কিস্তি ৬

ছফামৃত

নূরুল আনোয়ার | ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ৫:৩৩ অপরাহ্ন

shamim-shikder-sofa.jpg
ছফা, শামীম শিকদারের সঙ্গে

শুরুর কিস্তি

(কিস্তি ৫-এর পর)

সত্তরের দশকে তিয়াত্তরের প্রথমদিকে দৈনিক গণকন্ঠতে যোগদান করে ছফা কাকা তাঁর জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। পরে পঁচাত্তর থেকে বিরাশি সাল পর্যন্ত তিনি এই পত্রিকার সম্পাদকীয় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

10-janu-75-sofa.jpg…….
১৯৭৫-এ আহমদ ছফা (জানুয়ারি ১০), এ সময় তিনি জাসদ করতেন।
…….
পত্রিকাটির জীবনে কম ঝক্কি-ঝামেলা, উত্থান-পতন হয়নি। তারপরেও এটি একটা বড় সময় টিকে থাকতে পেরেছিল। যতদিন পত্রিকাটি বেঁচেছিল ছফা কাকাও এর একটা অংশ হয়ে গিয়েছিলেন। এ পত্রিকায় তিনি যত লেখা লিখেছেন জীবনে অন্যকোন পত্রিকায় অত লেখা লিখেননি। ছফা কাকাকে যে দ্রোহী এবং প্রতিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তার সূত্রপাতও অনেকটা এই পত্রিকা থেকে। তখনকার প্রায় লেখার মধ্যে তাঁর একটা প্রতিবাদী ভাব ফুটে ওঠত। এ জন্য তাঁকে সরকারের রোষানলেও পড়তে হয়েছে বারংবার। কবি ফররুখ আহমদ যখন চাকরি হারিয়ে পথে বসেছেন, মরতে বসেছেন তখন ছফা কাকা এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছিলেন, ‘কবি ফররুখ আহমদের কি অপরাধ?’ ছফা কাকার সেই প্রতিবাদ এত তীব্র ছিল যে সরকার তাঁর কথা কানে তুলতে বাধ্য হয়েছিল।
—————————————————————–
শেখ মুজিবের সঙ্গে যখন তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল তিনি তাঁকে ‘স্যার’ সম্বোধন করেছিলেন। শেখ মুজিব নাকি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ছফা, তুমি আমাকে ভাই বলে ডেকো। ওইদিন ছফা কাকাকে শেখ মুজিবুর রহমান একটি কম্বল উপহার দিয়েছিলেন। কম্বলটি ছিল কমলা রঙের এবং খুব হালকা। মাপলে এক কেজিও হবে না। ছফা কাকা যতদিন বেঁচেছিলেন ওটি জড়িয়ে ঘুমোতেন। এখনও কম্বলটি আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। তিনি একই কাপড়-চোপড় বেশিদিন ব্যবহার করতেন না। কিন্তু কম্বলটি হাতছাড়া হবার ভয়ে শীতের শেষে লন্ড্রি থেকে ধোলাই করে এনে তালা বদ্ধ করে রাখতেন।
—————————————————————-
‘গণকন্ঠ’-এর মাধ্যমে ছফা কাকা বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। প্রায় দশ বছর তিনি এ পত্রিকার সঙ্গে কাটিয়েছেন। এই দশটি বছরকে তিনি তাঁর জীবনের বিপ্লবের বছর হিসেবে উল্লেখ করতেন। এর পেছনে তিনি অনেক শ্রম-সাধনা করেছেন। অর্থ সংগ্রহের জন্য নানাজনের কাছে ধন্না দিয়েছেন। কোথাও কাজ হয়েছে, কোথাও হয়নি। যখনই পত্রিকাটির কোন রকম অধঃপতন গোচরে আসত তাঁর বুকটা হু হু করে উঠত। ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণে’র একটি পাতায় তাঁর মনোকষ্টের কিঞ্চিত উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:

“ঊনিশ শ’ আশি সালের আগস্ট মাসের দিকে হবে। টিপু সুলতান রোডে ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ পত্রিকার অফিসে গিয়ে নিশ্চিত হলাম, পত্রিকাটি মরতে যাচ্ছে। আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল। এত চেষ্টা চরিত্র, এত পরিশ্রম সব বৃথা যাচ্ছে। কতজনের কাছে ভিক্ষা করলাম। দেশি, বিদেশি কত মানুষের দুয়ারে টাকার জন্য ধন্না দিলাম। যা হওয়ার কথা ছিল তা হতে যাচ্ছে। আগামীকাল থেকে মেহনতি জনগণের মুখপত্রটি মুখ বুজে আত্মহত্যা করবে। (ছফা, খ. ২, পৃ. ২৫)

ছফা কাকা তখন জাসদ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ‘গণকন্ঠ’ ছিল জাসদের মুখপত্র। ‘গণকন্ঠ’ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে জাসদের অঙ্গহানী ঘটা। সুতরাং এটা ছফা কাকার সইবে কেন। জাসদ এবং ‘গণকন্ঠ’ দুটোই তাঁর কাছে সমান গুরুত্ব বহন করত। জাসদের সঙ্গে তিনি যতদিন জড়িত ছিলেন ওই সময়টাকে তিনি উল্লেখ করেছেন মুগ্ধতার বছর হিসেবে। ওই সময়ে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেয়ার কারণে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলে সঙ্গত কারণে তাঁর অনেক শত্রুর জন্ম সম্ভব হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের কক্ষও ছাড়তে হয়েছিল। গবেষণাকর্মটিও না ছেড়ে তাঁর উপায় থাকল না। এসবই ছিল জাসদের সঙ্গে জড়িত থাকার ফল। এই রাজনৈতিক দলটির পেছনে তিনি যত ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তার বিনিময়ে কিছুই তিনি পাননি। বিষয়টা দাঁড়িয়েছিল বাবার খেয়ে মামার মোষ তাড়ানোর মত। পরবর্তীতে তিনি আফশোস করে লিখেছেন:

“জাতীয় সমাজতান্তিক দলের যখন সমালোচনা করি, মনে হয় নিজের শরীরে ছুরি চালাচ্ছি। এক সময়ে আমি ওই দলটির প্রেমে পড়েছিলাম। জীবনের অনেকগুলো বছর আমি ওই দলটির সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। এগুলো আমার জীবনের অন্ধতা এবং মুগ্ধতার বছর। অন্ধ করতে পারা এবং মুগ্ধ করতে পারা একটা ক্ষমতা। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের তারুণ্যের সম্মোহনমন্ত্রে মোহিত হয়ে আমার মত অনেকেই এই দলটির পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সমাজ শরীর থেকে ফেটে পড়া অফুরন্ত প্রাণশক্তির এই দুর্বার যৌবনতরঙ্গেও কথা যখন চিন্তা করি, একটা অপরূপ বিস্ময়বোধ আমার মনকে চঞ্চল এবং উতলা করে তোলে। সেই অপরিচিত তারুণ্যের কথা যখন স্মরণে উদিত হয় একটা সুগভীর বেদনাবোধ আমার সমগ্র সত্তা আচ্ছন্ন করে ফেলে।” (ছফা, খ. ৭, পৃ. ১৬৯)

আরেক জায়গায় জাসদের প্রথম সারির তিন নেতা মেজর এম এ জলিল, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রবের প্রতি আক্ষেপ করে বলেছেন:

“একসঙ্গে জাসদের অগ্রসারির এই তরুণ নেতার কথা মনে হলেই আমার মন ফুঁড়ে একটা প্রতিতুলনা স্বতঃই মনে আসে। এককালের সেরা তিনজন মসলিন শিল্পী কারও কাছ থেকে কন্ট্রাক্ট নিয়ে অবিরাম ছেঁড়া কাঁথা সেলাই করার কাজটি করে যাচ্ছেন। আমি যদি ঊনিশ শ’ আশি সালের পূর্বে এই তিনজন ব্যক্তিকে খুন করে ফেলতে পারতাম, বাংলার তারুণ্যের ইতিহাসে তিনটি অক্ষয় প্রতীক স্থায়ী করে রাখতে পারতাম। শুধু তিনজন মানুষকে হত্যা করে বিপ্লবের তিনটি স্মারক চিহ্ন আমি প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম। অন্তর্গত দুর্বলতার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি বলে আজকে খেদ করতে হচ্ছে। আর সুযোগ পেয়েও সম্ভাব্য বিপ্লবের স্মারকস্তম্ভ আমি নির্মাণ করিনি। এই আফশোসের কারণে আমার আত্মহননের সাধ জাগে। এই তিনজনকে হত্যা করলে আমাকেও হত হতে হত। এ কথা তো একরকম অবধারিত। কিন্তু সংসারে অমর কে? বাংলার ইতিহাসে বাঙালির ইতিহাসে একটা জায়গা তো পেয়ে যেতাম। যদিও আমার পরিচয়টি হত বিশ্বাসঘাতক জুডাসের মত। (ছফা, খ. ৭, পৃ. ১৬৯)

সেসব কথা থাক। ‘গণকণ্ঠে’ প্রতিবাদী লেখা এবং জাসদের সভা-সমাবেশে গরম গরম বক্তৃতার কারণে ছফা কাকা মুজিব সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন এবং শান্তি নামক জিনিসটা কি তিনি তা একেবারে ভুলে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর থাকা-খাওয়ার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক হোসনে আরা তাঁকে স্নেহের চোখে দেখতেন। তিনি তাঁর শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন জনাব আজিজুল হক। তিনি এক সময় ‘কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর (বার্ড)’ পরিচালক ছিলেন। পরে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সিরডাপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক হোসনে আরার সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে আজিজুল হক সাহেব ‘ইউনিসেফ’ থেকে ছফা কাকার জন্য একটি গবেষণা প্রকল্প সংগ্রহ করেছিলেন। হক সাহেব ছিলেন ইউনিসেফের বাংলাদেশ শাখার প্রধান উপদেষ্টা। পাশাপাশি গ্যাসকার্ট নামের একজন জার্মান তরুণ তাঁকে একাজে সাহায্য করেন, যিনি ইউনিসেফ-এর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আজিজুল হক সাহেব এ গবেষণা কাজের জন্য ছফা কাকাকে সাত হাজার টাকা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন এক মাস কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে থেকে সমাজ উন্নয়ন বিষয়ক বই পড়ে উন্নয়নের ওপর একটা ধারণা লাভ করতে। উনিশ শ’ পঁচাত্তর সালের শুরুর দিকে ছফা কাকা কুমিল্লার বার্ডে গিয়েছিলেন। কিন্তু গবেষণা সংক্রান্ত পড়াশুনা তাঁর ভাল লাগল না। তাছাড়া আজিজুল হক সাহেব যেই টাকা তাঁকে দিয়েছিলেন তাও প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। এর পরে তিনি কিভাবে চলবেন সে চিন্তা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল। এ দুঃসময়ে একজন মানুষের সঙ্গে তিনি পরিচিত হন তিনি হলেন মাহবুবুল আলম চাষী। তখন তিনি ছিলেন বার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ছফা কাকার জ্ঞান-গরিমা সম্পর্কে চাষী সাহেবের অল্প-বিস্তর ধারণা ছিল। তিনি ধরে বসেছিলেন ছফা কাকা যেন শেখ মুজিবের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন। এ ধরনের একটা প্রস্তাব তিনি চাষী সাহেবের কাছ থেকে পাবেন তা কখনও ভাবেননি। এমন একটা প্রস্তাবে ছফা কাকা আকাশ থেকে পড়েছিলেন। তিনি মনে মনে বললেন, শেখ মুজিবের লোকজন সমাজতন্ত্রের শত্র“ মনে করে তাঁকে এক জায়গায় স্থির হতে দিচ্ছে না, আর চাষী সাহেব কিনা বলছেন শেখ সাহেবকে সাহায্য করতে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ছফা কাকা চাষী সাহেবের কথায় রাজি হয়েছিলেন। তাঁকে সমাজতন্ত্রের ইতিহাস এবং তত্ত্বগত বিষয়ে বক্তৃতা দিতে হবে। কাকা সপ্তাহে একটি বক্তৃতা দিতেন এবং তার সম্মানী স্বরূপ এক হাজার টাকাও পেতেন।

ইতোমধ্যে চাষী সাহেবের সঙ্গে মোটামুটি একটা অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছে। তখন তিনি ছফা কাকার সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। এ-ও বলেছিলেন, খন্দকার মুশতাক আহমদ এবং ঠাকুর উদ্দিন ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি প্রায় সময় তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তারা এখন তিনজন তিন জায়গায় আছেন। একটি সময় আসবে তাঁরা তিনজন এক জায়গায় হবেন। পরবর্তীতে চাষী সাহেব যখন খোন্দকার মুশতাক সাহেবের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হিসেবে ‘গণভবনে’ যোগদান করেন পুরো ব্যাপারটি তিনি বুঝে ফেলেন মুজিব হত্যার সঙ্গে এই তিনজনের একটা গোপন হাত ছিল। পরবর্তীতে তিনি ‘মুজিব হত্যার নীলনক্সা : আমি যতটুকু জানি’ প্রবন্ধে এই বিষয়গুলো সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।

চাষীর দেয়া চাকরি ছফা কাকা বেশিদিন করেননি। নানা কারণে চাকরিটা তাঁর পছন্দও হয়নি। তাঁকে আবার ঢাকায় চলে আসতে হয়েছিল। আসতে হয়েছিল আরও একটা কারণে, পঁচাত্তর সালের দশ আগস্ট কবি সিকান্দার আবু জাফর মারা যান। কবি সাহেবের সঙ্গে ছফা কাকার একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। সুতরাং তাঁকে শেষবারের মত দেখাটাই ছিল তাঁর ঢাকায় ফেরার প্রধান কারণ। ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করেছিলেন। তখন অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ ঠেলায় পড়ে হোক, নিজের গরজে হোক তাঁর একদলীয় বাকশাল রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন। ছফা কাকা এই একদলীয় বাকশালনীতির বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্মল সেনকে প্রেসক্লাবে কিছু কথা বলেন। আরও নানা জায়গায় তিনি এসব কথা বলে বেড়াচ্ছিলেন। কোন পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এসব বলে বেড়াচ্ছেন তা কিন্তু নয়। একজন সচেতন মানুষের যা করার কথা তিনি তাই করছিলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আট-দশজনের মত শিক্ষক বাকশাল বিরোধিতা করে ওই দলে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। শাসকগোষ্ঠী ধরে নিয়েছিলেন এর নেপথ্যে ছফা কাকার হাত ছিল। ফলে তাঁকে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হত। তিনি লিখেছেন:

“আমি কোন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলাম না। আমি শুধু লিখতাম এবং কথা বলতাম, সব সময়ে অসংকোচে কথা বলতাম। আমি রাতে থাকব কোথায়, পরের বেলা খাবার জোটাব কি করে তারও কোন নিশ্চয়তা ছিল না। তবু বিপদে পড়ে গেলাম। কি করে যে প্রচার হয়ে গেছে যে আমি শিক্ষক-সাংবাদিকদের যোগ না দেয়ার জন্য প্রচার কার্য চালাচ্ছি। এই খবরটা শেখ সাহেবের বড় ছেলে শেখ কামালের কানে যথারীতি পৌঁছায়। শুনতে পেলাম তিনি আমাকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। আমার অবস্থা হল ফাঁদে ধরা পশুর মত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গিয়ে একটা নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। একজন তো বলেই দিলেন, ভাই আমরা বউ ছেলে নিয়ে বসবাস করি। তোমাকে বাসায় বসতে দিতে পারব না। তোমার নামে নানা গুজব। তোমার সঙ্গে সম্পর্ক আছে জানলে বিপদে পড়তে পারি।

আমি চৌদ্দই আগস্ট সন্ধেবেলার কথা বলছি। একজন ভগ্নিস্থানীয়া হাউজ টিউটরের বাসায় গিয়ে হাজির হই। আমার বিশ্বাস ছিল তাঁর কিছু উপকার করেছি। আমি খাইনি এবং কিনে খাওয়ার পয়সা নেই। লাজশরমের মাথা খেয়ে তাঁকে কিছু খাবার দিতে বলি। মহিলা পলিথিনের ব্যাগে কিছু মোয়া দিয়ে বললেন, ছফা ভাই, এগুলো পথে হাঁটতে হাঁটতে আপনি খেয়ে নেবেন। আপনাকে বসতে দিতে পারব না।

তাঁর বাসার বাইরে এসে কি ধরনের বিপদে পড়েছি পরিস্থিতিটা আঁচ করতে চেষ্টা করলাম। বলতে ভুলে গেছি কার্জন হলে না কোথায় দুটো বোমা ফুটেছে। আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সে সময়ে আমার বন্ধু অরুণ মৈত্র আমার সঙ্গে ছিলেন। অরুণ ‘ইস্টল্যান্ড’ নামে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাতে কাজ করতেন। অরুণের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে বলাকা বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি আসি। অরুণ আমাকে বললেন, সময়টা আপনার জন্য অনুকূল নয়। আপনি কোন নিরাপদ জায়গায় চলে যান। পরামর্শটা দিয়ে অরুণ বাসায় চলে গেলেন।

উদ্দেশ্যহীনভাবে আমি বলাকা বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওমা কিছু দূর যেতেই দেখি একখানা খোলা জিপে সাঙ্গপাঙ্গসহ শেখ কামাল। একজন দীর্ঘদেহী যুবক কামালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, দেখ কামাল ভাই, আহমদ ছফা যাচ্ছে। কামাল নির্দেশ দিলেন, হারামজাদাকে ধরে নিয়ে আয়। আমি প্রাণভয়ে দৌড়ে নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারের ভেতর ঢুকে পড়ি। যদি কোনদিন স্মৃতিকথা লিখতে হয়, এই পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশদ করে বর্ণনা করব।”। (ছফা, খ. ৭, পৃ, ১৪১)

ছফা কাকার আয়ুতে কুলোয়নি। সুতরাং স্মৃতিকথাও লেখা হয়নি। আমরাও তাঁর অনেক অজানা কথা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। যাক, চৌদ্দই আগস্টের রাতটি ছিল ছফা কাকার জন্য এক ভয়ঙ্কর রাত। ওই রাতে তিনি বেঁচেছিলেন কি, মরে গিয়েছিলেন অনেকের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। ডক্টর আহমেদ কামাল লিখেছেন:

“১৯৭৫-এর ১৪ আগস্ট রাতে ছফা ভাই আমার বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন, আর ঠিক তখনই একটি জিপে করে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট কয়েকজন তরুণ ছফা ভাইকে তাঁড়া করল। ছফা ভাইয়ের কী হল বোঝা গেল না। ১৫ আগস্টের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর ছফা ভাইয়ের খোঁজ করাই আমার প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়াল। আগের রাতের ঘটনা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে বললে, তিনিও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বেলা দশটার দিকে ছফা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে জানতে পারলাম কীভাবে তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। আমি শঙ্কামুক্ত হলাম।” (ছফা স্মা. পৃ. ৬৭)

শেখ মুজিবের আমলে ছফা কাকা খুব সুখে ছিলেন না। ওই সময়ে তাঁকে নানাভাবে অপদস্ত হতে হত। তারপরেও তিনি শেখ মুজিবের ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে দিতে ভুল করেননি। তিনি তাঁকে খুব উঁচুমাপের মানুষ মনে করতেন। তিনি দাবি করতেন, শেখ সাহেবকে নিয়ে যত লেখা হয়েছে তার মধ্যে তাঁর লেখাগুলো শ্রেষ্ঠ। তিনি আরও একটা কথা বলতেন, বাঙালির শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘বলাকা’ নয়, ‘সোনার তরী’ নয়, ‘গীতাঞ্জলি’ নয়; বাঙালির শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ তাঁর এক প্রবন্ধে শেখ মুজিব সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:

“আজ থেকে অনেকদিন পরে হয়ত কোন পিতা তার শিশুপুত্রকে বলবেন, জান খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হল মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রুপালি কিরণধারায় মায়ের স্নেহের মত যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হল তাঁর ভালবাসা। জান খোকা তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।” (ছফা, খ. ৭, পৃ, ১৬২)

চৌদ্দ আগস্ট রাতে ছফা কাকা মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছিলেন। পনের আগস্ট রাতে যখন শেখ সাহেবকে সপরিবারে হত্যা করা হয় তখন তাঁর খুশি হবার কথা। কিন্তু তিনি খুশি হতে পারেননি; বরং তাঁকে দেখা যায় একজন প্রতিবাদী হিসেবে। কবি ফারুক আলমগীর লিখেছেন:

“১৯৭৫ সালের আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর একমাত্র আহমদ ছফা ‘হলিডে’ পত্রিকায় প্রতিবাদ জানিয়েছিল এই বর্বরোচিত ঘটনার। সেদিন আমাদের তথাকথিত কোন বুদ্ধিজীবীর উচ্চকণ্ঠ শোনা যায়নি, কোন রাজনীতিক সাহসে ভর করে ঘর থেকে বেরোননি। এই ঢাকা শহরে কোথাও কোথাও মিষ্টি বিতরণ ও ‘নাজাত দিবস’ পালন হতে দেখেছি। এই বৈরী পরিবেশে আহমদ ছফার মত নির্লোভ সাহসী মানুষেরাই প্রতিবাদ করতে পারে; সদা তুষ্টিসাধনে ব্যাপৃত পারিষদ দলের পক্ষে তা সম্ভব নয়।” (ছফা স্মা., পৃ. ২২)

শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কাকার সর্বমোট দু’বার কথা হয়েছে। কী নিয়ে তাঁদের কথা হয়েছিল বলতে পারব না। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের সঙ্গে যে দু’বার কথা হয়েছে ছফা কাকা বেশ ঘটা করে প্রকাশ করতেন। তিনি শেখ মুজিবকে কখনও ‘জাতির পিতা’ কিংবা ‘বঙ্গবন্ধু’ এসব সম্বোধন করতেন না। তিনি তাঁকে বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে জ্ঞান করতেন। শেখ মুজিবের সঙ্গে যখন তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল তিনি তাঁকে ‘স্যার’ সম্বোধন করেছিলেন। শেখ মুজিব নাকি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ছফা, তুমি আমাকে ভাই বলে ডেকো। ওইদিন ছফা কাকাকে শেখ মুজিবুর রহমান একটি কম্বল উপহার দিয়েছিলেন। কম্বলটি ছিল কমলা রঙের এবং খুব হালকা। মাপলে এক কেজিও হবে না। ছফা কাকা যতদিন বেঁচেছিলেন ওটি জড়িয়ে ঘুমোতেন। এখনও কম্বলটি আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। তিনি একই কাপড়-চোপড় বেশিদিন ব্যবহার করতেন না। কিন্তু কম্বলটি হাতছাড়া হবার ভয়ে শীতের শেষে লন্ড্রি থেকে ধোলাই করে এনে তালা বদ্ধ করে রাখতেন।

প্রতিভা অন্বেষণের প্রতি ছফা কাকার একটা প্রবল ঝোঁক ছিল। কারও মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের উন্মেষ লক্ষ্য করা গেলে তাকে তুলে আনা ছফা কাকা একটা বড় দায়িত্ব মনে করতেন এবং সবার সামনে তাকে তুলে ধরতে চেষ্টা করতেন। অন্যের প্রতিভার লালন করে বেড়ানো এমন মহামানব আমাদের সমাজে বিরল। কিন্তু ছফা কাকাকে দেখতাম তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কাউকে নিরাশ করার মত মানুষ তিনি ছিলেন না। হয়ত তাঁর সামর্থের সীমাবদ্ধতা ছিল, তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার মানুষ তিনি ছিলেন না। এদেশের অনেক কবি-সাহিত্যিকের প্রথম বই তাঁর সহযোগিতায় বেরিয়েছে। এসব নিয়ে তিনি তেমন একটা গর্ববোধ করতেন না এবং সেসব কথা কাউকে বলেও বেড়াতেন না। হুমায়ূন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, সাইদ-উর রহমান, আবু কায়সার, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এমনকি আমার প্রথম বইটিও তাঁর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল। এ রকম খুঁজলে আরও অনেককে পাওয়া যাবে।

থাক ওসব কথা। ছফা কাকার জীবনে সব চে’ বড় আবিষ্কার বিশ্ববরেণ্য শিল্পী এস. এম. সুলতান। শিল্পী সুলতান দেশের বাইরে বেশ নামধাম কামাই করলেও দেশের ভেতরে তাঁকে বিশেষ কেউ চিনতেন না। নড়াইলের অজপাড়া গাঁয়ে পড়ে থাকতেন, মাঝে মধ্যে হয়ত তিনি ঢাকায় আসতেন।

সুলতান সাহেবের সঙ্গে ছফা কাকার প্রথম পরিচয় হয় ঊনিশ শ’ ছিয়াত্তর সালে। জাসদের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তখন পুলিশ কাকার পিছে পিছে ছায়ার মত লেগে থাকত। আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস থেকে বের হলেই পুলিশ তাঁকে আটকাবার তালে থাকত। সুতরাং তাঁর চলাফেরা এবং কাজে-কর্মে তেমন একটা স্থিরতা ছিল না। এ রকম পরিস্থিতিতে এক রাতে সুলতান সাহেবের সঙ্গে ছফা কাকার দেখা। তাঁকে দেখে তিনি রীতিমত অবাক হয়ে গিয়েছিলেন এবং এর রেশটা তাঁর মনে অনেকদিন জাগ্রত ছিল। এ ব্যাপারে তিনি এক সাক্ষাৎকারে যে কথাগুলো বলেছেন আমি তার হুবহু উদ্ধৃত করছি:

“তখন আমি সারাদিন বাইর অইছি। সারাদিন খাইনি। তখন রাত্রিবেলার দিকে আসতেছি, আটটা সাড়ে আটটার দিকে হবে। ভাদ্রের শেষের দিকে হবে। আগস্টের শেষের দিকে। আকাশে জ্যোৎস্না। শিল্পকলা একাডেমির গোড়ায় এখন যে এক্সিবিশন রুম, এইটাতে জানলা-টানলা হয়নি। হঠাৎ করে দেখি যে একটা লম্বা লোক। কালো লম্বা চুল। সে, একটা বিড়াল, গাজা খাচ্ছে। গাজা খাওয়ার পরে একটা বিড়ালকে বের করে এনে বিড়ালটারে চুমো খাচ্ছে। আমার খুব অবাক লাগল, এ রকম লম্বা চুল অলা লোক! …গাজা খাচ্ছে! পরে দেখছি যে লোকটা একটা তুলি হাতে নিল। তুলি হাতে নিয়ে আঁকতে শুরু করল। মাই গড! মাই গড! এটা তো এক বিস্ময়! আমার মনে হচ্ছে আমার বুকের মধ্যে কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে। তখন আমি ওখানে প্রায় বারটা অব্দি দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর একমাস যদ্দিন ছবি আঁকছে সে, আমি কাউকে কিছু না বলে ছবি আঁকা দেখছি। …জানলা দরজা ছিল না তখন। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি। দেখার পরে এটা একটা গোপন প্রেমের মত। তখন আমি আবুল ফজল সাব যখন ই করতে যাচ্ছিলেন, ওপেন করতে যাচ্ছিলেন, বললাম আমারেও নিয়া যাইয়েন। নিয়ে গেলেন, যাওয়ার পরে যখন সকলে বলল যে সুলতান ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সুলতান গাজা খায়, সাপ পোষে, অনেকগুলো গল্প।” (ছফা সা., পৃ. ২২)

কাকা সুলতান এবং সুলতানের আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বটে, কিন্তু সুলতানের সঙ্গে কখনও তাঁর কথা হয়ে ওঠেনি। এটা ছিল এক গোপন প্রেমের মত। দূর থেকে দেখেই তৃপ্তি, কাছে গিয়ে প্রেমে যে পড়েছেন সেকথা বলার সুযোগ নেই। অভিসারের সুযোগ তো এমনিতে হয় না, কাউকে না কাউকে তৃতীয় পক্ষ হয়ে সুযোগ ঘটিয়ে দিতে হয়। আলোকচিত্রি নাসির আলী মামুন সেই দায়িত্বটা পালনের ভার কাঁধে নিয়েছিলেন তাঁর এক লেখা থেকে জানতে পাই। তিনি লিখেছেন:

