প্রবন্ধ

আহা, সেইসব রূপবান পুরুষ

শান্তা মারিয়া | 1 Aug , 2020  


‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে, গুণে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে, প্রতি অঙ্গ মোর।’ বৈষ্ণব পদাবলীতে পদকর্তা জ্ঞান দাস এই উক্তি ব্যবহার করেছেন রাধার আক্ষেপ হিসেবে। শ্রী রাধিকা শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবাসেন শুধু তার অতুলনীয় গুণের জন্যই নয়, বরং তার আকর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ ভুবনজয়ী রূপ। বৈষ্ণব পদাবলীর ছত্রে ছত্রে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের রূপ বন্দনা। নবীনমাধব, মোহন কালা, রাধামোহন কত নামেই না অভিহিত করা হয় তাকে। শুধু শ্রীরাধাই নন, কৃষ্ণের রূপে পাগল চন্দ্রাবলী, শত শত গোপিনী এবং রুক্মিণী, জাম্ববতী, সত্যভামা ও যদুকুলের আরও অসংখ্য নারী।
পুঁজিবাদ মূলত নারীর রূপকে পণ্য করে। কারণ মেলডোমিনেটেড সমাজে পুরুষই নারীর রূপের প্রধান ক্রেতা। কিন্তু ইতিহাস ও মিথোলজিতে পুরুষের রূপ নারীর তুলনায় কোন অংশে কম আলোচিত নয়। আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী কথাটি শুধু নারীর বেলায় প্রযোজ্য তা নয়। পুরুষেরও শত্রু হতে পারে তার রূপ। বিভিন্ন পুরাণ কাহিনী অন্তত সে কথাই বলে। অনেক রূপবান পুরুষকেই রূপের জন্য ভোগ করতে হয়েছে লাঞ্ছনা, পড়তে হয়েছে বিড়ম্বনায়, হতে হয়েছে অপহরণের শিকার। এমনকি রূপের কারণে জীবনও হারাতে হয়েছে অনেক সুদর্শনকে।

বিশ্বের প্রথম মহাকাব্যের নায়ক রাজা গিলগামেশকে তার রূপের জন্য ভোগ করতে হয় অভিশপ্ত জীবন। সুমেরীয় বা আক্কাডীয় পুরাণে বর্ণিত হয়েছে সেই কাহিনী। উরুক দেশের রাজা গিলগামেশ ছিলেন বীর ও রূপবান। সুদর্শন গিলগামেশের প্রেমে পড়েন, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী ইশতার। তিনি গিলগামেশকে ভালোবাসার কথা জানান। গিলগামেশ বুদ্ধিহীন ছিলেন না। তিনি বুঝেছিলেন মানবের প্রতি দেবীর প্রেম বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার নয়। তাই এই অনিশ্চিত প্রেমকে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। আর তার সেই প্রত্যাখ্যান দেবীকে এমনই ক্রোধান্বিত করে যে তিনি অভিশাপ দেন এই সুদর্শন পুরুষকে। ইশতারের অভিশাপে নষ্ট হয়ে যায় গিলগামেশের রূপ। এই রূপ পুনরুদ্ধারের জন্যই গিলগামেশের দীর্ঘ অভিযান শুরু হয় যার বর্ণনা রয়েছে সুমেরীয় পাথরের ফলকে কীলক লিপিতে।

সেমেটিক মিথোলজিতে রয়েছে য়ুসুফ বা ইউসেফ (ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রফেট জোসেফ, ইসলামে নবী ইউসুফ আ.)-এর ভুবনজয়ী রূপের কথা। প্রফেট জ্যাকবের সন্তানদের মধ্যে জোসেফ ছিলেন সবচেয়ে সুদর্শন। সৎভাইদের চক্রান্তে তিনি দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যান মিশরে। মিশরের গভর্নর প্রোটিফার কিনে নেন সুদর্শন কিশোর জোসেফকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিন্দ্যকান্তি তরুণে পরিণত হন জোসেফ। জোসেফের রূপে ছিল পাড়ভাঙা আহ্বান গীত। সেই রূপের আকর্ষণে প্রোটিফারের স্ত্রী জুলেখা কতভাবে প্রেম নিবেদন করেন এবং প্রত্যাখ্যাত হয়ে কিভাবে জোসেফকে কারাগারে পাঠান সেই বর্ণনা তো রয়েছে কত কাব্যে। জোসেফকে দেখে মিশরের অভিজাত নারীরা কিভাবে ফল কাটতে গিয়ে নিজেদের হাত রক্তরঞ্জিত করেন তার বিবরণও অভিজ্ঞ পাঠকের অবশ্যই জানা। বাংলা ভাষাতেও ইউসুফ জোলেখার কাহিনী শুনিয়েছেন শাহ গরীবুল্লাহসহ অনেক কবি।

