কবিতা

জিললুর রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

জিললুর রহমান | 3 Aug , 2019  


সাঁতার দিয়ে চলি সাগর উত্তালে

সাঁতার দিয়ে চলি সাগর উত্তালে
বছর বত্রিশ কোটির সমকালে
একাকী সত্তায় মানুষ হনুমান
শ্রেণীর কেউ নেই ডোভেনিয়ান যুগে

অষ্টবিংশতি কোটি বছর আগে
কার্বনিফোরাস যুগের যত প্রাণী
ডানায় ভর করা বিশাল পতঙ্গ
সাঁতার দিয়ে চলি সাগর উত্তালে

মেগানয়রাদের প্রবল ঝাপটায়
কী উৎকন্ঠায় কাঁপছে আয়ুকাল
তখনো সূর্যের ঝাঁঝালো রোদ তাপ
রক্ষে করে যায় নতুন মাছেদের

মাছেরা এসেছিলো তাদেরও ঢের আগে
ডাঙার উপরেও গাছেরা জন্মায়
আমি তো ঢেউ ঠেলে বিপন্ন দিবসে
ঝড়ের ঝাপটায় ডাঙায় ভীড়ে যাই

কেম্ব্রিয়াম যুগ অতীত হয়ে গেছে
তবু তো শ্যাওলার আঁকড়ে ধরা দু’পা
অনেক চেষ্টায় ছাড়িয়ে বন্ধন
বালুকাবেলাভূমে হালকা ঘুরে ফিরি

মাটির মহাদেশ কাদায় পচ্ পচ্
কোথাও সিলুরেন যুগের বিছুটিরা
কোথাও বিষণ্ন অচেনা উদ্ভিদ
এমন অদ্ভুত জগতে আমি একা

মানুষ প্রজাতিকে এখানে কে বা চেনে
এখানে ঘোরা ফেরা একাকী সত্তার
কোথাও মাছগুলো উড়তে শুরু করে
কোথাও উদ্ভিদ ডুবছে ঘোলাজলে

এমন দিনে কেউ চেনে না আমাকেও
আমিও নানা মাছ অথবা উদ্ভিদ
তাদের সাথে তাল মেলাতে হিমসিম
সাঁতার দিয়ে চলি সাগর উত্তালে

মানুষ প্রজাতিকে এখানে কে বা চেনে
এমন অদ্ভুত জগতে আমি একা

শুধু তারামাছ

পেলিওজোয়িক যুগে সাঁতরাই একাকী সত্তা
আর কেউ নেই জনমানুষের চিহ্ন দেখি না

শুধু তারামাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে বালুকাবেলায়
পঞ্চাশ কোটি বছর আগের পৃথিবী পাড়ায়

জেলিফিশ কিছু এদিক ওদিকে বুঁদ হয়ে পড়ে
কোন্ বেদনায় নির্বাক জেলি ফিরে নাই ঘরে

কোটি বছরের শীতে আর তাপে কে পায় রক্ষে
স্পন্জ মাছেরও ধীর বিচরণ সাগর বক্ষে

পৃথিবীতে আর সাগরের বুকে শৈবাল দাম
আর এককোষী ব্যাকটেরিয়ার ছড়ায় সুনাম

তাহাদের প্রেম ভালবাসা লয়ে প্রকৃতির কোনো
কিতাব দেখিনি, লেখা জোখা নেই মান অভিমানও

মেসোজোয়িকের কালের সেসব ডাইনোসরাস
জুরাসিক যুগ তখনো আসেনি সরীসৃপাস

কোটি বছরের সূত্রে নিজের পরিচয় খুব অতিথি সুলভ
আমাকে কেউ তো চেনে না জানে না এত দুর্লভ

সাঁতরে ফিরেছি পাঙ্গিয়া মহাদেশের দুপারে
মানুষের কোনো টিকি দেখি নাই ধুধু প্রান্তরে

তারা মাছেদের রাজত্বে খুব সাবলীল দিন
কলি যুগে আর ফেরে না কৃষ্ণ বাজবে না বীণ


টেথিস সাগরের ভুতুরে সন্ধ্যায়

টেথিস সাগরের টেরোডেকটাইল
পাঙ্গিয়া নামের সে মহাদেশটায়
বুঝিবা বিচরণ করেছে একদিন
জুরাসিক যুগের ভুতুরে সন্ধ্যায়

