বেযোগাযোগ: কী ফারাক বন্ধু কিংবা প্রতিবন্ধুতে?

মানস চৌধুরী | ২৯ মার্চ ২০০৯ ১২:৪১ পূর্বাহ্ন

প্রথম উপলব্ধি দ্বিতীয় মৃত্যুর পর!
বিপুল যখন মারা যায় তখন আমি পাঁচের কাছাকাছি। বড়দের কাছে শুনেছি ও গোদ রোগে মারা গেছিল। কেউ একজন মরে গেলে তার বা আশপাশের মানুষের কী হয় সে বিষয়ে বাস্তবে কোনোরকম ভাবনা গড়ে ওঠেনি।
—————————————————————–
অসতর্ক থাকলেই মনে হতে পারে বার্ধক্য নৈঃসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। তা তো নয়। নিরন্তর সঙ্গপিপাসু মানুষ সঙ্গপিপাসার ভাষা হাতড়াতে থাকেন। আর পান না। আবার ভাষা যখন পান, তখন ভাষা বিনিময়ের কোথাও কোনো সুড়ঙ্গ থাকে না। তারপর কেবল খাবারের একটা পোঁটলা হাতে ‘গৃহে’ ফেরেন মানুষ। ‘গৃহ’—যেখানে মানুষে ঘুমায়, যেখানে ঘুম থেকে উঠে সকালের আলো দেখে। এই সংজ্ঞাতেই কেবল সকলের গৃহ থাকে, এমন একটা পরিসর যেখানে মানুষ ‘ফিরতে’ পারেন।
—————————————————————-
মানুষজনের থমথমে মুখ দেখেছি। তাছাড়া পরে বিপুলকে আর দেখতে পাইনি কখনো। শোক বলে যে অনুভূতিমালার কথা বলা হয়ে থাকে সেই অনুভূতির কিছুমাত্র আমার ছিল বলে মনে করতে পারি না। বরং ছিল বিহ্বলতা। সেই বিহ্বলতার খানিকটা নিশ্চয় পরের দিনগুলোতে বিপুলকে আর দেখতে না পাবার কারণে, কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত সেটা এই কারণেও যে একটা সঠিক অনুভূতির জন্য হাতড়াচ্ছিলাম। হাতড়ানিকে বিহ্বলতা ছাড়া আর কী নামে ডাকা যায়! গভীরভাবে ভাবতে বসলে আমার এমনকি, ইদানীং, এও মনে হয় যে অন্যের মৃত্যুর পর কী কী ধরনের বহিঃপ্রকাশ থাকতে হয় সেটার একটা শক্তপোক্ত বিধিমালা আছে চারপাশে। হতে পারে বিপুলের মারা-যাওয়ার অভিজ্ঞতা, আনকোরা বলে, কোনো বিধিনিষেধ শিখে না-উঠবার বিহ্বলতায় পড়েছে। হতে পারে।

কিন্তু যখন কায়েদুরের ছোটবোন তিনদিনের জ্বরেই মারা গেল তখন এই বিচ্ছেদের অর্থ মালুম করতে আমার বেশি কসরৎ করতে হয়নি। বয়সে তখন আমি আর একটু বড়। হয়তো নয় বা দশ। শৈশবের এলাকা ছেড়ে আরেকটা জায়গায় তখন আমাদের পোঁটলা-পুঁটলির সংসার। কায়েদুর ছিল ভীষণ শান্ত, অথচ ভীষণ উদ্যমী। গার্হস্থ্য অর্থনীতি ভাল বুঝতাম না বলে কেন স্কুলের পর কায়েদুর মাঝেমধ্যেই বাদাম বিক্রি করতে যেত সেটা নিয়ে ভাবতাম মাঝেমধ্যে। কিন্তু আবার ওর অমিত প্রাণশক্তি দেখে গর্ব লাগত। বন্ধু শব্দটা তখন দস্তুর ব্যবহার করি অসংশয়ে। শব্দটা কানে এলে, কিংবা বইয়ে পড়লে, জ্ঞাত শাস্ত্রের ছলকানি বোধ করি। আর শব্দটা উচ্চারণের সময়ে একটা গাঢ় আত্মবিশ্বাস ঝিলিক মারতে থাকে। যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপর প্রাজ্ঞ অধিকারবোধের একটা চাবিকাঠি। সেই কায়েদুর বোন মারা যাবার পর যেন আরেকটা কায়েদুর, এমনকি আরেকটা প্রাণী। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে, কিংবা তাকাতে আতঙ্ক বোধ করতে-করতে একটা তামাম ব্রহ্মাণ্ড পরিক্রমা সাঙ্গ হয়েছিল আমার। মাত্র অল্প ক’টি দিনেই, এবং ভাষার বাহ্য কোনো সেতু ছাড়াই। কায়েদুরের মুখ বেয়ে, কিংবা মুখের উছিলায় আমি পরিক্রমা করছিলাম বিস্মৃত নানান সব পকেট। বিপুল থেকে শুরু করে নান্নুকে কবে অসহিষ্ণু কনুইয়ে ঠেলে দিয়েছি সেসব অবধি। একটা পর্যায়ে বোনটা আর কোথাও নেই, কেবল কায়েদুরের মুখ। আবার আরেকটা পর্যায়ে যেন কায়েদুরের মুখটাও কোথাও নেই আর, আছে কেবল বিচ্ছেদের অবোধগম্য নিরাকার পাণ্ডুলিপি। সেই থেকে মৃত্যুরা সব বিচ্ছেদ। আবার বিযুক্তিরাও মৃত্যু। একেকটি অটুট মৃত্যু। অগণ্য এবং নিরন্তর।

