অনুবাদ গল্প

কিলিমাঞ্জারোর তুষার

মোস্তাক শরীফ | 28 Mar , 2021  


মার্কিন কথাসাহিত্যের এক কিংবদন্তী আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১)। তাঁর মত করে আর কোনো মার্কিন লেখক পরবর্তীকালের এত বেশি লেখককে প্রভাবিত করতে পারেননি। সাহিত্যিক রাসেল ব্যাংকস-এর মতে, ‘আমেরিকায় যারা লেখালেখি করেন তাঁদেরকে হেমিংওয়ের ছায়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, প্রতিযোগিতা করতে হয় নিজের লেখার মাধ্যমে পৌরুষের যে দীর্ঘস্থায়ী প্রথাটির তিনি গোড়াপত্তন করেছেন তার সঙ্গেও। চাইলে তারা সে প্রথাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, তবে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই।’ ১৯৫৪ সালে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্যে নোবেল পান হেমিংওয়ে। এটি এবং কালজয়ী অন্যান্য উপন্যাসের কথা বাদ দিয়ে কেবল ছোটগল্পকার হিসেবেও যদি বিবেচনা করা হয়, বিশ্বসাহিত্যে হেমিংওয়ের তুলনা বিরল। ‘দ্য স্নোজ অব কিলিমাঞ্জারো’ গল্পটির প্রথম প্রকাশ ১৯৩৬ সালে, ‘এস্কোয়্যার’ পত্রিকায়। পরে হেমিংওয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প সংকলনে এটি স্থান পেয়েছে। হ্যারি নামে এক লেখকের আবেগকে চেতনাপ্রবাহ রীতির বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে এ গল্পে, প্রাণী শিকার করতে আফ্রিকায় এসে গ্যাংগ্রিনের বিষক্রিয়ায় যে মরতে বসেছে। হেমিংওয়ের নিজের বিবেচনায় ‘দ্য স্নোজ অব কিলিমাঞ্জারো’ তাঁর সেরা ছোটগল্প।

মূল: আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
অনুবাদ: মোস্তাক শরীফ

১৯,৭১০ ফুট উচ্চতার তুষারাবৃত পর্বত কিলিমাঞ্জারো, লোকে বলে আফ্রিকার উচ্চতম। এর পশ্চিমের শৃঙ্গকে মাসাইরা বলে ‘এনগায়ে এনগাই’-ঈশ্বরের ঘর। সেই পশ্চিম শৃঙ্গের কাছেই আছে একটা চিতাবাঘের শুকনো ও বরফে জমে যাওয়া মৃতদেহ। অত উঁচুতে চিতাবাঘটি কী করছিল কেউ জানে না।

‘সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, এতে কোনো ব্যাথা নেই,’ সে বলল। ‘ব্যাপারটা যে শুরু হয়েছে সেটাও বোঝা যাবে এতেই।’
‘সত্যি?’
‘একদম। গন্ধটার জন্য দুঃখিত অবশ্য। ভালো লাগার কথা নয় তোমার।’
‘না না, দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই।’
‘ওগুলোর দিকে তাকাও,’ বলল সে। ‘ছবি না গন্ধ কিসের টান এভাবে নিয়ে আসে ওগুলোকে?’
যে খাটিয়ায় সে শুয়ে আছে সেটা একটা মিমোসা গাছের চওড়া ছায়ার নিচে। ছায়াঢাকা জায়গাটা পেরিয়ে চোখ ধাঁধানো রোদে ভরা সমভূমির দিকে তাকাল সে, তিনটি বড় পাখি যেখানে রীতিমতো কদর্য ভঙ্গিতে বসে আছে। পেছনে চকিত ছায়া ফেলে আকাশে উড়ে গেল আরো ডজনখানেক।
‘ট্রাকটা ভেঙে পড়ার পর থেকেই ওখানে আছে ওগুলো,’ বলল সে। ‘আজই প্রথম মাটিতে নামল কোনোটা। কেমন সাবধানে উড়ছিল শুরুতে, যেন ভয় পাচ্ছিল গল্পে ব্যবহার করতে চাইব ওদের। রীতিমতো হাস্যকর।’
‘ওদের কথা লিখো না,’ মহিলা বলল।
‘আরে না, বলছি আর কি! বলা সহজ। তোমাকে বিব্রত করতে চাই না।’
‘আমি এতে বিব্রত হই না, তুমি জানো। আসলে কিছু করতে না পারার ব্যাপারটাই নার্ভাস করে রেখেছে আমাকে। বিমান আসার আগ পর্যন্ত ব্যাপারটাকে যদ্দূর সম্ভব সহজ-সরল রাখা উচিত।’
‘কিংবা বিমান না আসার আগ পর্যন্ত।’
‘দয়া করে বলো আমি কী করতে পারি। নিশ্চয়ই করার মতো আছে কিছু আমার।’
‘পা-টা কেটে নিতে পারো, তাতে হয়তো যাবে সমস্যাটা। যদিও অতটা নিশ্চিত নই আমি। অথবা গুলি করতে পারো আমাকে, বন্দুক তো ভালোই চালাও। আমারই তো শেখানো!’
‘এসব বোলো না প্লিজ। বই পড়ে শোনাই?’
‘কী শোনাবে?’
‘এমন কিছু যা আমরা আগে পড়িনি?’
‘শুনতে ভাল্লাগে না,’ সে বলল। ‘বরং কথা বলাই আরামের। ঝগড়া করতে করতে সময় কেটে যায়।’
‘আমি ঝগড়া করি না, করতে চাই না কখনো। এসো আর কখনোই ঝগড়া না করি আমরা। যত খারাপই লাগুক। এমন হতে পারে আরেকটা ট্রাক নিয়ে ফিরে আসবে ওরা আজ। হয়তো বিমানটাও আসবে।’
‘কোথাও যেতে চাই না আমি,’ লোকটা বলল। ‘তোমার ঝামেলা কমানো ছাড়া এখান থেকে যাওয়ার কোনো কারণ নেই আর।’
‘কাপুরুষের মতো কথা হলো ওটা।’
‘গালিগালাজ করা ছাড়া একটা মানুষকে আরামে মরতেও দেবে না? আমাকে হেনস্তা করে কী লাভ বলো!’
‘তুমি মরবে না।’
‘বোকার মতো কথা বলো না। আমি মরছি। ঐ বেজন্মাগুলোকে জিজ্ঞেস করো।’ বিশাল, নোংরা পাখিগুলো যেদিকটায় বসে আছে ওদিকে তাকাল সে। তাদের ন্যাড়া মাথা ডুবে আছে কোঁচকানো পালকের মধ্যে। চতুর্থ আরেকটা এসে নামল, হুড়মুড়িয়ে কয়েক পা গেল, তারপর হেলেদুলে এগোলো বাকিগুলোর দিকে।
‘সব ক্যাম্পের আশেপাশেই আছে ওগুলো। অথচ কখনোই খেয়াল করবে না। জেনে রেখ, হাল না ছাড়লে মরবে না তুমি।’
‘কোথায় পড়েছ এসব? বোকার হদ্দ একটা তুমি।’
‘অন্য কারও কথা ভাবতে পারো।’
‘যিশুর দোহাই,’ লোকটা বলল। ‘ওটা করেই পেট চালিয়েছি এতদিন।’
শরীরটা এলিয়ে চুপচাপ পড়ে রইল সে। তাপতরঙ্গ পেরিয়ে তাকাল দূরে, সমভূমি পেরিয়ে যেখানে বনের শুরু। কয়েকটা হরিণ চরছিল ওখানে। শুকনো, হলদেটে ঘাসের ওপর ছোট, সাদা বিন্দুর মতো লাগছিল ওগুলোকে। খানিক তফাতে জেব্রার একটা পালও চোখে পড়ল, সবুজ বনের বিপরীতে সাদা দেখাচ্ছিল ওদের।
পাহাড়ের পাশে বিশাল বৃক্ষের নিচে চমৎকার একটা ক্যাম্প এটা। সুপেয় পানি আছে, আর আছে খানিক দূরে প্রায় শুকনো একটা কুয়া যেখানে সকালবেলা বালিহাঁস উড়ে বেড়ায়।
‘বই পড়ে শোনালে খুশি হবে?’ মহিলা জিজ্ঞেস করল। খাটিয়ার পাশে একটা ক্যানভাসের চেয়ারে বসে আছে সে। ‘হাওয়া দিচ্ছে দেখ।’
‘লাগবে না।’
‘হয়তো ট্রাকটা আসবে।’
‘নিকুচি করি। ট্রাক এলো কি এলো না কিছু আসে যায় না আমার।’
‘আমার এসে যায়।’
‘আমি দু’পয়সার দাম দেই না এমন অনেক কিছুকেই গুরুত্ব দাও তুমি।’
‘সেরকম খুব বেশি কিছু নেই হ্যারি।’
‘একটু মদ গিললে কেমন হয়?’
‘ক্ষতি হবে তোমার। বø্যাকের বইতে সবরকমের মদ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। একদম ঠিক হবে না মদ খাওয়া।’
‘মোলো!’ হেঁকে উঠল সে।
‘জ্বি বাওয়ানা।’
‘হুইস্কি সোডা নিয়ে আয়।’
‘আনছি বাওয়ানা।’
‘ঠিক হচ্ছে না,’ মহিলা বলল। ‘হাল ছেড়ে দেয়া বলতে এটার কথাই বুঝিয়েছি। বইয়ে বলেছে তোমার জন্য এটা খারাপ, আমিও জানি খারাপ।’
‘উঁহু, আমার জন্য ভালো।’
এবং এখানেই সবকিছুর শেষ, মনে মনে ভাবল সে। এটাকে শেষ করার আর কোনো সুযোগ সে পাবে না। এভাবেই শেষ হচ্ছে ব্যাপারটা, মদ খাওয়া নিয়ে মনকষাকষির মধ্য দিয়ে। ডান পায়ে গ্যাংগ্রিন শুরু হবার পর থেকে কোনো ব্যাথা অনুভব করেনি সে। ব্যাথা যেহেতু নেই আতঙ্কও নেই। এখন আছে কেবল ভীষণ একটা ক্লান্তি আর রাগ। সবকিছুর শেষ এখানে, রাগটা এজন্যই।
‘এখন’ ব্যাপারটা যে আসছে শেষমেষ সে নিয়ে তেমন কৌতূহল নেই তার। লম্বা একটা সময় মনের মধ্যে গেঁড়ে ছিল ব্যাপারটা, কোনো মূল্য নেই এখন আর। প্রবল ক্লান্তি কী অদ্ভুত রকমের সহজই না করে দিয়েছে সব। এতদিন মনের মধ্যে জমিয়ে রেখেছিল অনেক কিছু, ভেবেছিল ভালোভাবে লেখার মতো যথেষ্ট জানলে লিখবে একদিন-সেদিন আর কখনও আসবে না। লিখতে গিয়ে ব্যর্থ হবার আশঙ্কাও তাহলে আর থাকল না। হয়তো এসব কোনোদিন লেখা যায় না, লিখবে লিখবে করেও তাই লেখা আর শুরু করে না কেউ। ব্যাপারটা কি আসলেই তাই? সে আর জানবে না কোনোদিন।
‘যদি কখনও না আসতাম এখানে!’ মহিলা বলল। হাতে গ্লাসটা ধরা তার, তাকিয়ে আছে হ্যারির দিকে, ঠোঁট কামড়ে আছে। ‘প্যারিসে থাকলে এ ধরনের কিছু ঘটত না। সবসময় বলতে প্যারিসকে ভালোবাসো। সেখানে থাকতে পারতাম, অথবা যেতে পারতাম অন্য যেকোনো জায়গায়। তুমি যেখানে চাইতে সেখানেই যেতাম। শিকার করতে চাইলে হাঙ্গেরিতে যেতে পারতাম, আরামে থাকতাম।’
‘তোমার জঘন্য টাকাপয়সা!’ সে বলল।
‘এটা কিন্তু ঠিক না,’ মহিলা বলল। ‘টাকাটা আমার যতটা তোমারও তাই। সব ছেড়েছুড়ে এসেছি আমি, তুমি যেখানে চেয়েছ সেখানেই গিয়েছি, যা যা করতে চেয়েছ তাই করেছি। তারপরও কেবলই মনে হয়, কেন যে এলাম এখানে!’
‘তুমি বলেছিলে জায়গাটা তোমার পছন্দ।’
‘যখন তুমি ভালো ছিলে তখন বলেছি। কিন্তু এখন ঘৃণা করি জায়গাটাকে। তোমার পায়েই কেন ঘটতে হবে এটা ভেবে পাই না। এমন কী করেছি যে আমাদের কপালেই ঘটল এটা!’
‘আমার অপরাধ হচ্ছে প্রথম যখন আঁচড় দিলাম আয়োডিন লাগাতে ভুলে গিয়েছিলাম। সংক্রমণ না ঘটায় তারপর আর খেয়াল করিনি ওটার দিকে। যখন খারাপ হতে শুরু করল, অন্য অ্যান্টিসেপটিকগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় আজেবাজে একটা কার্বলিক সল্যুশন লাগিয়েছিলাম-ভালোর চেয়ে খারাপ হয়েছে তাতে। ছোট রক্তনালীগুলোকে অবশ করে ফেলেছিল সেটা, পচনও শুরু হয়েছে তাতেই।’ মহিলার দিকে তাকাল সে। ‘আর কিছু?’
‘আমি ওটা বোঝাইনি।’
‘হতচ্ছাড়া ঐ কিকুয়ু ড্রাইভারটার বদলে ভালো একজন মেকানিককে পেলে সময়মত ট্রাকের তেল পরীক্ষা করত সে, বেয়ারিংটা জ্বালিয়ে দিত না।’
‘সেটা বোঝাইনি আমি।’
‘যদি তুমি নিজের লোকদের ছেড়ে না আসতে! আমার কাছে আসার জন্য পাম বিচের ওল্ড ওয়েস্টবেরি সারাটোগার জঘন্য লোকগুলোকে ছেড়ে না আসতে!’
‘আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম! এভাবে বলো না। তোমাকে ভালোবাসি। সবসময়ই বাসব। তুমি বাসো না?’
‘না,’ লোকটা বলল। ‘বাসি না। কখনো বাসিনি।’
‘হ্যারি, কী বলছ এসব? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার?’
‘না। খারাপ হবার মতো কোনো মাথা নেই আমার।’
‘মদ খেয়ো না,’ মহিলা বলল, ‘দয়া করে খেয়ো না সোনা। সাধ্যের মধ্যে সবকিছুই করতে হবে আমাদের।’
‘তুমি করো। আমি ক্লান্ত।’

