ভ্রমণ

ঈদের ভ্রমণ-কাহিনী: আজারবাইজানের খেনালুগ গ্রামে

সঞ্জয় দে | 12 Aug , 2019  


‘থামো, থামো! ভুলেও ও-জিনিস খেও না।’ ধোঁয়া ওঠা এক পিস মাটন শিককাবাব কিনতে গেলে ইয়াদ্গার পেছন থেকে দৌড়ে এসে আমাকে নিবৃত্ত করে। কিছুটা হাঁপিয়ে শান্ত হলে কোমরে হাত রেখে প্রথমেই কেবাবওয়ালাকে আচ্ছাসে বকুনি দেয়। যেন সাক্ষাৎ ল্যান্ডমাইনের হাত থেকে বাঁচিয়ে এনেছে, এই ভঙ্গিতে তারপর আমার দিকে ফিরে বলে, ‘শোন ভাই, আমি এসব খেলে কিছুই হবে না। কিন্তু তুমি খেলে সারাদিন হয়তো লোটা হাতেই ছোটঘরে দৌড়োদৌড়ি করতে হবে। বোঝা গেল?’ ইয়াদ্গারের সাবধানবাণীতে আমার কিছুটা হুঁশ ফেরে। ঢাকার চটপটিওয়ালাদের চার চাকার গাড়ির মত আজারবাইজানের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাইওয়ের পাশে গাড়ি নিয়ে বসেছেন কয়েক কেবাবওয়ালা। কয়লার উনুনে শিককাবাব ভাঁজছেন; আর কিছুক্ষণ পর পর সেই কেবাবে প্রলেপ ফেলছে পাশের নির্মিতব্য মহাসড়কের ধুলোঝড়। কেবাবওয়ালাদের অবশ্য সে-নিয়ে ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা আরামসে লিকার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কিছুক্ষণ পর পর কাবেবের শিক উলটেপালটে দিচ্ছেন। কেও-বা আবার ছোট হাতপাখা দিয়ে উনুনের ধোঁয়াকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন চারপাশে। খদ্দের ধরার কাজে এরা নিয়োজিত করেছেন কয়েক পথশিশুকে। তেমন এক ছিন্নকন্থা বালক-ই তো আমাকে হাত ধরে টেনে এনেছে এই ভ্রাম্যমাণ কেবাবশপে।

কাবাব ভক্ষণে ব্যর্থ হয়ে আমি কিছুক্ষণ আশেপাশের মানুষ পর্যবেক্ষণ করি। এটি একটি গঞ্জের বাজার। রঙ চলটে যাওয়া হলদেটে একতলা ভবনে বেশ কিছু মনিহারী দোকান। কোনটির সামনে ঝুলছে বাচ্চাদের লাল-নীল ফুটবল, আবার কোনটির সামনে সাজিয়ে রাখা বালতি-হাড়ি। আর সামনের দিকটায় টং ঘরগুলোতে জোরসে চলছে কাবাব ভাজাভুজি– স্থানীয় ভাষায় যেগুলোর নাম ‘কাবাবলার’। কারিগরেরা হাত চালিয়ে মাংশ পোড়াবার সাথে সাথে চাতক পাখির মত চেয়ে আছে মহাসড়কের দিকে। এ-পথে যেতে যেতে যত মানুষ এখানে থামবে, ততই না ওদের লাভ! আমাদেরকেও আজ এখানে হুট করেই থামতে হয়েছে। তবে কাবাব খাবার জন্যে নয়। ভিন্ন কারণে। পূজার হটাৎ প্রক্ষালন কক্ষে যাবার প্রয়োজন দেখা দিলে ইয়াদ্গার এখানে এনে গাড়ি থামায়।

এই ইয়াদ্গার ছেলেটির সাথে খেনালুগ নামক এক দুর্গম গ্রামে যাবার রফা হয় আজ সকালে। ওর একটা লক্কড়-ঝক্কর মার্কা জীপ গাড়ি আছে। সেটিতে করে ও পর্যটকদের নিয়ে আজারবাইজানের নানা প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়। বাকু’র পুরনো শহরের যে হোটেলে উঠেছি, তার খুব কাছেই ওর ড্যারা। যুবকের চাপায় আকৃষ্ট হয়ে দামদর ঠিক করার পর গাড়িতে উঠতে যাব, এমন মুহূর্তে কী যেন একটা হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এই ভঙ্গিতে ও বলে, ‘এইতো আর মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করে গাড়ি ছাড়ছি। আরও দু’জন সুন্দরী ভদ্রমহিলার আসবার কথা কিনা!’ এই ‘আরও’ শব্দটি যোগ করবার সম্ভাব্য কারণ হল– আমার পাশেই অপেক্ষারত স্লোভেনিয়ার মেয়ে বেঞ্জামিনার উপস্থিতি। আর চেহারা-সুরতের দিক দিয়ে ওকে নিঃসন্দেহে সুন্দরী তকমা দেয়া যায়। পাকা পেয়ারার মত গায়ের রঙ, সেই সাথে উদ্ভিন্ন কেশদাম। বেঞ্জামিনা’র সাথে দু চারটে টুকিটাকি কথা বলার মাঝে ভাবি– আমি তো আর প্লেন ধরার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে যাচ্ছি না। কাজেই এমন অলস প্রহরে দু চার মিনিট খেজুরে আলাপ করে কাটালে আমারই-বা ক্ষতি কী! তবে কিঞ্চিৎ বিরক্তি আমাকে গ্রাস করে, যখন দেখি পাঁচ মিনিট অতিক্রান্ত হয়ে ঘড়ির কাঁটা ত্রিশ মিনিটে গড়ায়, অথচ সেই বাকি সুন্দরীদ্বয়ের কোনো খবর নেই।

