পাঠ, পুনর্মুদ্রণ

ইলিয়াসের গল্প, মেডিকেল তত্ত্ব ও টেকনোলজি সংক্রান্ত ভাষ্য

farhad_mazhar | 2 Sep , 2010  

elias_1.jpg……..
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১২/২/১৯৪৩ – ৪/১/১৯৯৭)
……..

১৯৪৩ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার গোটিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবার বাড়ি বগুড়া জেলায়। বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) এবং মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারি ছিলেন। মা বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। ইলিয়াসের ডাক নাম মঞ্জু। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন ১৯৬৪ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাইমারী শিক্ষা বোর্ডের উপ পরিচালক, ঢাকা কলেজের বাংলার প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ইলিয়াসের মৃত্যুর পরে ফরহাদ মজহারের এ লেখাটি বাংলাবাজার পত্রিকার ১৩ জানুয়ারি ১৯৯৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। প্রায় সাড়ে তের বছর পরে ফরহাদ মজহারের সৌজন্যে লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো। এ লেখায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি গল্প ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’কে ঘিরে লেখকের আলোচনা অগ্রসর হয়েছে। তিনি সে সময়ে আলোড়ন তোলা ইলিয়াসের ‘ছোটগল্প’ বিষয়ক জনপ্রিয় ধারণাকে এ লেখায় চ্যালেঞ্জ করেছেন। বি. স.

 
আম্মার ঘরে আমরা কী ফেলে এসেছি?

খুবই কম লিখেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আমাদের জন্য এটা ভাল নাকি মন্দ বলা মুশকিল। তবে তাঁর খুব লোকশান হয়েছে কি? এত কম লিখে বাংলাসাহিত্যে নিজের জন্যে একটি জায়গা করে নিতে পারা দারুণ একটা ব্যাপার। ঈর্ষা করার মত। তবুও আমাদের সেই দোনামোনা থাকে না যে আখতার সবাইকে একটু চীট করেছেন। প্রতারণা। বোধ হয় তিনি আরো লিখতে পারতেন, লিখেন নি। তিনি আর লিখবেন না এটা মস্ত বড় লোকশান। আমরা ঠকেছি।

ইলিয়াস সম্পর্কে এত দ্রুত কিছু লিখতে বাধ্য হবো, এটা আমি কক্ষণোই ভাবি নি। ইলিয়াস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একবার তাঁর সব বইপত্র জোগাড় করে বসেছিলাম। তখনও ‘খোয়াবনামা’ হাতে আসে নি। পড়ে-টরে নিজেকে শুধালাম, আচ্ছা ইলিয়াস মশায়ের সবচেয়ে দারুণ গল্প কোনটি? তখন মাথা চুলকিয়ে থুতনি মুছে ঢের ভাবাভাবি করে মনে হোল, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এই সিদ্ধান্তে নিজেই নিজের কাছে খুব অবাক হয়ে গেলাম। এই গল্পটি ইলিয়াসের প্রথম দিককার রচনা। ষাট দশকের দিকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকি ঢাকা হলে, তখন আমি এই গল্পটি পড়েছি। সেই সময়েই গল্পটি আমার করোটির মধ্যে প্রবেশ করেছিল, এরপর আর বের হওয়ার দরোজা খুঁজে পায় নি।

সন্দেহ হয়েছিল তরুণ বয়সে পাঠ করেছি বলে গল্পটির ওপর খানিক স্নেহ বোধহয় লেপ্টে গিয়েছে। ওটা মোছা দরকার। গল্পটিতে বড়জোর বয়ঃসন্ধি, যৌনতা এবং ‘সোনার শৈশব’ সম্পর্কে নস্টালজিয়া ছাড়া আর কিছু নেই। এই সত্য কায়েম করার জন্য উঠে পড়ে লাগলাম। খুঁজে খুঁজে গল্পটির খারাপ দিকগুলো বাছতে লাগলাম। শুরুটা এইরকম:

‘এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তায় রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বাইছে, ‘তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।’ আমার জানায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিড়ে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে। ছম ছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনদিন নয়। বৃষ্টি-বুনোট এইসব রাতে আমার ঘুম আসে না। বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস..’

এই রকম ইন্টেলিজেন্ট ভাষা নিয়ে ট্যাঁ ফোঁ করার দরকার নেই। ইলিয়াসের এই শক্তি সম্পর্কে কে না জানে!! এগুলো কাব্য সন্দেহ নেই। ছোটগল্পে কাব্যমূলক ভাষার আধিপত্য কিছুটা থাকবে। ইলিয়াস সাহিত্যের সেই ধারায় পড়েন যাঁরা বাক্যের মধ্যে কাব্য করা ছাড়তে চান না। চরিত্র, কাহিনী, ঘটনাক্রম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা প্রতীক আর কল্পনাপ্রতিভার মজা আর বাক্যের মধ্যে উৎপাদিত উপমা উৎপ্রেক্ষার ফারাক আছে। কবিতার যা স্বভাব, ছোটগল্পে যা গুণ বা অলংকার, উপন্যাসে সেটা বাড়তি বোঝা হয়ে উঠতে পারে। ইলিয়াসের যখন বয়েস বেড়েছে তখন তাঁর ভাষা অনেকখানি পাল্টিয়েছে। কিন্তু অনেক সময় বোঝাটা তিনি বয়ে বেড়াতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’-কে কবিতা হিশাবে পাঠ করলে ক্ষতির চেয়ে লাভের সম্ভাবনা বেশি।

বৃষ্টি, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া, আর্দ্রতা, জলের চুপসানো আদর কিম্বা আলিঙ্গন–এই সকল প্রতীকাদির মধ্যে যৌনতা প্রবল ভাবে হাজির থাকে। এর একটা সহজ ব্যাখ্যা হোল, সঙ্গম ক্রিয়া একটি আর্দ্র ব্যাপার। হিন্দি সিনেমাগুলো সেন্সরের কারণে নায়কনায়িকাদের মিলন দেখাতে পারে না। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একটি কামার্ত গানের সঙ্গে নৃত্যের সিকোয়েন্স থাকে। এমনকি বিরহের মধ্যেও কাম আছে, বিচ্ছেদের মধ্যে শারীরিক আলিঙ্গনের সাধ তীব্র হয়ে ওঠে। সেই সকল ক্ষেত্রেও বর্ষার মধ্যে নায়িকার ভিজে যাওয়ার একটি দৃশ্য থাকে, আর কণ্ঠে বিচ্ছেদের গান। প্রতীক যে কী পরিমাণ মজার হতে পারে বৃষ্টি তার একটা উদাহরণ।

‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’-য় রঞ্জুর কাছে বৃষ্টি ‘ভারি অন্যরকম’। গল্পের শেষে রঞ্জুর নিঃশ্বাস শেষ হয়ে যাবার খবর আছে।

— ‘ভিজে শিমুল ফুলের রাশি স্তূপাকার পড়ে রয়েছে ওর চোখের ওপর। বুকে জড়িয়ে ধরবার সাধ করে হাত দুটো তুলতে গেলে; ওর হাতে শিমুল ডাল শান্ত অনিবার্য ছড়িয়ে রয়েছে। শুঁকবে বলে রঞ্জু জোরে নিঃশ্বাস নিতে চাইলো; কিন্তু ওর নিঃশ্বাস তখন শেষ হয়ে এসেছে, রঞ্জু সুবাস নিতে পারলো না।’

ফর্মুলা মাফিক এই গল্পে যৌনতা এবং মৃত্যু দুটোই আছে। এর একটা পাক্কা ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যা খাড়া করা যায়। এই ভেবে পুলক বোধ করি যে বয়ঃসন্ধি, যৌনতা এবং মৃত্যু সংক্রান্ত চেনাজানা থীম নিয়ে ইলিয়াসের একটি কবিতার বেশি মূল্য এই গল্পটিকে দেওয়া যায় না। কিন্তু মাথাটা খচ খচ করে। একদিন রাতে এগারোটার পর বৃষ্টি ভেজা শহরে রঞ্জু নামক এক বালক, কিম্বা কিশোর কিম্বা একটুকরা যুবক নিরুদ্দেশ যাত্রার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। তারপর শহরের কোন এক অজানা জায়গায় যার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে গেল। এই কি গল্প? এটা গল্পের মোটেও আসল কাহিনী নয়। এর যৌনতা, বয়ঃসন্ধি, মৃত্যু, নস্টালজিয়া সবই ইলিয়াসের ধার করা জিনিস। বাংলা ভাষাসহ বহু ভাষায় এই থীম নিয়ে হাজারো গল্প লেখা হয়েছে। কিন্তু কোথায় তার আসল গল্পটি লুকিয়ে রাখল ইলিয়াস? ইলিয়াসের থলির মধ্যে হাত চলে যায়। হাতড়াতে শুরু করি।

‘আম্মার ঘরে কি যেনো ফেলে এসেছি।’ এখানে এসে প্রথমে হোঁচট খেতে হয়। আম্মার ঘরে আমরা কি ফেলে আসি? নাড়ি? নাভির অন্য অংশ? কী ফেলে আসি? রক্ত এবং প্লাসেন্টা নিশ্চয়ই নয়। জন্মের তীব্র বেদনা, রক্তপাত এবং প্রাণোৎপাদনের আনুষঙ্গিক টিস্যু কোষ ও পিণ্ড ফেলে দেওয়া হয়। ওটা জন্মের খরচ। ওটা আদায় হয়ে যায়। একে আমরা ফেলে আসা বলি না। কারণ এগুলো আম্মার ঘরে কেউ জমিয়ে রাখে না। ওগুলো পরিত্যক্ত জিনিস। কী তাহলে ফেলে আসি আমরা আম্মার ঘরে? আম্মার ঘরে তো আম্মা একা নন আরো আছেন। তাহলে আম্মা আর আব্বার কাছে আমরা কী ফেলে আসি?

