বার্বিকিউ, কুয়াকাটা সৈকতে

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২৮ এপ্রিল ২০০৯ ৬:২৫ পূর্বাহ্ন

kua5-edited.jpg
স্থানীয় উপাদানে নির্মীয়মান আলী ভাইয়ের ইকো কটেজ।

একটা কোথাও বেরোতে হবে। জায়গা বাছাবাছির অবকাশ প্রায় নেই। কাজ-অকাজের ফাঁকে যে সময়টুকু বের করা গেছে, সে অবকাশে মেয়ে-জামাইকে নিয়ে কোন শৈলাবাসে যাব, নাকি ঘরের কাছে-পিঠে দু’দিন হাওয়া বদল করে আসব, ভাবছি দ্রুত। এরই মাঝে বিষ্যুদবার সন্ধেবেলা রুবাই-সাজ্জাদ এলো সপ্তাহান্তিক ছুটি কাটাতে।

kua2.jpg……..
সিদ্‌রের চিহ্ন রয়ে গেছে এখনো।
……..
সাজ্জাদ আমাদের সজ্জন জামাই। কথায় বলে, জন-জামাই-ভাগনা, কেউ নয় আপনা। কিন্তু আমাদের জামাইটি প্রবচন মিথ্যে প্রমাণ করেছে তার এ ক’দিনের কাজ-কর্মে, কথাবার্তায়। হাতে-গরম প্রমাণও মিলল। কাপের চা জুড়োনোর আগেই সাজ্জাদের পরামর্শমতো বেড়াবার জায়গা ঠিক হয়ে গেল। যাওয়া হবে এবার কুয়াকাটা—দেশের দক্ষিণ পশ্চিমে
—————————————————————–
অমন বিশাল বুদ্ধমূর্তি ওই গণ্ডগ্রামে দেখব ভাবিনি।… এখানেও কুয়াকাটার বৌদ্ধ মন্দিরের লাগোয়া যেমন, তেমনি এক প্রাচীন কুয়া বা ইঁদারা রয়েছে। বোধকরি, সেকালে দেবস্থানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পানীয় জল সরবরাহের সুব্যবস্থা করা আবশ্যিক শর্ত ছিল। তাই যদি হয়ে থাকে, তবে এই ইঁদারা প্রতিষ্ঠা এক অত্যাবশ্যক জনকল্যাণকর পদক্ষেপ ছিল নিশ্চিত, যা এখনকার মানুষেরও মনোযোগ ও প্রশংসা কুড়োবে।
—————————————————————-
বঙ্গোপসাগর তীরের ছোট্ট জনপদে। চেনাজানাদের অনেকেই বারবার যাওয়া-আসা করে এখনো জায়গাটাকে ম্যাড়মেড়ে, বিবর্ণ করে ফেলতে পারেনি। নানা অপশ্যনের মাঝে আমরা স্টিমার ভ্রমণের সুযোগ নেব, সিদ্ধান্ত নিলাম।

সহকর্মী রাশিদাকে ফোন করে জানা গেল, ওর স্কটিশ বর এলিস্টেয়ার অর্থাৎ আলী ভাই কুয়াকাটায় ইকো-পর্যটন কেন্দ্র তৈরিতে ব্যস্ত যদিও, আমাকে ওখানে যাবার বিষয়ে বিশদভাবে শিগ্‌গিরই জানাচ্ছে। সকালে সাজ্জাদ মোতিঝিলের অফিসে গিয়ে ‘রকেট’ স্টিমারের ক্যাবিন বুক করে এল। আলী কুয়াকাটা পর্যটন মোটেলের ফোন নাম্বার দিল। থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবার পর এবাড়ি-ওবাড়িতে ব্যাগ গোছানোর পালা। রুবি-রুবাই প্রচুর ফোনালাপ সাঙ্গ করে, প্রস্তুতি শেষে যাত্রার অপেক্ষায় রইল কেবল।

যাবার আগের দিন দুর্যোগ ঘনিয়ে এল অকস্মাৎ। অক্টোবর-নভেম্বরে ঝড় টড় হয় জানি। কিন্তু বেশ ক’দিন যাবৎ যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ শেষে যখন সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করা গেল, তখনই কি ঐ একেবারে কুয়াকাটা ঘিরেই সাইক্লোন ঘনিয়ে আসতে হল? ২০০৭-এর সিদ্‌র-এর কথা মনে পড়ল আমার। bdnews24.com-এর নিউজ সেকশ্যনে বসে শিরদাঁড়া টান্ টান্ রেখে দিনভর ঝড় বিষয়ক আপডেট পোস্ট করেছিলাম সেদিন। সন্ধেয় বাড়ি ফিরেই কম্পিউটার চালু করে bdnews24.com-সাইটে রেখে দিয়েছিলাম আর আধঘণ্টা পর পর ‘রিফ্রেশ’-এ ক্লিক করে ঝড়ের গতিবিধি সম্পর্কে খতিয়ান আপডেট্ করেছিলাম।

আবার কি সেরকম আতান্তরে পড়া গেল? রুবি সাজ্জাদকে ফোন করছিল। মন খারাপ।

—কী খবর সাজ্জাদ? তোমরা কী করবে ভাবছ?

—কেন মা? আমরা চলে যাব ঠিক।

আমি এঘর থেকে চেঁচাই। আহা, আবহাওয়ার খবর শুনে তো যেতে হবে! আমরা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব। অত ভাবনার কী আছে?

kua6.jpg…….
খাড়িতে নৌকায় রুবাই, পেছনে ফাতরার বন
…….
বিকেল নাগাদ ঢাকার আকাশে মেঘ ঘিরে আসে। রাত বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে আবহাওয়া অফিসের সতর্ক সংকেত বদলে বিপদ সংকেতের চেহারা নেয়। আমরা শয্যা নিই। সকালের আকাশ কাজলকালো মেঘে ঢাকা। রেডিও-টিভিতে শোনা গেল, বিকেলে দক্ষিণের উপকূল পেরিয়ে ঘূর্ণিঝড় মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে। আমরা বেশ আছি। ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা। সাজ্জাদ পর্যটনের মহাখালি অফিসে এসে আমাদের নির্দিষ্ট দিনে মোটেল বুকিং বাতিল করেছে, তারিখ এখন অবশ্য ওপেন রয়েছে। বাড়ির কেয়ারটেকার মোল্লাকে আগের দিনই রকেটের টিকিট ফেরত দিতে পাঠিয়েছিলাম। সবটা না হলেও কিছু টাকা ওরা ফেরত দিয়েছে। কিছু করার নেই।

ঝড় এসে গেল। ঝড়ের দিনে আমরা ঢাকায় বসেও তীব্র ঝোড়ো বাতাসের হাড়হিমকরা ছোঁয়া পেলাম। সে রাতে এগারোটার দিকে ইন্টারনেটে মেইল চেক করে ক্যানাডা প্রবাসী বন্ধু মুস্তাফার চিঠির জবাব টাইপ করছি। এমনি সময় বারছয়েক ধীর লয়ে নড়ে-নড়ে উঠলো পায়ের নিচের শক্ত মোজেইক, কমপিউটারের টেবিল ডানে-বাঁয়ে দোল খাচ্ছে, নিবাত ঠাণ্ডা ঘরের কোণে খাটের ওপর মশারির ফ্রিল কাঁপছে। পিসি শাটডাউন করা হল। ডাকবার আগেই রুবি উঠে এল, ভূমিকম্প? আমি গম্ভীরভাবে মাথা ওপর-নিচে দুলিয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করলাম। আমরা ডাকতে চাইনি ওদের। তবুও মেয়ে, জামাই উঠে এল। বাইরের ঘরে বসে সবাই এক রাউন্ড চা খেলাম। অতঃপর শয্যাগ্রহণ।

