
মনে পড়ে ছেলেবেলায়, আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি, একবার নানা বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। অনেক উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা, আর উচ্ছাস নিয়ে আমি যখন বাড়িতে ঢুকি তখন পরিবেশটা কেমন একটু অস্বাভাবিক লেগেছিলো। সাধারণত খালপাড় থেকে বাড়িতে ঢোকার দিকটায় কেউ থাকলে ছুটে গিয়ে বাড়িতে খবর দেয়, তখন মামা-খালাম্মারা ছুটে আসে। বিশেষত; আমার বুয়া (নানী) ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে করতে বাড়িতে নিয়ে ঢুকতো। তাঁর মতো সারল্যে ভরা খুশি মুখ আমি আর কোথাও দেখিনি। কিন্তু সেবার বুয়াও আসলো না, আমি নীরবে বাড়িতে ঢুকলাম। আমার দু’জন খালাম্মা রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলো, তারা ছুটে এলো। তবে প্রতিবার আমি যে ‘খোশআমদেদ’টা পেতাম এবার সেটা আর পেলাম না। সবদিক কেমন যেন সুনসান, বাড়ির উঠোনেও বাচ্চাদের কোন কোলাহল নেই। আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম, তবে এসব ভুলে যেতে আমার বেশি সময় লাগেনি।
পরের দিন আমি, নাছিম মামা, আর বুলু খালাম্মা দল বেঁধে খালপাড়ে চিংড়ি মাছ ধরতে গেলাম। বরশি দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরা একটা কঠিন কাজ, কেননা মাছ বড়শিতে গাঁথার পর ধীরে ধীরে মাটিতে তুলে আনতে অসম্ভব ধৈর্য্য লাগে। আরেকটি জিনিস দরকার; সুনসান নিরবতা-এটা চিংড়ি মাছ ধরার অন্যতম শর্ত। খালের দু’পাড় জুড়ে কেওড়া গাছের সারি, ডালগুলো নুয়ে আছে পানি বরাবর- যেন প্রবহমান স্রোত ছুঁতে চাইছে। আমার কাজ ছিল বড়শিতে টোপ গেঁথে দেয়া, আর খালাম্মা- বড়শি থেকে মাছ খুলে এনে ঝুড়িতে রাখা। এসব ছোটখাটো ব্যস্ততার মাঝে আমি কোন এক প্রসঙ্গে খালাম্মাকে ‘আসো’ বলে ডেকেছিলাম, ডেকে তো আস্ত আহম্মক হয়ে গেলাম। আমার ডাক শুনে খালাম্মা তীব্রভাবে চমকে উঠলো এবং বুকে থুতু ছিটিয়ে হাতের ইশারায় বললো আমি যেন আর ‘আসো’ না বলি। আমি কারণটা বুঝতে পারলাম না, তাই তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘আসো’ বললে কি হয়? কেন বলবো না? খালাম্মা আমাকে একটা গাছের আড়ালে নিয়ে চারদিক তাকিয়ে বললো, ‘আসো’, ‘আসেন’, ‘আয়’ এসব কথা এখন বলতে নেই। তার চোখে মুখে আতঙ্ক। আমি তো নাছোড়বান্দা, বললাম ‘কেন’? খালাম্মা আমাকে ইশারায় জানালো, ‘নয়া বাড়ি’ কলেরা এসেছে। খালের ওপাড়ে ‘নয়া বাড়ি’, সেখানে আমার আরও অনেক মামা-খালাম্মারা থাকেন। আমি তখনও বুঝতে পারলাম না- ‘কলেরা’ কিভাবে আসে? এটা তো কোনো মানুষ, ভুত বা ওরকম কিছু নয় যে এসে হাজির হবে। কিন্তু খালাম্মা যে ব্যাখ্যা দিলো তাতে কলেরার একটা দৈহিক কাঠামো আছে, কিন্তু কেউ তাকে দেখেনা। তারা নাকি তিন বোন: কলেরা, বসন্ত, আর যক্ষা।
মাছধরা শেষে ঘরে ফেরার পথে খালাম্মা চুপিসারে আরও জানালো যে – ওদের ডাকতে নেই, ওরা সাদা শাড়ি পরে গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে বসে হুড়–ম (মুড়ি) খায় আর চারদিক চেয়ে দেখে – কেউ ডাকে কিনা। যদি কেউ বলে ‘আয়’, ‘আসো’ অথবা ‘আসেন’, তাহলেই সর্বনাশ! অমনি তার সাথে সাথে ওই বাড়িতে চলে যাবে। তখন আমার কাছে নানা বাড়ির থমথমে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে গেল। সেইসব দিনগুলোতে মানুষের ধারণায় মহামারীর একটা ব্যক্তিরূপ ছিল, আর সে কারণেই আমরা এসব উক্তি-প্রতুক্তি, শাপ-শাপান্ত শুনতে পেতাম: ‘কলেরায় লইয়া গেছে (মৃত্যু হয়েছে)’, তোরে যেন কলেরায় লইয়া যায় (অভিশাপ)’, ‘আমি আল্লার আরশে দুই হাত তুইল্যা কইতে আছি তোরে যেন রক্ত-বমিতে (যক্ষায়) ধরে।’ মহামারী এবং এ থেকে সৃষ্ট ‘মৃত্যু’কে দৈহিক অবয়বে দেখার ধারণাটি মানুষের মাঝে ঠিক কখন শুরু হয়েছিল সেটা আমাদের অজানা থাকলেও শিল্প-সাহিত্যে ধারণাটি প্রভাব বিস্তার করে মধ্যযুগের শেষের দিকে ।
সেবার বেশিদিন বেড়াতে পারিনি। চারপাশের আরো কিছু দুঃসংবাদে সবার মাঝে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছিল। শহীদ মামার সাথে দূর-দূরান্তে ছুটে চলা, কিংবা নাছিম মামার পোষা কুকুর নিয়ে শিয়াল, সজারু খুঁজে বের করা-কিছুই হলো না। বাড়িতে ফিরে এলে আমার মলিন মুখ দেখে আম্মা জিজ্ঞেস করলো; বেড়ানো কেমন হলো। আমি তাকে কলেরা প্রসঙ্গটি খুলে বললে আম্মা আঁতকে উঠলো এবং বলল যে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে আমি ভালোই করেছি । তারপর আম্মা নীরব হয়ে গেলো-কিছুক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো ‘এই কলেরায়-ই তো ভাটু মরলো। ‘ আমি জানতে চাইলাম ‘ভাটু’ কে?’ ভাটু আমার মায়ের ছোট বোন, কৈশোরে কলেরায় মৃত্যুবরণ করেছে। “আহা রে…পানির জন্য ভাটু যে কত চিক্কুর দিছে, কেউ পানি দেয় নাই। ” মায়ের এই হাহাকারের মর্ম উপলব্ধি করেছিলাম পরিণত বয়সে। এখনও আমি দৃশ্যটি যখন কল্পনায় দেখি আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে; নয় দশ বছরের এক কিশোরী ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, পানিশূন্যতায় তার সোনালী বরণ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। ভাটু কি বুঝতে পেরেছিল তার সময় ফুরিয়ে এসেছে? তখন মানুষের মাঝে একটা ধারণা ছিল যে কলেরায় আক্রান্তরা পানি পান করলে পরিনাম খারাপ হয়। এ ভুল ধারণার কারণে কত হাজার হাজার মানুষ যে পানিশূন্যতায় মৃত্যুবরণ করেছে তার কোন লিখিত হিসেব নেই। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মহামারি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। প্লেগ, ¯প্যানিশ ফ্লু, কলেরা, এইডস, এবং ইবোলার পরে এখন দুনিয়া জুড়ে চলছে করোনার তান্ডব। বাতাসে লাশের গন্ধ, যম এখন দুয়ারে পালকি সাজিয়ে বসে আছে।
