সূফীবাদ নিয়ে ফ্রান্স দূতাবাস ও দ্য সেন্টার ফর অলটারনেটিভস্-এর সেমিনার

এস এম রেজাউল করিম | ১২ december ২০১০ ৫:৪৭ অপরাহ্ন

sufi_3.jpg
‘সূফী ও সূফীবাদ’ বিষয়ে সেমিনারে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত (বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয়) ও তিনজন আলোচক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের হলরুমে ‘Sufis and Sufism’ নামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হলো ১ ডিসেম্বর ২০১০। ঢাকাস্থ ফ্রান্স দূতাবাস এবং দ্য সেন্টার ফর অলটারনেটিভস্-এর যৌথ আয়োজনে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। সেমিনারে পাঁচটি লিখিত ও অলিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন পাঁচজন বক্তা। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত শার্ল কসেরেত-এর স্বাগত বক্তব্যের পরে পরে শুরু হয় মূল বিষয়ের উপর প্রবন্ধ উপস্থাপন। পুরো সেমিনারে বক্তব্য উপস্থাপন ও পরবর্তিতে শ্রোতাদের প্রশ্ন এবং বক্তাদের উত্তরপর্ব চালিত হয় ইংরেজিতে। প্রথম প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ছিলো ‘সূফী ও সূফীবাদ (Sufis and Sufism)’। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আলীমূর রহমান খান ‘ইবনে আরাবি ও সূফীবাদ (Ibn Arabi & Sufism)’, অ্যালিক্স ফিলিপ্পন ‘বারালভী আন্দোলন ও তার বহু নও-সূফী ধারা (Barelwi Movement and Its Many Neo-Sufi Orders)’, তানভীর মোকাম্মেল ‘লালন ও সূফীবাদ (Lalon & Sufism)’ এবং সবশেষে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ সামসুল হক ‘সূফীবাদ ও ঠাকুর (Sufism and Tagore)’। সেমিনারের আয়োজকপক্ষ জানানো হয় যে একই নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হবে। প্রকাশিতব্য গ্রন্থের পূর্বসূত্র হিসেবে এই সেমিনারটি আয়োজন করা হয়েছে।

—————————————————————–
ইবনে আরাবির শিষ্য আবদুল কাদের জিলানী ত্রয়োদশ শতকে ভারতবর্ষে তাঁর মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ‘সহিহ্’ ইসলামপন্থার কাছ থেকে বড় কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েননি। একইভাবে বাংলাদেশের নেত্রকোনা ও নারায়নগঞ্জে সূফী-পীরগণ নিজ নিজ মতবাদ প্রচারের মাধ্যমে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পেরেছেন বড় কোন বাধা ছাড়াই। এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো—এই সূফীগণ কোরান ও হাদিসনির্ভর কোন অর্থডক্স ইসলাম প্রচার করেননি। কিন্তু পরবর্তিতে বাগদাদে সুলতানদের উত্থানের ফলে সূফী-পীরগণ সুলতানদের দিক থেকে হুমকির মুখে পড়েন। এই বিষয়টির বিশ্লেষণে তিনি বলেন, ‘সূফীবাদ’ ‘ওয়াহদাত আল-উজুদ’ বা সৃষ্টিকর্তার সাথে সৃষ্টির অভিন্নতার যেই মত দেয়—সেটি আসলে ‘সহিহ্’ ইসলামের দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তখনই যখন রাষ্ট্রীয় তৎপরতার সাথে ইসলামকে যুক্ত করা হয় বা ইসলাম শাসনকর্মের একটি উপাদান হয়ে ওঠে।
—————————————————————-