রঞ্জু আম্মার ঘরে কী যেনো ফেলে এসেছে তাই তার ভাল্লাগছে না। ঘুম আসছে না। সন্ধে বেলা, তখনো আকাশ ভারি মেঘলা চারদিকে আঁধার করে আসছে এই ঘরে কি যেনো ফেলে গেলাম।

রঞ্জু তার ফেলে আসা জিনিস খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে। রঞ্জুর ঘর থেকে মাঝখানে একটা ঘর পার হয়ে আম্মাদের ঘর। অর্থাৎ আম্মা এবং আব্বার ঘর। দরজায় ছোটো একটা ফুটোয় ছুচোলো ঠোঁট রেখে নিচু ও নরম স্বরে রঞ্জু ডাকে, আম্মা দরজা খোলো, দরজা খোলো। রঞ্জু আম্মাদের ঘরে কিছু একটা ফেলে এসেছে। এই ফেলে আসাটাই আসল গল্প। এই গল্পে মৃত্যু ও যৌনতার মতো অতীব গুরুগম্ভীর জিনিসপত্র খুঁজে লাভ নেই। এটা হচ্ছে, রবীন্দনাথের ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন, মনরে আমার’ ধরণের নষ্টালজিয়ার বিপরীতে তৈরি করা অন্য প্রকার অন্বেষণ।

‘সাত পাওয়ারের বাল্বে জ্বলছে ভিজে আলো, আর চিন চিন করে ওঠে হঠাৎ, কতোদিন আগে এক বাদলে আশিকের সঙ্গে ফিরলাম সাতটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে, তুই ফেলে এসেছিস কারে, সেই সোনার শৈশবে ভুল করে দেখা একটি স্বপ্ন, স্বপ্নের মতো টল টল করে।’

সেই অন্বেষণটা কী? কী আমরা আম্মার ঘরে ফেলে আসি? সোনার শৈশবে ভুল করে দেখা খোয়াব? আমাদের ইতিহাস? আমাদের উন্মেষের জন্মের পরিগঠনের গড়ে উঠবার প্রক্রিয়া? এটা কি খোয়াব? খোয়াবনামা? ইলিয়াস আম্মার ঘরে একটা খোয়াব ফেলে এসেছিল। খুঁজতে খুঁজতে বহু বছর পর কাৎলাহারের বিলের চতুর্দিকে কুয়াশার মতো তাকে পেয়ে যায়। নাকি পায় না।

আমরা কখনোই বুঝতে পারি না আম্মার ঘরে আমরা কী ফেলে আসি। নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস রচনার এটাই হচ্ছে প্রথম পাঠ। রঞ্জু কখনোই বুঝবে না ফেলে আসা জিনিসটা আসলে কী। আমরা কখনোই জানবো না আমরা কী ফেলে আসি। না, বিরহকাতর রবীন্দ্রনাথের মতো কোন ব্যক্তিকে তো নয়ই। ইনোসেন্ট কিশোর যে বয়সে শুধু আম্মা আব্বা ভাইবোনদের জানে এবং আম্মার ঘর থেকে মাত্র একঘর দূরে ঘুমায় জরায়ুর ওম যার গা থেকে এখনো যায় নি, এমনকি দু এক ফোঁটা রক্ত এবং বাবার ‘লবণ-লাল’ যার গায়ে এখনো লেগে আছে–সে আবার কোন ব্যক্তিকে হারাবে? ফলে তার হারানো জিনিসটাকে ইলিয়াস ঠিক যেভাবে লিখেছেন তার বেশি মানে করা যাবে না। কী যেনো ফেলে এসেছি আম্মার ঘরে–এই হোল বাল্যের প্রথম অন্বেষণের তৃষ্ণা, প্রথম তাগিদ। আম্মার নাড়ি থেকে আলাদা হয়ে আমরা মোটেও আর বড় হতে চাই না। বড় হওয়ার কষ্ট অনেক। আমাদের মরে যেতে ভালো লাগে। আম্মার ঘর থেকে এক ঘর দূরে ঘুমুই, অথচ ভাল্লাগে না। আম্মার জরাযু থেকে কতোটুকু দূরেই বা থাকি? তবু বৃষ্টির দিনে সব মনে পড়ে যায়। এ্যামনায়োটিক তারল্যেব ধ্বনি এবং বাবার বলকানো লালের ছিটে এসে গায়ে লাগে। কোথা থেকে হঠাৎ তালগাছের পাতা উড়ে এসে ইলেকট্রিকের তারে ঝুলতে থাকে। এই সময়টায় আমরা আম্মার ঘরে ফেলে আসা কী যেনো সেই জিনিসটাকে খুঁজতে থাকি–যার নাম আমরা অনন্তকালের জন্য ভুলে গিয়েছি, কোনদিনই আর স্মরণ করতে পারবো না। এই তাগিদ থেকে আমরা ‘চিলেকোঠার সেপাই’ কিম্বা ‘খোয়াবনামা’ অবধি পৌঁছাতে পারি। যা খুঁজছি তা আর কোনদিনই পাই না। কোনদিনই পাবো না। কিন্তু অন্বেষণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা তৈরি করি আমাদের অতীত, আমাদের ইতিহাস। আমরা নিজেরা নিজেদেরই নির্মাণ করি।

ইতিহাস বলে কিছু নেই, ইতিহাস আমরা নিজেরাই রচনা করি। মূর্খ ইতিহাসবিদদের ধারণা তারা নাকি অবজেকটিভ ইতিহাস লিখে থাকেন। এগুলো ডাহা মিথ্যা কথা। যিনি ইতিহাস লেখেন সেটা হবে তাঁর নিজেরই রচনা। ইতিহাস তো তাঁর ইতিহাস বইয়ের মতো ঘটে নি। কখনোই না। ফলে অন্য একজন ‘ইতিহাসবিদ’ যখন ইতিহাস লিখে থাকেন তখন দেখা যায় অন্য চিত্র, অন্য ব্যাখ্যা, অন্য রকম ইতিহাসের উপাদান উঠে এসেছে। এই সত্য ইলিয়াসের মতো আমাদের বাংলা সাহিত্যে কে জানত? মনোরম মনোটোনাস শহরের বৃষ্টি এবং তাঁর বয়ঃসন্ধি, মৃত্যু ও যৌনতার মধ্য দিয়ে আমরা আম্মার ঘরে ফেলে আসা কী যেন জিনিসটাকে অন্বেষণ করে বেড়াই। এই কাম এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী পথে আম্মার ‘শাড়ির ঘুম ঘুম গন্ধ’ নিয়ে খুঁজি। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক কিম্বা বালিকার শরীর ও আত্মার অভিন্ন তাগিদ ছাড়া এই ফেলে আসার মর্ম অনুভব করা যায় না। আম্মার থেকে যারা মাত্র এক ঘর দূরে ঘুমায়, কেবল তারাই এর মানে বুঝতে পারে।

ইতিহাস রচনা তাহলে একই সঙ্গে একটা শারীরিক ব্যাপারও বটে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ইনোসেন্স নিয়ে নিজের ইতিহাস নিজে রচনা করার জন্য ঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়তে হয়। এই মনুষ্যমূলক ইনোসেন্স আমরা প্রায় অধিকাংশই হাতিয়ে ফেলি। বয়েস হয়ে গেলে কেউ ‘বাঙালী’ কিম্বা ‘বাংলাদেশী’ আত্মপরিচয়ে এলমেলো হয়ে যায়। বুড়ো বয়েসটাই মহা ধান্দাবাজির বয়েস। আসলেই।

‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’কে আমি আম্মার-ঘরে-কিছু-ফেলে-আসার তাগিদ থেকে জাত ইতিহাস স্পৃহা হিশাবে পাঠ করছি বলে অনেকের ভুরু কুঁচকে যেতে পারে। তাদের জন্যে আমার আছে পুলিশ। এই পুলিশটি প্রথমে ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গার রূপ নিয়ে রঞ্জুর সামনে হাজির হয়। রঞ্জু দুর্গার সঙ্গে রেলগাড়ি দেখে। অতঃপর সিঁদুরের কৌটা চুরি করে তাকের ওপর লুকিয়ে রাখাটাও বিভূতিভূষণের পুরো উপন্যাসটি সহ সত্যজিতের সেলুলয়েডে দেখে ফেলে। ‘দূর্গার শরীর একজন নিপুণ প্রতিমা হয়ে রঞ্জুর সমস্ত স্মৃতিকে গেঁথে রেখেছে–অসতর্ক মুহূর্তে ইলিয়াস এই স্বীকারোক্তিটাও এক জায়গায় করে। বাংলার যে ইতিহাসটাকে ইলিয়াস আম্মার ঘরে ফেলে এসেছে তার খানিক হদিস এখানে পাওয়া যায়। বোনের নিপুণ প্রতিমার মতো শরীর দেখে ভাইয়ের কী সৃষ্টি হয়? কাম? প্রেম? পাপবোধ? কী সেটা? সেই কারণে রঞ্জু উদ্বেল বুকে কলকল করে ওঠে, ‘‘দিদি’’। আর ঠিক এখানেই অসাধারণ ইলিয়াসের অপ্রতিরোধ্য শক্তিটা প্রকাশ পেতে শুরু করে। ইনসেস্টের পাপের, শাস্তি দেবার জন্যেই কি দুর্গা এখানে ‘পুলিশ’ হয়ে যায়? ইলিয়াস এখানে আম্মার ঘরে কিছু ফেলে আসার ইনসেস্ট (incest) আর দিদির প্রতি কামবোধের একটা শাস্তি বোধ হয় রঞ্জুকে দেবার চেষ্টা করে। সেই কারণেই কি রেনকোটে মোড়া দুর্গা হান্টার হাতে এগিয়ে আসে? কে জানে? কিন্তু পুলিশ সম্পূর্ণ অন্য রকম, অভূতপূর্ব একজন পুলিশ। এক মোহাজের বিহারির ভাষায় রঞ্জুর অতীব বন্ধু হয়ে যায়। এই আধা উঁর্দু আর আধা বাংলা বলা পুলিশ রঞ্জু। অর্থাৎ ইলিয়াসের বাবা দাদা সকলের ইতিহাস মুখ খুলতে শুরু করে। আমি কি এই অংশ পুরোটা তুলে দেব এখানে? এই অংশটি পাঠ করার সময় মনে রাখতে হবে উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের জন্য বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে। সেই সময়ের লিখা এই গল্প।

‘ওকে নিরনুভব ও স্নায়ুহীন করে গামবুট রেনকোটে মোড়া দুর্গা হান্টার হাতে এগিয়ে এলো।

‘কে?’ উত্তর না পেয়ে লোকটা ওর মুখোমুখি দাঁড়ালো ‘আপনি ? ইলিয়াস সায়েবের লড়কা না? কুথায় যাচ্ছেন?’

‘কোথাও না।’

‘এতে রাতে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো ?’ পুলিশ জিগ্যেস করলো, ‘ঘরে চলে যান। এই মেঘলা রাতে বাহারে এসেছেন কেনো?’

রঞ্জু বললো, এমনি। ঘুম আসছে না। বাদলা রাতে আমার ঘুম হয় না।

নিদ আসছে না, না? একটু পাইচারি করেন রাস্তায়, বেশ আরাম লাগবে, দেখবেন।

বৃষ্টি আর পড়ছে না । কিন্তু আকাশ জুড়ে কালো কানা মেঘ শেষ তারাটিকেও নিভিয়ে দিয়েছে। দুদিকের গাছ থেকে টিপটিপ জলপড়া শুনতে শুনতে পুলিসের সঙ্গে রঞ্জু হাঁটতে লাগলো।
আপনি কালিজে পড়েন?

না।

চাকরি করেন, না?

