ভ্রমণ

শীতের সাতকাহন

ক্রিসমাসে দার্জিলিং

মীর ওয়ালীউজ্জামান | 7 Mar , 2011  

পঞ্চম কাহন: ক্রিসমাসে দার্জিলিং

120.jpg
পাহাড়ে চাষ, মংপু

আমাকে তোমরা কাল শিলিগুড়ি রেখে এস… আমি আর সহ্য করতে পারছি না… তোমাদের ওই দূরের বাদ্য কাঞ্চনজঙ্ঘা ছেড়ে তুষারপাত এদিকে কবে এগোবে, তোমরা বসে বসে দিন গুনতে থাক… আর আমি এদিকে সন্ধ্যে হলেই কেবল সকালের অপেক্ষায় মরি…। এরকমটা আগে কখনো হয়নি। রুবি-রুবাই বর্ষায়-গ্রীষ্মে দার্জিলিং পাহাড়ে এসেছে আগে। বেশ উপভোগ করেছে শীত। বর্ষার সন্ধ্যেয় জিমখানা ক্লাব রিজর্টের ঘরে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বেলে মস্ত ঘর আরামদায়ক উষ্ণতায় জড়িয়ে নিয়ে বসে ডিনার করেছি। আষাঢ়ে বৃষ্টি ঝরেছে বাইরে অবিরাম। কিন্তু এবারে ডিসেম্বরের শেষে এসে একটু বিপাকেই পড়া গেছে। রাতে ঠাণ্ডাটা রুবির অসহনীয় ঠেকছে। মেয়ে মজাই পাচ্ছে। স্নানের ধারে কাছে নেই, পায়ের মোজা খুলছে না, জ্যাকেট গায়েই কম্বলের নিচে ঢুকে ঘুমোচ্ছে অকাতরে, সকালে বিছানায় বসে চোখ বুঁজেই ব্রেকফাস্ট খাচ্ছে অর্থাৎ রুবি মেয়ের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।

159.jpg
ড্রুক হোটেলের রুমে, দার্জিলিং

ডিসেম্বরের যে বিকেলে দার্জিলিং পৌঁছলাম, লাডেনলা রোডে দার্জিলিং ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (ডিটিসি) উল্টোদিকে ড্রুক হোটেলে চেক-ইন করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। ম্যাল-এ ক্রিসমাসের আলোকসজ্জা ঘুরে দেখলাম। পর্যটকের ভিড় বেশ। আগেরবার আমি জানুয়ারি মাসেও প্রচুর পর্যটক দেখতে পেয়েছি। কারণ শুনেছি, শীত নাকি কমেছে। তা দশ-বিশ বছর আগের তুলনায় তো শীত অবশ্যই কমেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কবলে তো হিমালয়ও পড়েছে। ক্যাভেন্টার-এর দোকানে গরম কফি, ক্রোয়াসঁ আর তিব্বতি চিজ খেলাম। গা গরম করে বেরিয়ে প্রতিবারের মতো হাতমোজা আর কানঢাকা পশমি টুপি কেনা হল। ডিটিসিতে এসে পরদিন মংপু যাবার জন্য গাড়ির কথা বলে হোটেলে ঢুকলাম। দোতলায় বড় ঘর দিয়েছে আমাদের। দুটো বেড। একদিকে পুরো দেয়ালটা কাঁচের। ভারি পর্দা টানা। বয় এসে জিজ্ঞেস করল, আমাদের রুমে হিটার বা গরম জলের বোতল চাই কিনা। রুবি বলে দিল, দিলে ভালই হয়। হিটার এনে ছেলেটা চালু করে দিল। শোবার আগে জলের বোতল দেবে। অতবড় ঘরে ওই হিটার অপর্যাপ্ত, আমার মনে হল। গরম জল আর ব্র্যান্ডিতে চুমুক দিয়ে ছেলেটিকে সাড়ে আটটায় রুমে ডিনার সার্ভ করতে বললাম। মা-মেয়ে ইতিমধ্যে কম্বলের নিচে।