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘সূফীবাদ’ একটি টার্ম হিসেবে প্রবর্তন করেন ইউরোপীয় প্রাচ্যবাদীগণ, আঠারো শতকের শেষ নাগাদ। প্রাচ্য সংস্কৃতির কিছু ক্ষেত্র যেগুলো ইউরোপীয় প্রাচ্যবাদীগণের কাছে আকর্ষণীয় লেগেছিলো সেগুলোকে তাঁরা ‘সূফীজম’ হিসেবে সনাক্ত করেন। প্রাচ্যবাদীগণ ‘ইসলাম’ ও ‘সূফীবাদ’ আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করেন যেখানে ‘ইসলাম’-এর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘কঠোর আইনী কাঠামো’ আর ‘সূফীবাদ’ হলো ‘ধর্মের সারমর্ম’। পরবর্তিতে প্রাচ্যের আধুনিকতাবাদী এবং ‘সহিহ্’ ইসলাম পন্থি—উভয়েই টার্ম হিসেবে সূফীবাদকে গ্রহণ করে নেয়। যদিও বহুক্ষেত্রেই তাঁরা ‘সূফীবাদ’-এর বৈশিষ্ট্য চিহ্নিতকরণে প্রাচ্যবাদীদের সাথে দ্বিমত করেছেন।
তাঁর আলোচনায় ভারতবর্ষে ও বাংলা অঞ্চলে খোরাসান, বাগদাদ ও বোখারা থেকে আগত সূফীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলাপ করেন। তিনি বলেন, ইবনে আরাবির শিষ্য আবদুল কাদের জিলানী ত্রয়োদশ শতকে ভারতবর্ষে তাঁর মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ‘সহিহ্’ ইসলামপন্থার কাছ থেকে বড় কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েননি। একইভাবে বাংলাদেশের নেত্রকোনা ও নারায়নগঞ্জে সূফী-পীরগণ নিজ নিজ মতবাদ প্রচারের মাধ্যমে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পেরেছেন বড় কোন বাধা ছাড়াই। এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো—এই সূফীগণ কোরান ও হাদিসনির্ভর কোন অর্থডক্স ইসলাম প্রচার করেননি। কিন্তু পরবর্তিতে বাগদাদে সুলতানদের উত্থানের ফলে সূফী-পীরগণ সুলতানদের দিক থেকে হুমকির মুখে পড়েন। এই বিষয়টির বিশ্লেষণে তিনি বলেন, ‘সূফীবাদ’ ‘ওয়াহদাত আল-উজুদ’ বা সৃষ্টিকর্তার সাথে সৃষ্টির অভিন্নতার যেই মত দেয়—সেটি আসলে ‘সহিহ্’ ইসলামের দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তখনই যখন রাষ্ট্রীয় তৎপরতার সাথে ইসলামকে যুক্ত করা হয় বা ইসলাম শাসনকর্মের একটি উপাদান হয়ে ওঠে।

ফলে তাঁর আলোচনা থেকে এই সেমিনারের তাৎপর্য অনুধাবন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এই সময়ের বিশ্ব রাজনীতিতে বিরোধ-সংঘাতের সাথে গভীরভাবে ইসলাম যুক্ত থাকায় আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে ইসলামের সম্পর্ক বিশ্লেষণ একটি দরকারি বিষয়। এই সম্পর্ক বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হিসেবে এই সেমিনারকে ভাবা যেতে পারে, যেখানে বিরোধ-সংঘাতের মিমাংসায় ‘সূফীবাদ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

alimur_r_khan.jpg
সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন আলীমূর রহমান খান

এরপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আলীমূর রহমান খান, ‘ইবনে আরাবি ও সূফীবাদ’ বিষয়ে। তিনি ‘সূফীবাদ’-এর দার্শনিক নির্মাতা হিসেবে ইবনে আরাবিকে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ইবনে আরাবি যেমনি বিতর্কিত তেমনি আবার অত্যন্ত প্রভাবশালী। ইবনে আরাবির লেখাগুলো টেক্সট, তার অর্থ, চিন্তা, বিষয়ভিত্তিক ধারনা, পরিচিতি সম্পর্কে আমাদের প্রথাগত চৈতন্যকে নাকচ করে দেয়। ইবনে আরাবিকে ঘিরে যেই বিতর্ক তার মূলে আছে প্রথাগত ধর্মবোধ ও তার চর্চাসমূহকে করা তাঁর চ্যালেঞ্জ। আলীমূর রহমান খান বলেন, প্রথাগত অর্থডক্স ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃত্ব তাদের নিজেদেরই তৈরি বা তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি। অর্থডক্স ধর্ম তাদের ব্যবস্থা থেকে যেকোন ধরণের বিচ্যূতি প্রত্যাখ্যান করে। এই পরিসরে ইবনে আরাবি ঝড়ের মতো আবির্ভূত হন, তাজা বাতাসের মতো এসে ইবনে আরাবি ধর্মকে অর্থডক্স কতৃত্বের কব্জা থেকে মুক্তি দেন এবং একটি নতুন জীবনের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। আলীমূর রহমান খান ইবনে আরাবিকে চিহ্নিত করেন ইসলামী চিন্তুকদের মধ্যে প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে, যিনি মিস্টিসিজমকে তত্ত্বায়নের মাধ্যমে একটি দর্শন হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। পরবর্তিতে ইসলামে মিস্টিসিজম দর্শন হিসেবে আরো এগিয়েছে কিন্তু কেউই ইবনে আরাবির প্রভাব থেকে দূরে থাকেননি।

তিনি বলেন, ইবনে আরাবির মতে তাঁর সকল চিন্তা ও লেখা কোরান থেকে উৎসরিত। কোরানের কেবলমাত্র একটিই অর্থ এমন নয়, কোরান বহুবিধ অর্থ ধারণ করে। প্রত্যেক পাঠক তাঁর কাংখিত অর্থ কোরানে খুঁজে পায়। খোদা সীমিত সময় ও পরিসরের জন্য তাঁর ওহী পাঠাতে পারেন না।

—————————————————————–
তিনি ‘সূফীবাদ’-এর দার্শনিক নির্মাতা হিসেবে ইবনে আরাবিকে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ইবনে আরাবি যেমনি বিতর্কিত তেমনি আবার অত্যন্ত প্রভাবশালী। ইবনে আরাবির লেখাগুলো টেক্সট, তার অর্থ, চিন্তা, বিষয়ভিত্তিক ধারনা, পরিচিতি সম্পর্কে আমাদের প্রথাগত চৈতন্যকে নাকচ করে দেয়। ইবনে আরাবিকে ঘিরে যেই বিতর্ক তার মূলে আছে প্রথাগত ধর্মবোধ ও তার চর্চাসমূহকে করা তাঁর চ্যালেঞ্জ। আলীমূর রহমান খান বলেন, প্রথাগত অর্থডক্স ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃত্ব তাদের নিজেদেরই তৈরি বা তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি। অর্থডক্স ধর্ম তাদের ব্যবস্থা থেকে যেকোন ধরণের বিচ্যূতি প্রত্যাখ্যান করে। এই পরিসরে ইবনে আরাবি ঝড়ের মতো আবির্ভূত হন, তাজা বাতাসের মতো এসে ইবনে আরাবি ধর্মকে অর্থডক্স কতৃত্বের কব্জা থেকে মুক্তি দেন এবং একটি নতুন জীবনের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। আলীমূর রহমান খান ইবনে আরাবিকে চিহ্নিত করেন ইসলামী চিন্তুকদের মধ্যে প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে, যিনি মিস্টিসিজমকে তত্ত্বায়নের মাধ্যমে একটি দর্শন হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। পরবর্তিতে ইসলামে মিস্টিসিজম দর্শন হিসেবে আরো এগিয়েছে কিন্তু কেউই ইবনে আরাবির প্রভাব থেকে দূরে থাকেননি।
—————————————————————-

