চিত্রকলা

রাইনার মারিয়া রিলকের চোখে ওগিস্তা রোদ্যাঁ: সৃষ্টিসুখের নীরব ভাষায়

দেবব্রত চক্রবর্তী | 30 Jun , 2019  


ছবি: ওগিস্তা রোদ্যাঁ

রাইনার মারিয়া রিলকে রোদ্যাঁর ওপর যে মনোগ্রাফ লিখেছিলেন তারই একটি অংশ, যার মূল শীর্ষক ছিল ওগিস্তা রোদ্যাঁ৷ এটি মূল জার্মান ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন জার্মান ভাষা ও সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ দেবব্রত চক্রবর্তী৷ একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সৃষ্টিতরঙ্গের অভিঘাত এই রচনার মধ্যে ধরা পড়েছে, যার আশ্চর্য প্রতিবেদন সৃষ্টিসুখের বিশ্বরূপ তুলে ধরবে৷

এই রচনার কাল ১৯০২-এর মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বর৷রিলকে রোদ্যাঁর সান্নিধ্যে ব’সে মাত্র এক মাসের মধ্যে এটি শেষ করেছিলেন৷এর পর রোদ্যাঁর কাছ থেকে তিনি চলে আসেন৷ ১৯০৫-এর সেপ্টেম্বর থেকে মে ১৯০৬ পর্যন্ত তিনিই আবার রোদ্যাঁ-র সচিব হন৷ একটি অকিঞ্চিৎকর ঘটনায় রোদ্যাঁ তাঁকে তাঁর চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেন, তবে পরে ১৯০৭ সালে তাঁদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হয় ও সম্পর্কের উন্নতি হয়৷ আবার নৈকট্যের কাল ১৯০৮-১৯১১ পর্যন্ত৷ রোদ্যাঁ বলেছিলেন, তাঁর যতগুলি জীবনী লেখা হয়েছে, রিলকে-র জীবনীটিকে তিনি শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করেন৷ ১৯১৩ থেকেই বস্তুত তাঁদের গভীর বন্ধুতার সূত্রপাত৷

এটি বই হয়ে বেরোবে খুব শিগগীর৷


যশস্বী হবার আগে রোদ্যাঁ বড়ো নিঃসঙ্গ ছিলেন। যশ যখন এল, তখন ওই যশই তাঁকে আরও
নিঃসঙ্গ করে তুলল। কারণ খ্যাতিই যত রকম ভুল বোঝাবুঝির মূল, একটা নতুন নামকে
সে ঘেরাটোপ পরিয়ে দেয়।

রোদ্যাঁকে ঘিরে রয়েছে অজস্র মানুষ, তাদের কাছে তাঁর ভাবনার মর্ম বোঝাতে যাওয়া,
সে এক দীর্ঘ একঘেয়েমির কাজ, বড়ো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। দরকারও তো নেই সে সবের;
আসলে ওরা তাঁর নামগান নিয়েই পড়ে আছে, কাজের গুণগান নয়। আর রোদ্যাঁর কাজ তাঁর
নামের সীমা ছাড়িয়ে বহুদূরে গিয়ে বাড় বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে, সেখানে তার কোনও নাম নেই,
যেমন একটা সমতলভূমির কোনও নাম হয় না, একটা সমুদ্রের নাম থাকে শুধু মানচিত্রে,
বইতে আর মানুষের মুখে, আসল কথাটা হল বিশালতা, গতি আর গভীরতা৷

তাঁর যে-কাজের কথা নিয়ে এখানে আলোচনা করতে চলেছি, তার বৃদ্ধি ঘটে চলেছে বহু বছর
ধ’রে এবং প্রতিদিনই সেটা বেড়ে চলেছে যেন অরণ্যের মত, এক ঘন্টা থামবার ফুরসৎও সে
পায়নি। মানুষ তাঁর সৃষ্ট হাজারো সামগ্রীর মধ্যে ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাঁর ভাণ্ডারের
পূর্ণতা ও আবিষ্কারের প্রাচুর্যেও তারা আপ্লুত হচ্ছে, কিন্তু সবার আগে তাদের চোখে পড়ছে দুটি
হাত যা থেকে এই পৃথিবীটা বেরিয়ে এসেছিল। সকলেই জানেন মানুষের হাত কত ছোট হয়,
কত তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে, আর কাজে লেগে থাকবার জন্যেও তার কতটা সময়
ধরা আছে। কিন্তু সকলে দেখতে চায় কেবলমাত্র সেই হাতদুটি, যা শত শত হাতের মত
জীবনযাপন করেছে, যেন একটা হাতের জনজাতি সেটা, এবং সূর্য ওঠবার আগেই ঘুম থেকে
উঠে কাজের পথে যে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। সবাই জানতে চাইছে, এই হাতকে এত
সক্রিয় ক’রে রেখেছে কে? কে সেই মানুষ?

