জার্নাল

রবীন্দ্রজন্মের দেড়শ বছর

অশেষ রবীন্দ্র প্রীতি

saymon_zakaria | 7 May , 2010  

dakghar_rabindranath.jpg
ডাকঘর নাটকে ফকিরের সাজে রবীন্দ্রনাথ, ১৯১৭

কেন যেন কী হয়, রবীন্দ্রনাথকে ভাবতে গেলে ভক্তি এসে অন্তরে জমা হয়। আর এমনই এক ভক্তি আচ্ছন্নতার মধ্যে একবার এক কবিগানের আসরে ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাত পেয়েছিলাম, তখন কবিয়াল নারায়ণ বালা ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের দোহাই দিয়ে প্রেমের সংজ্ঞা দিচ্ছিলেন। তার আগে কোনোদিন রবীন্দ্রনাথকে ঋষি ভাবিনি, তাঁকে কবি নাট্যকার গল্পকার উপন্যাসিক অভিনেতা নাট্যনির্দেশক চিত্রকর গায়ক ভাবুক দার্শনিক এমনকি ফোকলোরবিদ হিসেবেও দেখেছি, বড়ো জোর একজন বাউল হিসেবে ভেবেছি। কিন্তু তিনি যে ঋষি কবি হতে পারেন তা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি, চিন্তা করিনি, সেদিন কবিগানের আসরে বসে প্রথম জানতে পারি গ্রামের কবিয়ালরা তাঁকে ঋষি কবির মর্যাদা দিয়ে থাকেন এবং তাঁর কথা-বাণী-গান ও জীবনের দোহাই দিয়ে ভক্তি ও যুক্তির অপূর্ব ইন্দ্রজাল তৈরি করেন। সে রকমই একটি আসরে বসে ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথের গুণগান শুনতে শুনতে হঠাৎ দর্শকদের মাঝখানে তাকিয়ে দেখি বহু দর্শক-ভক্তদের মাঝখানে ধ্যানমগ্ন হয়ে কবিগানের আসর উপভোগ করছেন যেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, এটা কি আমার চোখের বিভ্রম না-কি সত্য তা যাচাই করে নেবার জন্য পাশে বসা বান্ধবকে ডেকে বলি, ‘ওই দ্যাখ কে এসেছেন? মনে হচ্ছে উনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ!’ জানি আমার এ দেখা তেমনই মিথ্যে নয় যেমন মিথ্যে নয় কুষ্টিয়া ও কুমারখালীতে আমার জন্ম বলয়ের মধ্যে এসে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন আত্ম-উদ্বোধনের চূড়ান্ত ইশারা। আচ্ছা, লালন সাঁইজির সঙ্গে কোনোদিন কি দেখা হয়েছিল তাঁর? এই প্রশ্নটার সুরাহা তিনি দিয়ে যাননি কোনোদিন, এমনকি কোনো ইশারাও রাখেননি এই প্রশ্নের উত্তরের। আমরাও তাই ভেবে মরি রবীন্দ্রনাথের রহস্যময়তা নিয়ে। তাহলে কি আমার সাথেও সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছে কোনোদিন? কী করে বলি—তা হয়নি, তা সম্ভবও নয়?

কেননা, শিউলি তলায় দাঁড়ালে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে পাই; চাঁদের আলোয় চোখ রাখতেই রবীন্দ্রনাথের সুরস্রোতে ভেসে যাই; সূর্যালোকে শরীর মেলে ধরতেই রবীন্দ্রনাথকে চেতনায় অনুভব করি; নদীতে গেলে, প্রেমে পড়লে ক্ষণে ক্ষণে তরঙ্গরাশির মোহ আর অনিবার্য প্রেম অনুভব জাগিয়ে রাখেন রবীন্দ্রনাথ; এমন কি জীবনসংকটে, অপ্রাপ্তিতে, স্বপ্ন বিধ্বস্ততায় তিনিই সাহস ও সহায় মনকণ্ঠে গেয়ে ওঠেন গান—‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে, যদি কেউ কথা না কয়, যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়, যদি ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে, তবে আপন বুকের পাজর জ্বালিয়ে তুমি একলা চলো রে’ কিংবা ‘সারাদিন আঁখি মেলে দুয়ারে রবো একা, শুভক্ষণ হঠাৎ এলে তখনই পাব দেখা।’

