বইয়ের আলোচনা

পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার: জন্মভূমির মায়াবী মুখশ্রী

লীনা দিলরুবা | 21 Jul , 2019  


জীবনের পান্থশালায় পরিবার যেন নিয়তি নির্ধারিত, এড়াবার উপায় নেই। পৃথিবীর গোশালায় কে-হিন্দু, কে-মুসলমান, কে কোন ঘরে টুপ করে ঢুকে পড়ছে কে বলবে! কোন মাঙ্গলিক ইঙ্গিতে সন্তান জননীকে মা ডাকছে, মাতৃদুগ্ধ পান করছে, কে কোন অঙ্গীকারে মাতৃদায় সেরে নিচ্ছে কে বলবে! সময়ের স্রোত বড় রহস্যময়, সে-কাকে কখন-কোনদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বলা মুশকিল। এসবই ভাবছিলাম পরিতোষ সেনের ‘জিন্দাবাহার’ বইটি পড়তে গিয়ে। পরিতোষ সেন প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রশিল্পী। অথচ এই গুণী শিল্পীর পেছনের দিনের গল্প পড়লে মনে হবে, কীভাবে সম্ভব! বিশাল পরিবার, হুট করে শিশু বয়সেই পিতার মৃত্যুর পর যেন পরিবারটি জীবন-নদীর ভাঙা ভেলায় ভেসে বেড়িয়েছে। বিশ্বজ্ঞানের আঙিনায় জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে বাড়াতে এ-পরিবারেরই একটি সন্তান হয়ে গেল পৃথিবী বিখ্যাত চিত্রকর। দেশে-বিদেশে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী হচ্ছে। যেন রূপকথার গল্পের মত বিষয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ। যুদ্ধে অক্ষ আর মিত্রশক্তির সৈন্য আর সাধারণ মানুষ মিলিয়ে নিহত হয়েছে কয়েককোটি লোক। এক কোণে যখন এ-অবস্থা, তখন অন্য কোণে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের দেশ, নদীপ্রধান, টারশিয়ারি যুগের পাহাড়েঘেরা বাংলাদেশের ঢাকা শহরের জিন্দাবাহার লেনে উনিশ-শ আঠার সালের অক্টোবরের আঠার তারিখে জন্ম হয় এ-শতাব্দীর এক বিস্ময়বালকের, যার নাম পূর্বেই বলা হয়েছে, পরিতোষ সেন। পিতার নাম শ্রীপ্রসন্নকুমার সেন আর মাতা হেমাঙ্গিনী দেবী। পিতার দুই স্ত্রীর (প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করেন) গর্ভে বিশটি সন্তান। পরিতোষ সেন ছিলেন পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভের। বৈমাত্রেয় আর নিজের ভাই-বোন মিলিয়ে বিশজনের মধ্যে সতের নম্বর।

জিন্দাবাহার নামের আকর-গ্রন্থটি লেখা হয়েছে মূলত পরিতোষ সেনের ফেলে আসা ঢাকার বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষ আর ঘটনা নিয়ে। বইতে শুধু জীবনস্মৃতি উঠে আসেনি, তাঁর বহুসত্তা এখানে ঠাঁই নিয়েছে অনুপম গদ্যের আশ্রয়ে। তিনি লিখেছেন তাঁর বিশাল পরিবারকে নিয়েও। পুরোপুরি আত্মজীবনীর ঢং-এ লেখা না হলেও নানান জায়গায় আলো ফেলে আমরা খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছি ব্যক্তি পরিতোষ সেনকে। খ্যাতিমান এই লোকটি বইটি লিখেছেন কোমল স্বরে। তাঁর গদ্যভাষা বইয়ের শ্রী-বৃদ্ধি করেছে অনেক। তাঁর ভাষা অনেকটা ছবির মতোই। বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন ভারতের ইউ.জি.সির জাতীয় অধ্যাপক, ভারতীয় জ্ঞানপীঠ ও সাহিত্য অকাদেমীর উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য, বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব অমলেন্দু বসু। অমলেন্দু বসুর পরিবারেরও আবাস ছিল ঢাকার জিন্দাবাহারে।

