সরল রেখা

শামীমা বিনতে রহমান | ৩০ মার্চ ২০০৯ ৬:২৯ অপরাহ্ন

আইসক্রিমটা খাওয়ার পর মনে হলো, মাথায় ছোট ছোট দুইটা চ্যাপ্টা পা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকা এক ঝাঁক চড়ুই ঠাস করে উড়া শুরু করলো। তিরু সামনে তাকালো। সামনে মোজাইকের ফ্লোরের ওপর একটা আলোর রম্বস। জানালা কাম ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে পড়া এই রম্বসাকৃতির সুরুজ বাতির বিকিরণটা তিরুর অনেক ভাল্লাগে। এই সময়টায়, মানে যখন সে সারাদিন বাসায় থাকে, সেই দিনের দুপুর সাড়ে তিনটার রোদ—তাকে আপ্লুত করে ফেলে। সে মাঝে-মধ্যে ডিভাইডার আর ফতুয়া খুলে সেই রম্বসের মধ্যে শুয়ে থাকে। আড় কাত হয়ে আর দেখতে আরো ভাল্লাগে তার বুকের পার ঘেঁষে, ক্রমশ নিচের দিকের শরীর, শরীরের কার্ভ লাইনে আলোর খেলা, একেবারে ছোট ছোট লোম জুড়ে আলোর বয়ে চলা। যেন করাতের খাঁজের ওপর দিয়া হেঁটে চলা একটা যুবক।

কোথায় প্রথম দেখা হয়েছিল মিতির সাথে? ইয়াপ! মনে পড়ছে। ডিপার্টমেন্টের পিকনিক প্রোগ্রামে মিতি ছিলো কার যেন গেস্ট। ওটা মনে নাই। কিন্তু বাস থেকে নেমে কুমিল্লা বার্ড এর প্রত্নতাত্ত্বিক অলিতে গলিতে ঘোরার সময় সে ফস করে একটা সিগারেট ধরায়। ওর ধরানোর মধ্যে একটা দারুণ ছেলে-ছেলে ব্যাপার ছিল, মানে মেয়েরা এরকম করে না সাধারণতঃ। কিন্তু ছেলেরা সাধারণতঃ যা করে, ও সেটা সেরকম সাধারণতঃ না কিন্তু অভিনবত্ব ফলায়ে করছে। তো মিতিকে ভাল্লাগবে না তো কারে ভাল্লাগবে? তিরু আবার রম্বস-শরীরের দিকে তাকালো। আজকে তার বাসায় থাকবার কথা না, কারণ আজকে তার রাশান কালচারাল সেন্টারে রবী বাবুর রাজা দেখতে যাবার কথা ছিল, সেখানে তওফিকের আসার কথা। নাটক শুরু হবার আগের দুই ঘণ্টা আড্ডা, কিছু চড়ুই চুমু হবার বিস্তর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই তার কেমন কেমন, ভাল্লাগেনা-ভাল্লাগেনা-ভাল্লাগেনা ফিলিং হইতেছিল। সে মোবাইল ফোন বন্ধ করে শুয়ে আছে। বাসায় এখন কেউ নাই। আজকে কারোই ডে অফ না। অফিসটা তিরুর দমবন্ধ লাগে। একদমই এনজয় করে না। এত ডিসিপ্লিন, এত মন খারাপ করা ডিপ্লোম্যাসি সহ্য করতে হয়! হাসি না আসলেও হাসতে হবে। বসদের ভালগার ম্যানারে, অধিক বোল্ডনেস দেখানো নারী সহকর্মীর পাশে দাঁড়ায়া তার মতো মেনে নেয়া হাসির সহযাত্রী হতে হয়। এসব কিছুই ভাল্লাগেনা মানতে তিরুর।

তিরুর আসলে কী ভাল্লাগে? এইটা খুব জটিল খুঁজে বের করা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভাল্লাগেনা শব্দটা শুনতে হয় তার রুমমেট আর বন্ধুদের। পল্লব বলছিল, তুই ভয়ানক নৈরাজ্যবাদী। তুই এনার্কিস্টদের মতো ভয়ানক এক্সট্রিমিস্ট মাঝে-মইদ্যে। স্ট্যাবলিশমেন্টের সাথে এডজাস্ট করা কিন্তু কোয়ালিটি। প্রফেশনে ভালো করতে চাইলে, এইটা তোমারে এডাপ্ট করতেই হবে। না চাইলে অন্য কথা।

আমি তো এডাপ্ট করতে চাই।

না, তুমি চাও না। চাইলে এতো অবজেকশন, এতো পেইন নিতা না। তোমার সাথে দেখা হইলেই কিছুক্ষণ পরই তোমার গলায় চাকরি নিয়া নানা গোলোযোগ শুনতে হয়। লাস্ট ফাইভ ইয়ারস্ ইটস হ্যাপেনিং। অ্যান্ড ভেরি স্যাড টু সে ইটস কন্টিনিউয়িং। তিরু, তুমি সিদ্ধান্ত নাও। তোমার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় হয়া গেছে কিন্তু।

কী সিদ্ধান্ত?

তুই চাকরি করবি নাকি নিজে নিজে একটা কিছু দাঁড় করানোর চেষ্টা করবি। অর ফ্রিল্যান্স।
ফ্রিল্যান্সেও একই প্রেসার।

না, ওইটায় প্রেসার রেগুলারের চাইতে কম।

* * *

পল্লব মাঝে-মধ্যে তিরুর সাথে গাইড অ্যান্ড ফিলজফার টাইপ আচরণ করে। ইউনিভার্সিটি থেকেই এই প্র্যাক্টিস চালু রাখছে সে। কথা নাই, বার্তা নাই। একদিন হুট করে স্রেফ বন্ধুত্বটাকে টার্ন দিয়া ভারি একটা আচরণের টানেলে চলে যায়। আজিব! রিয়্যালি আজিব এইটা। একটানা বল্লে তিরুর ভার-ভার লাগে, বাট এছাড়া রিক্সার তামাক-সিগারেটের লম্বা জার্নিতে এটা খুব এনজয়িংই মনে হয়।

মিতি সেই যে বার্ডের ভেতরকার প্রত্ন-ইটগুলিতে পিঠ ঠেকায়ে সিগারেট ধরাইছিল, সেটা তার সাথে প্রথম ভালোলাগা বিনিময়। এরপর রাতভর জার্নিতে ক্যাম্পাসে ফিরে এসে পরদিন দুপুরে ঘুম ভেঙে অনেক খুঁজছে তাকে। দেখা হয় নাই। হয়তো সে ঢাকায় চলে গেছিল। হয়তো বা না। ডিপার্টমেন্টে গিয়ে খুঁজলেও হতো। কিন্তু তিরুর ইচ্ছা হয় নাই। তবে স্যোশাল সায়েন্স হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে আগালেই সে একবার না একবার খোঁজার চোখ নিয়ে বাঁয়ে তাকাতো।

মিতি কখনোই জিন্স-ফতুয়া পরে না। অলওয়েজ সালোয়ার-কামিজ। আবার কামিজের নিচে কখনোই সে ব্রা পরবে না। ব্রা পরতে মিতির অস্বস্তি লাগে। মিতি সিগারেট খাবে, কিন্তু গাঁজা খাবে না। আর চুলের সাহস নাই ঘাড় থেকে নিচে নামার। মেয়েদের বিউটি বানানোর পার্লারে মরে গেলেও যাবে না। ছেলেদের পার্লারে চুল কাটবে। তবে চুল কাটার সময় সে একটা সিডেটিভ ট্যাবলেট খেয়ে নেয়। যাতে অস্থির না লাগে। একবার তিরু পল্লবকে খুঁজতে প্রান্তিক গেইটের ভেতর দিয়ে ঢুকে সব হোটেল, স্টেশনারি দোকান খুঁজে লাইনের মাথার দিককার সেলুন দোকানগুলির একটাতে গিয়া দেখে মিতি চোখ বন্ধ করে আছে। আর সেলুন মামা চুল কেটে দিতেছে। তিরু জিজ্ঞেস করলো, মামা কী ছাট?

মামা জবাব দেয়, বাটি ছাঁট।

মামা আমারেও এই ছাঁট দিয়া দেন।

মিতি চোখটা খুলে একটুখানি দাঁত বের হওয়াসহ মুচকি হাসি দিয়া বল্লো, মামা ওর চুল কাটবেন না।

তিরু অবাক হয়ে যায়। তখনো তাদের সম্পর্কটা আসলে দাঁড়ায় নাই। সে গোলাকৃতির চোখ রেখে বল্লো, তোমার সমস্যা কী? আমি কাটবোই।

শোনো তোমার চুলের সাইজটায় তোমাকে দারুণ লাগে। তোমার ফেইসটাও তো, খুবই ফটোজেনিক। কেউ বলে নাই তোমাকে?

মিতি যে তাকে খেয়াল করে বা করছে—এটা তিরু প্রথম খেয়াল করলো। মিতির কথা রাখায় তারা চা খেতে বের হলো সেলুন থেকে। চা খেতে খেতে মিতি বল্লো, শোনো বুদ্ধিই সৌন্দর্য। এটাই সুন্দর। তুমি পার্লারে গিয়া ভ্রূ প্লাক করলা, ফেসিয়াল-থ্রেডিং-ফেয়ার পালিশ—সবই করলা আর কথা-বার্তায়, আচরণে তোমার ভেতরে কেউ ডুবই দিতে পারলো না। তাইলে তো মানুষ তোমারে সাইড লাইনে বসায়া রাখবে সব সময়। তুমি সাইড লাইন থেকে মেইন বডিতে আইসা মাঝে মধ্যে পার্টিসিপেট করবা আবার তোমার আলাপ চালানোর অগভীরতার কারণে ফেরত যাবা আগের বসবাসে। এইটা কখনোই ফলো করো না। স্ট্যান্ডার্ডটাকে ভিন্ন জায়গায় সেট করো।