আলীমূর রহমান খান বলেন, ইবনে আরাবি তাঁর বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোরানকে এর অক্ষর আর শব্দের বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। ইবনে আরাবির মতে, যেই পাঠক কোরানের দুটি ভিন্ন পাঠে একই অর্থ পায় সে লাভবান হতে পারে না, বিপরীতে যে পাঠক প্রতি পাঠে নতুন অর্থ দেখতে পায় সেই লাভবান হয়। কোরানে খোদার অন্তঃস্থ থাকাই কোরানকে বহু অর্থের ধারক করে তোলে। ইবনে আরাবি বলেন, কোরানের বক্তব্য আনুযায়ী সর্বত্র খোদার নিশানা ছড়িয়ে আছে। মানুষ এরকমই একটি নিশানা, ফলে মানুষই সেই ‘লুকানো সত্য’, মানুষের মাঝেই খোদা বিরাজমান। এই পদ্ধতিতে ইবনে আরাবি ‘ওয়াহদাত আল-উজুদ (wahdat al wujud)’-এর ধারনা দেন। ‘ওয়াহদাত আল-উজুদ’ মানে খোদা ও তাঁর সৃষ্টিকে ‘এক’ হিসেবে দেখা। ‘উজুদ’ বা সত্তা বা সৃষ্টিকে আলীমূর রহমান খান ‘উজুদ’ বা সত্তা বা সৃষ্টিকে খোদা ও মানুষের মাঝে একটি ‘ইন্টারফেস’ বলে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ইবনে আরাবির মতে এই ‘উজুদ’-কে বোঝার মধ্য দিয়েই স্রষ্টা ও সৃষ্টির ‘একত্ব’ উপলব্ধ হয়। ইবনে আরাবি এটাকেই ‘তাওহীদ’ বলেছেন।

আলীমূর রহমান খান ইবনে আরাবির গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন যেখানে ইবনে আরাবি ঘোষণা দিয়েছেন, “……… ..আমি প্রেমধর্ম পালন করি, ভালোবাসার উট আমাকে যেখানেই নিয়ে যাক, প্রেম আমার ধর্ম ও বিশ্বাস।” আলীমূর রহমান খান বলেন, ইবনে আরাবির সমস্ত জীবন কেটেছে সত্যিকারের মানুষ হবার উপায় অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যায়। ইবনে আরাবির ফুতুহাত (Futuhat) থেকে তিনি উদ্ধৃত করেন, “God appeared to me in the inmost heart of my being and said to me “Make known to My servants that which you have verified of My generosity… Why do My servants despair of My Mercy when My Mercy embraces everything?”

এরপর বক্তৃতা দেন অ্যালিক্স ফিলিপ্পন। তাঁর বিষয় ছিলো পাকিস্তানের ‘বারালভী আন্দোলন ও তার বহু নও-সূফী ধারা’। অ্যালিক্স ফিলিপ্পন তাঁর বক্তৃতায় বারালভী আন্দোলনের সাথে সূফীবাদ, আধুনিকতা এবং সংস্কারবাদী ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী ও দেওবন্দী মতবাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর আলোচনার বিষয় সম্পর্কে বলেন, তিনি পাকিস্তানে সূফীবাদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক মাত্রাগুলো, বিশেষতঃ বারালভী আন্দোলন ও তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, বারালভী মতবাদ একইসাথে আধুনিকতা ও জামায়াতে ইসলামী ও দেওবন্দী মতবাদের মত ইসলাম—উভয়ের দিক থেকেই আক্রান্ত হয়।

alix_philippon.jpg
প্রবন্ধ উপস্থাপন করছেন অ্যালিক্স ফিলিপ্পন

ড. অ্যালিক্স ফিলিপ্পন তাঁর আলোচনায় পাকিস্তানে একটি ‘প্রেশার গ্রুপ (Pressure Group)’ হিসেবে ১৯৪৮ সালে বারালভীপন্থি রাজনৈতিক দল ‘জমিয়্যত-ই-উলামা-ই-পাকিস্তান’ গঠন এবং এটি কিভাবে সূফী ঐতিহ্যগুলোকে রক্ষা করার এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে এবং কট্টরপন্থী তালিবান ও দেওবন্দীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, আবার বিপরীতে কট্টরপন্থী তালিবানদের উত্থানের বিরুদ্ধে মতাদর্শিকভাবে কাজ করে—সেটি বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেন।

