সাক্ষাৎকার

বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম-এর সাক্ষাৎকার

admin | 27 Jan , 2008  

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলম খোরশেদএহসানুল কবির

১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের যশোর জেলার ঝিনাইদহ শহরে জন্মগ্রহণকারী জামাল নজরুল ইসলাম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিদ ও গণিতবিশারদ। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, জামাল njir.jpg………
বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ জামাল নজরুল ইসলাম
………
নজরুল ইসলাম লণ্ডনস্থ ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়-এর অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেমেটিক্স অ্যান্ড থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বিভাগ থেকে পিএইচডি ও ডিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন যথাক্রমে ১৯৬৪ ও ১৯৮২ সালে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও অধ্যাপনাশেষে ১৯৮৫ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে যোগ দেন। সেখানে তিনি সেন্টার ফর ম্যাথেমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস নামে একটি বিশ্বমানের গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং অদ্যাবধি তার পরিচালক পদে নিয়োজিত রয়েছেন। জামাল নজরুল ইসলাম-এর গবেষণার প্রধান বিষয় আপেক্ষিকতাবাদ ও মহাকাশবিদ্যা। এ বিষয়ে তাঁর অসংখ্য গবেষণাপত্র ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একাধিক গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে।

●●●

আলম খোরশেদ: প্রথমেই বলে রাখি যে এটা কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার নয়। ঘরোয়া পরিবেশে একটা খোলামেলা আন্তরিক আড্ডা দিতে চাই আমরা। আর এর মাধ্যমে আপনার কাজকর্ম এবং চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানতে চাই। এ ছাড়া সামাজিক সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে আপনার নিজস্ব মূল্যায়ন ও মতামত জানতেও আগ্রহী আমরা। আপনি একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, একজন বিশিষ্ট গণিতবিদ–এটা আমরা সবাই জানি। আজকে আমরা আপনার নিজের মুখ থেকেই একটু বিশদভাবে শুনতে চাই বিজ্ঞানের জগতে আপনার অবদান ও আপনার অন্যান্য কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে।

জামাল নজরুল ইসলাম: এখন তো আমার অনেক বয়স হয়েছে, ফলে আমার কাজের ক্ষেত্রটাও অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আমি যেটাকে রসিকতা করে বলি, ‘ওয়াইডার, বাট নট নেসেসারিলি ডিপার।’ যাই হোক, গোড়ার দিকের কথা দিয়েই শুরু করি। ১৯৫৭ সালে আমি কলকাতা থেকে অনার্স শেষ করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে গণিতশাস্ত্রে ট্রাইপস করতে যাই। সাধারণত এটা তিন বছরের কোর্স, তবে আমি দুই বছরেই শেষ করি। ওখানে আমার সহপাঠী ছিল পরবর্তীকালে ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ
narlikar.jpg……..
ভারতীয় গণিতবিদ জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার (জন্ম. ১৯৩৮)
……….
নারলিকার। আরেকজন সহপাঠী ছিলেন ব্রায়ান জোসেফসন, যে তার পিএইচ ডি থিসিসের জন্য মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, ১৯৭৩ সালে, পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পায়। আমার এক বছরের সিনিয়ার ছিলেন জেমস মার্লি, যিনি ১৯৯৬ সালে অর্থনীতিশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। অমর্ত্য সেন যে-বছর নোবেল পুরস্কার পান সে বছর অর্থাৎ ১৯৯৮ সালে রসায়নে নোবেল পেয়েছিলেন জন পোপল। তিনি কেমব্রিজে আমার শিক্ষক ছিলেন। আমি এগুলো বলছি সেই সময়ে আমাদের লেখাপড়ার পরিমণ্ডলটা কতটা সমৃদ্ধ ছিল সেটা বোঝানোর জন্য। যা বলছিলাম, আমার পিএইচ ডি থিসিস ছিল পার্টিকেল ফিজিক্স বা মৌলিক কণার ওপর। এর তিন-চার বছর পরই আমি আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে কাজ করা শুরু করি। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কসমলোজি। বলতে পারেন, এই তিনটিই হচ্ছে আমার আগ্রহ ও কাজের মূল ক্ষেত্র। পরে অবশ্য আমি ফ্লুইড ডইনামিক্স বা তরল গতিবিদ্যা নিয়েও কাজ করেছি।

