কবিসভা বিতর্ক ২০০৫
কসমিক থেকে লোকায়ত, ‘ছক’ ও অন্যান্য

| ৪ জুন ২০০৯ ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

——————————————————
wb_p.jpg২০০৪ সালের ১২ নভেম্বর তারিখে ইয়াহু গ্রুপ কবিসভা থেকে ই মেইল মারফত এর সদস্যদের কাছে বাংলা কবিতা সঞ্চালন উদযোগ-কিস্তি ৩ (ওয়ার্ড, পিডিএফ) সঞ্চালিত হয়। ৫৭ জন কবির কবিতা এই সঞ্চালনে সংকলিত হয়েছিল। পরে এক এক সপ্তাহে এক এক জনের কবিতার উপর পাঠকের আলোচনা ও মন্তব্য আহবান করা হতো কবিসভায়। তেমনই এক পর্বে মাসুদ খানের কবিতা সমালোচনার জন্য উপস্থাপিত হলে দীর্ঘ আলোচনা পাল্টা আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ, নূরুননবী শান্ত, মানস চৌধুরী, মজনু শাহ্, সুমন রহমান, ব্রাত্য রাইসু, শাহাদাতুর রহমান সোহেল, রাদ আহমেদ, অপূর্ব কুমার রায়, মিজান মল্লিক ও রাশিদা সুলতানা। চিত্তাকর্ষক সে আলোচনা কবিসভার সৌজন্যে আর্টস-পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

কবি মাসুদ খানের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যে সাক্ষাৎকারটি আর্টস-এ পত্রস্থ হয়েছে তার সঙ্গে এ বিতর্ক মিলিয়ে পাঠ করা যেতে পারে। শুরুতে মাসুদ খানের পাঁচটি কবিতা (ছক, প্রত্যাখ্যান, সংকট, হিমযুগ, শৈবালিনী)। পরে কালানুক্রমিক ৩০টি আলোচনা। বি. স.
——————————————————

মাসুদ খান-এর পাঁচটি কবিতা

ছক

দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে, সেইখানটায় গিয়ে বসে থাকেন আমার মা। পথের ধারে বসে মা আমার মানুষ দ্যাখেন, মানুষের আসা-যাওয়া দ্যাখেন। কোনো পথ দিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা। কোনো পথ দিয়ে আসে গ্রহণ-লাগা, ক্ষয়ে-যাওয়া, নিভু-নিভু সব বনি আদমের দল। আবার মেঘ ও মিথুন রাশির ছায়ায় তুমুলভাবে বাঁচতে থাকা মানব-মানবীদের যাতায়াত কোনো কোনো পথে।

একদিন আসা-যাওয়ার পথের ধারে মা কুড়িয়ে পেলেন আমার ভাইকে (আমি তখনো আসিনি আমার এই মায়ের কাছে)। কিন্তু কিছুকাল পর আমার সেই ভাই হঠাৎ গেল হারিয়ে। তারপর থেকে মা আমার ওই পথমোহনায় বসে তীব্র পুত্রশোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন।

একবার, গোধূলিরঙের লম্বা-লম্বা চুলদাড়িঅলা এক বুড়ো পথিক ক্ষণিকের জন্যে থামালেন তার পথচলা। মা-র কাছে সব শুনে বললেন, ‘কোথাও তো কিছু হারায় না মা এই মহাবিশ্বে! যাও খুঁজে দ্যাখো।’ তারপর থেকে মা আমার উড়ে উড়ে বিশ্বসংসার তোলপাড় করে খুঁজে ফিরেছেন তার সন্তানকে। শেষে সপ্ত-আকাশের পরপারে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে, এবং তার সন্তানকেই পেয়েছেন মনে করে, উড়িয়ে নিয়ে এলেন এই মর্ত্যের ধুলায়। আমি তখন সাত আসমানের ওপারে অনন্ত নক্ষত্রকুঞ্জের ঝাড়জঙ্গলের ধারে সোনালি খড়ের গাদায় বসে অনাথ শিশুর মতো কাঁদছিলাম একা একা, মাকে হারিয়ে।

দিন যাবে, মাস যাবে, ঘুরে আসবে বছর…একদিন হয়তো আবার হারিয়ে যাব আমি এই নতুন পাওয়া মায়ের কাছ থেকে আর আমাকে খুঁজে পাবেন অন্য এক মা। তারও হারিয়েছে সন্তান। আমাকে পেয়ে ভাববেন, খুঁজে পেয়েছেন তারই হারানো ছেলেকে।

এইসব অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন
এই যে নিখিল ভুলবোঝাবুঝি
লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদা আর হারানো-পাওয়া খেলা
এইসব নিরন্তর মায়া ও ম্যাজিক…
সবকিছু অমীমাংসিত রেখে দিয়ে,
কাটাকুটি ময়লা ডুপ্লিকেট নকশা একখানা জগৎসংসারের,
তা-ই মেলে ধরে অবাক উদাস হয়ে বসে আছেন জরিপকর্তা।

নকশাটাতে একপাশে লেখা-স্বাক্ষর/— অস্পষ্ট
নিচে তার চেয়েও অস্পষ্ট একটা সিল…
../৪/৪

প্রত্যাখ্যান
হঠাৎ মায়ের স্তন্য থেকে, আজই, উৎখাত হয়েছে শিশু
ঘুরে ফিরে বারে বারে যায় তবু মায়ের নিকট
বকা খায়, কিছুটা অবাক হয়, তবু শিশু যায়…

অবুঝ কী আর বোঝে কী-বা অর্থ হয় এই উৎখাত-কেলির!
কী-বা এর বিন্দু ও বিসর্গভাব
কিছুই পারে না বুঝতে মায়ের স্বভাব
শুধু ভাবে-মায়ের কৌতুক তবে এতটা নিষ্ঠুর!
মাতা কেন হয় আজ এতটা বিমাতা
এই খরাঋতুতে হঠাৎ?

ভেবে একা কষ্ট পায়, নিঃসহায়, ফের তবু যায়
শিশু ফের বকা খায়, আবার অবাক হয়, তবুও সে যায়…

কেঁদে কেঁদে অবশেষে বোবা অভিমানে
অবশ ঘুমিয়ে পড়ে মাটির শয়ানে।

শুধু তার পিপাসার ধ্বনি এসে লাগে কানে
থেকে থেকে, এই মহিমণ্ডলের এখানে ওখানে।
../৬/৪

সংকট
সূর্য তার বাড়িয়ে দিয়েছে তেজ শতগুণ
মুহূর্তে মুহূর্তে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে জল
জলজেরা যে যেভাবে পারছে পালাচ্ছে—
খাল থেকে নদী, নদী থেকে দরিয়া,
দরিয়ার থেকে মহাদরিয়ার দিকে।

কতগুলি প্রাণী, জলচর, শ্যাওলাস্বভাব,
অত দ্রুত পালাতে না পেরে
ফুলকা থেকে, কানকো আর লেজ থেকে
শিকড় ছড়িয়ে দিয়ে রূপ নিয়ে নিচ্ছে উদ্ভিদের।

এইভাবে একদিন যখন শুকিয়ে যাবে প্রায় সবই
এমনকী বের হয়ে পড়বে মহাসাগরেরও হাড়গোড় রগরেশা
যখন কোনোই গভীরতা আর থাকবে না গভীর
তখন কোথায় গিয়ে যে লুকাবে সেই
আশ্চর্য রহস্যময় প্রাণীকুল
যাদের সন্ধান কখনোই পায়নি মানুষ,
লুকিয়ে রেখেছে যারা নিজেদের এতকাল
মানুষের কামার্ত ছোবল থেকে?
../৮/৪

হিমযুগ
এই সেই ঘোর হিম-জমানা, যখন
শাকাহারী হয়ে উঠবে বেঘোর মাংসাশী।
উল্টাপাল্টা হাওয়া বইবে জোরে
সর্বনাম আর সর্ব-আকৃতি বিনাশী হিংস্র হিমেল বাতাস
ছুটবে দিগ্বিদিক।
কোনো কোনো হাওয়া ফের ঘুরেও দাঁড়াবে!

কয়লার ভিতর, তবু, যুগযুগ সুপ্ত থাকে যেভাবে হীরক
এবং বীজের মর্মে মহীরুহ যেভাবে ঘুমায়
নেহাত মামুলি কোনো একটি দিনের কোষে কোষে,
সেইভাবে, তোলপাড় করে উঠবে একযোগে যত
গত আর অনাগত দিনের ভ্রূণেরা।

আপাতত এই হিমযুগে
শাকাহারী হয়ে উঠবে বেঘোর মাংসাশী।
মাংসাশীরা, নীরব নিরীহ তৃণভোজী—
তৃণগুল্ম যা-ই পাবে তা-ই খাবে, না পেলে শুকিয়ে যাবে ধীরে…
../৯/৪

শৈবালিনী
স্রোতে শুধু ভেসে চলো তুমি ওগো শৈবালিনী, শৈবালিকা,
জলজা আমার
ধর্মে মৎস্য, জাতিতে শৈবাল, আর স্বভাবে যে সৌদামিনী তুমি!

তুমি ঊর্মি রাশির জাতিকা
ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলাতেই হয় তব ধর্ম, আনন্দ তোমার।

তুমি মাছ হয়ে যাবে, নাকি
হবে কোনো জলজ উদ্ভিদ—
এতকাল পর এই দ্বিধা আজ, শৈবালিনী, জাগছে তোমাতে
মুহুর্মুহু বিজলিবিলাসে।

ফোটে ফুল, আস্তে আস্তে, ফোটে তার বিবিধ ব্যঞ্জনা
আবার হারিয়ে যায় জলে সেই ফুল, সেই জলজ রচনা
জল থেকে জলান্তরে…বহু নাম জাগে পথে পথে,
সর্ব নাম ফের বদলে বদলে যায় স্রোতে।

বহুলনামিনী তুমি বহুলচারিণী বহু-আকারিণী জলজা আমার
তুমি, তুমি ধর্মে মৎস্য, জাতিতে শৈবাল,
স্বভাবে বিদ্যুৎ-লতা তুমি…

তুমি ঊর্মি রাশির জাতিকা, ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলাতেই হয় তব
ধর্ম ও সাধনা
তোমাতে ক্ষণেই জাগে মাছের স্বভাব, ক্ষণেই তো ফের
শিকড়বাসনা…
../১০/৪

আলোচনা মন্তব্য প্রতিমন্তব্য

১.
(জুন ২৭, ২০০৫)

‘নানিমার কোলে বসে… গল্প শোনার স্বাদ’ / নূরুননবী শান্ত

মাসুদ খান এক একটা কবিতায় মেলা গল্প শুনিয়েছেন। বেশ ব্যাপার কিন্তু। নানিমার কোলে বসে ছোট ছোট গল্প শোনার স্বাদ। আর শৈবালিনীর এত রূপ, নিরাকার আবার আকারে আকারে বিচিত্র ভঙ্গি, আগে দেখতেই পাইনি
—————————————————————–
‘ছক’ কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তি দুইটা মনে হইল ভারতের ইংরেজ (মানে ইংরেজিতে লেখেন) কবি এ.কে. রামানুজনের প্রতিধ্বনি… তিনি লিখছেন ‘প্রতিকৃতিতে কিছুই লেখা নাই/শুধু এক কোণে দেখি/সহি দেয়া আছে/আমার দাদার হাতে…
—————————————————————–
এই বিলে নৌকায় ছলাৎ ছলাৎ করে ঘুরে-বেড়ানো আমি। এখন আমার পাশে শৈবালের সবুজ আস্তরণ নাই তবু খানের কবিতা আছে। শুধু…

ak-ramanujan.jpg…….
আট্টিপাট কৃষ্ণস্বামী রামানুজন (১৯২৯-১৯৯৩)
…….
‘ছক’ কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তি দুইটা মনে হইল ভারতের ইংরেজ (মানে ইংরেজিতে লেখেন) কবি এ.কে. রামানুজনের প্রতিধ্বনি… তিনি লিখছেন ‘প্রতিকৃতিতে কিছুই লেখা নাই/শুধু এক কোণে দেখি/সহি দেয়া আছে/আমার দাদার হাতে… আর মাসুদ খান জীবনচক্রের বা ভেদচক্রের প্রতিকৃতিতে কোনো স্বাক্ষর পান নাই, ভালো তো… আসলে তো নাই কোনো মালিকের চিহ্ন এই আমাদের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা ছাড়া…

২.
(জুন ২৭, ২০০৫)

কসমিক দুনিয়া থেকে সরে এসে লোকায়ত / মাহবুব মোর্শেদ

মাসুদ খানের নতুন লিখা কবিতা নিয়া কথা হওয়া দরকার। অনেকেই বলতেছেন উনি কসমিক দুনিয়া থেকে সরে এসে লোকায়ত হইতে চাইতেছেন। এইটা তার সাথে যাইতেছে না। কিন্তু উনি এই ব্যাপারে স্ট্রিক্ট।
—————————————————————–
আগের অবস্থান খারিজ করে আগাইতেছেন। কবিতায় রাজনীতি ঢুকাইতে চাইতেছেন। সহজ বাক্য লিখতেছেন। আমার মতে, কবির স্বভাবের সাথে এইটা যায় না। বৈপ্লবিক উল্লম্ফন হয়ে যায়। উনি অবশ্য চালু কবি। কাজগুলা ধীরে ধীরে করতেছেন।
—————————————————————–
আগের অবস্থান খারিজ করে আগাইতেছেন। কবিতায় রাজনীতি ঢুকাইতে চাইতেছেন। সহজ বাক্য লিখতেছেন। আমার মতে, কবির স্বভাবের সাথে এইটা যায় না। বৈপ্লবিক উল্লম্ফন হয়ে যায়। উনি অবশ্য চালু কবি। কাজগুলা ধীরে ধীরে করতেছেন। তাতে আমাদের ছোট পাঠক সমাজের বাইরে তার যাতায়াত বেড়েছে বলে মনে হয় না। মিডল-ক্লাস-ই তার পাঠক থেকে যাচ্ছে। এদেশে জনগণের জন্য কবিতা লিখার চেয়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানে নামা ভালো। সেইটা সফল হলেই কিছু লোক কবিতা পড়তে পারে। নাকি?

৩.
(জুন ২৮, ২০০৫)

‘বদলের ভেতরেই নতুনত্ব’ / নূরুননবী শান্ত

মাহবুব,

কবিতা সব সময় অল্প লোকে পড়ে। তবে কোনো কবি যদি বোঝে যে বেশি মানুষকে কমিউনিকেট করার স্বার্থে ভাষা বদলানো দরকার, সেটা সবার (কবি ও পাঠক) জন্য মঙ্গলের। কসমিক দুনিয়ায় এখনো তো মাসুদ খান
—————————————————————–
কোনো কবি যদি বোঝে যে বেশি মানুষকে কমিউনিকেট করার স্বার্থে ভাষা বদলানো দরকার, সেটা সবার (কবি ও পাঠক) জন্য মঙ্গলের।… বদলের ভেতরেই নতুনত্ব থাকে, কনস্ট্যান্ট ফর্ম এক সময় পানসে হয়া যায়।
—————————————————————–
আছেন দেখি, যেমন তার মা তাকে যেই ভাবে যেই ভাবে পায় আর হারায় সেইটা কসমোলজি ভেদ করিয়া ঘুরিয়া বুঝতে হয়। সব ব্যাপার তো ইন্দ্রিয়জ নয়, তবু সবই কাব্যের সত্য।… মনে থুয়েন, বদলের ভেতরেই নতুনত্ব থাকে, কনস্ট্যান্ট ফর্ম এক সময় পানসে হয়া যায়। খান যদি আগামীকাল অন্যরকম ভাষা ও ছন্দে লেখেন তখনও লোকে বলবে যে ব্যাটা নয়া ভং ধরলো। কাল-ই সিদ্ধান্ত নেবে কোনটা টেকসই হইবে…

৪.
(জুন ২৯, ২০০৫)

সত্তা, তাই স্বর-এর প্রণোদিত স্থাপন / মানস চৌধুরী

মাসুদ খানের কবিতা পড়া এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। কবিতা পাঠাভ্যাসে আমার উল্লেখযোগ্য গাফিলতি তাঁর এ-দফা কবিতা পড়তে আমাকে বিশেষ সুবিধা দেয়—টের পাই। ৯১ বা এরকম সময়ে যখন তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত
—————————————————————–
মাসুদ খান সত্তার যে অন্বেষণে রত আছেন, নিবেদিতও বটে, আমার বিবেচনায় সেই অন্বেষণই বরং এই কবির এক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই অভিযাত্রা ব্যতিরেকে আর কীইবা একজন কবিকে প্রাণবন্ত, অথচ অভিজ্ঞাত, করে, আর কীসেরই বা আমরা সাথি হতে চাই!
—————————————————————–
হয়, অদূর বান্ধবেরাই প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর সেই কাব্যগ্রন্থ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল আমার মনে, কিন্তু এও সত্য নিজ-দোষে যথাযথ গ্রাহক হতে পারি নাই। এরশাদ বাহ্য-বিদায় নিয়েছে বটে, বাংলাদেশের কবিতা-পাঠপ্রক্রিয়ায় সেই কালের আছর যাদেরকে ভূতগ্রস্তের মতো বেলাইন করে রেখেছিল, খুব সম্ভবতঃ আমি ছিলাম তাদের একজন। আর ছোট কাগজের মনোযোগী পাঠক আমি কখনোই হতে পারি নাই। মনে পড়ে মডারেটর রাইসু মাসুদ খানের পূর্ব-প্রকাশিত কবিতা প্রথম কিস্তিতে চাপিয়ে আশা করেছিলেন এভাবেই একসময়ে কবির নতুন কবিতাও পাওয়া যাবে। এবারের কিস্তিতে সেই বাঞ্ছা, তাঁর এবং আর সকলের, পূরিত হয়েছে। মাহবুব মোর্শেদের মন্তব্য পড়ে আবারো মনে হলো, আমার গাফিলতি অন্ততঃ এবারে আমাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

যে অভিমতটা প্রকাশিত হয়েছে—যে, মাসুদ খানের লোকায়ত হবার প্রচেষ্টা তাঁর সঙ্গে মানানসই লাগছে না, ‘বৈপ্লবিক উল্লম্ফন’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে—সেটার সঙ্গে সহমত আমি নই। এই অর্থেও যে, ‘কসমিক’ আর ‘লোকায়ত’ দ্বিবিভাজনে মাসুদ খানকে, বা কোনো কবিকেই, আদৌ পাঠ করতে পারার নিশ্চয়তাই আমি বোধ করি না। মাসুদ খান সত্তার যে অন্বেষণে রত আছেন, নিবেদিতও বটে, আমার বিবেচনায় সেই অন্বেষণই বরং এই কবির এক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই অভিযাত্রা ব্যতিরেকে আর কীইবা একজন কবিকে প্রাণবন্ত, অথচ অভিজ্ঞাত, করে, আর কীসেরই বা আমরা সাথি হতে চাই! আমরা কবিতা পাঠ করি, কবিকেও পাঠ করি বটে। কিন্তু পুরাতন পরিচিত-অবয়ব কবিকেই ফিরে-ফিরে পেতে চাইবার কামনা আমি প্রত্যাখ্যান করতে চাই। আমি নিশ্চিত নই, কিন্তু, সম্ভবতঃ এই জিজ্ঞাসাটির মোকাবিলা আল মাহমুদ করেছেন তাঁর ‘পথের কথা’ কবিতায়, সাম্প্রতিক কালে। মাসুদ খানের অন্বেষণ অভিযাত্রার অন্তরঙ্গ এক গ্রাহক হয়ে পড়তে আমি বাসনা করি।

‘ছক’ কবিতায় তিনি মহাকাব্যিক-সত্যতে সংশ্রব ঘটিয়েছেন। “অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন…মায়া ও ম্যাজিক”। এই কবিতার চিত্রপট ভীষণ শক্তিশালী। রুদ্ধশ্বাস কষ্ট লাগে পড়তে, যে-কষ্টটা পেতেই আবার এই কবিতা পাঠ করা লাগে, বার বার। মুখ্য পাত্রী মা হওয়াতে এর আবেগ-ঘনিষ্ঠতা বিশেষভাবে দ্যোতিত হয় তা সত্য। সেটা ছাড়া আর কিছুই ভাবাও কঠিন। হয়তো দৈবাৎ নয়, মহাভারতের কুন্তী-কর্ণ-অর্জুন গতায়াত এখানে মনে পড়ে। সাধারণ রেফারেন্ট হিসেবে মনে পড়ে, কারণ পরিশেষে অনুভূতি আর সম্পর্কের অবধারণের অনিবার্যতা অবলোপ করে দেয় কবিতাটা, এমনকি চুরমার।

‘প্রত্যাখ্যান’ আপাতঃ সারল্যময় দৃশ্যপট আশ্রয়ী। কিন্তু এই আপাতঃ সারল্য অভিঘাতময়। আমি নিশ্চিত নই এই সঞ্চালনে ‘ছক’ এবং ‘প্রত্যাখ্যান’ কবিতাযুগল দৈবাৎ অনুবর্তিক কিনা। না-হলে, বা হলেও, এই কবিতাযুগল পরপর পড়তে থাকা স্বতন্ত্র এক অনুভূতির উদ্রেক করে। ‘ছক’ যে অনিবার্যতা অবলোপ করে, সেই অনিবার্যতার হৃততরঙ্গকে (ডিসকন্টিউনিটি অর্থে) ব্যথাতুরভাবে অনুধাবন করেন এখানে মাসুদ খান। তাঁর ভাষায় “বোবা অভিমান”। আশ্চর্য নয় যে মহিমণ্ডলের এখানে ওখানে “পিপাসার ধ্বনি” শোনা যায় বলে, আবারো কেমন একটা রেফারেন্ট দিয়ে যায় ‘ছক’ কবিতাটির মহাকাব্যিক বিশ্ব নিয়ে। কবিতাটিতে “বিমাতা” উপমা ভাল লাগে নাই, কিন্তু অনিবার্যতায় ফিরতে চেয়ে কবির হয়তো অনেক অপশন ছিল না। কে জানে!