ashesh_rabindra.jpg……..
‘ওই দ্যাখ কে এসেছেন? মনে হচ্ছে উনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ!’
……..
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের এই বাংলাদেশের জন্য আশ্চর্য এক সঙ্গীত দান করে গেছেন বহু আগে— ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। এই গানটির সুর তিনি ধার করেছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের এক সাধুর কণ্ঠ থেকে আর আমরা সেই সুরে রবীন্দ্রনাথের বাণীসুধার অপূর্ব মিশেল প্রত্যক্ষ করে গানটিকে করেছি জাতীয়সঙ্গীত—‘আমার সোনার বাংলা’। সেই ছোটবেলা থেকে অদ্যাবধি সম্ভবত এ গানটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি গাওয়া হয়েছে। স্পষ্ট মনে করতে পারি, বুঝে হোক না বুঝে হোক জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় অভিষিক্ত এই গানটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় অবধি কোনদিন আমরা না-গেয়েছি! আমি নিজে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধিকাংশ দিন গানটি গাইবার নেতৃত্বে থাকতাম। কিন্তু আজ সমগ্র বাংলাদেশ বিহার করার পর বুঝি—ওই গানটির মর্ম না-বুঝেই গেয়ে গেছি বারবার। এখন গানটির মর্ম বুঝি বলে গানটি গাইবার সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, থরথর করে কাঁপতে থাকি—গানটির ভেতরে গ্রথিত দেশপ্রেমের সুগভীর মর্ম অনুভবে, এমনকি আমার দুই চোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। কেননা, গানের কথাই আছে—‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি।’ আজ যে আমাদের দেশমাতৃকার বদনখানি শুধু মলিন নয়, বরং মলিনের অধিক বিবর্ণ প্রায়, তাই কী করে গানটির অমন চরণ উচ্চারণ মুহূর্তে নয়ন জলে না ভেসে পারা যায়। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি রবীন্দ্রনাথের এই ‘সোনার বাংলা’ গানটি যদি যথার্থভাবে মর্ম বুঝে এদেশের প্রতি নাগরিক গাইতে জানতেন তাহলে এদেশের মানুষ সত্যিকারের দেশপ্রেমের শক্তিতে শক্তিমান হয়ে উঠতো আর তখনই আমাদের এই দেশমাতৃকার বদনখানি অনেক বেশি উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো বৈকি। উল্লেখ্য, এই গানের মর্ম অনুভব করতে শিখেছি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ থানার জাফরাবাদ-নয়াপাড়া গ্রামের রঘুনাথ সম্প্রদায়ের রামমঙ্গল গায়ক গোপালচন্দ্র মোদকের আসর বন্দনার ভেতর দিয়ে।

