বিশ্বসাহিত্য

ওমর খৈয়ম: তাঁর দর্শন, তাঁর কবিতা

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী | 23 Jun , 2019  


[আরজ]
ওমর খৈয়ম নিয়ে আমার অবসেশন বলুন কিংবা ইনফ্যাচুয়েশন বলুন, তা অনেক দিনের। কিশোর কালে আমার প্রয়াত মাতামহের বইয়ের আলমিরা বাছাই করতে গিয়ে সিকানদার আবু জাফরের ‘রুবাইয়াৎ’ নামের দুটি বই খুঁজে পাই। একটি নিয়ে এসে বাড়িতে বসে পড়তাম। পুরো কৈশোরোত্তর এবং তরুণ কালের একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে খৈয়ম ছিলেন আমার ধ্যান এবং জ্ঞান। তাঁর কবিতাগুলি ছিল আমার ঠোটস্থ, আজও আছে কিছুটা। তখনকার রীতি অনুযায়ী, সকল বই আর খাতার প্রথম পাতায় খৈয়মের একটি করে রুবাই লিখে রাখতাম। কবিতা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান – এ দুটোতেই আমার হাতেখড়ি হয় খৈয়মের কবিতা পড়ে, তাঁর জীবনী পড়ে, রুবাইয়াৎ নিয়ে অপরাপর লেখকদের লেখা পড়ে। এমনকি খৈয়মকে ভাল বোঝার সুবিধার্থে ফারসি শেখাও আরম্ভ করেছিলাম, কিন্তু প্রাথমিক গণ্ডি পেরিয়ে আর কিছু করা সম্ভব হয়নি। প্রসংগত, খৈয়ম ছিলেন তদীয় সুলতানের দরবারের রাজ-জ্যোতির্বিদ। তিনি একটি চমৎকার ক্যালেন্ডারও প্রণয়ন করেছিলেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে যেটা ছিল অনেক সূক্ষ্ম, অন্তত সেই কালের প্রেক্ষিতে। তরুণ বয়সে ঢাকার বিভিন্ন লাইব্রেরিতে ঘুরে আমার কাজ ছিল – ১) ওমর খৈয়ম সংক্রান্ত অনুবাদ, বইপত্র খোঁজা, ২) এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা খোঁজা, এবং থাকলে ফটোকপির কী সুবিধা আছে তা জানা, ৩) জ্যোতির্বিজ্ঞানের কী বই আছে তা জানা। এভাবে আমি বেশ কিছু ইংরেজি বইয়ের সন্ধান পেয়েছিলাম, প্রধানত শাহবাগ গণগ্রন্থাগারে, এবং সেই সময়ে আমি প্রচুর নোট নিয়েছিলাম। এই নোটের ভিত্তিতেই বর্তমান রচনাটি রচিত, সম্ভবত ১৯৯৬/৯৭ সালে। এটি প্রকাশিত হয়েছিল বুয়েট সাহিত্য সংসদের প্রথম প্রকাশনা ‘অন্তঃশীলে’ ১৯৯৮’তে। এই প্রবন্ধে যে লেখনশৈলী আপনি দেখতে পাবেন সেটা সেই সময়কার। সেই শৈলীটিই রাখা গেল, কেননা তাতে নব্বই-দশকের শেষার্ধের গদ্য-চর্চার কিছু নিদর্শন মেলে। প্রকাশিত হলে এই লেখাটি প্রয়াত আহমদ ছফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এবং তিনি আমাকে ডেকে অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় এমন প্রশংসা আমাকে খুবই হ্লাদিত করেছিল, সে বলাই বাহুল্য। রচনাটির মূল তথ্য প্রায় অবিকৃত আছে, তবে খৈয়মের জন্মকাল নিয়ে কিছু নতুন তথ্য জানতে পেরেছি। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইতিহাসবিদ বায়হাকি (১০৯৭-১১৬৯) জানাচ্ছেন, ওমরের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর জন্মমুহূর্তে “রবি এবং বুধের উদয় ঘটছিল, তিনি মিথুন রাশির জাতক…”। জ্যোতির্বিদ্যার এই তথ্য মতে তাঁর জন্মকাল ১৮ই মে, ১০৪৮ সাল। গুগল ডুডুলের কল্যাণে এই তথ্যটি আমি জানতে পেরেছি সম্প্রতি। খৈয়ম নিয়ে পরবর্তীতে আমার পড়াশোনা তেমন আর এগোয়নি। বিদেশে আমি অনেক কৌতূহলোদ্দীপক বই পেয়েছিলাম, কিন্তু সেই সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং খৈয়ম বিষয়ে আমার চিন্তা-বৈকল্য উপস্থিত হয়। সে কারণে এই দুই বিষয়ে আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু আজো ঈদের চাঁদের খুশিতে খৈয়মের ‘কুজানামা’ থেকে কয়েক ছত্র আমার মগজে গুনগুন করে ওঠে। আরেকটি জীবন পেলে ওমর খৈয়ম নিয়ে পড়াশোনা করেই কাটাবো ভাবছি।]

মানব মনের ভাবনা-কল্পনা যখন অনুভূতি-রঞ্জিত যথাবিহিত শব্দসম্ভারে বাস্তব সুষমামণ্ডিত চিত্রাত্মক ও ছন্দোময় রূপলাভ করে তখনই তার নাম কবিতা। আর এই কবিতা যাঁর প্রতিভাস্পর্শে রূপায়িত হয়ে ওঠে তিনিই কবি। আমাদের বর্তমান আলোচ্য কবি হলেন পারস্যের বিখ্যাত কবি ওমার খাইয়াম। তাঁর পুরো নাম ছিল গিয়াসুদ্দিন ইবন আল ফাতাহ্ ওমর ইবন ইব্রাহিম আল খাইয়ামি। কবি-পরিচিতি ছাড়াও তিনি ছিলেন একাধারে জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ এবং, যেহেতু কবি কাজেই, দার্শনিক। যতোদূর মনে হয়, তিনি কবিতা লিখেছেন নিতান্ত খেলাচ্ছলে। তিনি যদি কবিতা নাও লিখতেন তবু গণিতে ও জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর কাজের জন্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। সেলজুক বংশীয় সম্রাট মালিক শাহের তিনি ছিলেন রাজ-জ্যোতিষ। তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মালিক শাহের পিতার প্রধান উজির নিজাম-উল-মূলক। অধিকাংশ পারস্য মনীষীদের জীবনবৃত্তান্ত রহস্যাবৃত। জীবন-স্মৃতিমূলক কোনো রচনা তাঁরা রেখে যাননি। প্রচার ও প্রতিপত্তি তাঁদের কাম্য ছিল না কখনোই।

