অনুবাদ কবিতা

হাইমে সাবিনেস-এর কবিতা: আদম ও হাওয়া

জয়া চৌধুরী | 12 Jun , 2019  


কবি পরিচিতি: জন্ম ১৯২৬ সালে, মেক্সিকোর চিয়াপাস শহরে। গত শতকের জনপ্রিয় মেক্সিকান কবি। মেক্সিকোর এই কবি ১৯৪৯ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন, নাম ‘ঘন্টা’ বা ওরাল। তারপর অসংখ্য কবিতা গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। সারাজীবন তিনি মানুষের কথা লিখেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর লেখায় তিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শহুরে সাধারণ বিষয়আশয়। মায়ের মৃত্যুর আগে দীর্ঘ রোগে ভোগাও তাঁর মনে ছাপ ফেলে যায় এবং অবিস্মরণীয় কিছু কবিতা লেখেন তিনি। তাঁর বাবার মতোই তিনিও রাজনীতিবিদ ছিলেন। চিয়াপাস’র ডেপুটি ফেডেরালও ছিলেন কিছুদিন। তাঁর মৃত্যুর পরে মেক্সিকোর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরনেস্তো সেদিইয়ো তাঁকে মেক্সিকোর বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিরূপে উল্লেখ করেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৯৯ সালে মেক্সিকোতেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অনুবাদ—জয়া চৌধুরী


আমরা স্বর্গে আছি। স্বর্গে তো কখনো কিছু ঘটে না! হাওয়া উঠে পড়ো। আমার আদর পেয়েছে, ঘুম পেয়েছে, খিদে পেয়েছে… ভোর হয়েছিল?
দিনের আলো ফুটে গেছে; কিন্তু তারারা এখনও রয়ে গেছে। সূর্যদেব দূর থেকে আসছেন আমাদের দিকে, আর গাছপালাদের দ্রুত ছোটাতে শুরু করিয়েছেন আমাদের দিকেই। শোনো।
আমি তোমাকে কামড়াতে চাই। এসো। আমি নগ্ন, ভিজে নরম হয়ে আছি। তোমার গন্ধ পাচ্ছি।
ওর পাশে গিয়ে আদম ওকে কাছে টেনে নিল। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল ওরা খুব চওড়া একটা নদীর ভেতরে ডুবে আছে।
জল যেখানে খেলা করছে গ্রীবা ছুঁয়ে, ওরা হাসছিল আর সেই ফাঁকে ছোট ছোট মাছেরা ওদের পা কামড়ে দিচ্ছিল।

দেখেছ। গাছেরা কীভাবে বড় হয়ে ওঠে? যে জায়গায় বীজ পড়ে জল সেখানটায় নাড়া দেয়: এই জলই তাকে অঙ্কুরিত করে, সূর্য ওঠেন। শাখায়, কান্ডে, বাতাস পর্যন্ত উঠে যায় জল।
তুমি যেমন মাঝদুপুর পর্যন্ত আকাশটাকে দেখতে থাকো, আর তোমার চোখদুটো উবে যেতে থাকে?
দিন দিন গাছেরা বেড়ে ওঠে। পৃথিবী বাড়তে থাকে; নরম হতে থাকে, সবুজ হতে থাকে, নমনীয় হতে থাকে। মাঠের ঢিপিতে ছাতা পড়তে থাকে। কলঙ্কিত বৃক্ষে পড়ে খড়ি, ওরা পড়ে যায়, ফিরে আসে। তুমি কি দেখেছ? ঋতু বেয়ে গাছেরা হেঁটে আসে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নয়: এক মুহূর্ত থেকে অন্য মুহূর্তে।
মাঠের ওপর তুমি যখন নিজেকে বিছিয়ে দেবে, ওর বুকে মুখ রাখবে আর তোমার চুল শেকড়ের মত মাটি ফুঁড়ে যাবে। তোমার পুরো শরীরটা দেখা যাবে পড়ে থাকা ডালের মত, তখন তুমি একথা অনুভব করতে পারবে। – আমি নদীতে প্রোথিত করতে চাই একটি বীজ, দেখি যদি কোন ভাসমান গাছ তাতে বেড়ে ওঠে আর আমায় তাতে চড়ে খেলতে দেয়। তার পাতায় মাছেরা খেলা করবে, আর সেটা এমন এক জলগাছ হবে যেটা একটুও না পড়ে সব জায়গায় চলে যাবে।