সকালে উঠে কুয়াকাটায় পর্যটন মোটেলে ফোন করলাম। মজুমদার ফোন ধরলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী হাল ওখানকার। মজুমদার জানালেন, আগের বছর সিদ্‌রের সময়ে উনি কুয়াকাটায় ছিলেন, সে তুলনায় গতকালের ঘূর্ণিঝড় বলতে গেলে হালকা বাওকুড়ালি অর্থাৎ টর্ন্যাডোর মতো ছিল। আজ সকালেই মেঘ কেটে গিয়ে দিব্যি রোদ হাসছে। সমুদ্র এখনো বেশ অশান্ত। তবে, আমরা রওনা হতে পারি।

সাজ্জাদকে বল্লাম, আমি বাদামতলি ঘাটে যাচ্ছি। স্টিমারের নতুন টিকিট কেটে উত্তরায় মেজশালা আরিফের বাড়ি তৈরির ইন্সপেকশ্যন সেরে বাসায় ফিরব। সাজ্জাদ জানাল, সেও তাহলে মহাখালিতে পর্যটনের সদর দপ্তরে মোটেলের নতুন বুকিং নিশ্চিত করেই নিজের অফিসে যাবে। বড়শালা শফিক আধঘণ্টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে এল। সোজা ফুলবাড়িয়ার পাশ দিয়ে বাদামতলি ঘাটে গিয়ে দেখি, সবচেয়ে বড় দু’টো স্টিমার ‘অস্ট্রিচ’ আর ‘মাসুদ’ ঘাটে দাঁড়িয়ে। প্রথম শ্রেণীর একটা আর দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা কেবিন পাওয়া গেল। ওরা বললেন, কেউ বুকিং ক্যানসেল করলে দ্বিতীয়টাও প্রথম শ্রেণীতে দিয়ে দেয়া যাবে। তাই সই।

উত্তরায় গিয়ে জানলাম, আরিফের জলা জমিতে পাইলিং করে ৬৫ ফুট নিচে গিয়ে শক্ত মাটি পাওয়া গেছে। সাব্যস্ত হল, ৩৫টি কংক্রিট আর রডের স্তম্ভ ওই ৬৫ ফুট নিচে থেকে গেঁথে, জমিয়ে, ওপরে তুলে, তার ওপর বাড়ি তোলা হবে। অনায়াসে ৬ তলা সাড়ে ছয় তলা পর্যন্ত ওপরে ওঠা যাবে। সাজ্জাদ ফোনে জানাল, তিনদিনের জন্য দু’টো ঘর বুক করা হয়েছে। আমি জানালাম, আজ বিকেলেই আমরা সদরঘাট টার্মিনাল থেকে অস্ট্রিচে উঠছি। বাড়ি ফিরে লাঞ্চ সেরে ব্যাগ গুছিয়ে নেয়া হল। সাজ্জাদ ওর কাজকর্ম সেরে, ওদের বাসায় তালাচাবি লাগিয়ে, পাশেই ওদের বাড়িতে ওর মায়ের হাতে চাবির গোছা বুঝিয়ে দিয়ে এসে পৌঁছল। খেয়েদেয়ে সবাই একটু গড়াগড়ি দিতে চারটে বেজে গেল। গাড়ি এসে নিচে অপেক্ষা করছে।

রুবির হাত নুড়কোত ফরিদাকে নিয়ে শফিক বেরিয়ে গেল। আমার ছোটশালা মারুফের বাসায় ওকে পৌঁছে দেবে। আমরা সদরঘাট পানে রওনা হলাম। স্টিমারে উঠে দোতলায় যেতেই ম্যানেজার জানালেন, আমাদের দু’টি ক্যাবিন-ই প্রথম শ্রেণীতে বুক্‌ড হয়ে গেছে। গুড নিউজ। নইলে রুবি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, মেয়েজামাইকে প্রথম শ্রেণীতে তুলে দিয়ে আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীতে রাতটা কাটিয়ে দেব। অহেতুক টানাপড়েন থেকে বাঁচল সবাই। আমরা সামনের ডেকে বসে চা দিতে বল্লাম। স্টিমার ছেড়ে দিল। বুড়িগঙ্গা সেতুর ওপরে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ। হাত নাড়ানাড়ি হল বিস্তর। অঘ্রাণের সন্ধে ঘনিয়ে এল।

চায়ের সঙ্গে চমৎকার ভেট্‌কি ফ্রাই খাওয়া হল। আতিথেয়তায় সবাই মুগ্ধ। আমি ছেলেবেলায় এসব স্টিমারে বহুবার সফর করেছি নারায়ণগঞ্জ-গোয়ালন্দ রুটে। আমার নানাবাড়ি মাগুরার গড়াই নদীর ধারে চৌগাছি যেতে দেড়-দু’দিন লেগে যেত সেকালে। স্টিমারেই তার অর্ধেক সময় কাটত। যাত্রীদের অনেকেই এসে বসেছেন ডেকে। আঁধারে বুড়িগঙ্গার দু’ধারে বসতি, ডকইয়ার্ড, ব্যবসায়ীদের গুদোম আর নির্মীয়মান ভবনে বাতি জ্বলছে। সবাই চুপচাপ বসে। স্টিমারের জল কেটে এগোনোর শব্দ শুনছি। একটু শীত-শীত লাগছে, আমি উঠে গিয়ে গায়ে জ্যাকেট চড়ালাম। মুখবন্ধ ফ্লাস্কে পানীয় ঢেলে, জল মিশিয়ে ঢাকা পেঁচিয়ে বন্ধ করে নিয়ে এসে পেছনের সারির কোণে আর্মচেয়ারে বসতে পেলাম।

kua4-edited.jpg
সৈকতে গোচারণ

রুবি, রুবাই, সাজ্জাদ নিচুস্বরে আলাপরত। একটু ঝুঁকতে শুনলাম, যে-যার মতো নদীপথে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা সবিস্তার বলে চলেছে। অন্যান্য যাত্রীরাও ছোট ছোট দলে আড্ডায় জমেছে। কেউ বা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। ডেকের পাতলা আঁধারে সিগ্রেটের লাল আগুনের ফুলকি হাওয়ায় ডুব দিচ্ছে পানকৌড়ির মতো। হঠাৎ মাথার ওপরে কড়া আলো জ্বলে উঠল। এই রসে ভঙ্গ দে’টি কে? বলে পাশে তাকিয়ে দেখলাম, সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত বাটলার নোটবই হাতে ডিনারের ‘হুকুম’ নিতে হাজির। সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে রাতের খ্যাঁটনের বরাত দেয়া গেল। আমি উঠে গিয়ে আরেক দফা এপিটাইজার মিশিয়ে নিয়ে এলাম।

