জার্নাল, সঙ্গীত

সংযোজন

(আমার) রবিভাব… ভাব ও অভাব

manosh | 6 Jun , 2010  

পূর্বকথা এবং পূর্বরাগ

“তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী…”

স্কুলে থাকাকালীন, নেহায়েৎ নিজেরই লব্ধানুশীলনে, নানান রকমের বইপত্র ইঁদুরের মতো কামড়ে কামড়ে দেখি যখন, তখন সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনীকিতাব থেকে জানতে পারি যে তিনি কৈশোরে প্রায় শ’ পাঁচেক tagore_mc.jpgরবীন্দ্রসঙ্গীত মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। আমৃত্যু সেই দক্ষতাটা তিনি ধরে রেখেছিলেন। এই ঘটনা জেনে আমার দুটো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আমারই সমবয়সী দূরবর্তী একটা ছেলের অর্জিত দক্ষতা ও রবীন্দ্রপ্রেমে আমি ঈর্ষান্বিত বোধ করি। এবং দ্বিতীয়ত, একটা জিদ দেখা দিয়েছিল ঠিক একই ভাবে রবীন্দ্রপ্রেমের প্রমাণ দিতে। কিন্তু ঘন তদন্তে আবিষ্কার করা সম্ভব, অন্ততঃ এতটা কাল পর যখন অনেক খতিয়ে বিষয়টাকে দেখা যায় বলে আমার মনে হচ্ছে, ওই জিদটা আসলে এক প্রগাঢ় অহংকার এবং অহংকারটা সাংস্কৃতিক উচ্চম্মন্যতার। রবীন্দ্রনাথ সেখানে নিমিত্ত বটে, কারণও বটে। গন্তব্য যেমন, বাহনও তেমনি। এই ঘোরতর পরিস্থিতি বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসেই প্রোথিত। কিন্তু আমি সংকল্প করেছি আমি আমার কাহিনীই আজ বলব।


গান করছেন মানস চৌধুরী

পরিস্থিতিটা আরও জটিল হয়ে গেছিল স্থানীয় এক গায়কের কারণে। তাঁর সঙ্গীতসুধা এবং উপস্থিতি আমার জন্য এক অনির্বচনীয় ফলাফল বয়ে আনত। তাঁকে গাইতে শুনলে আমার কণ্ঠনালী ফেঁপে ফেঁপে উঠত, গলা নিশপিশ করত। কোনো মঞ্চে তাঁকে উঠতে দেখলে আমার হাত-পা কেঁপে কেঁপে উঠত। তাঁর দৃষ্টিসুধা কোনোভাবে আমার উপর নিপতিত হলে, এমনকি ডাক্তার না-দেখিয়েই আমি টের পেতাম আমার নাড়ির গতি বেড়ে যেত, আসে যায় না তা সেই দৃষ্টিপাত ইচ্ছাকৃত নাকি অকস্মাৎ ইচ্ছা-নিরপেক্ষ নিপতন। তিনি কোনো কারণে গাণের কোনো চরণ আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে গাইলে আমার ইচ্ছা করত তাঁর চরণ বুকে করে রাখি, শিব যেমনটা রেখেছিলেন। যেহেতু তিনি নারী ছিলেন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন, খুব জটিলভাবে আমি নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ গাইয়ে হিসেবে স্বপ্নরচনা করতে থাকি—অন্তত ততখানি যতখানি হলে আমাদের বিচরণ-এলাকায় দুজন একই পঙ্‌ক্তিতে উচ্চারিত ও বিবেচিত হই। বড় জটিল সেই কামনা। আমি তাঁকে নারী বলছি বটে, কিন্তু স্থানীয় মুরুব্বিদের বিবেচনায় তিনি বড়জোর কিশোরী ছিলেন।আমিও কিশোর ভিন্ন কিছু ছিলাম না। আমার বাংলা-সাহিত্যে-এম.এ.-পাশ-করা বাবাও আমাকে কিশোর ভিন্ন কিছু ভাবতে পারেন নাই। আরও পরিতাপের হলো, এই সুধাকণ্ঠী অশ্রুতপূর্বা কিংবা অপূর্বশ্রুতা রবীন্দ্র-গাইয়ে নারীর প্রতিও কিছুমাত্র শ্রদ্ধাশীল থাকতে আমার বাবা ব্যর্থ হলেন। এবং তাঁকেও এক কিশোরী মাত্র সাব্যস্ত করলেন। ফলতঃ, বাবার পুত্র, মানে আমি, যে এই নারীর প্রতি কাতর হয়ে দিনাতিপাত করছিলাম সেই বিষয়টাকে বাবা বড়জোর বকাঝকা করার একটা কারণ হিসেবে আবিষ্কার করলেন। আমার এই তীব্র অনুভূতি বাবার বকাবকিতে কমল না একটুও। কেবল আমি অনুরাগের আরও বড় প্রমাণ দিতে বদ্ধপরিকর হলাম। শ’ পাঁচেক রবীন্দ্রসঙ্গীতই মুখস্ত করতে হবে।