ভূমিকায় অমলেন্দু বসু লিখেছেন-

“‘ওবিন ঠাকুর ছবি লেখে।’ ছবি লিখেছেন পরিতোষ সেন-ও। লিখেছেন এমন অকস্মাৎ, কোনো পূর্বাভাস না-দিয়ে এবং সে-লেখায় এমন নিখুঁত মুন্সিয়ানা যে বিশ্বাস হতে চায় না যে এই প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এই প্রথম অনবদ্য শিল্পীসত্তা প্রকাশ করলেন লেখনীর মাধ্যমে।”

লিখেছেন-

“ঢাকা শহরের বাবুর বাজার নামক জনবহুল অঞ্চলে কালীবাড়ির পাশ দিয়ে চ’লে গেছে জিন্দাবাহার লেন (নামের মানে কি জীবন্ত, প্রাণবন্ত সৌন্দর্য? ), সে-রাস্তার প্রায় শুরুতেই ছিল পরিতোষদের পৈতৃক বাড়ি, তার লাগাও ছিল আমাদের ভাড়াটে বাড়ি। এই রাস্তায় কয়েকটি বিদগ্ধ পরিবারের আবাস ছিল, তার মধ্যে ছিল মণীশদার (ঘটক) শ্বশুরবাড়ি, শ্রীনগরের জমিদারবাড়ি, পরবর্তী কালের খ্যাতনামা সাধক পরমানন্দ সরস্বতীর বাড়ি ৷ আবার এ রাস্তারই এক শাখায় ছিল একটি গলিতে বারাঙ্গনাপাড়া, এই বারাঙ্গনাদের কিছু বাকচিত্র পরিতোষের নিবন্ধগুলিতে আছে ৷”

যাদের বাড়ির আঙিনায় কোনোদিন কোনো তুলির রেখা পড়ে নি, আয়ূর্বেদই যাদের কাছে ছিল শিল্প, তাদের জীবন কীভাবে ক্যানভাসে পরিণত হয়! কোনো কলাই যে-পরিবারে আশ্রয় গাড়েনি তাঁদের সন্তানের পক্ষে কীভাবে এত সব সম্ভব! প্রশ্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তাঁর এক দিদি বেসুরো গলায় গান করতেন, ওস্তাদের কাছে শিখেছিলেন খানিকটা। সেন পরিবারে সঙ্গীতকলা বলতে এটুকুই। অন্যদিকে ললিতকলাও ‘উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ’ গোছেরই। বাড়িতে দেবদেবীর বাঁধানো কিছু ছবি আর ছিল উৎকট রঙের বড়ো পুতুল, তা আবার ঝুলে ঢাকা। তবে কী করে! বস্তুতপক্ষে, জীবনের রহস্য যদি আমরা বুঝেই যেতাম তবে তো সব কিছুরই মীমাংসা হয়ে যায়, এর গূঢ় আচরণ বোঝা যায় না বলেই মানুষ সম্পর্কে শেষ কথা বলা যায় না।