ওমার খাইয়ামের জন্ম ইরানের উত্তর খোরাসানের নিশাপুর শহরে সম্ভবত ১০২১-২২ (?) কিংবা ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। “কবে, কোন সনে, কোন দিনে সে স্বর্গের বীণা মর্ত্যে খসিয়া পড়িয়াছিল তাহার কোনো ঠিকানা নাই। কোন ভাগ্যবানের গৃহ তিনি আলোকিত করিয়াছিলেন, কোন রত্মগর্ভা রমণী তাঁহাকে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলেন সে সব বিষয়ে জগতের উৎকণ্ঠা কখনো দূরীভূত হইবার নহে[১]। কবির পদবী ‘খাইয়ামি’ শব্দের অর্থ তাঁবু নির্মাতা। কবি নিজেই নিজের পদবী নিয়ে উপহাস করতে ছাড়েননি:

জ্ঞানের তাঁবু সেলাই করে খৈয়াম গেলো বুড়ো হয়ে
ছিঁড়ে গেছে সূত্র এবার দিন কাটে তার দুঃখ সয়ে
ভাগ্য কাঁচি কাটল তারে হয়েছে সে পণ্য আজি-
বিক্রিওয়ালা হাঁকছে, “লহ একটি গানের বিনিময়ে।
[২]

ওমার খাইয়ামের পরিবার সম্পর্কেও আমরা একইভাবে অন্ধকারে। তাঁর এবং তাঁর সমসাময়িক দু’জনকে নিয়ে রয়েছে এক মজার মিথ। কথিত আছে, বাল্যকালে ওমরের সহপাঠী ছিলেন বিখ্যাত নিজাম-উল-মূলক এবং হাসান সাব্বাহ্ (ইসমাইলিয় এবং অ্যাসাসিনদের কুখ্যাত নেতা)। ওঁদের মধ্যে এই চুক্তি ছিল যে ওঁদের মধ্যে যে প্রতিষ্ঠা পাবে সে অন্য দুজনকে সাহায্য করবে। যখন নিজাম-উল-মূলক প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন তিনি তাঁর কথামতো ওমারকে একটি মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। দুঃখের বিষয়, এই গল্পটি সত্য বলে মেনে নিলে সাল-তারিখের বিরাট গণ্ডগোল হয়ে যায়। তাই আধুনিক পণ্ডিতেরা এই গল্পটি মানেন না।
সেলজুকি সম্রাটদের সংস্কার কর্মকাণ্ডের অধীনে একটি মানমন্দির নির্মিত হলে ওমার সেটার ভার গ্রহণ করেন। তিনি আরো আটজন গণিতবিদের সহায়তায় একটি পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন যার নাম (সম্রাটের নামানুসারে) জালালী সন। এছাড়া তিনি গণিতের দ্বিপদী উপপাদ্যের উন্নতি সাধন করেন। একাজে তিনিই প্রথম প্রথাবদ্ধ কাজ করেছিলেন। তাছাড়া ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের উপায় নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর সময়ে তিনি মূলত গণিতবিদ এবং দার্শনিক হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কবি হিসেবে তাঁর কোনো স্বীকৃতিই ছিল না। গণিতের এবং দর্শনের উপর তিনি অনেক বই রচনা করেছেন। দর্শন এবং বিজ্ঞানের উপর তাঁর প্রায় সমস্ত গ্রন্থই আরবীতে রচিত। সামান্য কিছু ছোট রচনা এবং ইবনে সিনার অনুবাদ কেবল ফারসীতে লেখা। তাঁকে বিভিন্ন সময়ে ইমাম-এ খোরাসান, আল্লামা-এ-জামানা, হুজ্জাতুল হক প্রভৃতি নামে ডাকা হতো। সমসাময়িক লোকেরা তাঁকে তাঁর মুক্তচিন্তার জন্যে দুর্নাম করত। এই দুর্নাম দূর করার জন্য তিনি শেষ বয়সে হজ্ব করেন। তাঁর সম্পর্কে উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় তাঁরই এক শিষ্য নিজামি আরুজি রচিত চাহার মকালা গ্রন্থে। ওমার খাইয়াম মারা যান নিশাপুরে ১১২৩ এবং ১১২৪ এর মধ্যে কোনো এক সময়ে। উপর্যুক্ত চাহার মকালা গ্রন্থে ওমারের সাথে তাঁর শিষ্য নিজামি আরুজির শেষ সাক্ষাৎকারের এক চমকপ্রদ বর্ণনা আছে: “আমি ৫১২ হিজরিতে হজ্বে যাবার পথে আমার ওস্তাদ ওমারের সাথে সাক্ষাৎ করতে ও আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলাম।… তখন তাঁর বৃদ্ধ বয়স। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন যে তাঁর কবর এমন স্থানে হবে যেখানে মৌসুমী বায়ুর প্রতি প্রবাহ তাঁর কবরের উপর নব নব পুস্পরাজি বর্ষণ করবে। কয়েক বছর পর নিশাপুরে গেলে আমি দেখতে পাই যে, তাঁর সমাধি হয়েছে এক উদ্যানের পাশে। উদ্যানের বৃক্ষরাজির শাখা প্রশাখা কবরের উপর পত্র ও মুকুলরাশি নিক্ষেপ করছে। তাঁর মকবরা এখনো নিশাপুরে আছে। এখনো তা ভক্তবৃন্দের কোলাহলে মুখর থাকে। কবরের প্রস্তরফলকে কবির রচিত একটি ছত্র লিখিত আছে:
আয় দিল চুন জামানা মীকুনাদ গম নাকাৎ
নাগাহ দে রওয়াদ যে তন রুয়ানে পাকাৎ
বর সবজা নেশীন ও খোশ্ জী রোসে চন্দ্
যাঁ পেশকে সব্জা বর দমদ আয খাকাৎ

