সাক্ষাৎকার

আল মাহমুদ ও জয় গোস্বামীর সঙ্গে আলাপ

raisu | 15 Nov , 2007  

joy-al-131.jpg

ভারতের পশ্চিমবাংলার কবি জয় গোস্বামী গত ১ নভেম্বর বাংলাদেশে আসেন। এ সাক্ষাৎকারের দুই দিন আগে তিনি কবি আল মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন। কবি আল মাহমুদের সঙ্গে তার সে সাক্ষাতকে তিনি তীর্থ দর্শন বলে অভিহিত করেন। দুই দেশের দুই কবিকে এক সঙ্গে বসিয়ে একটি সাক্ষাতকার গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করলে কবি দুজন তাতে রাজি হন। জয়ের বাংলাদেশ ছাড়ার দিন ৭ নভেম্বর দুপুরে কবি আল মাহমুদের গুলশানের বাসভবনে এ সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়।

~

ব্রাত্য রাইসু: মাহমুদ ভাই, বললেন জ্বর আসছে আপনার, সিগরেট খাচ্ছেন যে?

আল মাহমুদ: সিগারেট খাচ্ছি, সিগারেট ছাড়া থাকতে পারি না, কী করবো? মানুষের তো…এটাই তো আছে। আর তো কোনো শখ নাই, কিছু নাই। কোনো কিছু করি না।

জয় গোস্বামী: আপনি সুরা পান করেন না?

মাহমুদ: না। আমি সুরা পান করতে পারি না। সুরা পান করলে আমি অসুস্থ হয়ে যাই।

জয়: আপনার চোখের অবস্থা ভালো নয়, কিন্তু আমি আমার কবিতা সংগ্রহ-এর তৃতীয় খণ্ডটি নিয়ে এসেছি। আপনার কাছে রেখে যাবো। কখনো সময় পেলে একটু উলটে দেখবেন।

মাহমুদ: ঠিক আছে, আমি দেখব।

জয়: কখনো সুযোগ পেলে একটু বইটা পড়ে দেখবেন। এই আর কি।…বাবা তোমার নাম কী? (ঘরে আসা একটি মেয়েকে নাম জিজ্ঞেস করেন জয় গোস্বামী।)

মাহমুদ: এই, এদিকে আসো, নাম বলো। (আল মাহমুদ মেয়েটিকে নাম বলতে বলেন।)

জয়: নাম কী? অ্যাঁ?

মেয়েটি: প্রথমা।

জয়: প্র থ মা! ও বাবা! কী সুন্দর নাম!

মাহমুদ: আমার নাতনী।

জয়: বুঝেছি। কাবেরী (জয় গোস্বামীর স্ত্রী) আসতে পারল না এজন্যে যে আজগে যেহেতু আমরা চলে যাব, আমাদের সমস্ত কিছু এদিক-ওদিক হয়ে গেছে। সকাল থেকে লোক আসতে শুরু করেছে হোটেলের ঘরে। বিভিন্ন কারণে দেখা করতে করতে আমাদের সব পিছিয়ে গেছে। স্নান ট্নান কিছু হয়নি। ও আর কিছুতেই বেরুতে পারল না। ওর খুব ইচ্ছে ছিল যে আপনাকে একবার দেখবে। আমরা তো এলামও অনেক দেরিতে। যে সময়টা দিয়েছিলাম সে সময় আসতে পারলাম না।

মাহমুদ: ঠিক আছে।

জয়: ব্রাত্য, আপনার কাছে কি কলম আছে?

রাইসু: হ্যাঁ।

মাহমুদ: কী চাও তুমি বলো (সাক্ষাৎকারগ্রহীতাকে)?

joy-al-51.jpg
আল মাহমুদ

রাইসু: ইন্টারভিউ নেব একটা। আপনাদের দুজনের। একটা হইল রেকর্ড করব। ক্যামেরাটাও থাকল আর কি।

মাহমুদ: হাতে লিখে নিতে পারলে ভালো হতো।

জয়: ক্যামেরাও থাকল, মেশিনও থাকল। দুই-ই থাকল।

রাইসু : লিখতে হবে না আর। হবে?

মাহমুদ: ঠিক আছে। আমার দিক থেকে অসুবিধা নাই।…তো, জয়?

জয় : আজ্ঞে।

মাহমুদ: দেখলেন ঢাকা শহর?

জয়: আজ্ঞে হ্যাঁ।

মাহমুদ: কেমন লাগলো?

joy-al-6.jpg
জয় গোস্বামী

জয়: আমি ঢাকা যতটুকু দেখতে পেরেছি, আমি প্রধানত তরুণ কবিদের সঙ্গেই ছিলাম। আর আমি শহরের ভিতরে ভিতরে ঘুরে বেড়িয়েছি। এই প্রথম আমার মনে হলো – এর আগেও আমি ঢাকায় এসেছি – যে, ঢাকা শহর তার ধমণীর মধ্য দিয়ে আমাকে একবার ছুড়ে দিচ্ছে আর একবার তার দিকে লুফে নিচ্ছে। খুব ভালো লেগেছে। এদের সঙ্গে ঘুরতে পেরে। আর আপনাকে দেখলাম। একটা ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম কালকে। সেখানে পাঁচিলের উপর পা ঝুলিয়ে একটা মেয়ে বসেছিল।

মাহমুদ : কোথায়?

জয় : ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে।

মাহমুদ : আচ্ছা।

জয় : দেখে খুব ভালো লেগেছে আমার।

রাইসু : মাহমুদ ভাই?

মাহমুদ : নিঃসঙ্কোচে বলো।

রাইসু : সঙ্কোচই নাই। নিসঙ্কোচ কেমনে হবে। এই যে আপনাদের সাক্ষাৎ হইল। জয়দা তো আগে একদিন আসছিল, না?

মাহমুদ : আগে একদিন এসছিল।

রাইসু : মাহমুদ ভাই কি এখন আর স্মরণ করতে পারেন কিনা কীভাবে কবিতা লিখতে শুরু করছিলেন? বা জয়দা?

মাহমুদ: আমি খানিকটা স্মরণ করতে পারবো বোধহয়। কারণ আমি ইশকুলেই কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। স্কুলে যখন পড়ি। লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখতাম আমি। আমাদের বাড়িতে, যদিও খুব রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার, কবিতার একটা জায়গা দিল। কারণ আমার দাদা কবিতা লিখতেন। তাঁর নাম ছিল আবদুল ওহাব মীর। তাঁর নানা শখ ছিল। লড়াইয়ের মুরগী পুষতেন তিনি, লড়াইয়ের মুরগী। আসলি রাতা। আর কবিতা জারী গান লিখতেন। সারী গান করতেন। যেমন একটা জারী গানের ধোঁয়া হলো এরকম, ‘পত্র পাইয়া হানিফায়, পত্র পাইয়া হানিফায় শূন্যে দিল উড়া – দুই ভাই মইরা গেল কবুতরের জোড়া।’ এটা একটা ধোঁয়া। ঘুরে ঘুরে এসে এটা বলতেন। পায়ের মধ্যে ঘুঙুর বাঁধা থাকত। এই পরিবেশে আমি কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম।

জয় : আচ্ছা ব্রাত্য, আমি কি একটা প্রশ্ন এই সূত্রে ওঁকে জিজ্ঞেস করতে পারি?

রাইসু : নিঃসন্দেহে পারেন। জিজ্ঞেস করার দরকার নাই আমারে।

জয়: সেটা হলো যে কবিতায় যাকে চিরকালের মহিমা বলে তা আপনি ইতিমধ্যেই অর্জন করেছেন। এবং সেটা আজ নয়, অনেক দিনই আপনি অর্জন করেছেন। আপনি যে নিয়মিত এখনও লিখে চলেছেন – গদ্য এবং কবিতা – আমি গতকাল আবার আপনার একটি গদ্য রচনা পরলাম পত্রিকায়। এই যে লিখছেন, অন্তঃপ্রেরণা যাকে বলে, এই যে কবিতা ভিতর থেকে আসছে বা গদ্য রচনা ভিতর থেকে আসছে। আপনার কবিতা বিষয়ক গদ্য রচনা ঢাকাতে এসে দুটি পড়েছি। এই অন্তঃপ্রেরণা জন্মে বা আসতে আপনার কোনো অসুবিধা হয় না, না? কী করে তাকে পারেন, এটা একটু বলুন।

মাহমুদ: প্রথম কথা হলো যে আমার চিন্তার বিষয়টা কী দেখতে হবে। আপনি মনে করেন, আপনি কলকাতায় থাকেন, আপনি জানেন আপনার এক বন্ধু আছে ঢাকায় লেখেন। তার নাম আল মাহমুদ। এখন আমার চিন্তার বিষয়টা কী? চিন্তার বিষয়টা না ধর্ম, না কোনো দেশ, না কোনো কিছু। আমার চিন্তার বিষয়টা হলো কাব্য। কবিতা সৃষ্টি করার জন্য সবসময় একটা প্রয়াস আমার মধ্যে সেই অল্পকাল থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। আমি যখন শিখে ফেলেছি যে কবিতা লিখতে হলে বসতে হয়, ঘুরে বেড়ালে চলে না।

রাইসু : এই বসাটা কী রকম মাহমুদ ভাই?

মাহমুদ : যেমন কবিতা নিয়ে নানা কথা বললাম আড্ডা-টাড্ডায়, কিন্তু লিখলাম না। ঘরে ফিরে এসে না লিখলে কবিতা হয় না। তো আমার একটা সবসময় প্রয়াস ছিল যা বলি, যা করি, যা বিনিময় হয় এই শহরে, আমি কবিতা একটা লিখে ফেলবো। আমি সবসময় ভেবেছি আমার যে বিরোধিতা…আপনি তো জানেন, আমার প্রবল বিরোধিতা আছে এবং অত্যন্ত অন্যায় ভাবে বলা হয় যে আমি মৌলবাদী। আমি বরং বিশ্বাস করি। এ দেশে বিশ্বাস করলেই তাকে মৌলবাদী বলা হয়। তো আমি সবসময় ভেবেছি লিখতে হবে। এ কৌশলটা আমার নিজের। অন্য কেউর কাছ থেকে শিখিনি আমি। যে লিখতে হবে, এবং লিখলে ঘরে ফিরে আসতে হবে। আজিজ মার্কেট বসে থাকলে লেখাটা হবে না।

জয় : আমার আরেকটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করে সেটা হলো যে, এই যে এখনো আপনার ভেতরে অবিরল ভাবে যে লেখাটা আসে, এই যে দুটি খণ্ড কবিতা সংগ্রহ আছে আপনার। দুটি খণ্ড কবিতা সংগ্রহের মধ্যে বই আছে প্রায় চব্বিশ পঁচিশটি। আছেই, ছোটদের বই টই ইত্যাদি আছে। কিন্তু এর পরেও আপনার ভেতরে কবিতার যে স্রোত তা কিন্তু বয়ে চলেছে। তো এইটা বাঁচিয়ে রাখবার উপায়টা আপনি বলছেন যে এসে বসা, না? ও আচ্ছা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন।

রাইসু : আপনার অভিজ্ঞতাটা কী?

জয় : আমি ওঁকে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলাম একটা পথপ্রদর্শককে জিজ্ঞেস করার মতো। কারণ আমার এরকম মাঝে মাঝেই হয় যে সমস্তটা শূন্য হয়ে যায়। সমস্তটা। সকাল থেকে বসে থাকি। কিছুই আমার হয় না। এবং আমার জগতে মনে হয় না কোথাও কিছু আছে। বা কখনও একটা লাইনও কবিতা আমি লিখেছি। আপনার সামনে আমি আমার নিজের কবিতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করছি বলে আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু এ কথা ওঠাচ্ছি এজন্য যে এটা আমি আপনার কাছ থেকে জেনে নিতে চাই যে কী উপায়ে যুদ্ধ করা যায় এই নিষ্ফলা বন্ধ্যাত্বের সঙ্গে। যখন তাই বন্ধ্যাত্ব আসে এবং সেটা দীর্ঘ সময় চলে এবং কতগুলো মুখ মনে পড়ে। লিখতে গেলে কতগুলো মুখ মনে পড়ে। এদের মুখগুলো মনে এলে আর লিখতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় লিখে কিছু হবে না। এই যে আমি নিজের বাইরে বেরুতে পারি না, আপনার কাছে আমি যেটা জানতে চাইছি যে এই নিষ্ফলা এই বন্ধ্যাত্ব এইটার সঙ্গে আপনি নিশ্চয়ই পরিচিত। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কে একবার বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন তাঁর সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ-এর ভূমিকায় যে, যে-সমস্যা সুধীন্দ্রনাথের কাছে উত্থাপন করেছি…যে সাহিত্যিক সমস্যা, সব সময়ই দেখেছি, সেটি তার পূর্ব পরিচিত। তো আমি আপনার কাছে যেটি উত্থাপন করেছি, আমার ধারণা আপনি এর মধ্যে দিয়ে গেছেন। এই যে বিরাট একটা শূন্য, মনে হয় যে শেষ হয়ে গেল।

রাইসু : জয়দা, আপনি যে বললেন মুখ মনে পড়ে, এর অর্থ কী?

জয় : কয়েকটা মুখ মনে পড়ে মানে হলো মনে হয় যে, আমার কবিতা যখনই বেরুবে, ছাপা হবে, তখন এরা পড়বে। যখনই এটি মনে হয় তখনই লিখতে ইচ্ছা করে না। এটা হলো এক। দুই নম্বর কথা হলো যে, মানুষ যেমন যাকে ভালোবাসে তার সামনে নগ্ন হতে পারে। বা মায়ের সামনে সেবিকার সামনে, মানে আমরা যখন চিকিৎসার জন্য যাই, সেবিকার সামনে আমরা নগ্ন হতে পারি। ধাত্রীর সামনে আমরা যখন নগ্ন হই তখন আমাদের সে চেতনা থাকে না যে আমি নগ্ন। তো সেবিকার সামনে আমরা নগ্ন হতে পারি আর যাকে ভালোবাসি তার সামনে নগ্ন হতে পারি। এ ছাড়া অন্যের কাছে কি আমরা নগ্ন হতে পারি? পারি না তো। তেমনি মনে হয় মনের এই কথাগুলো আমি যে বলছি, এই যে নিজেকে ওপেন করছি, এটা আমি কার সামনে করছি! এটা মনে করলেই নগ্নতা মানে আপনি জামা কাপড় ভালো করে পরে নেই এই অবস্থায় ঘরে কেউ ঢুকলে আপনার যে সংকোচ হয় এবং আপনার যে রকম ভাবে ভেতরটা গুটিয়ে যায় আমারও কবিতা লিখতে গেলে ওরকম কিছু কিছূ কথা মনে পড়ে আর তখন আমার ভেতরটা গুটিয়ে যায়। আমি একটা নিষ্ফলা বন্ধ্যাত্বের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হই। আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি আমাকে কি একটা পথ দেখাতে পারেন?

মাহমুদ : আচ্ছা, একটা কথা বলব যে, এরকম যে আমি চেষ্টা করি নাই তা না। একটা সময় যায়, কিছু লেখা হয় না। শুধু চিন্তা চিন্তা। কিন্তু সময়টা বয়ে যায়। আমার মনে হয় যে এটা ঠিক বন্ধ্যাত্ব না। এটা হলো সৃজনশীলতার জন্যে সময়ের ভেতরে সময়ের মধ্যে একটা অপেক্ষা। আমি তো মাসের পর মাস লিখতে পারিনি। আমার নিজেরই মনে হতো আমি বোধহয় ফুরিয়ে গেছি, শেষ হয়ে গেছি – এসব। ভয় লাগতো আমার। কিন্তু আবার তো লিখেছি। লেখাটা শুরু করে দিয়েছি। আমি ফিরে আসতে পারি। সময়ের ভেতর থেকে সময়ের কিনার ঘেষে আমি বেরিয়ে আসতে পারি। আমি লিখি, পড়ি।

জয় : সময়ের ভেতর থেকে সময়ের কিনার ঘেষে আমি বেরিয়ে আসতে পারি! (স্বগতোক্তি) আচ্ছা।

মাহমুদ : আর আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো নারী। এবং এটা অকপটে বলা উচিত।

জয় : এবং সেটা সৌন্দর্য। আপনার কাছে নারী মানে সৌন্দর্য।

রাইসু : মাহমুদ ভাই কি স্বীকার করেন কিনা যে নারী মানেই সৌন্দর্য?

মাহমুদ : না, নারী মানে সৌন্দর্য এটা আমি বলি না। কিন্তু নারী আকর্ষণ করে।

জয় : না, আমি বলছি কবিতায় এই যে নারীর উদ্দীপনা আপনার মধ্যে যা তৈরি করে তা দিয়ে যে কবিতাটা লেখেন সেটা একটা সৌন্দর্যের উপাসনা।

রাইসু : আল মাহমুদ কী বলতে চাচ্ছেন, সাবজেক্ট হিসাবে নারী না উদ্দীপনার জন্যে নারী? মাহমুদ ভাই কোনটা বলছেন?

মাহমুদ : দুইটাই মিলে মিশে থাকে অবশ্য।

রাইসু : এবং এইটা সব সময় সৌন্দর্য কিনা। বা সৌন্দর্যের বাইরে নারী আছে কিনা?

মাহমুদ : ব্যাপারটা হলো তুমি সুন্দর বলো কাকে? কী কী বিষয়কে সুন্দর বলো। তুমি যেইটা সুন্দর বলো সেইটা কি সত্যিই সুন্দর। এ প্রশ্নটা করতে হবে। অনেক কবিরা যাকে সুন্দর বলেছেন সেটা প্রকৃতপক্ষে তার কাছেই সুন্দর। অন্যের কাছে সুন্দর ছিল না।

রাইসু : মাহমুদ ভাই, সেক্ষেত্রে যখন আপনার কাছে নারী আকর্ষণীয়, জয়দা যদি তখন বলেন সেই নারী সুন্দর বইলাই আকর্ষণীয়…

মাহমুদ : সেইটা উনি বলতেই পারেন।

রাইসু : আপনার কী মত এই ব্যাপারে?

মাহমুদ : সুন্দরটা নির্ভর করে তো আমার আকাঙ্ক্ষার উপর। আমি কামনা করি। আমি চাই। আমি শুয়ে পড়তে চাই তার সাথে।

রাইসু : সেইটা কি সুন্দর-অসুন্দর নির্বিশেষে আপনি চান না?

জয় : কী অপূর্ব! কী অপূর্ব!

মাহমুদ : এই যে আমার যে আকাঙ্ক্ষা, এই যে ভোগ করার যে লালসা, আর্টের সর্বক্ষেত্রে আমার মনে হয় এইটা আছে। রবীন্দ্রনাথেও আমি খুব ভালো করে পাই। রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বেশি এসব বিষয় নিয়ে ভেবেছেন। কিন্তু বলেছেন অত্যন্ত কম। লিখেছেন অনেক বেশি।

joy-al-71.jpg
ব্রাত্য রাইসু, জয় গোস্বামী ও আল মাহমুদ

রাইসু : দুয়েকটা উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের, এরকম? মনে পড়লে বইলেন। আমি জয়দারে মাঝখানে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি। জয়দা, আপনি যেটা বললেন যে, সৌন্দর্য ব্যতিরেকে নারীর প্রতি যে লালসা এটারে শিল্পের জন্য আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কিনা? বা শিল্পে এইটা থাকে কিনা?

জয় : আমার ক্ষেত্রে ব্রাত্য একটা কথা বলার দরকার। সকল মানুষের ক্ষেত্রে যেমন একই রকম খাদ্যরুচি নয়, সকল দেশের মানুষের পক্ষে যেমন পোশাক পরিচ্ছদ গাত্রবর্ণ যৌনরুচি একই রকম নয়, এমনকি একই দেশে একই সমাজের বিভিন্ন মানুষের যৌনরুচি ভিন্ন হতে পারে। তেমনি শিল্পের ক্ষেত্রে কোনটি কার পক্ষে সর্বোচ্চ উদ্দীপক সেইটে বলা যায় না। আর একটি মেয়ে আপনার কাছে আসায়, তার সঙ্গে সময় কাটানোয় আপনি উদ্দীপিত বোধ করেছেন এবং কবিতা লিখেছেন। না, ব্রাত্য রাইসুর কথা বলছি না। আপনি হয়তো কোনো মেয়ের দ্বারা উদ্দীপিত হয়েই কবিতা লিখেন নি। এমন হতেই পারে। না, এটা হতেও পারে। ধরুন, অমল বাবু, তিনি একটি মেয়ের দ্বারা উদ্দীপিত হয়ে কবিতা লিখলেন।

মাহমুদ : কে?