‘আঁখি জেগে থাকে বন্ধু…’
প্রথমবার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলায় যখন এই গানটি শুনি তখনও আমি দশের নিচে। আমার জন্মস্থান এবং প্রথম বিচরণলোক বরগুনা ছেড়ে চলে এসেছি। এটা একেবারে দৈবাৎ যে শৈশবে বরগুনায় আমার সাথিদের একজনের নাম ছিল আঁখি। সেই আঁখির কোনোরকম রূপকল্পনা আমার পক্ষে এখন আর সম্ভব নয়। কিন্তু মেহেরপুরের প্রথম বছরগুলোতে সম্ভব ছিল। শৈশবের একটা চেনাজানা আঁখিকে আমি তখন কল্পনা করতে পারতাম। এবং গানটা একটা আজব অনুরণন সমেত মাথায় ঘুরঘুর করতে শুরু করল, করতেই থাকত পরে। আঁখিদের বাড়িটা ছিল তালুকদার বাড়ি। বিরাট বড়। তাতে অনেক গাছপালা, দুইটা পুকুর তার মধ্যে একটা পদ্মপুকুর এবং ওর ঠাকুমা ছিলেন। বাড়ির তিনটা ঢুকবার-পথের মধ্যেরটা দিয়ে ঢুকলে ঠাকুরঘর বা মন্দির বাঁ-হাতে। আর তার পাশের টগর গাছটার ফুল মন্দিরপাশের পুকুরটাতে পড়ে থাকত। সেই বিরাট গাছপালাওয়ালা বাড়িটার আরেক প্রান্তে ছিল একটা কামরাঙ্গা গাছ। সেই গাছ থেকে সাদাশাড়ি-পরা ঠাকুমা কামরাঙ্গা পেড়ে দিচ্ছেন আমাদের দু’জনকে। একটা প্রান্তসীমাহীন কিন্তু নিশ্চিত দৃশ্য। এর বাইরে আরও অজস্র গাছের স্মৃতি এখন কেবলই একটা জমাট সবজেটে অন্ধকারের মতো। কিন্তু স্মৃতিচারণের সেই নিয়মিত কালে হয়তো নিশ্চিন্ত কিছু হাতড়ানি সম্ভব হতো, এখন সেটাও মনে নেই। যতোটা মনে পড়ে কাগজ-কলম নিয়ে আঁখিকে আমি চিঠি লিখতেও বসেছিলাম কখনো। পাঠানো হয়নি হয়তো, আর পাঠালেও পৃথিবীর ইতিহাসে আরেকটি বালসুলভতার বাইরে এটা কোনো নয়া সংযোজন হতো বলে মনে হয় না।

ফলে এখানে মুখ্য বিষয় চিঠিখানা পাঠানো বা না-পাঠানো নয় কিন্তু আঁখিকে আবিষ্কারের এই প্রচেষ্টাটা নিয়ে আমি ভাবি। সেই নিপাট শৈশবে যখন সত্তার কোনোরকম যৌনরূপ গড়ে উঠেছে বলে স্বীকৃতি নেই, তখন কেন একজন ‘সমবয়সী’ এবং ‘নারী’কে যোগাযোগের তাগিদ স্বতন্ত্র এবং খাঁ-খাঁ লাগা! কেনই বা রুমাপিসিকে এইরকম একটা চিঠি লেখার ইচ্ছে/তাগিদ/অনুভূতি হয়নি! নাকি হয়েছিল এবং স্মৃতিসেন্সরশিপে পড়ে গেছে তা?! রুমাপিসি যিনি আমাকে একনাগাড় গল্প পড়ে শোনাতেন নিবিড় মমতায় আর উৎসাহে, এবং ছিলেন আমার পয়লা বিস্ময়-মুগ্ধতা। বয়স আর লিঙ্গবোধ তাহলে মাথায় খোদাই করা হতে থাকে। এমনকি এত শৈশবেই! তাহলে সামাজিক খোদাইকৃত লিপিমালার বাইরে আমাদের অনুভূতির কী অর্থ, যদি নিজেরাই তা বদলে বা পল্টান দিতে না চাই!? দেখতে পাই, এসব ধারণার ব্যাপারে সসংশয়ী দূরত্ব চতুষ্পার্শ্বের অনুভূতি-চর্চায় কেন্দ্রীয়। যেন এসবের অর্থ সকলেরই জানা। আমরা কি মূলগতভাবে তাহলে হিপোক্রেইট?! নাকি এসব নাগরিক অভ্যাস আমাদের!

কল্পলোকের বন্ধু আর স্বর্গলোকের বন্ধু
ধরা যাক তার নাম মেরাজ। আমার থেকে বয়সে অনেকটা বড়। এবং পাড়ায় তখন জ্ঞাতিসম্পর্কের যা রেওয়াজ তাতে তাকে আমার মামা ডাকবার কথা। কিন্তু তিনি আমাকে নাম ধরে ডাকতে বলে এক কৌতুকের চোখে আমায় নিরীক্ষণ করতে থাকলেন। আমার সাহসে কুলালো না এবং তিনি সেটা জানতেন। ফলে রফাও করলেন তিনিই। পরস্পরকে আমরা বন্ধু সম্বোধন করব। বয়সে দ্বিগুণেরও বেশি একটা মানুষের সঙ্গে এরকম সমতার সম্পর্ক তখন আমার জন্য নতুন। বা এর আগে এই নিমিত্তগুলো তৈরি হয়নি। নানান সব গল্প তিনি আমার সঙ্গে করতেন, বা শুনতে চাইতেন আরও বেশি। আধাকল্পনা আর আধা নিজের মেধায় আমার শিশুসুলভ আস্থা মিশিয়ে আমি নানা কিছু বলে যেতাম। আমবাগানের নিচের মাচায় তিনি যখন বাতাস খেতেন কিংবা আম পাহারা দিতেন তখন পা ঝুলিয়ে-ঝুলিয়ে আমি শব্দাবলির রাজ্য বানাতাম। মেরাজ সচ্ছল পরিবারের ছিলেন। মাঝেমধ্যেই আমাকে কিনে দিতেন কিছু, বা চাইতেন বোধহয়। এভাবে চলল না। কখন যেন আমার স্কুলের সূচি বদলে গেল, তিনিও বোধহয় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর আমাদের দেখা হয় না। হঠাৎ একদিন একটা বিদেশী চিঠি এল। এই প্রথম। উত্তেজনায় খুলে দেখি বন্ধু সম্বোধনে এক দীর্ঘ চিঠি তিনি লিখেছেন। আর তাঁর ছবি। তিনি যে বিদেশ গেছেন আমি জানতাম না। আরও টাকা বানাবার জন্য তিনি সিঙ্গাপুর চলে গেছিলেন, তাঁর কুড়ি-ঊর্ধ্ব বয়সে। অগ্রজদের সঙ্গে সখ্য এরপরে খুব নিয়মিত একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। নাসির ভাই … মনা ভাই … রবু ভাই … কথা … কথা … কথা … শব্দের রাজ্য আর মূর্ত করবার খেলা … শব্দাবলির সঙ্গে আমার প্রণয়কালের সূচনা এরকম করেই ধীরে ধীরে পোক্ত হতে থাকে।