সাজ্জাদ টয়লেটে গিয়েছিল। আমি ওকে অনুরোধ জানালাম, বিস্তারিত বল। বুদ্ধিমান ছেলে রেখে-ঢেকে যা বলল, সেটা এরকম। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর মাঝে বাইরে থেকে তালাঝোলানো গোটা কয়েক ডব্লিউসি। যাত্রীদের প্রয়োজনমতো ওয়েটার-ক্লিনারদের কেউ এসে তালা খুলে দেয়। ভেতরটা মোটামুটি তালাবন্ধ না রাখলে নাকি অনধিকারীরা এসে নোংরা করে রেখে যায়, কমোডের সিটের ওপর সবুট উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়ে পোর্সেলিন কমোড, প্ল্যাস্টিক সীট এবং নিজেদের হাড়ভঙ্গ ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত এটেন্ড্যান্টদের ওপর চড়াও হয়। তাই এই সর্বজনীন নিরুৎসাহকরণ। রাত বাড়ছে, স্টিমার স্পিড তুলেছে ভালই, ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা বেশ লাগছে। ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে রুবির তাগিদে আমরা ভেতরে গিয়ে বড় ডাইনিং টেবিলের দু’পাশে বসে আরও কিছুক্ষণ গল্পগাছা করতে করতেই ডিনার গং বেজে উঠল, টিং টিং টিং। আমরা যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসেছিলাম সুসংবদ্ধ হলাম। রুবি, আমি ইনসুলিন নিয়ে এলাম।

খাবার এসে গেল। ওয়েটার ডিশ হাতে অতিথির বাঁ দিক থেকে খাবার এগিয়ে ধরে, যে-যার প্রয়োজনমত তুলে নিই ভাত, আলুভর্তা, সর্ষেভর্তা, লাউশাক মাখনে সাঁতলানো, ঘন মুগডাল। খেতে শুরু করি। স্বাদু রান্না। আরও রয়েছে সর্ষে ইলিশ আর চিকেন দোপেঁয়াজা। স্যালাড। শেষ পাতে পুডিং। বেশ খাওয়া হল। আমার কপাল-ঘাড়-কণ্ঠদেশ বেয়ে যথারীতি ঘামের চিকন চিকন সোঁতা নিম্নমুখী হয়েছে। উঠে গিয়ে তোয়ালে চেপেচুপে ভদ্রস্থ হলাম। বাইরের ডেকে দাঁড়িয়ে সিগ্রেট ধরিয়ে স্বস্তি পেলাম। বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। একে একে অন্যরাও এল। আধঘণ্টাটাক পরে চাঁদপুর ঘাটের আলো দেখা গেল। সাজ্জাদ, রুবাই দেরিতে ওঠা চাঁদ দেখবে, তারপর শোবে। ওদের ঠাণ্ডা লাগাতে বারণ করে আমরা কেবিনে ফিরলাম। ওষুধপত্তর খেয়ে সরু বাঙ্কবেডে চিৎ হলাম।

সারারাত ঘুম হলনা। জলপান আর জলবিয়োগ হল বারকয়েক। ভোররাতে দু’চোখ বুঁজে আসতেই বরিশাল এসে গেল। ভোর পাঁচটা। নামতে হবে। টল্‌তে টল্‌তে উঠে বেরোনোর প্রস্তুতি সারতে হল। আমার তখন বেশ ঘুম পাচ্ছিল। মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পেটের ভেতরে কেমন গুড়গুড়ে ভাব। মোটের ওপর, আমি তখন কুয়াকাটা যাবার বদলে বাড়ির বিছানায় শরীর ফেলতে চাইছি যে কোনো মূল্যে। ক্যাবিনের বাইরে হেড ওয়েটার খাবারের বিল নিয়ে দাঁড়িয়ে। বকশিশসুদ্ধ বিল পরিশোধ করলাম। ওয়েটারপুঙ্গব নাখোশ। কারণ, সব ওয়েটার আর দু’জন বাবু অর্থাৎ কেরানিরও দাবি রয়েছে ওতে। কথা না বাড়িয়ে আমি ট্রলি ব্যাগের চাকা গড়িয়ে দিলাম।

ইউ ক্যান্ট মেইক এভরিবডি হ্যাপি, তাই না সাজ্জাদ? বলে জামাইয়ের পানে তাকালাম। ও ঘাড় নেড়ে বল্ল, এবসল্যুটলি। তবে আমার কেন যেন মনে হল, আরো কিছু টাকা ওদের দিতে পারলে ও খুশি হত। এক হিসেবে এটা আমার ভালই লাগল। ছেলেটা দিলদরাজ। তোমার বয়সে আমিও হয়তো তোমার মতই ছিলাম, বাবা। মনে মনে বল্লাম। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। ডাঙায় পা দিয়ে শরীর কিছুটা বশে এল। কুয়াকাটার বাস ছাড়বে আধ কিলোমিটার দূরের স্ট্যান্ড থেকে। আমাদের বরিশাল করেসপন্ডেন্ট রফিক আগেই ফোনে জানিয়েছিল। আরো জেনেছিলাম, ইচ্ছে করলে আমরা হোটেল এথেনা-তে একটু বিশ্রাম করে, ব্রেইকফাস্ট সেরেও বাসে উঠতে পারি। পৌঁছতে চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে, অনেকগুলো নদী পেরোতে হবে কিনা।

আমার নাজুক শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সাজ্জাদ রিকশা ডেকেছে। উঠে পড়া গেল। একটু এগিয়ে ডানে ঘুরতেই দেখা গেল, কুয়াকাটার বাস দাঁড়িয়ে। কোন্ বাস এক্ষুণি ছাড়বে, জেনে নিয়ে রুবি আর আমি উঠে সামনের আসনে বসে পড়লাম। সাজ্জাদ আমাদের ব্যাগগুলো ওপরে তুলিয়ে রেখে, টিকিট নিয়ে, পাশের দোকান থেকে ডিম-পরোটা ভাজিয়ে রুবাইকে সাথে নিয়ে বাসে উঠল। মিনিট দশেকের মধ্যে বাস যাত্রীতে ভরে গেল। সকাল হয়েছে। সাজ্জাদের প্রতি মনে-মনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, পাশের জানালার কাচ বন্ধ করে, আসন পেছনে হেলিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। বাস ছেড়ে দিল।

চোখ বুজঁতেই গা গুলনো ভাবটা কমল। আরাম হচ্ছিল। একশ’ কি.মি. সড়কে পাঁচ-পাঁচটা ফেরি। ভাবা যায় না। সত্যিই বরিশাল নদীমাতৃক! বাস থামল। রুবি আর ছেলেমেয়ের আলাপ শুনে বুঝলাম, প্রথম ফেরি এসে গেছে। সকালে নদীর চেহারা প্রশান্ত। জলের ওপর হালকা নীলাভ কুয়াশার চাদর। ঘাড় ঝাঁকিয়ে বুঝলাম, মাথার ভার কমছে। বুঝতে পারছিলাম, কুয়াকাটায় পৌঁছে স্নানাহার সেরে একটি নিটোল ঘুম দিলেই বিকেল নাগাদ ঠিক হয়ে যাব। সাজ্জাদ এবং রুবি আমার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হলেও মেয়েটি ভোলানাথের মতোই উৎফুল্ল। আমার মনে হল, ওদের ভাল ঘুম হয়েছে। অনেক রাত অব্দি যদিও দু’জন স্টিমারের ডেকে শৈত্য এবং জ্যোৎস্না উপভোগ করেছে। আসলে, ওদের বয়সটা তো সব শৃঙ্খলা আর নিয়ম অগ্রাহ্য করারই মতো। নির্বিঘ্নে ফেরিতে উঠে পার হওয়া গেল। দক্ষিণের মানুষ, লক্ষ্য করলাম, এই সাত-সকালেই আমলকি, চালতার আচার যথেচ্ছ খাচ্ছে গপ্ গপ্ করে। মানুষগুলোর হাড়গোড় চওড়া, মজবুত।