মানুষটা একজন বৃদ্ধ। আর তাঁর জীবনটাও এমন, যার কথা কোনও গল্পে লেখা নেই। এই
জীবনটা তার শুরু হয়েছিল নিশ্চয় একসময়, এখনও ঠিক একইভাবে চলছে এবং ক্রমশ
গভীর বার্দ্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাবলে মনে হয়, তাঁর জীবন যেন বহু শত বছর আগে
অতিবাহিত হয়েছিল, কিন্তু কিছুই জানি না আমরা সে সম্পর্কে। সম্ভবত তাঁর শৈশবও ছিল
একটি, কোনও একটি শৈশব, দারিদ্র্যের শৈশব, অন্ধকার, টালমাটাল, অনিশ্চিত। আর সেই
শৈশব তাঁর ধরা আছে এখনও, কারণ সেন্ট আউগুস্তিনুস একবার একটা কথা বলেছিলেন:
যাবে কোথায়? বিগত সব প্রহরগুলি তাঁর হাতে ধরা আছে, প্রত্যাশার প্রহর এবং ত্যাগের
প্রহর, সংশয়ের এবং অভাবের দীর্ঘ প্রহর তাঁর হাতে। এ এমন এক জীবন যা কিছু হারায়নি
এবং কিছু ভুলেও যায়নি; এমন এক জীবন, যা সব-কিছু চলে যায় ব’লে সব-কিছু ধ’রে
রেখেছিল। আমরা বোধ হয় সে সবের কোনও খবরও রাখিনি। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস,
এইরকম একটি জীবন থেকেই কাজের এমন পরিপূর্ণতা ও প্রাচুর্য উঠে আসা সম্ভব। এ এমন
এক জীবন, যার মধ্যে সব কিছু একই সময়ে বর্তমান, সব কিছু সজাগ, কিছুই তা থেকে
বিচ্যুত হয়ে যায়নি। সবসময় একই রকম সতেজ ও শক্তসমর্থ হয়ে বাঁধা থাকতে পারে তা এক
উচ্চতর গুণলক্ষণে। একদিন হয়তো সেই সময় আসবে যখন মানুষ তাঁর জীবন ও ইতিহাস
উন্মোচন করবে, তাঁর জীবনের বহু পরতের ভাঁজ, নানান গল্প ও খুঁটিনাটি জানতে পারবে।
ওইগুলিকে তখন আবিষ্কার করতে হবে। মানুষ একটা শিশুর কথা বলবে যে কখনও কখনও
খেতে ভুলে গেছে, কারণ তার কাছে আরও দরকারী মনে হয়েছে একটা ভোঁতা ছুরি দিয়ে
যেমন-তেমন একটা কাঠকে খোদাই করবার কোনও কাজ, লোকে হয়তো সেই মানুষটির
বালক বয়সের এমন কোনও ঘটনা শোনাবে, যার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল ভাবীকালের কোনও
প্রতিশ্রুতি, এমন কোনও ঘটনা, যার মধ্যে নিহিত ছিল ভবিষ্যৎকালে তাঁর মহৎ হযে ওঠার
কাহিনী, এবং তা ছিল মাটির কাছাকাছি যা মানুষের মনকে ছুঁয়ে যায়। এ কোনও এক ঋষির
উক্তি যিনি হয়তো পাঁচশ বছর আগে মিশেল কোলোম্বো-কে বলেছিলেন, “কাজ করে যাও হে
ছোকরা, চোখ ভরে দেখে নাও সেইন্ট পোল-এর উন্মুক্ত ঘন্টামিনার, দেখো তোমার
সহকর্মীদের, যাঁরা দায়িত্ব নিয়ে ওই সূক্ষ্ম কাজগুলি করেছিলেন, আর ভগবানকে ভালোবাসো,
তবেই মহতের আশীর্বাদ পাবে।”১ “তাছাড়া মহতের সঙ্গে যুক্ত থাকবার আনন্দও গ্রহণ করতে
পারবে।” অন্তরের একটা অনুভূতিই হয়তো এমন ছিল, যা ঋষিদের মুখনিঃসৃত ওই কন্ঠস্বরের
মত ছিল না, ছিল প্রায় অশ্রুত অবস্থায় মনের ভেতরে লুকিয়ে, আর সেই কথাটাই যুবক
শুনতে পেয়েছিলেন জীবনের গোড়ায় একটা সন্ধিক্ষণের উপর পা রেখে। ওইটাই খুঁজতে
লাগলেন তিনি: মহতের সঙ্গে যুক্ত থাকবার আনন্দ। লুভ্র-র অনেকগুলি পুরাতাত্ত্বিক বস্তুর গা
থেকে যে আলো এসে পড়েছিল, তার ছটা তাঁর মনে জাগিয়ে তুলল দক্ষিণের আকাশ ও
সাগরের নৈকট্য, যার পিছনে জাগরূক অন্য ভারী প্রস্তরীভূত সব বস্তু, আর তার গায়ে যুগ
যুগ ধরে দীর্ঘায়িত এমন সব অচিন্ত্যপূর্ব সংস্কৃতি যার সময়কাল এখনও অধরা। ওইখানেই তো
ঘুমিয়ে রয়েছে যত পাথর, আর ক্রমে একটা অনুভূতি গড়ে উঠছে যে তারা যেন জেগে উঠবে
এক পুনরুত্থানের দিন, পাথর হলেও মৃত্যুর কথা লেগে নেই ওদের গায়ে। পাথর আরও ছিল
অবিশ্যি ওখানে, যাদের মধ্যে ধরা ছিল এমন সব গতিবিধি, এমন ভঙ্গিমা, আর এত জীবন্ত,
যে মনে হবে ওদের বোধ হয় কেউ সযত্নে পাহারা দিয়ে রেখেছে, যেন একদিন হঠাৎ এদিকে
ছিটকে চলে আসবে কোনও শিশু, যার হাতে তুলে দেওয়া হবে ওই জাগিয়ে রাখা জীবন। এই
সপ্রাণতা যে শুধু নাম-করা কতকগুলো কাজের ভেতর কিংবা ধরা যাক চোখে-পড়বার-মত
শিল্পবস্তুর মধ্যেই দেখতে পাওয়া যাবে তা নয়, যে সব শিল্পবস্তু আমাদের চোখে পড়েনি, সেই
ছোট্ট নামহীন অসংখ্য কাজের মধ্যেও দেখা যাবে এই গভীর ও অন্তর্মুখী উত্তেজনা প্রাণপণে
মিলে মিশে রয়েছে, আর তার মধ্যে ভ’রে আছে জীবনের একটা সমৃদ্ধ অস্থিরতা, বিস্ময়ের
অশান্তি। এমন কি যে স্তব্ধতা, অর্থাৎ যেখানে যেখানে সে স্তব্ধতা ছিল, তা কত শত গতির
মুহুর্তকে একটা সুন্দর ভারসাম্যে ধ’রে রেখেছে। ছোট ছোট কতকগুলি মূর্তি, বিশেষ করে
প্রাণীদের মূর্তি ছিল কতকগুলি, সেগুলি যেন নড়াচড়া করছিল, হাত পা ছাড়াচ্ছিল, নয়তো
গুটিয়ে বসে ছিল। পাখিটা হয়তো বসেই আছে কিন্তু লোকে মনে করছে যে ওই পাখিটার গা
থেকে আকাশ উজিয়ে উঠে এসে তাকে ঘিরে ফেলেছে। যেন একটা বিপুল সুদূর তার পালকে
পালকে ভাঁজ হয়ে রয়েছে, শুধু মানুষের একটু হাত লাগানোর অপেক্ষা, আর তা হলেই যেন
পাখাদুটো ছড়িয়ে গিযে সে বিরাট আকার ধারণ করবে। অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সেই একই
রকম, মনে হচ্ছিল যে তারা যেন ক্যাথিড্রাল-এর কার্নিসে কার্নিসে ব’সে অথবা দাঁড়িয়ে, কিংবা
গুটিয়ে কুঁকড়ে ব’সে ছিল, নিজেদের ভারটা পর্যন্ত বইতে পারছিল না। এছাড়া ছিল কুকুর,
কাঠবেড়ালি, কাঠঠোকরা আর টিকটিকি, কচ্ছপ, ইঁদুর আর সাপ। সব কিছুই অন্তত একটা
ক’রে। বোঝা যাচ্ছে সবগুলিকেই খোলা জায়গা থেকে ধরা হয়েছিল, নয়তো বনে কিংবা পথের
ওপর থেকে, কিন্তু পাথরের তৈরি লতার আকর্ষ, ফুল কিংবা পাতার রূপকাঠামোর মধ্যে গিয়ে
বাস করতে বাধ্য হয়ে তারা এখন যেভাবে আছে এবং এখন থেকে যেভাবে তাদের থাকতে হবে
তার সত্যটা তারা মেনে নিয়েছে এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই নিজেদের ধীরে ধীরে বদলে
ফেলেছে। এমনও হয়েছে যে মনে হচ্ছে জীবগুলো সব একসময় এই প্রস্তর-পরিবেশেই জন্ম
নিয়েছিল, যেন আগের আর কোনও সত্তার স্মৃতিতেই তারা আটকে নেই। ওরা যেন এক ঋজু,
উত্থানপর ও খাড়াই জগতের বাসিন্দা। তাদের অদ্ভুত হাড় জিরজিরে মূর্তির দলভুক্ত হয়ে
দাঁড়িয়ে রয়েছে খোঁচা দেওয়া খিলানের ভঙ্গিমায় কতকগুলি কঙ্কাল। মুখগুলি হাঁ করা, চিৎকার
করছে যেন বধিরদের সামনে বসে আছে, কারণ পাশেই ঘন্টা থাকার জন্য তাদের কানগুলির
সব বারোটা বেজে গেছে। শরীরের ভারটা ওদের আর বইতে হয়নি, এমনভাবে ছড়িয়ে গিয়েছে
যে তাতেই যেন পাথরগুলি নিজে থেকে ঠেলে উঠে পড়েছে। পাখির মত দেখতে যেগুলি, সেগুলি
সব সূক্ষ্মাগ্র ছোট ছোট স্তম্ভের ওপর উবু হয়ে ব’সে, মনে হয় যেন আসলে ওরা পথে বেরিয়ে
পড়েছিল, আর তারপর কয়েক শত বছর ধরে বিশ্রাম নেবার ইচ্ছায় নিচে পরিবর্দ্ধমান শহরের
দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। কতকগুলো মূর্তি আছে যেগুলি দেখতে কুকুরের মত, ছাদের
বাড়ানো কানাতের সঙ্গে আনুভূমিক অবস্থায় বাতাসের মধ্যে যেন তৈরি হয়ে ব’সে পড়েছে
তারা, যেন প্রতিশোধস্পৃহায় মুখ ফুলিয়ে ফুলিয়ে বমি ক’রে বৃষ্টির জল বার ক’রে দেবে।
দেখাই যাচ্ছে সকলে নিজেদের বদলে ফেলছে বেশ, মানিয়ে নিচ্ছে নতুন পরিবেশর সঙ্গে;
জীবনে যেন কিছুই ফেলা যায়নি, বরং আরও কঠিনভাবে, দাপটের সঙ্গে তারা বাঁচতে
চাইছে, বেঁচেও আছে চিরকালীনতায় একটা গভীর অন্তরঙ্গ ও ঝঞ্ঝার আবহে, এবং
এমন একটা সময়ের মধ্যে যে সময়ের বুক ঠেলেই তারা সঠিক বেরিয়ে এসেছে।


ছবি: ওগিস্তা রোদ্যাঁকে নিয়ে লেখা রাইনার মারিয়া রিলকের বইয়ের ইনার

কিন্তু যারাই এই মূর্তিগুলো দেখেছে, তারা বুঝতে পারবে যে এর কোনওটাই কোনও
খামখেয়ালীপনা থেকে উঠে আসেনি কিংবা খেলাচ্ছলে তৈরি হয়নি; এমন কি এগুলি নতুন এবং
অশ্রুত কোনও আকৃতির মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে ওরা সৃষ্ট হয়েছে একটা অভাব
থেকে। মানুষের কঠিন বিশ্বাসের মধ্যে নিহিত যে অদৃশ্য আদালত, তারই ভয় ও ত্রাস থেকে
নিজেদের মুক্ত করবার জন্য মানুষ নিজেকে এই দৃশ্যবস্তর মধ্যে রক্ষা করে রেখেছে,
অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচবার জন্যেই মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছে এই মূর্ত রূপের মধ্যে। নিজেদের
ভক্তি প্রকাশের জন্য তার ঈশ্বরের কোনও ছবি রচনা করেনি, চেষ্টা করেনি বহুদূর নিবাসী
কোনও একজনকে কল্পনায় ধরে ফেলতে। বরং তারা সবরকম ভয় ও দারিদ্র্য, আতঙ্ক ও
নম্র আচরণ সম্বল করেই ঈশ্বরের ভবনে গিয়ে পৌঁছেছে, তাঁর হাতে তার অর্ঘ্য তুলে দিয়েছে
এবং এই সমস্ত কিছু তাঁর হৃদয়ে স্থাপন করে তাদের মনের ধর্মটুকু প্রকাশিত রেখেছে। এ
কাজগুলি চিত্রাঙ্কনের চেয়ে অনেক ভালো : কারণ আঁকার কাজটাই যেন একটা ভ্রান্তিবিলাস,
একটা সুন্দর এবং দক্ষ প্রতারণা। লোকে চায় বরং বাস্তব একটা কিছু, একটা সাদাসাপটা
জিনিস। এইজন্যেই ক্যাথিড্রাল এর অত অদ্ভুত ভাস্কর্য, ঝাঁক ঝাঁক বস্ত ও প্রাণীদের ব্যাকুল
পদযাত্রা।

