গল্প

ঈদের গল্প: লাস ভেগাসের টম টম সুন্দরী

দিলরুবা আহমেদ | 4 Jun , 2019  


জামিনী বেগমের ধারণা ছিল প্লেন থেকে নেমেই দেখবেন চারদিকে সব উদোম গায়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষজন। তাই তিনি খুবই সংকোচবোধ করছিলেন। লজ্জা অনেকেরই না থাকতে পারে। কিন্তু তার নিজের তো তা আছেই। বরের সাথে আসলে তাও কথা ছিল। এসেছেন ছেলের সাথে। সাথে বড় একটা কালো রংয়ের সানগ্লাসও এনেছেন, চোখ ডেকে রাখবেন বলে। কোন দিকে চাইছেন তিনি, কেউ তা বুঝতে পারবে না। লাস ভেগাস বলে কথা। রাস্তায় রাস্তায় নাকি উলঙ্গ ছবি আর মানুষজন। টগরের মা বলেছেন কথাটা। অবশ্য ছেলেকে কথাটা বলেননি তিনি। বলতে আসলে পারেননি। জানে বললেই ছেলে বলতো, ঐ অশিক্ষিত মহিলার কথা তুমি কেন শুনো! তবে টগরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। টগর চোখ কপালে তুলে বলেছে, জানি না তো, আই নেভার ওয়েন্ট দেয়ার, টাকা ছাড়া উলঙ্গ দেখে ফেলবেন রাস্তা ঘাটে অতটা তো সম্ভব নয়! নিজেও তিনি ভেবেছেন, দিগম্বর সাধু সন্ন্যাসী পুরুষ দেখেছেন দেশে পথে ঘাটে, কখনও সখনও। পাগল তারা। তাদেরকে দেখতে তো একরকম ভয়ই লাগতো। জঠাধারী চুল। ময়লা হাতে পায়ে। কিন্তু এখানে তো হবে সব ফকফকা সুন্দরী। সাদা ধবধবে। আবার মেয়ে। তওবাস্তুকুল্লা। নেভার। নেভার। ভুল করেও তাকাবেন না তিনি সেদিকে। কিন্তু এদের দেখা যাবে পথে ঘাটে তা সম্ভবই তো না হবার কথা। কিন্তু হয় বলেই নাকি ওটাতে মানুষ যায় ছুটে ছুটে। টগরের মা তো তাই বলেছে। টগর বলেছে একেবারেই ভুয়া মিথ্যা কথা, ভুল ধারনা। ওটা একটা ফেমাস টুরিস্ট সিটি। মোজাভে নামের মরুভূমির মাঝখানে প্রচুর জাকজমক সাজসজ্জা আলো বাতি নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। হিউজ ঠাউস সাইজের ক্যাসিনো আছে। বিশাল। জুয়া খেলতে যায় মানুষ। মদ গিলে আর যে বিয়ে কোথাও করতে পারবে না তাও ওখানে করতে পারে তাই অনেকেই ছুটে যায় বিয়ে করতে। ফান টাইম এর জন্য স্বর্গ ওটা। এখন সেই মহা ধামাকাওয়ালা শহরে সে এসে দাড়িয়ে রয়েছে। একা। টগর বলেছে পরের সপ্তাহে সে তার মা আর দুই ভাইকে নিয়ে বেড়াতে আসবে। ততদিনে ছেলে যদি একটা বাসা নিয়ে নেয় তাহলে ওরা সবাই তার বাসাতেই থাকতে পারবে। আত্মীয় হতে হবে নাকি এক বাসায় থাকার জন্য। ডালাসে তো তারা প্রতিবেশী ছিল। উপরে নীচে এপার্টমেন্টে ছিল। অনেকদিনের পরিচয়। অনেক বলতে বছর খানিকও না অবশ্য। যখন আমেরিকার গ্রিনকার্ড