লেখক সংবাদ

প্রমা সঞ্চিতা অত্রি | ১৭ নভেম্বর ২০১০ ১২:১০ অপরাহ্ন


উম্মে মুসলিমানান্নু মাহবুব

রশীদ হায়দারউম্মে মুসলিমানান্নু মাহবুব

রশীদ হায়দার

রশীদ হায়দার…….
রশীদ হায়দার (জন্ম: দোহারপাড়া, পাবনা ১৫ জুলাই ১৯৪১)
…….
এই সময়ে কি লিখছেন জানতে চাই রশীদ হায়দারের কাছে। তিনি বলেন, “আমি আসলে এই মুহূর্তে তেমন কিছু লিখছি না। মৌলিক লেখা তেমন হচ্ছে না বলে আমি কিছু অনুবাদ ও ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। আমি আসলে লেখালেখির ক্ষেত্রে এখন যাকে বলে খুব সিলেকটিভ হয়ে গেছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে লেখাটি আমার মন মত হবে না সে লেখাটি আমি কোথাও দেব না। কিন্তু খুব হালকা ধরনের কিছু লেখা আমি এখন লিখছি যেমন, সম্প্রতি আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম সেখানে আমার কিছু ভ্রমণের সুযোগ ঘটেছে। সে সব বিষয় নিয়ে কিছু লেখালেখি করার কথা ভাবছি।” তারপরে বলেন, “আর এখন যে কাজটি আমাকে শীঘ্রই ধরতে হবে তা হল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু লেখালেখি। মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমি এখন যে খুব বড় ধরনের কোন কাজ করছি সেটা নয়। তবে আমার মাঝে মাঝে কিন্তু এরকম কিছু সময় যায় যেটাকে বলে ব্যারেন পিরিয়ড বা নিষ্ফলা সময়। এটা মাঝে মাঝে হয়। তো এরকম একটা সময় এখন আমার যাচ্ছে। তাই বলে আমি কখনো হতাশ হই না। হয়ত দেখা যাবে এরপর হঠাৎ করে এত লেখা আসছে সে একেবারে এক সাথে পাঁচটা, ছয়টা, আটটা, দশটা লেখা হয়ে গেল। তবে কিছু লেখা আছে যেগুলো হয়ত সামনে আমি লিখব। এই মুহূর্তে সেগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। বিশেষ করে বলব যে কিছুদিন আগে আমি আমেরিকাতে গিয়েছিলাম, আমেরিকার গেটিসবার্গ-এ। যেখানে আব্রাহাম লিঙ্কন ভাষণ দিয়েছিলেন সেই জায়গাটায়। তো সেই জায়গাটিকে নিয়ে আমার বড় ধরনের কিছু লেখার পরিকল্পনা আছে। আমি তার সামান্য কিছু লিখেওছি। একটি দৈনিক পত্রিকার সাময়িকীতে আমার এ সম্পর্কিত একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে।”

—————————————————————-
“আরেকটা খুব বড় খবর হচ্ছে যে, নজরুলকে নিয়ে খুব বড় কিছু অনুবাদের কাজ পৃথিবীর বেশ অনেকগুলো দেশে হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন, ইংরেজিতে কাজ হয়েছে। তারপর হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, টার্কিস, রাশান, ফরাসি, জার্মান, চীনা–এই ভাষাগুলোতে নজরুলের সাহিত্য কর্মের অনুবাদ হয়েছে এবং এখন মরোক্কোতে আরবী ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে।”
—————————————————————-

আরো বলেন, “এটা অনেকটা ভ্রমণকাহিনীর মতই কিন্তু এর মধ্যে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এসব কিছুও থাকবে। আমি যেটা প্রধানত লক্ষ্য করেছি যে, গেটিসবার্গে আব্রাহাম লিঙ্কন যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা ২৭৮টি শব্দ মাত্র এবং তাঁর বক্তৃতাটি ছিল মাত্র দুই মিনিটের। আর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ময়দানে যে ভাষণটি দিয়েছিলেন সেটি ছিল গিয়ে আঠারো মিনিটের। কিন্তু এই আঠারো মিনিটের ভেতরে তিনি একটা দেশের ইতিহাস, একটা দেশের বঞ্চনা এবং যুদ্ধ অনিবার্য হলে কী করতে হবে না হবে সমস্ত কিছুই বলে দিয়েছেন। এর উপর ভিত্তি করেই আমি মূলত কাজ করব।

আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষণ ছিল মূলত দক্ষিণের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আর বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা ছিল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তাদের যুদ্ধটা ছিল গৃহযুদ্ধ আর আমাদের যুদ্ধটা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। এ দু’টোর চরিত্রের ভেতর কিছু পার্থক্য আছে। সেই সময় এরকম মাথা ঠাণ্ডা রেখে একেবারে নির্ভুলভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা দেয়া, গেটিসবার্গের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে লিঙ্কন তাঁর ভাষণটি দিয়েছিলেন সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই কিন্তু আমার এ কথাগুলো মনে হয়েছে। তখন আমার মনে হল এটা তো একটা বিষয় হতে পারে লেখার জন্যে। সেটাই আমার মাথার ভিতরে কাজ করছে এবং এই বিষয়টা নিয়েই আমি কাজ করছি।”

সর্বশেষ প্রকাশিত বই সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার সর্বশেষ প্রকাশিত বইটি ছিল চিম্বুকের নিচে আলোর আভা। প্রকাশিত হয়েছিল গত বইমেলায়, অনুপম প্রকাশনী থেকে। এটা মূলত আমার কলামের বই। এটা আমার বিভিন্ন সময়ে লেখা রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি বিষয়ের কলামগুলোর একটা সংকলন। এছাড়া জসীমের নক্শী কাঁথাযদি দেখা পাও নামে দু’টি বইয়ের তৃতীয় সংস্করণ বের হয়েছিল গত বছর। এটা প্রকাশ করেছে বৃক্ষ প্রকাশ। এ বই দু’টো ছোটদের জন্য লেখা, কিশোর উপন্যাস।”

সামনে কোন বই বেরবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপাতত সেরকম কোন সম্ভাবনা নেই। গেটিসবার্গের যে লেখাটির কথা বললাম সেটা লিখতে আমার অনেক সময় লাগবে। প্রায় বছরখানেক তো লাগবেই। আর তাছাড়া আমি–ওই বইমেলাতেই যে বই বের করতে হবে, তাছাহুড়ো করে ওই ট্রেন ধরতেই হবে–আমি এটাতে বিশ্বাসী না। আমার লেখার ব্যাপারে আমি এত চুজি যে লেখা যদি ভালো না লাগে তো সেই লেখা আমি প্রকাশ করতে দেব না এরকম একটা ব্যাপার। দরকার হয় তো বই বের-ই করলাম না। এরকম কোন ব্যাপার নাই যে বইমেলা ধরতেই হবে। তাই আমি এই মুহূর্তে কোনভাবেই বলতে পারব না যে, সামনে আমার ঠিক কী বই বেরোবে না বেরোবে। যদি আমার কাছে মনে হয় কোন লেখা ভাল হয়েছে কেবল তাহলেই তা ছাপতে দেব নইলে না।”

