কবিতা

খালেদ হামিদীর দশটি কবিতা

খালেদ হামিদী | 16 Aug , 2019  


নারীই থাকে ভ্রূণ

অদেখা আগুনের চান্দ্র বিগলন
কিভাবে দুর্লভ হঠাৎ সম্প্রতি,
জানার আগেভাগে, পাঁজর গলে আজ
ফুটিছে নানা ফুল বিরল রঙে খুব।
অথচ এরই নিচে আমারই রক্তের
প্রবাহে ভেসে আসে নিথর কন্যার
অনন্তর দেহ, বলাৎকার কিবা
অগ্নিসংযোগে অকালহৃতপ্রাণ।
এমন ঘটনায় পুষ্প অবনত,
শোণিত ও ফুলের মধ্যে জিজ্ঞাসা:
নারীই থাকে ভ্রূণ আদিতে মানুষের।
পুরুষ তোরা এতো এলি বা কোত্থেকে!


রাখেনি নিয়ানডার্থাল কারা

‘মেয়েলি’ বলায় উঠানে লুকায় নাকি সে দাঁড়িয়ে থাকে?
হাডুডু, কাবাডি, ওপেন্টি ছাড়া না জেনে অন্য কিছু
সুবোধ ছাত্র, নিরীহ বালক বাতাসে স্বপ্ন এঁকে
কিঞ্চিৎ সরে, অ্যাডাম টিজিং যদি নেয় তার পিছু!

পেছনধাবক কেউ কেউ সোজা সমুখভেদীও যদি
কিশোর তরুণরূপে চিৎকৃত: ‘মনুষ্য কাকে বলে!’
ছোটে বড় শিশু চোখে পড়তেই কারুর রক্তনদী;
গাছআশ্রিত দেহতল দেখে শিকারি, উঁকির ছলে।

রাখেনি নিয়ানডার্থাল কারা, পুরুষ বেঁধাও ব্রত!
এদিকে পুষ্পপ্রেম শুধু স্মৃতি, উদ্ভিদ আশ্রয়।
নীপ, শিরীষের সাথে নির্ভরযোগ্য মিলছে কত?
ফিরে এলে হোমো লুজোনেন্সিস, ছেলে পায় বরাভয়!

ভাগ্যের রহস্যগল্প

ক্রেতা: ‘কিভাবে বসেন এ গরমে?’ ঊর্ধ্বে ভাঙা ছাতা।
‘কি করি! কপালে ছিলো লেখা!’ কহে আনাজ বিক্রেতা।

ললাটের স্থানে তার বুকের উপরিভাগ, চোখে
স্থাপিত যুগল স্তন; জন্মদ্বার, নাক ঠোঁট ঢেকে!
ধর্ষকের দৃষ্টি যদি এভাবে আঁকেন চিত্রী রেনে
ম্যাগ্রিৎ, নিয়তি ব’লে কিভাবে ছারখার নেয় মেনে
কন্যাদের অনেকেই? অভিন্ন শরীর বিঁধে কেউ
পুত্রশিশুর মুখেও দেখে তবে নিতম্বের ঢেউ!

ভাগ্যের রহস্যগল্প কেউ কি শোনাতে তবু চায়?
ধনেপাতা, রক্ত, চুল লোটে ভোক্তা, দর্শকের পায়।

না-মানুষ ব’লে

কোন্ ট্রাক্টরে হৃতসম্ভ্রম, অতঃপর মৃত কেউ?
ভাগ্যিস, সাল অধুনা একাত্তর নয়, তবে ঘেউ
শকুনবিহীনতার পাশ ঘেঁষে কেন আজও শোনা যায়?
না-মানুষ ব’লে বিয়োগের পরে পচন ধরে না গায়!

সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে ভেদ মা-বাবার কাছে নেই।
ওমের ডিম্ব না হলেও তবু উভয়কে বাঁচাতেই
পঙ্ক্ষী রাজের ভুল কল্পনা ভেঙেই আমাকে ডানা,
নিছক পাখির, দাও, দিক চিল অথবা ঈগল হানা।

একদিকে, আর পাশে

একদিকে যদি মেয়ের সর্বনাশ
আর পাশে কেন ছেলেও অনিরাপদ
ভাবতে না পেরে কোথায় এমন বাস
বলাৎকারক কাদের বশংবদ
ভাড়াটে দাঁড়াই পরের বারান্দায়,
কোত্থেকে সেথা পানির প্রবাহ ছোটে!
রেলিঙে পক্ষী প্রখর কণ্ঠে গায়;
অবোধ্য গানে না জানি কি ফুল ফোটে!

তথাপি রক্ত, শেষ নিঃশ্বাস ভেঙে
হাতের বৈঠা চিনলে বাজার, কাজ
কাক ও কোকিল ডিম-বিবাদের ঢঙে
আমার মুখেই ঝাপটা দেয় রে আজ!

