১৯৭১

ইতিহাসের দায় ও সাহিত্যের অভিপ্রায়

mofidul_hoque | 27 Mar , 2010  

carrying-woman.jpg

old-sikh.jpg
ওপরে দুই শরণার্থী মুসলমান ডোলিতে টেনে চলেছেন এক বৃদ্ধাকে, পাকিস্তানের পথে; নিচে বৃদ্ধ শিখ স্ত্রীকে কাঁধে করে চলেছেন প্রত্যাশিত ভূমির আশায়। সাল ১৯৪৭, ছবি. Margaret Bourke-White

ইতিহাসের পথপরিক্রমণ কখনোই সরলরৈখিক নয়, এই চলার পথে রয়েছে নানা চড়াই-উৎরাই, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর এই যাত্রা। মুক্তির জন্য মানুষকে মূল্য দিতে হয়েছে অনেক, আবার মুক্তির অলীক স্বপ্নও মানুষের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে চড়া মূল্য। এমনি এক মুক্তির প্রহেলিকা উপমহাদেশের মানস আচ্ছন্ন করেছিল ১৯৪৭ সালে, ভারতে বৃটিশ শাসনের অবসানের ঐতিহাসিক ক্ষণ স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের কাল হলেও অবিশ্বাস্য রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর রাতারাতি দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার ফলে ব্যাপক-সংখ্যক মানুষের কাছে তা আর স্বাধীনতা হিসেবে প্রতিভাত হয় নি, হয়ে আছে পার্টিশন বা দেশভাগ। যে সংঘাত রোধের জন্য ঘটেছিল দেশভাগ, পার্টিশনের পর সেই সংঘাত হিংসার লোলুপ জিহ্বা মেলে গ্রাস করতে চাইলো অযুত মানুষের জীবন। পাঞ্জাবে, সদ্যটানা সীমান্তরেখার এপারে-ওপারে বয়ে গেল রক্তস্রোত, শুরু হলো উদ্বাস্তু মানুষের অন্তহীন কাফেলা, টলে উঠলো লাখো মানুষের সাজানো সংসার। শেষ পর্যন্ত জনবিনিময় নামক অবিশ্বাস্য এক চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিয়ে হিন্দু ও মুসলমানকে সীমান্তরেখা অনুসরণ করে স্থায়ীভাবে আলাদা করবার নীতি গ্রহণ করলো উভয় দেশ। ভাবা হয়েছিল এভাবেই বুঝি আসবে শান্তি, কিন্তু দুই সম্প্রদায়কে যথাসম্ভব পৃথক করবার ফলে সম্প্রদায়গত অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ পেল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত গেঁড়ে বসলো দৃঢ় আসন। বাংলায় দাঙ্গার লেলিহান শিখা বিস্তার পেয়েছিল ১৯৫০ সালে, বিহারেও তা প্রসারিত হয়েছিল এবং উদ্বাস্তু ঢল নেমেছিল উভয় দিক থেকে। এই বাস্তবতা জোরদার করেছিল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ। অন্যদিকে মুসলমানের স্বঘোষিত আবাসভূমি পাকিস্তান ধর্মের নামে শুরু করে জাতীয় পীড়ন, বাঙালির জাতিসত্তা ও পরিচয় মুছে দিতে চলে জবরদস্তিতার রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার আয়োজন। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় এসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সদম্ভে বলেছিলেন যে, উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অংশ মিলে যে রাষ্ট্র, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হলেও এই মুসলমানদের মধ্যে ছিল স্বাভাবিক বৈচিত্র, পাকিস্তানের মুসলমান নানা ভাষা ও জাতিসত্তার মানুষ, ধর্মের নামে তো জাতি-বাস্তবতা ভুলে থাকা কিংবা মুছে দেওয়ার কোনো জো ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান জাতিসমূহের সমন্বিত রাষ্ট্র হওয়ার বদলে পা বাড়ালো জাতীয় অধিকার পদদলনের দিকে। ফলে শুরু থেকেই পাকিস্তান হয়ে উঠলো পীড়নমূলক রাষ্ট্র, এবং ’৪৭ সালে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা হয়ে থাকে নি।

