গল্প

রম্যগল্প: শাখামৃগ নৃত্য

চিররঞ্জন সরকার | 28 Jun , 2019  


চিত্রকর্ম: ভাসিলি কান্দিনিস্কি

আমাদের ছাপোষা মধ্যবিত্ত জীবনে পরম শান্তির দিন হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার। এদিন অফিসে যাবার বালাই নেই, বসদের অকারণ বিরক্তি-ক্ষোভ-বদমেজাজ সহ্য করার কোনো বিষয় নেই। সংকীর্ণমনা, স্বার্থপর কিন্তু অতিচালাক সব কলিগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার বালাই নেই। নিজের মতো করে কাটানো স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দিন। উপভোগের একটি দিন। কিন্তু সেই দিনটাও মাঝে মাঝে নষ্ট হয়ে যায়। সাংসারিক ঝামেলা সে দিনটাকেও পায়েসের মধ্যে বালুর ছিটার মতো কিচকিচে বানিয়ে দেয়।
আজকের দিনটির কথাই ধরা যাক। একেবারেই ভিন্ন এবং বিরক্তিকর। আসলে মানুষের জীবনে স্বাধীন-সার্বভৌম বলে কিছু নেই। আমরা তো নিজেরাই নিজেদের জন্য একটা কারাগার সাজাই। তারপর সেই কারাগারে অভ্যস্ত দিন কাটাই। কাজেই আক্ষরিক অর্থে ‘স্বাধীন-সার্বভৌম’ একটি দিন কাটানো আর হয়ে ওঠে না। শুক্রবার অফিস না থাকলে কি হবে, পরিবার আছে, সংসার আছে। অশান্তি সেখানেও।
ভোর হতে না হতেই বিকট শব্দে বেজে ওঠে মোবাইল ফোন। এটা কোনো ফোন কল নয় অবশ্য, এলার্ম: আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি! এটা আমার একটা প্রিয় গান। এই দুনিয়াকে, প্রিয়জনকে দেখার আকুতি আছে এই গানে। এটাকেই সকাল বেলার এলার্ম-টোন হিসেবে কেন জানি সেট করেছিলাম-মনে নেই। তো এই টোনটা অশ্লীল ভঙ্গিতে বেজে ওঠা মাত্রই সেটাকে দুম করে বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম।
আর তৎক্ষণাৎ এতক্ষণ ধরে আমাকে পাশবালিশ বানিয়ে শুয়ে থাকা, আমার অভিভাবক কাম গোয়েন্দা কাম স্ত্রী চোখ বন্ধ করেই, কর্কশ গলায় বলে উঠলো, এই যে নবাবের বাচ্চা, ঘুম কি আজ ভাঙ্গবে না?
আমিও ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই জবাব দিলাম, ‘আজ তো শুক্রবার। অফিস নেই, আরেকটু ঘুমালে ক্ষতি কি?
– না ক্ষতি আর কি, তবে মাসুমদের বাড়ি থেকে দুধটা কে আনবে, আমার বাবা?
– না না উনাকে আবার টানছ কেন, উনি স্বর্গে গিয়েছেন, সেখানেই থাকুন, আমিই যাবো, তবে সেটা আটটার পর।
– হাঁ, মাসুমের বাবা তো তোমার কেনা গোলাম, যে আটটা পর্যন্ত তোমার জন্য খাঁটি দুধ নিয়ে বসে থাকবে? এরপর গেলে পাবে জলমেশানো দুধ। আর আমি সেই জল ঢালা দুধ গিলব এটা ভাবলে কি করে?