এরপর আলোচনা করেন তানভীর মোকাম্মেল, ‘লালন ও সূফীবাদ’ বিষয়ে। তানভীর মোকাম্মেল তাঁর আলোচনায় তাঁর নির্মিত ‘লালন’ সিনেমার বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করেন। এই ভিডিও ক্লিপগুলোকে তিনি লালনদর্শন ও সেই দর্শনের প্রায়োগিক দিক এবং তৎকালীন যেসব সামাজিক প্রতিরোধের মুখে লালনদর্শন পড়েছিল—সেসব ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেন। তিনি বাউল জীবনপদ্ধতি ও লালনদর্শনকে চিহ্নিত করেন সূফীবাদ, বৈষ্ণবধর্ম ও তান্ত্রিক সাধনার সম্মিলন হিসেবে। তিনি বলেন, লালনদর্শনে ‘প্রেম’, ‘দেহ’ এবং ‘স্রষ্টা ও সৃষ্টির অভেদ’ কেন্দ্রীয় চিন্তা। লালন নর’কে ‘পুরুষ’ ও নারী’কে ‘প্রকৃতি’ হিসেবে দেখেছেন এবং ‘সাধনা’র উপায় হিসেবে ‘পুরুষ’ ও ‘প্রকৃতি (নারী)’র মিলনকে দেখেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের ‘রাধা-কৃষ্ণ’ ভাবনার যোগাযোগকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি লালনকে উদ্ধৃত করেছেন, ‘যা আছে ব্রক্ষ্মাণ্ডে, তা আছে দেহভাণ্ডে’।লালন তাই দেহ ও দেহের বিভিন্ন উপাদান (শুক্র, মল-মূত্র, রজঃস্রাব ইত্যাদি) আস্বাদনকে ‘সাধন’-এর উপায় বলেছেন।

তিনি লালনদর্শনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরকটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন—‘গুরু’ বা ‘মুর্শিদ’।তিনি বলেন, লালন ‘গুরু’-কে সাঁই বা সাঁইজি বলেছেন, যেটি সূফী প্রত্যয় (concept) ‘শাহ’-স্মরণ করিয়ে দেয়। লালনদর্শন অনুযায়ী একটি পর্যায়ে সৃষ্টিকর্তা, মুর্শিদ ও গুরু সমার্থক হয়ে ওঠে।

তানভীর মোকাম্মেল লালনের গানের দুটি স্তরের কথা বলেছেন—উপরিস্তরের ভক্তিমূলক নিবেদন বা প্রেমের গান আবার গভীরতর অর্থে সান্ধ্যভাষা’র রূপক ও প্রতীকের ব্যবহারে শিষ্যদের ‘ফকিরি’ জীবনচর্চার (যৌন-যোগী আচার ও দর্শন) শিক্ষাপ্রদান। তিনি বলেন, এই গানগুলোর গোপন অর্থসমূহ বহিরাগতরা বুঝতে পারে না, কেবল গুরু বা মুর্শিদ এগুলোর অন্তঃস্থ অর্থ বুঝিয়ে দিতে পারে।

তিনি বলেন, লালনের গানের অর্থ অনুধাবন করলে বোঝা যায় এগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিকতা বা প্রথাবিরোধী। ক্ষমতাসীন বেদবাদী হিন্দু আর সূন্নী ইসলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপে লালনকে তাঁর গান এমন সাংকেতিক ভাষায় লিখতে হয়েছে।