তিরু মন দিয়ে শুনতে শুনতে ডুব দিলো মিতির ভেতরে। এই শুরুটা আর্কিওলজিক্যাল এক্সক্যাভেশনের মতো। যতই খোঁড়ে, ততই ভেতরে নতুন কিছু আবিষ্কারের আসক্তির গভীর টান। এরপর থেকে তাদের সারাদিন এক সাথে ঘোরাঘুরি। একসাথে চলে। ক্লাস-ফ্লাস যে কই গেছে প্রথমদিককার মাসগুলির। ওরা প্রথম চুমু খায় হলের দোতলার লনে। তখন সন্ধ্যা ছিল। বাইরে আযান হচ্ছিল ক্যাম্পাসের মসজিদে। মাথার ওপরে ছিল খোলা আকাশ। চৈত্রের শুরুর দিকটাতে সন্ধ্যায়ও কুয়াশা জমে হলের পেছনের লেকটাতে। তিরুর ভীষণ অস্থির লাগতেছিল আর ভীষণ অন্যরকম লাগতেছিল। সে বার বার জাপটে ধরতেছিল মিতিকে। মিতি এমন ক্যানো! রুমে এসে মিতি তার স্তনে গোল গোল বৃত্ত আঁকতে আঁকতে বলেছিল, আই লাভ টু ডাই টু লিস্যন দ্য সাউন্ড। তিরু উন্মাতাল হয়ে উঠেছিল। তিরু উন্মাতাল হয়ে উঠতো সব সময়। ইভ্যেন, চাকরিতে জয়েন করার পর এক সাথে থাকার দিনগুলিতেও। যদিও তখন তার শরীরও বিভক্ত, মনও বিভক্ত, মননেও দুই ভাগ।

তিরু শুয়ে শুয়ে বাথরুমের আগের বাড়তি ড্রেসিং রুম অংশটাতে রাখা দৈনিক পত্রিকার ফুট তিনেক উচ্চতার স্তর দেখতেছিল। সে খেয়াল করলো ইংরেজি-বাংলা দৈনিকগুলোর মাঝখানে মাঝখানে কিছু সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন টাইপ পত্রিকা রাখা। চোখটা সেখান থেকে তুলে পায়ের বুড়া আঙুল ফলো করতে করতে উরুর কাছে আসতেই সে আবারো খেয়াল করলো, আলোর রম্বসটা খাটো হয়ে আসছে। একটু খানি নিচেও নেমে গেছে।

ফার্স্ট ইয়ার থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত চেপে রাখলেও বন্ধুদের কাছে, চাকরিতে জয়েন করার পর যখন সবাইকে জানায়ে তারা ইস্কাটনে বাসা নিলো, তখন কাছের বন্ধুদের জানাতে থাকলো তাদের সম্পর্কটা। আর সেই সময় তারা নিজেদের যৌথতাকে অ্যাড্রেস করতেছিল এইভাবে: উই আর লিভিং টুগ্যাদার। ইটস নট অনলি দ্য বেইজমেন্ট অব ফ্রেন্ডশিপ, মোর দ্যান লিনিয়ার লাভ। মিতি তখন অনেক সিরিয়াস। অফিস শেষ করেই বাসায় ফিরে আসে, একসঙ্গে সন্ধ্যায় চা বানায়া খায়। বেশিরভাগ সময় মিতিই রান্নার প্রেসার নেয়। তিরুর ইচ্ছা করতেছে না একটা কাজ করতে, এটা খুবই খেয়ালে রাখে মিতি। ঠিকাছে, ভাল্লাগতেছে না; ওকে। অপরাধাবোধসহ কাচুমাচু করার দরকার কী। লেইম এক্সকিউজের দরকার নাই। আমার যতক্ষণ খারাপ লাগবে না, ততক্ষণ আমার প্রেসার নিতে সমস্যা নাই—এইরকম আন্তরিক আচরণ করতো মিতি। এই সময়টায় সে হয়ে উঠেছিল অনেকটা স্যাক্রিফাইসিং। ছাড় দিতে ভাল্লাগতো। নিজেই স্পেইস তৈরি করতো, যাতে তিরু বোরড্ না হয়ে যায় সম্পর্ক নিয়ে। তিরু সন্ধ্যায় ফিরতেছে না, না ফিরুক। রাত ১১টায় আসতেছে, অসুবিধা কী? কোনো প্রকার প্রশ্নবোধক চোখও রাখতো না।

ওদের যৌথতার সংসারে বাঁধনহীন বাঁধন আছে বলেও ওরা গল্প করতো বন্ধুদের। এই গল্প অবশ্য মিতি’র রংপুর ক্যান্টনমেন্টের ভেতর পর্যন্ত যেমন পৌঁছাতো না, তেমনি তিরুর উত্তরার বাসা থেকেও খুব বেশি বিপত্তি তৈরি হয় নাই। মিতির লে. কর্নেল ডাক্তার মা শহরে নিজের একটা ব্যক্তিগত ক্লিনিক চালানো নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন আর বাবার সাথে দীর্ঘ সেপারেশন তাকে নিষেধের প্রশ্নে কখনোই আটকাতে হয় নাই। শৈশব-কৈশোর ভারতেশ্বরী হোমস এবং এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পুরোই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল পারিবারিক না থেকে। বছরে একবার বা দুই বছরে একবার বাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসে। টেলিফোনে বা ইন্টারনেট চ্যাটিংয়েই কথা সেরে যায় বড়াপিদের সঙ্গে। বাবার সঙ্গে মায়ের সেপারেশন তাকে এত বেশি পেইন দিতো যে বাবা প্রসঙ্গের আলোচনায় সে কখনোই বন্ধুদের সঙ্গে আগ্রহ দেখায় নাই। আবার অনাগ্রহটাও এমনভাবে প্রকাশ করতো যে, বাবার গল্প এড়িয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু মনে হতো না। এসময়টায় সে ইচ্ছা করেই মুখে একটা আনন্দের হাসি রেখে দিতো আর বাবাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করতো। ভুলেও অন্য বাবার গুণের সাথে নিজের বাবার কোনো বৈশিষ্ট্য/কোনো আদরের স্মৃতি শেয়ার করতো না। কেবল তিরুই ছিল এসব বেদনার একমাত্র শ্রোতা। মিতি বলতে বলতে কখনো কখনো চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়তো। তখন তার চোখ থাকতো অসম্ভব তীক্ষ আর বেদনাময়। ভীষণরকমের বেদনাময়। তামার মতো রং হয়ে যেত চোখের কর্ণিয়ার সাদা অংশ। সেসময়ে তিরুর একটুখানি চুলে হাত বুলিয়ে দেয়া মিতিকে সংযত, দুঃখ কাটিয়ে ওঠার স্থিতি দিতো।

এরকম একদিন মিতি তার তামাটে-কালো আর তীব্র ভাষাময় চোখ থেকে গড়ানো পানি মুছে, বাম হাতে নাকের একটা পাশ চেপে তিরুকে বলতে থাকলো: জানো তিরু! আমার মনে হয় আব্বু আম্মুকে অনেক বেশি ভালোবাসতো। অনেক বেশি ভালোবাসতো বলেই তারা একসঙ্গে থাকতে পারে নাই। আমার মনে হয় আব্বু এখনো আম্মুর জন্য অপেক্ষা করে।

ক্যানো এইটা মনে হয় তোমার? তুমি কি উল্টা করে ভাবতেছ না?

আমার মনে হয়। ক্যান জানি মনে হয়। আমার মনে হয় আব্বু আম্মুর একটা ফোনের জন্য ওয়েট করে। আমি তাকে ক্লাস এইট পর্যন্ত পাইছিলাম। আমি যখন ভ্যাকেশনে বাসায় আসতাম, কখনোই দেখি নাই তাদের ঝগড়া করতে। উল্টা এত কেয়ারিং মনে হতো আব্বুকে। আম্মু কেন যে সেপারেশনে গেল, আই নেভার ক্যান্ট গেইজ এনি থিং।

আমার মনে হয়, কোনো না কোনো একটা লিমিটেশনের জায়গা ছিলই। মানে, একটা গ্যাপ। সেই গ্যাপ নিয়েই হয়তো একসাথে থাকা শুরু করছিলো। ভাবছিলো বিয়ের পর, বাচ্চা-কাচ্চা হয়ে গেলে গ্যাপটা কমে যাবে বাট কমে নাই। এইটা একটা কজ হইতে পারে।
তিরুও গোল করে রাখা পায়ের ভাঁজ থেকে মাথা তুলে মিতি তিরুর চোখের দিকে তাকায়।

আচ্ছা গ্যাপ ছিলো মনে হলো ক্যান তোমার?

মনে হলো। মেইবি। মেইবি। নাও হতে পারে। ওঠো, মন খারাপ করার কিছু নাই এতো। সবাই তো আর রাইট-ম্যাচড্ হয় না। কষ্ট হলে মনে করো আমি আছি তোমার পাশে। আমি সব সময়ই তোমার সাথে সাথে আছি। ওঠো ওঠো। মুখ ধুয়ে আসো।

* * *

রম্বস আলোটা এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। বুড়া আঙুলের ডগার একটু নিচে এসে থেমেছে। তিরু মোবাইল সেটটার দিকে তাকালো। ওটা বাজতেছে না দেখে খুব হালকা লাগতে থাকলো। মনে হচ্ছে, মোবাইল না থাকাটা অনেক আরামের একটা ব্যাপার। খোলা থাকলেই অপেক্ষার চাপ থাকে। কথা বলার চাপ থাকে। বছর খানেক পর রিক্যাপ হচ্ছে আগের নয় বছর। মিতির সাথে থাকার ৬ বছরের মাথা থেকে অর্থাৎ চাকরিতে ঢোকার পরের বছরই তিরু যতই মিতির কাছ থেকে দূরে সময় কাটাতো, ততই তার ভাল্লাগতে থাকে বেশি। এ সময়টায় তিরু একটা গ্রুপের সাথে মেশা শুরু করলো, যারা একেবারেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক না। প্রফেশন বেইজড্। বিভিন্ন জন বিভিন্ন হাউজে কাজ করে, কিন্তু সন্ধ্যা হলেই তারা অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ক্যাফেতে বসে। রাত ৯টায় ক্যাফে বন্ধ হয়ে গেলে উল্টা দিকের চায়ের দোকানে আড্ডা চলতেই থাকে। এই আড্ডাতে ডিজিটাল মুভি বানানোর ভীষণ ঝড়। ডিজি ক্যামেরায় সিনেমা। দৈর্ঘ্য ছোট, দৈর্ঘ্য বড় যাই হোক। তিরুর খুব ভাল্লাগে এখানে বসে বসে অনেক রাত আড্ডা দিতে। ছবি বানানোর পরিকল্পনা মাথায় কাজ করতে থাকে। গল্পের প্লট, প্লট ছাড়া গল্প, শুধু প্লট, গল্প বলে কিছু নাই–এসব নানা কিছু নিয়ে আড্ডা তিরুর পায়ে দিন দিন আঠা বসিয়ে দিতেছিল তাড়া নিয়ে বাসায় ফিরে না যাবার। সে বুঝতে পারতেছিল, একটা আলগা আলগা কিছু হচ্ছে, হয়ে যাচ্ছে। মাস ছয়েকের মাথায় তিরুর কাছে পরিষ্কার হলো, এই মিতির ওপর আলগা অনুভূতির সাথে রাজনের প্রতি বেশি টান এর সম্পর্ক আছে। এক রাতে মিতিকে একটা প্লট বলতে গিয়ে তার মনে হলো মিতি কম্যুনিকেট করতে পারতেছে না। তিরু বলতে থাকলো,
ধরো, একটা মাছি, মাছিকে ফলো করা। কিছু পচা খাবার, ধরো পঁচা পাাউরুটি বা ফল রেখে দিবা একটা ঘরের ভেতর, সেরকম সময়ে যখন সূর্যের আলো মেঝের একপাশ জুড়ে থাকবে। আর খাবার থাকবে আলোর একপাশে। পড়ে থাকা আলোর খুব কাছে, যেন আলোর প্রতিসরণ গিয়ে একটা আভা তৈরি করে। এরপর ক্যামেরা রেখে দিবা। ক্যাজুয়্যেল শ্যুট। কাজ থাকবে জুম করার মধ্যে। ফিক্সড জুম, জুম ইন, জুম আউট এসব থাকবে।

