প্রবন্ধ

বিভ্রান্তি ও বিহ্বলতায় অশীতিপর ‘বনলতা সেন’

লীনা দিলরুবা | 21 Jun , 2019  


বাংলা কবিতার অন্যতম আলোচিত, লেখক অশোক মিত্রের মতে,‘যুগান্ত ঘটানো’ কবিতার নাম ‘বনলতা সেন’। আশি বছর পার করে কবিতাটি যখন প্রায় মিথের পর্যায়ে, তখন এই বাস্তবতা লক্ষ্য করে বলা যায়, শুধু ব্যক্তিগত বৃত্তে এর সীমা আর নির্ধারিত নেই, সর্বতোভাবে কবিতাটি এখন পাঠকের।

বাংলা সাহিত্যে ‘জীবনানন্দ দাশ’ সেই নাম, যিনি রবীন্দ্রনাথের পর নিজস্ব কাব্যভঙ্গি দিয়ে যুগকে এগিয়ে নিয়েছেন। জীবনানন্দ ছিলেন মৌল স্বরের কবি। বুদ্ধদেব বসু তাঁকে বলেছেন, ‘নির্জনতম কবি’, অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে চিহ্নিত করেন ‘শুদ্ধতম কবি’ রূপে। তাঁর সর্বাপেক্ষা আলোচিত কবিতা ‘বনলতা সেন’-এর প্রকাশকালীন ঘটনা প্রত্যক্ষ করে অশোক মিত্র লেখেন, ‘বাংলা কবিতার পাঠকসংখ্যা তখনও অবশ্য অতীব সীমিত। কিন্তু তাঁরা একযোগে মেনে নিলেন, এই কবিতাটি কোনও উৎকট পরীক্ষা নয়, জোর করে অভিনবত্ব পরিবেশনের দেখানেপনা নেই এতে, অথচ স্থবির গতানুগতিকতাও নেই, পূর্বসূরিদের ভূত ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে না, নিজস্ব একটি স্বাদ-স্বর-সুর। এই একটি কবিতা দিকে দিকে বার্তা রটিয়ে দিল, মাভৈঃ, আধুনিক বাংলা কবিতা পরিণতিতে পৌঁছেছে।’

বোঝা গেল, ‘বনলতা সেন’ আধুনিক বাংলা কবিতার পরিণতিতে পৌঁছনোর কবিতা। জীবনানন্দকে যারা অপছন্দ করতেন কবিতাটির কারণে তারাও যেন তাঁকে পছন্দ করতে শুরু করেন।

কবিতাটি নিয়ে জীবনানন্দের ঘনিষ্ঠজন কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের মনোভাব এভাবে জানা যায়, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির আকর্ষণ তরুণ পাঠক ও কবির চিত্তে এত ব্যাপক হয়েছিল, যাতে কবি নিজে বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ‘দুর্বোধ্য কবি’ হিসেবে চিহ্নিত হলেন বটে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দের মতো, কিন্তু তাঁর ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি সম্পর্কে সে অভিযোগ কারো ছিল না।’

সজনীকান্ত দাসসহ অন্যরা জীবনানন্দের কবিতার দুর্বোধ্যতা নিয়ে নানান আলোচনায় যেভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন এই কবিতা এবং কাব্যগ্রন্থটিও সেসব আলোচনায় যেন জল ঢেলে দিলো। এই বিবেচনায় ‘বনলতা সেন’ জীবনানন্দের দুর্বোধ্যতার দুর্নাম ঘোচানোরও কবিতা!