রে মন, জামানা যখন তোমাকে দুঃখ দেবে এবং প্রাণ পাখিও দেহ পিঞ্জর ছেড়ে যেকোনো মুহূর্তে পাখা মেলতে পারে তখন এই সবুজের উপর দুটি দিন স্কৃর্তিতে কাটাও তোমার সমাধির উপর সবুজ ঘাস গজাবার পূর্বে। [৩]

দর্শনচিন্তা
ওমারের বিভিন্ন রুবাইতে বিভিন্নরকম ভাবধারা দেখতে পারা যায়। নিজামি আরুজির পর তাঁর সম্পর্কে দ্বিতীয় উল্লেখ দেখা যায় নাজমুদ্দীন রাজীর ১২২৩ সালে রচিত মিরাসুদুল ইবাদ গ্রন্থে। এ বইয়ে তাঁকে “… একজন অসুখী দার্শনিক, নাস্তিক ও জড়বাদী” বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। [৪] অবশ্য মনে রাখতে হবে লেখক একজন আপাদমস্তক সুফী। কাজেই ওমারের অজ্ঞেয়বাদী রুবাইগুলি নিয়ে তিনি যে গালাগাল করবেন তাতে আর সন্দেহ কি! ওমারের কবিতা রচনার মূল প্রেরণা এসেছে সম্ভবত অন্ধকবি আবুল আলা থেকে। আরবীতে লেখা এই কবির কবিতাগুলিতে সমাজের কাপট্যকে তীব্র বিদ্রুপ করা হতো। আসলে ওমার খাইয়ামের দার্শনিক মতবাদ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তাঁর অসংখ্য চতুস্পদীর ভেতরে বিভিন্ন ভাবধারার বিচিত্র অভিব্যক্তি।…. কোথাও তিনি আশাবাদে উজ্বল, কোথাও আবার নৈরাশ্যবাদে বিবর্ণ। কখনও তিনি অদৃষ্টবাদে উৎকণ্ঠিত, আবার তারপরেই অজ্ঞেয়বাদে বিব্রত। কোথাও তিনি তপস্যাবাদে মন্ত্রণামুখর, কোথাও আবার ভক্তিবাদে গদগদ কণ্ঠ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি পরিহাসপ্রিয়তায় লঘুপক্ষ। এ থেকে নির্ণয় করা এক রকম দুঃসাধ্য তাঁর সত্যিকার মতাদর্শ কি। তিনি সুফীদের মরমীবাদ প্রচার করতে চেয়েছেন নাকি এপিকিউরিয় দর্শন অনুসারে দেহবাদের পক্ষে ওকালতি করেছেন? নাকি দার্শনিক জেনোর মতানুসারে সুখ-দুঃখে নিরাসক্তি (stoic) সন্বন্ধেই তাঁর পক্ষপাতিত্ব?” [৫] ওমার বলছেন:
মায় খোর কে ব’যের এ গেল বছে খাহি খোফত
বে মুনিস উ বে হারিফউ বে হামদম উ জোফত
যিনহাস ব’কাস ম’গো তু ই রাজে নেহোফত
হর লালায়ে পিজমুরদা না খাহাদ বেশেগাফত।

অনুবাদ:
পিয়ে নাও সুরা এই বেলা সখা, ঘুমাবার দিন অনেক পাবে
মৃত্তিকার নিচে দরদী বান্ধব, প্রেয়সী যেথায় কেহ না যাবে
বলো না কাহারে, বলো নাকো এই অতীব গোপন সত্য সার
যে ফুল নিশায় পড়েছে ঝরিয়া, সে নাহি কখনো ফুটিবে আর।

এ জাতীয় রুবাইগুলি পড়ে মনে হয় ওমার বোধহয় নিছক দেহবাদী। মনে হয় যেন তিনি কেবল জড়বাদী চিন্তার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জীবন সংক্ষিপ্ত, সুতরাং ভোগই জীবনের পরম ও একমাত্র লক্ষ্য। ওমারের অধিকাংশ পাঠকই এ মতের অনুসারী (যেমন এ জে আরবেরী)। কিন্তু কারও মতে (যেমন জে বি নিকোলাস) তিনি সুফীদের মরমীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। সরাইখানা, মদ, সাকী এসবই আসলে রূপকমাত্র। ওমারের অন্যতম গদ্য অনুবাদক জন পেইনের মতে ওমার আসলে সুফীবাদ এবং উপনিষদের মতাদর্শের একটি সমন্বয়। তাঁর মতে সেকালে পারস্যে প্রচলিত সুফীবাদ মরমীবাদের আবরণে বৈদিকসর্বেশ্বরবাদ (pantheism) ছাড়া আর কিছু নয়। এমত প্রমাণের জন্য জরথুস্ট্রের ধর্মনীতি,বৈদিক আদর্শ ব্রাহ্মণ্যবাদ, উপনিষদের যুক্তি, আর্য প্রভাব ও প্রভুত্ব কি করে পারস্য পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল এবং তার ফলে কিভাবে বৈদিক আদর্শ ফল্লুধারার মতো প্রচ্ছন্নভাবে পারসিকদের অবচেতন মনে সম্পৃক্ত ছিল তা নিয়ে একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ বইই লিখে ফেলেছেন [৬]।প্রসঙ্গত আই পি উমোভ বলছেন [৭],],“Incomparable as regards form, his quatrains contain profound thoughts, sometimes hedonistic, then again sad and pessimistic. As a sceptic and mystically minded philosopher, absorbed in the mysteries of Fate, seeking in God an explanation of earthly suffering, supplicating ‘Him’, the Silent One, in vain – a man renouncing his past, without faith in the future, living for the fleeting present, scourging with biting satire the hypocrisy and show of saintliness of his contemporaries – he lived and wrote at a time when the view of the Sufi mystics appeared as it were to be like the result of life itself, in which one kingdom after another collapsed, great and wise men fell victim to hands of unknown murderers, old doctrines were exchanged for new and rough nomadic hordes from foreign regions swept away and destroyed the ancient culture of Iran.”