আমি ভাবতে থাকি আমার আত্ম-অবয়ব ইমারতের মতো বানিয়ে তুলতে এইসব স্থপতিরা, ধরা যাক নাসির ভাই, কি কখনো জানেন? জানা কি জরুরি?! বা কখনো আমাকে তালিকাকারে বলতে হলে আমিই কি সেসব স্থপতিদের ভূমিকা একটা একটা করে স্পষ্ট করতে পারব?! পারা কি সম্ভব?! পারা কি জরুরি?! কিংবা আরও ভয়ানক প্রশ্ন। ইমারতটা ছাড়া আর কিছুর সঙ্গে কি আমি লিপ্ত? আর কিছুতে কি আমি লিপ্সু? আর কিছুর পথে আমি কি অভীপ্স? … নিজের অবয়ব ছাড়া আর কিছু কি আমরা ধারণ করি?! কিংবা কারণ করি?! কোথায় থাকেন ‘বন্ধু’রা? নিজ অবয়বের মধ্যে একটা কুঠুরি কিংবা অলঙ্কার হয়ে, এমনকি হয়তো নিরাপত্তা আর দম্ভের প্রহরী হয়ে?! নাকি নিজ অবয়বের বাইরে কোথাও স্বতন্ত্র ‘বন্ধু’রা বাস করেন! আদৌ করেন?

“... সেই থেকে মৃত্যুরা সব 
                 বিচ্ছেদ। 
আবার বিযুক্তিরাও মৃত্যু। 
    একেকটি অটুট মৃত্যু। 
 অগণ্য এবং নিরন্তর।...”

কিন্তু দাশরথী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটা অন্তিম কথামালা আমার আর হলো না। তিনি আমার দাশু জ্যেঠু। হিসেব মতে বাবার বন্ধু, আসলে তাঁরও অগ্রজ বন্ধু। একটা রহস্যজনক আগুনে পৌরসভার বাজারে তাঁর কাঠের ৫ হাত গুণন ৫ হাত কুঠুরিটা পুড়ে যায়। অনেকের দোকানই পুড়ে যায়। তাঁর দোকানটা ছিল হোমিওপ্যাথ ডাক্তারির অফিসঘর। এই আগুনের আগ পর্যন্ত তিনি হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন। আসলে তিনি অনেক কিছু ছিলেন। ছোট্ট শহরের শিক্ষাসংগঠক ছিলেন। সহায়সম্পত্তি আর শ্রম দিয়ে স্কুল তৈরি করেছিলেন। সেই স্কুল নামজাদা হলো, কিন্তু তিনি ছিলেন বিস্মৃত। বিস্মৃত প্রতিষ্ঠাতা। একটা জটিল রোগে পা বেঁকে যাবার আগ পর্যন্ত তিনি ফুটবলারও ছিলেন। শুনেছি। দারুণ পড়ুয়া ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাল ছাত্র ছিলেন। কিন্তু পড়া শেষ করেননি। আর ছিলেন নিভৃত গবেষক। কিন্তু আমার শৈশবে তাঁর একমাত্র লোকজ্ঞাত পরিচয় ছিল অকৃতদার এক লুঙ্গি-পরুয়া হোমিওপ্যাথ ডাক্তার। আমার শৈশবের বয়সে তিনি দশ-কুড়ি বছর বাড়তি বোনাস দিয়ে দিয়েছিলেন অনায়াস ভঙ্গিতে। আমি হেঁটে হেঁটে তাঁর দোকানে যেতাম। রুগি থাকলে বলতেন ‘খোকা বস, তোর সঙ্গে আলাপ আছে।’ আর রুগি না থাকলে হাতের বইটা পাশে রেখে বলতেন ‘তারপর বল কী খবর?’ কিংবা ‘তোর সঙ্গে রাজীব গান্ধী নিয়ে আমার আরও কথা আছে।’ বা এরকম। ফলে বড় হয়ে যাওয়া ছাড়া আমার অনেক উপায় ছিল না। কিন্তু আগুন লাগার পর তিনি আর ডাক্তার থাকেন না। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি দূরারোগ্য রুগি হয়ে পড়েন। কিন্তু সেটা অনেক বছর পরের কথা। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। খবর পাই দাশু জ্যেঠু চলৎশক্তিহীন। ততদিনে কথার পাহাড় জমিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে অভিসারের জন্য তৈরি হচ্ছি। কিংবা সেই অভিসারটাকে এখন শনাক্ত করছি। আমি খবর পাই দাশু জ্যেঠু বাকশক্তিরহিত। … বাক … শক্তি … রহিত …। ওই জড়বস্তুটার সঙ্গে দেখা করতে আমার বাক এবং শক্তি দুই-ই অপ্রস্তুত থাকে। আমি মেহেরপুর গিয়েও শুয়ে-থাকা রুগিটাকে দেখতে যেতে চাই না। যাই না। তারপর ফিরে আসবার আগে একটা বিহ্বল চকিত দেখা করতে গিয়ে তাঁর চোখের দিকে তাকাই। তিনিও তাকান। এরপর আমাকে সংশয়ের রাজ্যে আর বেশিদিন না-রেখে তিনি মারা যান। আমি খবর পাই। … এরকম…। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে পড়ে আরও শৈশবের চাঁদসি দাদুর কথা। যদিও তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমি পাইনি। এমনকি তিনি মরে গিয়ে থাকলেও পাবার সম্ভাবনা নেই। কিংবা তাঁর মৃত্যু হয়েছে তখনই যখন আমি অনেক অনেএএএএক বছর পর খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে বের করেছি বরগুনার একটা প্রতিষ্ঠিত বাড়ির মালিক হিসেবে। এবং ডাক্তার নূরুল হক, আমার চাঁদসি দাদু, আমার পরিচয় জেনেও আমাকে আর ‘ধোনভাই’ বলে ডাকতে পারলেন না যে নামে তিনি আমার জন্মের পর ছয় বছর অবধি ডেকেছিলেন। আসলে কোনো নামেই তিনি আর ডাকতে পারলেন না। একটা কুড়ি-ঊর্ধ্ব হঠাৎ-দেখা “যুবকে”র সামনে দ্বিধাগ্রস্ত তিনি এক লহমায় পুরোটা কালকে মুছে দিলেন। … এরকম…।

