জাপানে কোদো উৎসবে

রাশিদা সুলতানা | ২৬ জুন ২০০৯ ১:৫৭ পূর্বাহ্ন

rs3.jpg
সাদো দ্বীপ

16_kodo_lg.jpg
২০০৬-এর আর্থ সেলিব্রেশন কোদো উৎসবে ড্রাম বাজাচ্ছেন দুই শিল্পী

When I dance
I cannot Judge
I cannot hate
I cannot separate myself from life
I can only be joyful & whole
That is why I dance
–Hans Bos

rs1.jpg…….
সাদো দ্বীপের পাশে সমুদ্রের মাঝে ছোট গোল নৌকায় লেখক
…….
কিয়োতোর এক সান্ধ্য আসরে আমার বান্ধবী স্যালি প্রথম জানায় দুদিন পর তারা যাচ্ছে কোদো উৎসবে। আমার দু’চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখে সে জানায় নিগাতার কাছাকাছি জাপান সমুদ্রের সাদো দ্বীপে ড্রাম ও সঙ্গীত উৎসব। স্যালি ও উপস্থিত অন্য বন্ধুরা বলে, “তুমিও চলো, দারুণ এক অভিজ্ঞতা।” আমার দোনোমনো কাটে না। কোদো প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতেই, স্যালি, দেইদ্রা-দের চোখমুখের উদ্ভাস দেখে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

আমার বন্ধুরা কিয়োতো জার্নাল-এর স্টল বসবে বলে একদিন আগেই রওয়ানা হয়ে যায়। আমি জু’হাচি কিপ্পু টিকিট কিনি, ছাত্রছাত্রীদের জন্য বছরের বিশেষ সময়ে বিশেষ ছাড় দেওয়া টিকিট। সকালবেলা ট্রেনে চেপে অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ভিতর দিয়ে পার হই একের পর এক শহর। বেশ ক’বার ট্রেন বদলাই। ইট, কংক্রিট, পাহাড়, নদী, সমুদ্রে দৃশ্যপটের বদল ঘটে। পাহাড়, জঙ্গল, শহর আর স্বপ্নোপম উপত্যকার মধ্য দিয়ে নিগাতায় নায়্যেৎসু স্টেশনে পৌঁছাই। স্টেশনে নেমে ফেরির টিকিট কাটি। ফেরিতে উঠেই প্রথমে তিনতলার ডেকে চলে যাই। ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে ম্রিয়মাণ হতে থাকা বন্দরের কোলাহল। আমার মতো অনেকেই ডেকে বসে উপভোগ করে জাপান সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি। অল্প সময়ের মধ্যেই আর কোনোকিছুই দৃশ্যমান থাকে না। তিনতলার কেবিনরুমে এসে দেখি ব্যাকপ্যাক পাশে নিয়ে নানা বর্ণের নানা বয়সের নারী-পুরুষ নির্বিচারে কার্পেট-মোড়ানো মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কারো পায়ের কাছে মাথা, মাথার কাছে পা। সাদো দ্বীপে কোদো দর্শনার্থী এসব মানুষের বেশিরভাগই হয়তো কেউ কাউকে চেনে না, অথচ কী সহজে এ অন্যের পাশে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। রুমের এক কোনায় একটুখানি খালি জায়গা পেয়ে এক মেয়ের পাশে আমিও শুয়ে পড়ি এবং মুহূর্তে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাই।

দূর থেকে দৃশ্যমান বিন্দুর মতো, সমুদ্রের মাঝে পাহাড় ঘেরা, কোলাহলপূর্ণ ছোট্ট সাদো দ্বীপে আমাদের ফেরি ভেড়ে। হোটেল, এটিএম ম্যাশিন-সহ উন্নত শহরের সব সুবিধাই এই দ্বীপে আছে। ফেরি থেকে নেমেই স্যালিকে খুঁজে বের করি। স্যালি বলে, “আগে কনসার্টের টিকিট কেটে নাও, আর খোঁজ নাও কোনো তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায় কিনা। শুনেছি, এখানকার হোটেল, ব্যাকপ্যাকার্স, সব বুকড হয়ে গেছে। তবে কিছু তাঁবু ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে।” আমি ভয় পেয়ে যাই, শেষে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে হয় কিনা। আমার বন্ধুরা সবাই কিয়োতো থেকেই তাদের তাঁবু নিয়ে এসেছে।