অবশেষে তারা এলেন অনেকটা হাঁপাতে হাঁপাতে। বিলম্বের হেতু বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, গত রাত প্রায় তিন ঘটিকা অবধি স্থানীয় শেক্সপিয়ার ক্লাবে মদ্যপান ও নর্তন-কুর্দন করার পর আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতে তাদেরকে বেগ পেতে হয় বেশ। ওদিকে স্বীয় নিবাস দুবাইয়ে ফিরে যাবেন আগামী কালই। অর্থাৎ মাঝে বেঁচে থাকল– একটি মাত্র দিন। হাতের আঙ্গুলের কড়ে সেইসব ঘণ্টার হিসেব করে তারা সিদ্ধান্ত নেয়– প্রাতরাশ না করেই যদি একটা ভোঁ দৌড় দিয়ে ইয়াদ্গারের গাড়ি অবধি পৌঁছানো যায়, তবেই হয়তো দিবসের বাকি ভাগটা আনন্দচিত্তে কাটাবার একটা পথ তৈরি হতে পারে। এই দুজনের একজন হল পূজা, আরেকজন মিত্তাল। জাতিগতভাবে উত্তর ভারতীয়। দুজনের অন্তরঙ্গতা দেখে কাছের বন্ধু বলে প্রতিভাত হলেও বয়সের দিক দিয়ে দুজনের মাঝে কিছুটা ফারাক আছে। পূজার বয়স ত্রিশের কোঠায়। আর মিত্তালের বয়স হয়ত মধ্যবিশের আশেপাশে। পূজা দুবাইয়ে রেখে এসেছে স্বামী আর দু সন্তানকে। ওদিকে দুবাইয়ে জন্ম নেয়া মিত্তাল এখনো মুক্তপাখি। ওদের সেই গতরাতের উদ্দামতার কথা শুনে আমি ভেবেছিলাম– দুবাইয়ে এসবের মওকা না পেয়ে হয়তো বাকুতে এসে আঁশ মেটাচ্ছে। কিন্তু আমাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে মিত্তাল বলল, ‘এখানকার ক্লাবগুলোকে রীতিমত বোরিং মনে হল। এরচেয়ে দুবাইয়ে কত ভালো ভালো ডিসকো আছে!’ দুবাই সম্পর্কে আমি একেবারেই অজ্ঞ। তাই সঙ্গত কারণেই ওখানকার ক্লাব-কালচার সম্পর্কেও অবগত নই। মিত্তাল যখন পূজার দিকে ঘুরে বলে, ‘দুবাইয়ে এতো ক্লাব যে, আমরা মনে হয় এক ক্লাবে কখনোই দু’বার যাইনি, তাই না রে পূজা?’– তখন আমি সত্যিই কিছুটা ভিড়মি খাই।

ওদের যেহেতু প্রাতরাশ করা হয়নি, তাই মাঝপথে একস্থানে থেমে মুদি দোকান থেকে কিনেছি বিস্কুট আর চিপস। সেসব কিনে বাইরে এসে দেখি, মিত্তাল হাতে ধরা সিগারেট থেকে ছুঁড়ছে ধোঁয়ার রিং। পূজার অবশ্য সেই অভ্যেস নেই। ও তাই গাড়িতে বসে চিপস চিবোয় আর বান্ধবীর জন্যে অপেক্ষা করে। এই এখানেও, পূজা যখন গেছে বাথরুমের সন্ধানে, মিত্তাল সেই ফাঁকে চটজলদি ধরিয়েছে আরেকটি সিগারেট। মেয়েটি মনে হয় চেইন স্মোকার। এই মুহূর্তে সে শলাকায় টান দিতে দিতে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে এক ঠোঙা চেস্টনাট কেনার চেষ্টা করছে। বেঞ্জামিনা গাড়ির ভেতর মনমরা হয়ে বসে আছে। ওর এই বিষণ্ণতার হেতু জিজ্ঞেস করেছিলাম কিছুক্ষণ আগে। মেয়েটি এদেশে একাকী আসেনি। এসেছে প্রাণসখার সাথে। সে ছেলেটির সাথেই গত পাঁচদিন আজারবাইজানের পশ্চিমাঞ্চলে ভাড়া গাড়ি নিয়ে টো টো করে ঘুরেছে। পথিমধ্যে যেখানেই মুখরোচক খাবারের সন্ধান পেয়েছে, গোগ্রাসে গিলেছে। আর তাতেই ঘটেছে বিপত্তি। সেই যুবক এখন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হোটেলে শয্যাশায়ী। বেঞ্জামিনা তাই এখানে এসেও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। কিছুক্ষণ বাদে বাদে বন্ধুকে ফোন করে জেনে নিচ্ছে– গত এক ঘণ্টায় কতবার বিছানা থেকে উঠতে হল সেই হিসেব। আমি অবশ্য ইতোমধ্যে ওকে বাংলা স্যালাইনের প্রস্তুত-প্রণালী শিখিয়ে দিয়েছি। এ-ও বলে দিয়েছি, যদিও আমাদের দেশে এক চিমটি লবণের সাথে এক মুঠো গুড় মেশাতে বলা হয়, কিন্তু এই বাকু’তে তো আর গুড় পাওয়া যাবে না! তাই হোটেলের রন্ধনকক্ষ থেকে ছেলেটি বরং কিছুটা চিনি চেয়ে আনতে পারে গুড়ের বদলি হিসেবে। বন্ধুকে সেই রেসিপি পাঠিয়ে দিয়ে বেঞ্জামিনা’র মনের দুশ্চিন্তার মেঘ কিছুটা কাটলেও পুরোপুরি ভারমুক্ত হয়তো সে হতে পারেনি। তাই ভাবাকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দূরের ‘পঞ্চ-আঙুল’ পর্বতের দিকে।

এই পর্বতের নামটি জানলাম ইয়াদ্গারের কাছে। পর্বতের পাঁচটি কালচে পাথুরে চুড়ো উদ্ভুতভাবে ঊর্ধ্বমুখী। নিচ থেকে বঙ্কিম পথ চলে গেছে পর্বতের একেবারে শীর্ষদেশে। পর্বত আর জমিনের কাছটায় রুক্ষ ভূমিকে আড়াল করে রেখেছে একটি লালচে মসজিদের মিনার। এই পর্বতের সাথে পরিচয় করাবার মুহূর্তে ইয়াদ্গার বলে– ‘ওই যে চুড়ো, এর আছে ধর্মীয় তাৎপর্য। আজেরি মুসলিমদের কাছে এটি পবিত্রতম স্থান। রমজান মাসে রোজা ভাঙার পর ইবাদতের উদ্দেশ্যে মুসুল্লিরা চলে যান সেই চুড়োর কাছে। সেখানেই দল বেঁধে নামাজ পড়েন। অনেকে আবার চুড়োয় উঠবার পথে সন্ধান পাওয়া মরুবৃক্ষে বেঁধে দেন মানতের সুতো।’
‘তুমিও কি কখনো গেছ ওই চুড়োতে?’– কৌতূহলী হয়ে ইয়াদ্গারেকে জিজ্ঞেস করি। সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ও বলে– ‘একবার চাচাজানের সাথে গিয়েছিলাম একটা ভেড়া নিয়ে। উনার মানত ছিল। ওখানেই জবাই করে রেঁধে খেলাম। চাচাজান বলেছিল, মানতের মাংশ নিয়ে নাকি পাহাড় থেকে নিচে নামা যাবে না।’