কবিতাটি নিয়ে অশোক মিত্রের আরেকটি কথা তাৎপর্যময়। তিনি এ-কবিতাকে বাংলা কাব্যের মোড় ফেরা কবিতা বলে চিহ্নিত করেছেন। কবিতাটির ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘…তিন-চতুর্থাংশ শতাব্দী আগে ‘বনলতা সেন’ রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতাকে স্বীকৃতি দান করেছিল। এই কবিতা দিয়ে বাংলা কাব্যের যে মোড় ঘোরা, পরবর্তী সাড়ে সাত দশকে তেমন কোনও বড় বাঁকের মনে হয় দেখা পাওয়া যায়নি। ‘বনলতা সেন’-এর ঐতিহ্য অনুসরণ করেই বাংলা কাব্যের এখনও পথ-পরিক্রমা। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, সেই ১৩৪২ বঙ্গাব্দে পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে বনলতা সেন যদি ব্যাকুল প্রশ্ন তুলে না দিত, কয়েক দশক বাদে ‘অবনী, বাড়ি আছো?’ রচনা সম্ভব হত?’

এই যুগান্ত ঘটানো কবিতা কাদের কবিতা? জীবনানন্দ দাশ যাদের আহ্লাদিত করেন, যাদের আবিষ্ট করে রাখেন, যাদের হৃদয়ে আকম্পন শিহরন জোগান এটি তাদের কবিতা। জীবনানন্দ যাদের বিভ্রান্তির মধ্যে রাখেন, যাদের চৈতন্য থেকে বারে-বারে কবিতাকে দূরে সরিয়ে নেন, এটি তাদেরও কবিতা। তাই ‘বনলতা সেন’ যেমন অত্যধিক আলোচিত কবিতা, এটি অধরা কবিতাও। তবে আবিষ্কার এবং অনাবিষ্কারের যে-মাত্রায়ই অবস্থান করুক না কেন, কবিতাটি ইতিমধ্যে পাঠকের এবং সমালোচকদের কাছে বহুবার অনুশীলিত হয়েছে। সেসব আলোচনায় অনেক অব্যাপ্তি হয়ত রয়েছে, কিন্তু নানান সংযোগও যে নেই সেটি বলা যাবে না। কবিতাটিতে পাঠক লাভ করেছে চিত্তপ্রসাদ, অনেকক্ষেত্রে এটি হয়েছে তাদের কাছে হৃদয়-আকর্ষী। তবে, অনেক আলোচনায় সংশ্লিষ্ট লেখকের কল্পনার ফানুস ঊর্ধ্বপাতনের মতন হয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতিও যে ঘটায়নি সেটি বলা যাবে না। বহুল পঠিত কবিতাটিকে ঘিরে কারো-কারো সাতিশয়তাকেও আমাদের দেখতে হয়েছে। যেমন প্রাক্তন আমলা আকবর আলি খান। যাঁর মতে, বনলতা সেন ছিলেন একজন বারবণিতা। এই অদ্ভুতুড়ে কল্পনার বিষয়টির অসারতা লেখক অশোক মিত্রের লেখার সূত্র ধরে পরবর্তী পর্যায়ে উল্লেখ করা যাবে।

সবকিছু পেরিয়ে জীবনানন্দের লেখা এই প্রেমের কবিতাটি, যেখানে কবি যেন একাধারে আলুলায়িত কিন্তু তাঁর যে স্বভাব: কবিতার শরীরে যথেষ্ট আভরণ জড়িয়ে রাখা, কবিতাকে আলো-আঁধারিতে রাখা, তার সমস্ত আয়োজনই কবিতাটির জন্য তিনি করেছেন।

কবিতাটি প্রথম ছাপা হয় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায়। আর গ্রন্থভুক্ত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’-এ। কবির জীবদ্দশায় কাব্যগ্রন্থটির তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সালে বারোটি কবিতা নিয়ে ‘এক পয়সায় একটি’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হবার পর ১৯৫২ সালে এতে সংযোজিত হয় নতুন আঠারোটি কবিতা, এবং সর্বশেষ ১৯৫৪ সালে আরো তিনটি কবিতার সংযুক্তিঘটে। এই বিবেচনায় জীবনানন্দ অনুমোদিত এই কাব্যগ্রন্থের কবিতার মোট সংখ্যা তেত্রিশ।