কনসার্টের টিকেটের লাইনে বেজায় ভিড়। সাদা, কালো, লাতিন, জাপানি, নানা দেশের ভলান্টিয়াররা হিমশিম খাচ্ছে ভিড় সামলাতে। কাউন্টারে জানলাম সে-রাতে কোনো ব্যাকপ্যাকার্স হোটেল খালি নাই। পরদিন রাতে তারা আমার জন্য ব্যবস্থা করতে পারবে। সাদো দ্বীপের প্রথম রাতে পাহাড়ের নিচে সারি সারি তাঁবুর মাঝে একটা তাঁবু ভাড়া পাই। রাতে ভয় লাগে। মনে হয় পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবুতে যদি সাপ বা আনজানা কোনো পোকা ঢুকে কামড়ায়। অবশ্য জাপানিদের যে কোনো আয়োজনের ওপর ভরসা রাখা যায়। ভেতর থেকে তাঁবুর চেইন টেনে দিলে এটি হয়ে ওঠে একটা নিঃশ্ছিদ্র খুপরি। কাছাকাছির মধ্যেই আমার বন্ধুরা, স্যালি আর দেইদ্রা ঘুমাচ্ছে। আমার ঘুম আসে না। বাইরে ড্রামের শব্দ। সমুদ্রতীরে লোকজন নাচছে, গাইছে। তাঁবু ছেড়ে উঠে আমিও সমুদ্রতীরে চলে আসি। একপাশে দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা-কালো নারী-পুরুষেরা ফায়ার ড্যান্স করছে। কাছেই ড্রাম বাজাচ্ছে, গিটার বাজাচ্ছে, গাইছে একদল জাপানি নারী-পুরুষ। সমুদ্রগর্জন। অন্ধকারে আগুন নিয়ে নৃত্যরত মানুষ, রাতের কুয়াশা, ড্রামের শব্দ, মনে হয় পরাবাস্তব কোনো ছবির ভিতরে আমি। দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলে তাঁবুতে ফিরে যাই। ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায় গরমে। বাইরে আলো ফুটছে। সাগরপারে এসে দেখি রাতে যারা নাচছিল বা গাইছিল তাদের অনেকেই বেলাভূমির বালিতে পড়ে শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে।

রাতে ঘুম না হওয়ায় প্রথম কনসার্টের দিন সকালবেলা থেকেই সাদোর সমুদ্রতীরেই সাম্বা ড্যান্স, জাপানি স্থানীয় নাচ, নানা দেশের নানা নাচ চলছে। এ যে অনুষ্ঠানসূচির অংশ তা নয়; বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরাই নাচছে, আরেক পাশে নাচছে জাপানিরাও। সাদো দ্বীপে তিনদিন দিনরাত চলতে থাকে জাপানি লোকজ নৃত্য, ড্রাম, আফ্রিকান সঙ্গীত-নৃত্য, সাম্বা নৃত্য, আগুন নৃত্য, পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা উৎসবের তূরীয় আমোদপ্রমোদ। শহরের রাস্তায় সুদৃশ্য ড্রামসহ মুখোশ-পরা দেবতা-অপদেবতারা ঘুরছে দ্বীপকে বিপদ্-মুক্ত করতে। সাগরপারে গিয়ে বসি। রাতে ঘুম না হওয়ার ক্লান্তিতে ফেরি-বন্দরের কাছে বাঁধানো পাড়ের সিঁড়িতে গা এলিয়ে দেই এবং তৎক্ষণাৎ গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। ঘুম ভেঙে দেখি প্রায় এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। ক্লান্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলাম আমি। নিজেরও অবাক লাগে এত হাজার মানুষের চোখের সামনে, ড্রাম আর সঙ্গীত-নৃত্যের এই কলরব-রৌরবে কীভাবে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি! দুপুরে মঙ্গোলীয় আর থাই স্টল থেকে খাবার কিনে খাই। এই কোলাহল থেকে একটু দূরে, উঁচু পাহাড়ের পাশে, লোকজন টিকেট কিনে সমুদ্রে গোল-গোল নৌকায় চড়ছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরা সাদো দ্বীপের নারীরা এইসব নৌকার চালক, সমুদ্রের মাঝে ছোট গোল নৌকায় এইসব নারীদের দেখে মনে হয় “কমলে কামিনী”। আমিও টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়াই। দুলতে-থাকা ছোট নৌকায় সুন্দরী চালকের বরাভয় সত্ত্বেও, শক্ত হয়ে বসে থাকি।