মিতি আগ্রহ না দেখিয়ে শুনতে থাকলো। তিরু খুবই টান টান উজ্জ্বল চোখে বলতে থাকলো, শোনো এর মধ্যে মাছির ভন ভন শটটা বসানোর আগে আমি কী বসাতে চাই জানো? তোমাকে এডিটিং এর জায়গা থেকে বলতেছি। আমি জনসমাবেশে মানুষের অসংখ্য মাথার টপ শট ইউজ করবো। একটু শ্লো করে মুভি দিবো। আর সাউন্ড থাকবে ভন ভন। এই শটটার পরের শটটাই বিপুল মাছির আগমন। এখানে কোনো গল্প নাই কিন্তু। জাস্ট মাছিকে ফলো করা। বুঝতেছ?

তিরু বলতেছিল রেসপন্স পাওয়ার এমন ভাব নিয়ে যে, মিতি তাকে মাঝখান থেকে থামায়া বলবে, না এটা এইভাবে না, মাথার শট দিয়া শুধু শুধু ফিকশন মেইক করতেছ ক্যান? কিন্তু মিতি কিছুই বলে নাই। খুব মন দিয়া শুনছে বলেই মনে হয়। একটুও বেখেয়াল হয় নাই, তবে কেবল শুনেই গেছে।

তিরুর তখন প্রথমবারের মতো মনে হয়েছে এ জায়গায় রাজন থাকলে অনেক বেশি মজা হতো। অনেক বেশি ভাল্লাগতো আড্ডা দিয়ে। এই মনে হওয়াটাই, তিরুকে অন্য কিছু বুঝতে না দিয়ে ক্রমশই দখল করে ফেলছিল। আড্ডাগুলাতে তিরু যথাসম্ভব দ্রুত গতির দিনের বেগে অনেকের মাঝ থেকে রাজনকে তুলে নিয়ে সিঙ্গেল আড্ডা দেয়া শুরু করলো।

তিরু আলগা হতে থাকলো।

মিতির কিন্তু আলগা লাগতো না। তিরু মিথ্যা বলা শুরু করলো মিতির কাছে। কেন সে মিথ্যা বলা আরম্ভ করলো, এটা তিরু নিজেও বুঝতে পারে নাই, তখন। সে একদিন মিথ্যা বললো, সে চিটগং যাবে। শুটিং লোকেশন ঠিক করতে যাবে প্রোডাকশন টিমের সাথে। তিরু আসলে যাচ্ছিল সিলেটের জাফলংয়ে। রাজনের সঙ্গে বেড়াতে। প্রস্তাবটা তিরুরই ছিল। সে বলেছিল, চলো ঢাকার বাইরে যাই। সিলেট আর পঞ্চগড়ের মধ্যে টস করে সিলেট উঠলো। সে বেড়ানোর জায়গা সিলেকশনের এই পদ্ধতিটাতে অনেক মজা পেয়েছিল। মিতিকে সিলেট বললে, এমন কোনো ক্ষতি ছিল না। কারণ মিতি সেটা যাচাই করে নাই। করার কথাও না। তবু তিরু বলে নাই। কেন বলে নাই, ওই সময়ে ধরতেই পারে নাই। অবশ্য ধরার চেষ্টাও ছিল না তার। তিরু এভাবে আস্তে আস্তে রাজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত হয়ে পড়ে।

সিলেট থেকে ফিরে আসার পর তিরুর আলগা লাগা বোধটা আরো বাড়তে থাকে। সে বিছানায় এক সাথে ঘুমাতে গিয়ে কেমন যেন আরাম বোধ করে না। মিতিকে রোজ যেমন ধরে ঘুমাতো, তেমন ধরে ঘুমাতে তার ভাল্লাগে না। কোল বালিশ জড়িয়ে ধরে উল্টা দিকে পিঠ দিয়ে ঘুমায়। বেশি বেশি করে উত্তরায় যেতে থাকে। ইস্কাটনের বাসাটা অপশনাল হয়ে পড়ে। মিতির খুব একলা লাগতে থাকে। মিতি অপেক্ষা করতে থাকে। ভাবে তিরু একটু চঞ্চল, আস্তে করে ঠিক হয়ে আসবে। বেশ কিছু গ্যাপের পর একদিন রাতে; অনেক রাতের পর এক গল্পের রাতে, এক আনন্দের রাতে, এক আড্ডার রাতে তিরু অনেক প্রাণবন্ত ভাব নিয়ে গল্প করছিলো অনেক কিছু। তার নতুন বন্ধুদের গল্প। রাজনের সঙ্গের বেশ কিছু গল্প সে ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে বলতে থাকে মিতিকে। যাতে মিতি ধরতে না পারে রাজনকে একক কোনো ক্যারেক্টার হিসাবে। মিতি দেখছিল প্রত্যেকটি গল্প বলায় তিরু কেমন সাবলীল! অনেকদিন পর তিরু এমন সাবলীল। কিন্তু মিতি হঠাৎ প্রশ্ন করে, আচ্ছা রাজনকে তোর খুব ডেপেন্ড্যবল মনে হয়?

ন্-না, ওতো না। বাট বেশ এক্সাইটিং।

কী রকম?

ধরো, আমরা অলিয়ঁসের বাইরে যে আড্ডাটা দেই সেই আড্ডায় রাজন হুট করে এমন সব প্রপোজাল দেবে, সে, ঘুরাঘুরি—একজন বললো সিলেট যাবো। আরেকজন বললো সেন্টমার্টিন আর একজন বললো বান্দরবান আর রাজন বলবে পঞ্চগড়। ও বোঝানোর চেষ্টা করবে আনয়্যুজাল জায়গায় যাবার চার্মটা কেমন। আচ্ছা, তুমি ওই আড্ডায় যাইতে চাও না ক্যান?

তুমি তো আমাকে বলো নাই। ওইটা তো তোমার আড্ডা। তুমি আমার হোস্ট। না বললে, যাবো কী করে?

বললে যাবা?

যাবো।

ওকেই। কাল চলো। সন্ধ্যার পর। মানে ৮টা ৯টার দিকে। আমি ওখানেই থাকবো। তুমি চইলা আইসো।

* * *

পরদিন রাতে মিতি গিয়ে দেখলো, তিরু আর রাজন ছাড়া আর দুই তিনজন। যাদের কাউকেই মিতি চেনে না। সে বেশ কিছুক্ষণ একসাথে কাটাতে গিয়ে দেখলো তিরু রাজনের পাশাপাশি বসতেই বেশি আনন্দ পায়। মিতি যেন অনেকদিন পর দেখা হওয়া এক বন্ধু। কেবলই বন্ধু। মিতি প্রথমবারের মতো আলগা ফিল করতে থাকলো। ফেরার সময় রাজন তিরুকে আটকে রেখে কথা বললো অনেকক্ষণ। মিতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে একা, তিরু ফিরতে চাইলেই রাজন হাত ধরে রাখে। আর একটু পর বলে আবদার করতে থাকে সময়। মিতির নিজেকে বাড়তি মনে হতে থাকে। এখানে সে অপ্রয়োজনীয় এমন একটা কমপ্লেক্স, এখানে সে মিশতে পারছে না এমন এক অস্বস্তি, এখানে সে অযথাই এমন বোধ হতে থাকে। প্রায় মিনিট ১৫র মধ্যে মিতি ঘুরপাক খেতে থাকলো অস্থিরতায়। সে বার বার একটা দরজায় গিয়ে বাড়ি খেয়ে ফিরতেছে। কোনোভাবেই সে দরজা খুলছে না। সে বুঝতে পারতেছে না কী ভাবে এটা ওভারকাম করা যায়।

বাসায় ফিরে মিতি অস্থিরতা নিয়েই প্রশ্ন করলো, তিরু তুমি কি রাজনের প্রেমে পড়ছো?

তিরু অবাক হওয়ার মতো এক্সপ্রেশনের সঙ্গে খানিকটা সন্দেহ যোগ করে চোখ কুঁচকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলো, ‌’মানে কী?’

মানে কী? মানে সরাসরি হাঁ বা না বলবা। কোনো ব্যাখ্যা আমি শুনতে চাই না। তুমি হাঁ বা না একটা এনস্যর করবা।

রাজনের সঙ্গে প্রেম করবো কেনো?

তিরু তুমি একটা সিঙ্গেল এনস্যর সিলেক্ট করো।

তিরু খেয়াল করলো, মিতি অন্যরকম হয়ে উঠতেছে। ওর চোখ তামাটে হয়ে জ্বলে উঠতেছে। বাসায় ফিরে ড্রেস চেইঞ্জ না করেই মিতি তাকে প্রশ্ন করা শুরু করলো।

‘আমি পারবো না বলতে। আমার কাছে এরকম সরাসরি কোনো এনস্যর নাই। যেটা নাই সেটা বলার জন্য আমাকে প্রেসড্ করবা না।’ বলেই তিরু বাথরুমে ঢুকে গেল ড্রেস চেইঞ্জ করতে। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তিরু একই ড্রেসে বের হয়ে এসে বললো, ‘আমি উত্তরায় যাচ্ছি। আম্মু ফোন করছে।’

মিতি অপেক্ষায় বসে থাকবার পর এরকম কথা শুনে জ্বলে উঠলো। ‘না তুমি যেতে পারবা না। আমার সাথে কথা শেষ হবে, তারপর যাবা।’

মানে? আম্মু ফোন করছে! তোমার কোশ্চেন কালকে এনস্যর করবো। এখন ঝামেলা করবা না।

ঝামেলা! আমি অনেক ঝামেলা করবো। আমার শেষ কথা না শোনা পর্যন্ত তুমি কোথাও নড়বা না। কোথাও যেতে পারবা না। বসো এখানে।

তিরু প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হচ্ছে এমন ভাব এনে বললো, তোমার এই ক্রেজি ম্যানারস আমার পছন্দ না।

আমার অনেক কিছুই তোমার পছন্দ না। সেটা আমাকে বোঝানোর দরকার নাই। তুমি বলো, রাজনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কতটুক বন্ধুত্বের?