এখানে বলে রাখা ভালো যে, বিয়ের সময় পর্যপ্ত সোনা-গয়না-আসবাবের সঙ্গে বউয়ের তিরিক্ষি মেজাজটাও ফ্রি পেয়েছিলাম। বিয়ের পর আরও আবিষ্কার করলাম তার হাড়-হাড্ডির কি একটা জটিল সমস্যা আছে। একটু বেশি ঠাণ্ডা লাগলে হাত-পায়ের আঙুল কেমন স্থির হয়ে যায়। এ জন্য ডাক্তার একগাদা ওষুধ দিয়েছে। সঙ্গে প্রতি রাতে একগ্লাস খাঁটি গরুর দুধ গেলার পরামর্শ। সে নিজেই খাঁটি গরুর দুধের সন্ধান এনেছে। বাসা থেকে পায়ে-হাঁটা দূরত্বেই এক বাসায় এই দুধ বিক্রি হয়। একদিন পর পর গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। বলাবাহুল্য, কাজটি আমাকেই করতে হয়।
কথা না বাড়িয়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় উঠে পড়লাম। এসব ক্ষেত্রে মায়ের মুখটা মনে পড়ে, ছেলেবেলায় পড়তে বসে ঘুমিয়ে গেলে মা বলতেন, ‘পড়াটা করে নে বাবা, ঘুমানোর জন্য সারাটা জীবন পড়ে আছে।’ মার কথা বিশ্বাস করতাম। কিন্তু হায়, নিজের মতো করে কোনো রকম বাধা-বিঘ্ন ছাড়া অনির্দিষ্টকাল ধরে ঘুমানোর সুযোগ এই ৪৪ বছর বয়সী জীবনে এখনও পেলাম না!
যাহোক, টি-শার্টের ওপর একটা জ্যাকেট চাপিয়ে রাস্তায় নামলাম, শীতকালের সকাল সাড়ে ছয়টা মানে কিন্তু আসলেই অনেক সকাল। হালকা কুয়াশা-মোড়া পথে কয়েকটা চেনা নেড়িকুত্তা ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না ,ককুরগুলো পর্যন্ত বুঝে গেছে যে, আমি একটি বঞ্চিত ও নির্বিষ বান্দা, তাই তারাও আজকাল আমাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না। ভিখারিদের মতো আস্তে আস্তে হেঁটে আমি মাসুমদের বাসায় পৌঁছে গেলাম। মাসুমের বাবা একেবারে কুচকুচে কালো। বেশ মোটাতাজা শরীরে একটা ঢোলাঢালা কিম্ভুত সাইজের সোয়েটার চাপিয়ে দুধ দুয়ে চলেছে। তিনি একজন অদ্ভুত স্বভাবের লোক, ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই পান খেতে শুরু করেন, কালো কুচকুচে মুখে টকটকে লাল মোটা মোটা দুটি ঠোঁট, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কালো কড়াইয়ের একটা কোণায় আগুন জ্বলছে। তিনি কীভাবে যেন টের পেয়ে যান তার কাছে কে এসেছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে আমার দিকে না তাকিয়েই বলে উঠল, ‘কি দাদা, এসে পড়েছেন। তার পর ধ্যানমগ্ন গাভীটির উদ্দেশ্যে বলল, বুঝলি ময়না, এই দাদা মশায় হলেন আমার পরথম কাস্টমার। পরতি দিন সে ফাস্ট হয়। শীত গ্রীষ্ম বরষা, কুনু কামাই নাই, কুনু মিস নাই। বলেই নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেঁসে উঠল।
এই কথার মধ্যে হাসির কি আছে, আমি খুঁজে পেলাম না। রাগে শরীরটা গির গির করতে লাগল। অনেক চেষ্টা করলাম একটা জুতসই জবাব দেওয়ার, কিন্তু অনেক ভেবেও কি বলব ঠাহর করতে পারলাম না। অগত্যা ‘হ্যাঁ, তাই আরকি’ মার্কা একটা মানেমতলবহীন কথা বললাম! মাসুমের বাবা এর মধ্যেই একটা মগ দিয়ে এক লিটার দুধ মেপে দিল। দুধ নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম, চিন্তা করে দেখলাম, বউ একেবারে মিথ্যে বলে না যে, তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না।
