শ্রদ্ধাঞ্জলি

মৃত্যু হলেও সঙ্গে আছেন তিনি

জাহীদ রেজা নূর | 21 Apr , 2021  


এরশাদ-জামানার শুরুতে শঙ্খ ঘোষের লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। হরতালের দিন পিকেটিং করি, পুলিশ তেড়ে এলে দৌড়ে পালাই। আবার ইট হাতে প্রস্তুত হই। সম্মুখ-সমরে কিছু সময় অতিবাহিত হয়, তারপর রিট্রিট। ধরা পড়া চলবে না। বিকেলে আবৃত্তি করতে যাই টিএসসিতে।

সে সময়ই কন্ঠশীলনের আবৃত্তিকারদের মুখে শুনতে পাই,

‘বহোরে আলোর মালা
অবশা রাত্রি ঘিরে
মেঘের ঐ আকাশ ছিঁড়ে
ঝরে রে বেদন সুরা’!

‘বেদন সুরা!’ শব্দ দুটি মাথায় আসতেই কেমন যেন হয়ে যাই। আমাদের কবিতার গুরু বিপ্লব বালা একটা অসাধারণ আবৃত্তি-ঢঙে তৈরি করেছিলেন কবিতাংশটি। আমরা কোরাসে কিছু কথা বলার পর হঠাৎ একজন বলে উঠত, ‘কবি কি নিত্য কাঁদে?’

আরেকজন সাধারণ সত্যের মতো বলতো, ‘কবি? সে নিত্য কাঁদে!’

আর যখন ‘আকাশে নিত্য বেদন’ পংক্তিটি উচ্চারণ করতাম, তখন কি এক হাহাকারে ভরে উঠত বুক। ১৯৮৪ সালে কেবল কৈশোর পার হওয়া এক তরুণের জন্য শঙ্খ ঘোষের দিনগুলি রাতগুলি কবিতাটি ছিল কাব্য জগতের এক বিস্ময়কর ঘটনা।

বিপ্লব বালা, আমরা যাকে দাদা বলে ডাকি, বলেছিলেন, ‘শঙ্খ ঘোষের জার্নালটা পড়ে ফেলো।’

তিনি তো বলেই খালাস! কোথায় পাব জার্নাল। পকেট তখন প্রতিদিনই গড়ের মাঠ। কোনভাবে বাসভাড়াটা থাকত পকেটে। সিঙ্গারা খেলে তিন দিন হেঁটে হেঁটে চলতে হতো পথ। এ অবস্থায় বই কেনা! অসম্ভব!

তবে ভরসা রাখতে হতো মনে, কারো না কারো কাছে তো পাওয়া যাবে বইটা! এবং পাওয়া যায়!

গোগ্রাসে গিলতে থাকি একটার পর একটা ঘটনা।

সব কি আর এখন মনে আছে! হালকা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, ‘তুমি আর নেই সে তুমি’ কবিতাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ‌ একজন শঙ্খ ঘোষকে বলেছিলেন,‌ কবিতাটি লিখে ভালো করোনি।

শঙ্খ ঘোষ যা লিখেছিলেন জার্নাল-এ, তার মর্মকথা এরকম: কেউ বলতে পারে লেখাটা ভাল লেগেছে, কেউ বলতে পারে লেখাটা ভাল লাগেনি। কেউ বলতে পারে এ লেখার যে সারমর্ম তার বিরোধী তিনি। কিন্তু কেউ যদি বলে যে এটা না লিখলেই ভালো হতো, তাহলে আর কথা চলে কী করে?

এমনই ছিল বুঝি ভাবনাটা। এরপর সরাসরি রাজনীতির প্রসঙ্গটি চলে এসেছিল। ‘তুমি কোন দলে’ এটাই ছিল তখনকার মূল প্রশ্ন।

এখনো কি সেটাই মূল প্রশ্ন নয়?