এ বিশ্ব সভ্যতা অতিক্রম করে এসেছে প্রধান কয়েকটি পর্যায়, যথা, কসমোসেন্ট্রিক, যখন মানুষ গ্রহ, তারা, রবি এবং বিশ্ব সৃষ্টির অনন্ত রহস্য নিয়ে ভাবতো এবং এক একটি দেব-দেবতা ও স্রষ্টার কল্পনা করতো এবং তাঁদের উপাসনা করতো; তারপর এলো জিওসেন্ট্রিক পর্যায়, এবারে মানুষ হলো প্রকৃতিবাদী, বিশ্বের সকল সৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতি তথা বৃক্ষ-বনানী, সমুদ্র-মাটি, নদী-পর্বত ইত্যাদির সঙ্গে আত্মিক একটা যোগাযোগ স্থাপন করলো; সবশেষে এলো লগোসেন্ট্রিক পর্যায়, এবারে মানুষ বস্তুবাদী যুক্তির আলোকে সব কিছুকে বিবেচনা করতে শুরু করলো। আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ কবি-শিল্পী সর্বশেষ মতাদর্শ তথা লগোসেন্ট্রিক ভুবনের বাসিন্দা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই বিশ্ব সভ্যতার তিনটি পর্যায়কে একসঙ্গে ধারণ করেছেন এবং তিনি তাঁর গানের ভেতর দিয়ে এই ত্রিধারাকে সবচেয়ে অধিক হারে প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন গানের ছলে, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ/তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান। বিস্ময়ে তাই জাগে জাগে আমার গান।/অসীম কালে যে হিল্লোলে/জোয়ার ভাটায় ভুবন দোলে/নাড়িতে মোর রক্তধারায় লেগেছে তার টান। ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে/ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে/জড়িয়ে আছে আনন্দেরই গান।/কান পেতেছি চোখ মেলেছি/ধরার বুকে প্রাণ ঢেলেছি/জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান।’ এই গান যে কসমোসেন্ট্র্রিক চিন্তা থেকে উৎসারিত, তারপর তা জিওসেন্ট্রিক চিন্তার পথ বেয়ে লগোসেন্ট্রিক পর্যায়কে সমন্বিত করেছে, তা বুঝতে পেরে আমিও আকাশ ভরা সূর্য-তারা আর বিশ্ব ভরা প্রাণের মাঝখানে নিজেকে আবিষ্কার করে আনন্দ অনুভব করি, এমনকি উচ্চকিত কণ্ঠে গেয়ে উঠি গান, ছড়িয়ে পড়ি ঘাসে ঘাসে পা ফেলে অজানা বনের পথে এবং ফুলের গন্ধে চমকে উঠে ফিরে তাকাই বিশ্বভুবন সৃষ্টির সেই হিল্লোলে, সেই জোয়ার-ভাটার ছন্দ নৈপুণ্যে দুলে ওঠা অসীম কালের পানে।

আহা গুরুদেব! আবার তুমি কোন সাহসে গেয়েছো গান—‘আকাশ আমার ভরলো আলোয় আমি আকাশ ভরবো গানে।’ অর্থাৎ তুমি আলো ভরিয়ে দেবার প্রতিদানে আকাশকে উপহার দিতে চেয়েছো গানের আনন্দকুসুম, জানি তা করেছোও তুমি, তোমার গানে সত্যি ভরে আছে বাংলার আকাশ। জানি, এখনও পৃথিবীর কোনো কোনো নৃগোষ্ঠী ঝড়-ঝঞ্ঝায়, প্রকৃতির উত্তালতায় বা ভূমিকম্পে প্রকৃতির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে গাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায় লাফিয়ে বেড়ান।

ইরানের সূফিদের ঘূর্ণায়মান সামানৃত্য তো বিশ্ব-প্রকৃতির ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়ার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশেরই সমার্থক, সেখানকার সূফিরা না-কি বিশ্বাস করে—পৃথিবী ঘুরছে, সূর্য ঘুরছে, জগতের সকল কিছুই ঘুরছে, অতএব এটাই স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের উপায়, কেননা স্রষ্টাই প্রকৃতিতে ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়া চালু রেখেছেন।