রুবাইয়াতে অজ্ঞেয়বাদ (agnosticism) অত্যন্ত প্রকট। ওমার ছিলেন বিজ্ঞানী, কাজেই সন্দেহবাদী এবং অজ্ঞেয়বাদী। একটি রুবাইয়ে জ্ঞানের প্রতি তাঁর স্বভাবজ অজ্ঞেয়বাদী উদাসীনতা ব্যক্ত হয়েছে:
পৃথিবীর থেকে সাত আকাশের বিস্তৃতি বহুদূর
শনিগ্রহের দুয়ার পেরিয়ে পথরেখা বন্ধুর
সবই তো বন্দি আমার জ্ঞানের সীমানার বন্ধনে
তবু অজ্ঞাত মৃত্যু এবং ভাগ্রলিপির সুর॥
[৮] (অনু. সি. আবু জাফর. ৩১)

দর্শনে এবং বিজ্ঞানে, বিশেষ করে গ্রীক বিজ্ঞানে, তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। একথা বলেছেন ইবনুল কিফতি তাঁর তারিখুল হুকামা গ্রন্থে। কিফতির মতে “তাঁর পরবর্তী সুফীগণ তাঁর রুবাইগুলির কেবল বাহ্যিক অর্থেই তুষ্ট ছিলেন, কিন্তু এর অন্তুর্নিহিত অর্থ ছিল ধর্মগুরুদের প্রতি সমালোচনা।” তাঁকে অনেকে পারস্যের ভলতেয়ার বলে অভিহিত করেছেন [৯]। দর্শনে তিনি ছিলেন ইবনে সিনার সমকক্ষ। সিনা তাঁকে প্রভাবিত করেছে- চিন্তায় মননে দর্শনে বিজ্ঞানে। সিনার বেশ কয়েকটি রুবাইও খাইয়ামের নামে প্রচলিত আছে। খাইয়াম তাই তাঁর সময়ে প্রচলিত মরমীবাদকে (mysticism) কটাক্ষ করেছেন। যদিও তাঁর সমসাময়িকগণ মরমীবাদেই খুঁজে পেয়েছেন সান্তনা। সে সময় মরমীবাদের অন্তরালে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রচলিত ছিল কাপট্য। ওমারের অনেক রুবাইতে এই কপটদের মুখোশ উম্মোচিত হয়েছে।

ভণ্ড যতো ভড়ং করে দেখিয়ে বেড়ায় জায়নামায,
চায় না খোদায়-লোকের তারা প্রশংসা চায় ধাপ্পাবাজ!
দিব্যি আছে মুখোস পরে সাধু-ফকির-ধার্মিকের,
ভিতরে সব কাফের ওরা, বাইরে মুসলমানের সাজ।।
(-কাজী নজরুল, ১৩৫)

তবে বেশিরভাগ রুবাইতে মরমীবাদের উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিগত নয়শ বছর ধরে পারসিক সাহিত্যে যে বৈশিষ্ট্যসূচক মতাদর্শ প্রাধান্য বিস্তার করেছিল তার সূক্ষ্ম উপস্থিতি লক্ষণীয়। ঐক্যসাধন (unification) বা ঈশ্বরের সাথে মিশে যাওয়া(যেটা সুফীবাদে ‘ফানাফিল্লাহ’ নামে পরিচিত) হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য এবং এই তত্ত্ব অনেক রুবাইতেই প্রচ্ছন্নভাবে উপস্তিত। এই ধারার রুবাইয়ের একটি উদাহরণ হলো:
My body’s life and strength alone Thou art, /My heart and soul art Thou, O Soul and Heart!/Thou art my being: therefore Thou art I/ And I am Thou, since I in Thee depart.
অপরাপর রুবাইয়ে সর্বজনগ্রাহ্য সুফী মতবাদ প্রতিভাত হয়েছে, যেমন অন্তরের ভেতরেই কেবল সত্যতত্ত্ব (truth) পাওয়া যায়, স্বর্গ ও নরক আধ্যাত্মিক বিষয়, ঈশ্বরের সাথে একীভূত হতে বা ঈশ্বরে বিলীন হতে হলে ‘আত্মিক’ মৃত্য অপরিহার্য, পরম জ্ঞান কেবলমাত্র অজ্ঞানতা কিংবা ভাবাবেশেই নিহিত ইত্যাদি। ওমারের মতে,
“….. the true way to the knowledge of God is the way of the Sufis!… the way adopted by the dogmatists, philosophers and Isma’ilites is not the true one. Thus mysticism and peripatetic philosophy can go hand in hand just as mysticism is incompatible with rebelliousness or insolence towards God.”[[১০]