না।

কেনো? কিছু করেন না?

এমনি, ভালো লাগে না।

ভালো লাগে না? পুলিস একবার রঞ্জুর দিকে তাকালো, আপনার দাদার তবিয়ত এখন কেমন?

আপনি দাদাকে চেনেন?

ওহ! পুলিস একটুখানি হাসলো, চিনি না? আপনার দাদা যখন কাটিহারে ছিলেন, তখুনি তো হামি পরথম কনস্টেবল হলাম। তারপর হাওড়, শান্তাহারে একসাথ ছিলাম। আপনের আব্বারা তো তখন সব ছেলেমানুষ।

আপনি আমার আব্বাকে চেনেন?

তোমার জন্মের আগে থেকে চিনি বাবা, বহুত দিন থেকে চিনি। উচ্ছ্বাসে পুলিসের কণ্ঠ বলকানো দুধের মতো শব্দ করে উঠলো। একাগ্রচিত্তে রঞ্জু এই স্মৃতিশিহরিত মানুষকে ব্যাকুল তাকিয়ে বইলো।

কাটিহারে থাকতে, তোমার দাদা যখন কাটিহারে ছিলো, খুব দাপটে থেকেছে, অমোন বাড়াবাবু হামি আর দেখলাম না।

এক হাত কোমরে রেখে হান্টারটা নিজের হাঁটুতে ঠেকিয়ে পুলিস দাঁড়িয়ে পড়লো। বাঁ দিকের রাস্তার শেষে ল্যাম্পোস্টে তাকিয়ে স্বগতের মতো মর্মর করতে লাগলো, তোমার আব্বা তখন কোলকাতায় পড়তো আর খালি মিটিং করতো ছাত্রদের সাথে মিলে। এই আজ রাণাঘাট তো কাল ঢাকা তো পরসোঁ বর্ডোয়ান, ফের সেরাজগঞ্জ, কখনো পাটনা, দিল্লী চলে গিয়েছে –এই খালি ঘুরতো আর মিটিং করতো। বড়োবাবু কতো রাগ করেছে, তুমি এইসব করবে তো পড়ালিখা করবে কখন ?’

‘রঞ্জুর বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে: এইসব দিন আমার জন্মের কতো আগে মিশে গিয়েছে। এদের জন্যে আমার এমন করে কেন? আব্বার রক্তের সঙ্গে এই দিনগুলো কি আমার শরীরে উজান বয়ে এলো? আমার ভারি ইচ্ছে করে একবার এদের ছুঁয়ে দেখি।’

শেষের দিকে রঞ্জু তার জন্মেরও কতো আগে মিশে যাওয়া আর বাবার রক্তের সঙ্গে তার নিজের শরীরে উজান বয়ে আসা দিনগুলোকে একবার ছুঁয়ে দেখতে চায়। আম্মার ঘরে এই দিনগুলিই কি রঞ্জু ফেলে আসলো?

বাংলাদেশের গণ অভ্যুত্থানের সময় আধা বাংলা আধা উর্দুতে যে পুলিশটি রঞ্জুকে তার ইতিহাস শোনালো এই পুলিশটি কে? যে রঞ্জুকে ঘরে ফেরার উপদেশ দেয়, সুন্দর মনোটোনাস শহরে তার পাশে পাশে হাঁটে। এক সময় যার কণ্ঠে বাৎসল্য ঝরে পড়ে। এই দুর্দান্ত প্রতীকী চরিত্র সৃষ্টি করার শক্তি দেখে অভিভূত হতে হয়। ইলিয়াস সিম্পলি লা-জবাব।

আমি ইলিয়াসের অন্য কোন উপন্যাস দূরে থাকুক আর কোন গল্প থেকে উদাহরণ টানবো না। এই গল্পটি যদি আমরা বুঝি তাহলে এরই সুতো ইলিয়াসের বিভিন্ন গল্পে অন্যেরা বাঁধতে পারবেন। একজন লেখক সারাজীবন একটাই গল্প লিখে থাকেন, সুতো বাঁধা বলতে তাঁরা এই প্রকার আক্ষরিক অর্থ যেন না করেন। ইলিয়াস লিখেছেন কম ঠিকই কিন্তু থিমেটিক বৈচিত্র্য তাঁর বিস্তর। আমি সেই অর্থেই শুধু বাঁধা বলছি যে তাঁর উপন্যাসগুলোকে আমি অনায়াসেই আম্মার ঘরে ফেলে আসার স্পৃহা থেকে জাত ঐতিহাসিক অন্বেষণ ও নির্মাণ হিসাবে পাঠ করতে পারি।

ইলিয়াস মোটেও ভাল ঔপন্যাসিক নন। এতে আমি খুশি। কারণ উপন্যাসের ফর্ম, নন্দনতত্ত্ব, বাঁধুনিসহ আরো হাবিজাবি ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। যাঁরা খাঁটি উপন্যাস পড়তে চান তাঁরা অন্য কিছু পড়ে দেখতে পারেন। তবে ইলিয়াসকে যাঁরা পড়বেন তাঁরা রঞ্জুর মতো আম্মার ঘরে ফেলে আসা কী যেনো খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য। ইলিয়াসকে ঔপন্যাসিক বা ছোটগল্পকার বা কথাসাহিত্যিক বলা অসম্ভব। আর ঠিক এই কারণেই ইলিয়াসের মধ্যে আমাদের চিন্তার মানচিত্র বদলে দেবার উপাদান ও শর্তগুলো তৈরি হয়ে রয়েছে। সেটা ঘটবেই, জানা কথা। কী করে আর কেমন করে সেটা ঘটে আগামি দিনে তা দেখার সুখ ভোগ করব, এই আশা আমি করি।

 
ইলিয়াসের সাহিত্য সংক্রান্ত মেডিকেল তত্ত্ব ও টেকনোলজি প্রসঙ্গ
এবার আমি ইলিয়াসের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু কথা বলব। এর কারণ হোল রাজনৈতিক দর্শন ও তৎপরতার দিক থেকে আমি তাঁকে আমার আত্মীয় গণ্য করি এবং নানা কারণে এখনো নিঃশর্ত সমর্থন করি। কিন্তু প্রগতিশীল ধারার মধ্যে কিছু মৌলিক বিতর্ক রয়েছে যেগুলো মার্কস ও লেনিনের অনুসারীদের মধ্যে হওয়া দরকার। সেই সুযোগ এখনো বাংলাদেশে সৃষ্টি হয় নি। প্রগতিশীলতার নাম নিয়ে আমাদের অভ্যন্তরে এমন অনেক অসুখ বিরাজ করছে যার সঙ্গে বৈপ্লবিক চিন্তার কোন যোগ নেই। মার্কস লেনিনের চিন্তা তো দূরের কথা। এর ফলে বেশ কিছু অকারণ বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা রয়েছে। সেটা বোধ হয় সব দেশেই আছে। বৈপ্লবিক চিন্তা ও তৎপরতা তার স্বভাবের দিক থেকেই ক্রিয়েটিভ, সৃষ্টিশীল। আমাদের মধ্যে সেই সৃষ্টিশীলতার অভাব রয়েছে। ঐতিহাসিক কারণে এই দেশে বামপন্থার মধ্যে প্রধান ধারা হিসাবে ইতরোচিত বস্তুবাদ বাসা বেঁধে আছে। একে তাড়ানো যাচ্ছে না। এই ধারা টিকে থাকার সামাজিক ঐতিহাসিক শর্ত সমাজে আছে। ফলে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। কিন্তু ইলিয়াসের নান্দনিক চিন্তাভাবনার মধ্যে তার কিছু ছাপ পড়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখার দরকার আছে। কেন জানি আমার সন্দেহ হয় পরিণত বয়সে তাঁর অসামান্য কল্পনা প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতা কিছু বাঁধাগৎ চিন্তার রশিতে বাঁধা পড়েছিল। তাঁর সাহিত্য চর্চা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিনা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে সাহিত্যের নন্দন তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর ভাবনার মধ্যে কিছু দিক আছে যা নিয়ে তর্ক তোলা আমাদের সকলের জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে। বিপ্লবী রাজনীতি ও সাহিত্য উভয়ের জন্যেই।

ইলিয়াস ছোটগল্প সম্পর্কে কয়েকদিন আগে খুবই ছোট একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। শিরোনাম, ‘বাংলা-ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে’। এই যুগে ছোটগল্প কেন মরে যাচ্ছে একজন লেখকের পক্ষ থেকে তিনি তার কৈফিয়ত দিচ্ছিলেন। তিনি ছোটগল্প সম্পর্কে যা বলতে চেয়েছেন, সেই কথাগুলো নতুন কোন সত্য নয়। দেশেবিদেশে অনেকেই কথাগুলো বলেছেন। সমাজ এখন ভীষণ জটিল, নানান সূত্রে নানান সম্পর্কের জালে নানান টানাপোড়েনের মধ্যে সামাজিক মানুষ বাস করে। তার কান টানলে মাথা আসে। তার জীবনের একটি ছোট দিক নিয়ে ছোট পরিসরে ছোট গল্প লিখা খুবই কঠিন। ইলিয়াসের ভাষায় ‘একটি সমস্যাকে কেন্দ্রবিন্দু করে একরৈখিক আলোর মধ্যে তাকে যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট করার শর্তটি পালন করা সৃজনশীল লেখকের পক্ষে দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি মানুষকে এখন একটি মাত্র অনুভূতি বা সমস্যা দিয়ে চিহ্নিত করা অসম্ভব।’

তবে ইলিয়াসের কথা আংশিক সত্য, পুরোটা নয়। তাঁর দুর্দান্ত শক্তি ছিল ছোটগল্পে। তাঁর কাব্যশক্তির জন্যেই বোধহয়। কেন এত কম ছোটগল্প লিখছেন তার পক্ষে একটা কৈফিয়ত দেবার তাড়া তাঁর নিজেরই হয়তো ছিল। ফলে কৈফিয়তটা লেখক হিসাবে একান্তই তাঁর নিজের। এই লিখাটি পড়লে মনে হয়, ইলিয়াস যেন বলছেন আমি এখন আর ছোটগল্প লিখব না। কারণ এই যুগে ছোটগল্প লেখা কঠিন। ছোটগল্পে মানুষের সমস্যাকে যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট করে তুলে ধরা কঠিন। অতএব এখন আমি লিখব উপন্যাস। বোধহয় ‘খোয়াবনামা’ লেখার আগে উপন্যাস লিখবার পক্ষে তাঁর নিজের জন্য একটা যুক্তির দরকার ছিল।

