বিশ্বসাহিত্য

চিমামান্দা নগুজি আদিচির বক্তৃতা: এক গল্পের বিপদ

এমদাদ রহমান | 2 Jul , 2019  

ভাষান্তর ।। এমদাদ রহমান

২০০৯ সালের অক্টোবরে, স্যাপ্লিং ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘টেড টক’-এ ‘এক গল্পের বিপদ’ (The Danger of a Single Story) নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন নাইজেরিও নারী ঔপন্যাসিক চিমামান্দা নগুজি আদিচি, তখন তার ৩২ বছর বয়স। কোনও কিছুকে খণ্ডিত করে দেখবার, এক গল্পে বুঝবার প্রবণতাকে সমালোচনা করেছেন এই লেখক, বলতে চেয়েছেন- আমাদের জীবন, আমাদের সংস্কৃতি জুড়ে বহুস্তরের গল্প থাকে, যা আমাদের সমগ্র জীবনকেই একপেশে বা এক গল্পের ন্যারেটিভ থেকে মুক্তি দেয়, গল্পের ভারসাম্য তৈরি হয়, যে-কথা আরেক প্রখ্যাত নাইজেরিও ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবেও বলেছেন। চিমামান্দা এখানে বলেছেন কীভাবে তিনি তার লেখার জায়গা জমি মানুষকে পেয়েছেন, বলবার কণ্ঠটিকে পেয়েছেন ইত্যাদি প্রসঙ্গে। তিনি বারবার বলেছেন, আমরা যদি কোনও ব্যক্তি কিংবা দেশ সম্পর্কে একটি মাত্র গল্প শুনি, তাহলেই বিপদের সম্ভাবনা তৈরি হয়। মানুষ তখন মানুষের কাছে ভুল হিসেবে উপস্থাপিত হয়, খণ্ডিত মানুষ হিসেবে হাজির থাকে সে। এক গল্প মানুষকে একাকার করে না, বিচ্ছিন্ন করে, একা করে, ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে অন্ধকারে রেখে দেয়।
চিমামান্দা নগুজি আদিচি সম্পর্কে সমালোচকরা বলেন- ‘পশ্চিমপ্রভাবিত বর্তমান প্রজন্মের সামনে ভুলে যাওয়া নাইজেরিও ইতিহাস এবং ট্রাজেডির উপস্থাপনে অনুপ্রাণিত চিমামান্দা নগুজি আদিচির উপন্যাস এবং গল্পগুলি বিশ্বসাহিত্যের মুকুটে এক একটি মূল্যবান পাথর।’
জটিল মানুষ ও তাদের জটিল পরিস্থিতিগুলো যখন খণ্ডিতরূপে এক গল্পের ন্যারেটিভে পরিণত, তখন কী ঘটে : যখন আফ্রিকানদেরকে কেবলমাত্র বিবেচনা করা হয় শুধুমাত্র তাদের শোচনীয় দারিদ্র দিয়ে; যখন বলা হয়–তারা বিষাক্ত মাছির কামড়ের ভিক্টিম, দিনরাত কাৎরাচ্ছে। কী ঘটে তখন? এক গল্প আফ্রিকানদের সম্পর্কে ভুল বোঝাবোঝির ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাভাষী পাঠক-অঞ্চলে নাইজেরিয়ার নারী লেখক চিমামান্দা নগুজি আদিচির লেখাপত্র তেমন একটা পঠিত নয়, এখনও; নেটেও, বাংলা ভাষায় চিমামান্দা সম্পর্কে লেখা খুবই কম। একটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ পাওয়া যায়, আর তার প্রখ্যাত টেড লেকচার- ‘এক গল্পের বিপদ’ নিয়ে এক তরুণের গদ্য ছাড়া আর কিছুই নেই। চিমামান্দা গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং নারীবাদী। জন্ম নাইজেরিয়ায়, ১৯৭৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। তার বাবা জেমস নাওয়েই আদিচি নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন, মা গ্রেস লিফিওমা ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার।
চিমামান্দা নগুজি আদিচি’র প্রথম সাড়া জাগানো লেখা ‘পার্পল হিবিসকাস’ উপন্যাস। এছাড়া তিনি ‘হাফ অফ এ ইয়েল সান’ এবং ‘আমেরিকানা’ নামেও উপন্যাস লিখেছেন। তার আলোচিত ননফিকশনের বই ‘উই শুড অল বি ফেমেনিস্ট’। ‘পার্পল হিবিসকাস’ উপন্যাসের জন্য ২০০৪ সালে পেয়েছেন ‘কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ’, ‘হাফ অফ এ ইয়েল সান’ উপন্যাসের জন্য অরেঞ্জ প্রাইজ, ২০১৪ সালে তার ‘আমেরিকানা’ উপন্যাসটি জিতে নেয় আমেরিকার ন্যাশনাল বুক ক্রিটিক সার্কেল এওয়ার্ড। ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় তার গল্পের বই ‘দ্য থিং এরাউন্ড ইওর নেক’; ২০০৩ সালে ছোটগল্প ‘দ্য আমেরিকান এম্বেসি’র জন্য পান ও’হেনরি পুরস্কার, ২০০৮ সালে লাভ করেন ‘রিডার ডাইজেস্ট অথর অফ দ্য ইয়ার’ পদক। ২০১৮য় পেয়েছেন ব্রিট্রেনের সম্মানিত পেন হেরল্ড পিন্টার সম্মাননা। নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা- ‘হাফ অব আ ইয়েলো সান’ উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ১৯ বছর বয়সে আমেরিকায় পাড়ি জমান উচ্চতর পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। ক্রিয়েটিভ রাইটিংস্-এ মাস্টার্স শেষ করেই আরম্ভ করেন ‘আফ্রিকান স্টাডিজ’-এ পড়াশোনা।
