অনুবাদ গল্প

লিডিয়া ডেভিস: কাজের মেয়ে

মেহেদী হাসান | 9 Jul , 2019  


লিডিয়া ডেভিস ১৯৪৭ সালের ১৫ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নরদাম্পটনে জন্মগ্রহণ করেন। অণুগল্প (Flash fiction) কথিত অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের সাহিত্য আঙ্গিকের জন্য তিনি অধিক পরিচিত। পাশাপাশি তিনি একজন ছোট গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। তিনি মার্সেল প্রুস্তের সোয়ান’স ওয়ে এবং গুস্তাব ফ্লবেয়ারের মাদাম বোভারীসহ ফরাসী ও অন্যান্য ভাষার বেশ কিছু চিরায়ত সাহিত্য ইংরেজীতে অনুবাদ করেন।

লিডিয়া ডেভিসের বাবা রবার্ট গরহ্যাম ডেভিস (Robert Gorham Davis) ছিলেন একজন সাহিত্য সমালোচক এবং ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক এবং মা হোপ হেল ডেভিস ( Hope Hale Davis) ছিলেন একজন ছোট গল্পকার, স্কুল শিক্ষিকা এবং স্মৃতিকথা লেখক। গোড়ার দিকে তিনি সঙ্গীত শিক্ষা করেন- প্রথমে পিয়ানো, তারপর ভায়োলিন। সঙ্গীত ছিল তার প্রথম প্রেম। লেখক হওয়ার বিষয়ে লিডিয়া ডেভিস জানান, “আমি সম্ভবত সবসময় লেখক হওয়ার পথেই এগিয়ে গিয়েছি, এমনকি যদিও এটা আমার প্রথম প্রেম নয়।” তিনি বার্নার্ড কলেজ (Barnard College) এ পড়াশোনা করেন যেখানে তিনি প্রধানত কবিতা লেখতেন।

১৯৭৪ সালে লিডিয়া ভেভিস পল অস্টার (Paul Auster) কে বিয়ে করেন যার সাথে তার ড্যানিয়েল নামে একটি ছেলে আছে । পরবর্তীতে অস্টারের সাথে তার বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং অতঃপর তিনি চিত্রশিল্পী অ্যালান কোট (Alan Cote) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যার সাথে তার থিও কোট (Theo Cote) নামে আরেকটি ছেলে আছে। এই লেখিকা ইউনিভার্সিটি এট আলবেনী (University at Albany, SUNY) এর ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিভাগের অধ্যাপক।

লিডিয়া ডেভিস দ্যা থারটিন উম্যান এন্ড আদার স্টোরিজ (১৯৭৬) এবং ব্রেক ইট ডাউন (১৯৮৬) সহ মোট ছয়টি গল্প গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ব্রেক ইট ডাউন গল্প গ্রন্থটি পেন/ হেমিংওয়ে অ্যাওয়ার্ড (PEN/Hemingway Award) এর চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়। এবং তার সাম্প্রতিক প্রকাশিত ভ্যারাইটিজ অব ডিস্টারবেন্স (২০০৭) গল্প গ্রন্থটি স্থান লাভ করে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড (National Book Award) চূড়ান্ত তালিকায়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত লেখা তার সকল গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয়েছে দ্যা কালেক্টডে স্টরিজ অব লিডিয়া ডেভিস (২০০৯) ।

তার অনেক অণুগল্প (Flash fiction) মাত্র একটি বা দুটি বাক্যেই সম্পূর্ণ। ডেভিস এই সব গল্পকে আকাশচুম্বী ভবনের সাথে তুলনা করেন এই অর্থে যে তারা আরোপিত শূন্যতা দ্বারা পরিব্যাপ্ত।

লিডিয়া ডেভিস ৬৫ বছর বয়সে ২০১৩ ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরষ্কার লাভ করেন। ডেভিসকে পুরস্কার দেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ম্যান বুকার প্রাইজ ওয়েবসাইটে তার সাহিত্যকর্মকে কাব্যের পরিমিতি বোধ এবং যথাযথতা সম্বলিত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া