মনের চোখে কারাগাচের একটা রেলওয়ে স্টেশনকে দেখল সে। সিম্পলন-ওরিয়েন্ট ট্রেনের হেডলাইন অন্ধকার বিদীর্ণ করে এগিয়ে আসছে। ঝোলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, থ্রেস ছেড়ে চলে যাচ্ছে সেনা প্রত্যাহারের পর। লেখার জন্য যেসব ঘটনাকে বেছে রেখেছিল তার মধ্যে এটা একটা, আর সকালের নাস্তার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে বুলগেরিয়ার তুষারাবৃত পর্বত দেখা, ন্যানসেনের সেক্রেটারির বুড়ো মানুষটির কাছে জানতে চাওয়া ওটা তুষার কিনা এবং বুড়ো মানুষটার বাইরের দিকে তাকিয়ে জানানো-না, এটা তুষার নয়, তুষার পড়বে আরো পরে। তারপর অন্য মেয়েদের উদ্দেশে সেক্রেটারির মন্তব্য-উঁহু, এটা তুষার না, তখন সবার সমস্বরে বলা, এটা তুষার না, আমাদের ভুল হয়েছে। অথচ তুষারই ছিল ওটা এবং জনসংখ্যা বিনিময়ের বুদ্ধিটা বের করার পর ওখানেই তাদেরকে পাঠিয়েছিল সে; সেই শীতে, মৃত্যুর আগ অব্দি সেই তুষারকেই পায়ে দলেছিল তারা।
সে বছর বড়দিনের গোটা সপ্তাহ জুড়ে গোর্তালে যা পড়েছিল সেটাও তুষারই। সে বছর কাঠুরের বাড়িতে থেকেছিল তারা। ঘরটার অর্ধেক দখল করে রেখেছিল পোর্সেলিনের চারকোনা বড় একটা স্টোভ, তারা ঘুমাতো বিচ গাছের পাতায় ভরা গালিচায়, আর এর মধ্যেই একদিন সেনাবাহিনী থেকে পালানো লোকটা এসেছিল তুষারে রক্তাক্ত পা ফেলে। বলেছিল পুলিশ তাকে ধাওয়া করছে। তাকে উলের মোজা দিয়েছিল তারা, সেনা পুলিশদেরকে কথায় কথায় আটকে রেখেছিল তার পায়ের চিহ্নগুলো ঢেকে যাওয়া পর্যন্ত। বড়দিনের দিন স্ক্রাঞ্জ-এ তুষারকে এত উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল যে শুঁড়িখানা থেকে কেউ গির্জা থেকে বাড়িমুখো মানুষগুলোকে এক এক করে দেখার চেষ্টা করলে চোখ জ্বালা করত। আর ওখানেই কাঁধে ভারি স্কি নিয়ে স্লেজগাড়ির ঘষায় মসৃণ আর পেচ্ছাপে হলুদ রাস্তা ধরে হাঁটত তারা। পাশেই নদী, তারপর পাইন গাছে ভরা খাড়া পাহাড়। মেডলেনারহাউসের ওপরের হিমবাহ থেকে যে জায়গাটা দিয়ে তারা দৌড়ে নামত সেখানে তুষারকে মনে হতো কেকের ওপরের বরফের আস্তরণের মতো মসৃণ আর পাউডারের মতো হালকা। পাখির মতো যখন উপর থেকে নিচে নেমে আসত সে, কোনো শব্দ হতো না, গতিময় সেই নৈঃশব্দ্যের কথা মনে পড়ল তার। সেবার প্রবল তুষারঝড়ে গোটা একটা সপ্তাহ মেডলেনারহাউসে আটকা পড়েছিল তারা। সময় কাটিয়েছিল লণ্ঠনের আলোয় ধোঁয়াভর্তি কক্ষে তাস খেলে, হের লেন্ট-এর হারের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চড়ছিল বাজির দর। শেষে ফতুরই হয়ে গেল একদম। স্কি স্কুল থেকে পাওয়া টাকা, সে বছরের সমস্ত মুনাফা এবং নিজের পুঁজিও। লোকটাকে যেন চোখের সামনে দেখতে পেল সে, লম্বা নাক, কার্ড তুলছে এবং বাজি ধরছে, না দেখেই। সেবার পুরোটা সময় কেবলই জুয়া। তুষার না পড়লে জুয়া, খুব বেশি পড়লেও জুয়া। জুয়া খেলে কাটানো জীবনের সময়গুলোর কথা ভাবল সে। অথচ একটা লাইনও লিখেনি সে সম্বন্ধে, লিখেনি সেই ঠান্ডা, উজ্জ্বল বড়দিন সম্বন্ধেও। সমভূমির ওপারে পর্বতের সারি, শত্রু এলাকায় উড়ে গিয়ে ট্রেন থেকে নামা অস্ট্রিয়ান অফিসারদের ওপর বোমা ফেলেছিল বার্কার, তারপর দিশা হারিয়ে দিগি¦দিক ছুটতে থাকা লোকগুলোকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল মেশিনগানের গুলিতে। মনে পড়ল, মেসে ফিরে ঐ ঘটনার বয়ান দিতে শুরু করেছিল বার্কার। শুনশান নীরবতা নেমে এসেছিল, তারপর কেউ একজন বলেছিল, ‘বেজন্মা খুনি একটা তুমি, শালা!’ সেই একই অস্ট্রিয়ানদেরই খুন করেছিল তারা, যাদের সঙ্গে স্কি চালিয়েছিল পরে। না, একই লোক নয়। যার সঙ্গে গোটা বছর ধরে স্কি চালিয়েছিল সে সেই হ্যান্স ছিল কাইজারজ্যাগারের সদস্য এবং দুজন যখন করাতকলের উপরের ছোট উপত্যকাটিতে একসঙ্গে খরগোশ শিকারে যেত, পাসুবিওর যুদ্ধ আর পার্টিসারা ও আসালোনে আক্রমণের গল্প করত সে। এ সম্বন্ধেওতো একটা শব্দও লিখেনি। লিখেনি মন্টে করোনা, সেত্তে কমিউনির বা আরসিয়েরিওর কথাও। ক’টা শীতকাল কাটিয়েছে সে ভোরালবার্গ আর আর্লবার্গে? চারটি। মনে পড়ল সেই লোকটার কথা, যেবার তারা উপহার কেনার জন্য ব্লাদেঞ্জ-এ ঢুকেছিল তাদের কাছে শেয়াল বেচতে এসেছিল যে লোকটা। ভালো কার্শ মদের সেই চেরিফলের দানার মতো স্বাদ, বরফের আবরণের ওপর তুষারচূর্ণের গড়িয়ে পড়া, তাদের হেঁড়ে গলার গান, ‘হাই! হো! কে বলে? রলি!’ হুড়োহুড়ি করে খাড়া জায়গাটার শেষ অংশটা বেয়ে নামা, তারপর তিন পাকে আঙ্গুরবাগান আর বাইরের গড়খাই পার হয়ে সোজা সরাইখানার পেছনের বরফে ঢাকা রাস্তায়। দড়াদড়ি সরিয়ে স্কি-গুলোকে পা থেকে খুলে সরাইখানার কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসা লণ্ঠনের আলো আর ধোঁয়া আর মদের গন্ধভরা উষ্ণতার মধ্যে ভেতরে তখন অ্যাকর্ডিয়ন বাজছে।

‘প্যারিসে কোথায় ছিলাম আমরা?’ এখন, আফ্রিকাতে তার পাশে ক্যানভাসের চেয়ারে বসা মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করল সে।
‘ক্রিলোঁ-তে। তুমিতো জানোই।’
‘কীভাবে জানি?’
‘কারণ ওখানেই সবসময় থাকি আমরা।’
‘উঁহু, সবসময় না।’
‘ওখানে আর সাঁ জারমেইনে প্যাভিলিয়ন আঁরি-কোঁয়ার্তেতে। বলেছিলে ওখানে তোমার ভালো লাগে।’
‘ভালো লাগা একটা গোবরের গাদা আর আমি হচ্ছি সেই মোরগ যে ওখানে ওঠে কোঁ কোঁ করার জন্য।’
‘যদি যেতেই হয়,’ মহিলা বলল, ‘পেছনের সবকিছুকে মেরে যেতে হবে? বলতে চাচ্ছি, সবকিছু নিয়েই চলে যেতে হবে? খুন করতে হবে নিজের ঘোড়া আর বৌকে? পুড়িয়ে ফেলতে হবে ঘোড়ার জিন আর বর্ম?’
‘হ্যাঁ,’ সে বলল। ‘তোমার হতচ্ছাড়া টাকা ছিল আমার বর্ম। তলোয়ার এবং বর্ম।’
‘ওভাবে বোলো না।’
‘ঠিক আছে। থামলাম। তোমাকে আঘাত দিতে চাই না।’
‘থামার জন্য দেরি হয়ে গেছে একটু।’
‘ঠিক আছে। তাহলে বরং আঘাত দিতে থাকি। এতেই আনন্দ বেশি। তোমার সঙ্গে একমাত্র যে কাজটি করতে ভালো লাগত সেটা আর করতে পারছি না এখন।’
‘উঁহু, এটা ঠিক না। অনেক কিছুই করতে ভালো লাগত তোমার এবং যা যা করতে চাইতে আমি তার সবই করতাম।’
‘উহ্, খোদার দোহাই, বড়াই করা থামাও।’
তার দিকে তাকিয়ে দেখল, কাঁদছে।
‘শোনো,’ লোকটা বলল, ‘তোমার কি মনে হয় এসব করে মজা পাচ্ছি আমি? নিজেই জানি না কেন এসব করছি। হয়তো নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে আর কাউকে মারার মতো ব্যাপারটা। আমি এটা শুরু করতে চাইনি, আসলে পাগলা বুড়োর মতো হয়ে গেছি। চেষ্টা করছি যত বেশি সম্ভব নিষ্ঠুরতা দেখাতে তোমার সঙ্গে। পাত্তা দিও না আমার কথায়, সোনা। আসলে তোমাকে ভালোবাসি, তুমি জানো সেটা। এত ভালো আর কাউকে বাসিনি।’
পরিচিত সেই মিথ্যায় ফিরে গেল সে যে মিথ্যা তার পেটের খোরাক জুগিয়ে এসেছে।
‘খুব মিষ্টি আচরণ করছ আমার সঙ্গে।’
‘কুত্তী,’ সে বলল, ‘ধনী কুত্তী তুমি একটা। এটা কবিতা। এ মুহূর্তে কবিতা একেবারে টগবগ করছে আমার মধ্যে। আবর্জনা আর কবিতা। আবর্জনায় ভরা কবিতা।’
‘থামো, হ্যারি। শয়তান হয়ে উঠতে হবে কেন তোমাকে?’
‘কিছু রেখে যাওয়া পছন্দ না আমার,’ লোকটা বলল। ‘কিছুই রেখে যেতে চাই না।’