মার্চের ১৪ (২০২০ সাল) তারিখ সকালবেলা আমি বাসা থেকে বের হয়ে কাছের শপিংমলের দিকে যেতে যেতে খেয়াল করলাম রাস্তায় চলতে থাকা গাড়ি এবং পথচারীদের মাঝে কেমন একটা অস্থির ভাব। গাড়িগুলো দ্রুত চলে যাচ্ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও রাস্তায় অস্বাভাবিক মাত্রায় গাড়ির উপস্থিতি, এবং গতিও বেশ দ্রুত। শপিংমলে ঢোকার মুখে একটি কফির দোকান আছে, যেখান থেকে আমি সচারাচর কফি কিনে খাই, সেখানে এক কাপ কফির ফরমাশ দিলাম, এবং লক্ষ্য করলাম শপিংমল থেকে কেনাকাটা করে প্রচুর মানুষ বের হচ্ছে। ট্রলিতে স্তুপ করা সওদাপাতি-সচরাচর এমনটি ঘটে না- এর ভিতর চোখে পড়ার মতো ছিল টয়লেট টিস্যু, একেকজন অনেকগুলো বান্ডিল স্তুপ করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কফির দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি ব্যাপার আজ কোন বিশেষ ডিসকাউন্ট দিচ্ছে নাকি?’ দোকানি আমাকে জানালো যে গতকাল টেলিভিসনে ভাইরাস নিয়ে কি একটা বক্তব্য প্রচার হয়েছে – তারপর থেকেই মানুষ ছুটছে দোকানে; যে যা পারছে কিনে বাড়িতে ঢোকাচ্ছে। তখন করোনাভাইরাস অস্ট্রেলিয়ায় মাত্র অল্প কিছু মানুষকে আক্রান্ত করেছে কিন্তু চীনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইউরোপের দিকে ধেয়ে আসছে। আমি কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে দেখলাম লন্ড্রি ও স্যানিটারি সামগ্রী যেখানে থাকে সে স্থানটি একেবারে খালি-কিছুই নেই, শুধুমাত্র কয়েকটি হ্যান্ড-টিস্যুর প্যাকেট পড়ে আছে। অর্থনীতির ভাষায় এ ধরণের প্রবণতাকে বলা হয় ‘Pannic-buying’। আমি একটা অশুভ অনুভূতি নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। কিছুদিনের দিনের মধ্যেই অষ্ট্রেলিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগলো। পরের ঘটনাবলী প্রায় সব দেশেই একই রকম; লক ডাউন, সোশ্যাল ডিসটেন্স, আর মৃত্যুর মিছিল। তখন থেকে শুরু হল আমাদের স্বেচ্ছাবন্দ্বী জীবন।
এখন করোনা ভাইরাসের কাল, এ নয়া ভাইরাস জগৎ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পাড়ার গুন্ডাদের জমি দখল করার মতো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, যাবার কোনো লক্ষণ নেই। আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৮,৯৪,০০৫ (৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০) লকডাউন, শাটডাউন, পিপিপি, স্যানিটাইজার, মাস্ক, ভেন্টিলেটর, ভ্যাকসিন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দাবলী। বিশ্ব দখলকারী ভাইরাসের হাতে মানবজাতি জিম্মি। এর কোন হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি, ইউনানী, আয়ুর্বেদিক, কিংবা মঘাশাস্ত্রীয় চিকিৎসা নেই। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হবে, সে প্রচেষ্টা তোরজোরে এগিয়ে চলছে। এ বদ ভাইরাস কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছে না, অসহায় মানবজাতি তাই যুদ্ধ বা প্রতিরোধের চিন্তা বাদ দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য যতদূর সম্ভব চার-দেয়ালের ভিতর নিজেকে আটকে রেখেছে। এখন এ অদৃশ্য শক্তির কাছে আমাদের ক্রূজ মিসাইল, টমাহক, ড্রোন, হাইপারলুপ ট্রেন, স্বচালিত গাড়ি প্রযুক্তির অহমিকা ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন এর করাল থাবা থেকে নিস্তার পেতে আমাদের ওই ফ্রান্সিস বেকনের ‘নিউ অ্যাটলান্টিস (১৬২৭ খ্রি)’ উপন্যাসের কল্পিত দ্বীপরাষ্ট্র ‘বেনসালেম’ কিংবা হোসেন মিঞা’র ময়না দ্বীপে (পদ্মা নদীর মাঝি) আশ্রয় নিতে হবে। এখন গাড়ী, ঘোড়া, মোকাম, দোকান-পাট, হাট-বাজার, কল-কারখানায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার। কুলি-কামিন, মিন্তি, টোকাই, নিশিকুটুম্ব, ক্ষৌরকার, চর্মকার, কর্মকার, গীতিকার, সুরকার, অফিসের চাপরাশি থেকে বড়বাবু পর্যন্ত কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সন্দেহ, আতঙ্ক, আর হতাশায় রোগী দেখে ডাক্তারদের গা-ঢাকা দেয়া, আবার পেশার প্রতি শ্রদ্বাশীল অনেক ডাক্তার, সেবিকাদের আত্মত্যাগ স্বীকার করার দুঃখজনক ঘটনাও অহরহ ঘটছে। আক্রান্ত সন্দেহে আপনজনকে ফেলে সটকে পড়া, আবার সচেতন তরুণ এবং যুব সমাজের অসহায় মানুষ এবং প্রাণীকুলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়া আমাদের অন্তরের আলো আর আঁধারকে ¯পষ্ট করে তোলে। মানুষের প্রকৃত বন্ধু তারাই, যারা নিদানকালের দরদী, সুখের পায়রা নয়। এখন থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদেস এ সত্য উপলব্দি করেছিলেন।
করোনার গজব থেকে পরিত্রানের আশায় কিছু মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে একটা বৈজ্ঞানিক সমাধানের জন্য। আরেক দল-বিশেষত যারা মূর্খ, অসচেতন, কিংবা নিয়তিতে বিশ্বাসী-ভাবছে মহামারীর মূল কারণ-পাপ, বিধাতার ইচ্ছায় দুনিয়াতে এ গজব নাজেল হয়েছে। যেহেতু এখন পর্যন্ত এর কোন যথাযথ চিকিৎসা হাতের নাগালে আসেনি, তাই দু’পক্ষের অবস্থানই নাজুক। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের কণ্ঠেও হতাশার সুর। তাই দিশেহারা মানুষেরা কেউ যাচ্ছে থানকুনি পাতা কিংবা গোমূত্রের দিকে, আবার অনেকেই ভরসা করে আছে বিজ্ঞানের উপর। ১৪ শতকে ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগ মহামারীর সময় একদল ভাবতো আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃশ্বাস কিংবা মড়কের দুর্গন্ধ থেকে এ রোগ ছড়াচ্ছে। অন্যরা ভাবতো এটা ঈশ্বরের শাস্তি; মানুষের অনৈতিক কার্যকলাপ এবং পাপের কর্মফল। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অথবা গ্রহ-নক্ষত্রের কোনো স্থানচ্যুতির কারণে এ মহামারী নেমে এসেছে অনেক মানুষ এমন ধারনাও করতো, এবং এখনো কেউ কেউ এই আজগুবি ধারণা পোষণ করেন। বিজ্ঞান, বিশেষজ্ঞ, এবং চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়োজিত আছে এর দাওয়াই আবিষ্কারের জন্য। তাতে সাফল্য অর্জন করা এবং তা হাতের নাগালে পৌঁছানোর আগে কত মানুষ যে প্রাণ হারাবে সেটা ধারণা করলে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে আসে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে বিশ্বে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ, অনিশ্চয়তা, আর আতঙ্কের পরিবেশ আসেনি। প্রতিদিন পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, বাড়ছে মৃত্যু মানুষের ঢল, মনে পড়ে যায় শ্রীমতি লোপামুদ্রার গানটি:
“আমার মুশকিল আসান করো করো দিন কাল ভালো নয়
মুশকিল ঘরে মুশকিল বাইরে মুশকিল বিশ্বময়
মুশকিল ঘরে মুশকিল বাইরে মুশকিল ডাইনে-বাঁয়ে।”

অবশ্য এ ‘মুশকিল’ কোনো নতুন কিছু নয়। সভ্যতার শুরু থেকে এ ‘মুশকিল’ মহামারী মানুষের পিছু নিয়েছে। যখনই সভ্যতা একটু এগিয়েছে, তখনই মহামারীর ছোবলে মানুষের জীবন তছনছ হয়ে গেছে। লক্ষ্যণীয় যে প্রতি একশো বছর পর পর একটা মহামারী মানবজাতির উপর ছোবল হেনেছে। বিগত তিনশো বছরের রোগ-বালাইয়ের ইতিহাস তারই প্রমান। এখন থেকে একশ বছর আগে ১৯১৮ সালে ‘¯প্যানিশ ফ্লু’র প্রাদুর্ভাব ঘটে যা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারী। ১৯১৮-১৯১৯ সালে ১৫ মাস ব্যাপী প্রায় ৫০ কোটি (বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) মানুষকে সংক্রামিত করেছিল। এ মহামারীতে প্রায় ২-৫ কোটি মানুষ মারা যায়, এর ভেতরে ৬৭৫,০০০ ছিল আমেরিকার নাগরিক। এর শত বছর আগে, ১৮১৭ সালে, কলেরা মহামারী শুরু হয়। অবশ্য কলেরার ইতিহাস অনেক পুরাতন। প্রাচীন ভারতের সুশ্রুতা সংহিতা (Sushruta Samhita, খ্রি:পূর্ব ৫০০) এবং গ্রিসের চিকিৎসক Aretaeus (of Cappadocia, খ্রি: ১ম শতক), হিপোক্রেটস (খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম- চতুর্থ শতাব্দী), এবং গ্যালেন (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দী) একটি অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং কিছু উপসর্গের ফিরিস্তি দিয়েছেন যা থেকে ধারণা করা হয়-রোগটি ছিল ‘কলেরা’। তবে কলেরা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে ১৮১৭ সালে, এবং এর উৎপত্তি ঘটে বর্তমান বাংলাদেশের যশোরে। যশোরে থেকে কলেরা ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বার্মা (মিয়ানমার), এবং সিলন (শ্রীলঙ্কা) হয়ে ১৮২০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া (যেখানে জাভা’য় এক লক্ষেরও বেশি লোক মারা যায়), সিয়াম (থাইল্যান্ড), এবং ফিলিপাইন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটেছিলো। কেবলমাত্র ভারতেই ১৯১৮ -১৯১৯ সালে কলেরায় মৃত্যু হয় ৫ লক্ষ মানুষের. তখন পাশ্চাত্যের বিভিন্ন লেখালেখিতে এ মহামারীকে ‘এশিয়াটিক কলেরা’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। অবশ্য এটা ছিল একটা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি; রোগের আবার জাত কি? এখন যেমন Covid 19 বা করোনা ভাইরাসকে ট্রা¤প গংরা বলছে ‘চাইনিজ ভাইরাস’। আসলে নিজেদের ব্যর্থতা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার এ প্রবণতা অনেক পুরাতন। রোম সম্রাট মার্কাস আউরেলিয়াস (১৬১ খ্রি-১৮০ খ্রি ) Antonin Small Pox মহামারীর জন্য খ্রিস্টানদের দায়ী করেছিলেন, কেননা তারা নাকি রোমান দেবতাদের পূজা-পার্বনে অংশ নিতো না। মধ্যযুগে প্লেগ মহামারী সময় রোমান সাম্রাজ্য এবং খ্রিস্টান ইউরোপ দোষারোপ করেছে ইহুদীদের উপর, তারা নাকি পাত-কুয়ায় বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলো।
১৭২০ সালে ফ্রান্সের মারখসে বন্দরে ‘গ্র্যান্ড-সেইন্ট-এন্টোইন’ নামে একটি জাহাজ নোঙ্গর করলে প্লেগ ছড়িয়ে পরে, যা ‘দি গ্রেট প্লেগ অফ মারখসে’ হিসেবে পরিচিত। জাহাজটি পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে পণ্য বোঝাই করে ওই বন্দরে ভিড়েছিলো। অবশ্য জাহাজটি পৃথক করে রাখা হয়েছিল কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, প্লেগ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যুর হোলিখেলায় মেতে ওঠে। পরবর্তী তিন বছরে মারখসে এবং আশেপাশের অঞ্চলে প্রায় এক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়, যা কিনা মারখসে নগরীর মোট
জনসংখ্যার প্রায় তিনভাগের একভাগ। ১৩৪৭ র্খ্রি: ইতালির ফ্লোরেন্সে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার বর্ণনা দিয়েছেন সাহিত্যিক জোভানি বোক্কাচো, তাঁর মতে ফ্লোরেন্সে অর্ধেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। তারা এত দ্রুত মৃত্যুবরণ করে যে যথাযথভাবে তাদের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। চার্চ, চ্যাপেল খাঁ খাঁ করতো কিন্তু কোন যাজক, পাদ্রী, ব্রাদার, সিস্টার ছিলনা। ধনী-গরিব, উজির-নাজির, রাজা-বাদশা, পাইক-পেয়াদা সবাইকে একই কুয়োয় ছুঁড়ে ফেলে মাটি চাপা দেয়া হতো। যমের আতঙ্কে দিশেহারা, উ™£ান্ত এবং দিকভ্রান্ত মানুষ কুমারী মেরি, সন্ত রস, এবং সন্ত সেবাস্তিয়ানের বেদীতলে নিজেদের সমর্পণ করে মুশকিল আসান থেকে রেহাই পাবার প্রার্থনা করতো। আবার কেউ কেউ শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে শলাকাযুক্ত চাবুক দিয়ে নিজেদের পিটিয়ে আত্মপীড়ণ ভোগ করতো এবং পীর-পয়গম্ভরদের মহিমা কীর্তন করতে করতে পথ পরিভ্রমণ করতো।