ওমার ছিলেন জ্ঞানমার্গের কবি। তাঁর কবিতায়“.. ইউসুফ জোলেখার প্রেমালাপ নই, লাইলি মজনুর ন্যায় প্রেমের জন্য আত্মবিসর্জন নাই, প্রাচ্যদেশীয় চিরন্তন বাঁধাগত বিশ্বপতির স্তবও ইহাতে নাই। ইহাতে আছে সেই তথ্য যাহা যুগযুগান্ত ধরিয়া মানুষের চিন্তাকে বিব্রত, হৃদয়কে আলোড়িত করিয়া আসিতেছে সেই তত্ত্ব যা পৃথিবীর জন্মকাল হইতে আজ পর্যন্ত কেহ মীমাংসা করিতে পারে নাই…”[১১]। ওমারের পরবর্তী কবিরা, যেমন হাফিজ, অনেকেই তাঁরই সুরে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কিন্তু হৃদয় তাঁদের সন্দেহের দোলায় কখনো দোলেনি, তাই তাঁদের অবস্থান ভক্তিমার্গেই সীমাবদ্ধ। রিপকা বলছেন [১২]:]:“… his influence on the development of thought in Iran is exemplified by no less a poet than Hafiz and a legion of others also raised their voices against the omnipotent but hollow and hypocritical obscurantism.” কিন্তু ওমারের বিচরণক্ষেত্র বুদ্ধির রাজ্যে। তাই মিলন ও বিয়োগের মর্মোচ্ছাস, সুখ-দুঃখের দোলা তাঁর হৃদয়কে সহসা আন্দোলিত করতে পারেনি। বুদ্ধি দিয়ে, বিজ্ঞানের যুক্তি, দার্শনিকের দৃষ্টি দিয়ে তিনি বিচার করেছেন কার্য-কারণ-সম্বন্ধ। কেন এই অহেতুক জন্ম অথবা অনিবার্য মৃত্যু? এই ব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ কি কোনোদিনই মানবজ্ঞানের সীমানায় ধরা পড়বে না? হৃদয়ের এই আকুলতা ব্যাকুলতাই ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। ওমার সম্পর্কে আর এ নিকলসন বলছেন [১৩]:
“Omar was a man of science in the first place, a poet occasionally, a freethinker by necessity, in some moods, perhaps, a mystic, but he played with Sufism rather than believed in it. … If it were permissible to hazard any conjecture as to his positive beliefs, I should surmise that he accepted Islam in something of the some spirit and, mutatis mutandis, with the same reservations which have enabled many distinguished scientists in the middle ages … to accept Christianity.”

সৃষ্টির রহস্য সংক্রান্ত ওমারের দার্শনিক গ্রন্থাদি পাঠে জানা যায় যে, তিনি ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের দ্বারা বিশ্ব ও তার আদি কারণকে সনাক্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। সমুদয় অস্তিত্বকে তিনি দ্বিধাবিভক্ত করেছেন। একটি ওয়াজিব-উল-ওজুদ বা আবশ্যিক সত্তা (necessary existence), যেমন ঈশ্বর, অন্যটি হচ্ছে মমকিন-উল-ওজুদ বা সম্ভাব্য সত্তা যা ঈশ্বর ব্যতিরেকে অবশিষ্ট সব কিছুই নির্দেশ করে। যার অস্তিত্ব অনস্বীকার্য এবং অনস্তিত্ব অসম্ভব সেটাই আবশ্যিক সত্তা। সম্ভাব্য সত্তার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব দুটোই সমভাবে সম্ভব। সম্ভাব্য সত্তার উদ্ভব ও বিলয়ের ভেতরে কার্যকারণ সম্বন্ধ রয়েছে। কিন্তু আবশ্যিক সত্তার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। কারণ আবশ্যিক সত্তায় কোনো সৃষ্টি বা বিলয় নেই-এটা অনাদি-অনন্ত। অন্যান্য সত্তা এ থেকে উদ্ভুত। আবশ্যিক সত্তায় কোনো সৃষ্টি বা বিলয় নেই – এটা অনাদি-অনন্ত। অন্যান্য সত্তা এ থেকে উদ্ভূত। আবশ্যিক সত্তাই স্রষ্টা। এটা মূলত মঙ্গলের স্রষ্টা, কিন্তু অমঙ্গল আনুষঙ্গিকভাবে চলে এসেছে। এজন্যে সৃষ্টির ভেতর মঙ্গল-অমঙ্গল দুই-ই রয়েছে। ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জীবন বৈচিত্রময় হয়ে উঠেছে। স্রষ্টার আদি সৃষ্টি জ্ঞান বা চেতনা, আর নিন্মতম সৃষ্টি হচ্ছে জড়। মানুষ এ দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত তাই ভালো-মন্দের সংঘাত এখানে প্রকট। তিনি বলেন মানুষ যতো অন্তরের জড়ত্বকে অতিক্রম করে জ্ঞানের পথে অগ্রসর হবে ততোই সে স্রষ্টার নিকটবর্তী হবে। তাঁর মতে কোনো মানুষ একাকী, একেবারে প্রথম থেকে সাধনা শুরু করতে পারে না। এ বিষয়ে ওস্তাদকে অনুসরণ করতে হয়। মানুষের ভেতর যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী ও আধ্যাত্মিকতায় অগ্রগামী তিনিই জ্ঞান দানের ক্ষমতা রাখেন। [১৪]

