উপন্যাস

রৌরব (কিস্তি ১১)

leesa_gazi | 19 Jul , 2009  

কিস্তি ১কিস্তি ২কিস্তি ৩কিস্তি ৪কিস্তি ৫কিস্তি ৬কিস্তি ৭কিস্তি ৮কিস্তি ৯কিস্তি ১০

(কিস্তি ১০-এর পর)

leesa-11.jpgরাবেয়ার মার খুব ভয় লাগছে। খালুজানের জন্য আটার রুটি চার পাঁচটা বেলে রেখেছে, খেতে বসলে গরম গরম সেঁকে দেবে। আপাতত হাতে আর কোনো কাজ নাই। সারা বাড়ি কবরের মতো ঠাণ্ডা মেরে গেছে। এতটাই ঠাণ্ডা যে বারান্দা থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক রান্নাঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ছেদ পড়ছে আবার শুরু হচ্ছে। বারান্দার দরজা বন্ধ করে আসা দরকার। মুখলেস সাহেব কিছুক্ষণ আগে বসার ঘরে গিয়ে বসেছেন। বারান্দায় মনে হয় ঠাণ্ডা লাগছিল। গরম চাদরে গা মাথা জড়িয়ে রেখেছেন। বারান্দার দরজা খোলা দেখলে
—————————————————————–
তলানির পানি প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথের উপর দিয়ে কাঁচের মার্বেলের মতো গড়িয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে টুপ টাপ ঝরে পড়ে। লাভলির পাঁচ আঙুল চেপে বসে ছুরির বাটে, আঙুলের চাপে হাতের তালু রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নীল শিরা ফুটে বের হয়।… বিউটির প্রায় বুজে আসা চোখ আর ফিক ফিক হাসি থমকে যায়, দুই চোখের পাতা প্রথমে পুরোপুরি বুজে যায়, তারপর বড় হতে থাকে—নদীর চরের সাদা, অর্ধ চাঁদের জ্যোতি, অনন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রাতের রেলগাড়ির হেডলাইটের আলোর মতো তীব্র কিন্তু স্থির।
—————————————————————-
ফরিদা নির্ঘাত খেঁকিয়ে উঠবেন। কিন্তু রাবেয়ার মা প্রাণে ধরে যেতে পারছে না। আজকে কী যেন হচ্ছে, বদ বুঁ ঘিরে ধরেছে বাসাটা আর থেকে থেকে শরীরে কাঁপুনি ধরছে। পিচ্চিও রাবেয়ার মার পাশে চুপ করে বসে আছে। তার শীত করছে, হাত-পা হীম হয়ে যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে কেউ না কেউ তাকে ধরে বেদম ধোলাই দিবে।

টেবিলে খাবার দিবে কি না রাবেয়ার মা বুঝতে পারছে না। গরম করতেও তো সময় লাগবে। রুটিগুল সেঁকে ফেলা দরকার। সে ভীষণ একটা পেরেশানির মধ্যে পড়েছে।

—পিচ্চি উঠ, টেবিল লাগা গিয়া।

—আইজকা কেউ খাইতো না।

—খাইতো না?

—খাইতো না।

—আমরা কী করতাম? আমার পেট ভুক লাগছে।

—আমারও।

দু’জন মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে রান্নাঘরে বসে রইল এক সময় দু’জনেরই ঝিমুনি এল। এর মধ্যে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে কেউই জানে না। তবে রাত গভীর হচ্ছে এটা বোঝা যায়। শীতের রাত, কুয়াশার আড়ালে চলে গেল।

প্রথম ফরিদার ঘরের দরজা হাট করে খুলে গেল। অন্য দিনের মতো নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেন, রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন পিচ্চি আর রাবেয়ার মা ঝিমাচ্ছে। রাবেয়ার মা’র মাথা দেয়ালে ঠেস দেয়া আর পিচ্চি দুই হাঁটুতে দুই হাত লম্বা করে রেখে মাঝখানে মাথাটা ছেড়ে দিয়েছে। দু’জনের দিকে ফরিদা মুহূর্তক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর সজাগ করলেন।

—রাবেয়ার মা টেবিলে ভাত বাড়ো।

রাবেয়ার মা’র মাথাটা কেঁপে উঠল, ধড়মর করে উঠে বসল। পিচ্চি হাত দু’টা গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।