হোলডার হয়ে প্রথম আসে, সেই ছয়মাস আগে,তখন ছেলের ডালাসের এপার্টমেন্টের ঠিক উপরের তলায় ছিল ওরা। সেই থেকে পরিচয়। তারপর থেকেই যোগাযোগ। প্রবাসে দেশী দেখলেই মনে হয় কত আপন। নিজের উদ্যোগেই তিনি টগরের বিয়ের জন্য ছেলে দেখে চলেছেন। টগরের বয়স হবে ৩২/৩৩ কিন্তু মনে হয় ৩৬, অনেক মোটা, তাই। মনে হয় না সহসা কমবে। ইচ্ছে আছে বলেও মনে হয় না। বেশ আছে আয়েসী জীবন নিয়ে। চাকুরী করে, খায় দায়, ঘুরে ফিরে। মা আর দুই ভাই নিয়ে মহা সমারোহে জীবন কাটাচ্ছে। অদ্ভূত টাইমে চাকুরী। বিকেল তিনটা থেকে রাতের বারোটা। তারপরে এসে বলতে গেলে রাতের তিনটা পর্যন্ত জেগে থাকে। ঔদিকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। বলেছে তাকে যে শহরে যাচ্ছ, তুমিও আমার মত রাত ভর জেগে থাকবে। দিনে ঘুম দেবে নাক ডেকে। ছেলের এই নতুন চাকুরীটা না পেলে আসাই হতো না এখানে। ছেলে অবশ্য দোটনায় ছিল আসবে কি আসবে না ভাবছিল। বলতে গেলে সেই জোর করেছে, ঢুকে পড়তে ,কোন একটা চাকুরীতে। ডালাসের এ্যাপার্টমেন্টে জিনিসপত্র সব রাখা আছে। ভাল না লাগলে ফিরে যাবে। ছেলের তাই ইচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ তিনি। ছেলের মতন এতটা বিদেশী হয়ে উঠেন নি যে এই ধরলাম চাকুরী আর এই ছাড়লাম। এই বদঅভ্যাস এখনও হয়ে উঠেনি। কত কষ্টে বাংলাদেশে মানুষ একটা চাকুরী পায়। কত ভালবেসে সেই কাজকে আকড়েও ধরে। এদের এই দেশে সেরকম কোন তরঙ্গ সে দেখে না। ধরলো আর ছাড়লো কাজ। ছেলে বলেছে এটা হচ্ছে ফুর্তির শহর। চল না হয় কটা দিন ঘুরে আসি। প্রথম দুই সপ্তাহ তো হোটেলেই থাকতে পারবো কোস্পানীর খরচে। তারপরে না হয় ফিরেই চলে আসবো। তোমারও একটা নতুন শহর দেখা হবে। মনটাও ঝরঝরে হয়ে উঠবে। তবে সে ভেবেছে ওখানে গিয়ে এমন নির্বান্ধব অচেনা শহরে কিভাবে মন ভাল হবে কে জানে! বিশাল দোকান ওয়ালমাটের চাকুরীটা পেয়েই গিয়েছিল অবশেষে। দু চার দিন করেও ছিল। ক্যাশিয়ারের কাজ। মানুষজন জিনিস নিয়ে এসে দাড়ায় সামনে। সে রিং করে পার করে দেয়। তার আগে ট্রেনিংও হয়েছে। কিন্তু ঐ আট ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকা এটা সম্ভব নয়। খুব কষ্টের। ছেলে তাই কাজটা করতে দিতে চায় নি। কাজের আওয়ার কমিয়ে নিয়ে সপ্তাহে দুদিন করবে ভেবেছিল। কিন্তু হলো কি, ছেলের কারনে এখানে চলে এলো। ছেলেকে একটু রাগ করে বলেছিল কথাটা, ছেলে হেসে বললো, এখানের ক্যাসিনোতে কাজ কর মা, দারুণ দারুণ অভিজ্ঞতা