আমি যখন নতুন ধরনের নাট্য রচনার কথা ভাবি তখন সামনে তাকিয়ে দেখি—বাংলায় নতুন ধরনের নাট্যচিন্তার জনক তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিচিত্র প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে লিখেছেন–‘আমাদের দেশের যাত্রা আমার ওইজন্য ভালো লাগে। যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটা গুরুতর ব্যবধান নাই। পরস্পরের বিশ্বাস ও আনুকূল্যের প্রতি নির্ভর করিয়া কাজটা বেশ সহৃদয়তার সহিত সুসম্পন্ন হইয়া উঠে। কাব্যরস, যেটা আসল জিনিস, সেইটেই অভিনয়ের সাহায্যে ফোয়ারার মতো চারি দিকে দর্শকদের পুলকিত চিত্তের উপর ছড়াইয়া পড়ে।… আমাদের চির প্রচলিত যাত্রার পালাগানে লোকের ভিড়ে স্থান সংকীর্ণ হয় বটে, কিন্তু পটের ঔদ্ধত্যে মন সংকীর্ণ হয় না।’ (রবীন্দ্র-রচনাবলী: পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৪৫১) রবীন্দ্রনাথের এই রচনার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারি তিনি বাংলা ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা তথা যাত্রার আসর উপভোগ করেছিলেন। আর তা না হলে কীভাবে তিনি বাংলার চিরায়ত নিরাভরণ রঙ্গমঞ্চের প্রতি পক্ষপাত ব্যক্ত করে বলেন—‘আধুনিক য়ুরোপীয় নাট্যমঞ্চের প্রসাধনে দৃশ্যপট একটা উপদ্রবরূপে প্রবেশ করেছে। ওটা ছেলেমানুষি। লোকের চোখ ভোলাবার চেষ্টা। সাহিত্য ও নাট্যকলার মাঝখানে ওটা গায়ের জোরে প্রক্ষিপ্ত।… নাট্যকাব্য দর্শকের কল্পনার উপরে দাবি রাখে, চিত্র সেই দাবিকে খাটো করে, তাতে ক্ষতি হয় দর্শকেরই। অভিনয়ের ব্যাপারটা বেগবান, প্রাণবান, গতিশীল; দৃশ্যপটটা তার বিপরীত; অনধিকার প্রবেশ ক’রে সচলতার মধ্যে থাকে সে মূক, স্থানু; দর্শকের চিত্তদৃষ্টিকে নিশ্চল বেড়া দিয়ে সে একান্ত সংকীর্ণ করে রাখে। মন যে-জায়গায় আপন আসন নেবে সেখানে একটা পটকে বসিয়ে মনকে বিদায় দেওয়ার নিয়ম যান্ত্রিক যুগে প্রচলিত হয়েছে, পূর্বে ছিল না।’ এ কথাগুলো তিনি বলেছিলেন ১২৯৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত রাজ ও রাণী, পরবর্তীতে যা তিনি ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য ভৈরবের বলি নামে সংক্ষিপ্ত ও পরিবর্তিত আকারে অভিনয়যোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেন এবং সবশেষে ওই একই নাটক ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে গদ্যনাট্য হিসেবে ‘তপতী’ রচনার ভূমিকায় সংযোজন করেন। একই নাটকের আখ্যান বার বার বিভিন্নভাবে লেখার রবীন্দ্রনাথের নিরন্তর এই সাধনা একজন নাট্যকার হিসেবে আমাকেও এক একটি অতৃপ্ত আখ্যান রচনায় বার বার পুনর্লিখনে সাহস জোগায়, একই সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার প্রতি নিরন্তর সাধনা জাগিয়ে দেয়।

আবার যখন প্রথম এদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির নিবিড় পর্যবেক্ষক হবার সাধনায় নিমগ্ন হই তখন তিনি এসে বাংলাদেশের ফোকলোর সংগ্রাহক-সংকলক-সম্পাদক ও ব্যাখ্যাকারদের পথিকৃৎ হিসেবে সামনে দাঁড়ান। অনেক কম বয়সে ‘বাউলের গান: সংগীত সংগ্রহ—বাউলের কথা’র শীর্ষক একটি রচনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘Universal Love’ প্রভৃতি বড়ো বড়ো কথা বিদেশীদের মুখ হইতে বড়োই ভালো শুনায়, কিন্তু ভিখারীরা আমাদের দ্বারে দ্বারে সেই কথা গাহিয়া বেড়াইতেছে, আমাদের কানে পৌঁছায় না কেন?’ আজ আমাদের মধ্যে ওই সকল ভিখারী-ফকির-সাধুদের প্রতি আগ্রহ অনেকটা বেড়েছে, কিন্তু আমি পেছনে তাকিয়ে দেখতে পাই তাদের প্রতি একেবারে প্রথম থেকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে বলেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ফোকলোর শব্দের তিনিই প্রথম বাংলা পরিভাষা প্রদান করেন ‘লোকসাহিত্য’ নামে, যা বহুদিন ব্যবহৃত হলেও পরে দেখা যায় লোকসাহিত্য শব্দবন্ধ দিয়ে ফোকলোর শব্দের যথার্থ পরিভাষা সম্ভব নয় এবং এখন পর্যন্ত ফোকলোর শব্দটির যথার্থ কোনো বাংলা পরিভাষা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তবে, বাংলা ভাষায় ফোকলোর চর্চার পথিকৃৎ যে রবীন্দ্রনাথ এতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলে ভুলানো ছড়া কিংবা লালন সাঁইজির পদ সংগ্রাহক হিসেবে তাঁর ভূমিকা বাঙালি জাতি চিরদিন স্বীকার করবে।