‘এক পয়সায় একটি’ ছিল নানান কবিদের গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত খুদে কাব্যপুস্তিকা। ষোল পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থগুলো সে-সময় বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। ‘এক পয়সায় একটি’ প্রকল্পে আরও যাঁদের কবিতা ছাপা হয় তাঁরা হলেন বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, অশোকবিজয় রাহা, সুধীরচন্দ্র কর, বিমলচন্দ্র ঘোষ, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, অমল ঘোষ, হরপ্রসাদ মিত্র, তড়িৎকুমার সরকার, জীবন চৌধুরী এবং অনিলরঞ্জন বিশ্বাস। বলাই বাহুল্য, এগুলির মধ্যে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’-এর ঐ বারোটি কবিতা সবচেয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। পাঠকদের যেন কবিতাগুলি বিহ্বল করে তোলে, বিস্ময়াবিষ্ট করে। অশোক মিত্র লিখেছেন, ‘চল্লিশের দশকে এই কবিতাগুলি, একটির পর আর-একটি, পরপর পাঠের উন্মাদনা, পঙক্তিগুলি অন্তঃকরণে সেঁধিয়ে যাচ্ছে, আমাদের চেতনাকে মুহ্যমানতায় পৌঁছে দিচ্ছে, আমরা অবশ, হতবাক, স্তম্ভিত; কয়েক মুহূর্ত বাদে স্তব্ধতা ভেঙে অন্য একটি কবিতার আস্বাদনে চলে যাচ্ছি।’

তেত্রিশটি কবিতা বিবেচনায় নিলে আলোচ্য কবিতাটি ছাড়াও এ-কাব্যগ্রন্থটিতে জীবনানন্দের লেখা আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা স্থান পেয়েছে, যা-কালের বিচারে এখন কিংবদন্তিতুল্য। ‘কুড়ি বছর পর’ কবিতাটির কথা বলা যায়:

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
আবার বছর কুড়ি পরে–
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে–
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে– তখন হলুদ নদী
নরম-নরম হয় শর কাশ হোগলা–মাঠের ভিতরে!

কিংবা বলা যায় ‘হাওয়ার রাত’ কবিতাটির কথা:

গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল– অসংখ্য নক্ষত্রের রাত;
সারারাত বিস্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে;
মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনও মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,
কখনও বিছানা ছিঁড়ে
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে;
এক-এক বার মনে হচ্ছিল আমার–আধো-ঘুমের ভিতর হয়তো–
মাথার উপরে মশারি নেই আমার,
স্বাতী-তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে সাদা বকের মতো, উড়ছে সে!
কাল এমন চমৎকার রাত ছিল।

এ-কাব্যগ্রন্থেই আমরা পেয়েছি এমন অনেক পঙক্তি, যেগুলি কবির কাব্যপ্রতিভা আর চিরসন্ধানী মনের পরিচয় বহন করে:

বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ (শঙ্খমালা)

এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়না ক’ আর (শঙ্খমালা)

আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার (নগ্ন নির্জন হাত)

নদীর জল মচকা-ফুলের পাপড়ীর মতো লাল (শিকার)

হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘ-নিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি, হে হিম হাওয়া আমাকে জাগাতে চাও কেন।(অন্ধকার)

প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন ম’রে যেতে হয়; (দু’জন)

এক-একটা দুপুরে এক-একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হয়ে যায় যেন। (আমাকে তুমি)

এত সব কবিতার ভিড়ে জীবনানন্দ ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিকে পাঠকের কাছে যেন চির-রহস্যময় করে রেখেছিলেন। এটি সম্ভবত বাংলাভাষার এখনো পর্যন্ত সর্বাধিক পঠিত কবিতা।

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারি দিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

কবিতাটি যেন এক সুদূরের ধ্বনি, কালের পথ পেরিয়ে হারানো সময়ের পথ বেয়ে আসা এক ক্লান্ত পথিকের কথা বলছে। যে পথিকের, যে ধ্বনির, ভ্রমণের কোনো শেষ নেই। দীর্ঘ-দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে সে শান্তি খুঁজে পেয়েছে কোনো নীড়ে। সে নীড় কি কোনো নারী? কোনো আশ্রয়? যাকে কবি বলছেন, নাটোরের বনলতা সেন!