অনুবাদ: মেহেদী হাসান

আমি জানি আমি দেখতে সুন্দর নই। আমার ছোট করে ছাঁটা কালো চুল এতই পাতলা যে মাথা ঠিকমত ঢাকা পড়ে না। আমি অসংলগ্ন ভাবে একপাশে কাত হয়ে হাঁটি, দেখে মনে হবে যেন আমার এক পা খোঁড়া। কেনার সময় মনে হয়েছিল চশমাটা অনেক সুন্দর- প্রজাপতির ডানার আকৃতির কালো ফ্রেমের চশমা। তবে এখন মনে হয় এটা কেমন বেমানান। তারপরও চশমাটা আমাকে পড়তে হয় কারন নতুন চশমা কেনার মত টাকা আমার নেই। কোলা ব্যাঙের পেটের মত বিবর্ণ ও খসখসে আমার ত্বক আর ঠোঁট দুটিও কোঁচকানো। তবে আমি দেখতে আমার বৃদ্ধা মায়ের অতটা কুৎসিত নই। তার বলিরেখা পড়া ছোট্ট মুখটি আলুবোখড়ার মত কালো আর দাঁতগুলোও সবসময় নড়বড় করে। খাবার টেবিলে তার সামনাসামনি বসা আমি একদমই বরদাস্ত করতে পারি না এবং তার চাহনি দেখে বলে দিতে পারি যে আমার প্রতিও তার মনোভাব ঠিক একই রকম।

অনেক বছর ধরে আমরা বেসমেন্টের ঘরে একত্রে বসবাস করি। সে করে রান্নাবান্না আর আমি সারি ঘরের কাজ । আমরা ভাল বুয়া নই, তবুও আমাদের কেউ ছাড়িয়ে দিতে পারে না কারন এখনও আমরা অধিকাংশ বুয়াদের চেয়ে ভাল। আমার মায়ের স্বপ্ন হল সে একদিন বেশ টাকা-পয়সা জমাবে এবং আমাকে ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে উঠবে। আমার স্বপ্নও মোটামুটি একই রকম। তবে খেতে বসে যখন আমি কোন কারনে রেগে যাই বা প্রচন্ড মন খারাপ থাকে তখন তার নখরের মত হাতের দিকে তাকিয়ে মনে হয় গলায় খাবার আটকে সে মরে না কেন। তাহলে তার আলমারীতে রাখা টাকার বাক্স খুলে সকল টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিতে বাঁধা দেয়ার মত কেউ থাকবে না। আমি তার কাপড়-চোপড় ও টুপি পড়ে তার রুমের জানালটি আস্তে করে খুলে দেব যাতে রুমের ভ্যাপসা গন্ধ বের হয়ে যেতে পারে।

যেদিন গভীর রাতে রান্না ঘরে একাকী বসে এসব ভাবি তার ঠিক পরের দিনই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার মা-ই তখন রান্না-বান্না ফেলে রেখে আমার সেবা-যত্ন করে, মুখে পানি তুলে খাওয়ায় এবং মাছি তাড়ানি দিয়ে বাতাস করে। এসময় আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমার অসুস্থতায় সে মনে মনে খুশি হয়ে উঠে নি।

সবসময় এরকমটা হয় না। মার্টিন সাহেব যখন আমাদের উপরের রুমে থাকত তখন আমাদের মনে আনন্দ ছিল যদিও আমাদের মধ্যে তেমন কোন কথাবার্তা হত না। আমি দেখতে এখনকার মতই কুৎসিত ছিলাম। তবে তার সামনে আমি কখনই আমার চশমাটা পড়তাম না এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ও সাবলীলভাবে হাঁটার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম। প্রায়ই হোঁচট খেতাম এবং এমনকি মাঝে মাঝে উপুড় হয়ে পড়েও যেতাম কারন কোন দিকে যাচ্ছি তা ঠিক মত ঠাহর হত না। হাঁটার সময় আমার ঢোলের মত ফুলো পেট চেঁপে ধরে রাখার কারনে সারারাত আমাকে পেটের ব্যথায় কাতরাতে হত। তবে মার্টিন সাহেব ভালবাসতে পারে এমন কোন মেয়ে হওয়ার চেষ্টায় এগুলোর কোন কিছুই আমার সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারত না। তখন অবশ্য অনেক বেশী জিনিসপত্র ভাঙ্গতাম কারন ফুলদানী ঝারপোছ করা এবং ডাইনিং রুমের আয়না মোছার সময় আমার হাত যে কোথায় যাচ্ছে তা বুঝতেই পারতাম না। তবে মার্টিন সাহেব এসব কিছু আমলে নিত না। কাচ ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে সে আগুনের পাশের চেয়ার থেকে চমকে লাফিয়ে উঠে বিভ্রান্তের মত সিলিং এর দিকে তাকাত। এরপর যখন আমি মেঝেতে চকচক করতে থাকা ভাঙ্গা কাঁচের টুকরা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যেতাম, সে তখন তার সাদা দস্তানা পড়া হাত কপালে রেখে আবার ধপাস করে বসে পড়ত।

