প্রবন্ধ

কবিতায় বঙ্গবন্ধু, প্রসঙ্গ সত্তর দশক

মোজাফ্ফর হোসেন | 15 Aug , 2019  


বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর কয়েক হাজার কবিতা লেখা হয়ে গেছে বলে আমার ধারণা। বাংলাদেশের প্রায় উল্লেখযোগ্য সকল কবি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কলকাতা থেকে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কবিও লিখেছেন। কবিদের পাশাপাশি মনীষ ঘটক, শওকত ওসমান, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, বনফুলের মতো খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকরাও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতাকে আমরা দু-পর্বে ভাগ করতে পারি। ১৯৭৫-এর আগে, বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে; এবং ১৯৭৫-এর পরে, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের পর। ১৯৭০-৭১ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন দক্ষিণারঞ্জন বসু, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, অন্নদাশংকর রায়, জগদীশচন্দ্র চক্রবর্তী, নির্মলেন্দু গুণ, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, বিনোদ বেরা, বনফুল, নিশিকান্ত মজুমদার, নির্মল আচার্য, হাবীবুর রহমান প্রমুখ লেখক। এ সময় ত্রিপুরার কবি রামপ্রসাদ দত্তের ‘ইয়াহিয়া খাঁন তাণ্ডবনৃত্য’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি দীর্ঘ পালাগান রচনা করেন, সেখানে বার বার এসেছে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ। দু’টি লাইন আছে এরকম: আছেন শেখ মুজিবুর ভাই জয় বাংলাদেশে/ শাসনতন্ত্র গঠন করে মনের উল্লাসে। সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের সময় খ্যাতিমান কবি অমীয় চক্রবর্তী লেখেন: আশ্চর্য নেতার নামে জড়ো হয়, আয়ামির দল/ মুজিবের মুখে চেয়ে সারা পাকিস্তানে/ ভোটে জেতে, সংঘশক্তি মুক্তির নিশানী,/ রোধ করবে সাধ্য কার?
পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সালিম পাঞ্জাবি ভাষায় ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক এবং সোনার বাংলা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লেখেন। সেই ‘অপরাধে’ পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী তাঁকে জেলে পাঠায়, ৯ মাস পর ’৭২ সালের জানুয়ারি মাসে মুক্তি দেয়। লাহোর ডিস্ট্রিষ্ট জেলে বসে তিনি রচনা করেন ‘সিরাজউদ্দৌলাহ ধোলা’ শিরোনামে একটি কবিতা। কবিতাটি উৎসর্গ করেন শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। এখানে তিনি সিরাজউদ্দৌল্লাহ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে বলেন যে, স্বদেশি মীরজাফরদের (রাজাকারদের) সহযোগিতার কারণে রক্তস্নাত হল বাংলাদেশ। ভারতের উর্দু কবি কাইফি আজমী ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১৯৭১ সালে একটি কবিতা লিখেন, যেখানে শেখ মুজিবের ছবি ভেসে ওঠে। এভাবে দেশে বিদেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে।


বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে সমকালীন শিল্পসাহিত্য থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দিতে চেয়েছিল। ফলে এ সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখা সহজ কাজ ছিল না। তাই ১৯৬৭ সালে (প্রথম শিরোনাম ‘প্রচ্ছদের জন্য’ পরে ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ শিরোনামে গ্রন্থভুক্ত) ও ১৯৭০ সালে (‘হুলিয়া’ শিরোনামে) এবং ১৯৭১ সালে (‘শেখ মুজিব ১৯৭১’ শিরোনামে) কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে কবিতা লেখেন আর ১৯৭৭ সালে এসে যে কবিতা লেখেন তার মধ্যে পরিস্থিতিগত পার্থক্য ছিল। গুণ নিজেই বলেছেন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে কবিতা লিখতে হয়েছে। সেই কবিতা তিনি ১৯৭৭ সালে (‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ শিরোনামে) একুশের ভোরে বাংলা একাডেমির কবিতা পাঠের আসরে পাঠও করেছেন অসীম সাহস নিয়ে। ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ শীর্ষক কবিতাটির সাহসী উচ্চারণ: ‘শহীদ মিনার থেকে খসেপড়া একটি রক্তাক্ত ইট/ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/ আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম প্রকাশ্যে পঠিত কবিতা এটি। রচনার দিক থেকেও যদি ১৯৬৭ সালের আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর কোনো কবিতা লিখিত না হয়, তাহলে নির্মুলেন্দু গুণই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত প্রথম কবিতার স্রষ্টা। তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর রচনাকালের দিক থেকে প্রথম কবিতার জনক অন্য কেউ। নির্মলেন্দু গুণের কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি, তাঁর আগে আরবি শিক্ষক বঙ্গবন্ধুর বাল্যবন্ধু মৌলভী শেখ আবদুল হালিম আরবি ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা করেন। আরবি থেকে তিনি নিজে বাংলা করেন এবং নির্মলেন্দু গুণ সেটা কাগজে লেখেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে সমাধিস্থ করার পর মনোবেদনা থেকে আরবিতে একটি কবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর এটিই প্রথম কবিতা। কবিতাটি আমি পেয়েছি দৈনিক কালের কণ্ঠে মাওলানা এম এ রহমান লিখিত ‘শহীদ বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত প্রথম আরবি কবিতা’ শীর্ষক গদ্যে। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল’-এর বরাত দিয়ে লেখক কবিতাটি উদ্ধৃত করেছেন এভাবে—‘হে মহান, যাঁর অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত।/ যাঁর আলোতে সারা হিন্দুস্থান, বিশেষ করে বাংলাদেশ-আলোকিত হয়েছিল।/ আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি—ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা।/ নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বের উৎপীড়িত এবং নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলে।/ সেই হেতু অত্যাচারীরা তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে,/ আমি—আমরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের বিচারের প্রার্থনা জানাই,/ যারা তোমাকে বিনা বিচারে হত্যা করেছে।’
এরপরের কবিতাটি লেখেন বাংলাদেশের উর্দুভাষার কবি নওশাদ নূরী। বাংলাদেশের প্রধানতম উর্দু কবিদের একজন তিনি। ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিহারে জন্ম। ১৯৪৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর ওয়াশিংটন সফরের প্রতিবাদে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও লেখক সমিতি পাটনায় একটি বিশাল জনসভা আয়োজন করে। এ সমাবেশে নওশাদ নূরী তাঁর বিখ্যাত ‘ভিখারি’ কবিতাটি পাঠ করেন। বিহার কর্তৃপক্ষ এই কবিতা আবৃত্তির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গ্রেফতার এড়াতে ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। এরপর সামরিক অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট বিভাগে চাকরি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৫২ সালে লিখিত ‘মহেনজোদারো’ কবিতায় বাঙালিদের উপর উর্দুভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানানোয় তাঁকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলে ১৯৬০ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত উর্দু সাপ্তাহিক ‘রুদাদ’-এর সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৬৭-১৯৭১ সালে প্রকাশিত অন্য একটি উর্দু সাপ্তাহিক ‘জারিদা’-এর সম্পাদক ছিলেন।
৭৫-এর ১৫ আগস্ট তিনি ‘উত্থান-উৎস’ কবিতাটি লেখেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে তাঁকে নিয়ে লেখা দ্বিতীয় কবিতা এটি। কবিতায় তিনি বলেছেন—
… সে আছে, সে আছে-
সর্বদা হাজির সে যে, অফুরান শক্তি হয়ে
সে আছে, সে আছে
সে অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যু নেই তার। [অনুবাদ: আসাদ চৌধুরী]

৭৫-এর ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর দাফনের পর তিনি লেখেন ‘নজম টুঙ্গিপাড়া’ শীর্ষক কবিতাটি। এ কবিতায় বলেন—
তোমরা কি জানো? তোমরা কী জানো?
পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,
পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে। [অনুবাদ: আসাদ চৌধুরী]