আমি নিশ্চিত দাশরথী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে, কিংবা তাঁর উছিলায়, আমি রচনা করব আরেক প্রস্থ লিপিমালা। এই এখন যেমন করছি। কিংবা হামিদ বা হামদাকে যেমন আমার গল্পের নায়ক বানিয়েছি। এমনকি আমি নিজে ভিলেইন হয়ে হামদাকে নায়কের মর্যাদা দিয়ে আমার দ্বিতীয় গল্পটাই লিখেছি। হামদা বেঁচে আছে এবং ভ্যান চালাচ্ছে। দাশরথী বেঁচে নেই এবং বর্ণিল ডাক্তারি করছে না। কিন্তু আমি জানি, এই লিপিমালাগুলো নিজগুণে, আমার অস্তিত্বসাপেক্ষ। আর আমি এও জানি এই লিপিমালাগুলো এপিটাফিয়। একেকটা শব্দরাজ্যের স্মারক-লক্ষণা। একেকটা প্রণয়ের প্রস্তরখণ্ড যাতে ওই প্রস্তরটা দাঁড়িয়ে থেকে ঘোষণা দেয় ওখানে আমি ছিলাম। … আমি। জলের মতো, আর পাথরের মতো।

পত্রমিতালী থেকে ফ্রেন্ডসার্চ
চিত্রবাংলা পত্রিকাটি পয়লা কোথায় দেখি এখন মনে পড়ে না। কিন্ত পয়লা এর উপস্থিতিতে একটা শিরশিরে উত্তেজনা বোধ হয় যখন এতে পত্রমিতালী অংশটি লক্ষ্য করি। স্কুল ফাইনাল তখনো দিইনি। বোধহয় নবম বা দশম শ্রেণীতে পড়ি। যে বন্ধুর বাসায় আবিষ্কার করি সেখানে মাঝেমধ্যে আমরা ক্যারম খেলতে যেতাম। কোনো এক অজ্ঞাত এবং রহস্যজনক কারণে সেই বন্ধু তখনই ইংরেজি গান শোনার অভ্যাস রপ্ত করেছে। সেই পাঁড় মফস্বলের দোকানগুলোতেও তখন বনি এম কিংবা মাইকেল জ্যাকসনের লভ্য ক্যাসেটগুলোর বাংলাদেশী সংস্করণ পাওয়া যায়। এবং যে গুটিকতক নিম্ন-পনেরো কিশোর [এবং কিশোরী] তা সংগ্রহ করতে চেষ্টা করে সেই সহপাঠী বন্ধু তাদের মধ্যে প্রধান। তখনই সে কারো সাহায্য ছাড়াই দুলাভাইয়ের মোটর সাইকেল চালাতে পারে। রহস্য পত্রিকার প্রথম জমানাতেও সে ছিল প্রথম দিকের গ্রাহক বা পাঠক। এমনকি একমাত্র। ফলে সে ছিল সভ্যতায় প্রাগ্রসর, আমাদের সকলের থেকে। ফলে এটা সঙ্গতই যে পত্রমিতালীওয়ালা একটা পত্রিকা ওর বাসায় দেখে আমি অবাক হইনি। বরং তাজ্জব হয়েছিলাম এরকম একটা ব্যবস্থা দুনিয়াতে আছে জেনে। এবং বহুদিনের এক অমীমাংসিত বিস্ময় হঠাৎ করেই খোলাসা হয়ে গেছিল আমার কাছে। মেজমামা’র এক ‘পেন ফ্রেন্ড’ তাকে কলম, পত্রিকা আরও কীসব যেন ডাকযোগে পাঠিয়েছিল। আমি তখন অনেক ছোট, যখন ইউএস মিলিটারিও ইমেইল ব্যবহার করে না। কীভাবে বিদেশের ঠিকানা যোগাড় করে পোস্টাপিসে গিয়ে চিঠি পাঠিয়ে এই বন্ধুলাভ ঘটেছে সে কথা মেজমামা বোঝানোর চেষ্টা করলেও আমার মুখ হাঁ আরও বেড়েই যেত। কলমটি আমাকে কখনোই তিনি ধরতে দেননি। উত্তরকালে আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে সেটার কারণ এর গায়ে মুদ্রিত নগ্ন নারী-ছবি। যাহোক, চিত্রবাংলায় সেই পত্রমিতালী অংশ বন্ধুলাভের একটা অজানা জগৎ সম্বন্ধে অভিভূত করে দিয়েছিল। কেবল তাই নয়, এতে মুদ্রিত আত্ম-বিজ্ঞাপনগুলো সেই মোহকে প্রলুব্ধ করেছিল একটা সম্ভাব্য ‘ব্যক্তিসত্তা’য়। ওই ক’টি অক্ষরে কেমন জ্বলজ্বল করছে একেকটা ব্যক্তি এবং কেমন অকপট তাঁরা তাঁদের কাঙ্ক্ষাকে মেলে ধরছেন! এক অদ্ভুত নিমন্ত্রণ। নানা কারণে নিজের একটা বিজ্ঞাপন কখনো আর লেখা হয়নি, কিন্তু একটা আনদেখা জগতের হাতছানি হয়ে বহুকাল আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমাকে।