বউয়ের নির্দেশমতো বাইরে থেকে তালা আটকিয়ে গিয়েছিলাম। খুব গোপনে তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করি। যেন নিজের ঘরে নিজেই এক চোর। নাসিকা গর্জন শুনে নিশ্চিত হলাম যে তিনি এখনও শয্যা ত্যাগ করেন নাই। বেশ একটা তৃপ্তির শ্বাস নিলাম। বর্তমানে অশান্তির কোনো আশঙ্কা নেই। নিত্যকর্ম সেরে বসলাম ল্যাপটব নিয়ে। খুবই সন্তর্পণে ওয়াইফাইয়ের সুইচটা দিলাম। এরপর ল্যাপটবটা অন করে গেলাম একটু জল খেতে। আমার জন্য একটা বড় সাইজের সিভাস-রিগালের হুইস্কির বোতলে জল থাকে। অমল দিয়েছিল বোতলটা। আসল জিনিস তো খেতে পারি না। ওই বোতলে রাখা জল খেয়েই মনকে সান্ত্বনা দিই। বউ কিছূতেই ড্রিংক করাটা এলাউ করে না। গোপনে দুয়েকবার খেয়ে এসে দেখেছি, সুবিধা করতে পারিনি। চেহারা দেখলেই বুঝে ফেলে। পান করে এলে আমি নাকি অকারণেই হাসতে থাকি! আমি অবশ্য নিজেকে আয়নায় দেখেছি। এ অবস্থায় চেহারায় কেমন দুঃখী দুঃখী একটা ভাব আসে। অথচ বউ বলে কিনা আমি অকারণে হাসতে থাকি! যাহোক, সাতসকালে বোতল থেকে জল গ্লাসে ঢেলে খাওয়ার মেহনত করতে ইচ্ছে হলো না। সিনেমায় দেখা ভিলেনদের বোতল থেকে সরাসরি মদ খাওয়ার দৃশ্যের মতো বোতলটা মুখের ঊর্ধ্বে ধরে সরাসরি জল মুখে ঢালতে শুরু করলাম। তো কয়েক ঢোক গেলার পরই বিপত্তি ঘটল। জল গলায় আটকে গেল। খক-খক করে কাশতে লাগলাম! নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, হাত থেকে বোতলটা সজোরে মেঝেতে পড়ে চৌচির হয়ে গেল! সারা ঘর জল আর কাঁচের টুকরোতে সয়লাব! বোতল-ভাঙ্গার শব্দ শুনে বউ পুরাই রণরঙ্গিনী মূর্তি ধারণ করে ছুটে এল। সে ভেবেছে নিশ্চয়েই আমি তার বড় কোনো সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলেছি। ততক্ষণে কয়েকটা কাশি দিয়ে আমি নিজেকে মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে এসেছি। বউ আমার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর বললো, শুধু বোতল কেন, কাঁচের যা কিছু আছে, সব ভেঙ্গে ফেল। বলি, জলটা গ্লাসে ঢেলে খেতে কি হয়? মদ্যপ কোথাকার! সকাল হতে না হতেই দক্ষযজ্ঞ শুরু দিয়েছে।
একটু দম নিয়ে গলাটা আরেকটু চড়িয়ে সে আবার শুরু করে, তোমার ওই ভাঙচুরটা কি আজ না করলেই নয়, সপ্তাহের এই একটা দিন মাত্র একটু শান্তি করে ঘুমাই, সেটাও কি হতে দেবে না? শোনো, সাবধানে সব কাঁচের টুকরোগুলো খুঁজে বের করে ময়লার ঝুড়িতে ফেল! আমার পায়ে যেন কোনো কাঁচ না বিঁধে! এক নিশ্বাসে সব কথা বলে তিনি আবার শয্যায় চলে গেলেন।
একটা পুরনো তোয়ালে দিয়ে ধীরে-সুস্থে আমি জল আর কাঁচের টুকরো বাছতে লাগলাম। নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো! কিন্তু কি আর করা! নিজের অপকর্মের শাস্তি তো ভোগ করতেই হবে। অনেক সাধ্য-সাধনা করে জল ও কাঁচের টুকরোগুলো পরিস্কার করে পাশের ঘরের করিডোরে গিয়ে দাঁড়ালাম একটু নিরিবিলি থাকার জন্য। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম নিজের কথা, অতীত দিনের কথা!