শিল্প-সাহিত্যেও প্লেগ প্রভাব বিস্তার করেছে। সোফোক্লিসের ‘ওইদিপাউস দি কিং’ নাটকের কাহিনী শুরুই হয় প্লেগ মহামারির সময়। এথেন্সের রাষ্ট্রনেতা পেরিক্লিস এর মৃত্যু ঘটেছিল প্লেগে। হোমারের ‘দি ইলিয়ড’ মহাকাব্যে দেবতা অ্যাপোলো’র গ্রিক সৈন্যদের উপর প্লেগ চাপিয়ে দেবার বর্ণনা রয়েছে। মহামারী ইতিহাসে প্লেগে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে প্লেগ কয়েক হাজার বছর ব্যাপী সক্রিয় ছিল। রাষ্ট্র ক্ষমতা পালাবদলে প্লেগের প্রভাব লক্ষণীয়। বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান ১ এর গদি টলে যায় প্লেগের কারণে। তাঁর শাসনকালে (৪৮৩ – ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ) প্লেগ মহামারীতে ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে যা তখনকার হিসেবে পৃথিবীর মানুষের প্রায় অর্ধেক। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থগিত হয়ে যায়, সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং এ সাম্রাজ্যের দখলে থাকা অন্য জাতিগোষ্ঠীর অঞ্চলগুলো তারা আবার পুনর্দখল করে। এথেন্স-¯পার্টার যুদ্বে এথেন্সের পরাজয়ের কারণ এই প্লেগ। ১৩৪৫ সালে কাফফা, ক্রিমিয়ার একটি শহর, মোঙ্গলরা অবরুদ্ব করে রাখলেও তারা তা দখল করতে পারেনি, প্লেগ সব তছনছ করে দেয় ।
১৫৬২ সালে পিটার ব্রয়গল দ্য এল্ডার Triumph of Death’ শিরোনামে একটি একটি চিত্র এঁকেছিলেন, যার বিষয়বস্তু-মৃত্যু। ১৯৮৮-৮৯ সালে ডেভিড পোজনারউইৎজ একটি আলোকচিত্র তুলেছিলেন, সেটার বিষয়বস্তুও মৃত্যু, এবং দুটো ছবিই মহামারির প্রভাবে সৃষ্ট। সচরাচর আমরা বড় মাপের চিত্রপটে যে ধরণের বিষয়বস্তু লক্ষ্য করি, পিটার ব্রয়গলের চিত্রের বিষয়বস্তু তা থেকে ভিন্ন এবং অস্বাভাবিক। এ ধরণের বিশাল ক্যানভাসের কোনো ছবির বিষয়বস্তু সাধারণত হয়ে থাকে নয়নাভিরাম প্রকৃতি বা কোনো দিগন্তের, কিংবা কোন গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের গাঁথা। কিন্তু এখানে আমরা একটি দিগন্ত দেখি যেখানে সবই
মৃত; কেউ বেঁচে নেই, এমনকি পানির মাছও। একদম উপরে দেখা যায় দিগন্ত জুড়ে ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে গেছে, সাথে জ্বলছে আগুন। দেখে মনে হয় যুদ্ধে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। সাগর ছেয়ে আছে বিধ্বস্ত জাহাজের টুকরোয়। ছবির মাঝ বরাবর দেখা যায় কঙ্কালের দল মানুষদের তাড়িয়ে একটি শলাকাযুক্ত গুহার ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে, গুহার দরজায় যিশুখ্রিস্টের ক্রস আঁকা কিন্তু পরিত্রাণের কোনো লক্ষণ নেই। একেবারে সামনের দিকে অভিজাত শ্রেণীর মানুষের পাশেই মরে পড়ে আছে দিনমজুর, পড়ে আছে রাজা, কার্ডিনাল, পরিব্রাজক, প্রেমিক, এবং ভবঘুরে। মৃত্যুর প্রতীক নরকংকালদের মারকুটে আক্রমণে জীবিত মানুষের প্রতিরোধ থমকে গেছে। ছবিতে কঙ্কালগুলো সক্রিয়, যারা মানুষের করণীয় কাজগুলো করছে, যেমন: এক গাড়িয়াল (কঙ্কাল) ঘোড়ায় টানা গাড়ি চালিয়ে কবরখানার দিকে যাচ্ছে, গড়িতে কঙ্কালের স্তুপ। নিচের দিকে মৃত্যু তাঁর লাল ঘোড়ায় চড়ে মানুষের উপর হামলা চালানো কঙ্কাল সৈনিকদের পরিচালনা করছে, মূলত ছবিটির মাধ্যমে দর্শকদের মৃত্যুর মুখোমুখি একটা অভিজ্ঞতা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, ছবি আঁকার জন্য এন্তার বিষয় থাকতে চিত্রপটে কেন শুধু মৃত্যুর মিছিল? কেনই বা সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ কাতারে কাতার মরে পড়ে আছে? আসলে ইউরোপ জুড়ে মহামারী, যুদ্ধ, আর দুর্যোগে অগুনতি মানুষের প্রাণহানি এবং মানুষের উপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবে মধ্যযুগের শেষার্ধে শিল্প-সাহিত্যে একটি রীতির উদ্ভব ঘটে; যাকে বলা হয় Dance Macabere বা ‘ডান্স অফ ডেথ’। জার্মানিতে এটাকে বলা হতো টোডিটেন্যা›জ, ইতালিতে ‘ডে›জা দেল্লা মরতে’, এবং ইংল্যান্ডে ‘ডান্স অফ ডেথ’, যার সরল বাংলা হচ্ছে ‘যমের নৃত্য’। এ ধরণের চিত্রকলায় সচারচর একটিই বিষয় লক্ষ্য করা যায়; কঙ্কালের দল নৃত্যের তালে তালে জীবিত মানুষদের কবরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ( (উদহারণ: Bernt Notke, Niklaus Manuel Deutsch, John Lydgate, Holbein এর চিত্রকর্ম)। এ শিল্পরীতিতে ‘মৃত্যু’কে দৈহিক অবয়বে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কঙ্কাল) দেখানো হয়, যারা বিভিন্ন পেশার এবং বিভিন্ন পদমর্যাদার; বিশেষত রাজা-বাদশা, কার্ডিনাল, শিশু এবং মেহনতী মানুষদের, কবরখানা – অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। এ ধরনের শিল্প, চিত্রকলার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে, ‘আর কতকাল খেলবি খেলা মরণ কি তোর হবে না’, জানিয়ে দেয়া যে তাদের জীবন কত ঠুনকো, ঠিক কচুপাতার পানির মতো। মৃত্যুর থাবা থেকে কেউ নিস্তার পাবে না। প্রথম ‘ডান্স অফ ডেথ’ এর চিত্র আঁকা হয়েছিল ১৪২৪ সালে এবং এরপর কয়েকশো বছর ব্যাপী শিল্পরীতিটি সক্রিয় থাকে। তবে রেনেসাঁর সময় এর প্রভাব কমে গেলেও উনিশ শতকে ফরাসি রোমান্টিক সাহিত্যে আবার ধারণাটির পুনরুত্থান ঘটে। উনিশ এবং এবং বিশ শতকের সঙ্গীতেও এ ধারাটির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক ইঙমের বার্গম্যান তাঁর ‘The Seventh Seal’ চলচ্চিত্রে এ ধারণাটি ফলপ্রসূভাবে প্রয়োগ করেন। ডেভিড পোজনারউইৎজের আলোকচিত্রে দেখা যায় একদল মহিষ পাহাড়চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহনন করছে। এইডস মহামারি মোকাবেলায় রাষ্টীয় উদাসিনতা এবং আক্রান্তদের অবজ্ঞা করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রতিবাদ এ ছবি। শিরোনামহীন এ ছবিতে (বাফেলো) মূলত নিরাশা আর নিয়তিকে মূর্ত করা হয়েছে। এইডস যখন আমেরিকায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পরে তখন রিপাবলিকান এবং ধর্মপ্রচারক খ্রিষ্টানেরা সমকামীদের দায়ী করেছেন, কেননা আক্রান্তদের ভেতরে তাদের সংখ্যাই বেশি ছিলো। এটা নাকি তাদের উপর ঈশ্বরের গজব। যদিও মহামারির শুরুর দিকে এটা নিঃসন্দেহ ছিলো যে, নিরাপদ যৌনমিলনের মাধ্যমে মহামারি রোধ করা সম্ভব। কিন্তু এ তথ্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রশাসন রাজনৈতিক কারণে সাধারণের মাঝে যথাযথভাবে প্রচার করেনি। ডেভিড যখন এ ছবিটি নির্মাণ করেন (reproduction-reconstruction) তখন তিনি নিজেও এইডসে আক্রন্ত। তাঁর চোখের সামনে অনেক বন্ধু-বান্ধব এবং সঙ্গীজন এইডসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। ১৯৯২ সালে এইডস তাঁর জীবনও কেড়ে নেয়।
