
চীনের লোকজ সংস্কৃতি অতি সমৃদ্ধ। বিশাল দেশটিতে উত্সবের শেষ নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জাতির সংস্কৃতির পাশাপাশি রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠিগুলোর বিশেষ সংস্কৃতি। প্রতিটি জাতির রয়েছে বিশেষ উত্সব, বিশেষ পুরাণ কাহিনী, কিংবদন্তি।
ড্রাগন বোট উত্সব চীনের বিখ্যাত উত্সব। বিশেষ করে মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ চীনে জাঁকজমকের সঙ্গে ড্রাগন বোট উত্সব উদযাপন করা হয়ে থাকে। বেইজিংয়েও ড্রাগন বোট উত্সব হয় বেশ জাঁকালোভাবে। এই উত্সব চীনের অন্যতম প্রধান উত্সব। এই উত্সবে প্রধানত দেখা যায় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ ধরনের ডাম্পলিং খাওয়া। এই উত্সবের পিছনে রয়েছে ভালোবাসার মহান গল্প। এর কতটা ইতিহাস আর কতটা কিংবদন্তি তা এখন আর নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এই উত্সব যে দুই হাজার বছরের বেশি পুরনো তাতে সন্দেহ নেই।
ড্রাগন বোট উত্সবের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত গল্পটি একজন কবির প্রতি জনগণের ভালোবাসার কথা বলে। এই কবির নাম ছু ইউয়ান। ছু ইউয়ান(খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০-খ্রিস্টপূর্ব ২৭৮) ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। তিনি ছিলেন বিখ্যাত কবি। সেসময় চীন দেশ বেশ কয়েকটি সামন্তরাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ্যগুলোর পরষ্পরের মধ্যে যুদ্ধ ও ঝগড়াবিবাদ লেগেই থাকতো। ছু ইউয়ান চু রাজ্যের রাজকর্মচারী ছিলেন। রাজা ও জন্মভূমির প্রতি তার বিশ্বস্ততা ছিল অবিসংবাদিত। অভিজাত রাজপরিবারের সন্তান ছু ইউয়ান ছিলেন রাজার প্রধান পরামর্শদাতা। তিনি চু রাজ্যকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য রাজাকে বিভিন্ন সুপরামর্শ দিতেন। সেসময় চীনের সাতটি রাজ্য ছিল ছি, চু, ইয়ান, হান, চাও, ওয়েই এবং ছিন। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল ছিন রাজ্য। ছু ইউয়ান রাজাকে পরামর্শ দেন ছি রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে জোটবদ্ধ হয়ে ছিন রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার। কিন্তু ছু ইউয়ানের এই পরামর্শ রাজা অগ্রাহ্য করেন। এর পিছনে রয়েছে চিরকালের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। রাজ দরবারে ছু ইউয়ানের প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত অন্য মন্ত্রী ও পারিষদরা তার বিরুদ্ধে রাজার কান ভারি করে। রাজা ছু ইউয়ানের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং তাকে নির্বাসনে পাঠান। নির্বাসনে থাকার সময় ছু দেশপ্রেমমূলক অনেক কবিতা লেখেন যার অনেকগুলো এখনও চীনে বেশ জনপ্রিয়। গ্রামবাসী এই কবিকে ভালোবাসতো। তারা তার কবিতা শুনতো এবং তাকে সমাদর করতো। এদিকে ২৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ছিন রাজ্য চু রাজ্যের উপর হামলা চালিয়ে রাজধানী দখল করে নেয়। নিজের প্রিয় মাতৃভূমির পরাজয়ের সংবাদ যখন কবির কানে পৌঁছালো তিনি সে দুঃখ সইতে পারলেন না। তিনি মিলোও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করলেন। পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে এই বিয়োগান্তক ঘটনাটি ঘটে। স্হানীয় লোকেরা যখন তাদের প্রিয় কবির আত্মবিসর্জনের কথা জানতে পারে তখন তারা নদীতে নৌকা নিয়ে তার মৃতদেহের সন্ধান করতে থাকে। অশুভ আত্মাদের তাড়াতে তারা নৌকার বৈঠা দিয়ে নদীর পানিতে বাড়ি মারে এবং ঢাক পিটিয়ে জোরে জোরে শব্দ করতে থাকে। মাছ যেন কবির মৃতদেহ না খায় এজন্য তারা ভাতের ছোট ছোট পুঁটুলি নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। একজন বৃদ্ধ চিকিত্সক নদীতে কিছুটা মদিরা ঢালেন যেন অশুভ দানবরা তা পান করে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ছু ইউয়ান দানবদের গ্রাস থেকে রক্ষা পান। এই ঘটনার স্মরণে এখনও ড্রাগন বোট উত্সব পালন করা হয়। মধ্য চীনের হুনান প্রদেশে ছাংশা শহরের ৫০ কিলোমিটার উত্তরে মিলোও নদীতে এখনও নৌকা ভাসানো হয়। কালক্রমে এটি নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। ভাতের পুঁটুলি নদীতে ছুঁড়ে ফেলার ঘটনা স্মরণ করে ভাতের ডাম্পলিং বা চোংজি খাওয়া আর মদ পান করা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এসব রীতি রেওয়াজের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় দেশপ্রেমিক কবি ছু ইউয়ানকে।