পরিতোষ সেন উনিশ-শ চল্লিশ সালে ভারতের প্রখ্যাত ভাস্কর-চিত্রকর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর অধীনে চিত্রবিদ্যা শিক্ষালাভ করার মাধ্যমে মাদ্রাজের সরকারি আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। উনিশ-শ ঊনপঞ্চাশ সালে চলে যান ইউরোপে। পরে দেশে ফিরে কলকাতার রিজিওনাল ইনস্টিট্যুট অব প্রিন্টিং টেকনলজিতে ডিজাইন অ্যান্ড লে-আউটের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। দেশ-বিদেশে তাঁর পয়ত্রিশের মত একক এবং যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী হয়েছে। চুয়ান্ন সালে প্যারিসে হয় একক-চিত্রপ্রদর্শনী। উনিশ-শ উনাশি সালে মস্কোয় হয় তাঁর আরেকটি একক-চিত্রপ্রদর্শনী। পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোর সঙ্গে তাঁর স্টুডিওতে সময় কাটিয়েছিলেন পরিতোষ সেন। সেদিন পিকাসোর সেক্রেটারি তাঁকে মিনিট পনেরোর মত সময় দিয়েছিলেন। পিকাসোর সঙ্গে দেখা করতে পরিতোষ সেন নিজের কয়েকটি ছবি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন, পরিতোষ সেনের ছবি দেখে পিকাসো তাঁকে বলেন, ‘Sabertes (পিকাসোর সেক্রেটারি) আমাকে ফোনেই বলেছিল যে আপনার ছবি খুব সুন্দর। আমার চোখেও ঠিক তাই মনে হচ্ছে!’ তারপর আবার বলেন, ‘আপনি ঠিক পথেই এগুচ্ছেন। আপনার মিশ্রিত রঙের ব্যবহার খুব সুন্দর, ছবির গঠনগাঠনেও বেশ মুন্সিয়ানা আছে। ফর্মের দিকে সর্বদা খেয়াল রাখবেন।’ কিসের পনেরো মিনিট! তারপর পিকাসো ঘুরে ঘুরে তাঁর নিজের আঁকা ছবি দেখান। তাঁরা আলাপ করেন চিত্রকলার নানান বিষয় নিয়ে। পিকাসো পরিতোষ সেনকে প্যারিসে ছবি প্রদর্শনী করারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে আসবেন বলে সে আহ্বানে সাড়া দেননি, যদিও এ নিয়ে পরে ভীষণ আফসোস করেছিলেন। এসবই পরিতোষ সেন লিখে গেছেন তাঁর, আবু সিম্বাল, পিকাসো ও অন্যান্য তীর্থ গ্রন্থে।

পিতা প্রসন্নকুমারের পেশা ছিল কবিরাজি। লেখক বলেছেন তাঁর পিতার আয়ূর্বেদশাস্ত্র ছিল কণ্ঠস্থ। রোগী পরীক্ষার সময় তিনি সুশ্রত, চরক, বাগভট, চক্রপাণি দত্ত থেকে রোগ সম্পর্কিত উপযুক্ত শ্লোক আওড়ে যেতেন। কঠিন রোগের রোগী তাঁর কাছে এসে সুস্থ হয়ে যেত। পুরুষানুক্রমে এটি ছিল তাঁদের প্রায় আড়াইশো বছরের বৃত্তি। প্রসন্নকুমার ঢাকার নবাব বাড়িতেও রোগী দেখতে যেতেন, তখন সঙ্গে যেত তাঁর শিশুপুত্র পরিতোষ। নবাববাড়ির নবাব অসুস্থ, পিতার সঙ্গে এক অগ্রজসহ সেখানে গমন করার অভিজ্ঞতা লেখক জিন্দাবাহারে এভাবে লিখেছেন-

“অর্ধশায়িত অবস্থায় নবাব মখমলে-মোড়া, বিশাল তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে আছেন। নবাব-বাদশাহদেরই এমন চেহারা হয় বটে। বেদানার মতো গোলাপী গায়ের রঙ। নীল টানা চোখ আর কটা চুল। হাতে আতরে-ভেজা রেশমী রুমাল! সেটি মাঝে-মাঝে নাকের ডগায় তুলে ধরছেন। তার সুবাস ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর শরীরটি একটি দামী কাশ্মীরী শালে ঢাকা। জ্বর হয়ছে কি? ঐ অবস্থায় ডান হাতটি ইষৎ তুলে তিনি বাবাকে সশ্রদ্ধ আদাব জানালেন! চোখ বুজে বাবা নবাবসাহেবের নাড়ী পরীক্ষায় মনোনিবেশ করলেন।”