হবে। শুনেও লজ্জা পেয়েছে। কী রকম একটা বাজে কথা। সে বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, সে কিনা করবে ক্যাসিওনোতে কাজ। তাও আবার এই বয়সে! ছেলের কোন কথা বাধেও না যেন মুখে। এদেশে থাকতে থাকতে এদের মতন হয়ে গেছে। বয়সও তো ছেলের কম হলো না! ৩৬। তারপরও বাদরামী গেল না। হাবজাব কাজ তো সে মোটেও করবে না। ওয়ালমেটের কাজটা শুধু সময় পার করতে নিয়েছিল। মানুষ দেখবে দোকানো সারাদিন। এদেশীয়দের সাথে পরিচয় হবে। এই পৃথিবীতে কত রকমের কত শত কোটি মানুষ। একটু না মিশলে হয়! লাসভেগাসে ওয়ালমাট আছে কি না খুজতে হবে। টগরকে জিজ্ঞেস করেছিল। বলেছে গুগলে চেক করে দেখ। ওয়ালমাটের এক সহকর্মীকেও জিজ্ঞেস করেছিল, সে বলেছে আমি কি ওয়াকিং ডিকশনারী নাকি যে সব জানাবো। ইন্টারনেটে গিয়ে দেখ। কেও কিছু জানে না। সব জানে ঐ ইন্টারনেট। সেড। ভেরী সেড। যেদিন কোন কারণে ইন্টারননেট হ্যাং হয়ে যাবে বা ফ্রোজেন সেদিন সবাই বুঝবে মজা। নিজের মাথায় কিছুই ঢুকায় না। সব জমা রাখে মহকাশে, শূন্যে। ছেলে বলে, সব কিছু ডটের উপর। কানেক্ট দি ডটস। স্টীফ জব এর নাকি কথা। ছেলে নাকি কোন ডটের যোগাযোগ করতে পারছে না। বৌটা সেই যে হাওয়া হলো আর দেখা নেই। বলেছিল ডিভোর্স শেষ করবে সহসা। তাতেও অগ্রগতি নেই। জানেও না এই বিদেশীনী পেটে বেবী নিয়ে কোথায় কিভাবে আছে, কেমন আছে, ঝগড়া করে সেই যে একরাতে চলে গেল তারপরে নিখোঁজ। আলিমুল গায়েব। উনি থাকলে মোটেও চলে যেতে দিতেন না, ধরে রাখতেন। কিন্তু ছেলে বলেছে এত সহজ না এ যুগের মেয়েদের তাও আবার এই আমেরিকায় আমেরিকান বৌ ধরে রাখা। মন মর্জি মতন না হলেই আলবিদা। এতই কি সহজ সব কিছু!! যাই হোক লাস ভেগাসের এই জমজমাঠ ভাবটা ছেলেটার মনে একটু শান্তি এনে দিতে পারলেই হয়। তাতেই তিনি খুশী। এ্যাপারপোর্টে নেমেই মনে হয়েছে কি সুন্দর চারদিক। ফ্লোর থেকেও ঠিকরে আলো বের হচ্ছে যেন। খেয়াল করতে দেখেছে কালো গ্নানাইড দিয়ে ফ্লোরটা বানানো। তাতে প্রচুর গ্লিটারস বসানো। বিশাল বিশাল বুেথও চারদিকে ক্যাসিনো বসানো। প্লেন থেকে নেমেই জুয়া খেলতে বসে যাও। হোটেলে ঢুকে তো আরো অবাক, নিচের ফ্লোরটা এদিক ওদিক পুরোটাই ক্যাসিনো। ছেলে বলেছে সব হোটেলই এরকম এখানে। ক্যাসিনোতে ভরা মাঠ ঘাট পথ যেন। একেকটা হোটেল দুনিয়ার একেক শহরের আদলে তৈরি। প্যারিস ভেনাস থেকে শুরু করে মিশরের পিরামিড আর আইফেল টাওয়ার হয়ে নিউ ইয়কর্ , সব, সবই চারদিকে বানানো। দুনিয়ার