চিমামান্দা নাইজেরিয়া এবং আমেরিকায় থাকেন। নাইজেরিয়ায় তিনি নতুন নতুন লাইব্রেরি স্থাপন, সরকারি স্কুলে বই সরবরাহ এবং ক্রিয়েটিভ রাইটিং ওয়ার্কশপ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আফ্রিকায় তার প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক তিনি।

আমি একজন গল্পকথক, আর আজ এখানে আপনাদেরকে বলতে চলেছি আমারই কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প যাদেরকে আমি বলি ‘এক গল্পের বিপদ’। আমি বড় হয়েছি পুব নাইজেরিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। মা বলেছেন, আমি নাকি দু’বছর বয়স থেকেই পড়াশোনা শুরু করেছিলাম, যদিও আমি মনে করে যে পড়তে শুরু করবার সেই বয়সটা আসলে দুই নয়, চার, চার বছর বয়সটিই সত্যের অনেকটা কাছাকাছি। সে যাই হোক, নিজের সম্পর্কে এটা বলতেই পারি যে আমি হলাম এক ইঁচড়েপাকা পাঠক, সেই সময়ে যা কিছু পড়তাম তা ছিল ছোটদের জন্য লেখা ব্রিটিশ ও আমেরিকান লেখকদের বই।
শুধু পাঠকই না, সেই বয়সে আমি এক ক্ষুদে লেখকও ছিলাম। যখন লিখতে শুরু করি, মাত্র সাত বছর বয়সের সেসব গল্প ছিল কাঠপেন্সিলে লেখা আর পাতায় পাতায় ছিল ক্রেয়নের ইলাস্ট্রেশন, সে গল্প পড়তে আমার প্রিয় মা এক প্রকার বাধ্যই ছিলেন; সেসব গল্পে আমি তাই লিখতাম যে বইগুলো তখন আমি পড়তাম, আমার পাঠের জগতের সব কিছু হুবহু চলে আসতো লেখায়; অবধারিতভাবে সেইসব গল্পের চরিত্ররা ছিল শাদা চামড়া আর নীল চোখের মানুষ; তারা তুষারে খেলা করতো আর আপেল খেত।
তারা আবহাওয়া নিয়ে প্রচুর কথা বলতো, সূর্যোদয়ের পর চারপাশটা এক অপার্থিব আলোয় যে ছেয়ে গেছে- এ সংক্রান্ত গভীর সব আনন্দের কথা!
এখানে, আসল যে সত্যটি লুকোনো তা হচ্ছে আমি তো কখনোই বাইরের দুনিয়া দেখিনি, নাইজেরিয়ার বাইরে যাইনি কোথাও, আজন্ম এদেশেই আছি। আমরা কোনওদিনও তুষারপাত দেখিনি, আমরা আম খাই, আর কখনোই আমরা আবহাওয়ার ভালোমন্দ নিয়েও কথা বলি না, কারণ নাইজেরিয়াতে তার প্রয়োজনই পড়ে না।
আমার গল্পের চরিত্ররা জিঞ্জার বিয়ার পান করে কারণ ব্রিটিশ বইগুলোতে যে গল্পগুলো পড়তাম সেসব গল্পের চরিত্ররা জিঞ্জার বিয়ার পান করতো। কিছু মনে করবেন না আপনারা, জিঞ্জার বিয়ার কী জিনিস সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণাই ছিল না।
আর, বহু বছর পর পর্যন্ত জিঞ্জার বিয়ার চেখে দেখবার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার মনে, যদিও সে সম্পূর্ণ অন্য এক গল্প।
এইসব অনুষঙ্গ সম্পর্কে আমি প্রায়ই ভাবি যে ছোট্ট একটি শিশুর ভিতরে বিদেশি লেখকদের লেখা গল্পগুলো কী গভীর ইম্প্রেশনই না তৈরি করতে পারে, কী গভীরভাবেই না আক্রান্ত হতে পারে একটি শিশু। এমন ভাববার কারণটা হচ্ছে– তখন নিয়মিত যেসব বই আমি পড়ছিলাম, সেসব বইয়ে যত মানুষ ছিল, তারা সবাই ছিল ভীনদেশী। আমাদের নাইজেরিয়ার নিত্যপ্রিয় জগতের কেউ ছিল না সেসব গল্পে। সেসব বই দ্বারা আমি প্রভাবিত হয়ে পড়ছিলাম। চরিত্রগুলোর আচার স্বভাবের মাধ্যমে আমি প্রভাবিত হচ্ছিলাম। আরও বড় সত্য যা, তা হচ্ছে–এসব বইয়ের গল্পের মাধ্যমে আমি এমন কিছু বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলাম যা আমি নিজে কখনওই দেখি নি, সবকিছু ছিল আমার চেনা জানার বাইরের বিষয়। কিন্তু সহসাই সে পরিস্থিতি পালটে যায়, যখন পরম বিস্ময়ে আমি আফ্রিকার সাহিত্য জগৎটিকে আবিষ্কার করি! যদিও আফ্রিকার লেখকদের বইগুলো সহজলভ্য ছিল না। বিদেশি লেখকদের বই যত সহজে পাওয়া যেত, এখানকার লেখকদের বই পাওয়া ছিল ততোটাই কঠিন।
