গল্প

পান্নালালের বাস্তু

seuty | 1 Oct , 2010  

৭ই ডিসেম্বর ২০০৩

স্নেহের মনি ও আক্তার ,

আশা করি তোমরা সকলে ভাল আছো। ভগবানের কৃপায় গতকাল আমি কোন প্রকার সমস্যা ব্যতিরেকে কোলকাতা পৌঁছেছি। যাত্রাপথে কোন অসুবিধা হয় নাই, তবে এইবার শীত একটু আগেভাগেই পড়েছে। ভাগ্যিস মনি বুদ্ধি করে প্যান্টের সাথে কোট আর আলোয়ানখানা দিয়েছিলে। বর্ডারে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। আজকাল বুড়ো হয়েছি বলেই বোধ হয় ওরা করুণা করে ছেড়ে দেয়।

আমি গড়িয়ায় মুক্তর কাছে উঠেছি। আমায় দেখে বুবুন ভীষণ খুশি হয়েছে। দাদুকে যে সে কত কী দেখাবে তার ইয়ত্তা নেই। মুক্ত আর দেবুও আমায় দেখে খুশি বলেই মনে হয়। নতুন দেশে ভালই মানিয়ে নিয়েছে। দেবু ওর চাকরি থেকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে পাওয়া টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে পিসতুতো দাদাদের সাথে। দেবুর অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজনই বহুদিন ধরে এখানে আছে, তাই বিপদে আপদে ওদের সাহায্য নিতে পারছে। মুক্তটাকে নিয়ে যা একটু ভাবনা। বাংলাদেশ ছাড়বার সময় জেদ করে সরকারি চাকরিটা ছাড়ল না। ওর মুখ দিয়ে কথা বের করে কার সাধ্যি। আপাততঃ ও ঘরকন্নাই করছে ।

ওরা আমায় কদ্দিন থাকব কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। আমিও আমার পরিকল্পনা কিছু জানাইনি। মুক্ত হয়ত কিছু আঁচ করতে পারে। ও ছাড়া আমার আর আছে কে?

পৌঁছ সংবাদ দিতে গিয়ে অনেক কিছু লিখে ফেল্লাম। তোমরা সময় ক’রে লিখ। আমার মনটা এখনো বাংলাদেশে পড়ে আছে। ভাল থেক।
ইতি
পান্না কাকা

মনি চিঠিখানা হাতে নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে থাকে খানিকক্ষণ। জামগাছে একটানা ঘুঘু ডেকে যায়। গনগনে রোদে খালি মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনির চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। মাঠের বালুতে, মাঝদুপুরে শীতের কড়া রোদে মরীচিকার মতো ধোঁয়াটে দেখায় সব কিছু। আসলে মরীচিকা বলেলও ঠিক বোধগম্য হয় না। বরং মনির ক্রমাগত মনে হতে থাকে মাঠের পরে রাস্তা বরাবর একটা স্বচ্ছ পানির দেয়ালের মতো কিছু উঠে গেছে, আর সেটা হাত দিয়ে ছুঁতে গেলেই অজস্র ঢেউ হয়ে ভেঙ্গে পড়বে। ঐ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনি পান্না কাকার মুখটা মনে করতে চেষ্টা করে। যাও বা মনে পড়ে, তাও পানিতে প্রচ্ছায়ার মতো দুলতে থাকে। সন হিসেবে মনি মনে করতে পারে না কিছুই, শুধু টুকরো টুকরো সব ঘটনা মনে পড়ে।

 

সেবার আব্বার খুব জ্বর হলো। জ্বরের কারণে আব্বা কারখানায় যেতে পারেননি তিন দিন। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় আব্বাকে দেখতে এক ভদ্রলোক বাড়িতে হাজির হলেন। ভদ্রলোককে দেখে সবাই খানিকটা অবাক হলো। কারণ আব্বা বাড়ি এবং বাহির কখনো এক করতেন না। আব্বার অনেক বন্ধু কোন কালেই ছিল না। যা দু’ একজন সহকর্মীদের সাথে সখ্য ছিল, তা ঐ কারখানা আর বাজারে চায়ের দোকান পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, তবে ঈদের দিনে খানিক ব্যতিক্রম দেখা যেতো। ঈদ না হলেও অতিথি সৎকারের রেওয়াজ এ বাড়িতে পুরনো। বেশিরভাগ অতিথি ছিলেন দূরসম্পর্কের আত্মীয়।