মাসুদ খান ‘সংকট’ এবং ‘হিমযুগ’-এ ভয়ানক। তাঁর দৃশ্যকল্পের প্রখরতা এবং নিরাসক্তির নিষ্ঠা পাঠকের মনে হিম ধরিয়ে দেয়। আমার দিয়েছে। প্রথমে আমি এই বিশ্বাসে থাকি যে, কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের এক দারুণ অন্তঃ-বিবরণী পাঠ করছি। ‘সংকট’-এ। কিন্তু পরিশেষে কবির সেই নিরাসক্তি নিশ্চিত নিবিড় প্রশ্ন করে। মূলতঃ একটাই। যখন গভীরতাই আর থাকবে না, দরিয়ায়, তখন, এখনও মানুষের অ-দৃষ্ট প্রাণীকুল কোথায় লুকোবে! এই প্রশ্ন কিয়ামতে সবচেয়ে বিচলিত প্রাণী মানুষের, যে কামার্তও বটে, বিচলন-বোধকে অসার করে দেয়। ‘হিমযুগ’-এ মাংশাসীদের শাকাহারী হয়ে ওঠা আরেকটা পর্বকাল। এমন হওয়াও অসম্ভব নয় যে, যে-মানুষেরা এতকাল কামার্ত ছোবল দিয়ে গেছে তাদের জন্যও একটা সুযোগ, কঠিন সুযোগ বটে। আর নিরাসক্ত স্বরও কঠোর হয়ে কানে বাজে। এই কঠোরতা আসে এক অমোঘ বিধানের মতো—প্রায় ঐশ্বরিক। এমনকি বিধানে ঐশ্বরিক, কিন্তু প্রক্ষেপণে বড়ো নিরাসক্ত, নির্লিপ্ত, লৌকিক। এই প্রক্ষেপণ দারুণ সম্পাদন করেছেন মাসুদ খান। যদি এর নাম দেয়া হয় যেটাকে-কিনা ‘লোকায়ত’ বলা হয়ে থাকছে, তাইলে কবিকে সেলাম বরং!
হিগাশি-হিরোশিমা

৫.
(জুন ৩০, ২০০৫)

‘কবিতায় রাজনৈতিক ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রয়োগ’ / মাহবুব মোর্শেদ

শান্ত,

মহাকালের দিকে তাকিয়ে শিল্পবিচারে বিরত থাকার লোক আমি না। টেকসই কবিতা নিয়াও আমার চিন্তা নাই। মাসুদ খান ভালো কবি এই নিয়া আপনার সন্দেহ আছে বলে মনে হয়। কারণ আপনি যুক্তি দিচ্ছেন। আমার সন্দেহ নাই। তাই কবি হিসেবে তাকে ছাড় দেওয়ার লাইনে আমি নাই।
—————————————————————–
রাজনৈতিক ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রয়োগ কবিতায় ঘটাইতে হবে সেখানেই প্রবলেম।… শ্রমিক শ্রেণীর জন্য কবিতা লিখলে যেমন করে গালি দিতে ভালোবাসি তেমনি এই প্রবণতারেও গালি দিতে পারা উচিত।
—————————————————————–
আমার তর্ক রাজনৈতিক। আপনি জানেন কিংবা না জানেন তার কবিতার এই যে ভাবান্তর ঘটেছে তার একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে। কবিতার সত্য আর কবিতার মিথ্যা বললে এইসব ব্যাপার বোঝা যায় না। আমি বলতেছি না যে মাসুদ খান ভাষা সহজ কইরা ভুল করছেন। যে ভাবনা থেকে একজন কবি বুঝতে পারেন তার স্বভাব, রাজনীতি ও সংস্কৃতির বাইরে তাকে যাইতে হবে মানে তার রাজনৈতিক ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রয়োগ কবিতায় ঘটাইতে হবে সেখানেই প্রবলেম। আমরা আপনারা শ্রমিক শ্রেণীর জন্য কবিতা লিখলে যেমন করে গালি দিতে ভালোবাসি তেমনি এই প্রবণতারেও গালি দিতে পারা উচিত।

নাকি মাসুদ খান ভালো কবি আর আমাদের বন্ধু বইলা আমরা তারে শুধু শুধু প্রশংসা করে যাবো?

৬.
(জুন ৩০, ২০০৫)

সহজ কথা যায় না লেখা সহজে / মজনু শাহ

মাসুদ খান-এর কবিতার আলোচনায় যাবার আগে তার সাম্প্রতিক কবিতার পরিবর্তন নিয়ে মাহবুব মোর্শেদ-এর কথার সূত্র ধরে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। মাহবুব বলছেন, ‘… (তিনি) আগের অবস্থান খারিজ করে আগাইতেছেন।
—————————————————————–
নিরক্ষরতা দূরীকরণের ব্যাপারটা একেবারেই ‘মাহবুবীয় স্টান্ট’। বরং প্রশ্ন করা যাক, শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে ক’জনই-বা কবিতা পড়েন? ঠেলেঠুলে যে দেশে কবিতার পাঠক সংখ্যা হাজার উতরায় না, সেখানে নিরক্ষরতা দূরীকরণের প্রস্তাব বাহুল্য বটে।
—————————————————————–
কবিতায় রাজনীতি ঢুকাইতে চাইতেছেন। সহজ বাক্য লিখতেছেন। আমার মতে, কবির স্বভাবের সাথে এইটা যায় না। বৈপ্লবিক উল্লম্ফন হয়ে যায়।…এ দেশের জনগণের জন্য কবিতা লিখার চেয়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানে নামা ভালো।…’

মাহবুব যে কথাগুলো বলছেন, আমার মনে হলো, এখানে তার সঙ্গে দ্বিমত করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কবি যিনি, তার তো জগদ্দল পাথরের মতো অবিচল থাকার উপায় নাই। যা মাহবুবের কাছে ‘খারিজ’ বলে মনে হচ্ছে তা আসলে মাসুদ খান-এর একটি কাব্যগ্রন্থ থেকে আরেকটি কাব্যগ্রন্থে প্রবেশের আগে অনিবার্য ‘প্রস্থানচিহ্ন’। আমরা লক্ষ করি, খান ক্রমে গভীর ভাবের কথা সহজ করে বলবার চেষ্টা করছেন। সহজ করে বলার এই সাধনাই কিন্তু কঠিন একটা কাজ। কবিতায় শুধু সৌন্দর্য তৈরির চেষ্টায় একটা অভিজাত-ভাব ধরে থাকা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। কবিকে কুখ্যাত আইভরি টাওয়ার থেকে নেমে আসতে হয়, তাতে যদি স্বভাবিরুদ্ধতা কিছু দেখা দেয়, তবে তাকে ‘বৈপ্লবিক উল্লম্ফন’ বলে চিহ্নিত করাও বোকামি হবে। কেননা, যে-স্বভাবে আমরা স্থির হয়ে আছি, তা যদি নানাবিধ প্রভাবে দূষিত হয়ে থাকে তো তাকে প্রশ্ন আর চিন্তার আঘাত দিয়ে স্বচ্ছ করে তোলা দরকার। কবিতায় রাজনীতি ঢুকে গেলেই যে সর্বনাশ হবে—এও খুব একপেশে কথা। তার ‘সংকট’ আর ‘হিমযুগ’ কবিতায় যে প্রচ্ছন্ন কালজ্ঞান আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে, সেসব রসাস্বাদনের পাশাপাশি বেশ কিছু বিষয় আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে উস্কে দেয়। আর নিরক্ষরতা দূরীকরণের ব্যাপারটা একেবারেই ‘মাহবুবীয় স্টান্ট’। বরং প্রশ্ন করা যাক, শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে ক’জনই-বা কবিতা পড়েন? ঠেলেঠুলে যে দেশে কবিতার পাঠক সংখ্যা হাজার উতরায় না, সেখানে নিরক্ষরতা দূরীকরণের প্রস্তাব বাহুল্য বটে। মাসুদ খান যে ‘সহজ’ হয়ে উঠছেন, তা সর্বার্থে তার ক্রমবিকাশকেই সূচিত করছে।

২.
মাসুদ খান-এর কবিতায় এমন এক বর্ণাঢ্য আয়োজন থাকে যে, তার প্রত্যেকটি কবিতা আলাদাভাবে মনোযোগ দাবি করে। কবিসভায় এবার তার পাঁচটি কবিতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো সবগুলো নিয়ে বলতে গেলে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনাটা প্রলম্বিত হয়ে পড়বে। তার চেয়ে বরং একটা কবিতার অন্তর্গত সৌন্দর্য ও বেদনা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। অর্থাৎ ‘ছক’ কবিতার মধ্যেই আপাতত এ লেখা সীমাবদ্ধ থাকছে।

৩.
প্রথমেই বলে রাখি, এ কবিতার কোনো কোনো পঙ্‌ক্তি, যুক্তি-বুদ্ধির অতীত এক অনুভূতি এনে দেয়। দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে, সেখানটায় বসে থাকেন এক মা। যেখানে জয়ী, ব্যর্থ, হারানো আর নিভু নিভু বণি আদমের দল এক এক পথে আসে। যেন পথটাই নির্মাণ করে দিয়েছে মানুষগুলোকে, অথবা মানুষেরই সু/কু চিহ্নিত করেছে পথগুলোকে। মা যে এই দশপথের কেন্দ্রে বসে থাকেন, তা থেকে অনেকগুলো অনুসিদ্ধান্ত উঠে আসে। ঐ কেন্দ্রকে, সৃজনবিন্দু বলে মনে হয়। যেখান থেকে জগতের পল্লবিত হয়ে পড়া। বোর্হেস যেমন বলেন, এ মহাবিশ্বের সর্বত্রই কেন্দ্র, পরিধি কোথাও নাই—সেই বোধ অনিবার্যভাবে মনে পড়ে। জগতের সকল মা হচ্ছেন সেই দশদিগন্তময় ছড়িয়ে থাকা পথের কেন্দ্রমূল, তার থেকেই সমস্ত কিছু উৎসারিত। তিনি এক এক করে সন্তান কুড়িয়ে পান, লালন-পালন করেন, তারপর সে হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়া পুত্রকে কিন্তু আমরা প্রতিদিনের বাস্তবতার মধ্যে চলাচল করতে দেখি, জীবনের এক পর্যায়ে যে স্ত্রী আর সংসারে মত্ত হয়ে মাকে ভুলে থাকে। এও একরকম হারিয়ে যাওয়াই।
—————————————————————–
জগতের সকল মা হচ্ছেন সেই দশদিগন্তময় ছড়িয়ে থাকা পথের কেন্দ্রমূল, তার থেকেই সমস্ত কিছু উৎসারিত। তিনি এক এক করে সন্তান কুড়িয়ে পান, লালন-পালন করেন, তারপর সে হারিয়ে যায়।
—————————————————————–
জগতের বেশির ভাগ পুরুষপ্রকৃতির মধ্যে এই নিষ্ঠুরতা লক্ষ করি। মা কিন্তু বসে নেই, তিনি তখন একজনকে হারিয়ে সপ্ত আকাশের পরপার থেকে আর একজনকে পুত্র হিসেবে কুড়িয়ে নিচ্ছেন, যে আবার হারিয়েছে তার মাকে। এ লেখার শুরুতে যে বলেছিলাম—যুক্তিবুদ্ধির অতীত এক অনুভূতির কথা—তা এইখানে এসে মেলে। সপ্ত আকাশের পরপার থেকে বাস্তবে কাউকে কুড়িয়ে পাওয়া সম্ভব না। কবিতায় সবই সম্ভব বলে কবি ওরকম একটা অসম্ভাব্যতাও আমাদের সামনে হাজির করেননি। কেন যেন মনে হয়, সন্তান লাভের জন্য যে অবর্ণনীয় কষ্টের পথ একজন মা পাড়ি দেন, ঐ পঙ্‌ক্তিটির মধ্যে, বা বলা যাক, ঐ স্বীকারোক্তির মধ্যে, একজন মায়ের গূঢ় আর তীব্র এক সন্তান-লিপ্সা মুদ্রিত হয়ে আছে। মাসুদ খান-এর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ নদীকূলে করি বাস-এর ‘মা’ কবিতায় এমনি এক মায়ের মৃত্যুদৃশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম, যিনি ধূলি-ওড়া অপরাহ্ণে, দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি খোলা আকাশের নিচে একা শয্যা পেতে শুয়েছিলেন। যিনি ক্রমে প্লাস্টিক পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে আস্তে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেখানেও দিগন্ত ঘেষে জেগে উঠতে দেখি এক প্রাচীন মাতৃছায়া। যেন মায়ের মৃত্যুর পরও আমরা থেকে যাই মায়েরই ছায়ায়। এই ছক-কাটা বাস্তবতা থেকে আমাদের রেহাই নেই। রেহাই খোঁজার দরকারও নেই। কেননা জগতে কেবলমাত্র মা’ই চরম নিস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারেন, অন্যের গর্ভের হলেও তার ভালোবাসায় কিছু টান পড়ে না।

কিন্তু এইসব অনন্ত বিভ্রম, বন্ধন, নিখিল ভুল বোঝাবুঝি, লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদা, হারানো-পাওয়া খেলার যিনি জরিপ কর্তা, জগৎ সংসারের কাটাকুটি-ময়লা-ডুপ্লিকেট একখানা নকশার দিকে যিনি উদাস তাকিয়ে থাকেন, সেটা যে কতখানি সত্য তা তো দেখতেই পাচ্ছি। পৃথিবী নরক হয়ে উঠেছে, তবু তার অবাক উদাস ভাব যায় না। নকশার সিল স্বাক্ষর যে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে তার কারণ কি প্রযুক্তি নামক দানবের অসম্ভব উত্থান? এই কবিতার ভেতর দিয়ে মাতৃত্বের মূল চরিতার্থতার ইঙ্গিত আমরা পাই, পাই জগৎস্রষ্টার ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে পড়ার ইঙ্গিতও।

৭.
(জুন ৩০, ২০০৫)

‘বন্ধু দেকিয়া তার প্রশংসা করা যাবান্নয় সে কতা মুই না মানং’ / নূরুননবী শান্ত

মাহবুব,

মাসুদ খানের কবিত্ব নিয়া তো কোনো কথাই হয় নাই। কথা হইছে তার কবিতা নিয়া।

ঘটনাটা রাজনৈতিক বটে। সেইটা তোমার সাথে মেলে। কিন্তুক এই রাজনীতিটা তো পজেটিভ। তোমার ঘরের যে দুই একটা কবিতা মোর পড়া আছে তাতেও এই রাজনীতিটা বর্তমান! মোর কথা হলো মাসুদ খান তার পাখিতীর্থদিনে-তে যে ভঙ্গি দেখাইছেন, আর তার পরে নদীকূলে করি বাস-এ যে পরিবর্তন এবং তার বর্তমান কবিতাগুলার যে ভঙ্গি ও চল… মানে ধারাবাহিকভাবে যে পরিবর্তনটা হইতেছে সেইটা পজেটিভ। এ দেশের কবিতার জন্য। তবে লক্ষ্য করেন, তার ঘরের কবিতায় কসমোলজিক্যাল টেস্ট কিন্তু আছেই। কবিতাগুলা কোনটে থিকা যেন কোনটে নিয়া যায়। একটা মহাবিশ্ব ভ্রমণের স্বাদ। তার ভেতরে যে লোকায়ত ডিকশন, ভাব আসতেছে সেইটার রাজনীতি তো অতি পজেটিভ…
—————————————————————–
কবিতাগুলা কোনটে থিকা যেন কোনটে নিয়া যায়। একটা মহাবিশ্ব ভ্রমণের স্বাদ। তার ভেতরে যে লোকায়ত ডিকশন, ভাব আসতেছে সেইটার রাজনীতি তো অতি পজেটিভ…
—————————————————————–
মাসুদ খান বন্ধু দেকিয়া তার প্রশংসা করা যাবান্নয় সে কতা মুই না মানং। আবার তামরা যদি আরো অনেকের মতন মনে করেন যে এই দেশের মুসলমান লোকের, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, বিশেষ প্রাধান্য দেওয়াই লাগবে, তাহলে তার নিন্দা করা যাইবে।

কিন্তুক এই পর্যন্ত তিনি অপ-রাজনীতি (ill-politics) করেন নাই, তার সব কবিতাই মোর পড়া, দুইটা প্রবন্ধও, কোনোখানে অপরাজনীতি নাই। তাকে চিন্তাশীল, ক্রিয়েটিভ ও সক্রিয় কবি বলিয়া মুই অভিহিত করং।

ভালো থাকিয়েন

শান্ত

৮.
(জুলাই ১, ২০০৫)

সিলিকন থিকা ভাবান্দোলন: মাসুদ খানের ভ্রমণ / সুমন রহমান

আশিশেষের বা নব্বইশুরুর মাসুদ খান আমাদের ঘরের লোক ছিলেন না। তিনি বাস করতেন এক নিখিল কুড়িগ্রামহীনতায়, সিলিকন উড়াইতেন সাংখ্যদর্শনের বাতাসে, জলাভূমিতে দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া মিথেন দিয়া ঢিল
—————————————————————–
তিনি বাস করতেন এক নিখিল কুড়িগ্রামহীনতায়, সিলিকন উড়াইতেন সাংখ্যদর্শনের বাতাসে, জলাভূমিতে দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া মিথেন দিয়া ঢিল মারতেন আমাদের নাজুক টিনের ঘরের চালে। নিজ নিজ উপমা-উৎপ্রেক্ষা লৈয়া আমরা খুব শংকার মধ্যে কৈশোরযাপন করতাম, চোখ ধাঁধায়া যাইত মাসুদীয় শক্তিশেলে।
—————————————————————–
মারতেন আমাদের নাজুক টিনের ঘরের চালে। নিজ নিজ উপমা-উৎপ্রেক্ষা লৈয়া আমরা খুব শংকার মধ্যে কৈশোরযাপন করতাম, চোখ ধাঁধায়া যাইত মাসুদীয় শক্তিশেলে।

সেই মাসুদ খান। নদীকূলে এখন উনার বাস। বিজ্ঞান নয়, ভাবান্দোলন। চিপস নয়, ঘাস।

মানস ঠিক ধরছেন, লোকায়ত আর কসমিক এরকম ক্যাটেগরি করলে ওভারল্যাপিং থাকে। কিন্তু মাহবুব মোর্শেদের একটা অস্বস্তি নিশ্চয় ছিল, সেইটা তিনি এভাবে কৈছেন। আবার মজনু শাহ মাসুদ খান প্রসঙ্গে কৈলেন, কবিকে কুখ্যাত আইভরি টাওয়ার থিকা নাইমা আসতে হয়। এখন কথা হৈল, কইত্থিকা নামলেন আমাদের কবিবর?