তেমনি ভয়াবহ আগুনে হলকায়
আরো না কতো জীব চড়েছে মহাদেশে
কেউবা ভেসে ছিল টেথিস জলভাগে
কেউবা উড়েছিল পাখনা ভর করে

সে কোন্ দৈবের দীপ্ত অভিশাপে
আমিও সাঁৎরাই টেথিস উপকূলে
এখানে একা আমি শঙ্কা নিয়ে বুকে
ভয়াল সাইজের প্রাণীরা হেলেদুলে

কখনো হুঙ্কারে কখনো ঝগড়ায়
আগুনে হলকায় সে কোন্ আক্রোশে
মত্ত হল্লাতে কিংবা আহারের
ব্যস্ত আয়োজনে তপ্ত দিন শেষে

কোথাও সরীসৃপ কোথাও ডালপালা
ছড়ানো বৃক্ষের হা করা মুখ যতো
আমাকে গিলে খাবে সতত উদ্যত
মানুষ শুধু আমি একাকী বিব্রত

আমি তো এত আগে আসার কথা নয়
প্রাণীরা বিস্মিত রাগান্বিত কেউ
কলজে কাঁপে ভয়ে কখন কী যে হয়
পাঙ্গিয়ার চরে আছড়ে পড়ে ঢেউ

তবুও সাঁতরাই তবুও হেঁটে চলি
নিয়তি যেই ভাবে আমাকে এনে ফেলে
এদিকে সরীসৃপ আগুন মুখোগুলো
আমাকে দেখে আর মেতেছে কলরোলে

এদের কারও নেই নামাজ রোজা দেখ
এদের কারও নেই অযথা সন্দেহ
যখন খিদে জাগে সামনে যাকে পাবে
তাকেই সাথে সাথে করবে বুঝি দাহ

আমাকে দেখেছে কি আমি তো একা একা
টেথিস জলধিতে নীরবে ভেসে থাকা

একদিন বরফ যুগে

একদিন সমস্ত জগত ঢেকে গেল বরফের স্তুপে। প্যালিয়াজোয়িক যুগে সেই যে সায়ানো-ব্যাকটেরিয়া আচ্ছাদিত করে সমগ্র লরাশিয়া — আমি তার ফাঁকে ফাঁকে হাঁটতে চেয়েছি কতোকাল।
একদিন অগ্ন্যুৎপাতে লাভা ঝরতে ঝরতে ঢেকে দিয়ে গেল সমস্ত উত্তর গোলার্ধ জুড়ে। তারপর লক্ষ কোটি বছরের হাঁড় কাঁপানো শীতের সকাল মহাশীতকাল — রোদ্দুর পিছলে যায় বরফের সুমসৃণ শাদা পৃষ্ঠদেশে। বিপন্ন অস্তিত্ব নিয়ে হেঁটে চলি গন্ডোয়াল্যান্ডের দিকে — আরও আরও দক্ষিণের পথে।
লক্ষ লক্ষ বছরের ঘটনাবিহীন পৃথিবীতে প্রাণীহীন প্রাক-ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে প্যান্থালাসা মহাসাগরের তীরে খাবি খেতে থাকি আমি কোন্ আদম সন্তান! কোন্ স্বর্গ থেকে বিতাড়িত!
কোথাও প্রাণের চিহ্ন লেশমাত্র নেই, ব্যাকটেকিয়া বরফাচ্ছাদিত। আসেনি ম্যামথ কিংবা ডায়নোসরাস। এমনকি সাগরের পাড়ে দু’একটা তারামাছ যদি থাকতো কিংবা জেলিমাছ।
রোদ গিলে গিলে হেঁটে চলি বরফ উপত্যকায় — কখনো লরাশিয়ায় কখনো গন্ডোয়াল্যন্ডের টেথিস উপকূলে। আমি কি প্রথম মানুষ তবে? প্রথম সৃষ্টি ভেবে ভুল করি? আমিই ঈশ্বর তবে? গড়ে তুলব নতুন পৃথিবী? ভাবতে ভাবতে গ্রীণল্যান্ডে রাত নেমে আসে।
রাতে চাঁদ থাকলে কবিতার উপযোগ ঘটে। চন্দ্রতাপে বরফের রং প্রেমময়ী হয়ে ওঠে। তবে আদি পুস্তক এবার লেখা হোক কল্পিত মহাস্বর্গের স্লোকের ভাষায়…