একটি কেন্দ্রীয় সমস্যাকে একরৈখিক আলোর মধ্যে যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট প্রতিফলন করার নন্দনতত্ত্বটি বেজায় পুরনো। ইলিয়াস তত্ত্বটি মেনে নিয়েছিলেন কিনা সেটা তাঁর রচনাটি পাঠ করলে বোঝা যায় না। একটি মানুষকে এখন একটি মাত্র অনুভূতি বা সমস্যা দিয়ে চিহ্নিত করা অসম্ভব, এই ঘোষণা দিয়ে ইলিয়াস বলতে চেয়েছেন তাহলে তো ছোটগল্পের জন্য বিপদ। কারণ ছোটগল্প ঠিক এই কাজটি করবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদি কাজটি করা অসম্ভব হয়, তাহলে এই কালে ছোটগল্প রচনাও অসম্ভব হয়ে উঠবে। তবু ইলিয়াস বলছেন:

‘… আর ছোটগল্প তো তার জন্মলগ্ন থেকেই বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির রোগ ও ক্ষয়কে তীক্ষ্ণ ভাবে নির্ণয় করে আসছে। এই সমাজ ব্যবস্থার একটি ফসল হয়ে ছোটগল্প এই ব্যবস্থার শ্রীচরণে তার সিঁদুরচচিঁত মুণ্ডুখানি কোন দিনই ঠেকিয়ে রাখেনি যে এর মহা প্রয়াণ ঘটলে তাকে সহমরণে যেতে হবে। তাছাড়া এই বুর্জোয়া শোষণ ও ছলাকলার আশু অবসানের কোনো লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না।’

ছোটগল্প তাহলে ঠিক মরছে না। একটা দোনামোনা ছিল ইলিয়াসের, শেষের বাক্যটিতে একটা আশাভঙ্গের নিঃশ্বাসও আছে। আসলে প্রকাশকরা ছোটগল্প প্রকাশে আগ্রহী নয়, এই বাণিজ্যিক কারণ ছাড়া ছোটগল্প মরবে কি বাঁচবে এই প্রশ্নের অন্য কোন কারণ সন্ধানের জন্যে ইলিয়াসের লেখাটি কেউ যেন পাঠ না করেন। তাহলে রচনাটির প্রতি অবিচার হবে।

ইলিয়াস বলছিলেন লেখকের দিক থেকে। যদি পাঠকের দিক থেকে তাকাই, তাহলে একটি গল্প বা উপন্যাসকে পাঠক কি কখনো একটি কেন্দ্রীয় সমস্যাকে একরৈখিক আলোর মধ্যে যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট প্রতিফলন জ্ঞান করে পাঠ করে? কী করে একটি পাঠের আলো আমরা গ্রহণ করি, সেটা আমাদের জীবনের জটিলতা ও টানাপোড়েনের দ্বারাও কি নির্ণীত হয় না? পাঠ্যবস্তুর মধ্যে অর্থ লুকিয়ে থাকে? পাঠের মধ্য দিয়েও কি আমরা অর্থ বের করে আনি না? এমনকি পাঠক কোন অবস্থায় কেমন করে কী কারণে কোন দুঃখে কোন শোকে কোন আনন্দে কী পাঠ করছে সেই অবস্থান্তরে পাঠ্যবস্তুর ‘অর্থ’-ও নিরন্তর বদলায়। আমরা যে গল্প গতকাল পাঠ করেছি, আজ পাঠ করলে তার অনুভূতি উপলব্ধি অর্থবোধ কি একইরকম হবে? যদি হয় তাহলে নিশ্চয়ই সেই পাঠ আসলে একটি রোবটের। হয়তো একই টেক্সট বারবার স্ক্যান করে কোন একটা টেক্সটরীডার সফটওয়্যার দিয়ে পাঠ করলে সেটা হতে পারে। ডিজিট্যাল স্ক্যানার টেক্সট ‘রীড’ করতে পারে। এই ডিজিটাল পাঠকে টেকনিক্যালি বলা হয় ‘স্ক্যানিং’। মানুষের পাঠ, ভাগ্য ভাল ইলিয়াস, স্ক্যানিং নয়। গল্প পাঠ তো… ।

তাহলে যে জটিল মানুষটিকে এই বেয়াড়া সময়ে একহাজার একশোটি সুতো দিয়ে পুতুলের মতো আমরা বাঁধা দেখছি তার গোটাটাই লেখককে তুলে ধরতে হবে এই সংকল্প খুবই ডিফিকাল্ট একটা অঙ্গীকার। ওর পেছনে একটা বুজোয়া অহংকার কাজ করে। যেন বা, এটা লেখকেরই দায়িত্ব। কে এই দায়িত্ব দিয়েছে লেখককে? বুর্জোয়া সমাজের এই অহংকার এবং তুমুল ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ লেখকের মধ্যেও অসুখ হয়ে বাসা বাঁধে। সবচেয়ে মুশকিল হোল লেখা সম্পর্কে লেখকের নিজের ধারণা যে, লেখকের কাজ হচ্ছে, এই জটিল সমাজের জটিল মানুষটি ও তার সমস্যা ‘যথাযথ’ তুলে ধরা। কতোটুকু আমরা এই জটিল সমাজ আর জটিল মানুষটিকে জানি? এই সমাজের মধ্যে শুধু সাহিত্যের নায়ক-নায়িকারা নয়, তৈরি হচ্ছে খোদ লেখক — নিজে এবং পাঠকগণও। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে সমাজকে যথাযথ ভাবে জানা যায় সেই দাবি খুবই মুশকিলে। কীভাবে তারা, লেখক এবং পাঠক, নিজেরা এই সমাজ দ্বারা প্রভাবিত, নির্ণীত বা তৈরি হচ্ছে তারা নিজেরাও তো জানে না। জানার ক্ষেত্রেও বদল ঘটছে অনবরত। সত্যি কথা, তারা যা লিখছে আর পাঠ করছে তার মধ্য দিয়েই সমাজের একটা ভাষা তৈরি হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন ভাষা, পরিভাষা, প্রতীক, প্রতিমা ইত্যাদি। আবার ওর মধ্য দিয়ে কী প্রতিফলিত হবে আর কী হবে না সেটা নতুন ভাষা, ভাষার বৈশিষ্ট্য, ভাষা ব্যবহারের ধরণ প্রভৃতিও তৈরি করে দিচ্ছে। একটি কেন্দ্রীয় সমস্যাকে ‘একরৈখিক আলোর মধ্যে যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট প্রতিফলন জ্ঞান’ করে লেখা বা পড়ার তত্ত্বটা শুধু বুর্জোয়া অহঙ্কার বলেই, শুধু লেখকের ক্ষমতার উপর অতিরিক্ত আস্থা স্থাপন বলেই ভুল নয়, যে প্রক্রিয়ার মধ্যে সমাজে ও ইতিহাসে লেখক ও পাঠক তৈরি হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়াকে ‘একরৈখিক আলোর মধ্যে যথাযথ ভাবে জানা’ সাহিত্যের কাজ নয়। ছোত গল্পের তো নয়ই।

একটা ধারণা আছে যে ভাষা হচ্ছে নেহাতই একটা টেকনোলজি, টেলিভিশনের স্ক্রীনের চেয়ে বড়জোর একটু বেশি জটিল। আর সমাজের বাস্তব অভিনয়টা লেখক আই স্ক্রীনের মধ্য দিয়ে একজন মহান অনুষ্ঠান প্রযোজকের মতো আমাদের সকলকে ‘যথাযথ নির্দিষ্ট করে’ টিভি ফ্রেমের মধ্যে দেখাতে সক্ষম। ভাষা সম্পর্কে এই ধারণাটা সেই সব কম্পিউটার ইঞ্জিনীয়ারদের পক্ষেই করা সম্ভব যারা তাদের জীবদ্দশায় কোনদিন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নামও শুনবে না। সাহিত্য আর ইঞ্জিনীয়ারগিরি আলাদা জিনিস। কার্ল মার্কস সেই জন্যে কথনোই ভুল করেও মানুষকে তাঁর বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু করেন নি। শুরু করেছেন সম্পত্তির ধরণ বা উৎপাদন সম্পর্ক দিয়ে। আর ‘পুঁজি’ গ্রন্থ শুরু করেছেন পণ্য দিয়ে। একেকটা ঐতিহাসিক কালে ‘মানুষ’ নামক জিনিসটি কী, সেই সত্তাটাকে মানুষ নিজের সম্পর্কে কিভাবে ভাবনাচিন্তা করে কিম্বা নিজের সম্পর্কে কী বলে — ইত্যাদি দিয়ে বোঝা যায় না। তার সমস্যা সে কীভাবে চিহ্নিত করে তা দিয়েও মানুষকে চেনা মুশকিল। এক একটা সময়কালে মানুষ কী করছে, মানুষের চিন্তা মতাদর্শ রাজনীতি আচার আচরণ প্রভৃতির ব্যাখ্যা অন্বেষণের জন্য উৎপাদন সম্পর্কটাকে বুঝতে হবে আলাদা করে। তারপর চিন্তা ও উৎপাদন সম্পর্ককে মিলিয়ে উভয়কেই বুঝতে হবে একটিকে আরেকটির ডিকশনারির মতো। একটু সরল করে বলা হোল। কথা হোল মানুষকে বুঝতে হলে মানুষ বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না, এই হচ্ছে মার্কসের প্রধান শিক্ষা।

অন্যদিকে শুধু বুর্জোয়া সমাজ বা ইতিহাস জটিল সেটাও সত্য নয়। মানুষের ইতিহাস ও সমাজ সবসময়ই একটা জটিল ও বহুরৈখিক ব্যাপার। তথাকথিত অতি প্রাচীন অধিবাসীদের সমাজ ও সেই সমাজে উৎপন্ন মানুষগুলোও খুবই জটিল ও বহুরৈখিক হতে পারে। কিন্তু সেই সমাজের মানুষগুলোর চোখে এই জটিলতাগুলো ধরা নাও পড়তে পারে। এখন আমরা আমাদের আগে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের দিকে যখন তাকাই তখন সেই সমাজটিকে আমরা আমাদের এখনকার চোখেই তাকাই। উৎপাদন সম্পর্কের বহুধা বিস্তৃতির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কগুলোর বিকাশ ঘটে। ফলে আগে আমাদের যা চোখে পড়ে নি, পরের সমাজগুলোতে তা চোখে পড়তে শুরু করে। উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বদলাতে শুরু করেছি। কৃৎকৌশলেরও নিত্যনতুন বদল ঘটছে। আমরা আর আগের মতো নাই। চাই বা না চাই, আমরা বদলে গিয়েছি। ইলেকট্রনিক যুগের পর আমরা এখন প্রবেশ করছি ডিজিটাল যুগে। এতে শুধু আমাদের সমাজ আর অর্থনীতি বদলাবে না, আমরা নিজেরাও বদলে যাব। অধিকাংশই হয়তো টেরটিও পাবে না। তবে কারো কারো ভেতর-বাইরে অবশ্যই খবর হয়ে যাবে।