মানুষ এক সময় মধ্যযুগীয় প্লাস্টিক আর্টের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে প্রাচীন যুগের
নিদর্শনের দিকে তাকিয়েছিল, তার পর আবার তার দিক থেকে মন সরিয়ে নিয়ে অনির্ণীত
অতীতের গোড়ায় চোখ রেখেছিল। তাদের কি একথা মনে হয়নি যে ইতিহাসের উজ্জ্বল ও
অন্ধকার মোড় ধ’রে মানবাত্মা বারবার কেন শিল্পের এই মাধ্যমটাকে বেছে নিচ্ছে? শব্দ ও
চিত্রশিল্পের চেয়ে, রূপক ও প্রতীয়মানের চেয়ে এই মাধ্যম কি অনেক বেশী আমাদের দেয় না?
এই আর্টের মধ্যেই মানুষের ব্যাকুলতা ও ভয়ের যেন একটা সরল বস্তুরূপ মূর্ত হয়ে ওঠে।
রেনেশাঁস-এর শেষ দিকে প্লাস্টিক আর্টের সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছিল। জীবন তখন নতুনভাবে
পল্লবিত হয়ে উঠেছিল, মুখের গোপন রহস্য উম্মোচিত হয়েছিল এবং শরীরের বিভিন্ন
অভিব্যক্তি যে কত ঐশ্বর্যপূর্ণ হতে পারে তার একটি পরিচয় ঘটছিল।

আর এখন? এখন আবার সেই সময়টা এসেছে, যুগ আবার সেই পুরোনো অভিব্যক্তি খোঁজার
একটা তাগিদ তৈরি করে দিচ্ছে। যা ছিল অনির্বচনীয়, বিভ্রান্তিকর এবং রহস্যাবৃত, তা একটা
জোরালো অর্থময়তা ও ব্যঞ্জনা নিয়ে একগুঁয়ের মত সামনে এগিয়ে এসেছে। শিল্প কোনও না
কোনওভাবে নবীকৃত হয়েছে, প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা আর প্রত্যাশায় ভরে উঠে সে যেন
আবার সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছে। সম্ভবত এই শিল্প, এই প্লাস্টিক আর্ট এক বিশাল ব্যাপক
অতীতের ছায়ায় এস্ত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ছিল, যাকে অন্যেরা ব্যাকুল হয়ে তাহরে স্পর্শ করে দেখতে
চেয়েছিল, তাকেই আবার খুঁজে ডেকে আনা হয়েছে। এই আর্টের কাজ এমন একটা সময়কে
সহায়তা করা যার উদ্বেগ ওই অদৃশ্যের মধ্যেই নিহিত একটা দ্বন্দ্বের ভিতর থেকে উঠে এসেছে।
ভাষাই ছিল তার শরীর। মানুষ কখন এই শরীরটাকে সর্বশেষ দেখেছে? তার দেহের উপর
পরতে পরতে একটা একটা করে পোশাক পরিয়ে দেয়া হয়েছে, যেন বারবার তার ওপর নতুন
ক’রে রঙের পোঁচ, কিন্ত যেই এক রুদ্ধশ্বাসে তার মুখের অভিব্যক্তির ওপর কাজ শুরু হয়েছে,
অমনি ওই বর্মের তলে তলে গড়ে ওঠা আত্মা নিজেকে আবার বদলে নিয়েছে। সে তখন
অন্যরকম। এখন তার মধ্যে ঢুকে পড়া নামহীন ও নতুন হাজারো যে সমস্ত সম্ভাব্য অভিব্যক্তি
ধরা ছিল সেগুলিকে কেউ যদি অনাবৃত করে, তাহলে দেখা যাবে যে প্রতিটি পুরোনো রহস্যই
অচেতন অবস্থা থেকে উদগত হয়েছে এবং স্রোতস্বী অচিন দেবতাদের মত রক্তের মোহাবেশ
থেকে ঝরে পড়া সিক্ত মুখ তুলে ধরছে। পুরাতাত্ত্বিক বস্তুর চেয়ে এই সব শরীরগুলি কিন্তু কম
সুন্দর নয়, বরং আরও বড়ো, আরও মহৎ সৌন্দর্যের শরিক ওরা। দু হাজার বছর ধরে
মানুষের জীবন ওদের হাতে ধরে রেখে দিয়েছে, তার ওপর কাজ করেছে, কান পেতে শুনেছে
তাদের কথা, দিন রাত হাতুড়ি পিটিয়েছে তাদের ওপর। চিত্রশিল্প যা সে তো ওই শরীরগুলিকে
কেবল স্বপ্নে ভেবেছে, তাদের গায়ে আলোর অলঙ্কার চড়িয়ে আলো আঁধারীর মধ্যে ঠেলে
দিয়েছে, তাদের ঘেরাটোপ পরিয়ে দিয়েছে কোমলতার, সমস্ত রকমের মুগ্ধতা তাদের গায়ে
জড়িয়ে দিয়ে ফুলের পাপড়ির রূপকল্পে অনুভব করেছে তাদের, আর এগিয়ে দিয়েছে তরঙ্গের
অভিঘাতে। কিন্তু প্লাস্টিক আর্ট, এই যে কর্মকাণ্ডটা, সেটা এই পৃথিবীর মতই বিশাল। আর
যে মানুষটা এর সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার দিকে একভাবে চেয়ে থেকেছে, সেই লোকটা সম্পূর্ণ
অচেনা একজন মানুষ, রুটির জন্যে নিছক অন্ধকারে এসে সে হাত বাড়িয়েছে। একেবারেই
নি:সঙ্গ লোক, তবু যদি সে সত্যিকারের কোনও স্বপ্ন দেখতে পারত, তাহলে একটা সুন্দর
গভীর স্বপ্ন দেখবার অধিকারই তার ছিল, অর্থাৎ এমন একটা স্বপ্ন, যেটা বোঝবার সাধ্য ছিল
না কারও, আর এই দীর্ঘ স্বপ্নের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে জীবনটা তার একটা গোটা দিনের
মতই অতিবাহিত হয়ে যেতে পারত। এই যে যুবক যিনি কিনা সভ্রেস এর একটা কারখানায়
কাজ করতেন, তিনি ছিলেন অমনি একটা স্বপ্ন-দেখিয়ে। স্বপ্ন সড়সুড় করে তাঁর হাতের উপর
গিয়ে উঠত আর সেটা সঙ্গে সঙ্গে কাজে রূপান্তরিত হয়ে যেত। তিনি বুঝতে পারতেন কাজটা
কোথা থেকে শুরু করতে হবে, একটা ধীর শান্তি ছিল তার মনে, আর সেটাই তাঁকে
সত্যিকারের পথ দেখিয়ে দিত। ঠিক এই জায়গাটাতেই প্রকৃতির সঙ্গে রোদ্যাঁর একটা গভীর
সন্ধির স্থান। কবি গেয়র্গেস রোডেনবাখ২ এই নিয়েই একটা চমৎকার কথা বলেছেন, বলছেন
ওটাই আসলে তাঁর সহজাত শক্তি। বস্তুত এ হল রোদ্যাঁর মনের ঘনীভূত ধৈর্য, এক
একাগ্রচিত্ততা যা এই রোদ্যাঁ নামের ব্যক্তিটিকে নামহীন করে রেখে দেয়, এমন এক শক্তি যার
মধ্যে ধরা থাকে নৈ:শব্দ্য, এমন এক ক্ষমার সূত্র, যা এক তুরীয় স্থৈর্য্যেরই নামান্তর, চুড়ান্ত স্থির
মনের এক স্বভাবজ মঙ্গলবোধ, যার শুরু হয় শূন্য থেকে, কিন্তু যা গভীর অন্তরঙ্গতার সঙ্গে
নি:শব্দে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পৌঁছে যায় প্রাচুর্যের ভিতর। একটা গোটা গাছ গড়ে তুলবার
মত ভুল তিনি করেননি। তাঁর কাজ তিনি শুরু করেছেন মাটিতে একটা বীজ তৈরির মধ্য
দিয়ে। আর এই বীজ যে উপ্ত হয়েছে সেটাও নিচের দিকে, নিচের দিকেই সে তার একটার পর
একটা শিকড় চালিয়ে দিয়েছে, আর একটি কচি পল্লব ওপরের দিকে পাঠিয়ে দেবার আগে সে
নিজের নোঙর থিতু করে নিয়েছে নিচে। সময় লেগেছে, প্রচুর। তাঁর চারপাশের অল্প কতিপয়
বন্ধু যাঁরা তাঁকে এ ব্যাপারে কিছু বলবার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন, তাঁদের তিনি বলেছেন,
শোনো, এসব শিল্পের কাজ, এখানে ওরকম তাড়াহুড়ো না করাই ভাল।