যতই জমছে বরফ

ভেঙে পড়ার আগে শেষ চেষ্টা চালাতেই হবে। যতই বরফ তাল তাল জমে যাচ্ছে, উঁচু হচ্ছে পর্বতের প্রায়, আমরা এগিয়ে চলি বিষুবরেখার দিকে। আমরা মানে আমার সঙ্গী যত বিচিত্র প্রাণীকুল — কেউ মৎস্যকুমারী কেউবা ঘোটককুমার। কেউবা সদন্ত আর কেউ কেউ অগ্নি-উদ্গারী। কেবল জীবনের জন্যে আমাদের এগিয়ে যাওয়া — যশোর রোডের শরণার্থীর মতোন। পথ চলতি একে অপরকে সাবাড় করে বেঁচে থাকার লড়াই। হাঁপিয়ে উঠেছি যত দিন যায়। জ্ঞান হারাবার আগে এটুকুই মনে আছে — আমি বরফের বিশাল চাদরে পিঠ পেতে আছি। একা, অবলম্বনহীন, অথচ মনে হচ্ছে অসীম ক্ষমতা এসে কানে কানে বলছে তুমি হও বললেই হয়ে যাবে। এমন হয়ে কি যায়?

কেবল এগিয়ে যাওয়া…

সারা গায়ে এত আঁচড়ের দাগ, ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে কাল থেকে। চুলকে চুলকে ঘষটে ঘষটে চলি সারাদিন। তবু আচমকা টেকটোনিকের প্লেটেই ধাক্কা বুঝি! কোথা হতে সব খণ্ড ভূমিরা প্রায় একতাল পর্বতসম হিমালয় গড়ে তোলে। কোথাও আবার ভিসুভিয়াসের গলিত লাভার স্রোত। কোথাও শীতল কালো ভূমিতল কোথাও বেতাল সাগরের ঢেউ। যত বলি থাম্। থামছে না কেউ দিক দিগন্ত জ্ঞানহারা হয়ে ছুটছে বিশাল প্রাণী। নিজের আগুন লাভার আগুনে দিচ্ছে জলাঞ্জলি। যারা আরও ছোটো যায় ছুটে ছুটে জলের পরশ নিতে। লাভার অনলে গরম সে জলে আত্মাহুতির লীলা। আমি শুধু এক বুঝি নালায়েক সবকিছু দেখে যাই। সৎ পথে যত চাই ডাকিবারে, ভুল পথে ছোটা ততো। যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি ছুটেছে অসৎ পথের ডাকে। আমিই কেবল নামাবলী গাই কেবলাকান্ত টুপি দাঁড়ি চাই। শাপশাপান্ত করি প্রাণীকুলে আর — কে দেখে পথের দিশা? যতোদিন যায় টের পেতে থাকি জীবন মানেই ছোটা। বুঝে বা না বুঝে, মন যাহা চায় সেই পথে যাই ছুটে। থাক না বিপদ ভিসুভিয়াসের আগুন লাভার কিংবা কোথাও হিমবাহগুলো পিষে মারবার আগ মুহূর্ত হোক, কেবল এগিয়ে যাওয়া…

তারা নিজ ধ্বংসের পথে নিজেই হেঁটে যায়

কিছু প্রাণী ভেড়াদের মতো, কিছু আরো বেশী লোমে ঢাকা। একতাল বরফকে কাঁচকলা দেখিয়ে বেঁচে গেল — বের হয়ে এল শ্বেতশুভ্র অভিশাপ থেকে। তারপর কিছু বৃক্ষ জেগে ওঠে গা ঝাড়া দিয়ে। আবার জীবন জীবন খেলা — আবার কামড়া কামড়ি খেয়োখেয়ি করে বেঁচে থাকা বিশাল প্রান্তরে।
যখন আবার গলতে শুরু করে বরফ। যখন চুপসে যায় শ্বেতপর্বতের চূড়া, যখন উত্তপ্ত সূর্যের গনগনে তেজ আগ্রাসী হলো ভূপৃষ্ঠের উপর, লোমগুলো অভিশাপ হলো — বলো, যে লোম বাঁচিয়ে দিলো ভয়াবহ শীতে, সেই লোম কাল হয়ে গেল প্রচণ্ড উত্তাপে। আর তারা অবলুপ্তির পথে ধ্বংসের পথে এগিয়ে গেল। আমি তাদের লোম কেটে ছেঁটে দিতে যাই, আমাকে পাত্তা দেবার কেনো অবকাশ তাদের দেখিনি। তারা নিজ ধ্বংসের পথে নিজেই হেঁটে যায়। পথপ্রদর্শক তার কোনো কাজেই আসেনি।