জয় : ধরা যাক একটা নাম বলছি অমল বাবু। তিনি তার জীবনে একটি মেয়ে আসায় উদ্দীপিত হয়ে কিছু কবিতা লিখলেন। কবিতাগুলি উৎকৃষ্ট হলো। এইবার কমলবাবু হয়তো সেই মেয়ের সঙ্গেই মিশে কোনো আকর্ষণই বোধ করেন নি। একেবারে একই জিনিস কিন্তু একটি মেয়ের ক্ষেত্রেও হতে পারে, আরেকটি পুরুষের ক্ষেত্রেও। সে তার কাছে উদ্দীপক নয়। ফলে শিল্পে সর্বাবস্থায় সর্বকালের জন্য এইটি বা ওটি একমাত্র উদ্দীপক বা প্রধান উদ্দীপক এমন কিছু জিনিস আমি ঠিক জানি না। কারণ মানুষ তো অনেক রকম। মানুষের উদ্দীপনাও অনেক রকম।

রাইসু : কিন্তু আমি একটু বলে নেই জয়দা, উদ্দীপনার…

মাহমুদ : সিগারেট দাও। সিগারেট দাও একটা।

রাইসু : সিগারেট খাবেন আবার?

মাহমুদ : সিগারেট খাই না! বসে বসে উত্তেজিত করে ফেলছো।

রাইসু : কী করছি?

মাহমুদ : উত্তেজিত করে ফেলছো।

রাইসু : আমি সেইটা বলতেছি না। উদ্দীপক হিসাবে মেয়ে থাকল কী কুকুর থাকল কী ফুলগাছ থাকল কিছু যায় আসে না। এইটারে যখন আমরা সৌন্দর্যের সঙ্গে একীভূত করতে যাই তখন সাবজেক্ট হিসাবে কী আসল তাতে যায় আসে।

জয় : আপনি বলছেন ‘আমরা’। ‘আমরা’ বলে তো কবিতায়…কদিন আগে একজন ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ‘ব্রাত্যরা যা লিখছে তা কি আপনি পড়েছেন?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তা আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, ‘আপনি কথাটা কী বললেন? ব্রাত্যরা?’ ‘ব্রাত্য লিখছে’ এ কথাটার একটা মানে। আমি ওর নাম করছিলাম, ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই বলে। তখন বললেন, ‘ব্রাত্যরা যা লিখছে তা কি আপনি পড়েছেন?’ তো সেটা উনি বললেন। তখন আমি বললাম, ‘কী বলছেন আমাকে? আরেকবার বলুন।’ বললেন, ‘না ব্রাত্যরা মানে উনি এবং ওর বন্ধুরা যা লিখছে সেগুলো পড়েছেন?’ আমি বললাম, ‘পড়েছি, কিছু কিছু পড়েছি। আরো পড়তে চাই। কিন্তু যখন একজন লোক লিখে তার যতই বন্ধু থাক সে একলাই লেখে তার নিজের কথাটি।’ ‘ব্রাত্যরা’, এখানে ‘কবিরা’ বলে বা ‘আমরা’ বলে সৌন্দর্যকে দেখতে চাই কিনা…একটি খোঁড়া মেয়ের জন্য একটি ছেলে কীভাবে পাগল হয়েছিল আমি তাকে দেখেছি। তার জন্য অন্য ছেলেরা পাগল হয়নি। এইবার প্রতি মানুষ ভেদে সৌন্দর্য জিনিসটা বদলে যায়।

রাইসু : আমি আসলে এইখানে ফাঁকের মধ্যে পইড়া আছি। আগাইতে পারতেছি না। আপনারে বোঝাইতে পারতেছি না। এইটারে আমি সৌন্দর্য বলতে রাজি না।

জয় : আপনি রাজি না, কিন্তু আমি বলছি সেইটা আমার কাছে সৌন্দর্য।

রাইসু : এই যে বিভিন্ন রকম আকর্ষণ হচ্ছে, এইটার কারণ হচ্ছে সৌন্দর্য, আপনি কি এমন বলতেছেন? আমি সেইটাই জানতে চাইতেছি।

জয় : আমি বলছি এইটাই যে আমার যেই মেয়েটিকে সুন্দর লাগল তার মানে তার সৌন্দর্য আছে একথা আমি বলছি না।

রাইসু : মাহমুদ ভাই যখন বলেন নারী তার কাছে আকর্ষণীয় তখন উনি সৌন্দর্য়ের কথা বলতেছেন না কিন্তু। আমি সেই পার্থক্যটা রাখতে চাইতেছি। সেটা আপনি কীভাবে দেখেন?

জয় : আমার কাছে সুন্দর লাগল।

রাইসু : উনি কিন্তু লালসার কথা বলতেছেন। সৌন্দর্যের কথা বলতেছেন না।

জয় : এইবার সুন্দর লাগার পরে লালসা জন্মাতে পারে।

রাইসু : মাহমুদ ভাই কি মনে করেন সুন্দর লাগতে হবে লালসা জন্মানোর জন্য।

জয় : ‘হবে’টা বলি নি। আমি ‘পারে’ বলেছি। আপনি শুনুন, ওই লোক যেমন ‘ব্রাত্যরা’ বলতে পারে আপনি তা পারেন তা আমি ভাবিনি। আপনি সেই ভুল করে যাচ্ছেন। আশ্চর্য! সেটা হলো ‘কবিরা’ বা ‘আমরা’ সেটাকে সুন্দর বলে মনে করব। অথবা আমি বলছি ‘তার’ লালসা জাগতে পারে। আবার লালসা নাও জাগতে পারে। এমনকি বিষাদ হতে পারে। আমি যে আপনাকে কথাগুলো বলছি কথাগুলো বলছি আমার অভিজ্ঞতা থেকে, আমার এইগুলো এইগুলো হয়েছে। এইগুলো যে সব লোকের হয়, তার মানে এটা হবেই এমন ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না।

মাহমুদ : কথা হলো, আমি খুব বিবেচনা করে দেখেছি একজন কবি তার সময়ে তার আশেপাশে কোনো বিশেষ একটি মেয়েকে – অন্যান্য মেয়ের প্রতি তার লোভ ছিল কিন্তু একটি মেয়েকে নিয়ে কবিতা লিখেছে। লিখেছে এবং সেটা কবিতা হিসেবে গ্রাহ্যও হয়েছে। এখন এ মেয়েটির পরমায়ু কত? মেয়েটি কিছুদিন পরে হয়তো মরে যাবে। ধূলায় মিশে যাবে। কিন্তু সে কখনো ধূলায় মেশে না। কারণ একজন কবি, কোনো এক সময় তার রূপের গুণগান গেয়েছিল। সে অত রূপসী না আসলে। পরী-টরি না। কিন্তু একজন কবি তাকে পছন্দ করেছিল সেজন্য সে আর মরে না। সে কবর থেকে উঠে উঠে আসে। দশ বছর পর আরেকজন কবি তাকে কবর থেকে তুলে আনে। কারণ তার উপর একজর কবি কবিতা লিখে গিয়েছিল। আমি জানি না এটায় সুন্দরের কী ইয়ে, মানুষের কামনা-বাসনা থেকে সুন্দরের ধারণা সৃষ্টি হয়।

জয় : তা হতে পারে। আপনার একথা আমি মেনে নিলাম। সেক্ষেত্রে ব্রাত্য যেটা বলছেন তার একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। ব্রাত্য বলছেন যে আসলে সুন্দর যেটা লাগছে…দুজনে কিন্তু আপনারা একই জায়গায় গেলেন। বাহ! এবার বুঝতে পারলাম। এবার আমি ধরেছি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। এই যে তার প্রতি আকর্ষণটা জন্মাচ্ছে তা আসলে এক ধরনের আমার পক্ষে তখন পর্যন্ত না-জানা লালসা।

রাইসু : সৌন্দর্যের বোধ জন্ম নেয় নাই কিন্তু আকর্ষণ বা লালসা তৈরি হইছে এই রকম তো হয়। আপনার কবিতায়ও আছে নিশ্চয়ই।

জয় : আমি বোকার মতন ভালোবেসে ফেলি। সেটা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তারপর সেখান থেকে বেরুতে আমার বড্ড কষ্ট হয়।

রাইসু : জয়দা অনেক অনুভূতিশীল কবি। সংবেদনশীল কবি। মাহমুদ ভাইয়ের অবস্থা কী? আপনি কি বন্ধুরা আঘাত করলে বেদনা পান?

মাহমুদ : বন্ধুরা আঘাত করলে বেদনা পাই। যেটা সত্য সেটা বলছি। একেবারে অন্যায় ভাবে আঘাত করে তো বন্ধুরা। যখনই আঘাত করে অন্যায় ভাবে আঘাত করে। পক্ষে কেউ দাঁড়াতে চায় না। ব্যাথা পাই। কিন্তু একটা ক্ষমতা আছে। আমি কবিতা লিখি বলেই আমার হয়েছে। সেটা হলো, উপেক্ষার শক্তি।

জয় : উপেক্ষার শক্তি। এইগুলো শেখার কথা। আমি যে আপনার কাছে শিখতে এসেছি এইগুলো শিখব বলে। এখন আর জানি না এই বয়সে শিখতে পারব কিনা।

joy-al-19.jpg

২.

রাইসু : পুরনো কবিদের ব্যাপারে আপনাদের অবস্থানটা একটু জানতে চাই। প্রথম জীবনে কাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। প্রথমে জয়দা বলেন। তাপরে মাহমুদ ভাই বলবেন।

জয়: আমার ক্ষেত্রে মনে হয় যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম। আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী ছিল। সেই দেখা থেকেই আমি…আর ওই রবীন্দ্রনাথের যে কাটাকুটিগুলো ওগুলো দেখে মনে হলো, বেশ একটা লিখল। কত যন্ত্রণায় পড়লে ওই কাটাকুটির মধ্য দিয়ে যেতে হয় সেটা অনুভব করার বয়স তো তখনও হয় নি। জিনিসটা আমি ধরতে চাইছি ধরতে পারছি না। বার বার সে অপসৃয়মান। সরে সরে যাচ্ছে। তাকে আবার আনতে চেষ্টা করছি। আবার একটা বিকল্প মনে আসছে। সেই অপসৃয়মান বিকল্প, সেটাকে আবার ধরতে চাচ্ছি এইভাবে : আমি যখন তের নম্বর লাইনটা লিখছি আমি জানি না সতের নম্বর লাইনটা কী। ষোলো নম্বর লাইনটা যখন তৈরি হলো আমার দ্বাদশ লাইনটা চেঞ্জ করতে হলো। এই যে অবস্থা! এবং সে কবিতা উনিশ লাইনে শেষ হবে নাকি সাইত্রিশ লাইনে তা আমি জানি না। এই যে অবস্থার মধ্যে চলা – এই যন্ত্রণা তো রবীন্দ্রনাথকে পেতে হয়েছে। রক্তকরবীর মত বইটি ন’ বার লিখে দশ বারের বার লিখেছেন। তখন এইসব জিনিসগুলা তো আকর্ষণ করতোই।

রাইসু: মাহমুদ ভাইয়ের ক্ষেত্রে কী রকম?

মাহমুদ: আমার ক্ষেত্রেও প্রায় কাছাকাছি। আমি রবীন্দ্রনাথ দ্বারাই আমার অল্প বয়সে উদ্বুদ্ধ হয়েছি, দোলা লেগেছে রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু সত্য হলো এই, তখনকার সময়ে হঠাৎ কাজী নজরুল ইসলাম, একজন লোক, যিনি এসে কিছু কবিতা লিখলেন। এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনকে ইয়ে করে তিনি এগোলেন। এ ধরনের লোকের…তিরিশের কবিরা করল কী, প্রথম নজরুলের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হল। কিন্তু তারা সবাই ছিলেন ভালো ছাত্র। সাহিত্যের ভালো ছাত্র, তাদের দরকার ছিল ভালো চাকরি, আরামের জীবন। নজরুলের পিছনে গেলে সেটা কী করে হয়? কিন্তু নজরুলই তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল, তিরিশের কবিদের। তো তারা নজরুল থেকে ফিরে এসে রবীন্দ্র-পূজা শুরু করে। তারা বুদ্ধিমানের মত কাজ করে।

রাইসু: তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রপূজা শুরু করল কি? তারা তো অনেকাংশে রবীন্দ্রনাথ থিকা বেরুইতে চেষ্টা করল।

মাহমুদ: রবীন্দ্রনাথ থেকে বেরুবার চেষ্টা করেছিলেন, এটা হলো নজরুলের দিকে ঠকে। কিন্তু অতি অল্পকালের মধ্যে তারা বুঝলেন যে নজরুল হলো তাদের জন্য বিপজ্জনক।

রাইসু: এটা কি তাদের ব্যাপারে আপনার কোনো সাইকোলজিক্যাল রিডিং, না তাদের লেখালেখির মধ্যে আপনি এইটা পান, মাহমুদ ভাই?

মাহমুদ: দেখো, অত খোঁজ করে তো বলতে পারব না আমি…

রাইসু: মানে আপনার মনে হয়…?

মাহমুদ: আমার মনে হয়। যে তিরিশের কবিরা সবাই ছিলেন সাহিত্যের ভালো ছাত্র, সবাই। এবং তাদের ভালো চাকরি দরকার ছিল। কিন্তু তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এইজন্য তারা নজরুলের দিকে প্রথম যাইতে চাইলেন কিন্তু দেখলেন যে জেল-জুলুম নজরুলের মধ্যে…নজরুলের পশ্চাদ্ধাবন করা হলো এগুলোকে আহবান করা।

রাইসু: এটা কি মাহমুদ ভাই…

মাহমুদ: দাঁড়াও, আমি কথাটা শেষ করি…। তারা দ্রুত নজরুল থেকে ফিরে এলেন। এসে রবীন্দ্রপূজায় নিমগ্ন হলেন। তারা ঠিকই করলেন। কারণ কাজী সাহেবের যে জীবন এটা অনুসরণীয় ছিল না। আমি মনে করি না।

রাইসু: মাহমুদ ভাই, বলব এবার?

মাহমুদ: হ্যাঁ, বলো।

রাইসু: এটা কি এই জিনিস কিনা, আমাদের বাঙালি মুসলমানদের যে একটা তুলনার ব্যাপার আছে, গ্রেট তুলনা। যে রবীন্দ্রনাথ বড় না নজরুল বড়; ওইখান থিকা আসে নাই তো আপনার এই বিচার?

মাহমুদ: না, ওইখান থেকে আসে নাই। কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি যে রবীন্দ্রনাথ কত বড়। এবং এটা কাজী সাহেবও জানতেন।

রাইসু: আপনি উদ্বুদ্ধ হইলেন কারে দিয়া? আপনি কি নজরুল দিয়া উদ্বুদ্ধ হইলেন না রবীন্দ্রনাথ দিয়া?

মাহমুদ: সত্য কথা বলতে কী, আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম কিন্তু মুশলমান (উচ্চারণ-এ গুরুত্ব দেয়ার জন্য স-র পরিবর্তে শ ব্যবহার করা হলো – ব্রা. রা.) ছেলে হিসাবে, একটা পরিবারে মুশলিম ছেলে হিসাবে আমি নজরুল দ্বারাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। এটা হলো বাস্তব সত্য। অগ্নিবীণা এইসব তখন আমাদের ঘরে আসতে শুরু করেছে। আমরা নজরুলকে নিয়ে উন্মত্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু, অল্পকালের মধ্যে আমাদের কতগুলো বিচার-বুদ্ধি দানা বাঁধে। আমার হাতে চলে আসে একটা বই। ধূসর পাণ্ডুলিপিধূসর পাণ্ডুলিপি বলে একটা বই আসে। আমি দেখলাম যে অন্য রকম কবিতা আছে।

রাইসু: জয়দা পানি খাবেন?

জয়: না, এই একই রকম অভিজ্ঞতা তো আমারও তাই আমি উত্তেজিত বোধ করছি। মানে আমার মা একটা স্কুলে পড়াতেন। স্কুলের হেড মিট্রেস ছিলেন তিনি। এবং মায়ের মায়ের খুব দাপট ছিল। আমাকে যেমন দেখছেন যে আমার কোনো দাপট নেই। না সত্যি, আমি খুব যে ধরনের মানুষ আর কি, যে ভীরু প্রকৃতির আমার মা তেমন ছিলেন না। আমার মা খুবই যোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধ করতে পারতেন জীবনের সঙ্গে। দুটি বাচ্চা নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন। তখন আমার বয়স সাড়ে সাত আর আমার ভাইয়ের বয়স পাঁচ। এই অবস্থা থেকে উনি খুবই যুদ্ধ করে সংসার করেছেন। বড় যে পরীক্ষাগুলি হতো অর্থাৎ হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা তাতে সমস্ত স্কুলের টিচাররা গার্ড দিতেন। আমি একটা ছোট্ট টাউনে থাকতাম। ছোট মফস্বল টাউন। সেখানে চারটা পাঁচটা ছটা স্কুল ছিল। ছোট ছোট স্কুল। সেই স্কুলে প্রত্যেকটা ভেনুতে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা নেয়া হতো। তাকে প্রতিদিন ইনভিজিলেশন দিতে হতো। এই ইনভিজিলেশনের পর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সকলে মিলে একসঙ্গে হতো। ছটা স্কুলে প্রচুর সিট পড়েছে। আর তাতে দিদিমনিরা আর স্যারেরা মানে শিক্ষকরা এবং শিক্ষয়িত্রীরা, তারা গার্ড দিতেন। আমার মা ছিলেন চিফ ইনভিজিলেটর। এবং সে একটা ভেনুর প্রধানও ছিল। তারপর এই যে ছটা সাতটা ভেনুতে পরীক্ষা হলো, যারা পরীক্ষায় গার্ড দিলেন তাদের সবাইকে নিয়ে সোশ্যাল গ্যাদারিং একটা হতো একেবারে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর। তখন খাওয়া-দাওয়া হতো সন্ধেবেলা। দিদিমনিরা গান গাইতেন। দিদিমনিরা সেদিন চুলে ফুল-টুল লাগিয়ে এসেছে। কিছু কিছু অল্পবয়েসী ছাত্রী সাহায্য করতে আসতো। অল্পবয়েসী ছেলেরাও থাকত, তরুণরা। তারা সাহায্য করতো। মাষ্টার মশাইরা যারা আবৃত্তি করতে জানতেন তারা আবৃত্তি করতেন। যারা একজন দুইজন গান গাইতে জানতেন তারা গান গাইতেন। এই হলো অবস্থা।

এই পুরো জিনিসটা দেখাশোনা করতেন একজন ভদ্রলোক, তিনি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ওখানকার। তার ভার ছিল পুরোটা দেখার। সেই সোশ্যাল গ্যাদারিং যখন হচ্ছে তখন ভদ্রলোককে বলা হলো আপনি কিছূ বলুন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে খানিকটা এদিক-ওদিক তাকালেন। বুশ শার্ট পরা ছিলেন ভদ্রলোক। এদিক-ওদিক তাকালেন। তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তো গান-টান জানি না। আমি একটা কবিতা বলছি।’ এই ‘কবিতা বলছি’ কথাটা এই প্রথম শুনলাম। তার আগে শুনতাম ‘কবিতা আবৃত্তি করছি’, সব সময়। বলে, তিনি একটা কবিতা আস্তে আস্তে বললেন। সেই কবিতাটা হচ্ছে ‘বনলতা সেন’। তখন আমার তের চোদ্দ বছর বয়স। বা পনেরো। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবলাম, কবিতা কি এরকমও হয়। খুব অবাক হয়ে ভাবলাম, এটা কী রকম বললো! কিন্তু মনে একটা রোমাঞ্চ হলো একবার শুনে। তারপর আমি ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, এই কবিতাটা কোথায় আছে। বলে একটা বইয়ে আছে এই নামে। এইবার বইটা পড়লাম। বইটা পড়ে দেখলাম, মেয়েদের নাম ধরে ডাকছে। ‘অরুণিমা স্যান্যালের মুখ’। নাম ধরে ডাকছে। এই আস্তে আস্তে…

রাইসু: পরবর্তীকালে আরো পুরোনো কবিতা কি আপনারা পড়ছিলেন? আপনারা দুজনই তো মনে হয় পড়ছেন। ধরেন, মধুসূদন বা ভারতচন্দ্র। এঁদের ব্যাপারে আপনাদের অবস্থানটা কী ধরনের?

