ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি

সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৭)

chanchal | 29 May , 2009  

কিস্তি:

ha_young.jpg
ষাটের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ুন আজাদ

বইমেলা প্রিয় ছিল তাঁর; বছরের এই সময়টায় তাঁকে বেশি উৎফুল্ল দেখা যেত; সপ্তাহের প্রতিদিনই তিনি আসতেন বিকালে, থাকতেন মেলা শেষ হওয়া অব্দি; শুক্রবার দুপুরেই চলে আসতেন; প্রায়ই দেখা যেত অনুরাগী ও উৎসাহী কয়েকজন তাঁর সঙ্গেই হাঁটছে, তিনি আগামী প্রকাশনীর স্টলে বসলে সেখানে তাৎক্ষণিক ও সাময়িক আড্ডা জমে উঠেছে তাঁকে নিয়ে। ১৯৯৬-৯৭-র দিকে দেখেছি তাঁর পাশে বসে আছেন আকিমুন রহমান (কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক; হুমায়ুন আজাদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করেছেন); দু’জনেই কলা খাচ্ছেন। কলা তিনি পছন্দ করতেন খুব, আন্ওয়ার ভাইয়ের বাসায় গিয়ে সামান্য কথাবার্তার পর বলতেন, ‘আন্ওয়ার সাহেব, কলা আছে? কলা খাবো।’

তো, একদিন বইমেলায়, সেটা ২০০১ সালে সম্ভবত, দৈনিক আজকের কাগজ-এর (২০০৭-এ বন্ধ হয়ে গেছে পত্রিকাটি) সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ আগামী প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েই সেলসম্যানকে বললেন. ‘হুমায়ুন আজাদের যত বই বেরিয়েছে, সব প্যাকেট করুন। প্রতিটা দশ কপি করে দেবেন।’ একটার পর একটা বই জড়ো করছেন সেলসম্যান, হুমায়ুন আজাদ সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে তারপর তাকালেন ক্রেতার দিকে; তারপর সন্ধ্যারঞ্জিত পশ্চিমাকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ততক্ষণে মেলার সব আলো জ্বলে উঠেছে। চশমায় সেই আকাশ আর আলো তত বিপুল ছিল না; কেননা, নিজের বই বিক্রির আনন্দ তাঁর মুখে যে আভা ও রেখা তৈরি করেছিল, তা-ই দর্শনীয় হয়ে উঠেছিল। তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে খুব আয়েশি ভঙ্গিতে ধোঁয়া ছাড়লেন। মনে হয়েছিল, ধূমপান তাঁর উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য কাজী শাহেদ আহমেদের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করা। সেটা হয়ত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। নইলে এটা তিনি বলতে পারতেন না যে, ‘ধূমপান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।’ হুমায়ুন আজাদ গম্ভীর চেহারা ও স্বরে বললেন, ‘বাঙালির জ্ঞানভাণ্ড উপচে পড়ছে দেখছি!’

এক বার মেলা থেকে তাঁকে বের হতে দেখে পিছু নিলাম। আণবিক শক্তি কমিশনের সামনের দোকান থেকে সিগারেট কেনার মুহূর্তে একটা ছেলে এসে তাঁকে সালাম দিল। ততক্ষণে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি আমি। সে যে বাঙলা বিভাগের ছাত্র, তা মোটামুটি বুঝতে পারা গেল তখন, তিনি যখন বললেন, ‘সালাম পেলে আমি খুশি হতে পারি না। কারণ, আমার খালি মনে হয়, বাঙালিকে পাকিস্তান যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই আছে এখনও।’ ছেলেটি দু’হাত জোড় করে বিব্রত ও লাজুক চেহারায় সামান্য হাসল। আমি বললাম, ‘স্যার, মানুষ এই সংস্কৃতি কিন্তু গ্রহণ করেছে। সেটা পাকিস্তান চেয়েছিল বলে নয়, নিজেদের মুসলমান ভাবে বলে।’