লেখালেখির বাইরে কী করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “লেখালেখির বাইরে তো আমি যে কাজটা করি সেটা হচ্ছে নজরুল ইন্সটিটিউটের দায়িত্বে আছি। নজরুলকে নিয়ে কাজ করছি। আমরা প্রধানতঃ যেটা করে থাকি সেটা হচ্ছে, অখণ্ড নজরুল, অসাম্প্রদায়িক নজরুল, মানুষের কবি নজরুল–এই জিনিসটাকে নজরুল ইন্সটিটিউটের কাজকর্মের ভেতর দিয়ে প্রাধান্য দিতে চাইছি। নজরুলকে তো অনেকেই সাম্প্রদায়িকভাবে চিহ্নিত করে থাকেন। তারপর নজরুলের সাহিত্য কর্ম, শিল্পকর্ম এগুলোকে তো বিকৃত করা হয়। এইগুলো আমরা যথার্থ চেষ্টা করছি বন্ধ করতে। আমরা দেশবাসীর কাছে নজরুলকে তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। আমরা নজরুলকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষের কবি নজরুল, তিনি কোন নির্দিষ্ট ধর্মের কবি নয়–এটা হচ্ছে মূল কথা।

আর নজরুল ইন্সটিটিউট তো বরাবরই নজরুলকে নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা কর্মে সহযোগিতা করে থাকে। তারপর নজরুলের আদি গ্রামোফোন রেকর্ড অর্থাৎ নজরুলের সময়ে যে সব রেকর্ড বেরোত, সেই রেকর্ডে যে সমস্ত শিল্পী গান করতেন, যে সুরগুলোকে আদি সুর ধরা হয়–সে গানগুলোকে আমরা সিডিতে ট্রান্সফার করে প্রকাশ করছি। আমরা ইতোমধ্যে ৩৫টা সিডি বের করেছি। প্রতিটি সিডিতে ২০টা করে গান আছে এবং ৩৭টা গানের স্বরলিপি, নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শুদ্ধ সুরে ও শুদ্ধ বাণীতে নজরুল সঙ্গীত গাওয়া ও পরিবেশন করা হয়েছে।

তারপর আবৃত্তির ব্যাপারেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিশুদের, কিশোরদের ও বড়দের এই তিনটি গ্রুপে আবৃত্তি প্রশিক্ষণের কাজ চলছে। আর নজরুলের বই ইতিমধ্যেই প্রায় চার’শর মত প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল ইন্সটিটিউট নজরুলের প্রত্যেকটি বই একক ভাবে প্রকাশ করছে। বাংলা একাডেমী নজরুলের রচনাবলী প্রকাশ করেছে ১১টা খণ্ডে। কিন্তু আমরা নজরুলের বই এককভাবে, একটা একটা করে, আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশ করছি। এর বাইরেও নজরুল সম্পর্কিত বই, নজরুলের উপর গবেষণামূলক বই–সব মিলিয়ে প্রায়…. এ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে নজরুল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রায় চার’শ বই প্রকাশ করেছে। এর বাইরেও আমরা নজরুলকে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। সবকিছু ঢাকা কেন্দ্রিক হবে কেন? ঢাকার বাইরেও আমরা নজরুলকে ছড়িয়ে দিতে চাইছি। সেই লক্ষ্যেই প্রথম পর্যায়ে আমরা এ বছর জানুয়ারিতে রাজশাহী শহরে একটি নজরুল সম্মেলন করেছি। এবার এই ডিসেম্বরের ভেতরেই আমরা চট্টগ্রাম এবং সিলেট অথবা খুলনাতে বিভাগীয় পর্যায়ে আরও দু’টি সম্মেলন করতে যাচ্ছি। নজরুল যাতে ঢাকার বাইরেও পৌঁছাতে পারেন, নজরুল চর্চাটা যাতে ঢাকার বাইরের মানুষের মাঝেও অব্যাহত থাকে সেজন্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এছাড়াও প্রতি বছর নজরুল বিষয়ক কিছু ওয়ার্কশপ পরিচালনা করা হয়। এবারও করা হবে। আরেকটা ভাল খবর হচ্ছে আমাদের আরেকটি নতুন শাখা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমনিতে ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল দরিরামপুরে আমাদের শাখা আছে। আরেকটি শাখা শুরু হতে যাচ্ছে কুমিল্লাতে। আমাদের মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ সেখানে গিয়ে ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করবেন। তিনি ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেই আমাদের কাজ শুরু হয়ে যাবে। সেখানে অবশ্য ইতিমধ্যেই কিছু কাজ শুরু হয়ে গেছে। পরবর্তীতে আমাদের পরিকল্পনা আছে আরও শাখা খোলার, বিশেষ করে নজরুল বাংলাদেশের যে সমস্ত জায়গার গিয়েছিলেন… যেমন, চট্টগ্রামে তিনি কিছুদিন ছিলেন, সিলেটেও উনি গিয়েছিলেন… তো এই দুই জায়গাতেও আমাদের পরিকল্পনা আছে নজরুল ইন্সটিটিউটের শাখা খোলার। সেটা অবশ্য ভবিষ্যতের ব্যাপার।

আরেকটা খুব বড় খবর হচ্ছে যে, নজরুলকে নিয়ে খুব বড় কিছু অনুবাদের কাজ পৃথিবীর বেশ অনেকগুলো দেশে হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন, ইংরেজিতে কাজ হয়েছে। তারপর হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, টার্কিস, রাশান, ফরাসি, জার্মান, চীনা–এই ভাষাগুলোতে নজরুলের সাহিত্য কর্মের অনুবাদ হয়েছে এবং এখন মরোক্কোতে আরবী ভাষায় অনুবাদের কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক উদ্যোগটা যদিও আমরা নেই নি কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে আমাদের যে দূতাবাস আছে, সে দূতাবাসের মাধ্যমে আমরা সেই সব দেশের সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি এবং আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে, আমাদের জাতীয় কবি নজরুল যে আসলে মানবতার কবি, মানুষের কবি–এ কথাটা। ফলে বিশ্ববাসী ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছে, জানতে পেরেছে সে কথা । সেজন্য অনেক দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে।

আমি যে সব দেশের কথা বললাম তারা কিন্তু নজরুলের সাহিত্যকর্ম, তাঁর গান, কবিতা এগুলোর মানটা বুঝেই, সে বৈশিষ্ট্যটা বুঝেই কিন্তু আগ্রহ প্রকাশ করেছে অনুবাদ করতে। সেসব দেশের সরকাররা আগ্রহ দেখিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন বলেই সেসব দেশের মাতৃভাষায় নজরুলের বই অনুবাদ করা সম্ভব হয়েছে। এভাবেই আমরা জাতীয় কবিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি।”

এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু বই পড়ছেন বলে জানালেন তিনি। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইগুলোই বেশি পড়া হচ্ছে। বিশেষ করে মুনতাসীর মামুনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে বইগুলো আছে সেগুলো। একটা পড়ছি উনার পাকিস্তানি জেনারেলদের মন। এটা উনার বেশ বিখ্যাত একটি বই। এছাড়া পড়ছি উনার বাঙালী, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং কোয়ি হ্যায়? বই দু’টি। দু’টোই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই। আর এছাড়াও পড়ছি রাও ফরমান আলীর ‘বাংলাদেশের জন্ম’ (The birth of Bangladesh) বইটি। ফরমান আলীর বইটা অবশ্য আমি আগেও পড়েছিলাম। সেটা আমি আবারও পড়ছি। তার কারণ হচ্ছে এই মুহূর্তে আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে যে জাগরণ ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে সেটা আমাকে বইটি আবার পড়তে আগ্রহী করে তুলেছে। তার কারণ রাও ফরমান আলী ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যার একজন পরিকল্পনাকারী। আর মুনতাসীর মামুনের যে বই তিনটির কথা বললাম সেগুলো আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি। কারণ, এই যুদ্ধাপরাধী বিচারের ব্যাপারটা অর্থাৎ সে ইতিহাসটা একটু ভালোভাবে জানতে চাইছি। যদিও সে ইতিহাস আমার ভালোভাবেই জানা আছে। কারণ ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ৩০ বছর। অতএব, এ সবই আমার জানা কিন্তু উনারা গবেষক মানুষ, তো তাঁরা এ বিষয়টা কোন দৃষ্টিতে দেখছেন সেটা বুঝতে চাচ্ছি।”

