নামে কি আসে যায় কিম্বা আহমদ ছফা সমাচার

শামস আল মমীন | ২৮ জুলাই ২০১০ ৯:১০ অপরাহ্ন

এক
‘নামে কি আসে যায়’, মনিষী শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত উক্তি। আপাতত বিশ্লেষণে উক্তিটি যথার্থই মনে হয় কিন্তু প্রকৃত অর্থে এর উল্টোটাই ঘটে বেশী, অর্থাৎ আমরা নামের পিছনেই ছুটি। ক্যালভিন ক্লাইন, ক্রিশ্চিয়ান ডিওর, রালফ্ লরেন ইত্যাদি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের দ্রব্যাদি আমরা কত না সমীহ করি। শুধু তাই নয়, আজকের দুনিয়ায় এরা আভিজাত্যের প্রতীকও বটে। এটা আর একবার প্রমাণ করার জন্য এই ছোট ঘটনাটিই যথেষ্ট।

কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল আমাকে ঢাকার প্রধান দৈনিকগুলোর সাময়িকী অংশটা বড় খামে ভরে ডাকে পাঠাতেন, এবং পাঠিয়েছেন একটানা ১১ বছর (১৯৯৫-২০০৬) আমার ঠিকানায়, দূরের শহর নিউইয়র্কে। তখন ইন্টারনেটে বাংলা পত্রিকার এমন উচ্ছল যৌবন ছিল না। আর সেই সব সাময়িকী আমি কখনো সাদা সাদা বরফ দেখতে দেখতে, কখনো বা গরম কফির স্বাদে চিবিয়ে চিবিয়ে পড়তাম। সাময়িকীতে সচরাচর যে ধরনের লেখা থাকে যেমন গল্প,কবিতা প্রবন্ধ ইত্যাদি… তার মধ্যে এক লেখকের লেখাও প্রায়ই চোখে পড়তো, নাম আহমদ ছফা। সত্য বলার জন্য সাহস দরকার আর আজ সাহস করেই বলি এই লেখকের লেখা আমি কখনো পড়তাম না। কারণ ঐ নামটাই লেখক নাম হিসাবে আমার কাছে খুব বিদঘুটে লাগতো। ভাবতাম, যাঁর নামই এরকম সে আবার আহামরি কী লিখবে। যাই হোক, সাময়িকীগুলো পড়া হয়ে গেলে সেগুলো প্রায়ই সলিমুল্লাহ খানকে (সলিমুল্লাহ খান তখন নিউইয়র্কে) পড়তে দিতাম এবং লেখাগুলো নিয়ে মাঝে মাঝে তাঁর সাথে মত বিনিময়ও হতো। সলিমুল্লাহ খান প্রায়ই আহমদ ছফার লেখার তারিফ করে জানতে চাইতেন তাঁর অমুক লেখাটা পড়েছি কি না… আমি সরাসরি বলে ফেলতাম… না। উনি বিনয়ের স্বরেই বলতেন, ‘পড়ে দেখতে পারেন ভাল লেখা।’

এভাবে চলতে চলতে একদিন হঠাৎ করেই তাঁর একটা লেখা কী মনে করে পড়েই ফেলি এবং কিছুটা অবাক হই। মনে মনে বলি, আরে এরকম লেখাই তো আমি পড়ার জন্য উদগ্রীব থাকি! একরকম ঘোরের মধ্যেই তাঁর অলাত চক্র, বাঙালি মুসলমানের মন, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, গাভী বিত্তান্ত, অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী,ওঙ্কার অল্পদিনেই পড়ে ফেলি এবং যার পর নাই বিস্মিত হই। শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি আরও একবার যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হলো ‘নামে কী আসে যায়।’ তারপর থেকে, সাময়িকী হাতে এলে তাঁর লেখাই সবার আগে পড়তাম।