ছেলেটি স্থানত্যাগ করল। সঙ্গে-সঙ্গে আরও দু’জন ছেলে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। ‘ভালো আছেন স্যার?’ তখন হুমায়ুন আজাদ সিগারেটে অগ্নিসংযোগের উদ্যোগ নিচ্ছেন মাত্র, তা না-করে বললেন, ‘ভালো আছি। তোমরা ভালো আছ?’ সিগারেট ঠোঁটেই ছিল, ধরিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘চা খাবে?’ ওই দোকানের সামনের বেঞ্চটিতে বসার জায়গা ছিল না। ছেলে দু’টি বসে-থাকা লোকদের উদ্দেশে বলল, ‘স্যারকে বসতে দেন।’ শুনে দু’তিনজন উঠে দাঁড়াতেই তিনি তাদের বসতে বললেন। পরের বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই দোকান থেকে ২০-২৫ গজ দূরে তিনি ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। সেই রাতে আমি তাঁকে ফুলার রোডের বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। টিএসসি পার হতে হতে তিনি জানতে চাইলেন আমি কোথায় থাকি; বাসায় আমার কে-কে থাকে; বললাম, ‘ইন্দিরা রোডে থাকি। বাসায় আমার বউকে নিয়ে বাবা-মা-ভাই-বোনের সঙ্গে থাকি।’

‘সন্তান আছে?’

বলি, ‘আছে। ছেলে। একটা।’

‘কী নাম রেখেছ?’

‘ঋষভ।’

‘হুম। ভালো। হামা দেয়, না হাঁটে?’

‘হাঁটার সময় এখনও হয় নাই স্যার।’

ডাসের সামনের রাস্তাটি পার হওয়ার আগে আরেকটা সিগারেট ধরালেন তিনি। বললেন, ‘উত্তর দেয়ার এই ধরনটা তুমি কোত্থেকে পেয়েছ? বলবে হামা দেয় বা হাঁটে।’

‘স্যার, জন্মসূত্রে মনে হয় এটা আমি পেয়েছি। তবে উত্তরটা আমি নিজের মত দিতে পছন্দ করি। আর প্রশ্নকর্তাকে কিঞ্চিৎ খটকায় ফেলতেও ভালো লাগে স্যার।’

আমরা রাস্তা পার হয়ে রোকেয়া হলের সামনে আসি। তিনি বললেন, ‘সেজন্যেই তো পরীক্ষায় তুমি ভালো করতে পারো নি।’ বললাম, ‘সেটা পারা আমার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় আমি ভালো করেছিলাম। মাস্টার্সের মৌখিক পরীক্ষায় স্যার আমিই একমাত্র ফার্স্ট ক্লাস নম্বর পেয়েছিলাম। তবে সেজন্যে আমার কোনও প্রস্তুতি ছিল না। কারণ, মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না।’

আমার একটা ‘বদঅভ্যাস’ আমি খুব শব্দ করে কথা বলি। আবেগ আর উত্তেজনায় বেশ চেঁচিয়ে উঠি। ফলে, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ও বসে থাকা ছেলেমেয়েরা আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। হয়তো তারা হুমায়ুন আজাদকে দেখছিল—এও ভেবে যে, কোথাকার এক চশমাপরা লোক বিখ্যাত এই লেখকের সঙ্গে ‘বেয়াদবি’ করছে!

আমরা দেয়াল ঘেঁষে হাঁটছিলাম। ‘কারা তোমার পরীক্ষা নিয়েছিলেন?’

বলি, ‘আনিসুজ্জামান, আহমেদ কবীর এঁরা ছিলেন। আর ভুঁইয়া ইকবাল এসেছিলেন বাইরে থেকে।’

‘প্রশ্নগুলো মনে আছে?’

‘আছে। পরীক্ষাটা খুব উপভোগ করেছি স্যার। কার জন্ম কত সালে, কোন বইয়ের মলাট কেমন, লেখক কে—এই ধরনের প্রশ্ন আমাকে করা হয় নাই।’

‘তা হলে কী প্রশ্ন করা হয়েছিল?’