সে আমার সাথে কখনও একটা শব্দও উচ্চারণ করত না। অন্য কারও সাথেও অবশ্য তাকে কখনও কথা বলতে শুনি নি। তার কন্ঠ আমি কল্পনা করতাম উষ্ণ এবং কিছুটা কর্কশ। আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলে সে হয়ত তোতলাত। এমনকি তার মুখও আমি কখনও দেখি নি কারন সে সবসময় একটা মুখোশ পড়ে থাকত। মুখোশটি ছিল ফ্যাকাশে এবং কোমল। এটা তার পুরো মাথা ঢেকে রাখত এবং কিনারের অংশ সার্টের কলারের ভেতর ঢুকে থাকত। শুরুর দিকে এটা দেখে ভয়ে আমার হাত-পা সেধিয়ে যেতে চাইত। প্রথমবার যখন এটা আমি দেখি তখন আসলেই আমার মাথা ঘুরে যায় এবং দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে আসি। এটার সবকিছুই আমাকে ঘাবড়ে দেয়- হা করা মুখ, শুকনো খুবানির মত ছোট্ট কান, মাথায় জবরজং রং করা কালো চুলে শক্ত ঢেউ এবং শূন্য অক্ষিকোটর। যে কারো মন আতঙ্কে ভরে দেয়ার জন্য এটা যথেষ্ট। এবং শুরুতে রাতের অন্ধকারে এটার ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলে আতঙ্কে বিছানায় অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করতাম এবং বারবার উঠে বসতাম। এটার হাত থেকে মুক্তি পেতে বিছানার চাদরে মুখ ঢেকে আমার প্রায় দম-বন্ধ হওয়ার মত অবস্থা হত।

আস্তে আস্তে এটার সাথে আমি সহজ হয়ে উঠি। কল্পনায় দেখতে শুরু করি মার্টিন সাহেবের সত্যিকারের মুখাবয়ব- বইয়ের পাতায় নিমগ্ন হয়ে দিবা-স্বপ্ন দেখার সময় আমার চোখে পড়ে গেলে তার ধূসর গালে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ে। আর যখন সে আমাকে কাজ করতে দেখে তার মুখ ভরে উঠে দরদ ও মুগ্ধতায়। আমি তার দিকে একটুখানি তাকাই ও মাথা দোলাই আর তার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

তবে মাঝে মধ্যে যখন তাকে আমার দিকে ধূসর চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখি, তখন আমার মধ্যে এই উৎকন্ঠা আসে যে আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং সে সম্ভবত কখনই আমার প্রতি সাড়া দেয় নি- একটি তুচ্ছ ও নির্বোধ কাজের মেয়ের প্রতি। যদি একদিন অন্য কোন মেয়ে রুমে ঢুকে জিনিসপত্র ঝারপোছ শুরু করে তাহলে সে শুধু বইয়ের পাতা থেকে একবার মাত্র চোখ তুলে আবার পড়তে শুরু করবে এবং এটা যে অন্য মেয়ে তা সে খেয়ালই করবে না। এই সন্দেহের তাড়ায় আমি অসার হাতে এমনভাবে ঝারপোছ করতে থাকি যেন কিছুই ঘটে নি এবং খুব শীঘ্রই আমার সন্দেহ কেটে গিয়ে তা বিশ্বাসে পরিণত হয়।

মার্টিন সাহেবের কারনে আমি আরো বেশী বেশী কাজ করতে আরম্ভ করি। প্রথম প্রথম তার ময়লা কাপড়-চোপড় লন্ড্রীতে পাঠিয়ে দেওয়া হত আর এখন আমি নিজেই ওগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করি, এমনকি যদিও আমি কাজটা ভাল করে করতে পারতাম না। তার লিনেন মলিন থাকত এবং তার ট্রাউজার বাজে ভাবে ভাজ করে রাখা হত, তবে এসব নিয়ে তার কাছ থেকে কখনও কোন ধরনের অনুযোগ আসে নি। আমার হাতের ত্বক কুঁচকে যেতে থাকে এবং শিরা বের হয়ে পড়ে, তবে এতে আমি কিছু মনে করি নি। আগে গরমের সময় গুল্ম বেড়া ছাঁটতে এবং শীতের সময় ত্রিপল দিয়ে গোলাপঝাড় ঢেঁকে দিতে সপ্তাহে একবার একজন মালী আসত, আর এখন মালীকে বিদায় করে দিয়ে এই কাজগুলোও নিজের হাতে নিয়ে নেই এবং বাজে আবহাওয়ার মধ্যে দিনের পর দিন খেটে মরি। শুরুর দিকে বাগানের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে, তবে কিছু দিন পর এটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। হরেক রকমের জংলা ফুলের অত্যাচারে গোলাপগুলো উধাও হয়ে গিয়েছিল এবং বাগানের ভেতর দিয়ে চলা নুড়ি বিছানো পথ ছেয়ে গিয়েছিল ঘন আগাছায়। আমি দৃঢ় এবং কঠোর পরিশ্রমী হয়ে উঠি। মুখের ত্বক ক্ষত-বিক্ষত হওয়া উঠা এবং হাতের চামড়া শুষ্ক হয়ে ফেটে যাওয়া এবং অত্যাধিক পরিশ্রমে শরীর শুকিয়ে অস্থিচর্মসারে পরিণত হওয়া এবং গা থেকে বিশ্রী গন্ধ বের হওয়া এগুলোর কোন কিছুতেই আমি ভ্রূক্ষেপ করতাম না। যদিও আমার মা আমাকে বকুনি দিত, তবে আমার কাছে মনে হত আমার শরীর একটা বলির পাঠা মাত্র।

