খানিক ছফানামা

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর | ২৮ জুলাই ২০১০ ৯:২৫ অপরাহ্ন

আহমদ ছফার প্রতি একধরনের মোহাবিচ্ছিন্নতা যে কখন থেকে আমার শুরু হয়েছিল তা নির্ণয় করা অনেকটাই দুঃসাধ্য। আমার এ কথকতার শুরুতেই বলে নিতে চাই, দীর্ঘদিন তার প্রতি ছিল আমার দারুণ মোহগ্রস্ততা। তা হয়ত প্রায় একই রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে হতে পারে, তার সৃজনকৃত মুগ্ধতার সমান্তরাল কোনো আকাঙ্ক্ষা থেকেও হতে পারে, নাকি বিকল্প ভাষাগত কোনো চৈতন্য থেকে আমার বোধে এল তা এই মুহূর্তে নির্ণয় করা মুশকিলই। তার লেখালেখির অনুভব থেকে চিন্তা করলে আমি একধরনের প্রেমে পড়ি তার গ্রন্থ বঙ্কিমচন্দ্র: শতবর্র্ষের ফেরারী পাঠ করে। বঙ্কিমকে যে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে একেবারে মুক্তচিন্তার সমাজতাত্ত্বিক চৈতন্য থেকে এভাবেও দেখা যায় তা আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়ের ব্যাপার। আমি এর প্রতি এতই আকর্ষণ বোধ করি যে তার এ গ্রন্থটি নিয়ে রীতিমতো একটা লেখাই নির্মাণ করে ফেলি এবং তা স্থানীয় দৈনিক আজাদীর সাময়িকীতে ছাপতেও দিই।

এ লেখাটি যখন বের হয় তখন ছফা তখন নবউত্থান পর্বের (!) কর্ণধার। আমি সেইসময় গ্রন্থসংগ্রহের নিমিত্তে আজিজ সুপার মার্কেটে যাই। আমি তখন চাইলেই বিকালে তথায় তার সাথে দেখাও করতে পারতাম। কিন্তু ব্যক্তিগত নির্লিপ্ততার জায়গায় নিজেকে সঁপে দিয়ে আর সেখানে গেলাম না। এ ব্যাপারে আমার সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমি আমার ভালো লাগা থেকে একটি কিছু লিখে ফেলেছি, তা আবার নিজ উদ্যোগে তাকে তা জানাব কেন?! কিন্তু তাতে এটাই হল যে, এ লোকটির সাথে আমার আর সরাসরি দেখা হল না।

যাই হোক, ছফা বিষয়ে আমার আরও একটা আগ্রহের কারণ হচ্ছে, আবদুর রাজ্জাক বিষয়ে তার অতি আগ্রহ, গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, বাঙালী মুসলমান সম্পর্কে কিছু নতুন কথাবার্তা বলা, স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালানো, তার বলার ভিতরে নিজস্ব রাগ-জেদ-চৈতন্য লালনের চেষ্টা, কথাসাহিত্য চর্চায় তার একধরনের ব্যাকুলতা, ফাউস্ট অনুবাদকরণ।

বাঙালী মুসলমানের মন পড়তে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে তিনি আসলে কোন্ বাঙালির মননকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন, তা তার প্রবন্ধে স্পষ্ট হয়নি। তার দেখার বাঙালিত্বে কি তিনি নিজেও আছেন? একটা সময়ে মনে হয়েছে তিনি নিজেকেও তার দেখা বাঙালিত্ব থেকে মুক্ত করতে পারেননি। তার সৃষ্ট বাঙালির মনের গভীরে একধরনের সংস্কার আছে। তার দেখা মুসলমান কখনও পবিত্রতা দেখতে ভুল করেন না। এরা সঠিক দিশা পাচ্ছে না। এই মুসলমান সমাজ সংস্কারের প্রতি ব্যাকুলতা প্রকাশ করে, তারা তাদের মননে একধরনের আদিমতা জারি রাখে। তার সৃষ্ট ‌’বাঙালী মুসলমানের মন’-এ কখনও ভাববাদী প্রাবল্যমুখর প্রবণতাকে দেখেন না, তার সৃষ্ট বা দেখাতে সমস্যা শুধু একটাই, এই মুসলমানগণ যথার্থ শিক্ষিত-সংস্কারমুক্ত মুসলমান হতে পারেনি। এবং তিনি চাইতেন মুসলমানদের মননের যথোচিত সাধন-ভজন করে মহান কিছু কার্য সিদ্ধি করা যায় কিনা। তিনি এও বিশ্বাস করতেন, এই কাজটি আমাদের দেশের ভাষাভিত্তিক বুর্জোয়া দলটি করতে পারবে না; কারণ তারা মুসলমানদেরকে দেশজ অনুসঙ্গ থেকে বিচার করতে জানে না।