রুবাইয়াত: একটি তুলনামূলক আলোচনা
‘রুবাইয়াত’ শব্দটি ‘রুবাই’ শব্দের বহুবচন। ‘রুবাই’ শব্দের অর্থ হলো চতুষ্পদী বা চারলাইনের কবিতা-ছত্র। রুবাইতে সাধারণত প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থপদে অন্ত্যমিল থাকে, তুতীয় পদটি ভিন্ন সুর বা বিষম হয়। অর্থাৎ এরা ক ক খ ক ছন্দ অনুসরণ করে। মনে হয়, এভাবে কবিতা রচনার ফলে কবিতার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। অন্তর্নিহিত ভাব অধিকতর অর্থবহ হয়, গাম্ভীর্য বাড়ে। প্রাচীন মরমীবাদ কিংবা অজ্ঞেয়বাদের দুঃখবাদী সুর অনেকটা সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে এ ধরনের কম্পোজিশনে। ওমার খাইয়াম ইউরোপে পরিচিত হয়েছেন Astronomer poet of Persia নামে। যে কাব্যগ্রন্থ তাঁকে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে সে হচ্ছে তাঁর বিভিন্ন সময়ে রচিত ‘রুবাইয়াত’। এর সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সার্থক অনুবাদক হলেন এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড। এই অনুবাদ ইউরোপে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৫৯ সালে। ওমারের লেখা প্রকৃত রুবাইযের সংখ্যা নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে পাওয়া গেছে ৮০১টি রুবাই। অক্সফোর্ডের বোদলেয়ান লাইব্রেরিতে পাওয়া গেছে ১৫৮টি রুবাই এবং এর তারিখ ১৪৬১ খ্রিষ্টাব্দ। লক্ষ্মৌতে যে পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া গেছে তার তারিখ ১৪২৩ এবং সংখ্যা ৩৪৯। কিন্তু বিশেষজ্ঞের মতে এদের অধিকাংশই প্রক্ষেপ। রচনাভঙ্গি এবং বিষয়বস্তু যেকোনো দিক দিয়েই এই রুবাইগুলিকে আর পৃথক করা যায় না। প্রফেসর জুকোভস্কি রচিত এবং ডেনিস রস অনূদিত Omar Khayyam and the Wandering Quatrains (Journal of the Asiatic Society for 1898 এ প্রকাশিত)-এ লেখক দেখিয়েছেন যে ওমারের প্রায় ৮২টি চতুষ্পদীই অন্যের রচনা। এঁদের মধ্যে ফরিদুদ্দিন আক্তার, রুমি, হাফিজ, আবু সাইয়েদ, ফিরদৌসী, সানাই, আনসারী, মোল্লা মোহসিন, মোল্লা হাদী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। সময়ের বিবর্তনে মূল রুবাইয়াত এতো বেশি প্রক্ষিপ্ত হয়ে গেছে যে তা স্বয়ং খাইয়ামই সনাক্ত করতে পারতেন কিনা সন্দেহ! এ সম্পর্কে রিপকার মত: “There is the Proteus-like diversity in ideas and manuscripts, which was so striking as to arouse feelings of uncertainty among the investigators and doubts as to the authenticity of the tradition. For in the earliest attested quatrains one already finds conflicting ideologies, a feature that becomes more and more marked.’[১৫] অধ্যাপক আর্থার জে. আরবেরী অনেক গবেষণা করে ওমারের রুবাইগুলির সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন মোটামুটি ২৫০।

অনুবাদের কথায় ফিরে আসা যাক। এ কথা সত্য যে ফিটজেরাল্ড অনুবাদে যথেষ্ট স্বাধীনতা নিয়েছেন। তিনি অধ্যাপক কাওয়েলকে লেখা একটি চিঠিতে বলছেন: “My translation will interest you from its form, and also in many respects in its detail, very unlimited as it is. Many quatrains are mashed together and something lost, I doubt, of Omar’s simplicity, which is so much a virtue in him.”[১৬] ইংরেজিতে আরো অনেকে অনুবাদ করেছেন। যেমন এ ই নিকোলাস, ই এইচ হুইনফিল্ড, এ জে আরবেরী, জন পেইন, হেরন অ্যালেন প্রমুখ। বাংলায় করেছেন কাজী নজরুল, ড মু শহীদুল্লাহ এবং নুরুন নাহার বেগম সরাসরি ফারসী থেকে। এছাড়া ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সিকানদার আবু জাফর, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, নরেন দেবসহ আরও অনেকে। কবিতার তুলনামূলক আলোচনায় ফিটজেরাল্ডের প্রথম সংস্করণের অনুবাদ, আরবেরীর The Romance of the Rubayyat গ্রন্থ থেকে মূল ফারসী হতে ইংরেজি অনুবাদ এবং বাংলা অনুবাদ নেওয়া হয়েছে আবু জাফর, নজরুল এবং কান্তিচন্দ্র থেকে।

ফিটজেরাল্ডের প্রথম সংস্করণের ১১ নং রুবাই
মূল ফারসি:
তাঙ্গি মা’ইয়ে লাল খোয়াহাম উ দিওয়ানি
সাদ-এ রামাকে বয়াদ ও নিস্ফ-এ না’নি
ওয়া আংগাহ মান উ তু নিশাস্তা দর বিরানি
খুশতার বুওয়াদ আজ মামলাকাত-এ-সুলতানি

অনু: এক পাত্র লাল সুরা ও একটি কবিতার বই-এই মোর প্রার্থনা। বেঁচে থাকার জন্য একটি রুটির ছিলকে; এবং তুমি আর আমি কোনো উষর জনশূন্য প্রান্তরে বসে-এ বরং ভালো কোনো সুলতানের রাজত্ব থেকে।

ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ:
Here with a Loaf of Bread beneath the Bough
A flask of wine, a book of verse–and Thou
Beside me singing in the wilderness–
And wilderness is Paradise enow.

কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ:
সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায,
খাদ্য কিছু পেয়ালা হাতে ছন্দ গেথে দিনটা যায়!
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর-
সেই তো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর!

নজরুলের অনুবাদ:
এক সোরাহী সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর
প্রিয়া সাকী তাহার সাথে একখানি বই কবিতার
জীর্ন আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ,
এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ আমি শাহানশার!

অবু জাফরের অনুবাদ:
এখানে কোথাও পল্লবঘন নির্জন তরুতলে
বসে থাকি যদি নিরুদ্বিগ্ন দিন কাটাবার ছলে
সাথে থাকে যদি কিছু আহার্য, মদিরা পাত্র-ভরা
একটি কাব্য সুরভিসিক্ত ছন্দের শতদলে:

নবজীবনের সলাজ মধুর বিস্ময়ের সচকিতা
সাথে থাকো যদি লীলায়িত তনু মধুমুখী মধুমিতা,
তনুতে মুছায়ে তনুর পিপাসা আর যদি গাহো তুমি
ফিরদৌসের সমারোহে হবে এ-বনানী সুশোভিতা॥