সেই সংকল্প রবীন্দ্রপ্রেমের দলিল নাকি রবীন্দ্রগাইয়ে সেই নারীর প্রতি প্রেমের দলিল এত বছর বাদে আর নিশ্চিত হওয়া খুব মুস্কিল। কিন্তু মনে মনে আমি দৃশ্যকল্প আঁকতে থাকি যেন ওই নারীর পাশে বসে বসে, পাঞ্জাবি ও পাজামা পরিহিত অবস্থায়, হৃদয় নিংড়ে নিংড়ে, ছোট্ট শহরের সাংস্কৃতিক মঞ্চগুলোতে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে বেড়াচ্ছি। দৃশ্যটা বাস্তবে রচনা না-করা পর্যন্ত আমি থামিনি। গানের শিক্ষাগুরুর কাছ থেকে ভেগে গেছিলাম বছর খানেকের মধ্যেই। তিনি জানতেও পারলেন না কী অমিত অনুপ্রেরণায় আমি গাইয়ে হয়ে পড়লাম কয়েক বছর পর; এবং একটুও প্রশিক্ষণ ছাড়াই।

গ্রামোফোনের অভাব, রবিভাব এবং এর প্রাদুর্ভাব

“…যে হাওয়াতে ডুবলো তরী সেই হাওয়াতেই তরী বাওয়া…”