তাই তো তিনি একধরনের সাধনায় নামেন, শেষজীবনে তিনি লিবিয়ার অনুসরণে ইসলামি সমাজবাদ কায়েম করতে চান, ইসলামি নানাবিধ জলসায় গমন করেন, ওয়াজ মাহফিলের প্রতিও অনুরক্ত হতে থাকেন। এখানে একটা প্রশ্ন রাখা যায়; যে রাগ, গোস্বা, অভিমান থেকে আবুল ফজল কর্তৃক সরকারি প্রাপ্তিযোগে প্রয়োজিত সিরাত মাহফিলে যোগদান কল্পে ইসলামি কার্যকলাপের নমুনা দেখে তিনি অতিশয় বিস্মিত হন, এবং স্বল্পসময়ের ভিতর ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ (আসলে এটির শিরোনাম হতে পারত, বাঙালী শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমানের মন) লিখে ফেলেন। ছফা যে মনোবেদনা নিয়ে এটি সৃজন করেন, একই কার্যবিধিতে তিনি নিজেও কি একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েননি? আসলে তার মনোভাবের বড়ো শক্তি হচ্ছে তার তাৎক্ষণিক মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতা বা মনোপীড়াই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। যার ফলে মাণিকের পদ্মানদীর মাঝি’র হোসেন মিয়া, যিনি হয়ত-বা যান্ত্রিক সমাজবাদের ধারক, বেয়াদব পুঁজির পূজারি, অপব্যবসার অংশীদার, কুবেরের মতো সরল-সোজা মানুষটাকে চোর-পুলিশের ধাঁধায় ফেলে ময়নাদ্বীপে পাচার করার মেইন হোতা, সেই তিনিই ছফার দৃষ্টিতে হয়ে পড়েন নব্য মেঘনাদ! তার কারণ ছফার কাছে মনে হয়, হোসেন মিয়া মুক্তচিন্তার ধারক! অথচ একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, হোসেন মিয়ার যাবতীয় কর্মে আছে শ্রেণীস্বার্থের নিবিড় লালন। শ্রেণীদ্বন্দ্ব বা শ্রেণীর পূজারিদেরকে সেইভাবে চিনতে চান না বলেই ছফা ‘৭২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে থাকেন খুবই উৎফুল্ল।

আসলে ছফাকে পাঠ করার জায়গাটাই তার মুগ্ধতা বা বিমোহিত ভাবকে আমাদের মনে রাখা খুবই দরকার। এটা আমাদের চৈতন্য বিকাশের একটা দায়ও বটে।

৫/০৭/১০

editorkatha@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূরুল আনোয়ার — আগস্ট ২, ২০১০ @ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন

      কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের লেখাটা পড়লাম। আমরা চাই আহমদ ছফার জীবন এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হোক। সেটা হতে পারে ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক। যেটাই হোক, আমার কাছে দুটোই ইতিবাচক। আহমদ ছফার বাঙালি মুসলমানের মন নিয়ে আপনি সমালোচনা করেছেন। আমার কাছে ব্যাপারটি উপভোগ্য হয়েছে। আরও উপভোগ্য মনে হত আপনি যদি বাঙালি মুসলমানের মনোজগত সম্পর্কে কিছু বলতেন। তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম বাঙালি মুসলমান সমাজকে আপনি কীভাবে দেখেন।