একটি মানুষকে ‘একটি মাত্র অনুভূতি বা সমস্যা দিয়ে চিহ্নিত করা’ সর্বকালেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রতিটি কালেরই কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, কিছু চরিত্র আছে। সর্বকালেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা বিশেষ চরিত্রটিকে শনাক্ত করা চলে। সেই বৈশিষ্ট্যটির দিকে লেখক চোখ রাখতে পারেন, নাও রাখতে পারেন। তবে তার আসল কাজ হচ্ছে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ ও সতর্ক রাখা। যেন তাঁর নিজের সময়ের বদলগুলো এন্টেনার মতো তিনি ধরে ফেলতে পারেন। এই ধরে ফেলার মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেন কোন কিছুই স্থির নয়। সব কিছুই বদলায়। এবং বলাবাহুল্য বুর্জোয়া শোষণ ও ছলাকলার এই জগৎটিও একদিন ঠিকই লোপ পাবে। ইলিয়াসের মতো মার্কস যদি মনে করতেন বুর্জোয়া সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তিনি কোনদিনই ধরতে পারবেন না, বা ব্যাখ্যা করতে পারবেন না তাহলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেতো। তবে ইলিয়াসের উপর যেন অবিচার না হয়, তাই বলে রাখা ভাল যে ইলিয়াস সাহিত্যিক হিসাবেই কথাটা বলছিলেন। কিন্তু মন্তব্যটির মুশকিল আছে।

বলাবাহুল্য, একটি সমস্যাকে কেন্দ্রবিন্দু করে একরৈখিক আলোর মধ্যে তাকে যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট কবার শর্ত খুবই পুরনো একটি বুর্জোয়া তত্ত্ব। বুর্জোয়া শ্রেণী আজকাল নানা কারণে এই বিষয়ে উচ্চবাচ্য করে না বলে আমরা এই সম্পর্কে শুনি কম। বিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে বুর্জোয়া শ্রেণী সবসময়ই দাবি করে আসছে বুদ্ধি দিয়ে বা একটা যুক্তিগ্রাহ্য মডেল খাড়া করে মানুষের আচার আচরণ ঘটনা-ঘটনসহ মানুষের সমস্যা ‘যথাযথ ভাবে নির্দিষ্ট করা যায়’। মানুষের স্বভাবকে মেশিনের মতো বিচার করার কোশেশ করে বীহেভিয়রবাদী মনোবিজ্ঞানীরা রীতিমতো কাহিল হয়ে পড়েছেন। এঁরা হচ্ছেন এমন এক মনস্তত্ত্ববিজ্ঞানী যাঁরা মানুষের ব্যবহার ও আচার আচরণকে ব্যাখ্যা করতে চান যান্ত্রিক ভাবে, পয়ে পয়ে মিলিয়ে কার্যকারণের হিসাব মিলিয়ে। যেন, মানুষ একটি মেশিন মাত্র। তবুও মানুষ মেশিন হয় নি, মেশিনও মানুষ হয় নি। মানুষের কোন সমস্যাকেই সেই কারণে ‘যথাযথভাবে নির্দিষ্ট’ করা যায় না। এটা যে কখনোই সম্ভব নয় সেটাই তো সাহিত্য বার বার দেখায়। উৎপাদন সম্পর্কের চরিত্র ও বিবর্তন ‘যথাযথ’ ভাবে দেখানো সম্ভব হয়ত। কিন্তু ভাগ্য ভালো মানুষ নয়। কক্ষণোই। এই কারণেই একমাত্র মানুষের পক্ষেই বিপ্লব করা সম্ভব, অন্য প্রাণীরা প্রাকৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিজেদের সম্পর্কের ধরণ বদলাতে তারা সক্ষম নয়। কিন্তু মানুষ!!!

এর মানে এই নয় সাহিত্য মানুষ, মানুষের সমাজ, মানুষের ইহিহাস বা মানুষের সমস্যার কোন ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করবে না। সেটা করতে পারে, নাও পারে। কিন্তু ‘যথাযথ’ তত্ত্ব হিসাবে নয়। বরং আমি কে, কেন, কার জন্য কী উদ্দেশ্যে সেই সাহিত্যিক ব্যাখ্যাটা খাড়া করছি, উপমা উৎপ্রেক্ষা প্রতীকে মানুষের কোন ইন্দ্রিয়কে কোন উদ্দেশ্যে জাগিয়ে তুলছি সেই সকল বিষয়ে শক্তিমান সাহিত্যিকদের সচেতন থাকা ভাল। না থাকলেও ক্ষতি নেই। কারণ ভাল সাহিত্য সবসময়ই বিপ্লবী সাহিত্য। নানান অর্থে কথাটা সত্যি। যদি জানি যে আমার লেখা এখনকার সংগ্রামের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত তাহলে তা শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের দিক থেকে সোনায় সোহাগা হয়। কিন্তু বালজাককে বড় ঔপন্যাসিক হিসাবে মেনে নিতে মার্কসের অসুবিধা হয় নি। লেখকের রচনা সমাজের বিশেষ শ্রেণীর পক্ষে যাবে, বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর ক্ষতিও করবে, এই বোধটুকু কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন লেখকদের ঠিকই থাকে। অতএব সমাজে আমি কাকে শক্র মনে করি, কাকে মিত্র–সেই বিবেচনা ছাড়া আমরা কী লিখি?

বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের খুবই কেন্দ্রীয় ও খুবই মুখরোচক একটি দাবি হচ্ছে, আধুনিক সমাজ ও আধুনিক মানুষকে যথাযথভাবে সাহিত্যে হাজির করতে হবে। এর পেছনে রয়েছে সাহিত্যকে টেকনোলজির মতো বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতিয়ারে পরিণত করার তাগিদ, অন্যদিকে আগে থাকতেই মনের মধ্যে গড়ে তোলা একটা বুদ্ধিকাঠামো, সমাজতাত্ত্বিক মডেল বা ইতিহাসের ফর্মুলা বা বীহেভীয়রবাদীদের মতো মানুষের মনকেও কার্যকারণ সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ভাবার বিভ্রান্তি। ইলিয়াসের মধ্যে সাহিত্যচর্চার একটা ডাক্তারি মডেল দেখে আমি একটু ভয় পেয়েছি। একই নিবন্ধ থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে সেটা দেখানো যাক:

“বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তির উত্থানের সঙ্গে তার প্রকাশের স্বার্থে, বিকাশের তাগিদে জন্ম হয় উপন্যাসের। প্রথমদিকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোতে সমাজের নতুন মানুষ ‘ব্যক্তি’কে গৌরব দেয়ার উদ্যোগ স্পষ্ট; কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর কারণেই ব্যক্তিস্বাধীনতা যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পিচ্ছিল পথ ধরে বন্দি হোল ব্যক্তিসর্বস্বতার স্যাঁতস্যাতে কোটরে তখন এই মাধ্যমটিই তার ক্ষয় এবং রোগ সনাক্ত করার দায়িত্ব তুলে নেয় নিজের ঘাড়ে। আজ রোগ ও ক্ষয়ের সনাক্তকরণের সঙ্গে আরো খানাতল্লাশী চালিয়ে ব্যক্তির মানুষে উন্নীত হওয়ার সুপ্ত শক্তির অন্বেষণে নিয়োজিত হয়েছে উপন্যাসই।’

এই উদ্ধৃতির প্রথম দিককার তত্ত্বটুকু ইলিয়াসের নিজের নয়, এগুলো পুরনো কথা। তবে মাধ্যম হিসাবে ছোটগল্প ব্যক্তির ক্ষয় ও রোগ শনাক্ত করার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নেয়–এই তত্ত্বটি বোধহয় ইলিয়াসের নিজের। বুর্জোয়া সমাজ বিকশিত হওয়ার প্রথম দিকে ছোটগল্প এবং এখন উপন্যাসের দায়িত্ব কি তাহলে ‘ব্যক্তির ক্ষয় এবং রোগ তীক্ষ্ণ ভাবে নির্ণয় করা’? ইলিয়াস এই দায়িত্ব বা ভূমিকাকে ইতিবাচক জ্ঞান করছেন, এটা পরিষ্কার। তবে প্রতীকী অর্থে কথাটি বলেছেন, বলা বাহুল্য। আমাদের ভেতরকার বদ্ধমূল ভাবনাগুলো সাধারণত প্রতীক ও অবচেতনের পথেই বরং সততার সঙ্গে নিজেকে হাজির করে। ইলিয়াস হয়তো এই রকমই মনে করতেন। ইলিয়াসের এই ধারণার সঙ্গে আধুনিক মানোবিকলন শান্ত্রের ঘনিষ্ঠ মৈত্রী রয়েছে। মানুষের মনের রোগ এবং ক্ষয় নির্ণয় করার কথা বলে মনোবিকলন শাস্ত্র এই কালে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি ভয়াবহ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ইলিয়াস একজন সাইকোলজিস্টের জায়গায় ছোটগল্প ও উপন্যাসকে বসিয়ে দিয়েছেন, এই যা!! সাহিত্যকে কি তাহলে ডাক্তারিশাস্ত্র চর্চা করতে করতে হবে? ইলিয়াস নিজেরই অজান্তে বুর্জোয়া চিন্তাভাবনার দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন কি? বুর্জোয়া সবসময়ই সাহিত্যকে একটা ফাংশনাল ভূমিকা দিতে চায়, এর বেশি কিছু নয়। পাক ঘরের খুন্তি, ডাক্তারের স্টেথিসকোপ, কম্পিউটারের মাউস –এইরকম কিছু একটা হাতিয়ার হতে হবে সাহিত্যকে। ইলিয়াসের সাহিত্য রোগ শনাক্ত করে। এমনকি ইলিয়াসের সাহিত্যের যারা পাঠক তারাও সাহিত্য পাঠ করে একটি মাত্র উদ্দেশ্যে: কোন না কোন ভাবে তাদের রোগ শনাক্ত করার দরকারে। যে কারণে আমরা ডাক্তার বা হাসপাতালে যাই, ঠিক একই কারণে আমরা সাহিত্যেরও দ্বারস্থ হই, সাহিত্য পাঠ করি। এমনকি যিনি সাহিত্য রচনা করছেন সেই রচনার মধ্যে কোন মতলব কিম্বা উদ্দেশ্য থাকুক সেটা পাঠকের মূল বিবেচ্য নয়। পাঠক একটি রচনার অনুরাগী হয় নিজের সমস্যাকে কোন না কোন ভাবে পাঠ্যবস্তুর মধ্যে শনাক্ত হতে দেখলে। ইলিয়াস লিখেছেন:

‘লেখকের উদ্দেশ্য বা মতলব যাই থাক, নিজের সমস্যাকে কোন না কোনভাবে সনাক্ত হতে না দেখলে পাঠক একটি বইয়ের অনুরাগী হবে কেন?’

