ভ্রমণ-জার্নাল

ইস্তানবুলে ঘোরাঘুরি (কিস্তি ২)

মেখলা হক | 29 Nov , 2010  

(প্রথম কিস্তি)

blue-mosque-1.jpg
হোটেল আরারাত থেকে দেখা ব্লু মস্ক

(কিস্তি ১-এর পরে)

২য় দিন । ২৭ শে নভেম্বর ২০১০

এখানকার সময় ভোর চারটায় গেল ঘুম ভেঙে। জানালা দিয়ে ব্লু মস্ক। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আলোর সাথে সাথে রূপ পাল্টাচ্ছে। জানালাটা ছবি তোলার জন্য খোলার সাথে সাথে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকলো। আমাদের হোটেলের সামনে দিয়ে সব টুরিস্টের বাস যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। ছাদে নাস্তা খেতে গিয়ে দেখলাম একদিকে মারমারা সাগর আরেকদিকে ব্লু মস্ক। আমরা প্ল্যান করলাম প্রথমে ব্লু মস্ক দেখে তারপর হায়া সোফিয়া দেখবো। মজা লাগলো দেখে যে এখানকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কোনো জড়তা নাই। মেয়েরা হিজাব করে বোরখা পরেও কত সহজে জড়তাহীন ভাবে চলাফেরা করছে, জীবনকে উপভোগ করছে।

grand-bazar.jpg
গ্রান্ড বাজার

ব্লু মস্ক প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো, অটোমানদের সময়ে তৈরি। ব্লু মস্কের ভেতরে ঢোকার পরে নিচু ঝাড়বাতি আর রঙিন কাচের কারুকাজ দেখে আমি, দিদিভাই আর চন্দনা আপা খটাখট ক্যামেরার শাটার টিপতে লাগলাম। কোন অ্যাঙ্গেল ছেড়ে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে তুলবো বুঝেই পাচ্ছিলাম না। প্রচুর ট্যুরিস্টের ভিড়ে ঠিক মতো দাঁড়াতেও পারছিলাম না।

যাই হোক, ধাক্কাধাক্কি করে বেরিয়ে আসার পর, সামনে বেশ কিছুক্ষণ বসে ব্লু মস্কের সৌন্দর্য হজম করার চেষ্টা করলাম। সাথে নিয়ে নিলাম গরম গরম অ্যাপল ফ্লেভারড চা। দিনের শুরুটা মেঘলা ছিল দেখে গরম চা বেশ জমেছিল। পাশে দেখি এক ফুড কার্টে কাঠাল বীচি ধরনের কী একটা ভাজছে। সাইজে একটু বড়, সেটাও নিয়ে তিনজন ট্রাই করে ফেললাম–একদম কাঠাল বীচি!

our-guide-jesus.jpg……..
গাইড কাদির জানালো তাঁকে তাঁর বন্ধুরা ‘জেসাস’ বলে ডাকে।
…….
ধীরেসুস্থে রাস্তার ওই পাড়ে হায়া সোফিয়া দেখতে গেলাম। ঢুকতেই পড়লাম এক গাইডের পাল্লায়। বাট দরদামে আর মেলে না। শেষমেশ মাঝামাঝি এক দামে আসতে পারলাম। আমাদের গাইড কাদির জানালো তাঁকে তাঁর বন্ধুরা ‘জেসাস’ বলে ডাকে। আসলেই কাদির একদম জেসাসের মতো দেখতে। এঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম হায়া সোফিয়া মানে হোলি উইজডম। পবিত্র জ্ঞান। ১৬০০ বছরের পুরোনো। আগে আরো দুইবার এটা বানানো হয় এবং ধ্বংস করা হয়। তৃতীয়বারেরটা টিকে গেছে। এটা প্রথমে চার্চ ছিল, পরে অটোমানদের সময়ে চার্চকে মসজিদ বানিয়ে ফেলা হয়, বাইরে দুইটা মিনার তৈরি করে। এরপর–খুব বেশি বছর আগে নয়–আর্লি টোয়েন্টিন্থ সেনচুরিতে এটাকে মিউজিয়াম বানিয়ে ফেলে।

uncovered-angels-painting.jpg……..
আব্রুমুক্ত অ্যানজেল
………
দ্বিতীয় বার যখন হায়া সোফিয়া বানানো হয়, সে সময়কার কিছু স্তম্ভ এখনো রয়ে গেছে। একটা স্তম্ভে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা ভেড়া একটা খেজুর গাছের দিকে যাচ্ছে। এগুলো সবই সিম্বলিক। ভেড়াগুলো হচ্ছে মানুষ, কারণ যীশুকে শেফার্ড বা মেষপালক মনে করা হয়। আর খেজুর গাছটা স্বর্গ। বেশ মজাই লাগলো ইন্টারপ্রিটেশনগুলো! ভেতরেও মজার এবং ইন্টারেস্টিং আরো অনেক কিছু দেখলাম। একটা ওয়াল পেইন্টিং ছিল যেখানে দেখা যাচ্ছে রাজা যীশুকে সোনা উপহার দিচ্ছেন, কারণ তিনি যীশুর কাছ থেকে চতুর্থ বিয়ে করার অনুমতি চাচ্ছেন। হায়া সোফিয়ার ভেতরে উপরে চার কোনায় চারটা অ্যানজেলের ছবি আছে, যাদের মুখগুলো এটা যখন মসজিদ বানানো হয় তখন ঢেকে দেয়া হয়েছিলো। রিসেন্টলি, মাত্র পাঁচ মাস আগে, একটা অ্যানজেলের মুখের আব্রু সরানো হয়েছে, বাকিগুলার সরানোর পথে।