এ বিষয়ে কিছু লেখার পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাই। তিনি বলেন, “আমার লেখালেখির ব্যাপারটা আসলে খুবই এমন একটা ব্যাপার যে, আমি কখন কোনটা লিখব আমি নিজেও সেটা জানি না। কারণ অনেক সময় অনেক লেখা হয়ত আমি ভাবিইনি যে লিখব কিন্তু দেখা যায় সেটা হঠাৎ করে প্রাধান্য পেয়ে গেল এবং আমি তা নিয়ে কাজ করতে শুরু করলাম। আবার হয়ত অনেক লেখাই লিখব লিখব করে দেখা গেল যে শেষ পর্যন্ত লেখা হয়ে উঠল না। তবে, এটা ঠিক যুদ্ধপরাধী বিচারের ব্যাপারটা এ মুহূর্তে আমার ভেতরে বেশ আলোড়ন তৈরি করছে। হয়ত এটা নিয়ে কিছু লেখা তৈরি হয়েও যেতে পারে।”

এই সময়ের সাহিত্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের এখানে সাহিত্য চর্চাটা এখন এক ধরনের জনপ্রিয়তা ও মনোরঞ্জনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের লেখকদের মধ্যে কীভাবে খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, কীভাবে পাঠককে এক ধরনের আনন্দ দেয়া যায় এই প্রবণতাটাই বেশি দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ, সাহিত্যপাঠের আলাদা একটা আনন্দ আছে অবশ্যই। কিন্তু এই তথাকথিত জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য কিছু চটকদার লেখা, কিছু মনোরঞ্জন করার মত লেখা এগুলোই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। কিছুদিন আগে আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার ঈদ সংখ্যাগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। দেখি যে, আমাদের এখানে অধিকাংশ লেখকই খুব বেশি এইরকম লেখা লিখেছে। যা আমাকে খুব পীড়া দিয়েছে।

অবশ্য আমি হতাশ তা বলব না। কারণ এর মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতে কেউ না কেউ বেড়িয়ে আসবে। একটা উদাহরণ দেই, ১৭৫৭ সালে তো এদেশ ইংরেজদের দখলে চলে গেল। আর কবি ভারতচন্দ্র মারা গেলেন ১৭৫৯ সালে। একশ বছর পর ১৮৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। অর্থাৎ ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পাক্কা একশ তিন বছর পরে রবীন্দ্রনাথ এলেন। এর পরে আমি যদি বিষয়টাকে এভাবে বিবেচনা করি যে, রবীন্দ্রযুগের পরে এখন মাত্র দুই জন, বিশেষ করে কবিতায়, দুইজন লোককে একটু বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় এবং উল্লেখ করা হয়। তাঁদের মধ্যে এক জন হলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও অন্যজন হলেন জীবনান্দ দাশ। এর বাইরেও আরও অনেকে ছিলেন তো বটেই যেমন, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত, সমর সেন ছিলেন, ছিলেন আরও অনেকেই। কিন্তু এখন কি তাঁরা সেইভাবে পঠিত হন? তাঁদেরকে কি সেইভাবে চর্চা করা হয়? তাঁরা একটা নির্দিষ্ট পাঠকের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে গেছেন। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট যুগের পরেও যে দুই জন কবি ক্রমশ পঠিত হচ্ছেন, গৃহীত হচ্ছেন এবং যাদের উৎকর্ষ আরও বিকশিত হচ্ছে তাঁরা হলেন ওই দু’জন, কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ। তা এখন রবীন্দ্রনাথ পর্যায়ের কিংবা তার চাইতেও বড় কোন সাহিত্য শিল্পীকে আসতে হলে হয়ত কত বছর অপেক্ষা করতে হবে কে জানে। সেটা সময়ের হাতেই ছেড়ে দেয়া ভাল।

তবে এটাও সত্য কথা যে, আমাদের এখানে, উদাহরণটা এভাবে দেয়া যায় যে, আগাছার মধ্যে থেকেই তো একটা, দু’টো, তিনটে বড় গাছ, ভাল গাছ, মানে প্রয়োজনীয় গাছ জন্ম নেয় এবং সেটাই বড় হয়ে ওঠে এবং সেই বড় গাছটিই কিন্তু মানুষকে ছায়া দেয়। বোঝাতে পারলাম কিনা জানি না। এই আগাছার ভেতর থেকেই কিন্তু ওই প্রয়োজনীয় গাছটি কিন্তু ঠিকই জন্ম নেবে। আর সে জন্যই অপেক্ষা করতে হবে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তার কারণ আমাদের দেশে দু’টি খুবই বড় ঘটনা ঘটে গেছে, আমাদের দেশের ইতিহাসে। একটা হচ্ছে ভাষা আন্দোলন, আরেকটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। এই দু’টি বিষয় আমাদের দেশের ইতিহাসে ঘটে গেছে–এর আলোকে খুবই বড় কাজ হবে এবং হতেই হবে আমি এ ব্যাপারে প্রবল আশাবাদী।”

উম্মে মুসলিমা

উম্মে মুসলিমা……..
উম্মে মুসলিমা (জন্ম: আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, ১১ নভেম্বর ১৯৬০)
……..
এ সময়ে একই সাথে বেশকিছু ছোটগল্পের কাজ করছেন বলে জানালেন উম্মে মুসলিমা। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি এখন বেশ কয়েকটা ছোট গল্প লিখছি। এর মাঝে ‘বৈঁচিবালিকা’ নামে একটি গল্পের কাজ শেষ করলাম। আর আরেকটি গল্প লিখছি নাম ‘নেপথ্যে’। ওটার কাজ এখনও শেষ হয়নি, লিখছি। এছাড়াও আরও কিছু গল্পের আইডিয়া মাথায় আছে। হয়ত যেকোন সময় লিখতে বসব।”

গল্প দু’টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার বৈঁচিবালিকা’র থিম অনেকটা এরকম যে একটা মেয়ের জীবনে কখন প্রেম আসে বা আসতে পারে, এই বিষয়টা নিয়ে লিখেছি। যেমন শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে আছে না যে রাজলক্ষীর প্রেম এসেছিল নয় বছর বয়সে। তো সেরকম এটা আমি লিখেছি আমার নিজের জবানীতে আমার জীবনের একটা সত্যি ঘটনা নিয়ে। গল্পটা উত্তম পুরুষে লেখা। ঘটনাটা এরকম যে, আমার জীবনে প্রেম এসেছিল আরও আগে, আট বছর বয়সে। এটাই মূলত আমার গল্পের বিষয়। ব্যাপারটা এরকম যে, আট বছর বয়সেও যে একটা মেয়ের জীবনে প্রেম আসতে পারে সেটাই আমি আমার গল্পে বলতে চেয়েছি। আর ‘নেপথ্যে’ গল্পটা যুদ্ধের উপর লেখা। আসলে আমি বলতে চেয়েছি যে, মুক্তিযোদ্ধারা যাঁরা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ছিল না সেময়, যারা যুদ্ধে যায়নি কিন্তু নিজেদের প্রকাশ করত যে আমরা মুক্তিযোদ্ধা, তাদের নিয়ে কাহিনী। একাত্তরে যখন যুদ্ধ শুরু হল তখন দলে দলে লোক দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে চলে গেল। অনেকে আবার ট্রেনিং নেয়ার জন্য ভারতে গিয়েছিল। কিন্তু সেসময় এমন কিছু লোকও ছিল যারা যুদ্ধে যায় নি কিন্তু তারা দেখাত যে তারা যুদ্ধ করেছে। হয়ত তারা অন্য কোন গ্রামে লুকিয়ে টুকিয়ে থাকত কিন্তু নিজের গ্রামে এসে বলত যে, আমরা ট্রেনিং নিয়ে আসলাম, যুদ্ধ করেছি এরকম নানাকথা। কিন্তু সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ছিল না তারা। আবার এমন কিছু মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন যারা হয়ত সরাসরি যুদ্ধে যায় নি কিন্তু দেশে থেকেই তারা অন্যভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। যেমন অনেক শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ছিলেন যাঁরা তাদের লেখালেখি, নাটক কিংবা গান ইত্যাদির মাধ্যমে যুদ্ধ করেছেন। একটা ছেলের কাহিনী আমি লিখেছি, যে ছেলেটা বাচ্চাদের পড়াত এবং তাদের কাছে সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরত কিন্তু সে ছেলেটা নিজের অসুস্থতার কারণেই সেসময়ে আর যুদ্ধে যেতে পারে নি।”