rs2.jpg

বিকাল পাঁচটায় শিরোই পাহাড়ের পাদদেশে দীর্ঘ লাইন। “আর্থ সেলিব্রেশন”-এ অংশ-নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে শিরোই পাহাড়ের শানুদেশ থেকে পাহাড়চূড়ায় ওঠার পাথুরে পথে দারুণ দৃষ্টিনন্দন চতুষ্কোণ ফ্রেমে ঝোলানো অফ-হোয়াইট একেকটা লণ্ঠন। প্রত্যেক লণ্ঠনের কাগজে কালো ক্যালিগ্রাফিতে লেখা একটা করে হাইকু (জাপানি ঐতিহ্যবাহী তিন-লাইনের কবিতা)। পাহাড়ে নেমে-আসা সন্ধ্যার আঁধারে এমন স্নিগ্ধ মৃদু উদ্ভাস, আলোকসজ্জার এমন নান্দনিক রূপ, আমি জীবনে কোনোদিন আর কোথাও দেখি নাই।

কোদো মানে হৃৎস্পন্দন, সমুদ্র মন্থন করে যা সুর তুলে আনে। সার বেঁধে অনেকগুলো ড্রামে হালকা স্টিক দিয়ে একসাথে গুঞ্জন তোলে। যেন লক্ষকোটি মৌমাছি একত্রে অবিরাম গুনগুনিয়ে চলেছে। সেই গুঞ্জন সমস্ত মনপ্রাণচেতনায় প্রবাহিত, তরঙ্গায়িত হতে থাকে। হঠাৎ অট্টনিনাদে একবার ড্রাম বেজে ওঠে, তারপরে একেবারে নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ্য। অন্তরীক্ষ ভেদ করে যাওয়া ড্রামের সেই শব্দের অনুরণন দীর্ঘকাল ধরে কনসার্টের সব দর্শক-স্রোতা সমস্ত সংবেদনে অনুভব করে। এতে বিমূঢ়, বিহবল দর্শকেরা এই বাদ্যধ্বনি ও সঙ্গীতে সাদো দ্বীপের অরণ্য ও সমুদ্রের গভীরতাকে হৃদয়ঙ্গম করে। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মেয়ে সোফি বলে, “কোদোর এই কনসার্ট আধ্যাত্মিক এক অভিজ্ঞতা, একমাত্র জাপানিরাই পারে এই সৌন্দর্য তৈরি করতে।” কোদো দেখে ফেরা যে-কারো সাথেই কথা বলুন আপনি, তাদেরই মুখ থেকেই দেখবেন বিমূঢ়তা-বিহ্বলতা প্রকাশক শব্দের পর শব্দ বেরিয়ে আসছে। অসংখ্য ড্রামের বজ্রগর্জন আর কলাবিৎদের নানা সূক্ষ্ম কারুকলা, শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের এমন প্রকৃতিজোড়া নকশিকাঁথা, এ-অভিজ্ঞতার রেশ জীবনে কেটে যাবার নয়। প্রকৃতি থেকে প্রেরণা নেওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমুদ্র, বাতাস তথা প্রকৃতি মন্থন করে ড্রামে বা বাঁশিতে সুর তোলা, নৃত্যের ছন্দ তোলা কোদো দলেই সম্ভব।