153.jpg
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরের সামনে, মংপু

সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়ে নেমে ডিটিসিতে গাড়িতে চাপলাম। নতুন টাটা ইন্ডিকা। এসব হালকা গাড়ি পাহাড়ে চলছে, অসুবিধে হয় না? প্রশ্ন শুনে চালক রাজিব বলল, না স্যার, আমি তো চালাই। ভালই লাগে। দিলীপ বাবু সকালে বললেন, আমার বন্ধু যে ক’দিন থাকবেন, তুমিই এদিক ওদিক নিয়ে যেয়ো। ঠিক আছে, মংপু চল। গাড়ি কালিম্পং-এর পথে পড়ল। ঘন্টাখানেক চলে মংপু-র সাইন দেখে শাখা সড়কে ঢোকা হল। পাহাড়ে চলতে আমার খুব ভাল লাগে। চোখের আরাম, মনের আরাম। যথাসময়ে মংপু সিঙ্কোনা বাগানে পৌঁছলাম। একশো বছর আগে এক বাঙালি ভদ্রলোক এই বাগানের দায়িত্ব নিয়ে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ভেষজ গাছের চাষ গড়ে তোলেন। তাঁর স্ত্রী মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন। তারা যে বাংলোতে বাস করতেন, সেটা রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত হওয়ার কারণে সরকার রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। রবীন্দ্র স্মৃতি যাদুঘর বলা যায়। যে ঘরে কবি এখানে কিছুকাল কাটিয়ে গেছেন, সেটি তার ব্যবহৃত আসবাবশুদ্ধ তেমনি রক্ষিত আছে এই ৮০ বছর যাবত। কবির ঘরের জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্যন্ত অবাধে দৃষ্টি চলে। মংপু থেকে বেরিয়ে কালিম্পং পৌঁছলাম দুপুর নাগাদ। ক্যাকটাস প্রদর্শনীতে দৈত্যাকার ক্যাকটাই দেখা হল। শহরের উচ্চতম পয়েন্টে পৌঁছে সেখারকার রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ খেয়ে দার্জিলিং ফিরে এলাম। ম্যালে নিয়মিত সান্ধ্যভ্রমণ সেরে গ্লেনারি বেকারিতে প্যাটি-প্যাস্ট্রি সহযোগে কফি খাওয়া হল। পরদিন সকালে বেরিয়ে জোড়পুখরি গেলাম। কিছু সময় কাটিয়ে মিরিক যাওয়া হল। ঝকঝকে রোদ আর তীব্র হিমেল হাওয়া। সারাদিন তো ভালই লাগে। রাতে ঠাণ্ডায় আমার গা গরম হয়েছে মনে হচ্ছিল, রুবি গুনগুন করে অভিযোগ করে। প্যারাসিটামল নেবে নাকি? আমার প্রশ্নের উত্তরে সে বলে, না, না, আসলে রাতে আমার গা গরম হয় না মোটে। আগে তো কখনো এরকম ঠাণ্ডা লাগেনি! আমি ঠিক বুঝতে পারি না কী করা উচিত। নেমে যাব নাকি সমতলে? তাহলে তুষারপাত দেখা হবে না আব্বু আমাদের? এই ক্রিসমাসে এলাম এবার এত হিসেব করে…. রুবাই গুনগুনিয়ে বলে।

121.jpg
মিরিক লেকের পাড়ে

মহামুশকিল হল তো! মিরিকে বড় ফার্মেসিতে গেলাম। ওখানে যে ডাক্তার বসেন, তিনি রুবিকে যত্ন করে পরীক্ষা করে বললেন, ঠাণ্ডা বসেছে বুকে, সাইনাস গহ্বরে। ফ্র্যাঙ্কলি বললাম, বেড়াতে এসেছি, নিচে নেমে যাব কি? না, না, উনি হাসলেন আর ক’টা ওষুধপত্তর দিলেন। ওখানে বসিয়েই চায়ের সঙ্গে বড়ি খেতে দিলেন রোগীকে। আশ্বস্ত হলাম। বেলা বাড়ল। রোদ উঠেছে। আমরাও চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। সারাদিন লেকে নৌকো বেয়ে, ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁয় খেয়ে, আরো সব বাঙ্গালি পর্যটকদের সঙ্গে আড্ডা মেরে বিকেলে ফেরার পথে নেপাল সীমান্ত ঘেঁষে আসতে গাড়ি থামিয়ে আধঘন্টার জন্য নেপালে ঢুকে এককাপ কফি খেয়ে দার্জিলিং ফিরেছিলাম। যথারীতি ম্যালে সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে ক্যাভেন্টারের দোকানে বসে জিরিয়ে চিকেন মোমো সহযোগে জলযোগ শেষে হোটেলে ফেরা হয়। কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্য বেড়ে যায় অসহায়ভাবে। আজ সন্ধ্যেয় ম্যালের একেবারে ওপরে এক কিউরিও শপ থেকে টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা সেরে ইয়াকের দুধের পনির কিনে ফিরে লাডেনলা রোডে নতুন গজিয়ে ওঠা মাল্টিপ্লেক্সে ঢুকে সিনেমা দেখে সময় কাটাতে চাইলাম। কিন্তু রুবির জ্বরটা ফিরে আসছে আবার, ওর শীতবোধও বাড়ছে। অতএব ঘরে ফেরা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।