তারপরও কিন্তু চিনুয়া আচেবে, চামারা লাইয়ি’র মতো লেখকদের লেখা পড়ে সাহিত্য সম্পর্কিত আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বিরাট এক মানসিক পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে যায়। তাদের বইপত্র পাঠের পর আমি উপলব্ধি করতে পারি যে হুবহু আমারই মতো দেখতে মানুষরাও, মেয়েদের চামড়ার রঙ যেখানে চকোলেটের মতো, যাদের দড়ির মতো প্যাঁচানো চুলগুলোকে কখনওই টানটান পনিটেল করে বাঁধা যায় না—সাহিত্যে তাদেরও অস্তিত্ব আছে! তারপর থেকে আমিও এমন সব বিষয় আশয় নিয়ে লিখতে লাগলাম যা কিছু আমি চিনি, জানি, এবং অনুভব করি।
এই সময়ে এসেও ছোটকালে পড়া সেইসব ব্রিটিশ ও মার্কিন বইগুলোকে আমি পছন্দ করি। বইগুলো আমার সৃজনকল্পনার জগৎকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল, আমার সামনে খুলে দিয়েছিল অচেনা অজানা সব জগতের দুয়ার। কিন্তু আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল যে ব্যাপারটি তা হচ্ছে আমার মতো মানুষদের সাহিত্যে উপস্থিতি। হুবহু আমার মতো দেখতে মানুষরাও যে সাহিত্যের পাতায় থাকতে পারে তা আমি একেবারেই জানতাম না। আফ্রিকার লেখকদের আবিষ্কার করাটা আমার জন্য ছিল বিস্ময়কর এক ঘটনা। তাদের লেখা বইগুলো আমাকে এক গল্পের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিল।
আমি এক প্রথাগত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাইজেরিও পরিবার থেকে উঠে আসা লেখক। বাবা অধ্যাপনা করতেন, মা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ঠিক যেমনটি আমাদের সমাজের প্রথা, সে অনুয়ায়ী বাড়ির টুকটাক কাজে সাহায্যের জন্য কাছেপিঠের গ্রাম থেকে আসা কোনও একটি ছেলে বা মেয়েকে রাখা হতো। যে-বছর আমি ৮-এ পা দিলাম, ঠিক সে-বছরই কাছের এক গ্রাম থেকে বাড়িতে একটি কাজের ছেলে এল। ছেলেটির নাম ফিদে। ফিদে সম্পর্কে মা আমাদেরকে একমাত্র যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো- পরিবারটি দারিদ্র্যপীড়িত। মা ফিদেদের বাড়িতে ইয়াম আর ধান পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন, সঙ্গে গাট্টি বেঁধে দিলেন আমাদের কিছু পুরোনো কাপড়। মা যখনই দেখতেন যে আমি রাতের খাবার খেতে চাচ্ছি না, তখনই বলতেন : সব খাবার শেষ করবে কিন্তু, ফেলে দেবে না; জানো না কিছু? ফিদের মতো ছেলেদের ঘরে একমুঠো খাবারও নেই। এতকিছু জানবার পর, পরিবারটির জন্য মর্মবেদনা অনুভব করতে শুরু করি।
তারপর এক শনিবারে, আমরা গেলাম ফিদেদের গ্রামে, বেড়াতে। তার মা আমাদেরকে অদ্ভুত সুন্দর নকশা তুলে বানানো একটি ঝুড়ি বের করে দেখাল। ঝুড়িটি বানানো হয়েছিল রঙরঞ্জিত পামপাতার সুতো দিয়ে; বানিয়েছিল ফিদের এক ভাই। ঝুড়ির এমন সুন্দর নকশা দেখে তো আমি অবাক। এমনটা একবারও মনেই হয়নি যে এই পরিবারটির কারও পক্ষে এমন একটি দৃষ্টিনন্দন জিনিস বানানো সম্ভব। তাদের সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা কিছু জেনেছি, তাতে শুধু ছিল এই পরিবারটির চরম দারিদ্রের কথা, ফলে সীমাহীন দুঃখ আর দুর্ভোগ ছাড়া তাদের সম্পর্কে অন্যকিছু ভাবাটা ছিল অসম্ভব। ফিদেদের পরিবারের দারিদ্রতাই ছিল আমার কাছে তাদের সম্পর্কে শোনা একটিমাত্র গল্প, সে গল্পে তাদের সৌন্দর্য সৃষ্টির ব্যাপারে একটি শব্দও ছিল না।
তার ক’বছর আমি যখন নাইজেরিয়া থেকে মার্কিন দেশে পড়তে গেলাম, তখন আমি এই এক গল্পের বিপদ নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে শুরু করেছি; আমার বয়স তখন উনিশ-বিশের কোঠা পার হচ্ছে। আমাকে দেখে আমার মার্কিন রুমমেট যেন বিরাট এক ধাক্কা খেল, জানতে চাইলো এত সুন্দর করে ইংরেজিতে কথা বলা আমি কীভাবে রপ্ত করেছি? তারচেয়েও বড় ধাক্কাটি খেল যেখন সে আমাকে বলতে শুনলো যে নাইজেরিয়া দেশটি ইংরেজিকে তাদের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। রুমমেটটি যখন আমার গানের রেকর্ডগুলো থেকে আফ্রিকার আদিবাসী সঙ্গীত শুনবে বলে আশা করলো তখন আমি দারুণ উল্লাসে মারায়া ক্যারির গান শুনছি।
সে ধরে নিয়েছিল যে আমিই জানি না কীভাবে স্টোভ ব্যবহার করতে হয়!