আ খো: আপনার বৈজ্ঞানিক গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ও অন্যান্য প্রকাশনাগুলো সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

জা ন ই: আমি পঞ্চাশটারও বেশি গবেষণা-পত্র এবং কিছু বৈজ্ঞানিক বই লিখেছি। গবেষণা-পত্রগুলো অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান জার্নালসমূহে। আমার লিখিত বইগুলোর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য এবং প্রভাবশালী হল আলটিমেট ফেইট অফ দ্যা mirrlees.jpg……..
জেমস মার্লি (জন্ম. ১৯৩৬)
……..
ইউনিভার্স
। এটা ১৯৮৩ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি ফরাসি, ইতালীয়, জার্মান, পর্তুগিজ, সার্বোক্রোয়েট সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর সব বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, আমার এই বইটা পাঠ্যবই হিসাবে পড়ানো হয়। দ্বিতীয় বইটির নাম রোটেটিং ফিল্ডস্ ইন রিলেটিভিটি। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। তাও কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। এর পরের বই ইনট্রোডাক্শন টু ম্যাথমেটিকাল কসমোলজি। এটা আমার প্রথম বইটিরই গাণিতিক সংস্করণ। আমার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা ক্লাসিকাল জেনারেল রিলেটিভিটি। এটা অবশ্য আমার সম্পাদিত একটি বই। এই বইয়ে আমার সঙ্গে সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন ডব্লিউ. বি. বনর এবং এম. এ. এইচ. ম্যাককুলাম।

আ খো: আপনার কেমব্রিজ-পরবর্তী পেশাগত জীবন সম্পর্কে বলুন।

জা ন ই:
পিএইচ ডি শেষে আমি দুবছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড-এ চলে যাই। আমি সেখানে থাকা অবস্থাতেই কেনেডি আততায়ীর হাতে নিহত হন। মেরিল্যান্ড-এর পরে কেমব্রিজে ফিরে আসি
s-hawking.jpg……
স্টিফেন হকিং (১৯৪২)
…….
আবার। তখন আমার গবেষণার বিষয় হয় জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি। এ-পর্বে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমি একনাগাড়ে এই বিষয়ে কাজ করি। সেখানেই পরিচয় হয় স্টিফেন হকিং-এর মত ডাকসাঁইটে বিজ্ঞানীর সঙ্গে। এতে কসমোলজি বিষয়ে আমার আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। মাঝখানে পাঁচ মাসের জন্য আমি আইনস্টাইন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। ১৯৭১ সালে আমি ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্বখ্যাত ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দিই। সেখানেই আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়। সেটা হচ্ছে বিশিষ্ট পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনমেন-এর সঙ্গে পরিচয়। তার সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ কিছু সময় কাটে। তিনি সত্যিই অসাধারণ বন্ধুবৎসল ও পণ্ডিত মানুষ। ফাইনমেন দম্পতি একবার আমাকে সস্ত্রীক নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করেন। তাঁর স্ত্রী আমাদেরকে এটি মেক্সিকান ট্যাপেস্ট্রি উপহার দেন যেটা এখনও এই বাড়িতে আছে। সে যাক, ক্যালটেক থেকে আমি ছ-মাসের জন্য পার্শ্ববর্তী শহর সিয়াটলে যাই। সেখান থেকে আবার ফিরে যাই প্রিন্সটনে। ওখানে পদার্থবিজ্ঞানী ডাইসনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। তিনি আমার কাজের সম্পর্কে প্রথম থেকেই খুব আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এরপর ১৯৭৪ সনে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে এক বছর কিংস কলেজে কাজ করি। সেখান থেকে চলে যাই ইউনিভার্সিটি অফ কার্ডিফ-এ। সেখানে আবার আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে কাজ করা শুরু করি। এখন পর্যন্ত আমি সেটা করে যাচ্ছি। আমার মত এত দীর্ঘ সময় ধরে, প্রায় ৪০ বছর, আর কেউ আইনস্টাইন-উত্থাপিত এই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছেন বলে আমার জানা নেই।

আ খো: স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসলেন কবে?