মাসুদ খানের দ্বিতীয় বই নদীকূলে করি বাস পড়ার পর মনে হৈছিল, অনেক ঘরোয়া হয়া উঠতেছেন তিনি, ঝা চকচকে কবিতা সেগুলো নয়, একটু যেন ম্যাট-লেমিনেটেড। মাসুদ খান নিশ্চয় জানতেন যে, এই গ্রন্থ তার পাখিতীর্থদিনে-পড়া স্মার্ট পাঠককে খুব স্বস্তি নাও দিতে পারে। সেই অস্বস্তিরই প্রকাশ দেখা গেল মাহবুবের পত্রে।

সঞ্চালনের পাঁচটি কবিতাকে প্রতিনিধিত্বশীল ধরলে, আমার তো মনে হয়, এটা বিকাশের স্বাভাবিক মাসুদীয় দশা। নদীর জন্ম পাহাড়ে হয়, তারপর তাকে তো সমতটে লম্বা লম্বা আঁকাবাঁকা দিয়া বইতে হয়। আমার কাছে মাসুদ খানের এই কবিতাগুলোকে খুব উল্লম্ফনবাদী লাগে নাই। তবে খানের পদ্ধতি একটু বদলাইছে মনে হয়। এখন তিনি অনেক বেশি দার্শনিক কবি।

‘ছক’ কবিতা নিয়া মানস চৌধুরী আর মজনু শাহ অনেক সুন্দর আলোচনা করছেন। এই কবিতাটির মধ্যে কেমন যেন একটা আদুরে আদুরে ব্যাপার আছে, কবিতাটি যেন জানে যে, পঠনমাত্রই সে ঐ পাঠকের প্রিয় কবিতার তালিকায় চৈলা আসবে! আর কেন জানি, এই কবিতার পঠন আমার মাঝে রণজিৎ দাসের ‘ছেলেকে বলা রূপকথা’ নামক কবিতার স্মৃতিকে উসকায়া দিছে! পরে মিলায়া দেখছি, খানের কবিতায় রণজিতের কোনো প্রভাব নাই, যেমন রণজিতের কবিতায়ও খানের কোনো প্রভাব নাই। তবু যে ক্যান ঘ্রাণ আইসা লাগে নাকে, কৈত্থিকা? প্রসঙ্গত বলি, আমার কাছে ‘ছেলেকে বলা রূপকথা’ থিকা ‘ছক’ আরো ভাল কবিতা মনে হৈছে।

আমি বলছিলাম যে, মাসুদ খান ক্রমে দার্শনিক কবি হয়া যাইতেছেন। ‘ছক’ কবিতা থিকা প্রমাণ বাইর করা যায়:


এই অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন
এই যে নিখিল ভুলবোঝাবুঝি
লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদা আর হারানো-পাওয়া খেলা
এইসব নিরন্তর মায়া ও ম্যাজিক…
সবকিছু অমীমাংসিত রেখে দিয়ে,
কাটাকুটি ময়লা ডুপ্লিকেট নকশা একখানা জগৎসংসারের,
তা-ই মেলে ধরে, অবাক উদাস হয়ে বসে আছেন জরিপকর্তা।

এইভাবে এক জগদ্দার্ত্তীর ছেলে-খোঁজার পরিক্রমা গিয়ে শেষ হৈছে প্লেটোর দর্শনে। দর্শনকে আশ্রয় করে পৃথিবীতে যত সেরা কবিতা লেখা হয়েছে, এইটা তার মধ্যে প্রথম কাতারে স্থান কৈরা নিতে সক্ষম। প্লেটোর ঐ ভাব লয়া পার্সি বি শেলিও একখান কবিতা লিখছিলেন। খানের কবিতা সেইটারেও ছাড়ায়া গেছে। তবে, কবিতার ডিডাকটিভ হয়া ওঠা আমার কাছে জুতের লাগে না।
—————————————————————–
এইভাবে এক জগদ্দার্ত্তীর ছেলে-খোঁজার পরিক্রমা গিয়ে শেষ হৈছে প্লেটোর দর্শনে। দর্শনকে আশ্রয় করে পৃথিবীতে যত সেরা কবিতা লেখা হয়েছে, এইটা তার মধ্যে প্রথম কাতারে স্থান কৈরা নিতে সক্ষম। প্লেটোর ঐ ভাব লয়া পার্সি বি শেলিও একখান কবিতা লিখছিলেন। খানের কবিতা সেইটারেও ছাড়ায়া গেছে।
—————————————————————–
কিন্তু কথা হৈল, মাসুদ খান ডিডাকটিভ হয়া উঠলেন ক্যান? তিনি এমনকি যখন আগে সাংখ্যদর্শন লয়া কবিতা লিখছিলেন, তখনও তারে কিন্তু ডিডাকটিভ লাগে নাই। এইটা কি ভাবান্দোলনের প্রভাব? হৈতে পারে। ভাবান্দোলন লয়া আমার কিছু কিছু জিজ্ঞাসা আছে, আরও কিছু জিজ্ঞাসা আকৃতি পাইতেছে, প্রশ্রয় পাইলে ফরহাদ ভাই, সলিমুল্লাহ খান ও মাসুদ খানের কাছে ভবিষ্যতে এবিষয়ে কথা শুনতে চাই।

‘প্রত্যাখ্যান’ কবিতাটি এই পাঁচ কবিতার মধ্যে আমার সবচেয়ে ভাল লাগছে, শুধু এজন্য না যে এইটা মাসুদ খান বিষয়ে আমার ঘরোয়া-তত্ত্বকে প্রমাণ করছে। বরং এজন্য যে, প্রত্যাখ্যানে দার্শনিকতা নাই, কেবল একটু ইঙ্গিত আছে, যতটুকু ইঙ্গিত কবিতায় দরকার ততটুকুই।

‘সংকট’ আর ‘হিমযুগ’ কবিতাদুটো কিন্তু পাখিতীর্থদিনে-ফ্লেভারের। কিন্তু আগের মত খুব টানে না। ফলে মনে হয়, মাসুদ খান তার প্রথম বইয়ের পরিস্থিতি থিকা অনেক বাইরে আইসা পড়ছেন। হয় তো বৈপ্লবিক উল্লম্ফন না, হয় তো সহজ স্বাভাবিক অবরোহন। ওপরওয়ালা জানে।

নিচে যে আছে, সেও কম কিছু জানে না! ‘শৈবালিনী’ কিন্তু মাসুদ খানের বিখ্যাত দক্ষতার স্মারক। অটোগ্রাফ। তিনি আর কাজল শাহনেওয়াজ ছাড়া আশির দশকের সচল কবিদের আর কার বিষয়েই বা আমরা এখন পর্যন্ত ইতিবাচক ভাবনা ভাবতে পারি?

৯.
(জুলাই ১, ২০০৫)

বড়দের জন্য রূপকথা / ব্রাত্য রাইসু

সুমন রহমান মাসুদ খানের ‘ছক’ কবিতার একটা ‘যেন মূলক’ আলোচনা করলেন:


কবিতাটির মধ্যে কেমন যেন একটা আদুরে আদুরে ব্যাপার আছে, কবিতাটি যেন জানে যে, পঠনমাত্রই সে ঐ পাঠকের প্রিয় কবিতার তালিকায় চৈলা আসবে! আর কেন জানি, এই কবিতার পঠন আমার মাঝে রণজিৎ দাসের ‘ছেলেকে বলা রূপকথা’ নামক কবিতার স্মৃতিকে উসকায়া দিছে! পরে মিলায়া দেখছি, খানের কবিতায় রণজিতের কোনো প্রভাব নাই, যেমন রণজিতের কবিতায়ও খানের কোনো প্রভাব নাই। তবু যে ক্যান ঘ্রাণ আইসা লাগে নাকে, কৈত্থিকা?

কবিতায় ব্যাখ্যার অবকাশ বেশি থাকে বইলাই কিনা বা যে যেমনে বুঝলো থাকে বইলাই কিনা কে জানে এই ‘যেন’ যেন একটু বেশি বলা যায়। এই
—————————————————————–
এই কবিতাটারে আমার কেন যেন মোটেই ভালো লাগে নাই। মনে হয় কবি যেন নিছক ছক কাইটা কবিতাটা লেখছেন। তার সন্দেহও বোধহয় ছিল, কেউ তারে এই অপবাদ দিতে পারে যে মিলাইয়া মিলাইয়া লেখা। সে কারণেই কি কবিতার নামও ‘ছক’? যেন একটা গাণিতিক আইডিয়ারে মিলাইতে চাইছেন তিনি।
—————————————————————–
যেন দিয়াই আবার বলা যায় : এই কবিতাটারে আমার কেন যেন মোটেই ভালো লাগে নাই। মনে হয় কবি যেন নিছক ছক কাইটা কবিতাটা লেখছেন। তার সন্দেহও বোধহয় ছিল, কেউ তারে এই অপবাদ দিতে পারে যে মিলাইয়া মিলাইয়া লেখা। সে কারণেই কি কবিতার নামও ‘ছক’? যেন একটা গাণিতিক আইডিয়ারে মিলাইতে চাইছেন তিনি। তা মিলাইতে গিয়া ব্রহ্মাণ্ডর লগে খড়ের গাদা সামলাইতে হইছে মাসুদ খানের। তাতে গাদাকে সোনালী কালার দিতে হইছে। অবশ্য গাদা তো সোনালীই। মাসুদ খানের কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসাবে আমার এইটা চোখে পড়ে যে তিনি তুচ্ছ হিসাবে পরিচিত জিনিসরে বিশ্ব হিসাবে প্রকাশিত জিনিসের লগে মিলাইতে গিয়া তুচ্ছ জিনিসে বিপুল ভর তৈরি করতে চান। তাতে তুচ্ছের যে মহিমা তা নষ্ট হয়, তুচ্ছ তীব্রর পাশে গরীব আকারে তার কবিতায় দাঁড়াইয়া থাকে। কিন্তু তীব্র জিনিসের ধার তাতে কমে না।

আগেও এইটা ছিল। তার কুড়িগ্রাম কবিতায়ও এই জিনিস আছে। তুচ্ছ এক জেলা শহর কুড়িগ্রাম সন্ধ্যাবেলা আকাশে চলে যায়। আগে তুচ্ছেরা তীব্রর কাছে যাইতো এখন তীব্ররা তুচ্ছের কাছেও আসে। তা দিয়া বলা যায় মাসুদ খানের কবিতা আগের মতোই আছে। ব্রহ্মাণ্ড তার কবিতার এখনও প্রিয় বিষয়। তিনি এখন ব্রহ্মাণ্ডরে পরিচিত রাস্তাঘাট কি খড়ের গাদার পাশেই রেগুলার আবিষ্কার করতেছেন।
—————————————————————–
মাসুদ খানের কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসাবে আমার এইটা চোখে পড়ে যে তিনি তুচ্ছ হিসাবে পরিচিত জিনিসরে বিশ্ব হিসাবে প্রকাশিত জিনিসের লগে মিলাইতে গিয়া তুচ্ছ জিনিসে বিপুল ভর তৈরি করতে চান। তাতে তুচ্ছের যে মহিমা তা নষ্ট হয়, তুচ্ছ তীব্রর পাশে গরীব আকারে তার কবিতায় দাঁড়াইয়া থাকে।
—————————————————————–
আরো একটা ব্যাপার সুমন করছেন, তিনি প্রথমে রণজিতের কবিতার লগে মিল পাইছেন এই কবিতার, পরে দেখছেন প্রভাব নাই। অথচ বইলা ফেললেন “প্রসঙ্গত বলি, আমার কাছে ‘ছেলেকে বলা রূপকথা’ থিকা ‘ছক’ আরো ভাল কবিতা মনে হৈছে।” মিল যে নাই সেই থিকাই সুমন মিলাইতে চাইলেন। কিন্তু মিল না থাকলে মানুষ মিলাইতে চাইবে কেন? মিডল ক্লাস মানুষের সম্পর্ক লইয়া নয়া রূপকথা তৈরি কি রণজিতেরও কবিতার শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য না?

অপ্রসঙ্গত বলি, আমারে রণজিৎ দাশের এই বড়দের তরে রূপকথা কোনো মজা দেয় না। নিজেরে শিশুর সারল্যে (!) তাতে অভিষিক্ত করা যায়। কিন্তু কবিতার অন্বেষণ সরলতা না। সরলতা একটা দাবি। সুধীন দত্তও তার কবিতারে সরল দাবি করতে পারেন। মাসুদ খান তো পারেনই। যেহেতু সরলতারে গুণ বইলা মনে হইতে পারে সুতরাং ভালো কবিতা যারা লিখতে চান তারা সরল হইতে যাইয়েন না। তখন সরলতার কারণেই আপনের কবিতারে ভালো মনে হইতে পারে। পাঠকদের মতো তখন কবিও মনে করতে পারেন আরে বেশ সরল হইছে তো! তাইলে তো কবিতাই, ভালোই!

১০.
(জুলাই ৩, ২০০৫)

‘কবিতায় বিজ্ঞানের প্রচুর ব্যবহার উৎসাহ ব্যঞ্জক’ / শাহাদাতুর রহমান সোহেল

কবিসভায় মাসুদ খানের কবিতা ও তাঁর কিছু সমালোচনা পড়লাম। নদীকূলে করি বাস এই কাব্যগ্রন্থটির মাধ্যমে মাসুদ খানের কবিতার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। এই কাব্যগ্রন্থে বহুসংখ্যক কবিতায় কবি বিজ্ঞানের ব্যবহার
—————————————————————–
পূর্বে অমিয় চক্রবর্তী কবিতায় বিজ্ঞানের ব্যবহার করেন। এই নিয়ে কবি বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে অমিয় চক্রবর্তীর বিতর্ক সাহিত্য-গবেষকদের কাছে পরিচিত বিষয়।… আশির দশকের একজন কবি হাসান আলীম তোমার উপমা কাব্যগ্রন্থে বিজ্ঞানের ব্যাপক ব্যবহার করেন। এরপর মাসুদ খানের কবিতায় বিজ্ঞানের প্রচুর ব্যবহার উৎসাহ ব্যঞ্জক।
—————————————————————–
করেছেন। কবিসভায় পোস্ট করা ‘ছক’ কবিতাতেও বিজ্ঞানের ব্যবহার আছে : ‘কোথাও তো কিছু হারায় না মা এই মহাবিশ্বে! যাও খুঁজে দেখো।’ এখানে পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির নিত্যতার সূত্রের প্রয়োগ দেখি। এই মহাবিশ্বে শক্তির ধ্বংস বা লয় নেই, রূপান্তর ঘটে মাত্র। এই কবিতায় বিজ্ঞানের সাথে আছে “অনন্ত বিভ্রম, মায়া ও ম্যাজিকের” ব্যবহার। রহস্যময়তার মধ্য দিয়ে এর শুরু ও শেষ হয়।

তারপর ‘হিমযুগ’ কবিতার কথা উল্লেখ করা যায়। হিমযুগের কথা বিজ্ঞানের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি। আমার যতদূর মনে পড়ছে, বিজ্ঞানীরা এই পর্যন্ত চারটি বরফ যুগ পৃথিবীতে অতিক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন। এই বরফ যুগগুলোতে পৃথিবীতে ব্যাপক ধ্বংস ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আবারো হিমযুগ আসবে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। এই হিম যুগের হদয়গ্রাহী চিত্র মাসুদ খানের ‘হিমযুগ’ কবিতা। “আপাতত এই হিমযুগে/ শাকাহারী হয়ে উঠবে বেঘোর মাংসাশী / মাংসাশীরা, নীরব নিরীহ তৃণভোজী‐/ তৃণগুল্ম যা-ই পাবে তা-ই খাবে। না পেলে শুকিয়ে যাবে ধীরে…”। বিজ্ঞানের উক্ত তথ্য নিয়ে আরো অনেকে কবিতা লিখেছেন। যেমন রবার্ট ফ্রস্ট লিখেছেন : “কেউ বলে পৃথিবী আগুনে শেষ হবে/ কেউ বলে হয়তো তুষারে/ আমার কামনা থেকে/ তাদের কথাই মানি আগুনে যাদের পক্ষপাত। / কিন্তু যদি তাকে ধ্বংস হতে হয় দুইবার/ মনে হয় যতটুকু ঘৃণা আছে নিহিত আমাতে/ তাতে বলা যেতে পারে/ তুষার ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট, বিপুল।” (রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা, অনুবাদ: শামসুর রাহমান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ. ১১৪)।

নদীকূলে করি বাস কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করার পর কবিসভার পোস্ট করা কবিতাগুলো পাঠ করি। এর মধ্যে উল্লম্ফন দূরের কথা, কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করিনি। উভয়ই একই ধারাবিহকতায় লেখা। অবশ্য তাঁর আগের কবিতা সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।

মাসুদ খান কবিতায় বিজ্ঞানের ব্যবহার করেছেন। পূর্বে অমিয় চক্রবর্তী কবিতায় বিজ্ঞানের ব্যবহার করেন। এই নিয়ে কবি বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে অমিয় চক্রবর্তীর বিতর্ক সাহিত্য-গবেষকদের কাছে পরিচিত বিষয়। এরপর অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে কবিতায় বিজ্ঞানের ব্যবহার করেছেন। আশির দশকের একজন কবি হাসান আলীম তোমার উপমা কাব্যগ্রন্থে বিজ্ঞানের ব্যাপক ব্যবহার করেন। এরপর মাসুদ খানের কবিতায় বিজ্ঞানের প্রচুর ব্যবহার উৎসাহ ব্যঞ্জক। তাঁর কবিতায় বিজ্ঞানের অব্যাহত ব্যবহার কামনা করি।

১১.
(জুলাই ৪, ২০০৫)

‘শহরের মধ্যবিত্তের কাছে পৌঁছাইয়া দেওয়া গ্রামের টেস্ট’ / রাদ আহমেদ

ছক কবিতায় কবি মাসুদ খান যেভাবে ঈশ্বরকে ‘জরিপকর্তা’-চিত্রের মাধ্যমে ফুটায়া তুলছেন, সেটা ভালো লাগছে (অ্যাটলিস্ট আমার মত। ঈশ্বর ঈশ্বর গন্ধ পাইছি।)

এই জরিপকর্তা জিনিসটা মাঠে-ঘাটে খুব পরিচিত একটা এনটিটি হবার
—————————————————————–
ছক কবিতায় কবি মাসুদ খান যেভাবে ঈশ্বরকে ‘জরিপকর্তা’-চিত্রের মাধ্যমে ফুটায়া তুলছেন, সেটা ভালো লাগছে… সত্যিকারের গ্রাম আরো অনেক স্বতঃস্ফূর্ত—অনেক বেশি প্রাকৃতিক—মনের খুব কাছে আইসা টাচ করে… ঐসব জায়গায় পয়ার, অনুপ্রাস ইত্যাদি আপ্‌সেই চইলা আসে…
—————————————————————–
কথা—জরিপকর্তার হাতেই আমাদের মা বাপ—বাপের রেখে যাওয়া জমির সীমানা নির্ভর করে ইত্যাদি।

কবিতাগুলোয় একটা গ্রাম-বাংলার সুরের ভাব পাইছি বটে (আরো কিছু আলোচক যেমন বললেন), ঐটা মনে হয় শহরের মধ্যবিত্তের কাছে পৌঁছাইয়া দেওয়া গ্রামের টেস্ট।

সত্যিকারের গ্রাম আরো অনেক স্বতঃস্ফূর্ত—অনেক বেশি প্রাকৃতিক—মনের খুব কাছে আইসা টাচ করে… ঐসব জায়গায় পয়ার, অনুপ্রাস ইত্যাদি আপ্‌সেই চইলা আসে…

তবে নতুন কাজ হিসেবে—অ্যাটলিস্ট গ্রাম বাংলার (যেমন মা জিনিসটা আমাদের এদিককার একটা টিপিক্যাল জিনিস হিসাবে জানি) ছাঁচ রাইখা নতুন লিখা লেখা—এই এক্সপেরিমেন্টেশন ভালো লাগছে।

পাঠক হিসেবে নিতান্তই আমার নিজস্ব মত। কবি এবং অন্যান্যেরা কিছু ভুল-বোঝাবুঝি করবেন না প্লিজ।

১২.
(জুলাই ৬, ২০০৫)

‘কিছুটা সংশয়বাদী এবং মধ্যবিত্তসুলভ ভাববাদের দিকে…’ / অপূর্ব কুমার রায়

কবিতা নিয়ে আলোচনা শুনতে ভালোই লাগছিল। কবিতার শব্দ প্রয়োগ, ছন্দ, বিষয় এসব নিয়ে কথা বেশ কম, নাই বলাই ভালো। মাসুদ খান, তার দর্শন, বিশ্বাস এসবই বেশি এসেছে। খারাপ না। মাসুদ খান সাংখ্য দর্শনে
—————————————————————–
কেউ বিজ্ঞানের কথা বা শব্দ লিখলেই, মহাকাশের কথা বা শব্দ লিখলেই সে চিন্তাতে বিজ্ঞানী হবে সেটা ঠিক নয় বলেই ধারণা।… সেই বিচারে মাসুদ খান কিছুটা সংশয়বাদী এবং মধ্যবিত্তসুলভ ভাববাদের দিকে হেলে থাকে যার পাল্লা।
—————————————————————–
প্রভাবিত এটা কি সত্যি নাকি? নাকি ভাববাদী? কোনটা, নাকি অনেক কিছুতেই… মাসুদ খান কি বলেন জানতে অপেক্ষায় থাকলাম। হোমাপাখি হয়ে থাকলাম, চাতকের বৈমাত্রেয় ভাই হয়ে থাকলাম…

কেউ বিজ্ঞানের কথা বা শব্দ লিখলেই, মহাকাশের কথা বা শব্দ লিখলেই সে চিন্তাতে বিজ্ঞানী হবে সেটা ঠিক নয় বলেই ধারণা। বিজ্ঞান তো আরো দূরের কথা। বস্তুবাদিতা হলে বিজ্ঞানচর্চার অনুশীলন যা ধারাবাহিক, এবং থামার অবকাশ নাই। সেই বিচারে মাসুদ খান কিছুটা সংশয়বাদী এবং মধ্যবিত্তসুলভ ভাববাদের দিকে হেলে থাকে যার পাল্লা।

শুনি আজকের ভাবান্দোলনের উদ্গাতা সাবেক সমাজতন্ত্রীদের সাথে খান সাবের বেশ নৈকট্য, একই পথের সহযাত্রী। সেই কারণে উনি যা লিখতে চাচ্ছেন তা চোখের সামনেও রূপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না, আবার ভাব হয়ে বুকের ভেতরও ঢুকছে না।

কেউ কেউ ভাষা সহজ করার কথা বললেন, খুব খুশির কথা। নিশ্চয় এরপর তাকে কেউ না কেউ দেহতত্ত্বের গান লিখাতে চাইবেন অথবা শিশুতোষ ছড়া। সাধু…

যেটাই হোক না কেন আরোপিত না হলেই ভালো। আমাদের বেশ কিছু কবি আছেন যারা এক ধরনের আরোপিত আবদ্ধ কবিতা লিখতে ভালোবাসেন। সেটাই কি কেউ কেউ বললেন?