বক্ষ

দরোজা অর্ধেক খুলে কে দেখায় একটি স্তন শুধু
তা নিয়ে জল্পনা শেষ না হলেও কহি: ‘পুরুষেরও
কারো সাথে হতে পারে অপূর্ণ বুকের লুকোচুরি।’
কেবল তরুণীকেই দুর্মুখেরা কেন শব্দ হানে?

যে গৌর যুবার বক্ষ দেখে আধেক রমণী জ্ঞানে
মুচকি হাসে সে-ই নিজ সদাগর বেঢপ কাকার
সিনার ঝুলনকে ধরে নেয় টাকার যুগল থলে।
এদিকে পকেট থেকে ক্যাঙ্গারুশিশুর উঁকি কার?

মীনাক্ষীর পরে কোনো তরুণেরও তিন বুক হলে
পরাবে তাকে কি শাড়ি? নর বেশে সাম্রাজ্যবিজয়ী
মেয়ে যদি শিবপত্নী হতেই হারায় থার্ড ব্রেস্ট
ত্রিবক্ষের ছেলে কেন কৌমার্যেও লুকায় নিজেকে?

দরজার কপাট তবু অবিরল বাড়ে, বোজে, খোলে।
মস্তিষ্ক পায় না ফিরে কারো চোখ নানা স্তনে গেলে!

ভয় নেই

সসন্তান আমরা, তবু, চলো আজ অগ্নিউপাসক
হই যজ্ঞ থেকে যাতে উঠে আসে আরেক মীনাক্ষী।
ত্রিস্তনী কন্যার দিকে হামলা তবে চিলের ধরনে?
নাকি বাজের চেয়েও হিংস্র আসে মনুষ্যহায়েনা?
বিপরীত বেশে কভু না এগোয় যদি অগ্নিকন্যা
আত্মপরিচয় হতে কতো নিচে অবতীর্ণ ওরা?

শিকারি না হলেও এখন মা-বাবাই কালো ফিঙে।
ভয় নেই, বনের রাজাও তাকাবে না আর ভুলে।
ত্রিবক্ষোজ কন্যা দেখে নানা ঘুঘু কাছে, প্রথা ভেঙে;
নিঃসঙ্গ ডাহুক ঘেঁষে বুলবুলিরা নাচে লেজ তুলে।

আটাশে মে রজঃদিন

না, আটাশ নই আমি। দুই ক্ষরণের মধ্যে কাটে
দুই দশ আট দিন আর রক্তে ভাসি ন্যূন পাঁচ
দিবস বলেই তবে বছরের পঞ্চম মাসেই
আমার নীরব বয়ঃসন্ধিকাল উদযাপিত, দূরে?
নিকটেও কোনো গ্রামে কারুর এমন শুরু হলে
নানাবাড়ি যদি তাকে নানা বরণোৎসবেই মাতে
তাহলে বারণ কেন তার সঙ্গে আমারও গমন
ক্ষেতে, ঠাকুরঘরে কিংবা অন্য কোনো সুধীসমাবেশে?

কি চেয়ে বৈশাখী ঝড় ওঠে তীব্র একেক জঠরে,
অদ্ভুত অপ্রাপ্তি শেষে নামে ধস, ধীর রক্তরাগ
না জেনেই সরে যাও এখনো অশুচি জ্ঞানে যারা,
মানুষের লাল ত্যাগ, ছুঁয়ে দেখো, অস্পৃশ্য হয় না।

হাত রেখে যন্ত্রণায় উদরের নিচে কহি: এই
ছেলে, তুই আসার পরেও মা কিন্তু রক্তাক্ত ফের!

সরল বাচন

আমার বক্ষে গোয়ালিনি ব’লে পরিহাস ছুঁড়ে খুব
উল্লাসে মাতে না জেনে এস্ট্রোজেন বেড়ে গেলে নর
কখনো দুগ্ধবতী হতে পারে। শুনে বিক্ষোভে ডুব
দিলেই ওদেরই দরোজায় কারো তুলে হাস্যের ঝড়
হিজড়ারা কহে: ‘দুধসৃজা গ্রন্থির কারিশমা নাই!
খুন হতে দেখে হত্যাকারীকে ছুটে তবু পাকড়াই।’


অনিচ্ছায় পলকের জন্যে পরিধেয় খসে পড়া আর তারপর

যুগল বেণি দু’হাতে টেনে বলাৎকার, ভেবে,
খুশিতে কাঁপে আড়ালে কারা অচেনা নেই আর।
আগামী ক্ষণে অতীত এনে একক স্রোতে যদি
পৃষ্ঠ বেয়ে বিনুনি নামে পায়ের ফাঁকে খুব
কেবল শ্রোণি দেখতে তাও টাঙাবে কেটে তারে।
অথচ ছোটবেলায় কারো বস্ত্র খুলে গেলে
পলকে দেখা বিষয়ে বলি: ‘কাকার শুধু চুল,
নাইরে কিছু, আর কিছু না! কহিনি আমি ভুল!’


1 Response

  1. মানিক বৈরাগী says:

    সুপাঠ্য কবিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.