চা আর মুড়ি মাখা নিয়ে ঘরে ঢুকতেই আব্বা তার নতুন বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ‘মনি মা এইটা তোর পান্না কাকা। উনি বাজারে নতুন সাইকেল পার্টসের দোকান দিছেন। সেইদিন বল-বেয়ারিং কিনতে গিয়া পরিচয়।’ আমি সালাম দিয়ে ঘর থেকে বের হলাম আর অন্দরমহলে খবরটা চালান ক’রে দিলাম। সেই থেকে পান্না কাকার বিকেল বেলার চা মুড়ি এ বাসায় বরাদ্দ হলো ।

পরে আব্বার কাছে জানা গেল সৈয়দপুরে কাকা এসেছেন ষাটের দশকে। মূলতঃ পাটের ব্যবসা করতেন তিনি। গুদামঘরও ছিল তাঁর শহরতলিতে। ফলে বাজারে অনেক বেশি দেখা যেত না তাঁকে। সম্প্রতি পাটের ব্যবসায় মন্দা যাওয়াতে সাইকেল পার্টসের দোকান দিয়েছেন বাজারে। আব্বা বাজারে নতুন লোক দেখে পরিচিত হতে চেষ্টা করেন। সেই প্রথম আলাপ গিয়ে সখ্যে গড়ায়। সনটা ঠিক মনে পড়ে না আজ তবে আশির দশক হবে। সেই কবেকার কথা, ‘৮৫ বা ‘৮৬।

আব্বা সুস্থ হবার পরে পান্না কাকার গতায়াত আরো নিয়মিত হলো। কারখানার ভেঁপু বাজবার সাথে সাথে প্রায় রোজ সন্ধ্যায় মুন্সিজির হাতে দোকানের চাবিখানা দিয়ে, কাকা আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হতেন। প্রথমদিকে আম্মা কিছুদিন নিজহাতে চা-নাস্তা পরিবেশন করেছেন, আব্বা-কাকার আড্ডাতে শামিল হয়েছেন। সেকি আড্ডা—রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম থেকে শুরু করে আমাদের পারিবারিক খুঁটিনাটি কোন কিছুই বাদ পড়ে না সে আড্ডা থেকে। কিন্তু পান্না কাকা তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা সযতনে এড়িয়ে চলতেন। আমি সদ্য কলেজে পড়ি, টুকটাক গানও করি। মাঝে মাঝে আমার সংগীত চর্চা, বুবুর ঢাকাই রাজনৈতিক জীবন, আব্বার কারখানা-ইউনিয়ন, তো কাকার বামপন্থীদের প্রতি ঘোরতর আস্থা—সব নিশ্চিন্ত মনে ঢুকে পড়ত আড্ডায়। যার অনেক কিছুই আমার মাথায় ঢুকত না। তবুও ভরপুর আর প্রাণবন্ত ছিল সেই বিকেলগুলো।

সবকিছুই একে একে সাঙ্গ হয়—সেই আড্ডাও একসময় শেষ হয়। কাকা একদিন আব্বা কারখানা থেকে আসবার আগেই চলে আসেন। আম্মা কাকাকে একা পেয়ে নানা কথার মাঝে কথাটা তুলতে চেষ্টা করেন।

“পান্নাবাবু আপনার বাড়ির খোঁজ খবরই নেয়া হয় না কখনো। কে কে আছেন?” আম্মা অম্লান বদনে প্রশ্ন করে যান। আম্মার প্রশ্ন শুনে কাকা পাকাল মাছের মতো করতে থাকেন। আম্মাও নাছোড়বান্দা, ছাই হাতে মাছ ধরবেনই আজ।

“জ্বি বাড়ি একটা আছে ভাবি। মানে গুদাম ঘর যেটা নিয়েছি সেটার সাথেই একটা থাকবার বন্দোবস্ত করে নিয়েছি।”

“তো গুদামঘর একলাই পাহারা দেয়া হয়?” আম্মা খানিক তরল স্বরেই জিজ্ঞেস করেন।

আম্মার জেরার মুখে কাকা আরো লাজুক ভঙ্গিতে উত্তর করেন, “জ্বি গুদামঘরে আর কে সাথি হতে চায় বলুন? তবে ওটার জন্য দারোয়ান আছে।”

এবার আম্মার শরমিন্দা হবার পালা। আম্মা একটুও অপ্রতিভ না হয়ে ছাই হাতে এগিয়ে যান। “পান্নাবাবু হেঁয়ালি ছাড়েন। ঠিক করে বলেন তো বাড়িতে কে আছে?”