আমার বাবা যে দাবি করেন ৩/৪টার বেশি বই তাঁর এক সময়ে ছিল সেই দাবিটাকে আমার সিরিয়াসলি নিতে হয়েছে, অন্ততঃ এই কারণেও যে, স্বাধীনতার যুদ্ধটা আসলেই আমার স্মৃতিসীমানার মধ্যে পড়ে না এবং বহু লোকেরই বইপুস্তক যুদ্ধে খোয়া গেছে। একজন সৎ-বলে-পরিচিত স্কুল শিক্ষক, ফলে, এ বিষয়ে বানিয়ে বানিয়ে বলছেন না সেটা ভাবাই সঙ্গত ছিল। আরেকটা দিকও ছিল যেটাকে আরও গুরুতর প্রমাণ হিসেবে ভাবা সম্ভব। কখনোই তাঁকে বলতে শুনিনি যে রবীন্দ্র রচনাবলী তাঁর সংগ্রহে ছিল (কিংবা আর কারও রচনাবলী)। বাংলা মুল্লুকে একজন লোক বইয়ের সংগ্রহের ইতিহাস বলছেন, মামুলি যদিও, কিন্তু সেই অনুশীলনে রবীন্দ্র রচনাবলীর উল্লেখ নেই এরকম একটা পরিস্থিতি অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। কিন্তু অনেক বছর সময় নিয়ে আমি বুঝেছিলাম এটা নেহায়েৎ তাঁর বানিয়ে-বানিয়ে বলতে পারার ব্যর্থতা মাত্র। নইলে তিনিও আর পাঁচজন শিক্ষিত লোকের মতো তদ্দিনে বুঝে গেছিলেন বাসায় রবীন্দ্র রচনাবলী থাকাটা সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ঘোষণার জন্য অত্যাবশ্যক, এবং মওকা মতো ‘৭১-এর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারাটা ভাল ছিল। কিন্তু বাস্তবে একবস্তা রবিঠাকুরের বই কিংবা আর কোনো রচনাসম্ভার তাঁর কখনোই কেনা হয়ে ওঠেনি। হয়তো সেই অক্রীতদার বাস্তবতার কারণেই তাঁর সাংস্কৃতিক বাসনার এই জায়গাটা তিনি কল্পদাবি করে চরিতার্থ করেননি। এও আমার বুঝতে বিশেষ সময় লাগেনি এরপর যে তাঁর সাংস্কৃতিক সত্তার কেন্দ্রীয় জায়গায় রয়েছে রবীন্দ্র রচনাবলীর অস্তিত্ব (এই বিশেষ ক্ষেত্রে আসলে অনুপস্থিতির) এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত। তিনি রেডিওর নব ঘুরিয়ে নিয়মিত আকাশবাণী শোনেন, এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতের সবগুলো অনুষ্ঠান শোনেন। ঢাকা বেতারের প্রতি তাঁর বিশেষ বিরাগ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের ছিল, এবং যে গুটিকয় অনুষ্ঠান তিনি ঢাকা ও খুলনা বেতারের সহ্য করতে পারতেন তা রবীন্দ্র সঙ্গীতেরই ছিল। কীভাবে যেন আমার ধারণা হয়েছিল যে ঢাকা বা খুলনা বেতারের অনুষ্ঠান সহ্য করতে না-পারার কারণগুলোর মধ্যে যত না বাংলাদেশী সিনেমার গান ছিল তার থেকে ঢের বেশি ছিল জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনগুলো তখনো আমার জন্য প্রাসঙ্গিক নয় এবং অর্থবোধকও বিশেষ ছিল না; তথাপি এর আওতামুক্ত আমাকে রাখতে বাবাকে বিশেষ সচেষ্ট দেখা গেছে। বিস্ময়ের না যে রবীন্দ্র সঙ্গীতের অনুষ্ঠান যে ব্যাকুলতা সমেত তিনি অনুসন্ধান করতেন ঢাকা, খুলনা বা রাজশাহী বেতারে, ঠিক ততটা ব্যগ্রতা নিয়ে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ জিঙ্গল শুরু হওয়া মাত্র তিনি নব ঘুরিয়ে ফেলতেন। তুলনায় কলকাতা আকাশবাণী জন্ম-শাসনমুক্ত ছিল। তবে রবীন্দ্রনাথ আর জন্মশাসনের কোনো অবধারিত সম্পর্ক আবিষ্কার তিনি করে ফেলেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। যদিও বাবার দুয়েক বন্ধুকে আমি জন্মশাসনের কুফল সম্বন্ধে যুক্তি দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ দিতে শুনেছি। একথাও হলপ করে বলা যায় যে এরকম যুক্তিতর্কে বাবাকে কখনোই আমি উৎসাহী দেখিনি, হয়তো তাঁর সন্তানসংখ্যা দুই বলে কিংবা হয়তো খোদ রবীন্দ্রভক্তির কারণে, নাকি কী কারণে তা আসলে আমি জানি না। যাহোক, ফলে, অচিরেই, বিধিবদ্ধভাবে, আমি বুঝে গেছিলাম কাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতিচর্চা আসলে কী হতে হবে। অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, বাবার বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লব্ধ, আর তা ৬০ দশকের মধ্যভাগে। রাজশাহীকে তখন সাংস্কৃতিক শিরোমণি হিসেবেই দেখতেন মধ্যবিত্তকুল।