এ অবস্থায় আমার মনে হতে লাগলো : আমার জন্য সে বেদনা অনুভব করছে, এমনকি আমার সঙ্গে পরিচয়ের আগে থেকেই আমাদের সম্পর্কে সে বেদনাহত। আমার একজন আফ্রিকান হওয়ার কারণে এই পৃথিবীতে তার স্থানটি অবধারিতভাবেই নির্ধারিত ছিল আমার পিঠ চাপড়ে দেওয়াতে, আমাকে দয়া দেখানোতে। এখানে যা লক্ষ্যণীয়, তা হচ্ছে– আমার রুমমেটের কাছে ছিল আফ্রিকার একটিমাত্র গল্প, যে-গল্পে শুধু আমাদের হতাশা, দুর্ভোগ আর বিপর্যয় ছাড়া আর কোনও কথাই ছিল না। এই একটি গল্পের কারণে আফ্রিকান লোকদের তার মতো হওয়ারও কোনও সম্ভাবনা ছিল না, আমাদের জন্য দয়া কিংবা সমবেদনা ছাড়া আর কিছু পাওয়ারও ছিল না। এমনকি অন্য একজন মানুষের মতো আমাদের সঙ্গে তার সংযোগেরও কোনও সম্ভাবনা ছিল না।
এ-কথাটি এখন আমাকে বলতেই হবে যে আমেরিকা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনওদিনই সচেতনভাবে আমি কোথাও আফ্রিকান হিসেবে পরিচিত ছিলাম না। কেউ একবারও বলেনি যে আমি আফ্রিকান। কিন্তু আমেরিকায় যখনই আফ্রিকার কথা উঠত, লোকে আমাকে এই পরিচয়ে চিহ্নিত করত–আমি আফ্রিকান। আপনারা কিছু মনে করবেন না, আমি কিন্তু নামিবিয়া সম্পর্কে কিছুই জানি না, যদিও আমি আমার নতুন আত্মপরিচয়টিকে আলিঙ্গন করতে চেয়েছি আর বহুবার বহুভাবে নিজেকে একজন আফ্রিকান হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি।
তাই, একজন আফ্রিকান হিসাবে আমেরিকায় কিছুদিন কয়েক বছর কাটাবার পর, আমার প্রতি আমার রুমমেটের এই মনোভাবের মূলে গিয়ে সবকিছু বুঝতে শুরু করেছিলাম। যদি না আমি নাইজেরিয়ায় বেড়ে উঠতাম আর যদি সারাবিশ্বে জনপ্রিয় হওয়া ফটোগুলো দেখে দেখে আফ্রিকাকে জানতাম, তাহলে তার মতো আমিও মনে করতাম যে আফ্রিকা হচ্ছে নয়নাভিরাম ভূদৃশ্যাবলী আর বন্যপ্রাণির এক লীলাভূমি, আর অবোধ্য, অজ্ঞান সব মানুষ যারা নির্বোধ যুদ্ধে লিপ্ত, যারা দারিদ্র্যপীড়িত এবং এইডসে মারা যায়, আর যারা নিজেদের সম্পর্কে কিছুই বলতে পারে না, আর প্রতিদিন অপেক্ষা করে দয়ালু শাদা চামড়ার বিদেশীরা এসে তাদের রক্ষা করবে। আমিও আফ্রিকানদের ঠিক এভাবেই দেখতাম যেভাবে আমি ছোটবেলায় ফিদের দারিদ্রপীড়িত পরিবারটিকে দেখেছিলাম।
আফ্রিকা সম্পর্কিত এক গল্পের জন্ম হয় আমার মতে পশ্চিমা সাহিত্য থেকে। এখন আমি লন্ডনের এক প্রখ্যাত ব্যবসায়ীর নোটবই থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যার নাম জন লক, যিনি সাগরে নাও ভাসিয়েছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার উদ্দেশ্যে। জলপথে যেতে যেতে যাত্রাপথের এক চমকপ্রদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করছিলেন তিনি। কালো কালো মানুষ দেখে- ‘এরা জন্তু, যাদের ঘরবাড়িও নেই’ এসব বলে তিনি তার বিবরণীতে লেখেন- ‘তারাও মানুষ কিন্তু মানুষের মতো একটি মাথা তাদের নেই আর তাদের মুখ ও চোখ লটকে আছে তাদের স্তনে।’
ঠিক যতবার আমি লকের এই কথাগুলো পড়ি, পড়লেই হাসতে শুরু করি। কোনওমতেই তার বিপুল কল্পনাশক্তির প্রশংসা না করে থাকতে পারি না। এখানে যে কথা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তা হচ্ছে আফ্রিকা সম্পর্কিত গল্পকে পশ্চিমের কাছে উপস্থাপনের কৌশল। এই কৌশলটিই দেখার মতো বিষয়। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠবে আফ্রিকাকে ঠিক কীভাবে গল্পে বলা হচ্ছে। পশ্চিমে আফ্রিকা সম্পর্কিত গল্পে যা থাকে, তা মোটাদাগে এই : সাব-সাহারান অঞ্চল হিসেবে আফ্রিকা এক নিষ্ক্রিয়, অচিনা, অন্ধকার, আর এমন সব মানুষের দেশ, যারা–বিস্ময়কর কবি রুডইয়ার্ড কিপলিঙের লেখায় যেভাবে এসেছে–‘অর্ধেক শয়তান আর অর্ধেক শিশু’।