বড়দের নিয়ে লেখার এই এক সমস্যা। রাইসু বোধহয় ঠিকই বলেন, বড়দের জন্য রূপকথা লেখা যায় না, লেখা গেলেও তা কেমন জানি… মাহবুব কি এসবকেই রাজনীতি বলতে চান নাকি? মাসুদ খান এসব মনে রাখলে ভালো।

মাসুদ খানের ঈশ্বর উদাস জরিপকর্তা, আর মা, বিভ্রান্ত, যাকে আসলে দশমাথা রাস্তা থেকে তুলে এনে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে আদেশ জারি করা হয়েছে সে যেন নিজেই শুনতে না পায় তার নিজের কণ্ঠস্বর। মাসুদ খান আমাদের কী বলতে চান বুঝলাম না। মায়ের বন্দিত্বের যন্ত্রণা নাকি ঈশ্বরের উদাসীনতা। তিনি কোথায়? তার নিজস্বতাটা ভুললে চলবে না, তা ভাবের হোক বা বস্তুর হোক। নাকি তিনিই ঈশ্বর? এর পরেও আবার লিখার আশা থাকলো যদি প্রবেশের অধিকার পাই।

১৩.
(জুলাই ৬, ২০০৫)

তাত্ত্বিকের তাড়া, সাত্ত্বিকের সাড়া / সুমন রহমান


মাসুদ খানের কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসাবে আমার এইটা চোখে পড়ে যে তিনি তুচ্ছ হিসাবে পরিচিত জিনিসরে বিশ্ব হিসাবে প্রকাশিত জিনিসের লগে মিলাইতে গিয়া তুচ্ছ জিনিসে বিপুল ভর তৈরি করতে চান। তাতে তুচ্ছের যে মহিমা তা নষ্ট হয়, তুচ্ছ তীব্রর পাশে গরীব আকারে তার কবিতায় দাঁড়াইয়া থাকে।

আমি লা জবাব! চমৎকার পর্যবেক্ষণ!


আগে তুচ্ছেরা তীব্রর কাছে যাইতো এখন তীব্ররা তুচ্ছের কাছেও আসে। তা দিয়া বলা যায় মাসুদ খানের কবিতা আগের মতোই আছে। ব্রহ্মাণ্ড তার কবিতার এখনও প্রিয় বিষয়। তিনি এখন ব্রহ্মাণ্ডরে পরিচিত রাস্তাঘাট কি খড়ের গাদার পাশেই রেগুলার আবিষ্কার করতেছেন।

এইটাকেই আমি পদ্ধতির বদল (ইনডাকটিভ থিকা ডিডাকটিভ) কৈছিলাম। আপনি আরো সুন্দরভাবে কৈলেন স্যার।

যেহেতু সরলতারে গুণ বইলা মনে হইতে পারে সুতরাং ভালো কবিতা যারা লিখতে চান তারা সরল হইতে যাইয়েন না। তখন সরলতার কারণেই আপনের কবিতারে ভালো মনে হইতে পারে।
(‘বড়দের জন্য রূপকথা’ – ব্রাত্য রাইসু)

শিশুদের আহার্যের মতন তরল হও তুমি,
সরল তরল হও; বিকাশের রীতিনীতি এই।
(‘অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমে’ – বিনয় মজুমদার)

আবারও আপনের (‘মেরিটময়’) মন্তব্যের পাশাপাশি বিনয়ের (‘মেরিটলেস’) উদ্ধৃতি আইসা গেল! আমি নাচার। এইবার অবশ্য আপনেরা প্রতিপক্ষ।
—————————————————————–
নেহাত শারীরবৃত্তীয় কারণেই বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা ও প্রকাশভঙ্গি সরল হৈতে থাকে বৈলা শুনছি। বয়োবৃদ্ধ বিনয়বাবু হয়ত নিজের ‘অটোমেটেড’ এই সারল্যের পক্ষে সাফাই গাইবার চেষ্টা চালাইছিলেন।… মাসুদ খান এরকম কিছু কোথাও কৈছেন কি না সেইটা আমার জানা নাই। তবে উনার কবিতার প্রকাশভঙ্গি আগের চাইতে সরাসরি হৈছে।
—————————————————————–
আপনি ‘সরল’ হৈতে মানা করছেন, আর বিনয় কৈলেন এইটাই নাকি বিকাশের রীতিনীতি!

নেহাত শারীরবৃত্তীয় কারণেই বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা ও প্রকাশভঙ্গি সরল হৈতে থাকে বৈলা শুনছি। বয়োবৃদ্ধ বিনয়বাবু হয়ত নিজের ‘অটোমেটেড’ এই সারল্যের পক্ষে সাফাই গাইবার চেষ্টা চালাইছিলেন। এরকম চেষ্টা আরো বহুলোকে করছেন, এরকম প্রমাণ আমরা পাইছি। মাসুদ খান এরকম কিছু কোথাও কৈছেন কি না সেইটা আমার জানা নাই। তবে উনার কবিতার প্রকাশভঙ্গি আগের চাইতে সরাসরি হৈছে। এইটাকে যদি ‘সারল্য’ বলা হয়, তাইলে এইটাও বলা যায় যে, এই সারল্য ছদ্মবেশী এবং তার অন্তরালে নানান জটিল তত্ত্বচিন্তার ঘুরাঘুরি এখনও অব্যাহত আছে। তবে এখন অনেকসময় তত্ত্বচিন্তা কোনো কোনো কবিতাকে প্রোমোট করতেছে। এইটা আগে পাই নাই মাসুদ খানের মধ্যে। আগে তিনি তত্ত্ব অন্বেষণ করতেন না, অন্যান্য অন্বেষণের কারণে তত্ত্বের ভিতর দিয়া মাঝেমধ্যে সাঁতরাইতেন।

আমি দর্শনের ছাত্র হওয়ার সুবাদে এইটা দেখছি যে, তত্ত্বের অন্বেষণ তাত্ত্বিককে অধৈর্যশীল করে, বিশ্ববীক্ষা তৈরি কৈরা ফালানোর জন্য তিনি ব্যাকুল হৈয়া পড়েন। এইটা আমার মতে সাত্ত্বিক আর তাত্ত্বিকের মূল পার্থক্য। সাত্ত্বিকের তাড়া নাই, তার কেব্‌লা বদল হৈলেও তিনি বিকারহীন ভাবে সেইটা মাইনা লন। তাত্ত্বিক মানতে চান না। তিনি তার পুরনো বীক্ষা দিয়া নতুনরে ‘জাস্টিফাই’ করেন। মার্কস-হাইডেগার-লাকাঁর সই করা সার্টিফিকেট জোগাড় করেন লালন-জসীমের জন্য।
—————————————————————–
তবে এখন অনেকসময় তত্ত্বচিন্তা কোনো কোনো কবিতাকে প্রোমোট করতেছে। এইটা আগে পাই নাই মাসুদ খানের মধ্যে। আগে তিনি তত্ত্ব অন্বেষণ করতেন না, অন্যান্য অন্বেষণের কারণে তত্ত্বের ভিতর দিয়া মাঝেমধ্যে সাঁতরাইতেন।… তত্ত্বের অন্বেষণ তাত্ত্বিককে অধৈর্যশীল করে, বিশ্ববীক্ষা তৈরি কৈরা ফালানোর জন্য তিনি ব্যাকুল হৈয়া পড়েন।
—————————————————————–
মাসুদ খানের বর্তমান কবিতার মধ্যে একটা বাঁকবদলের ইচ্ছা আছে, সেইটা হয়ত নান্দনিক অর্থে খুব পরিস্ফূট এবং স্বয়ম্ভূ হয়া উঠছে বৈলা মনে হয় নাই। এর কারণ এইটা হৈতে পারে যে, যে নন্দনজগতের মধ্যে তিনি এতকাল বাস করতেন, সেইটা তার অভীষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির তুলনায় বেশি ক্ষমতাশালী। বা এইটাও হৈতে পারে যে, পাঠক স্থিতিজড়তার কারণে ঐ নতুন রসের আস্বাদ নিতে অনাগ্রহী হৈয়া আছে। ফলে মাসুদ খানের বর্তমান কবিতাগুলোর মধ্যে আমি একটা খুব হালকা একটা নৈতিক টানাপোড়েনও দেখতে পাই।

১৪.
(জুলাই ১০, ২০০৫)

সরলতা জটিলতা, কবিতার শরীলের মামলা / মিজান মল্লিক


ব্রহ্মাণ্ড তার কবিতার এখনও প্রিয় বিষয়। তিনি এখন ব্রহ্মাণ্ডরে পরিচিত রাস্তাঘাট কি খড়ের গাদার পাশেই রেগুলার আবিষ্কার করতেছেন? (‘বড়দের জন্য রূপকথা’ – ব্রাত্য রাইসু)

আসলেই কি তাই? আমি তো দেখছি তার কবিতায় ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোথাও না কোথাও থাকা খড়ের গাদা, দশদিকে কাটাকুটি হয়ে যাওয়া রাস্তা আছে, তা কবি কল্পনা করেছেন। পরিচিত খড়ের গাদার পাশে ব্রহ্মাণ্ডরে আবিষ্কার
—————————————————————–
কেমন জানি ফতোয়া এবং অনুশাসনের (তাও আবার শাস্ত্রীয়) গন্ধ পাইতেছি। (ফতোয়াও ঠাওরাইতে পারেন) কবিতার অন্বেষণ সরলতা কিংবা জটিলতা (কুটিলতা) হবে কেন? কবিতা অন্বেষণ করবে কবিতারই। নাকি?
—————————————————————–
করতেছেন দেখতেছি না তো! তবে ব্রহ্মাণ্ড বা মহাবিশ্ব তার কবিতার প্রিয় ও শক্তিশালী অনুষঙ্গ বটে। তার অনেক কবিতায়ই মহাবৈশ্বিক এবং কখনো কখনো এপিক ও ক্লাসিক ভাব টের পাই, লক্ষণ পাওয়া যায়। এমন কি তার ছোট ছোট কবিতাতেও। এইটা তার শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য। দুর্দান্ত।

রাইসু ভাই আরেক জায়গায় কইলেন:


কবিতার অন্বেষণ সরলতা না। সরলতা একটা দাবি। সুধীন দত্তও তার কবিতারে সরল দাবি করতে পারেন। মাসুদ খান তো পারেনই। যেহেতু সরলতারে গুণ বইলা মনে হতে পারে সুতরাং ভালো কবিতা যারা লিখতে চান তারা সরল হইতে যাইয়েন না। তখন সরলতার কারণেই আপনের কবিতারে ভালো মনে হইতে পারে।

এইখানে কেমন জানি ফতোয়া এবং অনুশাসনের (তাও আবার শাস্ত্রীয়) গন্ধ পাইতেছি। (ফতোয়াও ঠাওরাইতে পারেন) কবিতার অন্বেষণ সরলতা কিংবা জটিলতা (কুটিলতা) হবে কেন? কবিতা অন্বেষণ করবে কবিতারই। নাকি? কবিতার অন্বিষ্ট জায়গায় পৌঁছার রাস্তা নিয়া কথা হইতে পারে, সেইটা সরল/জটিল হইতে পারে। রাস্তাটা যেইখানে যট্টুক জটিল, কবিতার মধ্যে সেইখানে তট্টুক জটিলতা হাজির হইবো। আর যেইখানে যট্টুক সরল সেইখানে তট্টুকই। সরলতা জটিলতা, কবিতার শরীলের মামলা। এই মর্মে জিজ্ঞাসা, কবিতার গতরের জটিলতা দেইখ্যা কবিতার ভালো মন্দ বিচার করা যায় কী?

বোধকরি, একটা ভালো কবিতায় বিভিন্ন মাত্রা আর স্তর থাকে, তে কারণে, হরেক লেভেলের পাঠক, হরেক লেভেল থেকে হরেক প্রকারে ভালো কবিতার রস খাইতে (আস্বাদন অর্থে) পারে। একটা সত্যিকারের ভালো কবিতায় একই সঙ্গে সহজ (সহজাত, easy এবং আছানি অর্থে) ও বহুমাত্রিক। যেমন ধরেন, মাসুদ খানের ‘হিমযুগ’ কবিতায় কেউ বিজ্ঞান পাইছেন, কেউবা ভূগোল, অনুষঙ্গ পাইছেন, আমি পাইছি কী, পাক্কা রাজনীতিক ঘ্রাণ। কথা আছে। পয়লা নম্বরে কিন্তু পাইছি কবিতাই। আবার দেখেন, প্রত্যাখ্যান কবিতায় কেউ দেখছেন মায়ের স্তন্য থেইকা শিশুর প্রত্যাখ্যান হয়ে যাওয়া । আমিও দেখছি। আরও দেখলাম প্রেমিকার কাছ থেকে বিতাড়িত হওয়া, মা বসুধার থেকে বিদায় নেওয়া, আরও কত কি। (সুমন ভাইরে এইখানে চুপি চুপি একটু বলে রাখি, দর্শনের ডোজ কী মাত্রায় পড়ছে তা কিন্তু আমি মাপতে যাই নাই, হের পরও পাঁচ কবিতার মধ্যে প্রত্যাখ্যান আমারও সবচে ভালো লাগছে)।

অন্যতন্ত্রে, রাইসু ভাই মানবেন নিশ্চয়, মন্দ বা অ-ভালো কবিতা, প্রায় সরল ও একমাত্রিক এবং সাদাকালো হয়। আপনার কতকগুলো সরল (মাঝে মাঝে অতিসরল) অথচ ভালো কবিতা (পাঠকের বিবেচনায়, আপনার কিছু সরল অথচ ভালো কবিতা পড়ে আমার এমন হাসি পায় কী আর বলব) তো সেই কবিতাগুলারে সরলতা গুণের জন্য কি আপনি খারিজ করতে চান? যদি উত্তর হ্যাঁ সূচক হয় তাইলে প্রশ্ন, আপনের উদ্দেশ্য কি ভালো কবিতা লেখা নয়?

পুনশ্চ: অপূর্বদা তার মেইলে ভাববাদ আর ভাব আন্দোলন এক করে দেখেছেন বলে মনে হয়। বাংলার ভাব আন্দোলন কি ভাববাদ? বাংলার ভাব আন্দোলন হচ্ছে, বাংলার দর্শন ও সংস্কৃতির আন্দোলন। মনীষীগণ এই ব্যাপারে কথা বলতেছেন, বুঝনের বিস্তর অবকাশ আছে।

১৫.
(জুলাই ১৫, ২০০৫)

‘পলিটিক্যাল কবিতা যেন তার সাথে যায় না’ / রাশিদা সুলতানা

মাসুদ খানের কবিতাগুলার মধ্যে ‘সংকট’ কবিতাটা পলিটিক্যাল মনে হইছে। তবে মনে হয় পলিটিক্যাল কবিতা যেন তার সাথে যায় না ঠিক। তবে পরিবর্তন আসছে পাখিতীর্থদিনে কিম্বা নদীকূলে করি বাস বই-এর কবিতাগুলা থেকে। পূর্বোক্ত বইগুলার অনেক কবিতাই আমার ভালো লাগে।

এই কিস্তি কবিতাগুলার মধ্যে ‘ছক’ আর ‘শৈবালিনী’ বেশ ভালো লাগছে।

‘ছক’ কবিতাটি শুরু হয় সরল ভাবেই… ভালো লাগতে শুরু করে ‘অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন থেকে’… একেবারে কবিতাটির শেষ পর্যন্ত। এইখানে জরিপকর্তার সিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মাসুদ খানীয় সামর্থ্য দেখি।

‘সংকট’ কবিতাটিতে শ্যাওলা-স্বভাব প্রাণীকুলের গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে পরিবেশ-সংকট, উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের সংকট তথা এই সময়ের সঙ্কট হাজির
—————————————————————–
‘ছক’ কবিতাটি শুরু হয় সরল ভাবেই… ভালো লাগতে শুরু করে ‘অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন থেকে’… একেবারে কবিতাটির শেষ পর্যন্ত। এইখানে জরিপকর্তার সিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মাসুদ খানীয় সামর্থ্য দেখি।
—————————————————————–
করেছেন—যেইখানে এই সঙ্কটের মধ্যে পড়ে রহস্যময় কিছু প্রাণী কানকো আর ফুলকা থেকে শেকড় ছড়িয়ে উদ্ভিদে রূপ নিচ্ছে। এইখানে এই রহস্যময় প্রাণীদের মধ্যে আমি কিছু অন্তর্মুখী মানুষের মুখ দেখি যারা নানান সঙ্কটে উদ্ভিদের মতো প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে যাচ্ছে।

‘শৈবালিনী’ কবিতাটিতে ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলা বহুলনামিনী, বহুলচারিণী শৈবালিনীর ভিতরকার টানাপড়েন তুলে ধরেছেন চমৎকারভাবে।

১৬.
(জুলাই ১৫, ২০০৫)

বক্তব্য আলঙ্কারিক / ব্রাত্য রাইসু


ক.
কবিতা সব সময় অল্প লোকে পড়ে। তবে কোনো কবি যদি বোঝে যে বেশি মানুষকে কমিউনিকেট করার স্বার্থে ভাষা বদলানো দরকার, সেটা সবার (কবি ও পাঠক) জন্য মঙ্গলের। (‘বদলের ভেতরেই নতুনত্ব’ – নূরুননবী শান্ত)

খ.
আমরা লক্ষ করি, খান ক্রমে গভীর ভাবের কথা সহজ করে বলবার চেষ্টা করছেন। সহজ করে বলার এই সাধনাই কিন্তু কঠিন একটা কাজ।…মাসুদ খান যে ‘সহজ’ হয়ে উঠছেন, তা সর্বার্থে তার ক্রমবিকাশকেই সূচিত করছে। (‘সহজ কথা যায় না লেখা সহজে’ – মজনু শাহ)

হাঃ হাঃ হাঃ। হাসলাম। একজন বেশি মানুষকে বোঝানোর স্বার্থে যা বোঝাইবেন সেইটারেই সহজ কইরা ফেলতে আগ্রহী! (তাইলে সেইটা আর
—————————————————————–
মানুষের (জরিপ) গুণরে আল্লার উপরে আরোপ কইরা আল্লার ক্ষমতা নির্দেশের এই পন্থা ইসলাম বহু আগে খারিজ কইরা দিছে।… মানুষের চিন্তা থিকাই ধর্ম আগায়, সেই ধর্মরে সংস্কৃতি আর শিল্প-সাহিত্য থিকা একশো হাত দূরে রাখনে আবার ধর্ম-পূর্ববর্তী চিন্তা শিল্প-সাহিত্যের অবয়ব থিকা সমাজে বিস্তার লাভ করে।
—————————————————————–
সেইটা রইল কই?) আরেকজন কঠিন কাজের পক্ষে। কিন্তু সেইটা যাতে সহজ কইরা বলার কঠিন কাজটি হয়! আমি এই দুই সহজের বিপক্ষে লিখছিলাম:


কবিতার অন্বেষণ সরলতা না। সরলতা একটা দাবি। সুধীন দত্তও তার কবিতারে সরল দাবি করতে পারেন। মাসুদ খান তো পারেনই। যেহেতু সরলতারে গুণ বইলা মনে হতে পারে সুতরাং ভালো কবিতা যারা লিখতে চান তারা সরল হইতে যাইয়েন না। তখন সরলতার কারণেই আপনের কবিতারে ভালো মনে হইতে পারে। (বড়দের জন্য রূপকথা)

আমার বলা বা বলার ভঙ্গি মিজান মল্লিকের কাছে ফতোয়ার গন্ধবহ লাগছে।

কিন্তু মিজান, আপনে এই দুইজনের সহজিয়া বিধানের বিরুদ্ধে তো কিছু কইলেন না। তাতে ধইরা নিতে চাই যে ওনাগো দুইজনের মতামতের লগে আপনের বিরোধ নাই বা কম, বা থাকলেও সেই বিরোধের চেয়ে আমার ‘ফতোয়া’ই আপনের কাছে বেশি আপত্তির লাগতেছে।

সরলতা বা সহজতার কারণে যদি কোনো কবিতারে ভালো মনে হয়, তখন কি সেই কবিতার চেয়ে তথাকথিত সরলতাই অধিক মূল্য ধরে না। অবশ্য এইটা ঠিক যে সরলতা কবিতার অন্যান্য গুণের মইধ্যে এক গুণ হইতেই পারে। সে তো কুটিলতাও পারে। সর্বমাননীয় (!) বিজ্ঞান দিয়া যেমন আল্লারে প্রমাণ করতে হয় না তেমনি সরলতা দিয়াও কাব্যগুণ বিচার না করা ভালো। আমার কথাটা (সুতরাং ভালো কবিতা যারা লিখতে চান তারা সরল হইতে যাইয়েন না। তখন সরলতার কারণেই আপনের কবিতারে ভালো মনে হইতে পারে।) একটা “এই হইলে ঐ হওয়া সম্ভব না” জাতীয় সূত্র আছিল। ফতোয়ায় এত স্পেস থাকে না।

২.
উপরের দুইজন সহজের প্রস্তাব করছেন। আপনিও বলতেছেন সহজ ও কঠিন হইলো পথের দাবি। মানে ‘সহজ’ জিনিসটা কবিতার অন্বেষণ না হইলেও কবিতার পথ হইতে পারে। আপনে লেখছেন :


কবিতার অন্বিষ্ট জায়গায় পৌঁছার রাস্তা নিয়া কথা হইতে পারে, সেইটা সরল/জটিল হইতে পারে। রাস্তাটা যেইখানে যট্টুক জটিল, কবিতার মধ্যে সেইখানে তট্টুক জটিলতা হাজির হইবো। আর যেইখানে যট্টুক সরল সেইখানে তট্টুকই। (সরলতা জটিলতা, কবিতার শরীলের মামলা)

