গল্প

আনিসুর রহমানের একগুচ্ছ অনুগল্প

আনিসুর রহমান | 29 Jun , 2019  


চিত্রকর্ম: জামাল আহমেদ

ফেসবুক স্ট্যাটাস

হ্যালো স্যার, সালাম স্যার।
আমি মহাখালি বাস টার্মিনালে
এই মাত্র বাস থেকে নামলাম।
আমি এখন কি করব?
কালকে সকালে আমার একটা চাকরির পরীক্ষা আছে।
আমি এখন টকশোতে যাচ্ছি। রাত বারটায় একটা টকশো। তুমি এক কাজ কর তোমার ফেসবুকে আমার একটা ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দাও এখনি।

মে দিবসের সম্পাদকীয়

বল কি বলতে চাস।
একটা কথা বলব?
বললাম তো বল।
স্যার…
স্যার স্যার বাদ দিয়ে কি বলতে চাস বলে ফেল। হাত কচলানোর কি হলো?
আপনার পত্রিকার মে দিবসের সম্পাদকীয় পড়েছি আমি।
পড়েছিস। ভালো করেছিস তো হয়েছে কি?
আমার বেতন?
তোর বেতন মানে?
আমার বেতন স্যার মাত্র পাঁচ হাজার। কাজ করি ১২ ঘণ্টা। মেস ভাড়া আড়াই হাজার।
স্যার আমার চলে না।
চলে না মানে কি? তাহলে কালকে থেকে আসিস না।

নারী দিবসের ডাক

হ্যালো আম্মু।
বল?
তুমি কেমন আছ? কি করছ?
কিছু না রান্নাবান্না শেষ হলো। তোর বাবা হাঁটতে বের হয়েছে।
উনি ফিরলেই খেতে বসব।
তুমি কি দেখেছ? আজ আমাদের নারী দিবসের সমাবেশ ছিল শহীদ মিনারে।
দেখেছি।
আমার বক্তৃতা শুনেছ?
শুনেছি।
কেমন হয়েছে?
ভালো হয়েছে।
শুধুই কি ভালো হয়েছে?
না বেশ ভালো হয়েছে। তবে একটা কথা বলি আমি তো সেকেলে মানুষ, তোদের এত কিছু বুঝি না।
একটা কথা ভালো শোন;
স্বামীর গাড়ি;
স্বামীর বাড়ি;
স্বামীর স্ট্যাটাস;
স্বামীর টাকা;
স্বামীর অফিসের স্টাফ;
স্বামীর কেনা শাড়ি গয়না পড়ে টিপটাপ সেজেগুজে স্বামীর কেনা গাড়িতে চড়ে শহিদ মিনারে গিয়ে নারী দিবসের বক্তৃতা দিবি, টিভিতে ছবি দেখাবে। পত্রিকায় ছবি ছাপাবে এই নিয়ে গদগদ হবি।
এটা কেমন কথা?
নিজের কাজ নিজে করবি।
নিজের টাকায় নিজে চলবি;
দেশের সাধারণ মেয়েদের জীবনের কষ্ট আগে বুঝবি;
তারপর শহিদ মিনারে গিয়ে নারীদের পক্ষে কথা বলে দেখিস কেমন লাগে।
তখন আমাকেও জিজ্ঞেস করিস।

প্রাইভেট টিউটর
স্যার আপনি কি আমাকে একটা গল্প শোনাবেন?
শোনাব তবে পড়াটা আগে শেষ কর।
আচ্ছা স্যার, তাহলে আপনি চা টা খেয়ে নিন।
আমি অঙ্কটা করে ফেলি।
তুমি একটা বিস্কুট নাও।
না, স্যার। আমরা এই বিস্কুট খাই না।
কেন খাও না।
এই বিস্কুট আমাদের বাসার কুকুরে খায়।

দাদা দাদী

আম্মু!
বল।
আচ্ছা আমাদের ক্লাশের সকলের দাদা আছে দাদী আছে,
আমার নাই কেন?
তোরও আছে।
তাহলে ওরা কোথায়?
ওরা গ্রামে।
ওরা এখানে থাকে না কেন?
ওরা এখানে থাকলে তুই থাকবি কোথায়? এতো জায়গা কই?
তাহলে আমরা গ্রামে যাই না কেন?
প্যান প্যান বন্ধ করে পড়াটা মুখস্থ কর।