অর্থাৎ, প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম কবিতাটি রচিত হয় আরবিতে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি উর্দুতে। চতুর্থটি বাংলায়। সেটি লেখেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-কবি সন্তোষ গুপ্ত, ১৯৭৫ সালে। রচনার তারিখ নির্দিষ্ট করে জানতে পারিনি। কবিতার নাম ‘রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনী’। এরপর ১৯৭৭ সালে নির্মলেন্দু গুণ লেখেন ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতাটি। হতে পারে এর মধ্যে আরো কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, সময়ে সে সব তথ্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তাঁকে নিয়ে প্রথম গল্পটি লেখেন আবুল ফজল। গল্পের নাম ‘মৃতের আত্মহত্যা’। ১৫ই আগস্ট তিনি গল্পটি লেখেন। আর প্রথম গান লেখেন কবি কামাল চৌধুরী ও নাট্যব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকী। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে। লিয়াকত আলী লাকীর সুরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা আগের কিছু কবিতাসহ এ গানগুলো কণ্ঠে তোলা হয় এবং সিডি আকারে প্রকাশিত হয়। এর আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা হয় ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে/ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণী…’ গানটি। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচারের মাঝে প্রথম আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে রাতে ‘সংবাদ পরিক্রমা’য় বাজানো হয়েছিল গানটি। খ্যাতিমান গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় গানটিতে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন লোকসংগীতশিল্পী অংশুমান রায়। এই গান রচনার প্রেক্ষাপট আমাদের হয়ত জানা তবু উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। ৪ এপ্রিল, মুক্তিযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। কলকাতার দক্ষিণে গড়িয়া এলাকাটি গড়ে উঠেছে দেশভাগের পরে পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা উদ্বাস্তুদের কলোনি হিসেবে। এখানে একটা চায়ের দোকানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন এই অঞ্চলের বাসিন্দা কয়েকজন গীতিকার, সুরকার আর গায়েকেরা। সেদিনের আড্ডার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’। উপস্থিত ছিলেন লোকসংগীতশিল্পী দিনেন্দ্র চৌধুরী, অংশুমান রায় ও গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। কথার পিঠে কথা জমছে। গৌরীপ্রসন্ন আড্ডার মাঝে লিখে ফেললেন একটি গান। অংশুমানকে বললেন, ‘দেখো তো গানটা চলবে কি না?’ পড়তে পড়তেই অংশুমান বললেন, ‘গৌরীদা, এটা আপনি কাউকে দিতে পারবেন না। গানটায় সুর দেব আমি, গাইবও আমি।’ জন্ম হলো কালজয়ী সেই গানের। আকাশবাণীতে প্রচারের পর তুমুল হইচই পড়ে যায়। পরে হিন্দুস্তান রেকর্ড এই গানটি এলপি আকারে বের করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক হয়, রেকর্ডের এক পিঠে থাকবে অংশুমানের গানটি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, অন্য পিঠে কী থাকবে? এই বিপদ থেকে গৌরীপ্রসন্নই উদ্ধার করলেন। সুর ঠিক রেখে তিনি লিখে দিলেন গানটির ইংরেজি সংস্করণ। তখন মঞ্চে ‘মিলিয়ন মুজিবরস সিংগিং’ শিরোনামে ইংরেজি গানটি গাইতেন করবী নাথ নামে একজন শিল্পী।
বর্তমান গদ্যে আলোচনার বিষয় সত্তর দশকে লিখিত কবিতা। মূল আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর প্রতিবাদস্বরূপ প্রথম কবিতার প্রকাশনাটি হাতে আসে ১৯৭৮ সালে, ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ শিরোনামে। এই ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক সংকলনের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তখনকার সময়ের দেশসেরা কোনো কবি নন। আলতাফ আলী হাসু। বইটির সাম্প্রতিক সংস্করণের ভূমিকায় আমিনুল ইসলাম বেদু জানাচ্ছেন, ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি মতো একটি তরুণ এসে আমাকে বাসস অফিসে বলল আপনি আমাকে চিনেন না, আমি আইনশাস্ত্রে লেখাপড়া করি। আমরা কয়জন ঠিক করেছি, আমরা বঙ্গবন্ধুর উপর একটি ছোট্ট কবিতার সংকলন বের করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করবো।’ তাঁরই উদযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্লাস কক্ষে বেশ কয়েকজন কবি বসেন। আমিনুল ইসলাম বেদু জানাচ্ছেন, সেদিন বৈঠকে তিনি ও হাসুসহ উপস্থিত ছিলেন— দিলওয়ার, হায়াৎ মামুদ, রাহাত খান, মাশুক চৌধুরী, ফরিদুর রহমান বাবুল, সুকুমার বড়ুয়া, মোহাম্মদ মোস্তফা, মাহমুদুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, তুষার কর, মোহাম্মদ রফিক, আবদুল আজিজ, শান্তিময় বিশ্বাস, আখতার হুসেন, ভীষ্মদেব চৌধুরী, জিয়াউদ্দিন আহমদ, জাহিদুল হক, ইউসুফ আলী এটম, সিরাজুল ফরিদ, ফজলুল হক সরকার, মহাদেব সাহা, জাফর ওয়াজেদ, লুৎফর রহমান রিটন, নূর উদদীন শেখ, ওয়াহিদ রেজা, কামাল চৌধুরী ও খালেক বিন জয়েনউদ্দিন। এঁরা সকলে একটি করে কবিতা তিন দিনের ভেতর আলতাফ আলী হাসুর কাছে জমা দেন। এঁদের কবিতা নিয়ে সংকলনটি প্রকাশিত হয়। সম্পাদক হিসেবে কারও নাম যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অজ্ঞাত সংগঠন ‘সূর্য তরুণ গোষ্ঠী’র নামে সেটি প্রকাশিত হয়। লক্ষ্য করার বিষয়, সংকলনে স্থান পাওয়া লেখকদের অনেকে আজ খ্যাতনামা কবি, কেউ কেউ কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক, অনেকে আর কবিতা লেখেননি। যেমন আমিনুল ইসলাম বেদুর এটিই প্রথম এবং শেষ কবিতা। কিন্তু সেসময় আমাদের সাহিত্যে অনেক অগ্রগণ্য কবি ছিলেন, যারা তখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখার সাহস দেখাতে পারেননি। যাঁরা লিখেছেন তাঁদের পাশেও কোনো কোনো কবি দাঁড়াননি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখার কারণে রমনা থানা হাজতে নির্মলেন্দু গুণ সাতদিন ছিলেন। তখন অন্যলেখকদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গুণ বলছেন, ‘মহাদেব(সাহা) গেছিল আমার ছোটভাইকে নিয়ে দৈনিক বাংলায়, তখন শামসুর রাহমান, আহসান হাবীব, হাসান হাফিজুর রহমান—তখন দৈনিক বাংলার সাথে যারা যুক্ত, তারা মহাদেবকে ডিসকারেজ করলো যে নির্মলকে নিয়ে তুমিও প্রবলেমে পড়বা। বিবৃতি দেয়াতো দূরের কথা, তারা মহাদেবকে নিবৃত করেছিল আমার ইস্যুটা নিয়ে মুভ না করার জন্য। আমার মুক্তির জন্য কেউ দাবী জানায় নাই।’ [রাজু আলাউদ্দিন গৃহীত নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার, বিডিআর্টস, ১৫ আগস্ট ২০১৫] কিন্তু আমরা জানি, তাঁদের অনেকে পরে রাজনৈতিক অবস্থা অনুকূলে এলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কালোত্তীর্ণ কবিতার জন্ম হয়েছে তাঁদের কলম থেকে। পাঠকনন্দিতও হয়েছে সেসব কবিতা। কিন্তু কবিতার মান বিবেচনায় নয়, রচনার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সংকলন এবং এর লেখকেরা আলোচ্য ইতিহাসে আলাদা মর্যাদা পাবেন।
‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সংকলনটি যখন প্রকাশিত হয় তখন কোনোভাবে ঢাকাসহ গোটা বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার মতো মানুষ ছিল হাতে গোনা। পাকিস্তান শাসনামলেও এমনটি ঘটেনি। তখনকার তরুণ লেখক ও সাংস্কৃতিককর্মী এবং আজকের প্রখ্যাত সাংবাদিক জাফর ওয়াজেদ লিখেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি হওয়ার পর আমরা দেখলাম, ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানাও নেই। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দেখাও মেলে না। এরই মাঝে ছড়াকার আলতাফ আলী হাসুর উদ্যোগে বের হলো ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?’ নামে কবিতা সংকলন। তাতে আমরাও লিখেছিলাম। ক্যাম্পাসে সাতাত্তর সালেই কবিতা পাঠের আসর বসালাম মধুর ক্যান্টিনের সামনে। আমরা ক’জন কবিতা পাঠের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার প্রতি মাগফেরাত কামনা করলাম। এভাবে ক্যাম্পাসে-ক্লাসে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হতে থাকে। কবি কামাল চৌধুরী লিখলেন ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম’। ক্রমশ আরও অনেক কবি বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে কবিতা লিখেছেন। সেসব পাঠের জন্য ক্যাম্পাসে কবিতা পাঠের আসর বসত প্রায় প্রতি মাসেই। আমরা বঙ্গবন্ধু অনুসারীরা ক্যাম্পাসে দেয়াল লিখনের জন্য উদ্যোগী হলাম। ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীর সহযোগিতা পেয়ে গেলাম। দেয়াল লিখনের ভাষ্য নির্ধারণের দায়িত্ব পড়ল আমাদের ওপর। কবি কামাল চৌধুরী লিখলেন— ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’— কলাভবন, কার্জন হল, মহসীন হল, জহুরুল হক হল, শহীদুল্লাহ হলের দেয়ালে ভেসে উঠল এই বাক্য। আরও একটি লাইন পেলাম এই কবির কাছ থেকে— ‘মুজিবর আছে বাংলার ঘরে ঘরে, বাঙালীর অন্তরে।’ এই দুটি স্লোগানই সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ততদিনে পেয়ে গেলাম গায়ক, সুরকার লিয়াকত আলী লাকীকে। কামাল, আমি, আলতাফ আলী হাসুর লেখা গান সুর দিয়ে গাইতে শুরু করে লাকী। আমরা গড়ে তুললাম বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংস্কৃতি সভা।’ ১৯৭৯ সালের পনেরোই আগস্ট উপলক্ষে ছাত্রলীগের সংগঠনের নামকরণ করা হলো কবি কামালের বিখ্যাত লাইন— ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে।’ ক্যাম্পাসের দেয়ালজুড়ে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বাণী উদ্ধৃত করে দেয়াল লিখনের কাজও শুরু হলো। মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্রলীগকর্মী হায়দার আলীর সঙ্গে মিলে আমরা ক’জন রাত দশটার পর কলাভবনের দেয়ালজুড়ে উৎকীর্ণ করতাম বঙ্গবন্ধুর বাণী। ‘নক্ষত্রবীথি’ নামে চার পাতার একটি কবিতা পত্রিকা আমি এবং খায়রুল আনোয়ার মুকুল ও বদরুল হুদা চৌধুরী মিলে প্রতিমাসে বের করি। তাতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা ছাপা হতো। মাঝে মধ্যে দু’একজন হুমকি দিতো— এসব বন্ধ করার জন্য। এরা ছিল চৈনিকপন্থী, গলাকাটা রাজনীতির ধারক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। [যে রাতে দুয়ার ভেঙেছিল ঝড়ে, জাফর ওয়াজেদ, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা]
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা কবি কবিতা লেখেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিত্তোরে সম্ভবত সত্তর দশকের শেষদিকে মনিপুরের অন্যতম শীর্ষ কবি এলাংবম নীলকান্ত ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন যা তাঁর ‘তীর্থযাত্রা’ (১৯৮৫) গ্রন্থে স্থান পায়। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে ভারতের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ কবিতায় লিখেছেন: হে বঙ্গবন্ধু/ নিষ্ঠুর বুলেটের আঘাতে নিহত হয়েছো শুনে/ পেরিয়েছি আমি এক অস্থির সময়/ খোলা জানালা দিয়ে সুদূর আকাশের দিকে/ পলকহীন তাকিয়ে থেকেছি/ উত্তরহীন এক প্রশ্ন নিয়ে/ বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়ে তুলেছিলে স্বদেশ তোমার/ কিন্তু এ কোন প্রতিদান পেলে তুমি? (অনুবাদ : এ. কে. শেরাম) গান্ধীকে নিয়ে কবি অরুণ মিত্র একটি কবিতা লেখেন— ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশো গান্ধী যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য’— বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এই পঙক্তিতে গান্ধীর স্থানে মুজিব বসিয়ে শঙ্খ ঘোষ বলেন— ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশো মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’