জা ন ই: ১৯৮১ সালে প্রথমে এক বছরের জন্য দেশে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। তখন ভিসি ছিলেন সদ্যপ্রয়াত প্রখ্যাত josephson.jpg……..
ব্রায়ান ডেভিড জোসেফসন (জন্ম. ১৯৪০)
………
ইতিহাসবিদ ড. করিম। কিছুদিন আগে যিনি মারা গেছেন। তিনি আমাকে তিন হাজার টাকার একটি বিশেষ বেতন-কাঠামোয় নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সিন্ডিকেট তাতে কিছুতেই রাজি হয় নি। তারা আমার বেতন প্রস্তাব করল আটাশ শ টাকা। এক বছর পর বিশেষ পারিবারিক কারণে কিছুদিনের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয় আমার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ছুটি দিচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাই। দুবছর পরে, ১৯৮৪ সালে, আমি ওখানকার বাড়ি-ঘর সব বিক্রি করে দিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসি। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দয়াপরবশ হয়ে আমার বেতন তিন হাজার টাকায় উন্নীত করতে সম্মত হন এবং মাঝখানের দুবছরকে শিক্ষাছুটি হিসাবে গণ্য করেন।

আ খো: দেশে ফিরে আসার পেছনে প্রধান কারণ কী ছিল?

জা ন ই: স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার চিন্তা আমার কখনোই ছিল না। দেশে ফিরে আসার চিন্তাটা প্রথম থেকেই আমার মধ্যে ছিল, এটার ভিন্নতা ঘটে নি কখনোই। আরেকটা দিক হল, বিদেশে আপনি যতই ভালো থাকুন না কেন, নিজের দেশে নিজের মানুষের মধ্যে আপনার যে গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থান r-feynman.jpg…….
রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-১৯৮৮)
……..
সেটা বিদেশে কখনোই সম্ভব না। আমার পক্ষে দেশে ফিরে আসা সহজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল, আমাদের পরিবারের শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি। ফলে অর্থনৈতিক সংগ্রামটা আমাকে করতে হয় নি। তবে, অন্য আরেক ধরনের সংগ্রামের ভিতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। সেটা হল, দেশের বিদ্যায়তনিক ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের সংগ্রাম। এর জন্য সত্যিই আমাকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। এটা অবশ্য খুবই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে, নিজের দেশে থাকতে পারা ও কাজ করতে পারার তো আসলে কোনো বিকল্প নেই। তা ছাড়া, আমি মনে করি আমাদের দেশ সবদিক থেকেই অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ। সেই জায়গাটায় আমি যদি কোনো অবদান রাখতে পারি, সেটা হবে আমার জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। নিজের দেশের প্লেইস-পিপল-থিংস এর সঙ্গে যেভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় তেমনটা তো আর কোথাও, কোনোভাবে সম্ভব নয়।

আ খো: দেশে ফিরে আসার পর পেশাগত দিক থেকে আপনি এখন কতটা সন্তুষ্ট এবং আশাবাদী?

জা ন ই: এ বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি সত্যিই সন্তুষ্ট। cos.jpg………
জামাল নজরুল ইসলামের বই ইনট্রোডাক্শন টু ম্যাথমেটিকাল কসমোলজি
……..
এখানে আমি ‘রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিকাল অ্যান্ড ফিজিকাল সায়েন্সেস্’ নামে একটা উন্নতমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছি। এতে আমরা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করেছি, যেখানে বেশ কয়েকজন নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানীসহ বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা এসেছেন। এ ছাড়া, আমার তত্ত্বাবধানে ২০-২৫ জন ছাত্র ইতোমধ্যে এম ফিল ও পিএইচ ডি করেছে যাদের কাজের মান সম্পর্কেও কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই।

আ খো: আমরা জানি, বিজ্ঞানচর্চার বাইরে দেশের ও আন্তর্জাতিক সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়েও আপনার নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও মূল্যায়ন আছে। সেই দিকগুলোর ব্যাপারে আমরা জানতে আগ্রহী।