বাকি পথ আধো ঘুম, আধো জাগ্রত অবস্থায় কাটিয়ে আমার বিনিদ্র রাতের ক্লান্তি প্রায় মুছে গেল। পটুয়াখালি শহর বাঁদিকে রেখে বাস সোজা দক্ষিণে চলেছে। একসময় রুবি আমাদের ডিম-পরোটার রোল খেতে দিল। খিদেও পেয়েছিল। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় বরিশাল স্টিমারঘাট থেকে কুয়াকাটায় পৌঁছনো গেল। আমাদের চারজনকে ওরা পর্যটন মোটেলের ফটকে নামিয়ে দিয়ে সামান্য দক্ষিণে কুয়াকাটা ডাউনটাউনের দিকে চলে গেল।

ফটক পেরিয়ে আমরা মূলভবনের দিকে এগোলাম। দু’দিকে চমৎকার ফুলবাগান। কিছু অতি তরুণ ফুলের ঝাড় সাইক্লোনের ঝাপটা খেয়ে শুয়ে পড়েছে। মালি সেগুলোকে কঞ্চির ঠেক্‌নো দিয়ে তুলে খাড়া করতে ব্যস্ত। রিসেপশ্যনে হাজির হতে বুঝলাম, ওরা আমাদের অপেক্ষায় ছিল। আপাতত আর কোন অতিথি নেই। দোতলায় উঠে গেলাম। পাশাপাশি দু’টি ঘর আমাদের। রুবিকে বললাম, ছেলেমেয়েদের ঘরটা দেখে এস। সব বাতি-পাখা-এসি-রাতবাতি-টয়লেট ঠিকঠাক থাকলে ভাল, নইলে এক্ষুনি বাসযোগ্য করে দিতে বল। বেয়ারাকে ডেকে ঘণ্টাখানেক পরে আমাদের লাঞ্চ তৈরি করে ডাকতে বলে দিলাম। রুবি সাজ্জাদ-রুবাইদের ঘর থেকে ফিরল। ওদের ঘরে রাতবাতির বাল্ব অকেজো, নতুন বাল্ব লাগিয়ে দিচ্ছে বলল। ঠিকাছে, এবারে গোসল সেরে নাও।

রেস্টোর‌্যান্ট থেকে খাবার ডাক আসতে সবাই নিচে নেমে গেলাম। ভাত, সব্‌জি, ডাল, রূপচাঁদা ফ্রাই, চিংড়ি দোপেঁয়াজা আর মুরগির ঝোল। ফাঁকা ঘরের এককোণে বসে লেবু-লংকা সহযোগে পেটভর তৃপ্তি মিটিয়ে খাওয়া হল। রাতে রুটি-পরোটা হবে ওরা জানাল। খুশিমনে রুমে গিয়ে আমি কুলার চালিয়ে বিছানায় লম্বা হলাম। আহ্, কী আরাম। ঠিক সাড়ে চারটেয় ঘুম টুট্‌ল। অনেকটা জলপান করে চা দিতে বললাম। রুবি জানাল, মেয়ে-জামাই ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছে। বেশ হয়েছে, আমি খুশিমনে বল্লাম, অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে ওরা, সদ্য বিবাহিত, ওদের ইচ্ছেমতো ঘুরুক, ফিরুক। তোমার ইচ্ছে হলে তুমিও যতখানি কুলোতে পার, বেড়াও। আমি ক’দিন ছুটি নিয়েছি খবর লেখার কাজ থেকে। অল্পস্বল্প পড়ব, হাঁটব মোটেলের লম্বা, টানা বারান্দায় সকাল-সন্ধে আর খাব দাব, ঘুমোব, ব্যস।

চা খেয়ে ফোনে ধরলাম বাচ্চাদের। সাজ্জাদকে বললাম, আমি জীবনের অধিকাংশ অভিজ্ঞতা লাভের বেলায় পরের মুখে ঝাল খাইনি। তবে এখন কথা হচ্ছে, কুয়াকাটায় তোমরা যেমন, আমিও এই প্রথম এলাম পরিণত বয়সে। তাই বলব, তোমরা চুটিয়ে বেড়াও, ঘোরো বন্ বন্। কেবল গল্পটা চাই আমার নিশ্চিদ্র, ওখানে কোনো ফাঁকি চলবে না। আমার মেয়ে বাংলাটা মোটামুটি লেখে। যা দেখছ, দু’জনে মিলে সে-বিষয়ে বিস্তারিত নোট্‌স দেবে আমাকে। আমি তোমাদের চোখে আমার অদেখা যা, সেগুলো দেখতে চাই। বাই-ই। ঠিক আছে, বাবা, চেষ্টা করব। সাজ্জাদ গুডবয়ের মতো নিশ্চিন্ত করে আমাকে। চল, আমরাও একটু চলে-ফিরে আসি, রুবি বলে ওঠে। হ্যাঁ, অবশ্যই, তুমি বেরোও। আমি টয়লেট ঘুরে আসছি।

ঢিলেঢালা বার্মুডাজ আর টিশার্ট চড়িয়ে আমিও পায়ে মোজা আর চটি গলাই। মনশ্চক্ষে দেখি, রুবাই আর সাজ্জাদকে ঘিরে ঝক্ ঝকে বিকেলে কুয়াকাটার সমুদ্রবেলায় লেইটেস্ট সব মোবাইকের গর্জন। অবাক আমি। বেশ ভালও লাগছে। আমি আর হাবিবুল্লাহ্ সিরাজী গোয়ায় বেড়াতে গিয়ে দেখেছিলাম, ইয়াং ছেলেরা নানা মডেলের ভারতীয় মোটরবাইক নিয়ে পর্যটকদের পিলিয়ন ড্রাইভিং-এ নিয়ে যাবার জন্য সার-সার দাঁড়িয়ে রয়েছে। কালাংগুটে বিচে প্রথমবারের মতো দেখে অবাক হলেও পরে গোয়ার আরো গোটা সাতেক বিচে বেড়িয়ে সর্বত্র একই সুবিধে আমরা ভোগ করেছি। সিরাজী বাইক চালাতে জানতো না বলে পেছনে বসত। আমরা স্বচ্ছন্দে নর্থ গোয়া, সাউথ গোয়ার সব পাহাড় আর উপত্যকায় পাখির মতো বিহার করেছিলাম হপ্তাখানেক। তো, কুয়াকাটায় ঐ একই সুবিধে আমাদের ছেলেমেয়েরা পাচ্ছে প্রায় দু’দশক সময়ের ব্যবধানে। রুবিকে সেকথা বলায় সে আঁতকে উঠল প্রায়, ঐ বালুময় সৈকতে মোবাইক চালাবে? আরে, সবাই চালাচ্ছে, ঐ দেখ, ঐ নতুন দম্পতিকে দেখ। আমি সাহস যোগাই।

