
নজরুল ইসলাম হাজার তিনেক গান লিখেছিলেন। অনেকে বলেন, তার চেয়েও বেশি। কিন্তু তাঁর যে-কটি গানের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, তার কোনোটাতেই গানের সংখ্যা তিন হাজার নয়—তার থেকে কম। তাঁর গানের সংখ্যা যেমন এনতার, সেসব গানের বিষয়বস্তুও তেমনি বিচিত্র। তিনি প্রেম, পূজা ও প্রকৃতির গান থেকে আরম্ভ করে ছাদ-পেটানোর গান—সবই লিখেছেন। তবে তাঁর এসব গানের বেশির ভাগই ফরমায়েসী। ১৯৩০ সাল থেকে গান লেখা ছাড়া জীবিকা উপার্জনের তাঁর বিশেষ কোনো পথ ছিলো না। তিনি গ্রামোফোন কম্পেনির বেতন-ভুক কর্মচারী ছিলেন না যে, মাসে-মাসে বেতন পাবেন। কিন্তু গ্রামোফোন কম্পেনিই ছিলো তাঁর উপার্জনের প্রধান ক্ষেত্র। তিনি রোজ রেকর্ড কম্পেনিতে যেতেন। সেখানে গায়করা এসে তাঁর কাছে গান চাইতেন। তিনি তাঁদের গান লিখে দিতেন। প্রত্যেকটা গানের জন্যে তিনি রেকর্ড কম্পেনির কাছ থেকে বিশ টাকা করে পেতেন। প্রায় দোকানদারির মতো।
অবশ্য লিখে দিয়েই তাঁর কাজ শেষ হতো না। তারপর তিনি গানে সুর দিতেন। সুর দেওয়ার পরও তাঁর দায়িত্ব ছিলো গায়ককে গানটা শেখানোর। নিজে সুর দেওয়ার সময় না-পেলে তিনি শিষ্যস্থানীয় সুরকারদের সুর দিতে বলতেন। কমল দাশগুপ্ত লিখেছেন যে, অনেক সময় সুরের কাঠামোটাও বুঝিয়ে দিতেন। কমল দাশগুপ্ত একাই নজরুলের লেখা ১৬৪টি গানে সুর দিয়েছিলেন। নজরুল-রচিত গানে অন্য যাঁরা সুর দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন নিতাই ঘটক (৫১টি), চিত্ত রায় (নামে-বেনামে ৪০), সুবল দাশগুপ্ত (৩৪), রণজিৎ রায় (২৮), গিরীণ চক্রবর্তী (২৪), শৈলেশ দত্তগুপ্ত (২১), আব্বাসউদ্দীন (১১) প্রমুখ।
রোজই তিনি ফরমায়েশ অনুযায়ী গান লিখতেন। তাই বলে তিনি যে ইচ্ছে করলেই গান লিখতে পারতেন, তা নয়। ব্যতিক্রম ছিলো বৈকি! যেমন, একবার কমল দাশগুপ্ত কয়েকটা শ্যামাসংগীত লিখে দেবার জন্যে কবিকে অনুরোধ করেন। কবির আর সময় হয় না। শেষে একদিন সন্ধ্যের পর নির্জন পরিবেশে কবি চা আর পান আনতে বলেন কমল দাশগুপ্তকে। কমল দাশগুপ্ত লিখেছেন যে, তারপর কোনো কথা না-বলে কবি পেনসিল দিয়ে একটার পর একটা শ্যামাসংগীত লিখে চললেন। একে একে বারোটা গান লিখে তবে যেন তিনি বাস্তব জগতে ফিরে এলেন। নয়তো রেকর্ড কম্পেনিতে গিয়ে তিনি দিনে দুতিনটার বেশি গান লিখতেন বলে মনে হয় না। পঁচিশ দিনে মাস ধরলে এবং রোজ তিনটা করে গান লিখলে বছরে ন শো গান লেখা হয়। দশ বছরে ন হাজার গান। সুতরাং তাঁর গানের সংখ্যা নিয়ে যা বলা হয়, তা একটা কিংবদন্তী। তবে অন্তরের তাগিতে যখন লিখতেন তখনকার কথা আলাদা।
নজরুল অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু প্রতিভাবান হলেও কারও পক্ষে ফরমায়েশ-মতো যখন-তখন গান লিখে দেওয়া কঠিন। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। এবং একবার দুবার নয়, এ কাজ তিনি করেছিলেন দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি যখন বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন (১৯৩৯ সালের ডিসেম্বরে) একবার তাঁকে ফরমায়েশ করা হয় সরকারের কচুরিপানা ধ্বংসের যে-কর্মসূচী চলছিলো, সেই কাজের পক্ষে একটা গান লিখে দিতে। কচুরিপানা নিয়ে গান! অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু তিনি লিখে দিয়েছিলেন একটি গান—‘ধ্বংস করো এই কচুরীপানা।