আর, এজন্যই আমি খুব সহজে বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার মার্কিন রুমমেটটি আমাদের সম্পর্কে একক গল্পগুলোই শুধু শুনেছে, অনেকটাই সে অধ্যাপকের মতো করে যিনি আমাকে একদিন বললেন : আমার উপন্যাস কোনওভাবেই ‘বিশ্বস্ত আফ্রিকান’ নয়। আমি তো চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমি হয়তো উপন্যাস লিখতে ব্যর্থ হয়েছি, হয়তো যা বলবার তা পুরোপুরি বলে উঠতে পারিনি আমার উপন্যাসে কিন্তু এমনটা তো কখনও কল্পনাতেও আসেনি যে আমার উপন্যাস এমন কিছুকে ধরতে পারেনি যাকে বলে আফ্রিকান বিশ্বস্ততা! আর, সত্যি বলতে ঠিক কাকে বলে ‘আফ্রিকান বিশ্বস্ততা’ আমার তাও পুরোপুরি জানা নেই। অধ্যাপক আরও বললেন : আমার উপন্যাসের চরিত্রগুলো তার মতো হয়ে গেছে। তারা সব শিক্ষিত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন৷ গাড়ি চালাতে পারে আর একদমই ক্ষুধার্ত নয়। সুতরাং এ উপন্যাস প্রক্রিত অর্থে ‘বিশ্বস্ত আফ্রিকান’ হয়ে ওঠতে পারেনি।
আমি নিজেও একদিন এক গল্পে বিশ্বাস করেছিলাম বলে এখনও নিজেকে অপরাধী মনে করি। ক’বছর আগে একবার মেক্সিকো বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেই সময়ে আমেরিকার রাজনৈতিক আবহাওয়াও কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছিল মূলত অভিবাসন প্রশ্নে। মেক্সিকো-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। জোর বিতর্ক চলছিল অভিবাসন নিয়ে। আমি দেখেছি আমেরিকায় প্রায়ই এমনটা ঘটে থাকে–অভিবাসন শব্দটি মেক্সিকানদের সমার্থক হয়ে ওঠে। আমেরিকায় হরহামেশাই এসব একক গল্প শুনতাম–মেক্সিকানরা তাদের হেলথকেয়ার সিস্টেমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে, চোরের মতো শুধু সীমান্ত অতিক্রম করছে, অতিক্রম করতে গিয়ে সীমান্তেই গ্রেফতার হচ্ছে…এমন কত শত গল্প, যে-গল্পের শেষ বলে কিছু নেই।
মনে আছে, সেবার মেক্সিকোর গাদালাহারায় ঘুরছিলাম। ঘুরে দেখছিলাম সেখানকার জনজীবনের স্পন্দটিকে, ছন্দটিকে। লোকজন কাজে যাচ্ছে, হাসছে, ধূমপান করছে, রোল করা টর্টিলা খাচ্ছে। তুমুল জমাট এক জীবন। এসব দৃশ্য আমাকে হতবিহ্বল করে ফেলেছিল, ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম। সব কিছু মনে আছে। ভীষণ লজ্জিত হয়েছিলাম, বিব্রত হয়েছিলাম। মেক্সিকানদের নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একপেশে খবরে আমি এতোটাই নিমজ্জিত ছিলাম যে তাদের সম্পর্কে আমার মনে কেবল একটিমাত্র ধারণাই গড়ে উঠেছিল– ‘হীন, কাপুরুষ অভিবাসী’। পয়সা খরচ করে মেক্সিকানদের নিয়ে রচিত একক গল্প কিনছিলাম আমি এতোদিন! আর তাতেও আমার ভিতর কোনও লজ্জার জন্ম হয়নি! আজ আমি সত্যিই বিব্রত, নিজের কাছে নিজে।
এই হচ্ছে ‘এক গল্প’ তৈরির প্রক্রিয়া। এভাবেই আমরা মানুষকে ভুল মানুষ হিসেবে দেখি; এক গল্পে তাকে পুরোপুরি দেখা যায় না। আর বারে বারে এক মানুষকেই দেখানো হয়, আর এভাবে এক মানুষ দেখতে দেখতে আমরাও তাকে আর অন্যকিছু ভাবতে পারি না, মানুষটির আর কিছুই আমাদের দেখাও হয় না।
‘ক্ষমতা’ সম্পর্কে কিছু না বলে এক গল্পের বিপদ সম্পর্কিত আলোচনা অসম্ভব। আমি যখন পৃথিবীর ক্ষমতা-কাঠামো নিয়ে চিন্তা করি, তখনই একটি ইবো শব্দ আমার মনে পড়ে যায়, শব্দটি হচ্ছে ‘আঙ্কলি’ (নাইজেরিয়ার ইবো জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত একটি শব্দ-nkali); এটি একটি বিশেষ্য শব্দ, একটু শিথিল অনুবাদে যার অর্থ দাঁড়ায়–অন্যের চেয়ে বড় হয়ে থাকা, একেবারে আমাদের সময়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের মতো, এখানে আমাদের গল্পগুলো এই আঙ্কলির নীতি দ্বারা বিবেচিত হয়, যেমন–গল্পগুলো কীভাবে বলা হয়, কে গল্পগুলো বলে, গল্পগুলো কখন বলা হয়, আর কতগুলো গল্প বলা হয়। ক্ষমতা এ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
