গল্প

মাজহারুল ইসলাম-এর মায়া

মাজহারুল ইসলাম | 9 Aug , 2019  


কেনিয়া পৌঁছেই যদি চট করে ফোন করার সুবিধা না পাই, সেটা মনে করে হোটেল থেকে বের হওয়ার আগে আম্মাকে আরেকবার ফোন করলাম। আম্মা প্রায় দশ বছর ধরে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। ফোন ধরলেন আব্বা। আম্মা ইদানীং ফোনে কথা বলতে চান না। একটা-দুইটা কথা বলে আব্বাকে ফোনটা দিয়ে দেন। আজও আম্মা ফোন ধরলেন না। তা ছাড়া আম্মার কথা জড়ানো হওয়ায় সব কথা বোঝাও যায় না।
আব্বা ফোন ধরেই বললেন, পুব দিকের বড় আমগাছটার প্রায় সব আম পেকে গেছে। আজই আম পাড়ার ব্যবস্থা করেছি। তুমি যেদিন ফিরবে সেদিন সকালে আম নিয়ে আমি ঢাকা আসব। আর শোনো, তোমার আম্মা বলেছে ওই গাছের আম তুমি যেহেতু খুব পছন্দ করো তাই তুমি না খাওয়া পর্যন্ত আমরা কেউ মুখে দেব না।
আমি বললাম, ফিরব পাঁচ দিন পর। আজই কেন আম পাড়বেন ?
আব্বা বললেন, আজ পেড়ে না রাখলে তুমি এসে পাকা আম খেতে পারবে না।
আমি বললাম, আব্বা, কিছুক্ষণ পরই আমাকে এয়ারপোর্টে যেতে হবে। আমি ফোন করেছি আম্মার খবর নিতে।
আব্বা হয়তো আম নিয়ে আরও কিছু বলতেন। আমার কথায় কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমার আম্মা আগের মতোই আছে। খারাপ কিছু হলে তো আমি শুরুতেই তোমাকে বলতাম।
আমার বাচ্চারা গাছ থেকে পাকা আম পেড়ে খেতে খুব পছন্দ করে। রুবিনা সারা বছর শ্বশুরবাড়ি যেতে না চাইলেও আমের মৌসুমে একবার সে যাবেই। আমি কেনিয়া থেকে ফিরে আসার এক সপ্তাহ পর সবাইকে নিয়ে পাবনা যাব—এটা আব্বা জানেন। তবু তিনি গাছের প্রথম পাকা আম নিয়ে ঢাকা আসবেন এবং নাতিদের নিজের হাতে আম ছিলে খাওয়াবেন। আব্বার ছেলেমানুষি এখনো গেল না!
আমি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বললাম না। আম্মার ও তাঁর নিজের শরীরের যতœ নিতে বলে ফোনটা কেটে দিয়ে ছোটভাই রাসেলকে ফোন করলাম। সে জানাল আম্মার ডায়াবেটিস কয়েকদিন ধরে বেশি। ব্লাডপ্রেসারও কিছুটা ওঠানামা করছে। আমি চিন্তা করব দেখে আব্বা আমাকে এগুলো বলেন নি।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। রাসেলকে আম্মার খোঁজখবর রাখতে বলে শাওয়ার নিতে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে হোটেল থেকে চেক আউট করে এয়ারপোর্ট যেতে হবে।
গতকাল রাতে দুবাই এসেছি। চোদ্দ ঘণ্টার ট্রানজিট। আজ দুপুর সাড়ে বারোটায় কেনিয়ার ফ্লাইট। চারজনের একটি দল আমরা, তিন দিনের সরকারি সফরে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে যাচ্ছি। দলনেতা হিসেবে আছি আমি।


