গল্প

রুখসানা কাজল-এর ৪টি অণুগল্প

রুখসানা কাজল | 23 Jul , 2019  


চিত্রকর্ম: ভালেন্তিনো কিহানো মায়েক্কেল
জমিলা ১
দুই দোকানের মাঝখানে একফালি খালি জায়গা। আশেপাশের দোকান মালিক-কর্মচারী, ক্রেতা পথচারীরা সকাল বিকাল খাল্লাস হয় সেখানে।
একদিন সকালে দেখা গেল সেখানে একটি হোগলাঘর। নীল পলিথিনে ছাওয়া। রাতারাতি হোগলাঘর এলো কোত্থেকে ?
রে রে করে ছুটে আসে নুরুমিয়া আর ঠান্ডুকাজি, কে কে এই কে আছিস এখানে। দেখি তোর বদনখান বার কর তো একবার !
হোগলা ঘরের কানি তুলে বেরিয়ে আসে জমিলা। পেছনে এক কিশোর। জমিলার দেওর লিকলিকে জব্বার। চাটাই বিছানায় ছেঁড়া কাঁথার টুকরোয় ঘুমুচ্ছে পাঁচ বছরের ছেলে জুম্মন। হাঘরে, অভাবী, স্বামীহীন তরুণী বিধবা জমিলা। ছেঁড়াফাটা আঁচল মাথায়। ভয়হীন টনটনে গলায় বলে উঠলো, বড়কাজী থাকতি দিসে এহেনে ! কি কবেন আপনারা কয়ে ফ্যালান!
ভেটকে যায় ঠান্ডুকাজী। পেছন হটে নুরুমিয়া। কেস ইজ ইলা বিলা কিলা। ঠান্ডুর ঘর কা মামলা।
মাথার টুপি খুলে তার গর্তে ফুঁ দিয়ে আবার মাথায় পরে নেয় বিব্রত ঠান্ডুকাজী। তারপর চলে যেতে যেতে ভাবে, খচ্চরের খচ্চর হারামখোর বড়ভাই। কেমনে দখল করে নিল জায়গাটুকু ! কিন্তু ঘর তুল্ল কখন ? মাঝ রাত্তিরে নিশ্চয়! বাজারের কেউ তাকে জানালো না ! আর মাগীর চিত্তির দেখো ! কেমন ধনুকের মত শরীর বেঁকিয়ে বুক উঁচিয়ে মুখিয়ে আছে। লজ্জাশরম মধুমতির পানিতে ধুয়ে খাইছে হারামজাদি !
নুরুমিয়ার শ্লথ শরীর অনেকদিন পর টানটান হয়ে যায়। কি ফিগার মাইরি ! বুক দুটো দেখো! যেন জোড়া কালনাগিনী ! ফণা তুলে কাঁপছে। আহহা কি গড়ন ! যেন ডাকছে, ওরে আয় আয়, আমারে চরে খা—
ঠান্ডুটা মহা গাড়ল ! মেয়েমানুষ বোঝে ছাই। জমিজিরেতের ধান্দাবাজী ছাড়া আর কিছুই বোঝে না আখুন্দা বেটাটা ! মেয়েমানুষের শরীরেও হাত দিয়ে জমিজিরেতের মাপজোক করে, জল ছানে, মাটি ভাঙে, ফসলের দানা টিপে লাভক্ষতির হিসাব মেলায়। ঠান্ডুর বউ উড়োধরা দুপুরে আলাঝালা মন নিয়ে ঝুল বারান্দায় একা বসে থাকে। নুরুমিয়ার বুক ফেটে যায় তা দেখে!
জমিলা আর জব্বারকে কাজ জুটিয়ে দেয় নুরুমিয়া। নিজেরসহ কয়েকটা দোকানের ঝাড়পোঁছ, জলটানা, চা দেওয়ার কাজ। জব্বার তো রাতদিন নুরুমিয়ার দোকানেই পড়ে থাকে। সারাক্ষণ টিভি চলে সে দোকানে। ড্যাবডেবিয়ে টিভি দেখে আর অন্যদের ফাইফরমাস খাটে ! জুম্মানও টিভি পোকা। চাচার সাথে দোকানেই ঘুমোয়। খায়। চাচার হাতুয়া হয়ে কাজ করে দেয়।
কোনো কোনো রাতে হোগলাঘরে নুরুমিয়াকে হিসহিসিয়ে পেঁচিয়ে ধরে জমিলা। স্বামী হারানো, ভিটেমাটি জমি হারানো জমিলা বুঝে গেছে, তার শরীর বড় অমূল্য জমিন। তাই কড়ায়গণ্ডায় আদায় করে নেয় শরীর জমির খাজনা। যার কিছু নেই তার আবার লজ্জা, ভয়, ইজ্জতের বালাই ! বাঁচতে হবে। বাঁচাতে হবে যে !
