কবিতা

আসাদ মান্নানের ‘তালিকাটি বেহেস্তে টাঙাবো’ ও অন্যান্য

আসাদ মান্নান | 10 Jun , 2019  


কবিতার জন্য এলিজি
(কবি মাহমুদ আল জামান শ্রদ্ধাস্পদেষু)

তিনি বড় দৈনিকের সাময়িকী সম্পাদক,
আছে বেশ কবি পরিচিতি; সেদিন সকালে
ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি তাঁর স্বনামেই
নিজের কাগজে
একটি কবিতা ছাপলেন সগর্বে;
বাহ্!
বড় হাউজের বড় কাগজের
বড়লাট কবিদের সঙ্গে তিনি ক্ষুদ্র ছোটলাট !
তিনি কবি হবেন না তো কে হবেন–
পত্রিকার চতুর হকার কিংবা
নিরক্ষর চরের রাখাল?

বড় কাগজের সাময়িকী সম্পাদক
চাট্টি কথা নয়!
বাজারে গুজব আছে
এ কাগজে ছাপা হলে
বাজারের ফর্দ আর স্যানিটারি ন্যাপকিনও নাকি
শিল্প হয়ে ওঠে;
জাতহীন কবি ও কবিতা জাতে ওঠে।

তো এমন মাজেজা যে-কাগজের
তার সাহিত্যের পাতা
আহা! যার হাতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে
অগুণতি আলোর পাখি,
কখনও বা দেখা হলে তার হাত
গাঢ় মমতায় আকড়ে ধরি
বিনিময় করি ব্যক্তিগত সুখ- দুঃখের কুশল বার্তা,
স্বভাব গুণেই অন্য কবি ও কবিতার প্রতি
রয়েছে আমার এক ধরনের অন্ধ অনুরাগ।
সাহিত্য সম্পাদকের কবিতাটি
আমাকে যে পড়তে হয় পরম দরদে!
প্রবল আগ্রহ নিয়ে পড়তে গিয়ে হঠাৎ দ্বিতীয় লাইনে
প্রচণ্ড হোঁচট খেয়ে আমি পড়ে গেছি,
দুর্ঘটনা কবলিত বাসের যাত্রীর মতো
একটা দুর্গম পাহাড়ের খাদে
আমি যে এখনো পড়ে আছি!
নিখুঁত অক্ষর বৃত্তে শুরু করে
গুরুচণ্ডালী বেচাল ছন্দে কবি
কবিতাটা বাজারে ছাড়লেন!
না পড়েও কোনো কোনো নির্বোধ পাঠক
শুধু নামটা পড়েই
কবিকে আড়াল থেকে হয়তো বাহবা দেবে
দেখা হলে আলিঙ্গনে বুকে তুলে নেবে;
কী উজ্জল অপরূপ ভঙ্গিমায়
তৃপ্তির হাসিতে কবি
কিছু রহস্যের গুঁড় মিশিয়ে আসরে বা হাশরে
হাসবেন মুচকি মুচকি…

জানি,কবি তার পতনের জন্য
হয়তো নিজেই দায়ী; কিন্তু
পাঠক হিসেবে আমি যে ভূতলে পড়ে আছি!
পড়ে থাকবো ততদিন
যতদিন অই কবিতাটি
বাজারে থাকবে
মাজারে থাকবে;
আশেপাশে যদি কেউ এমন থাকেন
দয়া করে
আমাকে উদ্ধার করে এক হাতে
একটা বাঁশের লাঠি দিন
যাতে উঠে
দাঁড়াতে সহজ হয়– অনায়াসে হাঁটা যায়;
আর যদি থাকে
দয়া করে অন্য হাতে দেবেন একটা
যেন তেন ভাঙা হারিকেন,
যাতে অন্ধকারে
হাঁটতে গিয়ে দেখা পাই
প্রাচীন বটের মূলে দিবসের প্রথম আলোর।

আমার হিসাব খাতা

কালরাতে ঘুম ভাঙলে পর
পাশ ফিরে দেখি:
যে আমার পাশে শুয়েছিল তার জায়গায়
একটা দূরন্ত নদী
হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে
উলঙ্গ চণ্ডীর মতো
অস্থির উজান টানে
ছুটছে, ছুটে যাচ্ছে,
ছুটছে তো ছুটছে…
বাহ্! এই তো জীবন–
চারিদিকে জীবনের
এত রূপ এত মায়া!
বিচিত্র মায়ার খেলা;
এক খেলা শেষ না হতেই
শুরু হয় অন্য খেলা ;
এ এক আজব খেলা–
তিনি হক তিনি কবি
ফুল নিয়ে
পাখি নিয়ে
শব্দ নিয়ে
খেলতে খেলতে
ফুরফুরে মেজাজে
হাওয়াকে জড়িয়ে গায়ে
রঙ ও রেখায়
জীবনের
সব চাওয়া
সব পাওয়া
শেষ করে তারপর
অসমাপ্ত হিসাবের খাতা খুলে
ছেড়ে যান এই ইহধাম।
২.
সৈয়দ হকের অনুবাদ কবিতাসমগ্র
পড়তে পড়তে কেন জানি
নিজেকেই বলতে ইচ্ছে হয়
আমি কোনো হক নই, অন্য এক হকের সন্তান।
সবাই বলেন
হক ভাই ছিলেন হিসেবী
বেশ মোটাসোটা তাঁর জীবনের খাতা।
আমার হিসাব বলে কিছু নাই,
জীবনের ছোট্ট খাতা–
ময়লায় আকীর্ণ, তাও আবার দু’এক পৃষ্ঠা
এই বুঝি শেষ হয়ে গেলো!