শম্ভু মিত্রের আবৃত্তি নিয়ে একটা লেখাও ছিল সেখানে। কবির নিজের গলায় আবৃত্তি এবং আবৃত্তি শিল্পীর গলায় আবৃত্তি, এ নিয়েই বোধহয় ছিল সেই বিতর্ক। এ লেখাটি আমরা বারবার পড়তাম। এতদিন পর খুব বেশি মনে নেই। তবে শঙ্খ ঘোষ চলে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে, লেখাগুলো আবার পড়তে হবে।

২.
সে সময়, অর্থাৎ ১৯৮৫-৮৬ সালে কন্ঠশীলন দলের ভেতরে আমরা পাঁচজন একটা ছোট্ট আবৃত্তি দল তৈরি করলাম। আমি ছাড়া সে দলে ছিলেন মনোয়ার আলী, সুরভী ছন্দা, আলতাফ হোসেন ও মুজিবর রহমান। দলের ভেতর দল। পাড়ায়-মহল্লায় আমরা রাজনীতি-সচেতন কবিতা পড়ে বেড়াব, এই ছিল আশা। আমরা বেছে নিলাম জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, আসাদ চৌধুরী আর শঙ্খ ঘোষকে। কবিতাগুলো সবই ছিল রাগী কবিতা। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অনুষঙ্গ হতে পারে, এমন কবিতা। ‌ জীবনানন্দ দাশের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’, আসাদ চৌধুরীর ‘আছে রে আছে’, শামসুর রাহমানের ‘ধন্য রাজা ধন্য’, শঙ্খ ঘোষের ‘মারের জবাব মার’ আর ‘কলকাতা’।

বাপজান হে
কইলকাত্তায় গিয়া দেখি সক্কলেই সব জানে
আমি কিছু জানি না
আমারে কেউ পুছতো না
কইলকাত্তার পথে-ঘাটে অন্য সবাই দুষ্ট বটে
নিজে তো কেউ দুষ্ট না

কবিতাটি শেষ হয়েছিল এরকম পংক্তি দিয়ে:

ও সোনা বৌ আমিনা
আমারে তুই বাইন্ধা রাখিস
জীবন ভইরা আমি তো আর কইলকাত্তায় যামু না।

ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, সবগুলো শব্দ ঠিকভাবে লিখতে পেরেছি কিনা জানি না। বহু বছর কবিতাগুলো পড়িনি। ‌ যে অফিসে আগে কাজ করতাম, চাকরি ছাড়ার আগে সেখান থেকে আমার ৪১টি কবিতার বই কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। তারমধ্যে শঙ্খ ঘোষের স্বাক্ষর দেওয়া শ্রেষ্ঠ কবিতার বইটিও ছিল। ‌ এরপর থেকে তাঁর কবিতার বই আমার কাছে আর নেই। ফলে এই মুহূর্তে শব্দগুলো যাচাই করে দিতে পারলাম না।

অন্য কবিতাটিতে এরকম কিছু শব্দ ছিল:

এমনিভাবে থাকতে গেলে শেষ নেই শঙ্কার
মারের জবাব মার।

এ কবিতার একটি অসাধারণ সুন্দর পংক্তি ছিল
কিন্তু তারও ভেতরে দাও ছন্দের ঝংকার!

তীব্র প্রতিশোধের ভেতর ছন্দের ঝংকার সত্যিই মনকে দুলিয়ে দিত।

৩.
মাত্র দু বার দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। সেও এমন নয় যে আমি ছিলাম আমন্ত্রিত অতিথি। লোকমুখে শুনেছি, ধানমন্ডিতে নাহাস খলিল ভাইয়ের বাড়িতে এখন শঙ্খ ঘোষ। বোধ হয়, কন্ঠশীলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন, অরুণ বসু, খবরটি দিয়েছিলেন। তাই কালবিলম্ব না করে চলে গিয়েছিলাম তাঁকে দেখতে।

এখানে বলে রাখা দরকার, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে (পরবর্তীকালের রুশ ফেডারেশন) ছিলাম আমি। যে বইগুলো ছিল সঙ্গী, তারমধ্যে ছিল শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতা আর জার্নাল। ‌ শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকাটি পড়ে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। ৪০ বছর বয়সের কাছাকাছি সময় বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতায় একটি পংক্তি লিখেছিলেন, ‘আমি বুড়ো, প্রায় বুড়ো, কী আর আছে আমার, তীব্র তেতো মত্ত স্মৃতি ছাড়া’। প্রায় ৪০ বছর বয়সেই শঙ্খ ঘোষের কাছে প্রস্তাব এসেছিল শ্রেষ্ঠ কবিতার বই বের করার। তাতে কবির মনে হয়েছিল,‌ তাহলে কি চলার ‌সময়টা শেষ হয়ে এসেছে?‌ না হলে এখনই শ্রেষ্ঠ কবিতার আহ্বান কেন?