মাঝে মাঝে নুরুমিয়া পেরে ওঠে না। গালি দেয়, রেন্ডিমাগী ! পেটে নাই ভাত, শরীল য্যান আগুনের খামার !
অন্ধকারে হাসে জমিলা, আর তুই? তোর বাপ ভাই বন্ধুরা ? তারাও যে আগুন তাপাতে আসে রাতের কোনো কোনো সময় ! তার বেলা ? তারা কি ? রেন্ডিচাটা ?
নুরুমিয়ার মোক্ষম জিনিসটা চেপে ধরে জমিলা, এক পয়সা কম দিছেন তো ভালো হবে না কিন্তুক রেন্ডিচাটা নুরুভাইজান!

হালিমা ২
মুন্নুমিয়ার মুদি দোকান লাগোয়া ছোট্ট গুদামঘর। তার বারান্দায় ঠাই নিয়েছে ওরা। আজ নিয়ে চারদিন হলো। স্বামী স্ত্রী, একটা ল্যাদা বাচ্চা। দোকানের স্থায়ী কর্মচারী ইমান আলির দয়ার শরীর। তাড়িয়ে দিতে গিয়ে ভাবে, থাকুক না হয়। কতদিন কত বর্ষা বাদলে কত কুকুর বেড়াল উঠে আসে। থাকে অই বারান্দায়। আর এরা তো মানুষ !
মাঝে মাঝে সুর করে কাঁদে বউটা । সেই সুরে মিশে থাকে ছেলে হারানো, ঘর হারানো, উঠোন হারানোর দুঃখ। স্বামীটা সারাদিন কাজ খুঁজে হয়রান। ছুটকো ছাটকা কাজ করে যে চুটকি টাকা পায়, দুটি রুটি ভাজি কিনতেই শেষ হয়ে যায় সব।
গেলো বিকেলে অজু করতে এসে ইমান আলি বলেছিল, মিয়ার বেটা শুনো ত দেহি। তুমারে কিডা কইছে টাকা দিয়ি সবকিছু কিনা যায়! একবার আইসো আমার কাছে। স্বামী ইস্তিরি তুমাগো একটা না একটা কাজ জুটায়ে দিবানি ইনশাল্লাহ।
কথামত গুদামঘরের পেছনের দরোজা সামান্য খুলে দেয় ইমান আলি। সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে ছোরাব। অন্ধকার ছাওয়া মাখা একটা কোণ দেখিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে বলে ঈমান আলি চলে যায় দোকানের সামনে। সেখানে কয়েকজন কাস্টমার চাল, ডাল তেল নুনের নিত্য দাম বেড়ে চলায় সরোষে সরকারের মুন্ডুপাত করছে।
সেই মুন্ডুপাত শুনতে শুনতে হঠাত গন্ধ পায় ছোরাব। নাকের পাটা ফুলে ওঠে ওর । চাল, ডাল, আটার গন্ধ ছাড়িয়ে ছোরাবের নাকে আসে নুন নুন, কটা কটা গন্ধ। গাল ভেঙ্গে মুখ ভরে আসে টকনুনতা জলে। জিভ ডুবে যায় সেই নোনা সাগরে।
দুঃখ কষ্ট অনাহারে গর্তে ঢোকা চোখে হাজার পাওয়ারের আলো জ্বেলে ছোরাব খুঁজতে শুরু করে নুনের বস্তা। আঙুলের নোখ ডাবিয়ে দেয় একেকটা বস্তায়। অবশেষে পেয়ে যায়। নিমিষে দাঁত বসিয়ে ফুটো করে চুষতে শুরু করে নুনের বস্তার এক কোণ।
গেলো পাঁচদিন তারা নুন ছাড়া। নদি ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে নেমেছিল ছোরাব। পথ কেড়ে নিয়েছে আড়াই বছরের ছেলে রুস্তমকে। ছমাসের মেয়েটা বেঁচে আছে মায়ের দুধ খেয়ে। কিন্তু খাবার না পেলে বুকে দুধ আসবে কোথা থেকে! অচেনা শহর, অচেনা মানুষজন । সে চাষাভুষো জনমজুর। শহরের কাজকাম কিছুই জানে না। বউয়ের পায়ের গোছা দুহাতে চেপে ধরে ছোরাব, একবার যা তুই। লক্কি বউ আমার। মাইয়েটাও যে মরি যাবিনি না খায়ি ! ও বউ আমাগের তুই বাঁচা বউ।
সন্ধ্যা গায়ে জড়িয়ে পেছনের সেই দরোজা দিয়ে ছোরাবের বউ ঢুকে পড়ে গুদামঘরে।
ইমান আলী কয়েকটা বড় বড় ঠোঙ্গা দেখিয়ে বলে, আয়, বস ইখানে। দেখতি পাতিছিস ঠুঙ্গাগুলান? সব তোর ! তয় নেবার আগি তোর গুদামঘরের দরোজাখান খুলি দেখা ত সোনা, দেখি, কেমন মালসামান মজুত রাখিছিস সেখেনে!