স্থানীয় যুবকদের পথনির্দেশ অনুসরণ করে সাজ্জাদ আর রুবাই মোবাইকে বিচের ধার ধরে ফাতরার বনের দিকে এগোল। বিচে অগুণ্‌তি গোলাপি ফুল ফুটে আছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। কাছে গিয়ে ব্রেইক চেপে দাঁড়াতেই—সব রং আচমকা ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে নানা আজগুবি অনুমান ওদের মনে আসছিল। পাশ দিয়ে এক কাঠকুড়ুনি যাচ্ছিল। মহিলাটি হেসে উঠে যা বলল, সাজ্জাদ বুঝল, ওগুলো এক জাতের কাঁকড়া, শব্দ পেয়ে বালির নিচে লুকিয়েছে। এত ক্ষুদে কাঁকড়া, আর অত সুন্দর দেখতে? রুবাই অবাক। যাক্‌গে, চলো এবার ফাতরার বনমুখে। পথে পড়ল শুঁটকি পল্লী। বিস্তর শুঁটকি সার সার নাইলনের দড়ি নাকে গলিয়ে রোদে, বাতাসে শুকোচ্ছে। বিচের বাতাস সেখানে মাছের গন্ধে ভারি হয়ে আছে। ফাতরার বনের ভেতরে ভরা সাঁঝবেলায় ঢুকতে ইচ্ছে হল না। দু’চারজন কাঠ সংগ্রহ করে মাথায়, ঘাড়ে বাঁকে করে বয়ে নিয়ে ফিরছে লোকালয়ে। ওরাও বাইকের মুখ ঘোরাল। আমার দিবাস্বপ্ন ভঙ্গ হল।

মোটেলের গেটে একটি পানসুপারির দোকান। আলাপ করে জানলাম, পাকা রাস্তা ধরে আর পাঁচশ’ গজ এগোলেই সোজা দক্ষিণে বিচ। বাঁয়ে রাস্তা গেছে হোটেল নীলাঞ্জনা, বুড্ডিস্ট টেম্পলের দিকে। ডানের রাস্তা হোটেল-মোটেল জোন ঘেঁষে পশ্চিমে গেছে। দোকানদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিশ্চিত পদক্ষেপে ধীরেসুস্থে দু’দিকের দোকানপাট দেখতে দেখতে এগোলাম। ঐ যে বাঁয়ে সৌদিয়া, হানিফÑসব বাস কোম্পানির বুথ। রুবিকে নিশ্চিন্ত করলাম, ফেরার পথে খোঁজ নেব ফিরতি যানবাহনের। মোবাইক চালকদের সঙ্গে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্পগাছা করা গেল। একটা বাইক গছাতে চাইল। ওদের বোঝালাম, ষাট বছর বয়সে ত্রিশ-চল্লিশের যুবাসুলভ এন্টিক্‌স্‌ এটেম্পট করা আমার পক্ষে সমীচীন হবে না। আমি বরং একটু হেঁটেই বেড়াই কেমন? অগত্যা নাছোড় বান্দারা আমাদের পথ ছেড়ে দিল।

জলের ধার ধরে আমরা পশ্চিমমুখো হেঁটে যাচ্ছি। ওদিক থেকে মোটরসাইকেলে চেপে একজন দ্রুত এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসতে আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম, হেই আলী ভাই। আমরা এসে গেছি। এলিস্টেয়ার। রাশিদার জীবনসঙ্গী। স্কটল্যান্ডের মানুষটি কুয়াকাটায় পর্যটক নিবাস গড়ে তুলছে। তোমার পার্টনার মোর্শেদ কোথায়? জিজ্ঞেস করলাম। আসছে পেছনে, হেঁটে। ওর ভুঁড়ি হচ্ছে নাকি একটু-একটু। রুবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আলী হেসে সালাম দিল। সুন্দর, সহজ বাংলায় আলাপ জুড়ে দিল। এমনি সময় রুবাই আর সাজ্জাদ এসে গেল ঐ পশ্চিম দিক থেকেই বাইক হাঁকিয়ে। পাশেই পেতে রাখা বিচ চেয়ারে সবাই বসে পড়ে সূর্যাস্ত উপভোগে ব্রতী হলাম। ছেলেমেয়েরা ছবি তুলল। মোরশেদও এসে গেল। আলাপ-পরিচয় সাঙ্গ হল। মোরশেদ একধামা চিনেবাদাম ভাজা এনে ফেলল আড্ডাধারীদের মাঝখানে। বাদামের খোসা ছাড়ানো, টপাটপ মুখে ফেলা আর অনর্গল উচ্ছ্বসিত বাক্যালাপের মাঝে অরুণদেব অস্তমিত হলেন।

সন্ধেবাতি জ্বলেছে। দু’টো মোটরবাইকে রুবাই-সাজ্জাদ আর আলী-মোরশেদ সওয়ার হয়েছে। মোরশেদরা যাবে ওদের আবাস হোটেল নীলাঞ্জনা, ছেলেমেয়ে বাজার ঘুরবে, তারপর আশ্রয়ে ফিরবে। পদচারী রুবি, আমি বিচের দোকান-পশার নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে ফিরছি। একফাঁকে বাস কম্পানির অফিসে ঢুকে দিনদুয়েক পরে ফেরার টিকিট নিয়ে নিলাম। তেলেভাজার দোকানে বসে মোগলাই পরোটা ভাজা দেখলাম। টাট্‌কা ক’টা ভাজিয়ে কেটেকুটে ক্যারি ব্যাগে নিলাম। আমরা মোটেলে ফিরে হাতপা ছড়িয়ে বসে পরোটা আর চা খেলাম। রাতে হাল্‌কা কিছু রুটি-ফুটি খাওয়া যাবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে শুয়ে শুয়ে কালি ও কলমের পাতা ওলটাতে থাকলাম। ওরা এসে গেল। রুবি সযত্নে ক্যাসেরোল থেকে পরোটা বের করে ওদের খেতে দিল। ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে নিল সাজ্জাদ। ওদের খুব ভাল লাগছে, বলল। ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারছে, আবার বাবামা সঙ্গেই আছেন।

সাড়ে ন’টার মধ্যে ওরা খেয়েদেয়ে ঘরে চলে গেল। আমি মশারি লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম। আগের রাতে ঘুম হয়নি। ভাবলাম, খুব ঘুমোব পড়ে কুম্ভকর্ণের মতো। বেশ ঘরোয়া ব্যবস্থা হওয়া সত্বেও সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এলো না। দেরি করে ঘুমনোর ফলে ভোরে ঘুম ভাঙেনি। উঠে দোতলার টানা বারান্দায় এদিক থেকে ওদিকে ঘণ্টাটাক্ দ্রুত পায়চারি সেরে নাশতা দিতে বল্লাম। আলী, মোরশেদ এসে যাবে। ওরা নীলাঞ্জনায় ঘুমোলেও ব্রেইকফাস্ট খায় পর্যটন মোটেলের রেস্তোরাঁয়। আমাদের তৈরি হবার আগেই আলীর ফোন এল। নিচে ওরা প্রাতঃরাশের টেবিলে বসেই জানান দিয়েছে।