“হেঁয়ালি না ভাবি। বাড়িতে আসলে বলার মতো তো কেউ নেই। পুরো শহরে বন্ধু বলতে ছিল কেবল মণীষ—মণীষ নাথ মণ্ডল। ওর পরামর্শেই কোলকাতা ছেড়ে এই সৈয়দপুরে ব্যবসা পাতি। লাভ কী হলো বলুন? যুদ্ধে মণীষদের সবাই বিহারীদের হাতে মরল। মুক্তটা বেঁচে গেলো কপাল জোরে। সেই থেকে ওই আছে। আমার সংসার বলতে মুক্ত।”

আম্মা মণীষ কাকাদের কথা খানিকটা জানতেন। একই ক্যাম্পে থেকেছেন কিছুদিন। কাকা একরকম জেদ করেই এদেশে থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ভারি সব অনুভূতিতে বুঁদ হয়ে বেজুবান বসে থাকে দুটো মানুষ। আম্মার আর মুখে বলা হয়ে ওঠে না যে, দু’ কামরার বাড়িতে আড্ডার জন্য এক কামরা দখল করে রাখলে অবশিষ্ট এক কামরায় তিন ছেলেমেয়ের পড়তে অসুবিধা হয়। বলা হয় না তাঁর পতিদেব কাকাকে বন্ধুজ্ঞান করলেও আড্ডাটা ছুটির দিনে হলেই ভালো হয়। বরং নিঃসঙ্গ মানুষটার দিকে স্নেহভরে তাকিয়ে থাকেন আম্মা। কাকাও খানিকক্ষণ চুপচাপ বারান্দায় বসে থেকে আব্বার সাথে দেখা না করেই বেরিয়ে পড়েন। যেমন আচানক হাজির হয়েছিলেন তেমনি আাচানকই গায়েব হলেন কাকা। আব্বার সাথে দোকানেই আড্ডা দিতেন মাঝে-সাঝে। হয়তো কাকা আম্মার উৎকণ্ঠা পাঠ করতে পেরেছিলেন। আম্মা আব্বা মারফত দাওয়াত পাঠাতেন। আর কাকা আমাদের পড়াশুনার ক্ষতি হবে বলে এড়িয়ে যেতেন। আম্মা আর কাকা ব্যতিরেকে কেউ জানলো না আড্ডার রসভঙ্গের কারণ।

দেখতে দেখতে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলো। বুবুর বিয়ে হয়েছে, চাকরি করছে। আমি কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স শেষ করেছি তখন। আব্বা রিটায়ার করেছেন এবং রিটায়ার পরবর্তী কালে প্রায়শঃ ভীষণ অসুস্থ থাকতে লাগলেন। ঢাকার ডাক্তাররা ক্যান্সার শনাক্ত করলেন। এর চার মাসের মাথায় আব্বা বিছানায় পড়লেন। আম্মার স্কুল, সুমি আর মনার কলেজ থাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আব্বাকে একাই থাকতে হতো। একদিন দুপুরে পান্নাকাকা বুবু বন্ধু আখতারকে আব্বার খোঁজ-খবর নিতে পাঠান। সেদিন আখতারের সাথে আব্বার কী কথা হয়েছিল জানা যায় না। কিন্তু আখতার রোজ সন্ধ্যার দিকে আব্বার খোঁজ নিয়ে যেতো। আর পরদিন থেকে পান্নাকাকা আব্বার দ্বিপ্রাহরিক আড্ডার একান্ত সঙ্গী হিসেবে বহাল হলেন। শুধু আড্ডাই নয় আব্বার দুপুরের ঔষধ পথ্য খাওয়ানোর ভারটাও কাকা নিজ হাতে তুলে নিলেন। আব্বা কাকার পরস্পরের প্রতি নির্ভরতার স্মারক হিসেবে সম্বোধন আপনি থেকে তুমিতে নামলো। কাকার এই আচানক প্রত্যাবর্তনে আম্মা বহুদিনের চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলো ফেলবার সুযোগ পান। দু’জনের মাঝে নিঃশব্দে রচিত হয় এক চুক্তি, পরম আস্থায় আর নিছকই স্বাভাবিকতায়।