ছোটখাট একটা মডেল যেন। উঠেছে লাকজোর নামের হোটেলে, মনে হয়েছে বাহির থেকে এই বুঝি ঢ়ুকে পড়লো মিশরের পিরামিডের ভেতর। হোটেলের একদম চূড়ায় কোটি পাওয়ারের এক টচর্ লাইট যেন বসানো। কি দ্যূতি তার। সেই আলো রাতের কালো আকাশে আলো ছুড়ছে এমন ভাবে যেন হারিয়ে যাওয়া সব নিহারিকারা পথ খুজে পায়। হোটেলের বা রাস্তার সিডিগুলোতে উঠে দাড়লেই হয়, চলে, অনেক পথও তাই, উঠে দাড়ালেই চলতে শুরু করে। ছোট ছোট ট্রেন আছে। শাটল ট্রেন। এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে যাবার জন্য, এটা নির্দিষ্ট কিছু হোটেলের মাঝে সীমাবদ্ধ। আসতে না আসতেই ছেলে অনেক কিছু চারদিকে তাকে দেখিয়ে এনেছে। পাচতলা সমান বিশাল এক কোকের বোতল দেখে সে খুবই মুগ্ধ হয়েছে। ছেলে সারাক্ষণই তাকে ব্যস্ত রাখছে। নিজেও থাকছে ব্যতিব্যস্ত। সারাক্ষণ করছে কিছু বা ঘুরছে। একবারও তোলে না বৌয়ের কথা। ভুলতে ব্যস্ত। যেন ছিলই না কেউ। এত চুপ ঐ ব্যাপারে যে মাঝে মাঝে তার নিজেরই ভয় লাগে। নিজের থেকেই খুচিয়ে জিজ্ঞেস করে, বিয়ের আগে কতদিনের পরিচয় ইত্যাদি। ছেলে মাঝে মাঝে বলে, যেটা শেষ সেটার শুরুটা কিভাবে কেন মনে করাতে চাচ্ছো। যেন সেই দোষী। আবার সে নিজে দেশে চলে যেতে চাইলে বলবে, এই অবস্থায় আমাকে রেখে যেতে চাইছো। আরে বাবা, বলোও তো না কিছু মনের কথা। থাক চুপচাপ মুখে সেলাই, আবার ঐদিকে যেতে চাইলেই দেশী কায়দায় কাদতে বস। ভাবখানা ঐ আর কি, কেদে সাগর বানিয়ে দেবে। বলেছেও তুমি চলে গেলে এত কাদবো যে এই মরুভূমি উর্বরা হয়ে যাবে। বলে হেসেছে। বুঝেছে এটাও বাদরামী। তবে চারদিকটা মরুভূমিই। বিশাল বিশাল ক্যাকটাসের গাছও আছে। যশোয়া বৃক্ষ। এটা যে এত বড় হতে পারে জানতো না ,না দেখলে। দেশে দেখেছে এক বিঘা লম্বা। এখন দেখছে দুই মানুষ সমান লম্বা আর তিন মানুষ সমান পাশে। ছেলে অবশ্য বলেছে দুই মানুষ তিন মানুষ এসব হিসাব বাদ দিতে। চিকনা মানুষ ও অবিস মানুষ কত রকমের ফিগার আছে। দুই মানুষ তিন মানুষ দিয়ে কি বুিঝবে কে ! আজ সকালে এ্যায়ারপোর্টে নেমেই যে উবারে করে এসেছে হোটেলে তার ড্রাইভার ছিল একটা মেয়ে। সে ছিল এত শুকনা যে টগরের তিন ভাগের এক ভাগ। ছেলে বলেছে টগরের তিন মানুষ আর ঐ উবার ড্রাইভারের তিন মানুষ কি সমান হলো। যাই হোক ছেলে তো আছে শুধু তাকে আপডেট করার তালে। যেন বাংলাদেশ থেকে সে সব প্রাচীন কিছু শিখে এসেছে এবং ছেলে তাই তাকে প্রতি নিয়ত আপডেট করছে। প্লেনে বসেই বলেছে এই শহরে বাঙালি