/এরা লতা নয় পরদেশী অসুর ছানা।’ যে-কবি অন্যের অনুরোধে গানের গোলামী করতে সদাপ্রস্তুত ছিলেন, তিনিও নিশ্চয় এ গান লিখতে গিয়ে নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়েছেন। অভাবের মুখে তাঁর এই করুণ অধঃপতন এবং অর্থদাতার কাছে আত্মসমর্পণ দেখে তাঁর প্রতি আমাদেরও সহানুভূতি জেগে ওঠে।
ঢালাও মন্তব্য সাধারণত সঠিক হয় না। তা সত্ত্বেও, আমার মনে হয়, নজরুলের শ্রেষ্ঠ গানগুলো হলো তাঁর প্রেমের গান আর শ্যামাসংগীত। এ ধরনের গান তিনি লিখেছিলেন তীব্র প্যাশন নিয়ে। তবে ব্যতিক্রম ছিলো বৈকি! যেমন, তাঁর ‘মন বলে তুমি আছ ভগবান / চোখ বলে তুমি নাই’ এবং ‘যাহা কিছু মম / আছে প্রিয়তম’ দুটিই অতি উৎকৃষ্ট গান, কিন্তু কোনোটিই প্রেমের গান অথবা শ্যামাসংগীত নয়। দুটিই উপাসনার গান। এমনি ‘সখি, বাঁধো লো বাঁধো লো ঝুলনিয়া’ তাঁর সবচেয়ে সুন্দর গানগুলোর অন্যতম। কিন্তু গানটি প্রকৃতির গান।
সখি বাঁধো লো বাঁধো লো ঝুলনিয়া।/ নামিল মেঘলা মোর বাদরিয়া।
চল কদম তমাল তলে গাহি কাজরিয়া।/ চল লো গোরী শ্যামলিয়া।
বাদল-পরীরা নাচে গগন-আঙিনায়,/ ঝমাঝম বৃষ্টি-নূপুর পায়
শোনো ঝমঝম বৃষ্টি নূপুর পায়/ এ হিয়া মেঘ হেরিয়া ওঠে মাতিয়া।
মেঘ-বেণীতে বেঁধে বিজলী-জরীণ ফিতা,/ গাহিব দুলে দুলে শাওন-গীতি কবিতা
শুনিব বঁধুর বাঁশী বন-হরিণী চকিতা,/ দয়িত বুকে হব বাদল রাতে দয়িতা
পর মেঘ-নীল সাড়ি ধানী রঙের চুনরিয়া/ কাজলে মাজি লব আঁখিয়া (হরফ সংস্করণ)
কেবল সুরের বিচারে নয়, কাব্যের বিচারেও এই গানটি সার্থক। কিন্তু এ গানের কথায়ও তিনি ছন্দ বজায় রাখতে পারেননি। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত অথবা স্বরবৃত্ত—কোনো নিয়ম দিয়েই একে কোনো ছন্দের মধ্যে ফেলা যায় না। কিন্তু আমরা যখন কথাগুলোকে সুরের সঙ্গে শুনি, তখন ছন্দের এই বন্ধুর পথ সুরের গালিচায় সমান হয়ে ঢাকা পড়ে।
ভাষার বিচারে এ গানটি আগাগোড়া রোম্যান্টিক। এতে তিনি ছোটো ছোটো এমন কয়েকটি অপূর্ব শব্দ-ছবি অঙ্কন করেছেন, যা সমস্ত পরিবেশটাকে অবাস্তব এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে যায়। যেমন, ‘বাদল-পরীরা নাচে গগন-আঙিনায়’। এই পরীদের পায়ে বৃষ্টির নূপুর। তাই শুনে কবির হিয়া মেতে উঠেছে। আর-একটি ছবি মেঘের গায়ে বিদ্যুতের। মেঘের বেণীতে বাঁধা বিজলীর জরীণ ফিতা। এই স্বপ্নের ধারা-পতনের মধ্যে নীল রঙের শাড়ি, আর ধানী রঙের চুনরি পরে, চোখে কাজল দিয়ে রাতের অভিসারিকা তার প্রেমিকের বুকে আশ্রয় নেবে। প্রেমিক ও প্রেমিকার আসন্ন মিলনের প্রত্যাশা বৃষ্টিমুখর প্রকৃতিকে জীবন্ত করে তোলে। ঝুলনিয়া, বাদরিয়া, কাজরিয়া, শ্যামলিমা, মাতিয়া, দয়িতা, চুনরিয়া, আঁখিয়া ইত্যাদি শব্দও সমস্ত পরিবেশটাকে বিচিত্র রঙে সাজিয়ে তুলেছে।