‘এটা নিয়ে আমি প্রবন্ধ-গোছের একটা গদ্য লিখেছি। অরুন্ধতীতে।’

‘আবার তুমি ঠিকমতো উত্তর দিচ্ছ না।’

‘আমি তো স্যার পরীক্ষা দিচ্ছি না।’

‘তোমার পরিবর্তনের আশা আমি ছেড়ে দিয়েছি। এই স্বভাব নিয়ে কোনোদিন তোমার উন্নতি হবে না।’

‘স্যার, একটা প্রবচনে আপনি বলেছিলেন, উন্নতি হচ্ছে উপরের দিকে পতন।’

কিছুক্ষণ তিনি চুপ করে রইলেন। ভিসির বাড়ি পার হয়ে বাম দিকে হাঁটছিলাম আমরা। তিনি আমার দিকে না-তাকিয়েই বললেন, ‘এখন বাসায় যাও।’

বলি, ‘আপনাকে আর একটু এগিয়ে দিই।’

‘তুমি যাও। আমি কখনও পিছিয়ে থাকি না।’

‘সেটা জানি। কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে আর একটু হাঁটতে চাই।’

আমরা চুপচাপ রাস্তা পার হলাম, হাঁটতে হাঁটতে আবাসিক ভবনগুলোর সেই গেটে যখন এলাম, তিনি বললেন, ‘আর যেতে হবে না তোমাকে। অরুন্ধতীর ওই সংখ্যার একটা কপি আমাকে দিও তো!’

সেই কপি আমি তাঁকে দিতে পারি নি। এই না-পারার কথা ভাবলে আমার ছফা ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। তাঁর কবিতার বইয়ের ওপর সাপ্তাহিক খবরের কাগজে আমি একটা আলোচনা লিখেছিলাম ২০০০ সালে। প্রকাশের তিন দিন পর তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ‘তুমি খুব চমৎকার লিখেছ, কবিতা তুমি এত ভালো বোঝ, আমার জানা ছিল না। নিশ্চয় তুমি ভালো কবিতা লেখো। তোমার কবিতা আমি পড়তে চাই।’

আনন্দে তখন আমার বাকযন্ত্র প্রায় নিষ্ক্রিয়; আমি শুধু ‘জ্বি-জ্বি’ করতে লাগলাম। উল্লেখ বাহুল্য নয়, সাপ্তাহিক খবরের কাগজে প্রতি সংখ্যায় ওই সমালোচনা লিখে আমি খুব কমই প্রশংসা পেয়েছি; নিন্দিত হয়েছি অনেক বেশি, বিশেষত যাঁদের বই নিয়ে কাজটি করেছি। প্রায় সব বই হাসান মাহমুদের হাত থেকে আসত, যেগুলোর বেশির ভাগই ছিল সমালোচনার অযোগ্য। সম্পর্ক ভালো বা টিকিয়ে রাখার জন্যে সাহিত্যে যে-অসততার চর্চা হয়ে আসছিল, তা থেকে নিজেকে মুক্ত বা দূরে রাখার চেষ্টা করেছি আমি। ফলে, অনেকে আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সমালোচনা প্রকাশের পর দু’একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে শুনেছি। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবেই ছফা ভাইয়ের এসব কথা শুনে আমার মন ভালো হয়ে গেল।

তিনি বললেন, ‘তুমি কী খাবে, বলো। তুমি চাইলে আমি একটা বোতল পাঠিয়ে দিতে পারি।’

বললাম, ‘না-না, আমিই আসবো।’

বললেন, ‘এ-বছর তোমার কোনও বই বেরিয়েছে?’

‘না।’

‘তোমার বই অবশ্যই বের হবে। তুমি পাণ্ডুলিপি নিয়ে চলে এসো। মেলায় হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। সৃষ্টিশীলদের মৌসুম থাকতে নেই।’

তাঁর আবেগ আমাকে তছনছ করে ফেলেছিল, সেই সুখকর তাণ্ডবে এইসব কথা আমি সারাদিন মনে-মনে বহুবার শুনতে পেয়েছি। না নিজের কবিতার বই, না পাণ্ডুলিপি, কোনওটাই আমি দিতে পারি নি তাঁকে।

হুমায়ুন আজাদকে একদিন ছফা ভাইয়ের লেনিন ঘুমাবে এবার কবিতার কথা পাড়তেই তিনি বললেন, ‘বামপন্থিদের এটা পড়া উচিত; খুব পড়া উচিত।’

বললাম, ‘কেন? অন্যদের নয় কেন?’

‘আমি বলছি বিশেষত বামপন্থিদের কথা, এখানকার বামদের কথা, তাদের মধ্যে আবেগ বলে কিছু নেই। তারা ব্যবসা করে; কিন্তু ব্যবসার লক্ষ্য তো মুনাফা। মুনাফা দিয়ে বিপ্লব হয় না।’

‘আপনি কি মনে করেন কবিতাটি পড়ে তাঁরা ব্যবসা ছেড়ে দেবে?’