* * *

এখন বিকেল, ঘুমিয়ে ছিল সে। সূর্যটা অস্ত গেছে পাহাড়ের পেছনে। ছায়া পড়েছে সমভূমির এমাথা থেকে ওমাথা, ছোট প্রাণীগুলো ক্যাম্পের আশেপাশে চরছে, হুটহাট নেমে যাচ্ছে মাথা, লেজ নড়ছে এদিক সেদিক। জঙ্গল থেকে দূরে সরে থাকছে তারা, খেয়াল করল সে। পাখিগুলোও মাটিতে অপেক্ষা করে নেই। একটা গাছের ডালে বসে আছে সবগুলো। সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে এখন। তার নিজের ভৃত্য বসে আছে বিছানার পাশে।
‘মেমসাহেব শিকারে গেছেন,’ ছেলেটি বলল। ‘বাওয়ানাও যেতে চান?’
‘উঁহু।’
একটুকরো মাংস শিকার করতে গেছে মহিলা। যেহেতু সে জানে বন্য প্রাণী দেখতে পছন্দ করে হ্যারি এজন্য বেশ দূরে চলে গেছে যাতে সমভূমির একটেরে এই ছোট্ট জায়গার পুরোটাই দেখতে পারে সে। মহিলা সবসময়ই বুঝদার, ভাবল সে। যা যা জেনেছে, পড়েছে বা শুনেছে কখনো না কখনো-সবকিছুর ব্যাপারেই। এ দোষ তো তার নয় যে যতদিনে সে মহিলার কাছে গিয়েছে ততদিনে আর কিছুই করার নেই। একটা মেয়ে কীভাবে জানবে যা তুমি বলো তার কিছুই বোঝাও না, কথা বলো স্রেফ অভ্যাসের বশে, আরামের জন্য? তার সব কথাই যখন অর্থহীন হয়ে গেল তখন মেয়েদের কাছে সত্য বলার চেয়ে মিথ্যে বলারই ফায়দা বেশি ছিল।
সে মিথ্যে বলত এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আসলে বলার মতো কোনো সত্য ছিল না। জীবন পুরোপুরিই পেয়েছে সে, শেষও হয়ে গেছে ওটা, তারপর অন্য মানুষ এবং আরো বেশি টাকার মধ্যে, সেই একই তবে সেরা জায়গাগুলোতে-সঙ্গে নতুন আরো কিছু জায়গায়-আবার কাটিয়েছে জীবনটা।
ভাবনা থেকে দূরে ছিলে, এ কারণে সবকিছুই ছিল চমৎকার। ভেতরটা ঠিকঠাক ছিল, ফলে বেশিরভাগ মানুষ যেভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সেটা তোমাকে হতে হয়নি। এমন একটা ভাব করেছিলে, যে কাজগুলো তোমাকে করতে হয় তার দু-পয়সা দামও নেই তোমার কাছে, যেহেতু তার কোনোটিই তোমাকে করতে হয় না এখন আর। তবে নিজেকে বলেছিলে, একদিন লিখবে, ভীষণ ধনী এসব মানুষকে নিয়ে; বলেছিলে, তুমি তাদের একজন নও, বরং তাদের দেশে একজন গুপ্তচর; বলেছিলে, এদেশ ছেড়ে যাবে তুমি, লিখবে এসব নিয়ে এবং এই প্রথমবারের মতো এমন কারো হাতে এটি লেখা হবে যে জানে সে কী লিখছে। কিন্তু সেটি আর কখনোই করা হবে না কারণ প্রতিটি দিনের না লেখা, এই আয়েশ, সে যা নয় সেটি হওয়ার ব্যাপারে বিতৃষ্ণা তার সমস্ত সামর্থ্যকে ভোঁতা করে দিয়েছে, দুর্বল করে দিয়েছে তার কর্মস্পৃহাকে, ফলে শেষমেষ কোনো কাজই আর সে করল না।
পরিচিতেরা খুব স্বস্তি পেল সে কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়ায়। জীবনের সুন্দর দিনগুলোতে আফ্রিকাই ছিল সে জায়গা যেখানে সবচেয়ে সুখী ছিল সে, এ কারণে নতুন করে সব শুরু করার জন্য বেছে নিল আফ্রিকাকেই। শিকারের এই অভিযানটি খুব কম পরিশ্রমেই সাজিয়েছে তারা। ঝামেলা বলতে যেমন কিছু ছিল না তেমনি বিলাসিতাও নয়। তার ভাবনা ছিল, এভাবেই প্রশিক্ষণটা ঝালাই করে নিতে পারবে। আত্মা থেকে সরিয়ে ফেলতে পারবে চর্বি, যোদ্ধারা যেভাবে পর্বতে গিয়ে ঘাম ঝরায় আর প্রশিক্ষণ নেয় যাতে শরীর থেকে ঝরিয়ে ফেলতে পারে মেদ। মহিলাটিও পছন্দ করেছিল, বলেছিল ভালো লেগেছে এটি তার। রোমাঞ্চ জাগায় এমন সবকিছুই পছন্দ তার, দৃশ্যকে যা বদলায়, যেখানে নতুন মানুষ আছে, সবকিছু ছিমছাম আর সুন্দর। কর্মস্পৃহা ফিরে পাবার একটা বিভ্রম সেও অনুভব করেছিল। এখন সবকিছু যদি এভাবেই শেষ হয়-জানে সে এভাবেই শেষ হবে-সেক্ষেত্রে সাপের মতো পেছন ফিরে নিজেকে কামড়ানো ঠিক হবে না তার, কারণ পেছনটা ভেঙে গেছে। দোষটা মহিলার নয়, সে না হয়ে অন্য কোনো মহিলা হলেও একই ব্যাপার হতো। মিথ্যা নিয়ে বেঁচে থাকলে মিথ্যাকে নিয়েই মরার চেষ্টা করা উচিত।
পাহাড়ের পেছনে গুলির শব্দ হলো একটা। খুব ভালো আর ধনী এই কুত্তি, এই দয়ালু তত্ত্বাবধায়ক। তার সমস্ত মেধা ধ্বংসকারী মহিলাটি বন্দুক চালায় চমৎকার। বাজে কথা। নিজের মেধা সে নিজেই ধ্বংস করেছে। মহিলাকে কেন দোষ দিচ্ছে? তাকে দেখেশুনে রেখেছে এজন্য? নিজের মেধাকে সে ধ্বংস করেছে মেধা ব্যবহার না করে, নিজের সঙ্গে এবং যা যা বিশ্বাস করে সবকিছুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, অতিরিক্ত মদ গিলে নিজের অনুভূতিশক্তিকে ভোঁতা করে দিয়ে, অলসতা, কুঁড়েমি, নাক উঁচু ভাব, অহঙ্কার আর সংস্কারে। কী এসব? পুরনো বইয়ের তালিকা? তার মেধাটা আসলে কোথায়? হুম, মেধা আছে বটে, তবে ব্যবহার নয়, অপব্যবহার করেছে সে। যা করেছে কোনো দাম নেই তার, যা করতে পারত তাই দামি। কলম-পেন্সিল বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে বেছে নিয়েছে পেট চালানোর জন্য। এটাও কি তাজ্জব ব্যাপার নয় যে এক মহিলাকে বাদ দিয়ে যখনই আরেকজনের প্রেমে পড়েছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে আগেরজনের চেয়ে পরেরজনের কাছেই টাকাপয়সা বেশি ছিল? কিন্তু যখন আর প্রেমে পড়ছিল না, কেবল মিথ্যে বলছিল-যেমন এই মহিলার কাছে, তখন সবচেয়ে বেশি ধনী হলো কিনা এই মহিলাই! টাকাপয়সার কমতি নেই, স্বামী-সন্তান সবই ছিল, তারপরও একের পর এক প্রেমিক বেছে নিয়েছে এবং শেষমেষ কাউকেই পছন্দ করেনি। যে তাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছে, লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, সঙ্গী এবং গর্ব করার মতো সম্পত্তি হিসেবে। আজব ব্যাপার হচ্ছে, তার প্রতি হ্যারির যখন আর একবিন্দুও ভালোবাসা ছিল না এবং লাগাতার মিথ্যা বলছিল তার সঙ্গে তখনই মহিলার টাকার বিনিময়ে সর্বোচ্চটুকু দিতে পেরেছে সে-ভালোবাসা যখন ছিল তখন যা পারেনি।
যা করি তার জন্য যোগ্য হওয়া উচিত আমাদের, ভাবল সে। রুটি রুজির ব্যবস্থা করা যায় যা দিয়ে মেধাও থাকা উচিত তাতেই। নিজের জীবনীশক্তিকে বিক্রি করেছে সে গোটা জীবন, একভাবে নয়তো অন্যভাবে আর মায়ামমতার বাঁধনটি যখন সবচেয়ে আলগা হয়ে এসেছে, টাকার বিনিময়ে নিজের সেরাটা দিতে পারছে তখনই। উপলব্ধিটা এসেছে বটে, তবে এ নিয়েও কোনোদিন লিখবে না সে।
না, লিখবে না, যদিও ব্যাপারটা লেখার মতো।
ঐযে দেখা যাচ্ছে তাকে, খোলা জায়গাটা পার হয়ে ক্যাম্পের দিকে আসছে। যোধপুরী পাজামা পরনে, ঘাড়ে বন্দুক। ছেলে দুটো পেছন পেছন আসছে, ওদের ঘাড়ে একটা হরিণ। এখনও দেখতে দারুণ মহিলাটা, লোকটা ভাবল। শরীরটাও তাকিয়ে থাকার মতো। মেধা আর সমঝদারির স্বাক্ষর রেখেছে বিছানাতেও, দেখতে অতটা ভালো না হলেও চেহারাটা তার পছন্দ। প্রচুর পড়াশোনা করে, ঘোড়ায় চড়তে আর বন্দুক চালাতে ভালোবাসে আর মদ গিলতে পারে এন্তার। স্বামী মারা গেছে অল্প বয়সেই। তারপর কিছুদিন যত্ন করে দেখাশোনা করেছিল বাচ্চাদের, বাচ্চারা যদিও তাতে বিব্রত হতো এবং মাকে তাদের দরকারও ছিল না। আস্তাবলের ঘোড়া, বইপত্র আর মদের বোতলেও মন ঢেলে দিয়েছিল সে। ভালোবাসত রাতের খাবারের আগে বই পড়তে, পড়তে পড়তে চুমুক দিত স্কচ আর সোডায়। রাতের খাবারের সময় আসতে আসতে প্রায় পুরো মাতাল, খাবার শেষে আরেক বোতল গিলতেই ঘুমানোর জন্য যথেষ্ট মাতাল।
