আর্টস বৈঠক, চলচ্চিত্র

আর্টস বৈঠক

মেহেরজান বিতর্ক (কিস্তি ১)

admin | 17 Feb , 2011  

rubaiyat-hossain-writer-dir.jpg
মেহেরজান সিনেমার পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন

নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন-এর ‘মেহেরজান’ সিনেমার প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় ১৯ জানুয়ারি ২০১১। স্টার সিনেপ্লেক্সের দুটি হলে প্রিমিয়ার শো দেখানো হয়। ২১ জানুয়ারি থেকে সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া হয় মেহেরজান। মুক্তির সপ্তাহ খানেকের মাথায় ‘মেহেরজান’-এর পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘আশীর্বাদ চলচ্চিত্র’ সিনেমাটি হল থেকে উঠিয়ে নেয়।

মুক্তির এক সপ্তাহের মাথায় হল থেকে কোন একটি সিনেমা নামিয়ে দেওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সেটা হল কর্তৃপক্ষ নামায়। কিন্তু ‘মেহেরজান’-এর ক্ষেত্রে হল কর্তৃপক্ষের সাথে চুক্তির মেয়াদ থাকা অবস্থায় এবং হল কর্তৃপক্ষের আগ্রহ থাকলেও পরিবেশক পক্ষ থেকে সিনেমাটি তুলে নেওয়া হয়। এটি বাংলাদেশের সিনেমা জগতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

poster-meherjaan.jpg
‘মেহেরজান’ সিনেমার পোস্টার

‘মেহেরজান’ সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়ে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত হয়। কিন্তু মুক্তির পরে পরে বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইট, বাংলা ব্লগ ও ফেসবুকে ছবিটি ঘিরে সমালোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ আপত্তি জানিয়ে মানব বন্ধন করেন এবং পত্রিকা মারফতে প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করেন। সমালোচনার জবাবে ছবিটির নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন পত্রিকার মাধ্যমে ছবিটির উদ্দেশ্য ও বিশ্লেষণ হাজির করেন।

আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সমালোচকদের দাবি—‘মেহেরজান’ সিনেমায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে আসা পাকিস্তানী সৈনিকের সাথে বাঙালি এক নারীর প্রেম সিনেমায় দেখানো মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা ঘটায় বলে বলা হয় এবং ‘মেহেরজান’ সিনেমা এই দোষে দুষ্ট বলে তীব্র আপত্তি আসে। বহু সমালোচনা, আপত্তি আসলেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি ওঠেনি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ধরা যেতে পারে। অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে কোন নিষেধাজ্ঞা না আসলেও পরিবেশক পক্ষ থেকেই ছবিটি নামিয়ে নেওয়া হয়।

Bichar-Scene.jpg
মেহেরজান সিনেমার দৃশ্য

‘মেহেরজান’—‘একটি যুদ্ধ ও ভালোবাসার কাহিনী’, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভালোবাসা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন পুরুষ সদস্যের সাথে একজন বাঙালি নারীর ভালোবাসা। ছবিতে আরো এসেছে—১৯৪৭ সালের উপনিবেশোত্তর ভাগাভাগি, ধর্ষণ, বীরাঙ্গণা, সমকামিতার মতো প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে ছবিটির প্রতিক্রিয়ায় পরিষ্কার হলো যে, এই সিনেমা ও এর কাহিনী স্পর্শকাতর। হল থেকে সিনেমাটি তুলে নেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলো।

এই প্রেক্ষিতে আর্টস-এর পক্ষ থেকে সিনেমাটি নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজন করা হয়, বিডিনিউজ২৪.কম-এর ধানমণ্ডি কার্যালয়ে ১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখে। এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে আলোচকবৃন্দ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ, শিল্পকর্মের দায়-দায়িত্ব, ইতিহাস ও সিনেমার (শিল্পের) সম্পর্ক, নারীবাদ, পুরুষতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই বৈঠকের অডিও, ভিডিও এবং আলোচকদের বক্তব্য লিখিত আকারে আর্টস-এ প্রকাশিত হবে। লিখিত বক্তব্য অনলাইনে পড়া যাবে, ভিডিও দেখা যাবে এবং অডিও ডাউনলোড করে কম্পিউটারে বা এমপি৩ প্লেয়ারে শোনা যাবে। আর্টস-এর পাতায়ও সরাসরি অডিও শোনার ব্যবস্থা রাখা আছে।

‘মেহেরজান’ নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন ব্রাত্য রাইসু। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—

    হাবিব খান (সিনেমাটির পরিবেশক ও আশীর্বাদ চলচ্চিত্রের প্রধান)
    ফরহাদ মজহার (কবি, লেখক ও গীতিকার)
    সলিমুল্লাহ খান (শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক)
    পিয়াস করিম (শিক্ষক, লেখক)
    মোরশেদুল ইসলাম (চলচ্চিত্র নির্মাতা)
    জাকির হোসেন রাজু (চলচ্চিত্র সমালোচক ও নির্মাতা)
    ফৌজিয়া খান (লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা)
    সুমন রহমান (কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক)
    ফাহমিদুল হক (শিক্ষক ও লেখক)
    মোহাম্মদ আজম (শিক্ষক ও লেখক)
    মুসতাইন জহির (লেখক)

বিভিন্ন ইস্যুতে আর্টস এ ধরনের বৈঠক নিয়মিত আয়োজন করবে এবং আর্টস-এ সেগুলো নিয়মিত প্রকাশ করা হবে।


বৈঠকের অডিও/ভিডিও ১

বি.দ্র. অডিও/ভিডিও ডাউনলোড করার জন্য নিচের ঠিকানা থেকে মজলিা ফায়ারফক্স অ্যাড-অন ইনস্টল করে নিন।

ফায়ারফক্স অ্যাড-অন: অডিও/ভিডিও ডাউনলোড অ্যাড-অন
অ্যাড-অন লিংক-এ ডাউনলোড করার নির্দেশনা দেওয়া আছে।

আর্টস বৈঠক

মেহেরজান বিতর্ক

অংশ ১

ব্রাত্য রাইসু: আমরা মেহেরজান নিয়া আলাপ শুরু করি তাইলে। পদ্ধতিটা হইছে যে, সবাইর কাছে আমরা কিছু জিজ্ঞেস করবো না। যার কিছু বলার বা আপত্তি থাকবে তারা হাত তুলবেন। প্রথমে আমরা হাবিব খান সাহেবকে বলবো যে উনি ওনার অভিজ্ঞতা এই সিনেমা নিয়া বলার জন্য। সব মিলাইয়া, এখন পর্যন্ত অবস্থা নিয়া।

h-khan.jpg
বৈঠকে বক্তব্য রাখছেন ‘মেহেরজান’-এর পরিবেশক হাবিব খান

হাবিব খান: সিনেমাটার যে ডিস্ট্রিবিউশন আমি নিছি—এটার খুব কমার্শিয়াল আসপেক্ট ভাইবা কিন্তু নেই নাই। আমি যে ডিস্ট্রিবিউশন করি আর কি—সেটা মোর অর লেস ইট’স নট এ কমার্শিয়াল ভেনচার, আমার ডিস্ট্রিবিউশন করার পেছনে একটা কারণ হলো—আমি সিনেমাতে অনেক দিন আছি, একটু ভালো ছবি, একটু অফ ট্র্যাকের ছবি হলে অনেকে রিলিজ করতে পারে না, আমার কাছে আসে, আমি ছবিটা করি। এই হলো আমার ডিসট্রিবিউশনের ধারা। এখন, বাকি কী, মানে এখন?

(ব্রাত্য রাইসু: এই যে হঠাৎ করে সিনেমাটা নামাইয়া দেওয়া হইলো)

হাবিব খান: হঠাৎ করে সিনেমাটা… কোনোদিনও হঠাৎ করে নামেনি। প্রথম কথা হইল—ছয়টা হলে ছবিটা রিলিজ হইছিলো—আমরা নামাইয়া দেই নাই কিন্তু! প্রথম কথা হইলো—ওই এক সপ্তাহ পরে, শুক্রবার রিলিজ হবার পরে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে রিক্যোয়ার্ড সেল তার কাছাকাছি না থাকার কারণেই নিয়মানুযায়ী ওরা ডিসকনটিন্যু করে আমাদের ভাষায়। এইটাও চারটা হল থিকা ডিসকনটিন্যু হয়েছে। আর দুইটা সিনেমা হলে—এই বলাকায় আমি প্রেসার করে রেখেছিলাম—থাকে না ওয়ান টু ওয়ান রিলেশনে—আর স্টার সিনেপ্লেক্সে ছিল, চলতে পারতো। দুইটা সিনেমা হলে ছবিটা চলার একটা… এবং বলাকাতে এই সপ্তাহেই চলতো, আর চলতো না।  সিনেমা কিন্তু ওগুলো কিন্তু নামানো হয় নাই, ওগুলো কিন্তু এমনিই নাইমা গেছে।

(ব্রাত্য রাইসু: আচ্ছা, যেগুলো নামানো হইছে, সেইটা কোনটা তাইলে?)

সেইটা এখন ধরতে গেলে বলাকা আর স্টার সিনেপ্লেক্স।

(ব্রাত্য রাইসু: এটা কি আপনি নিজেই নামাইছেন?)

হ্যাঁ।

(ব্রাত্য রাইসু:কারণটা কী একটু বলবেন?)