নজরুল তাঁর গানে নিজের তৈরি বহু শব্দ ব্যবহার করেছেন। আগের বাক্যে যে-শব্দগুলোর কথা উল্লেখ করেছি, সে শব্দগুলোও এই শ্রেণীতে পড়ে। কিন্তু সব জায়গাতে তাঁর শব্দ ব্যবহার সার্থক হয়নি। তাঁর গানে তিনি পরিশীলিত গানের ভাষার পাশাপাশি অতি-মৌখিক, এমন কি, গ্রাম্য ও অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন, এক জায়গায় তিনি দেবীর বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সকল-খাগী’ (ভাতার-খাগীর মতো)। এর ফলে দেবীর মাহাত্ম্য কিছু বাড়েনি।
আমরা আগেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানে কথা ও সুরের বাঞ্ছনীয় অনুপাত বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁর গানে কথার গুরুত্ব সুরের থেকেও বেশি। তাঁর অনেক গান কথার উৎকর্ষের জন্যেই গান হিসেবে বিবেচিত হয়। কথাগুলোকে সুর কেবল ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে। এসব গানে সুর ও তানের বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই। বরং সুরে-সুরে কথাগুলো আবৃত্তি করতে হয়। যেমন, ‘তার হাতে ছিলো হাসির ফুলের হার, কত রঙে রঙ-করা।’ এ গানে বলতে গেলে তানের কোনো জায়গাই নেই। যেসব গানে টুকরো টুকরো তান আছে, সেসব গানেও তানগুলোকে অলংকৃত করার বিশেষ কোনো প্রয়াস নেই। আর তিনি যে-অলংকারটি বারবার ব্যবহার করেছেন, সেটি হলো মীড়।
প্রমথ চৌধুরী ছিলেন গানের মস্ত বড়ো সমঝদার। তিনি তান-প্রধান গান সম্পর্কে বলেছেন যে, যে-গানের কেবল অলংকার আছে, দেহ নেই, সে গানের সৌন্দর্য তিনি বিচার করবেন কী করে! ‘দেহ’ মানে গানের কথা, গানের বাণী। যেমন, বাংলা খেয়াল। সে গানে কথার প্রায় কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই গাইবার সময়ে কথার কোনো অগ্রগতিও লক্ষ করা যায় না; অর্থ সম্প্রসারিত হয় না। কেবলই একটা শব্দ অথবা বাক্যাংশকে তান দিয়ে অলংকৃত করার চেষ্টা চলে, এ রকমের গান বাঙালিদের আকৃষ্ট করে না। তা ছাড়া, রবীন্দ্রনাথের মতে, সুরের সঙ্গে কেবল কথা থাকলেই গান হয় না, কথাগুলোকে রীতিমতো কাব্য হতে হয়। তাঁর গানগুলো তাই সুরযুক্ত কাব্য। তাঁর মতো বড়ো কবি পৃথিবীতে খুব কমই জন্মেছেন। সে জন্যেই তাঁর গানগুলো একই সঙ্গে ছন্দোবদ্ধ কাব্য এবং সংগীত। অনেক সময় তিনি কবিতার ছন্দের সঙ্গে মিল রেখে গানে সুর দিয়েছেন। যেমন, পেয়েছি/ছুটি//বিদায়/দেহো//ভাই./..//; সবারে/আমি//প্রণাম/করে//যা../.ই//অথবা ‘এমন/দিনে/তারে//বলা যা/../.য়// এমন/ঘন/ঘোর/বরিষা/../.য়।
অপর পক্ষে, নজরুলের এমন বহু গান আছে, যার সুর শুনলে মুগ্ধ হতে হয়। কিন্তু সেগুলো পড়তে গেলে হোঁচট না-খেয়ে পড়া যায় না। তার কারণ কথাগুলোকে তিনি যেন-তেন প্রকারে ছন্দের বন্ধনে বাঁধতে চেষ্টা করেছেন। ফলে সুরের দরুন গান হিসেবে উৎরালেও, গানের কথাগুলো দুর্বল, ছন্দ তার থেকেও দুর্বল। এক কথায়, কাব্য হিসেবে উৎকৃষ্ট নয়। তাঁর একটা গান আছে: ‘একাদশীর চাঁদ রে ঐ রাঙা মেঘের পাশে’। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু তার পরক্ষণে তিনি যখন সেই চাঁদের একটা উপমা দিতে যান, তখন লেখেন: ‘যেন কাহার ভাঙা কলস আকাশ-গাঙে ভাসে।’ একাদশীর চাঁদের সঙ্গে ভাঙা কলসের তুলনায় চাঁদের সৌন্দর্য মোটেই বৃদ্ধি পায় না। বরং এ উপমা কবির মনোযোগের শিথিলতাই প্রমাণ করে। সত্যি বলতে কি, মনোযোগের অভাব এবং অযত্নবশত তিনি তাঁর অনেক গানে এমন উপমা এবং শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা হয়তো সমস্ত গানটির সৌন্দর্য ম্লান করেছে। এ কথায় বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথের গান কথার দিক দিয়ে নিখুঁত এবং তাঁর গান কথাপ্রধান, অন্য দিকে, নজরুলের গান তানপ্রধান।