ইয়াদ্গারের কথা শেষ হতে না হতেই পূজার কটকটে হলদে জামার ঝলকানি দেখতে পাই। তবে বোধহয় ওর কাজ হল। আমাদের কাছে এসে চোখমুখ কুঁচকে জানাল– কাজ ও সেরেছে, তবে একান্তই অনিচ্ছায়। প্রক্ষালন ঘরের অবস্থা নাকি নরকতুল্য। আমরা আর কথা বাড়াই না। সে সময়-ও নেই। আপাতত কুবা নামক যে শহরে খানিক বিরতি দেবার কথা, সেখানে পৌঁছুতেই আরও ঘণ্টা তিনেক প্রয়োজন।

দু’পাশে উইলো গাছের সুনিবিড় ছায়া। মাঝ দিয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলে আমাদের গাড়ি। অমসৃণ পিচের সাথে টায়ারের ঘর্ষণের শব্দ শুনে গাছের ফাঁক গলে ভোজবাজির মত উদয় হয় কয়েক যুবক। এরা পেশায় কৃষক। কিন্তু এ মৌসুমে কাজ নেই। তাই হাতের ডালিতে করে জমিতে ফলানো আপেল কিংবা নাসপাতি নিয়ে এরা ছুটন্ত গাড়ির দিকে মেলে ধরে। কিছু দূর পর পর এমন একেক জন বিক্রেতার সকরুণ আর্তি। বোঝা যায়– বাকু শহরের টাকার দমক এ-অবধি এসে পৌঁছয়নি। তাইতো তাদের বেশভূষায় এই মলিনতা। সামান্য কিছু আপেল বিক্রির জন্যে এতটা ব্যাগ্রতা। নিজের প্রয়োজনের জন্যেই হোক কিংবা তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়েই হোক, কেউ যদি গাড়ি থামিয়ে ফল কিনতেও চায়, তাকে দ্বিধায় পড়ে যেতে হবে। কারণ– সকলের কাছেই এক ফল, একই দর। তাহলে কাকে তিনি বেছে নেবেন বিক্রেতা হিসেবে? ইয়াদ্গার এই ফল বিক্রেতাদের দিকে নির্দেশ করে বলে – ‘এদিকে খুব সস্তায় জাফরান পাওয়া যায়। আমরা অনেক সময় চায়ের ভেতর জাফরানের রেণু মিশিয়ে খাই। ফেরার পথে এখানকার একটা বাজারে থামবো ক্ষণ। চাইলে বাড়ির জন্যে কিনতে পারো। মাত্র দশ মানাতে এই এতগুলো জাফরান পাবে।’ শেষোক্ত কথাটি বলে সে বিপজ্জনকভাবে স্টিয়ারিং থেকে দু হাত তুলে নিয়ে মুঠো তৈরি করে জাফরানের পরিমাণ বোঝায়।

কুবা শহরটি কোনো জনকোলাহলে পূর্ণ নগরী নয়। শহরের মাঝখানে থিয়েটার হল। সেটি ছাড়িয়ে কিছুদূর গেলে ছোট একটা পার্ক। পার্কের কেন্দ্রস্থলে হায়দার আলিয়েভের বিশাল ছবি। অবশ্য শুধু এখানে না, আজারবাইজানের বহু স্থানেই হায়দার সাহেবের সমুজ্জ্বল উপস্থিতি। তিনি এখানে একজন নমস্য ব্যক্তিত্ব। বজ্রকঠিন হাতে দেশ শাসন করেছেন সুদীর্ঘ প্রায় আড়াই দশক। এরপর ক্ষমতায় আসে তারই পুত্র। কাজেই তার জয়গান যে সর্বত্রই হবে, সেটাই তো বোধহয় অবধারিত।

আমরা থামি শহর ছাড়িয়ে একটি শৈলনিবাসের পাদদেশে। সেখানে একাশিয়া গাছ দুদিক থেকে যেন চেপে ধরেছে পথটাকে। গাড়ি থামাবার সাথে সাথে আমাদের ঘিরে ঘরে কয়েক ঘোড়সওয়ার। এরা টাকার বিনিময়ে ঘোড়ায় চাপিয়ে ঘুরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু আমাদের কারুরই তেমন ইচ্ছে নেই। এমনকি সময়ও নেই। আমাদের প্রত্যাখ্যানে সবাই বিদেয় নিলেও রয়ে যায় এক বুড়ো ঘোড়সওয়ার। তার কমলাভ মুখটাতে গভীর ক্ষতের দাগ। পাতলা বেত দিয়ে অযথাই ঘোড়ার পেটে আলতো খুঁচিয়ে সে চক্কর খায় আমাদের চারপাশে। ঘোড়াটিও সানন্দে স্বর্ণ কেশর দোলায়। অকারণেই মাটিতে খুরঘাত করে। বুড়োর দিকে সন্দেহের দৃষ্টি মেলে মিত্তাল পূজা’কে হিন্দিতে বলে– ‘শালার বুড়োটাকে খেয়াল করেছিস? আমাদের দিকে কেমন করে ড্যাব-ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। দেখ!’ আমি সে কথা শুনে ফেলে বুড়োর দিকে তাকাই। যদিও আমার কাছে বুড়োকে মনে হয় ভাবলেশহীন আর কৌতূহলী গ্রাম্য ঘোড়মালিক হিসেবে। তবে জানি না, মেয়েরা তো দাবি করে– তারা নাকি ব্যাটাছেলেদের কুনজর রাডারের মত ধরতে পারে। তাই এক্ষেত্রে মিত্তালের কথা সত্যি হলেও হতে পারে। আমি তাই ও-নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বেঞ্জামিনা’কে খুঁজি। আমাদের উল্টোদিকে কাঠের একটি হোটেল। আর পেছনে অনতিউচ্চ টিলা। হোটেলের পেছন দিকে উইলো গাছের ছায়াঘন বন। গ্রীষ্ম পুরোপুরি বিদায় না নিলেও এখনই বনের জমিন ভরে উঠেছে ঝরা পাতায়। বেঞ্জামিনা’কে দেখি, গায়ে একটি জ্যাকেট চাপিয়ে টিলায় ওঠার কসরত করছে। সাতসকালে বাকু থেকে যখন রওনা দিয়েছিলাম, তখন গায়ে খটখটে রোদ লাগিয়ে এলেও এই পাহাড়ি ভূমিতে ঝাঁকিয়ে ঠাণ্ডা পড়েছে। সেই সাথে দূরে খুব নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পাতলা মেঘের পুঞ্জ। আমাকেও তাই বাধ্য হয়ে কুশন জ্যাকেটটি গায়ে গলাতে হয়।