—টেবিল লাগা, পানি দে। জলদি কর, যা—অনেক রাত হইছে।

পিচ্চির মধ্যে কোনো তাড়া দেখা গেল না। কিন্তু রাবেয়ার মা তড়িঘড়ি শুরু করে দিল। ঘুম ঘুম চোখে সে চুলা জ্বালিয়ে তাওয়া বসাল রুটি সেঁকবার জন্য। তার হঠাৎ ভীষণ শীত করছে। গায়ের চাদর ভাল করে জড়িয়ে নিল। শীতে দুই কাঁধ বুকের দিকে চেপে আসছে, সে একটু পর পর তাওয়ার উপর হাত মেলে ধরছে আবার হাতে হাত ঘষছে। রাবেয়ার মা’র সাথে ফরিদাও হাত লাগালেন। পাশের চুলা জ্বালিয়ে তরকারি গরম বসালেন। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি তদারকি করলেন, হুকুম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন না।

—রাবেয়ার মা লেবু কাইটা দিও। পিচ্চি, এই পিচ্চি।

—জি নানি?

—কাটা ফেলবার প্লেট দিস। আল্লাহ’র তিরিশটা দিন মনে করায় দিতে হয়।

পিচ্চি মাথা নেড়ে খাবার ঘরে ফিরে গেল। ফরিদা রান্নাঘর থেকেই পিচ্চিকে বললেন মুখলেস সাহেবকে ডাকতে। নিজের হাতে হাঁসের মাংস আর ইলিশ পোলাও গরম করে বাটিতে বাড়লেন। রাবেয়ার মা টেবিলে দিয়ে আসল। ফরিদা টক দইয়ের সাথে শসাকুচি মিশিয়ে চট করে রাইতা বানালেন। সবকিছু শেষ করে খাবার ঘরে এসে দেখলেন মুখলেস সাহেব চুপ করে তার চেয়ারে বসে আছেন। দু’জনের একবার চোখাচোখি হল, কেউ কিছুই বললেন না। ফরিদা প্রথমে লাভলির ঘরের দরজায় হালকা টোকা দিলেন তারপর বিউটির দরজায়।

—লাভলি খেতে আয়। বিউটি খাবি না? —আয়।

ফরিদা টোকা দিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে আসার সাথে সাথেই দুই মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওরা যেন এতক্ষণ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ডাকতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। ওদের কারও চেহারা দেখে ভিতরে কী ঘটছে বোঝার জো নাই। প্রতিদিনের মত যার যার চেয়ারে গিয়ে বসল। লাভলি বাসায় ফেরার পর এই প্রথম ফরিদার মুখোমুখি হল। কিন্তু ফরিদা বা লাভলি কেউই তা নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। সবাই স্বাভাবিক থাকল। লাভলির মাথা আসলে একেবারেই কাজ করছিল না—নইলে ভয়ে ওর হাত-পা এতক্ষণে পেটের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার কথা। ওর যে অপরাধী মুখ করে থাকা উচিৎ সেটাও বেমালুম ভুলে গেছে। ক্ষুধা আর পানির পিপাসায় ওর অবস্থা খারাপ। খাওয়া শুরু হতেই লাভলি পোলাওয়ের উপর একরকম হুমড়ি খেয়ে পড়ল। খাবার সময় কোনো কাথাবার্তা হল না। ফরিদা সাংসারিক যা দু’একটা টুকটাক কথাবার্তা খেতে বসে বলেন এখন সেই চেষ্টাও করলেন না। চার চেয়ারে চার জন ক্লান্ত মানুষ মাথা নিচু করে গোগ্রাসে খাচ্ছে।

এই মুহূর্তে মুখলেস সাহেবের খাবার এবং খাওয়ার পরে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ার চিন্তা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ঘুরছে না। দুপুর থেকে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঠাণ্ডা ঢুকে গেছে। আজকে সারাদিন তিনি মানসিকভাবে ভীষণ নড়বড়ে অবস্থায় ছিলেন, নিজেকে কেঁচোর কাছাকাছি কোনো জীব বলে মনে হয়েছে।