জা ন ই: প্রথম কথা হচ্ছে, সব ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমাদের প্রচুর সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৌদ্ধিক-সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য আছে যার সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারি। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমরা সেই উন্নয়নের দিকে যেতে পারছি না। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, dyson.jpg…….
পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান জন ডাইসন
………
আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের ওপর নির্ভরতা। ভারত ও চিন ছাড়া সবটুকু এশিয়া এবং পুরো আফ্রিকাই আজ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের শিকার। আগের মতো সশরীরে তাদেরকে এখন আর আসতে হচ্ছে না। লন্ডন, ওয়াশিংটন কিংবা প্যারিসে বসেই আজকে তারা আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর দখলদারিত্ব বজায় রাখছে। নিজেদের স্বার্থরক্ষাকারী জ্ঞান, বুদ্ধি, পরামর্শ, নানা ধরনের চুক্তি এবং একটি আজ্ঞাবাহী শাসকশ্রেণী তৈরি করে তারা এটা করে চলেছে। আমাদেরকে এই জিনিসটা বুঝতে হবে।

আ খো: বিদেশিদের অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপ আমরা কীভাবে কমাতে পারি বা এর বিরুদ্ধে আমাদের করণীয় কী?

জা ন ই: এক্ষেত্রে আমি আলেকজান্ডার ও ডায়াজেনিসের সেই বিখ্যাত কাহিনীটা মনে করিয়ে দিয়ে বলতে চাই–তোমরা শুধু আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও, আমাদের ভালোমন্দ আমাদেরকেই ভাবতে দাও। আমি মনে করি, এটাই সর্বপ্রথম প্রয়োজনীয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কৃষিতে আমাদের অসীম সম্ভাবনা আছে। pople.jpg…….
জন পোপল (১৯২৫-২০০৪)
……….
কৃষিতে আমাদের যে সম্ভাবনা আছে সেটা দিয়ে আমরা নিজেরা স্বনির্ভর হওয়ার পর এমনকি জি-৮ এর দেশগুলোকেও সাহায্য করতে পারব। নজরুল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই কথাটা অনেক আগেই বলে গেছেন, যাকে আমি আমাদের স্বাধীনতার প্রথম ও প্রকৃত ঘোষণা বলে থাকি। ধূমকেতুতে তিনিই প্রথম বলেছিলেন, বিদেশি ভজনার স্বভাব ত্যাগ করে লড়াই-আন্দোলনের মাধ্যমে বিদেশিদেরকে বিতাড়িত করে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের চাবিকাঠি নিজেদের হাতে তুলে নিতে হবে সম্পূর্ণভাবে। আজকের প্রসঙ্গে সেই চেতনাটাই সবচেয়ে জরুরি।

এহসানুল কবির: কৃষি প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য শুনলাম। আমাদের দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে আপনার মূল্যায়ন কী?

জা ন ই: শিল্পায়নের প্রসঙ্গে আমার সাফ কথা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ-এর ক্ষতিকারক প্রেসক্রিপশন বাদ দিয়ে নিজেদের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা সুষ্ঠু শিল্পনীতি আমাদের প্রণয়ন করতে হবে। আর সেটাকে হতে হবে কৃষিভিত্তিক, শ্রমঘন, কুটিরশিল্প-প্রধান এবং প্রধানত দেশজ কাঁচামাল-নির্ভর। মোটকথা নির্বিচার ও ঢালাও ছাঁটাই কোনো সমাধান হতে পারে না। আমাদের বরং চেষ্টা করতে হবে কুটিরশিল্পের মতো শ্রমঘন শিল্প আরো বেশি করে স্থাপন করে দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার।

এ ক: বিজ্ঞানশিক্ষার উন্নয়নে আমাদের করণীয় কী?

