চিত্রকলা

অন্ধ বোর্হেসের একটা ড্রয়িং

মহসিন রাহুল | 29 May , 2019  


১.
হোর্হে লুইস বোর্হেস , অন্ধ হয়ে যাবার প্রায় ২০ বছর পর, নিউইয়র্কের এক বইয়ের দোকানে বসে একটা ড্রয়িং করেছিলেন। সকলেই জানেন, বোর্হেসকে প্রায় নয় লক্ষ বইয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এবং অন্ধতা ১৯৫৫ সালে মহান করুণাময় একই পত্রে লেখা আদেশে দান করেন ।
উপস্থিত সুধীগণের মিশ্র কৌতূহলের মধ্যে অবস্থিত অন্ধ বোর্হেস কলমে আঁকিবুকি করেন। কল্পনা করা যায় : চোখ বোজা , বৃদ্ধ ও ভুরু ঈষৎ ভাজকৃত বোর্হেস, কক্ষের নীরবতার মেটাফিজিকাল কয়েক মিনিট, হয়ত কালো স্যুট পরা, আঁকছেন, দর্শক কেউ খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না ঘটনাটা। ডানহাতে কলম ধরে বাম হাতে সেই কলম ঠেলে ঠেলে ড্রয়িংটা শেষ করেন বোর্হেস।
বোর্হেসের ম্যানুস্ক্রিপটসের মধ্যে এমন আরো কিছু ড্রয়িং পাওয়া যায় , যদিও চিত্রকর ছিলেন না বোর্হেস। শখের ড্রয়িং। কিন্তু দর্শক হিসাবে, আসুন, বিশেষভাবে নেই তাঁর এই ড্রয়িংটা।

অন্ধ বোর্হেসের করা ড্রয়িং

দেখে মনে হয় ওয়ান-লাইন ড্রয়িং,—– আঁকতে কলম সম্ভবত একবারও তুলতে চান নাই বোর্হেস ( বাইরের দু-একটা চিহ্ন বাদ দিলে)। ফলে, উল্লম্ব, তেড়ছা, সোজা, বাঁকা, কেঁপে-যাওয়া, অকম্পিত নানান উপায়ে ফিরে ফিরে যেন দুর্বোধ্য উদ্দেশ্যের দিকে গোলকধাধার মত গেছে রেখাগুলো।
বোর্হেস মোটেই সহজ বান্দা নন। এবং ড্রয়িংটা আর সরল ডুডলিং হিসাবে দেখার উপায় নাই প্রকৃত অর্থে। এই ড্রয়িংই বোর্হেস উলটে দেন, নিচে বোধহয় লিখেন ‘**NGLE WOOD ‘ । ১৯৭৬ সালে এভাবে উলটা করেই ছাপা হয়েছে দ্য প্যারিস রিভিউ পত্রিকায়:

গোলকধাঁধার ভক্ত বোর্হেসের এ-ও খেলা, বটেই , এবং এক ধরনের অবসেশন ।

এই ড্রয়িং এর প্রায় ১৫ বছর আগে, ১৯৬০ সালে, বোর্হেস লিখেন:

এক লোক পুরা দুনিয়া এঁকে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় । বছরের পর বছর ধরে তার আঁকা চলতে থাকে। সে ক্যানভাস ভরে তোলে বিভিন্ন এলাকা, রাজ্য, পর্বতমালা, সাগর, জাহাজ, দ্বীপমালা, মাছ, কক্ষ, যন্ত্রপাতি, তারকারাজি, ঘোড়া এবং মানুষের ছবিতে। জীবনভর এসব এঁকে, মৃত্যুর অব্যবহিত আগে লোকটা খেয়াল করে , অশেষ ধৈর্যে আঁকা তার রেখাগুলির ধাধাঁর মধ্যে ফুটে উঠেছে তার নিজেরই মুখের প্রতিকৃতি । ( ” A man sets out to draw the world. As the years go by, he peoples a space with images of provinces, kingdoms, mountains, bays, ships, islands, fishes, rooms, instruments, stars, horses, and individuals. A short time before he dies, he discovers that the patient labyrinth of lines traces the lineaments of his own face.”/ Jorge Luis Borges, Translated by Andrew Hurley)