হালিমা ওর গুদামঘরের শাড়ি ব্লাউজ, সায়া খুলে হাসে, সব নিতি চাও নাকি মিয়া? দিবানি। তয় বুকদুডোতি কিন্তু হাতমুখ দিবার দেবো নানে। বাচ্চাডার জন্যি দুধ জমা রাখিছি সেখেনে!
আধো আলোয় ইমান আলির চোখ জ্বলে ওঠে। হালিমাকে কাছে টেনে নীরব হাসি ছড়িয়ে দেয়, বলদ মেয়েমানুষ ! আগাগোড়া না দিয়ি তুই যাবিনি কোহানে ও ময়না!
গুদামঘরের ফ্লোরে শুয়ে পড়তে পড়তে হালিমাও হাসে। বুক খোলা হাসি, আবাল ব্যাটা, মায়ের দুধের কি শেষ আছে, না থাকে ! যত খাবো ততো বাড়ি যাবিনি। তয় আমার মরা ছেলে রুস্তমের কসম, শুরেরবাচ্চা ঈমান আলি তোরে আমি এই দোকান ছাড়া করবানিই করাবানি।
ইমান আলি জানেনা আজ দুপুরেই মুন্নুমিয়া এসে ঘুরে গেছে। বাচ্চাটা তখন দুধ খাচ্ছিল আর মায়ের বুক নিয়ে খেলছিল আপনমনে। ফল্গু নদীর ভেজা বালির মত চিকচিক করছিল খোলা বুক। তিরতির জল উসকে পড়ছিল বুকের চরে। মুনুমিয়ার তৃষ্ণার্ত মুখ দেখে বুক ঢাকতে মাথার কাপড় টানাটানিতে যে সে অবস্থা !
মুন্নুমিয়া চলে গেছে ঠিকই। চোখদুটো রেখে গেছে হালিমার ঠিক বুকের উপর।

মোতিমালা ৩
নুনিয়াশাক তুলছিল মোতি।
হুসসস—-ভেজা হাত মুখে বুলিয়ে চোখ টেপে ঠান্ডু, রাত্তিরে আসপানি বুঝিছিস !
ঢ্যামনা ! অজুর সুমাও পিত্তিভরা শয়তানি। জাত শয়তানের স্বভাব যাবে কোহানে!
গালির সাথে আড়াইমনি পাতিলের সাইজ পাছা দুলিয়ে থু ফেলে মোতি। তিক্ত হয়ে উঠে ওর মন। তবু ভাবে, শুয়োরের বাচ্চাডা আসপে যহন আসুক! ঘরে চাল নুন তেল বাড়ন্ত। বাড়তি শরীরের মেয়েটার যখন তখন ক্ষুধা লাগে। কয়েক মাস ইশকুলের বেতনও বন্ধ। হাসপাতালে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে একা আর পেরে উঠছে না মোতিমালা।
অনেক রাতে কঞ্চি কাছনির পলকা গেট ঠেলে চোরা বিড়ালের মত ঘরে এসে ঢোকে ঠান্ডু। কাবাব- তন্দুরের প্যাকেট টেবিলে রেখে এদিক সেদিক খুঁজে ফেরে। হতাশ হয়ে হাহাকার করে। মোতির হাত ধরে অনুনয়ে ভেঙ্গে পড়ে, তাতিয়ানাকে একবার ডাকপি মোতি? খালি একবার!