“সুলতানের সঙ্গে আমার সখ্য জানতেন আহমদ ছফা। সুলতানকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে বলতেন। নিয়ে গেলে আসা-যাওয়ার প্রতিশ্র“তি দিলেন। সে সময় সুলতান যতবার ঢাকায় আসেন, আমাকে খুঁজে বের করেন। কোন বড় লোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল না। তখন সুলতান গরিব শিল্পী, আমি এক কৌতূহলী বেকার। ঢাকায় তাঁর থাকার জায়গা খুঁজে বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। এখানকার বড় লোকদের আমিও চিনতাম না। সুলতাকেও কেউ মূল্যবান মনে করত না। এমন দুর্বল সময়ে সিদ্ধেশ্বরীতে একটা দোচালা ভাঙা টিনের ঘরে সুলতানের আশ্রয় হয়। যশোরের ভূগোলের অধ্যাপক আবুল কাশেমের ভাড়া নেয়া বাসা। সুলতানের পূর্ব-পরিচিত। ছফার কারণে সুলতানকে খুঁজতে গেছি। টিনের ঘরে নেই। মনে হল ভেগে গেছে নড়াইলে। শান্তিনগরের মোড়ে কয়েকটা ছোট রেস্টুরেন্ট ছিল। সেখানে সার্চ করতে গিয়ে দেখলাম প্রায় অন্ধকার বেড়ার একটা রেস্টুরেন্টে নাস্তা করছিলেন নড়াইলের এস এম সুলতান। আমাকে দেখে ইশারা দিলেন। সঙ্গে গাঁজার দলের শক্তিশালী কয়েকজন সদস্য। তারা সুলতানের সঙ্গে চেয়ারে পা তুলে নাস্তা করছেন। ছফা আমাকে টেক্সি ভাড়া দিয়েছিলেন সুলতানকে আনা-নেয়ার জন্য মাত্র ত্রিশ টাকা। আমি ভাবলাম, যদি নাস্তার টাকা আমাকে দিতে হয়, পুরো টাকাটাই যাবে। বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সুলতান নাস্তা সেরে এলে বললাম আহমদ ছফার প্রত্যাশার কথা। যেতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুলতান বললেন, তিনি কোন অধ্যাপকের কাছে যান না। আমি বললাম উনি আহমদ ছফা, আপনাকে ভালবাসেন। রাজি হলেন সুলতান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে ছফার রুমে ঢুকতেই চমকে উঠে দু’জনের চোখÑ দেখা হয় দু’জনের। জড়িয়ে ধরেন সুলতানকে এবং মনে হল অসামান্য ও মহামূল্যবান কোন বস্তু পেয়ে গেছেন আহমদ ছফা। টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চাকু দিয়ে পেন্সিল কাটছিলেন আহমদ ছফা। এ সময় সুলতান তাঁর নাগালের মধ্যে। দুই পাগলের প্রথম ফরমাল সাক্ষাৎপর্ব। আসার সময় সুলতান আমাকে বলেছিলেন দশ মিনিটের বেশি থাকবেন না তিনি; কিন্তু দু’ মিনিটের আগেই পটিয়ে ফেলেন বোহেমিয়ান সুলতানকে। (আমার দেশ, বর্ষ ৬, সংখ্যা ২০৮)

বেদনার কথা হল সুলতান যে একজন পেইন্টার সে কথা কেউ ভুলেও উচ্চারণ করল না। এদিকে ছফা কাকা সুলতানকে মনে মনে পছন্দ করে বসে আছেন। তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন সুলতান সাহেব একজন উঁচুমাপের শিল্পী। তাঁকে উপস্থাপন করার জন্য ছফা কাকা নানা কায়দা-কানুন করতে থাকলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সুলতান সাহেবের জন্য তিনি চারুকলাতে একটা চাকরিও ভিক্ষা করেছিলেন। তিনি যে একজন শিল্পী সে ব্যাপারটি কেউ পাত্তাই দিলেন না।

ছফা কাকার চিত্রকলা সম্পর্কে কোন জ্ঞান ছিল না। সুলতানকে শিল্পী হিসেবে তুলে ধরার জন্য পেইন্টিং-এর ওপর তাঁকে প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছফা কাকা সুলতান এবং তাঁর ছবির ওপর একটি বড় প্রবন্ধ রচনা করে ফেলেন। প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘অভিনব উদ্ভাসন’। লেখক মোরশেদ শফিউল হাসান এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে ‘মূলভূমি’ নামের একটি পত্রিকা বের করতেন। ‘মূলভূমি’র প্রথম সংখ্যার প্রথম লেখা ছিল ছফা কাকার সুলতানকে নিয়ে লেখা এই প্রবন্ধ। পরবর্তীতে ‘অভিনব উদ্ভাসন’ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে ‘বাংলার চিত্রঐতিহ্য : এস এম সুলতানের সাধনা’ নামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তার আগে প্রবন্ধটি একটি পুস্তিকাকারেও প্রকাশ পেয়েছিল। এই প্রবন্ধের প্রথম বাক্যটি বাংলা-সাহিত্যের অন্যতম একটি দীর্ঘ বাক্য হিসেবে অধ্যাবধি স্বীকৃত। এটাকে একটি কবিতা বলেও ধরে নেয়া যেতে পারে। বাক্যটি এ রকম:

“শেখ মুহম্মদ (এস. এম.) সুলতানের আঁকা গুরুভার নিতম্ববিশিষ্টা পীনস্তনী এ সকল চমৎকার স্বাস্থ্যবতী কর্মিষ্ঠা লীলাচঞ্চলা নারী, স্পর্ধিত অথচ নমনীয় সর্বক্ষণ সৃজনলীলায় মত্ত অহল্যা পৃথিবীর প্রাণ জাগানিয়া এ সকল সুঠামকান্তি কিষাণ, এ সকল সুন্দর সূর্যোদয়, সুন্দর সূর্যাস্ত, রাজহাঁসের পাখনার মত নরোম তুলতুলে এ সকল শুভ্র শান্ত ভোর, হিঙুল বরণ মেঘ-মেঘালীর অজস্র সম্ভার, প্রসারিত উদার আকাশ, অবারিত মাঠ গগন ললাট, তালতমাল বৃক্ষরাজির সারি, দীঘল বাঁকের নদীতীরের এ সকল দৃষ্টি-শোভন চর, মাঠের পর মাঠে থরে থরে ঢেউ খেলানো সোনার ধান, কলাপাতার ফাঁকে ফাঁকে জোনাকজ্বলা এমন মোহিনী অন্ধকার, আঁকাবাঁকা মেঠো পথের বাঁকে বাঁশ-কাঠে গড়া কিষাণের এ সকল সরল আটচালা, এ সকল আহলাদী বাছুর এবং পরিণত বয়স্ক গবাদি পশু, সর্বোপরি গোটা জনপদের জনজীবনে প্রসারিত উৎপাদন শৃঙ্খলে আবদ্ধ সভ্যতার অভিযাত্রী অজেয় মানুষ; তাঁরা যেন দৈনন্দিন জীবনধারণের স্রোতে কেলিকলারসে যুগ থেকে যুগান্তর পেরিয়ে অনন্তের পথে ভেসে যাচ্ছে, ক্যানভাসে তাঁদের প্রত্যয়দীপ্ত বলিষ্ঠ উপস্থিতি, স্বচ্ছন্দ ঋজু গতিভঙ্গিমা এমনভাবে বাঁধা পড়েছে, মনে হবে সমস্ত নিসর্গদৃশ্য ছাপিয়ে মেঘেতে মেঘেতে ঠেকেছে তাঁদের মস্তক এবং পাতালে প্রবিষ্ট হয়েছে মূল, তাঁদের শ্রম-ঘামের ঝঙ্কার, চেষ্টার সংগীত সমস্ত প্রাকৃতিক কোলাহল ভেদ করে আকাশগঙ্গার কিনারে কিনারে ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনিতে এক সঙ্গে ফেটে পড়েছে।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ১৫০)

কাকার এই লেখাটি প্রকাশিত হবার পর শিল্পী সুলতানকে সকলে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করেছিলেন। তাঁর সুবাদে প্রফেসর রাজ্জাকের কানেও পৌঁছে যায় সুলতানের গুণগান। ছফা কাকার সহযোগিতায় ঢাকার বুকে একাধিকবার অনুষ্ঠিত হয় তাঁর চিত্র প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীগুলোর কল্যাণে সুলতানের হাতে শেষ বয়সে বেশ কিছু টাকা পয়সাও চলে আসে। কিন্তু বোহেমিয়ান সুলতানের হাতে সেসব টাকা বেশিদিন থাকেনি। একমাত্র সুলতান ছাড়া বাংলাদেশের এমন কোন শিল্পী নেই যাঁর জীবদ্দশায় এত যশ-খ্যাতি ও টাকা-পয়সা অধিক পরিমাণে এসেছে, যেটা সম্ভব হয়েছিল ছফা কাকার একাগ্রতা এবং নিরলস পরিশ্রমের কারণে।

সুলতানের সঙ্গে পরিচিত হবার পর ছফা কাকার ভেতরে এক শিল্পীসত্ত্বা জাগ্রত হয়েছিল। ওই সময়ে ছবি আঁকা বিষয়ে তাঁকে অনেক পড়াশুনা করতে হয়েছে। পড়ার জন্য পড়া নয়। এই পড়াশুনাকে তিনি কাজেও লাগিয়েছেন। তিনি সুলতানকে নিয়ে লিখেছেন এবং পাশাপাশি নিজে ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন। ছবি আঁকার রঙ কেনার জন্য যে অর্থকড়ির দরকার তা তাঁর ছিল না। তাই তিনি ছবি আঁকার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন জবাফুল, টুথপেস্ট, আলকাতরা ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি দাবি করতেন, ছবি এঁকে তাঁকে পাঁচ বছর ভাতের পয়সা যোগাড় করতে হয়েছে। এটা হয়ত ছফা কাকার বাড়িয়ে বলা। ছবি আঁকা যদি তাঁর জীবিকার একমাত্র মাধ্যম হত তাঁর আঁকা ছবি কোথাও না কোথাও চোখে পড়ত। তবে তাঁর আঁকা একটা ছবি তিনি আমাকে দেখিয়েছিলেন চুরাশি সালের দিকে। ছবিটি মোটামুটি বড় সাইজের। তিনি বলেছিলেন, ছবিটি পাঁচ হাজার টাকা দামে পাঁচবার বিক্রি করে পাঁচবার কিনেছেন। তাঁর গুরু প্রফেসর রাজ্জাক ছিলেন এই ছবির ক্রেতা। খুব সম্ভব ছবিটি তিনি তাঁর জার্মান বন্ধু পিটার জেবিৎসকে উপহার হিসেবে দিয়ে দিয়েছিলেন। ছফা কাকার একটা বড়সরো পিয়ানো ছিল। এটিও তিনি জেবিৎসকে দিয়েছিলেন। সঙ্গে দিয়েছিলেন একটি বিড়াল ছানা। তখন ছফা কাকা মিরপুরের শিয়ালবাড়ির ফ্ল্যাটে থাকতেন। আমিও তাঁর সঙ্গে থাকতাম।

সুলতানের সান্নিধ্যে এসে ছফা কাকা বাঁশি বাজানো শুরু করেছিলেন। সুলতান সাহেব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারতেন। ছফা কাকা অত পারতেন না। তাঁর বাঁশির সুর আকর্ষণ করত বটে; কিন্তু একটা সুরের মধ্যেই তাঁকে আঁটকে থাকতে হত। গানের বেলায়ও তাই। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, পল্লীগান, ভাওয়াইয়া এমন কি নিজের লেখা গানও তিনি একই সুরে গাইতেন। তিনি কি সুর পাল্টাতে পারতেন না, নাকি ইচ্ছে করে গাইতেন বলা মুশকিল। তবে নিজের গাওয়া গানের প্রতি তাঁর দরদ ছিল অপরিসীম। তিনি দাবি করতেন, গান তাঁর গলায় উঠে গেছে। একবার তো বলেই ফেললেন, তাঁর গান ফাতেমাতুজ জোহরা গাইতে রাজি হয়েছেন। আমি বললাম, সুর করবে কে? তিনি জবাব দিলেন, আমিই সুর দেব? আমার তো আবেগ আছে। আমি কথা বাড়াইনি।

হারমোনিয়ামের পেছনে ছফা কাকা যত সময়, শ্রম ও সাধনা করেছেন সাহিত্যের পেছনে তা করলে হয়ত তাঁর সাহিত্য ভাণ্ডারটা আমরা অন্যরকম দেখতে পেতাম। সকাল-বিকাল, রাত-বিরাত যখনই তিনি সময় পেতেন হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়তেন। বাঁশির মত হারমোনিয়ামও একটা সুরের মধ্যে বিচরণ করত। গানের সঙ্গে হারমোনিয়ামের সুরের কোন মিল পাওয়া যেত না।

সুলতানের কথা বলতে গিয়ে আরও নানা প্রসঙ্গ চলে আসছে। ছফা কাকা এক সময় লম্বা চুল রাখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এটা সুলতানের প্রভাবে, নাকি জাসদের লম্বা চুলওয়ালা নেতাদের প্রভাবে, নাকি নিজের শখে বলা মুশকিল। তবে লম্বা চুল তিনি খুব পছন্দ করতেন। ওই সময় তিনি একটা টিয়ে পাখি পুষতেন। পাখিটা সব সময় তাঁর কাঁধের ওপর থাকত। টিয়ে পাখি এবং লম্বা চুল তাঁকে বেশ মানিয়েছিল। ঢাকা শহরে পাখিওয়ালা ফকির হিসেবে তাঁর একটা পরিচিতিও পেয়ে গিয়েছিল। তাঁর মাথায় খুশকি না হলে হয়ত তিনি চুল ছোট করতেন না।

সাতাত্তর আটাত্তর সালে ছফা কাকা গান লেখায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি সর্বমোট একষট্টিটি গান লিখেছিলেন। তাঁর প্রথম গান ‘ঘর করলাম নারে আমি সংসার করলাম না/আউল বাউল ফকির সেজে আমি কোন ভেক নিলাম না।’ গানটি ফকির আলমগীরের কণ্ঠে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ফকির আলমগীর আরও দু’টি গান গেয়েছিলেন -‘দাঁড়ের ময়না কি সব কথা বলে/ বলতে আমি পারি নারে করি অনুভব/ পোষা পাখির কণ্ঠে কেন বনের কলরব’; আরেকটি ছিল ‘ঘরে পরে তফাৎ আমার কখন গেছে ঘুচে/তবু লোকে সকাল বিকাল ঘরের খবর খোঁজে।’ শুনতে পাই ফকির আলমগীর গানগুলো নিজের নামে প্রচার করেছিলেন। ফলে ছফা কাকা তাঁর বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠানোর চিন্তা করেছিলেন। ফকির আলমগীরের বিরুদ্ধে ছফা কাকার একটা নালিশ ছিল গানগুলোর সুর তাঁর পছন্দ হয়নি। অবশ্য তাঁর লেখায় তিনি স্বীকার করেছেন, ফকির আলমগীর গানগুলো গেয়ে উপকার করেছেন, তাঁকে পরিচিত করেছেন।

ঊনিশ শ’ সাতাত্তর সালে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ নামক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। তার আগে বইটি দুই কিস্তিতে ‘দিগন্ত’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। বইটি সম্পর্কে মোরশেদ শফিউল হাসান এবং সোহরাব হাসান সম্পাদিত ‘আহমদ ছফা স্মারক গ্রন্থে’ উল্লেখ পাওয়া যায়:

“[এই বছর] ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ নামক প্রবন্ধ রচনা। প্রবন্ধটি প্রথমে কলিমদাদ খান সম্পাদিত ‘দিগন্ত’ পত্রিকায় দু’ কিস্তিতে ও পরে একই প্রকাশকের উদ্যোগে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। পুস্তক প্রকাশ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। সেনাবাহিনীর লোকেরা অনুষ্ঠানে বিক্রি ও বিতরণের জন্য আনীত বইগুলোও ছিনিয়ে নিয়ে যায়।” (ছফা স্মা., পৃ. ৪৭৫)

একই বছর ছফা কাকার আরও দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। একটির নাম ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, অপরটি ‘গো-হাকিম’। শিল্পী এস এম সুলতানের ‘নিসর্গ ও মানুষ’ চিত্রাবলির প্রদর্শনী দেখে কাকা এ কাব্যগ্রন্থটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এই কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন:

“এই কাব্য-তরুটির অঙ্কুরণ মঞ্জুরণে একাধিক যোগাযোগ বর্তমান। প্রকাশ না করলে স্বস্তি পাব না বলেই কথা ক’টি বিবৃত করছি। আমাদের দেশের অনন্য চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতানের ‘নিসর্গ ও মানুষ’ চিত্রাবলির প্রদর্শনী দেখে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হই। সেই সময়ে আমার মনে হয়েছিল এই চিত্রসমূহের চাইতে সুন্দর এবং প্রাণসমৃদ্ধ কোন বস্তু কোথাও দেখিনি। আর শিল্পীকে মনে হয়েছিল ইউরোপের রেনেসাঁ চিত্রকরদের মত এক দেদীপ্যমান এক পুরুষ। বলা বাহুল্য, এই দুই বোধ অধ্যাবধি আমার মনে সক্রিয়। এই প্রাণসুন্দর শিল্পী প্রকৃতি এবং প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত সবকিছু তুলির টানে এমন প্রাণবান করে সৃজন করেছেন যে, তার রেশ আমার মনের ভেতর একটা গভীর ও দীর্ঘকালস্থায়ী দোলার সঞ্চার করে। একটা আবেগ আমার মধ্যে জন্মলাভ করে নিরুদ্ধ আক্রোশে গর্জাতে থাকে অনেকদিন। চিত্তের এই শান্তিনাশা বস্তুটিকে নিয়ে কি করব দীর্ঘদিন মনস্থির করতে পারিনি। মাসখানেক যেতে না যেতেই অনুভব করলাম স্বগ্রামের শৈশবের বুড়ো বটগাছটি উন্মথিত আবেগরাশি একটু একটু পান করে বুকের ভেতর শেকড় ছড়াচ্ছে, ডালপালা বিস্তার করছে। এই প্রবীণ তরুও সম্ভ্রম বিনষ্ট করব এই আশঙ্কায় তখনও তার ছন্দিত প্রকাশ ঘটাতে সাহসী হইনি। সেই সময়ে আমি জার্মান কবি গ্যোতের অমর কাব্যনাটক ‘ফাউস্টে’র বাংলা অনুবাদে রত ছিলাম। এই অনুবাদ করার কালেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে সে বস্তুর, যার প্রাসাদে পঙ্গুও গিরি লংঘন করতে সাহসী হয়, গুণবানজন যার নাম রেখেছেন ‘প্রেরণা’। (ছফা, খ. ১, পৃ. ৪৮৯)

ঊনিশ শ’ ঊনাশি সালে ‘বুক সোসাইটি’ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর ইতিহাস গ্রন্থ ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’। এই বইটির প্রথম নামকরণ করা হয়েছিল ‘মহাজাগরণ’। এটি লিখে তিনি ইতিহাসবোদ্ধাদের দৃষ্টি তাঁর দিকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং ইতিহাস পরিষদ পুরস্কারও তিনি লাভ করেছিলেন। বইটি লিখে প্রথমদিকে তিনি এক রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সংশয় ছিল অল্প বয়সী একজন লেখকের এত বড় একটি বই পাঠকসমাজ সহজভাবে গ্রহণ করবেন কিনা। ফলে বইটি রচনার দায় চাপিয়েছেন তিনি বয়সের ওপর। স্বীকারোক্তিতে তিনি লিখেছেন:

“আমার যৌবনধর্মের অপরাধের প্রমাণ এই গ্রন্থ। বিএ পরীক্ষা দেয়ার পর পরই এ গ্রন্থ লিখতে প্রবৃত্ত হই এবং শেষ করতে একটানা দু’ বছর লেগে যায়। আমাদের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক শ্রী সত্যেন সেনের ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’ পড়ার পর এই বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখার আকাঙ্ক্ষা মনে প্রথম জাগ্রত হয়। তার আগে মরহুম আরিফ চৌধুরী সাহেব বারবার এ বিষয়ে আমাকে কিছু লিখতে উপদেশ দেন। সে যাক, সত্যেনবাবুর অনুপ্রেরণায় আমার আকাঙ্ক্ষাটিকে কাজে রূপ দেয়ার পাকা সংকল্প গ্রহণ করি।… সে সময়ে এই গ্রন্থের নামকরণ করেছিলাম ‘মহাজাগরণ’। (ছফা, খ. ৪, পৃ, ২৮৩)

‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’ ছাপার প্রাক্কালে পাণ্ডুলিপিটি ‘বুক সোসাইটি’র সত্ত্বাধিকারী কামাল সাহেবের কাছে বেচে দিতে হয়েছিল। পাণ্ডুলিপি বিক্রি করার পুরো টাকাটা তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার আবু যায়েদ শিকদারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কাকা জানতে পেরেছিলেন, রেজিস্টার সাহেব মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে যে পরিমাণ টাকার দরকার তা তিনি যোগাড় করতে পারছিলেন না। ডক্টর নাজমা শাহীনের সাক্ষ্য:

“১৯৭৯ সাল। আমি তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমার পছন্দের ও ভালবাসার ছেলেটির সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারটি যখন সবার সক্রিয় চেষ্টায় বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছেÑ সে সময়ের ঘটনা। …কী করে যেন আহমদ ছফা জেনে যান। তিনি সোজা বাংলাবাজারে গিয়ে কামাল সাহেবের কাছে বিক্রি করে দিলেন তাঁর রচিত ‘সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাস’-র পাণ্ডুলিপিটা, যেটা তিনি বাংলা একাডেমি থেকে ছাপাতে খুব আগ্রহী ছিলেন। অথচ সে স্বপ্নটুকু বিসর্জন দিয়ে অবলীলায় পাণ্ডুলিপি বিক্রির সব কটা টাকা আমার বাবাকে ধার দিতে এসেছিলেন। বাবা খুব অস্বস্তিতে পড়েছিলেন, আমার গ্লানিবোধ হচ্ছিল। কিন্তু ছফা ভাই পরিবারের একজনের মতই আমাদের টানাপোড়েন ভাগ করে নিয়ে অনেক বেশি তৃপ্ত ছিলেন।

এমন সহমর্মিতা আর এমন বন্ধুত্ব জনাব আহমদ ছফার পক্ষেই সম্ভব ছিল। কিন্তু যখন উনি ইতিহাস পরিষদ থেকে এই বইটির জন্য পদক পেলেন, তখন একদিন সন্ধ্যায় ছফা ভাই ছুটে এলেন বাসায় এবং বললেন, বেবী সাহেব, তোমার ভাগ্যে আমি এই পদক পেয়েছি। অনাবিল তৃপ্তির হাসিতে ওঁর সমস্ত চেহারা উদ্ভাসিত হয়েছিল – কারণ আমি তো এখনই এই বই ছাপতাম না যদি না তোমার বিয়েতে টাকার দরকার হত। যখন ছফা ভাই সিলেটে পদক আনতে গিয়েছিলেন, ফেরার সময় খুব যত্ন করে আমার জন্য একটি শীতল পাটি নিয়ে এসেছিলেন আমার পুরস্কার হিসেবে। আমার মা সেই শীতল পাটিটা বিগত তেইশ বছর ধরে পুরস্কারের ক্রেস্টের মতই আগলে রেখেছেন।” (ছফা, স্মা., পৃ. ১৭২)

ঊনিশ শ’ আশি সালে কাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাঁটাবন বস্তিতে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আন্তন ম্যাকারেঙ্কোর ‘রোড টু লাইফ’ বইটি পাঠ করে তিনি এই বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এই স্কুল সম্পর্কে ছফা কাকা ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ গ্রন্থে মোটামুটি একটা ধারণা দিয়েছেন। কিভাবে স্কুলটি প্রতিষ্ঠার চিন্তা মাথায় এসেছিল সে সম্পর্কে ছফা কাকা লিখেছেন:

“সেই সময়ে আমি আন্তন ম্যাকারেঙ্কোর ‘রোড টু লাইফ’ বইটি পড়ি। ম্যাকারেঙ্কো রুশ শিক্ষাবিদ। তিনি বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার টোকাই ভবঘুরে এবং অনাথ এতিমদের শিক্ষা দেয়ার একটি সুন্দর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। এই বইটা সেই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে লিখেছেন। বইটা পাঠ করার পর আমার শিরায় শিরায় চঞ্চলতা খেলে যেতে লাগল। জীবনের আরও এক সম্প্রসারিত রূপ প্রত্যক্ষ করে ধমনীতে রক্ত উজানে চলতে আরম্ভ করল।

ভাঙা-চোরা মানুষের শিশুর মধ্যেও মহামানবের অংকুর রয়েছে। মানুষ মাত্রই অমৃতের পুত্র একথা আগে কখনও এমন করে অনুভব করিনি। একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়াও হল। আমার চারপাশে এত শিশু। এত অযত্ন, এত অবহেলার মধ্যে তাদের জীবন কাটাতে হচ্ছে, এতদিন তাদের নিয়ে ভাববার অবকাশও হয়নি। একটা অপরাধবোধ পাথরের মত মনের ভেতর চেপে রইল। আমি এই শিশুদের প্রতি আমার কর্তব্য পালন করিনি। আমার মনুষ্যজন্ম বিফল হয়ে যাচ্ছে। এই শিশুদের জন্য কী করতে পারি, এই চিন্তার মধ্যে এতদূর মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি ক্ষেতের চারাগাছগুলোর প্রতি যত্ন করার কথাও ভুলে গিয়েছিলাম।

একদিন এরই মধ্যে মোস্তান এলেন। আমি তাঁকে বইটি পড়তে দিলাম। পরের দিন ভোর না হতেই দুয়ারে ঠকঠকানি শুনলাম। দরজা খুলে দেখি মোস্তান। তাঁর চুলগুলো উস্কখুস্ক। বুঝলাম বাসি মুখেই তিনি চলে এসেছেন। চেয়ারে বসতেই বললেন, সারারাত জেগে বইটা পড়ে শেষ করে আপনার কাছে ছুটে এলাম। আবেগে তাঁর কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসছে, চোখের পাতা কাঁপছে। আমি আল্লাহতায়ালাকে ধন্যবাদ দিলাম। একজন মানুষ আমি পেয়ে গেলাম, যিনি আমার ভাবনায় ভাবিত। এ তো এক সৌভাগ্যের ব্যাপার। সেই সকালে নাশতার টেবিলেই দুজনে মিলে আলোচনা করে ঠিক করলাম, হোস্টেলের পেছনে কাঁটাবন বস্তির শিশুদের জন্য একটা স্কুল করে আন্তন ম্যাকারেঙ্কোর আইডিয়াগুলো পরীক্ষা করে দেখব।” (ছফা, খ. ২, পৃ. ৪৫)

শুরু হয়ে গেল স্কুলের কাজ। স্কুলঘর তো ছিল না তাই মাঠে বসে বাচ্চাদের পড়ানো হত। বাচ্চারা ছিল ছড়ানো ছিটানো। কেউ কেউ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। কেউ কেউ ফাই-ফরমাশ খাটত। কেউ কেউ নিউ মার্কেটের মিনতির কাজ করত। কেউ কেউ পুলিশের খাবার নিয়ে যেত। কেউ কেউ ফেরি করে বেড়াত। এসকল বাচ্চাদের এক জায়গায় আনা চাট্টিখানি কথা নয়। নাজিম উদ্দীন মোস্তান মূলত বাচ্চাদের পড়াতেন। তাঁকে সাহায্য করতেন মুইনুর রেজা, আবু বকর সিদ্দিক ফণি। কিন্তু তাদের পাঠদান করা তত সহজ ছিল না। ছফা কাকার ভাষায়, মোষের শিং থেকে দুধ বের করা যত সহজ, ওসব বাচ্চাদের কাছ থেকে পড়া আদায় করা তত সহজ ছিল না।

এক সময় উদ্যোক্তা ছফা কাকা স্কুলঘরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। কিন্তু টাকা পাবেন কোথায়। মানুষের কাছে হাত পেতেও কোন কাজ হচ্ছিল না। কোরবানির চামড়ার টাকা সংগ্রহের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে ধন্না দিয়েছেন। অনেকে কথা দিলেও তাদের চামড়া বেচা টাকা মাদ্রাসা কিংবা এতিমখানায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। একজন মাত্র শিক্ষক কথা রেখেছিলেন তিনি চামড়া বেচা টাকা ছফা কাকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’-এ একটা সুযোগ হাতে এসে ধরা দিল। তাঁর বয়ান:

“একটা সুযোগ পাওয়া গেল। ইসলামিক ফাউন্ডেশন আমাকে ধরল সাতই মার্চ উপলক্ষে ‘ইসলামের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ’ এই শিরোনামে একটি বক্তৃতা দিতে হবে। আমি দাবি করলাম, ‘ইসলামের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ’ এ বিষয়ে বক্তৃতা দেব ঠিকই, কিন্তু আমার স্কুলঘর বানিয়ে দিতে হবে। ফাউন্ডেশনের সব টাকা মাদ্রাসা আর মসজিদ খেয়ে ফেলবে এটা তো কাজের কথা নয়। এই বাচ্চাদেরও তো একটা হক আছে। কর্তাব্যক্তিরা গাঁইগুঁই করতে থাকলেন। বললেন, স্কুলে অনুদান দেয়ার আমাদের নিয়ম নেই। আমি বললাম, নিয়ম নেই ভাল কথা, নতুন নিয়ম বানান। আপনাদের ফাউন্ডেশনে তো লেখক-সাহিত্যিক কেউ যান না, আমি তো নিয়ম ভেঙ্গে আপনাদের ওখানে যেতে রাজি হয়েছি। এবার চিঁড়ে একটুখানি ভিজল মনে হল। ডিরেক্টর ইয়াহিয়া সাহেব পথ একটা বাতলে দিলেন। হাঁ, দশ হাজার টাকা আপনাদের দেয়া যেতে পারে। আপনি একটা দরখাস্ত করুন এবং লিখুন যে কোরান শিক্ষা দেয়ার জন্য আপনি একটা মক্তব বানাতে যাচ্ছেন। আমাদের তখন অনুদান দিতে আপত্তি থাকবে না। আমি বললাম, আমার ঘর হলেই হল, দরখাস্তে যা লিখতে বলবেন, লিখে দেব।