যাত্রাকালের এই বাস্তবতার অসাধারণ প্রকাশ আমরা দেখি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতায়, ‘স্বাধীনতার প্রভাত’-এ তিনি লিখেছিলেন, “এই ছেঁড়া ছেঁড়া দাগ দাগ আলো/রাত্রির খামে-মোড়া এই ভোর/সেই ভোর নয় যার আসার প্রতীক্ষা ছিল আমাদের/ এতো সেই ভোর নয় যার/আকাঙ্ক্ষা বুকে পুষে/যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রিয়।”

দেশভাগের বাস্তবতা বাংলায় বয়ে এনেছিল বিশাল এক অবাঙালি জনগোষ্ঠীকে যারা নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ‘মুসলমানের আবাসভূমি’-তে। তারা বয়ে এনেছিলেন ভিন্ন ভাষা ভিন্ন সংস্কৃতি এবং বাংলা তো সবসময়ে ভিন্নতাকে আলিঙ্গন করেছে, মিলনে মিশ্রণে বাঙালি সংস্কৃতি পেয়েছে নতুন প্রাণময়তা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ছিল কুটিল জটিল চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি। অবাঙালি উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের হাতিয়ার করে তোলে রাষ্ট্রশক্তি এবং বাঙালির জাতীয় অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিতে চায় উর্দুভাষী এই গোষ্ঠীকে। গোটা পাকিস্তান আমলে শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা অবাঙালি জনগোষ্ঠীকে ব্যবহারের অনেক উদাহরণ মেলে। এই লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িকতা হয়েছিল তাদের অবলম্বন এবং কেবল হিন্দু-বিদ্বেষ নয়, তার সাথে যোগ হয়েছিল বাঙালি-বৈরিতা। এর পাশাপাশি উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর সচেতন অংশের পক্ষ থেকে উত্থিত হয়েছে সম্প্রীতির আদর্শ, বাঙালির জাতীয় সংগ্রামের কাতারে তারাও শরিক হয়েছেন জাতীয় মুক্তির আকুতি নিয়ে। হতে পারে সেই ধারা ছিল দুর্বল, ক্ষীণতোয়া, কিন্তু এর তাৎপর্য তো কোনোভাবে অস্বীকার করা যায় না।

এটাও আমাদের স্মরণ করতে হয়ে, বাঙালির জাতীয়তাবাদ উগ্রচিন্তা দ্বারা তাড়িত হয় নি। ১৯৫২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের বড় অংশ নাগরিকের মাতৃভাষা বাংলা হলেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবেই বাংলাকে দেখতে চেয়েছিল বাঙালিরা, উর্দুর পাশাপাশি তারা চেয়েছে বাংলা ভাষার অধিকার। বাঙালি যখন জাতীয় অধিকার ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল তখন সেই দাবি তো পাকিস্তানের অন্যান্য ভাষা-সংস্কৃতির জাতিসত্তার অধিকারেরও স্বীকৃতি বহন করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসরত পাঞ্জাবি, পাঠান, বেলুচ, সিন্ধিদের ভাষাভিত্তিক প্রদেশসমূহ বাতিল করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তথাকথিত ‘এক ইউনিট’ চালু করলে এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন এবং সত্তর সালে তা বাতিল করতে বাঙালির অবস্থান পালন করেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সবসময়ে তৎপর ছিল বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করতে। এই বিরোধকে রক্তাক্ত সংঘাতের রূপ দিতে তারা ছিল সক্রিয়। ১৯৬৪ সালে মিরপুর-মোহাম্মদপুরে এমনি সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সুফিয়া কামাল ও বিশিষ্ট নাগরিকরা উর্দু প্ল্যাকার্ডসহ ট্রাক মিছিল করে সম্প্রীতির আহ্বান জানান। উত্তেজনাময় ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ভাষণেও বঙ্গবন্ধু সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি, নন-বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই।’