পুরোটাই বন্ধুত্বের।

কী রকম বন্ধুত্ব?

আরে? এখন তোমাকে কি আমি উদাহরণসহ বোঝাবো নাকি? আই এম ট্রান্সপারেন্ট লাইক এনিথিং।

‘ওহ! তিরু! তুমি সত্য বলো।’ মিতি হাত ঝাঁকাতে লাগলো। ওর মাথাও একই বেগে নড়তে থাকলো। ‘তুমি বলো, রাজনের সঙ্গে কোথায় কোথায় ডেইট করছো? কই কই গ্যাছো? কিচ্ছু লুকাবা না।’

তিরু প্রচণ্ড ক্ষিপ্ততা চোখে এনে বললো, ‘অনেকবার। অনেক জায়গায়।’

মানে?

মানে আমার রাজনকে ভাল্লাগে। অনেক ভাল্লাগে।

ওর সাথে সেক্স করছো কোথায়?

জাফলংয়ে। আরো অনেক জায়গায়।

‘তিরু!!!’ মিতি চিৎকার করতে থাকলো। সে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলো। ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে অন্ধকারকে এডজাস্ট করবার আগ পর্যন্ত চোখ যেমন সব কিছুই নিকষ অন্ধকার দেখে, মিতির কাছে চারপাশ সেরকম অন্ধকার মনে হচ্ছিল। মিতি তিরুতিরুতিরু করে কীসব চিৎকার করতেছিল, একটা লাথি দিয়ে প্লাইউডে বানানো ওয়াড্রোবের কাভার্ডটা ভেঙে ফেললো। তিরু ভয় পেতে থাকলো। মিতি একনাগাড়ে কাঁদতে থাকলো। চিৎকারের কান্না যখন ফোঁপানোতে টার্ন করলো মিতি আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কবে থেকে রাজনের সঙ্গে প্রেম করা শুরু করলা?’

আমি রাজনের সঙ্গে প্রেম করি না মিতি। কিন্তু ওকে আমার অনেক ভাল্লাগে।

অসম্ভব। অ্যাবসার্ড। তুমি এখনো লুকাইতেছো। তুমি আর লুকাবা না। তুমি আমাকে বলো রাজনের সঙ্গে প্রেম শুরুর আগে কি আমাকে বলা দরকার ছিলো না?

ও মিতি। বি কুল আমি রাজনের সঙ্গে প্রেম করি না। প্রেম করি নাই। আমি তো বলছি, এটা এম্নি রিলেশন।

মিতি সরাসরি তাকায় তিরুর চোখে। কিছুক্ষণ স্থির তাকায়া থেকে বললো, ‘তুমি এই ভাল্লাগা রিলেশনটা আমার কাছে লুকায়া রাখছিলা ক্যানো? আমাকে আড়াল করছো ক্যান? তার মানে আমাকে তুমি প্রব্লেম ভাবছো, তাই না? লুকাইছো ক্যান?’

লুকাই নাই। বলতে পারি নাই। আই নিড সাম টাইম। কজ ইটস অলসো অ্যানাদার স্পেশাল থিং ফর মি।

তিরু তুমি নানা ভান করছো। তুমি রাজনকে নিয়া সিলেট গ্যাছো, আমারে বলো নাই। তুমি রাজনের সঙ্গে সারাদিন ঘুইরা আইসা আমারে বলছো অন্যদের কথা। ক্যানো এত মিথ্যা বলছো? ক্যানো আড়াল করছো? আমার সাথে এত ডার্টি ডিসট্যান্স করলা?

আমি ডার্টি ডিসট্যান্স করি নাই।

চুপ! কোনো প্রকারে ডাইভার্ট করার চেষ্টা করবা না। তুমি ভয়ানক অপরাধ করছো। তুমি আমার বিশ্বাস ভাঙছো। তুমি আমাকে অনেক মিথ্যায় আটকায়া রাখছিলা লাস্ট ফিউ মানথস্। ও মাই গড! তিরু তিরু আমি ভাবতেই পারি নাই। বলে আবার প্লেট-গ্লাস ভাঙা শুরু করলো মিতি। একটা খুবই ভয়ানক অবস্থা। তিরুর মনে হইতেছিল কিছু গ্লাস যেন তার মাথায় ভাঙা হচ্ছে। সে কোনো প্রতিবাদ না করে খাটের এক কোনায় বসে থাকলো। মিতি আবার কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে থাকলো।

কী ভয়ানক সেই দৃশ্য। কী ভারি সেই দৃশ্য! তিরু ভাবতে গেলে এখনো পুরাটা বুঝতে পারে না, কেন সে এমন অচেনা করে রেখেছিল মিতির কাছে নিজেকে। কেন মিতির চাইতে রাজনকে বেশি ভাল্লাগতো। কেন সেই ভাল্লাগাটা মিতির সাথে শেয়ার করা যায় নাই।…

* * *

তিরু খেয়াল করলো রম্বস আলো তো নাই-ই। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সে ফ্লোর থেকে মাথা উঁচু করে বারান্দা দিয়ে পাশের একটা লম্বা আর ব্যাপক ডালপালা ছড়ানো আমাগাছটা দেখতে থাকলো। ওখানে পাতাগুলা আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। সে উঠে দাঁড়ালো। ড্রেস পরে মোবাইলটা অন করলো। বারান্দায় এসে দাঁড়ালো—নানা জানালায়, ভারি পর্দা গলে সাদা আর কিছু কিছু হলুদ আলো বের হচ্ছে—আর চারপাশটা নিলচে-কালো অন্ধকার। বাতাস আসছে। মিহি বাতাস। একটা অদ্ভুত আশ্রয় ভর করছে তিরুর পুরো শরীর এবং মন ঘিরে। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে থাকলো, অপেক্ষা ক্যামন? এই জীবনে কখনোই তাকে অপেক্ষার স্বাদ নিতে হয় নাই। মানে প্রেম জাতীয়, প্রেমজর জন্য অপেক্ষা। সব সময় সে-ই অপেক্ষায় রাখছে। আচ্ছা অপেক্ষা ক্যামন?

আচ্ছা মিতি কোথায় আছে এখন?

কার সাথে থাকে?

মিতি কি চলে গেছে কোথাও? নাকি ঢাকায়?

তিরুর মনে হতে থাকলো, সামনের আম গাছ, তার ওপরকার পাঁচতলা বাড়ির জলছাদ, এটা পার হয়ে দম-ইনোর অ্যাপার্টমেন্টের চূড়া গুড়িয়ে সমান করে একটা বিশাল, ইলেকট্রিকের পোলহীন, একটা বিশাল হাকালুকি হাওর শুয়ে পড়েছে। শীতকালের হাকালুকি হাওর। বিস্তৃত মাঠ, কিছুদূর মাঠের পর পর পেরিনিয়্যাল হাওর, জল টলোমল। ধারে ধারে অনেক শীতের পাখি। বক আর হাসজাতীয়। ওরা বসে থাকে, উড়ে যায়। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, কানে-কানে কথা বলে, হাগু করে আবার ডুবে থাকে প্রেমে, অপ্রেমেও। তিরুর মনে হতে থাকলো, মিতি একটা টিভিএস হান্ড্রেড মটর বাইক চালিয়ে চুলে বাতাস মাখতেছে আর তিরু পেছনে তাকে ঝাপটে ধরে বসে আছে। আর বলতেছে, এইবার ছাড়ো, মিতি! এইবার আমি চালাব। ছাড়ো! নেক্সট আবার তুমি। মিতির ভাবটা স্পষ্ট দেখেতে পাচ্ছে তিরু: ওর ভঙ্গিটা এমন, অনেক মজা পাচ্ছে এবং ছাড়বে ছাড়বে সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে।…।

নিজের অজান্তেই তার চোখ বিষণ্ন থেকে সচল হয়ে উঠতে থাকলো। একটু হেসে, ধুলাপড়া গ্রিলে মুখ রাখলো। বাতাসটা খুব ভাল্লাগতেছে। এত মিহি আর এত চিকন!

বেশ কিছুক্ষণ ধরে মোবাইল ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। রুমে এসে দেখে, অবধারিত নাম্বার।

‘… … … … … … … … … … … …’

‘তওফিক আমার শরীর ভালো না। আমি ঘুমাই গেছিলাম। এই একটু আগে উঠলাম।’

‘… … … … … … … … … … … …’

‘না। না, আর বাইরাবো না। বেশ কিছু প্রপোজাল রেডি করতে হবে।’

‘… … … … … … … … … … … …’

‘… … … … … … … … … … … …’

‘… … … … … … … … … … … …’

‘হুম। কালকে। কাল অফিস ছুটির পর ফোন দিবো।’

মার্চ ২০০৯

mf-hussain-1.jpg ………
মকবুল ফিদা হুসেন (১৯১৫–২০১১)
………
[২০০৬ সালে দুবাইতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাবার পর সেখানে মকবুল ফিদা হুসেনের বর্তমান সাক্ষাৎকারটি নেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এডিটর ইন চিফ শেখর গুপ্ত। এনডিটিভি ২৪.৭’র ওয়াক দ্য টক অনুষ্ঠানে এটি সম্প্রচারিত হয়।–বি.স.]

অনুবাদ: শামীমা বিনতে রহমান

শেখর গুপ্ত: এম.এফ হুসেন দুবাইতে কি করছেন? এটাতো নিয়্যুর্ক বা প্যারিস, শিল্পকলা বিকশিত কোন পরিচিত স্থানও নয়!

হুসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি/অংশ–০১
মকবুল ফিদা হুসেন: আসলে আমি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করি। গত পঞ্চাশ বছরে আমি পৃথিবীজুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার কোথাও কোন স্টুডিও নাই। আমি কেবল রঙ সাথে রাখি এবং উঠে পড়ি কোন হোটেল রুম অথবা কোন বন্ধুর বাড়ি অথবা যে কোথাও এবং শুধু ছবিই আঁকতে থাকি। আমার ধারণা, আমার কাজ করার ধরন একজন শিল্পীরই ধরন . . . ৩/৪ বছর হলো আমি এখানে এসেছি, আমার কাছে এর কারণ মনে হয়, এটা এমন এক শহর, যেটা দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছে। গত ২৫ বছর ধরে আমার ভাইয়ের এখানে বসবাসের কারণে প্রায়ই এই শহরে আমার আসা হয়েছে। মরুভূমি থেকে একটা শহরে পরিণত হতে দেখেছি এখানটিকে।

. . . তারা পুরা স্বাধীনতা দেয়। আইন শৃঙ্খলা না ভেঙে এখানে তুমি যা খুশি করতে পারো। তাই এখানে আসার সিদ্ধান্ত নেই এবং কাজ করছি . . . বছর তিনেক আগে এখানে আমার একটা প্রদর্শনী হয়েছিল এবং লোকে তা পছন্দ করেছে। আমি এখন আরব সভ্যতা নিয়ে কাজ করছি, আল-আরব। নাস্তিবাদের জায়গা থেকে নয়, জ্যোতির্বিদ্যা, ভ্রমণ, বিজ্ঞান সব কিছুতে আরব সভ্যতা কীভাবে মানব সভ্যতায় সহযোগিতা করেছে সেই জায়গা থেকে। এর ওপর ভিত্তি করে এরমধ্যেই বেশ কিছু স্কেচ করে ফেলেছি এবং মনে হচ্ছে চিত্রকর্মের সংখ্যা হবে প্রায় ৯৯টি ।

আমি পুরা দুনিয়ার নাগরিক, একজন চিত্রশিল্পীর যা হওয়া উচিৎ, কারণ তার নজর হচ্ছে দৃশ্যমান পৃথিবী। যদিও গত ৬০/৭০ বছর ধরে আমার মূল নজর হলো ৫ হাজার পুরানো ভারতীয় সভ্যতাকে চিত্রকর্মে ধারণ করা। আমি তাই করছিলাম সেখানে, রামায়ণ এবং মহাভারতকে চিত্রকর্মে প্রকাশ করেছি এবং দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় ঘুরে বেড়িয়েছি। কেন আমার দীর্ঘ ভ্রমণের এমন তিয়াসা, এর একটা কারণ আছে, মাত্র দেড় বছর বয়সে আমি আমার মাকে হারাই এবং তুমি যদি মায়ের সেই ভালোবাসা-টানের অভাব বোধ করতেই থাকো, মায়ের সেই কোল, ওম, তাহলে পৃথিবীর কোথাও সেই স্থান নাই . . . এটাই মূল কারণ। পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় আমি যে নারী দেখেছি, প্রত্যেকের মধ্যে আমি আমার মাকে খুঁজে বেড়িয়েছি, বেড়াচ্ছি। খুব পষ্ট করে বললে, আমি এই-ই খুঁজে বেড়াচ্ছি, কারণ ভারতীয় সংস্কৃতির সার কথাই হলো শক্তি, নারী।

শেখর: যখন লোকে আপনাকে সবচে খ্যাত নির্বাসিত ব্যক্তি হিসাবে দেখে, কেমন মনে হয় তখন?

হুসেন: আমার সত্যি এ পৃথিবীর প্রতি হাসি পায়। ‘নির্বাসন’ কী জিনিস? গত ৫০ বছর ধরে আমি দুনিয়া জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এ কারণে? আমি পুরা সময় কাজ করে যাচ্ছি, এখানে নির্বাসন নামক কোন বস্তু নাই। প্রায় বছর তিনেক আগে আমি এখানে আসি এবং স্টুডিও স্থাপন করি, কারণ এটা ভারতের খুব কাছে এবং বহু বছর ধরে আরব বিশ্ব আর ভারত নিজেদের অনেক কিছুই পরস্পরের সাথে লেনদেন করে আসছে। এমনকি আমি যখন লন্ডন যাই, তখনো সেটাকে আমার আধা ভারতই মনে হয়, সব কিছুই অনেক আপন-আপন লাগে। একমাত্র যখন আমি নিয়্যুর্ক যাই, আমার মনে হতে থাকে আমি একজন বহিরাগত।

মকবুল ফিদা হুসেনের পেইন্টিং
(বড় আকারে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন।)

শেখর: অ্যামেরিকায় নিজেকে আপনার বহিরাগত মনে হয় কেন?

হুসেন: প্রথম কথা, আমি ৫ হাজার বছর পুরানো একটা দেশের লোক বিধায় যেইখানে অ্যামেরিকা মাত্র ২শ বছর পুরানো। আর ২শ বছর কিছুই না; তাদের আরো ১ হাজার বছর লাগবে বুঝতে…

শেখর: কিন্তু, আপনি যদি নিয়্যুর্ক, প্যারিস—এমনকি লন্ডনেও যদি চিত্রশিল্পী হিসাবে কাজ করতেন, তাহলে ভারতে আপনাকে যার মুখোমুখী হতে হচ্ছে, তা হতে হতো না?

হুসেন: আমি কী মোকাবেলা করছি? কিচ্ছু না। মামলাগুলা, ওসব তুচ্ছ বিষয় আমার কাছে। সব সত্ত্বেও আমরা তো একটা গণতান্ত্রিক দেশে বাস করি। এবং আমি যা কিছুই এঁকেছি তা রিয়ালিস্টিক নয়, সেগুলি আমি সমসাময়িক প্রবণতা অনুযায়ী, আধুনিক চিত্রশিল্পের বৈশিষ্ট্যের ভিতরেই এঁকেছি! সুতরাং এটা বোঝা খুব মুশকিল। আমার চিত্রকর্মে, যেখানে নারীর শরীর এঁকেছি, সেটা নগ্ন কিন্তু সেই শরীর বাস্তববাদী নয়। আমার চিত্রকর্মে নারীর শরীরের প্রত্যেকটা অংশের ডিটেইল আমি আঁকি না, যেমনটা এমনকি আমাদের মন্দিরগুলাতেও দেখা যায়। নগ্নতা হলো বিশুদ্ধতা এবং শক্তির রূপক।

শেখর: তো আপনি ভাবছেন লোকে এসব বুঝতে পারছে না? নাকি তারা জেনেবুঝে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বুঝতে না চাওয়াটাকে বেছে নিয়েছে?

হুসেন: আমি আসলে কারণটি জানি না, কিন্তু মনে হয় এটি জানতে সময় লাগবে। যেমন ধরুন, রেনেসাঁসের পর য়্যুরোপে যখন ইমপ্রেশনিস্ট ধারা এলো, ওটা প্রত্যাখ্যাত হলো। ওরা এটাকে অর্থহীন বলেছিল, কিন্তু আজ এটা ধ্রুপদী শিল্প হয়ে উঠেছে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে কনটেম্পোরারি আর্টিস্টদের কাজের মাধ্যমে বড় একটা শিল্প-আন্দোলন গড়ে উঠেছে। শত শত আর্টিস্ট আঁকছেন এবং এদের সবাই এটির (ইমপ্রেশনিস্ট ধারা) উপর ভিত্তি করেই কাজ করছেন।

শেখর: তাহলে হয়তো সেটা ছিল তার সময় থেকে খানিকটা এগিয়ে থাকা একটা সৃজনশীল আইডিয়া?

হুসেন: সব সময়ই তা আছে। ভিজ্যুয়াল আর্ট সবসময় সময় থেকে এগিয়ে থাকে; কারণ, জীবন ও প্রকৃতির নির্দিষ্ট কাঠামোর পরিবর্তনগুলি তারা আগেই দেখতে পায়। বস্তুজগতকে যেভাবে সে ওলট-পালট করে ফেলেছে তাতে মানুষ একটা শক্তি বটে! যেইভাবে সে আরেকটা পৃথিবী তৈরি করেছে!

শেখর: এটা আপনাকে উদ্বিগ্ন বা হতাশ করেছিল কী? আপনি সারা জীবন নানা বিতর্ক মোকাবেলা করে আসছেন, কিন্তু নির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ের ক্ষেত্রে?

হুসেন: মোটেই না। মামলাগুলা চলছে, কিন্তু কেউ আমার কাজ করাকে থামায় নি। এবং বিষয় হচ্ছে, যে কাজ আমি ২০/৩০ বছর আগে করে এসেছি, এখন তো আমি তা করবো না। এমনকি আজকের দিন পর্যন্তও আমি এমনটাই করছি।

শেখর: কিন্তু এ সময়ে এটা সহিংস হয়ে উঠেছে, এক জায়গায় হামলা হয়েছে, সেখানে কিছু ক্ষয়-ক্ষতি, ভাঙচুর হয়েছে।

হুসেন: না, সেখানে কিছুই ঘটেনি। কোন ভাঙচুর হয় নি। কে বলেছে ওরকম ঘটনা ঘটেছিল? সব ঠিক আছে, প্রতিবাদ এবং সবকিছু। কিন্তু তারা কখনো আমার ক্ষতি করে নি এবং আমি যা কিছু করে বেড়াই, তা থেকেও আমাকে থামিয়ে রাখে নি।


হুসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি/অংশ–০২

শেখর: আপনি বলছেন, ভারত থেকে আপনার চলে যাওয়ার সাথে আপনাকে নিয়ে বিতর্কের কোন সম্পর্ক নাই?

হুসেন: না। কোন সম্পর্ক নাই।

শেখর: কিন্তু সেখানে একটা লম্বা দূরত্ব এখন। আমাদের মধ্যকার অনেক প্রশংসাকারী এখন মনোকষ্টে আছেন।

হুসেন: আমি এসব সম্পর্কে আসলে জানি না। ৩০ ডিসেম্বর কোলকাতায় আমার একটা প্রদর্শনী শুরু হতে যাচ্ছে এবং আমি সেখানে থাকবো।

শেখর: যারা আপনার চিত্রকর্ম নিয়ে হতাশ ছিল, মামলা দায়ের করেছিল, তাদের উদ্দেশ্যে কি কিছু বলার আছে?

হুসেন: বিষয়টা এখন আদালতে আছে। সেই মানুষগুলা হলো যারা ক্ষিপ্ত হয়েছিল। আমি কীভাবে প্রতিটি ব্যক্তি, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের কাছে যাবো! এটা খুব কঠিন।

শেখর: কিন্তু আপনি কাউকে কাউকে আহত করেছেন বলে কি অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন?

হুসেন: এরইমধ্যে আমি বলেছি যে, আমি যা করেছি তা দৃঢ় বিশ্বাস এবং ভালোবাসা নিয়েই করেছিলাম। কিন্তু এরমধ্যে যদি কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগে, আহত হন, তাহলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

শেখর: এবং আগে আপনি যেরকম বলেছিলেন যে আল্লাহ এক। কারণ, এখন যদি আমি আপনার কাছে মানুষের মনের ভেতর থাকা যাবতীয় প্রশ্ন, সমালোচনাকে নির্দয়ভাবে হাজির করি . . .