মাঝে মাঝে আমি নিজেকে মার্টিন সাহেবের মেয়ে হিসেবে কল্পনা করতাম, আবার কখনও মনে হত আমি তার বউ, তবে কোন কোন সময় নিজেকে এমনকি তার কুকুরও ভাবতাম। আমি ভুলেই যেতাম যে আমি সামান্য একজন কাজের মেয়ে মাত্র।

আমার মা কখনও তার দিকে ফিরেও তাকাত না, এবং এতে মার্টিন সাহেবের সাথে আমার সম্পর্ক আরো বেশী রহস্যময় হয়ে উঠে। দিনের বেলায় আমার মা বেসমেন্টের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রান্না ঘরে পড়ে থাকত, সেখানে সে মার্টিন সাহেবের জন্য রান্না করত এবং উত্তেজিতভাবে তার মাড়ি চাটত। সন্ধ্যার সময়ই কেবল সে দরজার বাইরে পা রাখত এবং ফুলে ফুলে ভরে উঠা লাইলাক গাছের ঝোপের পাশে জড়সড় দাঁড়িয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকত। মাঝে মাঝে আমি অবাক হয়ে ভাবতাম কিভাবে সে এমন একজনের জন্য দিনের পর দিন খেটে মরতে পারে যাকে সে কখনও চোখে দেখে নি, তবে সে মানুষটাই ছিল এমন প্রকৃতির। প্রতি মাসে আমি তাকে টাকা ভরা খাম এনে দিতাম এবং সে এটা আমার হাত থেকে নিয়ে তার বাকী টাকার সাথে লুকিয়ে রাখত। লোকটি দেখতে কেমন এটা সে কখনও যেমন আমাকে জিজ্ঞেস করত না ঠিক তেমনি আমিও যেচে কিছু বলতাম না। আমার ধারণা লোকটা কে এটা সে জিজ্ঞেস করত না কারন সে তখনও বুঝে উঠতে পারে নি আমি কে। সে হয়ত ভাবত সে অন্যান্য মহিলাদের মত তার স্বামী ও ছেলে-মেয়ের জন্য রান্না করছে এবং আমাকে মনে করত তার ছোট বোন। মাঝে মধ্যে সে পাহাড় বেয়ে নামার কথা বলত যদিও আমরা পাহাড়ের উপর বাস করি না এবং আলু খুঁড়ে তোলার কথা বলত যদিও আমাদের বাগানে কোন আলু নেই। এতে আমার মেজাজ বিগড়ে যেত এবং হঠাৎ চিৎকার করে উঠে ও তার মুখের উপর দাঁত কিরমির করে আমি তাকে এই আজেবাজে কল্পনা থেকে বের করে আনতে চাইতাম। তবে কোন কিছুতেই কোন লাভ হত না এবং আমাকে অপেক্ষা করে থাকতে হত যতক্ষণ পর্যন্ত না শেষমেষ সে স্বাভাবিক ভাবে আমার নাম ধরে ডাকে। যেহেতু সে মার্টিন সাহেব সমন্ধে কোন আগ্রহ দেখাত না, ফলে আমি নির্বিঘ্ন চিত্তে তার দেখাশোনা করতে পারতাম -এবং যখন সে মাঝে মাঝে বেড়াতে বের হত তখন তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে পারতাম এবং ডাইনিং রুমের দোদুল্যমান দরজার পেছনে লুকিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকে দেখতে পারতাম এবং তার স্মোকিং জ্যাকেট বুরুশ এবং তার স্যান্ডেলের তলার কাদামাটি পরিষ্কার করতে পারতাম।