আমার দ্বারা প্রেম সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে বন্ধুরা অনেক সহযোগিতা ও চেষ্টা করেছে। কাঙ্ক্ষিতজনকে একা পেয়েও কিছু বলতে পারিনি। অবশেষে বিয়ের বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পর বাড়ির লোকজন দেখেশুনে একটা বিয়ে ঠিক করেছে। বিয়ে ঠিক হবার পর নিজের মধ্যে বেশ একটা ফুরফুরে ভাব এসেছিল। হবু বউ দেখতে-শুনতে আহামরি কিছু নয়। তারপরও মনে একটা তৃপ্তি ছিল। মেয়েটা যে রাজি হয়েছে-এটাই বা কম কি! আমিও তো এমন কোনো মহানায়ক নই। মা ছাড়া আমার চেহারা নিয়ে সবাই টিটকেরি করেছে। ভাইবোনরা পর্যন্ত। তো বিয়ের কথা পাকাপাকি হবার পর আমার মধ্যে সারাক্ষণ একটা খুশির তরঙ্গ বয়ে যায়। একা একা নাচতে ইচ্ছে করত। কাকের ডাকেও বেশ একটা মধুর আমেজ খুঁজে পেতাম। এর মধ্যেই বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হলো। বিশাল আয়োজন। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা হলো। কার্ড ছাপানো হল।
অফিসের কলিগদের দাওয়াত দেওয়ার জন্য কয়েকটা কার্ড আমাকেও দেওয়া হলো। আমি প্রথমেই আমার অফিসের বড়বসের নামে একটা কার্ড লিখলাম। এন আর তানভীর। নামের মধ্যেই বেশ একটা কেতাদুরস্ত ভাব আছে। ‘এন আর’-তে কি হয় সেটা অবশ্য জানতে পারিনি। নূর মোহাম্মদও হতে পারে। বস ভীষণ রাশভারী মানুষ। কথা বলা তো দূরের কথা, সামনে যেতেও ভয় হয়। একবার অফিসের এক ইভেন্ট শেষে বস জিজ্ঞেস করেছিলেন, কারা কারা ব্যাচেলর। ২৭ জনের মধ্যে আমিসহ মাত্র তিনজন হাত তুলেছিলাম। বাকি সবাই ছিল বিবাহিত। অবিবাহিত তিনজনের আবার দুইজনই ছিল মেয়ে। অবিবাহিত হওয়ার কারণে সেদিন নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয়েছিল। বিয়ের কার্ড দেওয়ার সুযোগে এবার বসের সামনে যাওয়া হবে, তাছাড়া এটাও বোঝানো যাবে যে, আমি একেবারে ফেলনা নই। আমিও বিয়ে করতে চলেছি। এতে যদি মানটা একটু বাড়ে।
অফিসে পৌঁছে অপেক্ষা করতে লাগলাম বড় বসের আগমনের। তিনি এলেন, তার সহকারী জানাল, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। আমি মিনিট পনের অপেক্ষার পর রুমে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। দুরুদুরু বক্ষে রুমে ঢুকে একটা সালাম দিয়ে কার্ডটা সরাসরি এগিয়ে দিলাম বসের দিকে।
তিনি একটু অবাক হয়ে ‘হোয়াট ইজ দিস’ বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই কার্ডটা হাতে নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করলেন।
পড়া শেষে একটা বড়সড় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, শেষমেশ তুমিও! বলেই এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি ভয়ানক একটা গর্হিত কাজ করতে যাচ্ছি! ভয়ে আমার শরীর অবশ হয়ে এলো। আমার গলা দিয়ে আর শব্দ বের হলনা, অনেক কষ্টে আমতা আমতা করে বললাম, জ্বী মানে ফ্যামিলি থেকে আয়োজন করল স্যার!