‘তা ছাড়বে বলছি না। কিন্তু কবিতাটির যে আবেগ তাতে একটা সৌন্দর্য আছে। কবিতা লেখার জন্যে যে জ্ঞান ও সৌন্দর্যবোধ দরকার আহমদ ছফার তা আছে। আমি বুঝি না, এরকম কবিপ্রতিভা নিয়ে কেন তিনি উপন্যাসে নিজেকে উজাড় করে ফেলছেন!’

ছফা ভাইয়ের মৃত্যুর (২৮ জুলাই ২০০১) পরদিন টিএসসিতে তাঁর লাশ আনা হয়। আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সালাম সালেহ উদদীন, সাখাওয়াত টিপু আর আমি আজকের কাগজ-এর পক্ষ থেকে যাই তাঁকে ফুল দিতে। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। হুমায়ুন আজাদের লাশ জার্মানি থেকে যেদিন ঢাকায় আসে সেদিনও আকাশের চেহারা এমন ছিল; বৃষ্টি হয়েছিল। আমার খুব মনে পড়ছে সমুদ্র গুপ্তর কথা (হায়, তিনিও নেই আজ, ২০০৮ সালের ১৯ জুলাই ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়); ফুলে-ফুলে ছফা ভাইয়ের লাশ ঢেকে গেলে সমুদ্রদা আর্তনাদ করে উঠেছিলেন, ‘এত ফুল কেন? এত ভালোবাসা কি তাঁর সহ্য হবে?’ তখন দেখি টিএসসির ভেতরবারান্দায় ছফা ভাইকে শেষবার দেখার জন্যে দীর্ঘ লাইন; তাতে হুমায়ুন আজাদ, হাতে ফুল তাঁর—রজনীগন্ধা; বিষণ্ণ, শোকগ্রস্ত মুখ নিয়ে তিনি আস্তে আস্তে লাশের দিকে এগুচ্ছেন। ততক্ষণে আমরা ফুল দিয়ে লাশের এক পাশে দাঁড়িয়েছি। আমাদের পেছনে দাঁড়ানো কে যেন বলে উঠল, ‘মাসখানেক আগেই তো দেখলাম স্যারের সঙ্গে ছফা ভাইয়ের কথা কাটাকাটি হইছে।’ ঘাড় ঘুরিয়ে টিপু বলল, ‘আপনার সমস্যা কী?’ ‘না, মানে স্যার তো ফুল দিতে আইছেন।’ টিপু বলল, ‘মতের পার্থক্য থাকলেও উনাদের জগত একটাই। পথ ভিন্ন হইলেও লক্ষ্য এক।’

কিন্তু কেন যেন মনে হল সব অর্থহীন। মনে হল, আমাদের আবেগে বৈধতা আরোপের জন্যে যত যুক্তি থাকুক না কেন, জীবিতের ফুল মৃত গ্রহণ করে না। মৃত ব্যক্তি যত অমর হোক, যত বড় পণ্ডিত হোক জীবিত ব্যক্তি—এই ফুল, শোক, বিষণ্নতা তাকে স্পর্শ করে না।

১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে হারালে খুব উৎসব হয়েছিল। যারা পাকিস্তানের সমর্থক তারা একে পাতানো খেলা মনে করে সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাকিদের জন্যে এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মতোই। এই আনন্দে নির্মলেন্দু গুণ থেকে শুরু করে সবাই মেতেছিলেন তখন। তো, হুমায়ুন আজাদ কেমন আনন্দিত তা জানার চেষ্টা করতেই তিনি বললেন, ‘খেলাটি আমার পছন্দ নয়।’

‘কেন?’

‘এটা তো পাকিস্তানের প্রিয় খেলা।’

‘অন্য দেশগুলিও তো খেলে।’

‘সেটা সেই সব দেশের ব্যাপার।’

‘তা হলে?’

‘বাংলাদেশের এই খেলা বর্জন করা উচিত। খেললেও পাকিস্তানের সঙ্গে নয়। বাঙালির উচিত নয় ওদের সঙ্গে কোনও খেলায় অংশ নেয়া। শুধু খেলা কেন, ওদের সঙ্গে বাঙালির কোনও সম্পর্ক রাখা উচিত নয়।’

‘কিন্তু অনেকেই বলে, খেলার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই।’

‘এটা পাকিস্তানপন্থিরা বলে। নির্বোধরা তা মেনে নেয়। একটা দেশ যখন আরেকটা দেশের সঙ্গে খেলে, রাজনীতি অবশ্যই থাকে। তারা তো নিজেদের পতাকা নিয়ে যায়।’

‘পাকিস্তানকে হারানোর পর সবাই ফূর্তি করছে। আপনার কি একটুও ভালো লাগছে না?’