খুজতে যেও না। পাবে না। জামিনী বেগম শুনে শুধু নিরবে হেসেছিলেন। কারণ টগর ইতিমধ্যে তার দুজন ফেইসবুক বন্ধুর ফ্রেন্ড সাজেশন পাঠায়েছে যারা এই শহরের বাসিন্দা, বাঙালি। জানেনও এই শহরের ৬% বাসিন্দা এশিয়ান,তার ভেতর বাঙালি অবশ্যই আছে। ছেলেকে আর তা বললো না। বললেই বলবে, আসতে না আসতেই দেশীদের সব খবর সাথে করে নিয়ে এসেছো। ছেলে বটে একটা। মোটেও তো মনে হয় না তার যে, ছেলে দেশীদের অপছন্দ করে অথচ ভাবখানা সে ওদের থেকে দূরে থাকতে চায়। সব ঐ বিদেশী বউটার কারনে। সে-ই-ই ছেলেটাকে এমন পরদেশী বানিয়ে ফেলেছে। বানিয়ে আবার ফেলে গেছে। না এখন ছেলে দেশী না বিদেশী। না ঘরকা না ঘাটকা। রুমে ঢুকেই ছেলে বললো, চল মা, আমরা বালাজিও- তে গিয়ে ডিনার করে আসি। ওই হোটেলের সামনে অনেক ফোয়ারা আছে। ফোয়ারা ডান্স করে, ওশান ইলেভেন মুভিতে দেখেছো। দূর্দান্ত। রেন্ট করা গাডীটাও নিয়ে আসবো। এক মাসের জন্য একটা গাড়ী রেন্ট করেছি। ভাবছি একমাস এই হোটেলেই থাকবো। বাসা নেব না। তারপরে অন্য কোথাও চলে যাব। জামিনী বেগম অবাক হয়ে বললেন, আমার কি যাযাবর নাকি। ছেলেও সাথে সাথে বললো, আমার পাখী। উড়বো। কি ক্ষতি তাতে। আর না হলে ডালাসেই ফিরে যাব। জামিনী বেগম বড় একটা শাল জড়িয়ে বেরিয়ে আসলেন। ডালাসের কথা শুনেই পরান পুরে উঠলো। ছিলেনই বা কদিন তারপরও ওটা ছিল তার পোর্ট অব এনট্রি। এই মহাদেশে থাকার শুরুটা ঐ শহর থেকে শুরু। ওখানে বন্ধু বান্ধব হয়েছে। চাকুরী হয়েছে। একটা এ্যাপাটমেন্টে তাদের অনেক স্মৃতি জমেছে। হোটেলের লবিতেও প্রচুর মানুষ। কতজন কত ধরনের টিকেট বিক্রির জন্য ধরছে। এই শো ঐ শো। আশ্চর্য্য পুরা দেখতে লুসির মতন সাজ করে একটা মেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই সাদা কালো যুগের বিখ্যাত মুভীর ‘লুসি’, যার আসল নাম ছিল লুসিলি বল॥ সেই লুসির বয়স এখন ৮০/৯০ তো হবেই , তাহলে এ কে ? ছেলে হেসে বললো, এটা ভেক। ফেইক। সেই লুসি মারাই গেছে আজ থেকে ৩০ বছর আগে, ১৯৮৯ এ। এই ধরনের প্রচুর রেপলিকা দেখতে পাবে। কেউ লুসি, কেউ ওয়ান্ডার ওমেন, কেও বায়োনিক ওয়ামেন হয়ে ঘুরছে। টাকা দিলে ওরা ছবি তুলবে তোমার সাথে। স্টিপ এর এই রাস্তাতেই ওদের প্রচুর দেখবে। আরো বললো, মা, নেভাডা রাজ্যের এই মেইন স্টীপের উপরই সব ভাল ভাল ফেমাস হোটেল। তারপর এদিক ওদিক দূর কাছে বহু হোটেল আছে। সারকাস নামে একটা হোটেল আছে যেখানে যাদের বেবী আছে তারা বেশী থাকতে চায়। কারণ সারাক্ষণ সাকাস