ব্যক্তিত্ব

আমাদের ভাষা আন্দোলনের গাজীউল হক

আহমাদ মাযহার | 19 Jul , 2009  

bangla-language-day-process.jpg
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের দেশে কোনও কোনও মানুষের একটি-দুটি কীর্তি কোনও কারণে বহুল উল্লিখিত হলে সেই মানুষটিরই জীবনের অন্যান্য উজ্জ্বলতা এই একটি কীর্তিরই বহুল উচ্চারণের নামাবলিতে ঢাকা পড়ে যায়। শুধু তাই নয়, এমনকী gaziul-haq-3.jpg…….
গাজীউল হক (জন্ম. ছাগলনাইয়া, নোয়াখালী ১৩/২/১৯২৯ – মৃত্যু. ঢাকা ১৭/৬/২০০৯)
……..
বহুল উল্লিখিত কীর্তিটিও যথেষ্ট পরিচ্ছন্নভাবে বিশ্লেষিত বা ব্যাখ্যাত হয় না বলে সেই মানুষটি শেষ পর্যন্ত একটা অস্পষ্ট কিংবদন্তী হয়ে বেঁচে থাকেন। ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের বেলাতেও এমনটিই ঘটেছে। গাজীউল হক যে ভাষাসৈনিক ছিলেন সে-কথাটিই কেবলমাত্র প্রচারিত তথ্য, কিন্তু ভাষাসৈনিক হিসাবে তাঁর ভূমিকাটি বাহান্নোর ভাষা-আন্দোলনে ঠিক কী ছিল তা তাঁর সমসাময়িক রাজনৈতিক কর্মীদের কারও কারও জানা থাকলেও উত্তর প্রজন্মের এমনকী সচেতন মানুষদেরও অনেকেরই তেমন জানা নেই। এর জন্য আমাদের সমাজের সামগ্রিক ইতিহাস-চেতনার অভাবই দায়ী।
—————————————————————–
তাঁর সাহসিকতার পরিচয় কেবল ভাষা আন্দোলনের সময়ই দেখা যায় নি। পরবর্তী সকল অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় সংগ্রামে গাজীউল হক অংশ নিয়েছেন। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪-র সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠক হিসাবে ও পরে জাতীয় পর্যায়ের লেখক এবং সংগঠকের ভূমিকায় তাঁকে পাওয়া গেছে। তাঁকে পাওয়া গেছে ১৯৮০-র দশক জুড়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে।
—————————————————————-
এ-কথা ঠিক যে ভাষা আন্দোলনে গাজীউল হকের ভূমিকা ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সেটা ছিল এমন এক সময় যখন নেতৃত্বের ভূমিকা পালনের ক্ষেত্র ছিল প্রস্তুত। কিন্তু কে হবেন ঐ যুদ্ধক্ষেত্রের নায়ক? এ প্রশ্নে আমরা যদি ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে ফিরে যাই তাহলে দেখতে পাব যে গাজীউল হকের ভূমিকা সেখানে উজ্জ্বল! সেদিন রাতে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ যে বৈঠকে বসেছিল তাতে গাজীউল হক উপস্থিত না হয়ে অপেক্ষা করছিলেন ফজলুল হক হলে। ঐ বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয় তা জেনে ঠিক করবেন তাঁর কর্মপন্থা। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল যে, সরকার ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। তাঁদের সিদ্ধান্ত এই কারণে যে, তাহলে গোটা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের ওপর জেল-জুলুম নেমে আসবে। এতে আসন্ন নির্বাচন পিছিয়ে যাবে। তাঁরা ভেবেছিলেন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনসাধারণের ব্যাপক জমায়েত হবার সম্ভাবনা কম। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের ঐ সভার অধিকাংশ সদস্যের মতামতের ভিত্তিতেই [১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ১১, বিপক্ষে ৪] এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন অলি আহাদ ও আবদুল মতিন। তাঁরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে থাকলেও মোহাম্মদ তোয়াহা ভোটদানে বিরত থাকেন কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত না থাকায়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ফজলুল হক হলে অবস্থানরত গাজীউল হক রাত সাড়ে বারোটার দিকে এই খবর পান। সর্বদলীয় সিদ্ধান্তে আওয়ামী মুসলিম লীগ, ছাত্রলীগ এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল। শুধুমাত্র যুবলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা পরিষদের প্রতিনিধিগণ মত প্রকাশ করেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে। পরিষদের প্রতিনিধি তোয়াহার মতও ছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় তিনি সরাসরি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দিতে না পারলেও ভোট দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। এখান থেকে শুরু হয় গাজীউল হকের ঐতিহাসিক ভূমিকার সূচনা। বাহান্নোর ঘটনার অন্যতম নায়কে পরিণত হন তিনি। তিনি তখন কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, রাজনৈতিক কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গেও নয়। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে যে সব রাজনৈতিক তৎপরতায় তিনি সে-সময় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তাতে তাঁর সমসাময়িক ছাত্র মহলে এবং রাজনৈতিক মহলে তিনি যথেষ্ট পরিচিত ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। তখন তিনি পরিচিত ছিলেন তার নিজ জেলা বগুড়া ও ঢাকায় সমানভাবে। ফলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি হবে না তা নিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটার পরে, মানে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে বিভিন্ন হলের ছাত্র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের ফজলুল হক হলে ডাকেন। রাত প্রায় একটার দিকে ফজলুল হক এবং ঢাকা হলের মাঝামাঝি পুকুরের পূর্বপাড়ে সিঁড়ি বাঁধানো পাকা ঘাটের ওপর সে-সময়কার ১১ জন ছাত্র মিলিত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ১. মোহাম্মদ সুলতান, ভাষা আন্দোলনের স্মারক কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বিখ্যাত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের তিনি ছিলেন প্রকাশক; ২. এস এ বারি এটি, পরবর্তীকালে বি এন পি সরকারের উপ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন; ৩. আনওয়ারুল হক খান, পরবর্তীকালে যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেস সচিব হয়েছিলেন; ৪. মনজুর হোসাইন, পরবর্তীকালে চিকিৎসক; ৫. হাবিবুর রহমান শেলী, পরবর্তী কালে প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা; ৬. জিল্লুর রহমান, বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি; ৭. গাজীউল হক; ৮. আবদুল মমিন, আওয়ামী লীগের নেতা ও পরবর্তী কালে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী; ৯. মোস্তফা রওশন আখতার মুকুল, এম আর আখতার মুকুল নামে পরিচিত, পরবর্তীকালে সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত চরমপত্রের জন্য বিখ্যাত; ১০. সৈয়দ কামরুদ্দীন হোসাইন শহুদ, পরবর্তী কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; ১১. আনওয়ার হোসেন, পরবর্তী কালের পরিচয় জানা সম্ভব হয় নি।