গভীরভাবে তাকিয়ে দেখি—কবিতা, গান, অঙ্কন, জীবনদর্শন সব কিছুর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অনেকটা একজন সন্তের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর আলোকচিত্রগুলোর দিকে তাকিয়েও তাঁকে তো চিরায়ত বাংলার সাধক হিসেবেই আবিষ্কার করি। বহুদিন ধরে ভাবছি লালনপন্থীদের মতো খিলকা বা জিন্দাদেহে মরার বেশ ধারণ করার কথা, আর এক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথের সাদা রঙের খিলকা দেখে চমকে উঠি, আরে তিনি তো লালনপন্থীদের খিলকা পরেই অধিক দৃশ্যমান, তাহলে কি তিনি সচেতনভাবে লালনপন্থীদের খিলকা ধারণ করেছিলেন, না-কি লালনপন্থীদের ভাবের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে খিলকা না ধারণ করে পারেননি!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত চিত্রকর্ম কখনো কখনো যে আমার সহায় হয়নি তা কিন্তু নয়, আমার নাটক শুরু করি ভূমির নামে মঞ্চায়নকালে যখন নাটকের প্রচারপত্র, পোস্টার ইত্যাদি তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে তখন আমি বন্ধু সাইম রানাকে বললাম—রবীন্দ্রনাথ অঙ্কিত নৃত্যরতা নারীর মতো একটি চিত্র এঁকে দিতে, যে কি-না ভূমির দাঁড়িয়ে এলোকেশে নৃত্যরতা, রানা আমার প্রস্তাবমতে শুরু করি ভূমির নামের মূলভাবকে চিত্রায়িত করলো রবীন্দ্রনাথ অঙ্কিত নৃত্যরতা সেই নারীর আদলে ভূমি থেকে উত্থিত একটি বৃক্ষ-মানবীর চিত্র অঙ্কন করে দিলো। আমার প্রথম নাটক শুরু করি ভূমির নামের প্রচারপত্রে রবীন্দ্রনাথ অঙ্কিত চিত্রের ইশারাকে গ্রহণ করতে পেরে চিরদিন আনন্দ অনুভব করবো বৈকি।

আমাদের দেশের চলচ্চিত্রকারদের নির্মিত চলচ্চিত্র দেখে সন্দেহ জাগে তারা আসলে চলচ্চিত্রের ভাষা বোঝেন কি-না? অথচ, কী আশ্চর্য! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনোদিন কোনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হয়েও চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে পরিষ্কার ধারণা ব্যক্ত করেছেন—যা পাঠ করে নিজের ভেতরে আমার নিজের ভেতরকার চলচ্চিত্রভাবনা পূর্ণাঙ্গতা পায়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ীর অনুজ মুরারী ভাদুড়ীকে এক পত্রে তিনি জানিয়েছিলেন—‘ছায়াচিত্রের প্রধান জিনিসটা হচ্ছে দৃশ্যের গতিপ্রবাহ। এই চলমান রূপের সৌন্দর্য ও মহিমা এমন করে পরিস্ফূট করা উচিত যা কোনো বাক্যের সাহায্য ব্যতীত আপনাকে সম্পূর্ণ সার্থক করতে পারে। তার নিজের ভাষার মাথার উপরে আর একটি ভাষা কেবলি চোখে আঙুল দিয়ে মানে বুঝিয়ে যদি দেয় তবে সেটাতে তার পঙ্গুতা প্রকাশ পায়। সুরের চলমান ধারায় সঙ্গীত যেমন বিনা বাক্যেই আপন মাহাত্ম্য লাভ করতে পারে তেমনি রূপের চলৎপ্রবাহ কেন একটি স্বতন্ত্র রসসৃষ্টিরূপে উন্মোচিত হবে না? হয় না কেবল সৃষ্টিকর্তার অভাবে—এবং অলসচিত্ত জনসাধারণের মূঢ়তায়, তারা আনন্দ পাবার অধিকারী নয় বলেই চমক পাবার নেশায় থাকে।’