মন্তব্য: এই রুবাইটি প্রায়ই উদ্ধৃত করা হয়। ইংরেজি থেকে অনুবাদ হিসেবে কান্তিবাবু এবং আবু জাফর ভালো করেছেন। কিন্তু কান্তিবাবু রুবাইয়ের মূল ছন্দে অনুবাদ না করে ক ক খ খ ছন্দে অনুবাদ করেছেন। তথাপি ভাব সুস্পষ্ট। আবু জাফর মূল ছন্দ ঠিক রাখলেও একটি রুবাইকে ভেঙ্গে দুটি করেছেন। কিন্তু বিশুদ্ধ বাংলার ব্যবহার ও চমৎকার ছন্দ এ দৃষ্টিকটু ব্যাপারটিকে ঢেকে ফেলেছে। মূল ফারসীতে যেখানে সুলতানের রাজত্ব ছিল সেটার পরিবর্তন লক্ষণীয়–ফিটজেরাল্ডে তা প্যারাডাইস হয়ে গিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে কবিতার অনুবাদে ভাবই মুখ্য, ভাষা গৌণ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “কবিতা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষার প্যাচে ফেলে দেওয়া কঠিন। কারণ এর প্রধান জিনিসটা ভাষা নয়, গতি”। মূল ফারসী থেকে অনুবাদ হিসেবে নজরুল বেশ সার্থক।

ফিটজেরাল্ডের প্রথম সংস্করণের ৪৯ নং রুবাই:

মূল ফারসি থেকে অনুবাদ: এ নয় কোনো রূপক, এতো বাস্তব– আমরা সবাই দাবার খুঁটি এবং স্বর্গই খেলোয়াড়। আমরা আমাদের স্বল্পকালীন খেলাখেলি জীবনের বা অস্তিত্বের দাবার ছকে আর একজন একজন করে ফিরে যাই অনস্তিত্বের বাক্সে।

ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ:
‘Tis all a Chequer-board of Nights and Days
Where Destiny with Men for Pieces plays:
Hither and thither moves, and slays,
And one by one back in the Closet lays

কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ:
ছকটি আঁকা সুৃজন-ঘরের রাত্রি-দিবা দুই রঙের
নিয়ৎ দেবী খেলছে পাশা, মানুষ ঘুঁটি সব ঢঙের,
পড়ছে পাশা, ধরছে পুনঃ, কাট্ছে ঘুঁটি, উঠছে ফের-
বাক্সবন্দী সব পুনরায়, সাঙ্গ হলে খেলার জের।

নজরুলের অনুবাদ (১৬৬):
আমরা দাবা খেলার ঘুঁটি, নাইরে এত সন্দ নাই।
আসমানী সেই রাজ-দাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই।
এই জীবনের দাবার ছকে সামনে পিছে ছুটছি সব,
খেলার শেষে তুলে মোদের রাখবে মৃত্যু-বাক্সে ভাই।

আবু জাফরের অনুবাদ:
দিন-রাত্রির রঙ দিয়ে আঁকা দাবার ছকটি মেলে
নসীঁব খেলছে বিচিত্র খেলা মানুষের ঘুঁটি চেলে;
ঘর থেকে ঘরে চালে চালে ঘুঁটি পড়ছে, মরছে আর
দান শেষ হলে তাদের আবার বাক্সে রাখছে ঢেলে ॥

মন্তব্য: এই রুবাইটিতে নিয়তিবাদ স্পষ্ট। আমরা সবাই কোনো এক খেলোয়াড়ের হাতের ঘুঁটি মাত্র। মানুষের নিয়তি পূর্ব-নির্ধারিত হয়ে আছে। এখানে কারো কিছু করার নেই। এ প্রসঙ্গে ৫৩ নং রুবাইটি স্মরণ করা যেতে পারে:
প্রথম মাটিতে গড়া হয়ে গেছে শেষ মানুষের কায়
শেষ নবান্ন হবে যে ধান্যে তারো বীজ আছে তায়।
সৃষ্টির সেই আদিম প্রভাতে লিখে রেখে গেছে তাই,
বিচার-কর্ত্রী প্রলয় রাত্রি পাঠ যা করবে ভাই॥
(সত্যেন দত্ত)

ফিটজেরাল্ডের প্রথম সংস্করণের ৭৫ নং রুবাই:
ফিটজেরাল্ড এই কবিতাটি লিখেছিলেন মূল দুটি রুবাইকে অনুসরন করে।

মূল ফারসি থেকে অনুবাদ: বন্ধুগণ, যখন তোমরা পরস্পরকে (একমন একপ্রাণ) দেখবে, তখন তোমাদের কর্তব্য তোমাদের বন্ধুকে স্মরণ করা। যখন তোমরা একত্রে বসে (বড় বড় চুমুকে) সুরা বা মদ পান করবে এবং যখন আমার পালা আসবে তখন (আমাকে স্মরণ করে) পাত্রটি উপুড় করে দিও।
… বন্ধুগণ, যখন তোমরা পূর্বনির্ধারিত স্থানে গানের জলসায় মিলিত হবে এবং পরস্পরের সৌন্দর্যে (বা মাধুর্যে) মুগ্ধ হবে, যখন সাকী যাদুকরী সুরা তার হাতে নেবে, তখন তোমাদের প্রার্থনায় স্মরণ কোরো অসহায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের।

ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ:
And when Thyself with shining foot shall pass
Among the Guests Star-scattered on the Grass,
And in Thy joyous Errand reach the Spot
Where I made one – turn down an empty Glass!

কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ:
বিভোর প্রাণে আসবে যেদিনআকুল মিলন প্রতীক্ষায়
তৃণাসনে অতিথ্-সভা ছড়িয়ে যেথা তারার প্রায়;
উজল পায়ে আসবে যখন আমার যেথায় ছিল স্থান,
উপুড় করে রেখো সেথায় আমার শূন্য পাত্রখান!

নজরুলের অনুবাদ (১৬৬):
আবার যখন মিলবে হেথায় শরার সাকীর আঞ্জামে
হে বন্ধুদল একটি ফোঁটা অশ্রু ফেলো মোর নামে!
চক্রাকারে পাত্র ঘুরে আসবে যখন সাকীর পাশ,
পেয়ালা একটি উল্টে দিও স্মরণ করে খৈয়ামে!