তখনো জমেনি শীলা

তখনো জমেনি শীলা, পাললিক লীলা চলে নানা কেলি। প্যাচপ্যাচে কাদা মাড়িয়ে শুকর পাড়ি দেয় খাঁড়ি। জোয়ারের জলে ভেসে ভেসে আসে জানে না কোথায় বাড়ির ঠিকানা । ভাটার টানে সে খোঁজে কোন দেশে নিজের বসত। কতদিন আর চলবে এভাবে যত বানভাসি জোলো সংসার।
পেলিওলিথিক যুগে পাথরের বৃথা ঠাঁই খোঁজা। তবু কিছু কিছু প্রাণী খোঁজে ভূমি— বন্য শুকর কিবা বাইসন অথবা যাদের নাম জানি নাই — লরাশিয়া থেকে গোয়াণ্ডাভূমি দিকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে।
এর মাঝে ফের মহা ধাক্কায় কোথা থেকে ভুঁই ফুঁড়ে হিমালয়। আহা কী শীতল বরফ গলিত জলধারা নদী থিম্পু অথবা লাওসের দেশে ফুল ফুটিয়েছে। উদ্ভিদ তার ধর্ম মতোন ডালপালা ছাড়ে আকাশের দিকে বাতাসের দিকে। পতঙ্গ তার সুঁড়গুলো দিয়ে ফুলে ফুলে করে আহরণ মধু। লাকুম লাকুম দীনুকুম বলে ওয়ালিয়া দীন প্রচুর দেখেছি।
আমি ইতি উতি খুঁজি কোথাও কি মানুষের মতো হিংসা করার ধর্মকে খুঁজি। মন্দির খুঁজি মসজিদ খুঁজি। প্রাণীকুল তার বোঝেনি কিছুই। এরা বুঝে তার বেঁচে থাকবার কাজ করে চলা। আর যে বরফ অথবা অনল অগ্ন্যুৎপাতে এসবে তাদের কালধর্মের আঙ্গিক মেলে ধরে। আমিই তা বৃথা খুঁজি হেথাহোথা অনর্থকের নামে…

নূহের বন্যার আগে

নূহের বন্যার আগে আরও আরও কতো মহপ্লাবনের স্বাদ পেয়ে গেছে ভূমি। কতোবার হিমালয় গলে গলে গেছে সূর্যের উত্তাপে। যখন থিয়ার সাথে ধাক্কা লেগে গেল — তৈরি হলো চাঁদ, তখন প্রবল বন্যা পৃথিবী ডুবিয়ে দিল — ভেসে গেল প্রাণীকূল, ডুবেছে উদ্ভিদ। আমিও তাদের সাথে ভেসে ভেসে একসময় আটকে পড়ি কোনো এক হিমালয় চূড়ার কিনারে — চাঁদের মায়ায়।

পপলার বন মরে পড়ে আছে

পপলার বন মরে পড়ে আছে। ওক গাছেদের ভীড়ে হেঁটে চলি। শত বছরের আয়ু কারও কারও, কেউ হাজার কিংবা লক্ষ বছর ঠায় দাঁড়িয়ে। কেউ ঢলে পড়ে কেউবা আবার শীলীভূত আর ফসিল হয়েছে। এখানে শীতের ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে হিমালয়ে। কিছু লোমঅলা কিছু রোমহর্ষক, প্রাণীর চেহারা মাঝে মাঝে উঁকি মারে। বরফ জমছে বরফ গলছে — সময় গলছে, জমছে লাভার স্রোত।