আম্মার স্কুলমাস্টারি আর আব্বার পেনশনের টাকায় বাড়ি এবং চিকিৎসার খরচ চালান এক অসম্ভব পর্যায়ে পৌঁছে। আব্বাও ক্রমাগত সেটা টের পাচ্ছিলেন। তিনি তাঁর ইহলৌকিক কর্তব্য সমাপ্ত করবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। একে একে তিনি ভাইদের ডাকিয়ে বাড়ির জমিজমা কিছু বিক্রি করান আর কিছু আম্মার নাম করে দেন। পান্নাকাকা এই দুঃসময়ে প্রায় জোর করে আব্বাকে দিয়ে বিহারীদের ছেড়ে যাওয়া কলোনির একটা বাড়ি কেনান। বাড়ির বন্দোবস্ত হলে আব্বা, আম্মা আর পান্না কাকা আমাদের নিয়ে পরিকল্পনায় বসেন। বুবুকেও ঢাকা থেকে আনানো হয়। পুরো বাড়িজুড়ে আসন্ন মৃত্যুর প্রস্তুতি চলে।

নতুন বাসায় ওঠার পর আব্বা তাঁর আকাঙ্ক্ষানামা পেশ করেন। সেদিন পূর্ণিমা ছিলো। বারান্দায় আব্বার বিছানা দেয়া হয়। আমরা সবাই ঘিরে থাকি আব্বাকে। সেদিন আব্বাকে দেখে প্রথম উপলব্ধি করি যে শ্বাস নেয়াটাও যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। আব্বা ভীষণ শ্বাসকষ্ট নিয়েই শুরু করেন, “রানী, রানীর আম্মা এবং পান্না তোমাদের সামনে আমার কিছু জিনিস ফয়সালা করার আছে। বাড়ি এবং জমিজমার ব্যবস্থা আমি আমার সাধ্যমতো করছি। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।”

বুবু আব্বাকে ভরসা দিতে চেষ্টা করে। “আব্বা আপনে খামোখা এ্যতো ভাবতেছেন ক্যান? আপনার শরীরটা একটু ঠিক হৌক তখন ভাইবেন। আমি তো আছি।”

আব্বা খানিক বিরক্ত হন বুবুর কথায়। “দেখ রানী তুই আছস আমি জানি। জামাই বাবাজি অত্যন্ত ভালো লোক, সময়ে-অসময়ে পাশে দাঁড়াইছে, তোরেও সাহায্য করতে বাধা দেয় নাই। তোর মা আমারে কিছু না কইলেও আমি জানি এই সংসারে কী পরিমাণ টাকা ঢালতেছস্। কিন্তু এই জোড়াতালি দিয়া চাইরটা মানুষের সারা জীবন চলব না।” এটুকু বলেই আব্বা হাঁপাতে থাকেন।

পান্নাকাকা আব্বার হাতটা ধরে থাকেন, “কাশেম তুমি কথা শেষ করো। ভাবি, রানী, মনি তোমরা সবাই মনোযোগ দিয়ে শোন। প্রশ্ন থাকলে পরে করো।”

আব্বা হাঁপাতে হাঁপাতেই বলেন, “আমি যাবার আগে মনির বিয়ার একটা বন্দোবস্ত করতে চাই। তোমাদের বা মনির কোন পছন্দ থাকলে আমারে জানাও। আমি না থাকাকালীন অবস্থায় সুমি আর মনার পড়াশুনা কোনোভাবে বন্ধ হইতে দিবা না। এবং মোমেনা আমার অবর্তমানে যে সিদ্ধান্ত নিবে সবাই মাইনা নিবা। কোন পরামর্শ লাগলে পান্নারে স্মরণ করবা।”

এর পরে প্রশ্ন থাকলেও কেউ তা উচ্চারণের ক্লেশ বোধ করে না। সবাই সবার দায়িত্ব বুঝে নিয়ে সেদিন গাঢ় নিরবতায় স্বস্তি খুঁজতে থাকে। পাথরসম নিস্তব্ধতা আমাদের অনুভূতিতে প্রোথিত হয়—সমবেত নৈঃশব্দে মাতম্ পল-মিনিট-ঘণ্টা বেয়ে অনন্তে মিলায়। সকলের মাতমের প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করে আব্বাও ঐ রাতেই গত হন। তাঁর দীর্ঘ দিনের যন্ত্রণার অবসান ঘটায় আমরা খানিক স্বস্তিতে তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করি। পূর্ণিমার স্বচ্ছ আলোয় মাতম্ গাঢ়তর হয়।