জুলাই ১৯৯৮। গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে যাই। কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সঙ্গে দেখা করি তাঁর আজিজ মার্কেটের অফিসে। আমি তাকে বলি, দু’টা কাজে তাঁর সাহায্য দরকার, এক. আহমদ ছফার সাথে দেখা করিয়ে দিতে হবে দুই. আকার ইকার (আমার সম্পাদনায় নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা) এর দ্বিতীয় সংখ্যার জন্য কিছু ভাল লেখা জোগাড় করা।

দু’টাই হবে, চিন্তা করার কিছু নাই, দুলাল অভয় দিলেন। এবং এও বললেন, আহমদ ছফার সাথে আজই দেখা করিয়ে দিবেন। দোতালায় তাঁর অফিস আছে এবং বেশির ভাগ সময় তিনি সেখানেই থাকেন। তখন দুপুর ১টা। আর একটু পরেই নিচে গিয়ে দেখা করব তাঁর সাথে। ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই দুলাল বললেন, চলেন যাই। আমরা দোতালায় গেলাম। অফিসের মতো একটা ঘরের সামনে গিয়ে দুলাল বললেন, উনি তো ঘুমাচ্ছেন। আমি কিছু দেখতে না পেয়ে তাকে বলি, আমি তো কাউকে দেখছি না। আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি বেঞ্চের উপর একজন কাত হয়ে শুয়ে আছেন। মুখ ফসকে বলেই ফেলি, এই অবস্থা কেন? দুলাল মনে হয় বুঝতে পারছিলেন আমার মনের অবস্থা। তিনি বললেন, উনি খুব সাধারন জীবনযাপন করেন। আমি কেন জানি একজন লেখকের সাথে তাকে মিলাতেই পারছিলাম না। এমনকি, তার লেখার সাথেও তাকে মিলাতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। সেই মুহূর্তে আমার ভাবনাগুলো এরকমই ছিল, এবং এটাই সত্য।

একটা ঘটনা মনে পড়ছে, আমি তখন ঢাকায় (১৯৮০-৮১’র দিকে) থাকি। বদরগঞ্জ (রংপুর) থেকে আমার এক অনুজপ্রতীম ঢাকায় এসে আমার কাছে উঠেছে। তাকে নিয়ে শহরের এদিক-ওদিক বেড়াচ্ছি। আজকের ভিআইপি রোডের এক জায়গায় রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন সিনেমার অভিনেতা আবদুস সামাদ। তাঁর পরনে ছিল অতি সাধারন পাজামা পাঞ্জাবি এবং দারিদ্রের ছাপ তিনি বহন করছিলেন খুব স্পষ্টভাবেই। তিনি সাধারণত রাজা-বাদশাহ এবং জমিদারের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। তাকে দেখিয়ে তাঁর পরিচয় দিতেই সে অবাক হয়ে আমাকে বলে, উনার এই অবস্থা কেন। সিনেমার জৌলুস আর বইয়ের মলাটে কিম্বা খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে প্রকাশিত নামগুলো পাঠক-দর্শকের কল্পনায় হয়তো বা রূপকথার চরিত্রের মতো স্থান করে নেয়। আহমদ ছফাকে দেখে তখন আমি সেরকম কিছুই ভাবছিলাম কি না তাও সঠিক করে বলা মুশকিল। আমরা আবার তিন তলায় কবি দুলালের অফিসে চলে গেলাম।