মাহমুদ: আমি অবশ্য আমার কথা বলতে পারি। সব সময় পুরোনো কবিতা পড়তে আমার ভালো লাগে। আমি শাহ মোহাম্মদ সগীর, সেই দশম শতকের কবি, তার ইফসুফ জুলেখা এইসব আমি পড়তাম।

রাইসু: এগুলি কি পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোথাও পড়তেন?

মাহমুদ: পাঠ্য বইয়ে তো কাছাকাছিই নাই। পাঠ্য বই তো অন্য রকম। এসব জোগাড়ও করতাম। যেমন এক জায়গায় আছে। শাহ মোহাম্মদ সগীরের কবিতায়। ওঁর ছেলেকে হারিয়ে ফেলেছেন। সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তো বলছেন,`ঘর ঘর যাও, পুত্র যেথা পাও, পুত্র হেন ভিক্ষা মাগো। কোন ধর্মশিক্ষা পুত্র দিব ভিক্ষা, তান পদগত লাগো।’ তার পায়ের মধ্যে পড়ে যাব। এইটা শাহ মোহাম্মদ সগীরের ইউসুফ জুলেখার। ইউসুফ জুলেখাকে খুব অশ্লীল কবিতা বলা হয়। কিন্তু আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। এত উপমা…এবং শব্দের যে প্রয়োগ! বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে যাই। এবং এরা ছিলেন খুবই উদার।

জয়: ওই যে পাঁচালীর মত একটা ফর্মে লেখা?

মাহমুদ: হ্যাঁ। এইভাবে আমি চর্যাপদ থেকে এ পর্যন্ত…।

রাইসু: মধ্যযুগের কবিতা, বৈষ্ণব কবিতা পড়ছেন আপনে?

মাহমুদ: হ্যাঁ সব, প্রায়। বলা যায় যে আমি খুব স্বাদ গ্রহণ করে পড়েছি। এ ছাড়া আমাদের এখানে একটা কালীবাড়ি আছে। কালীবাড়িতে পদকর্তারা গান গেয়ে খঞ্জনি বাজিয়ে এই যে, ‘নিচোল বলিয়া আঁচলে চলিনু পড়িনু অগাধ জলে, লছমি চাহিতে দারিদ্র বেড়ল মানিক হারানু হেলে, সখী গো, কী মোর করমে লিখি?’

জয়: এই আমরা তো গোসাই বাড়ির, আমাদের বাড়িতে এই কীর্তন এবং পদাবলী এবং বৈষ্ণব কবিতার মোটা মোটা বই আছে। আমি চৈতন্য চরিতামৃতও পড়েছি অল্প বয়সে। বুঝেছেন, পড়ে এই যে, ‘কৃপা করি করো আত্মসাৎ’ কেমন! এটা এখন আমি বুঝতে পারি যে ছিল, বাড়িতেই ছিল… আমি একটা অন্য কথা জিজ্ঞেস করছি। এ কথাটা বার বার ভুলে যাচ্ছি। গাড়িতে যখন আসছিলাম ওর সঙ্গে তখন ভেবেছিলাম এ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করব আপনাকে। আমার ভিতরে একটা জিনিস, একটা প্রশ্ন দানা বাঁধে। সেটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের পরে আমাদের যে…ওই যে তিরিশের কবিদের নিয়ে কথা হচ্ছিল, তিরিশের কবিদের থেকে এখন পর্যন্ত যারা বড় কবি আছেন, শক্তি-টক্তি সমস্ত আমি ধরেই বলছি—এই পর্যন্ত, একটা জিনিস আমি দেখতে পাই, আপনি এটা লক্ষ্য করেন কিনা জানি না, আমি জানি না ব্রাত্যও এটা লক্ষ্য করেন কিনা। সেটা হচ্ছে কবিরা নিজেদের কবিতার জন্য একটা ভাষা তৈরি করেন বা করতে পারেন বা সেটা জন্মায় বা সেটা সৃষ্টি করেন। তৈরি বলব না, সৃষ্টি করেন। তারপর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই ভাষাটিতে তারা সন্তর্পণে অথবা যথেচ্ছ—এই ‘সন্তর্পণে’ এবং ‘যথেচ্ছ’ দুটি কথা যে কোনো ধরনের কবি সম্বন্ধে বলা যাবে না। শক্তি সম্পর্কে বলা যায় ‘যথেচ্ছ’ কথাটা। আবার ‘সন্তর্পণে’ কথাটা বলা যায় বিষ্ণু দে বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কে—অনুসরণ করে চলেন। অলোকরঞ্জনকেও আমরা তাই দেখি। তারপর বিশেষ পালটে আর যান না।

আমাদের সমসাময়িক কবিরাও আছেন। আমি এখানে যাদের নাম করছি এঁরা খুবই ভালো কবি, আমার সমসাময়িক কবি। যেমন ধরা যাক, মৃদুল দাশগুপ্ত বা রণজিৎ দাশ। তাঁদের কবিতাও খুবই ভালো, এবং মন দিয়ে পড়ি। খুবই ভালো লাগে। কিন্তু ধরা যাক একটা ভাষা, সেই বাড়িটি তারা নিজে বানিয়েছেন, এমন নয় যে বাড়িটি অন্য কেউ বানিয়ে দিয়ে গেছে, তার নিজের জিনিস। কিন্তু সেইটার মধ্যে দিয়েই তারা চলতে থাকেন। এই একটা।

দ্বিতীয় হলো, কিছু একটা ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন জীবনানন্দের ক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে বার দুয়েক এরকম পরিবর্তন হয়েছে। শঙ্খ ঘোষের ক্ষেত্রে দুয়েক বার হয়েছে—কয়েকবার হয়েছে, কয়েক বার বলব। পাল্টে পাল্টে গেছে। আপনার ক্ষেত্রে হয়েছে। পাল্টে পাল্টে গেছে। কিন্তু প্রধান জিনিসটা থাকে না-পাল্টানোর দিকে, একই স্রোতে বয়ে যাওয়ার দিকে। কিন্তু আমাদের যিনি প্রধান কবি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আমরা দেখি সে ভেঙেচুরে পাল্টে এদিক দিয়ে ওদিক দিয়ে সেদিক দিয়ে, নানা পদ্ধতিতে যাচ্ছে। আমি এই বিষয়ে আপনার কথা একটুখানি শুনতে চাই। কবিদের মধ্যে কি একটা এরকম প্রবণতা থাকে যে একটা দিয়েই সে চলেছে, পথ চলেছে? রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে এটা ঠিক নয়। ঠিক নয় মানে রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই পাল্টেছে।

রাইসু: রবীন্দ্রনাথ প্রধান কবি এইটা কি মাহমুদ ভাই মানেন?

মাহমুদ: রবীন্দ্রনাথ হলো আধুনিক বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠাতা। আমার নিজের মতে, আধুনিক বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথই সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের আয়োজন যে রকম তিনি সেই প্রয়োজনটাও পূরণ করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ অনেক কাজ করে গেছেন। যার কোনো তুলনা হয় না। এত বেশি কাজ করেছেন! ছন্দের দিক দিয়ে তো অপূর্ব দোলাচল সৃষ্টি করে মোহগ্রস্ত করে গেছেন বাঙালী জাতিকে।

এখন রবীন্দ্রনাথের পরেও তো কবিতা লেখা হয়েছে, তিরিশের কবিতা। তিরিশের কবিদের দোষটা কোথায় ছিল? তিরিশের কবিরা, আমার ধারণা এটা, ভুলও হতে পারে, যে তিরিশের কবিরা প্রকৃতপক্ষে বাঙালী ছিলেন না। এটা তারা স্বীকারও করেছেন। যখন স্বীকার করেছেন তখন তাদের সবারই ষাইট পেরিয়ে গেছে। তাদের কোনো দেশ ছিল না। তিরিশের কবিদের কোনো দেশ ছিল না। আপনি দেখেন, বিষ্ণু দে বলেছেন, ‘আমরা খুঁজেছি হরেক বইতে আপন দেশ/দেশের মানুষ ঘুরিয়েছি শুধু ডাইনে বাঁয়ে।’ তারপরে কী যেন একটা লাইন আছে ‘হয়রান হয়ে খুঁজছি শেষ…ফিরব মোড়ল এখন বলো সে কোন গায়!’ তারা বুঝতে পেরেছিলেন, কবিদের একটা দেশ দরকার হয়। যখন তারা এটা বুঝতে পারলেন যে কবিদের একটা দেশ দরকার হয় তখন সবারই ষাইট বছর পেরিয়ে গেছে। আপনি দেখেন বুদ্ধদেব বসুকে সবচেয়ে বেশি আমরা পড়েছি। বুদ্ধদের বসু কিন্তু দেশে ফিরতেই চাইলেন। তারও একটা দেশ দরকার ছিল। কিন্তু তিনি ফিরলেন কোথায়? মহাভারত-এ!

রাইসু: সে তো এক অর্থে আরো বড় দেশ।

মাহমুদ: না, প্রকৃত দেশ যেইটাকে তিনি ভাবতেন, যেমন বাংলাদেশ, এইটাতে তো তিনি ফিরলেন না। তিনি ফিরলেন মহাভারত-এ। মহাভারতকেই দেশ হিসেবে বিবেচনা করলেন। আমি দোষ বলছি না।

জয়: না এটা দোষ নয়।

রাইসু: সবারই একটা পটভূমি দরকার হয়।

মাহমুদ: তো আমার মনে হয় প্রকৃত বাঙালী, যাদের দেশ আছে এরকম কবিদের মধ্যে নিশ্চয়ই শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন। এবং আমি আছি এইদিকে। আর জয় গোস্বামীকে এটা মনে হয়েছে। যে একটা…এরা দেশ খুঁজে পেয়েছে, এবং দেশটা হলো বাংলাদেশ।

রাইসু: মাহমুদ ভাই, জয়ের কবিতা কী পরিমাণ আপনি পড়ছেন?

মাহমুদ: আমি পড়েছি।

রাইসু: কী মনে হয়, জয়ের কবিতা সম্পর্কে যদি আপনি বলেন?

মাহমুদ: আমি খুব উদ্দীপনামূলক একজন জীবন্ত কবি হিসেবে, বাঙালি কবি হিসেবে গ্রাহ্য করি জয় গোস্বামীকে। জয় যখন তাঁর প্রথম দুইটা বই বের করেন তিনি আমাকে পাঠিয়ে ছিলেন। আমি মতামত জানাই নি, কিন্তু খুব উপভোগ করেছি। এটি আমার মনে আছে।

রাইসু: জয়দা, মাহমুদ ভাইয়ের কবিতা কেমন লাগে আপনার?

জয়: আমার মনে হয় যে বাংলায় চিরকালের জন্যে যে কবিতা থেকে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি সেই কবিতা উনি লিখেছেন। আমি অল্প কথায় উচ্ছ্বাস ব্যতীত বলতে চেষ্টা করছি। এবং ওঁর কবিতা আশ্চর্য হয়ে যাওয়ার মতন, যে কী করে এমন হয় যে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রেমের কবিতার মধ্যে সমগ্র দেশকাল এসে মিশছে। একেবারেই ব্যক্তিগত প্রেমের কবিতা। কিন্তু তার মধ্যে এসে সমস্ত মুহুর্মুহু যাতায়াত করছে। তা একবার ইতিহাসে যাচ্ছে। একবার কালোত্তরে চলে যাচ্ছে, আবার সে একেবারে শরীরে ফিরে আসছে। তানের মত। মানে একটা তান যখন চলে, বড় তান যখন চলে, ধরুন, সেতারে বা সরোদে একটা বড় তান, সেটা তিনটা অকটেভ জুড়ে চলতে থাকে। মধ্য সপ্তক থেকে শুরু হর, একটা নারীকে নিয়ে কবিতা শুরু হলো। ধরুন সেটি মধ্য সপ্তক, তারপর দ্রুত তা চলে এল তার সপ্তকে, আবার চলে গেল মন্দ্র সপ্তকে। এই যে যাতায়াত…একবার দেশকাল, একবার শরীর, একবার প্রেম, বাসনা এসমস্ত কিছু মিলেমিশে একটা…জাতির ইতিহাস…এ সমস্ত কিছু…অথচ সে কবিতাগুলো হয়তো লেখা হচ্ছে ধরা যাক ১৪ লাইনের মধ্যে। কুড়ি লাইনের মধ্যে। পুরো জিনিসটার জন্যে কিন্তু, আমার কবিতা লেখার জন্য বড় আয়োজন হয়, দীর্ঘ কবিতা লেখার চেষ্টা করি। খুব ছোট জায়গার মধ্যে, একটি দুটো লাইনের মধ্যে উনি সমস্ত জিনিসটাকে ধরেন। হঠাৎ এক জায়গায় ‘ফসলের সুষম বণ্টন’টাকে নিয়ে এলেন এমন একটা কবিতার মধ্যে…আবার পুরাণের মধ্যে ফিরে গেলেন…ব্যক্তিগত, যে, ‘পৌরুষ আবৃত করে জলাপাইয়ের পাতাও থাকবে না।’ ওর মধ্যে চলে গেলেন উনি। আবার তার মধ্যে আমাদের যে রিচ্যুয়ালগুলো, আমাদের যে…এই প্রথা, বধূবরণের বিভিন্ন প্রথা বা ইত্যাদি এইসব জিনিসগুলোকে মিলিয়ে দিচ্ছেন, এমন করে মেলাচ্ছেন যে সেইটা কিন্তু একটা চিরকালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এইটা একটা মস্ত বড় কাজ। এরকম একজন কবির সামনে বসে থাকতে পারা ভাগ্য!

রাইসু: মাহমুদ ভাইয়ের কবিতা ‘সোনালী কাবিন’ পড়ছেন?

জয়: হ্যাঁ। হ্যাঁ।

রাইসু: ওইটা নিয়া আপনার কী মত?

জয়: সেইটাই তো বললাম।

রাইসু: ওইটার মধ্যে সমালোচনাগুলারে কীভাবে দেখেন? কম্যুনিজম বা…

জয়: দেখুন রবীন্দ্রনাথ একটা কথা বলেছিলেন, আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথের একটা ভূমিকা আছে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একটা সম্পর্ক আছে। এই নিয়ে আমি গদ্যও লিখেছি। রবীন্দ্রনাথের একটা কথা আমি বলি এখন।

রাইসু: মাহমুদ ভাইয়ের কিন্তু প্রায় অভিসম্পাতের মত সমালোচনা থাকে…

জয়: হ্যাঁ, হ্যাঁ। রবীন্দ্রনাথ একটা কথা বলেছিলেন। সেই কথাটাই আমি পুরো রিপিট করছি। ‘রসের ক্ষেত্রে আমি মত বিচার করি নে।’

মাহমুদ: বাহ্।

জয়: রবীন্দ্রনাথের কথা।

রাইসু: এইটা এক অর্থে খারাপ। মত বিচার করা উচিত।

জয়: হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চিত নিশ্চিত।

রাইসু: মত যদি সঠিক হয় তখনও নিজের মত আকড়াইয়া থাকতেন রবীন্দ্রনাথ, অন্যের মত মানতেন না। এইটার মধ্যে সেটাই আছে।

জয়: হ্যাঁ, কিন্তু আমি তো রবীন্দ্রনাথের মত দৃঢ়চেতা মানুষ নই, আমি সহজে ভালোবেসে ফেলি।

মাহমুদ: হাঃ হাঃ হাঃ (হাসি)।

জয়: এটা আমার সাহিত্যের ক্ষেত্রেও চলে। আপনি দেখেছেন, আপনি আমার সঙ্গে মিশলেন। এই যে ধরুন আপনার কবিতাই বলুন, আমাদের শাহরিয়ারের কবিতাই বলুন, কি সাজ্জাদ শরিফের কবিতাই বলুন, আমি একবার দুটো কবিতা নেড়েচেড়ে দেখলাম যেই পড়লাম, পড়ে আমি মুগ্ধ হলাম, বাহ্ এ কী সুন্দর! এটা আমার স্বভাব। এই বয়সে এই স্বভাবকে আমি আর নতুন কোনো শিক্ষা নিয়ে বদল করতে পারবো না।

মাহমুদ: বাহ, খুব সুন্দর।

রাইসু: নিশ্চয়ই কেউ চায় না যে আপনি বদল করেন। এইটা অবশ্যই থাকবে আপনার। রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে মাহমুদ ভাই, উনি যেইটা বলছিলেন, মানে রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রধানতম কবি, এইটার ব্যাপারে আপনার কী মত? উনি কি প্রধানতম আমাদের, আপনি মনে করেন কিনা? এর আগে কিন্তু মধুসূদন আছে, ভারতচন্দ্র আছে, যাদের কবিতার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের হয়ত নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু তাদের কবিতা আমরা তো বাদ দিতে পারি নাই এখনো। বা জীবনানন্দ দাশ আছে পরবর্তী কবি। আপনি আছেন। শামসুর রাহমান ছিলেন। এখন প্রধানতম কবি হিসাবে রবীন্দ্রনাথরে আপনি কতটা গণ্য করেন। বা মান্য করেন?

মাহমুদ: আমি? আমি অকপটে এবং নিঃসঙ্কোচে বলছি যে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাংলাভাষার মুক্তিদাতা, আধুনিক কবিতার মুক্তিদাতা, সৌন্দর্যবোধের চরম প্রদর্শনকারী। এছাড়া বাংলাভাষায় সম্ভবপর মিল, অন্ত্যমিল যেটা, এটা রবীন্দ্রনাথের কাছে…। রবীন্দ্রনাথ এখনো দারুণ ভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

জয়: আমার একটু বলার আছে এই সঙ্গে, এর সঙ্গে আমি যোগ করতে চাই। এমন নয় যে আমি এই কথার বিরুদ্ধে কিছু বলছি। সঙ্গে এটার সমর্থনে আমি দু’একটা কথা বলব। আপনি যে ভারতচন্দ্র বা মধুসূদনের কথা বলছেন—মধুসূদন খুবই শক্তিমান কবি, কোনো সন্দেহ নেই তার প্রতি। ভারতচন্দ্র বা ধরুন চর্যাপদের কবিদের সম্মিলিত প্রয়াস সমস্তই আমি মনে রেখে একটা কথা শুধু আপনাকে বলি, কাজ করতে গেলে, বড় কাজ যদি কেউ করতে চান তাতে কিন্তু একটু আয়ুও লাগে। একটু আয়ুও লাগে।

মাহমুদ: (হাসি)।

জয়: মানে এটা সত্যি যে র‍্যাবো একটি ছোট্ট বই লিখে অমর হয়ে গেছেন, ঠিকই। একরকম বিশ্বসাহিত্যে আমরা অনেক পাবো। বি শ্ব সা হি ত্যে। কিন্তু আমি বলতে চাইছি, যাদের নাম আপনি করলেন অর্থাৎ ভারতচন্দ্র…

রাইসু: মধুসূদন…

জয়: বা যাদের থেকে রবীন্দ্রনাথ অনেক নিয়েছেন, যেমন বৈষ্ণব কবিতা…

রাইসু: এখন ধরেন ভারতচন্দ্র হয়তো রবীন্দ্রনাথ থিকা নিতে পারেন নাই আগে জন্মাইছেন বইলা। মধুসূদন সেটা নিতে পারেন নাই রবীন্দ্রনাথ থিকা। তাইলে হয়তো ওনারাও নিতেন।

জয়: এ যুক্তিটা কোনো যুক্তি নয়। এটা কোনো যুক্তি নয়।

রাইসু: না, এটা রসিকতা।

জয়: রসিকতা, হ্যাঁ। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাইছি, রবীন্দ্রনাথ যখন কবিতা লেখা শুরু করলেন তখন আর যখন শেষ করলেন, শুধু কবিতা লেখা নয়. রবীন্দ্রনাথ যখন লেখা শুরু করলেন…কিন্তু রক্তকরবী, ডাকঘর এগুলিকেও আমি গণ্য করি। এগুলিকেও আমার উচ্চাঙ্গের কাব্য বলেই মনে হয়। শুধু অন্য রকম ভাবে রচনা। আপনি একমত নাও হতে পারেন। আমি বলতে চাইছি যখন রবীন্দ্রনাথ লেখা শুরু করলেন আর ‘অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে…’ বলে যখন চলে গেলেন…এই যে মাঝখানের সময়টা—আর একজন লোককে আপনি, শুধু বাংলা সাহিত্যে না, পৃথিবীতে বার করুন, যে ওইখান থেকে ওইখানে পৌঁছে দিয়ে গেল একটা গোটা জাতির ভাষাকে, সাহিত্যকে, চেতনাকে—ওইখান থেকে ওইখানে পৌঁছে দিয়ে গেল। যখন শুরু করেছিল তখন সে যা ছিল…

রাইসু: শুরুতে কী ছিল বললেন?