নিউইয়র্কে জুলিয়ার্ড স্কুলে জ্যাজ সঙ্গীতের ওপর পড়ালেখা করে ওয়াতানাবে কাউরু যখন পরিকল্পনা করেন অফ-সেন্টার (কেন্দ্রাতিগ) কিছু একটা করবেন, তাঁর মনে হয় দেশে ফিরে কোদো দলে বাঁশি বাজানোই তাঁর জন্য হতে পারে আদর্শ স্থানান্তর। ওয়াতানাবে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি যখন কোদো দলে ইন্টারভিউ দিতে আসি, দলের প্রধান বংশিবাদক ইয়ামাগুচি মতোফুমির সাথে দেখা হলে বলি, ‘আপনার কাছে বাঁশি বাজানো শিখতে খুবই আগ্রহী আমি। ক্লাসিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে আমার।’ ইয়ামাগুচি বলেন, ‘বই পড়ো, সমুদ্র দর্শন করো, বাতাসকে বুঝতে চেষ্টা করো, পাহাড়, বৃক্ষ দ্যাখো, প্রকৃতি থেকে থেকে সুর তুলে নাও।’ টানা দশবছর কোদো দলে থেকে, সদস্যদের মধ্যে ‘বুশিদো’ স্পিরিট গড়ে তোলেন তিনি, যার মূলমন্ত্র হলো: বিশ্বস্ততা, শৃঙ্খলা আর দেশপ্রেম।

rsj.jpg……..
জাপানি পোশাকে জাপানি মেয়েদের সঙ্গে
…….
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোদোর উদ্বোধনী প্যারফরম্যান্স হয় ১৯৮১ সালে, বার্লিন ফেস্টিভাল-এ। তারপর থেকে এটা ক্রমাগত ছড়িয়ে গেছে, আরও সংহত আর বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়েছে। বর্তমানে কোদো বহদূরবিস্তৃত হয়েছে। নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানে, ওয়ার্ল্ড কাপ ফেস্টিভিটি, কার্নিয়েজ হল, সাদো দ্বীপের গ্রামের স্কুল… সর্বত্র। টানা তিনদিন ধরে জাপান সমুদ্রে সাদো দ্বীপে কোদো উপভোগ করা মানে শুধু কনসার্টে যাওয়া নয়, কোদোর মধ্যে দিয়ে জাপানি সংস্কৃতির দর্শন, অভিজ্ঞতা, আদর্শের মধ্য দিয়ে যাওয়া। পাহাড়চূড়ায়, খোলা অরণ্যে তিনটি পূর্ণাঙ্গ দিবসে কোদো কনসার্ট, আর্থ সেলিব্রেশন, সঙ্গীত, পরিবেশ আন্দোলন, প্যাশন, যূথবদ্ধতা, সবকিছুর মহামিলনমেলা। শিল্পোন্নয়নের কালে জাপানের গ্রামগুলো দ্রুত যুবা-শূন্য হয়ে পড়ে। সব তরুণই শহরে চলে যায় উচ্চশিক্ষার্থে বা চাকুরির খোঁজে। তাদেরকে গ্রামে ফিরিয়ে আনতেই কোদোর জন্ম। ঐতিহ্যবাহী তাইকো (ড্রাম) বাদনের এক নবজন্ম ঘটে এতে। এটি শুধু ড্রাম বা বাঁশি উৎসব নয়, বরং ড্রাম, বাঁশি, পাপেট, থিয়েটার, সবকিছু মিলিয়ে এই কোদো কনসার্ট এবং আর্থ সেলিব্রেশন।

সাদো দ্বীপে দ্বিতীয় রাতে ঘুমাই এক ব্যাকপ্যাকার্স হোটেলে। আমি ছাড়া দুই ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা ছিল আমার রুমমেট, সারা ম্যাকডোনাল্ড ও পলি মিচেল। গোসল-শেষে কিছুসময় আড্ডা দেই। সারা এবং পলি দু’জনেই ইরাকে ব্রিটিশ আক্রমণের সমালোচনা করছিল। মেঝেতে রোল-করা তোশক-চাদর বিছিয়ে মাথার কাছের টেবিল ফ্যান ছেড়ে আমরা তিনজন ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন বিকাল পাঁচটায় শিরোই পাহাড়ের পাদদেশে দীর্ঘ লাইন। লাইনে আমার ঠিক পিছনে দাঁড়ানো কিমোনো পরিহিতা এক প্রৌঢ়া। কিমোনো ও খড়মে ছন্দোময় তার হাঁটার ভঙ্গি আর তার চাহনি বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছিল কিয়োতোর গীয়ম এলাকায় দেখা গেইশাদের কথা। তার দিকে তাকিয়ে হেসে ‘হাই’ বলতে সে তার পরিচয় দেয় একজন শিল্পী বলে। তার চাহনি, ভ্রূকুটি, হাসি, দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা, সব যেন শিল্প। ষাটোর্ধ্ব এই ভদ্রমহিলা জানায়, একসময় সে গেইশা ছিল। তোকিওতে গান গায় এখনও।