হেঁয়ালীর ধূমকেতু

হেঁয়ালীর ধূমকেতু উড়ে যাচ্ছে আকাশের প্রান্ত ধরে সে কোন্ দূরের দিকে। অগ্নিগোলক ছোটে জ্বলজ্বলে রকেটের বেশে যুগান্তরের সংবাদ বয়ে নিয়ে যায়। ওলাবিবিদের দিন চলে গেছে, জ্বীনপরীদের ছমছমে রাত আমাদের রোমকূপে শিহরণ আর আনবে কি আনবে না — হেঁয়ালীর ধূমকেতু দিক থেকে দিকে সময়ের ঘূণপোকা হয়ে ঘোরে, দাগ রেখে যায়।
হিমালয় থেকে বরফেরা নেমে আসে ব্রহ্মপুত্র নদে, পদ্মার বিস্তীর্ণ চরে হাওয়া খায় ‘হাঁসুলী বাঁকের ইতিকথা’। দিন চলে গেলে নশ্বর শরীর যথা বিলীন হবার পথে প্রাণীকুল নদীপথ, এ বিচিত্র ধরাতল সার বেঁধে এগিয়ে চলেছে। কেবল কালের ধারা মেনে চলে চাঁদের ঘূর্ণন আর হেঁয়ালীর রাঙা জ্বলজ্বলে ধূম্রশলা।

আর্কিয়ান অধিযুগে

এখানে জীবন শুরু হবে একদিন
আর্কিয়ান অধিযুগে লাভা স্রোত ধারা
কিছু জল কিছু স্থল ভাগ নিয়ে লীন
টিমটিমে অক্সিজেন পাগলের পারা

এখানে জীবন শুরু হবে কোনো কালে
কিছু ক্ষুদ্র অনুজীব আলো খেয়ে বাঁচে
বাতাসে বিষাক্ত বায়ু শীতের সকালে
কেউ তবু শুরু করে সূর্যের আনাচে

এ যেন স্বপ্নের ঘোর আগ্নেয়গিরির
কোথাওবা মাটি ভেদ করবে উদ্ভিদ
এখানে অযূত বর্ষ এভাবেই স্থির
আমি নই শিলাখণ্ড ভূমিতত্ত্ববিদ

কেবল প্রথম জীব জন্মের উৎসবে
কতো মহা আয়োজন ঘটে পৃথিবীতে
নিজেকে করবো সাক্ষী আছি এই ভেবে
বায়ুবিষে পর্যুদস্ত আর কাঁপি শীতে

থামে না তবুও চলা অমোঘের টানে
জীবনের লুব্ধকর অনন্ত আহবানে

যেদিন প্রাণের জন্ম

যেদিন প্রাণের জন্ম পৃথিবীতে হবে
নিশ্চয় সে শুক্রবার দিনে দেখে শুনে
অথচ এখানে নেই জ্যোতির্বিদ, তবে
কিভাবে পবিত্র দিন প্রথম জীবনে
স্রষ্টার কৃপার কথা বলবে দু’কানে
এখানে কেবল স্রোতে ভাসছে ভূবন
আর্কিয়ান যুগে সপ্তা থাকে অন্যখানে
লড়াই নিজের জন্যে বাঁচাতে জীবন

আর্কিয়ান যুগে অতো অক্সিজেন নেই
কার্বনডাই অক্সাইডে বাতাসে গরল
জীবন অনন্ত বলে লাভা থেমে যায়
শীতল লাভার স্রোত শীলীভূত তাই
ফাঁদে ভরা পৃথিবীত লাভাও অচল
জীবন যে কেনো ভাবে টিকে থাকতে চায়

মহাকালের যাত্রায়

বটবৃক্ষ গেঁড়ে যায়
ডালপালাসহ শিকড় গজায়
তলা জুড়ে শেকড়ের ভীড় ও আগাছা
ডালে ডালে ভূত আর যতো প্রেতচ্ছায়া

বটগাছ ভাল নয় ততো
বরং ম্যানগ্রোভ হও, ভাসো
ভেসে থাকো
মহাকালের যাত্রায় পদচিহ্ন আঁকো