এটা ছিল তার প্রেমিক-পর্বের আগের কথা। দৃশ্যপটে প্রেমিকরা চলে আসার পর খুব বেশি মদ খেত না কারণ ঘুমানোর জন্য মাতাল হবার প্রয়োজন পড়ত না আর। অবশ্য প্রেমিকরা একঘেয়েমির জন্ম দিত। স্বামীকে নিয়ে একঘেয়েমির শিকার হতো না সে, এই লোকগুলোকে নিয়ে হতো। তারপর দুই সন্তানের একজন বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেল এবং এ ঘটনার পর প্রেমিকদের প্রয়োজনও ফুরাল তার। ঘুম পাড়ানিয়া হিসেবে মদের উপযোগিতা আর না থাকায় আরেকটি জীবন তৈরির দরকার হলো। হঠাৎই প্রচণ্ড ভয় পেতে শুরু করল নিঃসঙ্গতাকে। খুঁজতে শুরু করল এমন কারো সঙ্গ যাকে সে সম্মান করতে পারবে।
শুরুটা হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। মানুষটা যাই লিখত তার ভালো লাগত, ঈর্ষা করত তার জীবনযাপনকে। মনে হতো সে যা চায় তাই করতে পারে। যে ধাপগুলো পার হয়ে তাকে বগলদাবা করল এবং যেভাবে শেষমেষ তার প্রেমে পড়ল সবই ছিল স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়ার অংশ যেখানে নিজের জন্য নতুন একটা জীবন গড়ে নিল সে আর লোকটা তার পুরনো জীবনের যেটুকু বাকি ছিল সেটিকে বিসর্জন দিল। সন্দেহ নেই নিরাপত্তা আর আরামের জন্যই এটা করেছিল সে, নাকি আর কিছুর জন্য? জানে না সে। সে যা চায় মহিলা তাই কিনে দেবে, জানা ছিল তার, সত্যিই ভীষণ ভালো ছিল মহিলা। অন্যদের সঙ্গে যেমন তেমনি এই মহিলার সঙ্গেও বিছানায় যাবার ব্যাপারে এক পায়ে খাড়া ছিল সে। কারণটা সহজ। তার পয়সা ছিল বেশি, মানুষ হিসেবে ভালো, সমঝদার এবং কখনোই ঝামেলা পাকাত না। এবং এখন, নতুন যে জীবনটি মহিলা তৈরি করেছে সেটিও এগোচ্ছে সমাপ্তির দিকে কারণ দু’হপ্তা আগে, তারা যখন ওয়াটারবাক হরিণের একটা দলের ছবি তোলার জন্য এগোচ্ছিল এবং হরিণগুলো যখন মাথা উঁচিয়ে ইতিউতি তাকাচ্ছিল, বাতাসের গন্ধ শুঁকছিল তাদের নাসারন্ধ্র, কানদুটো ছিল সেই শব্দ শোনার জন্য উন্মুখ যা তাদের ভোঁ দৌড়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাবার সংকেত দেবে, তখনই একটা কাঁটা হাঁটুতে ঘষা দিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে আয়োডিন লাগাতে ভুলে গিয়েছিল সে।
সে ছবি তোলার আগেই ঠিকই পালিয়ে গিয়েছিল হরিণগুলো।
ঐ আসছে মহিলা। খাটিয়ায় শুয়েই ঘাড় ফেরাল সে তাকে দেখার জন্য। ‘কী খবর?’
‘হরিণ মেরেছি একটা,’ মহিলা বলল। ‘ভালো স্যুপ হবে, গুঁড়োদুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার জন্য কয়েকটা আলুও চটকে দিতে বলব ওদেরকে। কেমন বোধ করছ?’
‘আগের চেয়ে অনেক ভালো।’
‘বাহ! আমারও তাই মনে হয়েছিল। তুমি ঘুমোচ্ছিলে আমি যাওয়ার সময়।’
‘ঘুমটা খারাপ হয়নি। খুব বেশি দূরে গিয়েছিলে?’
‘না। স্রেফ পাহাড়ের পেছনটাতে। হরিণটা মারার সময় তাকটা খুব ভালো হয়েছিল।’
‘ভালো গুলি ছোঁড়ো তুমি।’
‘আমার ভালো লাগে। আফ্রিকাকেও ভালো লেগেছে। তোমার অসুস্থ হওয়াটা বাদ দিলে এত মজা কোনোদিন করিনি। তোমার সঙ্গে গুলি ছুঁড়তে কি আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। দেশটা সত্যিই ভালো লেগেছে আমার।’
‘আমারও।’
‘এই যে তোমার ভালো লাগছে তাতে কী খুশি যে হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না সোনা। তোমার খারাপ লাগা সহ্য করতে পারি না একদম। বলো ওভাবে আর কখনও কথা বলবে না আমার সঙ্গে? কথা দাও?’
‘ঠিক আছে,’ সে বলল। ‘কী বলেছি আমার খেয়ালও নেই।’
‘আমাকে তোমার ধ্বংস করে দেয়ার দরকার নেই, আছে? মাঝবয়েসী একটা মহিলা আমি, যে তোমাকে ভালোবাসে এবং তুমি যা চাও তাই করতে চায়। এরই মধ্যে দু-তিনবার ধ্বংস হয়ে গেছি। নিশ্চয়ই একই কাজ তুমিও করতে চাও না। চাও?’
‘বিছানায় আরো কয়েকবার ধ্বংস করতে চাই তোমাকে,’ সে বলল।
‘হুঁ। ওটা হচ্ছে সুন্দর ধ্বংস। ওভাবে ধ্বংস হবার জন্যই বানানো হয়েছে আমাদের। বিমান কাল আসবে।’
‘তুমি কীভাবে জানো?’
‘আমি নিশ্চিত। আসতে বাধ্য। ছেলেরা কাঠ-টাঠ সব জড়ো করে রেখেছে, ঘাসও, আগুন লাগানোর জন্য। আমি গিয়ে দেখে এসেছি। বিমান নামার জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে, ঘাসবিচালিও প্রস্তুত করা আছে দুই প্রান্তে।’
‘ওটা যে কাল আসবে কীভাবে জানলে?’
‘আমি নিশ্চিত। আসার সময় এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে। শহরে নিয়ে গেলে তোমার পা ঠিক করবে ওরা। তারপর দুজনে মিলে ইচ্ছেমতো সুন্দর ধ্বংসটা করতে পারব। তুমি যেভাবে বাজেভাবে বলো সেভাবে নয়।’
‘এসো কয়েক চুমুক মদ গেলা যাক। সূর্য অস্ত গেছে।’
‘তুমি নিশ্চিত তোমার খাওয়া উচিত?’
‘খাব।’
‘ঠিক আছে, একসঙ্গে খাব তাহলে। মোলো, দুটো হুইস্কি-সোডা!’ গলা চড়াল মহিলা।
‘মশানিরোধক জুতোগুলো পরা উচিত তোমার।’
‘স্নান পর্যন্ত অপেক্ষা করব।’
সন্ধ্যা নামার পর মদ খেলো দুজন। চারদিক অন্ধকারে ঢেকে যাবার ঠিক আগে-বন্দুক ছোঁড়ার জন্য যখন আর যথেষ্ট আলো ছিল না-একটা হায়েনা পাহাড়ের ওপারে যাওয়ার সময় খোলা জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
‘প্রতি রাতে এই কাজটা করে হারামজাদা,’ লোকটা বলল। ‘গেল দুই সপ্তাহ, প্রতিটা রাত।’
‘রাতে শব্দও ওটাই করে। পাত্তা দেই না, যদিও হায়েনা খুব নোংরা প্রাণী।’
একসঙ্গে মদ খেতে খেতে, কেবল একভাবে শুয়ে থাকা ছাড়া পায়ে যখন আর কোনো ব্যাথা অনুভূত হচ্ছিল না, ছোকরাগুলো যখন আগুন জ্বালাচ্ছিল আর আগুনের প্রতিবিম্ব তাঁবুর গায়ে ছোটাছুটি করছিল, মনোরম একটা আত্মসমর্পণের আয়েশ ধীরে ধীরে তার জীবনে ফিরে আসছে বলে মনে হলো তার। মহিলা অনেক করেছে তার জন্য। তার সঙ্গে নিষ্ঠুর আর অন্যায় আচরণ করেছে সে বিকেলে। এত ভালো মেয়েটা, চমৎকার এককথায়। এবং তখনই অনুভূতিটা ফিরে এল, মরতে যাচ্ছে সে।
ভাবনাটা যেন হুড়মুড় করে ঢুকল মনের মধ্যে, পানি বা বাতাসের ঝটকার মতো নয়, দুর্গন্ধেভরা একটা শূন্যতার মতো। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, হায়েনাটা সেই শূন্যতার প্রান্ত ধরে আস্তে করে হেঁটে গেল।
‘কী হয়েছে হ্যারি?’ মহিলা শুধোল।
‘কিছু না। বরং অন্য পাশে এসে বস তুমি। বাতাস যেদিক থেকে আসছে ওদিকে।’
‘মোলো কি তোমার ড্রেসিং বদলে দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ। এখন কেবল বোরিক লাগাচ্ছি।’
‘কেমন বোধ হচ্ছে?’
‘মাথাটা ঝিমঝিম করছে সামান্য।’
‘আমি স্নান করতে যাচ্ছি,’ মহিলা বলল। ‘ফিরছি ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই। একসঙ্গে খাব তারপর খাটিয়াটাকে ভেতরে নিয়ে যাব।’
অতএব, নিজেকে বলল সে, ঝগড়া থামিয়ে ঠিকই করেছি। এ মহিলার সঙ্গে খুব বেশি ঝগড়া সে করেনি, অন্য যেসব মহিলাকে ভালোবেসেছে তাদের সঙ্গে এত বেশি ঝগড়া করেছে যে ঝগড়া বাড়তে বাড়তে দুজনের বানানো সবকিছু মহিলারা নিজেরাই শেষ করে দিয়েছে। বেশি বেশি ভালোবেসেছে সে, বেশি বেশি চেয়েছে আর অতি ব্যবহারে শেষ করেছে সবকিছুকে।