হ্যাঁ বলবো।

(ব্রাত্য রাইসু: বলেন।)

আমি যখন ছবিটা রিলিজ করতে গিয়েছিলাম, ছবিটা দেখে আমার ব্যক্তিগতভাবে ভাল্লাগছে। আমার ভালো লাগার কারণেই আমি ছবিটা ডিসট্রিবিউশনে ইনভলভ হইছি, ভালো লাগার কারণে। ছবিটা রিলিজও করছি যে–রিলিজ যে করছি–সেখানেও কিন্তু আমার একটু কষ্ট করতে হইছে। কারণ আমাদের যে অ্যাসোসিয়েশন আছে—প্রযোজক-পরিবেশক সমিতি, ওখানে–তুমি বোধহয় জানো– দুইটা ছবি রিলিজ হলে থার্ড ছবি রিলিজ হতে পারে না। আমি যখন এটা রিলিজ করতে গিয়েছি তখন প্রযোজক সমিতি থেকে এরা বললো যে—ভাই এটা কেমনে, এটা তো হবে না। তো আমি—রুবাইয়াত চাচ্ছিলো ছবিটা এই সময়ই রিলিজ হউক, ওর একটা খুব ইচ্ছা ছিল আর কি। আমি মোটামুটি আমার সমিতির আইন অমান্য করে কাজটা করেছি এবং ওদেরকে বলেছি যে—একটা সুবিধা নেই তোদের কাছ থেকে আমি। সেই সুবিধাটা হইল—দ্যাখ রে আমি ওদেরকে বলছি যে—দ্যাখ, আমি এখন সবচেয়ে, সমিতির মধ্যে সবচেয়ে, সিনিয়র ওয়ার্কিং প্রডিউসার, বয়সের দিক থেকে (বয়সের সুবিধা নেওয়া আর কি)। তো মনে কর, আমি এইটা করলাম–তোরা আমার বিরুদ্ধে ফাইন কর জরিমানা কর, যা খুশি তোরা কর, এইটা আমি করমুই!

তো ওরা বললো যে, আপনি একটা কাজ করলেই… আমাদের ইয়ে হবে না? আমি বললাম যে, তোরা দেখিস না। আমি তো অনেক হল নিচ্ছি না, আমি এই দুইটা হল নিবো–তোরা ই কইরা দে। তো ওরা বললো যে (এরাও তো সব আমার অনেক জুনিয়ার ছেলেপেলে, এছাড়া এতদিন… আমি ফিল্মে মোটামুটি আটিত্রশ বছর যাবৎ আছি–জাস্ট থার্টি এইট ইয়ার্স—তো এতদিন আমি… সমিতিও করতাম টরতাম—তো এরা—বাঙালিদের যা হয় আর কী, কিছু সম্পর্ক, কিছু এই সব মিলাইয়া আর কি!) তো এরা আইসা বলে, আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা দেখলাম না। ওরা দেখলো না। মানে আইনত তারা পারমিশন দিতে পারে না। তারপরও কিন্তু আমি ছবিটা এইভাবে করেছি, তার মানে প্রথম বুঝতে হবে যে ছবিটা রিলিজ করার জন্যে আমার এক্সট্রা অ্যাফোর্ট নিতে হইছে এই ছবিটা রিলিজ করার জন্যে। এই পর্যন্ত আমি ছবিটা রিলিজ করেছি, তারপরে দুইটা হল থেকে আমি ছবিটা নামাইয়া নিছি। এখন ছবিটা নামাইয়া নিছি কেন? আমি দেখলাম যে, আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব—যারা আমার সঙ্গে—

( ব্রাত্য রাইসু: বন্ধু-বান্ধবদের একটু নাম বললে…)

না নাম আমি বলবো না, যারা আমার বন্ধুবান্ধব আছে, যারা মানে, এক পর্যায়ে তো বন্ধুরা আমাকে একজনে রাজাকারই বললো!

(ব্রাত্য রাইসু: আপনার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু তাঁরা?)

Wasim-meher.jpg
‘মেহেরজান’ সিনেমার দৃশ্য

তারা আমারে রাজাকারও বললো… তো আমি বললাম হ্যাঁ, আমি রাজাকারই ঠিক আছে…। তো আর একজন আমাকে বললো যে—যখন প্রেস শোটা হলো, ওই যে প্রিমিয়ার হলো–আমাকে এক… আমি কারো নাম বলবো না… আমাকে এক বন্ধু বললো যে, আপনি ছবিটা রিলিজ কইরেন না। আমি বললাম, ঠিক আছে, করলাম না। কিন্তু আমার একটা ছোট্ট সমস্যা আছে, বলে–কী? আমি বললাম, আমি হলের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করছি একটা, আর একটা প্রোডিউসারের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করেছি, তো এই দুইটা আমি কী করবো? বললো, তাইলে তো অসুবিধা, তার পরে বললো যে, ঠিক আছে। তার পরে একজন ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন জুনিয়র লেকচারার—আমি নাম-টাম বলব না–আমারে ফোন দিছে, বলছে যে এইটা ঠিক না, দেখেন এই ঘটনা! তা আমি বললাম যে ভাই এক কাজ করো, তোমরা এইটারে দেইখো না। এটাকে তোমরা যদি ওভারলুক করো ছবিটা কিন্তু এমনিই কেউ নোটিস করবে না। আর তোমরা যদি এইটা নিয়া ঝামেলা করো তাইলে কিন্তু ছবিটা অনেক… বেশি আলোচনা হবে। একজাক্টলি তাই হইতেছে।

তারপরে তারা তো বললো যে মানববন্ধন করবে কী করবে, আমি বললাম দ্যাখো, এইটা করলে… ছবি কিন্তু এমনিই নাইমা যাইব, এক সপ্তাহে জানবও না লোকে! এই ধরনের ছবির ফেইট কী হয় আমি জানি। তারপরে তো আমি গেলাম একটু কোলকাতায়, শুনলাম যে ওখানে অলরেডি এখানে অনেক সমস্যা ক্রিয়েট হয়ে যাচ্ছে। আমি দেখলাম যে একটা ছবি রিলিজ করে আমার এত বন্ধু-বান্ধব, এত সুহৃদ যারা আছে তাদের সঙ্গে রীতিমতো আমার… আমার ব্যক্তিগত ক্যাম্পও চেইনজ হয়ে যাচ্ছে, আমি বিশ্বাসটাও আমি মোটামুটি নাই আর কি এখানে। মানে টু সাম এক্সটেন্ট আমি আর এদিকে নাই–যেই বিশ্বাস নিয়ে ছিলাম। আমি বললাম, না ভাই, বিশ্বাসটা থাক তাইলে, আমি আমার জাগা থেকে লড়তে চাই নাই। সো, আমি এই জন্য ছবিটা নামাইছি!

(ব্রাত্য রাইসু: কোন দিকে?)

মানে যেই দিকে—আমাকে রাজাকার বানাইতে চাইছিল আমি ওইদিকে থাকতে চাই নাই। তো দেখলাম যে—আমি যেখানে ছিলাম আমি ওখানেই থাকি।

(ব্রাত্য রাইসু: কোন দিকে?)

মানে যেই দিকে… আমাকে রাজাকার বানাইতে চাইছিল আমি ওইদিকে থাকতে চাই নাই। তো দেখলাম যে—আমি যেখানে ছিলাম আমি ওখানেই থাকি।

(ব্রাত্য রাইসু: তাইলে আপনি আপনার মুক্তিযোদ্ধাত্ব বা ঐটা রক্ষা করার জন্যই এইটা নামাইছেন?)

কথাটা বোঝেন, এত কথা শোনার মতো আমার ই নাই, আমি দেখলাম যে আমি কী করবো? আমি এটা নিতে পারি নাই। আমার কাছে খুব ভালো লাগে নাই। এত লোক অসন্তুষ্ট হচ্ছে কেন? তাইলে আমার দেখাটা ভুল। আমিও তো, আমি নিজেও তো ভুল হইতে পারি। আমি দেখলাম যে—তাইলে বোধ হয় আই হ্যাভ ডান সামথিং রং! ও [মোরশেদুল ইসলামকে দেখিয়ে] একটু আগে আমাকে আন-অফিশিয়ালি জিজ্ঞেস করছে ছবিটা আপনি দেইখা নেন নাই। আমি বললাম, দেইখা নিছি! তো বলে, দেইখা নিলে নামাইলেন ক্যান? এই প্রশ্ন তো আমি নিজেরেও করতেছি এখন। আমি যদি জানতাম যে, এই প্রশ্ন আমারে করবে, তাইলে তো আমি ছবি রিলিজই করি না।

২.

ব্রাত্য রাইসু: তো এখন এই ছবির ব্যাপারে আমি প্রথম বলবো যে—আপনাদের যাদের আপত্তি আছে বা দেখার ক্ষেত্রে মনে করেন যে এই ছবির কাহিনীর মধ্যে বা এটার যে উপস্থাপনের মধ্যে আপত্তি আছে—সেইগুলি যদি বলেন আপনারা, যিনি বলতে চান প্রথমে, কে বলবেন?

mors-islam.jpg
বক্তব্য রাখছেন মোরশেদুল ইসলাম

মোরশেদুল ইসলাম: আমি বলি তাইলে।

(ব্রাত্য রাইসু: হ্যাঁ বলেন। মোরশেদ ভাই, নামটা বইলা নিয়েন।)

আমি মোরশেদুল ইসলাম, চলচ্চিত্র নির্মাতা। আপনার সঙ্গে হাবিব ভাই আমার, ছবির প্রিমিয়ার শোর পরের দিনই সম্ভবত কথা হইছে টেলিফোনে। তখন আমি ভুলে গেছি, ফোন রেখেই মনে হইছে যে আমি হাবিব ভাইকে এই কথাটা জিজ্ঞেস করবো ভাবছিলাম, করলাম না কেন—যে কেন আপনি ছবিটা রিলিজ করলেন? মানে আমার কথা সেইখানেও থাকতো যে ছবিটা কেন আপনি রিলিজ করলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে? কিন্তু ছবিটা যখন রিলিজ করলেন, তখন কিন্তু সেটা আবার নামানো—আমি সেটার বিরোধিতা করি। এটা আমি বলে নিচ্ছি, সবাইকেই। আমার স্ট্যান্ড আর কি—যদি সেন্সর বোর্ডও ছবিটা নিষিদ্ধ করতো, আমি একইভাবে প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু ছবিটার ব্যাপারে আমার যেটা বক্তব্য—হচ্ছে যে, আসলে বিতর্কগুলো আসছে সেগুলি খুবই—মানে বিভিন্ন রকমের বিতর্ক আসছে। এবং আমাদের একই মানসিকতার লোকজন আবার কেউ পক্ষে বলছে, কেউ বিপক্ষে বলছে।

(ব্রাত্য রাইসু: এটাএকই মানসিকতাটা কী একটু বলবেন?)