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতি দূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনই দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সে আশ্রয় তাকে মুগ্ধ করেছে। মুগ্ধ করেছে তার চুল, তার মুখ। অনেক ভ্রমণের পর সে ধ্বনি, যাকে পথিকও বলা যায়, পাখির নীড়ের মতো চোখ, এমন আরেকটি ধ্বনির মুখোমুখি, যে তাকে প্রশ্ন করছে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে–সব নদী–ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

দিন কেটে যায় মোহময়তায়, সন্ধ্যা আসে, সব গল্প ফুরালে যেন হবে গল্প লেখার আয়োজন, সন্ধ্যা…সে-তো পাখিদের নীড়ে ফেরার সময়, যখন আর কোনো প্রতীক্ষা নেই, অপেক্ষা নেই, সেই ধ্বনি আর অপর ধ্বনি মুখোমুখি বসে থাকে, বসে থাকে অন্ধকারে। সে আর তার বনলতা সেন!

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর। জীবনানন্দ ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের বিছানায় প’ড়ে আছেন। ভূমেন্দ্র গুহ মেডিক্যালে পড়ুয়া সদ্যযুবা, জীবনানন্দের কবিতার ঘোরে আবিষ্ট তখন, তাঁর অন্য বন্ধুদের নিয়ে ‘ময়ূখ’ পত্রিকায় কবিতা ছাপানোর উদ্দেশ্যে জীবনানন্দের সঙ্গে পরিচিত হতে গিয়েছিলেন, হয়ে পড়েছিলেন আপনজনের মতো। জীবনানন্দের দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে পালা-করে ডিউটি করার সুবাদে জীবনানন্দের পরিবারেরও নৈকট্য লাভ করেন। জীবনানন্দের সেবা করার এবং তাঁকে পাহারা দেবার বিষয়কে ঘিরে কথাচ্ছলে তাঁদেরই একজন প্রস্তাব করলেন ভূমেন্দ্র গুহের দলের লোকজনকে যেন তাঁদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থটি উপহার দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, হাসপাতালে জীবনানন্দের সেবায় নিয়োজিত যে সেবিকাটি ছিলেন, যাঁর নাম শান্তি ব্যানার্জি, প্রস্তাব দেওয়া হল তাঁকেও যেন একখণ্ড ‘বনলতা সেন’ উপহার দেওয়া হয়। এই অভিনব বিষয়টি নিয়ে তখন বেশ কৌতুক হয়, ভূমেন্দ্র গুহ এর বর্ণনাও করেছেন বেশ। সেই সেবিকা হাসপাতালের দিনগুলোতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। ভূমেন্দ্র গুহের বন্ধুরা সেবিকাকে ‘বনলতা সেন’ উপহার দেবার কার্যকারণ নিয়ে দীর্ঘ আলাপ জুড়ে দেন, কারো কারো প্রশ্ন ছিল, সেবিকা শান্তি ব্যানার্জি এই কবিতার কী বুঝবেন? একজন উত্তর দেন– ‘বনলতা সেন ওকেও (শান্তি দেবীকে) করাপ্ট করবেন, ওঁর ভেতরের বনলতা সেনকে ঘুম থেকে টেনে তুলবেন এবং তারপর দু’দণ্ড শান্তি দেবেন।’ দেখা গেল শান্তিদেবীকে আসলেই বনলতা সেন ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি একদিন ভূমেন্দ্র গুহদের ডেরায় হাজির হয়েছিলেন, হাজির হয়ে কবিতার বইটির দু’একটি কবিতা বুঝতে চেয়েছিলেন তাঁদের কাছে।