নজরুল যেহেতু অসংখ্য গান লিখেছিলেন সে জন্যে তাঁর গানের বিষয়বস্তুতে—বিষয়বস্তু কেন, তাঁর প্রিয় শব্দ, বাক্যাংশ এবং উপমার পুনরাবৃত্তি লক্ষ করি। বারবার তিনি পাখির উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে ‘বুলবুল’, ‘বৌ কথা কও’ এবং ‘পাপিয়া’ কথা। কোকিল সম্ভবত তাঁর প্রিয় পাখি নয়। আধখানা চাঁদ এবং জ্যোৎস্নার কথাও তিনি বারবার লিখেছেন। ‘ফুল-চুরি’ ও ‘ফুল-চোরা’ কথাটা সম্ভবত তাঁরই তৈরি। কিন্তু কথাটা এমন কিছু ভালো শোনাচ্ছে না। কথাটা তিনি বারবার ব্যবহার করেছেন।
যদি গীতিকার এবং সুরকার নজরুলের মধ্যে তুলনা করা হয়, তা হলে সুরকার নজরুলই হয়তো প্রথমে স্থান পাবেন। কথার নেশায় তিনি কথা বলেননি, কিন্তু সুরের নেশায় সুরের স্রোতে ভেসে গেছেন। সুর তাঁকে মুগ্ধ করেছিলো। তাঁর এ অবস্থা ঘটে তিনি গ্রামোফোন কম্পেনিতে যোগ দেবার পর। এ সময়ে তিনি ওস্তাদ জমীর উদ্দীনের সংস্পর্শে আসেন এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতে অনুরক্ত হন। অতঃপর তাঁর গানে উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রভাব বাড়তে থাকে।
আলোচ্য কালে তিনি বহু গান রচনা করেন, যাকে বলা যেতে পারে ‘রাগপ্রধান’ বাংলা গান। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় এবং তারাপদ চক্রবর্তীর মতো সেকালের নাম-করা ওস্তাদরা তাঁর রাগপ্রধান গানগুলো রেকর্ডে গেয়েছিলেন। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদই বেশি। নজরুল এঁদের তান দেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ফলে এ গানগুলো বাংলা গানের সীমানা অতিক্রম করে প্রায় হিন্দুস্তানী গানে পরিণত হয়। কিন্তু ইন্দুবালা দেবী, আঙুরবালা দেবী প্রমুখ এতোটা স্বাধীনতা নিতে সাহস পাননি। ফলে তারাঁ যে-গানগুলো গেয়েছেন, তাতে সম্ভবত নজরুলের দেওয়া তানগুলোই শোনা যায়। ইন্দুবালার তানগুলো দ্রুতগতির, তা সত্ত্বেও প্রতিটি স্বর প্রায় আলাদা করে শনাক্ত করা যায়।
বর্তমান যুগে নজরুলগীতির তানগুলো যাঁর কণ্ঠে অপূর্ব সৌন্দর্য নিয়ে সুস্পষ্ট এবং বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে প্রকাশ পায়, তিনি ওস্তাদ অজয় চক্রবর্তী। প্রসঙ্গত, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নাম স্মরণ করতে হয়। নজরুলগীতি যখন প্রায় পর্দার আড়ালে চলে যাচ্ছিলো, তখন যাঁরা এ গানকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁদের মধ্যে যাঁর নাম প্রথমেই বলতে হয়, তিনি মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কিন্তু যতো দিন গেছে, তিনি ততোই দুর্বোধ্য উচ্চারণে গানের কথা এবং তানগুলোকে পরিবেশন করেছেন। ফলে তাঁর গানগুলো বাংলা গান থেকে দূরে সরে গেছে। বাংলা গানে উচ্চারণ বিকৃতির জায়গা নেই।