পুরুষের শুধু রূপ নয়, রূপের জন্য অহংকারও থাকে বৈকি। আর এ অহংকারের কারণে পতনও হয়। মহাভারতের পঞ্চপান্ডবের অন্যতম ছিলেন মাদ্রীপুত্র নকুল। নকুল ছিলেন অসাধারণ রূপবান। মহাপ্রস্থানের সময় নকুলের পতন হলে যুধিষ্ঠিরকে ভীম তার পতনের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। যুধিষ্ঠিরের উত্তর ছিল, নকুল নিজেকে রূপবান বলে অহংকার করতেন, তাই তার পতন। এ উত্তরের ভিতর কি সামান্যতম ঈর্ষার ইঙ্গিতও পাওয়া যায় না? হোক না আদরের ছোটভাই। তবু অন্যের রূপ পুরুষের মনেও ঈর্ষার জ্বালা ধরায় তো বটেই।
বিরাট রাজার সেনাপতি এবং শ্যালক কীচকও সুপুরুষ ছিলেন। দ্রৌপদীর মন জয় করার চেষ্টায় তিনি নিজের মুখেই নিজের রূপের ব্যাখ্যান করেন। এও বলেন যে প্রাসাদের নারীরা নাকি তার রূপে পাগল। দ্রৌপদী অবশ্য কীচককে মোটেই পাত্তা দেননি। বুদ্ধিমান নারীর পুরুষের রূপে পাত্তা না দেয়ারই কথা।

আচ্ছা এবার না হয় বলি অ্যাডোনিসের কথা। সাইপ্রাসের রাজকন্যা মিরা গর্ভবতী অবস্থায় বৃক্ষে পরিণত হন। সেই বৃক্ষ থেকে জন্ম নেয়া অ্যাডোনিস ছিলেন পরম রূপবান। এই রূপবান যুবকের প্রেমে পড়েন আফ্রোদিতি ও পাতালরাণী পার্সিফোনে। সেটা নিঃসন্দেহে রূপের জন্য। কারণ তার অন্য কোন গুণের বিবরণ পাওয়া যায় না। এক পুরুষ দুই নারী বলে কথা। বাংলা চলচ্চিত্রের ফর্মুলা অনুযায়ী এই রূপবান তরুণকে নিয়ে দুই দেবীর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। জিউসের মধ্যস্থতায় স্থির হয় চার মাস অ্যাডোনিস থাকবেন পার্সিফোনের সঙ্গে। চারমাস আফ্রোদিতির সঙ্গে। আর বাকি চারমাস তার ইচ্ছামতো যে কোন একজনের সঙ্গে। অ্যাডোনিসের প্রেমের পাল্লা ভারি ছিল আফ্রোদিতির দিকে। এদিকে অ্যাডোনিসের প্রতি ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে তাকে কৌশলে হত্যা করেন দেবীর আরেক প্রেমিক রণদেবতা অ্যারেস। আর তার রক্ত থেকে সৃষ্টি হয় অ্যানামাইন ফুলের।
গ্রেকো রোমান পুরাণের এটাও একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য যে বিভিন্ন ফুলের জন্ম হয়েছে রূপবান পুরুষদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। সেই যুবকদের স্মৃতিতে নামকরণ করা হয়েছে ফুলগুলোর। এসব কাহিনী থেকে অবধারিতভাবে যে প্রশ্নটি জাগে তা হলো, তবে কি প্রাচীন গ্রিস ও রোমে রূপবান যুবকদের বলি দেওয়ার কোন প্রথা ছিল? যে প্রথাকে পরবর্তিকালে এসব শোভন মিথের আবরণে সুগারকোটেড করে লুকিয়ে রাখা হয়েছে? যেমন হায়াসিন্থ ফুলের জন্ম হয়েছিল রূপবান তরুণ হায়াসিন্থাসের রক্ত থেকে। এখানে বলে রাখা ভালো গ্রেকো রোমান দেবতাদের মধ্যে সমকামী সম্পর্ক কোন অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। সমকামীতা ও উভকামীতা ছিল তাদের স্বাভাবিক প্রেমসম্পর্কেরই অংশ। সেই স্বাভাবিকতার অংশ হিসেবেই রাজপুত্র রূপবান তরুণ হায়াসিন্থাসকে ভালোবাসতেন ক্রীড়া ও সংগীতের দেবতা অ্যাপোলো এবং পশ্চিম বায়ুর দেবতা জেফাইরাস। হায়াসিন্থাসের পক্ষপাতিত্ব ছিল অ্যাপোলোর দিকে। আর সেই কারণে ঈর্ষায় ভুগতেন জেফাইরাস। একদিন হায়াসিন্থাস ও অ্যাপোলো ডিসকাস বা চাকতি ছুঁড়ে খেলা করছিলেন। জেফাইরাস খেলায় যোগ দিতে চাইলেন। কিন্তু কাবাবের মধ্যে হাড্ডির মতোই তাকে খেলায় নিলেন না তারা। দেবতার ঈর্ষায় সেই চাকতি বাতাসে ভেসে গিয়ে আঘাত করে হায়াসিন্থাসের কপালে। এইভাবে প্রেমিক আ্যাপোলোর আঘাতেই মৃত্যু হয় হায়াসিন্থাসের। হতচকিত অ্যাপোলো তার মৃতদেহকে স্পর্শ করে বিলাপ করেন এবং তার রক্ত থেকে জন্ম নেয়া ফুলের নামকরণ করেন হায়াসিন্থ।