‘যারা ফূর্তি করছে, তারা কি জানে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও খেলতে হবে? আমি তো ওই চাঁদতারা পতাকার পাশে আমাদের পতাকা দেখতেই চাই না।’

ব্রাত্য রাইসু একটা কবিতা লিখেছিলেন শেষ চরণে হুমায়ুন আজাদের নামোল্লেখ করে, ঘণ্টা (সন্‌ত বেলাল সম্পাদিত, প্রথম সংখ্যা) পত্রিকায়। আমি সেই প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা ওঠানো মাত্র তিনি বললেন, ‘কবিতাটি আমি পড়েছি। উপহাসের প্রতিভা ওর আছে।’

বললাম, ‘স্যার, এই প্রথম কারও কবিতায় আপনার নাম উঠলো।’

‘হুম। মশকরাও হলো।’

তখনও রাইসুর সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিকমতো হয়ে ওঠে নি। এর আগে একবার দেখা হয়েছিল টিএসসিতে, সেটা খুব সম্ভবত ১৯৯০ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের ঘটনা। দিনটি সকাল থেকেই মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সেখানে ছিলেন মিহির মুসাকী, মাহবুব মাসুম (এখন মাহবুবুল হক— মাঝেমধ্যে লেখেন, সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন), নীনা আহমেদ (চার-পাঁচটি গল্প লিখে সংসারে হারিয়ে গেছেন), পিনাকী রায় (খুব কষ্ট করে দু’একটি কবিতা লিখে কোথায় হারিয়ে গেছেন, জানি না); প্রায় এক ঘণ্টা সেখানকার ঘাসে বসে আমরা কথা বলেছিলাম। ‘ক্লাসিক’ শব্দের বাংলা কী—এটা নিয়ে সামান্য তর্কও হয়েছিল, মনে পড়ে। তো, ওই কবিতা নিয়ে কথাটা অনেক দিন পর তাঁকে বলি এই ভেবে যে, হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে তাঁর বিশেষ খাতির আছে। আমাকে যখন তিনি বললেন ‘আপনি কি হুমায়ুন আজাদের চ্যালা?’—বুঝতে পারলাম, এ-নিয়ে আর এগোনো ঠিক হবে না। এবং সেই বিকালে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। টোকন ঠাকুর রুমের মধ্যে ঢুকতেই তাঁকে রাইসু বললেন, ‘কিস হিম!’ টোকন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমার পাশে উর্মিলা আফরোজ (দু’তিন দিন আগে পরিচয় হয়েছে, কবিতা লেখার চেষ্টা করছে এবং সবই রবীন্দ্রনাথের মতো হয়ে যাচ্ছে), তার উপর আমার শরীরটা যেন না-পড়ে, সেই চেষ্টায় সরে গিয়ে শাহরিয়ার রাসেলের (গ্রাফিক আর্টিস্ট, এখন অ্যানিমেশন চিত্রনির্মাতা) পাশে দাঁড়ালাম। কিন্তু টোকন আমাকে চুমু খাওয়ার জন্যে জড়িয়ে ধরেছেন ততক্ষণে; আর রাইসু পানির প্রায় খালি একটা বোতল নেড়ে নেড়ে বলছেন, ‘সাবাশ টোকন, সাবাশ!’ আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘আপনিও খান, প্রতিশোধ নেন।’…

টোকনের সঙ্গে এটাই আমার প্রথম সাক্ষাৎ। পরিস্থিতি শান্ত হলে আমরা পাশাপাশি বসলাম। এই ঘটনার হেতু রাইসুর কাছে জানতে চাইলাম। জবাব না-দিয়ে তিনি স্বর উঁচু করে বললেন, ‘হুমায়ুন আজাদের চ্যালা বাংলাদেশে ম্যালা।’…