বিউটি মাছের কাটা বাছছে পূর্ণ মনোযোগে, এখন যদি পৃথিবী রসাতলেও যায় তার কিছু যাবে আসবে না।

ফরিদা খাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কোনো কিছুর স্বাদ পাচ্ছেন না—লাভলি ফিরে আসার পরে উনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি নিয়ে নেয়ার পর হালকা বোধ করছেন। ঠিক করেছেন আবদুুল বশির সাহেবের ব্যাপারটা মেয়েদেরকে খুলে বলবেন। লাভলি তো জানেই, তবুও দুই মেয়েকে একসাথে বসিয়ে বলবেন। তার আগে মেয়েদের কঠিন নিষেধ করবেন বলার সময় কেউ যেন কথার উপর কথা না বলে বা অহেতুক প্রশ্ন না করে। কথা শেষ হওয়ার পরে তাদের যদি কিছু বলার থাকে তিনি তা শুনবেন। তবে আজকে রাতে না—নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার জন্য সবারই আজকের রাতটা দরকার।

লাভলি খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু আশেপাশে যা হচ্ছে বা ঘটছে সব কিছু ওর কাছে ঝাপসা লাগছে। যেন প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের খোলা জানালার পাশে লাভলি বসে আছে আর বাইরের দৃশ্য ক্রমাগত ওকে ফেলে দূরে সরে যাচ্ছে। বাইরের জগতের ঝাপট লাগছে, কিন্তু ঠাহর হচ্ছে না।

রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে, এক এক করে সবাই যার যার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার সময় প্রত্যেকেই আরেকটু নুব্জ হল—কাঁধের উপর অসহ্য চাপ ওদের মাথা, ঘাড় মাটির কাছে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওদের এই মানসিক অবস্থা সংক্রমিত হল বাড়িটার মধ্যেও।

মনিপুরি পাড়া ১১৫/৩। রাত এখন প্রায় সোয়া বারোটা। মহল্লার গলি ঘুঁপচিতে লেপটে থাকা কুয়াশা ক্রমশ ঘন হচ্ছে। ঘন হতে হতে চতুর্দিক থেকে এক সময় বাড়িটাকে নাই করে দিল। শীত রাতের চাঁদ তীব্র সার্চ লাইট ফেলেও বাড়িটাকে খুঁজে পেল না। ঠিক সেই সময় লাভলি ড্রয়ার থেকে ছুরিটা বের করল। বিছানার তোশকের নিচে রাখতে হবে—কিন্তু রাখবার আগে আরেকবার শানিয়ে নিতে চায়। মুগ্ধ হয়ে ছুরির ধার পরখ করল। ডান হাতের তর্জনি দিয়ে স্টেনলেস স্টিলের পাতের উপর আলতো বুলিয়ে গেল আঙুল।

—(আপুমনি, আপনের মতলব কী?) —

—কই ছিলা এতক্ষণ?

—(ঘুমায়ছিলাম। আপনে কার জন্য বইসা আছেন।) —

—বিউটির জন্য।

—(ছোটো আপু আসবে না ঘুমায় পড়ছে।) —

—আসবে।

—(আসলে কী করবেন?) —

—খেলবো।

—(আমি কই কী আজকে খেলাধূলা বাদ দেন। রেস্ট নেন। ধকল গেছে না।) —

লাভলি ভীষণ মজা পেল। মাথার ভিতরের লোকটা ওকে ভয় পাচ্ছে। এরকম অভিজ্ঞতা লাভলির এই প্রথম যেখানে ওর হাতে কলকাঠি—যেভাবে নাড়বে সেভাবে নড়বে।

দরজায় টোকা পড়ল। কান পেতে না রাখলে শোনা যাওয়ার কথা না, এতটা আস্তে। প্রথম টোকাতেই লাভলি সচেতন হল। দরজা খুলবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠল। টেবিলের উপর ছুরিটা রেখেও হাতে তুলে নিল। দরজার কাছে যাওয়ার আগে বালিশের নিচে রাখল।

—(আপুমনি, দরজা খুইলেন না। আজকে চলেন শুইয়া শুইয়া মজা করি। যে আসছে সে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়ে চলে যাবে।) —

লাভলি অবিচল হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। বিউটি দাঁড়িয়ে আছে, ঘরের আলো লাভলির ডান কাঁধের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে বিউটির মুখের একপাশ আলোকিত করেছে, অন্যপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কারও জন্য এক চুল নড়ল না।

—আপা, সরো ঘরে যাইতে দাও।

—কেন?