জা ন ই: তত্ত্বীয় ও মৌলিক বিজ্ঞানের মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরে বিজ্ঞানশিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা। অল্প বয়স থেকেই বিজ্ঞানের বিষয়গুলো সম্পর্কে যথাসম্ভব স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা দরকার। এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ভাষা হল মাতৃভাষা। একথা বহু বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং মনোবিজ্ঞানী বলেছেন। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুও একই কথা বলতেন। সবাইকে বিজ্ঞানী হতে হবে এমন কথা কেউ বলে না। কিন্তু ন্যূনতম বিজ্ঞানশিক্ষা সবার জন্য অপরিহার্য। যাদের বিজ্ঞানচর্চার প্রতি ঝোঁক ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ওপর দক্ষতা আছে তারা বিজ্ঞানী হবেন। কিন্তু মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাপক বিজ্ঞানশিক্ষার দ্বারাই বিজ্ঞানসচেতনা গড়ে উঠবে এবং বিজ্ঞানসচেতন একটা জনগোষ্ঠী আমরা পাব। বিজ্ঞানচর্চায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি সার্বিক পরিকল্পনা থাকাটাও অপরিহার্য।

আ খো: শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির ব্যবহার এবং ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

জা ন ই: এটি আজ একটি প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত সত্য যে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। মাতৃভাষার মাধ্যমে যত সহজে ও যতটা পরিপূর্ণভাবে শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে, তা আর অন্য কোনো ভাষার মাধ্যমে সম্ভব নয়। তাই আমি মনে করি শিশুর বিদ্যার্জনের প্রথম পর্যায়ে অবশ্যই মাতৃভাষার ব্যবহার হতে হবে। তার মানে এটা নয় যে, আমরা ইংরেজি শিক্ষাকে অবহেলা করব। আজকের যুগে সেটা হবে আত্মঘাতী। কিন্তু তার জন্য একেবারে শিক্ষার মাধ্যমটাকেই বদলে ফেলতে হবে সেটা কোনো কাজের কথা নয়। এর জন্য শুধু দরকার একটি ভালো ইংরেজি শিক্ষা কার্যক্রম, উপযুক্ত পাঠ্যবই, সুযোগ্য শিক্ষক এবং সেইসব শিক্ষকদের ইংরেজি শিক্ষাদান বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান। কিন্তু আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষার নামে এখন যা হচ্ছে সেটা স্রেফ বেনিয়াবৃত্তি। মূলত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই আজকাল ব্যাঙের ছাতার মত ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয় গড়ে উঠছে। সেখানকার শিক্ষার মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট সংগত কারণ রয়েছে আমাদের। তা ছাড়া, মুষ্টিমেয় কিছু ধনিক সম্প্রদায় ছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠী এগুলোর আওতার বাইরে। ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এবং মূলত বাণিজ্যিক শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীরা ক্রমশ দেশের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থা ধনী-গরিব বৈষম্যকেও বাড়িয়ে তুলছে।

আ খো: আমদের দেশ ও সমাজের সার্বিক ভবিষ্যৎ বিষয়ে আপনি কতটা আশাবাদ পোষণ করেন?

জা ন ই: আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান হতাশাজনক অবস্থা সত্ত্বেও আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আমার এই আশাবাদের ভিত্তি আমাদের জনগণ। আমাদের অত্যন্ত পরিশ্রমী, সৎ ও মানবিকতায় ভাস্বর একটা বৃহৎ সাধারণ জনগোষ্ঠী আছে। এদের ওপর আমি পরিপূর্ণ ভরসা রাখি। আমার বিশ্বাস, এই জনগোষ্ঠী থেকেই একদিন প্রকৃত নেতৃত্বের উত্থান হবে যা আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সত্যিকারের মুক্তির পথে।

চট্টগ্রাম, ২৯/৭/২০০৭

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক সংগঠন বিশদ বাংলার মাসিক মুখপত্র বিশদ সংবাদ-এর অক্টোবর ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত।

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


10 Responses

  1. Mohammad Shakhawat Hossain says:

    জনাব জামাল নজরুল ইসলামের পাণ্ডিত্য এবং দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছি। আমার বিশ্বাস তিনি তার ছাত্রদের মাধ্যমে তার চিন্তা-ভাবনা এবং দেশপ্রেম ছড়িয়ে দিবেন। আমি আশা করি তিনি সমাজ, রাজনীতি এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ে তার সুচিন্তিত মতামতসহ দেশের উন্নতির জন্য তার চিন্তা-ভাবনা পত্রিকায় লেখনীর মাধ্যমে আমাদের অবহিত করবেন। আমাদের ভালো আমাদেরই বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে তাঁকে অবশ্যই অগ্রণী ভূমিকায় দেখার আশায় রইলাম।