বেঞ্জামিনা’র পিছু নিয়ে কিছুটা ক্যালরি ঝরাবার পর আমিও টিলায় আরোহণ করি। সেখানে এক তেলেসমাতি কারবার। রাতের মরুভূমিতে যেমন অনেক সময় শিবিরাগ্নি জ্বেলে তার চারধারে চলে নৃত্যকলা, তেমনি এখানে ঘাসের মাঝে শুইয়ে রাখা ক্যাসেট-প্লেয়ারে আরবি গান বাজিয়ে তার চারধারে নাচছেন কিছু শহুরে পর্দানশীন নারী। এরা নির্ঘাত আরব দেশের টুরিস্ট পার্টি। কারণ, আজেরি শহুরে মেয়েরা পোশাকের দিক দিয়ে ততটা রক্ষণশীল নয়। তো এই আরব ললনাদের সাথে পুরুষকুলের কাউকে কিন্তু দেখছি না। কিংবা হয়তো আছে দূরে কোথাও। নারীকুলের নৃত্যভঙ্গিমাটি বেশ চপল। নিতম্বে ঊর্মিমালা তৈরি করে ধবধবে ফর্সা হাতের আঙুলগুলোকে তারা মেলে ধরছেন আকাশের দিকে। এ যেন মেঘকে আবাহনের ইঙ্গিত। তবে এদিকে তাদের ওই চড়া বাদ্যের গানটি সবুজ পাহাড়ের নিস্তব্ধ আবহকে করাতের ছুড়ির মত ফালা ফালা করে কেটে দিচ্ছে। কর্ণকুহরে এই বাদ্যের অত্যাচার সামাল দেবার জন্যে আর্দ্র মাটিতে পা ফেলে আমি টিলার শেষপ্রান্তের দিকে হেঁটে যাই। ওখান থেকে দেখি– বহু দূরে ঝাউবনে আড়াল হয়ে থাকা উপত্যকা আর মিহি কুয়াশার সাদা আবরণ মাঝে মাঝেই লুকোচুরি খেলায় মেতে ওঠে। বেঞ্জামিনা যে আমার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে, আগে খেয়াল করিনি। ওর ক্যামেরার ক্লিকের শব্দ শুনে ঘাড় ফেরাতে ওকে দেখি। মাত্রই খবর এসেছে– বন্ধুর অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। সেই শুনে ওর মনও কিছুটা চাঙ্গা। ক্যামেরাটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় ও কয়েকটি ছবি তুলে দিতে বলে। আর আমি সেই সুযোগে বুঝে নেবার চেষ্টা করি বাকু’র হোটেলকক্ষে এই মুহূর্তে শয্যাশায়ী ছেলেটির সাথে ওর সম্পর্কের গভীরতার পরিমাপ।

দক্ষিণ স্লোভেনিয়ার ইরস্ক শহরে ওর বাস। পেশায় স্কুল শিক্ষিকা। আর ওর সেই বন্ধুটি থাকে এক ঘণ্টা দূরের আরেক শহরে। তবে পাকাপাকিভাবে সংসার করার ক্ষেত্রে কে বেশি ছাড় দিয়ে অপরের শহরের গমন করবে, সেই নিয়ে উভয়ের মাঝে চলছে খানিক দ্বন্দ্ব। সমাধান এখনো হয়নি। সে না হলেও, এভাবেই কেটে যাচ্ছে ওদের আনন্দবেলা। প্রতিবছরই দুজনে মিলে হাতের জমানো টাকা খরচ করে বেরিয়ে পড়ে দূরে কোথাও। গতবছর এমনিভাবে ঘুরে এসেছে আফ্রিকার নামিবিয়ায়। আমেরিকাতেও গিয়েছিল বছর কয়েক আগে, সেখানে ভালো লাগেনি। বিশেষ করে কিছু আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঘুরতে গিয়ে বারে বারে স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে হা-পিত্যেশমূলক কথা চলে আসায় ওর কাছে মনে হয়েছে– সামাজিক সুবিধার দিক দিয়ে স্লোভেনিয়া এখনো স্বর্গসম দেশ।

হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনির কবলে পড়ে বুঝতে পারি, গাড়ি এবারে সমতল ছেড়ে পাহাড়ি পথে নেমেছে। বাইছে খাড়া পথ। সে পথে এখানে সেখানে নুড়ি বিছানো। পাকদণ্ডি বেয়ে একটানা উপরে ওঠার সময়ে দমবন্ধ করা কিছু দৃশ্য এসে জানালার বাইরে উঁকি দেয়। বহু দূরে দেখা যায় দু পাহাড়ের মাঝে আটকে পড়া কুয়াশার পোটলা। তারা সেই অবস্থা থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় পাহাড়ের ফাঁক গলে মেঘের সান্নিধ্য খুঁজছে। ওদিকে উল্টোদিকে আরেক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গলিত মোমের স্রোতের মতই নামছে শ্বেত পশমমণ্ডিত ভেড়ার পাল। বহু দূরে এক কালচে পাথরের চাইয়ের উপর বসে মাথায় উলের টুপি পরা রাখাল বালক তাদের উপর অলস উদাস দৃষ্টি রাখছে। পাহাড়ের বাঁক যেখানে কিছুটা সমতল ভূমির সন্ধান পায়, সেখানে আমাদের সাথে দেখা হয়ে যায় তাম্রবর্ণের কয়েকটি বুনো ঘোড়ার। শাবকসহ একটি ঘোটকী স্তনদানের মুহূর্তে অবাক কৌতূহলী চোখে আমাদের দ্রুত ধাবমান গাড়িটির দিকে তাকায়। কুচকুচে কালো চোখা বাকি ঘোড়াগুলো পাথরের মাঝে খুঁজে পাওয়া বিবর্ণ ঘাস চিবানোতে মন দেয়। এই পাহাড়টির নিচে, বহু নিচে দেখা যায় শীর্ণ এক নদীকে। সেটি যেন অনুসরণ করছে আমাদের পথকেই। চারধারে ছড়িয়ে থাকা খনিজ পাথরের মাঝ দিয়ে নদীর জল বয়ে চলেছে। ওদিকে অবশ্য বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। মাথা বোঁ বোঁ করে ঘোরে। ঘুরবেই-বা না কেন? আমরা তো এখন চলে এসেছি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছ’ হাজার ফুট উচ্চতায়।