কেবল অন্য একজনকে গল্পটি বলার সক্ষমতাই কিন্তু আসল ক্ষমতা নয়, আসল ক্ষমতা হচ্ছে সেই ব্যক্তির জন্য গল্পটিকে সুনির্দিষ্ট করে তৈরি করার ক্ষমতা। ফিলিস্তিনি কবি মুরিত বাঘোতি লিখেছেন : যদি কখনও কাউকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে চান, তাকে অধিকারচ্যুত করতে চান, অপদস্ত করতে চান, বিতাড়িত করতে চান, তার সবচে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে তাকে শুধু তার গল্পটিই বলতে থাকুন এবং আসল গল্পের জায়গায় অবশ্যই ‘দ্বিতীয়’ গল্পটি বলুন, মানে একক গল্পটি বলুন। গল্পটি শুরু করে দিন নেটিভ আমেরিকানদের ধনুকের তীর নিয়ে, আফ্রিকায় ব্রিটিশ আগমনের সঙ্গে গল্পটির যেন কোনও দূরতম সংযোগও না থাকে; তাহলেই দেখবেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প রয়েছে আপনার কাছে। এখন গল্পটি বলতে শুরু করে দিন আফ্রিকার দেশগুলোর ব্যর্থতা দিয়ে, কিন্তু খুব সাবধানে, আফ্রিকায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যেন এই গল্পের একটুও মিল না থাকে।
কিছুদিন আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করছিলাম, তখন সেখানকার এক ছাত্র বলে উঠলো : নাইজেরিও পুরুষরা শারিরীক নির্যাতনে ওস্তাদ, তারা প্রত্যেকেই আমার উপন্যাসের বাবা চরিত্রটির মতো। তখন আমি তাকে বললাম যে দেখো, গতকালই আমি একটি উপন্যাস পড়ে শেষ করেছি, উপন্যাসটির নাম ‘আমেরিকান সাইকো’। তো এ উপন্যাস পাঠের পাঠকৃতি হলো–এ এমনই এক অসীম লজ্জার কথা যে ইয়াং মার্কিনিরা প্রত্যেকেই সিরিয়াল কিলার।
আসলে, এসব কথার মধ্য থেকে মানুষের যে-মনোভাবটি প্রকাশিত হয়, তা হচ্ছে : চরম বিরক্তি।
কই, আমার ক্ষেত্রে তো এরকম কখনওই ঘটেনি যে কেবল একটি মাত্র উপন্যাস পড়েই–সে উপন্যাসের একটি চরিত্র যদি সিরিয়াল কিলারও হয়–মনে করতে লাগলাম যে সিরিয়াল কিলার চরিত্রটিই প্রকৃত মার্কিন তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করছে অথবা তারা সবাই সিরিয়াল কিলার। কখনওই এমন ধারণা জন্মায়নি। তার কারণটি হচ্ছে পাঠের দিক থেকে আমি ওই ছাত্রটির চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছি। সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির কারণে আমেরিকার অনেক গল্পই আমরা জানি। তাছাড়া আমি টাইলার পড়েছি, আমি আপডাইক পড়েছি। আমি স্টেইনব্যাক এবং গাসকিলকে পড়েছি। মোট কথা, আমার কাছে আমেরিকার কোনও একক গল্প ছিল না।
এমন একটি কথা কোথাও শুনেছিলাম–লেখককে সফল হতে হলে এক অসুখী শৈশবে বেড়ে ওঠতে হয়। সত্যিকার অসুখী শৈশব ছাড়া কোনও লেখকই সফল হতে পারেন না। কথাটি শুনেই ভাবতে শুরু করেছিলাম যে কীভাবে আমি আমার শৈশবে ঘটে যাওয়া বেদনাদায়ক ঘটনার স্মৃতিগুলো আবিষ্কার করতে পারব যা বাবা মা আমার জন্য তৈরি করেছিলেন আর আমি অসুখী হয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু সত্যটা তো এই–শৈশবে আমি চমৎকার ছিলাম। একটি ঘনিষ্ঠ পরিবারে হাসি আনন্দ ভালবাসায় পূর্ণ ছিল সে শৈশব।
কিন্তু তবুও আমার পিতামহকে শরণার্থী ক্যাম্পে মরতে হয়েছে। আমার চাচাতো ভাইয়ের–যার নাম ছিল পোলে–অকাল মৃত্যু হয়েছে কারণ সে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পায়নি। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি, ওকোলোমা, বিমান দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরেছে কারণ আমাদের আগুনের ট্রাকগুলিয় পর্যাপ্ত পানি ছিল না। আমি সামরিক শাসনের দমনপীড়ন দেখে দেখে বেড়ে উঠেছি কখনওই যারা শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়নি। প্রায়ই তারা বাবা মা’র বেতন আটকে দিতো; ফলে সেই ছোটবেলাতেই দেখছি–নাস্তার টেবিল থেকে একদিন জেলির বয়ামটি হারিয়ে গেছে, তারপর দিন হারিয়ে গেল মাখনের ডিবা, তারপর একদিন রুটিও; একদিন দুধের বরাদ্দও বন্ধ হয়ে গেল আর সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠলো এক ভয়, সে-ভয় ছিল রাজনৈতিক ভয়, যা আমাদের জীবনকে কেবল ছোবল মারতেই ফণা তুলছিল।