হুসেন: দেখুন এই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে, আমরা বরং সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলি . . .এই পৃথিবীর ইতিবাচক দিকগুলা নিয়ে কথা বলি, কারণ আমাদের এতো বড় দেশে ওসব তুচ্ছ জিনিসের মতো। বাইর থেকে আসা সব ধরনের শক্তিকে ধারণ করে আমরা একটা একক সংস্কৃতি বিকশিত করতে পেরেছি, যাকে বলা যেতে পারে সমন্বিত সংস্কৃতি।

শেখর: যখন কার্টুন বিতর্ক নিয়ে ব্যাপক চলছে, এসময়ে এরকম কথা জটিলতা বাড়াবে . . .

হুসেন: আমি এসবের সাথে একেবারেই যুক্ত না. . .কেবল সৌন্দর্য নিয়েই আমার যত উদ্বেগ, ব্যাস! আর কিছুই আমাকে বিব্রত করে না।

শেখর: ব্যাপক ভক্তি, অনুরাগ নিয়ে আপনি হিন্দু দেবতা-দেবীর ছবি এঁকেছেন, যেমন: গণেশ দেবতা। অনেক দিন ধরে এটা আপনার সাথে রূপক হয়ে আছে।

হুসেন: ভারতে আপনি যে কোন বাড়িতে যান, শুধু একটা না অনেক গণেশ আপনি দেখতে পাবেন।

শেখর: আপনার নিজস্ব যে ব্যক্তিজীবন, সেখানে কি আপনি ধার্মিক?

হুসেন: আমি একজন বিশ্বাসী এবং একজন অবিশ্বাসী নই।

শেখর: আপনি প্রার্থণার কোন ধরন অনুসরণ করেন কি, মন্দির বা মসজিদে কি যান আপনি?

হুসেন: আমি জন্মেছিলাম পাণ্ডারপুরে এবং আমার মা একজন মহারাষ্ট্রীয় এবং ‘খুদাই কসম’ বলার বদলে তিনি বলতে অভ্যস্ত ‘দেবাশীষ শপথ’ . . . আমি সেইরকম একটা পরিবেশে বেড়ে উঠি।

শেখর: আশ্চর্য নই যে, এরকম একটা সঙ্গতিপূর্ণ সমন্বিত সংস্কৃতির মধ্যে আপনি বড় হয়েছেন; তো, লোকে যে প্রশ্নটি আপনার দিকে ছুঁড়তে চায়, তা হলো, যদি আপনি হিন্দু দেবী-দেবতার ছবি আঁকতে পারেন, তাহলে নবীর চিত্রকর্ম করেন নি কেন?

হুসেন: আমি কিছুই বলতে চাই না।

শেখর: আমরা সবাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যখন লন্ডনে আপনার ডান হাতটা ভেঙে গেল।

হুসেন: হুম, দুই মাস আমার ডান হাত প্লাস্টারে ঢাকা ছিল। তো আমি ভাবতে থাকলাম, তাহলে এখন কী করা যায়! তখন আমি আমার বাম হাত দিয়ে আঁকা শুরু করলাম। আমি রঙের গঠন-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিতে থাকলাম। ৬০/৭০ বছর ধরে আঁকা-আঁকির পর এখন আপনার কারিগরি দিক নিয়ে ধস্তাধস্তির কিছু নাই, কিন্তু কল্পনাশক্তি নিয়ে করার আছে অনেক কিছু।

শেখর: বিবর্তনের প্রেক্ষিত থেকে যদি বলি, আপনার চিত্রকর্ম এখন কোন দিকটিকে বিকশিত করছে?

হুসেন: এখন আমি ব্যাপক আগ্রহী ইতিহাস বিষয়ে. . . এবং ইতিহাস হতে হলে তোমার কী করা উচিৎ! তিন বছর আগে আমি একটা সিরিজ কাজ করেছি, ‘ বিশ শতকের এক চিত্রশিল্পীর স্বপ্ন’, কারণ, মানব সমাজে এই বিশ শতক সবচে বৈচিত্রপূর্ণ সময়কাল। অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। ১৯১১ সালে প্রথম বিমান উড়লো, চাঁদে পৌঁছে গেল ১৯৫০-এর মধ্যে। সকল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য, কবিতা–যা যা কিছু ঘটেছে আমি সব কিছুর ছবি এঁকেছি ওই ধারাবাহিক চিত্রকর্মে। ২৫টি চিত্রকর্ম আমি শেষ করে ফেলেছি, এর একটা প্রদর্শনী এখানে হবে প্রথম, এরপর সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য জায়গায়। বাকি ৭৫টি ছবি আঁকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এখন। আরেকটা বিষয় হলো, আরব সভ্যতার ইতিহাস। কিন্তু সবকিছুর পরও চিত্রশিল্পীর পরিবর্তে আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে চাই। কারণ আমি চলচ্চিত্র মাধ্যমকে সবচে বৈচিত্র্যপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করি, যেখানে সব ধরনের শিল্পমাধ্যমের আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে–সাহিত্য, সঙ্গীত, কবিতা, সবকিছুই এখানে আছে। বাণিজ্যিক বিষয়-আশয়কে আমি পাত্তাই দেই না, কিন্তু সৃজনশীলতা থাকতে হবে। ৪০/৫০ বছর পর আমি সুযোগ পাই এবং মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়ে বানাই গজগামিনী চলচ্চিত্র। গত ৫০/৬০ বছর ধরে আমি পেইন্টিংয়ে যে নারী খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, মাধুরীর মাধ্যমে তা একটা পূর্ণতা পায় গজগামিনীতে, পুরা ছবিটাই শরীরী ভাষার ওপর আর তার প্রত্যেকটা নড়ন-চড়ন এত্তো ভারতীয়। এর ১০/১১ বছর পর আমি আরেক জনের মধ্যে নারী গঠন প্রকৃতি খুঁজে পাই, ভারতীয় সিনেমায়, তিনি হলেন অমৃতা রাও। তিনি ম্যাঙ্গালুরের, হাতে গোনা কয়েকটা ছবিতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু সুরাজ ভারজাত্যের ভিভাহ চলচ্চিত্রে, শহুরে ছোট্ট মেয়ে ও তার মূল্যবোধ ফুটিয়ে তুলেছেন এমন ভাবে, আমার ধারণা ওইটা একটা অসাধারণ চলচ্চিত্র হয়েছে। এবং এটা বিশাল জনপ্রিয়তার দিকে এগিয়ে যাবে। আমি এখন এই সিনেমা নিয়ে কাজ করছি। এরমধ্যে ছবিটা ১০বার দেখে ফেলেছি।

শেখর: তো আপনার ৭৫ বার দেখা হাম আপকে হ্যায় কৌন ছবিটি ছুঁতে এটির এখনো লম্বা পথ বাকি আছে?

হুসেন: না, আমার ধারণা আমি কমপক্ষে ১শ বার ছবিটি দেখবো। কারণ ছবিটিতে বাঁধন হারা কল্পনার চাইতে অনেক বেশি রকমের বাস্তবতা আছে . . . যেমন একটা বিশাল বাড়ি এবং ব্যাপক নাচ এবং গান। এটা ফ্যান্টাসি থেকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনার ছবি, একটা ছোট্ট শহরে একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প।

শেখর: তাছাড়াও সিনেমা বানানো দিন দিন ভালো হচ্ছে ভারতে!

হুসেন: আমি দুইটা ছবি বানিয়েছি। আমি বানিয়েছি গজগামিনী এবং আমি বানিয়েছি টেল অব থ্রী সিটিজ, কারণ আমি খুব শহর প্রিয় মানুষ। আমার একটি প্রিয় শহর হায়দ্রাবাদ, আরেকটি জয়সালমির এবং তৃতীয়টি আমি মনে করি প্রাগ, পুরা য়্যুরোপের সবচে সুন্দর শহর।

শেখর: অমৃতা রাওয়ের কোন দিকটি বিশেষভাবে আলাদা মনে করেন? এবং আমি জানি বোম্বে সিনেমার অনেক অভিনেত্রী সত্যিই হতাশ হয়ে পড়বে।

হুসেন: এখানে অনেক ভালো অভিনেত্রী আছে, কিন্তু আমার গভীর মনোযোগ হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত যে কোন কিছুতেই। আপনি ফ্রান্স, অথবা নিয়্যুর্ক অথবা যে কোথাও একটা বড় মাপের চিত্রকর্ম করেন, কিন্তু এরমধ্যে যদি ভারতীয় সংস্কৃতির নির্যাস থাকে–আমি গভীর গুরুত্ব নিয়েই যুক্ত থাকবো! আমার পুরা জীবনে আমি তা অব্যহত রাখবো। যদিও আমি অন্য দেশগুলাতে কী হচ্ছে, তা খারিজ করে দেই না। আমি যথার্থই আছি পুরোগামী শিল্পী সত্তার সাথে এবং অ্যামেরিকা যা বানাচ্ছে, যেমন অ্যান্ডি ওয়্যেরোল। সে একজন ভালো চিত্রশিল্পী ছিল, কিন্তু সে এমন এক সংস্কৃতিকে ধারণ করে, সেটা হলো জাঙ্ক কালচার। সেটা সেখানে বৈধ বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পন্ন, কিন্তু আমি এখানে বসে কেন সেটা অনুকরণ করবো?


হুসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি/অংশ–০৩

শেখর: আপনি বলেছিলেন ভিভাহ, হাম আপকে হ্যায় কৌন ছবির খণ্ডাংশ। অমৃতা রাওকে কি আপনি মাধুরী দীক্ষিতের একটা অংশ মনে করেন?

হুসেন: অভিনয়ের ক্ষেত্রে সে একেবারেই নতুন, কিন্তু তার ভেতরে প্রচণ্ড সম্ভাবনা আছে। সে কারণে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি তার ওপর কাজ করবো এবং আমার বাছাইয়ে ভুল হয়েছে, বলা যায় কালেভদ্রে।

শেখর: তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন গ্ল্যামার, সৌন্দর্য, আকর্ষণ এসব বাছাইয়ের বিষয়ে আপনার পছন্দ কখনো ভুল হয়নি?

হুসেন: ঠিক বলেছেন। এটাই হচ্ছে জীবনের প্রবল উৎসাহ ও আনন্দকে ধরে রাখার গোপন কথা। সেটা এমন যে তুমি সব সময়, প্রেমে থাকবে। নারীর সাথে শুধু প্রেম নয়, সত্যিকারের আবেশ নিয়েই থাকবে!

শেখর: এবং অমৃতা রাওয়ের বিশেষ ভিন্নতা বা আলাদা দিক কী?