একই মানে, যারা নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে–আমি মনে করি। তাদের অনেকেই আবার এটার পক্ষেও যুক্তি দেখাচ্ছে। যেমন আমি ফাহমিদুলের লেখাটাও পড়লাম। যদিও লেখাটা খুবই জ্ঞানগর্ভ লেখা—খুব একটা আমি বুঝতে পারি নাই।

আচ্ছা এখন, আমার বক্তব্য হচ্ছে ছবিটার বিষয়ে, ছবিটা খুবই দুর্বল ছবি–মেকিং খুবই দুর্বল, চিত্রনাট্য খুবই দুর্বল, চরিত্রগুলোও খুব দুর্বল। এবং অভিনয় অংশ তো খুবই দুর্বল। মানে মেইন কাস্টগুলো ছাড়া বাকি চরিত্রগুলোর অভিনয় খুবই দুর্বল। এখন কনটেন্ট নিয়ে যদি আমি বলি—এখন মূল যে কনটেন্ট নিয়ে সবাই আলোচনা করছে—এইটার ব্যাপারে আমার খুব একটা আপত্তি নাই। তারপরও আমি বলবো যে, ধরেন এই যে মেয়েটা—মানে একজন পাকিস্তানি আর্মির সাথে একজন বাঙালির মেয়ের প্রেম। এখন সেই পাকিস্তানিটাকে তো কিন্তু সেই পজিটিভ ওয়েতেই দেখানো হয়েছে। পাকিস্তানি সোলজারটাকে। সে তার বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে পক্ষ ত্যাগ করেছে, এক অর্থে, দেখছি। তো এইটা তো খুবই—ঠিকই আছে। এবং আমরা কিন্তু বিভিন্ন ছবিতে দেখি, পৃথিবীর বিভিন্ন ছবিতে দেখি… যুদ্ধ নিয়ে যেসমস্ত ছবি হয়েছে—বহু ছবিতে এই বিষয়টা এসছে, মানবিক ব্যাপারটা এসছে, ইন্ডিয়ান ছবিও আছে—ভীরজারা যদি বলেন বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের উপর অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ছবি হয়েছে, যেইখানে আমরা শত্রুপক্ষকে দেখি যে এইরকম।

এখন সেই ছবিগুলোকে কিন্তু আমরা বলি তখন ‌’যুদ্ধবিরোধী ছবি’ এবং যুদ্ধবিরোধী মানবতার ছবি আর কি। যুদ্ধবিরোধী ছবি মানেই কিন্তু মানবতার ছবি, কারণ যুদ্ধকে আমরা সবাই অপছন্দ করি, যে কোনো যুদ্ধ–দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বলেন বা পাকিস্তান-ইন্ডিয়ার যুদ্ধ বলেন। সেটা আমরা অপছন্দ করি বলেই যুদ্ধবিরোধী ছবি আমরা পছন্দ করি কিন্তু যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ এক জিনিস না। ঠিক আছে? মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে এমন একটা যুদ্ধ যেটা আমরা প্রয়োজনের তাগিদে করি এবং যেটা না করে আমাদের উপায় নাই–মুক্তির জন্য যুদ্ধ। সুতরাং যুদ্ধবিরোধী ছবিতে এই ধরনের বিষয় আসতে পারে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে এই ধরনের বিষয় আসলে আমরা সেটাকে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছবি বলবো, সহজ কথায়। আচ্ছা, এখন কথা হচ্ছে যে, এই ধরনের ঘটনা কি ঘটে নাই। ঘটেছে হয়তো, বাংলদেশেও ৭১-এ হয়তো দু /চারটা বিরল উদাহরণ আমরা খুঁজলে হয়তো পাবো। কিন্তু, সেগুলো কিন্তু বিরল, সেগুলো হচ্ছে–মানে ব্যতিক্রম। এখন আমরা ছবিতে কী দেখাবো–আমরা কি এই ব্যতিক্রমগুলো আমরা হাইলাইটেড করবো কি না এইটা হচ্ছে বিষয়। ঠিক আছে? তো সেইটা আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে করা উচিৎ না। সেই জন্যেই হয়তো ছবিটা নিয়ে বিতর্ক বেশি হচ্ছে। কিন্তু আমি আবার এটাও বলবো যে, এখনকার প্রজন্ম কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে দেখছে, বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করেছি, আমাদের যেই দেখার মধ্যে যে আবেগ—সবকিছু আছে তারা কিন্তু অনেকটা নিরাবেগভাবে, অনেকটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে, নানাভাবে বিশ্লেষণ করবে–এইটাই খুব স্বাভাবিক। সুতরাং তার ছবিতে এই জিনিসটাও আসতে পারে, আমরা তো আসবে না আসবে না করে কতদিন আর, আসতেই পারে! সেখানেও আমার আপত্তি নাই, যদি, অন্য বিষয়গুলোতে যদি, ছবির অন্য বিষয়গুলোতে যদি মুক্তিযুদ্ধকে মহিমান্বিত করা হতো। বা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবটাকে যদি প্রকৃত অর্থে তুলে ধরা যেত, তাহলে এই ব্যতিক্রম বিষয়টাও আমরা মেনে নিতাম, দর্শক হিসেবে। সেইখানেও পরিচালক কিন্তু ফেইল করেছেন এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে ফেল করেছেন।

Victor-Banerjee-as-Nanajaan.jpg
‘মেহেরজান’ সিনেমার দৃশ্য

আমরা যদি লক্ষ করি—যে—ছবিতে টোটাল মুক্তিযুদ্ধকেই, মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে আমরা একেবারেই খুঁজে পাইনি, আমরা যারা—মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের কিছুটা যাদের আছে। যেই গ্রামটা দেখানো হইছে—সেই তিনটা মেয়ে—তারা যেই আচরণ করছে বা সেই ভিক্টর ব্যানার্জি যে চরিত্রটা করছে—সেই চরিত্রটা তো—চরিত্রটাই কী সেটাই বোঝা গেল না কিছু, তাই না? এই সব মিলিয়ে এবং যে, গ্রামের যে আবহ সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে রিপ্রেজেন্ট করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো এরকম ছিল না। মুক্তিযোদ্ধা যে দু’এক জনকে দেখানো হয়েছে ছবিতে—সেই দুইটা চরিত্রকেই কিন্তু অনেক ইয়ে করা হয়েছে মানে সেই চরিত্রগুলো কিন্তু—মানে কী বলবো—সেই চরিত্রগুলো খুবই দুর্বল। একজন যেমন মার কাছে বলে যাচ্ছে যে—আমি যুদ্ধ করতে যাই, মা। মা কান্নাকাটি করছে—না যাইস না!

এই ধরনের ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটেনি কিন্তু যে, মার কাছে বলে যাচ্ছে এবং মা কান্নাকাটি করছে। হয়েছে কখন—হয়েছে—মাকে বলে গেছে যখন মাও ছেলেকে উদ্বুদ্ধ করেছে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। আর নতুবা করেছে কী—চিঠি লিখে হয়তো গেছে। আচ্ছা, তারপরে আবার গেল যুদ্ধে, মাঝপথে আবার ফিরে আসলো–কী বলছে ডায়লগে যে, ‘যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত’ তার মানে বিয়ে করতে চাচ্ছে, যুদ্ধের সময়ই। তো মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রগুলোকে খুবই…

(ব্রাত্য রাইসু: আদর্শ চরিত্রগুলা?)

হ্যাঁ–হ্যাঁ—সেগুলোকে খুবই ইয়ে ভাবে দেখানো হয়েছে। এটা হচ্ছে আমার প্রথম অবজার্ভেশন। তারপরে ছবির যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র হচ্ছে–যেই মেয়েটা ধর্ষিতা হলো। এখন যেই মেয়েটা ধর্ষিতা হলো তার চরিত্রকে কিন্তু খুবই–মানে কীভাবে পোট্রে করেছে দেখেন। তার চরিত্র দেখার পর একজন দর্শক হিসেবে আমার কিন্তু তার প্রতি বিন্দুমাত্র সিমপ্যাথি বা শ্রদ্ধাবোধ জাগে নাই– একজন বীরাঙ্গনা হিসেবে। তার যে চালচলন, পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে এভরিথিং–সবগুলোতেই সেই চরিত্রটা কিন্তু… এখন পরিচালক হয়তো বলছে বা এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা বলবে হ্যাঁ আমরা যারা ধর্ষিতা হয়েছে তাদের সবসময় দেখে এসেছি নরমভাবে দেখাতে, সেটা না, আমাদের চরিত্রটা অনেক স্ট্রং দেখাতে চেয়েছি আমরা ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ট্রং মানে কিন্তু বা আধুনিকতা মানে কিন্তু এই নয় আর কি। এবং সে আর একবার বলছে যে ছাত্র ইউনিয়ন করত সে এবং তার এই অভিজ্ঞতা এই প্রথম না—তাই না? এগুলো কী! এগুলো কেন এসছে বা কী জন্য এসছে? এটা করে কিন্তু তাকে যে, সে যে রেইপ্ট হলো পাকিস্তানী আর্মি দ্বারা—সেই জিনিসটাকে আরো নরম মানে হালকা করে ফেলা হলো। এবং সেই চরিত্রটাও আমাদের মনে কোনো দাগ কাটতে পারে নি এবং সেই চরিত্রটা এবং বীরাঙ্গণা—প্রকৃত অর্থে যারা বীরাঙ্গণা আমাদের তাদের প্রতি মানুষকে, বর্তমান প্রজন্মকে ভুল বার্তা দেবে… বা তাদেরকে হেয় করা হয়েছে বলে আমি মনে করি।

তো এই সব মিলিয়ে আমার কাছে ছবিটা আপত্তিকর মনে হয়েছে, আমি যদি বলি আপত্তিকর—

pk_1.png

ভিডিও ধারণ ও অনুলিখন: প্রমা সঞ্চিতা অত্রি


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


43 Responses

  1. আদনান সৈয়দ says:

    আমার আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়কালীন এক পাকিস্তানি বন্ধু ছিল, নাম ইমরান। একদিন বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত একজন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন নিয়ে এলেন (আহমেদ রেজা) এবং আমার সাথে তার খুব বন্ধুত্ব হল। একদিন রেজার সাথে আমি আমার পাকিস্তানি বন্ধু ইমরানের পরিচয় করে দিলাম। তারা পরস্পর হাই হ্যালো বলল এবং ইমরান আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। চলে যেতেই এবার রেজা আমার উপর চড়াও হল। “তুই শালা কেমনে এই পাইক্কা রাজাকারের সাথে বন্ধুত্ব পাতাইলি? তোর কি বিবেক বলতে কিছু নাই?” এই বলে সে তার হাতটা বাথরুমে গিয়ে ভালো করে সাবান দিয়ে ‍ধুয়ে এল। কারণ এই হাত দিয়ে সে নাকি সেই রাজাকার পাইক্কার সাথে করমর্দন করেছিল। সেই সময় আমি রেজার এই রেডিক্যাল মনোভাব দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তার বছর ছয়েক পর রেজার সাথে নিউইয়র্কে দেখা। দেখি তার সাথে ফুটফুটে একটা সুন্দরী বউ। দেখে বাঙালি মনে হল না। আমি খুব উৎসাহ নিয়ে তার বউয়ের দেশ কোথায় জানতে চাইলাম। কিন্তু রেজা তখন দেখি মুখ কাচু-মাচু করে বসে আছে। শেষ পর্যন্ত সে বলল যে ও এসেছে পাকিস্তান থেকে। রেজা যখন নিউজার্সির একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় তখন এই মেয়ে ছিল তার ক্লাসের ছাত্রী। তখন থেকেই তার সাথে চেনাজানা-প্রেম-ভালোবাসা এবং বিয়ে। রেজার ধারণা তার বউয়ের মত এত গুণ পৃথিবীর আর কোনো মেয়ের নাই। তখন আমি রেজাকে সুযোগ মত সেই আগের কাহিনীটা মনে করিয়ে দিলাম। “মনে আছে দোস্ত, তুই ইমরানের সাথে করমর্দন করে তোর হাত ধুইছিলি কারণ সে ছিল পাকিস্তানি? আর এখন তো ঠিকই সুন্দরী পাকিস্তানি বউ নিয়া ঘুরো!” রেজা সে কথার কোনো ‍উত্তর দিতে পারে নাই। ‍উপরের উদাহরণটা দিয়ে আমি যে কথাটা বলতে চাই যে আমাদের দেশের মানুষ মেহেরজান সিনেমা নিতে পারে নাই ‍দুটো কারণে।

    ১. আমরা পাকিস্তানিদেরকে এখনো স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। আমরা পাকিস্তানি মানেই রাজাকার মনে করি। এটা দোষের কিছু না। এখনো আইরিশরা বৃটিশদেরকে দেখতে পারে না। যুদ্ধ থেকে শুরু কর একটা দেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস এ ক্ষেত্রে খুব জরুরী একটা বিষয়। বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের নয় মাসের যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকিয়ে যায় নি। আর সে কারণেই আমাদের মানসিকতায় পাকিস্তানী একটা নায়ককে জায়গা দিতে পারি নাই। যে পাকিস্তানিরা আমাদের দুই লক্ষ মা-বোনদের ইজ্জত নিয়েছে সেই পাকিস্তানিদের আমরা নায়কের জায়গায় দেখতে চাই না। বা দেখার মত মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি।

    ২. চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম-এর কথায় আসা যাক। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে সিনেমাটা চলচ্চিত্র শিল্প হিসেবে কতটুকু সার্থক হয়েছে। যতদূর জানি ছয় কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা এই মেহেরজান সত্যিকারভাবেই কি সেই শিল্পিত জায়গাটায় পৌঁছতে পেরেছে? এর চরিত্রগুলো সত্যি কি মানুষের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য হতে পেরেছে? সব মিলিয়ে একটা সিনেমায় যে সব প্রধান প্রধান উপাদান থাকে যেমন গল্প, অভিনয়, পরিচালনা, শব্দ, সঙ্গীত, আলো, ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে এর গ্রহণযোগ্যতা সব মিলিয়ে সিনেমাটা কি সত্যি একটা পাতে দেওয়ার মত সিনেমা হতে পেরেছে?

    আর্টস এ ধরনের আরো কাজ করুক সেটাই প্রত্যাশা।

    নিউইয়র্ক

  2. আজমল says:

    দেরি না কইরা বাকিটা দ্যান তো।

  3. মনজুর আলম সিদ্দিকী says:

    প্রিয় বন্ধুরা
    শুভ কামনা করছি সকলের। আমি আলোচনাটি গভীর ভাবে পড়েছি। আমাদের সৌভাগ্য যে, একটি বাংলা সিনেমাকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হচ্ছে। এটিও হয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্মিত হয়েছে বলে। আমি আলোচনার সবকিছুই পজিটিভ ভাবে দেখছি। স্বাধীন মতামত প্রকাশ করাই চলচ্চিত্রের ভাষা। সারা পৃথিবীতে তাই হচ্ছে। যারা সমালোচনা করছেন তারা অনেক ভালবাসা থেকেই করছেন। রুবাইয়াত তার ডিফেন্সিভ যুক্তি-তর্কে তার নির্মান কে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করবে এটা স্বাভাবিক, আমি এটাকে আরো পজেটিভ মনে করছি। এটাতো ঠিক তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে রুবাইয়াত আমাদের দেশের সম্পদ। আমরা চাই রুবাইয়াত সমালোচনার চরম ঝড় মোকাবেলা করে উতরে যাক। এই আলোচনা-সমালোচনা বন্ধ করা যাবে না। তাহলে আমাদের দেশে আর ভালো নির্মাতা, নির্মাণ হবে না। সমালোচনা করা ও গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরী হলে এবং আমরা অভ্যস্থ হতে পারলে দুনিয়ায় আমাদের নাগাল পায় কে?
    আমি মনে করি হাবিব সাহেব-এর এখানে কোন দায় নেই। এটি নির্মাতার নির্মাণ কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার, আর যে দর্শকদের জন্য নির্মিত হয়েছে তারা গ্রহণ না করলে বুঝতে হবে সিনেমাটি যৌক্তিকতা পায়নি।
    ধন্যবাদ।

  4. গীতা দাস says:

    আদনান সৈয়দ,
    একজন সাধারণ নাগরিকের একজন পাকিস্তানী নারীকে বিয়ে করা আর একটা সিনেমায় ইতিহাসকে খেলো ভাবে উপস্থাপন এক নয়। এ প্রসঙ্গে মোরশেদুল ইসলামের একটি উদাহরণই যথেষ্ট।

    ”ছবির যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র হচ্ছে–যেই মেয়েটা ধর্ষিতা হলো। এখন যেই মেয়েটা ধর্ষিতা হলো তার চরিত্রকে কিন্তু খুবই–মানে কীভাবে পোর্ট্রে করেছে দেখেন। তার চরিত্র দেখার পর একজন দর্শক হিসেবে আমার কিন্তু তার প্রতি বিন্দুমাত্র সিমপ্যাথি বা শ্রদ্ধাবোধ জাগে নাই– একজন বীরাঙ্গনা হিসেবে।”
    কাজেই …………

  5. সামিম উল মওলা says:

    আমার একটিই জানার বিষয় আর সেটা হলো একজন পাকিস্তানি সৈন্যের সাথে প্রেম করা একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধের আগুনঝরা সময়ে এবং সেই কাহিনি নিয়ে আবার ছবি (থিসিসও নাকি করেছেন!) করা হাইপোথিটিক্যালি অসম্ভব না হলেও তা বাস্তব বিচারে কম পক্ষে ৫৬ হাজার ৩৭ তম বা ৭৮ হাজার ২৩ তম বা ওই জাতীয় ক্রমানুসারে পড়ে কিনা সে ব্যাপারে আমি রুবাইয়াত হোসেনের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করছি! তার আগে আমি জানতে চাই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কখনো দেখেছেন বা জেনেছেন? তাদের নিয়ে সার্থক ছবি কয়টা হয়েছে? তিনি তার এই দারুণ প্রতিভা অন্ততঃ এই দেশের জন্যে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্যে ব্যবহার করলেন না কেন?

  6. সামিম উল মওলা says:

    আরো একটা খুব বাজে কথা শুনছি যা বার বার বলা হচ্ছে এই ছবিটিকে হালাল করার জন্যে, আর তা হল দর্শকরাই নাকি সিদ্ধান্ত নেবেন যে ছবি চলবে কিনা! তাহলে দর্শকদের রুচি বিনির্মাণে নির্মাতাদের দায়িত্ব কোথায় গেল? নির্মাতাদের সামাজিক ও অন্যান্য কমিটমেন্ট কোথায় গেল?

  7. আসিফ ইকবাল says:

    আমি মোরশেদুল ইসলামের সাথে একমত। যদিও আমি চলচ্চিত্রটি দেখিনি, কিন্তু প্রোমোর ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছে, বাস্তবতার বাইরে কিছু জিনিস আছে, যা সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলো না। এছাড়াও, কাহিনীর কিছু অংশ পড়লে মনে হয়, নিছকই মনোযোগ টানার চেষ্টা। মেকাপ-গেটাপ দেখলেতো মনে হয়, ২০১০ সালে কাহিনী। আর্টসকে ধন্যবাদ।

  8. Anam says:

    আলোচনা চলতে থাকুক।

  9. Sariful Islam says:

    ফাহমিদুল হক কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক?
    যদি তাই হন, আমি যতদূর জানি তিনি এখনও অধ্যাপক হননি..

    [এখানে পেশাগত অর্থে ‘অধ্যাপক’ দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ তিনি অধ্যাপনা করেন তাই ‘অধ্যাপক’। প্রাতিষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেয়া হয়নি।–বি.স.]

  10. লিমন says:

    মেহেরজান ছবিটার একটা উর্দু ভার্সন বের করুন। পাকিস্তানে রিলিজ দেন, তাহলে বুঝতে পারবেন সিনেমাটা আসলে কাদের জন্য বানানো হয়েছে–পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশ। মেহেরজানের পরিচালক তরুণ সমাজের যে অংশটি নষ্ট হয়ে গেছে, তারই প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

  11. সামিমুল মওলা says:

    রুবাইয়াত হোসেন,

    আসলে আপনি প্রখ্যাত বৃটিশ লেখক সমারসেট মমের দি আনকঙ্ক’ড কপি করতে গিয়েছিলেন, অধিকৃত ফ্রান্সে হ্যান্স নামের জার্মান সৈন্যর দ্বারা রেপড হয় এক ফরাসী যুবতী, হ্যান্স যুবতীটিকে ভালোও বেসে ফেলে। যুবতীটি কিন্তু ভালোবাসার ফসল, বাচ্চাটাকে মা হয়েও মেরে ফেলে–এবং ওটাই ছিল তার চরম প্রতিবাদ! আপনি সে ধরনের কিছুই পারেন নি, কারণ ওটার জন্যেও লেখাপড়ার দরকার আছে আর দরকার আছে প্রতিভার।

    একগাদা টাকা কেন নষ্ট করলেন?