পরিতোষ সেনের পিতা প্রসন্ন কুমারের মেজাজ ছিল কড়া। বইতে পিতা বিষয়ে দুটি অধ্যায় লিখেছেন লেখক। দুটোই আকর্ষণীয়। সবচেয়ে মুগ্ধ করার মত ছিল পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মুখাগ্নির অংশটুকু। পরিতোষ সেন তখন নিতান্তই বালক। হঠাৎ করেই বিশটি সন্তানের পিতা, যাদের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠজনের বয়স মাত্র দশমাস। প্রসন্নকুমারের আত্মা ধরাতল থেকে চলে গেছে ঊর্ধে, হিন্দু রীতিতে শবমুখে অগ্নির সংযোগ ঘটিয়ে মৃতদেহকে মুক্তি দেয়া হবে। বালক পরিতোষ সেনের বোধগম্যতার মধ্যে তখনো মৃত্যু বিষয়টি ছায়া ফেলেনি। কিন্তু চারদিকের অবস্থা দেখে তার ছোট্ট হৃদয়টি ভেঙে খান-খান হয়ে গেল। পিতার শরীরে আগুন দেয়া হয়েছে। সেই আগুনের লাল যেন বহুবছর পরও লেখককে পুড়িয়ে মারছে। এই অংশে তিনি লেখেন-

“তার হাঁ-করা মুখের গহ্বর থেকে এবার-একটা নয়, সাত-সাতটা-আনাভিলম্বিত লকলকে জিভ যেন রক্তের সাতটা পাহাড়ী প্রস্রবণ। তার ভয়ংকর মুখমণ্ডল-চুল থেকে নিয়ে জিভের ডগা পর্যন্ত সবটাই যেন পৃথিবীর তাবৎ লাল রঙের মিলনক্ষেত্র। রক্তজবার লাল, রক্তকরবীর লাল, পলাশের লাল, শিমুল ফুলের লাল, কৃষ্ণচুড়ার লাল, রঙ্গনের লাল, রডোডেনড্রনের লাল, বকুল-বটফল-লিচুর লাল, শীতের বাদাম পাতার লাল, তরমুজের লাল, আবির-আলতার লাল, স্বর্ণসিন্দুর মকরধ্বজের লাল, মোরগের ঝুঁটির লাল, টিয়েপাখির ঠোঁটের লাল-আরো যে কত রকমের লাল, তার হিসেব কে করে! পৃথিবীর সব ইস্পাত কারখানার ফার্নেসের পুঞ্জিত উত্তাপে যেন লালের নির্যাস তৈরি হচ্ছে। আমার পলক পড়ছে না। আমি স্বপ্নাবিষ্ট, অর্ধ-অচৈতন্য।”