তিনি খানিকটা উদাস হয়ে বলতে শুরু করলেন, ফ্যামিলি তো বুঝলাম, কিন্তু তোমার মতো ইয়াংম্যানও শেষ পর্যন্ত উঠোনে বাঁশ পুঁতলে।
আমি আবার, আমতা আমতা করে বললাম, জ্বি মানে…স্যার!
বস চোখ থেকে চশমাটা খুলে একটা টিস্যু দিয়ে সেটার গ্লাসদুটো মুছতে মুছতে বললেন, ইয়াংম্যান, কে বলে সংসার সমুদ্র, তা হলে তো ভালোই হত, হয় ভেসে থাকা যেত, না হয় ডুবে মরা যেত। তা নয়, সংসার হল গিয়ে একটি তেল মাখানো পিচ্ছিল বাঁশ, যতই ধরে ওঠার চেষ্টা করবে, ততই সরসর করে নীচে নেমে আসবে। দারা পুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার, তাও পুরোপুরি সত্য নয়! তুমি কারো হবেনা তা ঠিক, কিন্তু সবাই তোমার, সবার জন্যই নিবেদিত হবে তোমার শালিকের প্রাণ, শুধু তোমার ভাগে কাঁচকলা! গড ব্লেস ইউ বলেই বস মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
আমি খানিক্ষণ হতবিহবল হয়ে বসে থেকে অনেক কষ্টে বসের রুম থেকে বের হয়ে এলাম। সেদিন মনে মনে বসকে গালি দিলেও আজ হাড়ে হাড়ে বুঝি ভদ্রলোক কত সত্যি কথাগুলো বলেছিলেন। বসরা যে আসলেই অনেক কিছু জানেন এবং বোঝেন, সেটাও পরে অনুভব করেছি।
আমার স্মৃতির জাবরকাটা ছেদ ঘটে বউয়ের হঙ্কারে। পেছনে এসে বলে, আজ কি সারাদিন এখানে কাকতাড়ুয়া হয়েই কাটিয়ে দেবে নাকি? বলি, রোজ তো আমি করে দিই, চা-টা আজ একটু নিজে করেই গিল না কেন! এতে কি হাতে ফোস্কা পড়ে যাবে?
কোনো কথা না বলে একান্ত বাধ্যগত ছাত্রের মতো রান্না ঘরে গিয়ে চায়ের পাত্রে গরম পানি চাপাতে চাপাতে ভাবলাম, আমার ত্রিকালদর্শী বসের একটা ছবি নিয়ে এসে ঘরে টাঙ্গিয়ে, দু বেলা ধূপ-ধুনো দেব।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল আজ তো সকাল ৯টা থেকে টিভিতে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ। সিদ্ধান্ত নিলাম, যত আঘাতই আসুক, যত বিপত্তিই ঘটুক আজ গৌতম-বুদ্ধের মতো টিভির সামনে ধ্যানে বসে যাব। পারিপার্শ্বিক কোনো প্রলোভনে কিংবা বাঁধাবিপত্তিতে মহামতি গৌতম যদি ধ্যান ভঙ্গ না করেন, আমি পারব না কেন? চেষ্টা করলে মানুষ কি না পারে?
একটা শুকনো টোস্ট বিস্কুটের সঙ্গে এককাপ চা খেয়ে অতঃপর টিভির সামনে বসে গেলাম।
খুবই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। খেলার টস হয়ে গেছে। টসে জিতে বাংলাদেশ আগে ব্যাটিং নিয়েছে। আজ যদি ভারতকে একটা শিক্ষা দেওয়া যায়। এখন চলছে বিজ্ঞাপন বিরতি। ইন্ডিয়ার বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে মনটা ভরে যায়। কি সুন্দর সুন্দর মেয়ে। কি সুন্দর ওদের সাজ-পোশাক, কত সুন্দর করে কথা বলে, ওদের সব কিছুই কত সুন্দর! আহা আমাদের সংসারটাও তো ওই বিজ্ঞাপনের মতো সুন্দর হতে পারতো। বউ হেসে হেসে কথা বলছে, নুডলস রান্না করে এনে পরিবেশন করছে। আমি এক চামচ মুখে দিয়েই ওয়াও বলে চোখ বন্ধ ফেলছি! জীবনটা আসলেই রঙিন হতে পারে যদি একটু আমরা উদ্যোগ নিই!