  12. শাকিল বিন মুশতাক says:

    অপেক্ষা করছি, আলোচনার বাকি অংশের জন্য।

  13. নাঈম হাসান says:

    আমি মোরশেদুল ইসলামের সাথে একমত। ছবিটির পরিচালক হয়ত প্রথম ছবিতেই নাম কামাতে চেয়েছিলেন, নয়ত মুক্তিযুদ্ধের মত একটি প্রেক্ষাপট যা আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব ও চেতনা জুড়ে আছে, তা নিয়ে এরকম এক্সপেরিমেন্ট করার কী অর্থ হতে পারে। আর পরিচালক যুদ্ধের মূল বিষয়কে পাশ কাটিয়ে প্রায় কাল্পনিক এক কাহিনির অবতারণা করেছেন যার সাথে বাস্তব প্রেক্ষাপটের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না, আর মুক্তিযুদ্ধের মত বিষয়ের বেলায় তা আরো সত্য, লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত এক পাকিস্তানি সৈন্যের প্রেমে চাপা পড়ে যাবার বা ভুলে যাবার নয়। উনি তার মনে যেটা ভালো লেগেছে সেটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, যাকে বলা হয় ‘সিলেকটিভ পারসেপশান’। তবে আমরা আরেকজন তসলিমা নাসরিন চাই না, আমরা চাই এমন মানুষ যারা উন্নত মানের কাজ দিয়ে খ্যাতি অর্জন করে নেবেন, শস্তা খ্যাতির পিছনে না ছুটে। বিডিনিউজ২৪-কে ধন্যবাদ বিষয়টি উত্থাপনের জন্য।

  14. azmal says:

    আমার জানা মতে মোহাম্মদ আজম এখনো অধ্যাপক হন নাই। তাকে ভুল ডাব করা হয়েছে এখানে। সংশোধনের অনুরোধ রইল।

    [সিরাজুল ইসলাম (আগের মন্তব্যকারী) ও আপনার পরামর্শে বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য পেশাগত পরিচয় হিসেবে ‘অধ্যাপক’কে ‘শিক্ষক’ করা হল।–বি.স.]

  15. sharma Ojha says:

    মেহেরজান নিয়ে অনেকদিন ধরেই বিতর্ক হচ্ছে। তাই আর যোগ না দিয়ে পারলাম না। আমি এ প্রজন্মেরই ১জন। ছবিটি দেখে আমি–কারো লেখা বা কারো দ্বারা–প্রভাবিত না হয়েই…যেটা আমার মনে হয়েছে:

    ১। ছবিটা নির্মাণের দিক থেকে শিল্পবোদ্ধাদের চোখে হয়তো খুব উন্নত মানের হয়নি। কিন্তু সাধারণ জনগণ যারা শাকিব খানের বাংলা সিনেমা দেখে বা মধ্যবিত্ত দর্শক যারা হিন্দি ও ইংরেজী সিনেমা দেখে চোখ পাকিয়েছে এবং তার সাথে প্রতিনিয়ত বাংলা সিনেমাগুলির মেকিং তুলনা করতে থাকে, তাদের কাছে এই ৬ কোটি টাকা দামের ছবির মেকিং মোটামুটি সন্তোষজনক। তারপর আমাদের বাঙ্গালিদের মাঝে ব্যয় নিয়ে ১টা বিশেষ বদগুণ আছে। এটাই সম্ভবত বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাজেটের ছবি। এটা জানার পর ছবি ভাল হোক, খারাপ হোক একটু নাক উঁচু ভাব নিয়ে দেখে নেবেই। ঐ যে ছেঁড়া জিন্সগুলোর মত। যতই ছেড়া হোক, দাম বেশি আর ব্রান্ডের হলে তো কোন কথা নেই,ফ্যাশনের দোহাই দিয়ে কিনে নেই আমরা।

    ২। যাহোক, তবুও ভুল কিছুটা চোখে পড়ার মতই–যারা মোটামুটি সিরিয়াসলি সিনেমা দেখে, ভাবে। পোশাক নির্বাচন ঠিক হয়নি। এখানে স্পষ্ট–পরিচালক রুবাইয়াত শাকিব খানের ছবির পরিচালকের মতই দর্শক টানতে চেয়েছেন। পার্থক্য ১টাই। শাকিব খানের পরিচালক আজেবাজে পোশাক পরান আর রুবাইয়াত মোটামুটি চলতি পোশাকেই নায়ক এবং নায়িকাকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। কারণ ৭১ এর ১টা গ্রাম্য বা যতই শহুরে মেয়ে হোক না কেন তার পোশাকের সাথে আজকালকার মেয়েদের পোশাক একমাত্র শাড়ী ছাড়া আর কোথাও মিল নেই। তাই আনস্মার্ট লাগাটাই স্বাভাবিক ছিল। তবে সেটা দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার দ্বায়িত্ব অভিনেতাদের ও পরিচালকের। তারা তাদের ব্যক্তিগত শিল্প দক্ষতা দিয়ে সহজেই সেটা ঢাকতে পারতেন। আমার মনে হ্য় রুবাইয়াত যিনি চলচ্চিত্রে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, তার জন্য এই ভুল বড় ধরণের ব্যর্থতা। কারণ এ পর্যন্ত যত চলচ্চিত্র আমরা দেখেছি যার কাহিনীতে ইতিহাসের এক বিন্দু ছোঁয়াও আছে, সেখানেই সব পরিচালককে বাধ্য হয়ে পোশাকের ব্যাপারে মনোযোগী হতে হয়েছে। হোক সেটা হলিউড কিংবা বলিউড। তাহলে ঢালিউড কেন নয়? আর যেখানে আন্তর্জাতিক উচ্চতায় নিয়ে যাবার প্রয়াস থাকছে-ই প্রযোজক ও পরিচালকের!

    ৩।বুঝলাম কাহিনীতে প্রেমকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু গুরুত্ব দেয়া আর কোনো কিছুকে ছোট করে অন্য কিছু বড় করা ঠিক নয়। কোন কিছুকে বড় করে দেখানোর জন্য অন্য কোন অনুভূতিতে আঘাত দেয়া কী ঠিক? পরিচালক প্রেমকে বড় করে দেখাতে গিয়ে যে দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখিয়েছেন এবং তাদের মুখে যে কথা তুলে দিয়েছেন তা সত্যি-ই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য অপমানদায়ক। এখানে কয়েকটি এ ধরণের চলচ্চিত্রের কথা তুলে না ধরলেই নয়। যেমন ড:জিভাগো। সেখানেও একজন ব্যক্তির প্রেমিক ও কবি সত্তাকে রাশিয়ার বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে মুখ্য করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও কী নায়কের মুখে সেধরণের কোন ডায়ালগ দেয়া হয়েছে যা বিপ্লবের বিপক্ষে যায় বা তাকে বিন্দুমাত্র ছোট করে? সত্যিই এটা ‘মেহেরজান’ এর পরিচালক ও কাহিনীকারের মানসিক বা দক্ষতাগত দারিদ্র্য ছাড়া আর কী বলব!

    ৪। আমি মোরশেদুল ইসলামের সাথে একমত। বীরাঙ্গণা চরিত্রটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা আমাদের হৃদয় ও মস্তিষ্ক কোনোটিই টানে না। অথচ, এদের মর্যাদা রক্ষায় আজও আমরা লড়ে যাচ্ছি। শুধু নীলাকে নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ে শিশু থেকে পূর্নাঙ্গ নারীকে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানীর সম্মুখীন হতে হয়। সেটা ৭১ এর আগে যেমন ছিল এখনও আছে। কিন্ত ৭১ এ যেটা হয়েছে সেটার সাথে স্বাভাবিক সময়ের তুলনা করে অন্যায় করেছেন পরিচালক নীলার মুখে এই ডায়ালগ তুলে দিয়ে, “এটাই আমার প্রথম নয়।” তার মানে সে যখন ছাত্র ইউনিয়ন করত তখন ও তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। কিন্ত একটি দেশে যখন সিভিল ওয়ার চলে তখন সে দেশের একজন নারীর বিদেশী সৈন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়া আর স্বাভাবিক সময়ে এই বর্বরোচিত অপরাধের শিকার হওয়া একই মানদন্ডে বিচার হতে পারে না। সেই সেন্সটুকু পরিচালকের থাকা উচিত ছিল।

    ৪। আরেকটা বিরাট ভুল আছে যেটা বিজ্ঞান বা মানুষের মনস্তত্ত্বের সাথে যায় না ঠিক। ধরলাম, মেহেরযানের জায়গায় আমি। আমার ভাই যুদ্ধে গেছে। প্রতিদিনই শুনছি ও দেখছি যুদ্ধে পাকি সৈন্যের বর্বরতা, ভয়াবহতা। সবচেয়ে বড় বিভীষীকা দেখছি যখন আমার বোন, যাকে দেখি আমার সবচেয়ে কাছ থেকে এবং ভালবাসি নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি, তাকে পাকিরা তুলে নিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে নোংরা কাজটি করেছে। তখন আমি কী স্বাভাবিক থাকবো? আমার মনোজগতে কী একটু ঘৃণার ঝড়ও উঠবে না পাকিদের বিরুদ্ধে? উঠবে নিশ্চিতভাবেই, এটাই মানুষের মনস্তত্ত্ব। প্রেম যতই আসুক, এই মনস্তত্ত্বকে ডিঙিয়ে আসতে পারে না।

    ৫। একটা ভুল আমার কাছে মনে হয়েছে তথ্যগত। আমরা জানি, পাকি সৈন্য তৎকালীন (১৯৭১) সময়ে বিশ্বকাঁপানো নিষ্ঠুর সেনাবাহিনী হিসেবে কুখ্যাতি কুড়িয়েছিল। তার মাঝে আবার বেলুচ সৈন্যদের বিশেষ কুখ্যাতি ছিল অশিক্ষা ও বর্বরতায়। সে বিচারে এই নায়ককে বেলুচ, শিক্ষিত ও মানবিক বোধসম্পন্ন সৈন্য হিসেবে দেখানো কী আরেকটা অদক্ষতা হল না? আর শত্রুপক্ষের এত অমানবিকতার মাঝে এক বিন্দু মানবিকতা চোখে মুহূর্তের শান্তি আনলেও ধাঁধা লাগাতে পারে কী? প্রশ্ন রইল কাহিনীকারের কাছে? অবশ্য ‘প্রেম মানে না বাধা’, কিন্তু চারদিকের বিভীষিকায় তা অস্বাভাবিক ও স্বার্থপর প্রেমে পরিণত হতে বাধ্য, তার মাঝে পবিত্রতা বা মঙ্গলের ছায়া থাকে না।

    ৫। তবুও ব্যতিক্রমের খাতিরে আমরা না হয় ডায়ালগ, মেকিং বাদ দিয়ে শধু মূল কাহিনীকে নিয়েই ভাবলাম, শিল্পের জন্য। সেখানেও কী শুধু বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু পাই?