এমন দুর্গম পার্বত্য পথে প্রায় দু ঘণ্টা চলবার পর আমরা এসে পৌঁছাই খেনালুগ গ্রামটিকে ধারণকারী পর্বতের প্রান্তদেশে। এরপর আর গাড়ি যাবে না। আমাদের কাছে সেই মুহূর্তে মনে হয়– এই যেন পৃথিবীর শেষপ্রান্ত। এর পর কোনো মনুষ্যবসতি নেই, নেই কোনো সড়কপথ। পর্বতারোহণের প্রস্তুতির মতই ইয়াদ্গার এবারে আমাদেরকে সামনের পাহাড়ে আরোহণের কৌশল শেখায়। কী করে পাথরের খাঁজে খাঁজে সতর্ক পা ফেলে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে হবে, সে নিয়ে কিছুটা জ্ঞানপ্রাপ্ত হই। এবারে পাহাড় বাইবার পালা। বেঞ্জামিনা বেশ তরতর করে উঠে গেলেও বিপদে পড়ে সেই দুবাই তরুণীদ্বয়। তারা শহুরে আহ্লাদী পরিবেশে বেড়ে ওঠা মেয়ে। এতসব মেহনতি কায়দা-কানুনের সাথে পরিচিত নয়। ইয়াদ্গার হাত ধরে ওদেরকে ধীরে ধীরে টেনে তুলবে জানিয়ে আমাদেরকে এগিয়ে যাবার ইঙ্গিত দেয়।

গ্রামটি পাহাড়ের কোনো মালভূমিতে অবস্থিত নয়। বরং পাহাড়ের আপাত সমতল স্থানে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এর বিস্তার। আর তাই একটি ঘরের চাতাল হয়তো পরিণত হয়েছে আরেকটি বাড়ির উঠোনে। তবে তাই বলে উঠোনে দাঁড়িয়ে সক্কালবেলায় কেও যে আলসেমি করে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজবে, সে উপায় নেই। কারণ, ওই উঠোন তথা অপর বাড়ির ছাদটি হল কাঁদামাটি দিয়ে নির্মিত। তাই অতটা ভার বইবার সামর্থ্য নেই। ওদিকে বাড়িগুলোর বয়স আবার কিনা দুশো থেকে পাঁচশ বছর। তেমন এক বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখি, পায়ে গামবুট লাগিয়ে গেরস্ত রমণী বেশ করে জলে ধোয়া কাপড়কে পিষছেন। আর এ জল কিন্তু কলের জল নয়। এমন এক আদিম গাঁয়ে কল কী করেই-বা আসবে! পর্বত শিখরের বরফগলা জলকেই কাঠের নালার মধ্য দিয়ে টেনে আনা হয়েছে এই বাড়িগুলোর একপাশে।

আমাদেরকে উঠে আসতে দেখে পাঁচ ছ বছরের একটি বালক বিস্ময়জোড়া চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। নাকের শিকনিতে তার ঠোঁটের উপরিভাগে পড়েছে পাতলা আস্তরণ। বেঞ্জামিনা বালককে লম্বাটে প্যাকেটে মোড়া ক্যারামেল চকলেট সাধে। কিন্তু তাতে বালক হয়তো উলটোপালটা কিছু একটা ভেবে বসে। সোয়েটারের গায়ে ময়লা হাতটি মুছে পাশের আরেক গলিতে সে ভোঁ দৌড় লাগায়। চোখে একরাশ শূন্যতা নিয়ে বেঞ্জামিনা কয়েক পল স্থানুর ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ইশারা করে ওকে এই গাঁয়ের সর্বোচ্চ স্থানে শোভা পাওয়া কাঠের একটি বাড়ির দিকে নির্দেশ করি। ওটির মাথায় লাগানো এলুমিনিয়ামের এন্টেনা। তার মানে এ গ্রামটি একেবারেই বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়!