হুসেন: আমি বলেছি-ই, আমি খুব গুরুত্ব দেই শারীরিক ভাষা এবং আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায়, এরকম যে কোন কিছু। যা কিছুই তুমি সৃজন করো না কেন, সেটা তোমার নিজস্ব মাটি থেকেই আসা উচিৎ, কেবল তখনই এটা হবে অকৃত্রিম, খাঁটি।

শেখর: আমাদের চলচ্চিত্রে অ্যামেরিকা বা পশ্চিমা প্রভাব যে বাড়ছেই খেয়াল করছেন কি?

হুসেন: অ্যামেরিকানরা মাত্র ২০০ বছরের পুরানো . . .তাদের একমাত্র দিক হলো তাদের জ্যাজ সঙ্গীত ছিল এবং এটা কেবল কালোদের দ্বারাই হয়েছিল এবং ভূমিকাটা ওদের।

শেখর: ইরাক ও অন্যান্যস্থানে প্রেসিডেন্ট বুশ যা যা করে বেড়াচ্ছেন, আপনার কি মনে হয় সাম্প্রতিক এ রাজনীতি আ্যামেরিকা সম্পর্কে সন্দিগ্ধ করে তুলেছে?

হুসেন: এখন আপনাকে রাজনীতির ভেতর ঢুকতে হবে। আমি এখানে বেশি মনোযোগ দেই না, কেবল ওপর থেকে ভাসা ভাসা দেখি, তাতে আমার যা মনে হয়, তা হলো পুরা দুনিয়াই জানে আ্যামেরিকা কী করে বেড়াচ্ছে। এবং এটা অ্যামেরিকার ইতিহাসের খুবই দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু এরকম কিছু ব্যক্তি, এরা আসবে এবং হারিয়েও যাবে।

শেখর: কিন্তু আ্যামেরিকা অনেক দারুণ দারুণ সিনেমা বানাচ্ছে!

হুসেন: না। বিখ্যাত সিনেমাগুলা ইতালিরই বানানো।

শেখর: আপনার পরবর্তী ছবি কবে নাগাদ প্রদর্শনীতে যাবে এবং কী থাকতে যাচ্ছে তাতে?

হুসেন: গজগামিনী নামে আমি একটা ধ্রুপদী চলচ্চিত্র বানিয়েছি, আরেকটি হচ্ছে টেল অফ থ্রী সিটিজ, এবং তৃতীয় যে ছবিটি আমি বানাতে চাই, তা একটা কমেডি ছবি। এটা এমন এক কমেডি ছবি হবে, যাতে হাস্যরস, রসিকতা থাকবে–আর তা পুরোপুরিই ভারতীয় হাসি-তামাশা-কৌতুক।

শেখর: ছবির প্লট সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

হুসেন: না, আমি বলবো না, কত কত চলচ্চিত্র নির্মাতারা চারপাশে বসে আছে . . .

শেখর: ঠিক আছে, ছবিতে অমৃতা রাও থাকছে, এছাড়া আর কাদের বিবেচনা করছেন?

হুসেন: ছবিতে দুটি মেয়ে চরিত্র আছে। দেখি, আমি এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি। কিন্তু আমি স্ক্রিপ্টের একটা অংশ লিখে ফেলেছি।

শেখর: চলচ্চিত্র বানানোর প্রতি আপনার যে আকর্ষণ, তা কি শুরুতে আপনি যেভাবে আঁকাআঁকি শুরু করেছিলেন, সিনেমার বিজ্ঞাপন পোস্টার তৈরি করা–সেখান থেকেই কি এসেছে?

হুসেন: যখন আমি বোম্বে এলাম, তার আগে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আমি আঁকা-আঁকি করি। এরমধ্যে প্রতিকৃতি আঁকার জন্য আমি স্বর্ণপদকও পেয়ে গেছি, তারপর আমি বোম্বে আসি। তখন আমাকে কেউ চিনতো না, থাকার জন্য আমাকে আয় করতে হতো, আমি তখন সিনেমার বিজ্ঞাপনের জন্য পোস্টার আঁকার কাজ করতে শুরু করি। এবং তখন থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাতা হবার জন্য আমি আকুল আকাঙ্ক্ষা অনুভব করতাম। এই মাধ্যম খুবই ব্যয়বহুল। ১৯৫৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম অংশগ্রহণে আমি ১৫ ফুট লম্বা একটা চিত্রকর্ম করি, এর নাম ছিল জামিন, মানে পৃথিবী। এর অনেকগুলো ভাগ ছিল, বলা যায় প্রায় সিনেমাটিক একটা চিত্রকর্ম ছিল সেটা। আমি সেখানে ভারতীয় গ্রামীণ জীবন-যাত্রা তুলে নিয়ে এসেছিলাম।

শেখর: বোম্বের সেই দিনগুলি সম্পর্কে আমি অনেক মুগ্ধতা নিয়ে পড়েছি। বোম্বের রাস্তায় একজন জনপ্রিয় নারী অভিনেত্রীকে পুরোপুরি ডিজাইন করে আপনি কী করে ছবি আঁকলেন! দুর্গা কোটে, ৪০ ফুট লম্বা আকৃতি!

হুসেন: কাজ করার জন্য আমার কোন জায়গা ছিল না, এবং আমরা খুব গরিবী হালে জীবন চালাতাম। সেই সময়ে বোম্বেতে ট্রাম ছিল। তো ট্রাম চলা শুরু করতো দুপুর ১২টা থেকে মধ্যরাত ১২ টা পর্যন্ত। তো মাঝরাতের ১২ টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত আমি রাস্তায় বিশাল কাট আউট রাখতাম এবং শেষ করতাম।

শেখর: এবং আপনি তো ধাবাতেও কাজ করেছেন?

হুসেন: হ্যা, ঠিক। যখন আমি প্রথম বোম্বে আসি, আমার বাবার তখন চাকরি ছিল না এবং আমাকে কোন আর্থিক সহায়তা করতে পারেন নি। সুতরাং আমি বললাম, আমার জন্য আমাকে কাজ করতে হবে। এবং আমি ফুটপাতে ঘুমাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। তখন আমি চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন পোস্টার বা ব্যানারের জন্য কাজ করা শুরু করলাম এবং দিন শেষে ৬ আনা করে পারিশ্রমিক পেতাম।

শেখর: ৬ আনা থেকে এখন এক চিত্রকর্মের জন্য মিলিয়ন ডলার, কেমন লাগে ভাবতে?

হুসেন: সেটা আমাকে অনেক সুখ এবং আস্থা দিয়েছে। এখন, অকশান হাউজগুলা এসব করছে, নিলামকারী এবং ডিলাররা এটা করছে। ‘ না অ্যায়ে কি খুশি, না যায়্যে কা গাম; কামায়ে দুনিয়া, খায়েন হাম!’ জীবনের এ স্তরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তখন আমি অনেক পরিশ্রম করতাম আর এখন লোকজন অনেক পরিশ্রম করে টাকা যোগাড় করছে আমার চিত্রকর্ম কেনার জন্য।

শেখর: যখন আপনার একটা ছবির জন্য কোটি বা মিলিয়ন ডলারের হাঁক ওঠে, তখন কি হাসি পায়?

হুসেন: আসলেই আমার হাসি পায়। তারা যেমন বলে তুমি সবসময় হাসির ব্যাংকে যাও। একটা সময় ছিল যখন চিত্রকলাসহ অন্যান্য শিল্প মাধ্যমগুলা কেবল ধর্মীয় স্থানগুলাতে সীমাবদ্ধ ছিল। ৩০ থেকে ৪০-এর দশক সময়টাতে লেখক-সমালোচকরাই সিদ্ধান্ত নিতেন। এখন এটা মার্কেটিংয়ের হাতে চলে গেছে। আমার মনে হয়, শিল্পীদের কাছে পরবর্তী ধাপ এমনভাবে আসবে যে কাজের স্বকীয় গুণাবলীই কেবল কথা বলবে।

শেখর: তো অত টাকা দিয়ে আপনি কী করেন?

হুসেন: প্রথম কথা, আমি তো ছবি বানিয়েছি, ছয় কোটি রুপী খরচা হয়েছে তাতে। ওতে পুরাটাই আমার টাকা ছিল। তারপর দিল্লী, আহমেদাবাদ, হায়দ্রাবাদ আর ব্যাঙালোরে আমি জাদুঘর বানিয়েছি। এটা একটা অলাভজনক বিষয়। সেখানে গ্রন্থাগার, থিয়েটার এবং সবকিছু আমি করেছি—যেটা করা উচিৎ ছিল সরকারের, কিন্তু আমি করেছি, কারণ আমি এটা করতে ভালোবাসি। তারপর আমার ছয় ছেলে-মেয়ে, এটা একটা বিশাল পরিবার। তো তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাকে এখনও কাজ করতে হয়। এটা আসলে পুরাপুরিই টাকার ব্যাপার, যেটা আসেও কঠিন পথ দিয়ে, কষ্টোপার্জিত, যায়ও কঠিন পথ দিয়ে।

শেখর: কিন্তু আপনি তো টাকার কাছে বন্দী হয়ে পড়েননি?

হুসেন: ব্যাংকে আমার কোন টাকা নেই। আমার ইচ্ছার কোন অবদমন নাই। কাল থেকে যদি আমার কিছুই না থাকে, তাহলে আমি রাস্তায় বসে পড়তে পারি।

শেখর: আপনি তো মার্কেটিংয়েও পাক্কা।

হুসেন: এমনকি মার্কেটিং একটা শিল্পের ধারা। মার্কেট কিভাবে হয়, এ নিয়ে আমি একটা পুরা নতুন ধারা তৈরি করেছি। এবং এ ব্যাপারে আমি রক্ষণশীল না। আমি আমার কাজের জন্য মার্কেট তৈরি করি। এছাড়া সব বড় ব্যবসায়ীই এখন বাতিল হতে বসেছে।

শেখর: সমালোচকরা বলে হুসেন মার্কেটিংয়ের ওপর চলে। তিনি এখন ঘোড়ার ছবি আঁকবেন, নগ্ন পায়ে হেঁটে বেড়াবেন, এ সব কিছুই মার্কেটিং, কি মনে হয় আপনার?

হুসেন: এ ধারণার মধ্যে কোন ভুল নাই। কিন্তু যে মোদ্দা কথাটা আমি বলতে চাই, তা হলো যদি এটা কিছুই না হয়ে থাকে, তাহলে আগামী ১০ বছরও এটা টিকবে না।

শেখর: আপনার নগ্ন পায়ে হাঁটার ইতিহাস আমাদের বলেন। কিভাবে এটা শুরু হলো এবং কেন?