৩.
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত প্রথম পর্বের কবিতার মধ্যে অন্নদাশংকর রায়ের কবিতাটি বহুল উচ্চারিত। ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী মেঘনা বহমান,/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান…।’ অন্নদাশঙ্কর রায় কবিতাটি লিখেছিলেন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরের আগে পরে। তিনি নিজে জানিয়েছেন, ‘তারিখটা ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ভারত দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি। আমরা কজন সাহিত্যিক যাচ্ছি সব স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান পুরুষদের অভিনন্দন জানাতে মুজিবনগরে।’ তিনি আরও জানান, ‘শেখ মুজিবুর রহমান যদিও মুজিবনগর সরকারের শীর্ষে তবু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার মুজিবনগরে গিয়ে সম্ভব হতো না। সেদিন মুজিবনগর থেকে ফিরে আসি তাঁর জন্যে ভয় ভাবনা ও প্রার্থনা নিয়ে। যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি, তার সবে আরম্ভ। যুদ্ধে হেরে গেলে পাকিস্তানিরা কি শেখ সাহেবকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে দেবে? প্রতিশোধ নেবে না? এর মাস চার-পাঁচ আগে থেকেই তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্যে আবেদন বিশ্বময় ধ্বনিত হয়েছিল। তার জন্যে কলকাতার ময়দানে আমরা সাহিত্যিকরাও জমা হয়েছিলুম। তার কিছুদিন আগে কি পরে আমি রচনা করি যতকাল রবে… ।’ [অন্নদাশঙ্কর রায়: কাঁদো প্রিয় দেশ, প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ, অন্বেষা, ঢাকা ২০১০]।
এ কবিতা নিয়ে সাধারণত পত্রপত্রিকায় যে ভুলটি হয়ে থাকে— অনেকে ব্যবহার করেন ‘যতদিন’ এবং ‘ততোদিন’ শব্দদুটো। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে কলকাতার প্রকাশনা সংস্থা অন্যদিন থেকে প্রকাশিত ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’ কাব্যগ্রন্থে ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে এ কবিতাটি প্রথম মুদ্রিত হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী মেঘনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান।/ দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/ রক্ত গঙ্গা বহমান/ তবু নাই ভয়, হবে হবে জয়/ জয় মুজিবুর রহমান’।’ কিন্তু আমরা দেখি প্রায় সবসময় ‘কাল’র পরিবর্তে ‘দিন’ করা হয়, যা বড় রকমের ভুল। ‘কাল’ আর ‘দিন’ দুটো শব্দ সময়ের ব্যাপ্তি ও ব্যঞ্জনার দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার কোথাও কোথাও ‘যমুনা’র স্থানে ‘মেঘনা’ ও ‘মেঘনা’র স্থানে ‘যমুনা’ করে দেন। ভুলটা প্রথম হয় পূর্বোক্ত ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ সংকলনে। ‘কাল’কে ‘দিন’ করা হয় এবং ‘যমুনা’র জায়গায় ‘মেঘনা’ চলে যায়। সেখানে পাশাপাশি মূল কবিতার ‘তবু নাই ভয় হবে হবে জয়’ লাইনটা পরিণত হয়েছে ‘নাই নাই ভয় হবে হবে জয়’। এভাবেই লিয়াকত আলী লাকী গানে রূপদান করার পর এটিই শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয় ওঠে। অনেকগুলো কবিতা সংকলনে এভাবেই মুদ্রিত হয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি কবিতার শুদ্ধপাঠ হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
উল্লিখিত কবিরা ছাড়াও বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে-পরে অগ্রজ কবি-লেখকদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সিকানদার আবু জাফর, বেবী মওদুদ, বেলাল চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, কায়সুল হক, শহীদ কাদরী, হুমায়ূন আজাদ, অজয় দাশ, অসীম সাহা, আবিদ আজাদ, মহাদেব সাহা, রবিউল হুসাইন, হেলাল হাফিজ, আবু বকর সিদ্দিক, আসাদ চৌধুরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, দাউদ হায়দার, নূহ-উল-আলম লেলিন, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, আবুল হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান, মনজুরে মওলা, কাজী রোজী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, আসাদ মান্নান, মুহাম্মদ সামাদ, রুবী রহমান, সিকদার আমিনুল হক, শিহাব সরকার, আখতার হুসেন, রবীন্দ্র গোপ, আবিদ আনোয়ার, নাসির আহমেদ, আসলাম সানী প্রমুখ কবি। পাশাপাশি সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবিরাসহ সমকালীন ও তরুণ প্রজন্মের কবিদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন।
তবে অনেকে আবার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা নয়, এমন কবিতাও বন্ধুর নামে প্রকাশ করেছেন কোনো কোনো সংকলনে। কেউ কেউ সাধারণ কবিতা বঙ্গবন্ধুর নামে উৎসর্গ করেছেন বা নিবেদন করেছেন। কোনো কোনো সম্পাদক সে সব কবিতাও সংকলনে স্থান দিয়েছেন। এভাবে কিছু বিভ্রান্তির তৈরি হয়েছে। ‘দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু’ কবিতা সংকলনে আমরা দেখি আবিদ আজাদের ‘নির্মিত ক্লাহারে যেন পাই আবক্ষ বাংলাদেশ’, আবু বকর সিদ্দিকের ‘রক্ষের পতাকা’সহ কয়েকটি কবিতার বিষয় বঙ্গবন্ধু নন; মুক্তিযুদ্ধ। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘মহামানব’ কবিতাটিও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বলে এই সংকলনে স্থান দেওয়া হয়েছে। সুকান্ত ১৯৪৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান তখন ছাত্রনেতা। তাঁকে নিয়ে এই কবিতা রচিত কিনা আমি নিশ্চিত নই। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির চিন্তাচেতনাপ্রসূত হয়ে তিনি এই কবিতা লিখে থাকতে পারেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগে-পরে লিখিত কয়েকটি কবিতার কিছু পংক্তি নিচে উপস্থাপন করলাম পাঠকদের জন্য। আশির দশকের পরে অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কিন্তু পরাধীন বাংলাদেশে ও মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং ৭৫-এর পর যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, তাঁদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। আজ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখার জন্য যেখানে পুরস্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে সব সময় উল্টো তিরস্কার তো বটেই, প্রাণনাশের আশঙ্কাও কম ছিল না।