জয়: যখন সে লিখতে শুরু করলো প্রথম সূচনা সঙ্গীত, প্রভাত সঙ্গীত তখন যা অবস্থা ছিল। আপনারা সাহিত্য করছেন ভালো করেই জানেন। এইবার যখন যে চলে যাচ্ছে তখন কতখানি…এতটা বদল কি মধুসূদনের ক্ষেত্রে, ভারতচন্দ্রের ক্ষেত্রে বা এদের ক্ষেত্রে আমরা কি কেউ দেখতে পাবো? এত বহুমুখী এবং এত ধরনের?

রাইসু: এইটা নিয়া একটু কথা বলতে পারবো কি? সেটা হইল যে, রবীন্দ্রনাথ যখন প্রভাত সঙ্গীত-এ তার ওই যে আধো আধো কবিতা লিখতেছেন, সেইখান থিকা যেই জায়গায় উনি প্রস্থান করলেন—আপনি যেই লাইনটা বললেন—কী জানি লইনটা?

জয়: ওই যে শেষ তিনটি কবিতা…

রাইসু: এখন দুইটা প্রশ্ন আসতে পারে, রবীন্দ্রনাথের আগে যারা লিখতেন, অন্যদের কথা বাদই দিলাম, মধুসূদন এবং ভারতচন্দ্রের সমগ্র কবিতারাশি কি রবীন্দ্রনাথের ওই আধো আধো প্রভাত সঙ্গীত-এর সঙ্গে তুলনীয়? নিশ্চয়ই না।

জয়: রবীন্দ্রনাথ শুধু আধো আধো প্রভাত সঙ্গীত লেখে নাই।

রাইসু: রবীন্দ্রনাথ যেই জায়গা থিকা, বাংলা কবিতার যেই জায়গা থিকা শুরু করলো ওইটা বাংলা কবিতার জায়গা না। এইটা রবীন্দ্রনাথের আধো আধো কবিতা। বাংলা কবিতা তখন পূর্ণতার মইধ্যেই আছে অলরেডি। এবং সেইখান থিকা সে ‘অনায়াসে যে পেরেছে…’ বইলা প্রস্থান করলো তারো আগে কিন্তু মধুসূদনে আপনি অনেক উদাহরণ পাইবেন সে ধরনের কবিতার, ঐ ধরনের গ্রেট কবিতার, আপনি পাবেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বাংলা কবিতারে কিছুই আগায় দিল না, রবীন্দ্রনাথ নিজেরে আগায় নিল, মাত্র।

জয়: কী বললেন আপনি! রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতার, কিছুই আগায় দিল না!

রাইসু: দিল সে, কিন্তু…

জয়: এই কথাটা আপনি বললেন! আপনি কী বললেন?

রাইসু: প্রভাত সঙ্গীত থিকা ‘অনায়াসে যে পেরেছে…’ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ যেইটা আগাইল সেটা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের নিজের অগ্রগতি। এইটা বাংলা কবিতার আলাদা ভাবে না।

মাহমুদ: তাইলে তো প্রশ্ন ওঠে তাইলে রবীন্দ্রনাথ কে?

জয়: আচ্ছা শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি, আপনি এই কথাটা লিখুন যে ‘রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতাকে কিছুই এগিয়ে দিলেন না।’

রাইসু: এইটা তো কোট করলে আলাদা বাক্য হচ্ছে। আমি বলছি, রবীন্দ্রনাথ আলাদা ভাবে বাংলা কবিতারে আগায় দিল না।

জয়: শুনুন, আপনার সঙ্গে আমি এই ব্যাপারে একমত নই।

রাইসু: সেটা তো হইতেই পারে।

জয়: এটাই, এটাই। এটা কিন্তু আমার কাছে শিহরণমূলক মনে হচ্ছে। সারাজীবনে এরকম উক্তি শুনিনি।

মাহমুদ: না না এখানে কিন্তু আমিও রাইসু তোমার সঙ্গে আমি একমত নই।

রাইসু: একমত না, তাইলে প্রভাত সঙ্গীত-এ তার যে দুর্বল কবিতাগুচ্ছ…আপনারা যেইটারে বলতেছেন প্রভাত সঙ্গীত, বাংলা কবিতারে রবীন্দ্রনাথ যেইখান থিকা এইখানে নিয়া আসলো…যখন নিয়া আসলো, প্রভাত সঙ্গীত যখন লিখতেছে মধুসূদন কিংবা ভারতচন্দ্রের কবিতা কি তখন প্রভাত সঙ্গীত-এর তুলনীয় খারাপ কবিতা? নিশ্চয়ই না। ওদের কবিতা তো আগেই গ্রেট হইয়া আছে। ফলে রবীন্দ্রনাথ যখন আগাচ্ছে সেটাতে তার নিজের কবিতা আগাচ্ছে। তাতে বাংলা কবিতার সামান্য অগ্রগতি হচ্ছে।

মাহমুদ: না, এইটা মানি না। কথা হইল রবীন্দ্রনাথ…

জয়: ঠিক আছে, আপনি যা মনে করেন মনে করেন এইটা আমি একরকম ভাবে বিশ্বাস করি। আপনি ভালবাসেননি রবীন্দ্রনাথকে কখনো।

রাইসু: না, আমি ভালোবাসি রবীন্দ্রনাথকে। ভালোবাসি বইলাই আমি তারে অতিশয় কইরা দেখতে রাজি না।

জয়: না, না, ভালোবাসলে কতগুলো জিনিস বোঝা যায়। ভালো না বাসলে কতগুলো জিনিস বোঝা যায় না।

রাইসু: তাহলে আপনিও তো মধুসূদন বা ভারতচন্দ্রকে ভালোবাসেন নাই।

জয়: একটি মেয়েকে আপনি যদি খুব গভীর ভাবে ভালো না বাসেন তাহলে আপনি তার কতগুলি জিনিস বুঝতে পারবেন না। ভালোবাসতে হয়।

রাইসু: কিন্তু তুলনা যখন করবেন মধুসূদন, ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তখন ভালোবাসাটা খালি একজনরেই কেন বাসবেন?

জয়: আপনি থাকুন না আপনার ওই পুঁথিঘর নিয়ে! কিন্তু আমরা ভালোবাসার লোক। আপনি থাকুন না। আপনি থাকুন। আমি খুব সন্তুষ্ট ভাবে, আমি খুব প্রসন্নভাবে আপনাকে বলছি, আপনি আপনার পুঁথিঘর নিয়ে থাকুন।

রাইসু: পুঁথিঘর বলতে কী বোঝাতে চাইছেন? যেটাকে ভালোবাসা যাবে না সেই ধরনের কিছু?

al-2.jpg
ব্রাত্য রাইসু, জয় গোস্বামী ও আল মাহমুদ

মাহমুদ: প্রশ্ন করো, প্রশ্ন করো।

রাইসু: না না, উনি যদি বলেন পুঁথিঘর, স্পষ্ট করতে হবে।

জয়: আমি স্পষ্ট করে বলছি, আপনি মনে করেন রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে দেন নি। আমি মনে করি রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতাকে শুধু এগিয়েই দেন নি। এবং রবীন্দ্রনাথ মানে শুধু তার কবিতাই নয়। একই সঙ্গে তিনি গানের মধ্যে কবিতার ফর্ম নিয়ে যা করেছেন, কবিতার ফর্ম নিয়ে যেসব কাণ্ডকারখানা করেছেন, এটা বুঝতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে একটু ভালবাসতে হয়, আর একটু কষ্ট পেতে হয়। এই দুটো জিনিস এক সঙ্গে না থাকলে রবীন্দ্রনাথের এই জিনিস বোঝা যায় না। এখন আপনি বাকি যেগুলো ভারতচন্দ্র এবং ওগুলো বলছেন…

রাইসু: মধুসূদন…।

জয়: আমি আপনার বাকি কথাগুলো মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এই ব্যাপারে আমি আপনার সাথে আর কোনো কথা বলব না। কারণ আমরা দুজন…ওই যে বললাম, ওই মেয়েটি, যাকে আমি ভালোবেসেছি আর আপনি ভালোবাসেন নি তাকে দুজন বুঝব কী করে? আমাদের এ ব্যাপারে কোনো মিল নেই।

রাইসু: এড়ানো তো ভালো সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে। আপনি যদি এইটা এড়াইয়া যান…

জয়: না এড়ানো না। এড়ানো না। এটা নিয়ে আমাদের কথা নিষ্ফল।

রাইসু: নিষ্ফল কথা কি আমরা বলব না?

জয়: না, নিষ্ফল কথা কেন বলব? অকারণ নিষ্ফল কথা বলব কেন?

রাইসু: ঠিক আছে, মূল্যবান কথায় ফিরি তাহলে আমরা।

মাহমুদ: প্রশ্ন, ডিসটিংক্ট প্রশ্ন করো। তাতে কিছু বের হয়ে আসবে।

রাইসু: ডিসটিংক্ট প্রশ্ন, আপনাদের দুই জনের ব্যাপারে আপনাদের কথা শুনলাম। এখন আপনি ভারতীয় কবিদের ব্যাপারে আপনার অবস্থানটা বলতে পারেন, মাহমুদ ভাই। বর্তমান কবিদের কবিতা কি আপনি পড়েন, ওইখানকার?

মাহমুদ: যতটা সাধ্য চেষ্টা করি, দেশ পত্রিকা দেখি-টেখি।

রাইসু: কী মনে হয় আপনার। বা কিছু বলার আছে কিনা এই ব্যাপারে?

মাহমুদ: আমার শুধু এইটুকু বলার আছে তারা যা লিখছেন লেখার মধ্যে স্বাদ-গন্ধ আছে। কোনো কোনো লাইন পড়লে তো চমৎকৃতই হতে হয়। চুপ করে থাকি। আছে। তারাও কাজ করছে। ভালো। আমি জয় গোস্বামীর কথা বলছি। জয় গোস্বামীর একটি দীর্ঘ কবিতা আমি পড়েছিলাম দেশ পত্রিকাতে। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি যে, কবিতাকে যে ফর্মের মধ্যে আমরা রেখেছিলাম সেটাকে তিনি—খুব ভালোভাবে পেরেছেন এটা আমি বলি না—কিন্তু তিনি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, বড় করে দিচ্ছেন। এইটা যেহেতু আমি করতে চেয়েছিলাম ‘চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি’ এসব কবিতায়…যখন হঠাৎ দেখি জয়ের মধ্যে আবার অন্য একটা রূপ গ্রহণ করেছে তখন তো আমি বিস্ময়ে পুলকে আনন্দিত না হয়ে পারি না। আরেকটা কথা হলো, জয়ের যে কবিতা, হ্যাঁ, ‘আমার বাবা দোকানে কাজ করে’, এই, এই ধরনের লাইন সাহস করে তো আমি লিখতে পারতাম না। বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাওয়া আছে না, এই কবিতাটা আমাকে খুব মুভ করেছে। এইজন্যে যে এটার মধ্যে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর আর্জ, আকাক্সক্ষা কীভাবে যেন হাজির হয়েছে। এবং হাজির হয়েছে এমনভাবে, আমার আত্মীয় মনে হয়। হ্যাঁ, বাঙালী হিন্দুকে আত্মীয় মনে হয় এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার আমার কাছে। খুবই আত্মীয় মনে হয়। মনে হয় যে আমারই সব।

জয়: কত সুন্দর কথা! মস্ত বড় পুরস্কার আমার কাছে।

রাইসু: জয়দা, বাংলাদেশের কবিতা আপনি কীভাবে পান?

জয়: বাংলাদেশের কবিতা আমি কীভাবে পাই, সেটা হচ্ছে, আমি যে অফিসে কাজ করি, করতাম, এতদিন, সেখানে-না অনেক পত্রপত্রিকা যায়। মানে সেখানে ডাকেও অনেক পত্রপত্রিকা যায়। তারপর আমাদের ওখানে পাতিরাম বুকস্টল আছে। সেখানে অনেক পত্রপত্রিকা রাখা থাকে। কেমন? তারপরে অনেক সময় হয় কি, কেউ এখান থেকে গেল, হয়ত বাংলাদেশ ঘুরে গেছে, যেমন মঞ্জুষ দাশ ছিলেন—মঞ্জুষ দাশ গুপ্ত—মঞ্জুষ দাশ গুপ্ত প্রচুর পত্রপত্রিকা নিয়ে যেতেন। খবরের কাগজ পর্যন্ত…। মঞ্জুষ দাশ এগুলো অনায়াসে দিয়ে দিতেন। অন্যকে দিয়ে দিতেন। ‘আচ্ছা নিয়ে যাও।’ ‘এই এই, তোমার সঙ্গে দেখা হলো। আচ্ছা, এটা দেখো আমার ব্যাগে এটা আছে, এটা নাও।’—এরকম করে দিতেন। এ থেকে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম গাণ্ডীব বলে একটা পত্রিকা, এই যে একবিংশ, আমাদের খোন্দকারের, এই সমস্ত পত্রপত্রিকা বা আরো অনেক, নিঃসর্গ নামে পত্রিকা, এরকম অনেক পত্রিকা আছে যা আমি পাই। আর দ্বিতীয় হলো আমাদের ওখানে যা বই পাওয়া যেত তা কিনতাম। ’৯৮ সালে যখন আমি বাংলাদেশে আসি তখন আমি এই এখন যে সুটকেসটা হয়েছে তার চেয়ে একটা বড় সুটকেস ভর্তি করে শাহবাগ থেকে বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাতে আমার খুব ভালো করে…মানে আমি পড়বার সুযোগ পেয়েছি সুন্দর করে। আর তার আগে আমি টুকরো টুকরো টুকরো টুকরো টুকরো টুকরো করে পড়েছি। এদের বই তো সব পাওয়া যায়। কবিতার বই পাওয়া যেত অনেক। মানে আমার কবিতার জীবনের শুরুতে যেমন এই জীবনানন্দ দাশবনলতা সেন-এর পর যেমন আমার এই যে সোনালী কাবিন, শক্তির প্রভু নষ্ট হয়ে যাই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আমার স্বপ্ন—তখন এদিকে লোরকার মৃত্যুর স্মরণে ‘কবির মৃত্যু’ বলে একটা দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন..

মাহমুদ: কে?

জয়: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন। এবং বাংলাদেশের যুদ্ধ নিয়েও লিখেছেন। ওই সময়ে একই সঙ্গে আমাদের নকশাল আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। দুদিকেই রক্তক্ষয়ী একটা অবস্থা। ওই জিনিসগুলি মনের মধ্যে একটা ছাপ ফেলে রেখে গেছে। এমন একটা ছাপ ফেলে যায় যে তা থেকে যে প্রত্যক্ষ ভাবে সে মুহূর্তে জন্মেছে তা না কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমার ধীরে ধীরে সেইগুলো ভিতরে কাজ করতে থাকে। যেমন, আমাকে সৈয়দ শামসুল হক একটা কথা বলেছিলেন। বলেন দেখো আমার যৌবন কেটে গেল চারজন শাসকের অধীনে। চারজন মিলিটারি শাসকের অধীনে আমার পুরো যৌবন কেটে গেল। বলে উনি বললেন যে আইউব খান, ইয়াহিয়া খান এ রকম চারজন, মাঝখানে মুজিবের পিরিয়ড এসেছিল। এরশাদ…। চারজন মিলিটারি ডিকটেটরের অধীনে, নিচে, আমার যৌবন কেটে গেল। এটা একটা…এটা বাংলাদেশের মানুষই এরকম কথা বলতে পারে। মানে এই যে এই কথাটা বলতে পারে…এ থেকে আমি বুঝলাম…কেন আমি এদের কাছে আসি…আমি অনেক সময় এদের কাছে শিক্ষা নেওয়ার জন্যও আসি। এই যে ব্রাত্য রাইসুর কাছেও আমি আসি, এসেছি…সেটাও একটা শিক্ষা নেওয়ার জন্যই বলা যায়। এরা এমন কিছু জিনিস ভাবতে পারে, এমন কিছু জিনিস বলতে পারে যেটা কিন্তু আমার কাছে অভাবিতপূর্ব। যেটা কিন্তু আমি, আমি জানি না। সেজন্যেই বাংলাদেশের প্রতি আমার গভীর টান একটা সবসময়ই রয়েছে। আসতে পারি না।

রাইসু: এইটায় ভুল বোঝার একটা অবকাশ থাকতেছে। আপনার শিক্ষা গ্রহণের জন্য বা উপকার হবে বইলা, বাংলাদেশের কবিতারে দেখতেছেন। কিন্তু এর বাইরে আমরা যেমন শক্তিরে একটা কবিতার এনটিটি হিসাবে দেখি, বা বিনয় মজুমদার বা উৎপলকুমার বসু ওই পারের, বা আপনি বা মৃদুল দাশগুপ্ত এঁদেরকে দেখি, পাঠক হিসাবে দেখি। সে আমাদের কাজে লাগবে বইলা দেখি না। ওই জায়গায় কাউরে দেখেন কিনা?

জয়: আচ্ছা আপনি একটা কথা বলুন দেখি…

রাইসু: হ্যাঁ?

জয়: আপনি একটা কথা বলুন আমাকে। সেটা হলো আপনি তো আমাকে এই কয় দিন দেখলেন, আপনার কি আমাকে দেখে মনে হলো…?

রাইসু: না না, প্রশ্নটা যেহেতু ইন্টারভিউয়ের মধ্যে ফলে এইটার একটা আনুষ্ঠানিক উত্তরই আমি আশা করতেছি। আমার মনে হওয়াটা না আসলে। এইটা পাঠকের প্রশ্নটাই আমি করলাম। যেহেতু ভুল বোঝার অবকাশ আছে। বইলা মনে হয়।

জয়: আমি একটা কবিতাপাগল মানুষ। হ্যাঁ। আমি নানা রকম ভাবে নিজেকে এক্সপ্রেস করি। কখন কখন শিক্ষা নেওয়ার কথা বলি…বা আমি যেটা জানি না বা আমার অজানা যে দিগন্ত সেদিকে যেতে চাই।

রাইসু: সেটা তো আমরাও চাই, মাহমুদ ভাইও নিশ্চয়ই চান ।

জয়: না, সেটা আপনি খুব চান বলে আমার মনে হয় না। আপনার সঙ্গে তো আমি মিশলাম এই কয়েকদিন, বুঝতে পারলাম।

মাহমুদ: হেঃ হেঃ হেঃ (হাসি)।

জয়: সেটা যে আপনি খুব চান তা মনে হয় না। যাই হোক সেটা আমার ভুল বোঝা হতে পারে। কিন্তু কবিতার একটা অজানা দিকে আমি যেতে চাই। আপনার যখন তিপ্পান্ন বছর বয়স হবে এবং আপনি তিপ্পান্ন বছর বয়সে ওই অল্প বয়সী তরুণ কবিকে একটা অন্য দেশে খুঁজে খুঁজে তার কাছে গিয়ে উপস্থিত হবেন, তখন আপনি বুঝবেন আমি কী বলছি। তার আগে পর্যন্ত আপনি আমার কথা বুঝবেন না।

রাইসু: কিন্তু সেটা তো একটা দিক। এর বাইরে আছে না…?