তানভীর মোকাম্মেল লালনকে ‘সূফী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় কতগুলো ঝুঁকির কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সূফী’ চিন্তার প্রভাব লালনে ছিলো কিন্তু লালনভাবনা মূলতঃ ‘বৌদ্ধ ও তান্ত্রিক’ ভাবনার সাথে নদীয়ার চৈতন্য উত্তর সহজিয়া বৈষ্ণব ভাবনা থেকে উৎসরিত। প্রসঙ্গত বলা দরকার, তিনি আগেই লালনকে ‘সূফী’ না বলে ‘ফকির’ হিসেবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সূফী’ চিন্তার সাথে লালনের প্রধান ফারাক হলো—লালন ভাবনায় সাধনার ক্ষেত্রে নারীর অপরিহার্যতা। লালন ভাবনায় নারী প্রকৃতি’র এজেন্ট আর তাই নারী পুরুষের তুলনায় উন্নততর, অধিকতর ‘সম্পূর্ণ’ মানুষ। পুরুষের জন্য তাই নারী ছাড়া ‘সহজ মানুষ’-এর ‘সাধনা’ অসম্ভব।


সেমিনারে সূফীবাদ ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বলছেন সৈয়দ সামসুল হক

সেমিনারে সর্বশেষ বক্তা ছিলেন সৈয়দ সামসুল হক। তিনি ‘সূফীবাদ ও ঠাকুর’ বিষয়ে। তিনি বলেন, একাডেমিক প্রবন্ধ উপস্থাপন তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না, তিনি বরং কবি হিসেবে রবীন্দনাথের কবিতা ও গানের প্রতি তিনি কিভাবে সাঁড়া দেন—তাই বলবেন। একই সাথে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার উপর সূফী কবি রুমি, হাফিজ ও সাদি’র প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। তিনি ১৯৩২ সাথে রবীন্দ্রনাথের পারস্য ভ্রমণ ও সূফী কবি হাফিজ ও সাদি’র সমাধি প্রাঙ্গনে গমনকে স্মরণ করেন।

তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘পারস্যে’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, রবীন্দ্রনাথ এক সাক্ষাতকারীকে বলেছিলেন, ‘আপনাদের পূর্বতন সূফীসাধক কবি ও রূপকার যাঁরা আমি তাঁদেরই আপন, এসেছি আধুনিক কালের ভাষা নিয়ে; তাই আমাকে স্বীকার করা আপনাদের পক্ষে কঠিন হবে না।’ আবার হাফিজের সমাধিতে রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি লিখে গেছেন ‘পারস্যে’ গ্রন্থে, ‘এই সমাধির পাশে বসে আমার মনের মধ্যে একটা চমক এসে পৌঁছল, এখানকার এই বসন্তপ্রভাতে সূর্যের আলোতে দূরকালের বসন্তদিন থেকে কবির হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত। মনে হল আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রূকুটি। তাদের বচনজালে আমাকে বাঁধতে পারে নি; আমি পলাতক, ছুটি নিয়েছি অবাধ প্রবাহিত আনন্দের হাওয়ায়। নিশ্চিত মনে হল আজ, কত-শত বৎসর পরে জীবনমৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।’

সৈয়দ সামসুল হক বলেন, রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনা, জীবনবোধে, লেখায় নিশ্চিতভাবেই সূফীবাদের প্রভাব আছে নইলে হাফিজের সমাধি প্রাঙ্গনে তাঁর মন ওভাবে আর্দ্র হয়ে উঠত না। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ সামসুল হক ‘গীতাঞ্জলি’র রচনায় ও রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কবিতা-গানে গাঢ় নিবেদনধর্মিতার স্মরণ করেন এবং রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গান-কবিতা পাঠ করেন। যেমন, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ/ এমনি লীলা তব ।/ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ/ জীবন নব নব।’ এবং এটির রবীন্দ্রনাথকৃত ইংরেজি অনুবাদ, ‘Thou hast made me endless, such is thy pleasure. This frail vessel thou emptiest again and again, and fillest it ever with fresh life.’