দুপুরের খাওয়া শেষ করে আব্বা বিছানায় শুয়েছেন। ছুটির দিনে খাওয়ার পর বিছানায় একটু গড়াগড়ি করা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। আমি পূজার ছুটিতে বাড়ি এসেছি। বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির সামনে আমগাছের নিচে বসে গল্প করছি। এরমধ্যে আব্বার চিৎকারে দৌড়ে ঘরে গিয়ে দেখি, আম্মা বিছানার মধ্যে বমি করছেন। মুখে গোঙানির শব্দ। চোখের মণি দুটো ওপরে উঠে আছে। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে ? একটু আগেই তো একসঙ্গে খেয়ে উঠলাম।
আব্বা বললেন, তোমার আম্মা দুইটা পান বানিয়ে একটা আমার হাতে দিয়ে অন্যটা নিজের মুখে দিয়ে বিছানায় শুয়েছে দশ মিনিটের মতো হবে। আমার চোখ দুটো মাত্র লেগে এসেছে। এরমধ্যে বমির শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে তাকিয়ে দেখি তোমার আম্মা কেমন জানি করছে। আমি তো বাবা কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি আম্মাকে বিছানা থেকে তুলে আধশোয়া অবস্থায় জড়িয়ে ধরে বললাম, কী হয়েছে আম্মা ? কথা বলেন। এমন করছেন কেন ?
আম্মা কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। বমি বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নাক-মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। আব্বা দিশেহারা হয়ে আম্মাকে ডাকছেন। মরিয়ম, কী হয়েছে তোমার ? এমন করছ কেন ? কথা বলো। তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে ?
আম্মা কোনো কথা বলছেন না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। আব্বা অস্থির হয়ে পড়েছেন। কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
আম্মা বিড়বিড় করে কিছু একটা কথা বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু বুঝতে পারছি না।
আব্বা বললেন, বাবা, আমার ভালো লাগছে না। তুমি একটা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করো। এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
আমারও মনে হলো হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
পাবনা ছোট্ট একটা শহর। চাইলেই অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। সদর হাসপাতালে একটা অ্যাম্বুলেন্স আছে। হাসপাতালের ফোন নম্বর নাই। এক বন্ধু চলে গেল হাসপাতালে। এরমধ্যে আরেক বন্ধু দ্রুত কোথা থেকে একটা টেম্পো নিয়ে এল। সবাই মিলে ধরাধরি করে সেই টেম্পোতে উঠিয়ে আম্মাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ইমার্জেন্সিতে একজন জুনিয়র ডাক্তার বসা। তিনি প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মাথার এক্সরে করতে পাঠালেন। এরমধ্যে একজন সিনিয়র ডাক্তার এসে এক্সরে দেখে বললেন, সিভিয়ার ব্রেন স্ট্রোক। আপনারা দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যান। আমরা এখানে কিছু করতে পারব না।