এইসব গল্পই আজকের এই আমার আত্মপরিচয়টি তৈরি করেছে। কিন্তু শুধু আমার নেতিবাচক গল্পগুলোকে প্রধান করে দেখবার মানে হলো আমার সমস্ত অভিজ্ঞতাকে একেবারে মামুলি বিষয়ে পরিণত করা, তাচ্ছিল্য করা, আর এড়িয়ে যাওয়া সেইসব গল্পকে যা আমাকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছে। নেতিবাচক গল্পগুলোকে প্রধান করে দেখবার মানে হলো আমার জীবনাভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা, আমার অন্য সমস্ত গল্পকে উপেক্ষা করা। এক গল্প সব সময়ই গৎবাঁধা অবস্থা (স্টেরিওটাইপ) তৈরি করে। গৎবাঁধা গল্পের সমস্যা হলো তারা শুধু মিথ্যাই নয়, অসম্পূর্ণ, এক গল্পকে যা শুধু একটি গল্পেই পরিণত করে।
অবশ্যই, আফ্রিকা দুর্যোগপূর্ণ একটি মহাদেশ, নিষ্ঠুরতা যেখানে অতিকায় দানব হয়ে উঠেছে, যেমন : কঙ্গোয় দীর্ঘদিন ধরে চলা ভয়ঙ্কর ধর্ষণ; যেখানে স্থায়ী হয়েছে বিপুল বিষণ্ণতা, যেমন : নাইজেরিয়ায় চাকরির একটিমাত্র পদের জন্য আবেদন পড়েছে ৫,০০০। কিন্তু, এসব সত্ত্বেও, এমন গল্পও তো আছে যা বিপর্যয়ের নয়, যা অর্থবহ, তাৎপর্যপূর্ণ। সে গল্প এতোই তাৎপর্যপূর্ণ যে তাদের নিয়ে অবশ্যই আমাদের কথা বলতে হবে।
আমার সব সময়ই মনে হয়েছে, কোনওভাবেই একটি স্থান কিংবা একজন ব্যক্তির গল্পগুলো না জেনে সে স্থান এবং ওই ব্যক্তির সঙ্গে কিছুতেই সম্পর্কিত হওয়া যায় না। এক গল্পের পরিণতি সম্পর্কে বলা যায় : এক গল্প আত্মমর্যাদা হরণ করে মানুষকে অসম্মানিত করে, মানুষের সমতার স্বীকৃতিগুলোকে জটিল করে তোলে। কীভাবে আমরা সকলেই এক এবং একাকার–এ-বোধের পরিবর্তে ‘কোথায় আমরা পরস্পর থেকে ভিন্ন’, এক গল্প সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
মেক্সিকো যাওয়ার আগে আমি যদি আমেরিকা-মেক্সিকো উভয় পক্ষের মধ্যে চলমান অভিবাসন বিতর্ক সম্পর্কে জেনে নিতাম, তাহলে কি ঘটত? মা যদি বলতেন ফিদের পরিবারটি দারিদ্রপীড়িত হলেও কঠোর পরিশ্রমী ছিল, তাহলে? কি হতো যদি আমাদেরও একটি আফ্রিকান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক থাকত যা বিশ্বজুড়ে বৈচিত্রময় আফ্রিকান গল্পগুলো সম্প্রচার করবে? নাইজেরিও লেখক চিনুয়া আচেবে যাকে বলেন ‘গল্পের ভারসাম্য’।
কী ঘটবে, রুমমেটটি যদি জানতে পারে আমার নাইজেরিও প্রকাশক মুহতার বাকের সম্পর্কে, যিনি এমন এক অসাধারণ মানুষ, স্বপ্নকে বাস্তব করতে গিয়ে একদিন তিনি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছিলেন, প্রকাশক হতে গিয়ে যিনি ব্যাংকের চাকরিটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। নাইজেরিওদের নিয়ে এমন একটি প্রজ্ঞাকথা চালু আছে যে তারা সাহিত্য পড়তে পারে না। প্রকাশক মুহতার বাকের অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন পড়ালেখা যে করেছে সে অবশ্যই বই পড়বে, যদি তুমি সাহিত্যের বইগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রকাশ করতে পারো, যদি সেই বইগুলো সহজলভ্য হয়।
আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর লিগোসের এক টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েছিলাম, সেখানে এক নারী, যিনি সেখানে মেসেঞ্জারের কাজ করতেন, আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন-‘তোমার উপন্যাসটি আমার ভাল লেগেছে কিন্তু শেষটা ঠিক মন মতো হয়নি। তুমি তোমার উপন্যাসের উত্তরভাগ (সিক্যুয়েল) লেখা শুরু করো, শেষের দিকে যেতে যেতে ঘটনাটি এরকম ঘটবে…’
তিনি বলে চললেন উপন্যাসের উত্তরখণ্ডে কী লিখতে হবে! আমি যে এতে শুধু আনন্দিতই হলাম তা নয়, বেশ নড়েচড়েও উঠলাম। এই যে নারী, এতক্ষণ কথা বললেন, তিনি কিন্তু নাইজেরিয়ার একেবারে সাধারণ জনগণের অংশ, যার হয়তো পাঠক হওয়ার কথা ছিল না; উপন্যাসটিকে তিনি কেবল পড়েননি, উপন্যাসটির মালিকানাও সে নিয়ে নিয়েছিলেন; আর আমাকে বলবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিলেন, উপন্যাসের উত্তরভাগের গল্পটিকে আমি ঠিক কীভাবে লিখব!