সেই সময়ের জিন্দাবাহারের ‘দর্জি হাফিজ মিঞা’, সিন-পেণ্টার জিতেন গোঁসাই’ দুটি চরিত্র নিয়ে লিখেছেন লেখক। বহুবছর পর এদের নিয়ে লিখতে গিয়ে গভীর ভালোবাসায় লেখকের মন আক্রান্ত হয়েছে। যেন এক অনিঃশেষ শুভবোধে প্রশান্ত মন নিয়ে চরিত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকিয়েছেন লেখক। এই দুই ব্যক্তি তাঁদের বৃত্তি এবং আচরণ দিয়ে বালক পরিতোষ সেনের হৃদয়কে উত্তেজনায় ভরিয়ে তুলেছিল। এরকমই আরো কয়েকজন ‘ডেন্টিস্ট আখতার মিঞা’ জামিলার মা’। তবে দর্জি হাফিজ মিঞা আর সিন-পেণ্টার গোঁসাই যেন ছোট্ট বালক পরিতোষ সেনের মগজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল রং, ক্যানভাস আর মাপজোখের বিষয়টি। দর্জি হাফিজ মিঞা থাকতেন তাদের বসতবাড়িরই নিচতলায়। যার কাজ ছিল সেলাই করা। মূলত দর্জির কাজ করলেও তাঁর নেশা ছিল পায়রার নেশা। অবসরে কবুতর নিয়েই মেতে থাকতেন তিনি। আর বালক পরিতোষ সেন দর্জির আচরণের আর জীবনযাপনের রকমসকম দেখা নিয়ে যেন ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করতেন। দর্জি হিসেবে হাফিজ মিঞার হাত ছিল দক্ষতায় ভরা। একবার নবাব বাড়ির এক সদস্য দর্জির কাছে একটা কোট সেলাই করতে আসেন, দর্জি নির্বিকারভাবে তার শরীরের মাপ না নিয়েই স্রেফ কাপড়টি হাতে নিয়ে তাকে বিদেয় করে দেন। বালক পরিতোষ তো অবাক! মাপ না নিয়ে কীভাবে কোট বানানো হবে। আর যদি মাপ ঠিক না হয় তবে নবাবপুত্র দ্বারা দর্জি কোন বিপদে পড়েন সেই উত্তেজনায় যেন পরিতোষ সেন ঘুমাতে পারেন না। দেখা গেল নির্দিষ্ট দিনে সঠিক মাপে এবং আকর্ষণীয়ভাবেই কোটটি তৈরি করা হয় এবং নবাবপুত্রকে সেটি বুঝিয়ে দেয়া হয়। নবাবপুত্রের বিস্ময়ের শেষ নেই, অবাক আমাদের লেখকও। দেখলেন নবাবপুত্র দর্জিকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘কামাল কামাল! গজব, গজব!’

‘সিন-পেণ্টার জিতেন গোঁসাই’ বলে লেখক যাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তাঁর কাজ ছিল থিয়েটারের সিন-সিনারি আঁকা। একবার এই সিন-সিনারি আঁকার সিনটি সঠিকভাবে বলে দিতে পেরেছিলেন বলে জিতেন বাবু পরিতোষ সেনকে বলেছিলেন, ‘তোর হবে।’ জিতেন বাবুর দোকানটি ছিল বাবুরবাজার-ইসলামপুরের কাছে। ছবি আঁকার হাত ছিল অসামান্য, তিনি গানও করতেন। এসব বিষয়ে তাঁর মুগ্ধতার কথা লেখক সবিস্তারে লিখেছেন। পরিতোষ সেন একদিন দোকানে গিয়েছেন, দেখলেন জিতেন গোস্বামী আধবোজা চোখে গাইছেন –

আমার কুল গাছে লেগেছে বসন
দাঁড়া দিদি, দাঁড়া লো
পোড়ারমুখো কোকিল এসে
কুঁহু-কুঁহু করে লো।

বইতে তৎকালীন ঢাকার একটি চিত্ররূপ খুঁজে পাওয়া যায়। হিন্দুদের জন্মাষ্টমী মিছিল, নবাবপুরের ‘বড়ো চৌকি’ মিছিলের বিবরণ, যা ভাষার নানান ব্যঞ্জনায় মুখর, পড়লে মনে হবে লেখক যেন টাইম মেশিনে শব্দের ভেলায় চড়িয়ে পাঠককে প্রায় আশি-নব্বই বছর আগের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঢাকায় নিয়ে গেছেন।

জিন্দাবাহার লেনে পরিতোষ সেনদের পৈত্রিক বাড়ির পাশেই ছিল বারাঙ্গনাপাড়া। লেখকের কলমে বারনারীদের কথা উঠে এল এভাবে –