জয়: কিন্তু এটা তো শিক্ষা নয়। তাহলে কবিতা পড়াটা তো তাহলে একরকম শিক্ষা। ধরুন আমি বিলায়াত খাঁ সাহেবের দরবারি কানাড়া শুনছি, তাহলে সেটাও তো এক রকম তাহলে শিক্ষা। সেই অর্থে, সেই অর্থে শিক্ষা। এই শিক্ষা মানে এই নয়, যে আমি আবার ওটাকে কাজে লাগাব। ওই কাজে লাগাব বুদ্ধিটা বা এই কথাটা যোগ করা আপনার। কিন্তু শিক্ষা কথাটা আমার কাছে হচ্ছে এই ভেতরের লোকটা বাড়বে, আমার ভেতরের লোকটা বাড়বে। আমি যদি ধরুন একটা মাতিসের ছবি দেখি, আমার ভেতরের লোকটা বাড়বে। সেটা এক রকম শিক্ষাই আমার কাছে। আর শিক্ষা শব্দটার প্রতি আমার একটা অবসেশন থেকে গেছে এই জন্য যে, সেটার খুব একটা ব্যাক্তিগত কারণ আছে…

মাহমুদ: ঠিক আছে…।

জয়: সেটা হচ্ছে আমি এগারো ক্লাস অব্দি পড়েছিলাম, বেশি দিন পড়াশুনো হয়নি। সেজন্য ‘শিক্ষা’ শব্দটার প্রতি একটা আমার…

রাইসু: এই প্রেক্ষিতে আমি মাহমুদ ভাইরে জিজ্ঞাসা করি, বা এই প্রেক্ষিতে না, এমনিই জিজ্ঞেস করতেছি যে আপনার কবিতায়, আপনি তো অনেক ধরনের কবিতা লিখছেন বিভিন্ন সময়ে, একেক সময় একেক ধরনের কবিতা লিখছেন, তো ওইটার মধ্য দিয়া মানে চাইছেন কিন্তু পারেন নাই এই রকম কিছু কি রইয়া গেছে কিনা? যেইটা করতে চাইছেন কিন্তু কইরা উঠতে পারেন নাই, বা এখনো পারতেছেন না এইরকম কিছু আছে কি আপনার? ধরেন ‘সোনালী কাবিন’ পড়লে যেমন মনে হয় আপনি যেইটা চাইছেন সেটা পারছেন। ওই রকম পরে কখনো এমন হইছে যে ধরতে চান কিন্তু পুরা পাইতেছেন না?

মাহমুদ: না, আমার মনে হয় যে ‘সোনালী কাবিন’ লিখে আমার একটা আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি ঘটেছিল।

রাইসু: ঘটছিল?

মাহমুদ: হ্যাঁ। এবং ‘সোনালী কাবিন’ যখন ছাপা হয়ে বেরুল সমকাল-এ, দশ বছর কোনো কথা নেই…নিঃশব্দ…

রাইসু: কেউ কিছু বলে নাই?

মাহমুদ: কেউ কিছু বলে নি।

রাইসু: এটা কি সম্ভব?

মাহমুদ: কেউ কিছু না।

জয়: কী আশ্চর্য!

মাহমুদ: দশ বছর আমি অপেক্ষা করেছি। দশ বছর পরে, ওরে বাপরে, এমন একটা হইচই শুরু হইয়া গেল সোনালী কাবিন নিয়ে যে আমি নিজেই অনেকটা বোকা হয়ে গেলাম। হ্যাঁ, আমার মনে হয় যে কবির ভাল কবিতা লিখে অপেক্ষা করতে হয়। আর ১০ বছর কি সোজা ব্যাপার! একটা যুগ। একটা যুগ অপেক্ষা করেছি। তুমি চিন্তা করো, আমার ধৈর্য আছে না?

রাইসু: হ্যাঁ। আপনার তো ধৈর্য অনেক।

জয়: ধৈর্য দরকার।

রাইসু: ধৈর্য তো আপনার অনেক বেশিই বলা উচিত। কিন্তু আমি বলতে চাইছি যে আপনি কোনো একটা কিছু করতে চাইতেছেন কিন্তু পারতেছেন না, এইকালে আর আছে কিনা কবিতার ক্ষেত্রে? অধরা একটা ব্যাপার হয় কি?

মাহমুদ: অধরা, একটা অপরিতৃপ্তি নিয়ে… মনে হয় এই রকম হয়েছে। কিন্তু এটা আমার প্রতি আমার প্রভুর অনুগ্রহ হতে পারে, যে আমি কিন্তু যখন একটা কবিতা লিখে পরিতৃপ্তি বোধ করেছি—এখন তো ধরো আর সেটা পারি না। কিন্তু আমি আগে একটা কবিতা লিখে অনেক ক্ষণ পায়চারী করতাম আর কবিতাটা আবৃত্তি করতে থাকতাম। অনেক ক্ষণ। তারপর একটা দুইটা শব্দও চেন্‌জ্ করতাম। আবার পড়তাম, আবার পড়তাম। এই নেশাটা এখন আর নাই। এটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এই আর কি।

রাইসু: এটা কি পায়চারির ক্ষমতা কইমা আসার কারণে কিনা?

মাহমুদ: হয়তো, কবিত্ব শক্তি, কবিত্ব শক্তিতেও ঘুণ ধরে। কবিত্ব শক্তিও তো একটা তরতাজা ব্যাপার। এ কথা কেউ বলতে পারবে না আমি কবি। এটা বলতে পারবে না। একটা কবিত্ব শক্তি তার মধ্যে কাজ করে বলে তাকে লোকে কবি বলে। তো, আমি তো, আমার তো মনে হয় যে একটা অপরিতৃপ্তি আছে আমার মধ্যে।

রাইসু: জয়দা, আপনার ক্ষেত্রে?

জয়: আমার ক্ষেত্রে সবসময় যেটা হয় যে একটা বিষাদের সঙ্গে আমাকে যুদ্ধ করতে হয়। বিষাদটা কেন আসে আমি জানি না, সবসময় তার প্রত্যক্ষ কারণ জানি না। আমার মনে হয় যে কোনো চিকিৎসকের কাছে গেলে বা ধরুন আপনার মত সঙ্গ পেলে—আপনার সঙ্গে যেমন আমি কথা বলছি, ঢাকায় যে আমি তিন দিন চার দিন ছিলাম আপনার সঙ্গে কথা বলেছি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার ভেতরকার অন্ধকার অনেক পরিষ্কার হচ্ছে। আমি কতগুলো জিনিসের কারণ বুঝতে পারছি। সেরকম কোনো গভীর নিবিড় বন্ধুর কাছে যেতে পারলে বা মনোচিকিৎসকের কাছে যেতে পারলে অনেক সময় এটা পরিষ্কার হয়—ওই বিষাদের কারণটা পরিষ্কার হয়। কিন্তু সেটি যখন এসে আক্রমণ করে তখন আমি বহুকাল কিছু লিখতে পারি না। বা যা লিখি তাও মনে হয় না…এবং এটা দীর্ঘকাল ধরেই এমন একটা হয় যেই মুহূর্তটায় লিখি সেই মুহূর্তটায় বা ওই সময়টায় যদি লিখতে পারি একবার বা আরম্ভ করি একবার…যে যার মত থাক, লিখতে থাকি, সেই থাকাটুকুর সময়টুকু একটা উজ্জ্বল সময়। তখন তো আমি ব্যস্ত আছি। তারপর কবিতাটা দিয়ে দিলাম, বেরিয়ে গেল, কি বই বেরিয়ে গেল, কি কিছু হয়ে গেল, তারপর ওই উজ্জ্বল অবস্থাটা আর থাকে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা চলে যায়। আচ্ছা, যখন খুব বড় নিষ্ফলা সময় আসে তখন তার সামনে ধৈর্য ধরে চুপ থাকা ভাল?

মাহমুদ: আসলে সময়টা আমরা বলি যে নিষ্ফলা। কিন্তু কবির কোনো সময়ই তো নিষ্ফলা না। একটা প্রস্তুতি। অনেক দিন লিখতে পারছি না, মনে হয় যে আমার কবিত্ব শক্তিই শেষ হয়ে গেছে। এই রকম হয়ে যায়। এবং একটা দিশেহারা অবস্থা।

জয় : সেই সময়টা কী করব? সেই সময়টা কাটাব কী করে?

মাহমুদ : আমার মনে হয় যে লেখার চেষ্টা বার বার করে যেতে হবে। লেখার চেষ্টাটা করতে হবে। হোক বা না হোক। আর হয়ে যায়, হয়ে যায়, হয়ে যায়।

জয়: আর একটা সমস্যার কথা বলি যেটা আপনি বুঝবেন। যেহেতু আমি আমার প্রথম কবিতা লিখেছি ৪০ বছর আগে। যেহেতু আমার প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছে ৩০ বছর হয়ে গেল। এখন আমি যদি মনে করি একটা কবিতা লিখব তাহলে বসে কিছুক্ষণ পরে লাইনগুলো এরম এরম করে এরম এরম করে এরম এরম করে একটা কিছু লিখতে পারি, যেটা কবিতা আকারের। আমি যদি আধ ঘণ্টা বসে থাকি চুপ করে তাহলে কয়েকটা লাইন…আপনি আমাকে পাঠিয়ে দিন ওঘরে…এখন অবশ্য আমি উদ্দীপ্ত অবস্থায় রয়েছি। অন্য যে কোনো সময় আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারি এ লাইনগুলো আমি যে লিখলাম সেটা আমি এতদিন যে কবিতা লিখে আসছি তারই অভ্যাসে। যা আমি লিখতে চাই না। এই অভ্যাসের হাত থেকেই বা আমি কী করে মুক্তি পাব?

মাহমুদ: এটা হল যে একজন কবি, এই যে অভ্যেস, দীর্ঘদিনের চর্চা—তিনি বসলে কয়েক লাইন লিখে ফেলতে পারেন। এটা তো কবিতা না। এটা কবিও জানে। আমি সবসময় এটা এড়িয়ে চলেছি। বাদ দিতে হবে এরকম কোনো জিনিস কখনো রচনা করতে চাই না। এটা আমার ব্যাপার। আমি সবসময় একটা উত্তীর্ণ অবস্থায় একটা রোমাঞ্চিত অবস্থায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি। আর এটা সার্থক হলে দারুণ ভাবে খুশি হয়েছি। এর চেয়ে খুশি আর কী হতে পারে। আমি কবিতা তৈরি করতে চেয়েছি এবং কবিতা তৈরি করতে পেরেছি তাহলে আমি মনে করেছি যে এটা দিগ্বিজয়। আমার অশ্বমেধের ঘোড়া কেউ ধরতে পারছে না।

জয়: না, এই রকম অবশ্য আমার যে হয়েছে বা খুব হয় তা মনে হয় না। আপনি তাহলে বলছেন ওই অভ্যস্ত লাইন এলেও সেটা লেখা…এবং তারপর সেটা ছাপালাম না। কিন্তু প্রাকটিসের মধ্যে রইলাম…।

মাহমুদ: না, এটা করবেন কেন আপনি?

জয়: তবে কী করব?

মাহমুদ: আপনি করবেন না কিছু।

রাইসু: লিখতে হবে কেন কবিতা?

মাহমুদ: লিখতে হবে কেন? আপনার যদি হৃদয় ভেঙে না আসে, শব্দ আসছে রক্ত থেকে বেরিয়ে…এরকম পরিস্থিতি না হলে আপনি লিখবেন কেন? আমি লিখি নি কোনো সময়। পত্রিকা কবিতা চেয়েছে সেই জন্যেই কবিতা দিয়ে দিতে হবে এটা আমি কক্ষনো করি না। এতে আমার মার খেতে হয়েছে। পাশাপাশি থাকতে পারি নি। কিন্তু আমি এটা করতে চাই না। আমি এটা করতে চাই না। আমি মিশি নি, কী হয়েছে তাতে? কারণ আমার কিছু লাইন তো এই দেশ জাতির মধ্যে ঢুকেই আছে। আমি কী পারি তা তো আমি দেখিয়েই দিয়েছি।

রাইসু: সেটা তো জয়দাও দেখাইছেন উনি কী পারেন, ফলে কবিতা না লিখতে পারলে কী অসুবিধা?

জয়: সেটায় একটা অসুবিধা কিন্তু হয়। মানে কত বছর চলে যাচ্ছে আমার মাথায় কোনো লাইন নেই, কিছু নেই, এই রকমও তো হয়। যেগুলো দুই চারটা লাইন লিখলাম বা দশ লাইন লিখলাম, বুঝলাম এটা অভ্যাসবশত লিখছি।

মাহমুদ: এখন কথা হল যে দশ লাইন লিখলেন সেটায় যদি আপনার নিজের ভেতরের সমর্থন থাকে যে এটা ছাপবেন তাইলে সব ঠিক আছে। এটিই কবিতা। আর যদি আপনার ভেতরে না না করছে কিন্তু যেহেতু দেশ পত্রিকা চাইছে বা আমাকে ওই জায়গাটা পূরণ করতে হবে আমি ছেপে দিলাম…অনেকে প্রসংসা করল…কিন্তু আপনি তো আপনাকে প্রশংসা করছেন না।

জয়: আমার মাঝে মাঝে অন্তর থেকে মনে হয় আমি যেন কোথাও নির্বাপিত হয়েছি। এইটা যখন আমার মনে হয় তখন আমার কষ্ট আরো বেড়ে যায়। তা আমি এই অবস্থাটা থেকে তো উদ্ধার চাই। আমি মনে মনে ভাবি, আচ্ছা নির্বাপিত হয়েছি কী হয়েছে, কত মানুষ আছে।

মাহমুদ: এটাই তো কবিত্ব শক্তি। এইটাই তো কবিত্ব শক্তি যে, এই যে আমি আর পারছি না, এটা বুঝতে পারাই তো কবিত্ব। অনেকে তো বুঝতেও পারে না।

জয়: আমার অল্প বয়সে আর একটা জিনিস ছিল, মানুষের কাছে আঘাত পেলে আমি কবিতা লিখতে পারতাম। কোনো ব্যবহারে আঘাত পেলে, কষ্ট পেলে আমি কবিতা লিখতে পারতাম। যত বয়স বেড়েছে তত আঘাতের পরিমাণ বেড়েছে। আর এখন আঘাত পেলে একদম বুঁেজ আসে।

মাহমুদ: আমি মানুষের কাছে এত আঘাত আমি পেয়েছি যে যেই জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ব্যথার সেখানে বেশি আঘাত পেয়েছি। তো আমি এর মলম জানি, আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি একটা মলম আমি জানি—বৌদ্ধ শাস্ত্র থেকেই সেটা আমার মধ্যে মনে হয় এসেছে। ধম্মপদ পড়েছি এক সময়—‘উপেক্ষা’।

রাইসু: ভালো হইছে ইন্টারভিউ। আপনার কিছু বলার আছে মাহমুদ ভাই, ওনারে?

মাহমুদ: না আমার বলার আছে যে জয়কে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমার প্রিয় কবিও। হয়তো আর কিছুদিন পরে মরেই যাবো। একটা সাক্ষাৎ হলো ঢাকার বাড়িতে। এটা হয়তো ও মনে রাখবে, ওর তো বয়স কম। এই আর কি। al-1.jpgআমাদের মধ্যে একটা আত্মীয়তা থাকাই দরকার সবসময়। আর আমরা তো কবিতা লিখছি। কে কোন দেশে জন্মেছি তা আর কোনো প্রশ্ন নয় বাংলা কবিতার জন্য। বাংলা কবিতা নানা কেন্দ্র থেকে লেখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্র নাই এখন। ঢাকায় লেখা হচ্ছে, কোলকাতাতেও লেখা হচ্ছে, লন্ডনে লেখা হচ্ছে। আমি অবাক যে নিউ ইয়র্কে একটি ছেলে ভাল কবিতা লিখছে। তো কেন্দ্রই তো ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে।

রাইসু: জয়দা কিছু বলবেন আপনি। শেষ করবো আর কি।

জয়: আমি বলব যে আল মাহমুদের কাছে আসা এটা আমার জীবনের একটা মস্ত বড় একটা আকাক্সক্ষা ছিল। আজকে তা পূর্ণ হলো। আগেও আমি একদিন এসেছি। আজকে আবার। এবং এই যে সময়টা আমরা কাটাতে পারলাম সেটা আমি সারা জীবন মনে রাখব।

ঢাকা ৭/১১/২০০৭

ছবি: সিউতি সবুর

আল মাহমুদের বাসায়

bratya.raisu@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:


53 Responses

  1. moinul says:

    very interesting and it seems the poets have spoken their minds. does bratya speak dhakaya bangla deliberately? not bad!

  2. ফয়সল নোই says:

    ভালো লাগলো

  3. মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা says:

    Thanks.

  4. nazla says:

    Waiting for the next part, wonderfull,& thanks to Al-Mahmud for your honest opinion about beauty. Very few poets r honest in their sense.& it is true when a poet is thinking about another poet there is nothing between them except the poem.
    My cordial thanks to seuty Sabur for some exclusive photos

  5. মুজিব মেহদী says:

    এই আসরে একজন বা দুজন নারী (অবশ্যই কবি) থাকার দরকার ছিল। তাহলে শরীর/সৌন্দর্য আলোচনায় ভারসাম্য রক্ষা পেত। সৌন্দর্য ধারণাটা সেক্ষেত্রে সর্বজনীন না হলেও কবিজনীন রূপ প্রাপ্ত হতো হয়ত, এখন যা হচ্ছে সেটা কেবল পুরুষজনীন।

    অপেক্ষা করছি পরের কিস্তির জন্য।

  6. আলতাফ হোসেন says:

    খুব ভালো লাগল। মুজিব ভালো বলেছেন,নারীর উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল, তাকে ঘিরেই যখন এত কথা, উত্তেজিত হয়ে পড়া! এটুকু লিখে ভুল ভাঙল, সিউতি তো ছিলেন!

  7. মুজিব মেহদী says:

    সিউতি সবুর যদ্দুর সম্ভব ছবি তোলাতেই মগ্ন ছিলেন (অবশ্য এটা আমার ধারণা), আলোচনায় তো তাঁকে দেখছি না।

  8. ব্রাত্য রাইসু says:

    ছবি তোলার জন্য সিউতি সবুর এই আলাপের শেষের দিকটায় আসছিলেন। নারী-শরীরের সৌন্দর্য আলোচনার জন্য সাক্ষাৎকারটা নেয়া হয় নাই। ফলে নারী-শরীরের অধিকারী কাউরেও ওইখানে প্রতিনিধি হিসাবে রাখার কথা মাথায় আসে নাই। আলাপের বিষয় অনুসারে বিষয়ী হাজির রাখতে হইলে এই জীবনে আর কথা বলা হইয়া উঠবে না।

    শুনছি এনজিওগুলা অধিকার-বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রস্তুত করার জন্য তাদের কী অভিমত তা শুনতে চায়। ফলে সেই ধরনের আসরে প্রতিনিধি হাজির রাখার বা ভাড়া করার প্রথা আছে। আমাদের লেখক-সাহিত্যিক এবং বিশেষত গল্পকারদের কারো কারো মধ্যে এনজিও প্রভাবিত উন্নয়ন ধারণা প্রবল হইয়া আছে গত দুই তিন দশক ধইরা। দেখা গেছে গল্পে যখন বাস্তবতা বর্ণনা করতেছেন লেখক তখনও তিনি বঞ্চিত ব্যক্তির ‌‌’অধিকার’কেই সর্ব গুরুত্ব দিয়া গল্প সাজাইতেছেন। এতে মানুষের উন্নতি হয়ত শনৈ শনৈ হইতেছে, কিন্তু লেখকের অভিজ্ঞতা বা কল্পনাপ্রতিভা মাইর খাইতেছে। লেখক যেন বিনামূল্যে এনজিওর অফিস করতে বসছেন। চিন্তা করতেও ভয় লাগে, একজন কবি আপন লালসার বর্ণনা করতে বসছেন তার নাকি যে বিষয়ে লালসা তার সামনেই সেই বর্ণনা করতে হবে!