ছোট শহরের বাসিন্দা হওয়াতে রবীন্দ্রঘনিষ্ঠতার কিছু লক্ষণার এই অনুপস্থিতি বিশেষ সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করেনি। বরং ‘রুচি’নিষ্ঠ জীবন নিয়ে সংশয় করবার মতো তেমন কোনো পরিস্থিতিতে তাঁর পড়তে হয়নি। প্রথমবারের মতো একটা পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার যখন কেনা হলো বিক্রেতা আচ্ছামতো ঠকিয়ে দিলেন। ঠকানিটা টের পেতে এতটুকু সময় লাগেনি যাতে ক্যাসেট-প্লেয়ার জনিত উত্তেজনা কিছুকালের জন্যও স্বতন্ত্র থাকতে পেরে থাকত। প্রায় যুগপৎ ঘটেছে। বহুকাল ধরে পুষে রাখা একটা স্বপ্ন, কল্প-প্রবাহ-বাসনার এরকম পরিণতিতে বাসা জুড়ে শোকে মুহ্যমান একটা আবহ। কিন্তু পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ অলখে থেকে একটা সান্ত্বনা বাৎলে দিলেন। ক্যাসেট প্লেয়ার যতই না কেন খারাপ হোক, আর যত অন্যায্য দামেই তা কিনে থাকি না কেন, রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনবার কসরতের অধিকন্তু একটা চাহিবা-মাত্র এবং রুচিমাফিক যন্ত্র হিসেবে রবীন্দ্র-সরবরাহের এলেম যে এটার আছে সেটাই, পরস্পরের জন্য সান্ত্বনা হিসেবে, মা ও বাবা বলতে থাকলেন। এবং, আমার মনে পড়ে যে আমিও দ্রবীভূত হয়ে পড়লাম। যে গ্রামোফোন বনেদীপনা ও রবীন্দ্রচর্চার মূর্তিমান স্বাক্ষর হয়ে কোনোকালেই আমাদের মধ্যে ছিল না, কোনোকালেই আমরা যার নাগাল পাবার দশাতে ছিলাম না, ঐতিহাসিকভাবে; অথচ যে গ্রামোফোনের অলঙ্ঘনীয় গুরুত্ব কীভাবে যেন বইটই পড়ে রেডিও-মেডিও শুনে এবং আরও দুরূহ অব্যাখ্যেয় উপায়ে আমরা জেনে গেছিলাম সেই অসম্ভব কল্প-গ্রামোফোনটির সাক্ষাৎ প্রতিনিধি হিসেবে এই নবলব্ধ এবং জরাক্ষুব্ধ যন্ত্রটি দিব্যি পুনরাভিষিক্ত হয়ে পড়ল। রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং ক্যাসেট দুটোই খুব সুলভ ছিল না। তারপরও সাগর সেন এলেন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এলেন, একে একে দেবব্রত বিশ্বাস, সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, পাপিয়া সরোয়ার, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, পূর্বা দাম, মায়া সেন…। সাগর সেন আসতেই থাকলেন যত পারা যায়। আমার মা তাঁর ভক্ত। এলেন আশা ভোঁসলে এবং কিশোর কুমার। শেষোক্ত দুজনের রবীন্দ্রভক্তি শান্তিনিকেতন বা তদ্রূপ প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিচার করে তা স্বতন্ত্র জিজ্ঞাসা, কিন্তু শ্রোতামাত্রই সহজে তা বুঝতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ মুম্বই-শিডিউল পরিত্যাগ করে যে শিল্পীরা রীতিমত গায়ে-গতরে খেটে রবীন্দ্রসঙ্গীত গান, তাঁদের রবীন্দ্রভক্তি নিয়ে আমি নিঃসংশয় হয়েছিলাম খুব দ্রুত এবং আমি সাদরে এই প্রচেষ্টার অনুগ্রাহী বনে গিয়েছিলাম।

প্রেমপ্রবাহ ও পুরুষোত্তম: একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইয়ের আবির্ভাব

“তোমার আমার মিলন হবে বলে আলোয় আকাশ ভরা…”

ক্যাসেট প্লেয়ারটা, জরাক্লিষ্ট তবু, আমার রবীন্দ্রপ্রেমে বিশেষ অবদান রাখতে না পারলেও আমার সেই নারীর (বা মতান্তরে কিশোরী) জন্য প্রেমপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। হিসেবটা খুবই সহজ যদি গোড়ার আলাপ কেউ বিস্মৃত না হন। আমার প্রকল্প ছিল পাঁচশ রবীন্দ্রসঙ্গীত মুখস্ত করে ফেলা, এবং দু-চার লাইন হলেও বেশ একটু গাইতে পারা। আর অতি অবশ্যই কিছু গান সেইমতো শিখে ফেলা যাতে একই আসরে কাছাকাছি, পাশাপাশি বসে আমি তাঁর সঙ্গে গাইতে পারি। মনে মনে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার আর তর সইছিল না। ক্যাসেটের গানগুলো ঘুরে-ফিরে কয়েকটাই তো। তাতে তো আর পাঁচশ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরাহা হয় না। ফলে প্রাথমিকভাবে নিউজপ্রিন্টের একটা গীতবিতান খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। সেটা যোগাড় হলো। এই দুরূহ প্রকল্পে রেডিওকে বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। মনপ্রাণ দিয়ে আমি গান শুনেই চলি। কিন্তু গলায় একটা গান তুলতে চাইলে ক্যাসেট হচ্ছে মোক্ষম যন্ত্র। অচিরেই আমি যন্ত্রটিকে আমার শিক্ষকের মর্যাদা দিয়ে পুনঃপুনরাভিষিক্ত করি।