শেষ প্রবন্ধ উপস্থাপনের পরে শ্রোতাদের প্রশ্ন নেওয়া হয় এবং প্রাসঙ্গিক প্রাবন্ধিক/আলোচক শ্রোতাদের প্রশ্নের জবাব দেন। প্রশ্নোত্তরপর্ব শেষ হলে সবাইকে ধন্যবাদ প্রদান করে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

rezaulkarim.manu@gmail.com

লেখক লিংক: আর্টস

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

শুরুতে ফিরে যেতে ক্লিক করুন
free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Noman khandaker — december ১৩, ২০১০ @ ২:৩৬ পূর্বাহ্ন

      আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বিশ্বকবি রবী ঠাকূরের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করলাম, পর্বত ও সিন্ধু দেখার পরও তিনি আফসোস করলেন “দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া,ঘর হইতে দুইপা ফেলিয়া,একটি ঘাসের উপর একটি শিশির বিন্দু” এত কিছু বলার কারণ সম্মানিত ব্যক্তিগণ আলোচনায় সূফীবাদ, আব্দুল কাদের জিলানীর ইসলাম পন্থা, পীরমূর্শিদ,ফকিরি, মওদুদীবাদ, দেওবন্দীবাদ, জামাআতে ইসলামী তথা রাষ্ট্রীয় ভাবে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা–সব কিছুই এসেছে। তবে কেন আলোচনা আরও একটু আগে থেকে মানে এর
      শুরু তো আমার দৃস্টিতে খেলাফত থেকেই হওয়া সমীচিন বলে মনে হয়। আর যে ব্যক্তি ‘আইনাল হক্ব’ এমন উক্তি করতে পারে তার চাইতে বড় সূফীবাদী আর কে হতে পারে।

      সূফী সাধক লালন ফকিরের অনেক কিছুই উদ্ধৃত, তবে কেন সীরাজ সাঁঈজীর কথা উপস্হাপন করা হয়নি। লালন ফকিরের উদ্ধৃতি দিয়ে নর, নারী ও প্রকৃতির সংমিশ্রনের সাথে উক্ত সেমিনারের আলোচনায় যদি নারীকে বৈষ্ণবী বা রাধা নাম দিয়ে বৈষ্ণব ও কৃষ্ণের আভাস ও আলোচনায় বিজ্ঞ আলোচকবৃন্দ দিয়ে থাকেন, তবে কি আমার দু’চারটি বিষয় আলোচনার অংশ হিসেবে এতই নগন্য!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোয়াজ্ঝেম আজিম — december ১৩, ২০১০ @ ৬:১৫ পূর্বাহ্ন

      ইন্টারেস্টিং!’সুফিবাদ’ সম্পর্কে আমাদের জানা বেশীর ভাগই শুনার উপর নির্ভরশীল। বিডি আর্টসকে অনুরোধ করবো প্রবন্ধগুলো ছাপানো যায় কিনা বিবেচনা করতে। বিডি আর্টসের জন্যে শুভকামনা রইল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ গুলশানুর রহমান — december ১৪, ২০১০ @ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন

      আমার মনে হয় উইকিপিডিয়ার এই লিংক থেকে “ওয়াহদাত আল-উজুদ” বিষয়ে বিভিন্ন ইসলামী মনীষিদের চিন্তা-ভাবনা জানা যাবে। একে সোজা ভাষায় “সৃষ্টি আর স্রষ্টার এক হয়ে যাওয়া” বললে তা অনেকটাই ভুল অর্থ প্রকাশ করবে-
      http://en.wikipedia.org/wiki/Wahdat_ul-wujud