কনস্টান্টিনোপলে একা থাকার সময়গুলোর কথা স্মরণ করল সে, ওখানে যাওয়ার আগে প্যারিসে ঝগড়াঝাঁটি করে এসেছিল। গোটা সময়টা কাটিয়েছিল বেশ্যাদের পেছনে, তারপরও যখন নিঃসঙ্গতার বোধটা পিছু না ছেড়ে উল্টো জেঁকে বসল, সেই মহিলা-তার প্রথমজন, যে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল, তাকে চিঠি লিখল। চিঠিতে জানাল চেষ্টা করেও কীভাবে মুক্ত হতে পারেনি অনুভূতিটা থেকে। জানাল, রিজেন্স-এর সামনে একবার তাকে দেখেছে বলে মনে হবার পর প্রায় মুর্ছা যাবার উপক্রম হয়েছিল তার, অসুস্থ হয়ে পড়েছিল রীতিমতো; বড় রাস্তায় খানিকটা তার মতো দেখতে এক মহিলাকে অনুসরণ করতে শুরু করেছিল, বুকটা এই ভয়ে ধুকপুক করছিল যে আসলে ওটি সে নয়, তাকে দেখার যে অনুভূতি সেটি হারিয়ে ফেলার ভয়ে মুষড়ে পড়েছিল। যত মহিলার সঙ্গে সে শুয়েছে প্রত্যেকে বরং তাকে, অর্থাৎ ঐ মহিলাকে না পাওয়ার বেদনাকে গাঢ়ই করেছে, লিখেছিল এটাও। মহিলা তার সঙ্গে যাই করুক কিছু আসে যায় না, কারণ সে জানে তাকে ভালোবাসার অসুখ থেকে মুক্তি নেই তার, লিখেছিল এটাও। ক্লাবে বসে লিখেছিল চিঠিটা, মাতলামোর ছিঁটেফোটাও ছিল না তার মধ্যে। চিঠিটা পাঠিয়েছিল নিউ ইয়র্কে, অনুরোধ করেছিল জবাবটা যেন প্যারিসে তার অফিসের ঠিকানায় পাঠায়। এ ব্যবস্থাটাকেই মনে হয়েছিল নিরাপদ। সে রাতে মহিলার অভাব এতটাই বেশি অনুভব করেছিল যে মনে হয়েছিল শূন্য হয়ে গিয়েছিল ভেতরটা। হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল ম্যাক্সিম পার হয়ে, একটা মেয়েকে জোগাড় করেছিল তারপর তাকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে গিয়েছিল। পরে একটা জায়গায় নাচতে গিয়েছির মেয়েটাকে নিয়ে। নাচে একবারেই যা তা ছিল মেয়েটা, তাকে ছেড়ে দিয়ে তাই খাসা একটা আর্মেনিয়ান বেশ্যাকে ধরেছিল, বেশ্যাটা তার পেটের সঙ্গে এমনভাবে পেট ঘষেছিল মনে হচ্ছিল ফোসকা পড়ে যাবে। ব্রিটিশ এক গোলন্দাজ সৈনিকের সঙ্গে কাছ থেকে ঝগড়া করে কব্জা করেছিল মেয়েটাকে। সৈনিকটা বাইরে ডেকে নিয়েছিল তাকে, সেখানে অন্ধকারের ভেতর খোয়া বাঁধানো রাস্তায় কুস্তাকুস্তি করেছিল দুজন। লোকটাকে চোয়ালের পাশে দু’বার আঘাত করেছিল সে, তারপরও যখন ব্যাটা ঝুলে রইল, বুঝল, এড়ানোর উপায় নেই মারামারিটা। ওর গায়ে আঘাত করল সৈনিকটা, তারপর চোখের পাশে। বাম হাত ছুঁড়ল সে, লাগলও, তারপরই ওর ওপর হামলে পড়ে ওর কোট আঁকড়ে ধরে এক টানে হাতাটা ছিঁড়ে আনে সৈনিক। লোকটার কানের পেছনে মোক্ষম দুটো ঘুষি বসিয়ে দেয় সে, প্রতিপক্ষ যখন তাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিল তখন ডানহাতেও সপাটে বসিয়ে দেয় একটা। সৈনিকটা মুখ থুবড়ে পড়ার সময় তার মাথাটা সজোরে ঠুকে যায় রাস্তায়। মেয়েটাকে নিয়ে দৌড়ে পালায় সে কারণ মিলিটারি পুলিশ আসার শব্দ শুনতে পেয়েছে দুজনেই। একটা ট্যাক্সিতে ওঠে দুজন, চলে যায় বসফরাসের পার ধরে রিমিলি হিসা-তে, এক চক্কর দিয়ে ঘুরে এসে রাতের ঠাÐা হাওয়া গায়ে মাখে, তারপর চলে যায় বিছানায়। দেখতে যেমন ঠিক তেমনি দারুণ পাকা ছিল মেয়েটি, কিন্তু মসৃণ, গোলাপের পাপড়ির মতো, গাঢ় টসটসে, মসৃণ পেট, পীনোন্নত বুক। নিতম্বের নিচে বালিশ দেয়ার দরকার হয়নি, ঘুম ভেঙে দিনের প্রথম আলোয় মেয়েটাকে মোটা আর কুচ্ছিত দেখানো এড়াতে আগেই কেটে পড়েছিল সে, চলে গিয়েছিল পেরা প্রাসাদে, চোখের নিচে কালসিটে, কোটটা হাতে ধরা কারণ হাতা নেই একটা। সে রাতেই আনাতোলিয়ায় রওনা দিয়েছিল সে। মনে আছে, ভ্রমণের শেষদিকে পপিগাছে ভর্তি একটা মাঠের মধ্য দিয়ে চলেছিল দিনমান, যে গাছগুলো লাগানো হয়েছিল আফিমের জন্য। কেমন অদ্ভুত লাগছিল গোটা ব্যাপারটা। সব দূরত্বকে যখন মনে হচ্ছিল ভুলে ভরা তখনই পৌঁছে গিয়েছিল সেই জায়গাটায়, সবে এসে পৌঁছানো কনস্টান্টাইন সেনা-কর্মকর্তাদের নিয়ে যেখানে আক্রমণ শানিয়েছিল তারা। ব্যাপারটা কী কোনো ধারণাই ছিল না নবাগতদের; গোলন্দাজ বাহিনী গোলা ছুড়েছিল সেনাদের ওপর, দেখে বাচ্চার মতো কাঁদছিল ব্রিটিশ পর্যবেক্ষক। জীবনে সেদিনই প্রথম মৃত সৈন্যদের দেখেছিল সে, গায়ে সাদা রঙের ব্যালে স্কার্ট আর পায়ে পমপম বসানো ওল্টানো জুতো ছিল লাশগুলোর।
তুর্কিরা এসেছিল ধীরস্থিরভাবে, তবে তেঁড়েফুড়ে। স্কার্ট পরা মানুষগুলোকে দৌড়ে পালাতে দেখেছিল সে। অফিসাররা গুলি ছুঁড়ছিল তাদের ওপর, তারপর নিজেরাও পালাচ্ছিল প্রাণ নিয়ে। সে আর ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকও উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়েছিল ফুসফুস ব্যাথায় ফেটে যাবার উপক্রম হওয়া পর্যন্ত। মুখের মধ্যে যেন পয়সার স্বাদ, কতগুলো পাথরের পেছনে গা ঢাকা দিয়েছিল দুজন। ওদিকে তুর্কিরা আগের মতোই আসছিল কুঁদতে কুঁদতে। এমন সব দৃশ্য সেদিন দেখেছিল কোনোদিন কল্পনাও করেনি যার কথা, তারপর দেখেছিল তার চেয়েও খারাপ কিছু। কাজেই সেবার যখন প্যারিসে ফিরে গেল, এসব সম্বন্ধে কোনো কথাই বলতে পারত না, তার সামনে কেউ এসবের কথা উল্লেখ করলেও সহ্য করতে পারত না। ওখানে এক ক্যাফের সামনে দিয়ে যাবার সময় আমেরিকান এক কবিকে দেখতে পেল, সামনে পিরিচের স্তূপ নিয়ে বসে আছে, আলুর মতো চেহারায় বোকা বোকা ভাব। দাদা আন্দোলন নিয়ে এক রোমানীয়র সঙ্গে কথা বলছিল লোকটা, যে নিজের পরিচয় দিচ্ছিল ত্রিস্তান জারা হিসেবে, সবসময় একচোখো একটা চশমা পরে থাকত লোকটা আর তার মাথাটা ব্যাথা করত সর্বক্ষণ। অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আবার বৌয়ের সঙ্গে, যেহেতু ততদিনে আবারও ভালোবেসেছে সে, ঝগড়াও করেছে, আবারও সেই একই পাগলামি-বাড়িতে ফিরতে পেরে খুশি, অফিস থেকে তার চিঠিগুলো পাঠানো হয়েছিল বাড়িতে। তার লেখা চিঠির জবাব ট্রেতে করে এলো এক সকালে, হাতের লেখাটা চিনতে পেরে শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল তার, আরেকটা চিঠির নিচে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল ওটাকে। কিন্তু তার স্ত্রী বলল, ‘কার চিঠি, সোনা?’ এবং সেটিই ছিল সে ব্যাপারটার শেষের শুরু। তাদের সবার সঙ্গে কাটানো ভালো সময়গুলোর কথা স্মরণ করল সে, ঝগড়াঝাঁটির কথাও। ঝগড়া করার জন্য বরাবরই সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলো বেছে নিত তারা। সবচেয়ে খোশমেজাজে থাকার সময়টাতেই কেন ঝগড়া শুরু করত তারা? এর কিছুই সে লিখেনি কারণ শুরুতে তাদের কাউকেই আঘাত দিতে চায়নি, পরে মনে হলো এসব ছাড়াও অনেক কিছুই আছে লেখার। তবে সবসময়ই মনে হতো, কোনো একদিন লিখবে এ সবকিছুই। কত কিছু যে লেখার আছে! চোখের সামনে দুনিয়াটাকে বদলে যেতে দেখেছে সে, কেবল ঘটনার বিচারেই নয়, যদিও এগুলোর অনেক কিছুই সে দেখেছে; দেখেছে মানুষদের, তবে তার চেয়েও সূ² পরিবর্তনগুলোও দেখেছে, নানা সময় কে কোন অবস্থায় ছিল দেখেছে সেটাও। সবকিছুর মধ্যে ছিল সে, দেখেছে সবকিছু এবং এ নিয়ে লেখা তার কর্তব্য। কিন্তু এখন আর এসবের কিছুই লিখবে না সে।

‘কেমন লাগছে?’ মহিলাটি শুধাল। স্নান সেরে বেরিয়ে এসেছে তাঁবু থেকে।
‘ভালো।’
‘খেতে পারবে এখন?’ মহিলার পেছনে ফোল্ডিং টেবিল হাতে মোলোকে চোখে পড়ল, অন্য ছেলেটার হাতে খাবারের বাসনকোসন।
‘আমি লিখতে চাই,’ সে বলল।
‘শক্তি পাবার জন্য খানিকটা স্যুপ খাওয়া উচিত তোমার।’
‘আজ রাতে মরে যাব আমি, শক্তি বাড়ানোর দরকার নেই।’
‘নাটক কোরো না হ্যারি, প্লিজ,’ সে বলল।
‘নিজের নাকটা ব্যবহার করছ না কেন? পচনটা উরু পর্যন্ত এসে গেছে। স্যুপ দিয়ে করবটা কী, হ্যাঁ? মোলো, হুইস্কি সোডা আন।’
‘খেয়ে নাও স্যুপটা দয়া করে,’ নরম হলো মহিলার গলা।
‘ঠিক আছে।’
স্যুপটা অতিরিক্ত গরম। ঠান্ডা হওয়া অব্দি হাতের মধ্যে পেয়ালাটা ধরে রাখতে হলো, তারপর কোনোমতে বমি না করে গিলল সেটা। ‘দারুণ একটা মেয়ে তুমি,’ বলল সে। ‘আমার যত্ন নেয়ার দরকার নেই।’
‘স্পার অ্যান্ড টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি’ পত্রিকার প্রচ্ছদের মতো তার সেই সুপরিচিত, সবার প্রিয় সেই চেহারা নিয়ে তার দিকে তাকাল মহিলা। মদ গেলা এবং বিছানার কারণে একটু কম সুন্দর, তবে টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি কখনও অমন সুন্দর স্তন, দরকারি দুটো উরু, মোলায়েমভাবে পিঠে বোলানো হাত দেখাতে পারেনি। অতিচেনা তার সেই চমৎকার হাসিটির দিকে তাকিয়ে সে অনুভব করল, আবার এসেছে মৃত্যু। কোনো তাড়াহুড়ো নেই এবার। স্রেফ একটা ফুঁ, যেন বাতাসের ঝটকায় মোমবাতির শিখা কেঁপে উঠে সরু হয়ে যাওয়া।
‘আমার জালটা পরে বাইরে এনে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিতে পারে ওরা, আগুন জ্বালানোর আগে। আজ তাঁবুতে ফিরছি না আর। কোনো মানে নেই এখান থেকে নড়ার। পরিষ্কার স্বচ্ছ রাত, মনে হয় না বৃষ্টি হবে।’
তাহলে এভাবেই মরতে যাচ্ছ তুমি, এমন একটা ফিসফিসানির মধ্যে যা নিজেই শুনবে না। যাক, ঝগড়াঝাঁটি তো শেষ হবে, এ প্রতিশ্রæতি অন্তত দিতে পারে সে। যে অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি সেটিকে এখন আর নষ্ট করবে না সে। করতেও পারে অবশ্য। সবকিছুই নষ্ট করো তুমি। আবার এমনও হতে পারে, নষ্ট করলো না।
‘শুনে শুনে লিখতে পারো তুমি?’
‘শিখিনি কখনো,’ মহিলা বলল।
‘ঠিক আছে।’
সময় খুব বেশি নেই, স্বভাবতই, যদিও মনে হচ্ছিল সঙ্কুচিত করা যাবে ওটাকে, যাতে চেষ্টাচরিত্র করলে একটা অনুচ্ছেদে আঁটিয়ে ফেলা যেতে পারে।