দ্বিতীয় দিনের শিরোইয়ামা পাহাড়চূড়ার কনসার্টে জাপানি কোদো দলের সাথে যোগ দেয় ন্যুইয়র্ক থেকে আগত আফ্রিকান ট্যাপ ড্যান্সাররা। আফ্রিকান নৃত্যদলের দলনেতা স্টেজে এসে বলেন, আগে আমরা ছিলাম অন্ধকারের যুগে, তারপর ছিলাম দাস, তারপর নিগ্রো, তারপর নিগার, এখন আমরা জেগে উঠছি। পায়ের গোড়ালি দিয়ে শব্দ ও ছন্দ তুলে নৃত্য আর আফ্রিকার ড্রামের নিনাদ দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ রাখে। আফ্রিকার দলের দলনেতা বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের যখন দাস হিসেবে নিয়ে আসে আফ্রিকা থেকে, বুনো প্রকৃতি, মাদল, কোনোকিছুই আমাদের আর থাকে না। কিন্তু আমাদের রক্তের ভিতরে নাচ-গান। আমাদের পায়ের গোড়ালিতে ছন্দ তুলে শব্দ করে আমরা বাদ্যযন্ত্রের অভাব পুষিয়ে নেই। সঙ্গীত, নৃত্য, ড্রামে পুরো আফ্রিকা নেমে আসে জাপানের সাদো দ্বীপে শিরোই পাহাড়ের চূড়ায়।”

কোদোর প্রশিক্ষণ বরাবরই চরম শ্রমসাধ্য। ইদানীং অবশ্য কোদোর সদস্যদের বিয়ের অনুমতি হয়। মদ্যপান বা ধূমপান সংক্রান্ত আইনও খানিকটা সহজ করা হয়েছে। কাঠের তৈরি এক প্রাচীন স্কুলঘরে কোদো দলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগ্রহণ করে। কঠিন অনুশীলনে চলে তাদের শিক্ষাজীবন। প্রতিভোরে ঘুম ভেঙে নিজ হাতে বাড়িঘর ধুয়ে সাফ করে নিজ হাতে কাপড় কেচে দশ কিলোমিটার দৌড়ায় প্রশিক্ষণার্থীরা। পাহাড়ি পথ ধরে নেমে সমুদ্রতীরে দৌড়ায় পাঁচ কিলোমিটার পথ, তারপর ফিরে আসে। স্টেজে সুবিশাল ড্রাম বাজানোর জন্য শরীরকে সক্ষম করে তুলতে হয়। বিশেষ করে “মিয়াকে” বাজাতে হয় লো স্টান্স-এ, যা কীনা হাঁটু ও কোমরের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। ওদাইকো, ইয়োদাইশি, মিয়াকোজিমা ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী ড্রাম পিটানোতেও প্রচুর শারীরিক শক্তির প্রয়োজন। হাঁটু মুড়ে আধবসা ভঙ্গিতে টানা দশ-পনের মিনিট বসে থাকাও কষ্টদায়ক। দলের সদস্যদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গি দর্শকদের কাছে দারুণ শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন মনে হয়। কোদো দলের সদস্যদের সবারই দ্বীপে নিজস্ব বাগান ও ধানক্ষেত আছে। সবাই মিলে ধানচাষ করে। বাগান করে। কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না সেখানে।

ব্রিটিশ মেয়ে জেন-এর সাথে স্যালি পরিচয় করিয়ে দেয়। জেন জানায় টানা চারদিন সাইকেল চালিয়ে কিয়োতো থেকে নিগাতায় সাদো দ্বীপে এসেছে সে। সাইকেলে তার তাঁবুও নিয়ে এসেছে। রাতে সাগরের তীরে বা অন্য কোথাও তাঁবু টাঙিয়ে ঘুমিয়েছে। মুগ্ধতা নিয়ে জেনকে দেখি। জাপান থাকার সময়ে একদিন সর্বোচ্চ চল্লিশ কিলোমিটার বন্ধুদের সাথে সাইকেল চালিয়েছিলাম। সেটাকে তখন এক বিশাল বাহাদুরি মনে হয়েছিল। তাও মাঝখানে দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে দিনশেষে সেদিন আমি মরার মতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।