ইলিয়াসের এই সাহিত্য সংক্রান্ত মেডিকেল তত্ত্ব মেনে নেওয়া খুবই মুশকিলের। তাছাড়া এখনকার বুর্জোয়া সমাজ ব্যক্তির উত্থানের পর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ‘পিচ্ছিল’ পথ ধরে এখন ব্যক্তিসর্বস্বতার ‘স্যাঁতসেতে কোটরে ঢুকেছে। বুর্জোয়া সমাজ এখন রোগী–এই ধারণাটির মধ্যেও কি বর্তমানের প্রতি প্রতিক্রিয়া নেই? এই সমাজ অসুস্থ, যিনি সমাজটিকে অসুস্থ ও অবক্ষয়গ্রস্ত গণ্য করছেন তিনিই কি কেবল সুস্থ? তাঁর কাজ হচ্ছে সমাজের রোগ নির্ণয় করে তাকে সুস্থ করে তোলা? বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের মধ্যে প্রাচীন সামন্তের অহংকার এবং বর্তমানের প্রতি প্রতিক্রিয়ামূলক মনোভঙ্গি এখনো যায় নি। অহংকারের প্রকাশ হতে নিজেকে অভিজাত, সাচ্চা, বিশুদ্ধ বা সকল পাপের উর্ধ্বে গণ্য করার মধ্যে। প্রতিক্রিয়াটি ধরা পড়ে নিজেকে ডাক্তার আর অন্য সকল ব্যক্তিকে রোগী গণ্য করার অসতর্ক মনোভঙ্গির মধ্যে।

ইলিয়াসের চিন্তভাবনার এই দিকটা নিয়ে আলাদা করে হয়তো অন্যত্র আমাদের অনেক কথা বলতে হবে। ব্যাপারটি কেবল ইলিয়াসের নয়। প্রগতিশীল আন্দোলনের ভেতরে কিছু পুরনো ময়লা এখনো রয়ে গিয়েছে। সাফ করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। সে যাই হোক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে চেনা যাবে সাহিত্যের ডাক্তার বা সাহিত্যিক ডাক্তার হিসাবে কখনোই নয়, যিনি সমাজের রোগ সারাবার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে কলম ধরেছেন। বরং সকলের রোগ সারাবার সংকল্প বাদ দিয়ে তিনি যখন সহজ এবং স্বাভাবিক, সেই সময়েই তাঁর শক্তি এবং মেধার ওজন টের পাওয়া যায়। এমনকি এই নিবন্ধটি, যা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি তার মধ্যেও তিনি ঠিকই তাঁর মৌলিক চিন্তা নিয়ে হাজির আছেন। সেই মেধাবী অংশে এবার তাহলে চোখ ফেরানো যাক। এবার আমাদের বাধ্য হয়ে একটা বড়ো উদ্ধৃতি দিতে হবে। তাঁর চিন্তাভাবনা, নিজস্বতা, সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার দিকটি প্রদর্শনের জন্য।

‘রাষ্ট্র ক্রমেই স্ফীতকায় হচ্ছে। মানুষের ন্যূনতম কলাণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ না নিলেও রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে চলেছে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সুস্পষ্ট কোন কৃষিনীতি সে নেবে না, কিন্তু সারের দাম বাড়িয়ে চাষীর মাথায় বাড়ি মারবে নির্দ্বিধায়; পাটের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে চাষীকে সে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে। বন্যার পর, দুর্ভিক্ষের সময় জমি থেকে উৎখাত হয়ে নিরন্ন গ্রামবাসী বিচ্যুৎ হয় নিজের পেশা থেকে, কিন্তু নতুন পেশা খুঁজে নিতে রাষ্ট্র তাকে সাহায্য করবে না। ব্যক্তিস্বাধীনতার ডংকা বাজিয়ে যে ব্যবস্থার উদ্ভব, সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বলেও কি কিছু অবশিষ্ট আছে? দম্পতির শোবার ঘর উকি দিয়ে রাষ্ট্র হুকুম ছাড়ে, ছেলে হোক মেয়ে হোক দু’টি সন্তানের বেশি যেন পয়দা করো না, কিন্তু ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্যের দায়িত্ব নিতে তার প্রবল অনীহা। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচনের মচ্ছব চলে, সেখানে ব্যবস্থা এমনি মজবুত যে, কোটিপতি ছাড়া কারো ক্ষমতা নেই যে, নির্বাচিত হয়। দফায় দফায় গণআন্দোলনে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী প্রাণ দেয়, রাষ্ট্রের মালিক পাল্টায়, ফায়দা লোটে কোটিপতিরা।’

এতোটুকু পাঠ করে মনে হতে পারে ইলিয়াস মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের পুরানো কাসুন্দি ঘাঁটছেন। রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণী শোষণের হাতিয়ার। এই হাতিয়ারটির স্ফীতির কথা তো তিনি বলবেনই। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে অনেকে বলছে রাষ্ট্র শুকাচ্ছে। রাষ্ট্র বড়োলোকদের শাসন ও শোষণের হাতিয়ার, এটা পুরনো তত্ত্ব। কিন্তু নিজের অস্তিত্বের নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের কিছু সাধারণ স্বার্থের কথা রাষ্ট্রকে ভাবতে হয়। যেমন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বেকারত্ব মোচন, মুদ্রাস্ফীতি কমানো, ইত্যাদি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে পুঁজির আত্মস্ফীতি এবং পুঞ্জীভবন এখন এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যখন রাষ্ট্র এই ভূমিকা পালন না করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানির ভাড়া খাটা ছাড়া অন্য কোন দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্র আর নিতে চায় না। অন্যদিকে তার ভূমিকাও বদলে গিয়েছে। এখন আরো প্রবল উৎসাহ নিয়ে রাষ্ট্র আমাদের শোবার ঘরে হানা দিচ্ছে। দরিদ্রের দায়িত্ব নেওয়া দূরের কথা, দরিদ্রদের মায়ের পেটে খতম করে দেওয়ার নিপুণ কাজটি পালন করছে রাষ্ট্র। জনগণের দায়িত্ব নেওয়ার বদলে মানুষের সংখ্যা কমানোর জন্যই তার বিপুল আয়োজন। রাষ্ট্র মোটেও শুকাচ্ছে না, বরং স্ফীতকায় হচ্ছে।

‘রাষ্ট্রের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্যে গ্রামে পর্যন্ত টেলিভিশন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে চাষা ভুষারা বসে বসে টেলিভিশনের পর্দায় এ্যামেরিকানদের সাম্প্রতিক জীবনযাপন দেখে, সেখানকার মেয়েপুরুষ সব তীব্রগতিতে গাড়ি চালায়, রকেট ছোড়ে, তাদের একটি প্রধান চরিত্রের নাম কম্পিউটার, তার কীর্তিকলাপও দেখা যায়। বাড়ি ফিরে ঐ চাষী পায়খানা করে ডোবার ধারে, ঐ ডোবার পানি সে খায় অঞ্জলি ভরে। টেলিভিশনে মস্ত করিডোরওয়ালা হাসপাতাল দেখে হাঁস-মুরগি বেচে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স পর্যন্ত পৌঁছে শোনে যে ডাক্তার সাহেব কাল ঢাকা গেছে, ডাক্তার সাহেব থাকলে শোনে যে, এখানে ওষুধ নেই। তখন তার গতি পানি পড়া দেয়া ইমাম সাহেব। রবীন্দ্রনাথের সময় বাংলার গ্রাম এই-ই ছিলো, তার আগে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদেশের কৃষকের যে বিবরণ লিখে গেছেন, তাতে এই একই পরিচয় পাই। পরে শরৎচন্দ্র কৃষকের ছবি আঁকেন, তাতেও তেমন হেরফের কৈ? তারাশংকর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, এমনকি সেদিনের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যে চাষীকে দেখেছিলেন সে এদেরই আত্মীয়। কিন্তু একটা বড় তফাৎ রয়েছে। যন্ত্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিলো রেলগাড়ি আর টেলিগ্রাফের তার দেখা পর্যন্ত, বড়োজোর রেলগাড়িতে চড়ার ভাগ্য কারো কারো হয়ে থাকবে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটেছে আরো পরে। বাংলাদেশের নিভৃত গ্রামের বিত্তহীন চাষী বিবিসি শোনে টেলিভিশন দেখে, জমিতে শ্যালো মেশিনের প্রয়োগ সম্বন্ধেও সব জানে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার তার জীবনে আর সম্ভব হয় না। টেলিভিশনের ছবি তার কাছ রূপকথার বেশি কিছু নয়। রূপকথা বরং অল্পক্ষণের জন্যে হলেও তার কল্পনাকে রঙিন করতে পারতো, একটা গল্প দেখার সুখ সে পেতো। গান আর গাঁথার মতো রূপকথা শোনাও তার সংস্কৃতি চর্চার অংশ। পংখীরাজ তো কল্পনারই ঘোড়া, এর ওপর সেও যেমন চড়তে পারে না, গ্রামের জোতদার মহাজনও তাকে নাগালের ভেতর পায় না। কিন্তু টেলিভিশনে দেখা জীবন তো কেউ কেউ ঠিকই ভোগ করে। ঢাকা শহরের কেউ কেউ এর ভাগ পায় বৈ কি। তাদের মধ্যে তার চেনাজানা মানুষও আছে। এই দুই দশকে শ্রেণীর মেরুকরণ এতো হয়েছে যে, গ্রামের জোতদারের কি সচ্ছল কৃষকের বেপরোয়া ছেলেটি ঢাকায় গিয়ে কি করে অনেক টাকার মালিক হয়ে বসেছে, সে নাকি এবেলা ওবেলা সিঙ্গাপুর হংকং করে। চাষীরা নিজেদের কাছে তাই আরো ছোটো হয়ে গেছে। তবে কি ঐ জীবন যাপন করতে তার আগ্রহ হয় না ? না, হয় না। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের স্পৃহাকে সংকল্পে রূপ দিতে পারে যে রাজনীতি তার অভাব আজ বড়ো প্রকট। রাজনীতি আজ ছিনতাই করে নিয়েছে কোটিপতির দল। এদের পিছে পিছে ঘোরাই এখন নিম্নবিত্ত মানুষের প্রধান রাজনৈতিক তৎপরতা। এখনকার প্রধান দাবি হলো রিলিফ চাই। এনজিওতে দেশ ছেয়ে গেলো, নিরন্ন মানুষের প্রতি তাদের উপদেশ: তোমরা নিজের পায়ে দাঁড়াও। কি করে?–না, মুরগি পোষ, ঝুড়ি বানাও কাঁথা সেলাই করো। ভাইসব, তোমাদের সম্পদ নেই, সম্বল নেই, মুরগি পুষে ডিম বেচে, ঝুড়ি বেচে তোমরা স্বাবলম্বী হও। কারণ সম্পদ ওরা হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে, তা তাদের দখলেই থাকবে, ওদিকে চোখ দিও না। রাষ্ট্রক্ষমতা লুটেরা কোটিপতিদের হাতে, তাদের হাতেই ওটা নিরাপদে থাকবে, ওইদিকে হাত দিতে চেষ্টা করো না। তাদের মানুষ হয়ে বাঁচবার আকাঙ্ক্ষা, অধিকার আদায়ের স্পৃহা এবং অন্যায় সমাজব্যবস্থা উৎখাত করার সংকল্প চিরকালের জন্যে বিনাশ করার আয়োজন চলছে। নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী তাই ছোটো থেকে আরো ছোটো হয়, এই মানুষটির সংস্কৃতির বিকাশ তো দূরের কথা, তার আগের অনেক অভ্যাস পর্যন্ত লুপ্ত হয়, কিন্তু নতুন সংস্কৃতির স্পন্দন সে কোথাও অনুভব করে না।’