আমি যখন বললাম ‘ইসলামের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ’ এই শিরোনামে বক্তৃতা দেয়ার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যাচ্ছি বন্ধু-বান্ধবেরা ছি-ছি করতে লাগলেন। ফোর্ড কিংবা রকফেলার ফাউন্ডেশনে যদি যেতাম সকলে মিলে আমার নামে ধন্যধ্বনি উচ্চারণ করত। আমি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে এক ঘণ্টা বক বক করে এলাম। সুখের কথা এই যে, আমার ওই বক্তৃতার কারণে বাংলাদেশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যায়নি।” (ছফা, খ. ২, পৃ. ৪৯)

ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে দশ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। ওই টাকাতে স্কুলঘর তৈরি করতে বেগ পেতে হল না। তখন স্কুলটিতে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হত। কিন্তু উদ্যোগটি বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। চুরাশি সালের দিকে কাঁটাবন বস্তি উচ্ছেদের সময় স্কুলটিরও একই পরিণতি ভোগ করতে হয়। তাছাড়া সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও স্কুলটিকে সন্দেহের চোখে দেখছিল। সরকারের অসহযোগিতার কারণে একটি ভাল উদ্যোগ অল্পদিনের ব্যবধানে বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

ঊনিশ শ’ ছিয়ান্নব্বই সালে ছফা কাকা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠায় আবার উদ্যোগী হন। এবার স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলায়। শাহবাগে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে এরকম চিন্তা -চেতনা তাঁর কখনও ছিল না। ওই সময় তিনি আজিজ মার্কেটের দোতলার একটি ঘরে বসতেন। কেবল বসার জন্য বসা। কাজ বলতে ছিল বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দেয়া। হঠাৎ একদিন তাঁর মাথায় পুরনো চিন্তা মাথাচারা দিয়ে উঠে। তিনি দেখতে পান মার্কেটের এখানে সেখানে নানা বয়সের ছেলেমেয়েদের ঘুরে বেড়াতে। তিনি মনে মনে ঠিক করে ফেললেন তাদের এক জায়গায় এনে লেখাপড়া শেখাবেন। অর্থাৎ স্কুল প্রতিষ্ঠা। কিন্তু একটা স্কুলের জন্য যা যা দরকার তার কোনটাই ছিল না। রত্নেশ্বর দেবনাথ নামের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাকার সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন। তাকে বলে দেয়া হল, আশেপাশে ভাসমান যত ছেলেমেয়ে আছে সকলকে ধরে নিয়ে এস। তাদের মা-বাবাকে বোঝাও আমরা এখানে একটা স্কুল করব। আমরা তাদের বাচ্চাদের পড়াতে চাই। রত্নেশ্বর ছাত্র সংগ্রহে লেগে গেলেন। অল্প ক’দিনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল স্কুল। স্কুলের নাম রাখা হয়েছিল ‘শিল্পী সুলতান পাঠশালা’। মেঝেতে হোগলা বিছিয়ে শিক্ষার্থীদের বসতে দেয়া হত। তারপর মোড়ার ওপর। বই খাতা কলম সবই কাকা সরবরাহ করতেন। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক ছাত্রছাত্রী হয়ে গেল। শিক্ষক হিসেবে যারা ছিলেন বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমিও অনেকদিন পড়িয়েছি। শিক্ষকদের তখন তেমন বেতন দেয়া হত না। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সকলে কাজ করতেন। কাকার তো তেমন টাকা পয়সা ছিল না। নানাজনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে এ স্কুলটি পরিচালনা করতেন। ওই সময় ‘শিল্পী সুলতান ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক ছিলেন আজিজুল হক, হোসেন জিল্লুর রহমান এবং আহমদ ছফা স্বয়ং। ওবেইদ জায়গীরদার, কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী, ইয়াহিয়া খান, আবদুল হক, ফরহাদ মজহার, লামিয়া করিম, রায়হানা হোসেন, শিবনারায়ণ দাস, আবদুল আজিজ, অধ্যক্ষ গিয়াসউদ্দিন এবং রুহি দাশ ছিলেন এই ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা। এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বস্তির অবহেলিত শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা, ‘উত্থানপর্ব’ নামাঙ্কিত একটি মানসম্পন্ন ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ এবং বেকার ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ সময় রুহিদাস এবং জামাল উদ্দিন প্রমুখ মিলে ‘বাস্তব’ নামের একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্যোগের পেছনে ছফা কাকা নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে বাস্তব-এর মাধ্যমে জার্মানির ‘নেটস’ নামক একটি এনজিও সংস্থা শিল্পী সুলতান পাঠশালার ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ সহায়তা প্রদান করে। বাস্তবের কল্যাণে জার্মানির এনজিও সংস্থাটি অধ্যাবধি অর্থসহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।

শাহবাগের আজিজ মার্কেটে একটি মাত্র ঘরে স্কুলের শিক্ষা কাযক্রম পরিচালিত হত। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবার কারণে স্কুলটি সরিয়ে বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাশের বাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়। বিজিএসের সঙ্গে জড়িত থাকাকালীন ছফা কাকা এক সময় এই বাড়িটিতে থাকতেন। স্কুলটি যখন বাংলামটরে সরিয়ে আনা হয় তিনি রত্নেশ্বর দেবনাথ ওরফে রতন বাঙালিকে ওই বাড়ির একটি ঘরে তাঁর অফিস সাজানোর কথা বলেছিলেন। রতন বাঙালি তখন শিল্পী সুলতান পাঠশালার প্রধান শিক্ষক। তিনি ছফা কাকাকে কোন রকম পাত্তা না দিয়ে ওই ঘরে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে নিজে বসে পড়েন। ছফা কাকা এতে করে ভীষণ রকম মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন। এই ঘটনার পর ছফা কাকা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনদিন আর শিল্পী সুলতান পাঠশালায় যাননি। রতন বাঙালির আস্পর্দা এত বেড়ে গিয়েছিল যে ছফা কাকাকে ছেঁড়া কাগজে লিখে স্কুলের ছাত্রদের মাধ্যমে নানা রকম নির্দেশ পাঠাতেন। রতনের উৎপাত তিনি নীরবে সহ্য করতেন। এই ব্যাপারে তিনি কোনদিন কাউকে কিছু বলেছেন বলে মনে পড়ে না। কেউ রতনের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি হাসতেন। ফারজানাকে লেখা এক চিঠিতে রতন বাঙালিকে নিয়ে তিনি কিছু মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন:

“ডাক্তার সাহেবেরা যদি চলাফেরা করার একটু স্বাধীনতা দিতেন ‘উত্থানপর্ব’ বের করে ফেলতাম। সব তৈরি, একমাত্র বাধা রত্নেশ্বর। তার মনের ভেতরটা ভীষণ কালো। সে মন থেকে চায় না স্কুল এবং পত্রিকাটা বেঁচে থাকুক। সব সময় একটা না একটা গোলমাল আঁটছে। আমার সমস্যা হল যখন কেউ ছিল না এই ছেলেটি একাকী আমার সঙ্গে স্কুলটি গড়তে, কাজ করতে রাজি হয়েছে। অধর্ম করতে আমার বাধে, তবু আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, অন্য কোথাও তার কাজ স্থির করে দেব। স্কুলে এবং কাগজে তাকে রাখব না। স্কুলটা মেয়ে দুটো খুবই ভাল চালাচ্ছে। দুর্ভাগ্য হল রতন ভয়ানক একরোখা এবং মহিলাদের শ্রদ্ধা করে না। তার ভেতরে কোন সুন্দর কল্পনাশক্তি কাজ করে না।” (ছফা, চি., পৃ. ২১০)

ছফা কাকা মারা যাবার পর অর্থকষ্টে পড়ে স্কুলটি সাময়িক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে স্কুলটি যখন পুনরায় চালু করা হয় স্কুল কমিটি রতন বাঙালিকে বাদ করে দেন। ওই সময় স্কুলটির নামকরণ করা হয় ‘সুলতান-ছফা পাঠশালা’। ছফা কাকার মৃত্যুর আগে থেকে ডক্টর হোসেন জিল্লুর রহমান এই স্কুলের কার্যকরী কমিটির সভাপতি ছিলেন। দুই হাজার আট সালে ডক্টর জিল্লুর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলে তিনি এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনাব আবদুল হক। সহসভাপতি হিসেবে আছেন ডক্টর আহমেদ কামাল। আমি সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ডাক্তার কাজী কামরুজ্জামান, ডক্টর চিন্ময় হাওলাদার, মিসেস সুলতানা রেবু এই কমিটি সদস্য। উন্নয়ন সংস্থা বাস্তব-এর জনাব জামাল উদ্দিন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে আছেন। স্কুলঘরটি বর্তমানে সোনার গাঁ রোডে অবস্থিত।

একাশি সালে ছফা কাকার বিখ্যাত প্রবন্ধের বই ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশিত হলে পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগে এবং তাঁর লেখকখ্যাতি অনেকগুণে বেড়ে যায়। এইটি প্রকাশের উত্তরকালে তিনি এক শ্রেণীর মানুষের বিরাগভাজন হয়েছিলেন এবং সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছিলেন। একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে তাঁকে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটি লিখতে হয়েছিল। এই বইয়ের উত্তর ভূমিকায় তিনি ঘটনাটি বিবৃতও করেছেন। তিনি লিখেছেন:

“এই গ্রন্থের নাম-প্রবন্ধটি লেখার পেছনে সামান্য ইতিহাস আছে। তখন জিয়াউর রহমানের রাজত্বকাল। অধ্যাপক আবুল ফজল তাঁর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা। আবুল ফজল সাহেবের সঙ্গে আমার বিলক্ষণ পরিচয় ছিল এবং তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। আমার গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধের উপর তিন তিনটে প্রবন্ধ লিখেছেন। লেখক জীবনে আবুল ফজল সাহেবের কাছে আমি অনেক পরিমাণে ঋণী। তিনি আমার মত অনেক তরুণেরই প্রেরণার উৎস ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির পূজারী এবং ঘোষিতভাবে নাস্তিক। যেহেতু ফজল সাহেব নাস্তিকতা প্রচার করতেন, প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ লোকেরা তাঁকে ভীষণ খারাপ চোখে দেখত এবং প্রায়ই তাঁকে গালাগাল করা হত।

একদিন সকালবেলা আমি প্রাতঃভ্রমণ করতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছি। খুব অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, সকালবেলা আবুল ফজল সাহেব মোটাতাজা উঁচা-লম্বা ফর্সামতন এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছেন। তাঁর মাথায় একটা গোল টুপি। আবুল ফজল সাহেবের মাথায় গোল টুপি দেখে আমি ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলাম। সালাম করে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, এত সকালে কোথায় যাচ্ছেন? তিনি জানালেন সিরাত মাহফিলে যোগ দেবেন বলে বেরিয়েছেন। তাঁর সঙ্গের মানুষটির পরিচয়ও আমি পরে জানতে পেরেছি। তিনি ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের আকাশ সেনা প্রধান জনাব এম এ জি তাওয়াব। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণে এই ভদ্রলোক জিয়াউর রহমানকে অনেকবার বেকায়দায় ফেলেন। শেষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়া তাওয়াব সাহেবকে তার শ্বশুরের দেশ জার্মানিতে চলে যেতে বাধ্য করেন।

আমি আবুল ফজল সাহেবকে টুপি পরে সিরাত মাহফিলে যোগ দিতে যাওয়ার ঘোষণা শুনে মনে মনে একটা চোট পেয়ে গেলাম। এই ঘোষিতভাবে নাস্তিক ভদ্রলোকটি আজকে ক্ষমতার স্বাদ পেতে না পেতে নিজেকে প্রচণ্ড ধার্মিক বলে পরিচয় দিতে চাইছেন। এরকম কাণ্ড কি করে ঘটে সেটা আমাকে ভয়ানক রকম চিন্তিত এবং উতলা করে তোলে।
অনেক নাস্তিক শেষ পর্যন্ত আস্তিকে পরিণত হয়েছে এরকম ভুরি ভুরি লোকের নাম আমি জানি। কিন্তু আবুল ফজল সাহেবের মত লোক যিনি সারাজীবন নাস্তিকতার পুরোহিতের ভূমিকা পালন করে গেছেন, তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি আসতে না আসতেই কোন রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না দিয়েই একটি ভিন্ন পরিচয়ে নিজেকে চিহিত করতে তৎপর হয়ে উঠলেন, সেটাই আমাকে সবচাইতে বিস্মিত করেছে।

এই যে পরিচয় পাল্টে ফেলা তার পেছনে আমার মনে হয়েছিল একগুচ্ছ সামাজিক কারণ বর্তমান। আবুল ফজল সাহেব উপলক্ষ মাত্র, কারণ নন। বাঙালি মুসলমান সমাজের ভেতরে এমন কিছু ব্যাপার-স্যাপার আছে যেগুলো ব্যক্তিকে কোন বিশ্বাসের বিন্দুতে স্থির থাকতে দেয় না। ডানে কিংবা বাঁয়ে হেলতে বাধ্য করে। মনের এই উত্তেজিত অবস্থাতে আমি একরাতে একটুও না থেমে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ রচনাটি লিখে ফেলি।” (ছফা, খ. ১, পৃ. ৮২)

আমি বলেছি এ লেখাটি লিখে কাকাকে নানাজনের বিরাগভাজন হতে হয়েছিল। কারা এ কর্মে জড়িত ছিলেন সেইসব কথা বলার অবকাশ এ লেখায় রয়েছে। তবে নিজের কথায় নয়, শোনা যাক ছফা কাকার কথায়। তিনি লিখেছেন:

“‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এই গ্রন্থের পক্ষে বিপক্ষে নানাব্যক্তি অভিমত ব্যক্ত করতে থাকেন। আমার এই রচনার বিরূপ প্রতিক্রিয়াসমূহের মধ্যে থেকে কয়েকটি কথা আমি তুলে ধরতে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক (ভূতপূর্ব সভাপতি, প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি) আবুল কালাম আজাদ জনাব অলি আহাদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় অন্যূন ছয় মাস ধরে আমার লেখা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধটির বিরুদ্ধে একটানা লিখে যেতে থাকেন। এই হ্রস্বকায় করিতকর্মা অধ্যাপককে যিনি জানেন, অবশ্যই একমত হবেন, তার প্রতিশোধ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা কী রকম ভয়ংকর হতে পারে। আজাদ সাহেব ইত্তেহাদ পত্রিকায় নিবন্ধসমূহ লিখে নিবৃত্ত হতেন না, তাঁর নিবন্ধ সংবলিত পত্রিকাটি প্রতি সপ্তাহে আমার দরজার তলা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে যেতেন। আমি তখন থাকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে এবং তিনি থাকতেন আমার পেছনে শিক্ষকদের কোয়াটার্সে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আজাদ সাহেব ভাল-মন্দ যা-ই লিখুন না কেন, আমি কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করব না। কারণ আমি আবুল কালাম আজাদ সাহেবের কৌশলটা আঁচ করতে পেরেছিলাম। তিনি তার লেখাগুলো পাঠ করিয়ে আমাকে খেপিয়ে তুলতে চাইছিলেন। আমি ঠিক করেছিলাম তার ফাঁদে আমি কিছুতেই পা দেব না। তাই দরজা খুলে যখন দেখতাম একটা ইত্তেহাদ পত্রিকা মেঝের ওপর শুয়ে আছে, আমি কাল বিলম্ব না করে সেটা জ্বালিয়ে ফেলতাম। তারপর আবুল কালাম আজাদ সাহেব একটা ভিন্ন পথ ধরলেন। ইত্তেহাদের প্রকাশিত নিবন্ধগুলো দিয়ে তিনি একটা পুস্তিকা প্রকাশ করলেন এবং সেই পুস্তিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিতরণ করে এলেন। কিন্তু শিক্ষকেরা কেউ উচ্চবাচ্য করলেন না। এই ছোট মানুষটি মোটেই দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি এক শুক্রবার স্বরচিত পুস্তিকাটি হাতে করে কাঁটাবন মসজিদে এলেন। নামায শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের কাছে নিবেদন করলেন, আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানদের হিন্দুদের জারজ সন্তান বলেছে। সুতরাং তার একটা বিহিত হওয়া দরকার। আমার ধারণা, মুসল্লি সাহেবরা আবুল কালাম সাহেবের চরিত্র জানতেন, তাই তাঁরা চেতে ওঠার বিশেষ প্রয়োজন অনুভব করেননি।

এভাবে তো আবুল কালাম আজাদ পর্ব ছুটল। এরপর আক্রমণ এল সম্পূর্ণ ভিন্নদিক থেকে। ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় আমাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে পর পর দু’ সংখ্যায় একটি লেখা প্রকাশিত হল। এক ভদ্রলোক ছদ্মনামে এ রচনাটি প্রকাশ করেছেন। পরে আমি এ ভদ্রলোকটির নাম-পরিচয়ও উদ্ধার করতে পেরেছি। তিনি ছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব উপাচার্য এবং পরবর্তীকালে জিয়া সরকারের একজন মন্ত্রী। যতই নিন্দে সমালোচনা হোক তথাপি লেখাটির মধ্যে একটা শক্তি ছিল যা আমাদের দেশে প্রধান এবং খ্যাতনামা গদ্য লেখকদেরও প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

আমি যে যুক্তি-শৃঙ্খলা প্রয়োগ করে বাঙালি মুসলমানের মানসজীবন বিশ্লেষণ করার প্রয়াস নিয়েছিলাম আমার সেই চিন্তন-পদ্ধতিটি অনেকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু আমার প্রতি সামান্যতম ঋণের কথা উল্লেখ করলে তাদের সম্মানহানি ঘটে সেজন্য আমার নামটি একেবারেই উল্লেখ করেননি। (ছফা, খ. ১, পৃ. ৮২)

একই সময়ে লিবিয়ার সঙ্গে কাকার একটা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি লিবিয়ার হয়ে ‘গ্রীনবুক’ নামের পকেট বুক সাইজের একটি ছোট্ট বই অনুবাদ করেছিলেন। ওই বইটির বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশেও তিনি যত্নবান হয়েছিলেন। সেই সুবাদে হোক কিংবা অন্য সূত্রে হোক ওই সময় তিনি লিবিয়ার কাছ থেকে কিছু অর্থকড়ি লাভ করেছিলেন। কিন্তু লিবিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ব্যাপারটি অনেকে ভাল চোখে দেখেনি, যেই কারণে একটা বিতর্কের জন্মও তাঁকে দিতে হয়েছিল। তবে ছফা কাকা ওসব খুব একটা গায়ে মেখেছেন বলে মনে হয় না। তিনি এটাকে কখনও দোষের ব্যাপার হিসেবেও দেখেননি। একবার তিনি লিবিয়ার যাবার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। সব কিছু ঠিকঠাকও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর যাওয়া হয়নি। বিরাশি সালের পাঁচ মে আমাকে লেখা তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন:

“হঠাৎ করে এ মাসের ৩১ তারিখ রাত বারটার প্লেনে আফ্রিকা মহাদেশের লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলী শহরে আমাকে যেতে হচ্ছে। …ত্রিপলী ভূমধ্যসাগরের তীরের একটি বন্দর। কর্নেল মোয়াম্মার আল গাদ্দাফী হচ্ছেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট। আমি তাঁর ওপর ইংরেজিতে একটি বই লিখছি। দাওয়াত পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে যাচ্ছি।” (ছফা, চি. পৃ.৩২)

কিন্তু লিবিয়া যাওয়া তাঁর হয়ে উঠেনি। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, সরকার তাঁর লিবিয়া যাওয়ার বিষয়টি ভাল চোখে দেখেনি। তারা তাঁর কাগজপত্র আটকে দিয়েছিল।
বিরাশি সালে ডক্টর এমাজউদ্দীন আহমদ, সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মোস্তান প্রমুখকে নিয়ে ‘নতুন সমাজ ট্রাস্ট’ গঠন করেন। ওই সময় ‘গণকন্ঠ’ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ‘সাপ্তাহিক উত্তরণ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং পাশাপাশি ‘সম্ভাবনা মুদ্রায়ন’ নামে একটি প্রেসও বসানো হয়। তাছাড়া ‘সম্ভাবনা’ নামে একটি সাহিত্য-পত্রিকাও বের করার সুযোগ এখান থেকে হয়েছিল। খুব সম্ভব লিবিয়া থেকে তিনি কিছু টাকা পয়সা পেয়েছিলেন। সেই টাকাটা তিনি এই পত্রিকা এবং প্রকাশনার পেছনে ব্যয় করেছিলেন। এই সম্পর্কে মোরশেদ শফিউল হাসানের লেখায় কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:

‘গণকন্ঠ’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রেসসহ ‘উত্তরণ’ নামে একটি পুরনো সাপ্তাহিক কিনে ছফা ভাই তা পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ নেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘গণকন্ঠ’ থেকেও দু’একজন সাংবাদিক-কর্মচারীকে তিনি তাতে নিয়ে আসেন। আমি মাসিক পনের শো টাকা বেতনে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই। এছাড়া পত্রিকার পরিচালনা পরিষদের মধ্যে আরও ছিলেন ড. এমাজউদ্দিন আহমদ, সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তান প্রমুখ। এ সময় পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি প্রেসের জন্য লিবীয় দূতাবাসের প্রকাশনা সংক্রান্ত কিছু অর্থকরী কাজও ছফা ভাই যোগাড় করতে সমর্থ হন। প্রায় একই সময়ে ড. এমাজুদ্দিন ও ছফা ভাইয়ের উদ্যোগে ত্রিপোলীতে ‘গ্রিনবুক’ সংক্রান্ত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়। ‘উত্তরণ’ থেকে রফিক ইসলাম এই প্রতিনিধিদলের অন্তর্ভুক্ত হন।” (ছফা ভাই: আমার দেখা আমার চেনা, পৃ. ২২)

একটানা ক’বছর চলার পর ‘উত্তরণ’ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অর্থকড়ির টানাটানিই ছিল এর প্রধান কারণ। পত্রিকাটি বিজ্ঞাপন নির্ভর হতে পারেনি। তাছাড়া পত্রিকার তেমন কাটতিও ছিল না, যার অর্থ দিয়ে পত্রিকাটি মোটামুটি টেনে নিয়ে নেয়া যায়। ‘উত্তরণ’ বন্ধ হয়ে গেলেও আটাশিতে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়। শুনতে পাই কাজী আকরাম হোসেন হাল ধরার কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। দিলওয়ার হোসেনের লেখায় দেখতে পাই :

“সম্ভবত ৮৭ সালে ‘উত্তরণে’র প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার কাজী আকরাম হোসেনের ব্যবস্থাপনায় আবার ’৮৮তে ‘উত্তরণ’ বের হয়। আকরাম ভাই প্রকাশক ও সম্পাদক, ছফা ভাই প্রধান সম্পাদক। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, ড. মফিজ চৌধুরী আর এম. আজিজুল হকের নাম ছাপা হত উপদেষ্টা হিসেবে। টাকা-পয়সার খুব টানাটানি – আকরাম ভাই তাঁর ভাইদের কাছ থেকে অনেক টাকা অন্য ব্যবসার কথা বলে এনে ‘উত্তরণে’ ব্যয় করেছেন – এমন কি তাঁর শিশুকন্যার দুধের টাকা দিয়েও উত্তরণের খরচ মিটিয়েছেন। আমি ‘উত্তরণে’র এ পর্যায়ে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলাম। ছফা ভাই পণ করেছেন ‘উত্তরণ’ দাঁড় করাবেনই। তাই নিজের প্রয়োজনে টাকা পয়সার কথা বলতেন না। মিরপুর থেকে যাওয়া-আসার খরচ বেশি বলে চট্টগ্রাম ভবনে উত্তরণ অফিসেই থাকতে শুরু করেন। এ সময় তিনি খুব অসুস্থ। পাইলস-এর যন্ত্রণা – প্রায়ই জ্বর। কিন্তু খরচের কথা ভেবে চিকিৎসার কথা বলেন না। তাঁর বন্ধু ডা. তপন চক্রবর্তী বিনা পয়সায় হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে যান। ছফা ভাই বিজ্ঞাপনের মতো, যে আসে তাঁর কাছেই ডা. তপন চক্রবর্তীর চিকিৎসার পারদর্শিতা প্রচার করতে থাকেন। তখন অবস্থা এমন যে, মাসে পাঁচ হাজার টাকা দিতেই আকরাম ভাইয়ের কষ্ট। এ টাকার অর্ধেকের বেশিই ছফা ভাইয়ের সিগারেটে খরচ হয়ে যায়। তারপর তাঁর হাঁটার অভ্যাস ছিল খুবই কম। তাই রিকশা ভাড়ায় খরচ হতো বেশ কিছু। ফলে মাঝে মাঝে তাঁর খাওয়া হতো না। আকরাম ভাই জানতে পেরে আরও কিছু টাকার ব্যবস্থা করলেন।” (ছফা, স্মা., পৃ. ১৮৪)

দ্বিতীয় দফায় ‘উত্তরণ’ যদ্দিন চলেছিল বলা যায় হামাগুড়ি দিয়ে চলার মত। তারপরেও বড় আকারে একটি ঈদ-সংখ্যা বের করা সম্ভব হয়েছিল। এই ঈদ-সংখ্যার জন্য ছফা কাকা ‘একজন আলী কেনানের উত্থানপতন’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। এটি তিনি নিজের হাতে লিখেননি। এর অনুলেখক ছিলেন দিলওয়ার হোসেন।

কাকার কোন কাজ কোন ঘটনার বিচ্ছিন্ন অংশ নয়। তাঁর প্রতিটি কাজ একটার সঙ্গে একটা সম্পর্কযুক্ত। একাশি সালের দিকে তিনি মাওলানা মোহাম্মদউল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের সঙ্গে পরিচিত হন। নির্বাচনে হাফেজ্জী হুজুর খেলাফত আন্দোলন থেকে জয়ী হলে কাকা তাঁর সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। একজন মাওলানা মানুষ নির্বাচনে জয়ী হওয়া তাঁর কাছে সেটি বড় আশ্চর্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি হুজুরের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য কামরাঙ্গির চরে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করেছিলেন। তখন তিনি সহচর হিসেবে পেয়েছিলেন সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মোস্তানকে। তাঁরা দুজন উদ্যোগী হয়ে কামরাঙ্গির চরে হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় বিভিন্ন ধারার রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিলেন। উল্লেখ্য যে মাওলানা হাফেজ্জী হুজুরও একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে ছফা কাকার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। হুজুরের এই পদার্পণে ছফা কাকা এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি তাঁকে পায়ে ধরে সালাম করেছিলেন।

ইসহাক ওবায়দী লিখেছেন:

“হাফেজ্জী হুজুরের উত্থানের সময় হুজুরের সাথেও কয়েকবার দেখা করতে গিয়েছিলেন। একবার তো হাফেজ্জী হুজুর স্বয়ং ছফা ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য মধুর ক্যান্টিনের পথ ধরে আন্তর্জাতিক হোস্টেলে গিয়ে উপস্থিত। ছফা ভাই শুনে প্রায় অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় দৌড়ে এলেন এবং কদমবুসি করলেন। আমাকে পরে বলেছেন যে, আমি তো অবাক হয়ে গিয়েছি যে, হাফেজ্জী হুজুরের মতো একজন আল্লাহর ওলি এই অধম গুনাহ্গারের কাছে এলেন!” (ছফা, স্মা., পৃ. ১৮৮)

ইসহাক ওবায়দী আরেক জায়গায় লিখেছেন:

“একবার দুই মেরুর দুই ‘জাতি’কে অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী ও আলেমসমাজকে একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করাবার উদ্দেশ্যে ‘ইনসানিয়াত সেন্টার বাংলাদেশে’র ব্যানারে তাঁর উদ্যোগে শিশু একাডেমিতে দুই বিপরীত সত্তার ব্যক্তিবর্গকে আলোচক হিসেবে উপস্থিত রেখে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন হাফেজ্জী হুজুর। ‘সাম্রাজ্যবাদ ও মুসলিম বিশ্ব’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন লিবিয়ান রাষ্ট্রদূত জনাব হাসান আল আইব, বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি জনাব কে. এম. সা’দউদ্দীন, প্রফেসর এমাজউদ্দীন ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা কমিউনিস্ট লীগের আবদুল মতিন সাহেব। কমিউনিস্ট আবদুল মতিন সাহেবকে কেন দাওয়াত করা হবে এ বিষয় নিয়ে লিবিয়ান রাষ্ট্রদূত আপত্তি করলে পর ছফা ভাই ভীষণ খেপে যান এবং বলেন, আমাদের সমাজ বিপ্লব কাকে নিয়ে কীভাবে করতে হবে তা আমরাই ভাল জানি, আপনি নন। আমাদের কাছে পয়সা নেই বলে আপনাদের মুসলমান ভাইদের পয়সা দিয়ে কাজগুলো করতে চাই। তাই বলে এ ব্যাপারে পলিসি আপনাদের হবে না, হবে আমাদের। রাষ্ট্রদূত ক্ষমা চেয়ে তখন থেমে যান।” (ছফা, স্মা., পৃ. ১৯০)

