ব্যক্তিত্ব, সাক্ষাৎকার

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯

রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

রাজু আলাউদ্দিন | 12 Oct , 2009  

hm5.jpg

হার্টা ম্যুলারের আলাপচারিতাটি রেডিও রোমানীয়া ইন্টারন্যাশনাল ২০০৭ সালের ১৭ আগস্টে সম্প্রচার করে। এ সাক্ষাৎকারে ম্যুলার কথা বলেছেন রোমানীয় ভাষায় অনূদিত তাঁর বইগুলো নিয়ে। আলোচনায় তাঁর অনুবাদিকা নোরা ইউগা ছিলেন। অনুবাদক লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন। বি. স.

অনুবাদ: রাজু আলাউদ্দিন

hm7.jpg

hm4.jpg
হার্টা ম্যুলার জার্মানীর বরেণ্য লেখকদের একজন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য তালিকায় তিনি জার্মানির প্রতিনিধিত্বকারী। রোমানীয়ার পশ্চিম বানাত অঞ্চলের সোয়াবিয় সম্প্রদায়ে তাঁর জন্ম। তিমিশোয়ারাতে তিনি জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন করেন এবং পরে এক গাড়ি নির্মাণ কারখানায় দোভাষীর কাজ নেন। নিরাপত্তা গোয়েন্দা পুলিশ (Securatate secret police) কে সহযোগিতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তিনি দোভাষীর কাজটি হারান। ১৯৮৭ সালে পশ্চিম জার্মানিতে অভিবাসনের আগে জার্মান ভাষার শিক্ষকতা করে জীবিকা অর্জন করতেন।
—————————————————————-
লেখিকা আমাদের বললেন, দুটো ভাষার মেজাজও আলাদা। রোমানীয় ভাষায় ‘তুষারপাত’ মানে ‘মৃদু অশ্রুপাত’। জার্মান ভাষায় এর অর্থ ‘মেইগলখেন’ (Maiglokhen) মানে লিটল মে বেলস (Little may bells)। তার মানে হচ্ছে এই যে আমরা কেবল ভিন্ন শব্দের কথা বলছি না, বলছি ভিন্ন জগতের কথা। রোমানীয়রা যখন একটি নক্ষত্র খসে পড়তে দেখে তখন ওরা বলে কেউ একজন মারা গেছে, কিন্তু জার্মানরা সেক্ষেত্রে কোনো অভিলাষ ব্যক্ত করে (make a wish)।
—————————————————————-
১৯৮২ সালে সাহিত্যিক স্বীকৃতির পর হার্টা ম্যুলারের প্রকাশিত ২০টি বই বহু ভাষায় অনূদিত হয়। প্রায় প্রতি বছরই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো না কোনো সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে আসছেন। যেমন, ‘রিকার্ডা হাক’, ‘ক্লেইস্ট’, ‘জোসেফ ব্রেইটবাখ’ এবং ‘আইএমপিএসি ডাবলিন সাহিত্য পুরস্কার’। পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে বহু নিবন্ধ। সম্মানজনক সাহিত্য পত্রিকা টৈক্সট + ক্রিটিক্ তাঁকে নিয়ে একটি গোটা সংখ্যাই প্রকাশ করেছিলো।

জার্মনিতে ২০ বছরের জীবনযাপন হার্টা ম্যুলারের রোমানীয় স্মৃতিকে মেঘাচ্ছন্ন করতে পারেনি। একে তিনি ব্যবহার করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “রোমানিয়াতে স্বৈরাচারের শাসনামলে জীবনযাপন ছিলো আমার জন্য সবচেয়ে স্পর্শময় অভিজ্ঞতা। কয়েকশ কিলোমিটার দূরে জার্মানিতে জীবনযাপন করলেও অতীতের অভিজ্ঞতাকে মোটেও তা মুছে ফেলতে পারে না। আমি যখন রোমানিয়া ছাড়ি তখন অতীতকে ঝোলায় পুরে নিয়ে এসেছিলাম। সেই স্বৈরাচার এখনও জার্মানিতে আলোচনার বিষয়।” হার্টা ম্যুলারের লেখার প্রয়োজনও মাথা চাড়া দিয়েছিলো স্বৈরাচারের আমলে। “অন্য কোনো ভাবে নয়। লিখেই আমাকে জীবন ধারণ করা শিখতে হয়েছে। একেবারে সাদামাটা মানসম্পন্ন যে-জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখতাম সে-রকম ভাবে বাঁচতে চেয়েছি।” একবার তিনি বলেছিলেন, “আর আমার কাছে লেখালেখি ছিল আমি যেভাবে মূলত জীবনযাপন করতে পারিনি তাকে ভাষা দেওয়ার উপায়।”