জাতীয় অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দৃঢ়বদ্ধ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রয়াস সত্ত্বেও পাক শাসকগোষ্ঠীর প্ররোচনা ও বিভেদাত্মক নীতি অন্যতর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। উর্দুভাষী উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী তাদের কাছে ছিল নিছক দাবার ঘুঁটি এবং রাজনৈতিক চালবাজিতে বিশাল জনগোষ্ঠীকে ব্যবহারে তারা পারঙ্গমতা অর্জন করে। পাকিস্তানিদের এই অপচেষ্টায় শরিক হয়েছিল অনেকে। এর ফলে জনগোষ্ঠীর জীবনে কী দুর্ভাগ্য নেমে আসতে পারে সে-বিষয়ে ক্ষমতাবানদের কোনো পরোয়া ছিল না। আর তাই ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকবাহিনী গণহত্যাভিযান শুরু করলে দোসর হিসেবে তারা গণ্য করে অবাঙালিদের এবং তাদের মধ্যকার সবচেয়ে উগ্র ও পশ্চাৎপদ অংশকে টেনে নেয় কাছে। বাঙালি জাতির এক ক্ষুদ্র অংশ উগ্র-ধর্মান্ধ রাজনীতি দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে হাত মিলিয়েছিল পাক-হানাদারদের সঙ্গে, তাদের মধ্য থেকে গড়ে তোলা হয়েছিল ঘাতকদল আলবদর। অন্য দিকে অবাঙালি-গোষ্ঠীকে পাক হানাদাররা স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে পরিণত করতে চায় সশস্ত্র সমর্থকে এবং তাদের মধ্য থেকেও গড়ে তোলে হিংস্র ঘাতকগোষ্ঠী। এভাবে বাঙালি-অবাঙালি বিরোধকে সশস্ত্র রূপ দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে সচেষ্ট হয় পাক শাসকগোষ্ঠী এবং পরিচালনা করে একাত্তরের নৃশংস গণহত্যাভিযান। এই জেনোসাইড বা গণহত্যার লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিকে রক্তবন্যায় ডুবিয়ে দিয়ে চিরতরে পদানত করে রাখা। গণহত্যার ভিত্তি ছিল বাঙালি-বিদ্বেষ, যে বিদ্বেষ বিষে কলুষিত হয়েছিল পাকিস্তানি মানস এবং যা অনেকাংশে আচ্ছন্ন করেছিল উর্দুভাষী উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর মানস।

১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ জেনোসাইড কনভেনশন অথবা ১৯৯৬ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জেনোসাইডের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তার বাস্তব রূপায়ণ ঘটেছিল একাত্তরের বাংলাদেশে। জেনোসাইডের সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল যে, কোনো জাতি, নৃগোষ্ঠী, গোত্র বা তাদের অন্তর্ভুক্ত বিশেষ গোষ্ঠীকে উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি জেনোসাইড হিসেবে গণ্য হবে। গণহত্যাভিযানের পেছনে তাই থাকে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, জাতিকে নির্মূল করবার উদ্দেশ্য।

একাত্তরের নয় মাস জুড়ে বাংলাদেশব্যাপী পরিচলিত হয়েছিল জেনোসাইড, বাঙালি জাতিকে পঙ্গু ও পরাভূত করবার এই হত্যাভিযানে তাই বেসামরিক নারী-পুরুষ-শিশু হয়েছে যথেচ্ছ হত্যার শিকার, পাশাপাশি হিন্দু জনগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় হয়েছে উৎখাতের বিশেষ লক্ষ্য।