      বেশ কিছুদিন আগে (অক্টোবর ২৩, ২০০৯) আপনি আমার ‘ছফামৃত’ লেখার মন্তব্য করতে গিয়ে ছফা সম্পর্কে বেশ ভাল ভাল কথা বলেছিলেন। ওই মন্তব্যের সারমর্ম কী দাড়ায় আমি জানি না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ওই মন্তব্য এবং এখনকার লেখার মধ্যে কিছুটা স্ববিরোধিতা আছে। আমি মন্তব্যটা এখানে তুলে দিলাম।

      ছফাকে বোঝার কত কিছু যে আছে। তার মনে-অবয়বে আছে মাল্টিকালার আবহ। তিনি একপ্রকার দ্রোহী, একধরনের সত্যনিষ্ঠতায় সদা বিচরণশীল। প্রতিবাদী। তিনি কি ধর্মবিযুক্ত মানুষ? মনে হয় না। ধর্মকে তো তিনি প্রয়োজনীয় উপাদানই মনে করেন। ‌‌বাঙালি মুসলমানের মন গ্রন্থটিতে ধর্মের বিষয়ে কোনো ভিন্নমত পোষণ করেছেন কি? বরং সেখানে বাঙালির সামাজিক-সংস্কারকেই বড় ঝামেলার এক বিষয় করে দেখেছেন। খাঁটি ধার্মিকতায় কোনো সমস্যা দেখতেন না। একধরনের সততা তার ছিল, তাই তিনি বয়ে বেড়াতেন। অন্যকে বহনের কথাও বলতেন। যা সত্যি বলে মনে করতেন, তার জন্য জেহাদ করতে জানতেন। তার দর্শন আসলে কী ছিল?
      তিনি নিজের পারিবারিক আবহকে মূল্য দিতেন, এ ব্যাপারে তার ব্যক্তিক উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট। ইতিহাস-ঐতিহ্যকে খুবই প্রয়াজনীয় বিষয় মনে করতেন। সব মিলিয়ে তিনি এক চটকদার চরিত্র। তাকে আরও জানার অপেক্ষায় থাকলাম।

      নূরুল আনোয়ার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বাক্ষর শতাব্দ — আগস্ট ৩, ২০১০ @ ১:৫৫ অপরাহ্ন

      “ছফা যে মনোবেদনা নিয়ে এটি সৃজন করেন, একই কার্যবিধিতে তিনি নিজেও কি একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েননি? আসলে তার মনোভাবের বড়ো শক্তি হচ্ছে তার তাৎক্ষণিক মুগ্ধতা।”

      “তাৎক্ষণিক মুগ্ধতা”ই কি ছফার দর্শন? আপনি কি সেরকম কিছু বোঝাচ্ছেন। একটু বিশদ ব্যাখ্যা করলে উপকৃত হই।

      – স্বাক্ষর শতাব্দ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহেদুজ্জামান লিংকন — জুন ১০, ২০১২ @ ১২:৩১ পূর্বাহ্ন

      আহমদ ছফার খুব বেশি লেখা এখনো পড়া হয়নি। তবে তার এক ‘ওঙ্কার’ই আমাকে যে মুগ্ধতা দিয়েছে তার রেশটুকু কিছুদিন থাকুক। অন্য রচনায় যদি সেভাবে তাকে না পাই তো তার প্রতি মুগ্ধতাটুকু ক্ষয়ে যাবে। এই তো সেদিন ওনার কি যেনো একটা উপন্যাস পড়লাম। ভালো লাগেনি আগের মতো। তবে আশা করছি ওনার যথেষ্ট লেখা আছে সেই মুগ্ধতা ফিরিয়ে আনার। ‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ’ কেনা আছে। পড়া দরকার শিঘ্রী।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com