তবে এখন বিচ্ছিন্ন না হলেও, মাত্র বছর দশেক আগেও এটি নাকি বিচ্ছিন্ন ছিল। সেকালে নিকটস্থ শহর কুবা থেকে এখানে আসার কোনো পথ ছিল না। গাঁয়ের লোকের অতি প্রয়োজনীয় কিছুর প্রয়োজন পড়লে বেশ কয়েক মাস পর পর ঘোড়ার পিঠে কয়েকদিনের খাবার চাপিয়ে ছুটত কুবা’র পানে। তারপর নানা উপত্যকা, নানা বুনো নদী, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বেশ কয়েকদিন বাদে হয়তো পৌঁছুত কুবা’তে। এমন জীবনই তাদের কাছে শ্রেয়তর ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। না, হয়তো ভুল বললাম। শতাব্দী নয়, প্রায় হাজার বছর ধরে। কারণ– এ-অঞ্চলে এটাই সবচেয়ে পুরনো মনুষ্য বসতি। জনপদ গড়ে ওঠে, তারপর কালের পরিক্রমায় বিলীন-ও হয়ে যায়। এইতো সভ্যতার নিয়ম। কিন্তু সেই নিয়মের কিছুটা ব্যাত্যয় ঘটিয়ে কী করে যেন টিকে গেছে এই গ্রামের ক্ষুদ্র জনপদ। হাজার বছর ধরে তাদের কাছে এই গ্রামটাই ছিল একটা পৃথিবী। আর সেই পৃথিবীর দূরসীমা হয়তো ছিল কুবা শহর অবধি। বছর দশেক আগে কুবা থেকে মনুষ্যনির্মিত একটা সড়ককে এ গাঁ অবধি টেনে-হিঁচড়ে এনে যেন হুট করে বদলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে গাঁয়ের নিস্তরঙ্গ জীবনকে। গাছের কাণ্ডকে খাম্বা বানিয়ে তাতে বয়ে আনা হয়েছে বিজলীবাতির তার। এনে দেখানো হয়েছে টেলিভিশন নামক আজব বাক্সের কেরামতি। গোলাপ গাছের মাথায় বাবলা গাছের ডাল এঁটে দেবার মত করে গাঁয়ের ইশকুলের মাথায় লাগানো হয়েছে ওয়্যারলেস ফোনের এন্টেনা। এতসব কৃত্রিমতায় অবশ্য গাঁয়ের অনেকে প্রীত নয়। বাইরের দুনিয়ার অজানা টুরিস্ট দেখলে তাই তারা মুখ গোমড়া করে ভিন্ন দিকে তাকিয়ে থাকে। আর হয়তো মনে মনে ইয়াদ্গারের মত শহুরে দালালদের দেয় অভিসম্পাত।
পাথরকে কোনো এক বিচিত্র কায়দায় ভেঙে দেয়া হয়েছে ইটের রূপ। তারপর সে পাথর একের পর এক বসিয়ে গড়া হয়েছে বসতবাড়ি। তেমন একটি বাড়ির সামনে চৌবাচ্চায় রাখা জল। পাশের খড়ের গাদা। সামনের উঠোনটিতে এসে আমরা কিছুটা জিরোই। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার দলের বাকি দু সদস্য এখনো বেশ কিছুটা দূরে। পূজা আর মিত্তাল সুবিধে মত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তোলায় মত্ত। ইয়াদ্গার আর ওদের অপেক্ষা না করে তরতর করে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে এসেছে। ও আমাদেরকে গাঁয়ের জাদুঘরটিতে এবারে নিয়ে যেতে চায়। এমন এক দুর্গম গাঁয়ে আবার জাদুঘর! আমার ঠিক বিশ্বাস হয় না। তবে ক্লে পাথরের ছাদওয়ালা একটি একচালা ঘরে ঢুঁকে বুঝতে পারি– ব্যাপারটা রসিকতা নয় মোটেও। গ্রামবাসী পরম মমতায় এখানে সংরক্ষণ করছেন শত বছর আগে তাদের গাঁয়ে ব্যবহৃত জামাকাপড়, প্রাচীন কোরান শরিফ, পশু চামড়া দিয়ে গড়া জুতো, নানা প্রকারের মৃৎপাত্র, বহু পূর্বে গাঁয়ের কারও আঁকা ছবি – এমন আরও নানা কিছু। এতে একদিকে ভালই হল। এই এক ঘরের মাধ্যমেই গাঁয়ের পুরনো ইতিহাসের খানিকটা ঝলক দেখা গেল।

বাইরে বেরিয়ে দেখি– পূজা আর মিত্তাল এই এতক্ষণে এ-চত্বরে এসে পৌঁছেছে। তবে ওদের আরও কিছু ছবি তুলবার ইচ্ছে। সে ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে ইগাদ্গার আরেকটি স্থানের সন্ধান দেয়। ওখান থেকে দূরের পর্বতের হিমবাহ আর বরফ গলা নদীর সুস্পষ্ট চিত্র নাকি দেখা যায়। আবলুশ কাঠ নির্মিত যে বাড়িতে ইয়াদ্গার আমাদের নিয়ে তোলে, সেটি আদতে গাঁয়ের একমাত্র মসজিদ। এখানকার অধিকাংশ মানুষই সুন্নি মুসলিম। এরা মূলত ককেশীয় গোত্রের। যদিও আজারবাইজানে এসে মিশেছে তিনটি গোত্রের মানুষের রক্ত– ককেশীয়, পারস্য এবং সেল্যুক তুর্কি। এর মাঝে মূলত তুর্কি আর পার্সিয়ানদের মাঝে এ অঞ্চলের কর্তৃত্ব নেবার সংগ্রাম চলে প্রায় হাজার বছর ধরে। সে যুদ্ধে জয়ী হয় শেষ অবধি তুর্কিরা। আজেরি সংস্কৃতিতে তাই তুর্কি প্রভাব প্রবল। তবে এ গ্রামটি রুশ সীমান্তের কাছাকাছি এক পার্বত্য অঞ্চলে হওয়ায় এখানকার লোকজ সংস্কৃতিতে ককেশীয় ধারাটিরই প্রাধিক্য।

‘ভাই, এখানে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হবে কোথায়?’– ইয়াদ্গার’কে এ প্রশ্নটি এর মাঝেই বেশ কয়েকবার করে ফেলেছি। প্রতিবারেই ওর উত্তর, ‘ভেবো না। কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই।’ কিন্তু এই গ্রাম তো দূরের কথা, এর একশ মাইল ত্রিসীমানায়ও কোনো হোটেল আছে বলে তো মনে হয় না। এদিকে দুপুর গড়িয়ে এল। পাহাড় বাইবার কারণে শরীরে সঞ্চিত ক্যালরির পরিমাণ প্রায় শূন্য। ইয়াদ্গার’কে আবারও তাড়া লাগালে ও এবারে রহস্য উন্মোচন করে বলে– ‘এ গাঁয়ের মোড়লের সাথে কথা হয়েছে। তিনি আমাদেরকে দুপুরের ভোজে আপ্যায়িত করলে কৃতার্থ হবেন।’ আমি কিছুটা সঙ্কুচিত বোধ করি। বলা নেই, কওয়া নেই, হুট করে একজনের বাড়িতে গিয়ে উঠবো? ওদিকে শুনেছি, এখানকার লোকেরা নিজেদের সকল শস্যদানা নিজেরাই ফলায়। খাদ্যের জন্যে তারা বাইরের পৃথিবীর উপর নির্ভরশীল নয়। তবে এটি দুর্গম পাহাড়। বছরের মাত্র কয়েক মাস হয়তো এখানে থাকে সোনাঝরা রোদ। বাকি সময়টা ডুবে থাকে কুয়াশা আর বরফের চাদরের তলে। তাই নিজেদের প্রয়োজনের ওই শস্যটুকু নিশ্চয়ই জোগাড় করতে হয় ব্যাপক মেহনত করে। ইয়াদ্গার’কে সেসব বললে ও মাথা নেড়ে বলে, ‘সেসব নিয়ে এতো ভেব না। লোকটিকে আমি জানি। খাওয়াতে পারলে ও খুব খুশি হয়। মেহমানদারিকে ও নিজের গর্ব বলে মনে করে।’