লক্ষ্য করা গেছে, এধরণের মহামারীকালে মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, আচার-আচরণ সবসময় এবং সব কালে একই রকম। যেমন মানুষের আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যাওয়া, মহামারীর এলাকা থেকে ভেগে যাওয়া, আক্রান্তদের একঘরে করে ফেলা, অথবা তাদের শরীরে কিংবা বসত-ভিটেয় চিহ্ন দিয়ে রাখা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সামাজিক অস্থিরতা, ঘুষ, দুর্নীতি, দাঙ্গা, এবং ভাঙচুর এসময়ের স্বাভাবিক প্রবণতা। সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘আতঙ্ক’- এটা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাচীন গ্রিসে, প্লেগ মহামারীর সময় এথেন্সবাসীর মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বয়ান দিয়েছেন গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইস। তিনি তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ পেলোপোনেসিয়ান ওয়ার’ গ্রন্থে লিখেছেন, দুর্যোগ এতটাই ভয়াবহ ছিলো যে মরণাতঙ্কে মানুষ আইন এবং ধর্মের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। উ™£ান্ত এথেন্সবাসী আইন আর ধর্মকে কোন তোয়াক্কা করতো না, তাঁর ভাবতো মৃত্যুর পরোয়ানা তো ইতোমধ্যে জারি-ই হয়ে গেছে, এখন আর আইন কানুনে লাভ কি। উপরন্ত, তারা তাদের সঞ্চিত অর্থ-কড়ি দেদারছে ওড়াতে থাকে, কেননা তাদের ধারণা ছিল বেশি দিন তো আর বাকি নেই, যা পারো ভোগ করো। মানুষের ভেতর থেকে শ্রদ্বা, আদব-লেহাজ উঠে যায়, কেননা তারা ভাবতো ভদ্রতার শুনাম অর্জন করেই বা কি লাভ? মানুষের ধন্য ধন্য শোনার সময়ও তো পাবো না। মধ্যযুগে ইউরোপে প্লেগ মহামারীর সময়ে মানুষের দিশেহারা অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন ইতালির সাহিত্যিক জোভানি বোক্কাচো:
মৃত্যুর করাল থাবা থেকে নিস্তার পাবার জন্য ভাই-ভাইকে, চাচা-ভাতিজাকে, বোন-ভাইকে ছেড়ে চলে গেছে। এবং অনেক অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী -স্বামীকে ছেড়ে চলে গেছে, তাঁর চেয়েও মর্মান্তিক হলো- পিতা মাতা’র নিজ সন্তানদের

সেবা-শশ্রুষা করতে অস্বীকার করা, যেন তারা তাদের সন্তানই নয় ( ‘দি ডিক্যামেরোন’: ভূমিকা, পৃষ্ঠা ৯)। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে এ গজব থেকে রেহাই পেতে কিছু মানুষ আবার আক্রান্ত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে দূরে কোথাও আশ্রয় নিতো এবং পরিমিত সুখাদ্য গ্রহণ করতো, সূরা-সংগীতে বুদ হয়ে থাকতো, এবং দেখা-সাক্ষাৎ এড়িয়ে যেত। কেউ কেউ আবার এই গুরুতর ব্যাপারটি মোটেও পাত্তা না দিয়ে হেসে-খেলে বেড়াতো, শুঁড়িখানায় গিয়ে মদ গিলে হুল্লোড় করত এবং গুলবাজি করে সময় কাটাতো । আবার অনেকে চলে যেত পরহেজগার লাইনে; পীর-ফকিরের মুরিদ হয়ে জেকের-আশকার করে আসন্ন বিপদকে হালকা করে দেখতো।
তবে মানুষের মাঝে চেপে বসা আতঙ্ক থেকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। ১৭৭১ সালের মস্কোতে কলেরা ছড়িয়ে পড়লে নগরবাসী উশৃঙ্খল এবং মারমুখী হয়ে ওঠে, চারদিকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে উশৃঙ্খল জনতা আর্চবিশপ এমব্রোজকে হত্যা করে, যিনি মহামারী রোধের জন্য মানুষদের উপাসনালয়ে যেতে বারণ করেছিলেন। ১৮৩০-৩১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো রাশিয়ায় কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটলে তখনকার ‘জার’ কলেরা রোধের জন্য যে পরিকল্পনা করেন তার প্রতিবাদে দাঙ্গা শুরু হয়। কোয়ারেন্টাইন, সশস্ত্র বেষ্টনী, এবং এলাকায় বাইরে যাতায়াতের নিষেধাজ্ঞায় জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়। মানুষের মনে সন্দেহ আর অবিশ্বাস দানা বাধে। চিকিৎসকরা নাকি পানির কুয়ায় বিষ মিশিয়ে দিয়েছে – এমন গুজবে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু হয়। উশৃঙ্খল জনতা বাড়িঘর লুঠতরাজ করে, কোয়ারান্টাইনের স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করে এবং চিকিৎসকদের হত্যা করে। আলেক্সান্দর পুশকিনের মতানুযাযী তখন ১৬ টি অঞ্চলে দাঙ্গা লেগেছিলো। ১৮১৭-২০ সালের কলেরা ইংল্যান্ডে পৌঁছায় ১৮৩১ সালে, কিন্তু প্রশাসন যথাযথ ভূমিকা নিয়ে ব্যর্থ হলে দাঙ্গা লেগে যায়। মৃত্যুর হার এতো বেশি বেড়ে যায় যে বড় বড় শহরতলিতে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হলেও প্রশাসন জনতা মুখোমুখি হয়। চিকিৎসকরা আক্রমণের স্বীকার হয়। তাদের উপর সাধারণ মানুষের সন্দেহ সৃষ্টি হয় যে হাসপাতালে মৃত্যু হলে লাশ নিয়ে ব্যবচ্ছেদ এর কাজে লাগানো হবে ।