—————————————————————-
“এই সময়ের সাহিত্য নিয়ে আমি বলব এখন আমাদের এখানে যে সাহিত্য চর্চা চলছে তা সন্তোষজনক। আমি সন্তুষ্ট। এখানে একটা বিষয় আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় সেটা হচ্ছে, এই সময়ের অর্থাৎ শূন্য দশকের যাঁরা তাঁরাও যেমন লিখছেন আবার পুরনোরা যাঁরা তাঁরাও লিখছেন। তো সেক্ষেত্রে আমি বলব শূন্য দশকের সাহিত্যিকরা বেশ ভালোই করছেন। আমি এখনকার যারা কবি তাদের কবিতাও পছন্দ করি আবার যারা গল্প লিখেন তাদের লেখাও ভালো লাগে।”
—————————————————————-

গল্প দু’টি কোথাও প্রকাশিত হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বৈঁচিবালিকা’ গল্পটি তো লেখা শেষ। একটা দৈনিকে সেটা দিয়েছি। হয়ত সামনে কোনদিন ছাপা হবে আর নেপথ্যে’র কাজ এখনও শেষ হয় নি। এটা এখনও লিখছি। তো, শেষ হলে দেখা যাক, কোথাও ছাপতে দেব হয়ত। এমনিতে আমার গল্প সবই প্রায় কোথাও না কোথাও প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সেই প্রকাশিত গল্পগুলো নিয়েই গল্প সংকলন বের করি।”

সামনে এরকম কোন সংকলন বের হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, সামনে এরকম পরিকল্পনা আছে। আমার আরও কিছু গল্প জমা হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আরেকটি ছোট গল্পের সংকলন বের করার ইচ্ছা আছে। এছাড়াও ইচ্ছা আছে আমার কবিতাগুলো নিয়ে একটি সংকলন বের করার। সামনের বইমেলাতে বই দু’টি বের হতে পারে।”

বই দু’টো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০০৮ সালে বের হয়েছিল আমার তিনটি বই। একটি কবিতার ও দু’টি ছোটগল্পের। কবিতার বইটি ছিল কাগজোছনা ও মাঘবসন্ত। আর গল্পের বই দু’টির একটি ছিল হাজরা কালার মেয়েমানুষেরা আর অন্যটি ক্ষুধা ও ক্ষেত্রনাশ। তো এরপর থেকে আমার যে গল্প এবং কবিতাগুলো জমা হয়েছে সেগুলো নিয়েই নতুন বই বের করব। আসলে এখনও এগুলো নিয়ে কাজ শুরু করি নি। মাথায় আছে এবং ইচ্ছাও আছে। হয়ত সামনের বছর বইগুলো বের করতে পারব। যেহেতু এ ব্যাপারে এখনও খুব বেশি দূর ভাবি নি তাই এখনো বইগুলোর নামের ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করিনি।

এমনিতে আমার অধিকাংশ ছোটগল্পেরই থিম মূলত নারীর জীবন। নারীর কষ্ট, নারীর দুঃখ, তাদের প্রতি বৈষম্য ইত্যাদি। এছাড়াও প্রেম, বিরহ, সন্দেহ, নারী পুরুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলোও উঠে আসে। তবে আমার গল্পে নারীর জীবনটাই বেশি আসে যদিও সামাজিক অন্যান্য বিষয় যেমন, গ্রামীণ জীবন কিংবা দারিদ্র্য এগুলোও রেখাপাত করে কিন্তু সেসব জীবনের ভিতরেও নারীর কষ্টটাই বেশি প্রাধান্য পায়। আর কবিতার ব্যাপারে বলব যে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় আমার কবিতাগুলো ঠিক হচ্ছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে যে কবিতাগুলো সেরকম ভাল হচ্ছে না। তাই আমি ছোটগল্পের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ছি। তাই কবিতা এখন আর অতোটা লেখা হচ্ছে না। তবুও ২০০৮-এর পর থেকে এ পর্যন্ত আমার যে কবিতাগুলো জমা হয়েছে সেগুলোই থাকবে আগামী সংকলনে। কবিতার বিষয়বস্তু বেশির ভাগই প্রেম। এছাড়াও আমার ব্যক্তিগত কিছু আবেগ-অনুভূতির ব্যাপারও আছে। এগুলো নিয়েই লিখেছি মূলত। খুব বেশি কবিতা নেই। হয়ত ৩৫-৩৬টার মত থাকতে পারে।”

কবিতা ও গল্পের বাইরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নারী বিষয়ক কলাম লেখেন বলে জানালেন। কিছুদিন আগেই ‘নারীর পেশা নারীর মর্যাদা’ শীর্ষক একটি কলাম লিখেছেন বলে জানালেন তিনি।

লেখালেখির বাইরে আর কী করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “লেখালেখির বাইরে আমি মূলত চাকরি করি। সরকারি চাকরি। এখন আছি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একটা প্রজেক্টে। চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে লেখালেখি এবং চাকরির বাইরে আমি পড়তে পছন্দ করি। আমি পড়ি, অনেক রকম বই পড়ি।”

এখন কী কী বই পড়ছেন জানতে চাইলে বলেন, “আমি আসলে সব ধরনের বই-ই পড়ি। শুধু যে বই পড়ি তা নয়। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন কলাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা কোন বুক রিভিউ এগুলোও পড়া হয়। কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার ঈদ সংখ্যাগুলো একটু দেখছিলাম। কিছু লেখা বেশ ভাল লাগল যেমন আন্দালিব রাশদীর লেখা একটা উপন্যাস পড়লাম, খুব ভাল লাগল। আরেকটা ভ্রমণ কাহিনী পড়লাম জিকরুর রেজা খানমের। উনি চমৎকার লিখেছেন। এটার নাম ‘কাহানী হিল্লি-দিল্লীকা’। সেটা হচ্ছে উনি গিয়েছিলেন দিল্লী বইমেলাতে। সেখানে গিয়ে উনি ওখানকার অনেক প্রসিদ্ধ স্থানে গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা উনি বর্ণনা করেছেন উনার ভ্রমণ কাহিনীতে। তিনি শুধু তার অভিজ্ঞতার বর্ণনাই করেননি সেই সাথে উনি সেখানকার ইতিহাসও বর্ণনা করেছেন। লেখাটা আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে।