সত্তরোর্ধ্ব বয়সে তিনি নিজেকে বুড়ো মনে করেন কিনা, সেরকম একটা প্রশ্ন নিয়ে আমি গিয়েছিলাম তাঁর কাছে। তিনি শুরুতেই বললেন, শ্রেষ্ঠ কবিতা ভূমিকায় উত্তরটি দিয়েছেন।

আমি বললাম, না, আমি উত্তরটি পাইনি।

তারপর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকাটি তাঁকে দেখালাম। তিনি মন দিয়ে পড়লেন। তারপর বললেন, ‘তাহলে এখানে দেওয়া হয়নি!’

এরপর একটু হেসে বললেন, ‘এখন তো নিজেকে বাচ্চা বাচ্চা বলে মনে হয়!’

কথোপকথনটা ঠিক এরকমই হয়েছিল কিনা, তা এত বছর পর বলতে পারব না (সেটা ছিল সম্ভবত ২০০৮ সাল)। কিন্তু ঘটনাটা ছিল এ রকমই।

তাঁকে গান শোনাতে এসেছিলেন ছায়ানটের শিল্পীরা। তিনি নিবিষ্টমনে শুনছিলেন। মাঝে মাঝে কেবল গানের বিরতিতে কথা হচ্ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি তার গুণমুগ্ধ পাঠক। ‌ তার সঙ্গে কথা চালানোর মত পূঁজি আমার ছিল না।

৪.
এরমধ্যে একটু একটু করে তার বই কিনতে শুরু করেছি। ঢাকায় যারা ভারতীয় বই বিক্রি করেন, তারা তখনও শঙ্খ ঘোষের বইকে খুব একটা পাত্তা দিতেন বলে মনে হয় না। তাই ভারত থেকে আসা পুরনো বইগুলোর ওপর নতুন করে দামের ট্যাগ লাগাতেন না। ফলে বহু আগে প্রকাশিত বইগুলো পেয়ে যেতাম প্রায় পানির দরে। লেখা দামের চেয়ে দ্বিগুণ দাম হলেও তা ছিল ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। এভাবেই কিনে ফেলি ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ, শব্দ ও সত্য, নিঃশব্দের তর্জনী, আরোপ আর উদ্ভাবন, এ আমির আবরণ, ভিন্ন রুচির অধিকার, কবিতার মুহূর্ত, ঘুমিয়েপড়া অ্যালবাম, সময়ের জলছবি আরো কয়েকটি বই কিনেছিলাম, কিন্তু এ মুহূর্তে নামগুলো মনে পড়ছে না।

প্রথমেই আমাকে নাড়িয়ে দেয় ভাষার গাঁথুনি। কি অবলীলায় একটার পর একটা ঘটনা বলে যাচ্ছেন তিনি। কখনো কখনো নিজের কথাই বলছেন নিজেকে আড়ালে রেখে। ‌ কোন এক বইয়ে পড়েছিলাম, একেবারে নিঃস্ব অবস্থাতেই গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু যে দারিদ্র্যের কথা উঠে এসেছিল তাঁর লেখনীতে, তাতে নিম্ন মধ্যবিত্তের তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছিল। আর মানিক বন্দোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর সেরকমই একটি লেখা আমাকে বিমূঢ় করেছিল। সাহিত্য আর দারিদ্রকে নিঃসংকোচে তুলে এনেছিলেন শঙ্খ ঘোষ।