শুধু রবীন্দ্রনাথের নিজের রচনায় নয়, আমি আমার রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেয়েছি গ্রাম-বাংলার এক প্রতিভাবান কবিসুধাকর বিজয় সরকারের গানে। মাঝে মাঝে পাগল বিজয়ের স্বকণ্ঠের সুরে অকৃত্রিম রবীন্দ্র বন্দনা শুনি, যা কোনোদিন কোনো শহুরে শিক্ষিত কবিদের কণ্ঠ বা লেখায় নিবিড় মমতা নিয়ে উচ্চারিত হতে শুনিনি। কবিয়াল বিজয় সরকার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বাণীকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়ে গেয়েছেন—‘মরণরে তুঁহু মম শ্যামও সমান/ও আমায় রাধা সম বাধা দিয়ে রেখেছে সংসার আয়ান॥/কালস্য কুটিলা গতি অতি ভয়ানক/দুর্মতি জটিলা যেমন জ্বলন্ত পাবক/আমায় কারাগৃহে করে আটক রাখে সারা দিন মান॥’ আহা! রবীন্দ্রনাথের ভানুসিংহের পদাবলী হতে একটি চরণ ‘মরণরে তুঁহু মম সম শ্যাম সমান’ ধার করে তার উপর আরোপ করেছেন একটি আখ্যান এবং একই সঙ্গে বাংলার রাধা-কৃষ্ণতত্ত্বকেও ব্যাখ্যা করেছেন ভিন্নতর দর্শন প্রয়োগে। কবিয়াল বিজয় সরকারের এই সৃজনশীলতা প্রত্যক্ষ করে রবীন্দ্রনাথকে আমিও নিজের ভেতর সংশ্লেষিত করে নেবার সাহস খুঁজে পেয়েছি। আর কবিয়াল বিজয়ের কণ্ঠ ধার করে গেয়ে উঠি—‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কে বলে আজ নেই/এই মহাদেশে পূর্ণ পৃথিবীর/দেখি তারে যেদিকে চাই॥’

saymonzakaria@gmail.com

free counters


1 Response

  1. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    সাইমন জাকারিয়ার রচনাটি বেশ লোকতথ্যবহুল। তিনি বরাবরই পথ-ঘাট-মাঠের লোকজীবনকে আমাদেরকে নিপুণভাবে চেনান। এখানে আমরা সেই জীবনকে রবিঠাকুরকে আশ্রয় করে চিনতে পারছি।

    একটা বিষয় আমরা বরাববরই শুনে থাকি, রবিঠাকুর ভালো কম্পোজিটরও ছিলেন, কিন্তু কোথাও সুনির্দিষ্ট কৃতজ্ঞতা তার নেই। এমনকি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কাছে লালনভক্তরা নাকি অনেকবারই এই অভিযোগ করেছেন যে, কবিগুরু লালনের গানের খাতা নিয়ে গেছেন, যা আর ফেরত দেননি।

    সাইমন যে ফকিরদের চমৎকার কিন্তু দৃশ্যত অবহেলাপ্রাপ্ত গানের কথা বললেন তা একদম সঠিক। আমাদের হাতের কাছের বলেই তাদেরকে দাম দিই না। যাই হোক, সাইমনকে তার চমৎকার লেখাটির জন্য ভালোবাসা জানাই।

    – কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.