“আমাদের পাড়ার বারবনিতারা প্রতিদিন সকালে দল বেঁধে বুড়িগঙ্গায় স্নান করতে যায়। তাদের স্নানে যাবার পথটি আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই। ভেজা কাপড়ে ফেরবার পথে কালীমন্দিরের দরজায় প্রণাম ক’রে আমাদের গলির মুখে আবার দেখা দেয়। সকালবেলার এই মনোরম দৃশ্যটি আমাদের পাড়ার পুরুষদের চোখকে তৃপ্তি দেয়। তাদের মন-মেজাজ খোশ রাখে। দিনটি ভালো রাখে।”

পরিতোষ সেনদের গ্রামের বাড়ি ঢাকার কাছে মুন্সিগঞ্জে। গ্রামের বাড়িতে ভ্রমণের বর্ণনায় আমরা দেখেছি চিরায়ত বাংলার অরণ্য, প্রকৃতি, জগৎ, জীবন উঠে এসেছে অপরূপভাবে। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে, জীবনানন্দের কবিতায় যে প্রকৃতির দেখা মেলে পরিতোষ সেন সে প্রকৃতিকেই মেলে ধরলেন স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থের কালো অক্ষরে। সাহিত্য আর প্রকৃতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। জীবনস্মৃতির সবকিছুই ঢাকা শহরকেন্দ্রিক ছিল না, নাগরিক জীবনের ব্যাসকূট ছাড়িয়ে গ্রামের মাঠ-জলাশয় তাঁকে আবিষ্ট করে রাখত। স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে সেই সুষমাও তিনি পাঠকের কাছে উন্মোচন করেছেন।

‘হে অর্জুন’ লেখাটিতে তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন একটি বৃক্ষের সঙ্গে। যে বৃক্ষ ছিল তাঁর সহোদরের মত। বৃক্ষটিকে নিয়ে তিনি লিখেছেন-

“‘সর্ব্বং মনোরমা’—অর্থাৎ যে-মূর্তির প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ বেশি সরুও নয়, আবার বেশি মোটাও নয়। বেশি লম্বাও নয়, আবার বেশি খাটোও নয়, কেবল এমনই শাস্ত্র মানসম্পন্ন মূর্তিকেই নাকি ‘রম্য’ বলা যায়। দশ লাখে মাত্র একটি এমন চোখে পড়ে। ‘তৎ লগ্নম হৃদ’ হৃদয়কে জয় করে এমন জিনিস মনোরম হতে পারে কিন্তু সত্যিকারের ‘অনুপম’ হতে হ’লে তাকে ‘শাস্ত্রমান’ হতে হবে। ‘বাক্যম রসাত্মকম কাব্যম।’ অর্থাৎ শিল্প তখন সৃষ্ট হয় মূর্তিতে ‘রস’ তার আত্মারূপে প্রবেশ করে। অর্জুন গাছটাকে দেখে এমন কত কথাই যে মনে আসে তা কোনোদিন ব’লে শেষ করতে পারব না।”

নিজের দেশ ছেড়ে চ’লে গেছেন। প্রিয় সেই অর্জুন বৃক্ষকে ছেড়ে অন্যদেশের নাগরিক হ’য়ে এবং বৃক্ষটির অবস্থানের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে লেখকের হৃদয় কতোটা কাতর, নিচের লেখায় সেটি অনুধাবন করা সম্ভব-

“হে তরুবর! প্রায় অর্ধশতাব্দী হ’ল তোমাকে দেখিনি। আজ তুমি পরদেশী। তুমি এখনো আছ কি নেই, কে জানে? জনবিস্ফোরণের চাপে, মানুষের প্রয়োজনে, তুমি হয়তো হয়েছ বিসর্জিত। তোমার পাদপীঠের ওপর দিয়ে হয়তো তৈরি হয়েছে নতুন রাজপথ। একদিন তৈরি হবে কলকারাখানাও। ভোরে সোনালী আলোয় যেখানে দেখেছি তোমার মণিমুকুট, সেখানে উচিয়ে থাকবে একদিন দৈত্যের মতো তার বিরাট চিমনি। কালো-কালো বিষাক্ত সাপের মতো অনর্গল ধোঁয়া পাকিয়ে-পাকিয়ে উঠে লাপিস-লাজুলির মতো স্বচ্ছ নীল আকাশটাকে ক’রে দেবে অন্ধকার।”