আমার প্রধান সঙ্কট দেখা দেয় আমি সাগর সেন হতে চাই নাকি চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় হতে চাই। লোকে বুঝুক না-বুঝুক আমি তখন একদিন সাগর সেন আরেকদিন চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় হয়ে অনানুষ্ঠানিক সাঙ্গীতিক জীবন চালিয়ে যাই, এবং সেটা একটা দ্বিধাগ্রস্ত মনের কারণেই। পরিস্থিতি আরও ঘণীভূত হলো যখন আমার মা আমার গলায় সাগর সেনের ছিঁটেফোঁটা খুঁজে পেলেন। একে তো মায়ের তাঁকে পছন্দ, অন্যদিকে পুত্রবাৎসল্যের কারণে তাঁর সম্ভাব্য কোনো পক্ষপাত আমার দেখতে না-পাওয়া আমাকে অনিবার্য এক সাগর সেনীয় দিকে ঠেলে দেয়। ফলে সাগর-চিন্ময় গতায়াতের যে অমিত সম্ভাবনা সমেত আমি সঙ্গীতজীবন অতিবাহন করছিলাম সেটা আর বজায় রাখা সম্ভব হয় না। আর এটা আমার প্রধান লক্ষ্যও ছিল না। আমি বরং সেই মৃন্ময়ী নারীর কণ্ঠের সঙ্গে সাগর ভাল মানাবেন নাকি চিন্ময় সেই ফয়সালা নিয়ে পেরেশান হয়ে থাকি। তাঁর পাশাপাশি বসিয়ে দেখি সাগর সেনকে, কিংবা চিন্ময়কে। কাউকেই পছন্দ করে উঠতে পারি না। কয়েক মুহূর্ত পরে সেখানে আমি ছাড়া আর কেউই ঠিক আরাম করে বসে থাকতে পারেন না। ফলে নব নব উদ্যমে আমি আমার সঙ্গীত প্রতিভার সম্ভাব্য বিকাশের জন্য উন্মুখ থাকি। ঘুম কিংবা কলেজে নেহায়েৎ ক্লাস কিংবা অপরাপর প্রাত্যহিক ক্রিয়াদি ব্যতীত হেন সময় নেই যখন আমি গান গেয়ে চলি না। কখনো সাগর, কখনো চিন্ময়। অস্বীকার করা ঠিক হবে না যে দুয়েকদিন কিশোরকুমারও আমার এই প্রকল্পের ভিতর ঢুকে পড়েছিলেন এবং এখন ব্যাখ্যা করতে না-পারলেও তাতে আমি বিশেষ গৌরব বোধ করতে পারি নাই। ইতোমধ্যে আমার ছোটবোনের গানের শিক্ষকের নজরে (আসলে শ্রুতিতে) আমি দ্বিতীয় বারের মতো পড়তে সমর্থ হই।