এই উদ্ধৃতিটি দিলাম টেকনোলজি সম্পর্কে ইলিয়াসের ধারণা টের পাবার জন্যে। কথাগুলো একটু সারমর্মে ভিন্ন ভাবে বলব।

এক: টেকনোলজি মানুষের মুক্তির কথা বলে, বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলের প্রতি আমাদের ঈমান এতই মজবুত এর মন্দ দিকগুলো আমরা স্বীকার করতে চাই না। আমরা সকলেই অতীব ধর্মপ্রাণতার সঙ্গে বিশ্বাস করি আমাদের সকলের, বিশেষত, গরিব মানুষের মুক্তি ঘটবে টেকনোলজির মাহাত্মে, কৃৎকৌশলগত বিপ্লবে। কিন্তু দরিদ্রের দৈনন্দিন জীবন ধারণের সংগ্রামে টেকনোলজি কোন বদল ঘটাতে পারে নি। কেবল বেড়েছে কৃৎকৌশলে দক্ষ একটি নতুন মধ্যবর্তী শ্রেণী।

দুই: মানুষের পাশে একটি চরিত্র হিসাবে এই কালে হাজির হয়েছে কম্পিউটার। মানুষ আর কম্পিউটার যেন একই পদার্থ, একই জিনিস। টেকনোলজিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি মানুষকে দেখাচ্ছে অসম্পূর্ণ, কম্পিউটারের মতো বিশাল বিশাল ডাটা প্রসেস করতে অক্ষম কিম্বা কম্পিউটারের চেয়েও কম বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী হিসাবে। মানুষ ও কম্পিউটার এই দুই চরিত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে? কম্পিউটার। মানুষ এগুলো দেখে এবং ভেতরে ভেতরে ক্ষুদ্র হতে থাকে। তার আদর্শ হয়ে ওঠে কম্পিউটার। সে নিজে যন্ত্র হয়ে ওঠার সাধনা করে। মানুষ নিজেই টেকনোলজির স্রষ্টা এবং টেকনোওয়ার্ল্ডের কর্তা এই সত্য মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে সবসময়ই। যারা টেকনোলজির নিয়ন্তা এতে তাদেরই পোয়াবারো। এর মধ্য দিয়েই টেকনোলজির যারা মালিক তারা আমাদের ওপর তাদের থাবাবিস্তার করে, তাদের মুনাফা কামানোর নখ ও দাঁতগুলো শানিয়ে নেয়।

তিন: বাংলাদেশের কৃষকের অবস্থা ও ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয় নি। কিন্তু টেকনোলজির সঙ্গে তার সংস্পর্শের ধরণে অভূতপূর্ব বদল ঘটেছে। প্রাচীন কৃষক রেলগাড়ি আর টেলিগ্রাফের তার দেখেছে মাত্র। কিন্তু কৃৎকৌশলজাত তথাকথিত ‘আধুনিক’ সভ্যতাকে চাক্ষুস দেখার সুযোগ তাদের হয় নি। যে জগৎ সে দেখে আর যে জগতে সে বাস করে তার মধ্যে একদিকে ঘোর বাস্তবতা আর অন্যদিকে অলীক রূপকথার পার্থক্য, অসীম ফারাক। অথচ রূপকথা অবাস্তব, চাষীও সেটা জানে। কিন্তু টেলিভিশনে জীবন অবাস্তব নয়। অনেকেই এই জীবন ভোগ করে যাদের সে চেনে। অথচ টেলিভিশনের জীবন সে কখনোই পাবে না। এর ফলে মানুষ নিজের মরমে নিজে মিইয়ে যায়। তার ভেতরটা ক্ষয়ে যায়। ইনফরমেশন যুগের প্রভাব আমাদের সমাজে কী হতে পারে তার কিছু খুচরো ইঙ্গিত এই সকল মন্তব্য।

প্রচলিত বামপন্থা আধুনিকতা ও কৃৎকৌশলকে যেভাবে দেখতে অভ্যন্ত ইলিয়াসের দেখাটা তাদের মতো ঠিক নয়। প্রগতিশীল রাজনীতি টেকনোলজি ও কৃৎকৌশলগত বিপ্লবকে প্রগতির অগ্রযাত্রা বলেই ধরে নেয়। এই ক্ষেত্রে বুর্জোয়ার সঙ্গে বামপন্থীর পার্থক্য নেই। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বার একটা বড়ো কারণ হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজগুলোর সঙ্গে টেকনোলজির ক্ষেত্রে পাল্লা দেওয়া। কৃৎকৌশলকে নির্বিচারে গ্রহণ করা। এই বিচারটি কখনোই করা হয় নি যে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় কৃৎকৌশলেরও একটা শ্রেণীচরিত্র আছে। টেকনোলজি মানেই ভাল, এটা হতে পারে না। কী তার বৈশিষ্ট্য, কী তার চরিত্র, কে তা তৈরি করছে, কে তা ব্যবহার করছে প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর জানা চাই। ইলিয়াসের এই সচেতনতা ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য আমি খুবই মূল্যবান মনে করি। টেকনোলজি সম্পর্কে ইলিয়াসের সংশয় ও সন্দেহ মোটেও কৃষকের জীবন সম্পর্কে রোমান্টিক ধারণা বা অহেতুক ভীতি থেকে তৈরি নয়। ইলিয়াস মোটেও মনে করেন না যে এই টেকনোলজিক্যাল সমাজ মানেই মন্দ, চলো যাই অরণ্যে প্রত্যাবর্তন করি। না, মোটেও নয়। টেকনোলজি কৃষকের জীবনে যে বৈপরীত্য তৈরি করছে তাকে স্বীকার করতে হবে, বুঝতে হবে, পর্যালোচনা করতে হবে। উপেক্ষা করলে চলবে না। টেকনোলজি মানেই ভাল এই কথাটিকে চ্যালেঞ্জ করার দরকার আগে। বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। ইলিয়াসের এই স্পিরিট সঙ্গে নিয়েই বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলের পর্যালোচনা আমাদের করতে হবে।

ঢাকা, জানুয়ারি ১৯৯৭

farhadmazhar@hotmail.com

ওয়েব লিংক
ফরহাদ মজহার: আর্টসফেসবুক

free counters


3 Responses

  1. বহুদিন এরকম অন্তর্ভেদী পাঠ করি না। তার কী? কেউ কেউ বলতে পারেন যে বাংলার চিন্তার জগতে কী সাহিত্যে, কী দর্শনে ইতিহাসে নির্মাণের নামে বস্তাপচা রাজা-রানীদের বিজয় সঙ্গীত শুনতে শুনতে কান নষ্ট হয়ে গেছে তাই প্রবন্ধের ব্ই দেখলে ভয়ে সরে আসি। এমন কী তা এই লেখকের গ্রন্থগুলো। ফরহাদের শেষ গ্রন্থ যা পড়েছি তা হলো বাংলার ভাব আন্দোলন। ফরহাদ পাঠক হিসেবে আমাকে ম্রফে ঠকিয়েছে বলেই আমার মনে হয়। এ জন্য সময় এবং অর্খ দুটোর জন্যই আমার বিলাপের শেষ নাই। সে শোকবানী আরেকদিন গাওয়া যাবে। এখন আসি ফরহাদের উপরিউক্ত পাঠ নিয়ে।
    ফেসবুকে অনেকে লিংক দেন, আমিও দেই। অধিকাংশ মানুষই দেয় অপ্রয়েয়াজনীয় লিংক ফলে অধিকাংশ সময় ক্লিক করে হতাশ হই।এবারো সেইরকম হাতাশার প্রস্তুতি নিয়ে বিডিআর্টসরে পাতায় ঢুকতে আমি থাপ্পড় খেলাম। এরকম থাপ্পড় অনেকদিন খাইনা। আমাদের দেশের দৈনিকি পত্রিকায় সাহিতেল্য নামে যেসব গুদামজাত মাল চালানো গচ্ছে তা সাহিত্য বটে, কিন্তু চটি সাহিত্যকে ছাড়িয়ে বেশিদুর যেতে পারেনি, এরকারনে দৈনিকের সাহিত্য পাতায় আমার কোনো আগ্রহ নেই। বিডিআর্টসে শুনেছি ব্রাত্য রাইসু দেখেন, মাঝে মাঝে ঢু মারি, দৈনিকের মত হতাশ হইনা। কিছু না কিছু পাই।এর আগে পেয়েছিলোম অদিতী ফাল্গুনির মিলে ফুকোর অনুবাদ। সেবার টানা আমার ঘোর ছিলো। সেই ঘোর কাটাতে আমার গুরু মার্কসের কাছেই ফিরতে হয়েছিলো। এই ঘোর আমাকে দৈনিকের কোনো সাহিত্য পাতা দিতে পারে না। আফসোর হয়, মফস্বলের পাঠকদের জন্য তারা হয়তো বিডিআটর্স পড়তে পারে না।
    এবার আসি মূল আলোচনায়। ফরহাদ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নিরুদ্দেস যাত্রা নিয়ে আলোটচানা শুরু করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইলিয়াস পাঠের একটি পর্যালোচনা করেছেন তিনি। সেই পর্যালোচনার সাথে আমার অন্তমিল দেখে আমি আতকে উঠেছি।
    ‘নিরুদ্দশে যাত্রায়’ ইলিয়াস মায়ের ঘরে রঞ্জু কী ফেলে এসেছে তা সে ‘খোবায়নামায়’ খোজে। ইলিয়াসের সাথে মার্কেজের মিল আছে। মার্কেজ একটি উপন্যাস লেখার আগে বেশ কিছু চোট গল্প লেখেন। তার পর মূল উপন্যাসে প্রবেশ করেন। ইলিয়াসও তাই।
    মায়ের ঘরে আমরা কী ফেলে আসি? নিজেরে ইতহিসা।জন্মের ইতিহাসে বাবার আনন্দের অংশগ্রণ ছাড়া আর কী কিছু থাকে? থাকে না। মায়েল ঘরে আমরা শুধু জন্মের ইতিহাস ফলে আসি না। আমরা পৃথিবীর ইতিহাস ফেলে আসি। যে ইতিহাস খুজতে তমজি খেয়ার অঞ্চলে তেভাগার দিন আনতে নিরুদ্দেশ হয়। আর মেয়ে সখিনা উই ঢিপির উপর দাড়িয়ে জোনাকপোকার মাঝেও তার পেটে নড়াচড়া দিয়ে উঠে বলকানো ভাতের গন্ধ।
    ইতিহাসের পাঠ কিম্বা অনুসন্ধান কোনোটিই ইতিহাস বিভাগ থেকে কী পাওয়া সম্ভব? ইলিয়াসের নিরুদ্দেশ যাত্রা থেকে ‘খোয়াবনামা’য় সেই উত্তর পাঠক হিসেবে আমরা পেয়েছি সেই ইতিহাস পাঠ অন্যখানে যেখানে খোদ ইতিহাস নির্মান করে মানুষ। তমিজ যেখানে নিরুদ্দশে হয়, সেই তেভাগার কোথায় যেনো আর তার মেয়ে খোয়াবে অথবা ঘোরের মধ্যও স্বপ্ন জারি রাখে তেভাগার।
    ফরহাদকে অভিনন্দন ইলিয়াসকে এইভাবে কাটাছেড়া করার জন্য। যে দাগ আমাদের জন্মের মতই গভীর সেখানে কাটাছেড়া অনেক বেশি প্রয়োজন…………