হচ্ছে ওখানে। এক্কেবারে ঝলমলে। তবে পুরাতন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ও একটা হোটেল আছে, নাম দি ট্রাম্প। দি ভেনিস হোটেলে গেলে গল্ডোলাও চড়তে পারবে। দেখতে দেখতে প্রথম একমাস দিব্যি চলে যাবে, কি বল , পারবে না পার করতে! ছেলে যেন তাকে নিয়ে বেশ চিন্তায় আছে। বললোও, হোটেলই থাকবো তাহলে রান্না বান্নারও চিন্তা নেই। হেসে বললেন, আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না ,বলে ছেলের হাত ধরে হাটতে লাগলেন। ছেলে বললো, ও-কে, নো সমস্যা ,ওটা তো মায়েদের অধিকারের ভেতর, সব ভাবনা যেন শুধু তাদের,মায়েদের। রাস্তার এক জায়গায় বানর আর মানুষ নাচছে। তাই দেখতে বসিয়ে দিয়ে ছেলে গেল আইসক্রিম আনতে। নাচনেওয়ালীদের দলে শেষে যোগ হলো ঘোড়ার গাড়ীতে চড়ে এসে একেবারে অর্ধউলঙ্গ বা বিবস্ত্র এক মেয়ে। বাদমী রং। হয় ইন্ডিয়ান নয় নেপালী হবে। কি নাচ বাপরে। সবাই খুব খুশী। শিশ দিচ্ছে। পয়সা ছুড়ছে। বেশরম মেয়ে এক্কেবারেই শরমহীন। ছেলে আসার আগেই এই মেয়ে চলে গেলে ভাল। সাদাদের অর্ধউলঙ্গ চলাফেরা দেখতে তার খুব খারাপ লাগে না,যে দেশে যেমন। কিন্তু কেন যেন উপমহাদেশীয়দের এরকম কাপড় ছাড়া অবস্থায় দেখলে নিজেরই লজ্জা লাগে। আশ্চর্য মেয়েটা আসছে তার দিকেই। বসবে কি তার পাশে। তাই তো হচ্ছে। তার দিকে চেয়ে হাসছেও। তার হাসতে ইচ্ছে করছে না। তারপরও ভদ্রতা। কি আর করা,হাসলো। অনেকে ডাকছে তাকে ছবি তুলতে। পয়সা দিয়ে ছবি তুলবে। সেদিকে না গিয়ে মেয়েটি তাকে ঘিরে আগ্রহী হচ্ছে। বলছে, : হ্যালো, আমি কি তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারি। তার সাথে এর আবার কি কথা। তারপরেও বললো, : সিউর, হোয়াই নট। : আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ! সারছে, এটা মেয়ে জানলো কিভাবে? বললো, ইয়েস। : আই এ্যাম টু। ওহ নোহ। হঠাৎ করেই মুখ থেকে বের হয়ে গেল। মেয়েটি হেসে ফেললো, বললো, যেহেতু আমি পথে পরে আছি তাই তুমি হয়তো ভাবছো এটা অসম্মান জনক তোমার দেশের জন্য, তাই না!! বারেক ওবামার বাবাও কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশ থেকে এসে এই দেশের এক সাদা মেয়েকে আমার বাবার মতনই মা করেছিলেন। সেই ছেলে কোথায় গেছে আর দেখ আমাকে, আমি কোথায় পরে আছি। সবার ভাগ্যে একই রকম ঘটনা ঘটে না। : ঠিক তাই। : আমার বাবা অবশ্য জানে না আমি জন্মেছি। বড় হয়েছি। কোন যোগাযোগ নেই। কখনো যাইনি ওইদেশে। এখানে