কিন্তু আমার সংসারে কোনো সুখই দীর্ঘ হয় না, কোনো কল্পনাই বাস্তব হয় না। আমার টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখা অবস্থাতেই কলিংবেল বেজে উঠল। আমি দরজা খুলতে দৌড় লাগালাম। এ সময় বুয়া আসে। দরজা খুলে দেখি পাশের বাড়ির বুয়া। উনি বললেন, আফায় বাড়ি নাই? আমি বললাম আছে, বল, আফাকে কি দরকার! এর মধ্যেই বউ আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। বউ কড়া সুরে বলে, কি হয়েছে? চিল্লাচ্ছ কেন? কি সমস্যা?
পাশের বাড়ির বুয়া বলে, আপনার বুয়া আইজ কামে আইতে পারব না! সকাল থেইকা তার ডাইরিয়া। আমারে খবরডা দিতে কইছে।
উৎসবের নগরীতে আকস্মিকই শোকের আবহ নেমে এলো। আমি দরজাটা বন্ধ করে নিঃসাড় দাঁড়িয়ে রইলাম। ওদিকে আমার বউ হতোদ্যম হয়ে ডাইনিংয়ের একটা চেয়ারে বসে মাথাটা ডাইনিং টেবিলে দিয়ে এলিয়ে পড়লেন। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, স্বামী-বিয়োগ হলেও সে এতটা কষ্ট পেত না।
কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাড়িয়ে থেকে আমি আবার টিভির সামনে গিয়ে বসলাম। বাংলাদেশের ছেলেরা ভালোই শুরু করেছে। দুই ওভারে ১৩ রান। মনে মনে বললাম, এত মারার দরকার নেই বাবা। টিকে থাক। উইকেটে টিকে থাকলে রান আসবেই। এর মধ্যে তামিমের ছক্কা। আমি উত্তেজনায় হাততালি দিয়ে উঠলাম। এমন সময় আলুথালু বাকরুদ্ধ বউ আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। উদাস কিন্তু শ্যেন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ঠিক যেন ঝড়ের পূর্বাবস্থা, এখনই বুঝি বুকে ত্রিশূল গেঁথে দিবে। বউকে সাক্ষাৎ মা-কালী মনে হলো। এমন মূর্তিকে প্রণাম করা উচিত, না দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো উচিত ঠাহর করতে পারলাম না। কোনো কিছু না বুঝে আমি ভয়ার্ত চোখে তাকালাম। সে বলল, তুমি কি আজ সারাদিন বসে এই সব ছাইপাশ দেখবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছ?
আমি আমতা আমতা করে বললাম, না মানে…
এবার সে খানিকটা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে খুব শান্ত ভাবে বলল, একবালতি জামাকাপড় যে সাবান-জলে ভেজান আছে, সে গুলোর কি হবে? আমি কি এ সংসারে বলদ? এই সংসারে আমার কাজ কি কেবল খেটে যাওয়া?
ভেবেছিলাম কিছুই বলব না, কিন্তু বাংলায় পড়ার কারণে ব্যাকরণগত ভুল আমার একেবারেই সহ্য হয় না , মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল, না না তুমি বলদ হতে যাবে কেন, বলদ তো আমি, তুমি হলে গাভী। কথাটা বলামাত্রই বুঝলাম মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি, বউ ততক্ষণে ছুটে গিয়ে ঘরের কোণায় থাকা একটা ফুলদানি আমার দিকে ছুঁড়ে মারতে উদ্যত হয়েছে। খানিক্ষণ আগে জলের বোতলের দেহাবশেষ হিসেবে একটা গোপন কাঁচের টুকরো আকস্মিক তার পায়ে বেঁধায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে ফুলদানিটা আমার দিকে ছুঁড়ে মারতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলে। ওদিকে তামিম ইকবাল বাউন্ডারি লাইনে বল তুলে দিয়েছে। বলের পেছনে ছুটছে শিখর ধাওয়ান। তিনি বল ধরে ফেললেন। তামিম আউট! এদিকে আমিও ক্ষিপ্র চিতাবাঘের মতে দৌড়ে এসে প্রায়-ভূপাতিত বউকে ধরে ফেললাম! নিজের কৃতিত্বে নিজেই মুগ্ধ হলাম। বউকে ধরে ফেলায় বড় কোনো বিপদ ঘটল না। তবে একটু এমন-তেমন হলেই নিশ্চিত তার মাথা ফাটত!