    ………………………..

  2. ———————————————–
    প্রযুক্তির গণতন্ত্রায়ন একটু একটু করে হতে থাকে, ক্ষমতাবান শ্রেণীর ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই।… বড় ক্যানভাসে হয়ত এই ছোট ছোট ব্যাকস্টেজ ইভেন্টগুলো ঠাহর করা যায় না, কারণ আমরা জেনারেলাইজ করি, করতে পছন্দ করি।
    ———————————————–

    ফরহাদ মজহারের এই লেখার সব বিষয়ে আমি একমত এমন না। তবে বলতে দ্বিধা নেই, ইলিয়াসকে নিয়ে এযাবতকাল যত লেখা পড়েছি, এই উচ্চতায় কোনোটাই উঠে নি। তিনটা ইস্যু আলোচনায় এনেছেন ফরহাদ।

    এক, ইলিয়াসের গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাস বিনির্মাণ তথা জাতির আত্মপরিচয়ের ধারণার ওপর আলো ফেলেছেন। মায়ের ঘরে রঞ্জু কি ফেলে এসেছিল, এই সামান্য কথার ক্লু ধরে সাবলীলভাবে এগোয় ফরহাদ মজহারের বিশ্লেষণ। তিনি পৌঁছান এখানে:

    “যা খুঁজছি তা আর কোনদিনই পাই না। কোনদিনই পাবো না। কিন্তু অন্বেষণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা তৈরি করি আমাদের অতীত, আমাদের ইতিহাস। আমরা নিজেরা নিজেদেরই নির্মাণ করি।”

    এই বিনির্মাণের গল্প কি তবে এখানেই শেষ হবে? একটু সিনিক শোনায় যেন! যা খুঁজছি, তা পাবো না বটে, কিন্তু যা পেয়েছি বা পাচ্ছি, তার আদলে কি আমাদের চাওয়াটাই বদলে যেতে থাকে না? আমি আত্মপরিচয় বিনির্মাণের ওপর এই চিন্তাটাকে কেন্দ্রীভূত রেখে কথা বলছি। লক্ষ্য রাখতে হবে, অবাঙালি পুলিশের নস্টালজিয়া রঞ্জুর মধ্যে তার পিতৃপুরুষের অতীত সম্পর্কে অদ্ভুত আলোড়ন তোলে। এর অর্থ কি এই নয় যে, সবকিছুর পরেও ইলিয়াস এক ধরনের এসেনশিয়ালিস্ট আইডেন্টিটির ধারণায় আস্থাশীল ছিলেন? এই জায়গায় তিনি ফরহাদ মজহারের ছাড় পেয়েছেন মনে হল।

    ফরহাদ মজহার লিখেছেন:

    “বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের খুবই কেন্দ্রীয় ও খুবই মুখরোচক একটি দাবি হচ্ছে, আধুনিক সমাজ ও আধুনিক মানুষকে যথাযথভাবে সাহিত্যে হাজির করতে হবে। এর পেছনে রয়েছে সাহিত্যকে টেকনোলজির মতো বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতিয়ারে পরিণত করার তাগিদ, অন্যদিকে আগে থাকতেই মনের মধ্যে গড়ে তোলা একটা বুদ্ধিকাঠামো, সমাজতাত্ত্বিক মডেল বা ইতিহাসের ফর্মুলা বা বীহেভীয়রবাদীদের মতো মানুষের মনকেও কার্যকারণ সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ভাবার বিভ্রান্তি।”

    চমৎকার, এরচে লাগসই কথা আর কী হতে পারে! সেইসাথে, ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভিলাষও কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সুপ্তাকারে আছে। সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করবার মাপকাঠি দরকার। ফাংশনাল ভ্যালু সেই মাপকাঠি প্রণয়ন করতে পারে, প্রথম প্রজন্মের মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বে সেরকম চর্চা বিস্তর হয়েছে। লেনিন কিন্তু তলস্তয়কে বলেছিলেন “রূশবিপ্লবের দর্পণ”, অর্থাৎ তলস্তয়ের সাহিত্য দিয়ে সমাজ বোঝা যায়। লেনিনের দরকার ছিল সমাজ বোঝা, সাহিত্য তাকে সহায়তা দিয়েছে। এখন সাহিত্যের চেয়ে সমাজতত্ত্ব এবং এথনোগ্রাফি আরো কার্যকরভাবে দেবে! ফলে সাহিত্যের ফাংশনাল ভ্যালু নিশ্চয়ই কমে যাচ্ছে বুর্জোয়া শাস্ত্রে! য়ুরোপে লাতিন আমেরিকান সাহিত্য এবং হালে ডায়াস্পোরা সাহিত্যের যে কদর, তাতে কিন্তু সমাজ-বোধনের ফাংশনাল ভ্যালু খুব আমল পায় না। আমাদের এখানে এখনো পায়।

    তিন, রাষ্ট্রের নিপীড়ক চরিত্রের ব্যাপারে ইলিয়াস ও ফরহাদ উভয়েই একমত। পাশাপাশি, খেটে-খাওয়া মানুষকে তাঁরা দেখছেন স্রেফ নিরুপায় ভূক্তভোগীরূপে। কিন্তু আবার এটাও ঠিক, সম্পদ বণ্টনের এই প্রবল শ্রেণীচারিত্রিক বিন্যাসের মাঝেও প্রযুক্তির গণতন্ত্রায়ন একটু একটু করে হতে থাকে, ক্ষমতাবান শ্রেণীর ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই। কখনো তা হয় বাজারের স্বতঃসিদ্ধ নিয়মে, কখনো সেটা হয় সাবঅল্টার্নের চোরাগোপ্তা প্রতিরোধ ও সৃজনশীলতার ফলশ্রুতিতে। বড় ক্যানভাসে হয়ত এই ছোট ছোট ব্যাকস্টেজ ইভেন্টগুলো ঠাহর করা যায় না, কারণ আমরা জেনারেলাইজ করি, করতে পছন্দ করি।

    সুমন রহমান
    ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া

  3. ফরহাদ মজহার ইলিয়াসের ‌’নিরুদ্দেশ যাত্রা’কে স্পর্শ করে ইলিয়াসেরই সাহিত্যকীর্তি, রাজনীতি, মার্কসীয় নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে অতীব সরস আলোচনাটি করলেন। এটি যিনিই পড়বেন তার ভিতরে কিছু রিএকশন হবে। ইলিয়াস বিষয়ে পাঠক তখন আর পূর্বোক্ত ধারণা খুঁজে পাবেন না। এটি ফ.ম.-এর একটা ক্রেডিট।

    তবে ইলিয়াস বরাবরই তার ধারণার ভিতর একই স্কেলে ছিলেন এমনটি মনে করার কারণ আছে বলে মনে হয় না। চিলেকোঠার সেপাই থেকে খোয়াবনামায়, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ থেকে ‘কান্না’ বা ‘অপঘাতে’-এ তিনি অনেক বদলে গেছেন–ভাষা, চরিত্র নির্মাণ, মানুষকে চেনানোর ধরন, তার ভিতরে নানা মাত্রার ধান্ধাবাজির আরোপ ইত্যাদিতে তার পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। খোয়াবনামায় তিনি জ্ঞানকাঠামোরও পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছেন। এখানে চরিত্র অনেক ভাংচুরের ভিতর দিয়ে গেছে। বহুস্বর সরাসরি যেন তাদের কথা বলে, এখানে একজন নয় হাজার হাজার ইলিয়াস বিভিন্ন চরিত্রে কলরব তৈরি করে।

    ইলিয়াস নিজেও গল্পে শুধুমাত্র একরৈখিক ভাবনা দ্বারা তাড়িত হননি।

    আর তিনি রোগ আর তার ক্ষয় বিষয়ে প্রতীকী অর্থেই কথা বলেছেন। সমাজের ডাক্তার হওয়ার কোনো লক্ষণ তার ভিতর খেয়াল করা মুশকিল।

    ফ.ম. সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের বড়ো কারণ দেখাচ্ছেন টেকনোলজির সাথে পাল্লা দেয়া। এই হচ্ছে আরেক সমস্যা! তিনি তার সুবিধামতো জায়গাটিতে ফোকাস করেই তার কাজের সমাপ্ত জ্ঞান করলেন। সোভিয়েট রাষ্ট্রব্যবস্থা পতনের আর কী কী কারণ ছিল? সেখানে লিডাররা কি বুর্জোয়া মানসিকতার হয়ে যায়নি? শ্রেণীসংগ্রামের বদলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে ব্যক্তি-পুজিঁর বিকাশ ঘটানোর সুযোগ করে দেয়নি? সর্বহারার গণতান্ত্রিক কোনো চর্চা তথায় হয়নি। ক্রমাগত প্রগতিশীল চৈতন্যের উন্মেষ না ঘটাতে পারলে সাম্রাজ্যবাদ পরিবেষ্টিত দুনিয়ায় তার পতন তো অনিবার্য।

    তবে লেখাটি বেশ ভালো লেগেছে।

    – কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.