বুক পেতে দাও ঘূর্ণিঝড়ের হাওয়ায়
উপকূল বেঁচে থাকে ম্যানগ্রোভের মায়ায়

মিশরের মরুভূমি ঘুরে ঘুরে চলা

মিশরের মরুভূমি ঘুরে ঘুরে চলা
হাঁড় কাঁপা হিম শীতে রাতের চন্দ্রিমা
দিনগুলো ক্লান্তিকর লু হাওয়ায় ভরে
বিশ ত্রিশ লক্ষ বর্ষ আগের জমানা

আমার ছায়ার পাশে চিরচেনা ঢেউ
আমি আর ছায়া ছাড়া সঙ্গী নেই কেউ
কতো প্রাণী ঘুরে ফিরে তৃণ কিছু কিছু
রাত আসে শ্বাপদের সাথে আসে ফেউ

হঠাৎ মিলেছে দেখা আত্মীয়েরও বেশী
যেমন সাযুজ্য দেহে তেমনি তার পেশী
কেবল সে খর্বকায় লিলিপুট যথা
প্রাইমেট প্রথম স্বজন ওরা গিবনের জাতি

এদের সমাজ ছিল মিশরের দেশে
বিশ লাখ ত্রিশ লাখ বছরের আগে
এখানে তারাই যতো মানুষের জাত ভাই
রূপান্তর ঘটে ধীরে নরবানরের বেশে

কিছু তারা আফ্রিকায় বিচরণ করে
কেউ সমতলে কেউ গাছের উপরে
আমাকে তাদের মতো বুঝি মনে হয়
একে অপরের দিকে ইশারা ফুকারে


15 Responses

  1. Khaled Hamidi says:

    নতুন, বিজ্ঞান চেতনার কাব্য
    খালেদ হামিদী

    এই ছোট্ট গদ্যের শিরোনামে কি কোনো আতিশয্য আছে? আপনারা কী বলবেন? আমি যতোটুকু জানি, কবির মানসভ্রমণের এমন প্রেক্ষাপট, অন্তত বাংলাদেশের কবিতায়, আর নেই। গঠনপ্রক্রিয়াধীন প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর নানা কালপর্বজোড়া নিজের অবস্থিতির এই কাব্যিক অনুবাদ অভিনতুন। এক কোষী প্রাণীর আবির্ভাবেরও আগে নিজেকে জগতে আবিষ্কারের এই সৌন্দর্য অতুলনীয়। না, জগতের সঙ্গে কবির এই একাত্মতাবোধ নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথ দেহাবসানের পরেও পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণার সাথে মিশে থাকবেন বলে জানান, কবিতায়। এই একাকার ঐহিকতা ভবিষ্যৎমুখী। জীবনানন্দ ‘রূপসী বাংলা’য় বাংলার এমন নিসর্গকে/প্রকৃতিকে আপন সত্তায় গ্রথিত করে নেন যা বাংলা কবিতায় থাকে অদৃষ্টপূর্ব। কিন্তু একই সঙ্গে বিজ্ঞানচেতনার প্রাখর্যে ও জগতের আদি হতে অন্ত অব্দি বিস্তৃত-সঞ্চারিত কবিসত্তার আবেগে-অনুভবে এযাবৎ রচিত হয় কি কবিতা? তাছাড়া উপর্যুক্ত কবিতাগুলোর সাফল্যও এখানে যে, এগুলো প্রায়ই ছন্দে লেখা। তাও, বিশেষত লক্ষণীয়, ছয় ও সাত মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত। অগম্ভীর সাবলীলতায় তিনি বৈজ্ঞানিক নাম ও পরিভাষাগুলোকে কবিতায় এক অভিভূতকর মসৃণতা দান করেন। কেবলই কি তাই? জিললুর লক্ষ-কোটি বছর পরের মানবীয় প্রচল ও ‘অনর্থকতা’কেও সরাসরি অথচ অনবদ্য কাব্যিকতাযোগে কটাক্ষ করেন কেবল নয়, খারিজও করে দেন। সেই সঙ্গে প্রমাণ করেন, প্রকৃত কবি প্রকৃতার্থেই সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত, একই সঙ্গে পথিক, নাবিক এবং এমনকি নভোচারী হিসেবেও, পরিভ্রমণরত থাকেন। জয়তু বিজ্ঞানচেতনার কাব্য।

    • জিললুর রহমান says:

      প্রিয় হামিদী ভাই
      অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং ভালবাসা। এই কবিতাগুলো নিয়ে প্রথম সমালোচনা তো আপনিই লিখেছিলেন

  2. Iqbal Ahmed Khan says:

    আর্টসে কবি জিললুরের কবিতা দেখে ভালো লাগছে। সময়ের ফাঁকে পড়ে নেবো ক্ষন !!