বরং, উত্তরকালে, সাধারণ হিসেবে যখন প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় বাস করছি, এরকম মিতালী পাতাতে দিব্যি উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এতদিনে ভঙ্গি আর মাধ্যম আমূল বদলে গেছে শহুরে পেশাজীবী মানুষজনের জন্য। ইমেইল এখন ‘বন্ধু’লাভের উপায় বা মাধ্যম। এখানে মানুষ ‘বন্ধু’ খোঁজেন, সাথি খোঁজেন, বিয়ের অংশীদার খোঁজেন। আরও নানান কিছু খোঁজেন। খুঁজতেই থাকেন। ক্রমাগত তাঁরা খোঁজেন … যতক্ষণ না একটা নিবিড় অন্বেষণের অবসাদে ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর ঘুম ভেঙে হঠাৎ একদিন যখন মনে পড়ে যে অমুকের সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ নেই, তখন ইমেইলে লেখেন ‘কী হে আওয়াজ নেই কেন!’ ও প্রান্ত থেকে উত্তর আসে ‘ভীষণ ব্যস্ত।’ ইদানীং এই আমার ভার্চুয়্যাল ‘বন্ধু’চর্চা।

সবাই ব্যস্ত। সবারই কি ব্যস্ত থাকার কথা না? কিন্তু কেনই বা সবাই ব্যস্ত থাকবে? হোয়াইট কলার পেশাজীবীদের ব্যস্ততা কী নিয়ে? এমন হতেও পারে যে ব্যস্ততা একটা ভঙ্গি, এমন একটা ভঙ্গি যা নিঃসীম নিপাট অবোধগম্যতা থেকে তৈরি হয়েছে। এমন এক অবোধগম্যতা যা সমকালকে ঠাহর করতে চাইবার, বা না-চাইবার, নিরন্তর অনুশীলন। এমন একটা ভঙ্গি যা নিয়ে গুছিয়ে বসে কখনো ভাবা হয়ে ওঠেনি। হতেও পারে। তার মধ্যে হঠাৎ করেই এক ইমেইল বান্ধব একটা বই পাঠিয়ে দিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণ-ইতিহাস নিয়ে। হঠাৎ। কিংবা হামবুর্গ থেকে একটা খেলনা টেলিভিশন কিনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আরেক বান্ধব। আবার ঢাকায় আমার একটা নিবাস নিশ্চিত করতে নিউজিল্যান্ডের ইমেইল বান্ধব ঢাকায় খোঁজ লাগাচ্ছেন। একটা ভোঁতা জীবনপ্রবাহে এগুলো ছলকানির মতো গায়ে জলের পরশ দিয়ে যায়। নতুন বৃষ্টিতে স্নানের উত্তেজনা মেখে তখন পরের প্রহরে নিশ্চিত উড়তে ইচ্ছা করে। ঠিক তখনি। কেবল তখনি।

তথাপি ৩৬ চৌরঙ্গী লেনের সেই বৃদ্ধা
কিন্তু বিষয়টাকে একদম অন্যভাবে ভাবা যায়। আচ্ছা, যদি ও প্রান্ত থেকে উত্তর আসত ‘আমি জানি না কী আওয়াজ দেব, হাতড়ে হাতড়ে আমি আওয়াজ পাচ্ছি না; কোনো ভাষা আর তৈরি হচ্ছে না’, তাহলে কিন্তু সঙ্কটটা একদম অন্য জায়গায় থাকত। হঠাৎই নিরর্থকতার একদম মুখোমুখি হয়ে যেতে পারতাম। ‘বেযোগাযোগ’-এর অন্তঃসার দেখে ফেলতে পারতাম। অনেকটা বাসায় ঢুকবার পথে গলির মুখেই অপেক্ষমান যমদূতের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার মতো।

সেটা আমাদের জ্যান্ত কিংবা ভার্চুয়্যাল বান্ধবেরা বলুন বা নাই বলুন, পরিস্থিতি কিন্তু তাই। নিরন্তর শব্দ হাতড়াচ্ছে আমার চারপাশের মানুষেরা। তাদের সেই হাতড়ানি বিহ্বল অস্থিরতার মতো পাক খেতে থাকে, আর ঘন মেঘের একটা দেয়ালের মধ্যে অভিমন্যুর মতো ঘিরে ফেলে। ধরা যাক আমাকেই।

“ক্রমাগত তাঁরা খোঁজেন
               যতক্ষণ না 
একটা নিবিড় অন্বেষণের 
                   অবসাদ 
ঘুম পাড়ায়ে দেয় তাদের ...”