—(ঠিকই বলছেন এতোরাতে ঘরে কী?) —

—ঝগড়া করবো না, বিদ্যা।

অবিকল ছোটবেলার মতো করে বিউটি বলল। লাভলি সরল না। বিউটি একটু সরে গিয়ে ওর শরীর ঘেঁষে ঘরে ঢুকল। লাভলি দরজা ফিরে লাগাল না, বিছানায় গিয়ে বসল। এক হাত আলতো করে বালিশের উপর রাখল। মনস্থির করতে পারছে না, ছুরিটা বিউটিকে দেখাবে কি না।

—ঘুমাবি না?

—ঘুম আসতেছে না। আপা, খেলবা?

—না।

প্রত্যাখ্যানে বিউটি জ্বলে উঠল। “কেন খেলবা না।”

—সারাদিন হাঁটাহাঁটি করছি, ঘুম আসছে।

বিউটি কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। লাভলি আরেকটু সঙ্কুচিত হল। বালিশের আরও কাছ ঘেঁষে বসল।

—ঘুম তোমার আসে নাই।

বিউটির কথায় ও কেঁপে উঠল। বালিশের উপর ওর ডান হাতের পাঁচ আঙুল ভীষণ অবাধ্য হয়ে উঠল।

—বালিশের নিচে কী?

—(সারছে!) —

—বালিশের নিচে কী আপা?

লাভলি উত্তর দিতে গিয়ে টের পেল গলা শুকিয়ে আসছে। শব্দ করে গলা পরিষ্কার করল।

—কিছু না, একটা ছুরি। আজকে নিউ মার্কেট থিকা কিনছি।

লাভলি বিছানা থেকে উঠে খাবার ঘরে এল। টেবিলের উপর ঢেকে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালল, তারপর পুরো এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল।

—(আপুমনি, আমার তরফ থেকে আরেক গ্লাস খান, শীতল হই।) —

—তুমি ঘুমাইতেছো না কেন?

—(আপনে না ঘুমাইলে কেমনে ঘুমাই।) —

—না ঘুমাইলে চুপ থাকো।

লাভলি আরেক গ্লাস পানি ঢেলে নিয়ে ঘরে ফিরে এল। বিউটি ছুরি হাতে বসে আছে—লাভলিকে ঘরে ঢুকতে দেখে কামড়ে ধরা ঠোঁট হাসি হাসি হল। লাভলি এক হাতে দরজা বন্ধ করে ছিটকানি লাগাল। পানি এনে ঘরের ছোট টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখল। অন্য কোনো দিকে তাকাল না। যথাসাধ্য চেষ্টা করল শব্দ না করে চেয়ার টেনে বসতে, ইশারায় বিউটিকেও উল্টাদিকের চেয়ারে এসে বসতে বলল।

—আজকে আসল ছুরি দিয়ে খেলব, না আপা?

কিশোরী-গলায় কথা বলে উঠল বিউটি। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া তার খুশি খুশি লাগছে। আপাকেও ভাল লাগছে। লাভলির উল্টা দিকের চেয়ারে এসে ধপ করে বসল সে। ছুরিটা পানির গ্লাসে ঠেস দিয়ে রাখল।

—হুম…।

—(আপুমনি, আপনের অবস্থা কিন্তু কেরাসিন। খেললে ধরা খাবেন।) —

“আম্মা তুমারে কোথায় পাঠাইছিল? বলতেই হবে।” ছুরির উপর থেকে চোখ সরাল না বিউটি, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

—আমারে কেউ কোথাও পাঠায় নাই। বললাম তো গাউছিয়া থিকা রমনা পার্কে গেছিলাম।

—যে মানুষ জন্মে একা বাড়ির বাইর হয় নাই, সে বলা নাই কওয়া নাই রমনা পার্কে চইলা যাবে—তুমি বললা আর আমি বিশ্বাস করলাম।

—বিশ্বাস না করলে নাই। যা হইছে তাই বললাম। ঐখানে একটা লোকের সাথে পরিচয় হইল, সে বাসা পর্যন্ত দিয়া গেছে।