উনিশ শ’ একাত্তর সালে পাকবাহিনী পরিচালিত গণহত্যাকালে অবাঙালি অধ্যুষিত কতক এলাকা হয়েছিল বিশেষ নিষ্ঠুরতার ক্ষেত্র। পাকিস্তানি বাহিনী এইসব অঞ্চলে তাদের অনেক স্বাভাবিক মিত্রের দেখা পেয়েছিল এবং রক্তপাত ও নিষ্ঠুরতা বহু ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আবার কোনো কোনো স্থানে সাধারণ নিরীহ অবাঙালি মানুষেরাও হয়েছিল নিষ্ঠুর সংঘাতের শিকার। তবে সেসব ছিল সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অপরিসীম দুঃখভোগের ঘটনা, কোনোভাবেই তা বাংলাদেশে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী নির্মূলকরণ বা জেনোসাইডের নীতিপ্রসূত ছিল না। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর তাই দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত কতক ঘটনা ছাড়া ব্যাপক আকারে হত্যাকাণ্ড বিশেষ ঘটেনি এবং বাংলাদেশের যুদ্ধরত সরকার ও মুক্তিবাহিনীর নীতিমালা ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে অবাঙালি-বিদ্বেষ কখনো দেখা যায় নি, বরং সম্প্রীতির আদর্শই সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে অবাঙালি উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর জীবনে নেমে আসে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়। সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে থেকে যারা পালন করেছিল ঘাতকের অথবা সহযোগীর ভূমিকা তাদের একাংশ ডুবন্ত তরী পরিত্যাগ করে পালিয়েছিল পাকিস্তানে, গণহত্যার দোসরদের কেউ কেউ আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সৈন্যদলের সঙ্গে মিলে ভারতের হাতে যুদ্ধবন্দি হওয়াটা শ্রেয় মনে করেছিল। কেউ কেউ দালাল আইনে দণ্ডিত হয়ে কারাভোগও করেছিল বটে, তবে তাদের অনেককে আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কারাগার থেকে মুক্ত করে পাকিস্তানে ফেরৎ পাঠায় জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার। বাংলাদেশে রয়ে যাওয়া উর্দুভাষী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিজেদের ‘আটকেপড়া পাকিস্তানি’ আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত করে। পাকিস্তান তাঁদের গ্রহণ করতে যৎসামান্য আগ্রহই দেখিয়েছে, যদিও একদা দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা মুসলিম সত্তা-পরিচয় নিয়ে তাদের বুলি কপচানোর অন্ত ছিল না।

এমনিভাবে কেটে গেছে প্রায় চল্লিশ বছর। শিক্ষিত, অগ্রসর, ধনবান অবাঙালি এবং তাদের মধ্যকার অথবা তাদের বাইরের ঘাতক সদস্যরা অনেকে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে উর্দুভাষীদের মধ্যে এমন মানুষদেরই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের বেশিরভাগ বাংলাদেশকে জেনেছে জন্মভূমি এবং স্বদেশভূমি হিসেবে। ইতিহাসের জটিলতা-সঞ্জাত দোলাচল যে তাদের মানসে নেই তা নয়। হাইকোর্টের এক যুগান্তকারী রায়ে নাগরিকত্বের অধিকার তারা হাসিল করেছেন। এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্তি রচনা করেন সেটা বিশেষ তাৎপর্যময়। কেননা ইতিহাস তাদের নিয়ে অনেক খেলা খেলেছে। আজ তাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে নতুন ও ঐতিহাসিক সুযোগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণমুখী সমাজ-আদর্শ বাংলাদেশে যত প্রতিষ্ঠা পাবে, সেই সমাজ বৈচিত্র ধারণ করবার এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার ন্যায় বাঙালি-অবাঙালি সবাইকে ভাই বলে গ্রহণের শক্তি ততো বেশি করে খুঁজে পাবে। এই ঐতিহাসিক পথপরিক্রমণে জাতির সঙ্গে এককাট্টা হয়ে একাত্তরের গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীকে, বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মের সদস্য-সদস্যাদের, দৃঢ়ভাবে সামিল হতে হবে। তাদের কণ্ঠ ও অবস্থান যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় যোগ করবে আলাদা মাত্রা এবং নিছক শ্লোগান না হয়ে তা যখন বাস্তব কর্মের রূপ নেবে তখন ইতিহাস বিচারে সবাই অর্জন করবে স্বচ্ছতর দৃষ্টি। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে দৃঢ়তর সংহতি গড়ে তুলে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জনসমাজে সৃষ্ট ঐতিহাসিক নেতিবাচকতা উপশমের পথে অবদান রাখতে পারে। আমরা আশা করতে পারি, বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে সম-অধিকারসম্পন্ন উর্দুভাষী নাগরিক, বিশেষভাবে তরুণ-প্রজন্মের সদস্যরা, গণহত্যাকারীদের বিচারকল্পে জাতির চলমান উদ্যোগে অর্থপূর্ণভাবে শরিক হবে এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতিহত্যার অপরাধে দায়ী প্রকৃত অপরাধীদের দণ্ডপ্রাপ্তির পক্ষে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। ইতিহাসের দায় ও সময়ের এই দাবি পূরণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও সম্প্রীতির পথে।