সেই বৃদ্ধার গল্পটি একটা মেটাফরের মতো। খাবার বানিয়ে পুঁটলি করে নিয়ে তিনি গেছিলেন পুত্রবৎ স্নেহ করতেন যাকে তাঁর বাসায়, তাঁর জন্মদিনের কথা মনে করে। সেই পুত্র বৃদ্ধার বাড়িতে নিয়মিত আসত। প্রায়শঃই ওর বান্ধবীকে নিয়ে। কাচের বাইরে থেকে বৃদ্ধা দেখতে পেলেন জন্মদিনের উৎসব চলছে। নিতান্ত অনাহূত আর উপেক্ষিত বোধ করলেন তিনি। না, আসলে নিঃসঙ্গ বোধ করলেন। তিনি আর দরজায় টোকা দিলেন না। বৃদ্ধাটি বাসায় ফিরতে থাকলেন। তার সাথি হয়েছিল একটা কুকুর। বৃদ্ধার ধারণা হয় হাতের খাবারের লোভেই কুকুরটি পিছু নিয়েছে। বৃদ্ধা কুকুরটিকে সেই খাবার দিতেও চাইলেন। কেবল একটা শর্ত সমেত। বৃদ্ধার বাসা পর্যন্ত কুকুরটিকে সাথি থাকতে হবে। বৃদ্ধা ভাবেন, খাবারটা আগে দিয়ে দিলে কুকুরটা ফিরেও যেতে পারে। তিনি একা ওই পথটা পাড়ি দিতে চাইছিলেন না। অপর্ণা সেনের ছবিতে নৈঃসঙ্গের চিত্ররূপ এই বৃদ্ধাকে আশ্রয় করাতে বয়স একটা গহীন অর্থ পেয়েছে। সেটা গুরুতর। প্রায় চড় লাগিয়ে দেয় দর্শকের মস্তিষ্কে।

আবার সে কারণেই আমি বৃদ্ধার ওই অভিযাত্রাকে মেটাফর ভাবি। অসতর্ক থাকলেই মনে হতে পারে বার্ধক্য নৈঃসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। তা তো নয়। নিরন্তর সঙ্গপিপাসু মানুষ সঙ্গপিপাসার ভাষা হাতড়াতে থাকেন। আর পান না। আবার ভাষা যখন পান, তখন ভাষা বিনিময়ের কোথাও কোনো সুড়ঙ্গ থাকে না। তারপর কেবল খাবারের একটা পোঁটলা হাতে ‘গৃহে’ ফেরেন মানুষ। ‘গৃহ’—যেখানে মানুষে ঘুমায়, যেখানে ঘুম থেকে উঠে সকালের আলো দেখে। এই সংজ্ঞাতেই কেবল সকলের গৃহ থাকে, এমন একটা পরিসর যেখানে মানুষ ‘ফিরতে’ পারেন। নগর শ্রমিকরা ‘ফেরেন’ তাঁদের কলোনিতে। নগর ভিক্ষুকেরাও ‘ফেরেন’ তাঁদের আগের রাত কাটিয়েছেন যে রাস্তায়। গার্মেন্টস শ্রমিকেরা ফেরেন তাঁদের পাড়াতুতো এজেন্টের ঠিক-করে-দেয়া চার চৌকির কুঠুরিতে। নগরের প্রান্তিকেরা ‘ফেরেন’ ঠিক আগের রাতেই যেখানে ঘুমিয়েছিলেন। আর নগর-অস্থিরেরা ফেরেন নিশ্চিত ছোট কিংবা বড় ফ্ল্যাটে। এভাবে ‘ফিরতে থাকেন’ তাঁরা। একা একা।

সম্পর্কের কর্পোরেটায়ন (নিশ্চয়ই মুদ্রায়নের পরের স্তর)
‘বন্ধু’ ধারণা নিয়ে আমার অনেক সংশয় আছে। প্রথম কারণ হলো মানুষে এত অর্থে এটার ব্যবহার করে থাকে যে আসলে পরিশেষে নিরর্থক হতে বাধ্য। কিন্তু মুখ্য কারণ হচ্ছে এই শব্দটার উপর সাধারণত অনেক ওজন দেয়া হয়ে থাকে—নৈতিকতার, আদর্শের এবং ফিল্যানথ্রপিকতার—আর আমার পাথুরে আর অকেজো মনে হয়। অকেজো মনে হয় কারণ সেই ওজনটা আসলে অনুশীলনে সিদ্ধও নয়। অনুশীলন একদম ভিন্ন। নাগরিক ‘বন্ধুত্বে’ এর সঙ্গে আছে মধ্যবিত্ত ‘জীবনাচরণের’ (লাইফস্টাইল) একটা বিদঘুটে ঐক্য। সর্বোপরি, মধ্যবিত্ত বন্ধুত্বের একটা স্তরে একে অযৌন প্রমাণের মরিয়াভাব থাকে। এর সবগুলো কারণই আমাকে এই বর্গ/পদ/ধারণা নিয়ে সংশয়ী করেছে। আমার ঈমান এমন পাৎলা বলেই কিনা জানি না, বন্ধু বলতে যা কিতাবে লেখা হয়ে থাকে, কিংবা যেসব মীথ দাঁড়িয়ে আছে, সেমতো কিছু আমার নেই। যা দু’চারজন ছিলেন, হয়তো আমার নিজের মুদ্রাদোষে, বা মুদ্রাগুণে, বিগত হয়েছেন আমার থেকে। সেই থেকে আবার বিযুক্তিরাই মৃত্যু!