তবে এই সুখ চিরদিনের ছিল না। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এক রবিবার সকালে আমি ঘুম থেকে সকাল সকাল জেগে উঠে দেখি যে আমার থাকার হল ঘরের ভেতরে উজ্জ্বল সূর্যালোক বেয়ে নেমেছে। অনেক ক্ষণ ধরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি রেন পাখির কল-কাকলী শুনছিলাম, ওরা বাইরে ঝোপের উপর বসে গলা ভাজছিল, আর তাকিয়ে তাকিয়ে হলওয়ের অপর প্রান্তের ভাঙ্গা জানালা দিয়ে সোয়ালো পাখির উড়ে উড়ে যাওয়া-আসা দেখছিলাম। অন্য সময়ের মত আমি বিছানা ছেড়ে অনেক যত্ন করে হাত-মুখ ধুই ও দাঁত ব্রাশ করি। বেশ গরম পড়ছিল। সদ্য ধোয়া গ্রীষ্মকালীন পোশাক গায়ে চাপাই এবং চামড়ার পামসুতে পা গলিয়ে দেই। জীবনে এই শেষবারের মত গোলাপজল মেখে শরীরের দুর্গন্ধ দূর করি। গীর্জায় সকাল দশটার ঘন্টা ক্ষ্যাপার মত বাজতে শুরু করে। তার খাওয়ার টেবিলে সকালের নাস্তা দেয়ার জন্য উপর তলায় গিয়ে দেখি মার্টিন সাহেব নেই। তার চেয়ারের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মনে হল যেন ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। প্রথমে ধীরে ধীরে, পর উন্মত্তের মত দ্রুততায়, যেন আমি কোন একটা রুমে ঢোকার সাথে সাথেই সে বের হয়ে যাচ্ছে, সব জায়গায় তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজি। তার ওয়ারড্রোব এবং তার বুক শেলফ খালি দেখার পরই কেবল বুঝতে পারি যে সে চলে গিয়েছে। তবুও, এমনকি পরবর্তী কয়েক দিন ধরে আমার মনে হতে থাকে যে সে যেন ফিরে আসবে।

এক সপ্তাহ পর, এক বৃদ্ধ মহিলা ভাঙ্গাচোরা তিনটি ট্রাঙ্ক নিয়ে এসে উপস্থিত হয় এবং চুলার উপরের তাকে সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখতে শুরু করে। কেবল তখনই আমি বুঝতে পারি যে একটা কথাও না বলে, আমার অনুভূতিকে পায়ে দলে, এমনকি কোন টাকা-পয়সা পর্যন্ত উপহার না দিয়ে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে মার্টিন সাহেব একেবারে চলে গেছে।

এটা একটা ভাড়া বাসা। আমাকে আর আমার মাকেও ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে হয়। লোকজন এখানে আসে ও চলে যায় এবং কয়েক বছর পর পর নতুন ভাড়াটিয়া উঠে। আমার বোঝা উচিত ছিল যে মার্টিন সাহেবও একদিন চলে যাবে। তবে আমি তা স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি। সেই দিনের পর থেকে আমি দীর্ঘ দিনের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং আমার মা, যে দিন দিন আমার প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে উঠছিল, আমার জন্য স্যুপ ও ঠান্ডা শসা আনতে আনতে ক্লান্ত হয়ে উঠে। অসুস্থতার পর আমি দেখতে লাশের মত হয়ে যাই। আমার নিঃশ্বাস দুর্গন্ধময় হয়ে উঠে। আমার মা ঘৃণায় আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত। যদিও চশমাটা আমার সরু নাকের উপর প্রজাপতির মত বসে থাকত তবুও আমি যখন দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে টলমল করে রুমে ঢুকতাম তখন ভাড়াটিয়ারা ভয়ে কেঁপে উঠত।

আমি কখনই ভাল গৃহপরিচারিকা ছিলাম না। তবে এখন, যদিও আমি অনেক চেষ্টা করি, আমি এতই নির্লিপ্ত থাকি যে কোন কোন ভাড়াটিয়া মনে করে আমি মোটেই ঘরদোর পরিষ্কার করি না এবং কেউ কেউ ভাবে আমি ইচ্ছা করে অতিথিদের সামনে তাদেরকে বিব্রত করার চেষ্টা করি। আমি শীতল দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাই এবং আপন মনে নিজের কাজ করে যাই। আমার মত মন ভাঙ্গার যাতনা তো তাদের কখনও সহ্য করতে হয় নি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.