    আমার জানা মতে, লেখক-শিল্পীর কামনা-বাসনা-অভিজ্ঞতা লিখিত আকারে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা বহ দিন হইল চালু আছে। এবং কাগজ, কলম ও লেখনী শক্তির অধিকারী ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে মতামত রাখতে পারেন। ফলে যাদের আগ্রহ আছে তারা সব সময়ই এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন। এনজিওর সেমিনার কক্ষে হাজির অধিকারহীন লোক যেমনটা কখনো পারে না। প্রতিনিধিরে যখন কথা বলতে রাজি করানো হয় ততমধ্যে তিনি আপন ইচ্ছার বাইরে চইলা গেছেন।

  9. wali says:

    heartening till now. waiting for the remainder. many thanks, bratya. but frankly, why do you have to write ‘ashssila’in place of ‘aisila’ or …., please?

  10. আলতাফ হোসেন says:

    ঠাট্টা করতে গিয়ে আহত করা হতে পারে কাউকে বুঝতে পারিনি। দুঃখিত। আলতাফ হোসেন

  11. মুজিব মেহদী says:

    ব্রাত্য রাইসু, আপনি বলেছেন, ‘লেখক-শিল্পীর কামনা-বাসনা-অভিজ্ঞতা লিখিত আকারে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা বহ দিন হইল চালু আছে। এবং কাগজ, কলম ও লেখনী শক্তির অধিকারী ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে মতামত রাখতে পারেন। ফলে যাদের আগ্রহ আছে তারা সব সময়ই এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন।’ এ প্রেক্ষিতে আমি বলছি যে, লেখক-শিল্পীর কামনা-বাসনা-অভিজ্ঞতা বিষয়ে যেকোনো মত নিয়ে পাঠক হিসেবে আমিও কথা বলতে পারি, মন্তব্য করতে পারি, আপত্তি উঠাতে পারি, এমনকি টিপ্পনিও কাটতে পারি। লেখক-শিল্পীর যেমন ‘লালসা’ নিয়ে কথা বলবার অধিকার আছে, আমারও তেমনি পাঠক হিসেবে সেটি পড়ে প্রতিক্রিয়া জানাবার অধিকার আছে। কারণ আমারও ‘কাগজ, কলম ও লেখনী শক্তি’ আছে, বলে আমি ধারণা করি।

    আপনার প্রতিক্রিয়ার শুরুর প্যারাটিতেই শ্রদ্ধেয় আলতাফ হোসেন ও আমার মধ্যকার মন্তব্য তিনটি বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য ও ব্যাখ্যা চলে এসেছিল। কিন্তু আপনি ওখানে থামলেন না, আপনি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন।

    কথা হচ্ছিল একটা রসালো টপিক (বিখ্যাত কবিদের নারীলালসা) নিয়ে, আর আসরে নারীপ্রতিনিধি রাখবার প্রশ্নে আপনি এনজিওর মতো একটা নীরস টার্মকে টেনে এনে এভাবে রসভঙ্গ করায় আমি যারপরনাই আহত হয়েছি, অন্য পাঠকদের কেউ কেউও তাতে আহত হতে পারেন বলেই তো মনে হয়।

    অধিকন্তু, এই কমেন্টে আপনি কোনো কোনো গল্পকারের গল্পে এনজিওদূষণের প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন। এখানে যদি আপনি একটু ঝেড়ে কাশতেন তাহলে আমরা উপকৃত হতাম। অর্থাৎ বলছি যে, গল্পকার ও গল্পের নাম উল্লেখসহ কথাগুলো বললে আমরা একটু জ্ঞানী হতে পারতাম যে, কীভাবে চরিত্রের ‘অধিকার’কে গুরুত্ব দিয়ে গল্প সাজালে লেখকের কল্পনাপ্রতিভা মার খায় ও খাচ্ছে।

  12. nazla says:

    Oh my god!
    What is it?is it any criticism or comment it is just fighting.
    I m very poor to understand any kind of hard writings. But how far i understand that it is simply a feelings of poet how he is inspired to write by a womanthe word “Nari” has a verse meaning i need not to explain this. Al mahmud or Joy Gosswami just discuss about their honest feeling how they r creating. So why u need a “nari” there.If he is telling about a river which inspired him to write will u bring the river to him on their discussions? So funny thinking. Nari doesnt mean the Woman only , it can be motherland , it can be river, it can be earth too.
    I read a poetry of Al mahmud (i dont know the bangla type i m writing in english that verse plz read it)”Burigonga amay dite pareni Brommoputrer modira”so here this river is an inspiration and it is also a symbol of “NARI”. So think again what do we need? We only need to respect the writers
    Nazla

  13. সুভাষ says:

    ভালোই লাগছে লেখকদের গণ্ডোগোল শুনতে। চালাইয়া যান আপনারা।

  14. alamgir ferdous says:

    thanks for the exelent interview.

  15. বিপ্লব রহমান says:

    পড়ছি। পরের পর্বের অপেক্ষায়…

  16. সাঈদ জুবেরী says:

    রোমাঞ্চকর

  17. Mohammad Nasir Uddin says:

    Was captivated with the deep senses of appreciation and heartening joy as long as was going through the reflections of the poets. From his poetry, prose and from many of his interviews that I have read,I get the impression that Al-Mahmud is the least hypocratic amongst our writers. Waiting for the next episodes – hope there will be number of long episodes.
    Ei aalap jodi shesh na hoto!

    Apnader torko niye montoboo kori na – kobider alap shonar je mugdhota seti bohman rakhi nijer maje…

  18. মুজিব মেহদী says:

    সাক্ষাৎকারটি বাংলাসাহিত্যের অনেক বড়ো দুজন কবির লেখালেখির নেপথ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় (আগে জানা ও না জানা দুটোই) উঠিয়ে এনেছে। কবির প্রেরণা হিসেবে ‘নারী’ ওর একটা অংশে অল্প জায়গা জুড়ে এসেছে মাত্র। আমার মন্তব্য এসবকে মোটেই গুরুত্বহীন বলতে চায় নি। সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমার মনে হয়েছিল এখানে নারী প্রতিনিধি থাকলে হয়ত এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। এটা আমার ধারণা, প্রকৃতপক্ষে সেটা না-ও হতে পারত। কিন্তু ছিলেন না বলেও এটির গুরুত্ব আমার কাছে কমে যায় নি।

    নাজলার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, কবি আল মাহমুদ ও কবি জয় গোস্বামীর প্রতি আমার শ্রদ্ধার কমতি নেই। শ্রদ্ধাটা তাঁদের এ যাবৎকালের লেখালেখিই আদায় করে নিয়েছে, এ সাক্ষাৎকার পড়ে সেটার নতুন করে জন্মাবার দরকার নেই। আমার জানামতে, তাঁদের অশ্রদ্ধা করে এখানে আমি একটি শব্দও লিখিনি।

    আমি কেন ওই আসরে একজন নারী প্রতিনিধি রাখবার ব্যাপারে কথা বলেছিলাম তা ওই মন্তব্যেই স্পষ্ট ছিল। বলেছিলাম, তাতে সৌন্দর্য ধারণার সর্বজনীন না হলেও একটা কবিজনীন রূপ স্পষ্ট হতো হয়তবা। আপনি আপনার মন্তব্যে যে উদাহরণ দিয়ে আমার ওই চাওয়াটাকে খণ্ডন করতে চাচ্ছেন, তা আমার কাছে খুব হাস্যকর ঠেকছে। নদী নিয়ে আলাপ করলে নদীর প্রতিনিধিত্ব দরকার নেই, কারণ নদীর কোনো মত নেই। তার কোনো অধিকার বা অপমানবোধও নেই, কিন্তু নারীর আছে। আপনার নিক দেখে আপনাকে একজন নারী মনে হচ্ছে বলে আমি মনে করি, ওই বোধটি আপনারও থাকা দরকার এবং সেটা আছেও।

  19. Saif Tinku says:

    Wonderful! Windows of minds of the two power poets really seems to be opened during their interview. Eagerly waiting for the remaining part and thanks to bdnews24 for showcasing the marvelous aaddaa.

  20. Sarwar says:

    very very interesting!
    Al-Mahmud has the embadded naturalism…sometimes it seems that the nature is speaking…river is speaking…trees are speaking…
    Joy is quite…self-detained …and flexible…nice to read their conversation. thanks Raisu.

  21. kallol says:

    are you satified with the interveiw ? brota .it’s wonderful interview . kallol

  22. Arif Hasan Chowdhury says:

    It’s a wonderful conversation between two poets. I appreciate their honesty and brought thinking. I strongly beleive, it will inspire our next generation poets.
    I would like to sincerely thanks to reporter of this interview.
    Arif, Sweden.

  23. সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ says:

    পরের কিস্তিতে নিশ্চয় আশা করা যায় অনেক ইন্টারেস্টিং আলাপ থাকবে। তা না থাকলে, এই প্রযুক্তির যুগে, পোস্ট মর্টেম কথাবার্তাও আমদানি করা যাইতে পারে হয়তো। এইপর্যন্ত আমার মন নাচতেছে না তেমন।

    তবে কম্বিনেশনটা ছিল সাংঘাতিক! তিন সাংঘাতিক কবি একসাথে! কিন্তু সংঘাত কই!!!

  24. Audity Falguni says:

    I felt it all so bad! How a poet like Al Mahmud can utter a sentence like “You would want to sleep with a woman!” God, and how Raisu says that beauty of a woman or a dog…my lord! so chauvinistic phrasings! So male chauvinistic is still our literary domain which portrays women as nothing but “sex objects.” I lose even my words to protest!

  25. চয়ন খায়রুল হাবিব says:

    It’s another gate crasher here.

    I have enjoyed the interview very much and still relishing on it.

    My observation is Al Mahmud is pretty clear of what he was saying, particularly when it came to talking about sex and lust.He is honest.He is very much in controll of his balls.Not meaning testicles…here it would mean that he was talking sense.

    I didn,t like the comments of Altaf Hossain, Muzib Mehdi, Nazla , Audity Falguni.None of the comments were doing fair justice to the interview.Bratya Raisu seemed got carried away and his comments sounded more than self justifyng.

    Altaf and Muzib jokingly demanded political corectness in the name
    of gender representation. Well enough that Altaf backed away and apologised.

    Muzib carried on.Good that he pointed out some descrepency in Nazlas comments.I agree with muzib that it’s tough to argue with somebody whose critical perspective is limited by conviction.That creats hysterical rethoric.

    Audity Falguni here not most probably but definitely used the word'”Chauvinism” wrongly.OED say this word means “Blind enthusiasm for national glory;jingoism.” I could’nt find any of them yet in the interview.

    If Audity meant “Male-Chauvinism”, even that wont be an appropriate term here as that has Victorian value attached to it where gestures are louder than voice.In fact Mahmuds comments regarding sexuality and sexual orientation are far removed from Victorian values.He is straight forward about it.The two other persons were less straight forward there.Both Joy and Bratya tried hard to attach aesthetics to it as if they were ambarassed by what Mahmud said.

    When a man talk about his sexuality, sexual orientation, lust and desires…it can not be maccho as much as it is not when an woman talk about it.When man don’t talk about it, bottled it up all the reppression come out as domestic fight, rape and depression.Same can go for woman.

    As much as it is in Bangladesh also in the west still in some parts talking about sex is taboo.

    Showing full naked body with full frontals in street bill boards are stiil not allowed in Britain and US where as in France or in Scandinavia no body bothers about it.Roald Dhalls daughter Sophie Dhal modelled for some perfumerys.In france you would find Sophies full naked body with the bottle of perfume, but in UK the same advertisement shows a Sophie covered in transparent clothing and not exposing vital parts.

    My son is regularly reciving a French Children magajine called Pomme D’appy since he was three monts old.He is four now and through this magajine he knows quite clearly now what is sex, how he came in here.But the magazine also cover other faculties which could help devolope a childs mind and body.Uk has yet to have an equivalent of it.

    Why I am saying all this?Just to confirm that sex is and can be as normal talk as any other part of life.If it gets special mentioning by a poet it dosnt need to be attached with the heaviness of political correctnes.When Clinton was forced to be on the dock by Kenneth Starr the then chief justice didn’t want to buy it.

    I hope readers here would like to know about award winning resident of Harvard Eve Enslers work “Vagina Monologe”.To name but few leading luminarys…Jane Fonda, Whoopy goldberg, Glen Close, Susan Sarandon played as guest stars in this Enslar production around the world.

    I could imagine if India can not absorb work like ” Fire”, it’s a bit pre mature to expect that Enslars work would be shown in Bangladesh.Enslar wrote this play as a response to the guilt and embarassment that some women still connect with their bodies or their sexuality.Same can go for man.That could be the reason why when Mahmud talked about his lust toward woman the other two had to cloak it with aesthetics.

    Taslima Nasreen could be the Eve Ensler of Bangladesh.Her fate say a lot about what could happen when woman talk about their lust.It could be interesting to see if Mahmud could talk positively about Taslima.I believe he can not and vise versa.

    Finally I would have problem with Mahmuds Bisshash or Faith, though I would’nt consider him fundamentalist.But I would,nt join his camp.Again I don’t have problem to stomack his comments about lust.It’s good fun.Not Victorian Adirosh.Not CHAUVINISTIC!

    Let’s all of us talk more about sex…

    ChoKhaHabib

    London

  26. HAIDAR says:

    The style of presenting the interview seems to be simple. But in many ways the interviewer was active to belittle both of the poets. It is a deliberate attempt,i think.during reading sometimes i felt ashamed on the interviewer’s style of talking and approach.

  27. ব্রাত্য রাইসু says:

    নারীর প্রতি কামনা-বাসনা নিয়া কবি আল মাহমুদ-এর বক্তব্য প্রসঙ্গে চয়ন খায়রুল হাবিব মন্তব্য করছেন, “My observation is Al Mahmud is pretty clear of what he was saying”, তারপরে তিনি বলতেছেন, “He is straight forward about it.The two other persons were less straight forward there.”

    আল মাহমুদ যখন বলেন, “আমি শুয়ে পড়তে চাই তার সাথে” তখন বাকি দুই পারসনের পক্ষে স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড হবার একটা রাস্তা হইল ওনারে বলা যে আমরাও শুইয়া পড়তে চাই। অথবা শুইয়া পইড়া কী কী করতে চাই তা বলা যাইত।

    আলাপ আগাইছে হইল সাহিত্যিক বন্ধ্যাত্ব থিকা কীভাবে বাইর হওন যায় তা নিয়া। এই শুইয়া পড়তে চাওনরে জয় গোস্বামী সৌন্দর্য হিসাবে দেখতে চাইছেন। এক হিসাবে আল মাহমুদও তাই বলছেন। আমি আগাগোড়া প্রিটি ক্লিয়ার ছিলাম যে নারীর প্রতি যে লালসা তার সঙ্গে আটের্র যোগ আবশ্যিক না। সেইটা ক্লিয়ার করতে অনেক ক্ষণ প্যাচাইয়াও লাভ হয় নাই।

    সাক্ষাৎকার থিকা টুকি :
    “রাইসু : মাহমুদ ভাই, সেক্ষেত্রে যখন আপনার কাছে নারী আকর্ষণীয়, জয়দা যদি তখন বলেন সেই নারী সুন্দর বইলাই আকর্ষণীয়…

    মাহমুদ : সেইটা উনি বলতেই পারেন।

    রাইসু : আপনার কী মত এই ব্যাপারে?

    মাহমুদ : সুন্দরটা নির্ভর করে তো আমার আকাঙ্ক্ষার উপর। আমি কামনা করি। আমি চাই। আমি শুয়ে পড়তে চাই তার সাথে।”

    এ ক্ষেত্রে আল মাহমুদ নারী আকর্ষণীয় হইতে গেলে যে আদৌ সুন্দর হইতে হইব না তা বলেন নাই কিন্তু। তিনি কবি জয় গোস্বামীর লালসা হইল সৌন্দর্য (আল মাহমুদে)-এর কারণ খুঁইজা পাইলেন। তা এই রকম যে : এর পিছনে কামনা কাজ করে। আকাঙ্ক্ষা থাকে। তাই মানুষ শুয়ে পড়তে চায়।

    লালসার কারণ হইল আকাঙ্ক্ষা। এই রকম একটা ইউনিভার্সাল ট্রুথরে আমি জানতে আগ্রহী ছিলাম না। আমার প্রশ্নে আমার অবস্থান এখনও ক্লিয়ার আছে। যে নারী বা নারী-শরীর আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য সুন্দরের সন্ধান করতে হয় না। আর্ট লাগে না। আকর্ষণ ব্যাপারটা শিল্প-সাহিত্য বা সুন্দর নিরপেক্ষ জিনিস।

  28. Audity Falguni says:

    Well…I got another shock knowing that Chayan Khairul Habib’s four years old son knows about sex through reviewing French magazines. Or, probably it’s a pleasure to get the nude body of any actress or model with a full bottle of perfume! Thanks to heaven, I am neither an European, nor an American. God forbid! Once a female scholar of our country was trying to show me some pictures and explain private parts of women’s body. I did not feel good.I got frightened. I liked Joy Goswami’s view most. He, in noway, made any bad comments on women. Also, thanks to Raisu that he defended Chayan that if they did not raise the issue of aesthatics, they had to…

  29. Mostafiz Ripon says:

    The comment that poet Al Mahmud made on 30s poets does not support the history, and their writing evidances.

  30. nazla says:

    সর্বনাশ!
    আমার পাগলা ঘোড়া রে কই থেইকা কই লয়া যাস!!!!
    আমরা আল মাহমুদ। জয় গোস্বামি আর ব্রাত্য রাইসু থেকে কোথায় এসে পৌছলাম।কামনা,বাসনা,ক্ষুধা বা পিপাসার মতোই আর একটা অনুভূতি।
    এটা আমরা মুখে বলতে সংকোচবোধ করি কারণ শুধুমাত্র এই একটা খাদ্য খেতে একটা সময় পাড় করতে হয়।আমরা সবাই আমাদের own perspective থেকে কথা বলছিলাম মতামত দিয়েছিলাম বিষয়টা নিয়ে বাচ্চাদের মতো ঝগড়া বা প্রতিবাদমূলক লিখার তো কোনো প্রয়োজন দেখলাম না। চয়ন আপনাকে বলছি আপনি বা আপনার ইভ এনস্লার বড় আধুনিক মানুষ, আমরা ছাপোষা মানুষগুলো অল্পতে বড় বেশি তুষ্ট। তাই ক্ষমা করবেন আপনার বোল বলতে না পারা ছেলের মত আধুনিক হতে পারিনি। জীবনে শিক্ষার কতগুলো ধাপ আছে আমরা ঐভাবে শিখেই বড় হয়েছি,যখন যা প্রয়োজন সময়ের জোয়ারে শিখে নেয়াট চেষ্টা করেছি। যদিও আক্রমণটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়ে যাচ্ছে বোধহয় তবু না বলে পারছি না চার বছর বয়সে sex নিয়ে ধারণা অর্জন সুফলটা আজ গোটা ইয়ুরোপে AIDS এর রূপ নিয়ে অথবা অল্প বয়সে মাতৃত্বের রূপ নিয়ে কি বীভিষিকাময় দিন যে দিচ্ছে আপনাদের আধুনিক সমাজকে তা না বলাই সমীচিন মনে করি। আমাদের দেশে যে এই AIDS বা অকাল মাতৃত্ব নেই তা আমি বলবো না আমাদের যতোটুকু ভুল বা অন্যায় তা শুধুমাত্র না জানার কারণে। জেনে ভুল করা মানুষদের পর্যায়ে আমরা নই। তাই সুশীল শব্দটা শুধুই আমাদের জন্য, sofsticated এর প্রতিরূপ হতে পারে না।

    এবার অদিতি আপনাকে বলছি নিজেকে কামনা বা বাসনার বস্তু নিজেরা কেন বানাচ্ছি, আল মাহমুদ তার অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন যা তাকে একজন নারী শুধু একজন নারী দিতে পারে, এটা লালসার মতো শোনালেও এটাই অনুপ্রেরণা। সব কিছু কেন ভালো ভাবতে শিখি না কেন? দেখবেন মন্দ চিন্তা পালিয়ে কূল পাবে না। নারীকে কামনা করে যদি উপমহাদেশ লিখা যায় তবে সে কাম্য নারী হতে অনেকের হয়তো ইচ্ছা করবে,অনেকের ঘেন্না লাগবে,এটাই তো আমাদের জীবন। আমাদের চিন্তা চেতনাটা শুধুই আমাদের। এটা নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করে তো কোনো লাভ নেই, যা আল মাহমুদ বা জয় গোস্বামীর ভালো লাগে তা আমার হতে পারে এটা কেন মেনে নেই না, কেন নিজেরাই মনে করিয়ে দেই আমাদের কেন ভোগ্য ভাবছ। যে যেমনটাই ভাবুক না কেন আপনি অদিতি আপনিই থেকে যাবেন।