ড্রাগন বোট উত্সবের পিছনে আরও একটি কিংবদন্তি রয়েছে। সেটি আরও প্রাচীন। চীনের চিয়াংসু এবং চেচিয়াং প্রদেশে এই কিংবদন্তি খুব জনপ্রিয়। এটিও চু রাজ্যের। তবে এটি কবি ছু ইউয়ানের আগের ঘটনা। উ চিশু(৭২২-৪৮১ খ্রিস্টপূর্ব)ছিলেন চু রাজ্যের অভিজাত এক তরুণ। তার বাবা ছিলেন রাজ পরিবারের বিশ্বস্ত শিক্ষক। কিন্তু রাজা ষড়যন্ত্রীদের কথায় এই প্রবীণ শিক্ষককে বন্দী করেন। শুধু তাই নয়, রাজা উ চিশু এবং তার বড় ভাই উ শাংয়ের মৃতুদণ্ডের আদেশ দেন। বড়ভাই এবং বাবার মৃত্যুদণ্ডের পর প্রাণভয়ে উ চিশু উ রাজ্যে পালিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি উ রাজ্যের রাজার প্রিয় পাত্রে পরিণত হন। উ দেশের রাজা যখন চু রাজ্য জয় করে নেন তখন তিনি রাজাকে সহায়তা করেন। এইভাবে তিনি বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেন। উ চিশু রাজ দরবারে বেশ প্রতিপত্তিও লাভ করেন। কিন্তু সুখ কখনও চিরদিন স্থায়ী হয় না। রাজার মৃত্যুর পর রাজকুমার ফুচাই নতুন রাজা হন। তিনি উ চিশুকে পছন্দ করতেন না। রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে উ চিশু নতুন রাজাকে পরামর্শ দেন ইউয়ে রাজ্য জয় করতে। কিন্তু রাজা এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি। এদিকে এক পারিষদ ইউয়ে রাজ্যের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে রাজাকে উ চিশুর বিরুদ্ধে উসকানি দিতে থাকেন। এই ঘুষখোর পারিষদের কথা শুনে রাজা তার প্রকৃত মিত্র উ চিশুর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। রাজা পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে উ চিশুকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেন। মৃত্যুর আগে উ চিশু রাজাকে বলেন যেন তার মৃতদেহ থেকে চোখ দুটি খুলে নিয়ে নগর ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে, ইউয়ে রাজ্যের সৈন্যদল কিভাবে উ রাজ্যকে দখল করছে। এর মাধ্যমে উ চিশু ভয়ানক পরিণাম সম্পর্কে রাজাকে সাবধান করে দিতে চান। কিন্তু রাজা একথায় আরও রেগে গিয়ে উ চিশুর মৃতদেহ সুচৌ নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিতে আদেশ দেন। উ চিশুর মৃতদেহ সুচৌ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় জনগণ উ চিশুকে ভালোবাসতো। তারা নৌকা নিয়ে তার দেহ খুঁজতে থাকে। এরপর থেকে প্রতিবছর পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে তারা উ চিশুর স্মরণে ড্রাগন বোট প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য রীতি পালন করে থাকে।

ড্রাগন বোট উত্সবের সূচনার পিছনে তৃতীয় যে কিংবদন্তিটি আছে সেটিও বেশ করুণ। প্রাচীনকালে সাও ই (১৩০-১৪৩ খ্রিস্টাব্দ)নামে এক তরুণী মধ্য পূর্ব চীনের চেচিয়াং প্রদেশে বাস করতেন। সাও ই তার বাবাকে খুব ভালোবাসতেন। একদিন তার বাবা একটি নদীতে ডুবে যান। বাবার মৃতদেহের সন্ধানে সাও ই আহার নিদ্রা ত্যাগ করে নদীর তীরে ঘুরতে থাকেন এবং মর্মস্পর্শী বিলাপ করতে থাকেন। পঞ্চম চান্দ্র মাসের পঞ্চম দিনে সাও ই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাঁচদিন পর পিতা ও কন্যার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। দেখা যায় সাও ই তার বাবার মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে আছেন। বাবার প্রতি কন্যার এই মহান ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ স্মরণে সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। নদীটির নামকরণও করা হয় সাও এর নামে। সাও নদীটি হলো হাংচৌ প্রদেশে প্রবাহিত ছিয়াংথাং নদীর একটি শাখা নদী। সাও ইর স্মরণে উত্তর চেচিয়াং-এ ড্রাগন বোট উত্সব পালন করা হয়।
ড্রাগন বোট উত্সবের তিনটি কিংবদন্তি মূলত দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, স্থানীয় জনগণের সহানুভূতি ও ভালোবাসার কথা বলে।
Comments RSS Feed