একটা পুরাতন হারমোনিয়াম গ্রামের কোনো সৌখিন বড়লোকের কাছ থেকে বাবা কিনে এনেছিলেন ক্যাসেট প্লেয়ার কেনার অন্তত চার বছর আগে। এবং একজন শিক্ষক আমাদের দুই ভাইবোনের জন্যই ঠিক করা হয়েছিল। সকালবেলা হারমোনিয়াম খুলে প্যাঁ পোঁ করে সা-রে-গা-মা করতাম দুইজনেই। কিছুকাল এভাবে চলল। আমার বোনের উৎসাহ উত্তরোত্তর বাড়ে, আর ততই আমারটা কমে। টনসিল ইত্যাদি যেসব অজুহাত দেয়া যায় সেগুলোও সুবিধা দিচ্ছিল। ফলে বছরখানেক ঐ আসুরিক কসরতের পর সুরের জগৎ থেকে আমার ইস্তফা দেবার বড় কোনো বাধা থাকেনি, মায়ের কিছু বিষণ্নতা ছাড়া। বলাই বাহুল্য, জলজ্যান্ত সেই রবীন্দ্রগাইয়ে নারীকে তখনো আমি আবিষ্কার করিনি। এদফা, বোনের শিক্ষক এবং আমার ভূতপূর্ব শিক্ষক আমার গলায় কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেললে, আমার সদ্যলব্ধ প্রেমপ্রবাহে, আমি বসে পড়লাম তাঁর সঙ্গে। কিন্তু কসরৎ!? আমার বাসনাটা খুব সোজা। একদিন সকালে উঠে দেখব আমি গাইয়ে হয়ে গেছি। এরকম সোজাসাপ্টা জাদুকরী উপায়ে সকল কিছু হতে আমার আগ্রহ। এখনো তাই আছে: সকালে উঠে দেখব আমি নায়ক হয়ে গেছি, আমি একদম ফুরফুর করে প্রিং প্রিং গীটার বাজাতে পারি, পালকের মতো দুলতে দুলতে সালসা নাচতে পারি, লেখার প্রথম পৃষ্ঠায় টাইপ করার পরের মুহূর্তেই শেষ পৃষ্ঠার শেষ লাইনটা লিখতে পারছি। কিংবা প্রকাশকের সঙ্গে পত্রিকার সঙ্গে দেখা না করেই ছাপানো অবস্থায় নিজেকে লেখক দেখতে পারি, এমনকি খ্যাতিমান হয়ে যেতে পারি। মাঝখানের হ্যাপা আমার ভাল লাগে না। ভূতপূর্ব সঙ্গীত শিক্ষক সেগুলো হয়তো জানতেন। তিনি বললেন মাত্র এক ঘণ্টার জন্য যেন তাঁর সঙ্গে আমি বসি। আমার মনে নেই আমাকে কী কী তালিম তিনি দিয়েছিলেন। তবে মনে আছে আমার খালি গলায় গাওয়া কয়েকটা গান শুনে আমাকে তারিফ করেছেন। সকাল, সন্ধ্যা, রোদ বৃষ্টি, করিডোর বারান্দা, স্কুলমাঠ বাজার—সর্বত্র আমার সঙ্গীতসাধনার দিনগুলো তখন যেন পুরস্কার পেল। এই বৈঠকের আগে আমি তেমন ভাবিনি যে এটার অপেক্ষাতেই আমি ছিলাম। ভূতপূর্ব শিক্ষকের সঙ্গে এই এক বৈঠকের পর আমার প্রণয়ারাধ্যা সেই নারীর সঙ্গে যুগল কণ্ঠে গান গাইবার জন্য আমার আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। স্থানীয় শিল্পকলার রঙ্গমঞ্চে আমরা গাইলাম:
‘ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনের মন্দির’

মফস্বলে এরকম হয়। যেকোনো গান দ্বৈত, অদ্বৈত, বৃন্দ বানিয়ে গাওয়া যায়, সকলই প্রায় গণসঙ্গীত।

অপ্রেম আর অর্থহীনতা: একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইয়ের তিরোভাব

“আমারে ডাক দিল কে ভিতর পানে…”