ঘণ্টা দুই পরে, তখন প্রায় বিকাল চারটা, আমরা আবার নেমে আসি দোতলায় তাঁর অফিসে। কবি দুলাল আমাকে ছফা ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর বড় বড় চোখের অগ্নিদৃষ্টি আর ভাঙা দাঁতের হাসি দিয়ে তিনি মুহূর্তেই যেন আমাকে আপন করে নিলেন। তিনি বসেছিলেন চেয়ারে, পাশে কবি সমরেশ দেবনাথ এবং আরো একজন অচেনা কবিতাপ্রেমিক। দেখে মনে হলো উনারা কবিতা নিয়েই আলোচনা করছিলেন। দুলাল চলে গেলেন তাঁর অফিসে আর আমি তাঁদের সাথে সহজেই মিশে গেলাম কবিতার আড্ডায়। আমি চুপ হয়ে ওনাদের কথা শুনছিলাম। মাঝে মাঝে তাঁরা কবিতাও পড়ছিলেন। তারপর, ছফা ভাই তাঁর ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ কবিতাটি প্রাণখুলে পড়তে থাকেন। সমরেশ দেবনাথ সাথে সাথে বলে উঠলেন, দারুণ হয়েছে ছফা ভাই। ছফা ভাই তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘চুপ করো মিয়া, তুমি কবিতার কী বোঝো।’ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, উনি আমেরিকার প্রফেসর উনার কাছ থেকে কিছু শুনি। আমি একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেও সামলে নিয়ে বললাম, ভাল হয়েছে ছফা ভাই তবে টুকটাক এডিটিং করলে ভাল কবিতা হয়ে উঠবে। হঠাৎ করেই ছফা ভাই কবিতাটার ইংরেজি অনুবাদ (তাঁর নিজের করা) বের করে পড়া শুরু করে দিলেন। শেষ করে জানতে চাইলেন আমার কাছে, কেমন হয়েছে। এবার আমি একটু বেকায়দায় পড়ে গেলাম। বাংলাদেশে যারা বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেন (হাতে গোনা কয়েকজন বাদে) তারা দুটি সমস্যায় ভোগেন; এক. তারা এত বেশি ভাষার ব্যাকরণ সচেতন থাকেন যে তাতে শুধু শরীর তৈরি হয় কোনো প্রাণ থাকে না, দুই. সেই ভাষায় জীবন যাপনের অনভিজ্ঞতা ও চলতি ভাষা প্রয়োগে অক্ষমতার কারণে সবুজ পাতার মনভোলানো রসটুকু কবিতায় ধরা পড়ে না। ছফা ভাইয়ের অনুবাদেও এর থেকে ব্যতিক্রম কিছু আমার চোখে পড়েনি। কবি সমরেশ দেবনাথ কিছু একটা বলতে গেলে উনি আবারো তাকে ধমক দিয়ে বললেন, উনি আমেরিকার ইংরেজির প্রফেসর ওনার কথা শুনি, তুমি ইংরেজির কী বোঝো মিয়া… বলে তাকে আবারো থামিয়ে দিলেন। আমার সাথে তাঁর প্রথম দেখা। কিছু বলে তাঁকে আহত করতে চাইনি তাই গৎবাঁধা অল্প-সল্প মন্তব্য করে এ যাত্রায় তরী পার করি। তারপর, চা-নাস্তা খেয়ে সেদিনের মতো ছফা ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেই।

এরপর আরো বহুবার তাঁর সাথে তাঁর অফিসে আড্ডা দিয়েছি, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছি অল্প-বিস্তর। এবং তিনি কখনোই তাঁর সহজ হাসিকে আড়াল করে রাখেননি। সেই যাত্রায় তিনি আমার আকার ইকার পত্রিকার জন্য ‘শঙ্খ নদী’ কবিতাটি ছাপতে দেন। আকার ইকার যখন প্রেসে যাওয়ার জন্য তৈরি তখন সূচি দেখে দুলাল ভাই বললেন, সিকদার আমিনুল হক ছফা ভাইয়ের সিনিয়র, তাঁর নামটা আগে যাবে। পরের বৈঠকে ছফা ভাইকে জিজ্ঞেস করি ব্যাপারটা। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, হ্যাঁ সিকদার আমিনুল হক তাঁর চেয়ে সিনিয়র।

যথা সময়ে আকার ইকার প্রেস থেকে বেরিয়ে আসে। আমারও যাওয়ার সময় হয়ে আসে। সবাইকে বাই বাই বলে ¯মৃতির শহর থেকে বহু স্মৃতি নিয়ে আমি ফিরে আসি নিউইয়র্কে।