মোরশেদ শফিউল হাসান এবং সোহরাব হাসান সম্পাদিত ‘আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্ত্রে’র বরাতে জানা যায়, ছফা কাকা ঊনিশ শ’ বিরাশি সালে একুশে বইমেলায় তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে গঠিত লেখক-সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের ‘গণবিরোধী’ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেন। একুশের সকালে একাডেমির নির্ধারিত মঞ্চের পরিবর্তে বটতলায় ‘মুক্তিযুদ্ধের আত্মা’ শীর্ষক কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

ঊনিশ শ’ চুরাশি সালে ছফা কাকা দিল্লীতে ‘অল ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন’-এর একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই বছর তিনি মিরপুরে কিস্তিতে ছোটখাটো একটা ফ্ল্যাট বাড়ি কিনেন। জুলাইয়ের দিকে তিনি ওই বাড়িতে ওঠেন। আগস্টের দিকে আমিও তাঁর সঙ্গে থাকতে শুরু করি। তিনি এ বাড়ি থেকে প্রতিদিন বাসে চেপে তোপখানা রোডের ‘উত্তরণ’ অফিসে যাতায়াত করতেন। সকাল সাতটা আটটার দিকে তিনি অফিসে চলে যেতেন, রাত এগার বারটার দিকে বাসায় ফিরতেন। তখন তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থাও বিশেষ ভাল ছিল না। পয়সা-কড়ির টানাটানিও ছিল ভয়ানক রকম। এত কষ্টের মধ্যেও তিনি চা-সিগারেট ছাড়া কিছু বুঝতেন না। তখন দিনে কম করে হলেও দু’ প্যাকেট সিগারেট লাগত। পয়সার অভাবে দামি সিগারেট কেনা বাদ করে দিয়েছিলেন। বস (ইঙঝঝ) সিগারেট নামে নিম্নমানের সিগারেট টানতেন। প্যাকেটে বিশটা করে থাকত। প্রতি প্যাকেটের দাম ছিল আট কি দশ টাকা।

সিগারেটের ব্রান্ড পাল্টিয়ে তিনি কাঁশি বাঁধিয়ে ফেলেছিলেন। যতবার সিগারেট জ্বালাতেন আর বলতেন, সিগারেটটা ছাড়তে হবে। কাঁশির জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে একদিন আমাকে বললেন, পাঁচটা ফাইভ ফাইভ ফাইভ সিগারেট নিয়ে এস। এসব বাজে সিগারেট খেয়ে শরীর নষ্ট করার কোন মানে হয় না। আমি সিগারেট কিনে এনে তাঁর হাতে দিলাম। তিনি একটা সিগারেট ম্যাচের আগুনে জ্বালিয়ে নিয়ে বললেন, বাকিটা তোমার কাছে রাখ। দুই ঘণ্টা পর পর তুমি আমাকে একটা করে সিগারেট দেবে। কিন্তু আমি তোমার কাছে সিগারেট চাইতে থাকব। বারবার অনুরোধ করব। তারপরেও তুমি আমাকে সিগারেট দেবে না। আমি রাজি হলাম। কিন্তু আমি তাঁর কথা রাখতে পারিনি। তিনি আধা ঘণ্টা পরে বলে বসলেন, বাবা, আমাকে একটা সিগারেট দাও, আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে আপনার নিষেধ আছে। আপনি অনুরোধ করলেও আমি সিগারেট দিতে পারব না। এক পর্যায়ে তিনি বলে বসলেন, আমি তোমার পায়ে ধরি তুমি আমাকে একটা সিগারেট দাও। এর পরে চাইলে তুমি দিও না। শেষ পর্যন্ত আমি তাঁকে সিগারেট দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। এভাবে কাকুতি মিনতি করে করে দু’ ঘণ্টার মাথায় তিনি সব সিগারেট শেষ করে ফেললেন। তারপরে যখন সিগারেট চাইতে এলেন আমি বললাম, সিগারেট আর অবশিষ্ট নেই। তিনি আমার ওপর ভয়ানক রকম খেপে গেলেন। বললেন, কুত্তার বাচ্চা তোরে বলেছিলাম আমি অনুরোধ করলেও তুই আমাকে সিগারেট দিবি না। শূয়োরের বাচ্চার চরিত্রে কোন দৃঢ়তা নেই। তোরে আমি একটা মেরুদণ্ডহীন পশু ছাড়া আর কী বলতে পারি?

আমি ধরা পড়া চোরের মত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার চোখ ফেটে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকল। আমি তাঁর কথার কোন সদুত্তর খুঁজে পেলাম না। এ ঘটনাটির রেশ আমাকে অনেকদিন বয়ে বেড়াতে হয়েছিল। সুযোগ পেলেই ছফা কাকা আমাকে এ নিয়ে গাল মন্দ করতেন। তিনি ধূমপান ছাড়ার জন্যে আমাকে দিয়ে এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন একথা সত্য নয়। তিনি আমাকে পরীক্ষা করেছিলেন আমার মনের জোরটা কেমন। আমি তাঁর পরীক্ষায় হেরে গিয়েছিলাম।

ছফা কাকা জীবনে বহুবার ধূমপান ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু কোনবার তিনি সফল হননি। ধূমপান ছাড়া একদিনও তিনি থাকতে পেরেছেন এমনটি বিরল। তাঁর ডায়েরির পাতায় বারবার লিখেছেন ধূমপান তাঁকে ছাড়তে হবে। চা পান কমাতে হবে। জীবনকে একমুখি করতে হবে। এগুলোর কোনটাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনেকে তাঁকে ধূমপান ছাড়ার জন্য অনুরোধ করতেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, চেষ্টা করছি। দ্বিতীয়বার বললে তিনি চেহারা-ভঙ্গি পাল্টে ফেলতেন, কিন্তু কোন রকম মুখ খুলতেন না। তৃতীয়বার যখন বলতেন তখন তিনি খেপে যেতেন। বলতেন, কোন ভদ্রলোক এককথা বারবার বলে না। ছাড়তে পারলে তো ছেড়েই দিতাম। এমনও দেখা গেছে ধূমপানে বিরত থাকতে বলার কারণে কাউকে কাউকে ঘর থেকে বেরও করে দিয়েছেন।

চুরাশি সালে ছফা কাকা ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। মাত্র বারদিনে এই উপন্যাসটি একটানা লিখে তাঁকে শেষ করতে হয়েছিল। ‘সাপ্তাহিক নিপুণ’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যার জন্য এ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। উপন্যাসটির জন্য তিনি অগ্রিম আট হাজার টাকা সম্মানি পেয়েছিলেন। ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসটি কোন প্রেক্ষাপটে লেখা তা আগে উল্লেখ করেছি। উপন্যাসটি শেষ করে তিনি বন্ধু পিটার জেবিৎসের বাসায় দাওয়াত খেতে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সন্ধেয় যখন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম তিনি জবাব দিলেন, সম্ভব নয়। লেখাটা লিখতে আমার এত পরিশ্রম হয়েছে যে আমি প্রসব যন্ত্রণা অনুভব করছি। বাসায় রান্না কর, ডাল ভাত খাব।

‘ফাউস্টে’র অনুবাদের কাজেও তিনি এ সময় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। এ কাজটি তাঁর জন্য খুবই শ্রমসাধ্য কাজ ছিল বোঝা যেত। অন্যান্য লেখকের দু’ তিনটি অনুবাদের বই বিছানার ওপর ছড়িয়ে রেখে নিজের কাজটি করতেন।

চুরাশি সালেরই ঘটনা। ছফা কাকা একদিন বিকেল বেলা অফিস থেকে ফিরে আসেন। ওইদিন তাঁকে খুবই অস্থির মনে হয়েছিল। তিনি পুরো ঘরময় পায়চারি করে যাচ্ছিলেন। একটার পর একটা সিগারেটও টানছিলেন। মাঝে মাঝে মুখমণ্ডলে এমন একটা বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে তুলছিলেন যেন নিজের চুল নিজে ছিঁড়বেন। তাঁর কী হয়েছে জিজ্ঞেস করব সেই সাহসও আমি পাচ্ছিলাম না। এক পর্যায়ে আমাকে বললেন, এক কাপ চা দাও।

আমি চা করে এনে দিলে তিনি বললেন, জান, এরশাদ সাহেব আমার কাছে লোক পাঠিয়েছেন। এ নিয়ে দু’বার। আমাকে দেখা করতে বলেছেন। কী করব ভেবে উঠতে পারছি না। আমার বন্ধু জিয়াউদ্দিন বাবলুও ফোন করেছেন।

তখন আমি রাজনীতি সম্পর্কে কিছু বুঝতাম না। মফস্বল ফেরত সদ্য মেট্রিক পাশ করা একটা বাচ্চা ছেলের পক্ষে এত বড় বিষয় নিয়ে ভাববার ঘিলু আমার ছিল না, তাছাড়া সময়ও কোথায়। তখন আমি ঢাকা শহরের চাকচিক্য দেখতে ব্যস্ত। কাকাকে তখন মনে হত তাঁর চে’ বড় লেখক বোধহয় পৃথিবীতে আর নেই এবং লেখালেখিই তাঁর একমাত্র কর্ম। সুতরাং এরশাদ সাহেব যেহেতু তাঁকে ডেকেছেন আমার মনে হয়েছে তাঁকে দিয়ে কিছু লিখাবেন। ওই সময় পড়াশুনা করে যতদূর জেনেছিলাম, আগেকার রাজা-বাদশাহরা কবি-সাহিত্যিকদের দিয়ে নানা কথা লিখিয়ে নিতেন। আমার মনে হয়েছে এরশাদ সাহেব ছফা কাকাকে দিয়ে কিছু লিখাতে চান। তাই আমি কোন রকম বাদ-বিচার না করে ছফা কাকাকে বলে ফেললাম, এরশাদ সাহেব বোধহয় আপনাকে দিয়ে কিছু লিখাবেন।

আমার কথা শুনে ছফা কাকা খুব রেগে গেলেন। বললেন, হারামজাদার মাথায় কোন বুদ্ধিসুদ্ধি নেই। কার কাছে কী বলি।

ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আমাকে আরও নানা কথা শুনতে হবে, তাই নিজেকে বাঁচানোর জন্য আমি অন্যত্র সরে দাঁড়িয়েছিলাম। সেদিনের কথা মনে হলে এখনও আমার হাসি পায়। পরে পরে জেনেছিলাম এরশাদ সাহেব তাঁকে ক্ষমতার টোপ দিয়েছিলেন, কাকা তা গ্রহণ করেননি।

একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। ছফা কাকা যখন বাসায় থাকতেন কাজের মধ্যেই থাকতেন। বন্ধু-বান্ধবেরা যতক্ষণ থাকতেন নানা বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে কাটাতেন। গল্প-গুজব, আড্ডার ছলে তিনি সময় ব্যয় করতেন না। তখন শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি কোন না কোন বিষয় তাঁর কাছে গুরুত্ব হয়ে ওঠত। বন্ধু-বান্ধবেরা চলে গেলে তিনি পড়াশুনা করতেন, নয়তো লিখতেন। নয়তো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতেন। তিনি যা-ই করুন কোন বিষয়ই তাঁর কাছে হেলাফেলার বস্তু ছিল না। ওই সময় এখনকার মত লোডশেডিং এত বেশি না হলেও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চলে যেত। বিশেষ করে সন্ধেবেলাটায় এ কাণ্ডটা ঘটত। আমরা তখন পাঁচ তলা দালানের তৃতীয় তলায় থাকতাম। বিদ্যুৎ যখন চলে যেত সব বাসার মহিলারা আমাদের দরজার সামনে এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিতেন। আমাদের দরজাটা বেছে নেয়ার কারণ হল পাশের ফ্ল্যাটে এক ভদ্রমহিলা থাকতেন তিনিই সকলকে এ জায়গায় জড়ো করতেন। এ সময় তার স্বামী অফিসে থাকতেন। তাঁকে রাত করে বাসায় ফিরতে হত। স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রী এই সময়টার সদ্ব্যবহার করতেন অন্য মহিলাদের একত্রিত করে। তাতে ছফা কাকার কাজের খুবই ব্যাঘাত ঘটত। তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। তখন তিনি আমাকে বারবার বলতে থাকতেন, তুমি এদের তাড়াও না কেন? এ মহিলারা এখানে পেয়েছেটা কি? কথাগুলো তারা শুনতে পেতেন, কিন্তু গাঁয়ে মাখতেন না। আমিও তাদের সরে যেতে অনুরোধ করতাম। তাতে কোন কাজ হত না। একদিন ছফা কাকা আমাকে একটা লম্বা প্যান্ট বের করে দিয়ে বললেন, দর্জির দোকানে গিয়ে এই প্যান্টটা কেটে হাফ প্যান্ট বানিয়ে নিয়ে এস এবং এক্ষুণি।

আমাকে তাঁর কথা শুনতে হয়েছিল। বাসার অনতি দূরে একজন দর্জি বসতেন, তাকে দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে আমি প্যান্টটা ছোট করে নিয়ে এলাম। ছফা কাকা তৎক্ষণাৎ প্যান্টটি পরে নিলেন। তারপর খালি গায়ে তিনি দরজা খুলে বাইরে একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়লেন। এরকম একটি পরিস্থিতির জন্য মহিলারা প্রস্তুত ছিলেন না। তারা যে যার মত চলে গেলেন। ব্যাপারটি ওখানে থেমে থাকলে পারত। কাকারা ওখানে একটা সমিতি করেছিলেন। পরের দিন সকল মহিলা মিলে ছফা কাকার বিরুদ্ধে সমিতিতে নালিশ করলেন। অনেকে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলে বসলেন, আমি ব্যাচেলার বলে সব মহিলা আমার ওপর হামলে পড়বেন তা কি করে হয়। আপনারা আপনাদের বেগমদের সামলান।