জীবনানন্দ দাশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাঁর শরীরের ডানদিকের অনেকগুলি হাড় ভেঙেছে, কণ্ঠার হাড়, বুকের খাঁচার একগুচ্ছ হাড়, জানুর হাড়। তাঁর ডানদিকের ফুসফুসের চারদিকে রক্ত জমা, ভাঙা হাড়ের খোঁচায় ফুসফুস থেঁতলে গেছে। ভূমেন্দ্র গুহের স্মৃতিতে দেখা যায়, হাসপাতালের দিনগুলোতে জীবনানন্দ কখনো-কখনো প্রচণ্ড ঘোরের কারণে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন, সেসব কথার অনেক কিছুই ইঙ্গিতময়। যেমন, জ্বরের ঘোরে জীবনানন্দ একদিন বলেন, ‘তারপর যা বলেছিলুম, লিখে রাখ আজকের তারিখটা, আজ থেকে গত একবছর খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। এখন ভোর, না সন্ধ্যে? আমি কী দেখতে পাচ্ছি জান? ‘বনলতা সেন’-এর পাণ্ডুলিপির রং।’ আরেকদিন বলে ওঠেন, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারা আকাশ জুড়ে, ধূসর পাণ্ডুলিপি সারা আকাশ জুড়ে।’

জীবনানন্দ আপাদমস্তক কবি ছিলেন। জীবনে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন, প্রকাশ করেছেন খুবই কম। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালককে তিনি নিজেই বাতিল করেছেন, এর পর তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রথম তাঁর জাত চিনিয়ে দিলেও বনলতা সেন ছিল তাঁর কবি জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এই বাঁক ঘুরে যাওয়া শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়, তাঁর পরিচিতি, তাঁর কবিতার বহুল পাঠও এই গ্রন্থের কারণে সম্ভব হয়।

জীবনানন্দ জীবদ্দশায় তেমন কোনো পুরস্কার পান নি, একমাত্র বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি ১৯৫৩ সালে নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলনের বার্ষিক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে। এর অর্থমূল্য ছিল ১০১ টাকা।

জীবনানন্দ কী এই কবিতাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন? ১৯৫৪ সালে জানুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে এক কবিসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, জীবনানন্দ সেখানে আমন্ত্রিত হন এবং ‘বনলতা সেন’ কবিতাটিই আবৃত্তি করেন। যদিও পরে অভ্যাগতদের অনুরোধে আরও কয়েকটি কবিতা তিনি পড়েছিলেন। এত সব কিছু বিবেচনা করে তাই হয়ত বলা যায়, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত প্রায় তিন হাজার কবিতা লিখলেও এই কবিতাটি হয়ত তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল।

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারি দিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

বনলতা সেন আসলে কে ছিলেন? অশোক মিত্র বলেন, ‘এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এল, সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, না কি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের জবার পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছিলেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন, সে-সমস্ত খবর বেরোত। হয়তো ১৯৩২ সাল হবে, নয়তো পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহী থেকে নাটোর তো একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহোত্তর পর্বে অন্য পদবি ব্যবহার করতেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কি না। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়।”

এই আলোচিত কবিতা এবং কবিতার চরিত্রটি সমালোচক এবং পাঠকদের পাশাপাশি কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশকেও সম্ভবত বিভ্রান্তির মধ্যে রেখেছিল। ভূমেন্দ্র গুহের বোন মিনু সরকার স্মৃতিচারণামূলক লেখা ‘ঘরোয়া জীবনানন্দ’তে লিখেছেন, ‘আসলে আমি যতটুকু বুঝেছি লাবণ্য দাশ মানুষটি ছিলেন সহজ সাধাসিধে পার্থিব। কবিতা তিনি একেবারেই বুঝতেন না। কবিতা রচনা যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এটাও তাঁর ধারণার বাইরে ছিল। যদিও কবির স্ত্রী বলে তাঁর একটা গর্ব ছিল। আমাকে প্রায়ই বলতেন ‘বনলতা সেন’ আসলে তিনিই।’