আবু জাফরের অনুবাদ:
কোনো ফাল্গুন-সন্ধ্যা লগনে হয়ত অন্যমনে
আগের মতো অনুরাগ-রাঙা নিমেষ অন্বেষণে
নূতন তারার অতিথি সভায় মখমল তৃণদলে
মধুমুখী প্রিয়া আসবে আবার নিভৃত কুঞ্জবনে;
আসবে, যেখানে জীবনের লোভে আমিও এসেছিলাম
তোমার শান্ত সুরভীতে আমি ক্লান্তি ঢেকেছিলাম,
সেই পরিচিত ভূমি পরে তুমি দিও গো উপুড়
করে
একটি শূন্য মদিরা পাত্র জড়ায়ে আমার নাম॥

মন্তব্য: এই রুবাইটির অনুবাদ বেশ জটিল। ইংরেজিতে মূল উৎস প্রথম রুবাইটি হলেও দ্বিতীয় রুবাইটির লক্ষণও স্পষ্ট। এই রুবাই দুটি ইসলাম-পূর্ব যুগের কবি আ’শার কথা মনে করিয়ে দেয় যিনি অত্যন্ত বেশি মদ পান করতেন এবং আনন্দ-উৎসবকারীরা তাঁর সমাধিস্থলে মিলিত হতো এবং মদ পান করার পর যেটুকু পাত্রে অবশিষ্ট থাকতো সেই শেষ বিন্দুটি তারা সে কবরে ঢালত। [১৮]
ইংরেজি থেকে অনুবাদ হিসেবে সিকানদার আবু জাফরের অনুবাদ বেশি হৃদয়গ্রাহী। নজরুলের অনুবাদের সরাসরি ফারসি থেকে অনূদিত বলে অর্থ সহজবোধ্য।

ফিটজেরাল্ডের ইরেজি অনুবাদে মূল ফারসি রুবাই কিভাবে মিলে মিশে গিয়েছে তার আরেকটি উদাহরণ হলো পৃষ্ঠা ২-এ উদ্ধৃত রুবাইটি। এই রুবাইটির প্রথম দুই ছত্র নিয়ে রচিত হয়েছে ২৩ নং চতুষ্পদী এবং শেষ দুই ছত্র নিয়ে রচিত হয়েছে ২৬ নং চতুষ্পদী। এ দুটি রুবাইয়ের উদাহরণ দিয়েই এ প্রবন্ধের ইতি টানছি।

২৩ নং চতুষ্পদী:
Ah, make the most of what we yet may spend,
Before we too into the Dust descend;
Dust into Dust, and under Dust, to lie,
Sans Wine, sans Song, sans Singer, and—sans End!

২৬ নং চতুষ্পদী:
Oh, come with old Khayyam, and leave the Wise
To talk; one thing is certain, that Life flies;
One thing is certain, and the Rest is Lies;
The Flower that once has blown forever dies.


সূত্র:

[১] পারস্য প্রতিভা, মো. বরকতুল্লাহ্, বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র, পৃষ্ঠা ৩২, বইটির একাধিক সংস্করণ আছে।
[২] ওমর খৈয়ম, হ্যারল্ড ল্যাম্ব, অনু. আব্দুল হাফিজ; র্ফ্যাংকলিন বুক্স, ঢাকা।
[৩] বরকতুল্লাহ্, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫।
[৪] A Literary History of Persia, E. G. Browne, Cambridge University Press, 1951,Vol. II, pp.249-250.
[৫] রুবাইয়াত-ই-ওমার-খাইয়াম, অনু. সিকানদার আবু জাফর, বাংলা একাডেমি, ১৯৭১, (দ্বিতীয়
প্রকাশ), পৃ. ১১।
[৬] সিকানদার আবু জাফর, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১।
[৭] I. P. Umov, in 1911, as quoted by A. Krimskiy, vide History of Iranian Literature, by Jan Rypka, edited by Karl Jahn, 1968, pp. 189-193, D. Riedel Publishing Co. Dordrecht, Holland.
[৮] এই রুবাইটি যদিও খাইয়ামের নামে প্রচলিত তবে পণ্ডিতদের মতে এর মূলে রয়েছে দার্শনিক
ইবনে সিনা। এটি বোধহয় তাঁরই রচিত, পরে খাইয়ামের নামে প্রচলিত হয়েছে।
[৯] ফারসী সাহিত্যের কালক্রম, আবদুস সাত্তার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
[১০] H. Ritten, quoted in Rypka, ibid.
[১১] বরকতুল্লাহ্, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮।
[১২] Jan Rypka, ibid.
[১৩] R. A. Nicholson, ‘Introduction’ in Rubaiyat of Omar Khayyam by Edward FitzGerald, pp. 12-13, A & C Black Ltd. London, 1967.
[১৪] বরকতুল্লাহ্, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭-৪৯।
[১৫]Rypka, ibid.
[১৬] R. A. Nicholson’s Introduction, ibid
[১৭] রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা, রোবাইয়াৎ ই ওমর খৈয়াম, অনুবাদ কান্তিচন্দ্র ঘোষ।
[১৮] R. A. Nicholson’s Notes, E. FitzGerald, ibid, pp.136.

গ্রন্থঋণ:
ওমার খাইয়ামের উপর ভালো সাধারণ আলোচনার জন্য নিচের বইগুলি দেখা যেতে পারে:
১. পারস্য-প্রতিভা, মো. বরকতুল্লাহ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ঢাকা।
২. ওমর খৈয়াম, হ্যারল্ড ল্যাম্ব, অনুবাদ আবদুল হাফিজ, ফ্র্যাংকলিন পাবলিশার্স, ঢাকা।
৩. ইরানের কবি, মো. মনসুর উদ্দিন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৪. ওমর খৈয়াম, মো. শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ সোশিও-ফিলসফিক হিউমানিস্ট গিল্ড, ঢাকা।
৫. বিজ্ঞানে মুসলমানের দান এবং বিজ্ঞানী কবি ওমর খৈয়াম, এম আকবর আলী, মালিক লাইব্রেরী, ঢাকা।


1 Response

  1. জিললুর রহমান says:

    আলোচনাটি পড়ে মন ভরে গেল। ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.