  2. রেফাত কিবরিয়া says:

    মুগ্ধ করা এক ব্যক্তিত্ব। অনন্যসাধারণ যোগ্যতা। এঁরা আমাদের দেশের সন্তান ভাবতেই গর্ব বোধ হচ্ছে।

  3. খুব ভাল লাগল বিশ্বমানের এক বিজ্ঞানীর কথা জানতে পেরে, যে কিনা আমারই দেশের। এসব খবর প্রতিদিন না হোক মাসে একবারও যদি আমাদের দেশের পত্রিকার হেডলাইন হত তাহলে অনেকেই আরও অনুপ্রাণিত হত।

    ধন্যবাদ আলম খোরশেদ ও এহসানুল কবিরকে, সুন্দর একটা রিপোর্টের জন্য। অনুরোধ রইল ভবিয্যতে এরকম আরও খবরের।

  4. অনি আলমগীর says:

    আপনার সম্পর্কে অনেকদিন জানার আগ্রহ ছিল। ঝিনাইদহের একজন গর্বিত সন্তান হিসেবে আপনার চিন্তা-চেতনার সাথে পরিচিত হতে পেরে আমি অভিভূত। ভবিষ্যতে আপনাকে নিয়ে আরো অনেক জানতে চাই।

  5. সুভাষ says:

    আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো দু’তিনটা কনফারেন্সে তার সাথে যোগ দেয়ার। কসমোলজি নিয়ে তিনি বক্তৃতা শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না। তিনি খুবই রবীন্দ্রভক্ত। তাঁর প্রতিটি বক্তৃতায় আমি রবীন্দ্রনাথের কবিতা উদ্বৃত করতে দেখেছি। তিনি সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো তাঁর গান শোনার (১৯৯৪).

  6. হাসান says:

    আমাদের দেশেই এত বড় প্রতিভা লুকিয়ে আছে অথচ এঁদের মত বিখ্যাত মানুষদের কোনো খবরই আমরা পাই না। দেশের পত্রিকাগুলোর এইসব প্রতিভাকে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে আরও এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। ডঃ জামাল নজরুল ইসলামের কথাবার্তাতেই বোঝা যায় যেকোন বিষয়েই ওনার দূরদৃষ্টি কতটুকু। ধন্যবাদ এরকম সুন্দর একটা প্রতিবেদন আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য।

  7. ইকবাল says:

    অনন্যসাধারণ যোগ্যতা। জনাব জামাল নজরুল ইসলামের পাণ্ডিত্য এবং দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছি।

  8. Md. Amdad Hossen says:

    আমি অনেক আগে থেকেই প্রফেসর ডঃ জামাল নজরুল ইসলাম-এর ভক্ত। উনার সাক্ষাৎকার পড়ে আবারও অনেক অনেক ভাল লাগল।

    Md. Amdad Hossen

  9. Zahirul Islam says:

    আমি উনার জন্য গর্ববোধ করছি। উনি কোনো অভিযোগ না করলেও আমার আক্ষেপ আছে। আর তা হলো, আমাদের দেশে এমন অনেক প্রফেসর আছেন যারা খুবই পরিচিত এবং নামি দামি (কাগজে-কলমে) কারণ তারা কোনো না কোনো পলিটিকাল দলের সাথে যুক্ত অথচ তাদের মেধা, মনন রিসার্চ, প্রকাশনা বলে কিছু নেই। তাদের আমরা এক নামেই চিনি! অথচ জামাল নজরুল ইসলাম স্যারদের চিনতে আমাদের ইন্টারনেটে সাহায্য নিতে হয়। আমাদের দেশটা তাহলে কীভাবে এগিয়ে যাবে!

    – Zahirul Islam

  10. অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। এমন একটা মানুষের কথা এত পরে শুনলাম, আফসোস হচ্ছে এখন। তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.