119.jpg
লেখক দম্পতি, কালিম্পং

সন্ধ্যের পরপরই রুমে হিটার চালু করা হল। আজ প্রকাণ্ড ঘরটা গরম করার জন্য দুটো যন্ত্র লাগিয়েছে। রুবি কম্বলের নিচে শয়ান। একটা নয়, গোটা দুই কম্বল চাপিয়েছে গায়ে। আমি গরম জলে ব্র্যান্ডি মিশিয়ে এগিয়ে দিলাম। নিল না। ওষুধ হিসেবে সেবনেও রাজি হল না। সকাল সকাল ডিনার খেয়ে বাতি নিবিয়ে সবাই বিছানা নিলাম। নাহ্। এবারও স্নো-ফল দেখা হবে না। রাত পোহালে নিচে নেমে যাওয়াই সাব্যস্ত করলাম। রুবি এমনও প্রস্তাব করল, ওকে শিলিগুড়ির হোটেলে অথবা শিবুদের হাকিমপাড়ার বাড়িতে রেখে এসে আমরা বাপ-বেটি দার্জিলিং-এ আরো ক’দিন কাটিয়ে তুষারপাত প্রত্যক্ষ করেই যাই না কেন? তাতো আর হয় না। একযাত্রায় পৃথক ফল আমি কৃতকর্মের ফল হিসেবে অবশ্যই চাই না! ঘুমোনোর আগে আমার সিদ্ধান্ত রুবি-রুবাইকে জানালাম। রুবি নিশ্চুপ। রুবাইও।

123.jpg
বাতাসিয়া লুপ, দার্জিলিং

সকালে দার্জিলিং থেকে নেমে গেলাম। শিলিগুড়িতে হোটেলের সামনে হাইওয়েতে জনজট। জিপের ভেতরে ঘেমে নেয়ে উঠে জ্যাকেট খুলে রাখতে হল। আজ এখানেই থাকব। হুড়োহুড়ি করে ঢাকা যাবার দরকার তো নেই। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবু শিলিগুড়ি এসেছেন। তার গাড়ির বহর হোটেলের পাশেই সার্কিট হাউসে ঢোকার পর আমাদের গাড়ি নড়ল। গরম জলে সবাই আরাম করে স্নান সেরে মাছ-ভাত খেয়ে ছোট্ট ঘুম দিলাম। রুবি প্রফুল্ল। মেয়েও মায়ের খুশিতে খুশি। বিকেলে সবাই অনেকটা হেঁটে ঢাকা যাবার বাসের টিকিট আর টুকিটাকি ভারতীয় স্যুভনির নিয়ে হোটেলে ফিরলাম। পরদিন লাঞ্চের পর শ্যামলী পরিবহনের বাস শিলিগুড়ি ছাড়ল। বিকেলে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে ঢাকার গাড়িতে সওয়ার হলাম। শেষরাতে কলাবাগানে এসে নামলাম। শীতই এবারে আমাদের দার্জিলিং থেকে তাড়িয়ে এনেছে।।

পড়ুন: (প্রথম কাহন) (দ্বিতীয় কাহন) (তৃতীয় কাহন)(চতুর্থ কাহন)

m.waliuzzaman@gmail.com
আর্টস প্রোফাইল: মীর ওয়ালীউজ্জামান


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.