শঙ্খ ঘোষের লেখাতেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে অন্যভাবে আবিষ্কার করেছিলাম। পার্টিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে জেনে সুভাষ মুখোপাধ্যায় চলে এসেছিলেন শঙ্খ ঘোষের কাছে। এবং পরামর্শ দিয়েছিলেন পার্টিতে যোগ না দিয়ে মুক্ত জীবন যাপন করতে। ‌ এখন যখন কমিউনিস্ট পার্টি’র নানা ভুল-ভ্রান্তি, মিথ্যা এবং একনায়কতন্ত্রের প্রকাশভঙ্গিটি দৃশ্যমান হয়েছে, তখন সেরকম ছিল না। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মানসিক অবস্থাটা দেখেই বোঝা গেছে, কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শে কবি বা সাহিত্যিক ধরা পড়ে গেলে, তার পক্ষে মুক্তভাবে লেখা আর সম্ভব নয়। পার্টি সেই উদারতাটুকু দেখাতে চায় না। অথচ ভাবনার জায়গায় মুক্তির কথা আছে, কর্ম ক্ষেত্রে সেটা মেনে চলা হয় না।

কথা প্রসঙ্গে মনে পড়ল, রাশিয়ার বিখ্যাত কবি কনস্তান্তিন সিমোনভকে একবার সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলো, ‘আপনি এখন কী নিয়ে লিখছেন?’

কবি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এখনও কিছু ঠিক করিনি। পার্টি যে নির্দেশ দেবে, তাই লিখব।’
কোভিদ মনোজগতে পার্টি নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ! এবং যার ফলে কবির ভেতরের কবির মৃত্যু!

ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। ‌ সেটা ভিন্ন আলোচনায় বিষয়।

৫.
কন্ঠশীলনের কবিতার ক্লাসে ‌ যখন ছন্দ শেখাতে গিয়ে উচ্চারণ করি,

হাতের ওপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারাজীবন বইতে পারা সহজ নয়

কিংবা
আমায় তুমি সুখ দেবে তা সহজ নয়
আমায় তুমি দুঃখ দেবে সহজ নয়

তখন ছন্দে এবং ছন্দহীনভাবে পড়তে পড়তে নবীন শিক্ষার্থীদের দিকে তাকাই। তাদের চেহারায় একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সহজ চারটি পংক্তি হঠাৎ করে তাদের কাছে অধরা হয়ে যায়। ‌ এত সহজ কাজগুলোকে কেন কঠিন বলা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন জেগে ওঠে মনে। তারপর জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে গিয়ে টের পাওয়া যায়, আপাত সহজ বিষয়গুলো আদতে সহজ নয়। কবিতায় পংক্তিগুলো ছন্দোবদ্ধ শিক্ষার দরজা পেরিয়ে এমন এক জগতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যায়, যেখানে নিজের সঙ্গেই নিজের বোঝাপড়া করতে হয়।

কথাটা বললাম দীর্ঘকাল নানা আবর্তনে পংক্তিগুলো উচ্চারণ করার পর বারবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে হয়েছে বলে। ‌ তুমুল আলোড়ন তুলতে পারার মতো সহজ শব্দগুলো। এই মনের অবস্থাটাকেই কি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘লাগিল যেন সুখের মতো ব্যথা?’

কি জানি! এ আমার নিজের উপলব্ধি। অন্যরা নিশ্চয়ই অন্যভাবে দেখবেন পংক্তিগুলোকে।

৬.
রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি অথবা মুসোলিনির দেশ ইতালিতে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথের যে উপলব্ধি, তা নিয়ে সোজাসাপ্টা নিজের মতামত জানিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ‌ এবং বলে যাওয়া কথাগুলোকে ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য পড়াশোনা করতে হয়েছে বিস্তর। ‌ ঘাটতে হয়েছে অনেক বই। মুসোলিনির প্রতি এক ধরনের পক্ষপাত রবীন্দ্রনাথকে বিচলিত করেছিল, তারও আভাস আমরা দেখেছি সেখানে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতিশীলতার পাশাপাশি সামষ্টিক শক্তির প্রাবল্যে ব্যক্তির নাভিশ্বাস অবস্থার কথাও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন। এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে যে প্রমাণগুলো শঙ্খ ঘোষ হাজির করেছেন, তা অমূল্য।