অথচ কনফুসিয়াস (নাকি অন্য কেউ) কত আগে কইয়া গেছেন : যেই গ্রামে যহন থামবা ভাববা সেইটাই তোমার গ্রাম। বা তুমি এই শুরু করলা মাত্র! বাস্তব ভ্রমণ নিয়াই এমন না-পৌঁছানোর পরামর্শ।

কবিতার শিরোনাম, লাইনগুলা, দাড়ি কমা, কবিতার শেষ শব্দটা, কবিতার কাটাকুটি, ঠিক করা এইগুলারে কি রাস্তা বলতেছেন? নাকি সত্যকার পিচঢালা কি মেঠো রাস্তার কথা বলতেছেন আপনি? মানে জটিল বা আঁকাবাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা দৌড়াইতে দৌড়াইতে কোনো কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা? এমন কিন্তু হইতেই পারে। বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলা যেমনে প্রতিভা খোঁজন শুরু করছে কবিতা লইয়া এমন তারা করতেও পারে। বা হয়তো জটিল কোনো উপায়ে মাসুদ খানের সেই ছক কবিতার রাস্তাগুলিরেই (দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে) আবার আপনে এই রাস্তার (কবিতার অন্বিষ্ট জায়গায় পৌঁছার রাস্তা) লগে মিলান নাই তো? অসরল চিন্তা প্রক্রিয়ার মইধ্য দিয়া ভাবতেছি। নাইলে ঠিক মিলতাছে না।

আপনের বুদ্ধি যদি আমার মতো প্যাচমারা হয় তাইলে হয়তো জিগাইবেন, আপনে যে অন্বেষণ কইলেন হেইডা কি রাস্তা না। না মিজান, সেইটা রাস্তা না। কবিতার কীবা অন্বেষণ বা মানুষ বা জীব জানোয়ারেরা* কবিতা লেইকখা কী চাইতে চায় তা আমি জানি না। কিন্তু এইটা বুঝি সরলতা কবিতার অন্বেষণ না। এবং কবিতা লেখার কোনো রাস্তা নাই। কবিতার রাস্তা আর গন্তব্য আলাদা করা যায় না। যাহা রাস্তা তাহাই গন্তব্য। ওইটাই কবিতা। কবিতা যা বলা হইল তা দিয়া আরেক জিনিস বোঝানো হইল এমন নাকি হয় না। যে যার সাধ্যমতো বোঝে, তারে অট্টুকই বলা হয়।

৩.
আপনে লেখছেন,


ব্রহ্মাণ্ড তার কবিতার এখনও প্রিয় বিষয়। তিনি এখন ব্রহ্মাণ্ডরে পরিচিত রাস্তাঘাট কি খড়ের গাদার পাশেই রেগুলার আবিষ্কার করতেছেন? (ব্রাত্য রাইসু: বড়দের জন্য রূপকথা)

আসলেই কি তাই? আমি তো দেখছি তার কবিতায় ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোথাও না কোথাও থাকা খড়ের গাদা, দশদিকে কাটাকুটি হয়ে যাওয়া রাস্তা আছে, তা কবি কল্পনা করেছেন। পরিচিত খড়ের গাদার পাশে ব্রহ্মাণ্ডরে আবিষ্কার করতেছেন দেখতেছি না তো! তবে ব্রহ্মাণ্ড বা মহাবিশ্ব তার কবিতার প্রিয় ও শক্তিশালী অনুষঙ্গ বটে।

এই কথা আলঙ্কারিক ভাবে বলছি তাই দেখতে পান নাই। ঘন ঘন ব্রহ্মাণ্ডের উল্লেখরে গৌণ কইরা দেখাইতে গিয়া ঐ মন্তব্য করছি। এমনিতে সবই যেহেতু ব্রহ্মাণ্ড তাই খড়ের গাদাও ব্রহ্মাণ্ডের অংশ। কবির ওইটা কল্পনা না করলেও চলে। আমগো ব্রহ্মাণ্ডে অনেক খড়ের গাদা আছেও। রাস্তাও আছে।

যাই হউক, এই রকম আলঙ্কারিক বক্তব্য দিলে পাশে বোধকরি লেইখা দিতে হইব এখন থিকা : ‘বক্তব্য আলঙ্কারিক; আকাট সত্য নহে।’

৪.
মাসুদ খানের ‘ছক’ কবিতার জরিপকর্তারে (এইসব নিরন্তর মায়া ও ম্যাজিক…/সবকিছু অমীমাংসিত রেখে দিয়ে,/কাটাকুটি ময়লা ডুপ্লিকেট নকশা একখানা জগৎসংসারের,/তা-ই মেলে ধরে অবাক উদাস হয়ে বসে আছেন জরিপকর্তা।) আমার উইলিয়াম ব্লেইকের ‘এনশিয়েন্ট অফ ডেইজ’ ছবির জরিপ করতে থাকা চরিত্রের মতো লাগে।

wb_p.jpg
উইলিয়াম ব্লেইকের ছবি এনশিয়েন্ট অফ ডেইজ(১৭৯৪)’; http://www.artchive.com/ftp_site.htm ঠিকানায় BLAKE দেখুন।

তয়, ফারাক আছে। মাসুদ ভাইয়ের জরিপকর্তা উদাসীন। ব্লেইকের কর্তা ব্যগ্র বটেন। তবু ব্লেইক মাসুদ দুই জনেই স্রষ্টারে তার সৃষ্টি দেখাশোনার জন্য বিজ্ঞান অবলম্বন করতে পরামর্শ দিতেছেন বোঝা যায়।

মানুষের (জরিপ) গুণরে আল্লার উপরে আরোপ কইরা আল্লার ক্ষমতা নির্দেশের এই পন্থা ইসলাম বহু আগে খারিজ কইরা দিছে। কেন করছে বুঝতে না পারার কারণে চিত্রকলা এবং কবিতা এখনো ওই পথেই ধায়। আল্লায় বিশ্বাস করেন আর না করেন স্রষ্টার ক্ষমতা কেমন হওয়া উচিত তা বিষয়ে এই ধরনের চিন্তা দারিদ্র জর্জরিত। কল্পনাশক্তির অভাবও এইখানে প্রকট।

মানুষের চিন্তা থিকাই ধর্ম আগায়, সেই ধর্মরে সংস্কৃতি আর শিল্প-সাহিত্য থিকা একশো হাত দূরে রাখনে আবার ধর্ম-পূর্ববর্তী চিন্তা শিল্প-সাহিত্যের অবয়ব থিকা সমাজে বিস্তার লাভ করে। অবশ্য ব্লেইক মুসলমান আছিলেন না। তার ধর্ম যিশুরে আল্লার সন্তান গণ্য করে। সুতরাং তার গডের হাতে কাটা কম্পাস না কী জানি কয় ওইটা থাকতেই পারে। মুসলমান মাসুদ ভাই এই ব্যাপারে কী কন তাই জানতে ইচ্ছা করি।

আড্ডা মারা, মদ খাওয়া ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে (মানে লেখতে বসলে ঘুম আহে) লেখতে দেরি হইল।

………….
* জানোয়ারেরা কবিতা লেখে না। ওই বক্তব্য আলঙ্কারিক।

১৭.
(জুলাই ১৬, ২০০৫)

‘গভীর ভাবের কথা সোজা করিয়া কওয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই সেয়ানামো আছে’ / নূরুননবী শান্ত


“অথচ কনফুসিয়াস (নাকি অন্য কেউ) কত আগে কইয়া গেছেন : যেই গ্রামে যহন থামবা ভাববা সেইটাই তোমার গ্রাম। বা তুমি এই শুরু করলা মাত্র! বাস্তব ভ্রমণ নিয়াই এমন না-পৌঁছানোর পরামর্শ।”

“মানুষের চিন্তা থিকাই ধর্ম….”

রাইসু,

আপনার এই এক উদ্ধৃতি আর এক বাণী খুবই খাঁটি হইছে। আমি কিন্তু রায় দেই নাই যে কবিতা বা সাহিত্যকে সরল হইতেই হবে। কথা হইলো তাই বলিয়া কবিতা একটা ভাবের খোলসে থাকিয়া আমজনতার কাছে ভীতিকর
—————————————————————–
জটিল হইলেই তা উচ্চ হইবে তেমন মনে হয় না, আবার সরল হইলেই তা বাহবা পাইবে তাহাও সত্য নয়। তবে মজনুর সাথে এক বিষয়ে একমত হইয়া কইতে চাই যে গভীর ভাবের কথা সোজা করিয়া কওয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই সেয়ানামো আছে।
—————————————————————–
থাকিয়া যাইবে, সেইটাও মানা যায় না। আবার আমজনতা কবিতা না পড়লেই যে সাহিত্যের আসমান-জমিন লস্ তেমনও না। ওই ব্যাপারে কনফুসিয়াসই একটা পয়সার মাল কথা কয়া গেইছেন। আপনে এই ভাবে ও ভঙ্গিরে চূড়ান্ত কইতে পারেনই না। সব পরিবর্তনই একটা কিছুর শুরু। আর যা কিছু শুরু হয় তার গন্তব্যে যাওয়া যে সউগ সময়ে হয়া ওঠে এমন বাণী কসম কাটিয়া দেওয়া যায় না। কিন্তু একই গ্রামে বসিয়ে থাকলে ভ্রমণকারীর তো চলে না। মাসুদ খানও এমন বদলের ভিতর দিয়া চলেন বলিয়া তার লেখার ধারাবাহিক পাঠে বোঝা যায়। কিন্তু তামার ঘরোক নিয়া, কিংবা কোন বুজুর্গর ঘরোক নিয়া (ইসলামী বুজুর্গর কথা এটেকোণা কইতেছি না, এইটাও আলঙ্কারিক) শ্যাষ কথা কওয়া যায় না। জটিল হইলেই তা উচ্চ হইবে তেমন মনে হয় না, আবার সরল হইলেই তা বাহবা পাইবে তাহাও সত্য নয়। তবে মজনুর সাথে এক বিষয়ে একমত হইয়া কইতে চাই যে গভীর ভাবের কথা সোজা করিয়া কওয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই সেয়ানামো আছে। মাসুদ খান তার ছক কিংবা শৈবালিনীতে সেই সেয়ানা কবিত্ব দেখাইতে পারছেন!

১৮.
(জুলাই ১৬, ২০০৫)

অনুভূতি যেন যুক্তি / ব্রাত্য রাইসু

আপনের কাছে যেইটা গভীর ভাব আমার কাছে সেইটা ফালতু প্যাচপ্যাচে সিউডো দার্শনিকতা…

ঐটা যে গভীর ভাব তা কেবল দাবিই করা যায়; বোঝাইয়া কইয়েন কেন ঐ ভাব গভীর ভাব।

কেন ব্লেইক-এর চিত্রকলা বা মাসুদ খানের ছক কবিতা গভীর ভাবের না,
—————————————————————–
মাসুদ ভাইয়ের পক্ষের চিঠিগুলাতে এইটা খুব খেয়াল করলাম, অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়া আপনেরা যুক্তির ভান ধরতেছেন…
—————————————————————–
তাতো আমি আগের চিঠিতে বলছিলাম। সেই নিয়া আপনে কিছু না কইয়াই যখন গভীর ভাব বললেন, তাইলে এইটা আপনের নির্দেশ হিসেবে আমি মাইনা লইলাম।

মাসুদ ভাইয়ের পক্ষের চিঠিগুলাতে এইটা খুব খেয়াল করলাম, অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়া আপনেরা যুক্তির ভান ধরতেছেন…

১৯.
(জুলাই ১৭, ২০০৫)

‘অযুক্তি আর কুযুক্তি আসিয়া ভর করলে প্যাঁচ খাইয়া যায়’ / নূরুননবী শান্ত


মাসুদ খানের পক্ষের চিঠিগুলাতে এইটা খুব খেয়াল করলাম, অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়া আপনেরা যুক্তির ভান ধরতেছেন… (ব্রাত্য রাইসু)

কবিতায় যুক্তি দিয়া সউগ সময় ভাব ও বস্তুকে মনের মতো করিয়া তুলিয়ে ধরা যায় না এইটা কবি ব্রাত্য রাইসু আমার মতোন আলসিয়ে গদ্যকারের চাইতে বেশি বোঝেন, এইটা নিয়া সন্দেহ দেখানো পাপ হইবে। কিন্তুক
—————————————————————–
ইশ্বর সৃষ্টি করার জন্য মাসুদ খানকে বিশেষ করিয়া মুসলমান হবার তো দরকার নাই। যখন জগতে ধর্ম আসে নাই তখনো ইশ্বরের ধারণা আছিলো—বৃক্ষরূপে, অগ্নিরূপে, পর্বতরূপে…শতসহস্র মূর্তিরূপে। সেই ইশ্বরদের যারা নির্মাণ করছিলেন তাদের আপনে কোন জাতের নামে ডাকবেন?
—————————————————————–
গদ্যভাষায় যা কইতে চান তার পক্ষে যুক্তি একটা ব্যাপার। তবে সেইখানে অযুক্তি আর কুযুক্তি আসিয়া ভর করলে প্যাঁচ খাইয়া যায়। রাইসু নিজেকে প্যাঁচালু হিসেবে দেখাইতে ভালোবাসেন, সেইটা তিনি মিজানের উদ্দেশে লেখা গদ্যে খোলাসা করিয়ে কইছেন। ইশপের একট গপ্প মনে পড়তেছে—

একটা ভেরা নদীর পাড়ে পানি খাইতে গেছিলো। তার চেহারা মোবারকের জেল্লা দেখিয়া পার্শ্ববর্তী এক পাহাড়ের উপরে বাস করা নেকড়ের ক্ষুধা চাগাল দিয়া উঠলো। এখন ভেরাটাক্ সে বিনা ছুতায় কেমনে খায়, একটা (কু)যুক্তি লাগে। নেকড়ে হুঙ্কার দিয়া কয়, ওই বেটা, তুই মোর জল ঘোলা করতেছিস ক্যানে? অথচ ভেরা আছিল ভাটিতে। ভেরা কইলো, বস্, ভাটিতে থাকিয়া মুই কেমনে তোমার জল ঘোলা করং? নেকড়ের কুযুক্তির অভাব নাই, সে কয়, তাহাইলে আগের বছরে করছিলি! ভেড়া কয়, আগের বছরেই আমার জন্ম হইছিল, বস্, তখন তো আমার নদীতে আসার উপায়ই আছিলো না। নেকড়ে ছাড়ে না, কয়, তাহাইলে সেইটা তোর মাও আছিলো। তোক্ মুই এলা খাইম!

এখন কন এমন কুযুক্তির বিপক্ষে ভেড়া যায় কেমনে। গদ্যেও যুক্তিপূর্ণ অলঙ্কার থাকে। এইখানে বলাই বাহুল্য নেকড়ে ও ভেড়া আলঙ্কারিক।

আমি কইছিলাম যে কোন কিছুই শেষ কথা না। আপনে কনফুসিয়াস না অন্য কাইকে টানিয়া আনিয়া আগে থাকিয়া সেই মতের মইদ্যে আছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তার এক কবিতাতে কইছেন যে যাওয়া মানে কেবল পথ চলা/ পৌঁছানো নয়…। সুভাষ কবিতা বা যেকোন শিল্পের পথ চলার কথা কইছেন বলিয়াই মুই লাইনটাকে ডিকন্স্ট্রাক্ট করি। আপনে অন্য অর্থে পাঠ করলে মোর ঘরের আপত্তি নাই।

এখন মাসুদ খানের এই লাইনগুলা আবার পড়েন—


ফোটে ফুল, আস্তে আস্তে, ফোটে তার বিবিধ ব্যঞ্জনা
আবার হারিয়ে যায় জলে সেই ফুল, সেই জলজ রচনা
জল থেকে জলান্তরে… বহু নাম জাগে পথে পথে,
সর্ব নাম ফের বদলে বদলে যায় স্রোতে।

এখন আপনে যদি বোঝেন যে খালি শৈবালের ফুল ফোটা আর জলেই মিশে যাওয়া কিংবা স্রোতের গতির সাথে বহুতর জলের সাথে (নদী থেকে নদীতে বা বিল থেকে বিলে অথবা সমুদ্র থেকে সমুদ্রে) সে মিলিত হয়ই তো, নানান খানে তার নানান নাম হয়ই তো কিংবা ছক কবিতার খড়ের গাদা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অংশই তো, তামার ঘরোক কবিতার ভেতরে টানিয়া আনার জরুরত কি, তাইলে অন্য ভাব পাইবেন ক্যামনে? বিলাসী পর্যটকেরা সমুদ্রে যায় ঢেইয়ের শোভা দেখতে আবার অনুসন্ধানীরা তার তলের উদ্ভিদ, প্রাণী বা না-জানা রহস্যের সন্ধান করে। ফলে আপনে বুঝতেই চাইবেন না তোমাতে ক্ষণেই জাগে মাছের স্বভাব, ক্ষণেই তো ফের শিকড় বাসনা-র ভাবটা কী!

আপনেই তো আপনার ভাষায় কইলেন সেই খঁটি কথাটা যে, ইশ্বর বা আল্লা মানুষের চিন্তা থাকিয়াই সৃষ্টি। এই বাণীর ভেতরেই তো মাসুদ খানের বা ব্লেইকের জরিপকর্তা ইশ্বর সৃষ্টি করার পেছনে যে প্রশ্ন আপনার মনে জাগছে, তার উত্তর আছে! এই ইশ্বর সৃষ্টি করার জন্য মাসুদ খানকে বিশেষ করিয়া মুসলমান হবার তো দরকার নাই। যখন জগতে ধর্ম আসে নাই তখনো ইশ্বরের ধারণা আছিলো—বৃক্ষরূপে, অগ্নিরূপে, পর্বতরূপে…শতসহস্র মূর্তিরূপে। সেই ইশ্বরদের যারা নির্মাণ করছিলেন তাদের আপনে কোন জাতের নামে ডাকবেন? তারা কি খানের মতো মুসলমান (খানের উপর মুসলমানিত্ব আপনে আরোপ করলেন, আমার তাকে কোনো ধর্মেরই মনে হয় নাই—তার কবিতা তেমন ইঙ্গিত দেয় নাই) নাকি ব্লেইকের মতো খ্রিস্টান (ব্লেইকের ইশ্বরের ছবিটা ভালো করিয়া আপনে আরও দেখিয়েন। অইটা যিশুর সৃষ্ট ইশ্বর নাকি কবি/শিল্পী ব্লেইকের নিজস্ব ইশ্বর?)?? আরও পুস করি ইশ্বর বা আল্লা কি নিজেই আবির্ভূত হয় না তার আবির্ভাবের কাহিনী ক্ষমতাবান জ্ঞানী পয়গম্বরে প্রচার করে? কবি যে সে তো সকল ধর্মের, জাতের, গোষ্ঠীর ভাব ধারণ করে, তাতে নিজেও কিছু মেশায় (বকতিয়ারের ঘোড়ার আল মাহমুদ ব্যতিক্রম, সেইখানে তিনি নিজের কবিত্বকে মহত্তম উপায়ে অপমান করছেন, আবার স্বভাব বদলানো এত সোজা না জন্যই তার আসল রূপ ঠিকই ফাল দিয়া বাড়ায়ে আসে)।

এক পয়গম্বর অন্য পয়গম্বরকে খারিজ করতে কত বুজরুকিই না করার চেষ্ট করে তা জানার জন্য যদি তাদের মাবুদ থাকতো তাইলে তারা মরণের পরে মুখ দেখাইতো ক্যামনে। এখন ছোট ছোট পীরেরাও তো নানান মাসলা বাইর করে তার প্রতাপ জাহির করতে। এই পদ্ধতি বহুকাল আগেই বাতিল হইছে, ভাইজান, এই কথা আমরা বেশিরভাগ লোক জানিয়া চোখ-কান মুঞ্জিয়া থাকি দেখিয়াই যেইখানে সেইখানে ধর্মভাবটারে আগে উদ্ধার করার পায়তারা করি। তাতে কেচাল লাগানো সোজা হয়, কিছু আলগা পেচাল পারা যায়!

বার্নার্ড শ একবার কইছিলেন, ইউ ক্যান টেইক আ হর্স টু দ্য ওয়াটার বাট ইউ ক্যান নট মেইক ইট ড্রিঙ্ক। এখন কি করা যাইবে, যার পিয়াস আছে সে পানি খাইবে, যার অস্তিত্ব ভিন্নভাবে প্রকাশ করা অতি দরকার সে তিয়াসে মরিয়া গেলেও কইবে, এই পানিতে জীবানু আছে!