লাভলির কথা শুনে বিউটি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে দুলতে থাকে। হয়তো সত্যিই রমনা পার্কে গেছিল। তবে শেষের কথাটা একেবারেই ফালতু।

—আম্মা যদি তোমারে না পাঠায়ে থাকে, তাইলে তুমি যে এত দেরি করে বাসায় ফিরলা আম্মার তো তোমারে খায়ে ফেলার কথা। আমারে বলো আপা, সত্যি বলতেছি আমি কাউরে বলবো না।

কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই চাপা গলায় খিক খিক করে হাসতে লাগল বিউটি। লাভলি চমকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না।

—আমাদের দু’জনেরই মাথা আওলা হইছে। আরে, আমি বলবটা কারে, বলার মানুষ আছে। তুমার সাথে কার পরিচয় হইছে—একটা লোকের? সে আবার বাসা পর্যন্ত আইসা পৌঁছায় দিয়া গেছে।— এ্যাহ্—।

তাচ্ছিল্যের চোটে ঠোঁটসহ গলার স্বর বেঁকে গেল বিউটির। কাশির দমকের মতো খিক খিক হাসি নিয়ন্ত্রণহীন ফিরে এল। লাভলি অনেকক্ষণ বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকল। কেন, ওর সাথে কি কোনো মানুষের দেখা বা পরিচয় হতে পারে না? বিউটি কি ভুলে গেছে রিয়াজ ওকেই পছন্দ করেছিল, ওকে।

—(আপুমনি এই সব পুরান প্যাঁচাল ফালায় থোন। একটা কথা কিন্তু ছোটো আপা খাপে খাপ বলছে, সন্ধ্যা কইরা বাসায় আসলাম তারপরও আমরা দুইজনেই বহাল তবিয়তে আছি, রহস্যটা কী?) —

এই ধাঁধার জবাব বাসায় ফেরার পর থেকে লাভলিও খুঁজছে। একটাবার ফরিদা জিজ্ঞেস তো করলেনই না ও কোথায় ছিল উল্টা তিনিই যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। চোখে চোখে তাকান নাই পর্যন্ত। তার মানে কী এই ও এখন থেকে ইচ্ছা মতো চলতে ফিরতে পারবে, কাউকে পরোয়া করতে হবে না। সবই আকাশ কুসুম ভাবনা তারপরও নিজের ভিতর আশ্চর্য রকম জোর অনুভব করল লাভলি। বিউটির দিকে তাকিয়ে দেখল গলা এখনও বেঁকে আছে আর বিশ্রী হাসিটা লালার মতো ঠোঁটের প্রান্তে লেপটে আছে। কঠিন শিক্ষা পাওনা হয়েছে বিউটির।

—(আবার ছোটো আপারে নিয়া পড়লেন, খালাম্মা কেন আপনেরে ধরতেছে না সেইটা নিয়া ভাবেন। এর মধ্যে একটা কিন্তু আছে।) —

—এই কিন্তুরে দুই পয়সা দিয়া পুছি না।

মনে মনে লোকটাকে জবাব দিয়ে লাভলি ছুরিটা হাতে তুলে নিল। হাতের মুঠির ভিতর স্টেনলেস স্টিলের ঠাণ্ডা পাত ওর শরীরে শিহরণ জাগাল। মুঠি আলগা করতে গিয়ে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

—আপা খেলবা?

—না।

—আমিও খেলতে চাই না।

—আজকে আমি আম্মা হবো তুই আমি।

—বললাম তো খেলতে চাই না।

—দেরি করে ফিরছি, আম্মা এখন ভিতরের কথা বার করবে তারপর ঘর বন্ধ করবে—না, না ঘরবন্ধ না একদম জানে মাইরা ফেলবে।

—আমি আম্মা হবো আর তুমি তুমিই থাকবা। দেখি…।

বিউটি ছোঁ মেরে ছুরিটা হাতে নিতে চেষ্টা করল কিন্তু লাভলি শক্ত মুঠিতে ধরে রইল। বিউটির পক্ষে ওর সাথে জোরাজুরিতে টেকা সম্ভব হল না।

—না, আমি আম্মা।—এতক্ষণ কই ছিলি?