দুই
প্রতিবার দেশ থেকে ফিরে এলে নতুন কিছু নাম যোগ হয় আমার টেলি-যোগাযোগের তালিকায়। এবং অভ্যাসবশে, এবার যোগ হলো ছফা ভাই। তাঁর সাথে টেলিফোনে কথা চলতে থাকে। আমার সাথে কথা বলতে উনি বেশ পছন্দই করতেন বলে আমার ধারণা। এরকম কথা বলতে বলতে একদিন তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন মিনা ফারাহ নামে নিউইয়র্কের কোনো লেখিকাকে আমি চিনি কি না। আমি বললাম, হ্যাঁ চিনি। তিনি আরো জানতে চাইলেন, তিনি কেমন লেখেন? আমি তাঁকে মিনা ফারাহ সম্পর্কে যা বলি তা হলো এরকম: পেশায় তিনি একজন দন্ত চিকিৎসক, গল্প-উপন্যাস ও কবিতা লেখেন, কেমন লেখেন তা আপনাকে তার বই পড়েই জানতে হবে। এ ব্যাপারে আমি ভাল-মন্দ কিছু বলতে পারবো না।

তিনি যা বললেন, ‘‘উনি আমাকে তার বইয়ের আলোচনা লেখার জন্য বলেছেন। আমি তাকে বলেছি, সরকারের বিরুদ্ধে অনেক বিতর্কিত কথাবার্তা আছে, তাই লেখতে চাই না। তিনি আমাকে বলেন, তাহলে বইটা ব্যান্ড করে দেন। আমি তো বই ব্যান্ড করার কেউ না। ওটা সরকার করতে চাইলে করবে এখানে আমার করার কিছু নাই, আমি তাই বললাম।” কথা শেষ করে ছফা ভাই একটু হাসলেন। এইভাবে টেলিফোনে আলাপচারিতা আমাদের চলতে থাকে।

তিন
গরমকাল, ১৯৯৯। আহমদ ছফা আসলেন আমেরিকায়। কিন্তু প্রথমে তিনি গেলেন ডালাস, টেক্সাসে। সেখানে থাকলেন বেশ কিছুদিন। আমার সাথে আগের মতই কথা চলতে থাকে। তবে এবারে একটা নতুন জিনিস আমরা শুরু করি। তা হলো কবিতাপাঠ। উনি এখানে এসে কিছু কবিতা লিখেছিলেন; সেগুলো পড়ে শোনাতেন। কখনো তাঁর পুরনো কবিতাও শোনাতেন। আমিও আমার কবিতা তাঁকে পড়ে শোনাতাম। এবং এসব দূরালাপনী-আড্ডা বেশ লম্বা সময় ধরেই চলতো। আমেরিকার রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মানুষের জীবন সম্পর্কে তাঁর জানার আগ্রহ ছিল প্রচুর। আমি যতটা পারতাম তাঁকে তথ্য সরবরাহ করতাম।

ডালাসে কিছুদিন থাকার পর তিনি আসলেন নিউইয়র্কে, ঢাকার বার্ড পাবলিশার্স-এর স্বত্বাধিকারী কবি এ বি এম সালেহউদ্দিনের বাসায়। নিউইয়র্কে যতদিন ছিলেন তার বাসাতেই ছিলেন। কবি এ বি এম সালেহউদ্দিন, আমার জানা মতে, মহৎ মানুষদের একজন। এবং তিনি খুব আদর-যতœ করে ছফা ভাইকে রেখেছিলেন তাঁর বাসায়। আমার সাথে ছফা ভাইয়ের টেলিফোন-আড্ডা চলতো আগের মতই। সলিমুল্লাহ খান একদিন আমাকে ফোন করে জানালেন ছফা ভাইয়ের টুথপেস্ট এবং দু’একটা অষুধ দরকার, আমি একটু কেনা কাটায় হেলপ্ করতে পারবো কি-না। পরদিন আমি বউ নিয়ে ঐ বাসায় হাজির হই। ভিতরে ঢুকেই দেখি, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ কবিতার ইংরেজি ভার্সনটা ছফা ভাই আবৃত্তি করছেন আর আমার অপরিচিত একজন তা খুব মনযোগ দিয়ে ভিডিও করছেন। আবৃত্তি শেষ হলে আমরা কুশল বিনিময় করি। তারপর, উনি আরো কয়েকটা কবিতা তাঁর কণ্ঠে ভিডিও করে রাখেন। কবি এ বি এম সালেহউদ্দিনের বাসায় আমি ঐদিনই প্রথম যাই। আমরা সবাই মিলে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম। এক ফাঁকে আমি ছফা ভাইকে তাঁর দরকারি জিনিসগুলোর কথা বলতেই উনি বললেন, ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ঐ বাসা থেকে চলে আসার আগে, আমি ছফা ভাইয়ের সাথে একদিন সারাদিন ঘুরবো এরকম একটা দিন তারিখ ঠিক করে আসি।