আব্বার মৃত্যুর পরে আমি কলেজে মাস্টারিতে ঢুকি। আখতারের সাথে সংসার পাতি, আম্মা, কাকা আর বুবুর ইচ্ছায়। আম্মা শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন—একদিনের জন্যেও কারো মুখাপেক্ষী হননি। এমনকি কাকার কাছ থেকে পরামর্শ ব্যতিরেকে কোন প্রকার সাহায্য তিনি গ্রহণ করেননি। আব্বা যাবার পরে কাকাও অনেক বেশি কর্তব্য সচেতন হয়ে ওঠেন। আমাদের সংসারের ভালো-মন্দ দেখবার সাথে সাথে নিজ সংসারের ভাবনা—মূলতঃ মুক্তকে নিয়ে ভাবনা তাঁকে পেয়ে বসে।

“মোমেনা বেগম, মনির বিয়ের পরে মনে হচ্ছে আচমকাই মুক্তটা আমার বড় হয়ে গেছে।” কাকা নতুন বাড়ির বারান্দায় বসে স্বগতোক্তি করেন।

“বড় তো হইছে পান্না ভাই। মেয়ে তো আপনার সংসার সামলাইতে বয়সের বহু আগে বড় হইছে।” আম্মা বারান্দায় অন্যপ্রান্তে তরকারি কুটতে কুটতে উত্তর দেন।

“মণীষ বা বৌদি বেঁচে থাকলে হয়তো ভিন্নভাবে ভাবতেন। আমার কাছে কন্যার পড়াশুনা মুখ্য ছিল, সেটা সে শেষ করেছে। নিজের মতো চাকরি করছে। এর বাইরে ওর কোন ইচ্ছা আছে কিনা কখনো জিজ্ঞেস পর্যন্ত করিনি।”

“আপনে আসলে ওরে ছাইড়া থাকবার কথা ভাবতেই পারতেছেন না। আর কইন্যাও হইছে আপনার মতো, আপনারে ফালায়া কিছুই করব না। মনি কইল এক পোলারে তার খানিক পছন্দ হইছিল। তো পোলা আপনার নামে কিছু কইছিল, ওমনি তারে বিদায় কইরা দিছে।” আম্মা তথ্যটি দিয়ে রান্না করতে ঢোকেন।

কাকা আম্মার দেয়া নতুন তথ্যে অনেক গৌরব বোধ করেন না বরং বিষণ্ন হয়ে নানা কিছু ভাবতে থাকেন। এরপরের দিনগুলো কাকা বিষণ্ন চেহারায় কাটিয়ে দেন। কী কী করা উচিৎ তা নিয়ে আম্মার সাথে তিনি বিস্তর আলাপ করেন। কিন্তু ভাবনাকে কাজে রূপ দিতে তাঁর উদ্যোগ বা উদ্যম কোনোটাই বিশেষ দেখা যায় না। আম্মা কাকার দোটানা দেখে নিজেই উদ্যোগী হন কথা বলতে।

আম্মা মুক্তর বিছানায় বসে ভণিতা ছাড়াই কথা পাড়েন। “মামণি তুমি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, সেই ভরসায় কিছু কথা বলতে চাই। আশা করি তুমি চাচিরে ভুল বুঝবা না।”

মুক্ত মিটমিট করে হাসতে থাকে, “চাচি কম তীক্ষ্ণ হলেও আমি ভুল বুঝতাম না। বাবা নিশ্চয়ই কোন গুরুতর সমস্যায় পড়েছে। নইলে আপনি আসতেন না।”

“এই না হইলে পান্নাভাইর বেটি। তুমি তো মামনি কথা শুরুর আগে ধইরা ফেলছ। আসলে তোমার বাবা তোমার ভবিষ্যৎ নিয়া খানিক উদ্বিগ্ন, আর তোমারে সরাসরি কিছু বলতেও পারতেছেন না।”

“চাচি আমার ভবিষ্যৎ তো অত্যন্ত উজ্জ্বল। পড়াশুনা চাকরি সব ঠিকঠাক চলছে।” মুক্ত হাসতেই থাকে।

“সে তো চলতেছেই। এইবার ঘর-সংসারের কথাও ভাব একটু।”

“সেটা না ভেবে কি উপায় আছে চাচি। বাবা কি আর সংসারের কথা ভাবে নাকি? সব তো আমাকেই দেখতে হয়।”

“মা অনেক তো বাবারটা দেখলা এবার নিজেরটাও ভাব।”