হুসেন: যখন তুমি কোথাও যাবে, তোমার যে দিকটা প্রথম লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, সেটা হলো তোমার পায়ের জুতা। এবং সেখান থেকেই তারা তোমার সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। ননসেন্স! এবং আমি ধাবায় যেতে খুবই ভালোবাসি এবং এসব কিছু এ কারণে যে আমার শুরুটা ছিল সেইরকম। এবং আমি হয়তো চাইলে ফাইভ বা সেভেন স্টার হোটেলে থাকতে পারি অথবা কোন মহারাজের অতিথি হতে পারি, কিন্তু রাত শেষে ভোরে আমি একটি ধাবাতেই যাই।

শেখর: কবে থেকে এটা প্রথম শুরু হয়?

হুসেন: প্রায় ৪০ বছর আগে। আমি খুব কবিতা ভালোবাসি, এবং কবি মুক্তি বোধ সে সময় দিল্লীতে গুরুতর অসুস্থ্য অবস্থায় চেতনহীন ছিলেন কয়েক মাস। তিনি মারা যান মে মাসে, আমি তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যাই, এবং তখন আমি হঠাৎ করে ভেবে দেখলাম, তার একটা একটা বুকলেট পর্যন্তও প্রকাশিত হয় নাই, এত্ত অবহেলিত ছিলেন তিনি! হিন্দি কবিতায় তাকে আমি একজন বড় মাপের কবি মনে করি। এবং ঠিক সেই সময় আমার এমন এক অনুভূতি তৈরি হয়েছিল যে, অবশ্যই আমারও কষ্ট পাওয়া উচিৎ। আমি জুতা খুলে নিলাম এবং মে মাসেই খালি পায়ে হাঁটা শুরু করলাম।

শেখর: মুক্তি বোধ সম্পর্কে কোন কিছু মনে করতে পারবেন কি?

হুসেন: আমি তার কবিতার কোন লাইনই স্মরণ করবো না. . .

শেখর: আপনি বলছিলেন যে আপনি কবিতা লিখতেন, আমাদের কি সে সম্পর্কে কিছু বলবেন?

হুসেন: আমার স্কুলে পড়ার সময়ে আমি উর্দুতে লিখতে অভ্যস্ত ছিলাম, কিন্তু যখন আমি বোম্বে আসলাম, আমি লিখতাম ইংরেজিতে। আমার একটা প্রকাশনা হয়েছিল জেনেভা থেকে, এবং এটাকে বলা হতো ‘পোয়েট্রি টু বি সিন’। এরমধ্যে একটা কবিতা মনে পড়ছে, যেটা পুরোটাই ছিল প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতো–‘তোমার ভেতরে জন্মানো আমার শব্দরা এখনও অনুচ্চারিত . . .’ এই সব লাইন আমি লিখেছিলাম চেকোশ্লোভাকিয়ায় থাকা আমার গার্লফ্রেন্ডকে। ১৯৫৬ সালে আমি তার সাথে প্রথম দেখা করি এবং আমি তার অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। এবং প্রতিদিনই আমি তাকে চিঠি লিখতাম এবং সেসব চিঠিতে এসব কবিতা থাকতো. . .‘ তোমার ভেতরে জন্মানো আমার শব্দরা এখনও অনুচ্চারিত।’

শেখর: তো চিত্রকলা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, কবিতা, কোন বিষয়টি আপনাকে অনেক তরুণ, গতিময় এবং উজ্জীবিত রাখে, পদ্ধতিটা বলেন আমাদের!

হুসেন: কম খাও এবং সবসময় প্রেমের মধ্যে থাকো, এমনকি ৯০ বছর বয়সেও। কেউ কেউ এমন বলে থাকেন, ‘ প্রতিটা সফল মানুষের পেছনে একজন নারী থাকেন’ এবং আমি বলি,‘ এসব কি বলছ? নারী থাকেন প্রত্যেকটা সফল চিত্রকর্মের পেছনে।’

শেখর: আপনি বলছেন প্রত্যেকটা সফল চিত্রকর্মের পেছনে একজন নারী থাকেন, এবং আমি শুনেছি দুবাইয়ে আপনি আরেকটা বড় শিল্পকর্ম করছেন যাতে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন আপনার জীবনের নতুন তন্ময়াচ্ছন্নতা, অমৃতা রাও! এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

হুসেন: যখন আমি কাজটা করছিলাম, তখন সে আমাকে অনুরোধ করলো যে সে অবশ্যই আমার চিত্রকর্মের ভেতর থাকতে চায়. . .তাই এইখানে আমি আছি, আঁকছি তাকে . . .
———————

অনুবাদকের নোট:

ভারতের ফোবর্স সাময়িকী তাকে অভিহিত করেছিল, ‘ভারতের পিকাসো’ নামে। পিকাসো তাঁর জীবদ্দশায় ব্যাপক আলোচিত সমালোচিত ছিলেন, মকবুল ফিদা হুসেন, সাধারণ্যে যিনি এম এফ নামে বেশি পরিচিত, তিনি তাঁর চিত্রকর্মের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শুধু বিতর্কিতই ছিলেন না, প্রাণনাশের হুমকি বয়ে বেড়িয়েছেন, ৯ জুন লন্ডনের রয়েল ব্রমটন হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার আগ পর্যন্ত। প্রায় শতবর্ষী ( ১৯১৫-২০১১) এই শিল্পী লম্বা এক তুলি আর বিশাল ক্যানভাসে এঁকে গেছেন ভারতীয় সংস্কৃতির নানা দিক, সিরিজ পেইন্টিং করেছেন মোহন দাস কে গান্ধী, মাদার তেরিজা, রামায়ণ, মহাভারত, ব্রিটিশ রাজের ওপর।

কাজ করছিলেন আরব সংস্কৃতি নিয়ে। ২০০৬ সালে, ভারতের বিশাল মানচিত্র জুড়ে শিল্পকলা, ফোকলোর, সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে নগ্ন নারী শরীরকে চিত্রায়িত করলে পরে ক্ষেপে ওঠে অনেকেই, যেন নগ্ন নারী শরীর জাতীয়তাবাদী চেতনায় ছুরি বসিয়েছে। তাঁর জীবন নাশের হুমকি তো আসেই, অনেকগুলা মামলা হয় আদালতে। এর আগে ১৯৯৮ সালে হিন্দু দেবী-দেবতার পোর্ট্রেইটে ন্যুডিটি থাকায় শিবসেনার নেতৃত্বাধীন বজরং দল তাঁর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়, শিল্পকর্ম ধ্বংস করে। ২০০৬ সালেই এম এফ চলে যান দুবাই, স্বেচ্ছা নির্বাসনে। ২০১০ সালে কাতারের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, ফেরেন নি আর নিজ দেশ ভারতে। চিত্রকর্ম ছাড়াও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও ব্যাপক আলোচিত হন তিনি।

তাঁর নির্দিষ্ট কোন স্টুডিও ছিল না কোথাও। রাস্তা, হোটেল, বন্ধুর বাড়ি—যখনই মন জেগে ওঠে, শুরু করেন রঙ-তুলির ধারালো খেলা। খালি পায়ে হেঁটে বেড়ান, পরোয়া করেন না অনেক প্রচলিত সংস্কার। গভীর আবেশিত প্রেমে তন্ময় ছিলেন গোটা জীবন, অপ্রকাশ্যও নয় তা।

—–

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা

লাল ব্যাসার্ধ্ব (গল্প)
অরুন্ধতী রায়ের নিউইয়র্ক বক্তৃতা: ইনস্ট্যান্ট-মিক্স সাম্রাজ্যীয় গণতন্ত্র (একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি)
সরল রেখা (গল্প)
মকবুল ফিদা হুসেনের সাক্ষাৎকার
বারান্দার টবে তামাক চাষ (গল্প)

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: শামীমা বিনতে রহমান
ইমেইল: sbinte@gmail.com





ফেসবুক পেজ । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিয়া হাশান — মার্চ ৩১, ২০০৯ @ ৪:১৮ অপরাহ্ন

      ভালো লাগল, তবে শুরুর উজ্জ্বলতা শেষের দিকে পাইনি।

      – জিয়া হাশান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আফসানা — এপ্রিল ৩, ২০০৯ @ ২:১৬ অপরাহ্ন

      শুরুটা খুব সুন্দর, গল্পটা খুব পরিচিত:) কেন জানি না… শেষটা বিশেষ ভালো লাগেনি। ওভারঅল গল্পটা বেশ ভালো:)

      – আফসানা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফ জেবতিক — এপ্রিল ৪, ২০০৯ @ ১:১১ পূর্বাহ্ন

      গল্পটা ভালো লেগেছে।

      – আরিফ জেবতিক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল — এপ্রিল ৫, ২০০৯ @ ১১:১৩ অপরাহ্ন

      সমকামীতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু পড়তে তো চেয়েছি গল্প। গল্প তো নাই। আছে সমকামীতার বর্ণনা। এধরনের গল্প কি সুস্থ্যতা? ভালো গল্প চাই। যেন পড়তে ভালো লাগে।

      – আশরাফুল

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাজুল হাসান — এপ্রিল ১৬, ২০০৯ @ ৮:০৯ অপরাহ্ন

      ‘‌জটিল’‌ গল্প …।

      – মাজুল হাসান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rased Mehdi — এপ্রিল ২৮, ২০০৯ @ ২:১৯ অপরাহ্ন

      শামীমা বিনতে রহমানের গল্পটি’র সম্ভবতঃ কেউই শেষ পর্যন্ত পড়ছেন না। কারণ শেষ অংশে এসেই গল্পটি গল্প হয়ে উঠেছে। গল্পলেখক শামীমাকে ধন্যবাদ।

      – Rased Mehdi

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিবিড় — জুন ১৫, ২০০৯ @ ৯:৩০ পূর্বাহ্ন

      “আজিব”
      শামীমা বিনতে রহমান সব সময় এই শব্দটা ব্যবহার করেন।

      – নিবিড়

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাঈদ ফেরদৌস — december ১৭, ২০০৯ @ ৭:৩৮ পূর্বাহ্ন

      পড়লাম, মজা লাগলো, বর্ণণা কোথাও কোথাও প্রবল হয়ে উঠলেও সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদটা মজার…। অভিনন্দন।

      – সাঈদ ফেরদৌস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Jahangir — মে ২৩, ২০১১ @ ৬:১৩ অপরাহ্ন

      ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ার পর যে অন্ধকার–উপমাটা ভালো লেগেছে। এরপর সয়ে যাওয়ার মতই গল্পের শেষটুকু।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com