ছবি: ওগিস্তা রোদ্যাঁর শিল্পকর্ম

এই সময়টাতে যুদ্ধ৩ এল, তখন যুদ্ধকালীন বাধ্যবাধকতায় রোদ্যাঁ গেলেন ব্রাসেলস্-এ কাজ
করতে। ব্যক্তিগত মালিকানার কিছু বাড়ির জন্য কতকগুলি মূর্তি তৈরি করলেন এবং বেশ
কিছু মূর্তি তৈরি হল কয়েকটি কোম্পানির স্টক এক্সচেঞ্জ-এর বাড়ির মাথায়, চার কোণে
চারটি মূর্তি খোদাই হল মেয়র লু-র স্মারকস্তম্ভের জন্য পার্ক দ্য আঁভার্স-এ। এগুলি সব
ফরমায়েশী কাজ, কিন্তু নিজের জায়মান ব্যক্তিত্বটি না ফলিয়ে তিনি মনের সবটুকু ঢেলেই
কাজগুলি করলেন। তাঁর পরিবৃদ্ধি তো তখন চলছেই ক্রমাগত; ছোট্ট অবসরগুলো ঠেলা দিয়ে
কাজ করিয়ে নিচ্ছে; সন্ধ্যার ফাঁকে, রাত্রির নি:সঙ্গ স্তব্ধতায় নিজেকে ব্যাপ্ত করে দিতে লাগলেন,
নিজেকে প্রাণশক্তিকে এইরকম ভাগ করে নিতে হল তাঁকে বছরের পর বছর। তাঁর মধ্যে এমন
একটা শক্তি ছিল, এমন একটা নীরব একনিষ্ঠতা কাজ করত, যেটা কাজের পক্ষে খুবই জরুরী
এবং যার দিকে সবসময় মুখ চেয়ে বসে থাকে বাস্তবে বড় একটা শিল্পবস্তু।

ব্রাসেলস-এর স্টক-এক্সচেঞ্জ-এর জন্য যখন কাজ করছেন, তখন তাঁর মাথায় হয়তো এইটাই
ছিল যে অতীত কালের প্লাস্টিক আর্ট-এর বড়ো বড়ো চুম্বকক্ষেত্র, অর্থাৎ ক্যাথিড্রাল, এগুলি
ভাস্কর্যের যে কাজ করে দেখাতে পারে বড়ো বড়ো বাড়িগুলি তা পারে না। ভাস্কর্য ব্যাপারটাই
আলাদা, যেমন কাষ্ঠফলকে দাঁড় করানো ছবিটাও আলাদা, কিন্তু ভাস্কর্যের জন্যে কোনও
দেওয়াল দরকার হয় না। ছাদেরও দরকার নেই। এ এমন এক বস্তু, যে নিজের জোরেই নিজে
দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই রকম একটা গোটা বস্তুর ওপরে যে সত্তা আরোপিত হল তার
সুবিধা অনেক বেশী, কারণ এক্ষেত্রে লোকে তার চারপাশে ঘুরে ঘুরে তাকে সব দিক থেকে
পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আর সেই সঙ্গে তাকে যে কোনও ভাবেই হোক না কেন অন্য বস্তুর
থেকে পৃথক করে নেওয়া যায়, অর্থাৎ মামুলি সেই সমস্ত জিনিসগুলি থেকে আলাদা করা যায়,
যাদের নিছক হাতে ছুঁয়ে দেখা সম্ভব। যেভাবেই হোক, ভাস্কর্যকে থাকতে হয় একেবারে ধরা
ছোঁয়ার বাইরে, সব ক্ষয়ক্ষতি ছাড়িয়ে সংরক্ষিত অবস্থায়, আকস্মিক অঘটনের বাইরে এবং
সময়ের আওতা থেকে দূরে। সেখানে তার স্থান একা এক আলৌকিকের মত, যেন এক
অলোকদ্রষ্টার চাহনিতে সে দেখছে। একটা নিজস্ব নিরাপদ স্থান তার চাই, খামখেয়ালীর মত
তো তাকে বসানো যায় না। আসলে তার সঠিক জায়গা হল স্থানমাত্রার (space) স্তব্ধ আয়ু ও
তার নিয়মাবলীর আওতায়। চারদিকে যে বাতাসটা আছে তার মধ্যে তার স্থান একটা
কুলুঙ্গির মধ্যে। এমনই একটা নিরাপত্তা দিতে হয় তাকে, এমন একটা সম্ভ্রম ও উচ্চতা, যেটা
তার সত্তার সরল অবস্থিতির কারণেই জরুরী, তার মহিমার কারণে নয়।

রোদ্যাঁ জানতেন যে ভাস্কর্য ব্যাপারটা সামগ্রিকভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষের শরীরের একটা
নির্ভুল জ্ঞানের ওপর। স্তিমিত লয়ে, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে তিনি তার মাত্র বহির্ভাগে
পৌঁছতে পেরেছেন। আর এখন এই বাইরেরই অন্য এক দিক থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে
বহিরঙ্গটির এমন একটা নিখুঁত পরিমাপ ও সীমানা দেখিয়ে দিচ্ছে, যা আসলে বস্তুটিরই অন্তরে
নিহিত ছিল। কারও পদচিহ্ন পড়েনি এই পথে; রোদ্যাঁ যতই এ পথে এগিয়েছেন, ততই নানান
আকস্মিকতা দানা বেঁধেছে, একটা নিয়ম তাঁকে অন্য একটা নিয়মের নিগড়ে ঠেলে দিয়ে চলে
গেছে। আর এই বহির্ভাগের উপরই তাঁর অনুসন্ধান চলেছে বিস্তর। ওই বহিরঙ্গেই বয়েছে
বস্তুর সঙ্গে আলোর অনন্ত মিলনমেলা। আমরা দেখছি আর হৃদয়ঙ্গম করছি যে প্রতিটি খেলাই
কতো বিভিন্ন, অথচ প্রত্যেকটাই কতো তাৎপর্যপূর্ণ। একটা জায়গায় মনে হয়েছে যে আলোর
একটা অগ্রাংশু যেন অন্য একটি অংশুর মধ্যে গিয়ে মিলে যাচ্ছে, আর একজায়গায় এসে একটু
ইতস্তত ক’রেই যেন একে অন্যকে অভিনন্দিত করছে। অন্য তৃতীয় ক্ষেত্রে আলোর অংশুগুলি
একে অন্যের পাশ দিয়ে চলে গেল যেন অপরিচিতের মত। এত অগণ্য অগ্রাংশু এত অগণিত
জায়গা দিয়ে গড়িয়ে চলেছে অথচ প্রতিটি সময় একটা না একটা কিছু ঘটছেই। ফাঁক থাকতে
পারছে না কোথাও।

এই বিন্দুতে এসেই রোদ্যাঁ আবিষ্কার করলেন তাঁর শিল্পের মৌলিক উপাদান, তাঁর স্ব-বিশ্বের
অঙ্কুরকোষ৷ এ হল সেই বস্তুপৃষ্ঠ (surface), যার আকার বিভিন্ন আরোপিত গুরুত্বও ভিন্ন,
নিখুঁত পরিমিত এই বস্তুপৃষ্ঠ থেকে সব কিছুরই উদ্ভব সম্ভব। ওইখান থেকেই শুরু হল তাঁর
শিল্পের আদিযাত্রা, যার জন্য তিনি প্রাণপাত করতে লাগলেন, যার জন্য জাগ্রত হয়ে উঠল
তাঁর মন এবং ওইখানেই শুরু হয়ে গেল তাঁর যন্ত্রণা। তাঁর যে শিল্প সে তো একটা বিশাল
ধারণার ওপর গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে সচেতন একটা ছোট্ট রূপায়নের মধ্য দিয়ে, একটা
পৌঁছে যাওয়ার সম্ভবনা, একটা পারঙ্গমতার ওপর নির্ভর ক’রে। এ তাঁর ঔদ্ধত্য নয়। এই
তাৎপর্যহীন ও দূরবগাহ সৌন্দর্যের কাছে তিনি নিজেকে বাঁধা রাখলেন, তাকে ঘিরে তিনি
একটা পরিক্রমা চালালেন, তাকে আদেশ করলেন এবং সেইসঙ্গে তার বিচারও করলেন। কাজ
সাঙ্গ হলে অন্যকে, অর্থাৎ মহৎ যে সৌন্দর্য, তাকে আসতেই হয়েছে – রাত্রি গভীর হলে
বনে-জঙ্গলে যেমন অচেনা কেউ আর থাকে না, প্রাণীরা যেমন জলাশয়ে জল খেতে নেমে আসে,
ঠিক তেমনি ক’রে।