প্রায় মিথের পর্যায়ে চলে যাওয়া কবিতাটি নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। কাব্যভাব ছাড়িয়ে এসব আলোচনা চলে গেছে বহুদূরে। কবির স্ত্রী ধারণা করছেন বনলতা সেন আসলে তিনিই, জনৈক সমালোচক মনে করছেন বনলতা সেন একজন বারবণিতা, অশোক মিত্রের মাধ্যমে জীবনানন্দের মুখনিঃসৃত কথা দিয়ে আমরা জানলাম, ‘বনলতা সেন’ কেবল একটি নামমাত্র। একটি নামকেই যেন তিনি কবিতায় মহিমান্বিত করেছেন। বলাই বাহুল্য, বাংলা সাহিত্যে কোনো কবিতা নিয়ে একইসঙ্গে এরকম মোহজাল এবং বিভ্রান্তি তৈরি হয়নি। তাই কবিতাটি যখন শতাব্দী পেরোনোর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, তখনো পাঠক কবিতাটি নিয়ে কথা বলছে!

গ্রন্থপঞ্জি

সম্পাদনা ভূমেন্দ্র গুহ, জীবনানন্দ দাশের কবিতা, মূলানুগ পাঠ, প্রথম সংস্করণ, বেঙ্গল পাবলিকেশনস লিমিটেড, ঢাকা, ২০১৫

সঞ্জয় ভট্টাচার্য, কবি জীবনানন্দ দাশ, প্রথম সংস্করণ, কবি প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৬

ভূমেন্দ্র গুহ, আলেখ্য: জীবনানন্দ, প্রথম সংস্করণ, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৯

আকবর আলি খান, চাবিকাঠির খোঁজে : নতুন আলোকে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন, প্রথম সংস্করণ, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৪

ক্লিন্টন বি সিলি, অনুবাদ: ফারুক মঈনউদ্দীন, অনন্য জীবনানন্দ: জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক জীবনী, প্রথম সংস্করণ, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১১

অশোক মিত্র, বিক্ষিপ্ত অর্ধশতক, প্রথম সংস্করণ, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০১৪

সম্পাদনা সুব্রত রুদ্র, জীবনানন্দ: জীবন আর সৃষ্টি, তৃতীয় সংস্করণ, নাথ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৫


3 Responses

  1. শান্তা মারিয়া ‍ says:

    প্রবন্ধটি পড়ে মুগ্ধ হলাম। বনলতা কি জীবনানন্দের কাজিন যার নাম ছিল বেবি? জীবনানন্দকে নিয়ে আরও লিখুন। তাার অন্যান্য কবিতা নিয়েও। একেকটি কবিতা নিয়ে গবেষণামূলক লেখা বাংলায় বড় কম।

  2. Anisuz Zaman says:

    খুব ভাল লাগল। অভিনন্দন !

  3. মো. হুমায়ুন কবির says:

    লেখাটি উপভোগ করেছি। ধন্যবাদ। আমার মনে হয় কবি জীবনান্দ দাস হয়তোবা “নীড়ের পাখির মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন” লিখেছিলেন কিন্তু ছাপাখানার ভুলে ‘পাখি নীড়ের মত’ হয়েগেছে। যেহেতু কবিতাটি খুবই শক্তিশালী ওতে গতি কমে নি। কবিও ওটা নিয়ে মাথা ঘামান নি। বরং ভেবেছেন নতুন কিছু একটা হলো আর চোখের ভ্রু বড়, পাতলা আর অগোছালো হলে তো পাখীর নীড়ের মতই হয় বিশেষ করে পুরুষদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.