প্রাচীনকালে মহামারীকে বিধাতার শাস্তি ধরে নেয় হতো, বাইবেলে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার যে ভয়াবহ বর্ণনা আছে তা মূলত ইসরাইলিদের সতর্ক করে দেয়ার জন্য, যেন তারা নৈতিকতার স্খলন না ঘটায়: (সূত্র: Exodus 9:14, Numbers 11:33, 1 Samuel 4:8, Psalms 89:23, Isaiah 9:13)। পাপ এবং মহামারীর এই পার¯পরিক স¤পর্ক হোমারের ‘ইলিয়ড’ এবং সোফোক্লিসের ‘ওইদিপাউস দি কিং’ নাটকেও উল্লিখিত আছে। থুসিডাইস তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ পেলোপনেসিয়ান ওয়ার’ এবং রোমান কবি লুক্রিসাস (৯৯-৫৫ খ্রি:পূর্ব) তাঁর De rerum Natura বইতে মহামারীর জন্য পূর্বের ওই বিধাতা বা অধিদৈবিকতার শাস্তিকে অস্বীকার করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং অর্থলিপ্সার উত্থানকে দায়ী করেছেন । মধ্যযুগে জোভান্নি বোক্কাচো (১৩১৩ – ১৩৭৫ খ্রি:) এবং জিওফ্রে চসার (১৩৪৩-১৪০০খ্রি) মানুষের পরিবর্তিত আচার-আচরণের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাদের মতে রোগ সংক্রমণের আতঙ্ক থেকে সৃষ্ট পাপ যেমন অর্থলিপ্সা, ধনাকাঙ্খা, এবং দুর্নীতির উত্থান মহামারি ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ এ সনাতনী ধ্যান-ধারণা থেকে সরে আসে। বিশেষত: জ্যাক লন্ডনের উপন্যাস The Scarlet Plague’ এ বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে মহামারীর উৎস ব্যাকটেরিয়াকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, যা মূলত লুই পাস্তর এবং রবার্ট কোচ এর আবিষ্কারের স্বীকৃতি। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শী জ্যাক লন্ডন প্লেগ মহামারীর জন্য পুঁজিবাদের কারণে জনসংখ্যার উল্লফনকে মুল কারণ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন ।
প্রশ্ন হলো, বিগত দিনের মহামারীগুলোর বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়েছিল কিভাবে, তখন তো কোন প্রতিষেধক ছিলনা? চিকিৎস্যা বিজ্ঞানীদের ধারণা জাস্টিনিয়ান প্লেগ থমকে গিয়েছিল মানুষের মাঝে ইমিউনিটি (প্রতিরোধ ক্ষমতা) সৃষ্টি হবার কারণে। ‘ব্ল্যাক ডেথ’ ঠেকিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছিল ‘কোয়ারেন্টাইন’ প্রচলন করে। ১৫০০ সালে ইংল্যান্ডে প্লেগ এ আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার বিধি চালু হয়। আক্রান্তদের বাড়ির সামনের একটি খুঁটিতে এক আটি খড় ঝুলিয়ে রাখতে হতো, এবং আক্রান্ত পরিবারের কেউ বাইরে গেলে তাকে একটি সাদা লগি নিয়ে বের হতে হতো। ১৬৬৫ সালের মহা প্লেগ রোধ করা সম্ভব হয়েছিল আইসোলেসন, কোয়ারেন্টাইন, এবং মৃতদের গণকবর দিয়ে। গুটি বসন্ত দূর হয়েছিল ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনারের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে। উনিশ শতকের লন্ডনে কলেরা সংক্রমণ কমিয়ে আনার পেছনে রাস্তার পাশের পানির কলগুলো বন্ধ করে দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্বান্ত ছিল এবং এর ব্যবহার স¤পূর্ণ রোধ করার জন্য চাপকলের হাতলও খুলে ফেলা হয়েছিল। এবং এখন করোনার থাবা থেকে রেহাই পাবার জন্য ‘কোয়ারেন্টাইন’ ই হচ্ছে একমাত্র উপায়, যেহেতু এখন পর্যন্ত কোন টিকা সাধারন মানুষের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মধ্যযুগে ইউরোপে এই ‘কোয়ারেন্টাইন’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও এ ধারণাটি অনেক আগের। হজরত মুহাম্মদ (স:) তাঁর সাহাবাদের একই পরামর্শ দিয়েছিলেন:
“If you hear an outbreak of plague in a land, do not enter it, and if the plague breaks out in a place while you are in it, do not leave that place” (Sahih al-Bukhari)
১৩৭৪ সালে ইউরোপে আবার যখন ‘ব্ল্যাক ডেথ’ এর প্রাদুর্ভাব ঘটে তখন ভেনিস নগর কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু স্বাস্থ্যবিধি চালু করে, যেমন: আক্রান্তদের সুস্থ মানুষ থেকে আলাদা করে রাখা এবং যে জাহাজগুলোয় আক্রান্তরা থাকতো সেগুলো পোতাশ্রয়ে ভিড়তে না দেওয়া। ১৩৭৭ সালের অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের রাগুসা প্রজাতন্ত্র (বর্তমানে ক্রোশিয়ার একেবারে দক্ষিণে) সন্দেহভাজন আক্রান্তদের ৩০ দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন রেখে পর্যবেক্ষণ করতো যা ‘ট্রেন্টিনো’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এটাকে খুব সংক্ষিপ্ত সময় মনে করে ১৪০৩ সালের পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে আগত যাত্রীদের একটি হাসপাতালে ৪০ দিনের জন্য রাখা হতো, এবং এটাকে ইতালিতে বলা হত ‘কোয়ারান্টা জিওরনি (quaranta jiorni)’, যেখান থেকে ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দটির উৎপত্তি । ৩০ থেকে ৪০ দিনে পরিবর্তনের কারণ সম্ভবত বাইবেলের সাথে স¤পর্কিত: যেমন খ্রিস্টানদের পালনীয় ‘ল্যান্ড’, অর্থাৎ যীশু খ্রীষ্ট যে দিনগুলো মরুভূমিতে উপোস করেছিলেন, তাছাড়া এর একটি ধর্মীয় এবং প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে, যেমন ঈশ্বর যখন দুনিয়াজুড়ে প্লাবন ঘটিয়েছিলেন সেটাও ছিল ৪০ দিন। সন্তান ধারণের পর ৪০ দিন আঁতুড়ঘরে থাকতে হয়। প্রাচীন গ্রিসের ‘Doctrine of Critical Days’ অনুযায়ী ধারণা করা হতো যে কোন ব্যক্তি ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার চল্লিশ দিনের মধ্যে তার উপসর্গ দেখা দেয়। ১৪ এবং ১৫ শতকে ইউরোপের বেশিরভাগ রাষ্ট্র ‘কোয়ারেন্টাইন’ প্রবর্তন করে মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পেরেছিলো।