কয়েকটি কবিতা থেকে:

মুজিবুর রহমান!
ওই নামে যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি উগারী বান।
[বঙ্গবন্ধু, জসীমউদ্দীন, ১৯৭১]

এই বাংলার আকাশ- বাতাস, সাগর- গিরি ও নদী
ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি
হেরিতে এখনও মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা
এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।
[ডাকিছে তোমারে, সুফিয়া কামাল, ১৯৭১]

বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান—
কী যে এক নাম সারা বাঙলায় এনেছে প্রমত্ত বান!
[বঙ্গবন্ধু, দক্ষিণারঞ্জন বসু, ১৯৭১]

আমার তোমার নয়, চাও তুমি বাংলার জয়
তারই লাগি মৃত্যুমুখে আগাইয়া গিয়াছ নির্ভয়
তোমার বিরাট সত্তা আজি তাই হিমাদ্রি-সমান
বাঙালির সর্ব গর্ব তোমাতেই আজি দ্যুতিমান।
আমি বাংলার কবি তাই বন্ধু ছুটিয়া এলাম
মুজিবর রহমান লহ মোর সহস্র সেলাম।
[সহস্র সেলাম, বনফুল]

মুজিব, এই লুপ্ত মহাদেশকে
নতুন করে আবিষ্কার করে
আমাদেরও বুকের মধ্যে ধ্বনিত করেছো তুমি
এক উজ্জ্বল নাম—
মানুষ।
[মানুষ, মনীন্দ্র রায়, ১৯৭১]

বাংলাদেশ:
তুমি ধন্য; তোমার স্বাধীন-পতাকাতলে,
সাত কোটি মানুষের নায়ক
মুজিবুর রহমান।
[বাংলাদেশ, শৈলেশচন্দ ভট্টচার্য, ১৯৭১]

আমরা দেবতা নই, তুমিও কি ছিলে?
ভুল— সে তো করে মানুষেই।
অপার ক্ষমার ভুলে যে-মাশুল দিলে
তার দায় আমাদের শুধতে হবেই।
[মুজিবের এপিটাফ্, হায়াৎ মামুদ, এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮]

সকালের সূর্য এসে ফিরে গেছে, আমি তাকে বসতে বলিনি।
কোথায় বসতে দেব তাকে?
রক্ত আর বারুদের ধূপগন্ধে সারা দিন আঙিনায় ঝরেছে গোলাপ।
[শোকগাথা: ১৬ আগস্ট ১৯৭৫, নির্মলেন্দু গুণ]