রাত তিনটায় আম্মাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছালাম। ইমার্জেন্সি ডাক্তার এক্সরে ফিল্ম দেখে একই কথা বললেন। সকাল আটটায় নিউরোসার্জন দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। এখন ইমারজেন্সিতেই অবজারভেশনে থাকবে।
আমরা অসহায়ের মতো সারা রাত আম্মার বেডের পাশে বসে থাকলাম। সকাল যেন আর হতে চায় না। এরমধ্যে কতরকম সমস্যা নিয়ে যে মানুষ ইমারজেন্সিতে আসছে তার কোনো ঠিক নেই। স্বামীর ওপর রাগ করে বিশটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছে এক মহিলা। এলাকায় মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে নিয়ে একজন এসেছে রক্তাক্ত অবস্থায়। আরেকজন এসেছে বুকে ব্যথা নিয়ে। সাভারে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে জখম হওয়া দুজনকে আনা হয়েছে। এদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। একজনের স্ত্রী’র আহাজারিতে পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠেছে। অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া এক তরুণীকে স্বজনেরা নিয়ে এসেছে টাঙ্গাইল থেকে। ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়-এঁদের ব্যস্ততায় কে বলবে এখন গভীর রাত!
কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কেউ নীরবে সবকিছু সহ্য করছে। কেউ আবার ঘুমে মগ্ন। নানা ধরনের রোগী। নানা ধরনের সমস্যা। বেড না পেয়ে কেউ কেউ মেঝেতেই বিছানা পেতে ঠাঁই নিয়েছে। এমনকি কেউ কেউ ইমার্জেন্সির বাইরে ঘোরঘুরি করছে। অপেক্ষা করছে নতুন একটি দিনের। কেউ কেউ আবার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরেও যাচ্ছে।
সকাল আটটায় ডাক্তার এসে সিটি স্ক্যান করতে বললেন। এরপর রিপোর্ট দেখে জানালেন দ্রুত সার্জারি করতে হবে। সিভিয়ার স্ট্রোক। ব্রেনে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আব্বা বললেন, প্লিজ ডু ফর দ্য বেস্ট ডক্টর।
আম্মার সার্জারি হলো। এক মাস আট দিন হাসপাতালে থেকে ফিরে এলেন বাড়িতে। কিন্তু শরীরের একদিক প্যারালাইজড হয়ে গেল। বিছানা হলো তার নিত্যসঙ্গী। আব্বা শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেন। পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক তিনি। তিন মাস ছুটি কাটানোর পর চাকরিতে আর ফিরে গেলেন না। আম্মার অসুস্থতা আব্বা মেনে নিতে পারলেন না। তিনি স্বেচ্ছাঅবসরে চলে গেলেন। আমাদের বাড়িটা একটা শ্মশানে পরিণত হলো।
হোটেল থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে আম্মার কথা ভাবছিলাম। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছিল। চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম একটা মুহূর্ত আম্মা বসে থাকছেন না। নিজের হাতে রান্না করছেন, ঘর গোছাচ্ছেন, আব্বার দেখাশোনা করছেন। সমস্ত সংসারটা যেন তিনি একাই আগলে রাখছেন।
মনে পড়ছে, আব্বা শিক্ষক হওয়ার পরও আম্মাই আমাদের পড়ালেখার দেখভাল করতেন। অথচ আজ এত বছর ধরে তিনি বিছানায় পড়ে আছেন!