ছবি: ওগিস্তা রোদ্যাঁর শিল্পকর্ম

\এই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় রোদ্যাঁর অন্তরঙ্গ কাজ। প্লাস্টিক আর্ট সম্পর্কে তাঁর
ঐতিহ্যগত ধ্যানধারণাগুলি এই প্রথম মূল্যহীন হয়ে পড়ল। তখন আর ভঙ্গিমা (pose),
বিভজন (Grouping) ও রচনা (composition) –র কোনও অস্তিত্ব রইল না তাঁর মনে।
তাঁর সামনে এল বিচিত্র সব জীবন্ত বস্তুপৃষ্ঠ, অর্থাৎ শুধুই জীবন, আর সেই সঙ্গে খুঁজে পেলেন
অভিব্যক্তির যাবতীয় উপাদান, যা সরাসরি এই জীবনের সঙ্গে মিশে গেল। এখন তাঁর ঝোঁক
শুধু উৎকর্ষের জায়গায় পৌঁছনো এবং প্রাচুর্যের দ্বারা নিজেকে আরও শক্তিশালী ক’রে তোলা।
জীবন যে সর্বত্রই ছড়িযে রয়েছে, তার নিদর্শন যেখানেই দেখলেন, রোদ্যাঁ তাকে হাতের
মুঠোয় এনে ফেলতে চাইলেন। জীবনের ন্যূনতম ছিটেফোঁটাটুকুও তাঁর চোখের বাইরে রইল না।
তখন তিনি তাকে অনুসরণ করতে লাগলেন। তিনি চেয়ে রইলেন কখন সে দুই পথের
সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়াবে, ইতস্তত করবে, আর তখন তিনি ছুটে গিয়ে তাকে ধরবেন,
আর সব জায়গাতেই দেখবেন সে রয়েছে সেই একই উচ্চতায়, একই রকম শক্তিশালী ও
হৃদয়প্লাবী হয়ে। শরীরের কোনও অংশই তার অর্থহীন এবং তুচ্ছ নয়: প্রতিটি অংশই জীবন্ত।
যে জীবন মুখের ওপর ঘড়ির মুখপাতের মত অভিব্যক্ত হয়েছিল, তা সহজে পড়া যাচ্ছে, এবং
তার প্রাসঙ্গিকতাও সময়ের সঙ্গে নিবিড় সামঞ্জস্যে বিধৃত-শরীরের মধ্যে তা সবদিকে ছড়িয়ে
পড়েছে, আরও বড়ো হয়ে উঠেছে সেটা, আরও রহস্যময় এবং অনন্তের অভিসারী। এখানে
মোটেও সে ছদ্মবেশ ধরেনি। যেখানে অমনোযোগই কাম্য, সেখানে সে অনবধান, যেখানে গর্ব
অভিলষিত, সেখানে সে গর্বিত। মুখের মঞ্চ থেকে সরে এসে সে তার মুখোশ আবার খুলে
নিয়েছে, দাঁড়িয়ে পড়েছে যেমন কে তেমন, পোশাকের পর্দার আড়ালে। এইখানেই রোদ্যাঁ তাঁর
সমকালীন বিশ্বকে খুঁজে পেয়েছেন, যেমনটি মধ্যযুগকে তিনি পেয়েছিলেন ক্যাথিড্রালগুলির
মধ্যে : ওরা যেন একটা রহস্যে ঘেরা অন্ধকারের মধ্যে এসে জড়ো হয়েছে, একটি গঠনতন্ত্র
ওদের দাঁড় করিয়ে ধ’রে ওদের মানানসই ক’রে তুলছে, আর ওরাও ওই সংস্থানের বিষয়ীভূত
হয়ে উঠেছে। মানুষ যেন মন্দির হযে উঠেছে এবং অমন মন্দির হাজারে হাজারে গড়ে উঠেছে,
অথচ প্রতিটি মন্দিরই আলাদা, প্রতিটিই জীবন্ত। এইটাই এখানে উল্লেখ্য যে এই মন্দিরগুলি সব
কিন্তু একজন দেবতারই মন্দির।

বছরের পর বছর রোদ্যাঁর জীবনের পথগুলি এইভাবে শিক্ষার্থীর নম্র অভিসারে কেটে গেছে;
বরাবর মনে করতেন তিনি শিক্ষানবিশ হিসাবেই থেকে গিয়েছেন। তাঁর এই প্রয়াসবৃত্তির কথা
কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। বিশ্বস্ত কোনও লোক ছিল না, বন্ধুর সংখ্যাও ছিল কম। কাজ
তাঁর কাছে গুটি গুটি এগিয়ে এসেছিল, আর কাজের পিছনে লুকিয়ে ছিল তাঁর ভাবী কাজ,
অপেক্ষা করছিল হয়ে-ওঠার জন্যে। পড়তেন প্রচুর। ব্রাসেলস-এর রাস্তায় বই হাতে নিয়ে
পড়ছেন, এ যেন তাঁর চেনা ছবি। হয়তো বা ছদ্মবেশ, মুখের সামনে বই নিয়ে আত্মচিন্তায়
বিভোর হয়ে যান, বিশাল কর্মকাণ্ডের ভাবনায় পেয়ে বসে তাঁকে৷ যাঁরা সত্যিকারের কর্মী,
তাঁদের মত তাঁরও একটা অনুভূতি কাজ করত, অদেখা কাজটি কি রূপ ধারণ করবে, একটা
উত্তেজনা, কিভাবে তিনি সক্ষম হয়ে উঠবেন আরও, কিভাবে কাজ তাঁকে আরও নিবিষ্ট ক’রে
তুলবে। মনের মধ্যে ঘনিয়ে উঠত সন্দেহ, অনিশ্চয়তা, তাঁর মধ্যে যে হয়ে-ওঠার ভাবনাটি
ছিল, সেটি সম্বন্ধে একটা অধীরতা পুঞ্জীভূত হয়ে উঠত, ঘনিযে উঠত অকালমৃত্যুর ভয় কিংবা
দৈনন্দিন অভাবের একটা আতঙ্ক, আর এইভাবে এইগুলি তাঁর মনে মধ্যেও একটা নীরব,
একটা খাড়া প্রতিরোধ নির্মাণ করত, বুকের মধ্যে গড়ে তুলত একটা “তা সত্ত্বেও”, তৈরি
ক’রে দিত জোরালো মন, একটা আত্মবিশ্বাস। সেই বিরাট বিজয়ের পতাকাটা যেন এখনও
খোলা হয়নি।হয়তো এই সব মুহূর্তে অতীত তাঁর কাছে এসে তাঁর পক্ষই অবলম্বন করত,
ক্যাথিড্রাল-গুলির কন্ঠস্বর শোনবার জন্য তিনি সবসময় আকুল হতেন। আবার বই থেকেও
প্রেরণার মত তাঁর সামনে এসে হাজির হত আরও অনেক কিছু। দান্তের দিভাইনা কমেদিয়া
তিনি প্রথম পড়লেন। তাঁর বোধোদয় ঘটল। চোখে ধরা পড়ল অন্যতর লিঙ্গের যন্ত্রণা-বিদ্ধ
শরীরগুলি, সমস্ত দিনের ওপারে উঁকি দিয়ে দেখতে পেলেন একটা শতাব্দীর পোশাক কেমন
শতচ্ছিন্ন হয়ে আছে, দেখলেন কবি তাঁর নিজের যুগ সম্বন্ধে অত্যন্ত স্মরণীয় কি নিদান দিচ্ছেন।
ওখানে অনেক ছবি ছিল যা তাঁর চিন্তাভাবনার স্বীকৃতি দিল; তৃতীয় নিকোলাস-এর ক্রন্দনরত
পাদুখানির কথা যখন পড়ছেন তখন জানতে পারছেন রোরুদ্যমান পা বলেও একটা কিছু হয়,
জানছেন, ক্রন্দন বলে একটা কিছু আছে যা সর্বত্র ও সর্বব্যাপী, একটা গোটা মানুষের শরীরটাই
কেঁদে উঠতে পারে, আর অশ্রু সে তো বেরিয়ে আসতেই পারে প্রতিটি রোমকূপ থেকে। এবার
দান্তে থেকে বেরিয়ে তিনি এলেন বোদলেয়ারে। এখানে কোনও নিদান নেই, এমন কোনও
কবিও নেই, যে কিনা একটি ছায়ার হাত ধ’রে স্বর্গে উঠে যেতে পারে, বরং সে থেকে যায়
যন্ত্রণাকাতর অনেকগুলি মানুষের মধ্যে এমন একজন হয়ে যে অন্যদের মাথা ছাড়িযে তার
কন্ঠস্বর জাগিয়ে তোলে রসাতলের হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে৷আর তাঁর এই
কবিতায় এমন এমন জায়গা আছে যেগুলি তাদের লিপি থেকে সরাসরি বেরিয়ে এসেছে :
কোনও লিখিত লিপি যেন নয়, হাতে গ’ড়ে তোলা হয়েছে ব’লে মনে হয়, শব্দ ও শব্দগুচ্ছ কবির
উত্তপ্ত হাতে গ’লে গিয়েছিল, স্পর্শ করলে তাই রিলিফের শিল্পকর্ম ব’লে আভাসিত হচ্ছে, আর
সনেটগুলিও জট পাকানো বড়ো হাতের অক্ষরের সঙ্গে স্তম্ভের মত এমন এক চিন্তাপ্রবাহের
বোঝা বয়ে চলেছে, যা মোটেই স্বস্তিকর নয়। একটা ক্ষীণ অনুভব মাত্র এই যে কলা ঠিক
যেমনটি চেয়েছিল, তেমনই সে আচমকা থেমে গিয়ে অন্য একটির শুরুতে গিয়ে ধাক্কা মেরেছে;
বোদলেয়ারের মধ্যে তিনি এমন একজন শিল্পীকে অনুভব করলেন যিনি ছিলেন তাঁরই
উত্তরসুরী, যিনি হাজারো মুখের প্লাবনে বিভ্রান্ত হননি, বরং এমন শরীরই খুঁজেছেন যার মধ্যে
জীবন ছিল আরও ব্যাপক, ভয়ানক এবং অশান্ত।