রূপের কারণেই রাজা সিফালাসের জীবন বিষময় হয়ে ওঠে। গ্রেকো রোমান পুরাণের একটি বেদনাবিধুর প্রেমকাহিনি হল সিফালাস ও প্রক্রিসের কাহিনি। রোমান পুরাণের ওভিদ ও অন্যান্যরা এই কাহিনি বর্ণনা করেছেন। সিফালাস ও প্রক্রিস ছিলেন স্বামী- স্ত্রী। অনিন্দ্যকান্তি সিফালাস ছিলেন বায়ুরাজ ইয়োলাসের পৌত্র। আর প্রক্রিস ছিলেন এথেন্সের রাজা ইরেকথিউসের কন্যা। তারা ছিলেন প্রেমিক প্রেমিকা। তারপর তাদের বিয়ে হয়। তারা সুখী দাম্পত্যজীবন শুরু করেন।
সিফালাসের শিকারের নেশা ছিল।একবার তিনি যখন ভোররাতে শিকার করছিলেন সেই সময় ঊষা দেবী ইওস তাকে দেখতে পান। সুদর্শন সিফালাসকে দেখে মোহিত হন ইওস। তিনি তাকে অপহরণ করে নিয়ে যান। মতান্তরে সিফালাস তার বিয়ের রাতেই অপহৃত হন।

ইওস সিফালাসের প্রতি বারে বারে প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হন। তিনি আট বছর সিফালাসকে আটকে রাখেন। তাদের একটি সন্তান হয়। কিন্তু ইওস কোনোভাবেই সিফালাসের মন থেকে প্রক্রিসের প্রতি প্রেমকে দূর করতে পারেন না। সিফালাস মানসিকভাবে একমাত্র প্রক্রিসের প্রতিই অনুরক্ত থাকেন। সিফালাসের মন থেকে প্রক্রিসের প্রতি প্রেম দূর করতে না পেরে ইওস তাকে মুক্ত করে দেন। কিন্তু সেই সঙ্গে বলেন, প্রক্রিসকে যতটা বিশ্বস্ত ভাবছেন সিফালাস সে প্রকৃতই ততোটা বিশ্বস্ত কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে। এই কথায় সিফালাসের মনে সন্দেহের বিষ ঢুকে যায়। আর এর ফলশ্রুতিতেই দুজনের দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।