এবার বোর্হেসের ওই ড্রয়িং-এ কয়েকটা রেখা হাইলাইট করে দেখা যাক:

[ মূল ড্রয়িং-এর উপর হাইলাইটগুলি বর্তমান লেখকের ]
এর সাথে, বোর্হেসের এই ফটোগ্রাফটিও আগ্রহীরা মিলিয়ে দেখতে পারেন :

২.
অন্ধ মানুষদের মগজের একটা অংশ ( ‘এরিয়া অফ স্টেরিওগনোসিস’, প্যারাইটাল লোবে অবস্থিত ) স্বাভাবিক দৃষ্টিসম্পন্ন লোকেদের চেয়ে বেশি বিকশিত হয়, স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন। এই অংশের কাজ : না দেখে, শুধু স্পর্শের মাধ্যমে বস্তু সনাক্ত করা। স্মৃতিক্ষমতার সাথেও সম্পর্কিত এর বিকাশ। অন্ধতা ও বিপুল পাঠ ও স্মৃতিক্ষমতার ভাগ্য নিয়েই আসেন বোর্হেস ।
কেননা, হোমো স্যাপিয়েন্সের বংশ কাগজের বইয়ের লাইব্রেরি, বইয়ে মুদ্রিত পরম্পরা ও জ্ঞান, মগজের কাঠামোর দৌড় ও গরীবিতা , পৃথিবীর মধ্যে চদুপ্রায় অবস্থানের হাস্যকরতা ভুলে যাবার আয়োজন করে তুলবে একদিন , —— আল্লাহতা’লা এবিষয় অগ্রেই সজাগ ছিলেন। সুতরাং উত্তরমানবদের কিংবা সাইবর্গদের( cyborg) সামনে অর্গানিক মানুষের মগজের স্নায়ুর আশ্চর্যতম উদাহরণ দু-একটা প্রয়োজন ছিল । মানব বংশে হোর্হে লুইস বোর্হেস, সম্ভবত, সেই আশ্চর্য।

সহায়ক সূত্র :
১. বোর্হেসের ড্রয়িংটির খোঁজ পাই www.openculture.com এর একটি পোস্টে , এবং www.lithub.com এর ( এমিলি টেম্পল ,আগস্ট ২০১৮ ) একটি রচনায় কিছু সহায়ক তথ্য পাই ।
২. Clinical Neuroanatomy, by Richard S. Snell, 7th edition
৩. Collected Ficciones of Jorge Luis Borges, Translated by Andrew Hurley.
৪. Res Media, Journal of Royal Medical Society, 1968. ( ‘Steriognosis’, by John B. Irving).


4 Responses

  1. Ronni Ahmmed says:

    সব শিল্পী নিজেকে আঁকে। …সবই সেলফ প্রোট্রেট …যখন অন্য কারো বা মরিচ বা ব্যাগ বা ধনিয়া বা শার্ট বা কুমির বা যাই আঁকুক গাড়ি -ঘোড়া সবই তার সেল্ফপোট্রেট। কারণ সবই গভীরভাবে সংযুক্ত। এবং এক…সবই ইলেক্ট্রন…..প্রোট্রন .. ওয়ান এক থেকে আসা আর একে মিলিয়ে যাওয়া ….শুন্য ও সংখ্যার মধ্যে দিয়ে আল্লাহকে .খোঁজা।

    • মহসিন রাহুল says:

      হ্যাঁ। সেখানে অবশ্য আর কথা থাকে না।

  2. Md.Mahfuzur Rahman says:

    আপনি দারুণ লিখেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.