আমি তাকে সিনেমার নায়কদের মতো আলগোছে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। এদিকে সে সদ্য জবাই হওয়া মুণ্ডুহীন মুরগীর মতো ডানপাটা নাড়াতে থাকলো। আমি তাকে শুইয়ে দিয়ে সেই পাটা নিরীক্ষা করা শুরু করলাম। অবশেষে আবিষ্কার কললাম যে, তার পায়ের তালুতে ক্ষুদ্র একটি ঘাতক কাঁচের টুকরো গেঁথে আছে। অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে দুই নখের নিপুণ টানে পায়ের থেকে সেই সূক্ষ্ম কাঁচের টুকরোটা বের কললাম। সেখানে একটু স্যাভলন লাগিয়ে দিলাম। মাথায় হাত বুলাতে থাকলাম। কিন্তু আমার হাতটা সজোরে সরিয়ে দিয়ে সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি জামাকাপড় ধুতে বাথরুমে চলে গেলাম।
জামাকাপড় ধুয়ে ছাদে গেলাম সেগুলো শুকোতে দেবার জন্য। ছাদের কোনাকুনি একটা দড়ি বাঁধা আছে, যার একপ্রান্ত ছাদের কোণার একটা পিলারে, আরেক প্রান্ত ছাদের কোণায় বেঁধে রাখা এক বাঁশের মাথায় লাগানো লোহার হুকের সঙ্গে। এক এক করে দড়িতে ঝোলাতে থাকলাম, চাদর, জামা, প্যান্ট, নাইটি। শেষ কাপড় হিসেবে সোয়েটারটা যখন দিব, তখন বলা নেই কওয়া নেই, আকস্মিকই লোহার হুক থেকে ফস করে দড়িটা খুলে গিয়ে সব কিছু ভূলুণ্ঠিত!
তখন খুব মনে হলো, ছাদ থেকে লাফ মেরে আত্মহত্যা করি। কিন্তু জানি সে সাহস আমার নেই, অগত্যা জামাকাপড় তুলে দড়িটা পূর্বস্থানে লাগানোর চেষ্টা করতে থাকলাম । হুকটা বেশ উঁচুতে, নাগাল আর পাই না, অতএব লাফ দিয়ে চেষ্টা করতে থাকলাম এবং বিফল হতে থাকলাম। চেষ্টাটা এতটাই আন্তরিক ছিল যে, কখন যে পাশের বাসার এক কিশোরী মেয়ে ছাদে এসে অবাক চোখে আমার শূন্যে লাফ মারা দেখছে, খেয়াল করিনি।
তার চোখে চোখ পড়তেই সে বলল, আঙ্কেল, আপনি কি করছেন?
মাথাটা গরম ছিল, খেঁকিয়ে বললাম, নাচছি!
কিশোরী বলল, এটা কোন ধরনের নাচ? আমি ধ্রুপদী, কত্থক, ভরত নাট্যম, কথাকলি দেখেছি। আমি নিজে কত্থক শিখছি! কিন্তু এ ধরনের কোনো নাচ তো কখনও দেখিনি!
আমি বললাম, এটা হলো বান্দর নৃত্য, পরক্ষণেই সংশোধন করে দিলাম, না না, এটাকে বলে শাখামৃগ-নৃত্য! এটা সবাই পারে না। আমিই কেবল শিখেছি। তোমার যদি এটা পছন্দ হয়, তাহলে তোমাকেও শিখিয়ে দেব!


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.