হ্রদের ধারে পাহাড়ের ওপর কাঠের একটা বাড়ি ছিল, দেয়ালের ফাঁকগুলো সাদা চুনসুরকি দিয়ে ভরানো। দরজার পাশে একটা দণ্ডের মাথায় ঘণ্টা ঝোলানো, মানুষকে খেতে ডাকার জন্য। বাড়ির পেছনে মাঠ আর মাঠ পার হলে গাছের সারি। বাড়ি থেকে ঘাট পর্যন্ত সার বাঁধা লোম্বার্ডি পপলার গাছ। অন্যান্য জাতের আরো পপলার শৈলান্তরীপ পর্যন্ত চলে গেছে। একটা রাস্তা চলে গেছে পাহাড়ের ওপর দিয়ে, গাছপালার পাশ ঘেঁষে, সে রাস্তার ধারে ব্ল্যাকবেরি পাড়ত সে। কাঠের বাড়িটা আগুনে পুড়ে গেল, খোলা ফায়ারপ্লেসের ওপর হরিণের পা দিয়ে বানানো তাকে রাখা সবগুলো বন্দুকও পুড়ল। বন্দুকের পুড়ে যাওয়া নল, ম্যাগাজিনের ভেতরের গলে যাওয়া সীসা আর বন্দুকের পোড়া কুঁদ-ছাইয়ের ওপর স্তূপ হয়ে পড়ে ছিল এসব, যে ছাইগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল সাবান বানানোর লোহার কড়াই ধোয়ার জন্য লাই (তরল ক্ষার) বানাতে। ওগুলো দিয়ে খেলা যাবে কিনা দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলে তুমি, না করে দিয়েছিল দাদা। বুঝতেই পারো, পুড়ে গেলেও বন্দুকগুলো তারই এবং এগুলো ছাড়া আর কোনো বন্দুকও কেনেনি সে। শিকারও করেনি এরপর আর। চেরাই করা কাঠ দিয়ে সেই একই জায়গায় ফের বানানো হলো বাড়িটাকে, সাদা রঙ করা হলো। বারান্দা থেকে পপলার গাছ আর তার পেছনের হ্রদটা দেখতে তুমি, তবে আর কোনো বন্দুক নয়। কাঠের বাড়ির দেয়ালে হরিণের খুরের নিচে ঝোলা বন্দুকের নলগুলো পড়ে থাকত ছাইয়ের গাদায়, কেউ কখনও সেগুলো স্পর্শ করেনি আর।
যুদ্ধের পর ব্ল্যাক ফরেস্টে ট্রাউট চাষের জন্য ছোট একটা নদী ভাড়া করেছিলাম আমরা, দুটো পথ ছিল সেখানে যাবার। একটা ছিল ট্রাইবার্গ থেকে উপত্যকার নিচে, গাছের ছায়ায় ঢাকা আর সাদা রাস্তার লাগোয়া সেই পথ উপত্যকা ঘুরে শাখা রাস্তায় মিশে শোয়ার্টজওয়ার্ল্ডদের বাড়িগুলো আর ছোট ছোট খামার পেরিয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে গিয়ে ডোবা পার হয়েছে। সেখান থেকেই মাছ ধরতে শুরু করতাম আমরা। দ্বিতীয় পথটা বনের পাশ দিয়ে খাড়াই বেয়ে উঠে গিয়েছিল, তারপর পাহাড় পার হয়ে পাইনবনের মধ্য দিয়ে গিয়ে ঘাসে ঢাকা একটা জায়গা পেরিয়ে-যার ওপারেই ছিল সেতুটা। নদীর দুপারে ছিল বার্চ গাছ। নদীটা খুব বড় ছিল না, সরু, স্বচ্ছ আর খরস্রোতা। নদীর স্রোত বার্চ গাছের শেকড়ের তলায় ছোট ডোবার মতো তৈরি করেছিল। ট্রাইবার্গের হোটেলটার মালিকের জন্য বেশ ভাল একটা মৌসুম ছিল সেটি। সব মিলিয়ে দারুণ একটা পরিবেশ, এবং ভালো বন্ধুও হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। তার পরের বছরই মূল্যস্ফীতি শুরু হল। হোটেল খোলা রাখতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য তার আগের বছরের কামানো টাকাটা যথেষ্ট ছিল না, ফলে আত্মহত্যা করল লোকটা।
কেউ শুনে শুনে লেখার জন্য এটা বলতে পারবে তুমি, কিন্তু কীভাবে বয়ান করবে প্লেইস কন্টেসকার্প-এর কথা যেখানে ফুলবিক্রেতারা রাস্তায় তাদের ফুলগুলোকে রঙ করে, আর সেই রঙ পাকা রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে চলে যায় অটোবাসগুলো যেখান থেকে ছাড়ে সেখানে, যেখানকার বুড়োবুড়িরা সবসময়ই মাতাল আর ঠান্ডায় বাচ্চাদের নাক দিয়ে সর্দি ঝরে, এবং ক্যাফে দু অ্যামেচার্স-এর নোংরা ঘাম, দারিদ্র্য আর মাতলামির গন্ধ এবং বেল মিউজেটের উপরতলায় বসবাস করা বেশ্যারা। নিজের কামরায় রিপাবলিকান গার্ডের এক সেনার মনোরঞ্জন করা সেই মহিলা কেয়ারটেকার, সৈন্যটির ঘোড়ার কেশর লাগানো শিরস্ত্রাণটি চেয়ারের ওপর রাখা। হলঘরের ওপাশের ভাড়াটে মহিলার স্বামী সাইকেলের রেস খেলত, সেদিন সকালবেলা দোকানে কী আনন্দ তার, ‘লা অটো’ পত্রিকা খুলেই যখন দেখে তার স্বামী জীবনের সবচেয়ে বড় রেস প্যারিস-ট্যুর-এ তিন নম্বরে আছে। ঝলমল করছিল চেহারা, হাসছিল হি হি করে, তারপর হলুদ রঙা ক্রীড়া পত্রিকাটি হাতে করে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল উপরে। ‘বাল মিউজেট’ নাচঘর চালাত যে মহিলাটি তার স্বামী ছিল ট্যাক্সিচালক। একদিন খুব সকালে বিমান ধরার তাড়া ছিল হ্যারির, লোকটি তার দরজায় টোকা দিয়ে জাগিয়েছিল, তারপর দুজনে মিলে সেই সকালেই, পানশালা ঠিকমতো খোলার আগেই মদ গিলেছিল ওখানে বসে। সব প্রতিবেশীকেই সে চিনত কারণ সবাই ছিল গরিব। মূলত দু’ধরনের বাসিন্দা ছিল ওখানে-মাতাল আর খেলোয়াড়। মাতালরা তাদের দারিদ্র্যকে গলা টিপে মারত ওভাবেই, আর খেলোয়াড়রা শরীরচর্চায়। সবাই ছিল কম্যুনার্ডদের বংশধর, নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠিক করতে বেগ পেতে হয়নি তাই একবিন্দুও। তারা জানত কমিউনের পর ভার্সাইয়ের সেনারা যখন তাদের শহর দখল করে এবং কড়া পড়া হাত বা টুপিওয়ালা বা শ্রমজীবী মনে হতে পারে এমন সবাইকে নিকেশ করার সময় তাদের বাবা, আত্মীয়স্বজন, ভাই আর বন্ধুরা প্রাণ হারিয়েছিল কাদের হাতে। সেই প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে, ঘোড়ার মাংসের দোকান আর মদ প্রস্তুতকারকদের সমবায় সমিতির উল্টোদিকের সেই মহল্লায় বসেই সে লিখতে শুরু করেছিল যা যা করবে বলে ঠিক করেছিল তার শুরুটা। প্যারিসের আর কোনো জায়গাকে এতটা ভালোবাসত না সে; ছড়ানো ছিটানো গাছ, নিচের দিকে বাদামি রঙ করা সাদা প্লাস্টার লাগানো পুরনো বাড়ি, গোলচক্করের লম্বা লম্বা সব সবুজ অটোবাস, বাঁধানো রাস্তার ওপর ফুলে লাগানোর বেগুনি রঙ, র্যু কার্ডিনাল লেময় থেকে নদীমুখো পথে পাহাড়টার হুট করে নেমে যাওয়া আর অন্যদিকে র্যু মুফেতাঁদ-এর সরু, ভিড়ে ঠাসা দুনিয়া। প্যানথিয়নের দিকে চলে গেছে যে রাস্তাটা এবং আরেকটা রাস্তা যেটাতে সবসময় সাইকেল চালিয়ে যেত সে, গোটা মহল্লায় অ্যাসফল্ট বিছানো একমাত্র রাস্তা সেটি, টায়ারের নিচে কী মসৃণ! দুপাশে উঁচু, সংকীর্ণ সব বাড়ি আর সস্তা ভাড়ার লম্বা হোটেলটা, পল ভার্লেইন যেখানে মারা গিয়েছিলেন। তারা যেখানে থাকত সেই অ্যাপার্টমেন্টে ক্ষ ছিল মাত্র দুটো। হোটেলের সবচেয়ে উঁচু তলায় একটা রুম নিয়েছিল সে যার পেছনে মাসে খরচ হতো ষাট ফ্রাঙ্ক। লেখালেখির কাজটি করত সেখানে, যেখান থেকে ঘরবাড়ির ছাদ, চিমনির মাথা আর প্যারিসের সমস্ত পাহাড় দেখা যেত। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দেখা যেত কেবল কয়লাওয়ালার দোকান আর কাঠ। মদও বেচত লোকটা, জঘন্য মদ। ঘোড়ার মাংসের কসাইখানাটার বাইরে ছিল ঘোড়ার একটা মাথা-সোনালী রঙের, জানালায় ঝুলত ঘোড়ার হলদে-সোনালী আর লালরঙা লাশ। সবুজ রঙ করা সমবায় সমিতির অফিস, যেখান থেকে তারা মদ কিনত, ভালো এবং সস্তা মদ। দেখার মধ্যে আর ছিল প্লাস্টার করা দেয়াল এবং প্রতিবেশীদের জানালা। রাতে কেউ মদ গিলে রাস্তায় পড়ে ফরাসিদের মাতালদের সেই নিজস্ব ঢঙে-যার অস্তিত্বে বিশ্বাস না করার জন্য প্রচারণা চালানো হয়-গোঙালে প্রতিবেশীরা জানালা খুলে তাকিয়ে থাকত আর বিড়বিড় করত, ‘পুলিশটা কোথায়? যখন দরকার থাকে না হতচ্ছাড়াটা তখনই ঘুরঘুর করে আশেপাশে। নিশ্চয়ই কোনো হোটেলের পরিচারিকার সঙ্গে ঘুমোচ্ছে। খুঁজে আনো এজেন্টকে।’ তারপর একসময় কেউ রাস্তায় শুয়ে গোঙাতে থাকা মাতালটার গায়ে এক বালতি পানি ছুঁড়ে মারত জানালা দিয়ে এবং গোঙানি বন্ধ হয়ে যেত। ‘কী এটা? পানি। হুম, বুদ্ধিমানের কাজ।’ জানালাগুলো পটাপট বন্ধ হয়ে যেত। মেরি, তার ঘর পরিষ্কার করত যে মহিলা, দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের প্রতিবাদ করে বলত, ‘কারো স্বামী ছ’টা পর্যন্ত কাজ করলে বাড়ি ফেরার পথে সামান্য একটু মদ গেলে এবং বেশি টাকাপয়সা নষ্ট করে না। অথচ পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করলে প্রতিরাতে মাতলামি করে আর সব টাকাপয়সা উড়িয়ে দেয়। কাজের সময় কমিয়ে দিলে তাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয় শ্রমজীবীদের স্ত্রীদের।’