ঘুমিয়ে আছে—ঝিল্লিরবে
বকুল গন্ধে মাছের চোখে

জেগে থাকে বাঘের চোখে
লক্ষ মুজিব দামাল ছেলে
। [বকুল গন্ধ বাঘের চোখে, মাহমুদুল হক, এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮]

একটি নামের মধ্যে উঠে আসে বাংলাদেশ
স্বপ্নের পাখি সুর, নিসর্গের কোমলগান্ধার
মৃদুকণ্ঠ ভালোবাসা সাজানো বাগান

একরাতে সবই নিহত হলো সপরিবারে
নিসর্গ পাখি ফুল ভালোবাসা নদীর নারীর গান।
[রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনী, সন্তোষ গুপ্ত]

একটি মুজিব ছিল বাঙালির প্রথম প্রেমিক
একটি মুজিব আছে এই দেশে গ্রাম জনপদে
এশিয়ার মাঠে ঘাটে শ্রমিকের পেশল শরীরে
পুরুষের শোণিত্ বাহুতে রমণীর প্রখর হৃদয়ে
প্রগতির মিছিলে মিছিলে
আছে তাঁর অমর ভাষণ

পৃথিবীর ঘাসজুড়ে তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠ জেগে থাকে। [একজন প্রেমিকের কথা, কামাল চৌধুরী, এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮]

যেই ছেলেটা আলোর শিখা
দেখিয়ে ছিলো অন্ধকারে
সেই ছেলেকেই করলো কে খুন
কোন সে ঘাতক, খন্দকারে?
[একটি ছেলের কথা, লুৎফর রহমান রিটন, এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮]

তোমার মহত্ব ছিল উদার
ঘাতকেরা অনায়াসে ঢুকে গেছে সেই পথ দিয়ে
[বঙ্গবন্ধু, জাহিদুল হক, এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮]

আমার পিতার হত্যাকারীর হাতে
তুমি গোলাপ দিয়েছো
তোমারও বিনাশ হবে
এই গোলাপের রঙে।
[অভিশাপ, ত্রিদিব দস্তিদার]

তুমিও ফিরে আসবে বৈকি
যথামর্যাদায় সার্থকনামা, বঙ্গবন্ধু।
তাই তো আজও দৈনন্দিন প্রাণ ধারণ করি।
তাই তো আজ
তুলে নিয়েছি কণ্ঠে তোমার শ্লোগান:
জয় বাংলা!
জয় বাংলা!
[১৫ আগস্টের এলিজি, শওকত ওসমান]

রাসেল, অবোধ শিশু, তোর জন্য
আমিও কেঁদেছি
খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে যারা
একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি
তারাই দুদিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায়—
বয়স্করা এমনই উন্মাদ!
তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে
সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়েসে ছিলি!
তবুও পৃথিবী আজ এমন পিশাচী হলো
শিশুরক্তপানে গ্লানি নেই?
সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!
যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায়
আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।
[শিশুরক্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়]

৪.
আলোচনার শেষাংশে আরো কয়েকটি কবিতা তুলে ধরছি যেগুলোর রচনাকাল সম্পর্কে আমি নিশ্চিত হয়ে কিছু জানতে পারিনি। এর ভেতর কোনোটি হয়ত আশির শেষ দিকে কিংবা নব্বই দশকে লিখিত। এর আগেও কোনটা লিখিত হতে পারে। সত্তর দশকের পরে লিখিত কবিতা আমার বর্তমান গদ্যের আলোচ্য বিষয় নয়; তবু বঙ্গবন্ধুর উপর লিখিত খ্যাতিমান কবিদের কালজয়ী কবিতা হিসেবে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি।

আজ বাংলার ভাগ্যবিধাতা মাটির কবরে শায়িত
দশকোটি বাঙালি আজ রাজাকার দ্বারা শাসিত
কুকুর এখন মসনদে বসে
সিংহচর্ম গায়ে দেয় কষে
বিদেশি প্রভুর সেবায় এখন পদানত দাস নিহত
তুমি তো হয়েছ শহীদ বন্ধু বাঙালি হয়েছে নিহত।
[বঙ্গবন্ধুকে, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী]

নিহত জনক, এ্যাগামেমনন্, কবরে শায়িত আজ
আড়ালে বিলাপ করি একা একা, ক্ষুধার্ত পিতা
তোমার জন্যে প্রকাশ্যে শোক কারাটাও অপরাধ।
এমন কি হায়, আমার সকল স্বপ্নেও তুমি
নিষিদ্ধ আজ; তোমার দুহিতা একি গুরুভার বয়!
[ইলেক্ট্রার গান, শামসুর রাহমান, ইকারুসের আকাশ (১৯৮২)]