এতদিনের ফোনালাপে যেন আমরা দু’জন দু’জনার কাছে বেশ সহজ এবং আপন হয়ে গেছি। আমাদের আলাপের কোনো নির্ধারিত বিষয় ঠিক গুরুত্ব না পেলেও সাহিত্য বিষয়টাই প্রতিবার প্রধান হয়ে উঠতো। নিউইয়র্কে থাকার কারণে, বলা যায়, ঢাকা-কলকাতার অনেক নামি-দামি লেখকদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ আমার হয়েছে কিন্তু প্রায় সবাই নিজের গুণগান নিয়ে ব্যস্ত। আবার এমনও কাউকে দেখেছি যার কথা শুনলে মনে হয় যে উনি সাহিত্যে না আসলে বাংলা সাহিত্য আজও অন্ধকার যুগেই থাকতো এবং তার কল্যাণেই বাংলা সাহিত্য এতদূর এগিয়েছে। কিন্তু ছফা ভাইকে কখনোই তাঁর নিজের সম্পর্কে উচ্চবাক্য কিছু বলতে শুনিনি। যাই হোক, নির্ধারিত দিনে আমি তাঁকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নেই, রে¯েতারায় বসে আড্ডা, অবিরাম আড্ডা… তারপর আমার বাসায় এসে আবার গল্প, বিরতিহীন গল্প..। তিনি তাঁর লেখা অনেক গান সেদিন গেয়ে শোনালেন আমাকে। একসময় তিনি তাঁর অসুখের কথাও বললেন এবং তাঁর পায়ের চামড়ার বর্তমান অবস্থা দেখালেন। বিস্তারিত কিছু না বলে শুধু এটুকু বলি, তা ছিল ভয়াবহ। তাঁর জন্য মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল আমার। কিন্তু তিনি হয়তো এটাকে মেনেই নিয়েছিলেন। তিনি নিজের দুঃখকে চেপে রাখতেন এক অসম্ভব ক্ষমতায় যাকে আয়ত্তে রাখতে দরকার হয় মহৎ আত্মার। আমার বাসায় খেলেন তিনি অতি সামান্যই কিন্তু রেখে গেলেন অসামান্য স্মৃতি আর মন ভোলানো অসম্ভব কিছু কথার স্নিগ্ধ সুর। দিনশেষে তাঁকে পৌঁছে দিয়ে আসি তাঁর বাসায়। সলিমুল্লাহ খান আমাকে বলেছিলেন, তাঁর একটা ইন্টারভিউ করে রাখতে। কিন্তু, আমি ভাবলাম দেশে যখন যাব তখন রয়ে-সয়ে করবো; এত তাড়া কীসের, তাঁর যে তাড়া ছিল সে তো আর বুঝে উঠতে পারিনি। এই দুঃখ এখনো আমাকে ভোগায় ভীষণ। এর কয়েকদিন পরেই তিনি ঢাকা ফেরত যান এবং যাওয়ার আগে তাঁর স্কুলের জন্য কিছু টাকা সংগ্রহ করতেও সমর্থ হন।