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ershad Mazumder — december ১৪, ২০১০ @ ১০:৫১ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ বিষয়টির আয়োজকদের। অবাক হলাম প্রবন্ধকারদের নাম দেখে। সুফীবাদের মূল বিষয় হলো ‘এক আল্লাহর প্রেম, আল্লাহতে নিবেদিত হওয়া’। এটা কোন ধর্মহীনতার বিষয় নয়। এই মূহুর্তে আমার কাছে বিশ্ব সুফীদের নেতা হলেন মাওলানা রুমী। পশ্চিমেও রুমীকে গ্রহণ করা হয়েছে। রুমীকে নিয়ে শত শত বই লেখা হচ্ছে। সুফীবাদেরও কিছু নিয়ম কানুন আছে। ধর্মে বিশ্বাস করি না, কিন্তু সুফীবাদে বিশ্বাস করি–এটা অলীক চিন্তা।
      আপনাদের আলোচনায় কবিগুরুর নাম এসেছে কিন্তু গালিব আসেনি। এতে আমি অবাক হয়েছি। গালিব হচ্ছেন এই উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সুফী কবি। সৈয়দ হক একজন শক্তিমান লেখক। তাঁর যে ইমেজ তাতে সূফীবাদ নিয়ে তাঁর আলোচনা গ্রহণ করতে পারলাম না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ershad Mazumder — december ১৪, ২০১০ @ ১১:০৩ পূর্বাহ্ন

      সম্মানিত মোয়াজ্জেম সাহেব, বাক্যটা ‘আইনাল হক’ নয়। এটা ‘আনা আল হক’। মানে হলো ‘আমিই সত্য’। ইংরেজীতে ‘I am the truth’. বলেছেন সুফীবাদের প্রথম শহীদ মনসুর হাল্লাজ। তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। তারপর তাঁর মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শরীফ ইকবাল — december ১৫, ২০১০ @ ৫:৩০ অপরাহ্ন

      সুফিবাদ সম্পর্কে আমাদের জানা বেশীর ভাগই শুনার (যা অনেকাংশে অনুমান-নির্ভর) উপর নির্ভরশীল। বিডি আর্টসকে অনুরোধ করছি–প্রবন্ধগুলো ছাপানো যায় কিনা?
      ধন্যবাদ ফ্রান্স দূতাবাস ও দ্য সেন্টার ফর অলটারনেটিভস্-এর সেমিনার আয়োজক, প্রাবন্ধিক, আলোচক ও এস এম রেজাউল করিম কে, বিডি আর্টসের জন্যে অনেক শুভকামনা।

      শরীফ ইকবাল

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sarwar chowdhury — december ২৯, ২০১০ @ ৪:০০ পূর্বাহ্ন

      ‘ওয়াহদাত আল ওজুদ’ অর্থ বুঝার জন্য ইবনে আরাবী’র ‘নকশাল ফুসুস’ এর এই কথা বুঝে নেয়া দরকার, তিনি বলেছেন,
      ‘God manifests Himself to the heart of the Perfect Man, who is His vicegerent.
      And the reflection of the lights of His self-manifestation overflows into the world’
      >>>-Ibn Arabi’s Naqsh al Fusus

      সুতরাং নকশাল ফুসুস এর এই বক্তব্য অনুযায়ী, সহজভাবে ‘ওয়াহদাত আল ওজুদ’ এর মানে স্রস্টা আর সৃষ্টি এক বা ইংরেজিতে ‘Oneness of being’ এই অর্থ সঠিক নয় এবং প্যারাডক্সিক্যাল। যিনি খোদার পারফেক্ট প্রতিণিধি হতে পারবেন, তার মধ্যে God manifests Himself. ওয়াননেস অব বীঙ্ যদি হয় তাহলে বিশেষ ব্যক্তির হৃদয়ে মেনিফেস্টেইশানের প্রয়োজন কি? তিনি যেহেতু সামগ্রিক অস্তিত্বের সাথেই একাকার। সুতরাং ওয়াননেস অব ক্রিয়েশান হতে পারে।
      ‘ওয়াহদাত আল ওজুদ’ এর অর্থ এখানে পরিস্কার- ‘Hence the existence of God is the only truth (Haqq), and the concept of a separate created universe is falshood. Arabic: (Batil).’

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com