ট্রয়ের রাজপরিবারের পুরুষরা বোধহয় প্রায় সকলেই ছিলেন রূপবান। আর রূপের কারণে তাদের অনেকেরই জীবন হয়েছে যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। এই পরিবারের রাজকুমার গ্যানিমেড ছিলেন অসাধারণ সুন্দর তরুণ। এই রূপের কারণে দেবরাজ জিউস তাকে অপহরণ করে নিয়ে যান নিজের প্রাসাদে। মতান্তরে গ্যানিমেডকে অপহরণ করেন ঊষাদেবী ইওস। আর ইওসের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেন জিউস। চোরের উপর বাটপারি যাকে বলে। জিউস ও গ্যানিমেডের সমকামী সম্পর্ক এবং জিউসের ঈগলকে দিয়ে গ্যানিমেডের অপহরণ মধ্যযুগে অনেক বিখ্যাত চিত্রকলার বিষয়বস্তু। গ্যানিমেড পরে দেবরাজের প্রাসাদে সুরা পরিবেশনকারী হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু জিউস কারও প্রেমে পড়লে হেরা তাকে বিষ নজরে দেখবেনই, সে নারী হোক আর পুরুষই হোক। গ্যানিমেড নিহত হয় হেরার চক্রান্তে। দুঃখ ভারাক্রান্ত জিউস এই অকালমৃত সুদর্শন তরুণকে স্থান দেন নক্ষত্রলোকে। তিনি কুম্ভ রাশির প্রতীকে পরিণত হন।

ট্রয়ের আরেক রাজপুত্র প্যারিস ছিলেন বিশ্বের সেরা সুদর্শন পুরুষ। এত রূপ থাকায় তার বুদ্ধির প্রকোষ্ঠটা একটু খালিই ছিল। আর এই রূপের কারণে ও বুদ্ধির ঘাটতিতে তিনি তিন দেবীর সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় বিচারক হতে রাজি হন। শুধু তাই নয়, হেরা ও অ্যাথিনির মতো ক্ষমতাবান দেবীদের অগ্রাহ্য করে তিনি মজেন প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির কথায়। ফলস্বরূপ হেলেনের অপহরণ এবং ট্রয়ের ধ্বংস। তা, রূপবানদের বুদ্ধি কম থাকতেই পারে। প্যারিসও ছিলেন সেইসব রাঙামূলোদের একজন। তবে প্যারিস অহংকারী ছিলেন না।