সকাল এগারোটায় এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। বাংলাদেশ কনসুলার অফিসের কনসাল জেনারেল আমাদের বিদায় জানাতে এসেছেন। চেকইন পর্ব শেষ করে ইমিগ্রেশনে যাওয়ার আগে মনে হলো আরেকবার আম্মার খবর নেই। নাইরোবি থেকে ফোন করার সুবিধা পাব কি না জানি না। গতকাল রাতে রাসেল বলছিল আম্মার ডায়াবেটিস কিছুটা বেড়েছে। ব্লাডপ্রেসার ওঠানামা করছে। কনসুলার সাহেবের ফোনটা নিয়ে আম্মাকে ফোন করলাম। ছোটভাই রাসেল ফোনটা ধরেই কান্নাকাটি শুরু করল। বারবার বলছি, কী হয়েছে বল আমাকে। রাসেল কথা বলতে পারছে না। আমার মনে হলো আম্মার কিছু-একটা হয়েছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই আম্মার কথা খুব বেশি মনে পড়ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বিছানা আর হুইলচেয়ার তাঁর ঠিকানা।
আমি এবার ধমক দিয়ে ফোনটা আব্বাকে দিতে বললাম। রাসেল কান্না থামিয়ে বলল, ভাইয়া, আব্বা ছাদ থেকে পড়ে গেছেন।
আমি বললাম, কী বলছিস এসব ? কীভাবে পড়ল ? এখন কেমন আছে ? কোথায় আছে ?
রাসেল বলল, পুব দিকের আমগাছ থেকে নুরুল হককে নিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে যে আমগুলো হাত দিয়ে পাড়া যায় সেগুলো নিজের হাতে পাড়ছিলেন। তুমি তো জানো ছাদের ওইদিকটায় রেলিং নাই। একপর্যায়ে….। সদর হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। ডাক্তাররা বলেছেন ঢাকায় নিয়ে যেতে। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পেয়েছে। অনেক জায়গা কেটে গেছে। সম্ভবত ডান পা ভেঙে গেছে।
রাসেল আবার কান্না শুরু করল। কথা বলতে পারছে না। আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে। মনে হলো চারদিকের সবকিছু ঘুরছে। আমি চোখে ঝাপসা দেখতে লাগলাম। আমি ফোনটা কানেই ধরে আছি।
রাসেল আবার কান্না থামিয়ে বলল, বড় মামা আছেন আমার সঙ্গে। তুমি মামার সঙ্গে কথা বলো।
মামাকে বললাম, দ্রুত ঢাকা রওনা হন। সঙ্গে একজন ডাক্তার নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
লাইনটা কেটে দিয়ে আমার মন্ত্রী মহোদয়কে ফোন করলাম। তিনি ফোন ধরে বললেন, আমি কেবিনেট মিটিংয়ে। পরে কথা বোলো।
আমি বললাম, স্যার খুব জরুরি।
তারপর দ্রুত আব্বার দুর্ঘটনার কথা জানালাম। জানতে চাইলাম, আমি এখন কী করব ? রাষ্ট্রীয় সফর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চিঠি আমার ব্যাগে যেটা কেনিয়ার রাষ্ট্রপতিকে লেখা। এই চিঠি আমার হস্তান্তর করার কথা। মন্ত্রীমহোদয় এগুলো সব জানেন। প্রায় চার বছর ধরে আমি তার পিএস হিসেবে কাজ করছি। অসম্ভব পছন্দ করেন আমাকে। একমুহূর্ত আমাকে ছাড়তে চান না। অফিসের কাজের বাইরেও রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে থাকতে হয় আমাকে। দীর্ঘদিন পর এই সফরে তিনি আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন।
মন্ত্রী বললেন, সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। একটা কথা শুধু মনে রাখবে—ভবিষ্যতে যেন কখনো মনে না হয় রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য বাবাকে হারিয়েছ বা দেখতে পাও নি। এরপর তিনি ফোন রেখে দিলেন।
মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝে গেলাম আমার কী করতে হবে। হাতব্যাগ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চিঠিটা বের করে একজন সফরসঙ্গীকে দিয়ে বললাম, তিনি যেন আমার দায়িত্বটা পালন করেন। এরপর কারও সঙ্গে কোনো কথা না বলে ছুটলাম তিন নম্বর টার্মিনালের দিকে। বাংলাদেশের ফ্লাইট তিন নম্বর টার্মিনাল থেকে যাওয়া-আসা করে। এইসময় বিমানের একটা ফ্লাইট থাকার কথা। আমার পেছনে কনস্যুলার জেনারেল সাহেবও দৌড়াচ্ছেন।
অল্প কিছুক্ষণের জন্য বাংলাদেশ বিমানের ঢাকার ফ্লাইট মিস করলাম। প্রচ- মন খারাপ হলো। পরবর্তী ফ্লাইট ছয় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। এমিরাত এয়ার লাইন্স। কনস্যুলার সাহেব আমাকে একটা জায়গায় বসিয়ে রেখে টিকিট করে আনলেন। জানা গেল, তিনি বিশেষ প্রটোকল পাস নিয়ে এসেছেন। তাকে চলে যেতে হবে। আমার কাছে কোনো ফোন নেই। কনস্যুলারের ফোন থেকে ঢাকায় রুবিনাকে ফোন করলাম। রুবিনা আমার স্ত্রী। ফোন ধরেই কান্নাকাটি শুরু করল। রুবিনা বুঝতে পারছে না আমি কোথা থেকে ফোন করেছি—দুবাই নাকি নাইরোবি। তাকে আমার ফিরে আসার কথা বললাম। ঢাকা পৌঁছানোর সময় জানালাম। আমি ফিরে আসছি শুনে রুবিনা খানিকটা ভরসা পেল। এরপর মামাকে ফোন করে আব্বার খবর নিলাম। সরাসরি অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললাম। মামা জানালেন দশ মিনিট আগে তারা রওনা হয়েছেন।