ফুঁসে উঠে মোতি, রাতদুপ্পুরে সোহাগ মারাইও নাতো তাতুর বাপ ! তাতু নাই। তুমি আসপা শুনি বাদলের বাসায় চলি গেছে।
বাদল মোতির ভাই। তিন রাস্তার মোড়ে পানবিড়ির দোকান দিয়ে লাল হয়ে উঠছে দিনকে দিন। সবাই বোঝে বাদল পানের আড়ালে টানের ওষুধও রাখে। তরুণ ছেলে ছোকরারা তাই ভিড় করে থাকে দোকানটায়। তাতিয়ানাও দোকানে বসে মাঝে মাঝে। সেদিন ভিড় বেড়ে ভিড়াক্কার। ঠান্ডু খবরটা যতবার শোনে ততোবার রাগে দুঃখে, হতাশায় মনটা মায়াময় হয়ে ওঠে। বুকের কোথায় যেনো মেয়ের ছোট ছোট হাতের আঁকশি আদর মনে পড়ে যায়!
ঠান্ডুর কেমন বাপ বাপ মার্কা টেনশন হয়, মোতিরে মেয়েটারে ইট্টু সামলি রাখিস তুই। যে দিনকাল পড়িছে!
ঝামড়ে উঠে মোতি, এহন আর বাপগিরি ফলাইও না তো তুমি। তালাক দিবার সু্মায় মেয়ার কথা ভাবছিলা একবারো ?
তাতিয়ানার জামা ঝুলছে আলনায় । লম্বা পাজামা । ফ্যানের বাতাসে সস্তা জর্জটের ওড়নার এক কোনা উড়ে উড়ে দুলছে। যেন আলনার আড়াল থেকে ছোট্ট তাতিয়ানা উঁকি দিয়ে বলছে, আব্বু টুকি! বল ত আমি কোথায়?
বড় হয়ে গেছে মেয়েটা। মায়ের মতই সুন্দরী হয়েছে। তেমনি মুখরা। রাস্তাঘাটে ঠান্ডুকে দেখলেই বান্ধবীদের সাথে আওয়াজ দেয়, অই দেখ আমার বাপ শালা মেয়ে চাটছে। চল পালাই—
মোতিকে তালাক দিয়ে তিনবার বিয়ে করেছে ঠান্ডু। একটিও টেকেনি। এখন আর কেউ বিয়ে করার কথা বলে না। একলা বাড়িতে একলাই থাকে সে। নামাজ রোজায় মন দিয়েছে। শতবার ক্ষমা চেয়েছে, পা ধরেছে। দুরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছ মোতি। শাকপাতা খেয়েও হাত পাতেনি। ভাগ্যিস মেয়ের জন্যে কিছুটা নরম হয়েছে আজকাল। ঠান্ডুরও কি যেন হয়েছে । যখন তখন বুক জুড়ে হাহাকার নেমে আসে। খালি ঘরে মোতির কথা মনে পড়ে যায়। কান্না পায়। কাঁদেও সে।
মোতি এখন পরনারী। দেখা করতে হয় লুকিয়ে চুরিয়ে। রাতদুপুরে। অন্ধকারে। তাও অনেক সাধ্য সাধনার পর।
ডান কাতে ঘুমিয়ে আছে ঠান্ডু। মোতি বোঝে ঠান্ডুর তেজ শেষ। তার শরীর খোবলানোর আগেই ঝুলঝুলে ন্যাতা মেরে গেছে হারামজাদা ব্যাটা ।
ভোরের বাতাসে মায়া জাগে বুকের কোথাও। বুকের উপর ছোট্ট মেয়ে তাতিয়ানাকে বসিয়ে রোজ ভোরে ঠান্ডু গান গাইত, মেয়েও ঠিক সুরে উউউউউ করে গাইতে চেষ্টা করলে কি যে খুশি হয়ে উঠত ঠান্ডু, মোতি রে মোতি আমার মেয়েরে আমি গায়িকা বানাবো বুঝলি তুই।
আর গায়িকা! তাতিয়ানা এখন নটি হচ্ছে। ছেলেদের ভাঙ্গিয়ে এটাসেটা খেতে, পেতে শিখে গেছে। কিছু বলতে গেলেই পনের বছরের মেয়ে এমন ঝাঁকি দেয়, চুপসে যায় মোতি। ভালোর ভালো এটুকুই, পড়াশুনায় দারুন মাথা মেয়ের। সেই মেয়ের তিনমাসের বেতন বাকি পড়েছে। ঠান্ডু কি বোঝে মেয়ে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ালে লোকে ঠান্ডুর মেয়ে বলেই জানবে ?