inside-of-blue-mosque.jpg
ব্লু মস্কের ভেতরে

এখানে অনেক ছবি তুলে আমরা এর বাইরেই দারভিশ নামে একটা ছোটো রেস্টোরেন্টে বসে ডোনার কেবাব আর কোক খেলাম। এরপর গ্রান্ড বাজার পর্ব। আমরা তিনজনই এক্সাইটেড। একটু মজা করে শপিং করবো, বাট ওখানে পৌঁছে সবাই সে কী পরিমাণে হতাশ হলাম তা আর বলার না! প্রথমত যেরকম শুনে এসেছি টার্কিশ জুয়েলারি খুবই সুন্দর সেরকম আহামরি কিছুই খুঁজে পেলাম না। তার ওপর যে কটা কিছুটা পছন্দ হলো, সেগুলোর দাম শুনে মোটেও কেনার ইচ্ছে রইলো না। শেষে কয়েকটা সাবান, সেরামিকের বাটি কিনে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। সবচেয়ে মজা হলো এই সবকিছুই আমাদের হাঁটা পথের মধ্যেই।

president-of-croatia.jpg……..
ক্রোয়াশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্বামী
…….
আমরা হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা থেকে আমাদের রাতের খাবার কিনে হোটেলে চলে আসলাম। লিখতে ভুলেই গেছিলাম যে হায়া সোফিয়াতে আমরা দাঁড়িয়ে যখন পোজ দিচ্ছি ছবি তোলার জন্য তখন হঠাৎ সব সিকিউরিটিআমাদের তিনজনকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে লাগল। বুঝলাম ভিআইপি কেউ এসেছে। দিদিভাই সুযোগ বুঝে ভিআইপিদের ছবিও তুলে ফেলল। তারপর গিয়ে গার্ডদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম উনি ছিলেন ক্রোয়াশিয়ার প্রেসিডেন্ট Jadranka Kosor।

আরেকটা ব্যাপার, হায়া সোফিয়াতেও দেখলাম ঝাড়বাতিগুলো অনেক নিচু। আমাদের গাইড জানালেন, আগে এগুলি তেল দিয়ে জ্বালানো হতো, তাই তেল দেওয়ার সুবিধার জন্য নিচু করে বানানো হয়েছে।

এই লেখায় হায়া সোফিয়ার ইতিহাসের এবং ওয়াল পেইন্টিং-এর ইন্টারপ্রিটেশন সবই কিন্তু আমাদের গাইডের কাছ থেকে শোনা।

(কিস্তি ৩)

হোটেল আরারাত, ইস্তানবুল, টার্কি; ২৮ নভেম্বর ২০১০

ওয়েব লিংক
মেখলা হক: আর্টস

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


6 Responses

  1. আন্না পুনম says:

    হায়া সোফিয়া! বাহ! বেশ লাগলো।

    – আন্না পুনম

  2. Faisal says:

    ‘বাট’ গুলো ‘কিন্তু’ হলে ভাল হতো :)

    – Faisal

  3. আকন says:

    হায়া সোফিয়া নয় ওটা হল আয়া সোফিয়া, সেইন্ট সোফিয়া অথবা হাজিয়া সোফিয়া।

  4. sajjad says:

    আমার জানা মতে তুর্কিরা বলে আয়া সফিয়া, তাই ‘হায়া সোফিয়া’ শুনতে একটু কেমন কেমন লাগতেছে। যাই হোক, জুয়েলারি কিনতে যদি গ্রান্ড বাজারে বা এরা যাকে বলে ‘কাপালিচারশি’-তে গেলে নিশ্চিত ভাবেই হতাশ হবেন আর ঠকবেন। তাই ওইখানে না যেয়ে অন্য দোকানগুলোতে যেতে পারেন, যেগুলো ওই বাজারের সীমানার বাইরে।

    আর মনে রাখবেন, এইখানের দোকারদাররা সাধারনত একটু ঠকবাজ টাইপের হয়ে থাকে। বিদেশিদের দেখলেই ঠকানোর একটা টেন্ডেন্সি এদের আছে।

    ভাল থাকবেন, আর আনন্দদায়ক হয়ে ঊঠুক আপনাদের ভ্রমন।

  5. ভাল লাগল লেখাটা। কিন্তু ওখানকার পরিবেশটার আঁচ পাওয়া গেল না। যা আমরা ওরহান পামুকের বর্ণনায় পাই… সেই ইস্তানবুল… অনেকটা যেন পুরনো ঢাকা।

    – আয়শা ঝর্না

  6. আব্দুল্লহ আল মামুন says:

    খুব ভাল লেগেছে……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.