২১ ফেব্রুয়ারির গভীর রাতের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। যদি ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা না হয় তাহলে ভাষা আন্দোলন চিরকালের জন্য ব্যর্থ হয়ে যাবে এই ছিল ছাত্র নেতাদের মত। ঐ বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, ২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের চিঠি দিয়ে ৪ জন ৪ জন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হবার ব্যবস্থা করতে হবে। চিঠি দেয়ার দায়িত্ব গাজীউল হকের ওপরই অর্পিত হয়েছিল। গাজীউল হক ও মোহাম্মদ সুলতান ছোট ছোট চিরকুট লিখে হলগুলোতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। সবাইকে সকাল ৯টা ৩০ থেকে ১০ টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জড়ো হবার আহ্বান জানান। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে সভা হবে তাতে সভাপতিত্বের দায়িত্বও গাজীউল হককেই দেয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, যদি তিনি গ্রেফতার হয়ে যান তাহলে সভাপতিত্ব করবেন কামরুদ্দীন শহুদ। সভাপতি হিসাবে গাজীউল হকের নাম প্রস্তাব করবেন মোস্তফা রওশন মুকুল। সমর্থন করবেন কামরুদ্দীন হোসাইন শহুদ।

আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সকাল সাড়ে আটটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাতে থাকেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা
amtala.jpg…….
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্টস বিল্ডিংয়ের আমতলা
………
কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমতলার ছাত্রসভাতে উপস্থিত হয়েও তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সমর্থন বক্তব্য দিলে আবদুল মতিন এবং আবদুস সামাদ (স্বাধীন বাংলাদেশে নিজের নামের সঙ্গে আজাদ শব্দটি যোগ করেছিলেন; পরবর্তী কালে যিনি দুইবার আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছিলেন) শামসুল হকের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন। সভাপতি গাজীউল হকও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে বক্তব্য রাখলে ছাত্রদের দ্বিধা কেটে যায়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে শুরু করেন। ঐ সময়ে পুলিশের ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাঁকে সরিয়ে নেয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে গাজীউল হক পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। বগুড়ায় এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার আলতাফুন্নেছা মাঠে তাঁর গায়েবানা জানাজাও পড়ানো হয়েছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনার আগেই এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভাষানীতি সম্পর্কে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধিবেশনে যে বক্তব্য রাখেন তাতে রাষ্ট্রভাষা উর্দুই থাকবে এমন মত প্রকাশিত হলে ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভা আয়োজিত হয়। সভাশেষে বের হয় প্রতিবাদ মিছিল। সেখানে দাবি ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। গাজীউল হক এই প্রতিবাদের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এর কয়েকদিন পরে, ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আয়োজিত আরও একটি প্রতিবাদ সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন।

procession-march-held-on-21.jpg…..
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা মিছিল
……..
ভাষা আন্দোলনের আত্মদান সে-সময়কার তারুণ্যকে এতটাই আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল যে বাঙালির কবিহৃদয়ের নতুন এক দুয়ার খুলে গিয়েছিল। গাজীউল হকও লিখেছিলেন কবিতা ‘ভুলব না ভুলব না একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না…’। বাহান্নো-পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা এই গানটিও মুখে মুখে ফিরত। গাজীউল হকের একটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছিল জেলের কবিতা (১৯৫৯) নামে, গণচেতনা যে কবিতার কেন্দ্রীয় প্রেরণা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছিল বাঙালির ন্যায্য অধিকার ও মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে লেখা এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম (১৯৭১), এগিয়ে চলো (১৯৭১)। Bangladesh Unchained (১৯৭১) সে-সময়ে লেখা তাঁর আরেকটি বই। বাংলা একাডেমীর জীবনী গ্রন্থমালার আওতায় ভাষা আন্দোলনের সহসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সম্পর্কেও একটি বই লিখেছেন তিনি, মোহাম্মদ সুলতান (১৯৯৪) নামে। আইন বিষয়েও দুটি বই রয়েছে তাঁর: Media Laws & Regulation in Bangladesh (১৯৯২), বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন (১৯৯৬) নামে।

বদরুদ্দীন উমর তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গাজীউল হকের নাম এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে, এর মাধ্যমে তিনি এক প্রকার অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন। এ ইতিহাসে তাঁর স্থান তিনি নিজের কর্মের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট করে গেছেন, এর জন্য কোনো অসত্য প্রচারণার প্রয়োজন হয় নি।’

তাঁর সাহসিকতার পরিচয় কেবল ভাষা আন্দোলনের সময়ই দেখা যায় নি। পরবর্তী সকল অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় সংগ্রামে গাজীউল হক অংশ নিয়েছেন। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪-র সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠক হিসাবে ও পরে জাতীয় পর্যায়ের লেখক এবং সংগঠকের ভূমিকায় তাঁকে পাওয়া গেছে। তাঁকে পাওয়া গেছে ১৯৮০-র দশক জুড়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। পেশায় তিনি আইনজীবী ছিলেন। আইন ব্যবসায়ী হিসাবেও ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে সর্বদা সমুন্নত রেখেছিলেন। আদালতে আইনজীবী হিসাবে সবসময় বাংলায় কার্য পরিচালনা করতেন। রাজনৈতিক মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থের চেয়ে আদর্শকে অগ্রাধিকার দিতেন। নিজে অর্থব্যয় করে মামলা পরিচালনা করেছেন এমন নিদর্শনও আছে। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে কর্নেল তাহেরের যখন সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছিল তখন কর্নেল তাহেরের পক্ষে মামলা লড়বার মতো আইনজীবী পাওয়া যাচ্ছিল না অর্থাৎ সামরিক শাসক গোষ্ঠীর বিরোধিতা করবার মতো সাহসী আইনজীবী খুঁজে পাওয়া যায় নি। গাজীউল হক কর্নেল তাহেরের পক্ষে সেই মামলা লড়বার সাহস দেখিয়েছিলেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতীকী বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি একজন বিচারকও ছিলেন।

দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে যৌবনে তিনি ছিলেন বাম চেতনাসম্পন্ন রাজনীতিক। বামপন্থার প্রতি তাঁর সমর্থন সর্বদাই বহাল ছিল। পরে, স্বাধীনতা উত্তর কালে অবশ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। ভাষা আন্দোলনের ফসল বাংলা একাডেমীরও তিনি ছিলেন আইন উপদেষ্টা। হামদর্দ-এর বোর্ড অব ট্রাস্টির তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। বগুড়া হামদর্দ ইউনানী মেডিক্যাল কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি।

গাজীউল হকের মতো এমন উজ্জ্বল ও সক্রিয় একজন মানুষ সম্পর্কে আমরা কত কম জানি! আমাদের স্বাভাবিক ঔদাস্যের শিকার হয়ে মৃত্যূত্তর গাজীউল হক আরও বিস্মৃতপ্রদোষে চলে যাবেন না তো?

টীকা
১. ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি বার কাউন্সিলের লাইব্রেরিতে রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের এক সমন্বিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভাতেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতিকে মনোনীত করা হয় কমিটির সভাপতি।

২. সমকাল, ১৯ জুন ২০০৯।

ঢাকা ১৬/৭/৯


5 Responses

  1. অসাধারণ লেখা। খুবই ভালো লেগেছে। গাজীউল হক সম্পর্কে আমাদের জানা শোনার সত্যি অভাব আছে এবং ছিল। ধন্যবাদ লেখককে এমন চমৎকার করে তাঁর সম্পর্কে লেখার জন্য।

    – শাহজাহান শামীম

  2. প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহারকে ধন্যবাদ একটি ভাল লেখার জন্য। গাজীউল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় বছর দশেক আগে থেকে। বড় ভাল লোক ছিলেন। তাঁকে নিয়ে দুটি প্রবন্ধ লিখেছি। এবার একটা স্মৃতিকথা লিখব। গাজীউল হকের আরো মূল্যায়ন হওয়া দরকার।

    – তপন বাগচী

  3. সোহাগ says:

    লেখা পড়ে খুব ভালো লাগলো। অসাধারণ একটা লেখা। আমার আসলে গাজীউল হকের সম্পর্কে জানার ইচ্ছা ছিল। বাট আজকে অনেকখানি জানতে পারলাম। দয়া করে যদি ওনার একটা জীবনী পাবলিশ করতেন তাইলে হয়তো আরো অনেক জানতে পারতাম। থ্যাংকস।

    – সোহাগ

  4. সৈয়দ আলি says:

    যদি কিছু মনে না করেন। আমাদের সংস্কৃতিতে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী রচনার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ সৌজন্যমূলক নিয়ম অনুসরণ করে তাদের সম্পর্কে অপ্রিয় সত্য কথা চেপে যাওয়া হয়। এটি নিঃসন্দেহে ভালো একটি নিয়ম, কিন্তু ইতিহাসের কণিকা ছড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি অসাধুতা। গাজীউল হককে যারা জানতেন, তার একবাক্যে তাঁকে একজন বিরলপ্রায় ভদ্রলোক হিসাবে চিহ্নিত করবেন সন্দেহ নেই। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তীকালে যখন পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসককুল ধরপাকড় শুরু করলো, তখন গাজীউল হক তার পিতার মুরীদের বাড়িতে আত্মগোপন করেন এবং মুচলেকা দিয়ে পুলিশি ঝামেলা থেকে মুক্ত হন। ইতিহাসের বিশুদ্ধতার জন্য এই তথ্যটুকু উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।

    – সৈয়দ আলি

  5. সৈয়দ আলি says:

    একটি তথ্য সম্পূর্ণ করতে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

    আব্দুস সামাদ আজাদ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে থেকে তার নামের সাথে আজাদ যু্ক্ত করে পরিচিতি লাভ করেন, এটি সত্যি কথা। তিনি যখন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ছিলেন, তখন তাঁর ছদ্মনাম ছিলো আজাদ। অনেকেই হয়তো জানেন না যে তিনি একসময় কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাঁর নেতার নামটি বলে সবাইকে আরেকটু চমকে দেয়া যাক – মাহমুদ আলী। হ্যা, ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিরোধী এবং অমর চরমপত্রে “চোষ পায়জামা” নামে অভিহিত এই ব্যক্তিই এক সময়ের কমিউনিস্ট। রাজনীতির গতিপথ বড়ই আঁকাবাঁকা :)

    – সৈয়দ আলি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.