লাভলি অবিকল ফরিদার গলায় ধমকে উঠল। ধমকের দাপটে বিউটি কেঁপে উঠল, কিন্তু খেলার খেই হারাল না। প্রায় সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে লাভলির মতো করে নরম-গলায় উত্তর দিল।

—গাউছিয়া গেছিলাম।

—তোরে বললাম না গাউছিয়া যাই নাই রমনা পার্কে গেছিলাম। খেললে ঠিক মতো খেল… না খেললে নাই।

—রমনা পার্কে কেন গেছিলা?

—তুই জিজ্ঞাস করতেছিস কেন? প্রশ্নটা আমি তোকে করবো।

আজকে লাভলি অন্য মানুষ। আজকে সবাই যা না তাই। সবাই খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে।

—রমনা পার্কে কেন গেছিলি?

—জানি না, ঘুরতে।

বিউটি মনোযোগ দিল খেলায়। খেলার নিয়মকানুন মাথা থেকে ছুটে যাচ্ছে, আর ভুল করা যাবে না।

—ঘুরতে? কার সঙ্গে গেছিলি? আজকে তোরে জানে শেষ করবো। ছিনালি বার করবো আমি তোর।

লাভলির ভ্রƒ ভীষণ রকম কুঁচকে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলি বেরিয়ে এল।

—কারও সঙ্গে যাই নাই। কার সঙ্গে যাবো?

—হারামজাদী তোদের দুইজনরে এমন শায়েস্তা করবো যে জন্মের মতো লুলা হইয়া ঘরে বইসা থাকবি।

—আমরা তো লুলাই।

কথাটা বলেই বিউটি লাভলির হাত থেকে ছুরিটা ছিনিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যাপারটা এতটাই অতর্কিতে ঘটল যে এর জন্য ও মোটেও তৈরি ছিল না। বিউটি বিপজ্জনক ভঙ্গিতে ছুরিসহ হাতটা লাভলির চোখের উপর দোলাতে লাগল।

—এখন কে কারে শায়েস্তা করবে? লুলা বানায় রাখবে, শখ কতো!

ছুরির গুঁতা থেকে বাঁচবার জন্য লাভলি ওর মাথা পিছনে সরিয়ে নিল আর একই সাথে মেঝেতে দু’পা ঘষটে চেয়ারটাও সরাবার চেষ্টা করল।

—মনে রাইখো আমি সব জানি। সবার সব কীর্তি আমার জানা। আমার নাকের ডগার সামনে দিয়া চুমাচুমি বার করতেছি। কত্তো বড় শয়তান আমি চুমা দিলে চুমা নেয় না। কেন, আমার ছ্যাপে কি বিষ না কি, তোমারটায় মধু, মধু।

এক ঝটকায় লাভলি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। বিউটি লাভলির উপর ছুরি নিয়ে প্রায় অর্ধ চাঁদের মতো বেঁকে ছিল, হঠাৎ করে উঠে পড়ায় লাভলির খালি চেয়ারটায় হেলে পড়ল সে এবং হাত থেকে ছুরি খসে পড়ে গেল পাকা মেঝেতে। সিমেন্টের মেঝেতে স্টেনলেস স্টিল ঝন ঝন করে উঠল। চেয়ারের পিঠ ধরে বিউটি নিজেকে সামাল দিল, তারপর মেঝে থেকে ছুরিটা তুলে টেবিলের উপর রাখল।

দুই বোনই হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। দু’জনেরই বাতাসের অভাব অনুভূত হল। বিউটি চেয়ারে বসল, হাত-পা বশে ছিল না। পানির গ্লাসটা মুখে তুলতে গিয়ে বেশ খানিকটা ছলকে পড়ল।

—নিজের পানি নিজে নিয়া আয় বিউটি। এই পানি আমি আমার জন্য আনছি।

বিউটি ওকে পাত্তা না দিয়ে প্রায় পুরোটা পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল এবং তৃপ্ত হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল। সহজ স্বাভাবিক হাসি। তলানিতে পড়ে থাকা পানিসহ গ্লাসটা বোনের দিকে বাড়িয়ে দিল। বাড়িয়ে ধরা হাতের দিকে ভ্রূক্ষেপ করল না লাভলি। অন্য চেয়ারটা এক হাতে টেনে বিউটির খুব কাছে নিয়ে এল, তারপর চুপ করে সেটায় বসল। পানির গ্লাসটা বিউটি ছুরির পাশে হেলাফেলা করে রাখল।