    আসি শেষ কথায়, প্রথম আলোয় পরিচালকে লেখা পড়ে মনে হল তিনি ১টা ড:জিভাগো ই বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি।

    তবে ১টা কথা এই বা অন্য সব পরিচালকের মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশের ৭১ এর যুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, এবং সত্যিকার অর্থে স্পর্শকাতর। তাই এ ইতিহাস নিয়ে বা এর ছোঁয়া নিয়ে কোন শিল্প তৈরি করার আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এবং অবশ্যই ইতিহাসকে গভীরভাবে জেনে নিতে হবে।

    ব্যতিক্রম কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ও শিল্পিত দক্ষতার প্রয়োজন। সেই পর্যায়ে নিজকে নিয়ে গিয়ে তারপর এধরণের নিরীক্ষা করলে ভাল হয়। সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট হল, যে সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে সেই সময়ে এই ছবি মুক্তি দেয়া কতখানি দেশপ্রেমিকের পরিচয় হল? নাকি যখন এ বিচার চলছে তখন এ বিতর্ক সৃস্টি করে মার্কেট তৈরি করাই লক্ষ্য ছিল পরিচালকের?

    এসব পয়েন্ট বাদ দেয়া যায় না, আরো বড় ১টা সন্দেহও বাদ দেয়া যাচ্ছে না, সেটা হল, এই ছবি যুদ্ধাপরাধীদের স্বপক্ষে প্রপাগান্ডার ফলাফল কিনা। এটা হতেই পারে যে, বিদেশে নিয়োজিত যুদ্ধাপরাধীদের স্বপক্ষ শক্তি এই গল্পকে আধুনিক চলচ্চিত্রে রূপ দিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই চলচ্চিত্র শুধুমাত্র বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করেছে ৭১ নিয়ে, ভালবাসার জন্য অন্য প্লট বেছে নিলেও হত। তাই এই সন্দেহ কে কোনভাবেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

  16. আমি তো গত তিরিশ বছরে কারো কাছেই শুনি নাই কোন পাকিস্তানি লোক কোন বাঙালী মেয়ের প্রেমে পড়ছে, পাকিস্তানি সৈনিক তো আটলান্টিক। ছবিটা পাকিস্তানে চলবে। এই জাতিটাকে আর লজ্জা না দিলে বাধিত হবো। একটি অসম্পন্ন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। হুদাই টাকাগুলা নষ্ট করলেন।

  17. samar says:

    প্রেমটি ভারতীয় কোন সৈন্যের সাথে হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

  18. মোরশেদুল ইসলামের বক্তব্যের সঙ্গে এ ক ম ত। চলুক।

  19. সামিমুল মওলা says:

    আমি আমার আগের বক্তব্যের সূত্র ধরে সন্দেহ পোষণ করছি যে এই ছবিটির যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় বেরিয়ে আসার পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে! যেহেতু ভালবাসার সাথে দৈহিক মিলনের নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে, তাই দলত্যাগী হোক আর দলে থাকা অবস্থাতেই হোক, ’৭১-র সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানী সৈন্যের সাথে প্রেমের ডকুমেন্টেশন এই মেহেরজান নামের “ছবিটি” পাকিস্তানীদের পাশবিক ধর্ষণের ও নারী নিগ্রহের অপরাধটিকে “হালাল” না হোক, নিশ্চিত রূপেই লঘু করে দিতে পারে বিচারের সময়! কারণ এটাকে আইনের ভাষায় তখন ইনফর্মড কন্সেন্ট বলে উপস্থাপন করা হতে পারে, আর তাতে লাভ কাদের হবে এই ইতিহাস বিকৃতিতে? এক বাঙালী মেয়ে ’৭১-এ পাকিস্তানী সৈন্যের সাথে প্রেম করলে, অন্যেরা যে করে নি আর ইচ্ছাকৃত ভাবে দৈহিক মিলনে অংশ নেয় নি তার প্রমাণ কে দেবে? কারণ পাকিস্তানী সৈন্যের সাথে প্রেম তো এই মেহেরজান নামের “ছবিটি” দ্বারা ডকুমেন্টেড হয়ে রইল!

    পরিশেষে জনাব সমর নামের একজন মতামত প্রদানকারীর মন্তব্যেরও দৃঢ় প্রতিবাদ করছি, বাংলাদেশে কি প্রেমিক পুরুষের অভাব পড়েছে যে পাকিস্তানী সৈন্যের সাথে না হলে আমাদের রমণীদের প্রেম ভারতীয় সৈন্যের সাথেই হতে হবে? হায় রুবাইয়াত হোসেন, মুক্তিযুদ্ধকে আপনি আজ কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন!

  20. আরিফ৩২১৫ says:

    পরিচালক প্রেমকে বড় করে দেখাতে গিয়ে যে দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখিয়েছেন এবং তাদের মুখে যে কথা তুলে দিয়েছেন তা সত্যি-ই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য অপমানদায়ক–“এটাই আমার প্রথম নয়।”

  21. সবাক says:

    ব্রাত্য রাইসুর শুরুর দিককার অবস্থা দেখে মনে হইলো হাবিব খানের রিমান্ড চলতাছে। এঁরা দেখি আলোচনার সংজ্ঞাই পাল্টে দিলেন! একই সাথে কয়েকটা রোল প্লে কর্তাছেন রাইসু। (১) আলোচক (২) মাস্তান (৩) পুলিশ অফিসার (৪) ডিটেকটিভ (৫) সাংবাদিক।

    আমি অবশ্য জানি না, এসব বৈশিষ্টের সমন্বয়ে এক সফল আলোচক হয় নাকি?!

  22. শারমিন says:

    লজ্জা, শুধু লজ্জা ছাড়া তিনি আমাদের আর কিছুই দেননি।

  23. Aminul Islam Sujon says:

    আমি অপেক্ষা করছি…
    যারা আলোচক, এদের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি। মোর্শেদুল ইসলাম-এর বিশ্লেষণ চমৎকার। তিনি নিজে একজন সুনির্মাতা। আমি তার একটা কথা খুব গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছি। যখন একজন নারীকে রেপ করার দৃশ্য চলচ্চিত্রে দেখানো হয় তখন সতর্কতা খুব জরুরি। বিশেষত, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক আর্মি কতৃক ধর্ষণ-এর পর তার উপস্থাপনায় সতর্ক থাকা খুব জরুরি ছিল।

    একজন পাক আর্মির সঙ্গে বাঙালি নারীর প্রেম দেখালেই মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ এত ঠুনকো নয়। বরং বাঙালি নারীকে রেপ করার পর সে বীরাঙ্গণার উপস্থাপনা দুর্বল হয়েছে, তার প্রতি দর্শকদের সহানুভূতি জাগেনি। এটাই ছবিটির প্রধান দুর্বলতা।

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবীত আমাদের প্রয়াত কবি, সাংবাদিক শামসুর রাহমান পাকিস্তান ক্রিকেট দল-এর খেলা পছন্দ করতেন। তাই বলে তিনি রাজাকার হয়ে যাননি। হিটলারকে অধিকাংশ মানবতাবাদী মানুষ ঘৃণা করে। কিন্তু এখনকার কোনো জার্মান নাগরিককে কেউ হিটলারের দেশের প্রতিনিধি হিসাবে ঘৃণা করে না। যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের শাস্তি প্রদান করা হোক। অনেকই ইরাকের সাবেক স্বৈরাশাসক সাদ্দামকে ঘৃণা করত। কিন্তু সাদ্দামকে উৎখাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে বর্বরতা চালায় তা সাধারণ মানুষ সমর্থন করেনি। এ নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও বিক্ষোভ হয়। আবার ইরাকে জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জন্য আমরা সবাই যুক্তারাষ্ট্রের সব মানুষকে ঘৃণা করি না। বলা হয়, এ যুদ্ধ বুশ-এর দলের পরাজয় ত্বরান্বিত করে।

    যিনি অপরাধী, শাস্তি পাবেন তিনি। একজনের অপরাধের জন্য তার পরবর্তী প্রজন্ম শাস্তি পাবে সেটা কাম্য নয়। তাছাড়া যখন বাংলাদেশে পাক দুতাবাস আছে, বাংলাদেশ-এর সঙ্গে পাকিস্তান-এর কূটনীতিক সম্পর্ক আছে তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে এ সম্পর্ক স্বীকার করা হচ্ছে। পাক ক্রিকেট দল বর্তমানে আমাদের দেশে। সুতরাং জাতিগত বিদ্বেষ পুষে রাখার মত সময়ে আমরা নাই।

    সাংবাদিকতা করার কারণেই চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পাবার পূর্বে দেখার সুযোগ পেতাম। তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলামদের তথাকথিত বাণিজ্যিক ধারার বাইরের ভাল ভাল ছবিগুলো দেখা ও এ বিষয়ে তৎকালীন সময়ে সংবাদপত্রের স্থান ও লেখার আকৃতি সীমিত রেখেও নিজের মতামত ব্যক্ত করে তৃপ্তি পেতাম।