১৯৮৭ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি, তখন আমি একজন স্বনামধন্য গাইয়ে। রবীন্দ্রগায়ক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দেবার কোনো সুযোগও, ফলে, আমি ছাড়তে চাইলাম না। বিভাগীয় অনুষ্ঠানে, গাছের ছায়াতলে, নবীন বরণে, ভাত খাবার দোকানে—অনুরোধ উপস্থিত হবার পর হাতছাড়া হবার ন্যূনতম সম্ভাবনাও আমি ঘটতে দিতাম না। কোনো বিশেষ শিক্ষালাভ ছাড়াই যে আমি গান গাই, সেটা বরং নেতিবাচক হবার বদলে, আমার খ্যাতির ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখা দিল। আমি গেয়েই চলি। অক্লান্ত, অনবরত এবং অনাড়ম্বর। বন্ধুরা পরামর্শ দেয় রেডিওতে গাইতে। আরও কদিন পর টিভিতে গাইতে। কিন্তু মুস্কিল হলো তারা রেডিও বা টিভির কর্তাব্যক্তি নয় যে আমি কারো সঙ্গে গিয়ে গেয়ে আসব। আমি নিজেও তখন গেয়ে চলবার এই দুর্নিবার অনুশীলনের একটা যুৎসই কারণ খুঁজছিলাম। এটা বোধহয় আর ভেঙে না বললেও চলে যে সেই নারী আমার মনোজগতের কোথাও আর বসবাস করেন না। তিনি অন্য কোথাও অত্যন্ত জ্যান্ত দুনিয়াতেই আছেন। আমার এই প্রেমবোধ তাঁর বা আমার কারও জীবনেই কোনো উৎপাত তৈরি করেনি। এবং তাঁকে ঐ বছরগুলোতে কোনোপ্রকার প্রেম নিবেদন ছাড়াই আমি আমাদের বিচরণস্থল ত্যাগ করতে সমর্থ হই, এবং উত্তর কালের ঘটনাপ্রবাহে বলা চলে, চিরতরে। রবীন্দ্রনাথ, আমার ভক্তির যতই কেন্দ্রে বসবাস করুন না কেন, ছিলেন নিমিত্ত আমার অঙ্কুরোদ্গমীয় প্রেমপ্রবাহে। সেই প্রেম গত হলে রবীন্দ্রনাথ নিমিত্ত থেকে মুক্ত হয়ে পড়েন, তিনি নিজেই রীজনে পরিণত হন। ফলে তাঁর সঙ্গীতের একজন গায়ক হিসেবে তাঁর জন্য নবাসন ঠিক করা আমার কর্তব্যে পরিণত হয়। এদিকে ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক চেতনাসম্পন্ন বলে যাঁদেরকে সবাই চেনেন, সেইসব বন্ধুরা খুবই নিশ্চিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া প্রেম সম্পন্ন হয় না। ‘বাংলা অঞ্চলে প্রেমের ভাষা রবীন্দ্রনাথ সরবরাহ করেছেন’; ‘রবীন্দ্রনাথের বাণী ছাড়া প্রেমের প্রকাশ অসম্ভব’—এসব কথা শুনতে শুনতে আমি খানিক বিশ্বাসও করতে শুরু করেছি। ফলে রবীন্দ্রসিক্ত সেসব প্রেমের ভাষা জগৎময় ছড়িয়ে দেবার প্রাথমিক একটা জায়গা হিসেবে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নিয়েছিলাম। আমার রবীন্দ্রভক্ত অন্যান্য বন্ধুদের যাই হোক না কেন, আমি অচিরেই অত্যন্ত ভাল ফল পেতে শুরু করলাম।

মোটের উপর নিরুপদ্রব এবং নায়কোচিত (গায়কোচিত বলাই বোধহয় সঠিক হবে) একটা ক্যাম্পাস জীবন শেষ করার পর নানান কিছুর মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে ভাবতে বসলাম। একটা সাফ প্রশ্ন আমি নিজেকে করতে পারি, কপালগুণে। রবীন্দ্রচর্চার এই সাংস্কৃতিক আভিজাত্য ঘোষণা আমার জন্য আবশ্যক কিনা? উত্তরটাও নিজের মধ্যে স্পষ্ট তৈরি ছিল। আমার জন্য আবশ্যক নয়। মুহূর্তের মধ্যে ভোজবাজির মতো, কিংবা কম্প্যুটারের হার্ডডিস্কের ডেটার মতো, সুকান্ত ভট্টাচার্য থেকে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণা কিংবা অফুরান রবীন্দ্র-নৈমিত্তিক প্রেমপ্রবাহ উধাও হয়ে গেল। এখন রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করতে বসি, ইচ্ছাসাপেক্ষভাবে, এর সাংস্কৃতিক-স্মারক বৈশিষ্ট্যের কারণে; নগর-জীবনযাপন বোধের এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে; আভিজাত্য ও স্বজাত্যবোধের এক দূরলক্ষণা কিংবা নস্ট্যালজিয়া উপলব্ধি করার স্বার্থে। রবীন্দ্রনাথ আমার পুরাই অধিগত।

পুনশ্চ

“জগতে আনন্দযজ্ঞে…”

১৬ বছর অগায়ক থাকবার পর গত কয়েক মাস আমি মনের মধ্যে দুর্নিবার এক আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করেছি। আমি আবার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব, প্রকাশ্যে। পরিচিতজনদের প্রায় নিমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেছি। কবে গাইব, কোথায় গাইব, কতগুলি গান গাইব তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। একজন দক্ষ ব্যবস্থাপকের জন্য মিত্রমহলে আহ্বান জানাতে শুরু করেছি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের কাঁধে সওয়ার হওয়ার এই ভাবনাটা আমি চিনি।

আমি আসলে রঙ্গমঞ্চের ঐ কেন্দ্রস্থলে নিজেকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। একদা স্বনির্ধারিত কৌশলে রপ্ত-করা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া আমার কাছে সুলভ কোনো উপায় নেই।

ঢাকা, ২০ বৈশাখ ১৪১৬ – ২৬ বৈশাখ ১৪১৭

manoshchowdhury@yahoo.com

free counters


8 Responses

  1. মোস্তাফিজ রিপন says:

    মুচমুচে শব্দ পাঠের মজা, বাক্যের গায়ে ঝুলে ঝুলে দোল খাওয়ার মজা–ভুলেই গেছলাম।

    অনেকদিন পরে মজা করে একটা কিছু পড়লাম। দারুণ!