মোড়ল আমাদেরকে দেখে দৌড়ে এলেন। বেঁটে-খাটো মানুষ। পরনে পুরনো চেক শার্ট। বয়স হয়তো পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলেও হাতের সতেজ ধমনীগুলো তার দৈহিক সুঠামতার ইঙ্গিত দেয়। মাটি আর পাথর দ্বারা নির্মিত তার এই বাড়িটি দ্বিতল। নিচের তলটি শীতের দেশের বেজমেন্টের মত অর্ধেক গলা ডুবিয়ে আছে ভু-অন্তরালে। আমরা গৃহপ্রবেশের মুখে দেখি– বাঁ দিকের মাটির উনুনে রান্না চাপিয়েছেন মোড়লপত্নী। মোড়ল সাহেব আমাদেরকে ভেতরে ঠেলে দিয়ে গিন্নীকে কী একটা বলতে দৌড়ে বাইরে চলে যান। জুতো খুলতে গিয়ে শুনি, উপরের তলে একটি মেয়ে ডুকরে কাঁদছে। পূজা কান্না শুনে সঙ্কীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে মেয়েটির কাছে যায়। আমরা ওর জন্যে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। এদিকে আমি ভাবতে থাকি, ব্যাপারটা মোড়লের পারিবারিক বিষয় হওয়ায় পূজার এই ছুটে যাওয়াটা তিনি কীভাবে নেন কে জানে! তবে ভাগ্য ভাল, পূজা যতক্ষণ ওপরে কাটায়, ততক্ষণ কেও এদিকে আসে না। ওকে নামতে দেখে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। আমাদের কাছে এসে বিষাদমাখা কণ্ঠে পূজা জানায়– অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটির কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করতে পারেনি। মূল সমস্যা ভাষাগত হলেও মেয়েটির আহত পলায়নপর দৃষ্টি বুঝিয়ে দিয়েছে, ভিনদেশীর কাছে নিজের গোপন বেদনালাপ করার জন্যে সে এই মুহূর্তে প্রস্তুত নয়। আমরা সিঁড়ির কোণে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করার মুহূর্তে মোড়ল সাহেব তার ঝুলে পরা ইংলিশ প্যান্টটি উপরের দিকে ঠেলতে ঠেলতে আবারও উদয় হন। এবারে তিনি আমাদের নিয়ে যান এই বাড়ির নিচতলের অন্ধাকারাচ্ছন্ন একটি ঘরে। এটিই বোধহয় উনার মেহমান আপ্যায়নের ঘর। ঘরের একদিকে পেতে রাখা পালঙ্কের উপর ছড়িয়ে রাখা বাহারি কাজের সিল্কের একখানা চাদর দেখে তেমনটিই মনে হল। খাটের পাশে খাবার টেবিলের চারধারে আমাদের বসতে বলে হোটেলের পরিবেশনকারীর মত তিনি জানতে চান, কী ধরণের খাবার খেতে চাই আমরা? চাইলে গরম ভাতের সাথে মুরগি কিংবা ভেড়ার ভাজা মাংশ দিয়ে আপ্যায়ন সম্ভব। আমরা আমাদের মাঝে কিছুটা আলোচনা করি। সবাই-ই প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। মাংশের ব্যবস্থা করতে বললে সেটি বানিয়ে আনতে আনতে ক ঘণ্টা লাগবে কে জানে! এর চেয়ে ভাত আর কিছু আলু ভাজা হয়তো এ-বেলার জন্যে যথেষ্ট। এতে করে মোড়ল সাহেবকেও খুব বেশি ঝামেলায় ফেলা হয় না। তিনি আমাদের ফর্দ শুনে আবারও সেই ঝড়ের বেগে বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটেন।

খাবার টেবিলের উপর থেকে জ্বলছে টিমটিমে বিজলী বাতি। ওটি না জ্বললে এ ঘরটি হয়তো হতো ঘুটঘুটে অন্ধকার। মিত্তাল ক্ষুধায় কাতর হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ে। ওদিকে সেই মেয়েটির ক্রন্দন বায়ুস্রোত সন্তর্পণে এসে ঢোকে এই ক্ষুদ্র কুঠুরিতেও। পূজা কান খাড়া করে সেটি শুনবার মুহূর্তে ইয়াদ্গার কক্ষে এসে ঢোকে। ও এতক্ষণ বাইরের উঠোনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। পূজা কোনো কথা না বলে ইশারায় ইয়াদ্গার’কে ডেকে নিয়ে বাইরে যায়। কোথায় যায়, সেটি ঠিক অনুমান করতে পারি না। উপোষী বেড়ালের মত বেঞ্জামিনা টেবিলের উপর থুতনি রেখে শোবার ভঙ্গি করে। এ সময়ে দশ-বারো বছরে দুটি ছেলে হাতে কয়েকটি প্লেট নিয়ে ঢোকে। সেই দেখে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আমাদের চোখ। যাক, অবশেষে কিছু খাদ্যের মুখ দেখা গেল। ওরা নিয়ে এসেছে নিখুঁতভাবে কাটা শসা আর টকটকে লাল টমেটোর টুকরো। আরেকটি প্লেটে পাউরুটির কয়েকটি টুকরো। মিত্তাল’কে না জাগিয়ে আমরাই প্রথমে সেগুলো গ্রাস করতে উদ্যত হই। রুটির টুকরোগুলো মোলায়েম নয় মোটেও। দাঁতের জোর না থাকলে সেগুলো ছিঁড়ে খাওয়া মোটামুটি দুঃসাধ্য। বাধ্য হয়ে রুটির সাথে টমেটো যোগ করে প্রাথমিক খিদে মিটাই। এ সময়ে দেখি পূজা ঘরে ঢোকে। ইয়াদ্গারের মুখ কিছুটা গম্ভীর। নিচু ছাদের এই ঘরটিতে না ঢুঁকে ও আবারও বাইরের উঠোনের দিকে পা বাড়ায়। পূজার কাছ থেকে শুনি– ইয়াদ্গার’কে দোভাষী হিসেবে ব্যবহার করে ও আবারও মেয়েটির কাছে গিয়েছিল কান্নার হেতু জানতে। মোড়লকন্যা মেয়েটি প্রথমে কুণ্ঠা বোধ করলেও চাপাচাপির কবলে পড়ে জানায়– এই সদ্য কৈশোরেই তার বিয়ে ঠিক হয়েছে গাঁয়ের এক যুবকের সাথে। কিন্তু এই মুহূর্তে বিয়েতে তার একেবারেই মন নেই। আরও কিছুটা কাল মেয়েটি ঘাসফড়িং-এর মত উড়ে বেড়াতে চায় পিতৃ গৃহকোণে। পূজাও হয়তো এই কাহিনি শুনে বোঝে, এ-সমস্যার সমাধান এই কয়েক ঘণ্টায় দিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই কিশোরীর মাথায় কিছুটা সময় সান্ত্বনাপূর্ণ হাত বুলিয়ে ও নেমে এসেছে নিচে।