    আর মুজিব আপনাকে বলছি আমার বক্তব্য আপনাকে আঘাত করার জন্য ছিল না। আঘাত যদি করেই থাকি ক্ষমা চাইছি, আমার তুলনা আপনার হাস্যকর লেগেছে শুনলাম কিন্ত কিছু করতে পারছি না কী করবো বলুন আমি বোধহয় মানুষটাই হাস্যকর। হাসি মানুষকে বাচিয়ে রাখে। So i deserve a great thanks from u. by the way i hope i wont tell a single more word about this interview. আল মাহমুদ যা বলবেন সেটা তার চিন্তা আমার কিচ্ছু না, ব্রাত্য যা বলবেন সেটা তার। আমি কোন অভাগা মন্তব্য করার?
    নাজলা

  31. মুজিব মেহদী says:

    তথ্যটা খুবই বৈপ্লবিক যে চয়ন ভাইয়ের ছেলে মাত্র চার বছর বয়সে সেক্স কী জিনিস তা পরিষ্কারভাবে জানে। আমাকে এটা চমকে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। অথচ আমি সংস্কারান্ধ ভেতো বাঙালি দশ বছর বয়সী ছেলে টিভি অ্যাড দেখে ‘কনডম’ কী জিনিস জানতে চাইলে “বিবাহিত নারী-পুরুষের ব্যবহারে লাগে এমন একটি জিনিস, যেটি তোমার এখনই জানার দরকার নেই”-এর অধিক কিছু বলতে পারি না।

    সেক্স এডুকেশন নিয়ে পৃথিবীব্যাপী বিতর্কের শেষ নেই। প্রথম বিতর্ক হলো, এটা দরকারি কি না বা হলে কতটা, দ্বিতীয় বিতর্ক কত বছর বয়স থেকে এটা উপযোগী এবং তৃতীয় বিতর্ক হলো কারিকুলামটা কী হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথম বিতর্কে আমি এ শিক্ষা দেয়ার পক্ষে, দ্বিতীয় বিতর্কে আমি প্রাথমিক শিক্ষার পর্যায় উত্তীর্ণ হলে পরে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করবার কথা বলব, আর তৃতীয় বিতর্কে আমি সংশ্লিষ্ট সবই অন্তর্ভুক্ত করবার কথা বলব বয়স অনুযায়ী, ধাপে ধাপে। শৈশবে, বিশেষ করে চার বছর বয়সে ছেলেমেয়েকে ‘সেক্স কী’ তা জানাতে চাইলে জন্মের পর থেকেই তার জন্য সেক্স এডুকেশন দেয়া শুরু করতে হবে, চয়ন ভাই যেটা ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিনের সহায়তায় সম্ভব করেছেন। সেটা নৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কে জড়াবার লোক এদেশেও আছেন বলে বোধকরি।

    খোঁজ নিয়ে দেখলাম, আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার কোথাওই এরকম বয়সে সেক্স এডুকেশন চালু নেই (অন্তত আমি খুঁজে পাইনি,অন্য কেউ খুঁজে পেলে জানাবেন। আমি ফলো করেছি এই লিংক http://en.wikipedia.org/wiki/Sex_education)। যেখানে ব্রিটিশরা তাদের ছেলেমেয়েদের ৪ বছর বয়সে ‘সেক্স কী’ তা শেখায় না, সেখানে বাঙালি-ব্রিটিশ চয়ন ভাই তা শেখান। একটু কি অতি দোষে দুষ্ট লাগছে না বিষয়টা? আমার কাছে তো সেরকমই মনে হচ্ছে।

    এ প্রেক্ষিতে চয়ন ভাইয়ের কাছে আরেকটা বিষয়ও জানবার আগ্রহ হচ্ছে, সেটা হলো, আপনার সন্তান মেয়ে হলেও কি সে তিন মাস বয়স থেকেই নিয়মিত ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিনটা পেত, যেটা ‘সেক্স কী’ দ্রুত এ ধারণাতেও উপনীত করে?

    মূল বিষয় ছাড়িয়ে আমরা অনেকদূর পর্যন্ত চলে এসেছি, নাজলাও সেকথা বলছেন। কিছু করার নেই, কারণ কথাই কথা বাড়ায়। নাজলাকে বলব, আপনি আমার উপর রেগে গিয়ে এ পোস্টে কথা বলা বন্ধ করবেন না প্লিজ। যদি বলার থাকে তাহলে অবশ্যই বলবেন, আমি হাসলেও বলবেন। বিতর্কে ভিন্নমত অবলম্বনকারীর কথা তো বিপক্ষে যাবেই। সেজন্য রেগে গেলে হবে কেন?

  32. nazla says:

    মুজিব ভাই, আমি রাগ করিনি।মাতিস কে নিয়ে বেশি মাতামাতি হয়ে যাচ্ছে তাই চুপ করলাম।ছোট্ট একটা দেব শিশু কি শিখছে তা তার পিতামাতাই ঠিক করুক।বলার মতো কিছু থাকলে অবশ্যই বলব, মা বলেন জোয়ারের মতো আমার চাপা নাকি বাধ দিয়ে ঠেকানো যায়না। সুতরাং আমি আবার মুখ খুলব তবে অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় নিয়ে নয়
    নাজলা

  33. চয়ন খায়রুল হাবিব says:

    Muzib, I did,nt exaggerate.The magajine “Pomme Dapi” exist.The relevant book supplement was about how a baby come to the earth
    is callled “La Naissance” by Agnes Rosenstiehl.

    The preface is written by the director of Paris Psycho-Pedagogique Centre Dr Andre Berge.Introduction is by Jean-Yeves Desjardins, professor of Sexology, Quibec University.

    The book and all its drawings are aimed at very early stage babys 3-4.The introduction is aimed at parents, how to demythify the birth process to children at a early stage and tell them innocently how they came into being.

    Did I mention it as part of any curriculam?Perhaps not.

    If you send me your address I would surely send you photocopy.Its a beautiful album of simplest drawing.

    My mother in law a retired school teacher living in a distant village actually subscribe twice a month for two Pomme Dapi for two of her grand childdren.One is a boy that is my son, another is for my sister in laws three year old daughter.

    The magajine deals only issues that would be helpfull for a childs mental and physical growth.It’s full of pictures, how to wash hand after shiting, animal storys,folk , fantasy, fairy tales, always introducing socialy benificial institution of police, fireman, nurse etc, etc.

    The very early stage Pomme Dapis are for parents to make sound to the baby and show picture.Thats how my wife taught my son French.To my sadnes I hav’nt got a Bangla pomme dapi.Pakhi sob kore rob….

    The magajine itself is not for learning about sex”quickly”.
    The particular book supplement was not about kama sutra.It’s how to explain in real terms with pronouncing the word “sex” when a Khoka or Khuku ask “Elem ami kotha theke”.

    Though British and French approach to child education is very different,British protection system involving babys has similarities with French as both has to abide by EEC guidlines.Both country from the nursery stage encourage body awareness and while showing,letting kids playing with the toys of police, fireman, nurse, builders also introduces toys as replica of new born baby,baby -feeding and how that baby is born and grow.One reason of this is to empower and encourage a baby to think that his/her body only belong to him/herself, that body could only be touched affectionately by parents and authorized adults, not in random by any adults.No chance of chacha, mama, paratuto dada ar jamaibababur abuse, though apparently here most of the young ones like to expose their body lines.

    This subtle body awarenes games are aimed at giving children tools, so they can signal abuse even when they can not make a full sentence.Its a protection from abuse.British authority to look after this is called OFSTEAD.
    Physical attitude of British and French are also very different.French are open and British are opening just recently.

    Even in Europe not in all country children body awareness programmes are that elaborate.Fund problem and attitude problems are there.
    In some European country its non existent.Germans, French and the scandinavians are highly advanced.British start the whole thing only in primary school.Irish put a blind eye to children sex education even till nineties.Child abuse is still very high in Ireland.Catholisism could be blamed here.
    The newly joined ex-communist countrys in the EEC spending their subsidy mainly for infrastructures.

    Nazla mentioned about aids.The highest rates of Aids now is in Africa, China and India.HIV+ patients are there in EEC.But it is now almost guaranteed that within EEC HIV+ patients wont die from AIDS as the health system now can manage the desease and can block the symptoms , but cannot cure it.Thats why a lot of African and Chineese elite suffering from HIV+ prefer to live in the EEC.Aids is a marginal problem in EEC, no where near to be mentioned as a crisis.

    Tough luck for Nelson Mandella.He had to see his son dying out of AIDS.Mandellas successor is a mad-orthodox -christian-marxist , who wouldnt allow resources for sex awareness programmes.This man is carrying the Popes and Bush’s message:it’s not awarenes, abstination!This type of attitude making body awareness among children more urgent.

    It’s for sure love making can not be stoped.But it can be safer.

    Thanks to Bratya Raisu for making his stand point clear.I am always helped when other writers talk about “creative blocks”.

    To the pain of Audity Falguni I have to point out that Joy was saying :ki Apurbo,ki apurbo…, when Mahmud and Bratya were making the controversial comments.He dosnt fit your bill that perfectly as you are demanding!

    Najla also used the word “amra”!Who are these “Amra”?I am not sure whether Begm Rokeya,Jahanara Imam, Taslima Nasreen, Monica Ali would want to joint your “Amra”.The striking common point of these four is the “Ami” of the Nari .

    From my part I am ending the discourse on this particular issue.more empowering issues waiting.Udashi upeekhay porlam:British Bangali, adhunik…ar ar onnanno sorbonamgulo.

    Finally again a warm congratulation to Bratya Raisu for this milestone interview.

    ChoKhaH

    London

  34. মুজিব মেহদী says:

    ‘Udashi upeekhay porlam: British Bangali, adhunik… ar ar onnanno sorbonamgulo’

    It is proved that you do have extraordinary power to keep away from unpleasant things which is less-important. Thank you very much.

    I think it is not necessary to debate more in this post because it is already created a distance from main topic of it. So…

    Anyway, please send me the photocopy of that beautiful album along with the introduction written by Jean-Yeves Desjardins according to you word. The request will be valid, if you consider it an effortless work only. I really feel a curiosity to hear your details on it.

    I am at m.mehdy@gmail.com
    I want to give you my physical address through e-mail.

  35. Audity Falguni says:

    Abuse is such a thing that probably a child can understand it even without sex education. One week ago, Indian gender trainer Kamla Bhasin held a gender orientation training in Dhaka, where she very frankly admitted that 13 men put finger in her vagina in her years between 4-9. She said, “How me, a four years old child, understood that I should not say it even to my mother whom I’m sharing little things like any cousin pushing me on back. We women understand it from the moment we are born.” I had never such ugly experience in my childhood…probably my parents could protect me better…but, ofcourse I have been molested in the street at my teens by unknown passers-by on upper parts of my body.I needed no sex education to detect that. That does not mean I’m against sex education. But, the craze for “sex education” also appears to me somewhat like an issue fed by west to us. Their thought-patterns and our thought-patterns can never be the same. I have passed almost a whole life…and millions of men and women like me in our country have passed their whole lives…generations after generations without sex education…so what? Don’t we live our lives?

  36. আফিফা আনোয়ার খানাম says:

    সন্দেহ নাই সাক্ষাৎকারটির নানা ভাবে বিশেষত্ব ছিল। আমি যেন খুবই উৎফুল্ল (উপহাস অর্থে) হয়ে পড়লাম আমাদের দুই প্রধান কবির মানসিক সীমাবদ্ধতা দেখতে পেয়ে। ঘটনাটি গলাধঃকরণ করা আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল যে, আমাদের প্রধান কবিরা ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক’ দারিদ্রসীমার নিচে বিচরণ করছেন। অথবা কিছুটা ভদ্রতার সঙ্গে বলা যেতে পারে [বেনিফিট অফ ডাউট] যে, নিজের মনোভাব প্রকাশ করতে গিয়ে শব্দ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের মান দারিদ্রসীমার নিচে লক্ষ্য করা যায়।

    এ প্রসঙ্গে আমার কাছে দুটো উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে :

    এক
    নারীর সৌন্দর্য্য প্রসঙ্গে মাহমুদ বলেছেন :

    “মাহমুদ : সুন্দরটা নির্ভর করে তো আমার আকাক্সক্ষার উপর। আমি কামনা করি। আমি চাই। আমি শুয়ে পড়তে চাই তার সাথে।”

    “মাহমুদ : এই যে আমার যে আকাক্সক্ষা, এই যে ভোগ করার যে লালসা, আর্টের সর্বক্ষেত্রে আমার মনে হয় এইটা আছে।”
    অতএব তিনি বলতে চেয়েছেন, তার ব্যক্তিগত যৌনাকাক্সক্ষার উপরেই নির্ভর করে নারীর সৌন্দর্য, এখন যদি কেউ তার এই বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করে তবে এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে ‘মাহমুদ একজন মানুষ বা কবি হিসেবে সাধারণ ভাবে নারীর সৌন্দর্যকে চিহ্নিত করবার ক্ষমতা রাখেন না। কেবল মাত্র তার যৌনাকাক্সক্ষা খুব উঁচুতে চলে গেলে তিনিও নারীর এক ধরনের সৌন্দর্য চিহ্নিত করতে পারেন!

    দুই
    তিন কবি যখন সাধারণভাবে সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলছিলেন জয় তখন বলার চেষ্টা করছিলেন, এটা রিলেটিভ যা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্ন হতে পারে, তার এই ধারণাকে সমর্থন দিতে গিয়ে একটি উদাহরণ দেন যে তিনি জানেন একটি ‘খোঁড়া মেয়ে’কে একটি ‘খোঁড়া-নয় যুবক’ গভীরভাবে ভালবাসে। এই যে মেয়েটিকে বর্ণনা করতে গিয়ে তার ‘খোঁড়া’ শব্দটির ব্যবহার এর পরিবর্তে তিনি আরো নির্দোষ শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন। যেমন ‘দৈহিক ভাবে বাধাপ্রাপ্ত’ [ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড] যাতে কোনো ‘খোঁড়া মেয়ে’র প্রতি তার ব্যক্তিগত মনোভাবটি উহ্য থাকত। তার কথার মধ্যে এখানে আরো লক্ষ্য করা যায় যে তার কাছে একটি ‘খোঁড়া মেয়ে’ সুন্দরী বালিকার সংজ্ঞার আওতাভুক্ত নয় এবং যেন ওই ‘খোঁড়া মেয়ে’টির প্রেমে কখনোই কেউ পড়বে না। ‘খোঁড়া মেয়ে’টি তার কাছেও সুন্দর নয় বলে কবি জয় গোস্বামীর জন্যে এটি একটি ‘সম্ভব-নয়’ ধরনের উদাহরণ।
    মন্তব্য করত গিয়ে লেখক হিসেবে আমি মূল বিয়য়ের (সাবজেক্ট) সঙ্গে থাকতে চেয়েছি আর সেটা হলো কবিদের কথোপকথন ও তার বিষয় (কনটেন্ট)। এখন মনে হচ্ছে বিষয়ের ফোকাস পরিবর্তিত হয়ে ‘যৌন শিক্ষা’র (সেক্স এডুকেশন) উপর পড়েছে। আসলে এ বিষয়ের (ডিসিপ্লিন) প্রকৃত শিরোনাম ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা’। ‘যৌন শিক্ষা’ কথাটি সাধারণত একটি ভুল ব্যবহার। বিষয়টির মূল শিরোনাম সম্পর্কে জানা থাকলে ‘যৌন’ কথাটির উপরে জোর না দিয়ে শিক্ষা শব্দটির উপর জোর দিলে কোনো ‘ভুল বোঝাবুঝি’র অবকাশ থাকবে না বলে আমার মনে হয়। সংক্ষেপে এই ডিসিপ্লি¬নে পড়ানো হয় মানব গোষ্ঠির যৌনতা, মনো-সমীক্ষা, শারীর বিজ্ঞান, শারীরিক নিরাপত্তা, জীবনে এসব ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, ইত্যাদি। আরো গুরুত্বের সঙ্গে বলা যায়, এই ফিল্ডে (ডোমেইন অর্থে) ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে, নিজের দেহ সম্পর্কে, নিজের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয়। এই অধ্যায়ন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে নিরাপদ সেক্সক্স কীভাবে হতে পারে তাও আলোচনা করে। তবে তার অর্থ এই নয় যে সেখানে দায়িত্বহীন যৌন সম্পর্ক গড়ায় অনুপ্রাণিত করা হয়। অতএব স্বাস্থ্য শিক্ষা সম্পর্কে যে মিথ বা ভুল ধারণা রয়েছে (যৌনতা শেখানো হয়!) সে সম্পর্কে বাড়তি কিছু বলা হলে ব্যক্তিগত ভাবে আমার কোনো আগ্রহ যেমন থাকবে না বা কারো থাকা উচিৎ বলেও আমি মনে করি না ।

    নোট
    মূল মন্তব্যটি ইংরেজিতে লেখা ছিল (যেহেতু কিছু মন্তব্য ইংরেজিতে দেখেছি)। কিন্তু হঠাৎ করে বিডি নিউজ-এর ‘বাংলায় মন্তব্য-লিখন আবশ্যক’ নীতি প্রয়োগের ফলে আমি আমার ওই ইংরেজি লেখাটার বাংলা অনুবাদ করবার চেষ্টা করেছি, ফলে কোথাও সামান্য বেখাপ্যা মনে হলে আগেই মাফ চাওয়া থাকল।

    আফিফা আনোয়ার খানাম

  37. সুমন রহমান says:

    তুমুল বিতর্ক! আল মাহমুদের যৌনতা বিষয়ক বয়ান আক্রান্ত হল উন্নয়ন এবং নারীবাদের জায়গা থেকে। মূল প্রসঙ্গটি ছড়িয়ে গেল নানান ডালপালায় এবং শেষে, হারাল। সেই সাথে চিত্ত আমার হারাল।

    আল মাহমুদের নারীভাবনা নিয়ে চমকাবার কিছু দেখি না। গত পঞ্চাশ বছর ধরেই তিনি প্রায় একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নারীর দিকে তাকিয়েছেন। সাম্যবাদ থেকে ইসলাম, আল মাহমুদের রাজনৈতিক-আধ্যাত্মিক কেবলা যেদিকেই ঘুরুক না কেন, তাঁর নারীরা যৌবন-জরদ উদাম করেছেন ক্ষেতের আড়ালেই। কিন্তু ইত্যবসরে, দেশে প্রবল নারীবাদ এসেছে, এসেছে সাজ সাজ উন্নয়ন। এই বৃদ্ধ কবি সেসবের বাইরে ছিলেন, এবং আছেন।

    আল মাহমুদের যৌনতা প্রাক-ভিক্টোরীয়, ফলে বিদগ্ধ সমাজের ভ্রুকুটি সে গায়ে মাখে না। বাংলা সাহিত্যের কনটেক্সটে তার যৌনতা বিস্ময়কররকম ধারাবাহিক, যদি আমরা চর্যাপদ থেকে ভারতচন্দ্র পর্যন্ত ইতিহাস খেয়াল করি। সেই অর্থে ইনি যথার্থ প্রাগাধুনিক, এবং কখনো কখনো ক্রিটিক অব মডার্নিটি। এই ধরনের যৌনতা-বিবৃতিকে আমাদের “সিভিল” গদ্যে সহ্য করা অনেকের জন্যই মুশকিল দেখছি, কিন্তু পদ্যে হলে কিন্তু প্রায়-সবাই সহ্য করে নেন। এটাই মাহমুদের কবিতার রাজনীতি। বা সার্বিক অর্থে, কবিতার রাজনীতি।

    সেই অর্থে জয় গোস্বামী তাঁর যৌনতাভাবনায় প্রাগাধুনিক নন। তিনি প্রাগাধুনিকতার গুণগ্রাহী।

    প্রসঙ্গটি নিয়ে যারা নানাদিক থেকে নানাভাবে আলোচনা করলেন তাদের মন্তব্যে অনেক বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাগুলো পড়েছি, ইংরেজিগুলো দেখে ভয় পেয়েছি! ইংরেজিতে না লিখে বাংলায় লিখলে আমাদের বড় উপকার হয়। বাংলা লেখা আজকাল বড় কোনো ঝামেলা নয়। আর কেউ কেউ দেখি বাংলায় নিবন্ধ লেখেন ঠিকই, কিন্তু মন্তব্যের বেলায় ইংরেজি! আমার বিশ্বাস বাংলায় আপনারা আরো সুন্দর লিখবেন।

  38. এহসানুল কবির says:

    “গত পঞ্চাশ বছর ধরেই তিনি প্রায় একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নারীর দিকে তাকিয়েছেন। সাম্যবাদ থেকে ইসলাম, আল মাহমুদের রাজনৈতিক-আধ্যাত্মিক কেবলা যেদিকেই ঘুরুক না কেন, তাঁর নারীরা যৌবন-জরদ উদাম করেছেন ক্ষেতের আড়ালেই। কিন্তু ইত্যবসরে, দেশে প্রবল নারীবাদ এসেছে, এসেছে সাজ সাজ উন্নয়ন। এই বৃদ্ধ কবি সেসবের বাইরে ছিলেন, এবং আছেন।”– অল্প কয়েকটা কথায় আল মাহমুদের যৌন ভাবনার গোটা ইতিহাসটা প্রকাশ করেছেন সুমন রহমান। ধন্যবাদ, সুমন।
    পক্ষান্তরে, অদিতি ফাল্গুনীর মন্তব্য পড়ে মনে হল, তিনি যেন কতকগুলো আখ্যাপত্র হাতে নিয়ে বসে আছেন সুযোগ পেলেই এঁটে দেবেন বলে!