নিচে নেমে দেখি, মোরশেদের বাইক আর দু’টো ভ্যান হাজির। হোটেল-মোটেল জোনের পাশ দিয়ে সমুদ্রের উপকূল ধরে বাঁধরাস্তায় চলে আধঘন্টায় আলীদের নির্মীয়মান রিজর্টে পৌঁছে গেলাম। অতি চমৎকার একটি কটেজ তৈরির কাজ ওরা প্রায় শেষ করে এনেছে। অনেকখানি জমি। মোরশেদের তাড়নায় একজন ঝট্ পট্ অতিথিসেবার জন্য কচি ডাব পেড়ে ফেলল। অমন স্বাদু ডাবজল অনেকদিন পান করা হয়নি। জায়গাটা বাঁধ থেকে শ’পাঁচেক গজ ভেতরে। লাগোয়া সবুজ ধানক্ষেত। তারও পরে গ্রাম। আর বাইরের দিকে বাঁধ। বাঁধের পর বঙ্গোপসাগর। ওদের কেয়ারটেকার বরিশালি উপভাষায় আলীর সঙ্গে দিব্যি প্রকল্প বিষয়ক আলাপ চালিয়ে যায়। আমি মন দিয়ে শুনি। আদ্যন্ত হার্দিক মিথস্ত্রিয়া চলছে এখানে। খবর লেখার কাজ থেকে ছুটি পেলে এখানে পড়ে থাকতে রাজি আমি, মনে মনে ভাবছিলাম। মনে পড়ে, কক্সবাজারে মোটেল লাবণি-র ম্যানেজার সাধুদাদা আমার হাত দেখে হেসে বলেছিলেন, দাদা, জীবনের শেষতক্ আপনার এরকম ছুটে বেড়ানোরই কপাল। ছুটি মিলবে ঐ একবারই। সবশেষে। লম্বা শ্বাসে বুক ভরে নিই নোনা বাতাস আর ছেলেমেয়েদের তাড়া দিই, চল, চল, তোমরা না আরো কোথায় কোথায় যাবে, ভ্যান ড্রাইভারকে তখন যে বলছিলে!

সকলে মিলে হেঁটে বাঁধের ওপর উঠে আসি। মোরশেদ মালাই ভাসানো চায়ের অর্ডার দিয়েছে। সমুদ্রকে পেছনে রেখে বাঁধরাস্তার ধারে টঙ সাজিয়েছে চা’ওলা চাচা নিত্য প্রয়োজনের মনিহারি জিনিষপত্রে। চা খেয়ে আমি আর আলী সাহেব বাঁধের ধার গড়িয়ে সমুদ্রের ধারে নেমে হেঁটে ফিরতে লাগলাম। রুবি, রুবাই, সাজ্জাদ ভ্যানে উঠল। মোর্শেদ বাইক চালিয়ে কোন দাপ্তরিক কাজে গেল। আলীর স্ত্রী রাশিদা ঢাকায় বিডিনিউজ অফিসে আমার সহকর্মী। আমরা অফিসের গল্প করতে করতে দ্রুত হেঁটে কুয়াকাটা পৌঁছে পল্লীর শুঁড়িপথে নতুন ও পুরনো বৌদ্ধমন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলাম। ওরাও ভ্যানে চড়ে সেখানে পৌঁছেছে। আমরা চারজন ওখান থেকে আলীকে রেহাই দিয়ে মিস্ত্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির দেখতে রওনা হলাম।

kua8.jpg…….
ভ্যানে করে মন্দিরে চলেছি, পাশে রুবি, পেছনে অ্যালিস্টার
……..
ভ্যানচালককে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, মোট রাস্তা ৯ কি.মি.-এর মতো হবে। মহাসড়ক ধরে উত্তরমুখো ভ্যান চলল। বেশ রোদ্দুর। অথচ ওদের কারো মাথায় টুপি নেই। আমি বাইরে কোথাও গেলে আমার মাথায় টুপি থাকে। এব্যাপারে এমনই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, আপনভুলে, ভ্রমণ শেষের আগেই কোথাও টুপি হারিয়ে ফেললে, যত শিগ্‌গির সম্ভব, বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে হলেও, আরেকটা যোগাড় করে মাথায় রাখতে হয়। টুপি পরতেই আমি জন্মেছি, স্ত্রী ঠাট্টা করে বলেন। যাকগে সে কথা। কিছুদূর গিয়েই ভ্যান ডানে ঘুরল। এবারে এবড়ো খেবড়ো কাঁচা রাস্তা। সেপথে নাচতে নাচতে, রবিবাবুর গান কোরাসে গাইতে গাইতে, আমরা একসময় মিস্ত্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দিরে পৌঁছে গেলাম। অমন বিশাল বুদ্ধমূর্তি ওই গণ্ডগ্রামে দেখব ভাবিনি। সিকিম-ভূটানে যদিও অনেক অবাক করা, সৌন্দর্যমণ্ডিত, এমনকি স্বর্ণখচিত বুদ্ধমূর্তি দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। এখানেও কুয়াকাটার বৌদ্ধ মন্দিরের লাগোয়া যেমন, তেমনি এক প্রাচীন কুয়া বা ইঁদারা রয়েছে। বোধকরি, সেকালে দেবস্থানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পানীয় জল সরবরাহের সুব্যবস্থা করা আবশ্যিক শর্ত ছিল। তাই যদি হয়ে থাকে, তবে এই ইঁদারা প্রতিষ্ঠা এক অত্যাবশ্যক জনকল্যাণকর পদক্ষেপ ছিল নিশ্চিত, যা এখনকার মানুষেরও মনোযোগ ও প্রশংসা কুড়োবে।

ফেরার সময় ক্ষুৎপিপাসায় সবাই একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে আবার মনোবল চাঙা করার চেষ্টা করলাম এবং ফল মিলল হাতে-হাতে। সবাই ঝিমুনি কাটিয়ে গলা মেলাল। মোটেলে পৌঁছে রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরির কথা বলে আমরা চট্‌জলদি ওপরে গেলাম হাতমুখ ধুয়ে পোশাক বদলাতে। রুবি, রুবাই স্নান সারল। খাওয়া সেরে একটু গড়িয়ে নিয়ে আবার বিকেলে বেরুব, ঠিক হল।

বিকেলে রুবাই, সাজ্জাদ বিশ্রাম নিয়ে আগেই বেরিয়ে গেছে। রুবি আর আমি চা খেয়ে নীলাঞ্জনায় গেলাম। আলী, মোরশেদ হৈ চৈ করে এগিয়ে এল। সাজ্জাদ, রুবাইকেও রুবি ফোন করে ডেকে এনেছে। সবাই মিলে দু’টো ভ্যানে চেপে ৩-৪ কি.মি. দূরে এক খ্যাপাটে ন্যাচারাল সায়েন্টিস্টের গবেষণাগার দেখতে গেলাম। আলীর সঙ্গে ভদ্রলোকের আলাপ হয়েছে। উত্তর ইয়োরোপের হিমশীতল অঞ্চলে উনি নাকি বহুদিন বাস করেছেন, মাছ ধরেছেন। শেষ বয়সে গ্রামের বাড়ি এই কুয়াকাটায় বসতি গেঁড়েছেন। ওর ল্যাবে নানা আকার ও আকৃতির কাঁচের জারে বঙ্গোপসাগরের জেলেদের জালে ধরা পড়ে, এমন ১৩০ প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর নমুনা দেখলাম। জারের গায়ে আঁটা লেবেল পড়ে যৎকিঞ্চিৎ জুলজি অধ্যয়নও হল। ফেরার পথে আলী জানান, সন্ধের পর বিচে আমরা ক্যাম্প করব। বারাক হোসেন ওবামা নির্বাচনে জিতেছে। তাই বারবিকিউ করে মাছটাছ খাওয়া আর কিঞ্চিৎ দাওয়া পানও চলতে পারে। কান্ডিশঞ্জ এপ্লাই। অফ কস্, আমি সোৎসাহে চেঁচাই। হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে আমরা ফিরে এলাম।