গতকালের রাতটা ছিল ইন্দ্রজালের মত। রাতের বেলায় ডঙ্কা বাজে আর জন্তুজানোয়ারেরা চোখ খোলা সজাগ নাকে ঘুমোয়। বাতাসে কেউ থাকে না। পালকেরা পাতারা জড় হয় গাছের ডালে, মাটিতে । কেউ কেউ আবার নড়ে ওঠে কিংবা কখনো কখনো পড়েও যায়। কালো বস্তা, কালো কন্ঠ, ভেসে বেড়ায় ভারী কালো নিস্তব্ধতা, হামাগুড়ি দেয়, আর পৃথিবী মুখব্যাদান করে তারাদের দিকে চেয়ে।
ভয় যখন ওদের পাশ দিয়ে যায়, বুকে ধাক্কা লাগে সজোরে, আর চোখেরা উপদেশ দেয় যাতে সব জিনিষ অনন্তকাল ধরে তার নিজের জায়গাতেই ঘুরপাক খেতে থাকে। চোখদুটো খোলা রেখে রাতে কেউ একটা পাও রাখতে পারে না। রাতের ঘনত্বে যে পা বাড়ায় সে হারিয়ে যায়। ছায়া ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপরে, ওর সম্পর্কে আমরা কেউ জানতে পারব না, ঠিক যেমন সমুদ্র যাদের কুড়িয়ে রাখে তাদের কথা আমরা জানতে পারি না- হাওয়া- আদম তাকে ধীরে ধীরে বলল- আমরা আলাদা হব না।

গতকাল আমি পশুদের লক্ষ্য করছিলাম, আর চকিতে মনে পড়ে গেল তোমার কথা । মাদীগুলো বেশি কোমল, বেশি মসৃণ, বেশি বিপজ্জনক। পুরুষদের ক্ষতি করতে চেয়ে এগোনোর আগেই তারা পরাস্ত হয়, পালিয়ে যায়। কেন? সেটা আমি তোমার মধ্যেও দেখেছি। আমি যখন শান্ত হয়ে থাকি তোমাকে পায়রার মত জ্বালিয়ে দিই। আসলে তবে কি তোমার আর আমার রক্ত ভিন্ন সময়ে জ্বলে ওঠে?
এখন যখন তুমি ঘুমিয়ে আছো, আমাকে তোমার উত্তর দিতেই হবে তোমার শ্বাসের ওঠাপড়া শান্ত, তোমার মুখ প্রস্ফুটিত আর ঠোঁট উন্মুক্ত। কোন শোচনা কিংবা হাসি ছাড়াই তুমি এটা বলতে পারবে।
আমরা কি আলাদা? ওরা তোমায় এটা করেনি? যাকগে আমার তরফ থেকেও কি আমি তোমায় ব্যথা দিই নি?
আমি যখন তোমার ভেতরে থাকি তা আমায় ক্ষুদ্র করে দেয়, তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো, আমায় মুড়ে রাখো তুমি এবং নিজেই বন্দী হয়ে যাও, পতঙ্গ যেমন ফুলকে ঘিরে রাখে। আমি সেটা জানি। আমরা জানি তো। মেয়েরা অবশ্য সবসময় যে কোন দিক থেকেই বড় হয়। আমরা নিজেদের উদ্ধার করি মৃত্যু থেকে। কেন? প্রতিটি রাত আমাদের বাঁচায়। আমাদের বাহুর ভেতরে আমরা একসঙ্গে থাকি আর আমি জাগতে শুরু করি… দিন যেমন করে জেগে ওঠে।
তোমাকে খুঁজতে গিয়ে আমায় হাঁটতেই হয় কিছুটা। তোমার কিছুটা অংশ আমার থাক আর যাতে কখনো আমাকে তোমার তা দিতে না হয়।
আমরা আলাদা হয়েছিলাম কেন? তুমি আমায় হাঁটতে দাও না, দেখতে পাও না। ঠিক যেন ত্রিনয়নী তুমি। আমার যেন অন্য একটা পা ছিল যা কেবল আমিই জানি।


1 Response

  1. সামিহা says:

    আদম-হাওয়ার প্রেমাখ্যান দারুণ হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.