২০.
(জুলাই ১৮, ২০০৫)

ফেল করছে / ব্রাত্য রাইসু

এই গল্প সাজ্জাদ ভাইয়ের কাছে শুনছিলাম। ওনাগো এক বন্ধু কোনো এক চৌধুরী আড্ডার মইধ্যে যে যাই লইয়াই কথা কউক না কেন সেই কথা শেষ হইলে ওই গল্প থিকা একটা শব্দ তিনি টুক করতেন, পরে তার গল্প
—————————————————————–
আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট এইটা দুর্বল চিন্তা। আল্লা যদি নাই থাকেন তাইলে আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট বলাটা অর্থহীন। দার্শনিক ভাবে, মানুষ যেই আল্লার সন্ধান করে মানুষের চিন্তাও সেই আল্লারই সৃষ্টি। ফলে চিন্তা দিয়া আপনি আল্লার প্রমাণ করতে পারেন না। এইজন্যই ইসলাম বলে বিশ্বাস করো।
—————————————————————–
ছাড়তেন। ধরনটা কইতেছি। আড্ডায় কেউ হয়তো কইলো আগের দিন সে ট্রেন ফেল করছে, তারপরে কী সমস্যা! তো চৌধুরী হয়তো বললেন, হেঁ, আমার ভাইগ্না তো এইবার পরীক্ষায় ফেল করছে। নূরুননবী শান্তর চিঠি পইড়া অনেক দিন পরে গল্পটার মজা আবার টের পাইলাম।

আমি লেখলাম (কোন দুঃখে যে লেখতে গেলাম!) “মাসুদ ভাইয়ের পক্ষের চিঠিগুলাতে এইটা খুব খেয়াল করলাম অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়া আপনেরা যুক্তির ভান ধরতেছেন।”

তো যুক্তি শব্দটা উনি বাইছা নিলেন। তারপরে লেখলেন, “কবিতায় যুক্তি দিয়া সউগ সময় ভাব ও বস্তুকে মনের মতো করিয়া তুলিয়ে ধরা যায় না…”।

আমি কি কোথাও কইছি যুক্তি দিয়া বা যুক্তিপূর্ণ কবিতা লেখা উচিত। আর মাসুদ ভাইয়ের পক্ষের চিঠিগুলা তো বিপক্ষের বা নৈরপক্ষের চিঠির মতোই গদ্যেই লেখা। তো এইখানে এই চিরসত্য বাক্য লেখনের মাজেজা কী?

তুলনায়, কারো কবিতা পইড়া খুব ভালো লাগছে এইটা যখন রাশিদা সুলতানা বলেন তখন তিনি যুক্তি দিতে যান না। ওনার কাছে ভালো লাগছে উনি বলছেন। আমি বড়জোর বুঝতে পারলাম রাশিদার কবিতা রুচি এই রকম। কিন্তু সবারই ওই কবিতা ভালো লাগা উচিত এবং কেন ভালো লাগা উচিত এমন আবদার রাশিদা করেন না। ফলে রাশিদার ভালো লাগা নিয়া কথা কইতে গিয়া দাঁত কিটিমিটি করা ছাড়া কিছু করা যায় না!

এবং অহেতুক ঈশপের গল্প শোনাইলেন শান্ত? আমি পালের ভেড়ার কোনোটারে জল ঘোলা করনের অভিযোগে অ্যাটাক করছি? করি নাই। আমি খালি কথাবার্তার স্ববিরোধ দেখানের চেষ্টা করছি।

২.
শান্ত, আপনে লেখছেন, “আপনেই তো আপনার ভাষায় কইলেন সেই খঁটি কথাটা যে, ইশ্বর বা আল্লা মানুষের চিন্তা থাকিয়াই সৃষ্টি। এই বাণীর ভেতরেই তো মাসুদ খানের বা ব্লেইকের জরিপকর্তা ইশ্বর সৃষ্টি করার পেছনে যে প্রশ্ন আপনার মনে জাগছে, তার উত্তর আছে!”

আমি বলি নাই যে আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট। এইটা অনেকে কয় এবং আপনে কইলেন। আপনের দুর্বল জবান আমার মুখে বসাইয়া দিয়েন না। আমার কথা আছিল “মানুষের চিন্তা থিকাই ধর্ম আগায়”।

আপনের জবানরে যে দুর্বল কইলাম এইটা বিরক্ত হইয়া কই নাই। আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট এইটা দুর্বল চিন্তা। আল্লা যদি নাই থাকেন তাইলে আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট বলাটা অর্থহীন। দার্শনিক ভাবে, মানুষ যেই আল্লার সন্ধান করে মানুষের চিন্তাও সেই আল্লারই সৃষ্টি। ফলে চিন্তা দিয়া আপনি আল্লার প্রমাণ করতে পারেন না। এইজন্যই ইসলাম বলে বিশ্বাস করো।

একই ভাবে দেখেন, মানুষ অসীম সম্পর্কে ভাবনা শুরু করতে পারে কিন্তু সমাধান সে পায় না। আপনে অবশ্য কইতে পারেন অসীমও মানুষের চিন্তা থিকাই সৃষ্ট। সে ক্ষেত্রে অসীম সম্পর্কিত সমাধানহীন জায়গাটাও মানুষের চিন্তারই সৃষ্ট বলতে হয়। যা বিষয়ে মানুষ চিন্তা করতেও সমর্থ না সেইটাও মানুষের চিন্তারই আবিষ্কার বলা যায় না। দার্শনিকভাবে অসীমও আল্লার সৃষ্টি। সেক্ষেত্রে অসীম বিষয়ে ভাবতে অপারগ মানুষের চিন্তা আল্লা সম্পর্কে ভাবতে বা চিন্তা করতে পারার কথা না। আমি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আল্লার কথা কইতেছি না। ইসলাম দার্শনিকভাবে যে আল্লার উপস্থাপন করে তার কথা কইতেছি।

৩.
এবং আপনে লেখছেন :

যখন জগতে ধর্ম আসে নাই তখনো ইশ্বরের ধারণা আছিলো—বৃক্ষরূপে, অগ্নিরূপে, পর্বতরূপে…শতসহস্র মূর্তিরূপে। সেই ইশ্বরদের যারা নির্মাণ করছিলেন তাদের আপনে কোন জাতের নামে ডাকবেন? তারা কি খানের মতো মুসলমান (খানের উপর মুসলমানিত্ব আপনে আরোপ করলেন, আমার তাকে কোনো ধর্মেরই মনে হয় নাই—তার কবিতা তেমন ইঙ্গিত দেয় নাই) নাকি ব্লেইকের মতো খ্রিস্টান (ব্লেইকের ইশ্বরের ছবিটা ভালো করিয়া আপনে আরও দেখিয়েন। অইটা যিশুর সৃষ্ট ইশ্বর নাকি কবি/শিল্পী ব্লেইকের নিজস্ব ইশ্বর?)??

আমি বলছি যে আল্লা সম্পর্কে খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের ধারণা ভিন্ন। মুসলমানরা আল্লার উপরে জগৎ বা বস্তুর গুণ আরোপ করে না। খ্রীস্টানরা করে। সুতরাং মাসুদ ভাই মুসলমান হিসাবে কীভাবে এইটা দেখেন এবং তার শিল্প সাহিত্যে যেইভাবে আল্লারে টানেন তা থিকা তার ধর্মবোধের পার্থক্য কেমন? এইখানে মাসুদ খান মুসলমান হইলে কী ক্ষতি? তা মাসুদ ভাইরে তো কিছু কইতে দিবেন। আমি তো ওনার কাছে জানতে চাইছিলাম।

মানুষ হিসাবে মুসলমান আর খ্রীস্টানে পার্থক্য আছে। এবং মুসলমান-নাস্তিকে আর খ্রীস্টান-নাস্তিকেও দুস্তর ব্যবধান। সেইটা চিন্তার জগতে কেমন পার্থক্য জানতে হইলে কে কোন ধর্মে বিশ্বাস রাখলো কি অবিশ্বাস করলো জানা দরকার। একজন মুসলমানের কি মুসলমান-নাস্তিকের শিল্প সাহিত্যে আল্লা যদি খ্রীস্টান ধর্মবোধ থিকা কি ধর্ম-পূর্ববর্তী ভাব থিকা (আপনের কথায় : যখন জগতে ধর্ম আসে নাই তখনো ইশ্বরের ধারণা আছিলো—বৃক্ষরূপে, অগ্নিরূপে, পর্বতরূপে…শতসহস্র মূর্তিরূপে।) উদয় হয় তার সমাজ তাত্ত্বিক কি শিল্পসঙ্গত সমালোচনা করন যায়। আমি সেইটাই করছি। মাসুদ ভাইরে ঠেইললা মুসলমান বানানের আমার ষড়যন্ত্র নাই। উনি এমনেই মুসলমান।

খানের কবিতার আল্লা হয় খ্রীস্টানের নয় তো ধর্ম-পূর্ববর্তী যুগের আল্লা। কিন্তু যেহেতু সীল ছাপ্পর আছে তারে ধর্ম-পূর্ববর্তী সময়ে ঠেইলা দেওয়া যাইতেছে না। সুতরাং আমি তারে ব্লেইকের (আমি ব্লেইকরে খ্রীস্টান ধইরা কথা কইতেছি; হইতে পারে উনি আসলে ইহুদি) কি খ্রীস্টানের আল্লা হিসাবেই দেখতে পাইতেছি। এবং সেই লোকও (জরিপকর্তা, মানে মে বি গড) খানরে দেখতে পাইতেছেন নিশ্চয়ই। এবং পাশে মরহুম ব্লেইকরেও। নাকি?

২১.
(জুলাই ১৯, ২০০৫)

‘খোদা হাফেজ’ / নূরুননবী শান্ত

ব্লেইকের ছবিটা আবার দেখলাম, ছবির ফিগারকে ইশ্বরের মতো তো লাগে নাই! দেখিয়া মনে হইতেছে আসমান থাকিয়া ধাক্কা খায়া কেউ নিচে পড়তেছে, পড়তে পড়তে রোমশ হাত দিয়া বাতাসে বিলি দিতেছে। সাত আসমানের উপর থাকিয়া এইভাবে শয়তান পতিত হইছিলো বলিয়া ধর্মীয় মিথে কয়। ফলে নিজের ভুলটা বুঝলাম, খালি যুক্তি শব্দটা নেওয়া ঠিক হয় নাই, বিষয় হইলো যুক্তির ভান। আপনে যে ফেল করা বিষয়ক গাপ্পিকদের আড্ডায় নিয়মিত বসেন, সেইটা বোঝা যায়। এইজন্যেই আপনার নিজের ব্যাপার নিয়া আপনার ঘরেরই কনফিউশন আছে কিন্তু যেহেতু একটা কথা বাজারে ছাড়ার চেষ্টায় আছেন সেই মালটা নকল হইলেও আপনার আর তা উইথড্র করার মহত্ব নাই! আপনে বলছেন, ‘মাসুদ ভাইরে ঠেইললা মুসলবান বানানোর আমার ষড়যন্ত্র নাই। উনি এমনেই মুসলমান।’ এর চাইতে বড় স্ববিরোধিতা আর কী হইতে পারে।

এই স্ববিরোধিতা থাকার কারণেই আপনার নিজের যুক্তিগুলারে আপনে অতি খাঁটি মানিয়া অন্য লোকের (আপনের ভাষায় মাসুদ ভাইয়ের পক্ষের) যুক্তিরে আপনে ভান সাব্যস্ত করছেন।
—————————————————————–
তার কবিতার কোনোখানে তো আল্লা শব্দটা নাই। তবু আপনে তার কবিতা থাকিয়া ‘খ্রীস্টানের নয়তো ধর্ম-পূর্ববর্তী যুগের আল্লা’কে টানিয়া বাইর করলেন।… আপনে কইছেন ‘আল্লা যদি নাই থাকেন তাইলে আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট বলাটা অর্থহীন।’ আবার পরের বাক্যেই কইছেন দার্শনিকভাবে, ‘মানুষ যেই আল্লার সন্ধান করে মানুষের চিন্তাও সেই আল্লারই সৃষ্টি।’ আবার স্ববিরোধিতা করলেন।
—————————————————————–
তাই বলিয়া আপনের যুক্তিগুলাকে আমি কিন্তু ভান মনে করতেছি না। কিন্তু মাসুদ খান যে ‘এমনেই মুসলমান’ এইটা আপনে কোন যুক্তি দিয়া বুচ্চেন তা মোর ঘরের মাথায় সান্ধায় নাই। তার কবিতার কোনোখানে তো আল্লা শব্দটা নাই। তবু আপনে তার কবিতা থাকিয়া ‘খ্রীস্টানের নয়তো ধর্ম-পূর্ববর্তী যুগের আল্লা’কে টানিয়া বাইর করলেন। বিষয়টা নিয়া, অথচ, আপনে নিজেও পরিষ্কার না। কারণ, আপনে জরিপকর্তার এ্যপোজিটিভ হিসেবে লিখছেন ‘মে বি গড’। তো এইটা সত্যি যে মাসুদ ভাই মুসলমান হইলে কোনো ক্ষতি নাই। কিন্তু কবিকে ওইভাবে যুক্তির ভান দিয়া আইডেন্টিফাই করার মধ্যে বিশেষ উদ্দেশ্যের গন্ধ থাকে। গন্ধের সমস্যা হইলো অইটা গিলাপ দিয়া ঢাকা যায় না। এইটাও আপনে ঠিক কইছেন, এই বিষয়ে মাসুদ খানের কিছু কওয়া উচিৎ। আমার মনে হয় উনি এইসব পড়িয়া শব্দ করিয়া হাসতেছেন খালি…হা হা হা।

আমার মনে হয় রাশিদাই ঠিক কাম করেন। কারো দাঁত কিড়মিড়কে পাত্তা না দিয়া উনি সোজা কথায় কন, ভালো হইছে বা মন্দ হইছে। আসলেই তো ভালো লাগা বা মন্দ লাগাকে যুক্তি দিয়া কইতে গেলেই অযথা প্যাঁচ লাগে। গোলাপ সুন্দর কওয়াই যথেষ্ট। যুক্তি দিতে গেলে কাঁটা, কাদা, ফুলের ভেতরের পোকাকেও টানতে হয়। তার চাইতে, আপনার ব্যাক ডেইটেড লাগলেও রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করা ভালো :

আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ/চুনি উঠলো রাঙা হয়ে/ আমি চোখ মেললুম আকাশে/ জ্বলে উঠলো আলো পূবে পশ্চিমে/ গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম সুন্দর/ সুন্দর হলো সে…

হ আপনের ‘আগায়’ শব্দকে আমি ‘সৃষ্ট’ হিসেবে অনুবাদ করছিলাম। কারণ কিছু সৃষ্টি হওয়া মানে আমি এক ধাপ আগানো বুঝি। আর আগে তো ধারণার সৃষ্টি হইবে, তারপর সেই ধারণা আগাইবে। আপনে কইছেন ‘আল্লা যদি নাই থাকেন তাইলে আল্লা মানুষের চিন্তা থিকা সৃষ্ট বলাটা অর্থহীন।’ আবার পরের বাক্যেই কইছেন দার্শনিকভাবে, ‘মানুষ যেই আল্লার সন্ধান করে মানুষের চিন্তাও সেই আল্লারই সৃষ্টি।’ আবার স্ববিরোধিতা করলেন। আমার কথা আর আপনার কথার পার্থক্য আপনে কোন্ ভার্নিয়ার স্কেল দিয়া মাপবেন? এইটা ডিম আগে না মুরগী আগে-বিষয় নিয়া কুতর্ক করার সামিল। আপনে তো জানেন দেখা যায় যে ইসলাম বলে বিশ্বাস করো। না বুঝিয়া বিশ্বাস তো দুর্বলচিত্তগণই করেন!

রাইসু ভাইজান, গরু রচনা লিখতে গিয়া যে নদীর তীরে গরু ঘাস খাইতেছিলো, সেই নদীতীরবর্তী গ্রামগুলার কথা আসিয়া যাইতেছে। এই তর্কের কোন শ্যাষ নাই। শুনছি, ধর্মে কইছে, মরণের পরে কেয়ামত উপস্থিত না হওয়া অবধি মমিন মুসলমানদের এমন এক মালা গাঁথতে দেওয়া হইবে যেই মালা এক দিক থাকিয়া গাঁথিলে অন্য দিকে খুলিয়া যাইবে। আমি মমিন মুসলমান না। অতএব খোদা হাফেজ।

২২.
(জুলাই ১৯, ২০০৫)

সরলের সাধনা / মাহবুব মোর্শেদ

কম্পিউটার নিয়া সেফমতো বসার সময় পাইতেছি না বলে এট্টু দেরি হইল। দেরি হইলেও বেখেয়াল ছিলাম না। পোস্টগুলা পড়তেছিলাম আর মিচকি মেরে হাসতে ছিলাম। ভাবতে ছিলাম, বাহারে—এমন জমজমাট আলোচনা!
—————————————————————–
যদি স্বভাবের বাইরে আমরা যাই তবে ভাবান্তর ঘটাইতে হয়। যে অবস্থায় থাকার কথা সেইখান থেকে লম্ফ দিতে হয়। একেই উল্লম্ফন বলে। বলাবাহুল্য লাফ সবসময়ই বৈপ্লবিক কাজ। ব্রহ্মাণ্ডের নানাবিধ জটিলতা মাসুদ খানকে জটিল করছে। এখন তিনি স্বভাবের বাইরে এসে চিন্তা করতেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য লিখবেন।
—————————————————————–
কিন্তু আলোচনা কই যায়? কোথায় যাইতেছে? কেমন জানি বেদিশা লাগে। তবে কি আমরা বাংলাভাষার মধ্যেই একেক জন এমন মৌলিক ভাব নিয়া বসে আছি যে, নিজেদের ভাষা আর বুঝতে পারতেছি না? মানস স্যার (আমরা যখন ছাত্র তখন তিনি শিক্ষক) হয়তো এর সদুত্তর দিতে পারবেন। নাকি?

খোঁচা মাইরা বলছেন, তিনি যে ইতিপূর্বে অর্থাৎ গতজন্মে মাসুদ খানের কবিতা বিষয়ে বেখবর আছিলেন তাতে এই জন্মে তার মনে হইতেছে তিনি আখেরে লাভবান হইছেন। কী দেখে তার এই ভাব? আমার অস্বস্তির। স্যারের যদি লাভ হয় তবে আমার অস্বস্তিতে দোষ কই?

এই তর্কের আদি পর্বে সুমন রহমানও কিছুটা দ্বিমত করার অবকাশ পাইছিলেন। কিন্তু তার যেন বাদী আলোচনা, ব্রাত্য রাইসুর তরফে সদুত্তর এবং তৎপরবর্তী সুমনের সর্বমতৈক্যে আমি বিমোহিত না হইয়া পারি নাই। সাধু!

নূরুননবী শান্তর সহিত দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ কম। কেননা তাহার মত নাই। তিনি অন্যের মতের সঙ্গে নিরন্তর দ্বিমত প্রকাশ করতেছেন। যিনি এত দ্বিমত প্রকাশ করেন, তার সহিত দ্বিমত প্রকাশ করে এমন সাধ্য কার?

রাইসু ভাই বলছেন, মাসুদ খানের পক্ষে যুক্তি দিতেছেন যারা, তারা অনুভূতিকেই যুক্তি মনে করতেছেন। কথাটা সকলের ক্ষেত্রে একবাক্যে খাটে না। ভিন্ন ভিন্ন বাক্য ব্যবহার করলে ভাল হইত। তারপরও কথাটায় মিথ্যা নাই। কেননা এনারা সকলেই ভালোবাসা থেকে কথাগুলা বলতেছেন। কিন্তু ভালোবাসা অন্ধ তাই অনুভূতিই যুক্তির চাইতে বড় হইতেছে। আমিও মাসুদ খানকে ভালোবাসি। এইটা আধুনিক ভালোবাসা। এইটায় আঘাত আছে, যুক্তিও আছে। ভালোবাসাটা একটু বেশি পরিমাণে আছে। আধুনিক ভালাবাসা মানে একটু বেশি ভালোবাসা।

মাসুদ ভাইয়ের কবিতা অন্তপ্রাণ মুগ্ধ চেহারা যারা দেখছেন তাদের কি নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হবে যে তিনি উৎপল, রণজিৎ, বিনয়, জয় প্রমুখকে এককালে কী চোখে দেখতেন এবং এখন কী চোখে দেখেন। তিরিশি আধুনিকতা নিয়া তার সংশয়ের জন্ম হলো কবে? কবে থেকে তিনি লালনের গান, জালালের গানকে কবিতার মর্যাদায় দেখতে শুরু করলেন? কেন তিনি কবিতায় স্রেফ নতুন উপস্থাপনা কিংবা চমকে দেয়া ভাষাভঙ্গির চাইতে সরলের সাধনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করলেন? একজন কবি কি তার কবিতার বিষয়ের বাইরে থেকে লেখেন, স্রেফ কবিতার ধারা পরিবর্তনের জন্য একবার সরল একবার জটিল, একবার বৈজ্ঞানিক একবার ভাবুক হন? হিউয়েন সাঙের দেশে শান্তি নামাইতে নামাইতে হঠাৎ বখতিয়ারের ঘোড়া দেখে থমকে দাঁড়ান। আমি বোকা বলে আমাকে ভুল বুঝানোর চেষ্টা কইরেন না। এইগুলা মানস চৌধুরী বুঝতে না পারেন, কিন্তু শান্ত বা মজনু শাহ বুঝবেন না তা তো মানা যায় না।

কবি তার স্বভাবের বাইরে যাইতে পারে না। আমার পর্যবেক্ষণ মতে, মাসুদ খান স্বভাবে সরল নন। আমরা কেউই তা নই। যদি স্বভাবের বাইরে আমরা যাই তবে ভাবান্তর ঘটাইতে হয়। যে অবস্থায় থাকার কথা সেইখান থেকে লম্ফ দিতে হয়। একেই উল্লম্ফন বলে। বলাবাহুল্য লাফ সবসময়ই বৈপ্লবিক কাজ। ব্রহ্মাণ্ডের নানাবিধ জটিলতা মাসুদ খানকে জটিল করছে। এখন তিনি স্বভাবের বাইরে এসে চিন্তা করতেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য লিখবেন। গরীবের জন্য কবিতা? আরে ভাই গরীব তো লেখাপড়াই জানে না। তারে তো আগে লেখাপড়াই শেখাতে হবে। তারপর না তার জন্য কবিতা লেখার প্রসঙ্গ। আপনারা গরীবকে লেখাপড়া না শিখাইয়া তারে পড়তে বলবেন তা তো মানা যায় না। তাই আমি প্রস্তাব দিছিলাম আসুন সাহিত্য ছাইড়া নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানে নামি। ভাল কথা কেউ শোনে না। কেউ সাড়া দিল না।

আরও আছে, আমি করবো পত্রিকায় চাকরি, গাছেরটা খাবো-তলারটা কুড়াবো। বিপদ দেখলে কাইটা পড়বো। মিছিল বলতে, গরীবের পক্ষ বলতে এড়িয়ে চলবো। আর চায়ের টেবিলে মহা বিপ্লবী হবো তা কি কেউ মানবে?