অহংকারী রাঙামূলো ছিলেন নার্সিসাস। নদীদেবতা সিসিফাস এবং পরী লেইরিওপির পুত্র যুবক নার্সিসাস এতই রূপবান ছিলেন যে, নারী-পুরুষ সকলেই তাকে দেখামাত্র প্রেমে পড়তো। কিন্তু নার্সিসাস তার প্রেমপ্রার্থীদের অত্যন্ত অবজ্ঞা ও উপহাস করতেন। বিশেষ করে বনদেবী ইকোর প্রেমকে তিনি অতি নিষ্ঠুরভাবে অবজ্ঞা করেন। প্রেমের অমর্যাদা করায় তাকে অভিশাপ দেন আফ্রোদিতি। আফ্রোদিতির অভিশাপে আত্মপ্রেমে পড়া নার্সিসাস জলের বুকে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একদিন মৃত্যুর জগতে চলে যান। নার্সিসাসের মৃতদেহ থেকে জন্ম নেয় এক সুন্দর ফুল। দেবী আফ্রোদিতি সেই ফুলের নাম রাখেন নার্সিসাস ফুল যে সারাক্ষণ চেয়ে থাকে জলের বুকে নিজের ছায়ার দিকে।
রূপের জন্য চিরঘুম বা মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হন সুদর্শন অ্যান্ডিমিয়ন। অ্যান্ডিমিয়ন ছিলেন মর্ত্যমানব। তার পরিচয় নিয়ে মতভেদ আছে। কারও মতে তিনি ছিলেন একজন রাজা, আবার কেউ বলে তিনি ছিলেন শিকারী। তবে বেশিরভাগ পুরাণকারের মতে তিনি ছিলেন মেষ পালক। অ্যান্ডিমিয়ন ছিলেন অসাধারণ সুদর্শন যুবক। তিনি ল্যাটমাস পর্বতে মেষ চড়াতেন। এক সন্ধ্যায় তিনি মেষ চড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে পাহাড়ের ঢালে শুয়ে ছিলেন বা বসে ছিলেন সেই সময় চন্দ্র উদয় হয়। চন্দ্রদেবী তাকে দেখতে পান। তার অসাধারণ সৌন্দর্যে তিনি বিমোহিত হন। তিনি নেমে আসেন এই সুদর্শন পুরুষের কাছে। সেলিনি তীব্র আবেগে তার প্রেমে পড়েন এবং তার সঙ্গে মিলিত হন।
তার পর সেলিনি তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেন। কোনো কোনো পুরাণে রয়েছে সেলিনি নিজেই মায়াজাল বিস্তার করে তাকে চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রাখেন। আবার কোনো পুরাণে রয়েছে সেলিনির অনুরোধে জিউস তার চোখে নিয়ে আসেন চিরঘুম। অ্যান্ডিমিয়নকে কেন নিদ্রায় আচ্ছন্ন করা হল তার কারণ অতি বিচিত্র। এই সুদর্শন পুরুষ যেন অন্য কোনো নারীর প্রতি আকৃষ্ট না হন সেজন্যই তাকে চিরদিনের জন্য নিদ্রাচ্ছন্ন করে দেওয়া হয়। মৃত্যুর কঠোরতাকেও কিভাবে স্বপ্নময় ও কাব্যিক করে তুলতে হয় তা গ্রিক পুরাণকাররা জানতেন খুব ভালোভাবেই। আর তাদের এই বাস্তব জ্ঞানটুকুও ছিল যে, একমাত্র মৃত্যুতেই সম্ভব প্রেমকে অমর করা। জীবিত মানুষ একজনের প্রতি চির বিশ্বস্ত থাকতে পারে না। তাই অ্যান্ডিমিয়নকে চিরনিদ্রিত করে দিয়েছিলেন জিউস।

ল্যাটমাস পর্বতের একটি গুহায় মতান্তরে চাঁদের বুকেই তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। চন্দ্রদেবী প্রতি রাতে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হন। আবার কোনো পুরাণে রয়েছে ঘুমন্ত অ্যান্ডিমিয়নের সঙ্গেই মিলিত হন সেলিনি।
আমাজন রানী হিপ্পোলাতি ও গ্রিক বীর থিসিউসের রূপবান পুত্র হিপ্পোলাইটাসের জীবনও দুর্বিসহ হয়ে পড়ে তার রূপের কারণেই। হিপ্পোলাইটাসের প্রেমে পড়েন তার বিমাতা ফিড্রা। অ্যাথেন্সের প্রৌঢ় রাজা থিসিউসের তরুণী স্ত্রী ফিড্রা রূপবান তরুণ হিপ্পোলাইটাসের অনন্যসাধারণ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে প্রেম নিবেদন করেন। এই ঘৃণিত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন হিপ্পোলাইটাস। অপমানিত ফিড্রা উল্টো নালিশ করেন থিসিউসের কাছে। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা বলে কথা। তিনি পুত্রের উপর চটিতং হয়ে তাকে অভিশাপ দিয়ে রাজ্য থেকে বহিষ্কার করেন। এবং রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান হিপ্পোলাইটাস।