    • জিললুর রহমান says:

      প্রিয় ইকবাল,
      তোমার ভাল লাগবে আশা করি

  3. সঞ্চারী গোস্বামী says:

    অসম্ভব শক্তিশালী লেখা কবি জিললুর রহমানের। এ কবিতাগুলোর শব্দ অন্য মাত্রার।

  4. Iqbal Ahmed Khan says:

    প্রত্নতত্ত্ব,প্রাণীতত্ত্ব,বিবর্তনবাদ,প্রাগঐতিহাকতা,ধর্মতত্ত্ব বিজ্ঞান গুলে যে কাব্যরস স্ফুরিত হতে পারে, তার অনন্য নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় কবি জিললুরের কবিতা গুলিতে। ব্যাপারটা মোটেই সহজ নয়। অথচ কত অবলীলায় ঘটে যাচ্ছে কবির প্রজ্ঞা আর সৃজনশীলতার যৌথ উদ্যোগে।ব্যাপারটা আমি আগেও লক্ষ্য করেছি তার বিভিন্ন কবিতার কাঠামোনির্মাণ কার্যে।

  5. Safayet Saymom says:

    অসাধারণ কবিতাগুলি!!
    এই প্রাগৈতিহাসিকে বিচরণ কবিতাগুলি যতই পড়ি ততই মনে শিহরণ জাগে, বিমুগ্ধ হই, ইচ্ছে হয় ফিরে যাই সেসব যুগে,সেসব দিনগুলিতে।আমিও কোন্ দৈবের দীপ্ত অভিশাপে সাঁতার দিয়ে চলি সাগর উত্তালে
    বছর বত্রিশ কোটির সমকালে, বিচরণ করি পাঙ্গিয়া নামের সে মহাদেশটায়।
    ধন্যবাদ কবি জিললুর রহমান।।

  6. Dhrubo Sadiq says:

    এই কবিতাগুলি আবার পড়তে হবে… একদম অন্যরকম ভালো লাগলো

  7. আখতারী ইসলাম says:

    আমার বরাবরই কবি জিল্লুর রহমানের কবিতা ভালো লাগে কারণ, বিষয়ের বৈচিত্র‍্য।
    এবং এই কবিতা গুলি বার বার পড়তে ইচ্ছে করছে, গভীরতা বুঝতে…
    কতটা ভাবনার গভীরে গেলে, এমন কবিতা লেখা যায়!!
    ভালো থাকবেন।

    • জিললুর রহমান says:

      আমার লেখা ভাল লাগে জেনে প্রীত হলাম। ধন্যবাদ

  8. আশরাফুল কবীর says:

    একগুচ্ছ কবিতা, এই শব্দগুচ্ছের মাঝে আরেকটি শব্দ যোগ করতে চাই- ধারাবাহিক, এটি একটি ক্রনোলজিক্যাল ধারাবাহিক কবিতাগুচ্ছ, খুবই দারুণ কবিতা হয়েছে, অসাধারন এক কথায়! শুভেচ্ছা জানাই সুপ্রিয় কবি জিললুর রহমান ভাইকে চমৎকার এই কবিতাগুচ্ছের জন্য পাশপাশি আর্টসকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা।
    একদম প্রাচীনকাল (ডোভেনিয়ান যুগ) থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কবি তার ক্রাফটসম্যানশিপ “পদ্মার বিস্তীর্ণ চরে হাওয়া” পর্যন্ত ছড়িয়েছেন। এটা শুধু একবার পড়ে চলে গেলাম তাই নয়-কবিতাগুচ্ছের শক্তি আবারো আপনাকে টেনে নিয়ে আসবে পড়ার জন্য। চমৎকার! জীবনীশক্তি এবং কবিতাশক্তি একসাথে এগিয়ে চলুক, এই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.