এরকম একটা চলমান দুর্ঘট আটত্রিশ বছর বয়সের অভিযাত্রার অবধারিত অংশ বলেই হয়তো, বন্ধুত্ব নিয়ে আমার কোনো ডগম্যা নেই, কিংবা নেই কোনো মর‌্যালিস্ট অবস্থান। যা আছে তাকে নৈর্লিপ্তি বলার সমস্যাটা আবার তাত্ত্বিক; তাহলে তো আমি এ বিষয়ে লিখতেই বসতাম না। বিষয়টাকে বরং একটা পরিস্থিতি হিসেবে দেখা যায়। অনেকগুলো মানুষের চেহারা আমার মাথায় ক্রিয়া করে যাঁদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নাকি শত্রুত্ব সে নিয়ে কেবল আমি দ্বিধান্বিত তা নয়, বরং তৃতীয় পক্ষও নিঃসংশয় হতে পারেন না। এমনকি আমি এই মীমাংসা নিয়ে বিশেষ ভাবিতও নই। লোকজন যাকে বন্ধুত্ব বলে সংজ্ঞা দিতে থাকেন, কিংবা ঘোষণা, সেটা অনেকের সঙ্গেই আমি টের পাই না। এমনকি ক্রমাগত বয়স্ক হতে হতে আমি টের পাই, হঠাৎ কোনো রাতে কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে, কিংবা সারাদিনের যে কোনো সময়ে, যে কথিত বন্ধুত্ব কারো সঙ্গেই আমি টের পাই না। অন্যরাও যে টের পান সেরকম কিছু বলেন না। কিংবা অব্যক্ত কোনো ক্রিয়া থেকেও আমার মালুম হয় না। কিন্তু তাঁরা যে অবন্ধু এরকম কোনো ফয়সালাও আমার হয়ে ওঠে না। হয়নি। শত্রুত্ব ঘোষণারও কোনো সুযোগ বা কারণ থাকে না। ফলতঃ এক সংজ্ঞাহীন সম্পর্কে থেকে যাই আমরা, বন্ধুশাস্ত্র অনুযায়ী। কিন্তু অন্য সময়ে আবার সাক্ষাতের বাসনা করি। এমনকি সেই সাক্ষাৎলাভে কী লাভ হবে সে ব্যাপারে কোনোরকম ধারণা ছাড়াই। ফলতঃ বন্ধুত্ব, আমার জন্য, নেহায়েৎ ধোঁয়াচ্ছন্ন এক কনসেপ্ট, অহেতু যদি নাও বলি। তবে আমি টের পাই নানান মানুষ পরস্পর বন্ধু হয়ে থাকেন এবং কখনো কখনো আমি এমন কিছুর মধ্যে থাকি যাকে অনেক মানুষ বন্ধুত্ব বলে অভিহিত করে থাকেন। বিষয়টাকে না-সংমিশ্রিত হয়ে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এবং অনায়াসে আমি, এসকল জিজ্ঞাসা সমেতই, মানুষজনকে বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে থাকি; অন্ততঃ এ কারণেও যাতে সমতটের প্রচেষ্টা নিয়ে তাতে সংশয় তৈরি না হয়।

বন্ধুত্ব-ভাবনা কতকগুলো প্রিমাইজ বা পূর্বানুমানের উপর দাঁড়ানো। কিন্তু মনুষ্য-সম্পর্ক তো আইডিয়া নয়, ক্রিয়া। পরন্তু যেসব প্রিমাইজ লোক-মুখেমুখে মীথ, তাই নিদারুণ লোভনীয়, কিংবা কিতাবে কিতাবে মহার্ঘ্য, সেসব খুব দ্রুত বদলে গেছে। এবং বদলটা কেবল যেসব সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলা হচ্ছে তারই নয় বরং তামাম মনুষ্য-সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ঘটছে। একটা বৌদ্ধিক সংশয় হিসেবে আমি ভাবতে প্রবৃত্ত হই এরকম বন্ধুত্ব কিছু কখনো ছিল না, কোথাও ছিল না। কারোরই ছিল না। এই সংশয় মাথায় নাড়াচাড়া করতে করতে আমি আবার সতর্ক হয়ে উঠি। নিজেকে শাসন করি এই বলে যে: এভাবেই একটা পেশাদার ঈর্ষা সুগঠিত হয়। ফলে বৌদ্ধিক সংশয় প্রত্যাহার করে নিই।

সাংবাদিকতা ও যোগাযোগের শিক্ষক কাবেরী গায়েন একটা চিত্তাকর্ষক গবেষণা করেছেন (নারী ও প্রগতি, সংখ্যা ৩, ঢাকা)। তাঁর বক্তব্য, পুরুষদের বন্ধুত্বের কাহিনী ইতিহাসে কিংবা সাহিত্যে যেরকম প্রতিষ্ঠিত সেরকম নারীদের বন্ধুত্ব নয়। এসূত্রে, তাঁর প্রতিপাদ্য হচ্ছে গ্রামের নারীদের বন্ধু নেই। যদি আমি তাঁর বক্তব্য ধরে থাকতে পারি, তাহলে আমার তখন থেকেই মনে হয় গ্রামের নারীদের সখীজগৎ যে সুবিন্যস্ত ছিল সেটারও বহু আলামত আছে। ক্ষুদ্রঋণ এবং অপরাপর উন্নয়ন প্রকল্প সেই সখীজগৎ থেকে নারীদের উৎখাত করেছে। এ নিয়ে নিশ্চয় আরও আলাপ করতে পারব আমরা। যেসূত্রে এই প্রসঙ্গ এখানে টানছি তা হলো অন্ত্যজ মানুষের বন্ধুজগৎ থেকে, এমনকি গোটা কর্মলোক থেকে, আধুনিকতার প্রকল্পগুলো তাঁদেরকে উচ্ছেদ করেছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে।

কিন্তু মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের কী বন্ধুত্ব ক্রিয়াশীল আছে?