“নিজেরটাই দেখছি। আমি বাবা ছাড়া থাকতে চাই না। অবশ্য উনি যদি তাই চান তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।” মুক্ত বিষণ্ন আর অভিমানাহত চোখ দুটো লুকাতে ঘাড় গোঁজ করে নিচে তাকিয়ে থাকে আর পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝেতে আঁকিবুকি করতে থাকে।

দেখতে দেখতে রেল ইঞ্জিনিয়ার দেবেশের সাথে মুক্তটার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। কন্যাসম্প্রদান কালে কাকা ধুতির খুঁটে চোখ মুছলেও মুক্ত শক্ত হয়ে থাকে। বিদায় কালে একটা কথা পর্যন্ত বলে না কাকার সাথে। অতিথিদের কেউ বধূকে ভীষণ শক্ত, কেউ বা অধিক শোকে পাথর বলে ঠাহর করে। কেউ ওর অভিমানটা দেখে না। আর ও নিজেও বোঝে না অভিমানটা কী নিয়ে বা কার প্রতি।

বিয়ের পরে মরিয়া হয়ে শহর ছাড়ল মুক্ত। বুবুন হবার পরে কাকাকে দেখতে আসাও বন্ধ করে দিল। কাকাই ওদের গিয়ে দেখে আসতেন। কাকা ভীষণ কষ্ট পেলেও কাউকে কিছু বলতেন না, পাছে মুক্তকে ছোট করা হয়। তবে উনি সবচেয়ে বড় আঘাত তখন পান যখন মুক্ত-দেবু কিছু না জানিয়ে কোলকাতায় পাকাপাকি থাকবার সিদ্ধান্ত নেয়। কোলকাতা যাবার আগে, দেবু পাটগুদামটাও বিক্রি করে দেয়। এ বিষয়ে মুক্তর নিরবতায় কাকা ভীষণ আহত হন। একের পর এক আঘাতের পর কাকা নিস্পৃহ থাকবার সিদ্ধান্ত নেন। হাসিমুখে ওদের সীমান্ত পর্যন্ত এগিয়ে দেন। একটাই তারকাটার বেড়া মাত্র, এক নিমেষে আপন-পর, নিজদেশ-পরদেশের বিভাজন মুখের উপর ছুঁড়ে মারে, অসংখ্য ম্মৃতি সেই বিভাজনকে মূর্ত করে, আর আনদেখা ভবিষ্যতের অবয়ব গড়ে।

মুক্তকে বিদায় দিয়ে ফিরবার পরে কাকা আরো চুপচাপ হয়ে যান। রোজ সন্ধ্যায় আমার বা আম্মার বাসায় বিকেলে চা খেতে আসতেন। অধিকাংশ সময় আপনমনে টেলিভিশন দেখতেন। আটটার খবর শুনে বাড়ি ফিরতেন। আব্বার মৃত্যুর পরে অনেকের সাথে কাজের সম্পর্ক থাকলেও আড্ডা দেবার মতো বন্ধু আর হয়নি কাকার। আম্মা, আখতার অর আমার সাথে যা একটু সময় কাটাতেন। বিহারী আর বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত এ শহরে হিন্দু, তাও ষাটের দশকে আশা, আত্মীয়-পরিজনহীন পুরুষের প্রান্তিকতা যতটুকু হবার কথা, কাকার অবস্থা ছিল তার চেয়েও খানিক প্রান্তিক। বাজারের চলতি আড্ডায় কেমন যেন বেমানান ছিলেন তিনি। বরাবরই। গৃহী হওয়াই হয়তো স্মিত এই পুরুষটার সবচেয়ে ভাল জায়গা হতে পারত। কিন্তু তিনি তো নিবিষ্ট হয়েছেন ব্রহ্মচর্যে।

রিটায়ার করবার বেশ ক’বছর পর আম্মা হঠাৎ ধুম করেই স্ট্রোকে মারা গেলেন, কাউকে কিছু বলবার সুযোগ পাননি। সেদিনটা স্পষ্ট মনে আছে। হাসপাতাল থেকে আম্মার লাশ এসেছে মাত্র, গোসল দেবার জন্য ভেতরের উঠানে নিমতলায় রাখা হয়েছে। কাকা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “মনি মা, মোমেনা দুনিয়ার হিসাব চুকিয়ে গেছে। কাশেম মারা যাবার পর ও বোধহয় তোমাদের জন্যই বেঁচে ছিল শুধু। কিন্তু আমাকে একটু বলে গেলেই পারতো। আমিও ওর কাছ থেকে হিসাবটা শিখে নিতাম, তাহলে অপ্রয়োজনীয় এ জীবনটাকে আর বয়ে বেড়াতে হতো না।”