মায়ার সাথে কি এক ঘৃনা এসে জমে যায় বুকের ভেতর। ফজরের আজান পড়েছে। ঠান্ডুকে ডেকে দেয়, এইযে, এইযে শুনতিছো কেউ দ্যাখপার আগি চলি যাও দেহি !
ঘেয়ো কুকুরের মত ধুঁকে ধুঁকে হাটে ঠান্ডু। হোঁচট খায়, হাঁটু চেপে উঠে দাঁড়িয়ে বারবার পেছনে তাকায়। সুপারিগাছের পাশে মনে হলো যেনো মোতি ! মাথায় ঘোমটা ! আহা মোতির শরীরটা কেমন হাড়সর্বস্ব হয়ে গেছে। মেয়ের নাম করে সামনে মাস থেকে কিছু টাকা দেবে নিয়মিত। কোচিং করাতে হবে। মেয়ে ত তারও। হারুণ মাস্টার সেদিন কত প্রশংসা করলে তাতিয়ানার।
নিজের বাড়ির বারান্দায় উঠে ঠান্ডুর চোখে জল আসে, সেদিন কি যে হয়েছিল ওর! কেন যে সে মোতিকে তালাক দিলো ! শুদ্ধ বাইন তালাক!

মিস জোন্স ৪
বাপি আশ্চর্য অতল চোখে জোনাক আলো জ্বেলে মাকে বলত, এই ত আমি! কেন যে ভয় পাও আমাকে হারাবার!
মা একবারের জন্যেও বাপির দিকে তাকাতো না। কিন্তু মার চোখ থেকে ঈর্ষার নীল সরে গিয়ে জল দেখা যেত।
শেষ বিকেলে মিস জোন্স আসতেন আমাদের বাসায়। কর্মে, আদর্শে বাপির বন্ধু। নিজের হাতে বানানো প্যানকেকের বক্স দেখিয়ে মাকে বলতেন, তোমার চায়ের পাশে এগুলো কি রাখতে পারি বিজয়নী?
ঈর্ষার জলবিছুটি ঝিকিয়ে উঠত মার মনে। তার স্বামি কি ভালোবাসে এই সন্ন্যাসিনী মিস জোন্সকে ? কর্মযজ্ঞে দুজনের নির্ভরতা মার মনে সাপ ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেই সাপ কেবলই মাকে ঠুকরে যাচ্ছে , গেলো গেলো তোর সব গেলো!
মার বুক ধড়াস ধড়াস। মার হাত জ্বলে। পা জ্বলে। মার মনে জাহান্নামের লাল আগুণ। শয়তান ইবলিশ বন্ধু হয়ে উস্কে দেয় মাকে। আচ্ছা মানুষটা কতটুকু ভালবাসে মিস জোন্সকে ?
তার স্বামি যখন মিস জোন্সের সাথে কথা বলে বড় মেদুর মধুর হয়ে যায় তার কন্ঠ। সন্ন্যাসিনীর সবুজ চোখে ধাঁধিয়ে ওঠে অরুদ্ধ জীবনের অবারিত আনন্দ । বাগানের মাটি নিড়িয়ে দিতে দিতে সন্ন্যাসিনীর ধবল পোশাকে কখনো কি রঙ ছুঁইয়ে দিয়েছে তার স্বামি ? কাল বিকেলে দুটি গোলাপ যে দিলো, সেকি সৌজন্যের উপহার নাকি বন্ধুত্বের চেয়েও আরো বেশি ইঙ্গিতবহ ?