অর্জুন বৃক্ষকে নিয়ে লেখার শেষে পরিতোষ সেন জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার আশ্রয় নিয়েছেন। লিখেছেন-

“হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘ-নিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি, হে হিম হাওয়া আমাকে জাগাতে চাও কেন।”

পরিতোষ সেনের যেমন, জীবনানন্দের আদি-বাড়িও ছিল মুন্সিগঞ্জে। জীবনানন্দের কবিতার প্রতি গভীর অনুরাগে পরিতোষ সেন লিখেছেন-

“তার কথা মনে এলে আমি আজও কীরকম ছন্নছাড়া হয়ে যাই। যেন অনেক দূরে, এক জনহীন অজ্ঞাত জগতের, উদাস, অপরূপ এক বুনো সৌন্দর্যের মধ্যে যেখানে জীবন এনে দেয় এক মুক্তির স্বাদ আর আনন্দের অনুভূতি।”

বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চ’লে গেছেন দু’জনই। আজ তাঁরা অন্যদেশের নাগরিক। অদ্ভুত কাকতাল হ’ল, পরিতোষ সেন এবং জীবনানন্দ দাশ উভয়ের মৃত্যুদিবস একইদিনে। বাইশে অক্টোবর।


1 Response

  1. খুব সুন্দর লাগল লেখাটা৷ যদিও গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা, তবু মনের মধ্যে একটা ঘোর লেগে গেল তাধিন তাধিন৷ আমার চিরদিন মনে হত যে জিন্দাবাহার লেন-এর সঙ্গে বারাঙ্গনা পাড়ার একটি অতি নিকট আত্মীয়তা আছে৷ আজ পরিণত বয়সে এসে মনে হল যে যিনি এ নামটি দিয়েছিলেন তাঁর মত রসিক হওয়া খুউব মুশকিল৷ শুধু শব্দে তার অভিনবত্ব নেই, আঁকা ছবিতে আছে, ছবির রঙেও আছে৷ মানে শব্দটা শুনলেই যে “ভিশুয়াল” চোখে এসে ঠেকে৷ শুনলেই যেন একটা নকশী কাঁথার নকশার কথা মনে হয়৷ আর ওই রসিকের প্রতিপত্তিও বেশ ছিল মনে হয়, নইলে লোকে তাঁর কথা মানবেই বা কেন আর সেই অনুযায়ী পাড়ার ওই নামটাই বা নথিভুক্ত করবে কেন৷
    পরিতোষ সেনকে একসময় আকছার দেখেছি – বহু জায়গায়, বহু সেমিনারে৷ শিল্পীদের কাছে একটা বটগাছের মত ছিলেন৷ আমি যেহেতু বেরসিক, তাই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে সাহস পাইনি কখনও৷ শেষ বয়সটা কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু মনোবল ছিল খুব দৃঢ়৷ সেজেগুজে আসতেন সভা সমিতিতে খুবই, কিন্তু বড় সাদাসিধা মানুষ ছিলেন৷
    প্রসঙ্গত বলি, মনীশদা নামে যাঁর কথা বলা হয়েছে, তিনি ঘটক, ঘঠক না৷ একটু শুধরে দেবেন, নইলে আবার ঠোকাঠুকি লেগে যাবে৷ তাঁর কন্যা মহাশ্বেতা দেবী, তাঁরই ভাই ঋত্বিক ঘটক৷ মনীশ ঘটকের “পটলডাঙার পাঁচালী” তরুণ বয়সে ভারি অদ্ভূত লেগেছিল৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.