এই দিন থেকে রোদ্যাঁর কাছে এই দুই কবি চিরদিনের মতে বাসা বেঁধে ফেললেন, তাঁর চিন্তাগুলি
আসতে লাগল ওদেঁর কাছ থেকে এবং ফিরেও যেতে লাগল তাঁদের দিকে। এই সময় তাঁর শিল্প
একটা আকার নিতে লাগল, এমন একটা অভিব্যক্তির প্রস্তুতি নিতে লাগল যেখানে তিনি যে
অখণ্ড জীবনের পাঠ নিয়েছেন, সেটা নামহীন ও অর্থহীন। রোদ্যাঁর চিন্তাভাবনা এই কবিদের
রচনাকে ঘিরেই তখন পুঞ্জীভূত এবং একটি অতীতকে তখন তিনি চয়ন ক’রে নিচ্ছেন।
পরবর্তীকালে যখন নিজেই স্রষ্টা হিসাবে রোদ্যাঁ এই মহলটিকে ছুঁয়ে যাচ্ছেন তখন তাঁর কাজের
চেহারার মধ্যে ফুটে উঠতে শুরু করেছে তাঁর স্বীয় জীবনের যাবতীয় স্মৃতি, আর তা
বাস্তবায়িতও হচ্ছে বড়ো বেদনার মধ্য দিযে, যেন মনে হচ্ছে যে এই কাজের মধ্যে প্রবেশ
করাটাই যেন তাঁর সত্যিকারের ঘরে ফেরা।


ছবি: ওগিস্তা রোদ্যাঁর শিল্পকর্ম

তারপর সব শেষে বহু বছর নিঃসঙ্গ অবস্থায় কাজ করবার পর তিনি ভাবলেন তাঁর একটা
কাজকে কেন্দ্র ক’রে তিনি মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ করবেন৷ এ ছিল আদতে
সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর একটা জিজ্ঞাসাচিহ্ন৷ সাধারণ মানুষ সাড়া দেয়নি৷
তখন রোদ্যাঁ নিজেকে তের বছরের জন্য বন্দী ক’রে ফেললেন৷ এই সময়টা রোদ্যাঁ
সাধারণ্যে খুব অপরিচিত, কিন্তু ধীরে ধীরে চূড়ান্ত দক্ষ হয়ে উঠছেন, তাঁর মাধ্যমের
কাজে তিনি তখনই অপ্রতিরোধ্য প্রভুত্বের অংশীদার, সময়ের দ্বারা নিতান্ত প্রভাবিত
না হয়ে অবিরাম কাজ করছেন, ভাবছেন, চেষ্টা করছেন, সময় তাঁকে ছুঁতে পর্যন্ত
পারছে না৷ সম্ভবত এক অনাহত শান্তির মধ্যে অবস্থানের ফলে তাঁর যে পরিবৃদ্ধি
ঘটল, তার সমগ্রটুকুর জন্যই একসময় তাঁর এমন অবস্থা এল যে যখন তাঁকে কেন্দ্র
ক’রে মানুষ বিতর্কে মেতে উঠছে, তাঁর কাজ নিয়ে বিরুদ্ধ মত বিনিময় করছে,
তখন তিনি নিজের জায়গায় নিজের প্রগাঢ় ও নিশ্চিত অবস্থানে অটল রয়েছেন৷তাই
লোকে যখন তাঁকে নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেছে, তখন নিজের সম্বন্ধে তিনি
একেবারে নিঃসংশয়; সমস্ত অনিশ্চয়তা তিনি ততদিনে পিছনে ফেলে এসেছেন৷ তাঁর
নিয়তি তখন আর কোনও স্বীকৃতি বা মানুষের রায়ের মুখাপেক্ষী নয়৷ মানুষ, যখন
মনে করছে যে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও শত্রুতা ক’রে তাঁকে চুরমার ক’রে দিতে পারবে,
তার আগেই এই কথাটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে যে তিনি অপ্রতিরোধ্য৷ যে সময়টা
ধ’রে তিনি হয়ে উঠছেন, তখন কিন্তু কোনও অচেনা কন্ঠস্বর তাঁর কাছে এসে
পৌঁছয়নি, কোনও প্রশংসা এসে তাঁকে পাগল ক’রে তোলেনি বা কোনও নিন্দা
এসেও তাঁকে বিভ্রান্ত ক’রে দিতে পারেনি৷ পার্সিভাল যেভাবে বেড়ে উঠেছিল, ঠিক
তেমনি ক’রেই তাঁর কাজ স্বমহিমায় শুদ্ধভাবে অনন্ত এই বিশাল প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে
উঠেছে৷ তাঁর কাজ তখন তাঁর সঙ্গে কথা বলছে৷৷ যখন ঘুম থেকে উঠছেন
তখন সে কথা বলছে, সন্ধ্যায় তাঁর হাতের ওপর ব’সে দীর্ঘক্ষণ ধ’রে যন্ত্রসঙ্গীতের
ভেতর থেকে কথা বলছে, এই কারণে তাঁর কাজ অনতিক্রম্য : সেগুলি যেন মহান
হয়েই এই পৃথিবীতে এসেছে, অসমাপ্ত অবস্থায় এসে বলেনি আমার ওপর অবিচার
করছ কেন৷ একটা বাস্তব বিষয় হয়ে তবে সে তার অস্তিত্ব প্রকাশ করছে, অর্থাৎ
এমন একটা বস্তু, যে আছে এবং যে আছে বলেই সে গণ্য হতে বাধ্য৷ ধরা যাক
একজন রাজা, সে শুনছে যে তার রাজ্যে একটা শহর গ’ড়ে তোলা উচিত, ভাবছে
ব্যাপারটা অনুমোদন করলে ভাল হয় কিনা৷ ইতস্তত করছে, তারপর সবশেষে চলেই
এসেছে জায়গা দেখতে৷এসে দেখছে একটা বিরাট ভারি শহর, তৈরি হয়ে ব’সে আছে,,
উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে, যেন অনন্তকাল থেকে রয়েছে, প্রাচীর, তোরণ, মিনার,
সবশুদ্ধু৷ঠিক এইভাবেই রোদ্যাঁ-র আহ্বানে সব মানুষ এইখানে ছুটে এসেছে তাঁর কাজ
দেখতে, দেখছে, সব একদম তৈরি৷

তাঁর পরিণত হয়ে ওঠবার এই যে সময়কাল, তা তাঁর দুটি কাজের মধ্যে ধরা
আছে৷ প্রথম কাজ হল ভাঙা নাক মানুষটি, আর শেষটা একটি যুবকের মূর্তি,
প্রথম যুগের মানুষ ৷ ল্যো মোনি ক্যাসসি (L’Homme au Nez Cassé) বা ভাঙা
নাক মানুষটি নামে মূর্তিটা ১৮৬৪ সালে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে “সালঁ৷’’ সবাই খুব
ভালই বুঝতে পারবে যে এই কাজে রোদ্যাঁ-র শিল্পকলা একটা অত্যন্ত পরিণত মাত্রা
ছুঁয়ে গিয়েছিল, পরিপূর্ণতা পেয়েছিল নিশ্চিত৷ অ্যাকাডেমিক সৌন্দর্যের মান অনুযায়ী৪
যে-বিষয়গুলি স্বীকৃত, তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়নি তাঁর কলা৷ ওই মানদণ্ডের
আধিপত্যটাই তখন সর্বত্র৷ প্ল্যাস দি লি তুয়ালে (Place de l’Etoile)জায়গাটার
বিজয়তোরণের মাথায় রুইদে (Rude) তাঁর বিদ্রোহের দেবী মূর্তিটিতে অর্থহীনভাবে
একটা বন্য চেহারা দিয়েছিলেন, আর দিয়েছিলেন একটা সুদূরপ্রসারী চিৎকার৷
একইভাবে ব্যারি (Barye) তাঁর নমনীয় প্রাণী তৈরি করেছিলেন; ক্যারপু
(Carpeaux’)-র নৃত্য নামে মূর্তিটি ছিল মানুষের ঠাট্টার বিষয়; ওটা দেখতে
দেখতে মানুষের এমন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল যে পরবর্তীকালে ওটা আর তাদের
চোখেই পড়ত না৷ কিন্তু তাতেও কিছু বদলালো না৷ প্লাস্টিক আর্ট তার পরেও ছিল
মডেল ভিত্তিক, ভঙ্গীসর্বস্ব এবং রূপকাশ্রিত, চটুল, সস্তা ও সহজ এবং ব্যক্তিগত
বৃত্তির বিষয়, আার ওইগুলিকেই মোটামুটি কম বেশী দক্ষ পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে
শুদ্ধ ক’রে একটা চেহারা বানিয়ে দেওয়া হত৷ এই পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে ভাঙা নাক
মানুষটি একটা ঝড় তুলে দিতে পারত সন্দেহ নেই, তবে পরবর্তী কালে ওটাকে
কোথাও একবার অন্যান্য কাজের সঙ্গে প্রদর্শ্য হিসাবে পাঠানো হয় এবং প্রায়
অপরীক্ষিত অবস্থায় ফেরৎ আসে, অজুহাত ছিল এটি অপরিচিত একজনের কাজ৷