    – মোস্তাফিজ রিপন

  2. DR. SIDDHARTHA SARKAR says:

    অনাবিল আনন্দে মন প্রাণ ভরে গেলো।

    ডা:সিদ্ধার্থ সরকার
    জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, ভারত

  3. মানস says:

    ১। জনাব মোস্তাফিজ রিপন, আপনার মন্তব্য কিন্তু আমার আরো মুচমুচে লাগল। আমার লেখার এই তারিফের থেকে আর বড় কিছুই প্রাপ্তি হতে পারে না।

    ২। জনাব সিদ্ধার্থ সরকার, খুশি হলাম আপনার প্রতিক্রিয়ায়। ভারত থেকে কেউ যে পড়েন অনেক ধারণা ছিল না। আর রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে গুরুগম্ভীর রচনা না-লিখবার অপরাধে সাব্যস্ত হবার প্রস্তুতি সমেত ছিলাম। সেটা ঘটেনি, গড়ে নিরবতা ধরনের একটা প্রতিক্রিয়া লেখাটি লাভ করেছে। আপনাকে ধন্যবাদ।

  4. tengra mach says:

    অপূব

    গুরুদেব পড়ে যেতে পারেননি এটাই দু:খ!!

  5. প্রদীপ সেনগুপ্ত says:

    মানস> আপনার লেখাটা খুব আনন্দদায়ক। সত্যিই রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রত্যেকের কাছে ব্যক্তিগত ভাবে উপস্থিত। রবীন্দ্রকাব্যের প্রতি বা তার গানের প্রতি অনুরাগ জন্মানোর ও সেই অনুরাগ আজীবন বহন করে নেওয়ার জন্য প্রত্যেকের কাছেই তার নিজস্ব অনুপ্রেরণা আছে। আপনি তা ব্যক্ত করে আমাদের প্রভূত আনন্দদান করেছেন।
    রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত মত হল, রবীন্দ্রনাথ গানের সুরকে ব্যবহার করেছেন তার বাণীর বাহন হিসাবে এবং প্রতিটি শব্দের পেছনে যে স্বরগুলি ব্যবহার করেছেন তা সেই বাণীর অন্তর্নিহিত ভাব এবং অর্থকে সম্পূর্ণ রূপদান করেছে। কাজেই বাণী ও তার সংলগ্ন স্বরগুলি একে অপরের থেকে অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য। এই কারণেই বলা চলে সুর ও বাণী নিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত এক সম্পূর্ণ সৃষ্টি। তাঁর গানে সুর ও ছন্দের সামান্য পরিবর্তন ঘটালেও এক অসম্পূর্ণতা জন্ম নেয়। গায়ককে তখন নানা মডুলেশন ও কৃত্রিম ভাব প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই অভাব পূরণ করার চেষ্টা করতে হয়।

  6. গৌতম চৌধুরী says:

    চমৎকার লেখা!

  7. শুসমিন says:

    শিল্পী হয়ে ওঠার জার্নি টা এমনই হয় বোধহয়। কারো পরোক্ষ অনুপ্রেরণায় এমন চমতকার গাইয়ে হয়ে ওঠা দুষ্কর। সেই প্রেম সময়ের গত হওয়ার সাথে সাথে বিলীন হয়েছে বটে কিন্তু সময় ও প্রেমবোধ আপনাকে দিয়ে গেছে সঙ্গীত সে কেউ জানুক আর না জানুক আপনি জানেন তা…

  8. Zakir Hossain Kamal says:

    কৈশোরের নির্মল ও তীব্র চাওয়া একজনের মনোজগতকে এভাবে আন্দোলিত করেছিল বলেই আমরা আপনার মতো একজন পরিপূর্ণ, বোদ্ধা শিল্পি পেয়েছি ! গল্পটা কিন্তু শীতের সকালে গরম মুড়ির মতো !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.