রাজধানী কলাপারা উন্নয়ন মহাবিদ্যালয়

হ্যালো!
হ্যালো আমি রাজধানী উন্নয়ন মহাবিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল মনজুরুল তালুকদার বলছি।
জ্বি স্যার।
এটা কি রূম্পাদের বাসা।
জ্বি স্যার।
আমি কি রূম্পার সঙ্গে কথা বলতে পারি?
স্যার, আমি রূম্পা।
ও তুমি। তাহলে ভালোই হলো। কলেজে তোমাকে একটা কথা বলব বলে বলা হয়নি। তাই ভাবলাম তোমাকে ফোনেই বলি।
বলুন স্যার।
আচ্ছা তুমি মোবাইল ফোন ব্যবহার কর না কেন?
আমার মোবাইল একটা আছে পুরনো মডেলের। ওটার নম্বর কেবল আম্মুর কাছে আর আব্বুর কাছে আছে। খুব জরুরি হলে ওনারা যোগাযোগ করেন।
আর আমার দরকার হলে আমি যোগাযোগ করি। স্বাস্থ্যগত কারণে আমরা আমাদের মোবাইল ব্যবহার সীমিত রেখেছি। আমার বাবা নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ তো, এই জন্যে। মোবাইলে বেশিক্ষণ কথা বললে কানের ক্ষতি হয়।
ও তাই না কি? তুমি স্মার্ট ফোন ব্যবহার করলেই তো পার। তখন ফেসবুক, ইমেইল, হুয়াটস আপ এগুলোতে যোগাযোগ করবে।
এ সবের দরকার কি স্যার। আর আমি যতক্ষণ কলেজে ততক্ষণ তো ক্লাশ আর পড়াশোনা নিয়ে ব্যাস্ত। এর পর হয় লাইব্রেরি প্রয়োজন হলে, নয় বাসা।
ও বুঝেছি।
কেন ফোন করেছিলেন স্যার? আম্মুর সঙ্গে কোনো কথা ছিল?
না। তোমার সঙ্গেই কথা ছিল।
বলুন স্যার।
তোমাকে একটা কথা বলি, কাউকে আবার বলো না। তুমি যে আজকে নীল শাড়ি পড়ে কলেজে এসেছিলে যা সুন্দর লাগছিল না। তাই ভাবলাম কথাটা তোমাকে না বললে কেমন হয়।
এই জন্যে কষ্ট করে স্যার আমাকে ফোন করলেন? আম্মুকে বলতে হবে তো আম্মু শুনে খুশি হবে। আম্মুই আমাকে রেডি করে দিয়েছিলেন তো।
কেন কেন? সব কথা আম্মুকে বলতে হয় না কি?
আমার সব কথা আম্মুকে বলি। না বললে আমার পেটে কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে যায়। আমার ছটফট লাগে। তাছাড়া আমাদের টেলিফোনের সব কথোপোকথন রেকর্ড করার ব্যবস্থা আছে। কারণ প্রায়ই আলতু ফালতু টেলিফোন আসে। মাঝে মাঝে হুমকি দিয়েও।
তাই। তাহলে তো সমস্যা। আগে বলবে তো!
স্যার, সমস্যা কিছু নাই উপায় একটা আছে।
কি উপায়?
উপায় হলো আপনি ভালো হয়ে যান। আপনি তো আমাদের ক্লাশের আরো অনেক মেয়েকেই ফোন করছেন।

মন্ত্রীর প্রতিবেশি

এই তুই কে?
আমি টোকাই স্যার। আপনি কে?
আমি ঠ্যাঙামারা টেলিভিশনের সাংবাদিক। কি করস?
কাগজ কুড়াই।
খাস কি?
যখন যা পাই। না পাইলে না খাই।
তোর বাড়ি কই।
বাড়ি নাই স্যার। আমরা খাদ্যমন্ত্রীর এলাকার লোক।
এখন থাকস কই।
রাজধানী শহরে।
রাজধানী শহরের কোথায়।
ঐ যে মন্ত্রীগোর বাসাগুলা চিনুন স্যার?
চিনি।
মন্ত্রীদের বাসাগুলোর শেষ মাথায় যে বাড়িটা আছে না।
আছে।
তার বাড়ির পরে একটু পার্কের মতো, পার্কের পরে একটা বাউন্ডারির পরে বড় একটা খাদের মতো। খাদের অই খানে, একটা রাস্তা, রাস্তার পারে একটা দোকান, অই দোকানের পেছনে একটা পলিথিন প্যাচাইয়া ঘুম দেই।
দোকানের পেছনে চিপা মতো একটা জায়গা ওখানে পলিথিন মুড়ি দিয়ে দেই এক ঘুম।
এক ঘুমেই রাত কাবার।

আমেরিকার ভিসা

হুজুর একটা কথা বলব?
বল।
আচ্ছা আপনার বিবিসাবরে নিয়ে আপনি যখন আমেরিকার ভিসার জন্যে খাড়াইয়াছিলেন তখন ফটো কেমনে উঠাইছিলেন। কান চোখ নাক মুখ কপালসহ পুরো মুখম-ল না কি শুধু চোখ দুইটা?


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.