‘আরেকটু স্যুপ খাবে?’ মহিলাটি জিজ্ঞেস করল।
‘উঁহু, ধন্যবাদ। বড্ড বেশি ভালো এটা।’
‘অল্প একটু খেয়ে দেখতে পারো।’
‘সামান্য হুইস্কি সোডা পেলে বরং হয়।’
‘তোমার জন্য ভালো না এটা।’
‘না। আমার জন্য এটা খারাপ। কথা লিখেছে এবং সুর করেছে কোল পোর্টার। আমার জন্য পাগলপারা তুমি, এটা জানা।’
‘তুমি জানো তোমার মদ খাওয়া অপছন্দ না আমার।’
‘হুঁ। কেবল একটাই সমস্যা, আমার জন্য এটা খারাপ।’
মহিলা চলে গেলে যা যা চায় সব করতে পারবে, ভাবল সে। ঠিক যা চায় তা নয়, যা করা যায় সব। ওহ, ক্লান্ত সে, বড্ড বেশি ক্লান্ত, একটু ঘুমোবে। চুপচাপ শুয়ে থাকল সে। মৃত্যু ওখানে নেই-নিশ্চয়ই অন্য কোনো পথে গেছে। জোড়া বেঁধে যায় ওটা, সাইকেলে চেপে এবং ফুটপাথ ধরে-একদম নিঃশব্দে।
না, প্যারিসকে নিয়ে কখনো লিখেনি সে। যে প্যারিসকে সে ভালোবাসে সেটিকে নিয়ে নয়। কিন্তু বাদবাকি সব, যেগুলো সম্বন্ধে লিখেনি কখনো? সেই খামারবাড়ি আর সেজব্রাশ ঝোপের রূপালি-ধূসর রঙ, সেচের নালাগুলোর উচ্ছ্বল, স্বচ্ছ জল আর আলফালফার গাঢ় সবুজ? পায়ে চলা পথটা পাহাড় বেয়ে সোজা উঠে গেছে, আর গ্রীষ্মকালে গরুবাছুরগুলো ঠিক হরিণের মতোই লাজুক। শরৎকালে নিচে নামিয়ে আনার সময় ঘোঁতঘোত শব্দ আর একটানা শোরগোল তুলে ঢিমেতালে নেমে আসা পশুগুলো ধুলোর মেঘে চারপাশ ঢেকে দেয়। পর্বতমালার পেছনে পর্বতশৃঙ্গটি সন্ধ্যালোকে জ্বলজ্বল করছে, যেন চাঁদের আলোয় নেমে আসছে পাহাড়িপথ বেয়ে, উপত্যকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বৃক্ষসারির মধ্য দিয়ে অন্ধকারে ঘোড়ার লেজ ধরে অন্ধের মতো নেমে এসেছিল সে-ও, মনে পড়ছে তার। মনে পড়ছে সমস্ত গল্পের কথা যেগুলো লিখবে বলে ভেবে রেখেছিল। এবং হাবাগোবা সেই কাজের ছেলেটির কথা, সেবার যাকে খামারে রেখে আসা হয়েছিল, বলা হয়েছিল কেউ যেন খড় নিতে না পারে। আর ফর্কের সেই বুড়ো বজ্জাত যে কিনা পশুর খাবার নেবার জন্য থেমেছিল এবং পিটিয়েছিল ছেলেটিকে, ছোঁড়া যখন তার হয়ে কাজ করত। তবু রাজি হয়নি ছেলেটা এবং ফের পেটানোর হুমকি দিয়েছিল বুড়ো। তারপর গোলাঘরে ঢোকার চেষ্টা করল বুড়ো এবং রান্নাঘর থেকে বন্দুক এনে তাকে গুলি করল ছেলেটা। ওরা খামারে ফিরতে ফিরতে এক সপ্তাহ, বুড়োর লাশটা পড়ে ছিল আস্তাবলে, তার শরীরের একটা অংশ খেয়ে ফেলেছিল কুকুরগুলো। যেটুকু বাকি ছিল সেটাকে কম্বলে মুড়ে স্লেজগাড়ির সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিলে তুমি, ছেলেটার সাহায্য নিয়েছিলে ওটাকে স্লেজে তোলার কাজে, তারপর স্কিতে চাপিয়ে দুজনে মিলে নিয়ে গিয়েছিলে ষাট মাইল দূরের শহরে এবং ছেলেটাকে তুলে দিয়েছিলে পুলিশের হাতে। তার কোনো ধারণাই ছিল না আটক করা হবে তাকে। বরং ভেবেছিল সে তার দায়িত্ব পালন করেছে এবং তুমি তার বন্ধু, বরং পুরস্কৃত হবে সে। লোকটাকে স্লেজে তুলতে সাহায্য করেছিল যাতে সবাই বুঝতে পারে কত শয়তান ছিল বুড়োটা, যে খাবার তার নয় কীভাবে সেটা চুরি করার চেষ্টা করেছিল। শেরিফ যখন হাতে হাতকড়া পরায় বিশ্বাস করতে পারছিল না ছেলেটা। কাঁদতে শুরু করেছিল গলা ছেড়ে। এই গল্পটা রেখে দিয়েছিল সে লেখার জন্য। এমন অন্তত বিশটা গল্প জানত ঐ জায়গার, যার কোনোটাই কখনো লিখেনি। কেন?
‘তুমি জানাও তাদের, কেন,’ সে বলেছিল।
‘কেন কী, সোনা?’
‘কেন কিছু না।’
তাকে পাওয়ার পর থেকে মদ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিল মহিলা। বেঁচে থাকলে মহিলাকে নিয়ে কখনোই লিখত না সে, জানে। লিখত না তাদের কারো সম্বন্ধেই। পয়সাওয়ালারা নির্বোধ, তারা অতিরিক্ত মদ খায় অথবা খুব বেশি ব্যাকগ্যামন খেলে। তারা গর্দভ এবং একই কাজ বারবার করে।
বেচারা জুলিয়ান এবং ধনীদের সম্বন্ধে তার ভাবালুতামিশ্রিত সমীহের কথা মনে পড়ল তার। মনে পড়ল, একবার এভাবে একটা গল্প শুরু করেছিল সে, ‘যাদের অনেক টাকাপয়সা তারা তোমার-আমার চেয়ে অন্যরকম।’ কেউ একজন বলেছিল, ‘হ্যাঁ, ওদের টাকাপয়সা বেশি’, তবে জুলিয়ানের কাছে এটাকে হাসির ব্যাপার মনে হয়নি। সে বিশ্বাস করত ধনীরা চটকদার এবং বিশেষ একটা জাত; পরে যখন জানল তারা তা নয় তখন অন্য যেকোনো আঘাতের মতো এ আঘাতেও ভেঙে পড়েছিল একদম।
যারা ভেঙে পড়ে তাদের সহ্য করতে পারত না সে। যেহেতু এটা বোঝো তুমি, কোনো কারণ নেই এটা পছন্দ করার। জানত, যেকোনো কিছুকেই হারাতে পারে সে, কোনোকিছুই কষ্ট দিতে পারবে না তাকে, যদি সে পরোয়া না করে।
ঠিক আছে, মৃত্যুকে আর পরোয়া করবে না সে এখন। কেবল ব্যাথা জিনিসটাই সবসময় ভয় জাগিয়েছে মনে। আর আট-দশজনের মতোই ব্যাথা সহ্য করতে পারে সে, যদি না সেটি খুব দীর্ঘ হয় এবং বেহাল করে ফেলে তাকে। সমস্যা হচ্ছে, এ ব্যাপারটা বড্ড বেশি যন্ত্রণাদায়ক এবং যখন মনে হচ্ছিল সহ্যের শেষ সীমায় চলে গেছে তখনই থেমে গেল সেটা।
বোম্বিং অফিসার উইলিয়ামসনের কথা মনে পড়ল তার, বহুদিন আগে এক রাতে কাঁটাতারের বেড়া টপকে আসার সময় জার্মান এক টহলদারের ছোঁড়া বোমা গায়ে এসে লেগেছিল তার। হেঁড়ে গলায় চেঁচাচ্ছিল সে, সবার কাছে কাকুতি-মিনতি করছিল তাকে মেরে ফেলার জন্য। বেশ মোটা ছিল সে, খুব সাহসী, এবং অফিসার হিসেবেও ভালো, যদিও আসক্তি ছিল ফ্যান্টাসি শোতে। কিন্তু সে রাতে আটকা পড়েছিল কাঁটাতারে, আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তাকে, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসে আটকে ছিল তারের মধ্যে। ফলে জ্যান্ত অবস্থাতেই তাকে কেটেছিঁড়ে বের করে আনতে হয়। গুলি করো আমাকে, হ্যারি। যিশুর দোহাই, গুলি করো। এক পর্যায়ে তাদের নিজেদের মধ্যে তর্ক বেঁধে গেল, প্রভু এমন কিছু তোমাকে পাঠাবেন না যা তোমার সহ্যক্ষমতার বাইরে। কেউ একজন জ্ঞান দিচ্ছিল, একটা সময় আসবে যখন তুমি ব্যাথায় হুঁশ হারিয়ে ফেলবে। সে কিন্তু উইলিয়ামসন আর সেই রাতটিকে কখনও ভোলেনি। উইলিয়ামসনকে সে নিজের সবগুলো মরফিন ট্যাবলেট দিয়ে দেয়ার আগ অব্দি বেহুঁশ হয়নি লোকটা-যে ট্যাবলেটগুলো নিজের ব্যবহারের জন্য রেখেছিল সে-এবং এতগুলো ট্যাবলেটও সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করেনি।
এখন পর্যন্ত, যা যা তার আছে সবকিছুই বড় সহজ এবং সময়ের সঙ্গে ঘটনা আরো খারাপের দিকে মোড় না নিলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সমস্যা হচ্ছে, আরো ভালো কারো সঙ্গে সময়টা কাটাতে পছন্দ করবে সে বরং।
যাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করবে তাদের কথা ভাবল সে খানিকক্ষণ।
না, অবশেষে ভাবল সে, যখন যাই করো, বড্ড বেশি সময় ধরে করো এবং বেশি দেরিতে। তখন আর ওখানে যারা আছে তাদের খুঁজে পাওয়ার আশা করতে পার না। সবাই চলে গেছে। পার্টি শেষ, এখন আছ কেবল তুমি আর তোমার মেজবান।
অন্য সবকিছুর মতো মৃত্যুর ব্যাপারটাও বড্ড বেশি একেঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে, ভাবল সে।
‘ভীষণ একঘেয়ে,’ জোরে জোরে বলল সে।
‘কী একঘেয়ে, সোনা?’
‘বেশি সময় ধরে করা সবকিছুই।’
তার এবং আগুনের মাঝখানে বসা মহিলার চেহারার দিকে তাকাল সে। হেলান দিয়ে আছে চেয়ারে, আগুনের আভা ঠিকরে পড়েছে তার কমনীয় চেহারায়, তাতে ঘুম ঘুম ভাব।
আলোকিত জায়গাটার ঠিক বাইরেই শব্দ করে উঠল হায়েনাটা, তার কানে এল।
‘লিখছিলাম,’ সে বলল, ‘কিন্তু ক্লান্ত লেগে উঠল।’
‘কী মনে হয়, ঘুমাতে পারবে?’
‘নিশ্চয়ই। তুমি ঘুমাতে যাচ্ছ না কেন?’
‘ভালো লাগছে তোমার সঙ্গে বসে থাকতে।’
‘একটু কি অন্যরকম লাগছে কিছু?’ সে জিজ্ঞেস করল।
‘না। কেবল ঘুম ঘুম একটা ভাব।’
‘আমার লাগছে।’
আবারও ফিরে এসেছে মৃত্যু, এইমাত্র টের পেয়েছে সে।
‘জানো, যে জিনিসটা কখনও হারাইনি আমি সেটা হচ্ছে কৌতূহল?’ মহিলাকে বলল সে।
‘তুমি কিছুই হারাওনি। আমার দেখা সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ তুমি।’