    তারেক মাসুদ একটি ছবি বানিয়েছেন`নরসুন্দর’। সংবাদপত্রে এটাই আমার সর্বশেষ সমালোচনা ছিল। সেখানে দেখানো হয়েছে, বিহারী মাত্রই বাঙালিদের খুন করেনি। কেউ কেউ বাঙালিদের সঙ্গে মানবিকও ছিল। ছবির উপস্থাপনার কারণে ঢাকায় আটকে পড়া বিহারী, বিশেষত যারা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মলাভ করেছে, তাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। যারা এখনো অমানবিক জীবন যাপন করছে। না তাদের পাকিস্তান নিচ্ছে, না তারা এখানে নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে।

    বোঝা যাচ্ছে, হাবিব খান খুব চাপে আছেন। মনে রাখা দরকার, হাবিব খান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে খ্যাতিমান প্রযোজক, পরিবেশক। তাঁর প্রযোজনায় আমরা অনেকগুলো ভাল ছবি পেয়েছি। চাপের কারণে বাধ্য হয়ে তিনি ছবিটা নামান। আমি শুধু একটা জায়গায় বলব, ছবিটা তিনি দেখার পর, মুক্তি পাবার পর নামানো ঠিক হয়নি।

    এ ধরনের সমস্যা যখন সামনে এলোই, তখন ভবিষ্যতে সতর্কতার দরকার আছে। তাই চলচ্চিত্র নির্মাণ করার আগেই কাহিনী, চিত্রনাট্য সেন্সর বোর্ড থেকে অনুমোদন-এর ব্যবস্থা করা যায় কিনা–বিষয়টা বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করছি।

    আমরা জানি, চলচ্চিত্র একটা শিল্প। এটা শিল্প অর্থে ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও মূলত কলা। বাণিজ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা ব্যাপার আছে। তাছাড়া চলচ্চিত্রের একটা ভাষাশৈলীও রয়েছে। চলচ্চিত্র দর্শককে খুব প্রভাবিত করে। তাই উপস্থাপনায় খুব সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।

    চলচ্চিত্রটা যখন সেন্সর বোর্ড বন্ধ করেনি, তখন তা স্বাভাবিকভাবে চলতে দিলে সাধারণ মানুষের মাঝে কোন আলোচনার জন্ম দিত বলে মনে হয়নি। কারণ নির্মাণশৈলী, মেকআপ-গেটআপ, চিত্রনাট্য, সংলাপ দুর্বল। বরং বন্ধ করে দিয়ে মানুষের উৎসাহ সৃষ্ট করা হয়েছে। আমাকে আকর্ষণ করেনি বলে ছবিটার পুরোটা আমি দেখিনি। কিন্তু এখন এত আলোচনা দেখে মনে হচ্ছে পুরোটা দেখা দরকার ছিল।

    বিডি নিউজ-কে ধন্যবাদ। অত্যন্ত সময়োপযোগী আলোচনার সূত্রপাত।

    যদিও এ বিষয়ে দু’জন লিখেছেন, এবং কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেনও। তবু বলব পদবী ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক থাকা দরকার। একজন অধ্যাপক লিখে দিলে এটা সমস্যা তৈরি করে। আমাদের অনেক কিংবদন্তী শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হতে পারেন নি। ঢাকা বিশ্ববদ্যালয় জগতে গুণী কয়েকজন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হতে পারেন নি। সর্বজন শ্রদ্ধেয় সরদার ফজলুল করিম, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক (মজার ব্যাপার, রাজ্জাক স্যার যখন জাতীয় অধ্যাপক হন তখন তিনি ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ–এ রকম আরো অনেক নাম বলা যায়।
    আর এখন তো অধ্যাপক হওয়া কঠিন কিছু না। রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকলে যোগ্যতা না থাকলেও অধ্যাপক সহজে হওয়া যায়।

  24. আড্ডার পুরোটা পড়তে পারলে, মন্তব্য করাটা সহজ হতো… তারপরও বলব , নিষিদ্ধ করাটা কোন সমাধান নয়… পাকিস্তানের সবাই খারাপ–এই যুক্তি মেনে নেওয়াটা কঠিন বই কি..! বাংলাদেশে এখন যাদের বিচার করার উদ্যোগ এই সরকার নিচ্ছে… তাদের অপরাধ কী..? তারা একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো…ভুলে গেলে চলবে না তারা কিন্তু এদেশেরই নাগরিক। তেমনি একাত্তরে কী দুএকজন শুভবুদ্ধির মানুষ পাকিস্তানে ছিলো না..? ছিলো , এমনকি এখনো আছেন যারা.. পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর নিপীড়ন পছন্দ করেনি… , আমি শুনেছি, পাকিস্তনের এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যারা.. এখনো সে ঘটনার জন্য মর্মপীড়ায় ভুগছেন.. পাক সরকারকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য নিয়ত চাপ দিয়ে চলছেন.. আসলে কি! মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের দেশের একটি গোষ্ঠী (সেটা..শিল্পী,বুদ্ধীজীবী রাজনীতিক,চলচ্চিত্রকার,নির্মাতাসহ বলা যায়) তাদের নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তির মতো দেখে, সামান্যতেই গেল..গেল.. বলে ঝাপিয়ে পড়ে.. সমস্যাটা ওখানেই। সুতরাং .. মেহেরজান সিনেমার নির্মাণ কতটা সিনেমার ব্যাকরণ মেনে করা হয়েছে ,কি হয়নি, সে তর্কে আমি যাবো না.. যাওয়া উচিতও আমার হবে না.. কারণ আমি সিনেমার মানুষ নই.. শুধু বলবো… ছবিটা দর্শকদের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হোক… দর্শক তথা জনগণই তার মূল্যায়ন করুক…কারণ স্বাধীনতা এসেছিলো বাংলার এসব সাধারণ মানুষের রক্ত ঋণে…..কোন গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে মেটাতে নয়…..

  25. কুলদা রায় says:

    মেহেরজান-এর কাহিনীকার হিসাবে লেখা হয়েছে–পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের নাম। আসলে তো এর কাহিনীকার হলেন মিঃ এবাদুর রহমান। তার গুলমোহর রিপাবলিকের ২৯ থেকে ৯৩ পৃষ্ঠায় এই মেহেরজানের গপ্পটি ছাপা করা আছে।
    কেন তাহলে কাহিনীকার হিসাবে এবাদুরের নাম ব্যবহার করা হল না? এর উদ্দেশ্যটা কি?

  26. আহসান হাবীব says:

    মেহেরজান,পাকিইজমকে যারা এখনও হৃদয়ে লালন পালন করে তাদের ক্রিয়া-কর্ম বলে মনে হচেছ। সব সম্ভবের এই দেশে রেকর্ড বাজেটের চলচ্চিত্র নির্মাণ করার জন্য এই ধরনের অফ ট্রাকের কাহিনী কেন নির্বাচন করা হল? ঘটনার পিছনের ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য অনুরোধ করছি। এই দেশে এখন মূলতঃ মানি এবং মানির বিনিময়ে সব কিছু নির্ধারিত হচেছ। এক জন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ধারী পরিবেশক বা অন্য কেউ ছবির কাহিনী, মূল ভাব–সব জেনে বুঝেই ছবিটা করেছেন এবং সেন্সর বোর্ডও জেনে শুনেই রিলিজ দিয়েছেন, কেন? টাকা এবং টাকাই ইহার মূল চালিকা শক্তি। ৬ কোটি টাকা বলে কথা।
    মনে হচেছ এক সপ্তাহ চালানো বা ছবিটাকে রিলিজ দিয়েই উঠায়ে নেয়াও প্রি-প্ল্যান করা। কেননা আলোচনা সমালোচনার মাঝেই ইহার অন্তর্নিহিত কূটচাল লুকায়িত। সুতরাং সাধু সাবধান॥

  27. রিটন খান says:

    যে কোনও আলোচনা বা সমালোচনা বিশেষ করে তা যদি চলচ্চিত্র হয়, তাহলে তার কয়েকটি সাধারণ শর্ত থাকে। যেমন মেহেরজান ছবিটির চিত্রনাট্য বা কাঠামগত বিন্যাস, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দৃশ্যান্তর এবং পরিণতি, ছবির ভিজ্যুয়াল দিক বা চাক্ষুষ দিকটি অর্থাৎ ছবিটি কতখানি সিনেমার ভাষায় প্রাণ পেয়েছে। এছাড়া অবশ্যি ফটোগ্রাফি, সংলাপ, অভিনয়, সম্পাদনা ইত্যাদি। উপরের আলোচনা থেকে মনে হচ্ছে, (মনে হচ্ছে এই জন্য বলা যে ছবিটি এখনো দেখা হয় নি) সিনেমার সংজ্ঞায় মেহেরজান যায় না। ব্যাকরণ যে ভাঙ্গা যাবে না তা কিন্তু নয়। ব্যাকরণ ভাঙতে হলে তাকে আয়ত্তে আনাটাও জরুরী। তারপরেও বলবো মেহেরজানকে এভাবে সরিয়ে নিয়ে উৎসাহ কে আরো উস্কিয়ে দেয়া হলো।

  28. শাহীন says:

    মাইনসেরে একটু সামনে বাড়তে দেন। চোখ খুইলা দুনিয়াটারে দেখবার দেন। নাইলে শেষে জয়বাংলা না সোনার বাংলা বোঝা যাইবো না। কে না জানে, আমরা কর্মবিমুখ হইলেও সাতিশয় আবেগপ্রবণ জাতি। কিন্তু পেটে ক্ষুধা নিয়া বেশীক্ষণ আবেগের ধারা একপক্ষে বজায় রাখা যায় না। বদলায়া যায়। এইটা অস্তিত্বের ধর্ম। তাই নিরুপায় হয়া, অস্তিত্বের প্রশ্নে, আমরা বাইর দেশ থিকা নানাভাবে টাকাপয়সা আনার ব্যবস্থা করতে শুরু করি। নানান চ্যানেলে এই দেশে টাকা লগ্নি হয়। যার ফলে আপনাদের মতো খুব অল্প সংখ্যক ব্যতিক্রমী মানুষেরা মুক্তযুদ্ধের কথা বইলা ক্ষুধা নিবারণ করতে পারতেছেন। আবার সেই ইমোশনরে বিক্রিও করতে পারতেছেন। বাকিরা যে যার মতো নিজেরে টিকায়া রাখতেছেন। তাই সব কিছুরে একটা লিনিয়ার পদ্ধতিতে পলিটিসাইজ কইরা ব্যবসার দিন শেষ হইয়া আসতেছে। কিছুটা ফল্স গ্লোবালাইজেশনের ধুয়াও কাজ করতেছে। এই অবস্থায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা না দিলে তো কোন ফতোয়াই টিকব না। সব খসল্লা হয়া যাইব।
    মুক্তিযুদ্ধরে এই ধরনের লালশালুকরণ পক্রিয়ার বিরোধিতা করতেছি। কারণ এই প্রক্রিয়ার চাপে বাস্তবতা হারাইয়া যাইতেছে। উহার মুক্তপঠন সম্ভব হইতেছে না। পবিত্রতা আরোপন না কইরা বরং উন্মোচন করলে বিশ্বাসযোগ্য হয়। বাস্তবতা নিরুপণে আবেগের চাইতে বস্তুভিত্তি বেশী কার্যকর।
    ফিল্মের মুরুব্বিরে বলতে চাই- সামন্তবাদী ঘরানা থিকা বাইর হয়া আসেন। ফিল্মি দুনিয়া এইসব ঘাস খায় না। সাধারণ মানুষের কথা শোনেন। সাধারণ মুনষেরা শুধুই শাকিব খান আর শাহরুখ খানের ফিল্ম দেখে না। এখন ঘরে বইসা বইসা স্পিলবার্গের ফিল্মও দেখে। মানি, ‘মেহেরজান’ সেই মাপের ছবি না। কিন্তু আবার এইটাও জানি, আপনার ঈর্ষার এইরকম একটা গোপন জায়গা আছে। কারণ- আপনার ছবির চাইতে ‘মেহেরজান’ অনেক অনেক বেশী ব্যবসা সফল। পাবলিক আপনার ছবির চাইতে এই ছবিরে বেশী পছন্দ করে (না নামাইয়া নিলে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হইত!)। সিনেমায় কোন ব্যতিক্রমী পার্সপেক্টিভ তৈরী করার মতো উদারতা আপনার নাই। কিন্তু একজন শিল্পী বা স্রষ্টার এই উদারতা থাকা প্রয়োজন। আপনে শিল্পী না। তাই আপনে যে এই প্রকার ফতোয়াধর্মী ওয়াজ করবেন এইটা আর বিচিত্র কী?

  29. শাহীদ says:

    একবার এক পর্যটক নরক পরিদর্শন করতে যায়। তখন নরকের একজন গাইড ঐ পর্যটককে সাথে নিয়ে নরকের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন। পর্যটক দেখলেন বড় বড় গর্ত করে তার মধ্যে পাপীদের রেখে দিয়ে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। এসময় তিনি প্রশ্ন করলেন–গর্তের উপরে গার্ডরা পাহারা দিচ্ছে কেন? তখন গাইড উত্তর দিলেন শস্তি থেকে বাঁচতে পাপিরা গর্ত থেকে উঠে পালিয়ে যায়। তাদের বাধা দেয়ার জন্য এরা গর্তের উপরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এবং এই নরকে প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা আলাদা গর্ত রয়েছে। পর্যটক ঘুরতে ঘুরতে একসময় একটি গর্তের সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। কি ব্যাপার এটা কোন দেশের গর্ত, যেখানে কোনো গার্ড নেই! এরা কি এতই ভালো যে পাপের শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছে । কেউ পালানোর চিন্তা করে না? তখন গাইড উত্তর দিলেন, ‘না বিষয়টা এমন নয়। এটি বাংলাদেশের গর্ত। এখান থেকে কেউ একজন পালানোর জন্য গর্ত থেকে উঠতে চাইলে অন্যরা তার পাঁ ধরে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলে। বলে, আমাদেরকে ফেলে তুই বেঁচে যাবি–এটা হবে না। তাই এখানে গার্ডেরও প্রয়োজন নেই। তারা নিজেরাই যথেষ্ট।’ রুবাইয়াত হোসেন, মেহেরজান বানিয়ে ভুলটা আসলে আপনিই করেছেন। যে গর্তে কেউ বাঁচার চেষ্টা করে না শুধু মুখে বড় বড় বুলি ফোঁকেন আর বারান্দায় বসে লাল চা খেতে খেতে দেশটা রসাতলে গেছে বলে আফসোস করেন, সেখানে থাকতে হলে আপনাকেও এসব অভ্যাস রপ্ত করতে হবে।

    ধন্যবাদ

  30. zahid sohag says:

    বাকি অংশ পড়তে চাই।

  31. মাহমুদ হাসান says:

    অধ্যাপককে “শিক্ষক” করার জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। আজকাল অনেকেই “অধ্যাপক” লিখতে বা বলতে পছন্দ করেন বলে মনে হয়। শিক্ষক বললে কেউ যাতে স্কুলমাস্টার ভেবে না বসেন এই ভয় থেকেই করেন কিনা কে জানে…

  32. মহি আহমেদ says:

    আমাদের চিন্তা চেতনা কতোখানি polarized তা এই আলোচনার প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়। আমার কাছে আমিনুল ইসলাম সুজন এর প্রতিক্রিয়া সব চেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।

  33. Muhammad Shah Alam says:

    আসলে ছবিটি দেখার সুযোগ পাইনি। তবে আমাদের সমাজে দ্রুত খ্যাতির লিপ্সা জাতির জ্ন্য অনভিপ্রেত। সব জায়গাতে বাণিজ্যিক হিসেব করে শিল্পের বারটা বাজানো হচ্ছে আবার শিল্পের নামে কিছু ক্ষেত্রে কি যে হয় সেটাও বিতর্কের দাবি রাখে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার, জাতির গৌরবময় ইতিহাস আর এর অবমাননা সামনের দিনগুলির জ্ন্য ভুল বার্তা দিবে। আধুনিক লেখাপড়া বর্তমানে তথ্যপূর্ণ দলিল ব্যতিরেকে আলোচনানির্ভর নিরিক্ষাধর্মী কাজের মাধ্যমে আমাদের এমন কিচু দেখাচ্ছে যা ইতিহাসের সাথে অসংগতিপূর্ণ। তাই নির্মাতাকে আমি তার পেশাগত দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ রাখতে বলব।

  34. জাহিদ সোহাগ says:

    বাকিটুকু ছাপা হবে– এমন আশা ছেড়ে দিয়েছি। ছাপতে না পারলে বলুন। নাকি সরকারের মতো বলবেন, লোকবল নেই!

    পরিচালকের পরিচয় (জেলা/গ্রাম আর যা যা প্রকাশ করা সম্ভব), ৬ কোটি টাকার উৎস জানতে চাই।

  35. কাওসার আল-আমিন says:

    “সামিমুল মওলা” কে অনেক ধন্যবাদ, তার মন্তব্য ভাল লেগেছে এবং আমি তার সঙ্গে একমত। পরিচালক রুবাইয়াত এর কাহিনী নির্বাচন ভুল হয়েছে। তার এত কম বয়সের কারণেই সে “মুক্তিযুদ্ধ”কে একটা সাধারণ বিষয়বস্তু হিসেবে নিয়েছে আমার মনে হয়। আসলে “মুক্তিযুদ্ধ” একটি অসাধারণ বিষয়। যা নিয়ে যে কেউ ইচ্ছা করল আর চলচ্চিত্র তৈরি করল (ইহা ঠিক নয়)।

  36. ইউসুফ শরীফ says:

    ছবিটা দেখতে পারিনি, ছবি রিলিজ করে উঠিয়ে দেয়া ঠিক হয় নাই, সমালোচনা হতে পারে ছবি নিয়ে কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত দর্শকদের–গ্রহণ বা বর্জনের।

  37. খালেদ says:

    মেহেরজান বন্ধ করা ঠিকই হয়েছে।

  38. পলাশ says:

    মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার । কাজেই সবার-ই সাবধান হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি ।

  39. gunjan says:

    আমার মনে হয় এটা মোটেও ঠিক হয় নাই । ছবি দেখে শুধু কিছু বিশেষ মহল সমালোচনা করেছে । ছবি যাদের জন্য তৈরী করা হয়েছিল অর্থাৎ বাংলাদেশী জনগণ, তাদের কে দেখতে দেয়াও হলো না আর পুরো মতামতও গ্রহণ করা হলো না।

  40. noor says:

    কোয়ালিটিটা আরেকটু ভালো দরকার…

  41. KM Arafat says:

    আমি লিমন ভাইয়ের সাথে একমত…

    মেহেরজান ছবিটার একটা উর্দু ভার্সন বের করুন। পাকিস্তানে রিলিজ দেন, তাহলে বুঝতে পারবেন সিনেমাটা আসলে কাদের জন্য বানানো হয়েছে–পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশ। মেহেরজানের পরিচালক তরুণ সমাজের যে অংশটি নষ্ট হয়ে গেছে, তারই প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

  42. সাইফ খান says:

    সামিমুল মওলা আপনি রুবাইয়াতকে প্রস্ন করলেন এতগুল টাকা কেন নস্ট করলেন । টাকাটা উনি খাটিয়েছেন কিনা জানা নেই তবে ওনার মত আরও অনেকের পিছে এই টাকা খাটানো হচ্ছে এবং মেহেরজান এর মত গনিমতের মালকে হালাল করার প্রক্রিয়া থেমে নেই । টাকাটা যারা খাটিয়েছে তাদের এত টাকা খাটানোর উৎস জানা দরকার নয়ত তারা অন্যভাবে অন্য কোথাও আরও টাকা খাটাবে ।

  43. সুদীপ্ত হাননান says:

    কার্ল মার্কস জীবিত থাকতেই তার তাত্ত্বিক অবস্থানকে একটু ঘুরিয়ে প্রকাশ করছিলেন হার ইউজিন ড্যুরিং নামের একজন। ড্যুরিং নাকি জানাশোনা লোকই ছিলেন। তো ড্যুরিং মার্কসের তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক দিক নাকি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, এটি তিনি বলতেন। কিন্তু ড্যুরিংয়ের লেখা প্রকাশ এবং প্রচার হওয়ার পর এ্যাঙ্গেলস নাকি দেখলেন যে মার্কসকে উল্টাভাবেই মূলত ড্যুরিং প্রচার করছেন। তাই এ্যাঙ্গেলস লিখেছিলেন – এ্যান্টি ড্যুরিং।
    মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো ব্যবসায়ের শেষ নেই …
    মেহেরজান সিনেমা নিয়ে আমার আর কোনো মতামত নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.