তোমাকে হারিয়ে
আমরা সন্ধ্যায়, হারিয়ে যাওয়া ছায়ারই মতো
হয়ে যাচ্ছিলাম,
আমাদের দিনগুলি ঢেকে যাচ্ছিল শোকের পোশাকে,
তোমার বিচ্ছেদের সংকটের দিনে
আমরা নিজেদের ধ্বংসস্তূপে বসে বিলাপে ক্রন্দনে
আকাশকে ব্যথিত করে তুললাম ক্রমাগত, তুমি সেই বিলাপকে
রূপান্তরিত করেছ জীবনের স্তুতিগানে, কেননা জেনেছি—
জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।
[ধন্য সেই পুরুষ, শামসুর রাহমান, অবিরাম জলভ্রমি ১৯৮৬]

এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,
সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে—
বত্রিশ নম্বর থেকে
সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে
অমল রক্তের ধারা বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।
[এই সিঁড়ি, রফিক আজাদ]

বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজতে গেলে
যেতে হবে বত্রিশ নম্বর
বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরবগাঁথা দেখতে হলে
যেতে হবে বত্রিশ নম্বর
[বত্রিশ নম্বর, বেলাল চৌধুরী]

এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;
তাঁরই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলার পথ চলি—
চোখে নিলাকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।
[আমার পরিচয়, সৈয়দ শামসুল হক, ১৯৯৩]

আমার হাঁটু ভেঙে আসছে, আমি কি পরাভবের মধ্যে
পিতৃপুরুষের স্রোতে রুদ্ধ হতে দেখে যাব অবশেষে?
কিছুই আমার সপক্ষে বলে না, কেবল প্রতিটি
শোণিত কণার সমস্বরে ভেতরে ঝাঁঝা করে বেজে উঠছে:
না না তুমি অবিনাশ, তুমি অবিনাশ।
[তুমি অবিনাশ, হাসান হাফিজুর রহমান]

তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম
বুট, সৈনিকের টুপি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিল
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের
মতো দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলার মানুষ

এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনব না কোনোদিন। [হন্তারকদের প্রতি, শহীদ কাদরী, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও, ২০০৯]

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে কবিতাগুলো লেখা হয়েছে তার অধিকাংশ কবিতায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নানা সংগ্রামী দিক ও তাঁর দৃঢ়চেতা চরিত্রের গুণকীর্তন উপমা উৎপ্রেক্ষার মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশ্বের খুব কম রাষ্ট্রনায়ক ও রূপকারকে নিয়ে এত অধিক সংখ্যক কবিতা লেখা হয়েছে। অগ্রজ কবিদের লেখনী থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমকালীন কবিরা যেমন লিখছেন, আগামী দিনের কবিরাও তেমন বঙ্গবন্ধুকে তাদের কবিতায় চিত্রিত করবেন নানাভাবে নানারঙে। এভাবে শিল্পসাহিত্যে অমর হয়ে রইবেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। যতকাল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থাকবে, ততকাল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত হবে কোনো না কোনো কবিতা, কোনো না কোনো গল্প, কোনো না কোনো উপন্যাস, কোনো না কোনো নাটক।

ঋণস্বীকার
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, ১৯৭৮
নওশাদ নূরী ও তার একটি কবিতা, মফিদুল হক, দৈনিক যুগান্তর, ২৬ জুলাই ২০১৯
কাঁদো প্রিয় দেশ, অন্নদাশঙ্কর রায়, প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ, অন্বেষা, ঢাকা ২০১০
যে রাতে দুয়ার ভেঙেছিল ঝড়ে, জাফর ওয়াজেদ, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা, ১৪ই আগস্ট ২০১৮
শহীদ বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত প্রথম আরবি কবিতা, মাওলানা এম এ রহমান, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৭জুন ২০১১
চায়ের আড্ডায় সিগারেটের কাগজে যেভাবে জন্ম হয় ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’ গানটির, অমিতাভ ভট্টশালী, বিবিসি বাংলা, ১৭ মার্চ ২০১৯
আড্ডায় জন্ম কালজয়ী গান, প্রণব ভৌমিক, প্রথম আলো, ৪ ডিসেম্বর ২০১৬
একটি কবিতার শুদ্ধ পাঠ, মোহাম্মদ হাননান, প্রথম আলো, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১
রাজু আলাউদ্দিন গৃহীত নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার, বিডিআর্টস, ১৫ আগস্ট ২০১৫
দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, আহমেদ সুবীর সম্পাদিত, শিশুসাহিত্য কেন্দ্র ২০১৬
দুই বাংলার কবিতায় বঙ্গবন্ধু, আখতার হোসেন সম্পাদিত, আগামী প্রকাশনী ২০০৫
কবিতায় বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুর কবিতা, শেখ নজরুল সম্পাদিত, পারিজাত প্রকাশনী ২০১৫
বাড়ির কাছে আরশীনগর, আসাদ চৌধুরীর সম্পাদিত, বাংলা-উর্দু সাহিত্য ফাউন্ডেশন
বিদেশি লেখকদের মূল্যায়নে শেখ মুজিব, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৭ মার্চ ২০১৭


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.