ছফা কাকা নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করতেন। তাঁর কাজে ব্যাঘাত হোক এ রকম কোন হাঙ্গামা তিনি সইতে পারতেন না। আমরা যারা তাঁর সঙ্গে থাকতাম সব সময় আমাদের এক রকম বোবা হয়ে থাকতে হত। এমনকি টিভির শব্দও যদি তাঁর কানে যেত তিনি উত্তেজিত না হয়ে পারতেন না। একবার তিনি আমাকে এক টুকরো কাগজ দিতে বললেন এক ভদ্রলোককে একখানা চিঠি লিখে দেয়ার জন্য। আমি একটা সাদা কাগজ ভাঁজ করে তা দু’ভাগ করলাম। তারপর কাগজখানা মাঝ বরাবর টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললাম। কাগজ ছিঁড়তে গেলে তো একরকম শব্দ হবেই। শব্দটা তাঁর বুকে গিয়ে বিঁধেছিল। তিনি এমন ভাব করেছিলেন পারলে আমাকে মারেন। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমার দিকে তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিলেন, তুমি কেমন নিষ্ঠুর ছেলে? তোমার মধ্যে কি কোন দয়া-মায়া নেই? কাগজখানা কিভাবে কেঁদে ওঠল একবারও বুঝতে চেষ্টা করলে না?
আমি তাঁর কথার কোন জবাব খুঁজে পাইনি। ছফা কাকার কাছে আমি জীবনে প্রথম শুনেছিলাম কাগজও কাঁদতে জানে। গোশল করার সময় পানি ঢালতে গিয়ে শব্দ হলেও তিনি একই রকম মন্তব্য করতেন। কেউ যদি অযথা কোন গাছের পাতা ছিঁড়ত তিনি আহা-উহু করে বেদনা প্রকাশ করতেন। কাকার উপলব্ধি করার শক্তি ছিল আশ্চর্য রকম। তিনি নির্জীব পদার্থের মাঝেও প্রাণের স্পন্দন দেখতে পেতেন।

পঁচাশি সালের এপ্রিলে ছফা কাকার খুব জ্বর হয়েছিল। বলা যায় জ্বরটা তিনি ইচ্ছে করে বাধিয়েছিলেন। একদিন ‘উত্তরণ’ অফিস থেকে রাত করে ফিরছিলেন। মিরপুর দুই নম্বরের বাস স্ট্যান্ডে নামতে না নামতেই শুরু হয়ে যায় কালবৈশাখী। বাতাস এবং শিলাবৃষ্টি দুটো এক সঙ্গে হয়েছিল। অনেক গাছপালা উপড়ে পড়েছিল। বিদ্যুতের খুঁটিগুলোও অক্ষত থাকেনি। ছফা কাকা এই দুর্যোগের মধ্যে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে বাসায় ফিরেছিলেন। তাঁর অবস্থা এমন হয়েছিল ঠাণ্ডায় তিনি রীতিমত কাঁপছিলেন। ঝোলার মধ্যে কাগজপত্র ছিল বলে সেটি একটি দোকানে রেখে এসেছিলেন। তাঁকে আমি প্রশ্ন করলাম, এত বড় বিপদ মাথায় নিয়ে বাসায় আসা কি আপনার ঠিক হয়েছে? কোন একটা দোকানের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেও তো পারতেন?

তিনি আমার কথার কোন গুরুত্বই দিলেন না। ঠাণ্ডায় তিনি কাঁপছেন, তারপরেও ভাবটা এমন করলেন যেন বেশ আছি। আমাকে হাসতে হাসতে বললেন, জান, কবি শেলি সাইক্লোনের সময় সমুদ্রে নৌকা ভাসিয়েছিলেন। তিনি বাঁচতে পারেননি তাতে কী হয়েছে, তাঁর সাহসটার তো প্রসংশা না করে পারা যায় না? এ ধরনের মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মধ্যে একটা আনন্দ আছে। বিশ্বাস কর আমি একটুও ভয় পাইনি।

ওই রাতেই তাঁর শরীরে জ্বর এসে যায়। প্রচণ্ড জ্বর ও মাথা ব্যথায় তিনি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছিলেন না। বারবার তিনি মা মা বলে চীৎকার করছিলেন। জ্বরের প্রকোপ এত বেড়ে গিয়েছিল যে প্যারাসিটামলেও কোন কাজ করছিল না। পনের বিশদিনের মত তাঁকে শরীরে জ্বর নিয়ে থাকতে হয়েছিল। এই জ্বরের মধ্যে একবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে তিনদিন অচেতন ছিলেন। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মাঝে মধ্যে আমি জাগিয়ে চারটে খাইয়ে দিতাম। খাওয়া শেষ হতে না হতেই আবার ঘুমিয়ে পড়তেন। একদিন শরীরে জ্বর নিয়ে লিখে ফেললেন একটি কবিতা:

“আকাশ থেকে করুণার মত নামল
চৈতের প্রথম ধারা
মেঘ কেটে নাচল বিদ্যুৎ
এবং বাতাস দুঃশাসনের থাবার ঘায়ে
কুটি কুটি করে ভাঙছে চিরছে
ইলেকটিরির খুঁটি, দোকানির ঘুণ্টিঘর
ভূমি শয়ান করছে অহিংসুক তরুকুঞ্জ
ক্ষমতার দাপটে ধ্বংস হচ্ছে যা কিছু হওয়ার।
তথাপি বছরের প্রথম বিষ্টি
নিখিলের তিয়াসের পানি
ঝুপঝুপ টুপটাপ বিষ্টির পতন
চরাচরে ঢেউ দেয়া সান্ত্বনা সঙ্গীত।
এমন চৈত্রের দিনে এমন বাদল দিনে আমার শরীর
পড়ে আছে শয্যাতলে কম্পিত অস্থির
শরীরে জ্বরের অগ্নি চোখে নাই ঘুম
চেয়ে চেয়ে দেখি ধরে গেছে বিষ্টির বেগ
চৌদিক নিঝঝুম
পৃথিবী স্বপ্নমগ্ন সদ্যোজাত নগ্নিকার মত
আকাশ এসেছে সদ্যস্নাতা চাঁদ বড় চুপে চুপে
মাঠের ফাটল আর গর্তে জমা জলে
অগুনতি চূর্নিত চাঁদ নিভে আর জ্বলে।”
(ছফা, খ. ৮, পৃ. ৪৭৫)

ছফা কাকা একবার নাকি পৌষের কনকনে শীতের রাতে কার্জন হলের পাশে ফুটপাতে ভাসমান লোকদের সঙ্গে ঘুমিয়েছিলেন। ভাসমান মানুষের কষ্ট বোঝার জন্য তাঁকে এমন পথটি বেছে নিতে হয়েছিল। আবার এমনটিও তিনি করেছেন, ফুল কিভাবে ফোটে সেটি দেখার জন্য একটি ফুলের দিকে চোখ রেখে নির্ঘুম সারারাত বসে থেকেছেন। রাত শেষ হয়ে যায়, ফুল ফোটে না। ছফা কাকার কৌতূহলও কমে না ফুল না ফোটা পর্যন্ত। কিন্তু শেষ দেখার সুযোগ তাঁর হয়ে উঠেনি। ফুল এক সময় স্বমহিমায় ফোটে যায়। ছফা কাকা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন, এ-ও কি সম্ভব? তাঁর ভেতরে উথাল-পাতাল শুরু হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি লিখে ফেললেন :

“ফুল ফোটানো সহজ কথা নয়
শূন্য থেকে মূর্ত করা সৃষ্টির বিস্ময়।
পারে সেজন
ভেতর থেকে ফোটার স্বভাব যার
ফালতু লোকের ভাগ্যে থাকে
মিথ্যা অহংকার।”
(ছফা, খ. ৫, পৃ. ৫০৫)

ফুল ছফা কাকা খুব পছন্দ করতেন। মিরপুরে থাকা অবস্থায় তিনি একদিন পাঁচটি গোলাপের চারা নিয়ে এলেন। চারাগুলো লাগানোর দায়িত্ব বর্তালো আমার ওপর। ফলে আমাকে মিরপুর এগার নম্বর বাজার থেকে টব কিনে আনতে হয়েছিল। নানা জায়গা ঘুরে আমাকে মাটি এবং গোবর সংগ্রহ করতে হয়েছিল। চারাগুলো লাগানোর পর অল্পদিনের মাথায় বেশ বড় হয়ে ওঠল। পাতাগুলো এমন সতেজ ছিল যে দৃষ্টি কাড়ার মত। কোন কোনটাতে ফুলের কলিও দেখা দিয়েছিল। ছফা কাকার খুশি আর দেখে কে; পারেন না যে গাছগুলো টেনে আরও লম্বা করে ফেলতে। তিনি গাছগুলোর প্রতি ভীষণ রকম মনযোগী হয়ে ওঠলেন। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে দু’ কেজির মত খৈল নিয়ে আসলেন, উদ্দেশ্য ওগুলো তিনি গোলাপ গাছের গোড়ায় দেবেন। মাথায় যখন একবার ঢুকে গেছে সেটা না করে তাঁর নিস্তার নেই। সুতরাং কোন রকমে জামা-কাপড় ছেড়ে তিনি একখানা বটি নিয়ে টবের মাটিগুলো আলগা করতে লেগে গেলেন। তারপর টবের মাটিগুলো সরিয়ে সবগুলো টবে সমস্ত খৈল ঢেলে দিলেন। খৈলগুলো যাতে দেখা না যায় মাটিগুলোকে তার ওপর ছড়িয়ে দিলেন। তারপর টবের কানায় কানায় পানি দিয়ে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। পুরো কাজটিতে তাঁকে আমার সহযোগিতা করতে হয়েছিল।

ashim-saha.jpg
কবি অসীম সাহার খাদ্যগ্রহণ তদারক করছেন ছফা

sofa_bhat.jpg
……..
বাংলামটরের বাসায় পড়ার, লেখার ও খাবার টেবিলে ভাত খাচ্ছেন ছফা
……..
পরের দিন দেখা গেল গাছগুলো আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করেছে। ছফা কাকার ধারণা সার গাছগুলোতে কাজ করছে। তারও পরের দিন যখন দেখা গেল সবগুলো গাছের পাতা লাল হয়ে গেছে। আমার টনক নড়ল গাছগুলো মরতে বসেছে। কিন্তু ছফা কাকা আমার কথা মানতে রাজি নন। তিনি আমাকে একরকম ধমকও দিলেন। চার পাঁচদিন পর যখন গাছগুলোর পাতা ঝরে পড়তে শুরু করেছে কাকা মাটি খুঁড়তে লেগে গেলেন। দেখা গেল খৈল পঁচে বড় বড় লেদা পোকার জন্ম হয়েছে। খৈল পঁচার গন্ধে নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসার উপক্রম। তিনি পরীক্ষা করে দেখলেন সবগুলো গাছের শিকড় পঁচে গিয়েছে। গাছের এমন দশা দেখে তিনি অনেকক্ষণ থ হয়ে বসে রইলেন। তাঁর মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুতে চাইল না। অনেকক্ষণ পর বললেন, কবি জসীম উদ্দীন আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন।

জসীম উদ্দীন সাহেব মারা গেলেন অনেকদিন আগে। তিনি তাঁকে কিভাবে অভিশাপ দিলেন বোঝা গেল না। আমি তাঁকে বললাম, এসবের মধ্যে কবি জসীম উদ্দীনকে টেনে আনছেন কেন? উনি কী করেছেন?

তিনি আমার কাছে পুরো ব্যাপারটি বয়ান করলেন। বিষয়টি সংক্ষেপে এই রকম – জসীম উদ্দীন সাহেবকে আঘাত দেয়ার জন্য ছফা কাকা তাঁর বাগানের সব ফুল ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। সেদিন তাঁর নিষ্ঠুর কাজ দেখে কবি সাহেব কেঁদেছিলেন। কবি সাহেব মনে মনে তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, যেটি এতদিন পর এসে ফলেছে।
আমি তাঁর কথায় থ বনে গেলাম। আমাকে তিনি যে ঘটনাটি বয়ান করেছিলেন অনেকদিন পর জসীম উদ্দীন সাহেবকে নিয়ে লেখা তাঁর একটা রচনার মধ্যে এর আভাস পাওয়া গেল। তিনি লিখেছেন:

“আমি যখন কবির বাড়িতে হাজির হলাম তখন দুপুরবেলা। আকাশে প্রচণ্ড রোদ। কবি সাহেব তাঁর এক নাতিকে নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার দুটো পা ধুলোতে ভরে গেছে। কবি সাহেব আ-হা-হা করে উঠলেন, ‘তুমি অনেক কষ্ট করে এসেছ, একটু জলপান খাও। আমার ক্ষুধা ছিল, তৃষ্ণাও ছিল। জলপান খাওয়ার কথায় দুটোই জেগে উঠল। কবি সাহেব নিজে বাড়ির ভেতর গিয়ে মাত্র দুটো নাইস বিস্কুট এবং এক গ্লাস পানি দিয়ে বললেন, খেয়ে একটু ঠাণ্ডা হও। ঠাণ্ডা হব কি? আমার মাথায় রক্ত বয়ে গেল। আমার ধারণা ছিল কবি সাহেব চিড়া দেবেন, দই দেবেন, তাতে নারিকেল থাকবে এবং অন্তত দুটো পাকা কলা নির্ঘাত পাওয়া যাবে। জলপানের আকার-প্রকার দেখে আমার ইচ্ছা হল গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলে দেই। কিন্তু পারলাম না। যে ফুটফুটে বাচ্চাটি বিস্কুট দুটো ছোট হাত দিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরেছে তাকে কষ্ট দিতে পারলাম না। সুতরাং কবির আনা জলপান ভক্ষণ করলাম। শরীরের রাগটি তখনো নামেনি। কিছু একটা করা প্রয়োজন। কবি সাহেবেকে তো আর বাড়িতে গিয়ে গালমন্দ করা যায় না? আমি তাঁর দিকে না তাকিয়ে বাগানে ঢুকে বললাম, কবি সাহেব, জলপান তো করলাম, এখন আপনার বাগান থেকে কিছু ফুল নেই। তিনি ফুল নেয়ার কথা শুনে আমার দিকে বড় বড় চোখ পাকিয়ে বললেন, আমরা ফুলকে পূজা করি, ছিঁড়িনে। আমি বললাম, ফুলের ব্যাপারে আমার একটা আলাদা থিওরি আছে। আমরা গাছ লাগাই, জল দেই, সার দেই, ফুলের বাবার সাধ্য নেই যে না ফুটে। একথা বলে আমি একটা একটা করে বাগানের সব কটা ফুল ছিঁড়ে চাদরে ভরে নিয়েছিলাম। কবি সাহেব অবাক-বিহ্বল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোন কথা বললেন না। আমি যখন ফুল নিয়ে চলে আসছি, তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁর চোখ পানিতে ভরে গেছে। আরো একটা পরিচয় পেলাম। ইনি হলেন কবি জসীম উদ্দীন। ফুলের শোকে যিনি শিশুর মত কাঁদতে পারেন। (ছফা, খ. ৩, পৃ. ২৩২)

(কিস্তি ৭)

nurulanwar1@gmail.com

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদ বিশ্বাস — ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১০ @ ১:৪৪ পূর্বাহ্ন

      আহমদ ছফার অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী উপন্যাসের দুর্দানা আফ্রাসিয়াব তাহলে শামীম শিকদারই। এই ছবি দেখে আজ নিশ্চিত হলাম।

      – মাসুদ বিশ্বাস

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com