কী ঘটতো, আমার সেই রুমমেট যদি প্রিয়বন্ধু ফুন্মি ইয়ান্ডা সম্পর্কে কিছু না কিছু জানতো! ফুন্মি এক সাহসী নারী লিগোসে যে একটি টিভি শো যে উপস্থাপনা করে, যে-গল্পগুলিকে আমরা ভুলে যেতে চাই সেগুলোকে সে কোনওভাবেই আমাদের ভুলতে দেয় না, ভুলতে দেবেনা; গল্পগুলোকে বারবার বলতে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ! এসব যদি আমার রুমমেট জানতো? আমার রুমমেট যদি জানত গত সপ্তাহে লিগোসের হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসায় কী অসাধ্য সাধনই না করা হয়েছে! কী ঘটত, যদি আমার রুমমেট সমসাময়িক নাইজেরিও সংগীত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতো, প্রতিভাবান সব শিল্পী সেখানে ইংরেজী এবং পিজিন এবং ইবো এবং ইওরুবা এবং ইজো ভাষায় গান গাইছেন, জে-জো থেকে ফেলা হয়ে বব মার্লে হয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের গানের দূরতম প্রভাব এসে মিশে যাচ্ছে এদেরও গানে।
আমার রুমমেট যদি সেই নারী আইনজীবীকে জানতো, সম্প্রতি যিনি নাইজেরিয়ার আদালতে গিয়েছিলেন উদ্ভট একটি আইনকে চ্যালেঞ্জ করতে, যে-আইনে বলা হয়েছে কোনও নারী পাসপোর্ট নবায়ন করতে চাইলে স্বামীর সম্মতি নিতে হবে। আমার রুমমেট যদি নলিউড সম্পর্কে জানতো, যেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই পূর্ণ উদ্ভাবনীশক্তির অধিকারী মানুষগুলো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তৈরি করছেন। রুমমেট যদি আমার পরিচিত সেই বিস্ময়কর মেয়েটিকে জানতো যে চুল বিনুনি করার কাজ করে করে এখন নিজেই চুলসজ্জার দোকান খুলেছে? কিংবা যদি কয়েক মিলিয়ন নাইজেরিওর সম্পর্কে জানতো যারা বিরাট স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসা শুরু করে, কখনও কখনও ব্যর্থ হয়, নিঃস্ব হয় কিন্তু ভিতরে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে লালন করতে থাকে?
যখনই আমি দেশে যাই, গেলেই বুঝতে পারি যে বেশিরভাগ নাইজেরিও নাগরিকের জন্য এই ব্যাপারগুলো অস্বস্তিকর : আমাদের ব্যর্থ অবকাঠামো, আমাদের ব্যর্থ সরকার। কিন্তু আসল অস্বস্তি তো তাই, যেখানে মানুষ তার নিজের জীবনের সমৃদ্ধি অর্জনে একটি ব্যর্থ সরকারের চেয়েও ব্যর্থ; এখানে মানুষের কাজই হচ্ছে পিছিয়ে থাকা, পিছিয়ে যাওয়া। অস্বস্তি এ কারণেই। প্রতি গ্রীষ্মেই আমি লিগোসে লেখালেখি বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করি, সেসব কর্মশালায় অংশগ্রহণের আবেদনের পরিমাণ দেখে আশ্চর্য হই! কত লোক যে অংশ নিতে আবেদন করে, কত লোক যে লিখতে অধীর, গল্প বলতে অধীর…
আমার নাইজেরিও প্রকাশক এবং আমি মিলে ‘ফারাফিনা ট্রাস্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। আমাদের সবচে বড় স্বপ্ন এখন নতুন নতুন লাইব্রেরি গড়া, পুরোনো লাইব্রেরিগুলোর সংস্কার। যাদের লাইব্রেরি এবং সরকারি স্কুলে বই নেই সেখানে বই সরবরাহ করা; আর প্রচুর, প্রচুর সংখ্যক কর্মশালার আয়োজন। সেখানে শুধু বইপড়া আর লেখালেখি নিয়ে কথা হবে তাদের সঙ্গে যারা তাদের গল্পটি বলবার জন্য অধীর হয়ে আছে।
গল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বহু গল্পই গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা করে ফেলতে সক্ষম। গল্প যেমন বহু মানুষকে অসম্মান করেছে, কাউকে না কাউকে ক্ষতিকর মানুষ হিসেবে দেখিয়েছে, গল্প তেমনি ক্ষমতায়ন এবং মানবিকিকরণের কাজেও লেগেছে। গল্প যেমন মানুষের আত্মসম্মানবোধকে নস্যাৎ করে দিতে পারে তেমনি গল্প পারে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে।
মার্কিন লেখক অ্যালিস ওয়াকার তাঁর দক্ষিণি আত্মীয়দের সম্পর্কে লিখেছেন যারা দক্ষিণের বাস গুটিয়ে উত্তরের দিকে চলে গেছেন। তিনি তাদেরকে দক্ষিণি জীবন নিয়ে–যে-জীবন তারা পেছনে ফেলে এসেছেন–লিখিত একটি বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন; তিনি বলেন : ‘তারা গোল হয়ে বসে, বইটি নিজেরা পড়ে, পড়তে পড়তে তারা আমার কথা শুনতে পায়, এবং তারা বইটিতে এমন এক জগতের সন্ধান পায় যা অপার্থিব।’
আমি এই কথাটি বলেই আজ শেষ করতে চাই: যখনই আমরা এক গল্পকে প্রত্যাখ্যান করি, যখনই আমরা উপলব্ধি করি কোনও কিছুরই একক গল্প নেই, তখনই আমরা অপার্থিব এক জগতের সন্ধান পাই।

ধন্যবাদ


1 Response

  1. Arefin says:

    অসাধারণ। ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.