চিগনোন-এ বাসকারী এক রমণী নামের বইটি নোরা ইউরা কর্তৃক রোমানীয় ভাষায় অনূদিত হলে সে উপলক্ষ্যে বইটি থেকে পাঠ করার জন্য বুখারেস্টের রোমানীয় সাংস্কৃতিক সংস্থা হার্টা ম্যুলারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো। এটি হচ্ছে এক কোলাজ-কবিতা যেখানে তিনি রোমানীয় পত্রিকা থেকে শব্দগুচ্ছ বা সিলেবল কেটে সেগুলোকে বিচিত্র ধরনে সমন্বিত করেছেন। সেগুলোর কোনো কোনোটির তিনি চিত্রায়ণও করেছেন। বিদেশে অবসর যাপনের সময় বছর দশেক আগে কোলাজ সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহের শুরু। সাধারণ পোস্টকার্ডকে তিনি পত্রিকা থেকে শব্দ বা সিলেবল যুক্ত করে বদলে দিতেন। এই ভাবেই তাঁর কোলাজ-কবিতার বইটি তৈরি হয়েছে। বইটির নাম ‘এটা আইয়ন কিনা’ এবং ২০০৫ সালে পলিরম প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। রোমানীয়া থেকে এটাই লেখিকার প্রথম বই। হার্টা ম্যুলার স্বয়ং এখানে রোমানিয়ার সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা বলছেন:

আমার রোমানীয় কোলাজ ভালভাবে বেরিয়েছে দেখে আমি খুবই খুশী। কেবল কাঁচি ব্যবহার করে এগুলো তৈরি করাটা বেশ মজার। আমার মনে হয়েছে কাজ করার সময় ভাষাটা আমার আয়ত্তে। রোমানীয় ভাষা নিয়ে এটা ছিলো এক সামান্য খেলা; যদিও রোমানীয় ভাষায় আমি লিখতে পারি না। হাতের মধ্যে শব্দ পাওয়া আর তাদের অন্তর্নিহিত অর্থগুলো অনুভব করা এক ভিন্ন ব্যাপার। রোমানীয় ভাষায় আমার দখল গড়পরতা মানুষের মতই। আমার ধারণা রোমানীয়দের সবচে সুন্দর দিকটা হচ্ছে এর প্রতিদিনের ভাষা যা আমি গাড়ি নির্মাণ কারখানায় কাজ করার সময় শিখেছি। কেউ একজন আজকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আর্ভ-গার্ড থেকে আমি কী শিখেছি। আমি বললাম লোকগীতি থেকে আমি প্রচুর শিখেছি। আমি যখন প্রথম মারিয়া টেলাস শুনি আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিলো। লোকসাহিত্য যে কী জিনিস আমি ঐ প্রথমবারই টের পেয়েছিলাম। রোমানীয় লোক-সংগীত খুবই অর্থময়ভাবে তা অস্তিত্বের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। জার্মান লোক-সাহিত্য আমার কাছে মোটেই উদ্দীপক মনে হয় নি।”

রোমানীয়দের সাথে হার্টা ম্যুলারের যোগাযোগ বরং দেরিতেই ঘটেছে; বয়স যখন ইতিমধ্যে ১৫ হয়েছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি (পশ্চিম রোমানিয়া) বানাত, নিটশিডর্ফ-এ কেউ রোমানীয় ভাষায় কথা বলেন না। ভাষা দুটো একটা থেকে আরেকটা কত আলাদা তা দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন। কখনো কখনো তা কী স্ববিরোধীই না হতে পারে। বলেন হার্টা ম্যুলার।

রোমানীয়াতে মেটাফরগুলো অনেক বেশি ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং একেবারে লক্ষ্যভেদী। আমার মাতৃভাষা আলেমান যা দিতে পারে তার চেয়ে এই সরাসরি ইমিজে আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এই কারণে আমি রোমানীয় ভাষা শিখতে চেয়েছি। রোমানীয়দের মত আমি খুবই স্পর্শকাতর, তবে আমার রোমানীয় শব্দভাণ্ডার তত সমৃদ্ধ নয়। শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ না হলে নিজেকে প্রকাশ করা কঠিন। এমিল সিয়োন-এর সাথে প্যারিসে আমার সাক্ষাতের কথা মনে পড়ে। তিনি বললেন, ফ্রান্সে আসার পর নাকি রোমানীয় ভাষায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন, যদিও বড় হয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন রোমানীয়তে এবং এ থেকে তার কোনো নিষ্কৃতি ছিল না। ‘এখানেও এই ভাষা আমাকে তাড়া করে ফিরছে, এ থেকে আমি রেহাই পাচ্ছি না।’ আমাকে বললেন তিনি।

hm8.jpg

লেখিকা আমাদের বললেন, দুটো ভাষার মেজাজও আলাদা। রোমানীয় ভাষায় ‘তুষারপাত’ মানে ‘মৃদু অশ্রুপাত’। জার্মান ভাষায় এর অর্থ ‘মেইগলখেন’ (Maiglokhen) মানে লিটল মে বেলস (Little may bells)। তার মানে হচ্ছে এই যে আমরা কেবল ভিন্ন শব্দের কথা বলছি না, বলছি ভিন্ন জগতের কথা। রোমানীয়রা যখন একটি নক্ষত্র খসে পড়তে দেখে তখন ওরা বলে কেউ একজন মারা গেছে, কিন্তু জার্মানরা সেক্ষেত্রে কোনো অভিলাষ ব্যক্ত করে (make a wish)। ঠিক এই কারণে চিগনন্-এ বাসকারী রমণীর কোলাজ-কবিতাগুলো অনুবাদ করার সময় নোরা ইউগা বহুবার সামান্য কিছু অদল-বদল করেছেন। নোরা বলেন:

“আমরা যখনই কোলাজগুলো পড়ি তখন এগুলোকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা বলতে ইচ্ছে করে। যদিও একে ঠিক নিরীক্ষা বলা যাবে না, কারণ এই কোলাজগুলোতে বেশ কিছুটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে, এর প্রত্যেকটাতেই রয়েছে গভীর মানবীয় বিষয়। মানুষের কাছে এগুলোর একটা আবেদন রয়েছে এবং এগুলো মানুষের জীবন ও অনুভূতি সম্পর্কে কথা বলে। শৈলীগত এই চর্চার পেছনে সুগভীর কাব্য-সম্পদ লুক্কায়িত রয়েছে। যদিও আগে আমি কোলাজ-ধরণের লেখা লিখিনি, তারপরেও এই ধরনের লেখার অভ্যাসের কারণ হলো অদ্ভুত আর সাবলীলতাকে জাগাতে চাওয়া। এক্ষেত্রে হার্টা আর আমি পরস্পর পরস্পরের খুবই কাছাকাছি। হার্টার শৈল্পিক প্রণোদনা বিস্ময়কর—আমাকে তিনি শব্দার্থের ব্যাপারে খুব বেশি সুনির্দিষ্ট না হওয়ার জন্য বললেন, কারণ তাতে করে বিপত্তি ঘটতে পারে। আমাকে তিনি সব রকমের স্বাধীনতাই দিয়েছেন আর আমি তাতে বেশ আনন্দই পেয়েছি কাজটা করতে পেরে।”

কোলাজ-কাজের জন্য হার্টা ম্যুলার নিজের জন্য একটা বিশেষ সারনী (Table) করেছেন, বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজিয়ে একটা গোটা গ্রন্থাকাবই তৈরি করেছেন। হার্টা ম্যুলার বলেন জীবনের সাথে কোলাজের বেশ সাদৃশ্য আছে। এক্ষেত্রে নির্বিচার খেলার ভূমিকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি একটা শব্দ খুঁজতে গিয়ে অন্য একটার মুখোমুখি হচ্ছেন যাকে হঠাৎ করেই অনেক বেশি যথাযথ এবং অনেক বেশি আবেদনময় বলে মনে হয়। পরে আপনি সেগুলোকে একটা বোর্ডের উপর আঠা দিয়ে লাগালেন আর এভাবেই তৈরি হয়ে গেল কবিতা, কোনো কিছু বদলাবার দরকার নেই। কোলাজের ব্যাপারে হার্টা ম্যুলার এই ব্যাপারটাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। একবার তৈরি হয়ে গেলে আপনি আর এর কোনো কিছু বদলাতে পারবেন না। এই ব্যাপারটাই কোলাজকে যতদূর সম্ভব জীবনের কাছে নিয়ে আসে। অতীতকে আপনি ফিরিয়ে আনতে পারেন না। সাধারণ কবিতাকে মুছে ফেলতে পারলেও এই ধরনের কবিতাকে আপনি মুছে ফেলতে পারেন না। চিগনন-এ বাসকারী রমণী এবং এটা আইয়ন কিনা আলোচ্য এই দুটো বইয়ের পাশাপাশি রোমানীয় ভাষায় হার্টা ম্যুলারের আরও তিনটি বই অনূদিত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে রাজার কুর্নিশ ও হত্যাকাণ্ড, হৃদয়ের পশু এবং বহুদিন আগে শেয়াল ছিলো শিকারী

razualauddin@hotmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:


3 Responses

  1. ভাল অনুবাদ। মূল লেখাটা পড়েছি সম্প্রতি। নোবেলজয়ী লেখিকা গাড়ি নির্মাণ কারখানায় ঠিক দোভাষীর কাজ নয়, আমদানিকৃত মেশিন টুলসের অপারেটিঙ ম্যানুয়াল রুমানীয় ভাষায় অনুবাদ করতেন।

    মারুফ রায়হান
    বাংলামাটি ডট নেট, বাংলাদেশ

  2. ভালো অনুবাদ। ভালো উপস্থাপন। অনুবাদক’কে ধন্যবাদ।

    -ইমন রেজা
    নন্দন(an open platform on Art Literature and Culture)

  3. হার্টা ম্যুলারের বইয়ের নামগুলো ইংরেজিতে দিলে ভালো হতো।

    – সাইফ সামির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.