যখন খুব উপন্যাস লিখছেন, তাঁর কবিতা লেখা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ‘কবিতা আর লিখছেন না?’ বা, ‘কবিতা কি ছেড়ে দিলেন?’ এই ধরনের প্রশ্ন তাঁকে করতেন অনেকেই। তিনি প্রায়ই একটা কথা বলতেন, ‘ভাষা দূষিত হয়ে গেছে; বাংলা ভাষার শব্দগুলো কবিতায় নতুন অর্থ সৃষ্টির শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।’ ১৯৯৮-র বইমেলায় এক সাংবাদিক বোকার মত প্রশ্ন করেছিলেন, ‘উপন্যাস লিখছেন কেন?’ তাঁর উত্তর ছিল, ‘কোনও বদমাশকে কি তুমি প্রশ্ন করেছ—আপনি বদমাইশি করছেন কেন? প্রশ্নটি না করে থাকলে কাজটা আগে করে এসো এবং জবাবটাও নিয়ে এসো; তার আগে তোমার এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না।’ সাংবাদিক সঙ্গে সঙ্গে স্থানত্যাগ করলেন। আরও বললেন, ‘এই সাংবাদিক বেশ অভিজ্ঞ, কিছুদিন আগে সে হুমায়ুন আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে; তাতে সে জানতে চেয়েছে, হাসির নাটক লেখার সময় তার হাসি পায় কি-না।’ বললেন, ‘এর আগে এক সাংবাদিক আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসে প্রশ্ন করেছিল, আপনার প্রিয় নায়িকা কে? বললাম, তোমার সম্পাদক তোমাকে কার কাছে পাঠিয়েছেন? ওই মহিলা বোঝাতে চাইল যে, সে আমার কাছেই এসেছে। জানতে চাইল, হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস আমি পড়েছি কি-না। বললাম, তিনি আমাকে তাঁর কয়েকটি উপন্যাস উপহার দিয়েছিলেন। তাতে আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা প্রীতিভাজনেষু শব্দে তিনটি ভুল ছিল। এটা দেখেই মনে হয়েছে, এই লেখকের মধ্যে গোলমাল আছে।’

কিস্তি ৮

মনিপুরী পাড়া, ঢাকা ১২/৫/৯

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: চঞ্চল আশরাফ
ইমেইল: chanchalashraf1969@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


11 Responses

  1. জুয়েল মোস্তাফিজ says:

    লেখাটি ভাল লাগল।

    – জুয়েল মোস্তাফিজ

  2. রঞ্জন says:

    জানি না কেন, হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে ভাল মন্দ যে কোনো লেখাই পড়তে ভাল লাগে ।

    – রঞ্জন

  3. Abedin says:

    স্যারকে নিয়ে লিখাটি পড়ে ভালো লাগলো।

    – Abedin

  4. গীতা দাস says:

    হুমায়ুন আজাদ স্যারের চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে চঞ্চল আশরাফের এ লেখা হুমায়ুন আজাদ বিষয়ক গবেষকদের সহযোগিতা করবে।

    – গীতা দাস

  5. রঞ্জন says:

    ১৯৯২ সালের বইমেলায় “মোড়ক”-হীন নারী-তে স্যারের অটোগ্রাফ নিতে নিতে আমাদের চার বন্ধুর কেউ একজন (আমি, সঞ্জীব, গৌতম, দীপক) স্যারকে উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা আছে কিনা জিজ্ঞেস করেছিলাম। স্যার তখন “অপন্যাস” শব্দের জন্ম দিয়ে বেশ আলোচিত, হুমায়ূন আহমেদ-এর ব্যক্তিগত ইমেজও তখন বেশ উঁচু—পরে যা তিনি হারিয়েছেন । ১৯৯৪ সালের দিকে আজকের কাগজ পত্রিকায় স্যারের উপন্যাস নিয়মিত ছাপা হতে থাকে—ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইল। সুতরাং কাজী শাহেদ আহমেদ-এর সাথে স্যারের গল্পটা তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আরেক দিন আমার বন্ধু প্রণব-এর নাম শুনে স্যার খুশি হয়েছিলেন—পরক্ষণেই তার ছাগলদাড়ির জন্য একটু অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কোনো একদিন শিশু একাডেমি থেকে ১৪ টাকা দিয়ে ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না কিনে নিয়ে স্যারের স্বাক্ষর নিতে গেলে বিস্মিত হয়ে স্যার জিজ্ঞেস করেছিলেন “বইটি এখনো ওখানে পাওয়া যায়!” (আগামীতে বইটি তখন ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।)