বার্বিকিউ আ লা কুয়াকাটা কোৎ দাজুর। কুয়াকাটার সাগরবেলায় আগুনে সেঁকে সামুদ্রিক মাছের কাবাব পার্টি। টেনিদার ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক্ ইয়াক্ মনে পড়ায় চেঁচিয়ে সেই দুর্বোধ্য মন্ত্র উচ্চারণ না করে পারলাম না। মেয়ে ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করল, ওটা কী হল, আব্বু? সাজ্জাদ মিটি মিটি হেসে আমার হয়ে কৈফিয়ৎ দিল, ওটা হল বিপুল আনন্দের অবারিত অভিব্যক্তি। ছেলেবেলায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা’র গল্পে পড়েছি আমিও। মোরশেদ আহবান জানালো, এসো, এসো মা, সাজ্জাদ এসো, তোমরা হলে বিশেষ অতিথি। বোস এইখানে। নিয়ে নাও তোমাদের পছন্দের পানীয়। এখানে লেমোনেড, টোমাটো জুস, বিয়ার আর তোমাদের সাহেব আঙ্কেলের স্কচ ফায়ার ওয়াটার—সব প্রস্তুত। মা, জুস খাও আর এই সেদ্ধ ডিমগুলোর খোসা ছাড়িয়ে ফেল তো বেশ করে। জমে উঠল আড্ডা। আলী ভাই স্টিলের শিকে গাঁথা আস্ত মাছ আর মুরগি উল্টে দিচ্ছিল মাঝে মাঝে, অলিভ অয়েলে চুবোনো বড় তুলোর টুকরো মাছমাংসের গায়ে বুলিয়ে দিচ্ছিল। নিচের ট্রেতে গন্ গনে কাঠকয়লার আগুন সমুদ্রের বাতাসে নিয়ন্ত্রিত জ্বলছিল। পানভোজন আর গল্পে বেশ রাত হল। এবার ফেরত যাত্রা। দোকানপাট তখন প্রায় সবই ঝাঁপ ফেলেছে। আলী, মোরশেদ ডানদিকে ওদের হোটেলের পথে চলে গেল হাত নেড়ে। আমরা ফিরে এলাম মোটেলে।

আমার তেমন ইচ্ছে না থাকলেও সূর্যোদয় দেখতে ওদের সঙ্গী হতে হল। সাজ্জাদ ভ্যান ওয়ালাকে বলে রেখেছিল। আঁধার তখনো কাটেনি পুরোপুরি। পাঁচটার আগেই রওনা হয়ে আমরা কুয়াকাটা ইকোপার্ক পর্যন্ত গেলাম। সৈকত স্বাভাবিকভাবেই জনশূন্য। আরো দর্শনার্থীদের অপেক্ষায় থাকতে হল। ওখান থেকে একটা পিকআপ ভ্যানে পুবদিকে গঙ্গামোতি যেতে হবে, যে স্থলবিন্দু থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যান্ত দুই-ই দেখা সম্ভব। তিন কিলোমিটার পথের দু’ধারে তখনো সাইক্লোন সিদ্‌রের ধ্বংসচিহ্ন। গঙ্গামোতি পৌঁছে পুবমুখো হয়ে অপেক্ষারত আমাদের ভাগ্যে অবশেষে বরুণদেব উদিত হলেন। চক্ষু সার্থক হল। ওরা ছবি তুলল। ফিরে এলাম মোটেলে। আমি দ্রুত পায়চারি সারতে সারতে ওরা স্নান সেরে নিল। ব্রেকফাস্ট খেলাম একসঙ্গে আমাদের ঘরে বসে। রুবাই, সাজ্জাদ আর এক দফা ঘুরতে গেল বাইক ভাড়া করে। আমরা ঘরে রইলাম বিশ্রামে।

রিসেপশ্যনে বললাম, আমাদের ১২টায় লাঞ্চ দেবেন, যাতে দেড়টায় স্বচ্ছন্দে ঢাকার বাসে উঠে বসতে পারি। শুয়ে বসে, পত্রিকার পাতা উলটে বেলা গড়াল। ছেলেমেয়ে ফিরেছে, লাঞ্চ খাওয়া হল। একটায় তৈরি হয়ে নিচে নেমে গেলাম। বিল পরিশোধ করে মজুমদারদের ধন্যবাদ জানালাম। ওদের আতিথেয়তা মনে থাকবে, বললাম। স্টাফদের সঙ্গে ছবি তোলা হল। আলী, মোরশেদকে ফোনে বললাম, ওরা ঢাকায় এলে অবশ্যই একটা জম্পেশ মিলনীর ব্যবস্থা হবে আমাদের আস্তানায়, রাশিদা এবং মিসেস মোর্শেদশুদ্ধ।

kua7.jpg
সৈকতে।

দেড়টায় আমরা ধীরেসুস্থে এগিয়ে মোটেলের গেটে দাঁড়ালাম। দেখলাম, বাস আসছে। মোটেলের ওয়েটাররা হাত তুলে বাস থামাল, ব্যাগ তুলল লাগেজ বক্সে, আমরা উঠে বসলাম সামনের চারটে সিটে। এবারে আমি, রুবি চালকের পেছনে, ছেলেমেয়ে বাঁ দিকে। আবার সেই পাঁচ নদী পার হওয়া! আসার অভিজ্ঞতা মনে পড়ায় আমি সিট হেলিয়ে শোল্‌ডার রেস্টে মাথা রেখে ভাতঘুম দেবার চেষ্টা করলাম। চোখ বুঁজে বাসের ইঞ্জিনের শব্দ, যাত্রীদের গুঞ্জন শুনতে শুনতে হঠাৎ কানে এল রুবাইয়ের উচ্চস্বর, ওই যে মোটর বাইকে আলী চাচা আর মোরশেদ চাচা, আব্বু দেখ। তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই। আলী সাহেবকে দেখে চালক গাড়ি থামিয়েছে। সামনেই প্রথম ফেরিঘাট আলিপুর। ওরা ওপার থেকেই আসছে। হাত নাড়ানাড়ি, কুশল বিনিময়, বিদায় নেয়ার পর বাস সামান্য চাকা গড়িয়ে ঢালুতে নেমে ফেরিতে উঠল। আমি না নামাতে পরিবারের কেউই নামল না। গ্যাঁট হয়ে সিটে বসে থাকার অপরাধে মনটা একটু ভার হল। কী করব, ভর দুপুরে রোদমাথায় আর নামতে মন চাইল না।