সন্ন্যাসিনীর চুলে ত দেখি প্রৌঢ় সূর্যের গলিত আলো খেলা করছে ! কতটুকু কাম আছে তাতে ? আর প্রেম? ভালোবাসা ? নুনঘাম স্পর্শ ? সে কি নির্ভরতার আশ্রয়ে দুজনের মোহন ঘন উল্লাস ?
বুকের পাড় দুলে ওঠে মার। এক অজানিত ভয় মন ছুঁয়ে দেহের চামড়ার সমস্ত রোমকূপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আগুণের মত ! মা মিস জোন্সকে পাত্তা না দিয়ে তড়িৎ উচ্ছ্রাসে বাপিকে ডেকে বলে, এই যে শুনছ তোমার চায়ে কিন্তু চিনি দিচ্ছি না। আর প্যানকেক না খেলেই ভাল। এ বয়সে সুগার কোলেস্ট্রল কন্ট্রোলে থাকা দরকার।
সন্ন্যাসিনী মিস জোন্স মার কথায় অনূদিত হয়ে হাসে, ও ইয়েস ইয়েস !
মার হাতের আঙ্গুল কাঁপে। স্পুনের এলোমেলো আঘাতে চা পড়ে যায় ট্রেতে। বাপির খুব অপছন্দ ভেজা ট্রে। মিস জোন্স রুমাল দিয়ে সযত্নে মুছে দেয় ছড়িয়ে পড়া চা। বাপি হা হা করে ওঠে। মার মন আরও ভেঙ্গে পড়ে চারঙ ছোপানো রুমাল দেখে। সেও ত পারত ট্রেটা মুছে দিতে। দরকারের সময় কেনো যে মনে থাকে না এ সবকিছু ! রুমালগুলো যে কোথায় থাকে। মিস জোন্সের কি দরকার ছিল ট্রে মুছে দেওয়ার ! বেশি বেশি। ঢং আর কাকে বলে ! পুরুষ ভুলানো ছলচাতুরী।
তবে কি তার বিজয়পথে কোনো কাঁটা ঝাপালো ? কেনো আরো ভালো করে সে সাজিয়ে দিতে পারেনা বিকেলের নাস্তার ট্রে ? এই যে অসুখ সে কি সেরে যাবে না কোনোদিনও ? মার মনে ভয়ে জাগে ! কিছু কি হারালো তার ? চেনা মীড়? নীড়ে থাকা আহির ভৈরব! রাত্রিসুখ, খাম্বাজ ঠাটে, রে মাপা ণিধাপা ?
ক্রমশ কংকাল হয়ে আসা আঙ্গুলসহ তার হাত কোলের ভেতর লুকিয়ে ফেলে মা। কলাপাতা রঙ হাতে সন্ন্যাসিনী জড়িয়ে ধরে মার পিঠ, ওকে ম্যাম। এইত ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু। আর কিছুদিন। কুল ম্যাম, কুল প্লিজ। সন্ন্যাসিনীর কাঁধে মাথা রেখে মা ফুঁপিয়ে ওঠে, আর কতদিন ? আর কবে আমি সুস্থ হয়ে উঠবো মিস জোন্স ? সত্যি কি সুস্থ হবো আমি !
সন্ন্যাসিনীর দু চোখে মায়া। বাপি সাদা রুমালে মুছে দেয় মার চোখ। ঈশ্বর ক্ষমা হয়ে বয়ে যায় বিকেলের বাতাসে।
রাতে কেক খাই আর পড়ার টেবিলে বসে বুঝি চূর্ণ হচ্ছে মার খোঁপার মালা। বাপি অসহায় পুরুষ বিহ্বল, কষ্ট পাও যখন প্লিজ বাসায় আর ডেকো না মিস জোন্সকে।
মা তবু রোজ ডেকে পাঠায় মিস জোন্সকে। দুহাতে জড়িয়ে ধরে , তুমি না এলে কি যে একা লাগে! এসো এসো। প্লিজ! আমার পাশে এসে বসো ভাই !
মিস জোন্সও জড়িয়ে নেয় মাকে।
উষ্ণ চা ছুঁয়ে তিনটি হৃদয়! সেতারে রবিশংকর বেজে যায়। রাগ সন্ধ্যা। ভালোবাসা কি ত্রিভঙ্গ স্রোত! পাশাপাশি খুব কাছের তবু কেউ কারো সম্পূর্ণ বন্ধু নয়!


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.