আমাদের এই আশাবাদ গড়ে ওঠার আরেক ভিত্তি নিশ্চয় উর্দু সাহিত্য, বিশেষভাবে বাংলাদেশে বিকশিত উর্দু সাহিত্য, যা মানবতা ও প্রগতির পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে নিজেকে দাখিল করেছে। সেই ভাষা আন্দোলনের পর্ব থেকে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত আমরা দেখেছি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উর্দু সাহিত্য কীভাবে জাতীয় মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন কঠিন সময়ে সাহিত্য নিয়ে প্রকাশ্য হওয়ার কোনো উপায় ছিল না, না বাংলায় না উর্দুতে। কিন্তু সাহিত্যিকের অন্তরের রক্তক্ষরণ তো রুদ্ধ হয় নি। সেইসব সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্য দিয়েও ঘটতে পারে ইতিহাসের দায়মোচন। কেননা সাহিত্য তো সর্বদা দাঁড়িয়েছে সত্য সুন্দর ও ন্যায়ের পক্ষে, তৈরি করেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনক্ষেত্র। আবারও স্মরণ করতে হয় ফয়েজকে, রণেশ দাশগুপ্ত অনুবাদ করেছিলেন কবিতা, ‘পা থেকে রক্ত ধুয়ে ফেলো’, ফয়েজ লিখেছিলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের পথগুলি/গিয়েছে ছিঁড়ে-খুড়ে সবই/কাঁটায় ভরে গেছে আগাগোড়া/এগিয়েছি যে-দিকেই তাই/রক্তাক্ত হয়েছে পা দুটো।”

সবশেষে কবির প্রত্যাশা, “বুক বাঁধো, জেনো, এইসব পথ যদি/রুদ্ধ হয়ে গিয়ে থাকে, তবু/এদেরই জঠর থেকে শত শত পথ আরও/একদিন বেরিয়ে আসবেই।/তারই অপেক্ষাতে এতদিন/ভাঙুক তোমার বক্ষ জুড়ে/শত শত ছুরি বেঁধে বেঁধে/বিঁধুক ভাঙুক।”

(বাংলা-উর্দু সাহিত্য ফোরামের স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে পঠিত)

mofidul_hoque@yahoo.com

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


3 Responses

  1. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    মফিদুল হককে শুভেচ্ছা। এতে আমাদের মুক্তি-সংগ্রামের নতুন একটা দিককে আবারও আমাদের স্মৃতিতে দাঁড় করানো হল। উর্দুভাষীদের উপর আমাদের একধরনের সরল ঘৃণা কিন্তু আছে। এখানে তা থেকে বেরিয়ে আসার একটা যুক্তিমুখর চেষ্টা লক্ষ করা গেল। আমরা ইতিহাসকে যেমন স্মরণ রাখব, তেমনি মানবিক দিককেও স্মরণে রাখা দরকার। উর্দু সাহিত্যের আছে দরকারি এক ভাণ্ডার; আমরা তা থেকে নিশ্চয়ই ঋদ্ধ হবো। আবারও লেখককে ভালোবাসা জানিয়ে শেষ করলাম।

    -কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

  2. yusuf reza says:

    ভাল লাগল। অনেক কিছু জানলাম। লেখক কে Thnx.

  3. prokash biswas says:

    যখন শ্লোগান দেয়া হয়,‌‍ গোলাম আজম, আব্বাস খান ফিরে যাও পাকিস্তান, শ্লোগানটির জাতীয়তাবাদী ভাল অর্থ থাকলেও, আরেকটি অর্থ এই যে পাকিস্তানে প্রগতিশীল মানুষ নেই। নেই শেষিত মানুষও।

    মফিদুল হকের এ লেখাটি ভালো লেগেছে।

    –প্রকাশ বিশ্বাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.