kua3.jpg
সৈকতে।

তেমন উপভোগ্য হবে না কুয়াকাটা থেকে পাঁচ-পাঁচটি নদী ডিঙিয়ে ৬ ঘন্টায় ১০০ কি.মি. পথ পেরিয়ে বরিশাল পর্যন্ত যাত্রাপথ—এই কথা জেনে গেছি—এই বোধই আমাকে অক্লেশে একবারও ছোট বাইরে যাবার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না। বরিশালে অতি স্বল্পকাল থেমে, যাত্রী তোলানামানো সেরে চালক যখন ঘোর সাঁঝবেলায় গোঁ গোঁ গর্জনে মসৃণ পথ বেয়ে, সাট্ সাট্ করে ঘণ্টায় ১৪০ কি.মি. বেগে চাকা ঘুরিয়ে বরিশাল, মাদারিপুর, শরীয়তপুর জেলার বুক চিরে, ঘুমিয়ে পড়া বাংলার গ্রামগঞ্জ দু’ধারে ফেলে রেখে পদ্মাপারে যাবার দৃঢ়সংকল্পে ব্রতী, আমি খানিক চোখ বুঁজে, একটুক্ষণ পরিচিত ল্যান্ডমার্কগুলো নিরীক্ষণ করে, অধীর আগ্রহে সামনের হেডলাইট উদ্ভাসিত কিলোমিটার খানেক পিচরাস্তা দেখতে থাকি। যাত্রীরা অনেকেই নিঃশব্দ, অনেকে ঝিমুচ্ছেনও।

kua1.jpg…….
কটেজের সামনে
……..
ঠিক ন’টায় চর জানাজাত ঘাটে পৌঁছেছিলাম। নেমে গিয়ে দোকানপাটের পেছনে দাঁড়িয়ে বৃক্কের চাপ কমালাম সর্বপ্রথম। সাজ্জাদ বলল, বাবা, আমরা কি ফেরিতে উঠে খাবারের অর্ডার দিতে পারি না? অবশ্যই, সানন্দ সম্মতি দিলাম। ছেলেমেয়েরা ফেরিতে উঠে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। আমাদের বাস ফেরিতে থিতু হওয়া পর্যন্ত রুবি, আমি অপেক্ষা করলাম। অতঃপর চালকের সঙ্গে আলাপচারিতা সেরে, খাওয়াদাওয়া বিষয়ে বিশদ জেনে নিয়ে আমরাও উর্ধ্বমুখী হলাম। ওপরে পৌঁছে দেখলাম, আমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছেলেমেয়ে সময় অপচয় না করে তিনতলার ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত’ লাউঞ্জের তালা খুলিয়ে, টয়লেট ফ্লাসিং করিয়ে, ডিনারের হুকুম দিয়ে আরাম্‌সে বসে পদ্মার হাওয়া খেতে খেতে বিটিভিতে ফ্রাইডে নাইট ফিচার ফিল্ম দেখছে।

kua9.jpg
কুয়াকাটা থেকে ১০ কিমি দূরে মিস্ত্রিপাড়া প্যাগোডা

এসে গেলো ধোঁয়া ওড়ানো রাশি রাশি যুঁইফুলের মতো ভাত, ইলিশের ঝোল, খাসির কালিয়া, আলু-পেঁপের তরকারি। সাদা, ভারি পোর্সেলিনের প্লেইটে খাবার পরিবেশন করছে ওয়েটার। চল্লিশ বছর আগে এই পদ্মাতেই পানির প্রবাহ ছিল ভয়ঙ্কর, কিন্তু স্টিমারে প্রথম শ্রেণীর লাউঞ্জে আতিথেয়তা ছিল ‘এ’প্লাস ক্লাসের। সে থাক্‌গে, বর্তমানে সন্তষ্ট থাকতে শেখ হে বান্দা, নিজেকে সেনশ্যূওর করি। ফেরি চলছে। খাওয়া সারা হলে আমরা সিনেমা দেখে সময় কাটালাম। চা খাওয়া হল দু’বার। মাওয়া পৌঁছে, ডাঙায় নেমেই আমাদের চালক আবার তার সুপারসনিক ড্রাইভিং-এর নমুনা দেখাতে প্রবৃত্ত হল। চল্লিশ মিনিটে বুড়িগঙ্গা সেতু পেরিয়ে যাত্রাবাড়ি সাউদিয়া অফিসের সামনে বাস দাঁড়িয়ে গেল। চালককে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা নেমে এলাম। বড় শ্যালক শফিক ভ্যান নিয়ে হাজির। মেয়ে জামাইকে ওদের সুবাস্তু ভ্যালির বাড়িতে নামিয়ে যখন নিজেদের আবাসে পৌঁছলাম, তখন রাত ১টা। রুবি অত্যন্ত দ্রুত হাতে পরোটা, ওমলেট আর পেঁপেসেদ্ধ করে টেবিলে রাখল। আরাম্‌সে গা জুড়িয়ে, সামান্য খেয়ে শুয়ে পড়ি এবং ক্লান্তিতে চোখ বুঁজি।

ঢাকা, এপ্রিল ২০০৯

mir.waliuzzaman@bdnews24.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব সুমন — মে ২, ২০০৯ @ ৭:০৭ পূর্বাহ্ন

      এক নিশ্বাসে পুরো ভ্রমণনামা পড়লাম। লোভ লাগিয়ে দিলেন এক্কেবারে। আমার তো ইচ্ছে হচ্ছে এখনি ছুটে চলে যাই কুয়াকাটা। ওখানে গেলে আলি ভাইয়ের ইকো কটেজে থাকবোই থাকবো। পুরোটা পরে মনে হয়েছে আমি নিজেই যেন ভ্রমণ করছি আপনাদের সাথে।

      – মাহবুব সুমন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এহসানুল কবির — মে ৪, ২০০৯ @ ৬:৪১ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার! বঙ্গে জন্মিয়াও অদ্যাবধি কুয়াকাটা সৈকতে না যাওয়ায় আত্ম-সেনশ্যুওর এবং অনতিবিলম্বে তথাগমনের দৃঢ়সংকল্প—দুইয়ের পালেই সমান হাওয়া দিল এ-লেখা।

      ধন্যবাদ, মীর ওয়ালীউজ্জামান। অভিনন্দন ও ঈর্ষা জানবেন।

      – এহসান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অন্তু মিয়া — মে ৬, ২০০৯ @ ২:৫৩ পূর্বাহ্ন

      সদাসুন্দরম দক্ষিণ বাংলায় প্রকৃতির কতোই অজানা রূপ এখনও অদেখা রহিয়াছে, যাহা না দেখিলে ভাষায় প্রকাশ করিবার নহে, লেখকের দর্শনলিপিতে তাহাই প্রস্ফূটিত হইয়াছে। হে বঙ্গবাসী, তোমরা পরপারে যাইবার পূর্বে অন্তত একবার সাগরকন্যার রূপ দেখিতে ভুলিও না।

      অন্তু মিয়া
      নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউর — আগস্ট ১৬, ২০০৯ @ ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

      কুয়াকাটা নিয়ে ভ্রমণের উপর লেখাটা পড়লাম। রিয়েলি নাইস। আমি কুয়াকাটা যাইনি… এখন ভাবছি যাব।

      – মশিউর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Santosh — জানুয়ারি ৩০, ২০১০ @ ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

      আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। ফাটাফাটি।

      – Santosh

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com