যাপন করবো মধ্যবিত্তের জীবন। আর লিখতে গিয়া মধ্যবিত্তরে গালি দিয়া একেকটা ন্যারেটিভের মধ্যে ফানা হইয়া যাবো, এইটা কেমন? মধ্যবিত্তের বিষয় নাই? নাকি সেইগুলা নিয়া ডিল করতে কষ্ট?

আমার মতো দোষ মাসুদ ভাইয়ের নাই। তার একটাই দোষ, তিনি সরল হইতে চাইতেছেন। এইটাতে আমার মত নাই। তিনি ভাল কবি এইটাই আমাদের ঈর্ষার বিষয়। এর উপর যদি আবার সরল হন তবে আমরা যাবো কোথায়?

হাতের কাছে পত্রিকা নাই। ১৯ তারিখ কতই শ্রাবণ লিখতে পারলাম না।

২৩.
(জুলাই ১৯, ২০০৫)

‘সরল’ ‘জটিল’ এই ক্যাটেগরিগুলো নিয়ে প্রবল সন্দেহ থাকা দরকার / মানস চৌধুরী

মাহবুব মোর্শেদের সর্বশেষ পত্রটি চিত্তাকর্ষক। কয়েকটা অর্থে। প্রথমতঃ তাঁর চিঠি মাসুদ খানের বর্তমান কাব্যভাবনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে; দ্বিতীয়তঃ বাংলা কবিতার ইতিহাসে চর্চাকার “আত্ম”কে যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে একটা পক্ষে স্থাপন করা ছাড়াও মোর্শেদকে ক্ষুব্ধ মনে হয় সম্ভাব্য প্রতিপন্থীদের প্রতি; তৃতীয়তঃ এবং মুখ্যতঃ, সপ্তাহ তিনেক আগে “কসমিক দুনিয়া থেকে লোকায়ত” বলে একটা ঢিল ছুঁড়ে বসে থাকবার লোকই যে কেবল তিনি নন, বরং অন্যদের কথাবার্তা মিচকি-মারা হাসি-সমেত পড়তে পড়তে স্বীয় ভাবনা ব্যক্ত করাও যে তাঁর কর্তব্য বিবেচনা করেন সেটাও এই চিঠিতে স্পষ্ট হয়।

মাহবুব মোর্শেদের চিঠিখানার সূত্রে আমার সংশ্রবের পয়লা জায়গা আমি নিজেই। তিনি লিখেছেন, শুধিয়েছেন “…তবে কি আমরা বাংলাভাষার মধ্যেই একেক জন এমন মৌলিক ভাব নিয়া বসে আছি যে, নিজেদের ভাষা আর বুঝতে পারতেছি না? মানস স্যার (আমরা যখন ছাত্র তখন তিনি শিক্ষক) হয়তো এর সদুত্তর দিতে পারবেন। নাকি? … খোঁচা মাইরা বলছেন, তিনি যে ইতিপূর্বে অর্থাৎ গতজন্মে মাসুদ খানের কবিতা বিষয়ে বেখবর আছিলেন তাতে এই জন্মে তার মনে হইতেছে তিনি আখেরে লাভবান হইছেন। কী দেখে তার এই ভাব? আমার অস্বস্তির। স্যারের যদি লাভ হয় তবে আমার অস্বস্তিতে দোষ কই?…” মোর্শেদের পূর্ব-পত্রের উল্লেখ করে আমি লিখেছিলাম বটে। কিন্তু তাঁকে আমি খোঁচা মারি নাই। কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল মাসুদ খানের পয়লা-কালের কবিতা আমার একান্ত মনোযোগে পড়া হয় নাই-সেটাই প্রকাশ করেছিলাম মাত্র। আমি আমার অজ্ঞতা বা অপ্রস্তুতি প্রকাশের উসিলা খুঁজতে এখন পর্যন্ত কাউকে খোঁচা মেরেছি বলে মনে পড়ে না। বরং মাহবুব মোর্শেদ একেকজনের ভাব ও ভাষা নিয়ে যে প্রশ্ন আমার কাছে রেখেছেন সেটাই খোঁচা-মারা হিসেবে পঠিতব্য হতে পারে। কার ভাষা বোঝেননি মোর্শেদ? বেশ তো বুঝলেন! আর যতখানি অবোধ্যতা সেটা যে স্ব-স্ব পাত্রের ভাবের ‘মৌলিকত্ব’জনিত কারণেই সেই ফয়সালাও তো জানাচ্ছেন তিনি (আসে যায় না এ দিয়ে কী বোঝা সম্ভব! এত মৌলিক ভাব দুনিয়ায় হয় নাকি? এটা কাস্টমাইজেশনের বিজ্ঞাপনের পাল্লায় পড়ে আমাদের মনে হয় মাত্র।)। তাইলে এখানে আমার কাছে ‘সদুত্তর’ চাওয়া হচ্ছে কী বিষয়ে? তাঁর চিঠিখানা পড়তে পড়তে আগাতে থাকলেও কি মনে হয় যে এই প্রশ্নটা তাঁকে আকুল করে রেখেছে? ফলে এটা আমার বহর নিয়ে তাঁর কটাক্ষ (খোঁচা-মারা) মাত্র। কিন্তু আমিও এমন কিছু বহরদার নই। ডিসমিস!
—————————————————————–
ওস্তাদ জালাল খাঁ বা লালনের নাম এমনভাবে নেয়া হয়ে গেছে যে তাঁদের ক্যাটেগরিটা অবধারিতভাবেই “সরল” প্রতিভাত হয়। তাঁর মানে কি তাঁরা হরেদরে বোধগম্য?… আমার সন্দেহ আছে মাসুদ খানের, বা যে-কারোরই, কবিতায় “সরলের সাধনা” চলছে বললে আদৌ কিছু বোঝা সম্ভব কিনা।
—————————————————————–
এরপর মাহবুব বাংলা কবিতার ইতিহাস, মাসুদ খানের বিকাশ এবং কবিসভায় আলাপসূত্র মোতাবেক যা বলেছেন সেই বিষয়ে আমার না বলাই ভাল। তিনি সম্ভবতঃ যথার্থই বলেছেন : “…এইগুলা মানস চৌধুরী বুঝতে না পারেন, কিন্তু শান্ত বা মজনু শাহ বুঝবেন না তা তো মানা যায় না।…”

তবে, মাহবুব মোর্শেদের পত্রের শেষাংশ আমার গুরুতর লাফঝাঁপ মনে হয়েছে। সেটা দুইভাবেই। বক্তব্য বা যুক্তি বিচারেও কোনো ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় নাই, আবার বেশ রাগতঃ অর্থেও। চিঠিখানা থেকে উদ্ধৃতি দিতে গেলে দীর্ঘ হয়ে যায়। কী করা! “কবি তার স্বভাবের বাইরে যাইতে পারে না। আমার পর্যবেক্ষণ মতে, মাসুদ খান স্বভাবে সরল নন। আমরা কেউই তা নই। …এখন তিনি স্বভাবের বাইরে এসে চিন্তা করতেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য লিখবেন।…” আমার অজ্ঞতার সীমা নেই! আমার এখন জানতেই ইচ্ছা করছে মাসুদ খান কি বর্তমান ধারায় কবিতা লেখার তাগিদ ব্যক্ত করেছিলেন কোথাও? তিনি কি ব্যক্ত করেছিলেন যে তিনি তাঁর কবিতা “সাধারণ” বা “গরিব” মানুষজনকে পড়াতে চান? সেটা ঘটে থাকলে একটা আলাপপ্রসঙ্গ বটেক। না হলে বড় এলোমেলো অত্যুক্তি হয়ে যাচ্ছে চারধারে।

আর কবির স্বভাব! এইটা একটা আশ্চর্য বিষয় লাগল আমার কাছে। কবির স্বভাবকে এরকম স্থান-কালোর্ধ্ব একটা আকাট বস্তুপিণ্ড হিসেবে দেখা সম্ভব কীভাবে! কবি বা আর যে কেউই কি নিরন্তর চিন্তাপ্রবাহের অভিঘাতে নেই? যদি আদৌ “স্বভাব” দিয়ে কিছু বুঝতেই হয়, কবির স্বভাব কি অ-বদলযোগ্য? মাহবুব মোর্শেদ একটা যথার্থ কথা বলেছেন যে কেউই আমরা সরল নই। আধুনিক কালের কোনো বৌদ্ধিক (অথবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল) উৎপাদনই কি তাইলে সরল হতে পারে। খানের [একালের] কবিতা? কীভাবে??? তাহলে আপনারা কথা বলছেন বড়জোর কবিতার আকৃতি-গঠনপ্রণালী-ধারা নিয়ে। উঁহু, সেটা তো হতে দেয়া যায় না! মানে দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু কবিতাকে (বা যা কিছু ধরেন হাগজ বা টয়লেট পেপার) সরল-জটিল ভেদে ট্যাক্সোনমাইজ করবার কাজটা করতে চাইলে এত অনায়াসে এই পদ্ধতি এস্তেমাল করতে দেয়া যায় না। এটাও অন্ততঃ কারণ যে, এই আলোচনায় কথিত সারল্য বদগুণ কিংবা আপোস হিসেবে চিহ্নিত। ফলতঃ প্রবক্তাদের অন্তঃসার নিয়ে ভাবিত/সংমিশ্রিত হতে হবে। বিশেষতঃ এটা আরো জরুরি, যেহেতু কিনা ওস্তাদ জালাল খাঁ বা লালনের নাম এমনভাবে নেয়া হয়ে গেছে যে তাঁদের ক্যাটেগরিটা অবধারিতভাবেই “সরল” প্রতিভাত হয়। তাঁর মানে কি তাঁরা হরেদরে বোধগম্য? এমনকি পাটাতন-প্রস্তুতি ব্যতিরেকেই? কবিসভায় আমাদের সকলের কাছেই? তা যদি না হয়, তাহলে তো মানতে হচ্ছে যে জ্ঞানপ্রবাহ একটা শর্ত যে কোনো কালের বাণীস্রষ্টাকে (যেহেতু কবি বললে ভেজাল বাধতে পারে) কমিউনিকেট করতে। তাহলে কবির স্বভাবটা এখানে ফিট করে কোথায়? আর সারল্যের ফ্রেমওয়ার্কটা দিয়েই বা কী অনুধাবন সম্ভব?

আমার সন্দেহ আছে মাসুদ খানের, বা যে-কারোরই, কবিতায় “সরলের সাধনা” চলছে বললে আদৌ কিছু বোঝা সম্ভব কিনা।

হিগাশিহিরোশিমা

২৪.
(জুলাই ২১, ২০০৫)

হাসি, সহজতা, উইলিয়াম ব্লেক ইত্যাদি / মজনু শাহ্

ব্রাত্য,

আপনার ‘বক্তব্য আলংকারিক’ লেখাটার উত্তর দিতে বিলম্ব হলো।

মাসুদ খান-এর কবিতার আলোচনায় আমি বলেছিলাম,

‘আমরা লক্ষ করি, খান ক্রমে গভীর ভাবের কথা সহজ করে বলার চেষ্টা করছেন।…সহজ করে বলার এই সাধনাই কিন্তু কঠিন একটা কাজ।’

আপনি আমার এই মন্তব্য এবং নূরুননবী শান্ত’র একটি মন্তব্য পড়ে ‘হাঃ হাঃ
—————————————————————–
কোন্ কবি খ্রিস্টান আর কোন্ কবি মুসলমান এই প্রশ্নও তোলাও একটা কবিতা পাঠের জন্য বাহুল্য বলে মনে হয়। এতে রচনাবস্তু থেকে মনোযোগ অন্যত্র সরে যায়, যা নিয়ে কথা হচ্ছে তা গৌণ হয়ে পড়ে। আর, ব্লেকই-এর ঐ ছবিটা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক ‘ছক’ আলোচনায়?
—————————————————————–
হাঃ’ করে হাসলেন। এই হাসি যদি স্বাস্থ্যরক্ষার কারণে হয়ে থাকে তবে আপত্তি নাই, কিন্তু এই হাসি থেকে অন্য মতের প্রতি অসহিষ্ণুতাই প্রকাশ পাচ্ছে, মনে হলো।

কথাগুলো আপনার হাস্য কলরবের মধ্যে পড়ে অন্য অর্থ ধারণ করেছে। তা আপনার কাছে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ালো :

‘আরেকজন কঠিন কাজের পক্ষে। কিন্তু সেইটা যাতে সহজ কইরা বলার কঠিন কাজটি হয়!’

আমি সাধনার কথা বলেছি, আর সেই সাধনাকে বলেছি কঠিন কাজ, সরলতার ক্ষেত্রে বিষয়টি এমনিতেই এসে পড়ে। আসলে আমার কথাটা রবীন্দ্রনাথের একটি কথার প্রতিধ্বনিমাত্র ছিল, তিনি কবিতা বিষয়ে ‘গভীরভাবে ভেবে সহজ করে প্রকাশ’ এর কথা বলেছিলেন। আপনি বলছেন,

‘যেহেতু সরলতারে গুণ বইলা মনে হতে পারে সুতরাং ভালো কবিতা যারা লিখতে চান তারা সরল হইতে যাইয়েন না। তখন সরলতার কারণেই আপনের কবিতারে ভালো মনে হইতে পারে।’

মিজান মল্লিক আপনার এই মন্তব্যে ফতোয়ার গন্ধ পেয়েছে। আপনারে সাহিত্যের মোল্লা/মৌলবী বানানো তার উচিৎ হয়নি। যে কেউ একটা কিছু মত দিতে পারে, তা মানতেই হবে এমন কোনো কথা নাই। তবে আপনার ‘যারা ভালো কবিতা লিখতে চান’ বলার কোনো অর্থ হয় না। কেউ আবার খারাপ কবিতা লিখতে চায় নাকি? আর, সরলতার কারণে যদি কবিতাকে ভাল মনে হয়, তাতে অসুবিধা তো দেখি না। সরলতার কত রকমফের-ই না হয়! সম্প্রতি পবিত্র সরকার-এর একটা প্রবন্ধে দেখতে পাচ্ছি, যে জীবনানন্দের কবিতা তিরিশের অন্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সহজ বলে মনে হয়, সেই জীবনানন্দ তাঁর কাব্য-পরিণতির দিকে যেতে যেতে তৎসম শব্দবহুল আর দুরূহ হয়ে উঠেছিলেন।

মাসুদ খান-এর ‘ছক’ কবিতার জরিপকর্তাকে আপনার কাছে উইলিয়াম ব্লেইকের ‘এনশিয়েন্ট অফ ডেইজ’ ছবির জরিপ করতে থাকা চরিত্রের মতো লেগেছে। এবং এই কর্তাকে মনে হয়েছে ব্যগ্র। খান-এরটা উদাসীন।

তা আপনার মনে হতেই পারে। কল্পনায় তো কতকিছুই সম্ভব। কল্পনার সূত্র ধরে, গড, ঈশ্বর বা আল্লাকেও দেখলাম আপনার লেখায় কীভাবে ঢুকে পড়ল! কোন্ কবি খ্রিস্টান আর কোন্ কবি মুসলমান এই প্রশ্নও তোলাও একটা কবিতা পাঠের জন্য বাহুল্য বলে মনে হয়। এতে রচনাবস্তু থেকে মনোযোগ অন্যত্র সরে যায়, যা নিয়ে কথা হচ্ছে তা গৌণ হয়ে পড়ে। আর, ব্লেকই-এর ঐ ছবিটা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক ‘ছক’ আলোচনায়? যতদূর জানা যায়, ব্লেইক-এর ঐ পর্বের ছবিগুলো মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট্’ অবলম্বনে আঁকা। এবং যাকে আপনি এখানে জরিপকর্তা ভাবছেন, তা সম্ভবত ‘অ্যাডাম’-কে জাজ করছে।

২৫.
(জুলাই ২১, ২০০৫)

কবিতার বাইরে / ব্রাত্য রাইসু

মজনু,

মিজান মল্লিকের একপেশে অবস্থা দেইখা হাসছিলাম। আপনের বা শান্তর বক্তব্য নিয়া হাসি দেই নাই। আপনেরা তো আমারে ফতোয়াবাজ গালিও দেন নাই। মল্লিক যে ফতোয়াবাজ বলতে চাইছে তাতে হাসি না দিলে আমি নিজেই তার অভিযোগে বিশ্বাস আইনা ফেলতে পারতাম।
—————————————————————–
ওনাগো [ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ] এইরকম আগাপাশতলা মুসলমান কবিতা পইড়াও কবিতার রচনাবস্তুতে ধর্ম আর খোদা বাদ দিয়া অন্যকিছুর সন্ধান করতে হইবো?… আল্লা গড এনাদেরকে কবিতার বাইরে রাখবেন কেমনে? আপনের জীবনযাপনে কি তারা কবিতার বাইরে থাকবেন এমন কথা দিয়ে দিছেন?
—————————————————————–
হাসিও তো এক রকমের মত-ই। অন্যের মতের প্রতি অসহিষ্ণুতায় আমার আপত্তি নাই। কিন্তু যার লগে তর্কে প্রবৃত্ত হইছি তারে হাইসা দুর্বল করার বাসনা আমার নাই।

অনেকেই কবিতা লিখতে পারলেই অনেক মনে করেন। সবাই ভালো কবিতা লিখতে চান তা মনে হয় না।

খানের খোদা যে উদাসীন তা তো খান বলছেনই। আর ব্লেইক-এরটা যে ব্যগ্র সেইটা কি তার কর্তার দেহভঙ্গি আর কাঁটা কম্পাসওয়ালা হাত দেইখা বোঝা যাইতেছে না। কল্পনায় খালি সম্ভব কেন হইব?

ফররুখ আহমেদ নিয়া কি আল মাহমুদ নিয়া আলোচনায় তো আসে যে ওনারা মুসলমান কিনা… তো ওনাগো এইরকম আগাপাশতলা মুসলমান কবিতা পইড়াও কবিতার রচনাবস্তুতে ধর্ম আর খোদা বাদ দিয়া অন্যকিছুর সন্ধান করতে হইবো?

কবিতায় সবকিছুর সন্ধানই চাইলে করা যাইতে পারে। কবিতায় যারা কবিতা খুঁইজা বেড়ায় তারা আগে-ঠিক-করা একটা খাপে মালটা ঢুকানোর চেষ্টা করতেছে।

আল্লা গড এনাদেরকে কবিতার বাইরে রাখবেন কেমনে? আপনের জীবনযাপনে কি তারা কবিতার বাইরে থাকবেন এমন কথা দিয়ে দিছেন?

২৬.
(জুলাই ২২, ২০০৫)

তক্কাতক্কি গুলতানি: কারবার দেখি সুলতানি / মিজান মল্লিক

রাইসু ভাই,

যারা মাসুদ খানের কবিতার পক্ষে কইছেন, তারা তাদের কেন ভাল্লাগছে কীভাবে ভাল্লাগছে, এইসব কইতে গিয়া কিছু যুক্তি দেখাইলেই সেটা যুক্তির ভান হইবো, আর আপনে যে তার কবিতার বিপক্ষে বলতে গিয়া, কত তত্ত্ব
—————————————————————–
রোবটের লাহান জটিল মার্গীয় ভাব-ভড়ং নিয়া এই যে, কবিতা এস্তেমাল হইয়া আসতেছে (মাসুদ খানের প্রথম দিকের কিছু কবিতা ওইরকম) সাধারণ তো দূরে থাক্, এইগুলা তো অনেক সময় খোদ কবিরাও বুঝতে পারেন কিনা সন্দে আছে।
—————————————————————–
কত যুক্তি দেখাইলেন, এই যেমন ধরেন—তুচ্ছ-তীব্র’র তত্ত্ব, প্যাচপেচে সিউডো-দার্শনিকতার কথা কইলেন, ব্লেইকের ছবি টাইনা আনলেন, ধর্ম-দর্শনের ব্যাখ্যা দিলেন, মাসুদ খানের কবিতায় যা নাই (যেমন, আল্লা) হাতে তুড়ি দিয়া তেলেসমাতি তা আবিষ্কার করলেন, তারে ঠেইল্লা ‘মুসলমান’ কবি বানানোর পাঁয়তারা করলেন (কী তামশা!) এইগুলো যুক্তির ভান হইবো না, এটা কেমন কথা রাইসু ভাই? কবিতাগুলা কেমনে ভাল্লাগলো না, তা যেমন যুক্তি-তত্ত্ব দিয়া কওন যায়, কেমনে ভাল্লাগলো তাও নিশ্চয়ই যুক্তি-তত্ত্ব দিয়া কওন যাইবো, না-কি?