অনেক হয়েছে খেলা
রঙারঙি
সঙ্গে তার রঙবাজি,
আর কিছু
ভুল শব্দবাজি!
অনেক হয়েছে
আর কত–
কী লাভ হিসাব করে!
এই ভাবতে ভাবতে
ঘুমিয়ে পড়ার আগে
মনে পড়লো তোমাদের কথা,
হে আমার অদৃশ্য প্রেমিকাগণ!
তোমাদের কথাও ভুলি না
সঙ্গ দিয়ে গন্ধ যারা ছড়িয়েছে গোপন বাগানে
আর তোমাদের কথা মনে পড়তেই
শুরু হয় আমার নতুন যাত্রা :
মরু সাহারার পথ ছেড়ে
সুন্দরের পথে;
সুন্দরের স্বপ্ন ছাড়া
আমার সঞ্চয়ে অপরাহ্ণে
আর কোনো স্বপ্ন নেই;
সুন্দরের কুঞ্জ ছাড়া আর অন্য গন্তব্য দেখি না:
ছোট স্বপ্ন ছোট প্রেম
ছোট ছোট ভালোবাসা
কী সুন্দর ছোটর জীবন!
বোকারাম আমি কোন স্বর্গে আছি
এ জন্মে পাইনি যাকে
পরজন্মে তাকে নিয়ে সংসার কী করে পাতবো !
৩.
মনে পড়ে খুব প্রিয় শৈশবের কথা–
শৈশবের কথা মনে পড়লে
আমার অাক্রান্ত মনে
শৈশবের একমাত্র খেলাসঙ্গী
সমুদ্রের স্মৃতি ভেসে ওঠে।

সমুদ্র আমার ভিন্ন এক ডাক নাম;
এখনও ঘুমের মধ্যে
বহু দূর অসীমে দাঁড়িয়ে
আমাকে এ নামে কেউ কেউ ডাকে;
এইমাত্র পুনরায় সেই ডাক শুনে
আমি জেগে ওঠি
আমি এক পিতৃহীন যুবরাজ
জেগে উঠলাম
শূন্যতার রাজতন্ত্রে
রাজ্যভার হাতে নিয়ে;
আহা কতদিন পর
সহসা ঐ ডাক শুনে
আজ আমি পুনর্বার জেগে ওঠি :
তাকালাম চারিদিকে–
এখানে জীবন আছে তার কিন্তু কোনো গন্ধ নেই
যে জীবনে গন্ধ নেই তাকে আমি জীবন বলি না;
এই ইটপাথরের ময়লাকুঞ্জে
অন্ধের জীবন নিয়ে থাকতে থাকতে
প্রায় মৃত একটা নদীকে পাশে নিয়ে
গত রাতে প্রান্তহীন সীমান্তের দিকে
শুরু হয় আমার সমুদ্র যাত্রা ;
যেতে যেতে
অবশেষে জানা হলো
সমুদ্রের পাতা ছাড়া এ জীবনে
আর কোন পৃষ্ঠা নেই আমার হিসাবে।

তালিকাটি বেহেস্তে টাঙাবো
(সদ্য প্রয়াত আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি)
একটা জানাজা পড়া হচ্ছে
খােলা মাঠে
কাতারে কাতারে
আত্মীয় স্বজন প্রিয়জন
সবাই দাঁড়িয়ে আছে

ইমাম সাহেব জানাজা পড়ানো শেষে
মুনাজাত ধরলেন:
দু’হাত উপরে তুলে বললেন
প্রভু!
মউতের প্রেম ছাড়া অন্য ধর্মে খুব একটা
আসক্তি ছিল না;
আপনি মেহেরবান!
এ মহান প্রেমিকের
প্রেমটাকে কবুল করুন ( আমীন)।

জানাজার পর শোকাহত স্বজনেরা
মরদেহ কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে
যাত্রা করে কবরের দিকে,
পেছনে পেছনে হাঁটে একান্ত সুহৃদ ,
হাঁটে প্রেম
হাঁটে ভালোবাসা…

তারপর লাশটাকে কবরে নামানো হলো,
মাটির দুনিয়া ছেড়ে
মাটিতেই চলে যান কথার সম্রাট:
ভীতিকর গোরস্তানে নেমে আসে স্তব্ধ নীরবতা,
একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাকে শোনা গেল বিদায়সঙ্গীত।
দেখতে দেখতে
দিন যায় রাত্রি যায় বছর গড়ায়
কবরের সংখ্যা বাড়ে,শুধু
প্রেমিকের সংখ্যা কমে যায়
হঠাৎ কবর ফুঁড়ে
যে প্রেমিক মরে নাই তার কণ্ঠ ভেসে আসে:
রোজ হাশরের মাঠে গমনের আগে
সকল মউতের
গায়েবী জানাজা পড়া হবে মেঘের উঠোনে,
সেই জানাজায়
শুধু একজন ছাড়া
থাকবেন যারা
দয়া করে নাম দিন–
তালিকাটি বেহেস্তে টাঙাবো।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.