দ্বিতীয় দিনের কনসার্ট শেষে রাত ১২টায় সাদো দ্বীপ থেকে রওয়ানা হই। উৎসবমুখর দ্বীপ পিছনে ফেলে জাহাজে চড়ি। স্যালি, আলভি, দেইদ্রা, মাইকা সবাই হাত নেড়ে বিদায় জানায়। ডেকে দাঁড়িয়ে দেখি স্বপ্নের সাদো দ্বীপ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। রাত আড়াইটায় নামি নায়েৎসু বন্দরে। স্টেশনে নেমে গন্তব্যস্থলের ট্রেনের সময় জেনে নেই। ভোর ছয়টার ট্রেন, ভাবছি এসময়টা কী করব। স্টেশনের আশেপাশে কোনো হোটেলে উঠব কীনা। দেখি, আমার চারপাশে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ওয়েটিংরুমে জাপানি এবং সাদাচামড়ার তরুণ-তরুণীরা চাদর-বিছানা বের করে স্টেশনের মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়ছে। আমিও দ্বিধা কাটিয়ে তাদের অনুসরণ করি।

ট্রেনে আমার সামনে বসে জাপানি এক প্রৌঢ়া। তার পাশে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী রোগা এবং ক্লান্ত এক তরুণ ঘুমিয়ে আছে। এদের সাদো দ্বীপে নানা সময়ে দেখেছি। সমুদ্রে গোসল করতে দেখেছি। তবে ছেলেটিকে সবসময় বিষণ্ন মনে হয়েছে। ভদ্রমহিলা হিরোশিমায় গবেষণা করে। আমাকে জানায় ১৯৭২ সালে গবেষক হিসাবে সে বাংলাদেশে এসেছিল। পাশের ছেলেটিকে দেখে জিজ্ঞাসা করি, “তোমার ছেলে? সে কি অসুস্থ?” লাজুক হাসিতে সে বলে, “আমার বয়ফ্রেন্ড সে।” একটু ধাক্কা খাই আমি। এ-পর্যন্ত যতবার এই অসমবয়সী যুগলকে দেখেছি, ছেলেটির চোখে-মুখে এক মুহূর্তের জন্য কোনো প্রেমিকের চোখের আলো আমি দেখি নাই। কোনো আনন্দ নাই, সারাদিন তাকে ক্লান্ত, অসুস্থ, বৃদ্ধার ইচ্ছার দাস মনে হয়েছে।

ঢুলুঢুলু দু’চোখে অথবা ঘুমে, পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, নানা শহর পার হয়ে শিগায় আমার বাড়ি পৌঁছাই।

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা
আলিমের নিভৃতিচর্চা (গল্প)
শহীদুল জহিরের সাথে আর দেখা হল না (স্মৃতি)
কর্কট (গল্প)
জাপানে কোদো উৎসবে
নর্ডিক বসন্তে
ঙং পাহাড়ের কোলে

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: রাশিদা সুলতানা
ইমেইল: rashida031973@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পাপড়ি রহমান — জুলাই ৫, ২০০৯ @ ৪:২৪ পূর্বাহ্ন

      রাশিদা সুলতানার লেখা থেকে ‘জাপানের কোদো উৎসবকে’ জানা গেল। লেখনশৈলী ও কিমোনো পরিহিতা রাশিদা দুটোই অসাধারণ…।

      – পাপড়ি রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব — জুলাই ৯, ২০০৯ @ ৪:৪৪ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ লিখেছেন। আপনার লেখা পড়তে পড়তেই কোদো উৎসবের অর্ধেক উপভোগ হয়ে গেছে। বাকি অর্ধেকের জন্য সশরীরে যেতে চাই। পরবর্তী উৎসবের দিন আর ওসাকা থেকে লোকেশান একটু জানাবেন? অগ্রিম ধন্যবাদ।

      – মাহবুব

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com