খালি এইটুকু ভালো লাগালো, ওইটুকু লাগলো না—এই ভাবেও কেউ কইতে পারেন, আবার কেউ ব্যাখ্যাও দিতে পারেন বটে। আর ব্যাখ্যা দিতে গিয়া তো অটোমেটিক যুক্তি আসেই, হেইডা ক্যান ভান-ভণিতা হইবো বুঝতে পারলাম না।

মাসুদ খানে’র কিছু কবিতায় (ম্যটাফিজিক্যাল বিষয় আশয় আছে সত্য (জগতে অনেক বিখ্যাত কবিতা মেটাফিজিক্যাল আছে বটে), বাট্, তার কবিতায় মুসলমানীয়, বা খ্রিস্টানীয় আল্লা-খোদা নাইগা তো। একজন প্রকৃত কবি তো, অনেক কিছু ধারণ করেন এক সাথে, মুসলমানীয়, খ্রিস্টানীয়, কনফুসীয়, বৈদীয়, নাস্তিকীয়, ইত্যাদি হরেক রঙের ধর্মভাব কিম্বা হরেক জাতের দর্শনচিন্তা। হেইডাই তো কবির স্বাভাবিক বিশেষত্ব।

ঘন ঘন ব্রহ্মাণ্ডের উল্লেখরে গৌণ কইরা দেখাইতে গিয়া ঐ মন্তব্য করছি….

(এইটা আবার আলঙ্কারিক কিনা!) যাই হোক, এই যে গৌণ কইরা দেখানোর প্রবণতা, বোধ করি এর পিছনের উদ্দেশ্য মহৎ, নাকি?

আমার আরেক ভাই, মাহবুব মোর্শেদ ডরাইতেছেন, মাসুদ খান সাধারণের লাইগা কবিতা লেখার জন্য সহজ হইয়া যাইতেছেন। কিন্তুক, আমার মনে হইছে কী, ভালো কবিতা লেখার তাগিদেই তিনি সহজ হওয়ার সাধন করতেছেন। সহজ বলতে, আবারও কই, সহজাত, ইজি ও আছানি (মুশকিল আছান) … সহজ কিন্তু সরল বা তরল না। আম-জনতার তরে, নিশ্চয়ই মাসুদ খান কবিতা লেখেন না। তার দ্বারা এ কাজ সম্ভব কি? তবে, রোবটের লাহান জটিল মার্গীয় ভাব-ভড়ং নিয়া এই যে, কবিতা এস্তেমাল হইয়া আসতেছে (মাসুদ খানের প্রথম দিকের কিছু কবিতা ওইরকম) সাধারণ তো দূরে থাক্, এইগুলা তো অনেক সময় খোদ কবিরাও বুঝতে পারেন কিনা সন্দে আছে। আপনে কইছেন মাসুদ ভাইয়ের একটাই দোষ তিনি সরল হইতাছেন। আমি কই কী, মাসুদ খানের একটাই একটু দোষ, তা হইলো, কেন যে তিনি আরও সহজ হইতাছেন না?

২৭.
(জুলাই ২৮, ২০০৫)

ধর্মাবতার, আপনার আদালতে / মাহবুব মোর্শেদ

গত চিঠিতে মানস চৌধুরীকে শিক্ষক স্বীকার করে নিছিলাম। কিন্তু জাজ বা বিচারক স্বীকার করি নাই। কিন্তু আমার পত্র বিষয়ে বলতে গিয়া রীতিমতো বিচারকের আসন নিয়া উনি আমাকে শিকার করার প্রয়াস পাইছেন। ওনারে বিচারক ভাবতেও আমার অসুবিধা নাই। তাই তাকে বিচারক হিসাবে এবং তার ভার্চুয়াল আদালতকে হাজির-নাজির মেনে এই চিঠি।

মানস শুরু করছেন বিচারকসুলভ ঔচিত্যবোধ থেকে। শিরোনামেই বলছেন, দরকার। কী দরকার? ‘সরল’ ‘জটিল’ ক্যাটাগরি নিয়া সন্দেহ। ‘সন্দেহ’ থাকা দরকার, পুলিশের এবং বিচারকের। কেননা তাদের বিচার পদ্ধতির শুরু অন্যকে অপরাধী ভাবা দিয়াই। মানস ‘সন্দেহ’ করছেন। কিন্তু ধর্মাবতার একটু দেরিতে সন্দেহ করলেন। মাসুদ খান এবং ‘সরল’ ‘জটিল’ ‘ক্যাটাগরি’ আমিই প্রথম উত্থাপন করি নাই। এই নিয়া এই পর্বে কবিসভায় কিঞ্চিত তর্ক বহিয়া গেছে। কিন্তু স্যারের রহস্যময় কারণে তখন সন্দেহ করার অবকাশ তৈরি হয় নাই। আমাকে কাঠগড়ায় পেয়ে তার সকল সন্দেহের বাঁধ ভেঙেছে।
—————————————————————–
মাননীয় আদালত, ‘ক্যাটাগরি’র মামলা তো ৫৪ ধারা বা বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতোই। এই মামলায় মানুষকে মানুষ, কবিতাকে কবিতা, কবিসভাকে কবিসভা ইত্যাদি সকল কিছুকে সকল কিছু বললেই ফেঁসে যেতে পারি। কারণ শুধু সরল/জটিলই নয়, সকল কিছুই ক্যাটাগরি… ভাবুন, ঘোড়া একটা ক্যাটাগরি আর ডিম আরেকটা ক্যাটাগরি। কিন্তু ঘোড়ার ডিমকে দেখুন কেমন আলাদা একটা ক্যাটাগরি হয়ে আছে?
—————————————————————–
পরন্তু, আমরা একে অন্যকে বুঝতে পারতেছি না কেন-আমার এই একটি আর্জিও আদালতের মনঃপূত হয় নাই। তিনি অবজেক্টিভ কনডিশনটাকে সাবজেকটিভ আকারে বিবেচনা করার অবকাশ পাইছেন। ফলে সমস্যাটা তার কাছে আদালতকে বিদ্রুপ করার শামিল। এবং আমার আর্জি সেই কারণেই তিনি ‘ডিসমিস’ করে দিছেন।

কিন্তু আদালত যে মামলা চালাতে চান তা হলো-মাসুদ খানের ‘সরলতা’ মামলা। তিনি রীতিমতো সাক্ষ্য-প্রমাণ দাখিল করতে বলছেন। (…মাসুদ খান কি বর্তমান ধারায় কবিতা লেখার তাগিদ ব্যক্ত করেছিলেন কোথাও?) এখন আদালতের কাছে আমার ভীরু জিজ্ঞাস্য, সাক্ষ্য-সাবুদ বা লিখিত স্বীকারোক্তি কোনটা তার রায় দিবার ক্ষেত্রে সহায়ক হইতে পারে?

মানস বলছেন, ‘মাহবুব মোর্শেদের পত্রের শেষাংশ আমার গুরুতর লাফঝাঁপ মনে হয়েছে।’ ধর্মাবতার, আপনি কি দেখেন নাই কাঠবিড়ালের চলনই লাফঝাঁপময়? সে হাঁটে, কিন্তু মানুষ তাকে দোষারোপ করে বলে লাফাইতেছে। আসলে কিন্তু দুনিয়া জুড়ে লাফাইতেছে মানুষেই। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আমি যে জায়গায় লাফঝাঁপের বিরুদ্ধে দাঁড়াইছি সেইখানেই স্যারের মনে হইছে আমি লাফ-ঝাঁপ দিতেছি। (আমরা কি পরস্পরের কথা বুঝতে পারতেছি?) কেমন? আমি বলছি, কবি তার স্বভাবের বাইরে যাইতে পারেন না। কারণ স্বভাবের (স্বভাব-শুধু নিজের ভাব নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থানও স্বভাবের অন্তর্ভূক্ত হইতে পারে) বাইরে গিয়া কবি যে কবিতা লেখেন তা আর কবিতা থাকে না। আর কবিও কবিতা লেখতে পারেন না। এই ঘটনা বহুজন পর্যবেক্ষণ করছেন। (সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে।) যে নারীবাদী না সে লেখায় তা প্রকাশ করতে গেলে করতে পারে। এবং ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু, ধর্মাবতার, যে কবি যা না, সে তা করতে গেলে ধরা পইড়া যায়। এইটা কেমনে হয়? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হইলে আমারে অনেক ‘ক্যাটাগরি’র মামলায় ফাঁইসা যাইতে হবে।

আপাতত এইটুকু বলাই যথেষ্ট, আমি সজ্ঞানে লাফ-ঝাঁপ দেই নাই। কাহাকেও ইহাতে প্রলুব্ধও করি নাই। বরং, আমি ইহার বিরোধিতা করিয়াছি। অঙ্গীকার করিতেছি, লাফ-ঝাঁপের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করিয়া ভবিষ্যতে সুশীল সমাজ গঠনে অবদান রাখিব।

আর মাননীয় আদালত, ‘ক্যাটাগরি’র মামলা তো ৫৪ ধারা বা বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতোই। এই মামলায় মানুষকে মানুষ, কবিতাকে কবিতা, কবিসভাকে কবিসভা ইত্যাদি সকল কিছুকে সকল কিছু বললেই ফেঁসে যেতে পারি। কারণ শুধু সরল/জটিলই নয়, সকল কিছুই ক্যাটাগরি। আদালত যদি চাহেন তো সরল/জটিল লাগবে না, যে কোনো ক্যাটাগরিতেই আমাকে সাজা দিতে পারেন।

অবশ্য আপনার ক্যাটাগরির প্রসঙ্গ উত্থাপন দেখে একটা দারুণ আইডিয়া পাইলাম। ভাবুন, ঘোড়া একটা ক্যাটাগরি আর ডিম আরেকটা ক্যাটাগরি। কিন্তু ঘোড়ার ডিমকে দেখুন কেমন আলাদা একটা ক্যাটাগরি হয়ে আছে? ধর্মাবতার, এই ক্যাটাগরির মামলা থেকে আমারে রেহাই দিন। ক্লাসরুমে এই বিদ্যা শেখা যায়। কিন্তু কবিসভায় এই ভার বহিবার সাধ্য আমার নাই।
আসামী, অধম
মাহবুব মোর্শেদ

২৯.
(জুলাই ২৯, ২০০৫)

জনাব মাহবুব মোর্শেদ সমীপে / মানস চৌধুরী

জনাব মাহবুব মোর্শেদ,

আপনার বর্তমান চিঠির স্বর থেকে নিশ্চয়ই কিছু তালিম নেয়া যায়। কিন্তু নানা কারণে সেটা আমার আগ্রহ নয়। অধিকন্তু, স্বর সারমর্মের সঙ্গে বিলক্ষণ জড়িত জানা থাকা সত্ত্বেও, সারমর্ম নিয়ে যোগাযোগ করাই আমার এলেমে কুলায় আজ অবধি, স্বর নিয়ে নয়।

আমার একটা স্বীকারোক্তিকে আপনি ‘খোঁচা মারা’ ধরে নিয়েছিলেন যাতে আপনার খোঁচা-মারা জায়েজ হয়। এবং সেটাকে আমি উল্লেখ করাতে আপনি এখন জানাচ্ছেন আমাকে ‘শিক্ষক স্বীকার করে নিয়েছিলেন’। গত চিঠিতে আমার ভাবনা আমি দৃঢ়ভাবে বলতে প্রয়াস পেয়েছিলাম, যে-কবিতা (বা সাধারণভাবে সাহিত্যের ক্ষেত্রেই) ‘সরল-জটিল’ ভেদবিচার করবার ব্যাপারে প্রবল সন্দেহ পোষণ করা পদ্ধতিগতভাবে জরুরি। সেটা আমি এখনো মনে করি। আর বলেছিলাম আপনার যুক্তি-তর্কের মধ্যে গুরুতর লাফ-ঝাঁপ আছে। যথা এই বচন যে ‘কবি তাঁর স্বভাবের বাইরে যেতে পারেন না’। আমি দাবি করেছিলাম কবি-স্বভাব আকাট কিছু নয়। কার্যতঃ আপনি আমাকে বিচারক সাব্যস্ত করলেন, কারণ, হয়তো, আপনার ধারণা এভাবে আমাকে নাকাল করা সম্ভব। কিন্তু আমার লক্ষ্য আপনাকে নাকাল করা ছিল না। আপনার সঙ্গে আমি এই আলাপে শামিল/সংমিশ্রিত বোধ করতেই চেয়েছিলাম। অধিকন্তু, আমার পত্র এসংক্রান্ত একটা খোলা-আলাপের লক্ষ্যে কেবল আপনাকেই আর উদ্দিষ্ট রাখেনি শেষমেশ। যাহোক, আপনার কথাবার্তার লাফ-ঝাঁপ এক্ষণেও আলোচ্য হতে পারে। আপনি আমি উভয়েই তো জানি যে এটা কবিসভা, এবং ‘ক্লাশরুম’ নয়। জানি তো? এবং কবিসভায় আমার আলোচনার (বা আপনার ভাষায় বিচারকার্যের) ভার বহন করবার সাধ্য আপনার নাই -আপনার বয়ান অনুযায়ী। তাহলে আমাকে শিক্ষক হিসেবে স্বীকার করে নেবার প্রাসঙ্গিকতা কী এখানে? আপনি নিজেও জানেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মাষ্টারি করবার প্রসঙ্গটা আপনি হাজির করেছিলেন কেবল আপনার দেয়া খোঁচাটিকে আরো মহিমান্বিত করবার জন্য। তো, আমার কী করার আছে এখানে! প্রসঙ্গতঃ, ‘কসমিক দুনিয়া থেকে লোকায়ত’ বলে চিঠিখানাতে সরল-জটিল আলাপের কাঠামোটি আপনিই উদ্বোধন করেছিলেন। সেটা বড় বিষয় নয়; আপনি বিস্মৃত হওয়াতে মনে করিয়ে দিচ্ছি মাত্র।
—————————————————————–
কার্যতঃ আপনি আমাকে বিচারক সাব্যস্ত করলেন, কারণ, হয়তো, আপনার ধারণা এভাবে আমাকে নাকাল করা সম্ভব। কিন্তু আমার লক্ষ্য আপনাকে নাকাল করা ছিল না। আপনার সঙ্গে আমি এই আলাপে শামিল/সংমিশ্রিত বোধ করতেই চেয়েছিলাম।
—————————————————————–
ঘটনাচক্রে, আপনি ও আমি একটা অভিন্ন কর্মজগতে একত্রে কিছুকাল সময় কাটিয়েছি-শিক্ষক বা শিক্ষার্থী হিসেবে। আমি একে নেহায়েৎ দৈবাৎ হিসেবে দেখি যে কবিসভায় আমাদের আবার মোলাকাত হয়েছে। ‘সুশীল সমাজ’ গঠনে আপনার পারঙ্গমতা সম্বন্ধে নিশ্চয়ই আমি ওয়াকিবহাল। কিন্তু সেটা নিয়ে আলাপ আমার আগ্রহ নয়। পক্ষান্তরে, আমি যে সুশীল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসি নাই কখনো, কিংবা সেটা আমার বাসনা নয়, তা সুনিশ্চিত আপনি জেনে আসছেন এযাবৎ। কবিসভার ফোরামে তা আপনার মনে না পড়লে সমস্যা নাই। চূড়ান্ত বিচারে, এটা প্রাসঙ্গিকই মনে করি না আমি।

আপনার বিশ্বস্ত
মানস
হিগাশি-হিরোশিমা

৩০.
(জুলাই ২৯, ২০০৫)

আমিন! / ব্রাত্য রাইসু

মিজান মল্লিক ভাই,

(আপনেরে ভাই ডাকলাম, কারণ আপনেও আমারে তাই ডাকছেন; এইটা ব্যঙ্গ বা বক্রতা নয়।)

আপনের ২২/৭/৫ তারিখের পত্রে লেখছেন,

যারা মাসুদ খানের কবিতার পক্ষে কইছেন, তারা তাদের কেন ভাল্লাগছে কীভাবে ভাল্লাগছে, এইসব কইতে গিয়া কিছু যুক্তি দেখাইলেই সেটা যুক্তির ভান হইবো, আর আপনে যে তার কবিতার বিপক্ষে বলতে গিয়া, কত তত্ত্ব কত যুক্তি দেখাইলেন, এই যেমন ধরেন—তুচ্ছ-তীব্র’র তত্ত্ব, প্যাচপেচে সিউডো-দার্শনিকতার কথা কইলেন, ব্লেইকের ছবি টাইনা আনলেন, ধর্ম-দর্শনের ব্যাখ্যা দিলেন, মাসুদ খানের কবিতায় যা নাই (যেমন, আল্লা) হাতে তুড়ি দিয়া তেলেসমাতি তা আবিষ্কার করলেন, তারে ঠেইল্লা ‘মুসলমান’ কবি বানানোর পাঁয়তারা করলেন (কী তামশা!) এইগুলো যুক্তির ভান হইবো না, এটা কেমন কথা রাইসু ভাই? কবিতাগুলা কেমনে ভাল্লাগলো না, তা যেমন যুক্তি-তত্ত্ব দিয়া কওন যায়, কেমনে ভাল্লাগলো তাও নিশ্চয়ই যুক্তি-তত্ত্ব দিয়া কওন যাইবো, না-কি?

‘যুক্তির ভান’ (যুক্তিসহকারে কথা বলার ভান) আর ‘যুক্তির ভুল’ এক জিনিস না। আপনের পোস্ট পইড়া মনে হইল আপনে এই ব্যাপারটা খেয়াল করতে চান নাই। বরং আপনে আবারও, এইখানেও, একটা যুক্তির ভান ধরছেন।

বোঝাইয়া কই। একটু মনোযোগ দিয়া শুইনেন। এক কথা বার বার বোঝাইলে মাইনষে আমারে বলদ নাইলে মাষ্টার ডাকন শুরু করবো। অবশ্য একই কথা।
—————————————————————–
আপনের কথিত “এটা কেমন কথা” একটা আবদারমূলক উষ্মা। অথচ কেমন আপ্‌সে যুক্তিবৎ ছাইড়া দিলেন। মনে হইতে পারে যে আপনি বোধহয় বইলা ফেলতে পারছেন যে আমার কথাগুলা কেন যুক্তির ভান হইব, কিন্তু আদতে তো আপনে কিছু কন নাই।… এই যে যুক্তি দেওনের ভানটি করলেন কিন্তু দিলেন না, অথচ ঠিকই সিদ্ধান্ত টাইনা দিলেন…এইটারেই আমি বলছি যুক্তির ভান।
—————————————————————–
ধর্মনিরপেক্ষ (বা ধর্ম পরিচয়ে নিরুৎসাহী) খান ও তার কবিতার খ্রীস্টান গড বিষয়ে লেখায় যেইসব কচকচি করছি সেগুলা তো আমার ইন্দ্রিয় অনুভূতির সারাৎসার না। যুক্তিপূর্ণ মতামত। খানের কবিতায় আমি যা দেখতে পাইছি, তাই আছে বইলা বলছি। কীভাবে আছে তাও বলছি। এখন আমার বলাটা ভুল হইতে পারে বা আমার যুক্তি ভুয়া হইতে পারে। আপনে তা খন্ডন না কইরা আমি কী কী কইছি তার একটা লিস্টি দিয়া দিলেন। আপনে দিলেন অইল লিস্টি ভাবটা দেহাইলেন যুক্তি দিতাছেন।

আপনে কী কইছেন মনে আছে? আমি কী কী করছি না করছি আপনের ভাষায় কইয়া মইয়া হেষে কইছেন: ‘এইগুলো যুক্তির ভান হইবো না, এটা কেমন কথা রাইসু ভাই?’

কীসের কারণে বা কীভাবে আমার কথাগুলা ভান হইব তা কি বলতে পারছেন আপনে। বলতে চান নাই বা বলতে পারেন নাই। আপনে লিস্ট তৈরি করলেই তা আমার কথারে অপ্রমাণ করে না? আপনের কথিত “এটা কেমন কথা” একটা আবদারমূলক উষ্মা। অথচ কেমন আপ্‌সে যুক্তিবৎ ছাইড়া দিলেন। মনে হইতে পারে যে আপনি বোধহয় বইলা ফেলতে পারছেন যে আমার কথাগুলা কেন যুক্তির ভান হইব, কিন্তু আদতে তো আপনে কিছু কন নাই।

এই যে যুক্তি দেওনের ভানটি করলেন কিন্তু দিলেন না, অথচ ঠিকই সিদ্ধান্ত টাইনা দিলেন…এইটারেই আমি বলছি যুক্তির ভান।

২.
আপনে লেখছেন, “মাসুদ খানের কবিতায় যা নাই (যেমন, আল্লা) হাতে তুড়ি দিয়া তেলেসমাতি তা আবিষ্কার করলেন।”

আমারে আপনে বলেন, মাসুদ খানের কবিতায় জরিপকর্তা যে আসমানের আগায় বইসা বইসা জরিপ করতে আছে হেয় কে তাইলে? আল্লা না তো কি রাজউকের আমিন সাব?

ওয়েব লিংক
http://groups.yahoo.com/group/kabishabha/
http://www.kabishabha.com


free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com