চার
জুলাই, ২০০১। আমি আবার ঢাকায় যাই। ছফা ভাইযের সাথে আবার আড্ডা, গল্প-গুজবে মেতে উঠি কখনো তাঁর বাসায় কখনো তাঁর অফিসে। জুলাই ২৭, ২০০১ তারিখে সলিমুল্লাহ খানের সাথে দেখা করার জন্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে হাজির হলাম। দেখি, খান তখনো জ্যাক লাঁকার উপর অবিরাম বলে চলেছেন; তাঁর সামনে ২০-২২ জন ছাত্র। ভাবলাম, আমি বরং ছফা ভাইয়ের বাসা থেকে ঘুরে আসি। যেই কথা সেই কাজ। তাঁর বাসায় গিয়ে দেখি তিনি তখনো ঘুমাচ্ছেন। বাসার কাজে সহযোগিতা করেন এমন একজনকে বলতেই তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে দেন। তিনি হাতমুখ ধুয়ে আমার সামনে এসে বসলেন। তাঁকে সতেজ এবং হাসি-খুশি লাগছিল। আমাকে দেখে সেদিন তিনি এতো খুশি হলেন যেন আমার ডাকের অপেক্ষাই করছিলেন। এটা-ওটা নানান কথা বলতে বলতে তিনি বলতে লাগলেন, ‘‘জানেন, আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে মাঝরাতে একা ছাদে যাই, ন্যাংটা হয়ে হাঁটি গভীর রাত পর্যন্ত, পাখিদের সাথে কথা বলি, গাছের সাথে কথা বলি, বাতাসের সাথে কথা বলি আর ওদের সবাইকে ডেকে বলি, দেখ বিশুদ্ধ আমাকে।’’ আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে তন্ময় শুনছিলাম তাঁর কথা। সেদিন তিনি আমাকে আনারস, পেয়ারাসহ অনেক ধরনের ফল খেতে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যা প্রায়, আমি ছফা ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি।

পরদিন আমি ব্রাত্য রাইসু ও সাজ্জাদ শরিফের সাথে দেখা করে ‘প্রথম আলো’ অফিস থেকে বেরিয়ে রিক্সা কিম্বা বেবি ট্যাক্সির জন্য দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ আমার নাম শুনে ফিরে তাকাই, কবি টোকন ঠাকুর চলন্ত রিক্সা থেকে চিৎকার করে বলছে, ‘মমীন ভাই, ছফা ভাই মারা গেছে।’ আমি যেন কাঠবিড়ালির মতো চুপ হয়ে গেলাম। আমার সামনে ভেসে উঠলো কাল বিকেলের চঞ্চল মুখখানি। মাথা যেন কিছুতেই আর কাজ করতে চাইছে না। ওখান থেকে আসি আজিজ মার্কেটে। ততক্ষণে সবাই জেনে গেছে খবরটা। আমি সম্ভবত কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সাথে মগবাজারের এক হাসপাতালে আসি যেখানে তাঁর মরদেহ শুয়ে আছে। লোকের ভিড় ঠেলে তাঁর মুখটা দেখলাম আর একবার… শেষবার। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গনে জানাজায় যাই, তারপর টিএসসি… অল্পক্ষণ পরেই আমি ফিরে আসি। বাইরে দাঁড়াই, একা। আমার দুই আঙুলের ফাঁকে মার্লবরো পুড়ছে আর মনে পড়ছে তাঁর সেইসব কথা, ‘‘আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে মাঝরাতে একা ছাদে যাই, ন্যাংটা হয়ে হাঁটি গভীর রাত পর্যন্ত, পাখিদের সাথে কথা বলি, গাছের সাথে কথা বলি, বাতাসের সাথে কথা বলি আর ওদের সবাইকে ডেকে বলি, দেখ বিশুদ্ধ আমাকে।’’ তাঁকে কবর দিতে আমি যাইনি কারণ কাফন কাপড়ে কাউকে ওভাবে রেখে আসতে আমার ভাল লাগে না।

নিউইয়র্ক জুলাই ২৫, ২০১০

kabitanadia@hotmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mujahid — আগস্ট ২, ২০১০ @ ২:১১ পূর্বাহ্ন

      আপনার কাছে আমি ঋণী ও কৃতজ্ঞ…. এই কথাটার চাছাছোলা বহিঃপ্রকাশ হলো ‘ধন্যবাদ’।

      – mujahid

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com