আশ্চর্য হলেও সত্যি যে ইতিহাসের এই ভয়াবহতম বিপর্যয়গুলো নিয়ে প্রাচীন এবং মধ্যযুগের শিল্প-সাহিত্যে সৃজনশীল কাজ খুব একটা হয়নি। প্রাচীন এবং মধ্যযুগের কিছু লেখনীতে মহামারীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। ইতালীয় উপন্যাসিক আলিসান্দ্র মানজনির (১৭৮৫-১৮৭৩) ‘The Betrothed’ উপন্যাস এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। ১৬৩০ সালের দিকে মিলানে ছড়িয়ে পড়া প্লেগের অসাধারণ বর্ণনা রয়েছে এ উপন্যাসে। তবে আধুনিক যুগে, বিশেষত বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে, মহামারী থেকে সৃষ্ট মানবিক সংকট, সমাজে এর বিরূপ প্রভাব, এবং গণমানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে শিল্প-সাহিত্য অনেক সৃজনশীল এবং নিরীক্ষাধর্মী কাজ হয়েছে। অন্যদিকে আধুনিক কথা সাহিত্যে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাসে মহামারী প্রসঙ্গ এসে থাকলেও সেটা এসেছে রূপকার্থে। যেমন গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেসের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ অথবা আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’, এবং জোসে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস’ উপন্যাসে মহামারী এসেছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ উপন্যাসে প্রেমকে কলেরার সাথে তুলনা করা হয়েছে। মানুষের প্রেমের অসম্ভব শক্তি এবং ক্ষমতা, এ প্রেম কলেরার মতো সর্বগ্রাসী। মার্কেস অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে এ প্রেমের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন-কেউ যেন তাঁর উপন্যাসের কাহিনীর ফাঁদে না পড়ে। আলজেরিয়ার সাহিত্যিক আলবেয়ার কামুর ‘দি প্লেগ’ উপন্যাস উত্তর-পশ্চিম আলজেরিযার ওরান শহরে প্লেগের আক্রমণ এবং নগরবাসীর সেটা প্রতিহত করার প্রচেষ্টার আড়ালে লেখক মূলত দ্বিতীয় মহাযুদ্বের নাৎসি দখলদারিত্বের বিরুদ্বে ফরাসি প্রতিরোধকে তুলে ধরেছেন। অনুরূপ, পর্তুগালের সাহিত্যিক জোসে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস (১৯৯৫)’ ও একটি প্রতীকী উপন্যাস। আবার মহামারী কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে এমন উপন্যাস এবং চলচ্চিত্রের সংখ্যাও কম নয়। বিগত কয়েক দশকে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেমন কানাডার সাহিত্যিক এমিলি সেইন্ট জন ম্যান্ডেল এর উপন্যাস ‘স্টেসন ইলেভেন (১৯১৪)’। কল্পকাহিনী হলেও বর্তমান বাস্তবতার সাথে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। এর কাহিনীতে দেখা যায় একটি ভাইরাস ‘সোয়াইন ফুলু’ বা ‘জর্জিয়া ফ্লু’ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লে প্রায় সবাই মৃত্যুবরণ করে:
কানাডার এলগিন থিয়েটারে ‘কিং লেয়ার’ নাটক দেখার সময় জীভন লক্ষ্য করেন যিনি কিং লেয়ার এর চরিত্রটি করছিলেন-আর্থার, তাঁর এর হার্ট এটাক হয়েছে। জীভনের প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ থাকায় সে আর্থারকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। তবে তিনি ওই নাটকের একজন শিশু শিল্পী ক্রিস্টেনকে সুস্থ করে তোলেন। নাটক শেষে জীভন বরফের মাঝে হাটতে গিয়ে তার এক ডাক্তার বন্ধুর ফোন পান। ওই বন্ধু তাকে সতর্ক করে বলেন সে যেন যত তাড়াতাড়ি পারে শহর ছেড়ে চলে যায়, কেননা আশ্চর্যধরণের একটি ফ্লু খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে যা কিনা মহামারীর আকার ধারণ করবে। জীভন গাট্টি-বস্তা গোল করে তার ভাইয়ের ওখানে চলে যায়, এবং এর কিছুদিনের ভেতরে জর্জিয়া ফ্লু পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লে প্রায় সবাই মৃত্যুবরণ করে। কয়েক বছর পরে বেঁচে যাওয়া কিছু মানুষ বিরাণ-ভূমিতে ঘুরে বেড়ায়-বিদ্যুৎ নেই, নেই কোন সরকার, নেই কোন আইন-কানুন।
তবে এদিক থেকে এগিয়ে রয়েছে সমকালীন বাস্তবতার সাথে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ Contagion শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র:
হংকং থেকে একটি ব্যবসায়িক ভ্রমন শেষে বেথ এমহফ দেশে ফেরার পথে নিউইয়র্কে যাত্রা বিরতি করে তার প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তারা ক্ষানিকটা ঘনিষ্ট সময় কাটিয়ে বেথ বাড়ি ফিরে আসেন। এর দুদিন পরে তিনি আচমকা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তার স্বামী মিচ এমহফ তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে শেষ রক্ষা হয় না, বেথ মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে মিচ বাড়ি ফিরে এসে দেখেন তার সৎ ছেলে ক্লার্কও মরে পড়ে আছে। এরপর মিচকে পরীক্ষার জন্য বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় কিন্তু তার দেহ ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম হলে তিনি তার কিশোরী মেয়েকে নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন।
ক্রমশ এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে কাহিনী এগিয়ে চলে। স্টিফেন সোডারবার্গের পরিচালনায় এ ছবিটি ২০১১ সালে নির্মিত। বর্তমান করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সাথে ছবিটির কাহিনীর সাদৃশ্য থাকার কারণে এটি এখন অসম্ভব জনপ্রিয়। কেননা এ কাহিনীতেও দেখা যায় একটি ভাইরাস শ্বাস-প্রশ্বাস, কথোপকথন, সর্দি-কাশি, এবং বমির মাধ্যমে অন্যের দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে মহামারীর আকার ধারণ করে। পরিশেষে একটি টীকা আবিষ্কারের মাধ্যমে মহামারী ঠেকিয়ে দেয়া হয়। ছবিটি ৬৮তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হলে সমালোচক, বুদ্বিজীবি এবং বিজ্ঞানীরা কাহিনীর বুনন এবং অভিনয়ের প্রশংসা করেন। বিশেষত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা কাহিনীর যথার্থতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশংসা করেন। ছবিতে ফ্ল্যাশব্যাকে ভাইরাসের উৎস চিহ্নিত করা হয়:
চায়নার একটি রেইনফরেস্টে কলাগাছের জঙ্গল উজাড় করার সময় সেখানে থাকা কিছু বাদুড় এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। একটি বাদুড় গিয়ে আশ্রয় নেয় শূকরের খামারে, এবং এ বাদুড়টির মুখ থেকে এক টুকরো কলা নিচে পড়ে গেলে একটা শূকর সেটা খেয়ে ফেলে। তারপর সেই শূকরটি খাবারের উদ্দেশ্যে জবাই করা হয় এবং ম্যাকাওয়ের একটি ক্যাসিনোতে এক শেফের তত্ত্বাবধানে রান্না করা হয়। এই শেফ বেথের সাথে হ্যান্ডশেক করেছিলেন, এবং তার মাধ্যমে ভাইরাসটি বেথ হয়ে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।
ধরে নেয়া হয় বর্তমান করোনা ভাইরাস ঠিক এভাবেই চায়নার উহান প্রদেশ থেকে কোনো মানুষের মাধ্যমে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে, এবং ভক্ষণযোগ্য কোন প্রাণী কিংবা বাদূর এ ভাইরাসের উৎস।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের এই যুগে এ মহামারীর কি কোনো পূর্বাভাস ছিলোনা? এটা কি কোনোভাবে ধারণা করা যায়নি? এমনকি চীনে ছড়িয়ে পড়ার পরেও কি এর ভয়াবহতা স¤পর্কে উপলব্দি করা যায় নি? নাকি বাস্তবতাকে আড়াল করা হয়েছে? আসলে প্রকৃত অবস্থা গোপন করার প্রশাসনিক চক্রান্ত প্রায় সব মহামারীর সময়েই ঘটেছে এবং এ কারণে জনরোষ থেকে সামাজিক বিশৃঙ্খলাও ঘটেছে। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা ব্যতিক্রম, কেননা এ বিপর্যয়ের আগাম বার্তা তো অনেকেই দিয়েছিলেন। বুদ্বিবৃত্তিক পর্যায়ে এর পূর্বাভাস বা ইঙ্গিত অনেক আগে থেকেই দেয়া হয়েছিল। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত Dean Koontz এর উপন্যাস ‘The Eyes of Darkness’ এর কাহিনীতে চায়নার এক মিলিটারি গবেষণাগারে একটি ভাইরাস তৈরী হয়, নাম ‘Wuhan 40’, যা শুধুমাত্র মানুষকেই আক্রান্ত করতে পারে এবং মৃত্যুর হার ১০০%। যদিও করোনা ভাইরাস কোনো গবেষণাগারে সৃষ্টি হয়নি কিন্তু লেখকের এ ধারণাটা কি কাকতালীয়? করোনার উৎপত্তিও তো উহান থেকে। রিচার্ড প্রেস্টনের উপন্যাস ‘The Hot Zone’ (১৯৯৪ সালে প্রকাশিত) এর ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘Outbreak’ ১৯৯৫ সালের ১০ তারিখে যখন মুক্তি পায় তখন জায়ারে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘটে শুরু হয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো ছবির কাহিনীতে ও দেখানো হয়েছিল ইবোলার অনুরূপ একটি ভাইরাস ‘Motaba’ জায়ারে (Zaire) এবং পরবর্তীতে আমেরিকার একটি ছোট শহরে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। সিলভিয়া ব্রাউনির কল্পকাহিনী ‘End of Days’ এ উল্লেখ আছে যে ২০২০ সাল নাগাদ নিমোনিয়া জাতীয় একটি অসুস্থতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এবং ফুসফুস এবং শ্বাসনালিকে আক্রান্ত করবে, এবং প্রচলিত কোনো চিকিৎসাই কাজে আসবে না।
অধ্যাপক ভৎসলফ স্মিল (Vaclav Smil) তাঁর Global Catastrophes and Trends (2008) বইতে মহামারীর ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। বিল গেটস ২০১৫ সালের (২০১৫/ Ted Talk) আলোচনায় তারই পুনুরাবৃত্তি করেছিলেন: “The world needs to prepare for pandemics in the same serious way it prepares for war.” সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ মাইকেল অস্টারহোম এর ২০০৫ সালে Foreign Affairs পত্রিকায় মন্তব্য ছিল “Time is running out to prepare for the next pandemic. We must act now with decisiveness and purpose” তিনি ২০১৭ সালে প্রকাশিত আরেকটি গ্রন্থ ”Deadliest Enemy: Our War Against Killer Germs’ এ দাবি করেছিলেন যে মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্র মহামারী মোকাবেলার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়নি। আমরা কি এসব বিশেষজ্ঞের আশংকা আমলে নিতে পারতাম না? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে মোটেও আমলে নেয়নি সেটা এখন প্রমাণিত। কারণ এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা ১,৮৬,৭১৮ (জুলাই ৪, ২০২০)। জ্ঞান-বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করা এই দেশের মানুষের এ পরিণতি কি আশা করা যায়?
অতএব এ বিপর্যয় থেকে আমাদের কি উপলব্দি? এটা প্রমাণিত যে মানুষ এখনো প্রকৃতির কাছে অসহায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান যতদূর এগিয়েছে তা যে যথেষ্ট নয় এটা তারই প্রমান। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা যে মানুষগুলোর নীল আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়, তাদের কাছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি এখন পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের স্বাস্থব্যবস্থা যে কতটা নাজুক অবস্থায় আছে তাও দেখিয়ে দিয়েছে এ মহামারী। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর কথা না হয় বাদ দেয়া গেল, উন্নত বিশ্বের স্বাস্থব্যবস্থার লেজে-গোবরে দশা প্রমান করেছে এ নিয়ে সুপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। পুঁজিবাদের কালো থাবায় সৃষ্ট শ্রেণী বৈষম্য, নি¤œ আয়ের মানুষদের নূন্যতম স্বাস্থ্য সুবিধা এবং মৃত্যুর হার প্রমান করেছে এ বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা মানুষের মঙ্গল বয়ে আনবে না, নয়া সমাজব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী। অন্যদিকে এ সংকট ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত ঐসব শ্রদ্বাভাজন মানুষের সহযোগিতা, সহমর্মিতা, আর আত্মত্যাগ আবারো প্রমান করলো ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ তবে নিশিদিন ভরসা রাখি এ আশায় যে কোনো একটা টেকসই প্রতিষেধক আসবে, তখন নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াবে, বাগিচায় ফুটবে শতফুল, আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা।
ভালো লাগলো।