আম্মা যাবার পরের ক’দিন কাকা নিয়মিতই আমার কাছে আসতেন। বসে থাকতেন চুপচাপ। কথা বলা অনেক কমিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কোনোরকম সান্ত্বনা খুঁজতে আমার ভরসা হতো না। মনে হতো এই লোকটারই সেটা ভীষণ দরকার। শঙ্কা নিয়ে অপেক্ষা করতাম এই বুঝি এমন কিছু বলেন যা শুনবার প্রস্তুতি আমার হয়নি। কোনো এক সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে সেটাই বললেন, “মামণি এবার যে কাকাকে বিদায় দিতে হয়।”

“কই যাবেন আপনি?” নিজেকে আড়াল করেই আমি জিজ্ঞেস করি।

“কয়দিন ধরেই মুক্ত আর বুবুনটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। ভাবছি দেখতে যাব ওদের।” কাকা এক মনে নিমগাছটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। কুয়াশা আর আলো মিলে নিম গাছটাকে কেমন বিষণ্ন দেখায়।

“ওহ।” বুকের উপর থেকে পাথর নেমে যায়। “দেখতে দেখতে তো কতগুলো বছর পার হলো, একবার দেখতে গেলেন না। বেড়িয়ে আসুন ক’দিন, ভালো লাগবে।”

“না রে মামনি, একেবারেই যেতে চাই। মেয়ে না হয় আমার উপর অভিমান করে আছে, আমি কি ওকে ছাড়া থাকতে পারি?” অনেক দিন পরে কাকা মিষ্টি করে হাসেন।

“মানে? দোকান, বাড়ির বন্দোবস্ত? যোগাড়-যন্ত্র?” লঘু সব নিমিত্তকে আমি বড় করে তুলবার প্রাণপণ চেষ্টা চালাই। কাকার মুখের হাসিখানাকে কোথাও জায়গা দিতে পারি না।

“আমি সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছি, গোছগাছ প্রায় সারা। এবার মায়ের আজ্ঞা হলেই বেরিয়ে পড়ি।”

আমার খানিক ত্রস্ত লাগে, আমি কিছুতেই ঠাহর করতে পারি না কার বাস্তুচ্যুতি ঘটছে। ভীষণ খাঁ খাঁ লাগে আমার। শূন্য দৃষ্টি মেলে কুয়াশায় এমন এক পথ খুঁজতে থাকি যার জমিন কখনোই আমার বানানো হয়নি।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি আর আখতার কাকাকে সীমান্ত অবদি পৌঁছে দিয়ে আসি। কাকাকে শক্ত করে জড়িয়ে থাকি কতক্ষণ—এই প্রথম, আর হয়তো শেষবারের মতো। আমরা অনেক কিছু বলতে চাই, গলা ধরে আসে, অথচ শেষে বলা হয়, “পানির বতোলটা নিছেন তো?” অথবা “গিয়েই ঠিকানা পাঠাব, লিখবে কিন্তু সময় করে।” অগোছালো কথার স্রোতে সময় দৌড়ে পালায়। পাসপোর্ট হাতে মানুষের লাইন কাকাকে ইমিগ্রেশন বুথের দিকে ঠেলে। তখনো আমাদের কিছুই বলা হয় না। পরস্পরের নিরবতার ভাষা পাঠ করতে করতে এ যাত্রা আমরা বিদায় নিই, ভোঁতা বোধ আর নাম না-জানা অগণিত অনুভূতি সমেত।

 

মনির ম্মৃতি-পরিক্রমা শেষ হলে কোলে-রাখা বাকি চিঠি দুটোতে সে চোখ বোলায়। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ভীষণ শূন্যতা আর অবসন্নতা শরীরের ভেতর আজিব রসায়ন সৃষ্টি করে—পলকের মতো হালকা, কাটা ঘুড্ডির মতো সুতো ছেঁড়া আর ভাসতে-থাকার অনুভূতিতে মেলতে থাকে সারা শরীর। শিকড় ছেঁড়ার দুরূহ অনুভব ক্লান্ত করে। সেই ক্লান্তিসমেত চিঠি দুটোর প্রতিটা অক্ষর আলাদা করে মনি পড়ে এবার, আর একবার।