এছাড়া এসময়ে মার্কেজের বেশ কিছু অনুবাদ পড়ছি। শেষ করলাম, উনার নিঃসঙ্গতার একশ বছর বইটি, এখন পড়ছি কলেরা ও প্রেমনিঃসঙ্গতার একশ বছর বইটি অনুবাদ করেছেন জি. এইচ. হাবিব আর কলেরা ও প্রেম অনুবাদ করেছেন কবির চৌধুরী। বইগুলো পড়ে বেশ মজা পাচ্ছি। মার্কেজের লেখাগুলোর ভেতরে জাদুবাস্তবতাই তো বেশি। বিশেষ করে নিঃসঙ্গতার একশ বছর; এটা তো পুরোপুরিই জাদুবাস্তবতা। তবে কলেরা ও প্রেম-এর ভিতরে অতটা জাদুবাস্তবতা নেই। এখানে গল্পের যে নায়ক, দেখা যায় সে ছোটবেলায় ভালোবেসেছিল একজনকে। তারপর তার বয়স যখন আশির কোঠায় এসে পৌঁছায় দেখা যায় তখনও সেই একই মেয়েকেই সে ভালবাসে। লোকটি বিয়ে করেনি কিন্তু তবু এটা ছাড়াও তার আরও অন্যান্য সম্পর্কও থাকে। অনেক নারীর সাথেই তার সম্পর্ক হয়েছিল। এখানে বলা হয়েছে যে ৬২২ জন নারীর সঙ্গে সে থেকেছে। কিন্তু সে ভালবেসেছে সেই একজনকেই। ছোটবেলায় যাকে ভালবাসত। আবার শেষে, একদম শেষে আবার তার সাথে সে মিলিত হয়। দেখাচ্ছে যে সত্যিকারের প্রেমটা ছিল ওই মেয়েটার জন্যই। এত বছর অন্য অনেক মেয়ের সাথে সে মিলিত হয়েছে কিন্তু প্রেমটা ছিল ওই মেয়েটার জন্যই জমা। পরে আবার তারা একত্রে মিলিত হয় এবং তাদের ভিতর যৌনমিলনটাও ঘটে, সেই বুড়ো বয়সে এসেও। এটাই আর কি দেখায়।”

এই সময়ের সাহিত্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “এই সময়ের সাহিত্য নিয়ে আমি বলব এখন আমাদের এখানে যে সাহিত্য চর্চা চলছে তা সন্তোষজনক। আমি সন্তুষ্ট। এখানে একটা বিষয় আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় সেটা হচ্ছে, এই সময়ের অর্থাৎ শূন্য দশকের যাঁরা তাঁরাও যেমন লিখছেন আবার পুরনোরা যাঁরা তাঁরাও লিখছেন। তো সেক্ষেত্রে আমি বলব শূন্য দশকের সাহিত্যিকরা বেশ ভালোই করছেন। আমি এখনকার যারা কবি তাদের কবিতাও পছন্দ করি আবার যারা গল্প লিখেন তাদের লেখাও ভালো লাগে। তবে সবার লেখাই যে ভালো লাগে তা না। আমার কিছু পছন্দের লেখক আছেন তাদের লেখা তো ভালো লাগেই আবার যারা একদমই কম বয়েসি এবং একেবারেই নতুন লেখক তাদের লেখাও তো ভালই লাগে। যেমন, মুনিরা কায়েসের লেখা ভালো লাগে। তারপর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা তো ভাল লাগেই। গল্প ভালো লাগে হরিপদ দত্তের। রাশিদা সুলতানার লেখাও ভালো লাগে। এছাড়াও আরও অনেকেই আছেন যাদের লেখা আমার ভালো লাগে। আমি আশাবাদী। আমার মনে হয় এসময়ে সাহিত্যচর্চা যেভাবে চলছে তা আশানুরূপ ভাবেই চলছে। সাহিত্যিকদের কাছ থেকে যতটা আশা করা যায় তা তাঁরা পূরণ করতে পারছেন এবং ভালোভাবেই পারছেন।”

নান্নু মাহবুব

নান্নু মাহবুব……..
নান্নু মাহবুব (জন্ম: যশোর, ১১ জুন ১৯৬৪)
……..
একই সাথে পাঁচটি বই নিয়ে কাজ করছেন নান্নু মাহবুব। ভারতের থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি উপ্পলূরি গোপাল কৃষ্ণমূর্তির (Uppaluri Gopala Krishnamurti) সাক্ষাৎকার ভিত্তিক এ বইগুলো হচ্ছে যথাক্রমে: ‘দা মিস্টিক অব এনলাইটেনমেন্ট’ (The Mystique of Enlightenment), ), ‘মাইন্ড ইজ এ মিথ’ (Mind is a Myth) ‘দা কারেজ টু স্ট্যান্ড এলোন’ (The Courage to Stand Alone), ‘থট ইজ ইওর এনিমি’ (Thought is Your Enemy) এবং ‘নো ওয়ে আউট’ (No Way Out)। বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি যে পাঁচটি বই নিয়ে কাজ করছি সে পাঁচটিই মূলত ইন্টারভিউ কেন্দ্রিক বই। বইগুলোতে যিনি ইন্টারভিউ দিয়েছেন তাঁর নাম হচ্ছে উপ্পলূরি গোপাল কৃষ্ণমূর্তি। তাঁর জন্ম ভারতের মাদ্রাজে এবং মৃত্যু ইতালিতে। বইগুলোতে মূলত তাঁর সাথে বিভিন্ন ধরনের লোকদের কনভারসেশন রয়েছে। সেই কনভারসশনগুলোই পরে লিখিত আকারে বই হিসেবে বের হয়েছে। আমি উনার প্রতিটা বইয়ে যতগুলো টেক্সট আছে সবগুলোই অনুবাদ করছি। কাজ প্রায় মোটামুটি শেষ হয়ে এসেছে। এখন এটাকে আমি ফিনিশিং দেয়ার চেষ্টা করছি।”

—————————————————————-
“আমাদের অস্তিত্বের যে সংকট অর্থাৎ মানবজাতির অস্তিত্বের যে সংকট, পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে আমাদের নিজেদের তৈরি একটি দ্বন্দ্ব। এটা মূলত সভ্যতা কেন্দ্রিক বা সংস্কৃতি কেন্দ্রিক একটা বিষয়। এটাই আমাদের মূল দ্বন্দ্ব। আমরা যদি এই কৃত্রিম যে বলয় সেটা থেকে বেরুতে না পারি তবে আমরা কখনোই ন্যাচারাল যে স্টেট আছে সে স্টেট-এ পৌঁছতে পারব না এবং আমাদের সংকটের মূলটাও ঠিক এখানে। আমরা যে মাইন্ড (Mind) বলছি, দীর্ঘকাল ধরে আমরা যে মন শব্দটাকে ব্যবহার করে আসছি, আসলে আমরা কেউই কিন্তু জানি না যে মন বলতে কী বোঝায়। বিজ্ঞান বা দর্শন–জ্ঞানের কোন শাখাই আমাদের পরিষ্কার করে ধারণা দিতে পারে না যে আসলে মন বলতে কী বোঝায়। কিন্তু তারপরও আমরা মনের উপর দিয়েই ক্রিয়া করছি। কিন্তু উনি বলতে চাচ্ছেন, মন জিনিসটাই পুরোপুরি একটা কাল্পনিক ব্যাপার সেটা সেল্ফকে (Self) কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে আর এর সৃষ্টি হয়েছে ভয় থেকে। মূলত সেল্ফ এর কোন অস্তিত্ব নেই এবং সেই অর্থে আত্মারও কোন অস্তিত্ব নেই। আমাদের দেহটাই শুধু সত্যি আর এর সাথে আমরা মন নামক একটা জিনিস কল্পনা করে নিয়েছি।”
—————————————————————-

বইগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বলেন, “এখানে আমার পারসোনাল ইন্টারেস্টের একটা ব্যাপারে আছে। দীর্ঘদিন ধরে আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও থিয়োরি অব রিলেটিভিটিটা বোঝার চেষ্টা করছি। আমার কবিতার সাথে আমি এটাকে রিলেট করতে চেয়েছি। এটা আমার কাছে ইম্পর্টেন্ট একটা ব্যাপার মনে হয় যে প্রাকৃতিক যে নিয়মগুলো রয়েছে অর্থাৎ আমাদের ইউনিভার্স কেন্দ্রিক যে প্রাকৃতিক নিয়মগুলো রয়েছে, সেগুলো মানুষ কতটুকু বুঝতে পেরেছে সেটা বোঝার ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত একটা তাড়না কাজ করেছে। এটা আমি অনেকদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছি। একপর্যায়ে আমার মনে হল যে এরকম একটা টেক্সট তৈরি হতে পারে যে, ‘মন কাল্পনিক’। এটা নিয়ে আমি নিজেই যখন লেখার চিন্তা করছিলাম তখনই আমি মূলত এই বইগুলো হাতে পাই।

আমি খুব আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, যে বিষয়গুলো নিয়ে আমি ভাবছি এখানে ঠিক সে বিষয়গুলোতেই কেউ একজন একটা চূড়ান্ত ভাব-এ পৌঁছে গেছেন। যার ফলে আমি আমার চিন্তার ধরনটাকে বাদ দিয়ে সেটাকেই স্টাডি করতে শুরু করলাম। তার কথাবার্তার ধরন বুঝতে চেষ্টা করলাম। খুব বিস্ময়ের সাথে দেখতে পেলাম আমি যা বলতে চাচ্ছি, যে সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছতে চাচ্ছি সে সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যে উনি পৌঁছে গেছেন। আমার সেই চিন্তাভাবনার একটা ওয়েল স্টাবলিস্ট ফর্ম আমি তার কথার মধ্যে খুঁজে পেলাম।

তিনি যখন কথা বলেছেন তখন তিনি একটা থ্ট স্ট্রাকচার থেকে কথাগুলো বলেছেন কিংবা বলা যায় তথাকথিত সোল কেন্দ্রিক বা আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে তিনি কথাগুলো বলেছেন। যদিও আধ্যাত্মিকতা বা স্পিরিচুয়ালিটি শব্দটাকেই উনি সমর্থন করেন না। উনি বলতে চেয়েছেন যে আমরা আসলে হাজার বছর ধরে আমাদের চারপাশে একটা কৃত্রিম থ্ট স্ফেয়ার বা চিন্তা বলয় তৈরি করে নিয়েছি। আমরা আমাদের ভিতরে কৃত্রিম যে সত্তাটা তৈরি করে নিয়েছি তার সাথে প্যারালাল একটা জাগয়াও আমরা তৈরি করে নিয়েছি। এটাই আমাদের বিভ্রান্তির মূল।

আমাদের অস্তিত্বের যে সংকট অর্থাৎ মানবজাতির অস্তিত্বের যে সংকট, পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে আমাদের নিজেদের তৈরি একটি দ্বন্দ্ব। এটা মূলত সভ্যতা কেন্দ্রিক বা সংস্কৃতি কেন্দ্রিক একটা বিষয়। এটাই আমাদের মূল দ্বন্দ্ব। আমরা যদি এই কৃত্রিম যে বলয় সেটা থেকে বেরুতে না পারি তবে আমরা কখনোই ন্যাচারাল যে স্টেট আছে সে স্টেট-এ পৌঁছতে পারব না এবং আমাদের সংকটের মূলটাও ঠিক এখানে। আমরা যে মাইন্ড (Mind) বলছি, দীর্ঘকাল ধরে আমরা যে মন শব্দটাকে ব্যবহার করে আসছি, আসলে আমরা কেউই কিন্তু জানি না যে মন বলতে কী বোঝায়। বিজ্ঞান বা দর্শন–জ্ঞানের কোন শাখাই আমাদের পরিষ্কার করে ধারণা দিতে পারে না যে আসলে মন বলতে কী বোঝায়। কিন্তু তারপরও আমরা মনের উপর দিয়েই ক্রিয়া করছি। কিন্তু উনি বলতে চাচ্ছেন, মন জিনিসটাই পুরোপুরি একটা কাল্পনিক ব্যাপার সেটা সেল্ফকে (Self) কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে আর এর সৃষ্টি হয়েছে ভয় থেকে। মূলত সেল্ফ এর কোন অস্তিত্ব নেই এবং সেই অর্থে আত্মারও কোন অস্তিত্ব নেই। আমাদের দেহটাই শুধু সত্যি আর এর সাথে আমরা মন নামক একটা জিনিস কল্পনা করে নিয়েছি।

আসলে আমরা যেখান থেকে ক্রিয়া করছি সেটা হচ্ছে প্রাকৃতিক সত্তা বা ন্যাচারাল স্টেট। সেখান থেকে আমরা বহুদূরে চলে এসেছি। আমরা মনে করি মস্তিষ্ক সকল চিন্তাচেতনার জনক ও অতি বিস্ময়কর বস্তু। আমাদের সব চিন্তাভাবনাগুলো মস্তিষ্কই তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তা আসলে নয়। উনি বলতে চেয়েছেন আমাদের চিন্তাভাবনাগুলো বাইরে থেকে আসে। মস্তিষ্ক কোন ক্রিয়েটর নয়। তিনি বলতে চেয়েছেন, ব্রেইন ইজ জাস্ট লাইক এ কম্পিউটার। আমি যখন কথা বলছি বা আর কেউ যখন কথা বলছে আমরা দু’ জনেই আসলে দুটা পুতুল চরিত্রে অভিনয় করছি, বোথ উই আর লাইক এগজাক্টলি এ পাপেট আর সেই পাপেটের সুতাটা মূলত রয়েছে প্রকৃতির হাতে। আমরা যে চিন্তাটা পাচ্ছি সেটা পাচ্ছি মস্তিষ্ক থেকে কিন্তু মস্তিষ্ক সেটা পাচ্ছে বাইরে থেকে অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে। এটাকেই উনি বলেছেন চিন্তাবলয় বা থটস্ফেয়ার। এই থট স্ফেয়ার থেকেই আমরা মূলত ক্রিয়া করছি। আমাদের দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে এই ব্যাপারটাই।”

যাঁর সাক্ষাৎকার নিয়ে এই বইগুলো তৈরি হয়েছে সেই উপ্পলূরি গোপাল কৃষ্ণমূর্তি সম্পর্কে জানতে চাই তাঁর কাছে। তিনি বলেন, “উপ্পলূরি গোপাল কৃষ্ণমূতি ছিলেন ভারতের থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি। উনি সর্বধর্মের একত্ব নিয়ে সারা পৃথিবীতে ভাষণ দিতেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে তাঁর কাছে মনে হল কোথাও একটা ভুল এবং মিথ্যা রয়ে যাচ্ছে আমাদের সামগ্রিক চিন্তাভাবনার ভিতরে। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা যে চর্চাটা করছি বা সাধুরা যে চর্চাটা করছেন বা বিজ্ঞানীরা ও দার্শনিকেরা যে জায়গাটা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে কোথাও একটা মেকি ব্যাপার রয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোন একটা মিথ্যা থেকে যাচ্ছে। তখন উনি হাল ছেড়ে দেন এবং তখন তাঁর একটা শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। এটাকে ভারতীয় শাস্ত্রে বলে কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হওয়া। একে বলা যায় বোধি বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) অর্থাৎ যে দশায় এসে গৌতম বুদ্ধ পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সেটা আমার আগ্রহের বিষয় নয়, আমার কাছে যেটা ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়েছে সেটা হচ্ছে উনি বলেছেন যে, ‘আসলে এনলাইটেনমেন্ট বলেই কিছু নেই! তাঁর এই যে এনলাইটেনমেন্ট বলে কিছু নেই–এই উপলব্ধিটাই হচ্ছে আসলে একটি এনলাইটেনমেন্ট।’