সফলদের একটা নেটওয়ার্ক! কিংবা ‘সফল’ এবং ‘সাফল্যকামী’দের একটা মিথোজীবী নেটওয়ার্ক। একজন অন্যজনে প্রবিষ্ট আছেন বিশেষ ব্যবসাক্ষেত্রে, কিংবা ব্যবসাকালীন ‘হাইহ্যালো’ পানাহারে। কিংবা ‘সফল’ বসেন কাচঘেরা অফিসে, অন্য ‘সফলে’র সঙ্গে মোবাইল-সংলাপ ওইদিনের লাঞ্চমেনু নিয়ে, পরবর্তী বিজনেস/কনফারেন্স ট্রিপ নিয়ে, নিদেন পক্ষে পরের প্রজেক্ট ও তার প্রসপেক্ট নিয়ে; অথবা অন্যত্র ক্যামপেইন প্রগ্রাম নিয়ে, টিভির পরের প্যাকেজের স্পন্সর খুঁজবার সম্ভাবনা নিয়ে, পরের কন্ট্রাক্টটা পাবার জন্য কার সঙ্গে দেখা করা যেতে পারে তা নিয়ে; কিংবা আরও অন্যত্র কোন ‘বড়’ লেখক কাকে বই বের করবার জন্য ‘উৎসাহ’ দিচ্ছেন, প্রকাশককে উপযাচক হয়ে বলছেন তা নিয়ে, কোন এনজিও ডিরেক্টর কাকে যে-কোনো-বেতন চেয়ে নিয়ে জয়েন দিতে বলছেন…। ইত্যাদি। বছরে কয়েকটা ইভেন্টে পরস্পরের বাসা পর্যন্ত আসা যাওয়া—বাচ্চাদের জন্মদিন, ম্যারেজ ডে, বড়জোর বিশ্ববিদ্যালয়-এ্যালামনাই উৎসব। আমি কল্পনায় এইসব সম্পর্করাজির শব্দমালা শুনতে চেষ্টা করি। চেষ্টা করি বুঝতে যে কোন ভাষারাজ্যে এই বন্ধুত্ব বিরাজমান। কল্পনা করা ছাড়া আমার জ্ঞাত হবার রাস্তা নেই কোনো। কিন্তু এর নাম আমি জানি। কর্পোরেট-বন্ধুত্ব। সম্পর্কের এই পর্যবসন/রূপান্তরকে বন্ধুত্বের কর্পোরেটায়ন বলতে পারি।

আমার কিছুই যায় আসে না।

শব্দের রাজ্যে প্রণয়
কিন্তু শব্দপ্রণয়ের কামজ্বর নিয়ে আমি দিন গুজরান করি।
মস্তিষ্কে শব্দের রাজ্য।
রাজ্যে মস্তিষ্কের শব্দ।
শব্দে রাজ্যের মস্তিষ্ক।
প্রণয়াকাঙ্ক্ষা আমার শব্দাবলির সঙ্গে, মস্তিষ্কের সঙ্গে, কিংবা রাজ্যের সঙ্গে। এমন এক রাজ্য, হয়তো, যা কেবল শব্দাবলিতে সৃজিত মূর্ত ও গতিশীল হয়, আমাকে লিপ্সু করে তোলে। আমি নিশ্চিত হতে পারি না।

এই কাঙ্ক্ষা আসলে একটা অভিযাত্রা। বন্ধু বা অবন্ধুতে কিছু ভেদ নাই। বন্ধু বা শত্রুতেও ভেদ নাই। এমনকি এসব বর্গবিভাজন কোথাও কোনো অর্থসিঞ্চন করে না। করে কেবল অভিযাত্রা, লিপ্সা। আসঙ্গ একটা অভিযাত্রা। অধুনা কালে গন্তব্য নিশ্চিত জেনেও এই অভিযাত্রা। এই অভিযাত্রা ছাড়া ‘আমি’টাই লুপ্ত হয়ে যায়। যে মৃত্যুজ্ঞান বিযুক্তিকে মূর্ত করে তুলেছে, সেই মৃতুজ্ঞান পুনর্স্থাপন করবার জন্য এই অভিযাত্রা ছাড়া রাস্তা নাই কোনো। আমি জানি।

মৃত্যুই কেবল সঙ্গলিপ্সার অন্ত ঘটায়। অন্যের মৃত্যুতে এই খতিয়ান দুরূহ হয়ে পড়ে। প্রতিটি মৃত্যু। প্রতিটি অটুট মৃত্যু। এবং অগণন। তুলনায়, ‘নিজ’ এর মৃত্যু অনায়াস ও সাশ্রয়ী।

লিপ্সার অন্তে মৃত্যু। অথবা অনন্ত লিপ্সার মৃত্যু। এই আমার পদ্ধতি।

পশ্চিম শেওড়াপাড়া, ঢাকা॥ ১৯শে জুলাই ২০০৭

____________________________
সম্পাদকের নিমন্ত্রণে, এবং ছোটকাগজের লেখক হবার প্রলোভনে, এই রচনাটি আমি প্রায় দুই বছর আগে লিখি এবং মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা-তে মুদ্রিত হবে বলে আশা রাখতে থাকি। কোনো কিছু কারণে পত্রিকাটি প্রকাশ পায় না, তাই আর্টস-এ নিবেদন। কবিসভার পুরনো একটা ইমেইল-আড্ডাতে এই লেখার কিছু ভাবনাসূত্র প্রকাশিত ছিল। পরে মশিউল আলম, মী.র.ত্রৈ.প. সম্পাদক, ওই ভাবনাসূত্র দিয়ে লেখা বুনতে বলেছিলেন। কবিসভা ও মশিউল উভয়েই আমার কৃতজ্ঞতাভাজন।

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনিকা শাহ — মার্চ ২৯, ২০০৯ @ ৩:২৫ পূর্বাহ্ন

      ভিন্ন ধরনের লেখা। মানস চৌধুরীর কাছ থেকে এ ধরনের লেখা আগে পাইনি বলেই বোধহয় ভিন্ন মনে হচ্ছে…। খুব ভাল লাগল।

      – আনিকা শাহ

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com