মানুষ বুঝতে পারে যে মাথাটি তৈরি করবার পিছনে রোদ্যাঁ-র উদ্দেশ্য কি ছিল,
তিনি চেয়েছিলেন একজন বয়স্ক ও কুৎসিত লোকের ভাঙা নাকের ওপর যে
অত্যাচার হয়েছে,তার ওপর অতিরিক্ত আলো ফেলতে, অথচ প্রাণের প্রাচুর্য যেন তার
বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ঘনীভূত থাকে৷ এখানে অভিনব ব্যাপার হল এই যে ওই মুখের
বিভিন্ন অংশের মধ্যে কোথাও এক ফোঁটা সামঞ্জস্য নেই, কোনও জায়গায় একটা
পুনরাবৃত্তি নেই, একটু ফাঁক নেই, কিংবা কোনও জায়গায় একটা নির্বাক অংশ বা ঔদাসীন্য
নেই। মুখটার মধ্যে প্রাণ পুরে দেওয়া নেই, অথচ তার প্রতিটি অণু পরমাণুতে প্রাণের ছোঁয়া
লেগে আছে। যেন একটি নির্মম হাত তাকে একটা নিয়তির গর্ভে শক্ত ক’রে ধ’রে রেখেছে,
একটা ঘূর্ণির জলাভিষেক ও জলদংশনের বৃত্তে ধ’রে নিয়ে অহর্নিশ আটকে রেখেছে৷
কেউ যদি এই মুখোশটাকে হাতে ধ’রে ঘোরায় তাহলে সে তার পার্শ্বমুখের আনুক্রমিক
পরিবর্তন দেখে অবাক হবে, যা একটুও আকস্মিক নয়, কিংবা কল্পিত অথবা সন্দিগ্ধও নয়।
এই মাথাটির এমন কোনও রেখা নেই, এমন কোনও সন্ধিস্থল নেই কিংবা রূপরেখাও নেই, যা
কিনা রোদ্যাঁর চোখের বাইরে থেকে গেছে এবং যা তাঁর ইচ্ছাপ্রণোদিত নয়। খুঁটিয়ে নজর
করলেই টের পাওয়া যাবে কতকগুলি আঁচড় আগে এসেছে, অন্যগুলি পরে, এই রেখা ও অন্য
আর একটি রেখার মাঝখানে হয়তো অনেগুলো চলে যাওয়া বছর লুকিয়ে রয়ে গেছে, অনেক
দুঃসময় গড়িয়ে গেছে। সবাই বুঝতে পারছে, মুখের কতকগুলি বলিরেখা ধীরগতিতে খোদাই
করা হয়েছে। একটু ইতস্তত ক’রেই হয়তো করা হয়েছে, কিন্তু আবার কতকগুলি রেখা খুব
হালকা চালে চলতে চলতে গভীর হয়ে উঠেছে, তা সেটা অভ্যাসের বশেই হোক, কিংবা বিশেষ
চিন্তার ফল হোক। টেনে আনা হয়েছে তাদের এবং এসেছে তারা বারবার। কোনও কোনও
জায়গা দেখলেই বোঝা যায় ধারালো এক একটা রেখা, এক রাতের মধ্যেই টানা হয়েছে নির্ঘাৎ,
দিব্যি যেন একটা পাখির ঠোঁট থেকে টেনে এনে এক বিনিদ্রের জাগরূক কপালের উপর বসিয়ে
দেওয়া হয়েছে। ওই একটি মুখাবয়বের ওপর এত কিছু একসঙ্গে বসিয়ে দেওয়া রয়েছে, এমন
নামহীন একটা জীবনের ভার ওই মূর্তিতে প্রতীয়মান যে পরে সেইগুলিকে স্মরণ করতে বেশ
বেগ পেতে হয়।

মুখোশটাকে মুখ থেকে নামালে মনে হবে যেন একটা মিনারের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছি এবং
নিচে একটা অসমান ভূদৃশ্য চেযে দেখছি, যার বিভ্রান্তিকর সব রাস্তার মধ্যে রয়ে গেছে বহু
মানুষের পদচিহ্ন। মুখোশটাকে আবার মুখের ওপর তুলে নিলে বলতেই হয় যে কত সুন্দর এই
জিনিসটা, উৎকর্ষের একটা চুড়ান্ত জায়গায় যেন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই সৌন্দর্য যে শুধু
একটা অতুলনীয় করণকৌশলের ফল তা নয়। সামঞ্জস্যের একটা গভীর সংবেদন থেকে এই
সৌন্দর্যের উদ্ভব, চলিষ্ণু বিভিন্ন বস্তুপৃষ্ঠের মধ্যে পারস্পরিক একটা ভারসাম্য রক্ষা করছে সে,
আর এমনই এক প্রজ্ঞার মধ্য থেকে তার আবির্ভাব যে এই সমস্ত আবেগঘন মুহুর্তগুলি আবার
খোদ বস্তুর মধ্যে গিয়েই আত্মস্থ হয়ে গেছে। ওইখানেই তাদের শেষ। যদি কেউ এই মুখের
বহুস্বরায়িত উদ্বেগের মধ্যে বাঁধা পড়ে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সে টের পায় যে ওই বস্তুর
মধ্যে অন্তত যাই থাকুক, কোনও অভিযোগ নেই, দুনিয়ার কাছে তার উমেদারি কারারও কিছু
নেই। তার নিজের ন্যায্য বিচারটা সে নিজেই করে নিতে পারে বলে মনে হয়। মনের মধ্যে যত
রকমের দ্বন্দ্ব আছে তাদের দূর ক’রে নিজের সহিষ্ণুতা রক্ষা করতে পারলেই তা তার নিজের
বোঝা সামলানোর পক্ষে যথেষ্ট।

রোদ্যাঁ যখন এই মুখোশটা তৈরি করছিলেন, তখন তাঁর সামনে শান্ত হযে শান্ত মুখে বসে
থাকতেন এক ভদ্রলোক। অবশ্য তাঁর মুখ একজন জীবিতের মুখ; কিন্তু শিল্পী যখন তাঁর সেই
মুখ নিয়ে গভীর অনুসন্ধানে ব্যস্ত, তখন একটা জিনিস তাঁর কাছে পরিস্কার হয়ে যেতে থাকল
যে ওই মুখ অত্যন্ত গতিশীল, খুব অশান্ত ও তরঙ্গের অভিঘাতে গ্রস্ত। রেখার চলনের মধ্যে
সবসময় একটা গতিশীলতা, বস্তুপৃষ্ঠের বৃত্তির মধ্যে গতির একটা প্রবণতা, ঘুমের মধ্যে যেমন
হয় সেইরকমই তাকে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে ছায়া, আর আলোর দীপ্তি কপালকে আলতো ক’রে
ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছুর মধ্যেই যেন শান্তি নেই, এমন কি মৃত্যুর মধ্যেও নয়। কারণ
যেটা ধ্বংস, তার মধ্যেও গতি, যেটা মৃত্যু সেটাও জীবনের বিষয়ীভূত। গতিশীলতা, সে শুধু
প্রকৃতির মধ্যে: কিন্তু একটি শিল্পের অভিপ্রেত হল ব্যাপ্ত জীবনের একটা সচেতন ও বিশ্বস্ত
ব্যাখ্যা দেওয়া; যার অস্তিত্বই নেই, সেইরকম স্থিরতাকে সে তার আদর্শ হিসাবে উপস্থাপিত
করে না। বস্তুত পুরাবস্তুগুলি এই ধরণের কোনও আদর্শ সম্বন্ধে ওয়াকিবহালই নয়। নিকে-র
কথাটাই ভাবা যাক৫। গ্রীক এই ভাস্কর্যটি আমাদের শুধু এক অভিসারিকা সুন্দরীর
গতিশীলতাটাই উপহার দেয়নি, একই সঙ্গে সেটি হেলেনিক বায়ুর চিরন্তন ছবি, তার ব্যাপ্তি ও
চমৎকারিত্বের দ্বারা মহিমান্বিত। আরও অনেক পুরাতন সংস্কৃতিতেও পাথরের মধ্যে কোনও
স্থির শান্তি দেখতে পাওয়া যায়নি কখনও। প্রাচীন ধর্মপদ্ধতিতে পুরোহিততেন্ত্রর ব্যঞ্জনায জীবন্ত
সমভূমির অস্থিরতাটাকে আটকে রাখা হত, পাত্রের চৌহদ্দির মধ্যে যেমন জলকে ধরে রাখা
হয়। উপবিষ্ট মৌনমুখ দেবতাদের মধ্যে বহতা স্রোত ছিল, আর যারা দাঁড়িয়ে, তাঁদের
ভঙ্গীতে পাথরের মধ্য থেকে উঠে আসা ঝরণা ঠেলে জল উঠে আসত আর ঢেউয়ে ঢেউয়ে
তাদেরই গা দিযে নেমে ফিরে যেত। এই গতিময়তা ভাস্কর্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের
বিরুদ্ধাচরণ করেনি (অর্থাৎ গতিময়তা বস্তুর সত্তাটির বিরুদ্ধাচরণ করেনি)
কখনও; এ সেই গতিময়তা যার কোনও শেষ নেই, অন্য কিছুর সাহায্যেও তাকে ভারসাম্যের
মধ্যে ধরে রাখা যায়নি, ভাস্কর্যের সীমানা ছাড়িয়ে সে চলে গেছে। প্লাস্টিক আর্ট হল ঠিক
প্রাচীন কালের সেই সব শহরের মত, যা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, তারা বেঁচে ও ছিল সেই দেয়ালের
মধ্যে: শহরের অধিবাসীদের তাতে শ্বাসরোধ হত না, জীবনযাত্রাও ভেঙে পড়েনি কখনও।
কিন্তু তাদের জীবনে এমন কোনও তাড়নাও ছিল না যার ফলে ওই চার দেওয়ালের সীমা থেকে
বেরিয়ে যেতে হতে পারে; তাদের কাছে ওই চৌহদ্দির বাইরে আর কিছু ছিল না, মানে তোরণের
ওপারে আর কিছু নেই, বাইরের জগতের কাছে কোনও প্রত্যাশারও লেশমাত্র ছিল না তাদের।
একটা ভাস্কর্যের গতিময়তা যত শক্তিশালীই হোক, সে যে-অনন্ত সুদূর থেকেই আসুক,
আকাশের যত নিবিড় গভীরতা থেকেই তার আগমন হোক, তার কাছেই তাকে আবার ফিরে
যেতে হবে, বৃত্তটাকে তো সম্পূর্ণ হতে হবে, যে-নিঃসঙ্গতার পরিবেশে একটি শিল্পবস্তুর দিন
অতিবাহিত হয় তার বৃত্তটাকে তো একবার পূর্ণ করতে হবেই। ভাস্কর্যের সেই প্রাচীন
দিনগুলোয় একটা নিয়ম ছিল, একটা অলিখিত নিয়ম। রোদ্যাঁ সেটা ধরতে পেরেছিলেন।
একটা প্লাস্টিক শিল্পবস্তুকে যা বিশিষ্টতা দেয, অর্থাৎ কোনও কাজের মধ্যে পুরোপুরি বুঁদ হয়ে
যাওয়া, তিনি তা জানতেন; জানতেন কোন্ জিনিস প্লাস্টিক আর্ট-কে স্বস্তি দিতে পারে।
বাইরের দাবি বা প্রত্যাশার বস্তু সে নয়, তার নিজের পরিধির বাইরে যা আছে তার সঙ্গে তার
কোনও সম্পর্ক নেই, সে এমন কিছু দেখে না যা তার মধ্যে ছিল না। তার পরিবেশ তার মধ্যেই
থাকে। ভাস্কর লেওনার্দো দে ভিঞ্চি ধরা ছোঁয়ার বাইরে রেখেছেন লিজা দেল জিওকোন্ডা-কে৬,
এই গতিময়তা অন্তমুর্খী, এই দেখা সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না। সম্ভবত তাঁর ফ্রান্সিসকু
স্ফোর্ৎসা’৭-র মূর্তিও অনুরূপ মনস্কতায় গ্রস্ত, তার ভঙ্গিমার মধ্যে এমন একটা ভাব ছিল যেন
দেশের একজন গর্বিত দূতের মতই সে তার কর্তব্যকর্ম সেরে দেশে ফিরে এসেছে।


