদের জাতীয় স্বকীয়তা আর এ দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে আরো একমুহূর্ত ভাবব। আজ যখন আমরা নিজেকে ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবতে পারি না, সে সময়ে দাঁড়িয়ে বলছি এই তো অনেক। অদিতি ফাল্গুনী, আপনি আরোও লিখুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Rasheduzzaman — জুন ১৯, ২০১২ @ ৪:৫৪ অপরাহ্ন

      যারা আমাদের জন্য এত করেছে আজ তাদের জন্য আমারা কিছুই করাতে পারছি না !
      এ স্বাধীনতা আনার দরকার কি?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com