    – রঞ্জন

  6. আরিফ says:

    হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে লিখাটি সুন্দর হয়েছে। হুমায়ুন আজাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে লেখাটি খুব কাজে আসবে।

    হুমায়ুন আজাদ একজন সাহসী লেখক। তিনি জানতেন অনেক। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে তার সীমিত জ্ঞানের কারণে অযথা ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন। এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার হুমায়ুন আজাদরা হিন্দুয়ানী সব কালচার পছন্দ করেন কিন্তু ইসলামের সব কিছুই অপছন্দ। নিজেদের নাস্তিক দাবি করেন বটে তবে ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্মের কালচার নিজেদের জীবনে ধারণ করতে ভাল লাগে। এ বিপরীতমুখী চরিত্র আমাদের সব নাস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের!

    – আরিফ

  7. চঞ্চল আশরাফের স্মৃতিকথা বেশ ভালো লাগছে। হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে তাঁর আগের স্মৃতিচারণও পড়েছি। চমৎকার! এত স্মৃতিধর তিনি! ভাবতে অবাক লাগে। আমারও কিছু স্মৃতি আছে। সাহস করে একসময় লেখার ইচ্ছে রইল। চঞ্চলকে ধন্যবাদ।

    – তপন বাগচী

  8. pranab says:

    লেখাটি ভালো লেগেছে। হমায়ুন আজাদ আরো সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাচ্ছি।

    – pranab

  9. তপন বাগচীকে বলছি, আপনার স্মৃতিচারণা কেন এখনই লিখে ফেলুন না? আমরা যারা হুমায়ুন আজাদকে জীবদ্দশায় পাইনি, তাদের কাছে ওঁর বিষয়ে একটা লাইন-ও অনেক কিছু, যা হয়ত আপনার বা আপনাদের কাছে নিছক-ই একজন কালপুরুষের স্মৃতি!

    চঞ্চল আশরাফকে ধন্যবাদ, আবারো; এর আগের সবগুলো কিস্তি-ই পড়েছি… অনেক অনেক কিছু জানতে পেরেছি, ভালো লেগেছে…।

    – সালাউদ্দিন ফেরদৌস

  10. নিশাচর says:

    @আরিফ:

    >> কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে তার সীমিত জ্ঞানের কারণে অযথা ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন।

    আমি বাজি ধরে বলতে পারি আপনার থেকে হুমায়ুন এবং অনেক নাস্তিকের ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বেশি জানেন। আপনি যদি শুধু ইসলাম ধর্মের পক্ষে কথা বললেই তাকে জ্ঞানী ভাবেন তবে আমি অপাত্রে জ্ঞান দিচ্ছি।

    >> এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার হুমায়ুন আজাদরা হিন্দুয়ানী সব কালচার পছন্দ করেন কিন্তু ইসলামের সব কিছুই অপছন্দ। নিজেদের নাস্তিক দাবি করেন বটে তবে ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্মের কালচার নিজেদের জীবনে ধারণ করতে ভাল লাগে। এ বিপরীতমুখী চরিত্র আমাদের সব নাস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের!

    হুমায়ুন আজাদ এবং অন্য নাস্তিকদের সম্পর্কে এরকম মন্তব্য করার আগে আপনার ভাবা উচিত ছিল। কোন প্রমাণ আছে আপনার কাছে?

  11. […] তার ছাত্র চঞ্চল আশরাফের স্মৃতিকথায় উল্লেখ আছে- “হুমায়ুন আজাদকে একদিন ছফা ভাইয়ের লেনিন ঘুমাবে কবিতার কথা পাড়তেই তিনি বললেন, ‘বামপন্থীদের এটা পড়া উচিত; খুব পড়া উচিত।’ বললাম, ‘কেন? অন্যদের নয় কেন?’ ‘আমি বলছি বিশেষত বামপন্থিদের কথা, এখানকার বামদের কথা, তাদের মধ্যে আবেগ বলে কিছু নেই। তারা ব্যবসা করে; কিন্তু ব্যবসার লক্ষ্য তো মুনাফা। মুনাফা দিয়ে বিপ্লব হয় না।’ ’’ [সূত্রঃ সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি তার ছা…] […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.