ছবি: ওগিস্তা রোদ্যাঁর শিল্পকর্ম

প্রথম যুগের ওই ভাঙা নাক মানুষটি নামের মুখোশ এবং আদিম যুগের মানুষ নামের মূর্তির
মধ্যেকার সময়কাল দীর্ঘ, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে অনেক নীরব সমৃদ্ধি ঘটেছে তাঁর জীবনে।
নূতন সম্পর্ক এসে তাঁর শিল্পের অতীতের সঙ্গে তাঁকে আরও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ ক’রে
দিয়েছে। বহু মানুষ এই অতীত এবং তার আকারকে যে একটা বোঝার মত বয়ে আনল,
রোদ্যাঁর সঙ্গে তা ডানার মত হয়ে উঠল, তাঁর সঙ্গে জুড়ে গেল। তিনি যদি সেই সময়ে তাঁর
ইচ্ছা ও অনুসন্ধানের পথে কোনও প্রেরণা ও তার সমর্থন পেয়ে থাকেন, তাহলে সেটা তাঁর
কাছে এসেছিল পুরাবস্তু ও পরতে ঢাকা অন্ধকার ক্যাথিড্রাল থেকে। মানুষ তাঁর সঙ্গে কথা
বলেনি কখনও। বলেছিল পাথরেরা।

ভাঙা নাক মানুষটি দেখিয়েছিল রোদ্যাঁ কিভাবে একটা মুখের ভেতর দিযে তাঁর পথ বের করে
নিয়েছিলেন, আদিম যুগের মানুষ-এর শরীর রচনায় তাঁর অখণ্ড আধিপত্য প্রমাণ হয়ে
গিয়েছিল। মধ্যযুগের মহাশক্তিধর সব শিল্পীরা একে অন্যকে নিতান্ত অসূয়া না ক’রেই
আত্যন্তিকতার সঙ্গে পরস্পরকে যে নামে অভিহিত করতেন অর্থাৎ সভ্রাঁ তেইয়ের দামাজ
(“Souverain tailleur d’ymaiges”) খলিফা-সার্বভৌম, সেই নামে রোদ্যাঁকেও অভিহিত করা হল।
আদিম যুগের মানুষ একট মানুষ-প্রমাণ পাথরের কাজ, যার প্রতিটি অংশ যে সমান
শক্তিশালী তাই নয়, দেখলে মনে হয় সব জায়গায় সে যেন একই অভিব্যক্তির
উচ্চতায় দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ মুখের ওপর গুরু জাগরণের যে বেদনাক্লিষ্টতা আছে তার সঙ্গে
তার ব্যাকুলতাও জুড়ে গিয়ে রেশ ফেলেছে এমন কি শরীরের ক্ষুদ্রতম অংশেও; অংশগুলির
প্রত্যেকটি যেন এক একটা মুখ, যারা তাদের নিজস্ব শৈলীতে কথা বলছে। সবচেয়ে কড়া চোখও
এই মূর্তির এমন কোনও বিন্দু আবিষ্কার করতে পারবে না যা কম জীবন্ত, কম নির্দ্ধারিত ও
স্বচ্ছ।এমনই ব্যাপার যে মনে হয় এই মানুষটির কর্মদক্ষতা যেন মাটির গভীর থেকে উত্থিত
হয়ে তার নাড়িতে প্রবেশ করেছে। মানুষটা আসলে একটা ছায়ামূর্তির মত, তার সামনে রয়েছে
মার্চ মাসের ঝড় আর সে কাঁপছে কারণ ফল ও গ্রীষ্মের প্রাচুর্য তার শিকড়ে নেই, ধীরে ধীরে
ঊর্দ্ধগতি হয়ে সেসব তার বৃক্ষকাণ্ডে এসে দাঁড়িযে পড়েছে, এইবার চারদিকে প্রচণ্ড ঝড় এসে
যেন এক্ষুণি আছড়ে পড়বে।

সূত্রাবলী
১। পঞ্চদশ শতকে ঋষিরা ব্রিটানি-তে কর্মরত মিশেল কলোম্বোকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন,
কলোম্বো সেটা স্মরণ করেই একথা বলেছেন।
২। গেয়র্গেস রোডেনবাখ (Georges Raymond Constantin Rodenbach: ১৮৫৫-১৮৯৮)
৩। ফ্রাঙ্কো প্রুশীয় যুদ্ধ ১৮৭০।
৪। অ্যাকাডেমিক সৌন্দর্যের মানদণ্ড অনুযায়ী-আসলে এটি হল শিল্পের ইতিহাসে অ্যাকাডেমিক
বাস্তবাদ বা অ্যাকাডেমিকতা, ইউরোপীয় শিল্পকলায় যার পরিধি সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ
শতাব্দী পর্যন্ত। এর বৈশিষ্ট্য হল শিল্প অ্যাকাডেমির আকৃতিগত কারিগরী ও নান্দনিক
নিয়মাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা।
৫। নিকে-র কথাটাই ভাবা যাক- The Winged Victory of Samothrace মার্বেল পাথরের দ্বিতীয়
শতাব্দীতে তৈরি হেলেনিক মূর্তি, লুভ্র জাদুঘরে রাখা আছে।
৬। লিজা দেল জিওকেন্ডো; ১৪৭৯-১৫৪২ ছিলেন ইতালীয় এক
অভিজাত মহিলা, ফ্লোরেন্স ও টাসক্যানির ঘেরার্দিনি পরিবারের সদস্য। লিওনার্দো দে ভিঞ্চি
তাঁর ছবিটি এঁকেছিলেন তাঁর স্বামীর ফরমায়েশে। ইতালীয় রেনেশাঁসের যুগে। ভিঞ্চি তার নাম
দিযেছিলেন মোনালিসা।
৭। ফ্রান্সিসকু স্ফোর্ৎসা- (Francesco Sforza: ১৪০১-১৪৬৬) ইতালীর মিলানে স্ফোর্ৎসা
রাজত্বের স্থপতি ইনি। ছিলেন আদতে ইতালীয় কনদত্তিয়েরো (Condottiero)। তাঁর
পোর্ট্রেট করেছিলেন Bonifacio Bembo


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.