পথে পথে নেচে নেচে রোজগার করি। জানলে হয়তোবা উনি ছুটে আসতেন আমাকে বেটার লাইফ দিতে। তোমার মতনই ওহ নো বলতেন আমার জীবন যাপন দেখে। : আমি সরি যদি তোমাকে আঘাত করে থাকি। তোমার মা কি কাজ করেন! উনি তোমাকে কিছু বলেন না! : এবারে আমি বলবো ,ওহ নো। উনি আসলে তার নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আর মা ভাবেন আমিও আমার বাবার মতন একটা ট্রাস। অপচয় মাত্র। বস্তাপচা কিছু। যেহেতু আমি বাবার মতন দেখতে হয়েছি তাই আমার মায়ের বা তার পরিবারের কেও আমাকে আপন ভাবে না। তোমাকে দেখে আমার হয়তোবা তাই আপন মনে হয়েছে। ভাবছিলাম তুমি ইংরেজী বুঝবে কি না। আমি তো তোমার ভাষা জানি না। মেয়েটির চোখে জল। কোন এক লোকের এক বসন্তের আনন্দ অযথাই কষ্ট করে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এই জীবনটিকে,মেয়েটিকে। কবে হবে প্রতিটি মানুষ সচেতন। নিজের ভুলের মাসুল অন্যের উপর চাপাবে না আর যেন কিছুতেই। এটা একটা জীবনের দায়িত্ব। লাসভেগাসে গেছে বা কোন রিসোটে, তাই বলে এত উল্লাস আর উন্মাদনায় কেন থাকবে যে ভুলে যাবে হয়তোবা রেখে যাচ্ছে এক ফোটা স্মৃতি যা কাদাবে কাউকে বাকীটা জীবন। : আমি ইন্টারনেটে খুজেছি আমার বাবাকে। ছবি দেখেছি। নামও জানি। কিন্তু মা বলেছে যেহেতু ওদের বিয়ে হয়নি সেহেতু আমার পরিচয় আমার বাবা লুকাতে চাইবে। তোমাদের দেশে কেও আমাকে মানবে না। জামিনী বেগম কিছুই বললেন না। শুধু হাত তুলে মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন। নিজেদের একটা মেয়ে হারিয়ে গেছে যেন কোথাও! এভাবে কতজন হারাচ্ছে কতখানে। কতজন পাচার হচ্ছে। চোখের আড়ালে যে পৃথিবী তাতে না জানি কত কি ঘটনা আছে অব্যক্ত হয়ে। জানতে চাইলেন। : নাম কি তোমার। : টমটম সুন্দরী বললে সবাই দেখিয়ে দেবে তোমাকে এই আমাকে, আমি কোথায় থাকি তাও! : টমটম। এ আবার কেমন নাম। : তুমি আমাকে একটা বাংলাদেশী নাম দিতে পার। ফুল বা কোন দেশী খেলার নাম দিতে পার। আমি খেলতে খুব ভালবাসী। : হা-ডু-ডু। বলেই অবাক হলো, এ কেমন নাম এলো মুখে। মেয়েটা খুশী হয়ে বললো, : হেই- দু- দু, নাইস নেইম। জামিনী বেগম তাড়াতাড়ি বললেন। না না দু দু মানে অন্য কিছু, থাক এ নাম বাদ, অন্য নাম দিচ্ছি। জবা। : ওকে জবা তাহলে। কিন্তু দু দু মানে কি? : কিছু না। বাদ দাও। আইসক্রিম হাতে ছেলে এগিয়ে আসছে দেখতে পাচ্ছেন। ছেলের সামনে না এই দুদু দেখানো মেয়ে বলে বসে দুদু কি! এ যে বাংলাদেশের মেয়ে এটা