নজরুলগীতি সম্পর্কে আরও একটা কথা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলতে হয়, সে এর এক্স্প্রেশন। যাঁরা বর্তমান সময়ে নজরুলগীতি গেয়ে থাকেন, মনে হয় না যে, তাঁরা এ বিষয়ে আদৌ সচেতন। গানের অর্থ বেঝানোর জন্যে যেখানে অর্থ-বিরতি দিতে হবে, যেখানে ঝোঁক দিতে হবে, যেখানে বিশেষ দরদ ফোটাতে হবে, সেসব এই গায়করা বোঝেন কিনা, বলা শক্ত। তাঁরা সুর নিয়ে কুস্তি করতে থাকেন, গানের কথাগুলো মারা যায়। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। কবির একটা বিখ্যাত প্রেমের গান আছে:
সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে।
অনুরাগ-কুমকুম দিলে দেহে মনে, বুকে প্রেম কেন নাহি দিলে।
যাঁরা এ গানটি গেয়ে থাকেন, মনে হয় না, তাঁরা এর প্রথম পংক্তিটির অর্থ বুঝে গানটি পরিবশেন করেন। ‘সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে’ এর অর্থ কি ‘সুর ও বাণীর মালা দিয়ে’, নাকি ‘সুরে ঐ বাণীর মালা দিয়ে’? অর্থ অনুযায়ী গাইলে ‘সুরের’ পরে একটি ছোট্টো অর্থ-যতি থাকা উচিত: সুরে / ও বাণীর মালা দিয়ে’। এ ভাবে অংশত অর্থ না-বুঝে গাওয়ায় এবং দীর্ঘ তানের দরুন বেশির ভাগ শ্রোতারা নজরুলগীতির ভুল ব্যাখ্যা করেন। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। নজরুলের একটি বিখ্যাত গজল: আসলো যখন ফুলের ফাগুন গুল-বাগে ফুল চায় বিদায় / এমন দিনে বন্ধু কেন বন্ধুজনে ছেড়ে যায়’। গানটি রেকর্ডে শুনেছিলাম মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। তাঁর গানের লয় আর তানের তোড়ে অর্থ বুঝতে পারিনি। তারপর লন্ডনের এক আসরে গানটি শোনার সৌভাগ্য হয় নিলুফার ইয়াসমীনের কণ্ঠে। শুনে প্রথম বুঝতে পারলাম গানটা কী দারুণ দুঃখের। আরও একটা গানের কথা মনে পড়লো: শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়, ফিরে আয়। জ্ঞান গোঁসাইয়ের গলায় শুনে অর্থ বুঝতে পারিনি; কারণ তাঁর লয়, উচ্চারণ ও তানের বন্যায় অর্থ ভেসে গিয়েছিলো। গানটি সঠিক অর্থে গেয়েছেন অজয় চক্রবর্তী।
নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের মতো বড়ো কবি ছিলেন না। তাঁর গানগুলো তাই কাব্যিক মূল্যের দিক দিয়ে সর্বত্র সমান উৎকর্ষ লাভ করেনি। রবীন্দ্রনাথের মতো সৃজনশীলতার প্রেরণায়ও তিনি তাঁর বেশির ভাগ গান রচনা করেননি। রচনা করেছিলেন ফরমায়েশে, পেটের দায়ে। রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব ছিল বাণীতে, নজরুলের গুরুত্ব ছিলো সুরে। তাঁদের বড়ো হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবশে। তাঁদের রুচি আলাদা। সে জন্যে একজন লিখেছেন, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, আমার সাধের সাধনা।’ অন্যজন একই কথা লিখেছেন ভিন্ন ভাষায়: ‘মোর প্রিয়া হবে, এস রাণী / দিব খোঁপায় তারার ফুল।’ তা সত্ত্বেও কথা ও সুর মিলে নজরুলের যে-গানগুলো সফল হয়েছিলো, সেগুলো রবীন্দ্রসংগীতের চেয়ে আদৌ হেয় নয়। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল বাংলা গানের দুই শ্রেষ্ঠ গীতিকার ও সুরকার।
Comments RSS Feed