—রিয়াজের কথা তুই আম্মারে বলছিলি। আমি ভাবলাম কাদের।

বিউটি ফিক করে হেসে ফেলল। লাভলি একবারও তার দিকে তাকাল না। অলস দৃষ্টিতে গ্লাস আর গ্লাসের নিচে পড়ে থাকা পানির দিকে মাথা ঈষৎ নিচু করে তাকিয়ে থাকল।

ঠিক কতক্ষণ লাভলি তাকিয়েছিল আমরা জানি না। শুধু এইটুকু জানি শান্ত পুকুরে বড় মাছের আতকা ঘাই যেমন দুর্দান্ত আলোড়ন তোলে তেমনি লাভলির শরীরের গভীরে অদেখা কেউ আচমকা ঘাই মারল—সময়ের চেয়ে ধীর গতিতে লাভলি টেবিল থেকে ছুরিটা হাতে তুলে নিল, তুলে নেয়ার সময় কুঁচকে থাকা টেবিল ক্লথের অংশ উঠে এল হাতে—হাত অপ্রস্তুত হয়ে টেবিল ক্লথটা ছেড়ে দেয়, ছুরিটা দ্বিধান্বিত কেঁপে ওঠে আঙুলের ফাঁকে। এক মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্য ছুরিটা সম্পূর্ণভাবে পাঁচ আঙুলের আওতা থেকে শূন্যে বেরিয়ে এসেই আবার পাঁচ আঙুলের কড়াল মুঠিতে বন্দি হয়ে যায়। এই আন্দোলনে গ্লাসটা কাঁৎ হয়ে পড়ে। তলানির পানি প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথের উপর দিয়ে কাঁচের মার্বেলের মতো গড়িয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে টুপ টাপ ঝরে পড়ে। লাভলির পাঁচ আঙুল চেপে বসে ছুরির বাটে, আঙুলের চাপে হাতের তালু রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নীল শিরা ফুটে বের হয়। দু’জনের বোধের সীমানা ছাড়িয়ে বিউটির দুই পাঁজরের ঠিক নিচে স্টেনলেস স্টিল ছুরি আমূল ঢুকে যায়। বিউটির প্রায় বুজে আসা চোখ আর ফিক ফিক হাসি থমকে যায়, দুই চোখের পাতা প্রথমে পুরোপুরি বুজে যায়, তারপর বড় হতে থাকে—নদীর চরের সাদা, অর্ধ চাঁদের জ্যোতি, অনন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রাতের রেলগাড়ির হেডলাইটের আলোর মতো তীব্র কিন্তু স্থির।

শীতের রাতের ঝিম ধরা নৈঃশব্দ ওদের গিলে খাচ্ছে। বিউটির এক হাত বাতাসে ঝুলতে থাকে, আরেক হাত টেবিলের ওপর এলানো; মাথাটা তার ওপর এলোমেলো পড়ে আছে। এত যতেœর কালো চুলের বন্যা চেয়ারের পিঠ ছাপিয়ে ঢেউ তুলছে। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসির আভাস দেখা গেল কি গেল না। এত জোরে চীৎকার দেয়ায় তাকে একটু লজ্জিত দেখাচ্ছে। চোখ দু’টিতে বিস্ময় না কি বোনের কীর্তিতে মুগ্ধতা বোঝা গেল না।

বন্ধ দরোজায় প্রচণ্ড জোরে বাড়ি পড়ছে। সেই শব্দ লাভলির কান ভেদ করে, মস্তিষ্ক ভেদ করে, বুক ভেদ করে তবুও ভিতর পযন্ত পৌঁছায় না।

(কিস্তি ১২)

রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন

অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ

leesa@morphium.co.uk


3 Responses

  1. রাশিদা সুলতানা says:

    উপন্যাসটির প্লট, ভাষা, লেখনশৈলী… চমৎকার! অভিনন্দন!

    – রাশিদা সুলতানা

  2. লীনা says:

    সুন্দর এবং গভীর।

    – লীনা

  3. আদিব says:

    চমত্‍কার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.