  39. আসাদ says:

    ভাল সাক্ষাৎকার। পরের কিস্তি কখন আসবে? অপেক্ষায় আছি…

  40. টিংকু says:

    এই নান্দনিক কাব্য-সাক্ষাৎকারের বাকি কিস্তিটি কেন ১ মাস ২০ দিন পরেও প্রকাশিত হচ্ছে না?

    টিংকু

  41. শামীম রহমান says:

    খুবই ভাল লেগেছে দুই কবির মিলন ক্ষণটিকে।

  42. ফয়সল নোই says:

    থ্যাংকস। খুব ভালো লেগেছে।

  43. রাইসুল মোসাফির says:

    ভালো সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী হিসেবে বাংলাদেশে ব্রাত্য রাইসুর নামডাক আছে। ওই বিবেচনায়ই এটি পড়তে লাগলাম। শুরুতে জয় গোস্বামী একটা চমৎকার প্রসঙ্গ টানলেন। কবির নিজস্ব ভাষা এবং সেটার বদলে যাওয়া বা এক ভাষায়ই লেখা চালিয়ে নেওয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গে। খুব বড়ো পরিসর নিয়ে তিনি আগাচ্ছিলেন। কিন্তু ব্রাত্য রাইসু ওখানে হঠাৎই তাঁর বাঁ হাতটি ঢুকিয়ে দিলেন। তাঁর এই কাজটা করার উদ্দেশ্য পরে পরিষ্কার হলো, যখন বোঝা গেল যে তিনি রবীন্দ্রনাথকে খাটো করবেন এরকম একটা পূর্বপ্রস্তুতি তাঁর ছিল। যেজন্য তাঁর তর সইছিল না।

    আরেকটা বিষয় পাঠক হিসেবে আমার দৃষ্টিতে এসেছে, সেটা হলো আল মাহমুদ যখন জয়ের কবিতা প্রসঙ্গে বললেন, তখন খুবই ভাসা ভাসা হালকা কিছু কথা এল, যা দিয়ে এটাই বোঝা গেল যে আল মাহমুদ ভালো করে জয় গোস্বামী পড়েন নি। অপরপক্ষে যখন আল মাহমুদ প্রসঙ্গে জয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলো, তখন তিনি এমন চমৎকার করে ‘সোনালী কাবিন’ পাঠের অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করলেন যে, ওই কবিতার সমস্ত শক্তিই ওই কয় কথায় মূর্ত হয়ে গেল।

    এই জবানির পর ব্রাত্য রাইসু যখন শিশুর মতো জয়কে এই প্রশ্ন করেন যে, ‘মাহমুদ ভাইয়ের কবিতা ‘সোনালী কাবিন’ পড়ছেন?’, সত্যি বলছি তখন আমার খুব লজ্জা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, যিনি এই প্রশ্নটা করছেন, তিনি কোনোভাবেই প্রমাণ করতে পারবেন না যে, তিনি ‘সোনালী কাবিন’ পড়েছেন।

    যাহোক, সাক্ষাৎকারটি পড়ে আমি খুব ঠকেছি বলা যাবে না। তবে এই সাক্ষাৎকারটির সম্ভাবনাগুলোকে ব্রাত্য রাইসুর কারণে মরে যেতে দেখে কষ্ট পেয়েছি এবং এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, ব্রাত্য রাইসু সাক্ষাৎকার গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল এই জায়গায় অদ্বিতীয় যে, তিনি সাক্ষাৎকারপ্রদানকারীদের বিশেষভাবে বিরক্ত করতে পারেন।

    – রাইসুল মোসাফির

  44. টিংকু says:

    সাক্ষাৎকারটি সব কবিরই পাঠ্য।

  45. সায়েমা খাতুন says:

    বহু পার্শ্বীয় প্রতিক্রিয়াসমেত উপভোগ্য সাক্ষাৎকারটি নজরে এল অনেক পরে। বাংলা ভাষার অসামান্য দুই কবির সাক্ষাৎ, সাহিত্যভাবনা, রসবিচার সমৃদ্ধ লেখাটি বহু চিন্তা ও অনুভূতিকে উস্কে দিয়েছে–সন্দেহ নেই। সেখান থেকে একটা মীমাংসিত সত্যের দরবারে পৌঁছতেই বা হবে কেন? এ তো কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বালোচনা নয়। কলাকারের রসের জগতে অনুভব ও উপলব্ধিই তো শেষ কথা। আবার শেষ কথা নয় এজন্য যে, অনুভবের রঙ কোনো স্থির কিছুও নয়। উপলব্ধির কোনো শেষ কথা নেই। সমাজবিজ্ঞান নারী-পুরুষের সম্পর্ককে, কিংবা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ককে নিয়ে যে ধরনের বিচার করে থাকে, যে সত্য অšে¦ষণ করে, কলা ও সাহিত্যের সত্য সে রকম তর্কের বিষয় নয়। বরং সেখানে কিছু স্তব্ধতার জায়গা আছে। কোনো বিশেষ ধরনের সাহিত্যকে যদি আমরা বর্জন করতে চাই, তা গালাগাল করেও বিশেষ সুবিধা হয় বলে আমার মনে হয় না। কৃমী খুঁটে খাওয়া হাজার হাজার পৃষ্ঠা সাহিত্য সমালোচনাই বা কী করতে পারে? কেবল নতুন রসের সওদাগরই পুরোনো, যাকে আমরা বাতিল করতে চাইছি, তাকে সরিয়ে দিতে পারে। নতুন করে সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে না পারলে সব তর্কই বৃথা।

    যে ভাষাকাঠামো যৌনবাদী, লিঙ্গবাদী, বর্ণবাদী, যে গোটা চিহ্নব্যবস্থাই দমনমূলক ক্ষমতার কেন্দ্র, সেখানে বসে যখনই কথা বলি, কবিতা লিখি, রস সৃষ্টি করি, বার বার তাকেই তো শতরূপে শতবার গড়ে তুলি, জেনে শুনে বিষ পান করি। সেখানে একজন আল মাহমুদ বা একজন জয় গোস্বামীর মত রসস্রষ্টারাও সেই ঘরে, তার মধ্যেই বাস করেন। আমাদের ঘর-সংসারের কর্তাই যে পুরুষ, তাই তো নয়, ভাষার সংসারের কর্তাও তো তিনি। নারী সেই সংসারে বস্তুর পঙ্ক্তিতে। এই ভাষার সংসারে একজন নারী লিখলেই সেই সংসার ভেঙে পড়ে না, বরং তাতে আরও হাস্য-লাস্য-রসের সঞ্চারও হতে পারে। সমালোচনা সেই সংসারে অশান্তি ঘটাবে, ঠিক, তবে সেই সংসার ভাঙবে কোনো নতুন প্রতিভার হাতে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির ভেতর। দেবতাদের বদলে যেমনি সাধারণ মানুষের জীবনকে, তার হৃদয়কে একদিন দেখতে পেয়েছিল সাহিত্যের জগত।

    তাই কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা বৃথা। করতে হলে তো প্রিয় বন্ধু অদিতি ও অন্যরা, আধুনিক সাহিত্য সমগ্রকেই প্রশ্ন করতে হবে। কেট মিলেট যেমন করেছিলেন। ভার্জিনিয়া উলফ যেমন নতুন সংসারের স্রষ্টা হয়ে উঠেছেন। অদিতি যেমন করে চলছেন। সে কেবল দুর্গত নারীর উদ্ধারের বিষয় নয়। শ্লোগানমুখর রাজনীতি কিংবা ফ্যাক্টসর্বস্ব সমাজবিজ্ঞান নয়। নারী ও পুরুষের সম্পর্কের আনন্দ, সৌন্দর্য ও রসের মুক্তির খোঁজ। এই চিহ্ন ব্যবস্থায় দাসত্বের ভেতর যা নিখোঁজ হয়ে আছে।

    প্রাচীন বা মধ্য যুগীয় সাহিত্যে মানবিক অনুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলস্বন যৌনতার অবদমন আসে আধুনিক যুগের সাহিত্যের ঢাক্ ঢাক্ গুড় গুড় দিয়ে। ভিক্টোরীয় মতাদর্শে যৌনতাকে অস্বীকার করে নীতি-নৈতিকতার গঠন হয়েছে। বিশেষ করে যৌনসত্ত্বা হিসেবে নারীর সকল প্রকার কর্তৃত্বকে খর্ব করে দেয়া হয়েছে। নারীর পক্ষে আত্মপ্রকাশকে অসম্ভব করে তুলেছে। সাধারণ পুরুষের জন্যও তা দমনমূলক। তিরিশের সাহিত্যে যে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল, তাতে এর একটা স্বীকৃতি তৈরির চেষ্টা হয়েছে। প্রেমের সাথে যৌনতার সম্পর্ককে উদ্যাপন করা হয়েছে। ষাটের সাহিত্য তো রীতিমত এ বিষয়ে শোরগোল তুলে ফেলেছিল। এ পর্যন্ত নারী-পুরুষের পুরোনো সম্পর্কে ভাঙন ধরাতে কেউ আসেনি। হয়ত এই দু হাজারে কেউ আসবে। দার্শনিক ভাব আন্দোলনগুলো চিত্রকলা, সাহিত্যের ঘর-সংসার তছনছ করে, আবার নতুন সংসার কি বাঁধে নি?

  46. থ্যাংকস। ফ্যান্টাসটিক।

    – Jahir Elias khan

  47. মাহমুদ শাওন says:

    সাক্ষাৎকারটি (না-কি আড্ডাটি) খুব উপভোগ করলাম। কিছুটা উত্তেজিতও বোধ করলাম। ব্রাত্য রাইসু, আপনার নেওয়া আরও কিছু সাক্ষাৎকার বিভিন্ন সময় পড়েছি। সে সব সাক্ষাৎকারে উত্তরদাতারে খোঁচাইতে, কখনো বিব্রত করতে, কখনো হঠাৎ বিভ্রান্ত করতে দেখেছি। যা হোক, আমার খুব ইচ্ছা আপনার একটা ইন্টারভিউ করার।

    মাহমুদ শাওন
    কল্যাণপুর, ঢাকা

  48. বেশ উপভোগ্য সাক্ষাৎকার। সমান আকর্ষণীয় পরবর্তী মন্তব্য ও আলোচনার আসর।

    আমি পশ্চিম বাংলার; তদূপরি মূলতঃ সাহিত্য-বহির্ভূত লোক। জয় গোস্বামীর কবিতার সাথে স্বল্প পরিচয় আছে, কিন্তু আল মাহমুদ বা ব্রাত্য রাইসুর কবিতা পড়ি নি কখনো (তবে ইচ্ছে হচ্ছে এখন)। লেখা-গুলো পড়ে বেশ কিছু কথা মনে হল, বলছি।

    ১) নারী সম্পর্কে আল্ মাহমুদের বক্তব্য সাধারণ ভাবে সুরুচির নয়। ব্যক্তিজীবনেও নারী সম্পর্কে তিনি এরকম মত পোষণ করলে সেটা অমানবিক, শুধু পুরুষতান্ত্রিক বললে কম বলা হয়। তবে কেবলমাত্র কবিতার প্রেরণা হিসেবে নারীকে তিনি যদি কামনার বস্তুরূপে দেখে থাকেন, সেটা তার নিজস্ব এক্তিয়ার। সেটা স্বীকার করার সৎসাহস আমার কাছে ধন্যবাদার্হ।

    ২) রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ব্রাত্য-জয়ের কাজিয়া খুব সাংস্কৃতিক লাগল না। জয়ের রবীন্দ্র-পূজা আবেগমথিত (যদি কবি মাত্রেই আবেগের সওদাগর!); ব্রাত্যের সমালোচনা রূঢ়, অশিষ্ট। আবেগ বর্জন করলেও যেটা বলা যায়, কোন ব্যক্তিবিশেষের অবদান সেটাই, তিনি আসার পূর্বে কি ছিল আর তিনি চলে যাওয়ার পরে কি পেলাম–এ দুইয়ের অন্তর। গণিতের পরিভাষায় যাকে বলে ডেল্টা (delta) | রবীন্দ্রনাথ নিজেও বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন “পূর্বে কী ছিল এবং পরে কী পাইলাম তাহা দুই কালের সন্ধিস্থলে দাঁড়াইয়া আমরা এক মুহূর্তেই অনুভব করিতে পারিলাম। …বঙ্গভাষা সহসা বাল্যকাল হইতে যৌবনে উপনীত হইল।” (আধুনিক সাহিত্য, বৈশাখ ১৩০১) ‘প্রভাতসংগীত’ যেমন সেই অন্তর (subtraction) পরিমাপের সূচনাবিন্দু হওয়া উচিত নয় (ব্রাত্যর সাথে একমত), তেমন রবীন্দ্রনাথের ভাব, ভাষা, প্রকাশশৈলীর বৈচিত্রের সাথে মধুসূদন বা ভারতচন্দ্র তুলনীয় নন (তাঁদের কবিত্বের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি)।

    ৩) যৌনতা বিষয়ে আমরা হয় ভীষণ রক্ষণশীল, নয় ভীষণ লোক-দেখানো বৈপ্লবিক। চিঠি-গুলোতে দুটো অবস্থানই চোখে পড়ল। সায়েমা খাতুনের সাথে আমি একমত–আমাদের দেশে (ভারত বা বাংলাদেশ বা আরো বড় করে বললে তৃতীয় বিশ্বের যে কোন দেশ) ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা’ অনেক বেশি জরুরি, ‘যৌন শিক্ষা’ যার অংশবিশেষ। কিন্তু আমরা পশ্চিমের দৃষ্টিতে জগৎ দেখি, তাই নিজের ঘরের সমস্যা প্রথমে চোখে পড়ে না।

    – সুকোমল পাল

  49. মাহবুবুল হক says:

    পুরো বিতর্কটা পড়ার ফাঁকে একটা কথা না লিখে পারছি না। নব্বইয়ের দশকে বইয়ের ফ্ল‌্যাপ পড়া কিছু আঁতেল ছিল, তাদের কাজ ছিল বইয়ের ফ্ল‌্যাপ আর ফুটনোটের রেফারেন্স পড়ে শাহবাগে আঁতলামি করা। তারা অবশ্য কালে কালে বাংলা সাহিত্যের এমনকি বাংলা ভাষার নিয়ামক হয়ে উঠেছে দেখতে পাই। তাদের অনেকে আল মাহমুদকে পীরের পর্যায়ে নিয়ে যাবার চ্ষ্টো করছেন এখনও। এই সাক্ষাৎকার সেই অভীপ্সারই রূপান্তর। আল মাহমুদ কবি ছিলেন, এখন নেই। ‌’আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি ‘ বলে তিনি বাংলা কবিতার সাথে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সোনালী কাবিনের কবি নিজেই বলেছেন, তিনি পারলে সোনালি কাবিনের সনেটগুলো বদলে ফেলতেন। অথচ এই সাক্ষাৎকারে বললেন সোনালী কাবিন নিয়ে তৃপ্তির কথা। বললেন ‘কবির দেশ দরকার হয়’ আবার বলেও দিলেন তার দেশ আছে- (‘যাদের দেশ আছে এরকম কবিদের মধ্যে নিশ্চয়ই শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন। এবং আমি আছি এইদিকে। আর জয় গোস্বামীকে এটা মনে হয়েছে। যে একটা…এরা দেশ খুঁজে পেয়েছে, এবং দেশটা হলো বাংলাদেশ।’) ঠাকুর ঘরে কেরে…? ভূতের মুখে রাম নাম। আল মাহমুদের মুখে বাংলাদেশ শব্দটির জন্য ভালোবাসা খুবই সন্দেহজনক। তার বিবৃতি এবং আতিথ্য প্রাপ্তির সুযোগ যাদের হয় এবং যাদের তিনি জেহাদী জোশে উদ্বুদ্ধ করেন তাদের কাছেই তিনি কবি হতে পছন্দ করেন কিনা প্রশ্নটি ব্রাত্য করেন নি। কারণ যৌনতা আর নারীকে সৌন্দর্যের সাথে গুলিয়ে ফেলে একটা আঠালো-ভাব তৈরি না হলে কি কাব্য-টাব্য বা শিল্প-টিল্প হয় নাকি!

    তো, সেই আল মাহমুদ যখন সাক্ষাৎকারে মৌলবাদিতার কথা তুললেন, ব্রাত্য সেদিকে গেলেন না, আল মাহমুদ ‘উপক্ষোর শক্তি’ র কথা বললেন দু’দুবার–ব্রাত্য সেটাও এড়িয়ে গেলেন। বরং রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার প্রধান কবি কি না এ বিতর্কটি মর্ষকামীর মত খুঁচিয়ে তুললেন। এমন মন্তব্য করলেন যে পরে আমতা আমতা করে তা থেকে বেরিয়ে আসতেও চাইলেন একটা কিছু বুঝ দিয়ে। কারণ তিনি সাহিত্যের অনুপ্রেরণায় নারী ও সৌন্দর্যের অবস্থান নির্ণয়ে বসেছেন, এই বহু পুরোনো আলোচনার নতুন কোন দার্শনিক দিক এখানে উন্মোচিত হয় নি। বরং দুই কবির কাব্য ভাবনার খানিকটা জানা গেছে। যা শেষমেশ কিছু কিছু কাজের কথায় গিয়ে ঠেকেছে ।

    তো এই সাক্ষাৎকারের মোটিফ কী? তা তো আর বুঝতে অসুবিধা হয় না।

    – মাহবুবুল হক

  50. গোলাম ফারুক says:

    অসাধারণ সাক্ষাৎকার। খুব ভাল লাগল।

  51. শাহ ইয়াছিন বাহাদুর says:

    অসাধারণ একটা ইন্টারভিউ পড়লাম। ব্রাত্য রাইসুর প্রশ্ন করার মেধা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিশেষতঃ জয় গোস্বামী যতবার তাঁর প্রশ্নে (পড়ে মনে হয়েছে) বিরক্ত বা বিব্রত হয়েছেন, মজাটা ততই বেড়েছে। ফাঁকে ফাঁকে হেসেছিও।
    কবিত্রয়ের জন্য শুভ কামনা।

  52. ব্যাত্যা রাইসু এত সুন্দর একটি উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না।

  53. সরোজ মেহেদী says:

    কবিতার বিচারে আল মাহমুদ আকাশ ছুয়েছেন।মন খারাপ হলেই আমি জয় গোস্বামী (মেঘবালিকার জন্য রূপকথা) পড়ি। বহুদিন পর বাংলাদেশী মিডিয়ায় মনের খোড়াক পেলাম। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলের ব্যবচ্ছেদ হলে আরও ভাল হতো। বিডি নিউজকে ধন্যবাদ এমন একটি পরিবেশনার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.