অবশেষে আসল খানা এসে পৌঁছায়। সেটি নিয়ে প্রবেশ করেন মোড়ল সাহেব স্বয়ং। অন্তঃপুরবাসিনী কেউ তার অনুগামী হয়নি। হয়তো তারা হেঁসেলে ব্যাস্ত, কিংবা হয়তো অচেনা মানুষের সামনে লজ্জাবনত বদন দেখাতে চান না। যাকগে, পরিবেশিত খাবারের মাঝে দেখি– বিশাল চিনা মাটির প্লেটে পিলাফ আর আরেকটি ডিসে গোলাকার বিস্কুটাকৃতির ভাজা আলু। ‘আর কিছু চাইলে ওদেরকে বলবেন’– বলে মোড়ল দরজার কাছে প্রহরীর মত দণ্ডায়মান সেই বালকদ্বয়ের দিকে নির্দেশ করেন।
আমরা যেটিকে বলি ভাত, সেটাকেই এরা বলে পিলাফ। লম্বাটে চালের ভাতের সাথে কিছুটা জাফরান মেশানোয় এর রঙ হয়েছে হলদেটে। পিলাফের স্তরের মাঝে মাঝে পুরে দেয়া হয়েছে খুবানি আর কাজু বাদাম। মুখে দিয়ে বুঝি, অনেকটা পোলাও-এর এর কায়দায় এর সাথে মেশান হয়েছে পিপাসা উদ্রেককারী মাখন। ওদিকে গোল করে কাটা আলুগুলোও ভাজা হয়েছে তেলে নয়, মাখনে। সেই ভাজি দিয়ে পিলাফ খেতে যেন অমৃতসম লাগে।

বেলা কিছুটা পড়ে এসেছে। সমতলে এখন গ্রীষ্মকাল হলেও এই পাহাড়ি জনপদে এখনই শারদ অপরাহ্ন এসে হানা দিয়েছে মিষ্টি আর ভারি বায়ুসহ। ঘণ্টা কয়েক পরেই হয়তো ক্ষিপ্র গতিতে নামবে সন্ধ্যা। তার আগেই এই অঞ্চল পার হওয়া যায় কিনা সে নিয়ে ইয়াদ্গারের সাথে কিছুটা শলাপরামর্শ হয়। ঘড়ি মেপে দেখি, ঠিক এই মুহূর্তে যাত্রা শুরু করলে হয়তো বিকেলের কোমলাভাময় সূর্যকে সাথে করেই পাহাড়কে বিদায় জানানো সম্ভব। আমরা তাই খাবার পর একটি দিবানিদ্রার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়ে মোড়লের উঠোনে এসে রোদের তাপ গায়ে মাখি। বহুক্ষণ অন্ধকারে থাকার পর আলোয় আসায় চোখে ঝিঁঝিঁ লাগে। আমাদেরকে দেখে মোড়ল রন্ধনশালা থেকে দৌড়ে এসে বলেন, ‘আরে, আপনারা উঠে এলেন কেন? দেখ কাণ্ড! সবার জন্যে চায়ের ব্যবস্থা হচ্ছে তো!’ লোকটি সবসময় এমন দৌড়ে দৌড়ে চলে কেন কে জানে! ইয়াদ্গার তাকে আমাদের তাড়ার কথাটি বুঝিয়ে বললে বুকে হাত রেখে কিছুটা হতাশ মুখভঙ্গি করে বলেন– বড় ছেলেটিকে তিনি মাত্রই আদেশ দিয়েছিলেন সামোভারে জল চাপাতে। কিন্তু ওতে আগুন ধরাতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছিল। আগে যদি আমাদের তাড়ার কথা জানতেন, তবে ছেলের বদলে তিনি নিজেই সামোভারের দায়িত্ব নিতেন। আমি ডান দিকে তাকিয়ে দেখি– উঠোনের একধারে রাখা লম্বাটে সামোভারের মাথায় লাগানো চিমনি দিয়ে ততক্ষণে খুব ধীরে নির্গত হচ্ছে জলীয় বাষ্প।

গেটের বাইরে পা রেখে আমরা সবাই মোড়লকে কিছু টাকা সাধি। পোকায় খেয়ে নেয়া দাঁত বের করে আকর্ণবিস্তৃত হাসি উপহার দিয়ে তিনি জানান– যে স্থান আর সমাজে তারা বাস করেন, সেখানে ওই কাগজের খুব একটা দাম নেই। বরং দাম আছে ভালোবাসার, হৃদ্যতার আর গর্বের। এই যে গ্রামের আর সব বাড়ি থাকতে কেবল তার বাড়িতেই আজ আমরা দুপুরের খাবার খেলাম, এতে করে তার-ই কি কম গরিমা হল গাঁয়ের বাকি সবাইয়ের কাছে? কাজেই ওসব দেনা-পাওনার হিসেব থাক। বরং মোড়লবাড়ির মেহমানপনার কথা মনে করে আমরা সবাই যদি আবারও খেনালুগে আসি, সেটাই হবে তার পরম প্রাপ্তি।

আমরা মোড়লকে বুকে জড়িয়ে ধরি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.