মামা বললেন, তুমি চিন্তা কোরো না। দুলাভাইয়ের জ্ঞান আছে। দুই-একটা কথাও বলছেন। আমের ঝুড়িটা সঙ্গে নিয়েছি কি না সেটা জানতে চেয়েছেন। ব্যথায় একটু কষ্ট পাচ্ছেন। ব্যথা কমানোর জন্য ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন। চিন্তা না করে দোয়া-দরুদ পড়ো। সন্তানের দোয়া বাবা-মার জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করে।
এরপর রাসেলকে সান্ত্বনা দিয়ে সাবধানে আসতে বললাম। অফিসের এক সহকর্মীকেও ফোন করে অ্যাপোলোর ইমারজেন্সিতে কথা বলে রাখতে বললাম।
এবার কাউন্সিলর সাহেবকে বিদায় দিয়ে লাউঞ্জে গিয়ে বসলাম। সময় কাটছে না। মারহাবা লাউঞ্জের ঘড়ির কাঁটা কোথায় যেন আটকে আছে। চোখের সামনে আব্বার চেহারাটা ভাসছে। আহারে কী কষ্টটাই না পাচ্ছেন তিনি! ছেলের জন্য গাছের আম নিয়ে ঢাকায় আসবেন। নিজের হাতে আম পাড়তে গেছেন। আচ্ছা, কথাটা শুনে তখন কেন আব্বাকে জোর করে নিষেধ করলাম না ? কেন বললাম না সবাইকে নিয়েই তো আম খেতে যাব, আপনার আসার দরকার নাই ? বললেই বা কী হতো! আব্বা তো কারও কথা শোনেন না। নিজে যেটা ভালো মনে করেন সেটাই করবেন। কত পরিকল্পনা তাঁর। নাতিদের নিজের হাতে আম খাওয়াবেন।
মাথায় নানা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। রুবিনা আসার আগে বলেছিল ফোনটা রোমিং করে নিয়ে যেতে। সব সময় সেটাই করি। ব্যস্ততার কারণে এবার করা হয় নি। নিজের ওপর প্রচ- রাগ হচ্ছে। ওরা কতদূর এল কিছুই বুঝতে পারছি না। আম্মার কী অবস্থা তাও জানি না। শুনেছি বড়বোন চাটমহর থেকে এসেছে আম্মার দেখাশোনা করতে। ওঁর জামাইটা একটা অমানুষ। বিয়ের পর থেকে একদিনের জন্যও আপা শান্তি পান নি।
পাশের এক ভদ্রলোক অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। মনে হলো ব্রিটিশ নাগরিক। একবার ইচ্ছা করছিল তার ফোনটা চেয়ে নিয়ে একটা ফোন করি। বিষয়টা তাকে বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই তিনি ফোনটা এগিয়ে দেবেন। কয়েকবার বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। এরমধ্যে মনে পড়ল এয়ারপোর্টে তো পে-ফোন আছে। আমি এখানে কেন বসে আছি ? দ্রুত বের হয়ে গেলাম লাউঞ্জ থেকে। এস্কেলেটর দিয়ে নিচে নেমে বামদিকে ঘুরতেই পেয়ে গেলাম ফোন। কফিশপ থেকে কয়েন ভাঙিয়ে এনে ফোন করলাম রাসেলকে। সে বলল, আব্বা ভালো আছেন। যমুনা ব্রিজ পার হচ্ছে ওদের গাড়ি।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোন করলাম আম্মাকে। কী অদ্ভুত! আম্মা খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন। কথাও আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট। আমি ফিরে আসছি শুনে বললেন, ভালো করছিস বাবা। তোকে দেখলে তোর আব্বা অনেক খুশি হবে। আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি ভালো আছি।
ফোন রাখার আগে বললেন, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি ? তোর আব্বা বাঁচবে তো ?
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই আম্মা চিৎকার করে কান্না শুরু করলেন। কান্নার শব্দ যেন দুবাই এয়ারপোর্টে এসে আমার বুকের মধ্যে শেলের মতো আঘাত করল। আমি আম্মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফোন রেখে দিলাম। বিমানে ওঠার আগ পর্যন্ত বার তিনেক আব্বার খোঁজ নিতে মামাকে ফোন করেছি। কিন্তু আম্মাকে ফোন করার আর সাহস পাই নি।


ঢাকা এয়ারপোর্টের রানওয়ে স্পর্শ করামাত্রই প্রথমে ফোন করলাম মামাকে। তিনি ফোন ধরলেন না। রাসেলকেও ফোনে পেলাম না। ফোন করলাম রুবিনাকে। আব্বার খবর জানতে চাইলে সে আমাকে বাসায় আসতে বলল। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, কী বলছ তুমি ? আমি সরাসরি হাসপাতালে যাব। আব্বাকে দেখে তারপর বাসায় আসব। আব্বা এখন কেমন আছেন বলো।
রুবিনা কিছুক্ষণ কথা বলল না। বোধ হয় কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে। পরে একসময় আস্তে করে বলল, আব্বাকে কিছুক্ষণ আগে বাসায় আনা হয়েছে। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। মামা তোমাকে আনতে এয়ারপোর্টে গেছে। তুমি বাসায় আসো।


1 Response

  1. ML Gani says:

    ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.