তিনি আরও বলেছেন, আমাদের পরকালের যে ধারণাটা বা বিয়ন্ডের (Beyond) যে ধারণাটা, আফটার লাইফের (After life) যে ধারণাটা বা ঈশ্বরের যে ধারণাটা–এটাকে উনি বলেছেন, আমাদের মনের সৃষ্টি। সেক্ষেত্রে তিনি বলেছেন যে ঈশ্বরের প্রশ্নটা আসলে এই মুহূর্তে একদমই অবান্তর। মন জানে যে, কখনো না কখনো সে বিনাশপ্রাপ্ত হবে কিন্তু সে বিনাশপ্রাপ্ত হতে চায় না। চায় না বলেই কাল্পনিক এ জাতীয় শব্দগুলো সৃষ্টি করে তার ভিতর দিয়ে সে টিকে থাকতে চায়। ফলে প্রকৃতির সাথে সারাক্ষণই সে একটা দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। কারণ, প্রকৃতি তার কাছ থেকে এ ব্যাপারটা আশা করছে না। প্রকৃতি চাইছে না যে সে এমন কিছু করুক যেটা তার হারমোনির সাথে বেমানান বা ডিহারমোনাইজড হয়ে যায়। কিন্তু মাইন্ড বা মন মূলত সে কাজটাই করতে শুরু করেছে বহু বছর ধরে। এটা হতে পারে প্রকৃতি হয়ত চাইছে যে মানুষ তার নিজের মাধ্যমেই নিজে বিনাশ প্রাপ্ত হোক। এ কারণে হয়ত প্রকৃতি তাকে ইভোল্যুশনের মধ্য দিয়ে এরকম একটা জায়গাতে নিয়ে এসেছে।

আমার কাছে মনে হয়েছে, সভ্যতাকেন্দ্রিক বা পৃথিবীকেন্দ্রিক যে প্রেডিকশানগুলো তিনি করেছেন সেগুলো খুব পিনপয়েন্টেড। সেগুলো সব একিউরেটলি খেটে গেছে এবং খাটছে এই মুহূর্তেও। যেমন যে দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা যাচ্ছে এবং সিভিলাইজেশনটা যে একটা সর্বনাশের দিকে এগোচ্ছে, তার বক্তব্য অনুযায়ী এটা একটা অনিবার্য ব্যাপার। মনুষ্য সভ্যতা মূলত তার চিন্তার ধরনের কারণেই একটা ডিজ্যাসটারের দিকেই ধাবিত হতে থাকবে। এর থেকে বেরোনোর আর কোন উপায় নেই। সেটাই তিনি বলেছেন তাঁর নো ওয়ে আউট বইটিতে। ফলে তিনি কোন পথনির্দেশ বা স্কুলিং করতে চাচ্ছেন না বা মানুষকে শিক্ষা দেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তিনি বলেছেন যে, ’তুমি যেহেতু আমাকে প্রশ্ন করছ তাই আমি তোমাকে উত্তর দিচ্ছি। আসলে আমি তোমাকে উত্তর দিচ্ছি না; তোমার কাছেই সব উত্তর জানা আছে। তুমি তোমার আরেকটি সত্তার মত সেটা আমার কাছ থেকে বের করে নিচ্ছ। সেটাকে বলে ‘ভেন্ট্রিলোকুইস্ট’ অর্থাৎ পাপেটরা যেভাবে কথা বলে। আমরা যে আসলে যন্ত্র এবং আমরা যে আসলে আর দশটা অন্য প্রাণীর চেয়ে আলাদা কিছু নই–এটাই আমরা ভুলতে বসেছি। আমরা মনে করছি আমরা সৃষ্টির সেরা জীব, পৃথিবীতে এসেছি কোন একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এই চিন্তাটাই আমাদের সর্বনাশের মূল।’

এ ব্যাখ্যার সাথে কোয়ান্টাম মেক্সানিক্স এবং থিয়োরি অব রিলেটিভিটির সম্পর্কটা কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের শেকড়টা তৈরি হয়েছে এখান থেকে, উনি যে বললেন ইভোল্যুশনের একটা পর্যায়ে গিয়ে মানুষের ভিতর আত্মসচেতনতা বা সেল্ফ-এর সেন্স ডেভেলপ করেছে এবং যখন থেকেই সেলফ ডেভেলপ করেছে তখন থেকেই মানুষ তার রিয়েলিটিটাকে পাল্টে ফেলতে শুরু করেছে। কারণ আমাদের রিয়েলিটিটা আমরাই তৈরি করি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সও কিন্তু তাই সমর্থন করে। তাছাড়া আমাদের যে ন্যাচারাল স্টেট বা প্রাকৃতিক দশা সেটা কিন্তু মূলত একটা না জানার বা নির্জ্ঞানের দশা। আমরা যে কিছু জানি না এটাই আমাদের মূল দশা। কিন্তু যখনই আমরা জ্ঞানটাকে হাজির করছি, সেটাকে সত্যি বলে মনে করছি এবং এর দ্বারা অভিজ্ঞতা লাভ করছি তখনই আমরা একটা বাস্তবতাকে ফিল করছি, যা আসলে কৃত্রিম। এভাবে আমরা একটা দুষ্ট চক্রের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবতা বলে তো আসলে কিছুই নেই। কেউ যদি থিয়োরি অব রিলেটিভিটির সাথে এই আইডিয়াকে রিলেট করে তবে দেখবে এটা খুবই ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার যে থিয়োরি অব রিলেটিভিটিও ঠিক সে জায়গায় গিয়েই পৌঁছায় যে বাস্তবতা বলে আসলে কিছু নেই। আমাদের কনশাসনেস (Conciousness) বা চেতনাই এটা তৈরি করছে। কিন্তু চেতনা বলেই আসলে কিছু নেই। অবচেতনা, অধিচেতন–এগুলো তো পুরোপুরিই বুজরুকি। আসলে চেতনা আমাদের চিন্তারই একটা সৃষ্টি মাত্র। শুধু যেটা আছে সেটা হচ্ছে স্টিমুলি (Stimuli) ও তার যে সাড়া অর্থাৎ উত্তেজক ও তার সাড়া। সেটা সকল জৈব প্রাণের একটা সাধারণ গুণ মাত্র।”

বইগুলো কবে প্রকাশিত হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আসলে এত বড় একটা কনটেক্সট এবং এর মাঝে এত ডিটেইলিং রয়েছে যে এটার কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ করতে গেলে আমাকে দিনরাত কাজ করতে হবে। আপাতত আমি পাঁচটি বইয়েরই কাজ মোটামোটি গুছিয়ে এনেছি। ওগুলো এখনো খসড়া অবস্থায় আছে। সম্পূর্ণ কাজটা শেষ হলে পরে আমার কাছে যেটা সবচেয়ে নিখুঁত হয়েছে বলে মনে হবে সেটাই প্রথমে প্রকাশ করব। সামনের বছর বই মেলাতে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। প্রথমে হয়ত একটা বইই প্রকাশ করব। এর পর আস্তে আস্তে বাকিগুলোও বের করব। তবে আগে হোক পরে হোক পাঁচটি বইই আমি বের করব।”

সামনে আর কী কী বই বের হতে যাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সামনের বছর আমার একটি নতুন কবিতার বই আসবে। নাম ঠিক করেছি আজ কি ফুল ফুটিয়েছ, অরণ্য।” ২০০৫ সালে আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটি বের হয়েছিল নাম পুনরুত্থিত শহর। এরপর এই পাঁচ বছর বিচ্ছিন্নভাবে আমার যে কবিতাগুলো জমা হয়েছে সেগুলো থেকেই বাছাই করার চেষ্টা করেছি। এটা সবাই জানেন যে কবিতার বইয়ের ব্যাপারে পাবলিশাররা ততটা আগ্রহী থাকেন না। এটা অনেকটা নিজ উদ্যোগেই করতে হয়। সেটার জন্য আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি যাতে যে করেই হোক এটা বের হয়।”

বইটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বইটি কলেবরে খুব একটা বড় নয়। তিন ফর্মার মত হবে। এতে প্রায় ৪৮টার মত কবিতা থাকবে। আমার অন্য দুটো কবিতার বই রাত্রিকালীন ডাকঘরপুনরুত্থিত শহর-এর সাথে এটারও বিষয়বস্তুতে কিছুটা সামঞ্জস্য আছে। যদিও সামাজিক দায়বদ্ধতা যেটা–সেটা আমি এড়াতে পারিনি। আমাদের সাংস্কৃতিক মূল ট্রেন্ড যেটা সেটা থেকে আমি নিজেও মনে হয় ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। প্রকৃতি ব্যাপারটা আমার অনেক ভেতরে প্রবেশ করছে, শেকড় দিয়ে ঢুকে পড়ছে, শেকড় গেঁড়ে দিচ্ছে বলা যায়। এ কবিতা গুলো ওই রকম সামাজিক জীবন থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। এটা বোধহয় একটা থিম। খুব কোর (Core) জায়গা থেকে বললে এটাই হয়ত আমার কবিতার একটা থিম।”

সামাজিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলতে কি বোঝাতে চাচ্ছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সামাজিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলতে বোঝাতে চাচ্ছি আমাদের কবিতার যে প্রথাগত একটা ট্রেন্ড আছে, যে আন্দোলনগুলো এই মুহূর্তে চলছে বা এই প্রজন্ম যে কবিতাগুলো পছন্দ করে আমার নিজের এ বিষয়গুলোতে মূলত কোন আগ্রহ নেই। আমি যেটা ফিল করি সেটা সচেতন চিন্তা থেকে নয় বরং সেটা আসে এবসলিউট স্বপ্ন থেকে। ঠিক সেটা ছাড়া কবিতার ক্ষেত্রে কোন লাইন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না। আমাদের সাবকনশাস যে মাইন্ড সেটাই মূলত আমাদের থেকে কবিতা লিখিয়ে নেয়।”

এছাড়াও এ মুহূর্তে বেশ কিছু হাইকু অনুবাদ করছেন বলেও জানালেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিখ্যাত দুজন জাপানী কবি মাৎসুয়ো বাসো এবং কোবাইয়াসি ইসা’র কিছু হাইকু অনুবাদ করছি। চারশ বছর আগেকার হাইকু মাস্টারদের মধ্যে এরা দুজন ছিলেন খুব প্রমিনেন্ট। এদের প্রায় শ’ দেড়েক মত কবিতা (হাইকু) আমি অনুবাদ করেছি। এখনও কিছু করছি। এর মাঝে কয়েকটা আমি ব্লগেও আপ করেছি। ইচ্ছা আছে এটা নিয়ে একটা ছোট সংকলন করব। জিনিসগুলো মোটামুটি রেডিই আছে। হাইকুর কনটেক্সটগুলো তো ছোট হয়। তিন লাইনের একেকটা কবিতা। ফলে এটা বের করা তেমন কঠিন নয়।”

এ সময়ে কী কী বই পড়ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যে বইগুলোর কথা বললাম যে অনুবাদ করছি ওই বইগুলোই বেশি পড়া হচ্ছে। এছাড়া লুই ক্যারলের থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস, কোয়ান্টাম মোকানিক্সের উপর লেখা একটি বই ‘তাউ অব ফিজিক্স’, গ্যারি জুখাভ-এর ‘দা ডান্সিং উ লি মাস্টার্স’ (The Dancing Wu Li Masters) এই বইগুলো পড়ছি। আমার পছন্দের বই সবই মূলত কোয়ান্টাম মেকানিক্স রিলেটেড। কবিতা পড়ছি আঁরি মিশো’র ডার্কনেস মুভস প্লুমপ্লুম বইটি পড়ে বেশ মজা পাচ্ছি। প্লুম হচ্ছে উনার একটা ফ্যান্টাসি চরিত্র, এটা একটা নায়ক ক্যারেকটার। এই কারেকটারকে নিয়ে তার অনেক কবিতা আছে। আর লুই ক্যারোলের থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস খুবই দারুণ একটা বই। এটা উনার এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড-এর সিক্যুয়াল।”

এ সময়ের সাহিত্যচর্চা নিয়ে কী অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে যদি বলি তবে বলব যে, সাহিত্যে নতুন ধারা বলতে যা বোঝায় এমন কোন কিছুই গত দশ বিশ বছরে আমার চোখে পড়ে নি। আমি যদি কোন ট্রেন্ড-এর কথা বলি তবে সব থেকে শক্তিশালী যে ট্রেন্ডটা ছিল, আমি ব্যক্তগতভাবে বিশ্বাস করি সেটা হল আশির দশক। এই ধারাটাই একরকম স্বাধীনতার ভিতর দিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিল। সেটা নব্বইতে এসে যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে সেটা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং যথেষ্ট এলোমেলো। এছাড়া গত বিশ বছরে আমাদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষপটে খুব দ্রুত বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন, টেকনোলজি একটা বড় ঘটনা। কম্পিউটার প্রযুক্তি, ভিডিও প্রযুক্তি বা ইন্টারনেট গত দশ বারো বছরে যেভাবে আমাদের সমাজের ভেতর ঢুকে পড়েছে সেটার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সাহিত্যটা ঠিক সেভাবে আগাতে পারেনি। পত্রিকার ক্ষেত্রে ও কেমন একটা মহামারী চলছে। এমন কোন সাহিত্য পত্রিকা নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না যেটা দ্বারা কোন মূল ধারাকে শনাক্ত করা যায়। এ ক্ষেত্রে কিন্তু গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতাও থেকে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে যদি বলি তবে প্রতিনিধিত্বশীল কোন কাগজকে আমরা বলতে পারব না। তবে তার মানে এই না যে–আমি বলব ব্যাপারটা খুব নৈরাশ্যজনক। তা নয়। আসলে এখানে আশা করার কিছু নেই। সাহিত্যে এরকম দশ বা বিশ বছর এলোমেলো সময় যেতেই পারে। সেটা এমন কোনো বড় ব্যাপার নয়।”

লেখালেখির বাইরে আর কি করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “লেখালেখির বাইরে আমি আসলে নানারকম কাজ করার চেষ্টা করেছি। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, আইন ব্যবসা ইত্যাদি নানারকম পেশা করার চেষ্টা করেছি। বলা যায় সেক্ষেত্রে আমি কমপ্লিটলি ব্যর্থ! কোন সুনির্দিষ্ট জীবিকার সাথে আমি কখনোই কাজ করতে পারিনি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সমস্ত সময়টাই আমি লেখালেখিতেই ব্যয় করব এবং এ মুহূর্তে তাই-ই করছি।”

pshanchita@gmail.com

—–


বি.দ্র. প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে নিয়মাবলী পড়ুন। খেয়াল রাখবেন, বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। – বি.স.

আরো লেখক সংবাদ


karuzzaman-jahangir.jpgchanchal-ashraf.jpg

হায়াৎ মামুদকামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরচঞ্চল আশরাফ

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গীতা দাস — নভেম্বর ১৭, ২০১০ @ ৮:০৪ অপরাহ্ন

      প্রমা সঞ্চিতা অত্রিকে ধন্যবাদ তার ধারাবাহিকভাবে লেখকদের নিয়ে লেখার জন্য।ভাল লাগছে। আশাকরি এ ধারা অব্যাহত থাকবে। সাথে লেখকদের নিজস্ব লেখালেখি নিয়ে আরও একটু বিস্তারিত ও বিশ্লেষণ সম্প্রসারিত করার ছোট্ট একটা অনুরোধ রইল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com