ছেলেকে বলতেও তার লজ্জা হবে। এ এখন তাড়াতাড়ি গেলেই যেন সে বাচে। একটু আগেই যে মায়াটা উঠে আসছিল হঠাৎ তা উড়ে গেল নিজের সম্মান রক্ষার্থে। মেয়েটি হঠাৎ করে জানতে চাইলো, তোমার নাম কি? কেন যেন জামিনী বেগমের বলতে ইচ্ছে হলো না তার নিজের নাম। এ যদি গিয়ে আবার তার নিজের নামই রাখে জামিনী তাহলে কেন যেন তা জামিনী বেগমের পছন্দ হবে না। তাই শুধু বললেন বেগম। বলেই বাই বলে উঠে ছেলের দিকে হাটা দিলেন। বুঝতে পারছে মেয়েটা যতটা মায়া করে এগিয়ে এসেছিল সে ততটাই নিষ্ঠুরভাবে মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু ছেলেকে দেখা মাত্রই প্রথম কথা বললেন, আজই খুঁজে বের করতে হবে লিন্ডাকে, তোর বৌকে। আমি চাই না আমার নাতি বা নাতনী অচেনা সমাজ সংসারে কারো অনাদরে অবহেলায় বড় হোক। আজই খুজে বার কর। আজই । যেতে যেতে শুনছেন পেছনে মেয়েটি নাচছে। গাইছে কিস মি কিস মি। আপন মনেই ভাবেন ,কিইবা সে করতে পারে। সবার মতন সেও স্বার্থপর। আপন নিবাসী। খুব ব্যতিক্রম কেও হলে হয়তো এগিয়ে যেত খোজ নিতে কোথায় কোন কোনে বসে আছে নিরবে বাংলাদেশী সেই বাবা। বা মেয়েটির ভাল থাকার জন্য কোন পদক্ষেপ নিত। কিন্তু মেয়েটি যে নেচে গেয়েই খুশী নেই তাইবা সে জানবে কোত্থেকে। যে যেভাবে বড় হয় সে তো সে ভাবেই ভাবে। একটা দীর্ঘশ^াস ফেলে পেছনে ফিরলেন তিনি। মেয়েটি ফলাইং কিস ছুেড় দিল। আহ মরন, মেয়েটি তার দিকে চেয়েই হাত নাড়ছে।
জামিনী বেগম কিছু বললেন না, ঝাপসা দেখছে,এক সময় দেখতেও আর পাচ্ছে না। হয়তোবা দুইদিন যেতেই মেয়েটাও তার মানসপট থেকে বিদায় হয়ে যাবে,ঘোড়ার গাড়ী টমটমে চড়ে টমটম সুন্দরীও বিদায় নেবে। কিন্তু যদি থেকে যায় তার মনের মাঝারে, চমকাবে কি মাঝে মধ্যে চকচকে এক ঘা হয়ে কিংবা কখনো কি ঘ্রান হয়ে জড়াবে আচলে!


4 Responses

  1. সামিহা says:

    সুন্দর

  2. Mina Rahman says:

    What an excellent story. Beautifully described the LasVegas. I am a great fan of Dilruba Ahmad’s write up . Write more and make us more happy .

  3. shekh Lohani says:

    বরাবরের মতন-ই অসাধারণ রচনাশৈলীর একটি গল্প । কি দারুন গাঁথুনি ।দুর্দান্ত ভাব প্রকাশ ।এতো ঝরঝরা লেখার গতি যে মনে হয় না সহসা আপনাকে কেও থামাতে পারবে ।এগিয়ে যান ।

  4. hridoy says:

    গল্পটা পড়ে ভাল লাগল বরাবরের মতই সুুন্দর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.