সুদর্শন ট্রয়রাজপুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ছিলেন সম্ভবত ইনিয়াস। তিনি ছিলেন আফ্রোদিতির পুত্র। ট্রয়ের ধ্বংস রজনীতে যে কোনভাবে হোক তার প্রিয় পুত্রের প্রাণরক্ষা করেন দেবী। ইনিয়াস অবশ্য শুধু রূপবানই ছিলেন না, বীর এবং বুদ্ধিমানও ছিলেন। বিউটি, বার্থ ও ব্রেইনের বিরল সমন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে। এহেন রূপবান ইনিয়াস এরপর কত দেশে ভ্রমণ করেন, রানী ও রাজকন্যারা কিভাবে তার প্রেমে পড়ে এবং সেজন্য কতভাবে বিব্রত হতে হয় তাকে সেসব বিবরণ ভার্জিল তার ইনিড মহাকাব্যে দিয়েছেন। আমি বিস্তারিত উল্লেখ করতে গেলে চর্বিত চর্বণ হবে। যাহোক, শেষ অবধি ইনিয়াস বেঁচে বর্তে ছিলেন এবং রোমান জাতির প্রতিষ্ঠাতা রূপেও পূজিত হন। সে অন্য প্রসঙ্গ । কথা হচ্ছিল পুরুষের রূপ নিয়ে। মহাজন বাক্য হলো রূপের প্রতিযোগিতার বেলায় নাকি সন্তানের শ্রেষ্ঠত্বও সহনীয় নয়। নারীর কথা হচ্ছে না, এখানেও পুরুষের কথাই হচ্ছে।

উদাহরণ? কৃষ্ণ এবং শাম্বের উদাহরণটাই না হয় দিই। কৃষ্ণ ও জাম্ববতীর পুত্র শাম্ব ছিলেন পরম রূপবান। রৈবতক পর্বতের এক প্রমোদ কাননে কৃষ্ণ তার অনুবর্তি ষোল হাজার নারী( নরকাসুরের কারাগার থেকে কৃষ্ণের কৃপায় মুক্তি পাওয়া) নিয়ে জলকেলী করছিলেন। সেখানে তিনিই ছিলেন একমাত্র পুরুষ। অন্য কোন পুরুষের সেই প্রমোদকাননে প্রবেশের অনুমতি ছিল না।দেবর্ষি নারদের কূটচালে সেখানে উপস্থিত হন শাম্ব। শাম্বকে দেখে সেই ষোল হাজার নারী বেশ উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণকে দেখে তারা যতটা আহ্লাদিত হতেন তারচেয়ে বেশি হয়ে ওঠেন শাম্বকে দেখে। এরপরের কাহিনী সকলেরই জানা। রূপ ও প্রেমের ক্ষেত্রে এহেন প্রতিযোগিতা স্বয়ং বাসুদেবেরও অসহ্য বোধ হয়েছিল। তিনি পিতা হয়ে পুত্র শাম্বকে কুষ্ঠ হওয়ার শাপ দিতেও দ্বিধা করেননি। কারণ কোন সফল পুরুষই প্রিয় নারীর(বা নারীকুল)কণ্ঠে অন্য পুরুষের রূপগুণের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করেন না।
পুরুষের রূপ, তার বন্দনা, রূপবান পুরুষের জন্য স্তূতি এসব শুধু পুরাণের বিষয় নয়। পুরাণ তো জীবনের কথাই রূপকচ্ছলে শোনায়। রূপবান পুরুষেরা না থাকলে পৃথিবীটাই যে নিরস হয়ে যেত তাতে আর সন্দেহ কি।


3 Responses

  1. Rana Amir says:

    ইতিহাস এবং পুরাণ – দুটো এক নয়। অসাধারণ এই লেখায় একটি সিলি মিসটেক দেখে অবাক হলাম। ইউসুফ – জুলেখার কাহিনীকে লেখা হয়েছে মিথোলজি। অথচ এই কাহিনী মিথোলজি নয়, হিস্ট্রি।

    • শান্তা মারিয়া ‍ says:

      ইউসুফ বা য়ুসোফ বা জোসেফ সেমেটিক মিথোলজির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ও কোরান শরীফে (দুটোই ধর্ম গ্রন্থ, ইতিহাসের বই নয়) তার নাম রয়েছে। তিনি ইতিহাসের চরিত্র কিনা সে বিষয়ে কোন প্রমাণ আধুনিক ইতিহাস দিতে পারেনি। আদৌ এই নামে কোন মানুষ ছিলেন কিনা তারও প্রমাণ নেই। তবে বিশ্বাসে মিলায়, তর্কে বহুদূর। আর্টিকেলটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

      • prottoy jashim says:

        লেখাটি সুন্দর। নারীরা বেশি সুন্দর রূপবান পুরুষের চেয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.