‘যিশু,’ সে বলল। ‘মেয়েরা কত কম জানে! কী এটা? তোমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়?’
কারণ ঠিক তখনই মৃত্যু এসে খাটিয়ার পায়ের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়েছে এবং সেটির নিঃশ্বাসের গন্ধ এসে লাগছে তার নাকে।
‘কাস্তে আর খুলি সম্বন্ধে যা যা শোনো তার একবিন্দুও বিশ্বাস করবে না,’ সে বলল। ‘এমনও হতে পারে ওটা সাইকেলে চড়া দু’জন পুলিশ বা একটা পাখি। আবার এমনও হতে পারে, হায়েনার মতো ওটারও সুঁচালো নাক আছে একটা।’
ধীরে ধীরে তার শরীরের উপরের দিকে উঠছে ওটা, যদিও এখন আর কোনো আকৃতি নেই। কেবল জায়গা দখল করে আছে একটা।
‘চলে যেতে বলো ওটাকে।’
ওটা গেল না, বরং আরেকটু কাছে সরে এলো।
‘জঘন্য তোর নিঃশ্বাসের গন্ধ,’ ওটাকে বলল সে। ‘দুর্গন্ধে ভরা হারামি একটা!’
উপরের দিকে উঠল ওটা, আরো ঘনিষ্ঠ হলো। এখন আর ওটার উদ্দেশে কিছু বলতে পারছে না সে। যখন দেখল সে কিছু বলতে পারছে না তখন আরো কাছে সরে এল ওটা। মুখ না খুলেই দূরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল সে ওটাকে, কিন্তু আরো কাছে ঘেঁষে এল ওটা, এখন তার গোটা ওজন ওর বুকের ওপর, গুটিশুটি মেরে তার বুকে বসে আছে, নড়তে কিংবা কথা বলতে পারছে না সে, শুনতে পেল মহিলাটি বলছে, ‘বাওয়ানা ঘুমিয়ে পড়েছেন। সাবধানে আলগে ধরো খাটিয়াটাকে, তাঁবুর ভেতর নিয়ে যাও।’
ওটাকে তাড়িয়ে দেয়ার কথা মহিলাকে বলতে পারল না সে। আরো গুটিশুটি মেরে বসেছে ওটা এখন, ভারি হয়ে গেছে আগের চেয়ে, ফলে দম আটকে আসছে তার। তারপর, ওরা যখন খাটিয়াটা উপরে তুলল, হঠাৎই সব ঠিকঠাক হয়ে গেল এবং তার বুকের ওপর থেকে ভারটা নেমে গেল।
এখন সকাল। দিনের আলো ফুটেছে বেশ আগেই, হঠাৎ বিমানের শব্দ কানে এল। শুরুতে খুব ছোট দেখা গেল ওটাকে, বড় একটা চক্কর দিল। দৌড়ে গিয়ে কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালাল ছেলেরা, ঘাস জড়ো করল যাতে সমতল জায়গাটার দুই প্রান্তে বড়সড় দুটো অগ্নিকুণ্ড সৃষ্টি হলো; সকালের বাতাস ধোঁয়াগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে এল তাঁবুর দিকে। আরো দু’বার চক্কর দিল বিমানটা, এবার বেশ নিচে, তারপর ধীরে ধীরে নেমে এসে সোজা হলো, থেমে দাঁড়াল মসৃণভাবে। তাদের দিকে হেঁটে এল বুড়ো কম্পটন, গায়ে টুইড জ্যাকেট আর পাজামা, মাথায় বাদামি রঙা ফেল্ট হ্যাট।
‘কী সমস্যা বন্ধু?’ কম্পটন বলল।
‘পায়ে,’ সে বলল। ‘নাস্তা খাবে?’
‘ধন্যবাদ। চা খেতে পারি একটু। দেখতেই পাচ্ছ, বিমানটা পুশ মথ , মেমসাহেবকে নেয়া যাবে না। একজনের জায়গা হবে কেবল। তোমার লরি পথে আছে।’
কম্পটনকে একপাশে নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলছে হেলেন। চনমনে ভাব নিয়ে তার কাছে এল কম্পটন, এতটা চনমনে তাকে আগে কখনও দেখেনি হ্যারি।
‘এক্ষুনি ভেতরে ঢুকিয়ে নেব তোমাকে,’ বলল সে। ‘তারপর মেম-এর জন্য ফিরে আসব। সমস্যা হচ্ছে, তেল নেয়ার জন্য আরুশায় থামতে হবে। এখনই রওনা হওয়া দরকার।’
‘চা খাবে বললে যে?’
‘খেতে যে খুব ইচ্ছে করছে তা নয়।’
ছেলেগুলো খাটিয়াটা নিয়ে সবুজ তাঁবুটা ঘুরে পাথুরে জায়গার পাশ দিয়ে সমভূমি পেরিয়ে ছোট বিমানটার দিকে যাচ্ছে। আগুনের কুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে, ঘাসগুলো পুড়ে ছাই, বাতাসের ঝাপটা আগুনকে উস্কে দিচ্ছে আরো। তাকে ভেতরে ঢোকাতে কষ্টই হলো তাদের, ভেতরে ঢুকে চামড়ার আসনে গা এলিয়ে বসল সে, পা-দুটো কম্পটনের আসনের পাশটায় লম্বা করা। ইঞ্জিন চালু করে ভেতরে ঢুকল কম্পটন। হেলেন আর ছেলেগুলোর উদ্দেশে হাত নাড়ল সে, ইঞ্জিনের ঠনঠন শব্দ যখন পরিচিত গমগমে আওয়াজে রূপ নিতে নাক ঘোরালো বিমান। বুনো শুয়োরের গর্ত বাঁচিয়ে সাবধানে এগোলো কম্পটন, গোঁ গোঁ শব্দ করে, ঝাঁকুনি খেতে খেতে আগুনের দুই কুণ্ডের মধ্যিখানের জায়গাটা দিয়ে শূন্যে ভাসল শেষ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে। সবাইকে নিচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে দেখল সে। পাহাড়ের পাশে ক্যাম্প, ক্রমশ চ্যাপ্টা হচ্ছে পাহাড়, সমভূমি প্রসারিত হচ্ছে, গাছগুলোও চ্যাপ্টা হচ্ছে, আরেকটি কুয়ো চোখে পড়ছে, যেটির কথা তার জানা ছিল না। জেব্রাগুলোর ছোট, গোলাকার নিতম্ব আর ওয়াইল্ডাবিস্টগুলোকেও দেখা যাচ্ছে, ঠিক যেন বড় বড় মাথাওয়ালা বিন্দু। সমভূমি ধরে লম্বা আঙ্গুলের মতো সার বেঁধে চলা প্রাণীগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে চড়াই ভাঙছে। ছায়া ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে তাদের দিকে, ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণীগুলো, একদম ছোট দেখাচ্ছে এখন। চলায় আর লাফালাফির কোনো চিহ্ন নেই তাদের, যতদূর চোখ যায় সমভূমি এখন ধূসর-হলদে। সামনে বুড়ো কম্পটনের জ্যাকেট পরা পিঠ আর বাদামি টুপি। একটু পরই প্রথম পাহাড়সারির উপরে উঠে এল তারা, ওয়াইল্ডাবিস্টগুলো এখন তাদের পেছনে। পর্বতের ওপর এখন তারা, এখানে ওখানে সবুজ অরণ্যানীর চকিত গভীরতা আর বাঁশগাছে ঢাকা নিবিড় সব ঢাল, ফের গভীর অরণ্য তারপর-উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার আগ অব্দি মনে হয় পর্বতশৃঙ্গে আর গহŸরের গায়ে যেন খোদাই করা। পাহাড়ের সারি ফের নামতে শুরু করেছে ঢাল বেয়ে, আরেকটি সমভূমি, উষ্ণ এবং বেগুনি-বাদামি, কাঁপছে তাপতরঙ্গে; পেছনে ফিরে আরোহীর অবস্থা দেখে নিচ্ছে কম্পটন, সামনে আরো ধূসর-কালো পর্বতের সারি।
বামে ঘুরল তারা আরুশায় যাওয়ার বদলে; বাড়তি জ্বালানি লাগছে না, ধরে নিল সে। নিচে তাকাতে মাটির ওপর ঘুরপাক খেতে থাকা ছাড়া-ছাড়া গোলাপি মেঘ চোখে পড়ল। আকাশেও তাই, যেন তুষারঝড়ের প্রথম তুষার, কেউ জানে না কোত্থেকে এসেছে; তারপরই বুঝল সে, পঙ্গপালের দল, আসছে দক্ষিণ থেকে।
ফের উপরে উঠতে শুরু করল বিমান, মনে হলো পূবে যাচ্ছে। তারপর অন্ধকার নেমে এল এবং ঝড়ের মধ্যে পড়ল তারা। বৃষ্টি এত ভারি যেন জলপ্রপাতের মধ্য দিয়ে উড়ছে বিমান, তারপর হঠাৎ করেই মুক্ত আকাশ। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কম্পটন, হেসে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। যতদূর চোখ যায় একটাই দৃশ্য কেবল সামনে-পৃথিবীর সমান চওড়া, বিশাল আর উঁচু, সূর্যালোকে অবিশ্বাস্যরকমের সাদা-কিলিমাঞ্জারোর চৌকোনা মাথা।
এবং তখনই বুঝল সে, যাচ্ছে ওখানেই।
রাতের গভীরে গোঙানিটাও ঠিক তখনই থামাল হায়েনাটা, তারপর কিম্ভুত, প্রায় মানুষের কান্নার মতো একটা ডাক ছাড়তে শুরু করল। মহিলার কানে গেল সে ডাক, অস্বস্তিভরে এপাশ ওপাশ করল সে, তবে জাগল না। স্বপ্নে লং আইল্যান্ডের বাড়িতে চলে গেছে, তার মেয়ের অভিষেকের আগের রাত। কীভাবে কীভাবে যেন বাবাও ওখানে, কেমন বাজে আচরণ করছে। হায়েনাটার গোঙানিটা এত বাড়ল যে ঘুম ভেঙে গেল তার, কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারল না সে কোথায়। ভয় লাগছিল খুব। ফ্ল্যাশলাইটটা হাতে নিয়ে অন্য খাটিয়ার ওপর আলো ফেলল, হ্যারি ঘুমিয়ে পড়ার পর খাটিয়াটাকে নিয়ে এসেছে তাঁবুতে। মশারীর নিচে হ্যারির শরীরটা চোখে পড়ল, কীভাবে যেন মশারির বাইরে বেরিয়ে এসেছে পা-টা, খাটিয়ার একপাশে ঝুলছে। পায়ের পট্টিটা খুলে নিচে নেমে এসেছে, তাকাতে পারল না সে ওটার দিকে।
‘মোলো,’ চেঁচিয়ে উঠল সে, ‘মোলো! মোলো!’
তারপর ‘হ্যারি, হ্যারি!’ গলা চড়ল তার, ‘হ্যারি! প্লিজ। ওহ, হ্যারি।’
জবাব নেই কোনো, হ্যারির নিঃশ্বাসের শব্দও কানে এল না।
তাঁবুর বাইরে হায়েনাটা সেই অদ্ভুত শব্দটি করল যেটি তার ঘুম ভাঙিয়েছে-যদিও নিজের বুকের ধুকপুকানির জন্য হায়েনার ডাকটা শুনতে পেল না সে।


1 Response

  1. বাহ! দারুণ..একটানে পড়ে ফেললাম..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.