এ প্রসঙ্গেই বলে রাখি, দুই ভদ্রলোক শঙ্খ ঘোষের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কেন স্বীকার করে নেননি যে, মুক্তক ছন্দে তিনি লিখেছেন নজরুল বিদ্রোহি লেখার পর। অর্থাৎ নজরুলের কাছ থেকেই সেটা তিনি শিখেছেন।

যারা কথাগুলো বলছিলেন, তারাও জ্ঞানীগুণী মানুষ। কিন্তু তারা একবারও সন-তারিখ হিসেব করে দেখেননি। অন্যদের কাছে শুনেছেন, সেটাই অভিযোগ আকারে প্রকাশ করেছেন শঙ্খ ঘোষের কাছে।

শঙ্খ ঘোষ যখন তাঁদের বললেন, নজরুলের বিদ্রোহী ছাপা হয়েছে ১৯২১ সালে। রবীন্দ্রনাথের বলাকা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৬ সালে। বলাকাতেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম মুক্তক ছন্দ ব্যবহার করেন। তাহলে বিদ্রোহীর কাছ থেকে মুক্তক ছন্দ ধার করার প্রশ্নই আসে না!

মুশকিল হলো, কেউ কোন কিছু যাচাই করে দেখে না। যা শোনে, সেটা বিশ্বাস করে বসে থাকে। এই আক্ষেপ শঙ্খ ঘোষ আরো অনেক জায়গায় করেছেন।

৭.
রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে শঙ্খ ঘোষের অনেকগুলো লেখা রয়েছে। ‌ সেগুলো পড়ার সময় শম্ভু মিত্রের উপস্থিতি টের পাই। আমরা যখন শম্ভু মিত্র এবং উৎপল দত্তের নাট্য ভাবনার দিকে দৃষ্টি দিই, তখন দু’ধরনের নাট্যতত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত, তার প্রমাণ পাই। ‌ তারপরও দুজনের কাউকেই খারাপ লাগে না।‌ দুজনের দায়বদ্ধতা দু জায়গায়। রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে শঙ্খ ঘোষ লিখে যান তাঁর গবেষণালব্ধ কথাগুলো। ‌ কেউ তার সঙ্গে একমত হবেন, কেউ হবেন না। কিন্তু তার মোকাবেলা করতে হবে যুক্তি দিয়েই। শঙ্খ ঘোষ তাঁর যুক্তির জায়গাতে বরাবরই শক্তিশালী।

স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলো আমাকে খুব বেশি আকর্ষণ করেছে। ‌ এক এক জন মানুষের কথা তিনি তুলে এনেছেন, আর আমরা গোটা একটা সমাজ ও সময়কে তার মধ্য দিয়ে দেখতে পাচ্ছি। এমনকি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আর সুকুমার সেনের কথাও যখন বলেন, তখন মনে হয়, গল্পকারের লেখা কোন গল্প শুনছি যেন। বুদ্ধদেব বসুদের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের (অর্থাৎ দুই প্রজন্মের) কবিতাবিষয়ক দ্বৈরথ যে ভাষায় তুলে এনেছেন শঙ্খ ঘোষ, তার তুলনা মেলা ভার।

শঙ্খ ঘোষ পড়তে গেলে আমি আরাম পাই। ‌ কখনোই মনে হয় না, জোর করে কোনো কিছুর ওপর বিশ্বাস রাখতে প্রলুব্ধ করছেন তিনি। মনে হয়, নিঃসঙ্গ এক মানুষ সমুদ্রতট থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছেন সকল পাথর। তারপর তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন আবার, শুধু যোগ করছেন নিজের ভেতরকার আনন্দটিকে। আপনি তা নেবেন কিনা, নিলে নিয়ে কী করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। পরের দায়টুকু শুধুই আপনার।

আমি নিজের মতো করে শঙ্খ ঘোষকে নিয়েছি। তাই আজ ২১ এপ্রিল করোনায় বিধ্বস্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হলেও তিনি আপনজন হয়ে আমার সঙ্গেই বসবাস করছেন।


1 Response

  1. শাহাব আহমেদ says:

    বড়মাপের একজন মানুষকে নিয়ে বড়মাপের কিন্তু বিনয়ী আর একজন মানুষের বড় সুন্দর একটি আলোচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.