ডিয়ার মিজ মনি,

নমস্কার। আই হোপ ইউ আর কীপিং ওয়েল। লেট মী ইন্ট্রোডিউস মাইসেল্ফ, আয়্যাম হরিশ। আই ওয়াজ ইন দ্য সেম আশ্রম ইন পন্ডিচেরী উইদ শ্রীমান পান্নালাল। ইট ইজ রিয়েলি বীয়িং ডিফিকাল্ট ফর মী টু লেট ইউ নো দ্যাট পান্নালালজি হ্যাজ পাস্ড এ্যাওয়ে অন এইটথ মার্চ, ২০০৪। এভরি রিচ্যুয়াল অব ক্রেমেশন হ্যাজ বীন ডান ইন দ্য বেস্ট পসিবল ওয়ে আশ্রম ক্যুড ডু।

আই ডোন্ট নো ইয়োর রিলেশন উইদ পান্নালালজি, বাট উই আর সরি টু বদার ইউ এ্যাজ উই ক্যুড ফাইন্ড ইয়োর এ্যাড্রেস অন এ্যান এনভেলপ। উই আর সেন্ডিং ইউ হিজ বিলংগিং এ্যালং উইদ এ্যান আনফিনিশড লেটার হুইচ প্রিজুম্যেবলি হী হ্যাড বীন রাইটিং অন দ্যাট ভেরি মর্নিং। মে হিজ সোউল রেস্ট ইন পীস!

আওয়ার কনডোলেন্স ইজ উইদ ইউ। মে ইউ হ্যাভ দ্য স্ট্রেন্থ টু ওভারকাম দ্য সরো !

ইয়োরস ট্রুলি
হরিশ রয়
১০.০৩.২০০৪]

৮ই মার্চ ২০০৪
পণ্ডিচেরী

 
স্নেহের মনি মা,

আশা করি ভগবানের কৃপায় তোমরা সকলে ভাল আছো। মোমেনা, তোমার কথা ক’টা দিন ভীষণ মনে হচ্ছে। কী লিখতে বসেছি, কেন লিখতে বসেছি বলা দুরূহ। হয়তো মোমেনা বেগমকেই বলা যেত সব কথা। হয়তো যা বলতে বসেছি আজ তাও আসলে তোমাকে শুনিয়ে মোমেনাকেও শোনানো, হয়তো আমাকেও।

দেবু, মুক্ত ও বুবুনকে দেখার আঁশ আমার মিটে গেছে। ওরা সবাই ভাল আছে। অনেক বদল ঘটেছে ওদের, ঠিক কী—তা বলতে পারব না। নতুন জায়গায় মানাতে হলে ওটাই বোধ হয় ভাল রাস্তা। আমি ওদের জন্য অপ্রাসঙ্গিক উপস্থিতি, যা কেবল অস্বস্তি দেয়—বারবার আপন অতীত মনে করিয়ে দেয়। পর ভিটাকে আপন করবার রাস্তা, এ উপস্থিতি কেবল বন্ধুর হয়। মাগো, এতোটা অবিবেচক তো আমি কোনোকালে ছিলাম না যে কন্যার আয়েশ-আরাম হারাম করব। ওদিকে সব দাবি ছেড়েই বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছি। ফেরবার মন নেই। এদেশ থেকেও যাবার সময় সকল বন্ধন ছিন্ন করেই গিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল পণ্ডিচেরী আশ্রম যাব কোন এক কালে, সেকাল বোধহয় চলে এসেছিল।…

(১৫ই মে ২০০৬, সিঙ্গাপুর।)

seutysabur@gmail.com

free counters


3 Responses

  1. মোয়াজ্ঝেম আজিম says:

    পড়লাম গল্প কিন্তু অনুভূতিটা উপন্যাসের। গল্পের জন্যে এটা ভাল না মন্দ বুঝতে পারছি না। পান্নালালের পুরো জীবনটা যেন চোখের সামনে শ্যাওলার মতই ভাসছে।
    ধন্যবাদ লেখককে।
    মোয়াজ্জেম আজিম

  2. স্বাধীন says:

    অসাধারণ এক গল্প পড়লাম। লেখককে ধন্যবাদ।

  3. মনি says:

    পান্নালালের গল্প পড়ে আমার বাবার বন্ধু তপন কাকার কথা খুব মনে পড়ছে,যার সাথে আামাদের ছিল আত্মার সম্পর্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.